📄 দুঃখের পর সুখ আসে
হে মানুষ! ক্ষুধার জ্বালার পর আসে তৃপ্তির সুখ। পিপাসার যন্ত্রণার পর আসে প্রশান্ত নিবারণ। বিনিদ্র জাগরণ শেষে আসে শান্তির ঘুম। অসুস্থতার যন্ত্রণা শেষে আসে সুস্থতার প্রহর। পথহারা খুঁজে পাবে পথের দিশা। দুঃখ-পীড়িতজন পাবে সুখের দেখা। আঁধার যাবে কেটে।
فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِي بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِنْدِهِ *
অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেবেন। [মায়েদা: ৫২]
রাতকে সুখবর দাও আলোকিত ভোরের। দুশ্চিন্তাগ্রস্তকে সুখবর দাও ত্বরিত আগত সুদিনের। বিপদগ্রস্তকে সুখবর দাও পরম প্রভুর মহানুভবতার। মরুভূমির প্রান্তর যখন সুদীর্ঘ অনুভূত হবে, তখন বুঝবে খানিক বাদেই দেখা দেবে সবুজ-শ্যামল উদ্যান। কান্নার পর আসে হাসি। ভয়ের পর আসে নিরাপত্তা। উদ্বিগ্নতার পর আসে প্রশান্তি।
আগুন পারেনি জ্বালাতে হযরত ইবরাহিম-কে। কারণ, প্রভুর আদেশ ছিল-
يُنَارُ كُونِي بَرْدًا وَ سَلْمًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ
হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। [সূরা আম্বিয়া: ৬৯]
সমুদ্র পারেনি ডোবাতে হযরত মুসা-কে। কারণ, তিনি একনিষ্ঠভাবে বলেছিলেন-
كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ
কখনোই নয়। আমার সাথে আছেন আমার পালনকর্তা। তিনি আমাকে পথ দেখাবেন। [সূরা শু'আরা : ৬২]
রাসুল ও গুহার ভেতর তাঁর সঙ্গীকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন-
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
পেরেশান হয়ো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। [তওবা : ৪০]
দুর্দশার শিকার ও হতাশাগ্রস্তরা সবকিছুতেই কেবল সংকীর্ণতা ও দুর্ভাগ্যই দেখে। এর কারণ হলো, তাদের দৃষ্টি ঘরের দরজা ও দেয়াল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। হায়! তারা যদি পর্দার অন্তরালের দৃশ্যও দেখতে পেতো! তাদের চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারণা যদি দেয়ালের ওপারেও পৌঁছত!
অতএব, হতাশ হয়ো না। মনকে ছোট করো না। অবস্থা সব সময় একরকম থাকে না। আল্লাহ-র দয়া ও অনুগ্রহ লাভ এবং সহজতা প্রাপ্তির জন্য অপেক্ষার চেয়ে উত্তম এবাদত আর নেই। সময় বদলায়। কালের বিবর্তন ঘটে। অদৃশ্য বরাবরই অপ্রকাশ্য। জগতনিয়ন্তার প্রতিদিনই নব নব শান হয়ে থাকে। মনে রেখো, দুঃখের পরই মিলে সুখের দেখা। সংকীর্ণতার পরই আসে প্রশস্ততা।
📄 টক লেবু দিয়ে বানাও মিষ্টি শরবত
বিচক্ষণ সে-ই যে লোকসানকে পরিণত করতে পারে লাভে। কারণ, কেবল নির্বোধরাই একটি বিপদকে দুটি বিপদে রূপ দেয়।
রাসুল ﷺ-কে যখন মক্কা থেকে বের করে দেওয়া হলো, তখন তিনি মদিনায় চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দীনি দাওয়াত অব্যাহত রাখলেন এবং ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করে ফেললেন। যা ইতিহাসে আজও মহা বিস্ময় হয়ে আছে।
ইমাম আহমদ ؒ-কে কয়েদখানায় বন্দি করা হয়েছিল। অত্যাচারে জর্জরিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই তিনিই হয়েছিলেন হাদিসের বড় ইমাম।
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ؒ-কে জেলে আবদ্ধ করা হয়েছিল। ছাড়া পাবার সময় তার সাথে ছিল ইলমের এক বিশাল খাজানা।
ইমাম সারাখসী ؒ-কে বন্দি করা হয়েছিল। রাখা হয়েছিল একটি পরিত্যক্ত কূপের তলদেশে। তিনি সেখানে বসে বিশ খন্ডের ইসলামী আইন শাস্ত্র প্রণয়ন করেছিলেন।
আল্লামা ইবনুল আছীর ؒ-কে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। সেই বন্দি অবস্থায় তিনি হাদিস শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ দুটি কিতাব 'জামিউল উসূল' ও নিহায়াহ' রচনা করেছিলেন।
আল্লামা ইবনুল জাওযী ؒ-কে বাগদাদ থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। নির্বাসনে থেকে তিনি সাত কেরাতের তাজভীদ তৈরী করেছিলেন।
মালেক ইবনে রাইব মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তার প্রসিদ্ধতম কবিতাগুলো রচনা করেছিলেন।
আবু যুআইব আল হুযালী ؒ-র ছেলেরা মারা যাওয়ার পর তাদের প্রশংসায় তিনি যে মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, পৃথিবীবাসী তার যথোপযুক্ত মূল্যায়ন করেছে।
সুতরাং, তুমি যদি কখনও বিপদে পড়ো, তখন ঘাবড়ে না গিয়ে এর আলোকিত দিকটি খোঁজার চেষ্টা করো। কেউ যদি তোমাকে টক লেবুর রস দেয়, তুমি তাতে খানিকটা চিনি ঢেলে দাও আর বানিয়ে ফেলো মিষ্টি শরবত।
কেউ যদি তোমাকে (মৃত) সাপ উপহার দেয়, তবে তার মূল্যবান চামড়াটি রেখে দিয়ে বাকিটুকু ফেলে দাও। মনে রেখো, বিচ্ছু যাকে দংশন করে, সাপের বিষ তার গায়ে ক্রিয়া করে না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝে নিজেকে মানিয়ে নাও, দেখবে ফুলে ফুলে ভরে যাবে তোমার জীবন।
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
হতে পারে যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর তাই তোমরা অপছন্দ করছ। [সূরা বাকারা : ২১৬]
ফরাসী বিপ্লবের পূর্বে ফ্রান্স দুজন প্রসিদ্ধ কবিকে বন্দি করেছিল। তাদের একজন ছিল আশাবাদী। আরেকজন নিরাশাবাদী। একদিনের ঘটনা। দুজনই জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বাহিরটা দেখছিল। তখন আশাবাদী কবি হাসছিল। কারণ, সে দেখছিল আকাশের তারকারাজি। নিরাশাবাদী কবি কাঁদছিল। কারণ, সে দেখছিল রাস্তার পাশের ময়লা-আবর্জনাগুলো।
জীবনটাও এমনই। দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যে বদলে যায় জীবনের অনেক কিছু। মনে রেখো, পৃথিবীর সবকিছুই মন্দ নয়। তাই, কখনও বিপদ পড়লে তার ভালো দিকটির দিকেই নজর দাও।
📄 আল্লাহমুখী হও
অসহায়ের ডাকে কে সাড়া দেয়? বিপদে-আপদে কে সাহায্য করে? বিশ্বজগতের সবাই কার মুখাপেক্ষী? কার যিকির সবার মুখে মুখে? তিনি আল্লাহ। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই。
দুঃখ-দুর্দশায়, বিপদে-আপদে স্মরণ করব তাঁকেই। সাহায্য চাইব তাঁর কাছেই। মাথা নত করব তাঁর দরবারেই। তাঁর কাছেই করব প্রার্থনা, হয়ে যাব তাঁরই। তবেই নেমে আসবে তাঁর সাহায্য। খুলে যাবে তাঁর রহমতের দুয়ার।
তিনিই ডুবন্তকে বাঁচান। বিপদগ্রস্তকে মুক্তি দেন। মজলুমকে সাহায্য করেন। পথহারাকে পথ দেখান। অসুস্থকে সুস্থ করেন। নিঃসহায়ের সহায় হন।
﴿فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ﴾
তারা যখন জলযানে আরোহণ করে, তখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকেই ডাকে। [সূরা আনকাবুত : ৬৫]
মানুষের দুশ্চিন্তা, পেরেশানী, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য যেসব দোআ রয়েছে, সেগুলো তুমি হাদিসের বিভিন্ন কিতাবে পাবে। (আমি এখানে আর তা উল্লেখ করলাম না। সেখান থেকেই শিখে নিও এবং ওগুলোর সাহায্যে) আল্লাহ -র সাথে কথা বলো। তাঁর কাছে সাহায্য চাও। মনে রেখো, তাঁকে যদি পাও তবে সবকিছুই পেলে তুমি। আর তাঁকে যদি না পাও, তবে কিছুই পেলে না তুমি।
দোআ একটি বড় এবাদত। তুমি যদি উত্তমরূপে তাঁর কাছে চাইতে পারো, তাহলে তুমি কখনও ভুগবে না হতাশায়। দুশ্চিন্তারা তোমায় ধরবে না ঘিরে। কেননা, একমাত্র তাঁর রশি ছাড়া সব রশিই যাবে ছিঁড়ে। তার দুয়ার ছাড়া সব দুয়ারই হয়ে যাবে রুদ্ধ। আমাদের অতি কাছেই তিনি আছেন। সবকিছু দেখেন। সবকিছু শোনেন।
দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি যখন তাঁর কাছে ফরিয়াদ জানায়, তখন তিনি তা উত্তমরূপেই শুনতে পান। তিনি মহাপরাক্রমশালী। অমুখাপেক্ষী।
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ﴾
তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। [সূরা মুমিন: ৬০]
তাই, যেকোনো বিপদে, যে কোনো সংকটে, স্মরণ করো তাঁর নাম। ডাকো তাকেই। সাহায্য চাও তাঁর কাছে। তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো। লুটিয়ে পড়ো সেজদায়। তবেই তুমি লাভ করবে তাঁর গোলাম হওয়ার মর্যাদা।
দু'হাত তোলো। বিছিয়ে দাও ভিক্ষার আঁচল। ক্ষমা চাও তাঁর কাছে। জপো তাঁর নাম। তালাশ করো তাঁর রহমত। সু-ধারণা পোষণ করো তাঁর প্রতি। হও একনিষ্ঠ। আকড়ে থাকো তাঁর দুয়ার। তবেই তুমি পাবে প্রকৃত সুখ ও সাফল্যের দেখা।
📄 অবস্থান করো ঘরেই
মূর্খ ও অসৎ লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করো। সম্ভব হলে অধিকাংশ সময় ঘরেই অবস্থান করো। এতে মানসিকভাবে প্রশান্তি লাভ করবে। যেসব কাজ তোমাকে আল্লাহ্-র আনুগত্য থেকে বিমুখ করে দেয়, সেসব কাজ থেকে দূরে থাকো। এটি এমন এক ঔষধ, যা আল্লাহর ওলীগণ ব্যবহার করেছেন এবং সুফল পেয়েছেন।
আরেকটি কথা যা আমি তোমাকে বলতে চাই, তা হলো- তুমি সকল প্রকার পাপাচার, অনর্থক কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকো। এতে যেমন কার্যক্ষম হবে তোমার মেধা, তেমনি সুরক্ষিত থাকবে তোমার মর্যাদা। মহান প্রভুর সাথেও সম্পর্ক স্থাপনের মিলবে সুযোগ।
তবে কিছু স্থান রয়েছে যেখানে সমবেত হওয়া ও মানুষের সাথে কথাবার্তা বলা প্রয়োজনের গন্ডিতে পড়ে। যেমন, সালাতের জামাত, জুমা, ইলমে দীনের মজলিস ও ভালো কাজে সহযোগিতার স্থান। অতএব, তুমি অলসতা ও অকর্মণ্যতার স্থান থেকে দূরে থাকো। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য রোনাজারি করো। জবানকে সংযত রাখো এবং ঘরের ভেতরেই অবস্থান করো।
বেকার ও অলস লোকদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। যদি করো তবে তুমি যেন নিজের বিরুদ্ধে নিজেই যুদ্ধ ঘোষণা করলে। মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক স্বস্তিকে নিজ হাতে ধ্বংস করলে। কেননা, এরা সময় নষ্ট করতে পটু। গুজব রটানোতে সিদ্ধহস্ত। ফেতনা ছড়ানোতে দক্ষ। এরা তোমাকে হতাশা ও নিরাশার সাগরে এমনভাবে হাবুডুবু খাওয়াবে যে, মরার আগেই তুমি দশবার মারা যাবে।
لَوْ خَرَجُوا فِيكُمْ مَّا زَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا
যদি তারা তোমাদের সাথে (অভিযানে) বের হত, তা হলে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করত না। [তওবা: ৪৭]
আমার বিশ্বাস, তুমি নিজেকে তোমার ঘরে আলাদা করে রাখবে। একমনে নিজের কাজ করে যাবে। হাঁ, কোথাও কোনো ভালো কাজ কিংবা কল্যাণকর বিষয় থাকলে, অবশ্যই তাতে অংশগ্রহণ করবে। এতে তোমার মন পাবে শান্তি। কাজে লাগবে সময়। জীবন হবে না ধ্বংস। জবান পরনিন্দা থেকে বাঁচবে। কান শোনবে না কোনো মন্দ কথা। মনে জাগবে না কোনো খারাপ আকাঙ্ক্ষা। এই ফর্মুলাটি তুমি ট্রাই করে দেখো, সফলতা তোমার পদচুম্বন করবে। কল্পনায় যার বসবাস, অনর্থক সময় নষ্ট করা যার অভ্যাস, তাকে দূর থেকেই বলো - সালাম বলো।