📄 অন্ধ অনুকরণকারী হয়ো না
কারো অন্ধ অনুকরণ করো না। অন্যের অনুসরণে নিজের ব্যক্তিত্বকে দিও না বিসর্জন। এটি একটি স্থায়ী শাস্তি। আপন স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে চলো। অনেককেই দেখা যায় কথাবার্তা, চলাফেরা, আচার আচরণসহ যাবতীয় বিষয়ে অন্যদের এমন অনুকরণ করতে চায়, যেন তারা হুবহু তাদের মতো হয়ে যাবে। অনুকরণের আতিশয্যে জলাঞ্জলি দেবে নিজের ব্যক্তি সত্তাকে। লৌকিকতা, অহংকার ও অশান্তি- এ শ্রেণির লোকদের স্থায়ী ব্যাধিতে পরিণত হয়ে দাঁড়ায়।
আদম থেকে নিয়ে আজ অবধি জন্ম নেওয়া কোনো দু'টি মানুষই আকার-আকৃতি ও গঠনে এক রকম নয়। তা হলে তারা তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও স্বভাব-চরিত্রে কীভাবে এক রকম হবে? মনে রেখো, আপন স্থানে তুমি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বতন্ত্র এক সত্তা। অতীতেও কেউ তোমার মতো হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। সুতরাং, তুমি কেন অন্যের মতো হতে চাইবে? অন্যের অন্ধ অনুকরণ করবে? তুমি তোমার ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র অনুযায়ী এককভাবে অগ্রসর হও।
قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ
প্রত্যেকেই চিনে নিলো নিজ নিজ ঘাট। [সূরা বাকারা: ৬০]
وَلِكُلِّ وَجْهَةٌ هُوَ مُوَلَّيْهَا فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرُتِ لا أَيْنَ مَا تَكُونُوا يَأْتِ بِكُمُ اللَّهُ جَمِيعًا إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ )
আর সবার জন্যই রয়েছে কিবলা, যেদিকে সে অভিমুখী হয়। কাজেই সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও। [সূরা বাকারা: ১৪৮]
অতএব, তুমি যেমন তেমনই থাকো। দরকার নেই তোমার চলনে বলনে, ভাবভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার। মেনে চলো ওহীর দিক নির্দেশনা। যেন বিলীন না হয়ে যায় তোমার অস্তিত্ব।
তোমার নিজস্ব রুচিবোধ ও স্বতন্ত্র স্বভাব-বৈশিষ্ট্য আছে। আছে একান্ত কিছু ভাবভঙ্গি ও বর্ণ। আমরা তোমাকে সে রূপেই দেখতে চাই। কেননা, এটাই তুমি। এটাই তোমার সহজাত। এভাবেই তোমাকে চিনি আমরা। অতএব, তুমি হতে যেও না কারো অন্ধ অনুকরণকারী।
মানুষের স্বভাব-চরিত্রের উপমা গাছপালার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়। তাতে টকও আছে, মিষ্টিও আছে। লম্বাও আছে, খাটোও আছে। তাদেরকে তেমনই থাকতে দেওয়া উচিত। কলা- কলা হওয়াতেই সুন্দর ও মূল্যবান। সে কেন যাবে নাশপাতি হতে। তদ্রুপ আমাদের সৌন্দর্য ও ব্যঞ্জনারও একটি স্বাভাবিক অবস্থা রয়েছে। আমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা, স্বভাব ও চরিত্র বৈচিত্র, মেধা ও যোগ্যতার পার্থক্য- এসবই মহান আল্লাহ-র নিদর্শন। তাঁর নিদর্শনকে অস্বীকার করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
📄 বিশ্বাস রাখো তাকদীরে
مَا أَصَابَ مِنْ مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَبٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَّبْرَاهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর কোনো বিপদ আসে না; কিন্তু তা জগত সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে [সূরা হাদীদ: ২২]
শুকিয়ে গেছে কলম। উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে পাতা। যা ঘটবে তাও হয়ে আছে স্থির। তাকদীর হয়ে গেছে লিপিবদ্ধ। তোমার জীবনে তা-ই ঘটে কিংবা ঘটবে, যা লেখা আছে তাকদীরে। তোমার জীবনে যা কিছু আসবার তা আসবেই। আর যা না পাবার, তা তুমি পাবে না কখনোই। এ বিশ্বাস যদি তোমার অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত থাকে, তবে বিপদাপদ ও যন্ত্রণার জ্বালাগুলো তোমার কাছে উপঢৌকনের মালা হয়ে ধরা দেবে।
(রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন-) আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকেই বিপদাপদে জর্জরিত করেন।
যা কিছু হয়, ভালোর জন্যেই হয়- এমন মনোভাব পোষণ করো। আল্লাহ যার জন্য যা কিছু কল্যাণকর মনে করেন, তাকে তা-ই দান করেন। তাই যদি কোনো কষ্টে নিপতিত হও কিংবা আক্রান্ত হও কোনো রোগে অথবা হারাও কোনো আপনজনকে কিংবা আর্থিকভাবে পড়ো ক্ষতির মুখে, তা হলে তাকদীরের ফয়সালা হিসেবে তা মেনে নাও। কারণ, তাকদীরের লিখন, না যায় খন্ডন। এক্ষেত্রে একচ্ছত্র এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ -র। তবে হাঁ, যদি ধৈর্য ধরো, যদি সন্তুষ্ট থাকো তাকদীরের ফয়সালায়, তা হলে তুমি পাবে এর প্রতিদান। পক্ষান্তরে যদি অস্বীকার করো, তাহলে হারাবে ঈমান।
অতএব, সুসংবাদ বিপদগ্রস্তদের জন্য। কারণ, আল্লাহ -র হুকুমেই সবকিছু হচ্ছে; তিনিই করেন দান। আবার তিনিই নিয়ে যান।
﴿لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْئَلُونَ ﴾
তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না, তবে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে। [সূরা আম্বিয়া : ২৩]
যতক্ষণ তুমি তাকদীর ও আল্লাহ -র ফয়সালার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না, ততক্ষণ তুমি প্রশান্তি লাভ করতে পারবে না। দূর হবে না তোমার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। নিস্তেজ হবে না তোমার অন্তর্দাহ। যা হবার তা হবেই। তাই, না পাওয়ার যাতনায় অনুতাপ করে কী লাভ বলো?
তুমি এমনটি ভেবো না যে, ধ্বংসোন্মুখ দেয়ালকে বাঁচাতে পারবে তুমি। পানির প্রবাহ ও বাতাসের গতিপথ রোধ করতে পারবে তুমি। কাঁচকে ভেঙে যাওয়া থেকে রুখতে পারবে তুমি। এটা অসম্ভব। ঘটবে তা-ই যা লেখা আছে তাকদীরে। তোমার আমার ভালো-মন্দ লাগার উপর থেমে থাকবে না কিছুই। আল্লাহ -র ফয়সালার বাস্তবায়ন ঘটবেই।
অতএব, যার ইচ্ছা বিশ্বাস স্থাপন করুক আর যার ইচ্ছা অমান্য করুক। [সূরা কাহফ : ২৯]
﴿وَفَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَ مَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ ﴾
ক্রোধ, অভিযোগ ও হা-হুতাশ না করে ঐশী ফয়সালার সামনে আত্মসমর্পণ করো। তা হলে, লজ্জিত হতে হবে না তোমায়।
তুমি শত উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতে পারো, করতে পারো হাজারো চেষ্টা তদবির, কিন্তু পরিশেষে দেখবে ঘটছে তা-ই যার করেছিলে আশঙ্কা।
তাই, এরূপ বলো না-
আহা! যদি আমি তেমনটি করতাম, তা হলে এমন হত না。
বরং বলো-
তাকদীরে আমার এমনটিই ছিল। আল্লাহ যা চান তা-ই করেন।
📄 দুঃখের পর সুখ আসে
হে মানুষ! ক্ষুধার জ্বালার পর আসে তৃপ্তির সুখ। পিপাসার যন্ত্রণার পর আসে প্রশান্ত নিবারণ। বিনিদ্র জাগরণ শেষে আসে শান্তির ঘুম। অসুস্থতার যন্ত্রণা শেষে আসে সুস্থতার প্রহর। পথহারা খুঁজে পাবে পথের দিশা। দুঃখ-পীড়িতজন পাবে সুখের দেখা। আঁধার যাবে কেটে।
فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِي بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِنْدِهِ *
অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেবেন। [মায়েদা: ৫২]
রাতকে সুখবর দাও আলোকিত ভোরের। দুশ্চিন্তাগ্রস্তকে সুখবর দাও ত্বরিত আগত সুদিনের। বিপদগ্রস্তকে সুখবর দাও পরম প্রভুর মহানুভবতার। মরুভূমির প্রান্তর যখন সুদীর্ঘ অনুভূত হবে, তখন বুঝবে খানিক বাদেই দেখা দেবে সবুজ-শ্যামল উদ্যান। কান্নার পর আসে হাসি। ভয়ের পর আসে নিরাপত্তা। উদ্বিগ্নতার পর আসে প্রশান্তি।
আগুন পারেনি জ্বালাতে হযরত ইবরাহিম-কে। কারণ, প্রভুর আদেশ ছিল-
يُنَارُ كُونِي بَرْدًا وَ سَلْمًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ
হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। [সূরা আম্বিয়া: ৬৯]
সমুদ্র পারেনি ডোবাতে হযরত মুসা-কে। কারণ, তিনি একনিষ্ঠভাবে বলেছিলেন-
كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ
কখনোই নয়। আমার সাথে আছেন আমার পালনকর্তা। তিনি আমাকে পথ দেখাবেন। [সূরা শু'আরা : ৬২]
রাসুল ও গুহার ভেতর তাঁর সঙ্গীকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন-
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
পেরেশান হয়ো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। [তওবা : ৪০]
দুর্দশার শিকার ও হতাশাগ্রস্তরা সবকিছুতেই কেবল সংকীর্ণতা ও দুর্ভাগ্যই দেখে। এর কারণ হলো, তাদের দৃষ্টি ঘরের দরজা ও দেয়াল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। হায়! তারা যদি পর্দার অন্তরালের দৃশ্যও দেখতে পেতো! তাদের চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারণা যদি দেয়ালের ওপারেও পৌঁছত!
অতএব, হতাশ হয়ো না। মনকে ছোট করো না। অবস্থা সব সময় একরকম থাকে না। আল্লাহ-র দয়া ও অনুগ্রহ লাভ এবং সহজতা প্রাপ্তির জন্য অপেক্ষার চেয়ে উত্তম এবাদত আর নেই। সময় বদলায়। কালের বিবর্তন ঘটে। অদৃশ্য বরাবরই অপ্রকাশ্য। জগতনিয়ন্তার প্রতিদিনই নব নব শান হয়ে থাকে। মনে রেখো, দুঃখের পরই মিলে সুখের দেখা। সংকীর্ণতার পরই আসে প্রশস্ততা।
📄 টক লেবু দিয়ে বানাও মিষ্টি শরবত
বিচক্ষণ সে-ই যে লোকসানকে পরিণত করতে পারে লাভে। কারণ, কেবল নির্বোধরাই একটি বিপদকে দুটি বিপদে রূপ দেয়।
রাসুল ﷺ-কে যখন মক্কা থেকে বের করে দেওয়া হলো, তখন তিনি মদিনায় চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দীনি দাওয়াত অব্যাহত রাখলেন এবং ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করে ফেললেন। যা ইতিহাসে আজও মহা বিস্ময় হয়ে আছে।
ইমাম আহমদ ؒ-কে কয়েদখানায় বন্দি করা হয়েছিল। অত্যাচারে জর্জরিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই তিনিই হয়েছিলেন হাদিসের বড় ইমাম।
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ؒ-কে জেলে আবদ্ধ করা হয়েছিল। ছাড়া পাবার সময় তার সাথে ছিল ইলমের এক বিশাল খাজানা।
ইমাম সারাখসী ؒ-কে বন্দি করা হয়েছিল। রাখা হয়েছিল একটি পরিত্যক্ত কূপের তলদেশে। তিনি সেখানে বসে বিশ খন্ডের ইসলামী আইন শাস্ত্র প্রণয়ন করেছিলেন।
আল্লামা ইবনুল আছীর ؒ-কে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। সেই বন্দি অবস্থায় তিনি হাদিস শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ দুটি কিতাব 'জামিউল উসূল' ও নিহায়াহ' রচনা করেছিলেন।
আল্লামা ইবনুল জাওযী ؒ-কে বাগদাদ থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। নির্বাসনে থেকে তিনি সাত কেরাতের তাজভীদ তৈরী করেছিলেন।
মালেক ইবনে রাইব মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তার প্রসিদ্ধতম কবিতাগুলো রচনা করেছিলেন।
আবু যুআইব আল হুযালী ؒ-র ছেলেরা মারা যাওয়ার পর তাদের প্রশংসায় তিনি যে মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, পৃথিবীবাসী তার যথোপযুক্ত মূল্যায়ন করেছে।
সুতরাং, তুমি যদি কখনও বিপদে পড়ো, তখন ঘাবড়ে না গিয়ে এর আলোকিত দিকটি খোঁজার চেষ্টা করো। কেউ যদি তোমাকে টক লেবুর রস দেয়, তুমি তাতে খানিকটা চিনি ঢেলে দাও আর বানিয়ে ফেলো মিষ্টি শরবত।
কেউ যদি তোমাকে (মৃত) সাপ উপহার দেয়, তবে তার মূল্যবান চামড়াটি রেখে দিয়ে বাকিটুকু ফেলে দাও। মনে রেখো, বিচ্ছু যাকে দংশন করে, সাপের বিষ তার গায়ে ক্রিয়া করে না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝে নিজেকে মানিয়ে নাও, দেখবে ফুলে ফুলে ভরে যাবে তোমার জীবন।
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
হতে পারে যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর তাই তোমরা অপছন্দ করছ। [সূরা বাকারা : ২১৬]
ফরাসী বিপ্লবের পূর্বে ফ্রান্স দুজন প্রসিদ্ধ কবিকে বন্দি করেছিল। তাদের একজন ছিল আশাবাদী। আরেকজন নিরাশাবাদী। একদিনের ঘটনা। দুজনই জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বাহিরটা দেখছিল। তখন আশাবাদী কবি হাসছিল। কারণ, সে দেখছিল আকাশের তারকারাজি। নিরাশাবাদী কবি কাঁদছিল। কারণ, সে দেখছিল রাস্তার পাশের ময়লা-আবর্জনাগুলো।
জীবনটাও এমনই। দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যে বদলে যায় জীবনের অনেক কিছু। মনে রেখো, পৃথিবীর সবকিছুই মন্দ নয়। তাই, কখনও বিপদ পড়লে তার ভালো দিকটির দিকেই নজর দাও।