📄 কারো ধন্যবাদের আশায় থেকো না
مَن يَفْعَلُ الْخَيْرَ لَا يَعْدِمُ جَوَازِيْهِ لَا يَذْهَبُ الْعَرْف بَيْنَ اللَّهِ وَالنَّاسِ
ভালো কাজের প্রতিদান কখনও বিনষ্ট হয় না।
আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার পরিচয় কখনও মুছে যায় না।
আল্লাহ তাঁর এবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন বান্দাদের। তাঁর শুকরিয়া আদায় করার জন্য করেছেন রিযিকের ব্যবস্থা। কিন্তু সবাই তাঁর এবাদত করে না। উল্টো তাঁর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করে অন্যকে। অধিকাংশ মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না তাঁর। অন্যায়, অস্বীকার, বাড়াবাড়ি ও নাফরমানীর প্রবণতা বেশিরভাগ মানুষের মাঝেই প্রবল। তাই তুমি যখন দেখবে যে, মানুষ ভুলে গেছে তোমার কৃপা, অস্বীকার করছে তোমার দয়া, অবজ্ঞা করছে তোমার সদাচরণ, শত্রুতার মাধ্যমে প্রতিদান দিচ্ছে তোমার অনুগ্রহের, তখন তুমি হয়ো না হতাশ কিংবা পেরেশান। করো না মন খারাপ। কারণ, মানুষ যে এমনই।
আল্লাহ ও তার রাসুল নিজ গুণে তাদেরকে সম্পদশালী করে দিয়েছেন- এ ছাড়া তাদের অসন্তুষ্টির আর কোনো কারণ নেই। [সূরা তওবা: ৭৪]
পৃথিবীর ইতিহাস তোমার সামনেই। পড়ে দেখো। এর পাতায় পাতায় সেই পিতার কাহিনী বর্ণিত আছে, যিনি তার সন্তানকে লালন পালন করেছেন সযতনে। ব্যবস্থা করেছেন তার উত্তম শিক্ষা-দীক্ষার। নিজে না খেয়ে খাইয়েছেন তাকে। তার শান্তির জন্য করেছেন কঠোর পরিশ্রম। কিন্তু এ সন্তানই যখন বড় হয়েছে, হয়েছে সামর্থ্যবান, তখন সে-ই তার পিতার জন্য মহা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবাধ্যতা, অবজ্ঞা, অসম্মান ও ঘৃণার মাধ্যমে প্রতিদান দিয়েছে তার কষ্টের। পিতার জন্য সে পরিণত হয়েছে সাক্ষাত এক আযাবে।
সুতরাং, যে নির্বোধেরা ভুলে গেছে তাদের প্রতি তোমার দয়া ও অনুগ্রহের কথা, উল্টো অকৃতজ্ঞতার আঘাতে তোমাকে করেছে জর্জরিত, তাদের প্রতি তুমি মন খারাপ করো না। বরং তোমার জন্য আনন্দের সংবাদ হলো- তুমি পুরষ্কার পাবে এমন সত্তার কাছ থেকে যার ভান্ডার কখনও শেষ হবার নয়।
আমি একথা বলব না যে, তুমি মানুষের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহের হাত সংকুচিত করে নাও। সদাচরণ পরিত্যাগ করো। বরং আমি বলবো, তুমি তাদের অকৃতজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত থাকো। কৃতঘ্নের কৃতঘ্নতায় হয়ো না হতাশ। একমাত্র আল্লাহ -র সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই করে যাও ভালো কাজ। তাহলেই তুমি হতে পারবে সর্ব ক্ষেত্রে সফল। কারও অকৃতজ্ঞতায় কোনো ক্ষতি হবে না তোমার। তুমি অনুগ্রহকারী হবে। তোমার হাত উঁচু হবে; যা নীচের হাত থেকে উত্তম।
﴿إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا﴾
আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদেরকে আহার্য দান করি এবং তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না। [সূরা দাহর : ৯]
কখনও কখনও অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিরাও মানুষের অকৃতজ্ঞ স্বভাবের কথা ভুলে যান। যেন তারা অকৃতজ্ঞতা সম্পর্কে আল্লাহ -র এ বাণী কখনও শোনেননি-
﴿وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنْبِةٍ أَوْ قَاعِدًا أَوْ قَائِمًا فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّةً مَرَّكَانُ لَمْ يَدْعُنَا إِلَى ضُرِّ مَسَّهُ كَذَلِكَ زُيِّنَ لِلْمُسْرِفِينَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾
আর যখন মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হয়, তখন শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর আমি যখন তা থেকে মুক্ত করে দিই, সে কষ্ট যখন চলে যায়, তখন সে এমন পথ অবলম্বন করে, যেন তাকে যে দুখ-দুর্দশা স্পর্শ করেছিল, তার জন্য সে কোনোদিন আমাকে ডাকেইনি। এভাবেই সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য তাদের কৃতকর্মকে সুসজ্জিত করে দেওয়া হয়েছে। [সূরা ইউনুস : ১২]
ধরো, তুমি কাউকে একটি কলম উপহার দিলে। আর সে ওই কলম দিয়ে তোমার বিরুদ্ধে লিখতে শুরু করল। কিংবা তুমি কাউকে ভর দিয়ে হাঁটার জন্য একটি লাঠি দিলে। আর সে ওই লাঠি দিয়েই ফাটিয়ে দিলো তোমার মাথা। তা হলেও তুমি রাগ করো না। মানুষ তো এমনই। অধিকাংশ মানুষই যখন তাদের মহান প্রতিপালকের প্রতিই অকৃতজ্ঞ তখন আমি আর তুমি তাদের কাছ থেকে কী-ই বা আশা করতে পারি?
📄 অন্যের কল্যাণে ব্রত হও, সুখ পাবে
ভালো কাজের ফলাফল সবসময়ই ভালো হয়। কল্যাণকর কাজ, পরোপকারের নতিজা সর্বদাই হয় শুভ। পরোপকারী ব্যক্তি তার উপকার দ্বারা প্রথমে নিজেই হয় উপকৃত। হৃদয়-মনে অনুভব করে এক আশ্চর্য প্রশান্তি। তাই তুমি যদি কখনও কোনো উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হও তখন এগিয়ে আসো অন্যের কল্যাণসাধনে। সাহায্য করো বিপদগ্রস্তকে। এতে তুমি মানসিক প্রশান্তি পাবে। আত্মিক পরিতৃপ্তি লাভ করবে।
অভাবীকে দান করো। মজলুমকে সাহায্য করো। বিপদগ্রস্তকে উদ্ধার করো। ক্ষুধার্তকে খাবার দাও। অসুস্থের সেবা করো। এতে হৃদয় হবে প্রশান্ত। আত্মা হবে তৃপ্ত। জীবন হবে সৌভাগ্যময়। ভালো কাজ হলো উত্তম সুগন্ধির ন্যায়। যার উৎপাদনকারী, ক্রেতা, বিক্রেতা সবাই এর দ্বারা উপকৃত হয়।
মানুষের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাত করো। এটা তোমার জন্য সদকার শামিল। পক্ষান্তরে গোমরা মুখে কারো সাথে সাক্ষাত করাটা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ-ঘোষণার শামিল। যার অশুভ পরিণতির কথা একমাত্র আল্লাহ্-ই ভালো জানেন।
হাদীসে বর্ণিত সেই বেশ্যা নারীর গল্পটি নিশ্চয় শুনেছো? যে পিপাসায় কাতর একটি কুকুরকে পানি পান করিয়েছে। আর এক অঞ্জলি পানির বিনিময়ে হয়ে গেছে জান্নাতের হকদার। মনে রেখো, দো-জাহানের মালিক আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি নিজে দয়ালু এবং ভালোবাসেন দয়ালুদের। তিনি প্রশংসিত। তিনি অমুখাপেক্ষী। অতএব, দুঃখ-দুর্দশা, ভয়-ভীতি, হতাশা ও নৈরাশ্য যদি তোমায় সংকুচিত করে রাখে, তাহলে তোমার উচিত নেকী ও কল্যাণের পথে আসা এবং সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে অন্যের পাশে দাঁড়ানো। তবেই তুমি পেয়ে যাবে তোমার কাঙ্ক্ষিত সুখের দেখা।
الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّىٰ ۞ وَمَا لِأَحَدٍ عِندَهُ مِن نِّعْمَةٍ تُجْزَىٰ ۞ إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْأَعْلَىٰ ۞ وَلَسَوْفَ يَرْضَىٰ
(যে কারও প্রতি অনুগ্রহ করে) তার প্রতি কারও অনুগ্রহের প্রতিদানে নয়; কেবল তার মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায়, সে অচিরেই সন্তুষ্টি লাভ করবে। [সূরা লাইল : ১৮.১৯..২০]
📄 বেকার থেকো না, কাজের মাধ্যমে দূর করো আলস্য
অলস, অকর্মণ্য ও বেকার লোকেরাই সময়কে অর্থহীন গল্পগুজবে নষ্ট করে।
﴿رَضُوا بِأَنْ يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ وَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ﴾ তারা পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থেকে যেতে পেরে আনন্দিত হয়েছে। [সূরা তওবা : ৮৭]
কর্মহীন বসে থাকা অনুচিত। কারণ, বেকার মস্তিষ্কে শয়তান এসে বাসা বাঁধে। অকর্মণ্য ব্যক্তি লাগামহীন উটের ন্যায় এদিক ওদিক উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
তুমি যখন কাজ ছেড়ে অলস বসে থাকবে, তখন হতাশা ও বিষণ্ণতা, পেরেশানী ও উদ্বিগ্নতা তোমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরবে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কষ্টরা তোমার সামনে ঝাঁপি খুলে বসবে। বিপদে পড়বে তুমি। তাই তোমার প্রতি আমার আন্তরিক উপদেশ হলো, বেকার না থেকে ফলপ্রসূ কাজে নিয়োজিত রাখো নিজেকে। বেকার থাকা মানে নিজেকে জীবন্ত কবর দেওয়া। অলসতা করা মানে আত্মহত্যা করা।
আলস্যের একটি উদাহরণ দিচ্ছি। চীনের জেলখানাগুলোতে একধরণের টর্চার সেল আছে। সেই টর্চার সেলে বন্দীদেরকে এমন একটি পানির টেপের নীচে রাখা হয়, যেখান থেকে প্রতি মিনিটে একটি করে পানির ফোঁটা পড়ে। ওই এক ফোঁটা পানির জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অনেক কয়েদি পাগল হয়ে যায়।
আরামপ্রিয়তা-আলস্য ও উদাসীনতার আরেক নাম। অলসতা এক দক্ষ চোর। আর তোমার মন হচ্ছে তার শিকার। সুতরাং, নিজেকে অবসর রেখো না। একটুখানি সময় পেলেই সালাত পড়ো। তেলাওয়াত করো। যিকির করো। বই পড়ো। লেখালেখি করো। ব্যায়াম করো। অফিস পরিপাটি করো। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করো। অন্যের কাজে সাহায্য করো। আর এভাবেই কাজের ছুরি দিয়ে কেটে ফেলো অবসরকে। বিজ্ঞজনেরা এ পদ্ধতি অবলম্বনে তোমাকে পঞ্চাশ ভাগ সুখের গ্যারান্টি দিয়ে থাকেন।
কৃষক, শ্রমিক, মজুরদের দেখো, কাজের সময় তারা কীভাবে পাখির মতো গুনগুন করে গান ধরে। অক্লান্ত পরিশ্রম করেও তাদের মেজাজ কতো ফুরফুরে থাকে। কারণ, তারা সুখী। তারা পরিতৃপ্ত। অথচ তুমি বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করো। কষ্টে চোখের পানি মোছো। কারণ, আলস্য কেড়ে নিয়েছে তোমার সব সুখ।
📄 অন্ধ অনুকরণকারী হয়ো না
কারো অন্ধ অনুকরণ করো না। অন্যের অনুসরণে নিজের ব্যক্তিত্বকে দিও না বিসর্জন। এটি একটি স্থায়ী শাস্তি। আপন স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে চলো। অনেককেই দেখা যায় কথাবার্তা, চলাফেরা, আচার আচরণসহ যাবতীয় বিষয়ে অন্যদের এমন অনুকরণ করতে চায়, যেন তারা হুবহু তাদের মতো হয়ে যাবে। অনুকরণের আতিশয্যে জলাঞ্জলি দেবে নিজের ব্যক্তি সত্তাকে। লৌকিকতা, অহংকার ও অশান্তি- এ শ্রেণির লোকদের স্থায়ী ব্যাধিতে পরিণত হয়ে দাঁড়ায়।
আদম থেকে নিয়ে আজ অবধি জন্ম নেওয়া কোনো দু'টি মানুষই আকার-আকৃতি ও গঠনে এক রকম নয়। তা হলে তারা তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও স্বভাব-চরিত্রে কীভাবে এক রকম হবে? মনে রেখো, আপন স্থানে তুমি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বতন্ত্র এক সত্তা। অতীতেও কেউ তোমার মতো হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। সুতরাং, তুমি কেন অন্যের মতো হতে চাইবে? অন্যের অন্ধ অনুকরণ করবে? তুমি তোমার ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র অনুযায়ী এককভাবে অগ্রসর হও।
قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَشْرَبَهُمْ
প্রত্যেকেই চিনে নিলো নিজ নিজ ঘাট। [সূরা বাকারা: ৬০]
وَلِكُلِّ وَجْهَةٌ هُوَ مُوَلَّيْهَا فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرُتِ لا أَيْنَ مَا تَكُونُوا يَأْتِ بِكُمُ اللَّهُ جَمِيعًا إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ )
আর সবার জন্যই রয়েছে কিবলা, যেদিকে সে অভিমুখী হয়। কাজেই সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও। [সূরা বাকারা: ১৪৮]
অতএব, তুমি যেমন তেমনই থাকো। দরকার নেই তোমার চলনে বলনে, ভাবভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার। মেনে চলো ওহীর দিক নির্দেশনা। যেন বিলীন না হয়ে যায় তোমার অস্তিত্ব।
তোমার নিজস্ব রুচিবোধ ও স্বতন্ত্র স্বভাব-বৈশিষ্ট্য আছে। আছে একান্ত কিছু ভাবভঙ্গি ও বর্ণ। আমরা তোমাকে সে রূপেই দেখতে চাই। কেননা, এটাই তুমি। এটাই তোমার সহজাত। এভাবেই তোমাকে চিনি আমরা। অতএব, তুমি হতে যেও না কারো অন্ধ অনুকরণকারী।
মানুষের স্বভাব-চরিত্রের উপমা গাছপালার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়। তাতে টকও আছে, মিষ্টিও আছে। লম্বাও আছে, খাটোও আছে। তাদেরকে তেমনই থাকতে দেওয়া উচিত। কলা- কলা হওয়াতেই সুন্দর ও মূল্যবান। সে কেন যাবে নাশপাতি হতে। তদ্রুপ আমাদের সৌন্দর্য ও ব্যঞ্জনারও একটি স্বাভাবিক অবস্থা রয়েছে। আমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা, স্বভাব ও চরিত্র বৈচিত্র, মেধা ও যোগ্যতার পার্থক্য- এসবই মহান আল্লাহ-র নিদর্শন। তাঁর নিদর্শনকে অস্বীকার করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।