📄 আল-বাদি : الْبَدِيعُ
আমার কাছে পাখির বিশ্বকোষ আছে। বইটির ভূমিকায় লেখক বলেছেন, 'আজ পর্যন্ত তৈরি হওয়া উন্নত প্রযুক্তির বিমানের কোনোটিই পাখির স্তরে পৌঁছতে পারবে না।' মানুষ যত কিছুই তৈরি করুক, যদি গভীরভাবে লক্ষ করেন, তবে দেখবেন- সবক্ষেত্রেই সে প্রকৃতির কোনো অভূতপূর্ব সৃষ্টির অনুসরণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন ভূতপূর্ব কোনো দৃষ্টান্ত ছাড়া বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করলেন, তখন কেউ কি বলেছে-পৃথিবী হতে হবে গোলাকার, বলের মতো। কেউ কি বলেছে-পৃথিবীকে নিজের চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে হবে, সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করতে হবে?
আলো কে সৃষ্টি করলেন? কে সূর্যকে করলেন উত্তপ্ত, প্রজ্জ্বলিত? কে পানিকে তার বৈশিষ্ট্য দিলেন, বাতাসকে তার বৈশিষ্ট্য দান করলেন? কে সকল উপাদানকে দান করলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য? সব উপাদান যদি একই মাত্রার তাপে গলে যেত, তাহলে দেখা যেত-সমগ্র বিশ্ব গ্যাসে আচ্ছন্ন কিংবা শক্ত অথবা তরল হয়ে আছে। যদি এই বিশ্বজগতের ছায়াপথ, ধূমকেতু, অগণিত গ্রহ-নক্ষত্র-এসবের মধ্যকার দূরত্ব, ভারসাম্যপূর্ণ গতিময়তা, অতিসূক্ষ্ম বিন্যাস সবকিছু নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন, তবে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
উদাহরণ হিসেবে আমরা সামনে দৃশ্যমান গাছের পাতার কথা ভাবি। আপনি কি মনে করেন, আমরা এমন একটি পাতা আঁকতে পারব-যার কোনো অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই? সেই পাতাটি হোক ছোট বা বড়, মসৃণ বা অমসৃণ, ডোরাকাটা কিংবা রেখা টানা, গাঢ় রঙের কিংবা উজ্জ্বল রঙের অথবা মিশ্র বর্ণের। আপনি যদি নানা ধরনের পাতা আঁকেন, তাহলে সেই পাতাগুলো কি একই রকম হবে? এমনকি একটি গাছের পাতাও কি একরকম হয়? আল্লাহর শপথ! একটি যাইতুন গাছের দুটি পাতাও যদি সাদৃশ্যপূর্ণ হতো, তাহলে আমার রবের নাম আল-ওয়াসি (الواسع) যার নিদর্শন সর্বব্যাপী বিরাজমান-হতো না!
মানুষের চেহারার কথাও আমরা বলতে পারি। পৃথিবীতে সাড়ে ৭ বিলিয়ন মানুষ বাস করে।[১] পুরো পৃথিবীতে কি এমন একজন মানুষ আছে, যার সাথে অন্য কোনো মানুষের চেহারার পুরোপুরি মিল আছে? অসম্ভব। ফিঙ্গারপ্রিন্টের কথা যদি বাদও দেওয়া হয়, তারপরও প্রতিটি মানুষের শরীরে বিশেষ ঘ্রাণ রয়েছে। সেই ঘ্রাণ অনুসরণ করেই প্রশিক্ষিত কুকুর অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারে। একজন মানুষের ঘ্রাণের সাথে আরেকজনের কোনো মিল নেই। এমনকি দেখা গেছে একই পরিবেশে থাকা এবং একই খাদ্য গ্রহণ করা যমজ ভাইবোনদেরকেও শরীরের ঘ্রাণ দিয়ে আলাদা করতে পেরেছে প্রশিক্ষিত কুকুর।
শরীরের ঘ্রাণের মতো প্রতিটি মানুষের সুরও ভিন্ন ভিন্ন। চোখের মণি ভিন্ন, আঙুলের ছাপ ভিন্ন। প্রত্যেকের রক্তের প্লাজমাও ভিন্ন। আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী মানবদেহে টিস্যু বা কোষ জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। রক্তের গ্রুপ যদিও সীমিত কিন্তু মানবদেহের টিস্যুর ধরন অসীম। পৃথিবীতে শুধু আপনার টিস্যুই আপনার মতো; আপনার মতো আর কেউ নেই। এটি কি 'বাদউন' নয়?
কোনো শিল্পীকে যদি মানুষের চেহারা আঁকতে বলা হয়, তাহলে দুটি, তিনটি, দশটি হয়তো আঁকতে পারবে। খানিক বাদেই তার মস্তিষ্ক থেকে সৃজনশীলতা শেষ হয়ে যাবে। গাড়ি নির্মাতারা গাড়ির আকৃতি তৈরি করে। কখনো বাঁকা করে, কখনো লম্বালম্বিভাবে, কখনো-বা আড়াআড়ি আকৃতিতে। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই আগের ডিজাইনেই ফিরে আসে। কারণ তাদের সৃজনশীলতা খুবই সীমিত। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা হলেন আসমান ও জমিনের 'বাদি' (بَدِيع)। তার প্রতিটি সৃষ্টিই অনন্য ও অভূতপূর্ব।
আল্লাহ তাআলার 'আল-বাদি' (اَلْبَدِيع) নাম কুরআনুল কারিমেও বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَإِذَا قَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ (۱۱۷)
তিনি আসমান ও জমিনের অনুপম সৃষ্টিকর্তা। যখন তিনি কোনোকিছু সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার জন্য কেবল বলেন, 'হও'; আর তাতেই তা হয়ে যায়।[১]
আল-বাদি (بَدِیع) শব্দটি নির্গত হয়েছে বাদউন (بدع) ক্রিয়ামূল থেকে। বাদউন অর্থ পূর্বের দৃষ্টান্ত ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি করা। এক কথায় বলতে পারি, বাদউন মানে মৌলিক বা অভূতপূর্ব কিছু সৃষ্টি করা, সম্পূর্ণ নতুন কিছু সৃষ্টি করা। একই ধরনের আরেকটি শব্দ হলো ইবদা (إبداع)।
আমরা যদি মানবসৃষ্ট জিনিসগুলো খুঁজে দেখি, তাহলে দেখব-ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, জেনে বা অজান্তে মানুষের সব সৃষ্টিই অনুকরণ মাত্র। মানুষ যদি বলে, আমি সাবমেরিন সৃষ্টি করেছি; তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, সাবমেরিন মাছের অনুকরণ। এরকমভাবে যখন বিমান তৈরি করে, তখন সেটি হয় পাখির অনুকরণ।
আগে মনে করা হতো, শুধু ফিঙ্গারপ্রিন্ট মানুষের একক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখন আমরা জানি, মানুষের চেহারা, চোখের মণির রং, শরীরের ঘ্রাণ, গলার স্বর, ফিঙ্গারপ্রিন্ট; সবই মানুষের একক বৈশিষ্ট্য।
আপনি যদি সমুদ্রের মাছের প্রজাতি সম্পর্কে জানেন, যদি এই সম্পর্কে লেখা সচিত্র কোনো বই পড়েন, তাহলে হতবাক হয়ে যাবেন। এখন পর্যন্ত মিলিয়ন প্রজাতির মাছ আবিষ্কৃত হয়েছে। আপনার মনে যেরকম মাছের চিত্রই উদিত হোক, তার অস্তিত্ব রয়েছে। সুচ্ছ, ফসফরাসের মতো, চোখে লম্বা পাপড়ি বিশিষ্ট, পা বিশিষ্ট, ফুল আকৃতির মাছও রয়েছে। এমন মাছও আছে, যা আত্মরক্ষার জন্য কালির মতো পদার্থ ছুড়ে লুকিয়ে পড়ে। এমন মাছও আছে, যা শত্রুকে হাজার ভোল্টের ইলেক্ট্রিক শক দিতে পারে। ছোট ছোট অর্নামেন্টাল মাছও আছে অগণিত। আপনি যদি মাছের প্রকার সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে আপনার জানা কখনো শেষ হবে না। যদি পাখির প্রজাতি, আকৃতি ও ধরন সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে দেখা যাবে, এই বিষয় শুধু কল্পনাতেই ধারণ করা সম্ভব।
এক বন্ধু আমাকে ১৮ খণ্ডে লেখা একটি বইয়ের কথা জানিয়েছিলেন, যার প্রতিটি খণ্ডের পুরুত্ব ১৮ সেন্টিমিটারের বেশি। এই বিশাল বইটি লেখা হয়েছে কেবল নানা জাতের পেঁয়াজ নিয়ে।
অনেকে বলেন, পৃথিবীতে প্রায় ৩ হাজার জাতের গম রয়েছে। কৃষি গবেষণাকেন্দ্রের একজন প্রকৌশলী আমাকে জানিয়েছেন, তাদের গবেষণাকেন্দ্রে ৩০০ জাতের আঙুর রয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি ফল, সবজি শত শত, এমনকি হাজারো জাত আছে। এসবই আল্লাহর ‘আল-বাদি’ নামটিকে ফুটিয়ে তোলে।
একবার আমি মিশরে পতঙ্গ প্রদর্শনীতে গিয়েছিলাম। বিশাল প্রাঙ্গণে বহুসংখ্যক স্টল নিয়ে প্রদর্শনীটি আয়োজিত হয়েছিল। প্রতিটি কামরার চার দেওয়ালজুড়ে ছিল নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ; যেগুলোর কোনোটির সাথে কোনোটির মিল নেই। আমার কাছে বিষয়টি আজও অকল্পনীয়। এটিই আল্লাহর বাণী— ‘তিনি আসমান ও জমিনের অনুপম সৃষ্টিকর্তা’—এর অর্থ।
নানা ধরনের গাছের পাতা, গাছের প্রজাতি, বিভিন্ন ধরনের কাঠ, নানা জাতের উদ্ভিদ, নানা রকমের ঘ্রাণ, অসংখ্য প্রজাতির মাছ, পাখি, ফল-ফুল পৃথিবীতে রয়েছে। এমনকি প্রতিটি তুষার-দানাও স্বতন্ত্র আকৃতি বিশিষ্ট।
আমরা যদি তুষার-দানা অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে বড় করে দেখি, তাহলে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখতে পাব। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে যদি তুষারের হাজারো নমুনা সংগ্রহ করেন, তবুও দেখবেন—প্রতিটি দানার আকৃতি স্বতন্ত্র। সবই আল্লাহর ‘বাদউন’—এর উদাহরণ।
আল্লাহ তাআলার ‘আল-বাদি’ নামের প্রথম অর্থ তিনি নিজ সত্তার ক্ষেত্রে ‘বাদি’; উপমা ও তুলনাহীন। কোনো কিছু তাঁর সদৃশ নয়। তিনিও কোনো কিছুর মতো নন। নিজ সত্তার ক্ষেত্রেও যেমন তিনি ‘বাদি’ তুলনাহীন, তেমনই সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তুলনাহীন। পূর্বে বিরাজমান ও জ্ঞাত আকৃতি-উপমা ছাড়াই তিনি সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করেছেন।
সারকথা হলো, আল্লাহ তাআলাই আসমান ও জমিনকে সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টি করেছেন, সমস্ত বস্তুকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। তিনি বিশ্বজগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন পূর্ববর্তী কোনো দৃষ্টান্ত কিংবা শিক্ষাগ্রহণ ছাড়া। তিনি ‘বাদি’ অর্থাৎ অভূতপূর্ব সৃষ্টিকর্তা।
টিকাঃ
[১] ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী।
[১] সুরা বাকারা, আয়াত: ১১৭
📄 উপসংহার
যে তৃষ্ণার্ত হৃদয় প্রতিক্ষায় থাকে এক পশলা বৃষ্টির, যে পথভোলা পথিক খুঁজে ফেরে পথ, সঁপে দেওয়ার তাড়নায় যে নয়নযুগল হয়ে ওঠে অশ্রুসজল, পাপে নিমজ্জিত যে অন্তর অন্বেষণ করে বেড়ায় রহমতের বারিধারা, তাদের রবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার, রবের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষুদ্র প্রয়াসই হলো 'তিনিই আমার রব'।