📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-আদল : الْعَدْلُ

📄 আল-আদল : الْعَدْلُ


আমাদের শরীরে প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান যথাযথ। চোখ, কান, নাক, ঠোঁট; মুখাবয়বের প্রতিটি অঙ্গ নিখুঁতভাবে প্রতিস্থাপিত। হাতপায়ের অবস্থানও যথাযথ। মহান রব আমাদের অত্যন্ত নিখুঁত ও সুষমভাবে সৃষ্টি করেছেন।
বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ির মাঝামাঝি যা থাকে, তা-ই হয় ন্যায়সংগত, মধ্যপন্থা। সাধারণত বৈদ্যুতিক সুইচ স্থাপন করা হয় উপযুক্ত স্থানে। বাবা-মা, সন্তান; বাড়ির সবাই তা সহজেই ব্যবহার করতে পারে। যদি উঁচুতে স্থাপন করা হতো, তাহলে মই প্রয়োজন হতো। আবার নিচু জায়গান স্থাপন করা হলে, লাইট জ্বালানোর জন্য উবু হতে হতো। তাই উঁচু ও নিচুর মাঝামাঝি যে স্থানটিতে সুইচ লাগানো হয়, সেই স্থানটিই হলো মধ্যবর্তী।
আরবি ‘আদল’ (عَدْلٌ) শব্দ থেকে নির্গত একটি শব্দ হলো ‘ইতিদাল’ (اِعْتِدَالٌ)। ‘ইতিদাল’ অর্থ-মধ্যপন্থা অবলম্বন করা, ভারসাম্য রক্ষা করা। বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির মধ্যবর্তী পন্থাকেই বলে ‘ইতিদাল’।
মানুষ যদি পানির গ্লাসে থাকা সকল ব্যাকটেরিয়া দেখতে পেত, তাহলে পানি পান করতে পারত না। আমরা যদি খালি চোখে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিস দেখতে পেতাম, তাহলে আমাদের জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে যেত। আবার দৃষ্টিশক্তি যদি এত বেশি দুর্বল হতো যে, বিপজ্জনক জিনিসও দেখা যায় না; তাহলেও জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ত।
প্রথম অবস্থাটি হলো বাড়াবাড়ি, আর দ্বিতীয় অবস্থাটি হলো ছাড়াছাড়ি। আর মানুষকে যে দৃষ্টিশক্তি দেওয়া হয়েছে, তা হলো মধ্যম অবস্থা। আল্লাহ তাআলা মানুষকে ন্যায়সংগতভাবেই সৃষ্টি করেছেন।
আমাদের শ্রবণশক্তির কথাও বলতে পারি। এমন অনেক শব্দ আছে, যা আমরা শুনতে পাই না। যদি শুনতে পেতাম, তাহলে রাতে আমরা ঘুমাতে পারতাম না। শব্দতরঙ্গ ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভের মতো তা অপরিবর্তিত থাকে না।
নাসা বৃহস্পতি গ্রহে অভিযান চালিয়েছে। যে স্পেসক্রাফটটি প্রেরণ করা হয়েছিল, সেটি ছয় বছর ঘণ্টায় ২৪ হাজার মাইল গতিতে উড়ে বৃহস্পতিতে পৌঁছেছে। তারপর সেখান থেকে রেডিওর মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ হ্রাস পায় না; বরং তার ব্যাপ্তি শুরুর মতোই থাকে। এজন্য এই তরঙ্গের মাধ্যমে রেডিও, ফ্যাক্স ও টেলেক্স সম্প্রচার করা হয়। সাধারণ শব্দতরঙ্গ দূরত্বের কারণে হ্রাস পায়। শব্দতরঙ্গ যদি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গের মতো হতো, তাহলে যেকোনো শহরে বসে সারা পৃথিবীর আওয়াজ শুনতে পেতেন। সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, লোহা-লক্করের আওয়াজ, কল-কারখানার শব্দ; সব শুনতে পেতেন। তখন জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ত।
সুতরাং শ্রবণেন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা ও শব্দতরঙ্গের হ্রাসপ্রাপ্ত হওয়া সৃষ্টির সুষম বণ্টন; মধ্যপন্থা অবলম্বন। অসহনীয় শব্দ ও শুনতে-না-পারার মতো অতি ক্ষীণ আওয়াজের মধ্যবর্তী একটি অবস্থা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ .
নিশ্চয় আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি পরিমিতভাবে।
আমাদের দৃষ্টিশক্তি পরিমিত, শ্রবণশক্তিও পরিমিত। অনেক সময় মানুষের হাত আহত হয়। কখনো ফ্রিজের দরজা ধরলে বিদ্যুৎ অনুভূত হয়। মানুষের সেন্সরি নার্ভ (সংবেদশীল স্নায়ু) যদি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় ঘুমন্ত থাকে, তবে মানবজীবন দুষ্কর হয়ে পড়বে। দেহের প্রতিটি স্নায়ুর ক্ষেত্রেই বিষয়টি এমন।
কনুইয়ের অস্থিসন্ধি এমন ভারসাম্যপূর্ণ জায়গায় স্থাপিত, যাতে সহজে আহার গ্রহণ করা যায়। কনুইয়ের অস্থিসন্ধি না থাকলে বিড়ালের মতো উবু হয়ে খেতে হতো। কনুয়েই স্থানে অন্য কোনো ভারসাম্যপূর্ণ বিকল্প হতে পারে না।
يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ فِي أَي صُورَةٍ مَّا شَاءَ رَكَّبَكَ
হে মানুষ, কোন জিনিস তোমাকে ধোঁকায় ফেলেছে তোমার মহান রবের ব্যাপারে-যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, সুগঠিত করেছেন এবং সুষম করেছেন? যে আকৃতিতে চেয়েছেন, তাতেই তিনি তোমাকে গঠিত করেছেন। [১]
মানবদেহের প্রতিটি জিনিস-ইন্দ্রিয়, স্নায়ু, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, হৃৎপিণ্ড, ধমনি; সবকিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন অত্যন্ত নিখুঁত ও সুষমভাবে।
কাপড়ের বুননেও ইতিদাল বা ভারসাম্য রয়েছে। ভারসাম্য না থাকলে একটি কাপড় একবার পরলেই নষ্ট হয়ে যেত। একজন মানুষ একটুকরো কাপড় নিয়ে কাটল, মাপ দিল। একমাস পর জামা তৈরি হলো। তারপর শুধু একবার জামাটি পরতে পারল- এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। আপনি দেখবেন, কাপড়ের সুতা শক্ত, সুবিন্যস্ত, সুষম; একবছর, দুবছর পর্যন্ত পরতে পারবেন। উপভোগ করবেন। তারপর হয়তো পুরোনো হবে। সুতরাং সুতার স্থিতিস্থাপকতাও ভারসাম্যপূর্ণ, সুষম।
মুরগি প্রতিদিন ডিম দেয়। যদি মাসে একটি ডিম দিত, তবে ডিমের দাম অনেক বেশি হতো। গাভির খাদ্যের দাম যদি দুধের চেয়ে বেশি হতো, তাহলে কেউ গাভি পুষত না। গাভির খাদ্যের দাম দুধের দামের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ।
আপনি হাজার বছর এই পথে হাঁটতে পারেন। শুধু আল্লাহর বাণী- 'নিশ্চয় আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি পরিমিতভাবে'-এর সত্যতাই অনুভব করবেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো সীমলঙ্ঘন নেই; নেই কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি। বরং তিনি প্রতিটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন ভারসাম্যপূর্ণরূপে, সুষমভাবে।
সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের কথা ভাবতে পারি। এই দূরত্বও ভারসাম্যপূর্ণ। সূর্য যদি পৃথিবীর বেশি কাছে থাকত, তাহলে পৃথিবী উনুনে পরিণত হতো। আবার যদি বেশি দূরে থাকত, তাহলে পৃথিবী পরিণত হতো হিমায়িত কবরস্থানে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ بِحُسْبَانٍ *
সূর্য ও চন্দ্র আবর্তন করে নির্ধারিত কক্ষপথে [১]
শিশু মাতৃগর্ভে নয় মাস অবস্থান করে। যদি পাঁচ বছর অবস্থান করত, তাহলে মায়ের জন্য তা অসহনীয় হয়ে যেত। আবার যদি এক সপ্তাহ থাকত, তাহলে সন্তান হতো মৃত। সন্তানের মৃত্যুও সহ্য করার মতো নয়।
নারীর ডিম্বাশয় যদি পুরুষের মতো দীর্ঘকাল ডিম্বাণু উৎপাদন করত, তাহলে ৮৫ বছর বয়সেও নারী গর্ভবতী হতো এবং প্রসব-যাতনা ভোগ করত। যে বয়সে তার দাঁত পড়ে যেত, সে বয়সেও আপনি তার থেকে সন্তানের আশা করতেন। তাই ডিম্বাণু উৎপাদনের সময়কালেও ভারসাম্য রয়েছে। সাধারণত নারীরা ৪৫ কিংবা ৫০ বছর বয়সে উপনীত হলে গর্ভধারণ করতে পারে না। এই ব্যবস্থা আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীদের প্রতি রহমত। এটিও তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন; সুষম বণ্টন।
এছাড়া আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, রাত-দিন; সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টিতে এমন উদাহরণ অসংখ্য। দিন যদি হতো ৫০ ঘণ্টা, অথচ আপনি কাজ করতে পারেন আট ঘণ্টা, তবে কেমন হতো? দোকান খুলতেন, আবার বন্ধ করে বাড়িতে যেতেন, দিনের বেলায়ই ঘুমাতেন। ওদিকে অন্য কেউ হয়তো কাজ করত। তারপর আবার দোকানে ফিরতেন। জীবন হয়ে যেত দুর্বিষহ। আবার যদি রাত-দিন উভয়টিই ৫০ ঘণ্টা হতো, তবে ঘুমাতেন, ঘুম থেকে জেগে কাজে যেতেন, তারপর আবার ঘুমাতেন, ঘুম থেকে উঠে পুনরায় কাজ করতেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ اللَّيْلَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بضيَاءٍ أَفَلَا تَسْمَعُونَ قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَّهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فِيهِ أَفَلَا تُبْصِرُونَ وَمِنْ رَحْمَتِهِ جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ )
আপনি বলুন, আল্লাহ যদি রাতকে তোমাদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত অবিরাম করেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য আছে, যে তোমাদের আলো এনে দিতে পারবে? তবুও কি তোমরা শুনবে না? বলুন, আল্লাহ যদি দিনকে তোমাদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত দীর্ঘ করে দেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া কি কোনো উপাস্য আছে, যে তোমাদের এমন রাত এনে দিতে পারবে-যে রাত তোমরা যাপন করবে? তোমরা কি তবুও ভেবে দেখবে না? তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদের জন্য রাত ও দিন বানিয়েছেন, যাতে তোমরা বিশ্রাম নিতে পারো এবং আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধান করতে পারো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।[১]
তাই আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে—রাত ও দিনের দৈর্ঘ্য, পৃথিবী থেকে চাঁদ ও সূর্যের দূরত্ব, পৃথিবী ও চাঁদের আকার অত্যন্ত পরিমিত, সুষম। পৃথিবীর আকার যদি বর্তমান আকারের চেয়ে পাঁচগুণ বড় হতো, তাহলে আপনার ওজনও পাঁচগুণ বেড়ে যেত; চলাফেরা কষ্টকর হয়ে যেত। কারণ মানুষের ওজন পৃথিবীর ওজনের সাথে সম্পৃক্ত। এর প্রমাণ হলো, চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষের ওজন পৃথিবীর ওজনের এক ষষ্ঠাংশ।
সুতরাং পৃথিবীর আকার, পুরুত্ব, আকর্ষণ, সূর্য ও চন্দ্র থেকে পৃথিবীর দূরত্ব, পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি; সবকিছুই পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ।
গম যদি তরমুজের মতো ক্রমান্বয়ে পরিপক্ক হতো, তাহলে আমাদের একটি একটি করে শীষ দেখতে হতো-কাটার উপযুক্ত হয়েছে কিনা। এখন গম বোনার তিন মাস পর পাকে; একদিনেই কেটে ফেলা যায়। কিন্তু ফল পাকে ধীরে ধীরে।
আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ, ভারসাম্য রক্ষাকারী। তিনি সূক্ষ্মদর্শী, ভারসাম্যপূর্ণ, প্রজ্ঞাবান। তাই সুচিন্তিত একটি মাত্রায় সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।
কল্পনা করুন, তরমুজের খোসা যদি হতো টমেটোর খোসার মতো তাহলে হয়তো জীবনে একটি তরমুজও খেতে পারতেন না। কারণ তরমুজ স্থানান্তর করা দুষ্কর হয়ে পড়ত। আবার টমেটোর খোসা যদি হতো তরমুজের মতো, তাহলে পুরো টমেটোই খোসা হয়ে যেত। প্রতিটি ফলের খোসা, আকার, আকৃতি, স্বাদ, মিষ্টতা; সবই ভারসাম্যপূর্ণ।
'আল-আদল' এর প্রথম অর্থ-আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষাকারী, ন্যায়পরায়ণ। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন চূড়ান্ত প্রজ্ঞার আলোকে। কুরআনুল কারিমের একটি আয়াতে এ মর্ম ফুটে উঠেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ وَيَوْمَ يَقُولُ كُن فَيَكُونُ ...
তিনি সেই সত্তা, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং যেদিন তিনি (কিয়ামতকে) বলবেন, 'হয়ে যাও', তখনই তা হয়ে যাবে।[১]
অর্থাৎ তিনি আসমান ও জমিনের প্রত্যেকটি জিনিসকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেন, যাতে কোনো কম-বেশি নেই। আমরা আমাদের খাদ্য ও আমাদের সৃষ্টির ব্যাপারে ভেবে দেখি-
فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ إِلَى طَعَامِهِ أَنَّا صَبَبْنَا الْمَاءَ صَبًّا ثُمَّ شَقَقْنَا الْأَرْضَ شَقًّا فَأَنْبَتْنَا فِيهَا حَبًّا وَعِنَبًا وَقَضْبًا * وَزَيْتُونَا وَنَخْلًا وَحَدَائِقَ غُلْبًا وَفَاكِهَةً وَأَبًّا مَّتَاعًا لَّكُمْ وَلِأَنْعَامِكُمْ
মানুষ যেন তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করে, আমি প্রবল ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করি, তারপর জমিনকে যথাযথভাবে বিদীর্ণ করি। তারপর তাতে ফলাই শস্য, আঙুর, শাক-সবজি, যাইতুন ও খেজুর, নিবিড়-ঘন বাগান, ফল ও ঘাস, তোমাদের ও তোমাদের গবাদি পশুর ভোগের জন্য।
فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ * إِنَّهُ عَلَى رَجْعِهِ لَقَادِرٌ
অতএব মানুষ যেন লক্ষ করে, কোন জিনিস থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি (বীর্য) থেকে। যা বেরিয়ে আসে মেরুদণ্ড ও পাঁজরের মাঝ থেকে। নিশ্চয় তিনি তাকে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম। [১]
أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ * وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ * وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ * وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ *
তারা কি তবে তাকিয়ে দেখে না উটগুলোর দিকে, কীভাবে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে? আকাশের দিকে, কীভাবে তা উঁচু করা হয়েছে? পাহাড়গুলোর দিকে, কীভাবে সেগুলো স্থাপন করা হয়েছে? পৃথিবীর দিকে, কীভাবে তাকে বিস্তৃত করা হয়েছে?[২]
আল্লাহ তাআলা তাঁর আদেশের ক্ষেত্রেও ন্যায়পরায়ণ। তিনি আমাদের বছরে ৩০ দিন সিয়াম পালনের আদেশ দিয়েছেন। তিনি যদি ছয় মাস সিয়াম পালনের আদেশ দিতেন, তবে তা মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যেত। এর প্রমাণ হলো, রামাদানের শেষ পাঁচদিন মানুষের মনে হয়, প্রতিটি দিন যেন একমাস। তাই ৩০ দিনই ভারসাম্যপূর্ণ সময়সীমা।
তিনি আমাদের দৈনিক পাঁচবার সালাত আদায়ের আদেশ দিয়েছেন। যদি তিনি ৫০ বার সালাত আদায় করতে বলতেন এবং প্রতিবার ৫০ রাকাত আদায় করতে বলতেন, তাহলে আমাদের পক্ষে তা অসম্ভব হয়ে পড়ত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ...
আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না। [৩]
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে জীবনে একবার হজের আদেশ দিয়েছেন। যাকাতে ৪০ ভাগের একভাগ ব্যয় করার আদেশ দিয়েছেন। অথচ আমরা দেখতে পাই, ক্ষেত্রবিশেষ ট্যাক্স শতকরা ৮০ টাকা থেকে ৯৩ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়-যা অধিকাংশ মানুষের কাছে বেশি। অন্য দিকে যাকাত দিতে হয় ৪০ ভাগের একভাগ; শতকরা আড়াই টাকা, হাজারে ২৫ টাকা, লাখে আড়াই হাজার টাকা। এই অঙ্ক সহজসাধ্য। সুতরাং যাকাত, সিয়াম, হজ; আল্লাহর সকল আদেশই ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায়সংগত।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে দৃষ্টি অবনত রাখার আদেশ দিয়েছেন। কেউ যদি রাস্তায় চলতে চলতে মোড়ের সামনে আসে এবং মোড় পার হতেই কোনো নারীর ওপর দৃষ্টি পড়ে, তাহলে এতে কোনো গুনাহ হবে না। কারণ সে তখন অসতর্ক ছিল। তাই প্রথমবার দৃষ্টিতে পড়লে কোন অসুবিধা নেই; দ্বিতীয়বার তাকালে গুনাহ হবে।
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ ...
আপনি মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে।[১]
যদি তিনি অবনত রাখার আদেশ না দিয়ে দৃষ্টিপাত না করার আদেশ দিতেন, তবে আমরা সবাই গুনাহগার হতাম।
সিয়ামরত অবস্থায় যদি আপনি সফর করতে চান, তাহলে আল্লাহ আপনাকে সিয়াম পালন না করার সুযোগ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
أَيَّامًا مَعْدُودَاتٍ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ...
এই সিয়াম নির্দিষ্ট কয়েকদিনের জন্য, তবে তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ থাকে কিংবা সফরে থাকে, (এবং এই কারণে সিয়াম পালন করতে না পারে) তাহলে সে অন্য দিনগুলোতে সিয়াম পালন করে নেবে।[২]
এরকমভাবে আপনি যদি মুসাফির হন, তবে আল্লাহ আপনাকে সালাত কসর করার আদেশ দিয়েছেন; অর্থাৎ চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ সালাত দুই রাকাত আদায় করতে বলেছেন। হানাফি আলিমদের মতে সফররত অবস্থায় সালাত কসর করা ওয়াজিব।
বাসস্টেশন, এয়ারপোর্ট কিংবা রেলস্টেশনে আপনি উদ্বিগ্ন থাকতে পারেন। তাই তিনি আদেশ দিয়েছেন, যুহরের সালাত দুই রাকাত আদায় করো। অতএব শরিয়ত ভারসাম্যপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে যেমন ভারসাম্য রক্ষা করেন, ন্যায়সংগত আচরণ করেন; ঠিক তেমনই আদেশ-নির্দেশের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রাখেন, ন্যায়বিচার করেন।
আল্লাহ তাআলার 'আল-আদল' (الْعَدْلُ) নামের ক্ষেত্রে বান্দা হিসেবে আমাদের করণীয় কী?
আল্লাহ তাআলার সুন্দর নামগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের দুটি বড় উদ্দেশ্য থাকা উচিত-
প্রথম উদ্দেশ্য আমরা যেন আল্লাহকে চিনতে পারি। পুরো জীবনে আল্লাহকে চিনতে পারার চেয়ে উত্তম লক্ষ্য আর কী হতে পারে! যে মহান সত্তার দয়ায় আমি চিরকাল থাকব, তাকে কি চিনব না?
দুনিয়ার রীতি হলো, বিয়ে করার পূর্বে সবাই তার জীবনসঙ্গীর ব্যাপারে জানতে চেষ্টা করে। সেই দাম্পত্য হয়তো থাকে মাত্র ৫০ কি ৬০ বছর। অথচ আল্লাহ তাআলার সাথে আমাদের থাকতে হবে চিরকাল। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ কি আছে এমন-যে পরিচয় পাওয়ার উপযুক্ত? আল্লাহকে চিনতে পারার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় কি আছে?
আল্লাহ তাআলার সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। তিনি সেই নামে আমাদের ডাকতে বলেছেন। এখন আমরা যদি বলি, ইয়া লাতিফ! ইয়া রহিম! ইয়া কাদির!; তবে কি আমাদের এই নামগুলোর অর্থ জানা উচিত নয়?
এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছে, যারা অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে যায়। তারপর যখন ডাক্তার তাকে বলে, আপনার সুস্থ হওয়ার কোনো আশা নেই, তখন সে ভেঙে পড়ে। কারণ সে জানে না যে, রোগ যত কঠিন হোক, ডাক্তার যত সুনিশ্চিত কথা বলুক, আল্লাহ আরোগ্য দান করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা যেমন রোগ সৃষ্টি করেছেন, আরোগ্যও সৃষ্টি করেছেন। তিনি দুর্বলতা থেকে শক্তি সৃষ্টি করেন, সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করেন, হতাশা থেকে আশার আলো দেখান।
মানুষ যখন আল্লাহ তাআলাকে ‘ইয়া কাদির!’ (হে সর্বশক্তিমান!) নামে ডাকার পরও হতাশ হয়, তখন বুঝতে হবে, সে ‘আল-কাদির’ (الْقَادِرُ) এর অর্থই জানে না। মোটকথা আপনি যখন ‘আল-কাদির’ এর অর্থ জানবেন, তখন হতাশা আপনার থেকে দূরে পালাবে।
আমি বলি, যখন আপনি নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করবেন—আল্লাহ তাআলা আপনাকে সবচেয়ে কঠিন ব্যাধি থেকে কোনো মাধ্যম ছাড়াই আরোগ্য দান করতে পারেন, তখন আপনার সেই বিশ্বাসই হবে নির্ভেজাল ঈমান। আল্লাহ যখন আছেন, তখন মানুষ কি চিন্তিত হতে পারে, ভয় পেতে পারে? বরং মানুষ থাকবে নিশ্চিন্ত। আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন, সুদৃঢ় করবেন, আরোগ্য দান করবেন। কুরআনে বর্ণিত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বক্তব্য শুনুন—
قَالَ أَفَرَأَيْتُم مَّا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ ۞ أَنتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ ۞ فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِّي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ ۞ الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ ۞ وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ ۞ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ ۞ وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ ۞ وَالَّذِي أَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ ۞ رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ ۞ وَاجْعَل لِّي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ ۞ وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ
ইবরাহিম বলল, তোমরা কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছ, তোমরা কীসের পূজা করছ? তোমরা ও তোমাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদারা? এরা সব আমার শত্রু, সৃষ্টিজগতের রব (এক আল্লাহ) ছাড়া। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনিই আমাকে পথ প্রদর্শন করেছেন। তিনিই আমাকে খাওয়ান ও পান করান। আর আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। তিনি আমাকে মৃত্যু দেবেন, তারপর আবার জীবিত করবেন। বিচার দিবসে তিনিই আমার অপরাধগুলো ক্ষমা করবেন বলে আমি আশা রাখি। হে আমার রব, আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন আর সৎকর্মশীলদের দলভুক্ত করুন। পরবর্তীদের মধ্যে আমার সুখ্যাতি অব্যাহত রাখুন। আমাকে সেসব লোকের দলভুক্ত করুন, যারা হবে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতের অধিকারী [১]
তিনি সৃষ্টি করেন, সুপথ প্রদর্শন করেন, রিজিক দান করেন, আরোগ্য দান করেন, জীবন দান করেন তিনি, মৃত্যুও দেন তিনি। ক্ষমাও করেন তিনি। তিনিই রাব্বুল আলামিন; বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এমন কোনো ব্যক্তি কখনো পুরোপুরি হতাশ হতে পারে না, চিন্তিতও হতে পারে না। কেননা আল্লাহ সবসময় তার সাথেই রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَقَالَ اللَّهُ إِنِّي مَعَكُمْ لَئِنْ أَقَمْتُمُ الصَّلَاةَ وَآتَيْتُمُ الزَّكَاةَ وَآمَنتُم بِرُسُلِي وَعَزَّرْتُمُوهُمْ وَأَقْرَضْتُمُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا لَأُكَفِّرَنَّ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَلَأُدْخِلَنَّكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ فَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ )
আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সাথে আছি। যদি তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত প্রদান করো, আমার রাসুলদের বিশ্বাস করো ও তাদের সাহায্য করো এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর; তবে অবশ্যই আমি তোমাদের পাপগুলো মোচন করে দেব এবং তোমাদের সেই জান্নাতে প্রবেশ করাব-যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদীনালা। কিন্তু এরপরও তোমাদের মধ্য থেকে যে লোক কুফরি করবে, সে অবশ্যই বিচ্যুত হবে সরল পথ থেকে।[২]
সমাজে যার কিছুটা অবস্থান কিংবা ক্ষমতা আছে, সে মানুষকে বলে, 'আমি তোমার সাথে আছি, ভয় পেয়ো না। কিছু লাগলে কল দিয়ো।' অভয় পাওয়া সেই ব্যক্তি যখন অন্যায়ভাবে কারও সাথে লড়াই জুড়ে দেয়, তখন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির অভয়ের কথা ভেবে নিশ্চিন্ত থাকে।
দুনিয়ার সামান্য ক্ষমতাশালী ব্যক্তির অভয় পেয়ে যদি মানুষের এমন অবস্থা হয়, তবে মুমিন ব্যক্তির অবস্থা কেমন হওয়া উচিত, যাকে আল্লাহ অভয় দিয়ে বলেছেন, 'আমি তোমাদের সাথে আছি। যদি তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো, আমার রাসুলকে বিশ্বাস করো ও তাদের সাহায্য করো এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করো; তবে অবশ্যই আমি তোমাদের পাপগুলো মোচন করে দেব এবং তোমাদের সেই জান্নাতে স্থান দেব-যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়।'[১]
তাই বলছি, কেন আল্লাহ তাআলার নামগুলো জানবেন? কারণ সেই নামে তাঁকে ডাকবেন, তাঁর কাছে চাইবেন। তখন আপনি জানতে পারবেন আল্লাহ রহিম; পরম করুণাময়। আল্লাহর কোনো ফয়সালা সাময়িকভাবে কঠোর মনে হলেও তার মধ্যে রহমত ও দয়া নিহিত রয়েছে। আল্লাহ ‘আল-কাদির’ (সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী)। আপনি যখন জানবেন, আল্লাহ তাআলা আপনার রোগ নিরাময় করতে সক্ষম, তখনই আপনি মুমিন। আপনার হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
পশ্চিমা বিশ্বে কেন আত্মহত্যার হার এত বেশি? কারণ তারা আল্লাহকে চিনে না। বিপরীতে তুলনামূলক অনুন্নত দেশগুলোতে জীবনযাত্রার মান নিম্ন ও কঠিন হওয়ার পরও আত্মহত্যার হার অনেক কম। কারণ আর কিছু নয়; আল্লাহর প্রতি ঈমান।
ইউনিভার্সিটিতে আমাদের একজন সাইকোলোজির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ইউরোপের একটি মানসিক ব্যাধি শীর্ষক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমাদের তিনি বলেছেন, সম্মেলনে আমি বলেছি, ‘আমাদের দেশে মানসিক রোগের হার অনেক কম। কারণ আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি, তাঁর সিদ্ধান্ত ও ভাগ্যের উপর সন্তুষ্ট থাকি।’
প্রকৃতপক্ষে মুমিন বলে, ‘আল্লাহ এমনটি চান’, ‘এটাই আল্লাহর ইচ্ছা’, ‘আল্লাহ যা চান, তাই হয়; তিনি না চাইলে হয় না’। সহিহুল বুখারি ও সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
আল্লাহ তাআলা যা নিয়ে নেবেন, তা তাঁর। আর যা আপনাকে দেবেন, তা তাঁর পক্ষ হতে আপনার জন্য অনুগ্রহ। আপনি যদি এই বিশ্বাস করেন, তাহলে কিছুতেই কোনো সমস্যা হবে না।
কোনো পরিবারে ছোট শিশু মারা গেলে দুঃসহ বেদনা সৃষ্টি হয়। আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার আবু তালহা রায়িয়াল্লাহু আনহুর এক ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ল। বর্ণনাকারী বলেন, (সেই রোগেই) তার মৃত্যু হলো। আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বাড়ির বাইরে (সফরে) ছিলেন। তখন তার স্ত্রী উম্মু সুলাইম তার পরিবারের লোকদের বললেন, 'যতক্ষণ আমি না বলি, ততক্ষণ তোমরা আবু তালহাকে তার ছেলের মৃত্যু সংবাদ দিয়ো না।' আবু তালহা বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'তার ছেলের অবস্থা কেমন?' উম্মু সুলাইম বললেন, 'তার আত্মা শান্ত হয়েছে এবং আশা করি সে এখন আরাম পাচ্ছে।' আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু ভাবলেন, তার স্ত্রী সত্য বলেছেন। উম্মু সুলাইম রাতের খাবার নিয়ে এলেন, তিনি খাবার খেলেন। তারপর উম্মু সুলাইম আগের চেয়ে উত্তমরূপে সাজগোজ করলেন। আবু তালহা তার সাথে মিলিত হলেন। উম্মু সুলাইম যখন দেখলেন, আবু তালহা পরিতৃপ্ত, তখন তাকে বললেন, 'আবু তালহা, কেউ যদি কোনো জিনিস রাখতে দেয়, তারপর তা নিয়ে নেয়, তবে কি সে ফেরাতে পারে?' আবু তালহা বললেন, 'না।' উম্মু সুলাইম বললেন, 'তাহলে আপনার ছেলের ব্যাপারে মনে করুন (আল্লাহ তাকে নিয়ে নিয়েছেন)।' আবু তালহা রেগে গিয়ে বললেন, 'তুমি আমাকে আগে বলোনি, এখন আমি অপবিত্র, এখন সংবাদটা দিলে।' তিনি রাত যাপন করলেন এবং গোসল করলেন। তারপর তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে (ফজরের) সালাত আদায় করলেন এবং নবিজিকে রাতের ঘটনা জানালেন। তখন নবিজি বললেন, 'আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা তোমাদের এ রাতের মধ্যে বারাকাহ দেবেন।' বর্ণিত আছে, পরে আবু তালহা দম্পতির নয়জন সন্তান হয়েছিল। তারা সবাই কুরআনের হাফিয ছিল।[১]
একটি মুমিন পরিবারে ও ঈমানহীন পরিবারে সন্তানের মৃত্যুবরণের মাঝে এটিই পার্থক্য। এমনকি দেখা যায়, অনেক মা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন পর্যন্ত হয়ে যায়।
অতএব আমরা আল্লাহ তাআলার নামগুলো জানব-এর মাধ্যমে সৌভাগ্য অর্জন করার জন্য। আপনি আল্লাহর সাথে থাকবেন অনন্তকাল। দুনিয়াতে যদি তাকে চিনতে পারেন, তবে তা হবে প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।
দ্বিতীয় উদ্দেশ্য
এই নামগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? মুমিন হিসেবে এ নামগুলো থেকে আপনি কীভাবে উপকৃত হবেন? কারণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও।'
বান্দা হিসেবে 'আল-আদল' নামের ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হলো, বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি উভয়টি পরিহার করে চলা। যেমন: জৈবিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে পাপাচার অর্থাৎ বাড়াবাড়ি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আবার একেবারে নিষ্ক্রিয়তা অর্থাৎ ছাড়াছাড়িও ত্যাগ করতে হবে।
সমাজে আমরা এমন কিছু মানুষ দেখি, যাদের বলা হয় 'প্লেবয়'। তারা প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে ডুবে থাকে, হিংস্র হয়ে ওঠে, মানুষের সম্ভ্রম নষ্ট করে। আবার এমন মানুষও আছে, যে দুনিয়ার কোনো জিনিসের প্রতিই আগ্রহ দেখায় না; এমনকি পারিবারিক বিষয়গুলোও এড়িয়ে চলে।
এক নারী আমিরুল মুমিনিন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলেছিলেন, 'আমার স্বামী বেশি বেশি সালাত আদায় করেন আর সিয়াম পালন করেন।' উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু ভাবলেন, স্ত্রী হয়তো তার স্বামীর প্রশংসা করছে। তিনি বললেন, 'আল্লাহ আপনার স্বামীকে বারাকাহ দান করুন।' তখন কেউ একজন বললেন, 'আমিরুল মুমিনিন, তিনি তার স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করছেন; প্রশংসা নয়।' উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন ওই লোককে ডেকে এনে উপদেশ দিলেন। বললেন, 'তোমার ওপর তোমার পরিবারেরও হক রয়েছে।'[১]
উসমান ইবনু মাজউন রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে এমন একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একদিন উসমান ইবনু মাজউন রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী বিষণ্ণ ও মলিন মুখে আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে গেলেন। আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা তার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমার স্বামী এত বেশি সালাত আদায় আর সিয়াম পালন করেন যে, আমার জন্য তার কোনো সময়ই নেই। তিনি দিনে সিয়াম পালন আর রাতে সালাত আদায় করে কাটিয়ে দেয়। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান ইবনু মাজউন রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে নবিজি বললেন, 'হে উসমান, তুমি কি আমার সুন্নাহ এড়িয়ে চলছ?' তিনি বললেন, 'না, আল্লাহর শপথ হে আল্লাহর রাসুল! বরং আমি তো আপনার সুন্নাহরই অনুসারী।' তিনি বললেন, 'আমি (রাতে) ঘুমাই এবং সালাত আদায় করি, সিয়াম পালন করি এবং ইফতারও করি, নারীদের বিবাহও করি। হে উসমান, আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তোমার প্রতি তোমার পরিবারের হক রয়েছে। পরের দিন উসমান ইবনু মাজউনের স্ত্রী প্রফুল্ল ও হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে এলেন। তিনি তার অবস্থা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিলেন, 'সবাই যা পায়, আমিও তাই পেয়েছি।' [১]
তাই আমরা যখন 'আল-আদল' নামটি জানব, তখন আমরা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে বেঁচে থাকতে পারব। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ *
যারা নিজ লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে, তবে তাদের স্ত্রী ও তাদের মালিকানাধীন দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে দোষ নেই। কিন্তু এর বাইরে অন্যদের কামনা করলে তারা হবে সীমালঙ্ঘনকারী [২]
দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই অবস্থান ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সংগত।
সন্তানের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। সন্তানের হাতে এত বেশি অর্থ তুলে দেবেন না-যার কারণে সে নষ্ট হয়ে যায়। আবার তাকে এতটা বঞ্চিতও করবেন না-যার কারণে তারা আপনার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। বরং তাকে যথেষ্ট পরিমাণ খরচ দিন, তার প্রয়োজন পূরণ করুন। যদি তাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দেন, তাহলে আপনি বাড়াবাড়ির করলেন, যদি প্রয়োজনের চেয়ে কম দেন, তবে ছাড়াছাড়িতে জড়িয়ে পড়লেন।
একবার হিন্দা বিনতু উতবা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ ব্যক্তি।
তিনি আমার এবং আমার সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় করেন না। তবে আমি তাকে না জানিয়ে তার সম্পদ থেকে প্রয়োজনীয় খরচ গ্রহণ করে থাকি। এতে কি আমার কোনো পাপ হবে?’ তখন নবিজি বললেন, ‘তোমার ও তোমার সন্তানের জন্য যতটুকু যথেষ্ট হয়, তা ন্যায়সংগতভাবে নিতে পার।’ [১] ‘ন্যায়সংগতভাবে’ এর মানে হলো, শরিয়তের দৃষ্টিতে যা বেশিও নয়, কমও নয়।
যুদ্ধের ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। হিংস্র পশুর মতো হওয়া যাবে না, আবার ভয় পেয়ে বসে থাকাও যাবে না। বরং মধ্যবর্তী পন্থা; অর্থাৎ সাহসিকতা অবলম্বন করতে হবে। একইভাবে বুদ্ধির ক্ষেত্রে ধূর্ততা, ধোঁকা ও চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকতে হবে; বেঁচে থাকতে হবে বোকামি ও নির্বুদ্ধিতা থেকে। বরং অনুসরণ করতে হবে এই প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী-
| আমি ধোঁকাবাজ নই; ধোঁকাবাজও আমাকে ধোঁকা দিতে পারে না।
অর্থাৎ এত সরল নই যে, ধোঁকায় পড়ব; আবার এত মন্দও নই যে, ধোঁকা দেব।
এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا ...
এভাবেই আমি তোমাদের বানিয়েছি মধ্যপন্থি উম্মত। [২]
আমরা সবসময় বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করার চেষ্টা করব। দেখুন, সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আপনি চাইলেই কঠোর হতে পারেন। কঠোরতার জন্য তো খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। তাকে দুটো থাপ্পড় লাগিয়ে দিলেই হলো। কিন্তু এর ফলে কী হবে, তার মনটাই ভেঙে যাবে। সে ঠিকই আপনার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে থাকবে।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা শিক্ষা দাও, কিন্তু নির্দয় হয়ো না। [১]
আবার সন্তানকে এত বেশি ছাড় দেওয়া যাবে না, যাতে সে সীমলঙ্ঘন করে ফেলে। বরং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হলো, সন্তান আপনার প্রতি আগ্রহী থাকবে, আবার আপনাকে ভয়ও পাবে। এই অবস্থানে থাকা সুকঠিন। প্রান্তিক অবস্থান গ্রহণ করা সবসময় সহজ। নিংড়ে ফেলার মতো নরম হওয়া যেমন সহজ, তেমন ভেঙে ফেলার মতো শক্ত হওয়াও সহজ।
আপনার মাঝে এবং মানুষের মাঝে এমন অবস্থান থাকতে হবে-যেন তারা কঠিন হলে আপনি ছাড় দিতে পারেন; তারা ছাড় দিলে আপনি কঠিন হতে পারেন। আপনার চারপাশে যারা থাকে, তারা যেন একইসাথে আপনার সঙ্গ কামনা করে এবং ভয়ও পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شهيدًا ...
এভাবেই আমি তোমাদের বানিয়েছি মধ্যপন্থি উম্মত-যাতে তোমরা অন্যদের ব্যাপারে সাক্ষী হও আর রাসুল হয়ে যান তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষী।[২]
পূর্বে আমরা আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্দেশের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার আলোচনা করেছি। এখন আমরা কর্মের ক্ষেত্রে আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতা ও ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে আলোচনা করব। আপনাকে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতে হবে, বিশ্বজগতে পুরোপুরি ভারসাম্য বজায় রয়েছে।
মনে করুন, কোনো ব্যক্তি সঠিকভাবে ব্যবসা করছে। তার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানও ঠিক আছে। মূল্যও নির্ধারিত ও স্বাভাবিক। তার কাছে কাগজপত্রও আছে। তারপরও কোনো কর্মকর্তা এসে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে তাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দিল।
এটা কি সুস্পষ্ট জুলুম নয়?
শুধু এই ঘটনাটি বাহ্যিকভাবে জুলমই। কিন্তু এই ঘটনার সাথে যদি এই মানুষটির পারিবারিক জীবনকে যুক্ত করি, তার পরিবারের সাথে, প্রতিবেশীর সাথে, তার ঊর্ধ্বতন ও অধঃস্তন ব্যক্তিদের সাথে তার আচরণকে যুক্ত করি, তাহলে এই ঘটনার মাঝে আমরা চূড়ান্ত ন্যায়পরায়ণতা দেখতে পাব। অথবা হতে পারে, ব্যবসায়ী দৃষ্টিকোণ থেকে এমন হিসাব পাওয়া যাবে, যাতে কোনো জুলুম নেই। তবে জুলুম রয়েছে দলিলপত্রে।
১০ বছর আগে একটি ঘটনা ঘটেছিল। বাজারে দুজন লোকের মাঝে ঝগড়া লেগেছিল। একজনের কাছে অস্ত্র ছিল। ঝগড়ার একপর্যায়ে সে গুলি করে বসল। কিন্তু যাকে গুলি করেছিল, তার গায়ে লাগেনি। একব্যক্তি ঝগড়ার আওয়াজ শুনে দোকান থেকে উঁকি দিয়ে দেখছিল। গুলি লক্ষভ্রষ্ট হয়ে তার মেরুদণ্ডে এসে লেগেছিল। চিরদিনের জন্য সে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল।
একব্যক্তি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'উস্তায, আপনি তো আমাদের আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার কথা বলেছিলেন। কিন্তু একি করলেন তিনি? তিনি ছিলেন একজন সৎ ব্যবসায়ী। রিজিকের সন্ধানে পরিবারের ভরণপোষণ যোগানোর জন্য দোকান খুলে বসেছিলেন। কাপড়ের ব্যবসা ছিল তার। তার তো কোনো অপরাধ ছিল না। সে শুধু বাকবিতণ্ডা শুনে দোকান থেকে মাথা বের করেছিল। আচমকা গুলি এসে লাগল তার মেরুদণ্ডে। কোথায় আল্লাহর ন্যায়বিচার?
আমি বললাম, 'আল্লাহর শপথ! আমি জানি, আল্লাহ ন্যায়বিচারক। কিন্তু আপনি এই ঘটনার বহু শাখা-প্রশাখার মধ্য থেকে একটি শাখা হয়তো আমাকে শুনিয়েছেন। হয়তো এই ঘটনার আরও বহু ডালপালা রয়েছে, যেগুলোর কথা আমরা জানি না। আমি বিষয়টি আল্লাহর ন্যায়বিচারের সামনেই সমর্পণ করব।'
শপথ আল্লাহর, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই! আপাতদৃষ্টিতে এটি দুর্ঘটনা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
এই ঘটনার ২০ দিন পর মায়দানের এক বন্ধু আমাকে বললেন, 'আমাদের এক প্রতিবেশী তার ভাইয়ের এতিম সন্তানদের দায়িত্ব নিয়েছিল। তার কাছে (বাড়ির মূল্য বাবদ) এতিম ছেলেগুলোর ২০ হাজার টাকা পাওনা ছিল। কিন্তু সে তাদের টাকাগুলো দিতে অস্বীকার করে বসে। তারা তখন শাইখ হুসাইন খাত্তাবের কাছে অভিযোগ জানাল। শাইখ সেই প্রতিবেশীকে এবং তার ভাতিজাদের ডেকে আনলেন। কিন্তু সে তার মতের ওপরই অটল রইল। তখন শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'বাবারা, তিনি তোমাদের চাচা। চাচার বিরুদ্ধে অভিযোগ কোরো না। এই অভিযোগ তোমাদের জন্য শোভা পায় না। তোমরা বরং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করো।'
এই ঘটনাটি ঘটেছিল রাত আটটায়। পরদিন সেই প্রতিবেশী দোকান থেকে উঁকি দিয়ে দুজন লোকের ঝগড়া দেখছিল। হঠাৎ গুলি লেগে চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে।
এক ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন, 'আচ্ছা, আমি এখনো যে পাপ করিনি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেওয়া কি যৌক্তিক?' আমি উত্তর দিয়েছিলাম, 'এই শাস্তি ছিল পুরোনো পাপের জন্য। আল্লাহর নিরঙ্কুশ ন্যায়পরায়ণতার প্রতি বিশ্বাস রাখা উচিত।'
কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'হে আদম সন্তান, তোমার পাপের কারণে তোমার ওপর শাস্তি আসে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের হোঁচট খাওয়া, রগে টান লাগা ও কাঠের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া; সবই তোমাদের কর্মের প্রতিফল। আর আল্লাহ অনেক পাপই মাফ করে দেন।' [১]
একবার আমি এক ভাইয়ের সাথে গাড়িতে উঠেছিলাম। সে অন্য একটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে বসল। গাড়িটির বডি ও বিভিন্ন পার্টস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, গাড়ির মালিক হয়তো রেগে গিয়ে বকাবকি করবে। সে গাড়ি থেকে নেমে এল। আমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, 'মাফ করে দিলাম।'
আল্লাহর শপথ! আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। আমার বন্ধু যখন ফিরে এল, তখন দেখি, তার চোখে পানি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'ঘটনা কী?' সে বলল, 'একবছর আগে এক ব্যক্তি আমার গাড়ির সাথে তার গাড়ি লাগিয়ে দিয়েছিল। তার গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি, গাড়িতে পর্দানশীন কয়েকজন নারী বসে আছে। তাদের কিছু বলতে মন সায় দিল না। তখন ড্রাইভারকে বলেছিলাম, 'মাফ করে দিলাম।' আজ একবছর পর আমার রব আমার সাথে সেই আচরণই করলেন, যে আচরণ আমি করেছিলাম সেই লোকটির সাথে।'
অন্তরের অন্তস্তল থেকে বিশ্বাস করতে হবে, 'যেমন কর্ম করবে, তেমনই ফল পাবে।'
মনে রাখবেন, 'সদাচার কখনো পুরোনো হয় না, পাপ কখনো বিস্মৃত হয় না, প্রতিদান দেনেওয়ালা কখনো মৃত্যুবরণ করে না।'
আপনাকে মা-বাবার প্রতি সদাচারী হতে হবে। তাহলে আল্লাহ আপনার সন্তানদের মনে আপনার প্রতি সদাচারী হওয়ার ইচ্ছা দান করবেন। মা-বাবার সেবা করবেন; আপনিও সেবা পাবেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দরিদ্র বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন, 'হে বিলাল, তুমি খরচ করে যাও। আরশের অধিপতির কাছে কম হয়ে যাওয়ার ভয় কোরো না।' [১]
খরচ করুন, আল্লাহও আপনার জন্য খরচ করবেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনাদের প্রত্যেকের কাছেই এমন শতাধিক; হাজারো গল্প আছে-মানুষ যেমন আচরণ করে, অন্যের থেকে ঠিক তেমন আচরণই পায়।
এই ঘটনাটি প্রায় সবাই জানি। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ভীষণ ভালোবাসত। তারা দুজন একদিন মুরগির গোশত খাচ্ছিল। এমন সময় একজন ভিক্ষুক দরজায় কড়া নাড়াল। স্ত্রী তখন ভিক্ষুককে মুরগির গোশত দিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু স্বামী তাকে তিরস্কার করল। ধমক দিয়ে বলল, 'তাড়িয়ে দাও!' স্বামীর কথা শুনে স্ত্রী ভিক্ষুককে তাড়িয়ে দিল।
এই ঘটনার দু-তিনবছর পর তাদের সম্পর্কের অবনতি হলো। অবনতির একপর্যায়ে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিল। অন্য এক ব্যক্তির সাথে স্ত্রীর বিয়ে হলো। নতুন স্বামীর সাথে সে সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতে লাগল। তারপর আরও পাঁচ-ছয় বছর অতিবাহিত হলো। একদিন দ্বিতীয় স্বামীর সাথে বসে স্ত্রী মুরগির গোশত খাচ্ছিল। এমন সময় কেউ একজন দরজার কড়া নাড়াল। স্ত্রী দরজা খোলার জন্য এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার সামনে গিয়ে হকচকিয়ে গেল। স্বামী বলল, 'কী হয়েছে?' স্ত্রী বলল, 'ভিক্ষুক এসেছে।' স্বামী বলল, 'তাতে ঘাবড়ানোর কী আছে?' স্ত্রী বলল, 'জানেন, এই ভিক্ষুক কে? আমার প্রথম স্বামী!' তখন দ্বিতীয় স্বামী বলল, 'জানো আমি কে? আমি প্রথম ভিক্ষুক!'
এমন ঘটনা সত্যিই অহরহ ঘটে চলেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে সবকিছু পূর্ণ ন্যায়পরায়ণতার সাথে ঘটে। আপনাকে একটি উপদেশ দিচ্ছি-
যখনই কোনো জুলুমের কথা শুনবেন, বলবেন, 'আমি হয়তো ঘটনার অনেক অধ্যায়ের মাঝ থেকে একটি কিংবা কয়েকটি অধ্যায় শুনলাম। হয়তো আমার অজানা আরও কোনো অধ্যায় বাকি আছে, যা শুনলে আমি এর মাঝে ন্যায়পরায়ণতাই দেখতে পেতাম।' তাই তাড়াহুড়া করবেন না। ঘটনার পূর্বাপর জেনে মন্তব্য করুন। বলুন, 'আল্লাহ ভালো জানেন', 'আপনার রবই তাঁর বান্দাদের খবর জানা এবং দেখার জন্য যথেষ্ট', 'আল্লাহই জানেন, আমরা কিছুই জানি না।'
তবে সবক্ষেত্রে পাপের কারণেই যে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আসে, তা কিন্তু নয়। যেমন: কেউ দৃষ্টিশক্তি হারাল কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করল, তখন এই কথা বলা যাবে না যে, তার পাপের কারণেই এমন হয়েছে। কারণ সমস্ত কল্যাণ আল্লাহর হাতে। হয়তো দৃষ্টিহীনতা ও পঙ্গুত্বই তার জন্য কল্যাণকর।
অতএব দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ, তাঁর আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ, তাঁর সমস্ত কর্মের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ। আমি আবারও সেই হাদিসটি উল্লেখ করছি-
তোমাদের হোঁচট খাওয়া, রগে টান লাগা ও কাঠের খোঁচা লাগা; সবই তোমাদের কর্মের প্রতিফল। আর আল্লাহ অনেক পাপই মাফ করে দেন।[১]
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
১৭১ তোমরা যেকোনো বিপদেই আক্রান্ত হও না কেন, তা তোমাদের কৃতকর্মের কারণেই। আর তিনি বহু পাপ মাফ করে দেন [১]।
وَتِلْكَ الْقُرَىٰ أَهْلَكْنَاهُمْ لَمَّا ظَلَمُوا وَجَعَلْنَا لِمَهْلِكِهِم مَّوْعِدًا
সেসব জনপদের অধিবাসীরা যখন অন্যায় করেছিল, তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম এবং তাদের ধ্বংসের জন্য নির্ধারণ করেছিলাম একটি সময় [২]।
আপনারা অনেক সময় বিভিন্ন দেশে ভূমিকম্প হওয়ার সংবাদ পাঠ করেন। আমি চাই, আপনারা বুঝুন, ভূমিকম্প কি শুধুই ভূপৃষ্ঠের বিচ্যুতির ফলে সৃষ্ট কম্পন?
উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে সুন্দর শহর ছিল এ্যাগাডির। এ্যাগাডির আটলান্টিক সাগরের উপকূলে অবস্থিত ছিল। কিন্তু শহরটি ছিল অশ্লীলতা, পাপাচার ও উলঙ্গপনার আখড়া। নাইটক্লাব, বার ও পতিতালয়গুলো ছিল পাপের সাগরে নিমজ্জিত, যা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে হঠাৎ ভূমিকম্প হয় এ্যাগাডিরে। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮। মাত্র তিন সেকেন্ডে এ্যাগাডির এক বিরান সমতলভূমিতে পরিণত হয়েছিল। আমি মনে করি, এই ভূমিকম্প ছিল আল্লাহর প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ
আল্লাহ দৃষ্টান্ত পেশ করছেন এমন এক জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। সেখানে সব জায়গা থেকে প্রচুর জীবনোপকরণ আসত। এরপর তারা আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা শুরু করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ আস্বাদন করালেন [৩]।
সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টি, নির্দেশ ও কর্ম; সর্বক্ষেত্রেই ‘আদল’; ভারসাম্যরক্ষাকারী, ন্যায়পরায়ণ। মুমিন হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো, মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং সকল কাজে ন্যায়সংগত আচরণ করা।

টিকাঃ
১) সুরা কামার, আয়াত: ৪৯
[১] সুরা ইনফিতার, আয়াত: ৬-৮
[১] সুরা আর-রাহমান, আয়াত: ৫
[১] সুরা কাসাস, আয়াত: ৭১-৭৩
[১] সুরা আনআম, আয়াত: ৭৩
[২] সূরা আবাসা, আয়াত: ২৪-৩২
[১] সুরা তারিক, আয়াত: ৫-৮
[২] সুরা গাশিয়া, আয়াত: ১৭-২০
[৩] সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬
১) সুরা নূর, আয়াত: ৩০
২) সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৪
[১] সুরা শুআরা, আয়াত: ৭৫-৮৫
[২] সুরা মায়িদা, আয়াত: ১২
[১] প্রাগুক্ত
[১] সহিহুল বুখারি: ১৩০১; সহিহু ইবনি হিব্বান: ৬০৯; রিয়াযুস সালিহিন: ৪৪
[১] মুসনাদুল ফারুক, ইবনু কাসির, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৮৬; আল-ইস্তিআব ফি মারিফাতিল আসহাব, খন্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১৩২০; আখবারুল কুজাত, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৭৬; আল-জাওহারাতুন নাইয়ারাহ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২৬
[১] সুনানু আবি দাউদ: ১৩৬৯; সহিহ ইবনি খুযাইমা: ২১০৫; সহিহুল জামি: ৭৯৪৬; মুসনাদু আহমাদ : ২৬৩০৮; মুসনাদুল বাযযার: ৪৮; হাদিসটি সহিহ।
[২] সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৫-৭
[১] সহিহুল বুখারি: ২২১১, ৫৩৬৪, ৭১৮০; সহিহ মুসলিম: ৪৩৬৯, সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৩২, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২২৯৩
[২] সূরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩
[১] মুসনাদু আবি দাউদ আত-তায়ালিসি: ২৬৫৯; মুসনাদুল হারিস: ৪৩; শুআবুল ঈমান, বাইহাকি : ১৬১৪; কানযুল উম্মাল: ২৯৩৩০; হাদিসটির সনদ দুর্বল।
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩
[১] মায়দান-দামেশকের একটি অঞ্চল। উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনু আব্দিল মালিকের শাসনকালে এই অঞ্চলটি আবাদ করা হয়।
[১] শুআবুল ঈমান: ৯৩৫৭; কানযুল উম্মাল: ৬৬৯৩; তাফসির ইবনি কাসির, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৬৩; তাফসিরুত তবারি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৭৫; হাদিসটি সনদের দিক থেকে মুরসাল তথা সূত্রবিচ্ছিন্ন। তবে এর অর্থ বিশুদ্ধ।
১) আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ২৫৭৫; মুসনাদুল বাযযার: ১৩৬৬; সহিহত তারগিব ওয়াত তারহিব :৯৩৩; শুআবুল ইমান: ৩০৬৭; সহিহল জামি: ১৫১২; হাদিসটি সহিহ।
[১] শুআবুল ঈমান: ৯৩৫৭; কানযুল উম্মাল: ৬৬৯৩; তাফসির ইবনি কাসির, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৬৩; তাফসিরুত তবারি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৭৫; হাদিসটি সনদের দিক থেকে মুরসাল তথা সূত্রবিচ্ছিন্ন। তবে এর অর্থ বিশুদ্ধ।
[১] সুরা শুরা, আয়াত: ৩০
[২] সুরা কাহফ, আয়াত: ৫৯
[৩] সুরা নাহল, আয়াত: ১১২

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-বাদি : الْبَدِيعُ

📄 আল-বাদি : الْبَدِيعُ


আমার কাছে পাখির বিশ্বকোষ আছে। বইটির ভূমিকায় লেখক বলেছেন, 'আজ পর্যন্ত তৈরি হওয়া উন্নত প্রযুক্তির বিমানের কোনোটিই পাখির স্তরে পৌঁছতে পারবে না।' মানুষ যত কিছুই তৈরি করুক, যদি গভীরভাবে লক্ষ করেন, তবে দেখবেন- সবক্ষেত্রেই সে প্রকৃতির কোনো অভূতপূর্ব সৃষ্টির অনুসরণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন ভূতপূর্ব কোনো দৃষ্টান্ত ছাড়া বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করলেন, তখন কেউ কি বলেছে-পৃথিবী হতে হবে গোলাকার, বলের মতো। কেউ কি বলেছে-পৃথিবীকে নিজের চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে হবে, সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করতে হবে?
আলো কে সৃষ্টি করলেন? কে সূর্যকে করলেন উত্তপ্ত, প্রজ্জ্বলিত? কে পানিকে তার বৈশিষ্ট্য দিলেন, বাতাসকে তার বৈশিষ্ট্য দান করলেন? কে সকল উপাদানকে দান করলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য? সব উপাদান যদি একই মাত্রার তাপে গলে যেত, তাহলে দেখা যেত-সমগ্র বিশ্ব গ্যাসে আচ্ছন্ন কিংবা শক্ত অথবা তরল হয়ে আছে। যদি এই বিশ্বজগতের ছায়াপথ, ধূমকেতু, অগণিত গ্রহ-নক্ষত্র-এসবের মধ্যকার দূরত্ব, ভারসাম্যপূর্ণ গতিময়তা, অতিসূক্ষ্ম বিন্যাস সবকিছু নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন, তবে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
উদাহরণ হিসেবে আমরা সামনে দৃশ্যমান গাছের পাতার কথা ভাবি। আপনি কি মনে করেন, আমরা এমন একটি পাতা আঁকতে পারব-যার কোনো অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই? সেই পাতাটি হোক ছোট বা বড়, মসৃণ বা অমসৃণ, ডোরাকাটা কিংবা রেখা টানা, গাঢ় রঙের কিংবা উজ্জ্বল রঙের অথবা মিশ্র বর্ণের। আপনি যদি নানা ধরনের পাতা আঁকেন, তাহলে সেই পাতাগুলো কি একই রকম হবে? এমনকি একটি গাছের পাতাও কি একরকম হয়? আল্লাহর শপথ! একটি যাইতুন গাছের দুটি পাতাও যদি সাদৃশ্যপূর্ণ হতো, তাহলে আমার রবের নাম আল-ওয়াসি (الواسع) যার নিদর্শন সর্বব্যাপী বিরাজমান-হতো না!
মানুষের চেহারার কথাও আমরা বলতে পারি। পৃথিবীতে সাড়ে ৭ বিলিয়ন মানুষ বাস করে।[১] পুরো পৃথিবীতে কি এমন একজন মানুষ আছে, যার সাথে অন্য কোনো মানুষের চেহারার পুরোপুরি মিল আছে? অসম্ভব। ফিঙ্গারপ্রিন্টের কথা যদি বাদও দেওয়া হয়, তারপরও প্রতিটি মানুষের শরীরে বিশেষ ঘ্রাণ রয়েছে। সেই ঘ্রাণ অনুসরণ করেই প্রশিক্ষিত কুকুর অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারে। একজন মানুষের ঘ্রাণের সাথে আরেকজনের কোনো মিল নেই। এমনকি দেখা গেছে একই পরিবেশে থাকা এবং একই খাদ্য গ্রহণ করা যমজ ভাইবোনদেরকেও শরীরের ঘ্রাণ দিয়ে আলাদা করতে পেরেছে প্রশিক্ষিত কুকুর।
শরীরের ঘ্রাণের মতো প্রতিটি মানুষের সুরও ভিন্ন ভিন্ন। চোখের মণি ভিন্ন, আঙুলের ছাপ ভিন্ন। প্রত্যেকের রক্তের প্লাজমাও ভিন্ন। আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী মানবদেহে টিস্যু বা কোষ জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। রক্তের গ্রুপ যদিও সীমিত কিন্তু মানবদেহের টিস্যুর ধরন অসীম। পৃথিবীতে শুধু আপনার টিস্যুই আপনার মতো; আপনার মতো আর কেউ নেই। এটি কি 'বাদউন' নয়?
কোনো শিল্পীকে যদি মানুষের চেহারা আঁকতে বলা হয়, তাহলে দুটি, তিনটি, দশটি হয়তো আঁকতে পারবে। খানিক বাদেই তার মস্তিষ্ক থেকে সৃজনশীলতা শেষ হয়ে যাবে। গাড়ি নির্মাতারা গাড়ির আকৃতি তৈরি করে। কখনো বাঁকা করে, কখনো লম্বালম্বিভাবে, কখনো-বা আড়াআড়ি আকৃতিতে। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই আগের ডিজাইনেই ফিরে আসে। কারণ তাদের সৃজনশীলতা খুবই সীমিত। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা হলেন আসমান ও জমিনের 'বাদি' (بَدِيع)। তার প্রতিটি সৃষ্টিই অনন্য ও অভূতপূর্ব।
আল্লাহ তাআলার 'আল-বাদি' (اَلْبَدِيع) নাম কুরআনুল কারিমেও বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَإِذَا قَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ (۱۱۷)
তিনি আসমান ও জমিনের অনুপম সৃষ্টিকর্তা। যখন তিনি কোনোকিছু সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার জন্য কেবল বলেন, 'হও'; আর তাতেই তা হয়ে যায়।[১]
আল-বাদি (بَدِیع) শব্দটি নির্গত হয়েছে বাদউন (بدع) ক্রিয়ামূল থেকে। বাদউন অর্থ পূর্বের দৃষ্টান্ত ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি করা। এক কথায় বলতে পারি, বাদউন মানে মৌলিক বা অভূতপূর্ব কিছু সৃষ্টি করা, সম্পূর্ণ নতুন কিছু সৃষ্টি করা। একই ধরনের আরেকটি শব্দ হলো ইবদা (إبداع)।
আমরা যদি মানবসৃষ্ট জিনিসগুলো খুঁজে দেখি, তাহলে দেখব-ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, জেনে বা অজান্তে মানুষের সব সৃষ্টিই অনুকরণ মাত্র। মানুষ যদি বলে, আমি সাবমেরিন সৃষ্টি করেছি; তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, সাবমেরিন মাছের অনুকরণ। এরকমভাবে যখন বিমান তৈরি করে, তখন সেটি হয় পাখির অনুকরণ।
আগে মনে করা হতো, শুধু ফিঙ্গারপ্রিন্ট মানুষের একক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখন আমরা জানি, মানুষের চেহারা, চোখের মণির রং, শরীরের ঘ্রাণ, গলার স্বর, ফিঙ্গারপ্রিন্ট; সবই মানুষের একক বৈশিষ্ট্য।
আপনি যদি সমুদ্রের মাছের প্রজাতি সম্পর্কে জানেন, যদি এই সম্পর্কে লেখা সচিত্র কোনো বই পড়েন, তাহলে হতবাক হয়ে যাবেন। এখন পর্যন্ত মিলিয়ন প্রজাতির মাছ আবিষ্কৃত হয়েছে। আপনার মনে যেরকম মাছের চিত্রই উদিত হোক, তার অস্তিত্ব রয়েছে। সুচ্ছ, ফসফরাসের মতো, চোখে লম্বা পাপড়ি বিশিষ্ট, পা বিশিষ্ট, ফুল আকৃতির মাছও রয়েছে। এমন মাছও আছে, যা আত্মরক্ষার জন্য কালির মতো পদার্থ ছুড়ে লুকিয়ে পড়ে। এমন মাছও আছে, যা শত্রুকে হাজার ভোল্টের ইলেক্ট্রিক শক দিতে পারে। ছোট ছোট অর্নামেন্টাল মাছও আছে অগণিত। আপনি যদি মাছের প্রকার সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে আপনার জানা কখনো শেষ হবে না। যদি পাখির প্রজাতি, আকৃতি ও ধরন সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে দেখা যাবে, এই বিষয় শুধু কল্পনাতেই ধারণ করা সম্ভব।
এক বন্ধু আমাকে ১৮ খণ্ডে লেখা একটি বইয়ের কথা জানিয়েছিলেন, যার প্রতিটি খণ্ডের পুরুত্ব ১৮ সেন্টিমিটারের বেশি। এই বিশাল বইটি লেখা হয়েছে কেবল নানা জাতের পেঁয়াজ নিয়ে।
অনেকে বলেন, পৃথিবীতে প্রায় ৩ হাজার জাতের গম রয়েছে। কৃষি গবেষণাকেন্দ্রের একজন প্রকৌশলী আমাকে জানিয়েছেন, তাদের গবেষণাকেন্দ্রে ৩০০ জাতের আঙুর রয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি ফল, সবজি শত শত, এমনকি হাজারো জাত আছে। এসবই আল্লাহর ‘আল-বাদি’ নামটিকে ফুটিয়ে তোলে।
একবার আমি মিশরে পতঙ্গ প্রদর্শনীতে গিয়েছিলাম। বিশাল প্রাঙ্গণে বহুসংখ্যক স্টল নিয়ে প্রদর্শনীটি আয়োজিত হয়েছিল। প্রতিটি কামরার চার দেওয়ালজুড়ে ছিল নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ; যেগুলোর কোনোটির সাথে কোনোটির মিল নেই। আমার কাছে বিষয়টি আজও অকল্পনীয়। এটিই আল্লাহর বাণী— ‘তিনি আসমান ও জমিনের অনুপম সৃষ্টিকর্তা’—এর অর্থ।
নানা ধরনের গাছের পাতা, গাছের প্রজাতি, বিভিন্ন ধরনের কাঠ, নানা জাতের উদ্ভিদ, নানা রকমের ঘ্রাণ, অসংখ্য প্রজাতির মাছ, পাখি, ফল-ফুল পৃথিবীতে রয়েছে। এমনকি প্রতিটি তুষার-দানাও স্বতন্ত্র আকৃতি বিশিষ্ট।
আমরা যদি তুষার-দানা অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে বড় করে দেখি, তাহলে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখতে পাব। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে যদি তুষারের হাজারো নমুনা সংগ্রহ করেন, তবুও দেখবেন—প্রতিটি দানার আকৃতি স্বতন্ত্র। সবই আল্লাহর ‘বাদউন’—এর উদাহরণ।
আল্লাহ তাআলার ‘আল-বাদি’ নামের প্রথম অর্থ তিনি নিজ সত্তার ক্ষেত্রে ‘বাদি’; উপমা ও তুলনাহীন। কোনো কিছু তাঁর সদৃশ নয়। তিনিও কোনো কিছুর মতো নন। নিজ সত্তার ক্ষেত্রেও যেমন তিনি ‘বাদি’ তুলনাহীন, তেমনই সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তুলনাহীন। পূর্বে বিরাজমান ও জ্ঞাত আকৃতি-উপমা ছাড়াই তিনি সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করেছেন।
সারকথা হলো, আল্লাহ তাআলাই আসমান ও জমিনকে সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টি করেছেন, সমস্ত বস্তুকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। তিনি বিশ্বজগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন পূর্ববর্তী কোনো দৃষ্টান্ত কিংবা শিক্ষাগ্রহণ ছাড়া। তিনি ‘বাদি’ অর্থাৎ অভূতপূর্ব সৃষ্টিকর্তা।

টিকাঃ
[১] ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী।
[১] সুরা বাকারা, আয়াত: ১১৭

📘 তিনিই আমার রব > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


যে তৃষ্ণার্ত হৃদয় প্রতিক্ষায় থাকে এক পশলা বৃষ্টির, যে পথভোলা পথিক খুঁজে ফেরে পথ, সঁপে দেওয়ার তাড়নায় যে নয়নযুগল হয়ে ওঠে অশ্রুসজল, পাপে নিমজ্জিত যে অন্তর অন্বেষণ করে বেড়ায় রহমতের বারিধারা, তাদের রবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার, রবের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষুদ্র প্রয়াসই হলো 'তিনিই আমার রব'।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00