📄 আল-হক : الْحَقُّ
আল্লাহর নাম ‘আল-হক’ (الْحَقُّ ) শব্দটি বহুল প্রচলিত। আল্লাহ তাআলা ‘আল-হক’। তাঁর কালাম হক (সত্য), তাঁর প্রতিশ্রুতি হক, তাঁর সমস্ত কাজও হক (ন্যায়সংগত)।
এবার আমরা ‘আল-হক’ শব্দটি নিয়ে আলোচনা করব। এর পূর্বে কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করছি—
মনে করুন, আপনার কাছে একটি বৈদ্যুতিক মেশিন আছে। মেশিনটির জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন। আপনি একটি সকেটের কাছে গিয়ে তাতে প্লাগ লাগালেন। কিন্তু প্লাগ লাগানোর পরও মেশিনটি চালু হলো না। তখন আপনি অন্য একটি সকেটে প্লাগটি প্রবেশ করালেন এবং মেশিনটি চলতে শুরু করল। এর দ্বারা বোঝা গেল, প্রথম সকেটটিতে বিদ্যুৎ নেই। সুতরাং দ্বিতীয় সকেটটি ‘হক’ এবং প্রথম সকেটটি ‘বাতিল’। এখানে ‘হক’ অর্থ কী?
‘হক’ এর অর্থ হলো, বিরাজমান বিষয় কিংবা বস্তুটি বিরাজমান। বাস্তবতা হলো, আল্লাহ তাআলা ‘হক’ (সতত বিরাজমান)। তিনি ছাড়া অন্য কারও অভিমুখী হলে আপনি দেখতে পাবেন—সবই মরীচিকা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, অন্তঃসারশূন্য কথা ও ধারণাপ্রসূত শব্দমালা। আপনি যদি আল্লাহর অভিমুখী হন, তাহলে সবকিছু পাবেন। সুতরাং ‘আল-হকে’র প্রথম অর্থ—বিরাজমান জিনিস। আর হকের বিপরীত শব্দ ‘বাতিলে’র প্রথম অর্থ—অস্তিত্বহীন জিনিস।
মানুষ যখন আপনাকে কোনো ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) দেয় এবং সেই ওয়াদা পূরণ করে, তখন তার ওয়াদা হক (সত্য) হয়। পক্ষান্তরে যদি ওয়াদা পূরণ না করে, তাহলে তার ওয়াদা হয় বাতিল (মিথ্যা)।
আল্লাহ তাআলা জিনদের অসাধ্য সাধনের শক্তি দেননি। এজন্য যদি বিশ্বাস করেন, জিনরা মানুষকে কল্যাণ-অকল্যাণ দিতে পারে, উন্নতি দান করতে পারে, বিপদ থেকে মুক্তি দিতে পারে, তাহলে আপনার এই বিশ্বাস হবে বাতিল। কারণ এই বিশ্বাস বাস্তবতার পরিপন্থি। আবার আপনি যদি বলেন, অমুক ব্যক্তি এই এই কাজ করতে পারে, অথচ বাস্তবে সে সাধারণ বান্দামাত্র; যার এমন কিছু করার ক্ষমতা নেই, তাহলে আপনার কথাটি হবে বাতিল।
সুতরাং বিরাজমান জিনিস, বিরাজমান জিনিসের অস্তিত্বে বিশ্বাস পোষণ ও স্বীকৃতি প্রদানই হক। পক্ষান্তরে যে জিনিসের অস্তিত্ব নেই, তার অস্তিত্বে বিশ্বাস হলো বাতিল বিশ্বাস। এমনিভাবে বাতিল বিশ্বাসের কথা বললে সেই কথাও বাতিল বলে বিবেচিত হয়। হক সতত বিরাজমান এবং বাতিল অস্তিত্বহীন।
মোটকথা আকিদা-বিশ্বাস যদি বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেই আকিদাকে বলা হয় হক; আর বাস্তবতার পরিপন্থি হলে সেই আকিদা বাতিল। একইভাবে কোনো বক্তব্য কিংবা কথা যদি বিরাজমান বিষয়ের সাথে সমঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন সেই বক্তব্য বা কথা হক; বিপরীত হলে বাতিল।
মানবজীবনে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো, এমন কিছুতে বিশ্বাস করা-যা কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না কিংবা এমন আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করা, যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। এমনিভাবে বাস্তবতা-পরিপন্থি কথা সবচেয়ে বিপজ্জনক। এর থেকে বোঝা যায়, বাতিল মানুষকে ধ্বংস করে।
মনে করুন, আপনি কোনো আকিদা পোষণ করেন। দীর্ঘদিন পর সারাবিশ্বের কাছে প্রকাশিত হলো, আপনার সেই আকিদাটি ছিল বাতিল। সেই বিশ্বাস মানুষের কোনো উপকার করেনি; বরং ক্ষতিই বাড়িয়েছে।
আপনি যদি হকের সাথে থাকেন, তাহলে বড় সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন। কারণ আপনি তখন থাকবেন বিরাজমান ও সুসাব্যস্ত বিষয়ের সাথে। এটিই এই অধ্যায়ের মূলকথা।
বিরাজমান বিষয়টি হয়তো 'ওয়াজিবুল উজুদ' (অবধারিতভাবে বিরাজমান) সত্তা হবে কিংবা সম্ভাব্য-বিরাজমান হবে। আমাদের মহান রব 'ওয়াজিবুল উজুদ' (অবধারিতভাবে বিরাজমান) সত্তা। তিনি অবধারিতভাবে বিরাজমান ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। মানব-বিবেক একজন সৃষ্টিকর্তা, অভিনব সৃষ্টিকারী, রূপকার, মহাপ্রজ্ঞাবান, মহাজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান উপাস্য ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে এই গুণ মেনে নিতে পারে না।
সুতরাং সতত বিরাজমান সত্তা অবধারিতভাবে বিরাজমান। পক্ষান্তরে সম্ভাব্য বিরাজমান সত্তার উদাহরণ আমরা মানুষরা। আমাদের অস্তিত্ব সম্ভাব্য; আমাদের অস্তিত্ব থাকতেও পারে; না-ও থাকতে পারে। আমাদের অস্তিত্ব কেবল তখন বিরাজমান থাকতে পারে, যখন 'অবধারিতভাবে বিরাজমান সত্তা' ইচ্ছা করেন। এজন্য আল্লাহ তাআলা যা চান, তা-ই হয়; তিনি যা চান না, তা হয় না।
وَقَالَ الشَّيْطَانُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدتُّكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ وَمَا كَانَ لِي عَلَيْكُم مِّن سُلْطَانٍ إِلَّا أَن دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي فَلَا تَلُومُونِي وَلُومُوا أَنفُسَكُم مَّا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنتُم بِمُصْرِخِيَّ إِنِّي كَفَرْتُ بِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِن قَبْلُ إِنَّ الظَّالِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
যখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, 'আল্লাহ তোমাদের সাথে সত্য ওয়াদা করেছিলেন। আর আমিও তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছিলাম। তবে আমি আমার সে ওয়াদা ভঙ্গ করেছি। আমি তোমাদের ডাক দিয়েছিলাম আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। এছাড়া তোমাদের ওপর তো আমার কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। অতএব তোমরা আমাকে তিরস্কার কোরো না, বরং নিজেদেরই তিরস্কার করো। (এখন) আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারব না, তোমরাও আমাকে সাহায্য করতে পারবে না। আগে তোমরা যে আমাকে (আল্লাহর সাথে) শরিক করেছিলে, আমি (এখন) তা অস্বীকার করছি। অবশ্যই অন্যায়কারীদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি [১]
সুতরাং শয়তানের প্রতিশ্রুতি বাতিল (মিথ্যা)। কখনো শয়তান আপনাকে ভয় দেখাতে পারে। তার ভয় দেখানোও বাতিল। কখনো আপনাকে দারিদ্র্যের ভীতিপ্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু তার ভীতিপ্রদর্শনও বাতিল। এখানে হক-বাতিলের বিষয়টি চিন্তাভাবনার সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং পরিণতির সাথে সম্পৃক্ত।
মনে করুন, আলেপ্পোতে আপনার বড় অঙ্কের টাকা পাওনা আছে। শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে আপনি টাকাগুলো হস্তগত করতে পারবেন। টাকাগুলো পেলেই আপনার সব সমস্যার সমাধান হবে। আপনি স্টেশনে গিয়ে আলেপ্পোর ট্রেনে উঠলেন। ট্রেনে বসে আপনি হাজারটা ভুল করতে পারেন। কিন্তু ট্রেন যতক্ষণ আলেপ্পোর পথে আছে, ততক্ষণ এই নিশ্চয়তা আছে, আপনি দুপুর ১২টার আগেই আপনার গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন। সুতরাং আপনি হকের মাঝেই রয়েছেন।
অপর দিকে আপনি যদি ‘দারাআ’গামী ট্রেনে চেপে বসেন, তাহলে সেই ট্রেনটি আপনার জন্য বাতিল। কারণ এই ট্রেনে আপনি কখনো গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন না। যদিও এই ট্রেনটি আলেপ্পোগামী ট্রেনের মতোই; কিন্তু এটি আপনাকে নিয়ে যাবে আপনার গন্তব্যের বিপরীত দিকে।
হক ও বাতিলে পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে খানিকটা অপ্রস্তুত অনুভব করছি। কারণ পার্থক্যটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর।
আল্লাহ তাআলা ‘আল-হক’। কারণ তিনি সতত বিরাজমান। তিনি এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির অস্তিত্ব সবসময় সম্ভাব্য। তাঁর অস্তিত্ব থাকতেও পারে; না-ও থাকতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ‘ওয়াজিবুল উজুদ’; অবধারিতভাবে বিরাজমান। আপনি যদি তাঁর অস্তিত্বে বিশ্বাস রাখেন, তাহলে আপনার আকিদা-বিশ্বাস হক। যদি তাঁর অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেন, তবে আপনার স্বীকৃতিও হবে হক।
পক্ষান্তরে যদি বিশ্বাস করেন, কোনো সৃষ্টি আপনার উপকার কিংবা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে, তাহলে আপনার এই বিশ্বাস হবে বাতিল। যদি এমন কথা বলেন, তাহলে আপনার কথা হবে বাতিল। এজন্য বিরাজমান সত্তা হলেন হক, তাঁর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন হক, তাঁর অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেওয়াও হক।
এই আলোকোজ্জ্বল ভাবনা আমাদের আরেকটি ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। আমাদের মনে এই চিন্তার উদয় হয়, বিশ্বজগতে ‘আল-হক’ বহুজন হতে পারে না; বরং ‘আল-হক’ একজনই। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ )
সুতরাং তিনিই আল্লাহ, তোমাদের প্রকৃত রব। হকের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী থাকতে পারে? অতএব তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ? [১]
কুরআনুল কারিমে যা রয়েছে, আপনি যদি এর বিপরীত আকিদা রাখেন, তাহলে অকাট্য দলিলের আলোকে আপনি পথভ্রষ্ট। (আল্লাহ তাআলা আমাদের এর থেকে হিফাজত করুন!)
আপনি যদি বিশ্বাস করেন, মৃত্যু স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া না হওয়ার সাথে সম্পর্কিত, তাহলে এই বিশ্বাস হবে বাতিল। কারণ নির্ধারিত সময় শেষ হলেই মানুষ মৃত্যুবরণ করে। তবে আমরা অস্বীকার করি না যে, স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়াও আবশ্যক। কিন্তু স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়ার সাথে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই।
এক সম্মানিত ভাই আমার কাছে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন-
আমার জন্ম হয়েছে একটি বাড়িতে। আমার দুজন চাচা ছিলেন। আমরা এবং আমাদের দুই চাচা সেই বাড়ির তিনটি ঘরে থাকতাম। মঙ্গলবার চারটার সময় আমি জন্মগ্রহণ করি। আমাদের রুমের সাথেই যে চাচা থাকতেন, তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তার চিকিৎসার জন্য চারজন ডাক্তার উপস্থিত হয়েছিলেন। আকস্মিকভাবে সবাই একমত হলেন যে, আমার চাচি এক ঘণ্টার বেশি বাঁচবেন না। সেদিনের পর বহুদিন অতিবাহিত হয়েছে। আমি বড় হয়েছি। স্কুল-কলেজে পড়ালেখা শেষ করেছি। আমার বাবার সাথে কাজে যোগ দিয়েছি। বাবা ইন্তিকাল করেছেন। আমি বিয়ে করে সংসারী হয়েছি। সেই বাড়ি থেকে নতুন বাড়িতে উঠেছি। অন্য আরেকটি বাড়ি কিনেছি, যেখানে আমি বর্তমানে থাকছি। আমার বয়স এখন ৫৪ বছর। আমার সেই চাচি সেদিন আমাকে দেখতে এসেছিলেন। যদিও চারজন চিকিৎসক বলেছিলেন, তিনি একঘণ্টা পরই মারা যাবেন, তারপরও তিনি ৫৪ বছর ধরে বেঁচে আছেন। সুতরাং চিকিৎসকদের কথা ছিল বাতিল।
চিকিৎসকের জ্ঞান রয়েছে; জ্ঞানের আলোকে সে বলে, তবু সে মানুষটা বহুদিন বাঁচতে পারে। তারপর যখন মানুষের জীবনের সফর শেষ হয়, চিকিৎসক হতবুদ্ধ হয়, চিকিৎসা-জ্ঞান তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
সম্মানিত পাঠক, এখন আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। আপনি কি জানেন, বিজয়ী কে?
বিজয়ী সেই ব্যক্তি—যার বিশ্বাস বাস্তবতা অনুযায়ী হয়, যার কথা হয় বাস্তবতার অনুকূল। যার ওঠাবসা, চলাফেরা হয় আল্লাহ তাআলার মানহাজ [১] অনুযায়ী। একটি উদাহরণ উপস্থাপন করি।
মনে করুন, অত্যন্ত উপকারী, দামী ও জটিল মেকানিজমের একটি মেশিন রয়েছে। আপনি সেই মেশিনটি ম্যানুফ্যাকচারার কোম্পানির নির্দেশনা অনুযায়ী চালাতে সীমাহীন আগ্রহী। মেশিনটির জায়গায় যদি আমরা নিজেদের চিন্তা করি, তাহলে কেমন হবে?
আমি আশা করি, প্রত্যেক পাঠক নিজের ধর্মচিন্তা সম্পর্কে এই বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন—
আপনার চিন্তা কি বিশুদ্ধ?
আপনার আকিদা কি সহিহ?
আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে আপনার আকিদা-বিশ্বাস কি সহিহ?
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে আপনার আকিদা কি সহিহ?
সমকালীন প্রেক্ষাপটে আপনার মতামত কি সঠিক?
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে দীর্ঘ ১৪ বছর গৃহযুদ্ধ হয়েছে। [২] ১৪ বছর পর এই যুদ্ধের আগুন নিভেছে। এই গৃহযুদ্ধকে আরব-দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। আমরা বলতে পারি, সেই দেশটি আরব শক্তিগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।
একইভাবে আমরা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে সাম্প্রদায়িক কিংবা আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করতে পারি। আমরা বলতে পারি, দেশটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র-যা অন্যান্য দেশের প্রতিযোগী ছিল। আবার কুরআন, দ্বীন ও শারয়ি দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করতে পারি।
যেমন কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন-
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ )
আল্লাহ দৃষ্টান্ত পেশ করছেন এমন এক জনপদের-যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। সেখানে সব জায়গা থেকে প্রচুর জীবনোপকরণ আসত। এরপর তারা আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা শুরু করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ আস্বাদন করালেন।[১]
এই দ্বীনি ব্যাখ্যা সঠিক, নাকি অন্য ব্যাখ্যাগুলো?
এই ব্যাখ্যা বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তার ব্যাখ্যা! আপনি যদি অন্য ব্যাখ্যাগুলোর অভিমুখী হন, তাহলে আপনি বাতিল ব্যাখ্যায় পতিত হবেন।
অনেক সময় ভূমিকম্প হয়, পুরো শহর ধসে পড়ে। এর সরল ব্যাখ্যা হলো, ভূ-অভ্যন্তরে যখন একটি শীলা অন্য একটি শীলার ওপর উঠে আসে, তখন ভূমিকম্প হয়। পৃথিবী-পৃষ্ঠের অংশবিশেষের হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন বা আন্দোলনই ভূমিকম্প। এটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। কিন্তু এই ব্যাখ্যা দ্বীনি ব্যাখ্যার বিপরীত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ )
জনপদগুলোর অধিবাসীরা সৎকর্মশীল থাকা অবস্থায় আপনার রব অন্যায়ভাবে সেসব জনপদকে ধ্বংস করেন না।[২]
হকের পরিচয় লাভ না করলে, আকিদা হক না হলে, আপনার কথাবার্তা, চলাফেরা হক না হলে আপনি সফল হতে পারবেন না।
আপনি যদি নানা ধরনের বিপদে থাকেন এবং বলেন আপনার ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়, তবে এই ব্যাখ্যা বাতিল হবে। ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে আপনি বলতে পারেন, আমাকে অনেক মানুষ হিংসা করে। তাদের হিংসা আমাকে বিপদে ফেলেছে। এই ব্যাখ্যাটিও বাতিল। কারণ উদাসীন কিংবা উপযুক্ত না হলে কোনো মানুষকে অন্য কেউ বিপদে ফেলতে পারে না।
জীবনের একটি দিনে আপনি হাজারো বাতিলের মুখোমুখি হতে পারেন। তবে হককে চিনতে পারা, হককে বিশ্বাস করা এবং হকের কথা বলার মাঝেই সফলতা নিহিত রয়েছে। আপনি যদি হককে চিনতে না পারেন, তাহলে হকের ওপর থাকতে পারবেন না। যদি হককে চিনতে না পারেন, তাহলে হককে বিশ্বাস করতে পারবেন না; হকের কথা বলতে পারবেন না।
আল্লাহ তাআলাকে চিনতে পারাই দ্বীনের মূলভিত্তি। এজন্যই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শাসনকর্তা হিসেবে ইয়েমেনে পাঠিয়েছেন, তখন বলেছিলেন-
'তুমি এক আহলুল কিতাব [১] সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ। তাই প্রথমে তুমি তাদের আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেবে। যখন তারা আল্লাহকে চিনবে, তখন তাদেরকে জানিয়ে দেবে-আল্লাহ তাদের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করে দিয়েছেন।' [২]
মনে করুন, যদি কোনো ব্যক্তি তার কাজে ভুল পন্থা অবলম্বন করে, তাহলে আমরা বলব, তার এই পন্থাটি বাতিল। কেউ যদি ভিত্তি ঠিক রেখে ভবন নির্মাণ করে, তাহলে বলব, এই ভবনটি 'হক'। কারণ এই ভবনটি স্থায়িত্ব লাভ করবে। কিন্তু কেউ যদি ভবন নির্মাণের সময় মূলভিত ঠিক না রাখে, তাহলে আমরা বলব ভবনটি 'বাতিল'। কেন?
কারণ ভবনটি অচিরেই ধসে পড়বে। তাহলে এখানেও হক অর্থ ‘বিরাজমান বস্তু’। তবে এর সাথে আরেকটি অর্থ যুক্ত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَإِنَّ السَّاعَةَ لَآتِيَةٌ فَاصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ
আসমান-জমিন ও উভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু আমি সৃষ্টি করেছি যথার্থভাবে। আর কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী। অতএব আপনি (তাদের দোষত্রুটি) সুন্দরভাবে এড়িয়ে যান।[১]
أَوَلَمْ يَتَفَكَّرُوا فِي أَنفُسِهِم مَّا خَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُّسَمًّى وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ بِلقَاءِ رَبِّهِمْ لَكَافِرُونَ *
তারা কি নিজেদের ব্যাপারে ভেবে দেখে না? আল্লাহ তো আসমান- জমিন ও উভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন যথার্থভাবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। কিন্তু অনেক মানুষই তাদের রবের সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করে।[২]
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا ذَلِكَ ظَنُّ الَّذِينَ كَفَرُوا فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ كَفَرُوا مِنَ النَّارِ
আসমান-জমিন ও উভয়ের মধ্যবর্তী কোনোকিছু আমি অহেতুক সৃষ্টি করিনি। এটা তো (অহেতুক সৃষ্টি) কাফিরদের ধারণা। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ [৩]
বাতিল অস্থায়ী আর হক চিরস্থায়ী। এখন আমরা এই অর্থের সাথে আরেকটি বিষয় যুক্ত করতে পারি। বিরাজমান জিনিস হক। এর চেয়ে উচ্চ পর্যায় হলো অবধারিতভাবে বিরাজমান এবং সর্বদা বিরাজমান সত্তা। তাঁর সাথে অন্য কেউ বা কিছু বিরাজমান নেই। সুতরাং তিনি অবধারিত, সর্বকালীন, একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই গুণগুলো আল্লাহ তাআলার জন্যই সাব্যস্ত।
আল্লাহ তাআলা সতত বিরাজমান, অবধারিতভাবে বিরাজমান এবং শাশ্বতরূপে বিরাজমান। তাঁর পরে কিছু নেই। তিনি তাঁর অস্তিত্বে একক ও পরিপূর্ণ। আপনি যদি তাকে চিনতে পারেন, তাহলে সবকিছু চিনতে পারলেন। তাঁর পরিচয় না পেলে কোনো পরিচয় কাজে আসবে না।
আল্লাহর শপথ, আপনি যদি দুনিয়ার অঢেল সম্পদও অর্জন করেন, জীবনের সর্বোচ্চ শিখরেও উপনীত হন, তাঁর পরিচয় না পেলে আপনি কিছুই অর্জন করতে পারবেন না। কারণ আপনার অস্তিত্ব নিজস্ব নয়। আপনার অস্তিত্ব যদি নিজস্ব হতো, তাহলে কোনো বাধা থাকত না। কিন্তু আপনার অস্তিত্বের সম্পর্ক অবধারিতভাবে বিরাজমান অস্তিত্বের সাথে। তিনি যদি চান, এক লহমায় আপনার অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতে পারেন।
একবার দামেশকের এক মসজিদে আমাদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। আমাদের এক পরিচিত ভাই কার্ড পাঠিয়ে দাওয়াত দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান ছিল শুক্রবার দরসের পর। আমি সেই মসজিদে গেলাম। প্রবেশদ্বারের সামনে আমন্ত্রিত মেহমানদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অনেকে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি একজন একজন করে সবার সাথে হাত মেলালাম। যিনি আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন তার সাথে দেখা হলো। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এই অনুষ্ঠানে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে?' সে উত্তর দিল, 'আমার চাচা, তিনি আমার শশুরও।' আমি বললাম, 'তিনি কোথায়?' তিনি বললেন, 'মসজিদের ভেতরে।'
মসজিদের আঙিনায় প্রবেশ করতেই দেখলাম, পৌরুষদীপ্ত হাস্যোজ্জ্বল এক ব্যক্তি বসে আছেন। গায়ে চমৎকার পোশাক। আমি তাকে আগে থেকে চিনতাম না। তিনি আমাকে উয় অভ্যর্থনা জানালেন। আমার অনেক প্রশংসা করলেন। তারপর আমি অনুষ্ঠানে আমার নির্ধারিত জায়গায় প্রবেশ করলাম। সেসময় একজন অতিথি আলোচনা করছিলেন। তার আলোচনার মধ্যেই দুজন অতিথি কেঁপে উঠলেন। হঠাৎ এভাবে কেঁপে ওঠার কারণ বুঝতে পারলাম না।
তারপর আমি ২০ মিনিটে আমার আলোচনা পেশ করলাম। আলোচনা শেষে একজন আমাকে কানে কানে বলল, 'মসজিদের প্রাঙ্গনে যিনি আপনাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, তিনি একটু আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। আপনার আলোচনা শুনতে পারেন নি!'
পাঠক, অবাক হবেন না। কারণ আমরা 'ওয়াজিবুল উজুদ' (অবধারিতভাবে বিরাজমান সত্তা) নই; আমরা সম্ভাব্য বিরাজমান প্রাণীমাত্র। 'ওয়াজিবুল উজুদ' মুহূর্তেই তার অস্তিত্ব শেষ করে দিয়েছেন। তিনি আমার আলোচনা শোনার অপেক্ষায় ছিলেন। আমি মঞ্চে প্রবেশের পরপরই তিনি মারা গেছেন। আল্লাহর শপথ, আমাদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না।
অনুষ্ঠান শেষ হলো। আমরা হাসপাতালে গেলাম। জরুরি বিভাগে ঢুকে দেখি, তার নিথর দেহ পড়ে আছে। রুহ চলে গেছে মহান রবের কাছে। আমরা অবধারিতভাবে বিরাজমান নই, আমাদের অস্তিত্ব সম্ভাব্য। আমরা হক নই। হক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। আমরা হক হলে আমাদের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য হতো-
فَلَوْلَا إِنْ كُنْتُمْ غَيْرَ مَدِينِينَ تَرْجِعُونَهَا إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
আচ্ছা, যদি তোমাদের শেষ বিচার বলতে কিছু না-ই থেকে থাকে, তবে তার (মুমূর্ষু ব্যক্তির) প্রাণ ফেরত আনো দেখি, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো?[১]
বৃষ্টি এলে আমরা খুশি হই। কেমন হতো, যদি আকাশ থেকে আর বৃষ্টিবর্ষণ না হতো? আমাদের অস্তিত্বের কী হতো তখন?
আমরা দেখতে পেতাম, সমস্ত নদী-নালা শুকিয়ে গেছে। গাছপালা, তরুলতা মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। তারপর আমাদের অবস্থা কী হতো? আমাদের অস্তিত্ব কী নিজস্ব?
না, আমাদের অস্তিত্ব ওয়াজিবুল উজুদের ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত।
মানুষ মনে করে, সে বিরাজমান; অবধারিতভাবে বিরাজমান। যখন বিশ্বাস করে, সে শুধু নিজ যোগ্যতায় কাজ করে অর্থ উপার্জন করে, তখন কী নির্বুদ্ধিতার পরিচয়ই না দেয় সে। এই বিশ্বাস বাতিল। আপনি যখন আল্লাহর পরিচয় লাভ করবেন, তখন আপনার দৃষ্টিতে নিজেকে ছোট মনে হবে, আল্লাহ তাআলাকে মনে হবে সুমহান। সুতরাং মুমিন কে? সে-ই মুমিন, যে শুধু আল্লাহকেই দেখতে পায়।
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ ...
যারা আপনার হাতে বাইআত তথা আনুগত্যের শপথ করে, বাস্তবে তারা আল্লাহর কাছেই বাইআত করে। আল্লাহর হাত [১] আছে তাদের হাতের ওপরে।[২]
فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى وَلِيُبْلِيَ الْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَاءً حَسَنًا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ )
সেদিন তোমরা তাদের হত্যা করোনি, বরং আল্লাহই তাদের হত্যা করেছেন। আর আপনি যখন কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি, বরং বাস্তবে আল্লাহই তা নিক্ষেপ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে মুমিনদেরকে উত্তম প্রতিদান দেওয়ার জন্যই (তাদের হাতে এই কাজ করিয়েছেন তিনি)। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবই জানেন।[৩]
وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ فَاعْبُدُهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ وَمَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ )
আল্লাহর কাছে রয়েছে আসমান ও জমিনের অদৃশ্য জ্ঞান এবং তাঁর কাছেই সকল বিষয় ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতএব তুমি তাঁর ইবাদত করো এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখো। তোমরা যা করো, তোমাদের রব সে সম্পর্কে অনবহিত নন।[৪]
فَكِيدُونِي جَمِيعًا ثُمَّ لَا تُنْظِرُونِ إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ رَبِّي وَرَبِّكُم مَّا مِن دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ )
অতএব তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করো এবং আমাকে একটুও অবকাশ দিয়ো না। আমি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছি, যিনি আমার রব এবং তোমাদেরও রব। প্রত্যেক প্রাণীর কপালের চুলগুচ্ছ তাঁরই হাতে (অর্থাৎ সব প্রাণী তাঁরই নিয়ন্ত্রণে)। নিশ্চয় আমার রব সঠিক পথেই রয়েছেন [১]
আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, মানুষ কেন এমন বিষয় নিয়ে কথা বলে, যা নিয়ে সে তুষ্ট নয়?
কারণ সে আল্লাহ তাআলাকেই সবকিছু মনে করেনি। সে মনে করেছে, আল্লাহ মহান, অমুক ব্যক্তিও মহান। সে বিশ্বাস করেছে অফিসের বস, দলের নেতা ও অন্যান্য মানুষ তাকে উন্নতি কিংবা অবনতি দিতে পারে। তার উপকার কিংবা অপকার করতে পারে। তাওহিদ যত কমতে থাকবে, শিরকও তত বাড়তে থাকবে। আপনার আকিদা-বিশ্বাস ঠিক থাকবে না।
আকিদা-বিশ্বাসের এই বিষয়টি সম্পৃক্ত চিরস্থায়ী জীবনের সাথে। সুতরাং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-
আপনাকে জানতে হবে, আপনি কি হকের ওপর রয়েছেন?
আপনার আকিদা কি হক?
আপনার চিন্তাভাবনা কি হক?
আপনার কর্ম, অবস্থান কি হক?
আপনি কি হক অনুযায়ী দিয়েছেন, নাকি না-হক ভাবে?
আপনার রাগ-ক্রোধ কি হক ছিল?
আপনি কি হকের প্রতি সন্তুষ্ট থেকেছেন?
ক্রোধ কিংবা সন্তুষ্টিও হক অনুযায়ী হতে হবে। সম্পর্ক রক্ষা কিংবা সম্পর্কচ্ছেদও হতে হবে হকের আলোকে।
আপনি যখন জানবেন, 'আল-হক' হলেন অবধারিতভাবে বিরাজমান সত্তা, চিরস্থায়ী সত্তা, তিনি তাঁর অস্তিত্বে একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ; তিনি ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে, তখন আপনি সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। একমাত্র মহান রবের অভিমুখী হবেন।
সুতরাং জ্ঞানের মজলিসে উপস্থিত হওয়া, দু-রাকাত সালাত আদায় করা এবং দু-টাকা দান করার চেয়ে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বাসের পরিণতি চূড়ান্ত, চিরস্থায়ী। বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব হক-বাতিলের দ্বন্দ্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ
সুতরাং তিনিই আল্লাহ, তোমাদের প্রকৃত রব। হকের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী থাকতে পারে? অতএব তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ? [১]
আপনি যদি অনিশ্চিত বিশ্বাসে বিশ্বাসী হন, তাহলে কী আপনি জান্নাতের প্রতি বিশ্বাসী? আল্লাহর শপথ, আমার প্রবল ধারণা-এই বিশ্বাসও বাতিল বলে বিবেচিত হবে।
আপনি কি বিশ্বাস করেন, আল্লাহ আপনাকে সবকিছু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন না? তিনি কি আমাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেবেন না? তিনি কি আমাদের বোধ ও বিবেকের পরিমাণ অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না?
তাহলে এমন আকিদা-বিশ্বাস বাতিল। আপনি কি আল্লাহর এই কালামে বিশ্বাস করেন-
أَفَمَنْ حَقَّ عَلَيْهِ كَلِمَةُ الْعَذَابِ أَفَأَنتَ تُنقِذُ مَن فِي النَّارِ
যার ওপর শাস্তির আদেশ কার্যকর হয়ে গেছে, আপনি কি সেই জাহান্নামিকে রক্ষা করতে পারবেন? [২]
অনেক সময় অবিন্যস্ত অধ্যয়নে, স্থূল বক্তব্যে, ভুল আসরের ফাঁদে পড়ে মানুষের মনমস্তিষ্ক বাতিলের প্রতি ধাবিত হয়। তখন সে বাতিল কাজ করে। আমরা যদি জিজ্ঞেস করি, 'ভাই, তুমি মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছ কেন?' সে বলে, 'আমার কয়েকটি সন্তান আছে, আমি কী করব বলুন?' তার এই বক্তব্যও বাতিল। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলাই জীবিকা দানকারী, ক্ষমতাশালী, মহাশক্তিমান। নিশ্চয় প্রতিটি সৎকাজের প্রতিদান রয়েছে, অসৎ কাজের জন্য রয়েছে শাস্তি।
এজন্য আকিদা-বিশ্বাসকে সমস্ত ভুল-ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আকিদা-সংক্রান্ত এমনই একটি বিষয়ে নবিগণকে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন: ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা। এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বর্ণিত হয়েছে—
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَن رَّأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ ﴿২৪﴾
মূলত এই নারী তার (ইউসুফ আলাইহিস সালামের) ব্যাপারে কুচিন্তা করেছিল আর সেও তাকে নিয়ে কুচিন্তা করত, যদি না সে তার রবের নিদর্শন দেখতে পেত। এভাবে তাকে নিদর্শন দেখানো হয়েছিল, যাতে আমি তাকে অন্যায় ও অপকর্ম থেকে দূরে রাখতে পারি। সে আমার নিষ্ঠাবান বান্দাদের অন্যতম।[১]
প্রিয় পাঠক, ইউসুফ আলাইহিস সালাম একজন নবি ছিলেন। নবি কখনো ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারেন না—শুধু এমন আকিদা বাতিল। কেউ যদি—
لَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا
এই অংশ ব্যাখ্যা করে—'মূলত এই নারী তাকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল আর সে তাকে প্রতিরোধ করেছিল', তাহলে এই ব্যাখ্যাও ভুল হবে। বরং আমরা যদি সম্পূর্ণ আয়াত পাঠ করি, তাহলে সঠিক ব্যাখ্যাটি বুঝতে পারব। আয়াতের বাকি অংশ এই—'সেও তাকে নিয়ে কুচিন্তা করত, যদি না সে তার রবের নিদর্শন দেখতে পেত।' অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা করা হয়েছিল। নবিদের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে এটিই সঠিক ব্যাখ্যা। এটিই হক তাফসির।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের হৃদয়ে বিশেষ নূর দান করেন, যা মুমিনের সামনে হককে হকরূপে এবং বাতিলকে বাতিলরপে উদ্ভাসিত করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَوْ شِئْنَا لَآتَيْنَا كُلُّ نَفْسٍ هُدَاهَا وَلَكِنْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ )
যদি আমি চাইতাম, তবে প্রত্যেককেই সঠিক পথের সন্ধান দিতাম। কিন্তু আমার এ কথা অবধারিত সত্য যে, নিশ্চয়ই আমি জিন ও মানুষ উভয়কে দিয়েই জাহান্নাম পূর্ণ করব [১]
সুতরাং কুরআনকেও 'হক'ভাবে বুঝতে হবে, 'বাতিল'ভাবে নয়। একইভাবে নবিজির হাদিসও বুঝতে হবে 'হক'ভাবে।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, শপথ সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা যদি গুনাহ না করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের অপসারিত করবেন এবং এমন জাতির আবির্ভাব ঘটাবেন-যারা গুনাহ করবে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, আর তিনিও তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।[২]
হাদিসের অর্থ তো স্পষ্ট, কিন্তু এর উদ্দেশ্য কী? হাদিসের মানে কি এই যে, আমরা গুনাহে লিপ্ত হব?
না হাদিসের উদ্দেশ্য এমন নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো, আমরা যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছি যে, আমাদের গুনাহের কোন অনুভূতিই নেই, তাহলে আমরা হয়ে পড়ব মৃত মানুষের মতো। তখন আল্লাহ তাআলা আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। যেমন: কেউ হয়তো রাতভর গিবত তথা পরনিন্দা করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে। অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, গিবত ব্যভিচারের চেয়েও ভয়ংকর। [৩]
মানুষ যদি গুনাহ করে এবং তার মধ্যে গুনাহের কোনো অনুভূতিও না থাকে, তাহলে সে মৃত (তার হৃদয় মরে গেছে)। পক্ষান্তরে মুমিনের সারারাত থাকে নেক আমলে পূর্ণ। অতএব আল্লাহর ব্যাপারে আপনার বিশ্বাসকে ঠিক করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
... يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ ...
তারা আল্লাহ সম্পর্কে অন্যায়ভাবে অজ্ঞতাসুলভ ধারণা পোষণ করছিল [১]
এমন মানুষও রয়েছে, আল্লাহর ব্যাপারে যার অধিকাংশ ধারণাই ভুল, অধিকাংশ বিশ্বাস ও অনুধাবনই ভ্রান্তিপূর্ণ। যেমন: কেউ কেউ বলে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন রাস্তায় হাঁটছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি পৌঁছে গেলেন তার পালকপুত্র যাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ঘরের দরজায়। নবিজি দরজায় কড়া নাড়লেন। দরজা খুলে দেওয়া হলো। নবিজির সামনে যাইনাব রাযিয়াল্লাহু আনহাকে দেখা গেল বস্ত্রহীন অবস্থায়। তার চুল কোমর অব্দি নেমে এসেছিল। নবিজি তাকে দেখে মুগ্ধ হলেন। বললেন, সুবহানাল্লাহ!
এমন আজগুবি ঘটনা কোথা থেকে জেনেছেন? কে বর্ণনা করেছে এমন ঘটনা? এ ঘটনার সত্যতা কি যাচাই করেছেন? সর্বশ্রেষ্ঠ নবি এমন কাজ করতে পারেন? একজন মুমিন হিসেবে আপনি কি এমন কাজ করতে পারবেন? তাই এ ঘটনা সম্পূর্ণ বাতিল, বানোয়াট।
وَلَقَدْ عَلِمْنَا الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنكُمْ وَلَقَدْ عَلِمْنَا الْمُسْتَأْخِرِينَ )
যারা তোমাদের পূর্বে গত গেছে, আমি তাদের ব্যাপারে জানি এবং যারা পেছনে রয়ে গেছে, জানি তাদের সম্পর্কেও [২]
আবার কেউ ধারণা করে, জনৈকা সুন্দরী নারী সাহাবিদের মাঝে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত রূপবতী। সাহাবিদের কেউ কেউ রুকু-সিজদার সময় তার সৌন্দর্য দেখার জন্য পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আবার কেউ দাঁড়িয়েছিলেন তার সামনে। তখন উপরিউক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই উদ্ভট তাফসির সম্পূর্ণ বাতিল। সম্মানিত সাহাবিগণ এমন অপবাদের বহু ঊর্ধ্বে।
সুতরাং আপনাকে হক জানতে হবে; জানতে হবে হকের সাথে সম্পৃক্ত সবকিছু। আর এর জন্য আপনাকে আল্লাহ তাআলার সুন্দর নামগুলো ও তাঁর শ্রেষ্ঠ গুণাবলি জানতে হবে; জানতে হবে নবিদের সাথে সম্পৃক্ত সবকিছু।
আল্লাহর নবি দাউদ আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বলা হয়, তাঁর ৯২জন স্ত্রী ছিল। তারপরও তিনি তার এক সেনাপতির স্ত্রীকে পছন্দ করেছিলেন। তিনি তখন নির্দেশ দিলেন, সেই সেনাপতিকে যুদ্ধের সম্মুখভাগে এগিয়ে দিতে, যাতে সে মারা যায় এবং তিনি তার স্ত্রীকে গ্রহণ করতে পারেন। তখন আল্লাহ তাআলা দাউদ আলাইহিস সালামকে তিরস্কার করে বললেন-
﴿ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى...﴾
তুমি প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না।[১]
এই উদ্ভট তাফসিরও সঠিক নয়; বরং দাউদ আলাইহিস সালাম মানুষের সমস্যার সমাধান না করে ইবাদতে মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তখন আল্লাহ তার কাছে দুজন ফেরেশতা পাঠালেন। তারা দেওয়াল ডিঙিয়ে দাউদ আলাইহিস সালামের ইবাদতের জায়গায় ঢুকে পড়ল এবং দুজনে বিচার চাইল। তখন দাউদ আলাইহিস সালাম একজনের কথা শুনেই বললেন, 'সে তোমার প্রতি অবিচার করেছে।' তিনি মূলত তাড়াতাড়ি ইবাদতে ফিরে যেতে চাইছিলেন। এজন্য আল্লাহ তাকে যে প্রবৃত্তি থেকে নিষেধ করেছিলেন, সে প্রবৃত্তি ছিল ইবাদতের প্রবৃত্তি। তার ইচ্ছা ছিল, তাড়াতাড়ি আল্লাহমুখী হওয়ার।[২]
সুতরাং আমাদের সেই তাফসিরটিই গ্রহণ করতে হবে, যা সত্য এবং নবিদের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, মহান দ্বীনের সাথে মানানসই। আমরা সঠিক আকিদা পোষণ করব, সঠিক কথা বলব এবং সঠিকভাবে সামঞ্জস্য বিধান করব-যাতে আমরা হকের ওপর অবিচল থাকতে পারি।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেল, হক মানে বাস্তবানুগ কথা। সুতরাং আপনি এমন কোনো কথা গ্রহণ করবেন না, যা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক মিথ্যাবাদী আছে, 'যারা বলে, কোনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালো না থাকলে, স্ত্রী সাদা ও কালো রঙের দুটি মেষ জবাই করবে। তাহলে স্বামী সেই স্ত্রীকে ভালোবাসবে।' এমন কথা বাতিল, পুরোপুরি মিথ্যা।
ধরুন, কোনো বাড়িতে গুনাহের কাজ হয়। তখন তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা হলো শরীরে সরু তরবারি কিংবা শিক প্রবেশ করানোর মাধ্যমে।[১] এর দৃষ্টান্ত অনেকটা এমন— কোনো অসুস্থ ব্যক্তির পেটে ব্যথা হচ্ছে। পেটব্যথা নিয়ে তিনি গেলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার তাকে অপেক্ষা করতে বলে একটি রশি টানালেন। তারপর সেই রশির ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। অসুস্থ ব্যক্তিটি সেই অদ্ভুত কসরত দেখতে লাগল। অথচ তখন তার প্রয়োজন চিকিৎসা ও ঔষধ। ডাক্তার বাজিকরের মতো দড়ির ওপর হাঁটলে রোগীর কী উপকার হবে!
আমি এসব উদাহরণের কথা বলছি, কারণ আরোগ্য, আত্মিক প্রশান্তি, ভারসাম্য, চিরস্থায়ী সুখ আমাদের অতি প্রয়োজন। এমন চিরন্তন সত্য আমাদেরও প্রয়োজন— কালের পরিক্রমায় যা ভুল বলে প্রকাশ পাবে না। কেউ হয়তো দীর্ঘদিন পর্যন্ত কোনো আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করতে পারে। সবশেষে প্রকাশ পায়, সেই আকিদা বাতিল। সঠিক হওয়ার কোনো ভিত্তিই নেই। এসব বিবেচনায় আল্লাহ তাআলাই হক। হক শব্দটি তাঁর জন্যই সাজে।
আপনার আকিদা যদি বাস্তবানুগ হয়, তাহলে সেই আকিদা হক।
আপনার কথা যদি বাস্তবানুগ হয়, তাহলে সেই কথাও হক।
আপনার জ্ঞান, কল্পনা, বিশ্বাস, অবস্থান, দান করা ও বিরত থাকা, সম্পর্ক রক্ষা করা কিংবা ছেদ করা, ক্রোধ কিংবা আনন্দ সবই হতে হবে হক অনুযায়ী।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রসিকতা করতেন। কিন্তু তার রসিকতাও হতো হক; সত্য। সুতরাং আপনিও রসিকতা করতে পারেন। তবে সেই রসিকতা হতে হবে সত্য। আপনার রসিকতা যেন কারও অনুভূতিতে আঘাত না করে, কোনো ব্যক্তি কিংবা পেশাকে অপদস্থ না করে।
আশা করি, ‘হক’ শব্দটি স্পষ্ট হয়েছে। এই শব্দটি কুরআনুল কারিমে শতবারেরও অধিক বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলাই হক; চিরন্তন সত্য। আল্লাহর মাধ্যম ছাড়া কোনো কিছুর কোনো অস্তিত্ব নেই। যখন আল্লাহ চান কোনো কিছু বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখনই তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তিনি সেই জিনিসটিকে আদেশ করেন, ‘হও, তখনই তা হয়ে যায়।’ তিনি আদেশ করেন, ‘বিলুপ্ত হও, তখনই তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।’
সুতরাং আল্লাহ তাআলা ছাড়া যা কিছু রয়েছে, সবই সম্ভাব্য বিরাজমান। যদি সেগুলো অস্তিত্ব লাভ করে, আল্লাহর মাধ্যমেই করে। যদি বহাল থাকে, তবে আল্লাহর মাধ্যমেই থাকে। আবার যখন শেষ হয়ে যায়, আল্লাহর মাধ্যমেই শেষ হয়ে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআয় বলতেন—
اللَّهُمَّ أَنَا بِكَ وَإِلَيْكَ
আল্ল-হুম্মা আনা- বিকা ওয়া ইলাইক।
অর্থ : হে আল্লাহ আপনার মাধ্যমে (বেঁচে আছি) আর ফিরে যাব আপনারই কাছে।[১]
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ ...
আপনি বলুন, ‘হে আল্লাহ, হে বিশ্বজগতের অধিপতি!’
তিনি বিশ্বজগতের মালিক। পৃথিবীর সবকিছুর মালিক তিনি। আপনার চোখের মালিকও তিনি। আপনি ততক্ষণই চোখ দিয়ে দেখতে পারবেন, যতক্ষণ তিনি দেখার অনুমতি দেবেন। তিনি চাইলে যেকোনো মুহূর্তে আপনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলতে পারেন। এমনকি বাহ্যিক কোনো কারণ ছাড়াই আপনি অন্ধ হয়ে যেতে পারেন।
আপনার চোখ, কান; সবকিছুর মালিক তিনি। এক ভাই আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়েছেন। এক মানসিক হাসপাতালে একটি ভয়ংকর বিভাগ রয়েছে, যার ক্রমিক নং ছয়। সেই বিভাগের রোগীরা গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে, মলমূত্র, রক্ত, চুল; সবকিছু খেয়ে ফেলে। কোনো কিছু অক্ষত থাকে না তাদের কাছে। তাদের শরীরে প্রচন্ড শক্তি; কিন্তু শরীর পরিচালনাকারী মস্তিষ্ক অচল।
আপনার হয়তো একটি কর্মক্ষেত্র রয়েছে, রয়েছে সুস্থ বিবেক। সেই বিবেকের মাধ্যমে আপনি কোনো পেশায় নিয়োজিত আছেন। নিখুঁতভাবে সেই পেশায় কাজ করে যাচ্ছেন। সবই কিন্তু হচ্ছে আল্লাহর দয়ায়। তিনি যদি আপনাকে দেওয়া সবকিছু ফিরিয়ে নেন, তাহলে আপনি শেষ। তখন আপনার কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।
মনে করুন, আপনি একটি বাড়ি নির্মাণ করলেন। সুন্দরভাবে সাজালেন। তারপর হঠাৎ একদিন আপনার মানসিক সমস্যা দেখা দিল। আপনার পরিবার সহ্য করতে না পেরে আপনাকে রেখে এল মানসিক হাসপাতালে। অথচ আপনিই ছিলেন বাড়ির মালিক। আপনার কষ্টার্জিত টাকায় বাড়ি কিনেছিলেন। তিলতিল করে গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এখন আপনি কোনো কিছুর মালিক নন। মানুষ যখন তার বিবেক হারিয়ে ফেলে, তখন তার শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলে।
আপনার দুটি কিডনি রয়েছে। কিডনি দুটি ঠিকমতো কাজ করছে। এখন পর্যন্ত কিডনির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বাহ্যিক কোনো কারণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু হঠাৎ দুটি কিডনিরই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেল। দুর্বিষহ হয়ে উঠল আপনার জীবন। প্রতি সপ্তাহে দুদিন ডাক্তার দেখাতে হয়। প্রতিবার ডাক্তার দেখাতে সময় লাগে সাত ঘণ্টা। কখনো হাতে, কখনো পায়ে কঠিন স্নায়বিক বৈকল্য দেখা দেয়।
তখন আপনার আশা-আকাঙ্ক্ষা কোথায় হারিয়ে যায়? আপনি কি আপনার কিডনির মালিক? আপনার হৃৎপিণ্ডের ভাল্বের মালিক কি আপনি?
না, আপনার সবকিছুর মালিক আল্লাহ তাআলা।
আমার এক যুবক বয়সী আত্মীয়ের রক্তস্বল্পতা দেখা দিয়েছিল। তার পরিবার ছিল বিত্তশালী। খাওয়া-দাওয়াও ছিল উন্নত। ছেলেটি নিজেও মেডিকেল সাইন্সের ছাত্র। কিন্তু চিকিৎসকরা তার অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ে। অবশেষে জানা যায়, প্লীহায় কোনো গোলমাল রয়েছে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা গেল, প্লীহায় কোনো কমতি নেই। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় তার প্লীহা অতিরিক্ত সক্রিয়। প্রাণীর দেহে প্লীহা বেশকিছু কাজ করে। যেমন, স্বল্পমেয়াদী রক্ত সঞ্চয় করে, রক্তে বিদ্যমান ভারী ধাতু, ব্যাকটেরিয়া, বর্জ্য পদার্থ এবং ক্ষত ও পোড়া জায়গায় টিস্যু ভাঙার সময় গঠিত পদার্থ থেকে রক্তকে বিশুদ্ধ করে, শরীরের রোগ-প্রতিরোধ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমার আত্মীয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি অতিরিক্ত সক্রিয় ছিল। ফলে কিছুদিন পর সে মৃত্যুবরণ করে।
আমাদের সবার জীবন আল্লাহর হাতে। তিনি আমাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ পরিমিতভাবে পরিচালনা করেন। তাই আমাদের প্লীহা ঠিকমতো কাজ করে, ইনসুলিন ঠিক থাকে, হার্টের ভাল্ব ঠিক থাকে, রক্তনালিতে ব্লক দেখা দেয় না, কিডনি বিকল হয়ে পড়ে না।
আপনি জানেন কি, মস্তিষ্কে একবিন্দু পরিমাণ রক্ত জমলেই প্যারালাইসিস হতে পারে? অথবা ছোট্ট একটা ধমনি চর্বি দিয়ে আটকে গেলে স্ট্রোক করে আপনার হাসপাতালে পৌঁছতে হবে?
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاءُ وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴿২৬﴾
বলুন, 'হে আল্লাহ, সার্বভৌম রাজত্বের অধিকারী। আপনি যাকে চান, তাকে ক্ষমতা দান করেন; আর যার থেকে চান, রাজত্ব কেড়ে নেন। যাকে চান সম্মানিত করেন, আবার যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। আপনার হাতেই সমস্ত কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সবকিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।[২]
কখনো হয়তো আল্লাহ তাআলা আপনাকে দুনিয়া দান করেন। কিন্তু দুনিয়ার সাথে সংকীর্ণতাও দেন। তখন অর্থ-সম্পদের কোনো মূল্য থাকে না। আল্লাহ যদি আপনাকে সম্পদ দেন এবং আপনার থেকে প্রশান্তি ছিনিয়ে নেন, তাহলে আপনার জীবন হবে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতাময়। যদি অর্থ-সম্পদ দিয়ে আপনার থেকে সুস্থতা, নিশ্চিন্ততা ও স্থিরতা ছিনিয়ে নেন, তাহলে আপনার জীবনের কোনো মূল্যই থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُمْ بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا ۚ فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالْأَمْنِ ۖ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ ۗ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُولَٰئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ ﴿٨٢﴾
তোমরা যেসব বস্তুকে (আল্লাহর) অংশীদার সাব্যস্ত করেছ, আমি কীভাবেই-বা তাদের ভয় করি, যখন তোমরা ওইসব জিনিসকে আল্লাহর শরিক বানাতে ভয় করছ না, যাদের ব্যাপারে তিনি তোমাদের প্রতি কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি? সুতরাং তোমাদের কাছে যদি কিছু জ্ঞান থাকে, তবে (বলো), দুই দলের মধ্যে কোন দল নির্ভয়ে থাকার বেশি উপযুক্ত? যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে জুলুমের (শিরকের) সাথে মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই সুপথগামী। [১]
প্রিয় ভাই, আপনার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হক (সত্য) ও হাকিকত (বাস্তবতা) চিনতে পারা। প্রমাণের ভিত্তিতে বাস্তবানুগ প্রতিটি কথাই হক। প্রমাণ ছাড়া মেনে নেওয়া মানে অন্যের অনুসরণ করা।
সুতরাং যদি কেউ বলে 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই'—তাহলে এই কথাটি প্রকৃতপক্ষে হক। কিন্তু এই কথাটির যদি কোনো প্রমাণ না জানা থাকে, তাহলে তা হবে প্রমাণবিহীন কথা। অতএব হক বলা হবে সেই কথাকেই, যা দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে বাস্তবানুগ হবে।
এখন হকের প্রতি আপনার বিশ্বাস যদি অকাট্য না হয়, তাহলে সেই বিশ্বাসের কোনো মূল্যই থাকবে না।
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুত্তাকিদের জন্য এটি পথনির্দেশিকা। [২]
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ )
মুমিন তো তারা, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, এরপর তাতে কোনো সন্দেহ পোষণ করে না এবং নিজেদের অর্থ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। তারাই প্রকৃত সত্যবাদী [১]
আপনার বিশ্বাসে যদি কোনো সন্দেহ কিংবা সংশয় অথবা অনিশ্চয়তা থাকে, অথবা কোনো কিছুর প্রতি আপনার বিশ্বাস ১০০তে ৩০ পার্সেন্ট থাকে, তাহলে একে বলা হয় 'সংশয়'।
যদি ১০০তে ৫০ পার্সেন্ট থাকে, তাহলে তাকে বলা হয় 'সন্দেহ'।
আর ১০০তে ৯০ পার্সেন্ট হলে তাকে বলা হয় 'প্রবল ধারণা'।
যদি আপনার বিশ্বাস থাকে ১০০তে ১০০, তাহলে সেই বিশ্বাসকে বলা হবে ঈমান।
জান্নাত, জাহান্নাম, বিচার-দিবসের প্রতি আপনার ঈমান অকাট্য। সুদি লেনদেনকারীর সম্পদ অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে, ব্যভিচারী অচিরেই দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হবে; যে ব্যক্তি হারাম থেকে দৃষ্টিকে রক্ষা করে না, তার পরিবারে অশান্তি দেখা দেবে; যার হারাম সম্পদ রয়েছে, আল্লাহ অচিরেই সেই সম্পদ ধ্বংস করে দেবেন, আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে; ইত্যাকার বিষয়গুলোতে যদি আপনি ১০০তে ১০০ ভাগ অকাট্য বিশ্বাস পোষণ করেন, তাহলে আপনি হকের ওপর আছেন। হক সংশয়, সন্দেহ, ধারণা কিংবা প্রবল ধারণার সাথে মিলিত হতে পারে না।
হক কখনো সংশয়, সন্দেহ, ধারণা কিংবা প্রবল ধারণার সম্ভাবনা রাখে না। হকের সাথে সম্পর্ক শুধু অকাট্যতার।
প্রতিটি অকাট্য বক্তব্যই বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাস্তবতার পরিপন্থি যেকোনো কথাই বাতিল। এই মূলনীতি হাজারো ভ্রান্ত আকিদা, বানোয়াট কাহিনি ও অবাস্তব বিষয়কে দ্বীন থেকে দূরীভূত করে দেয়।
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খিলাফতকালে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেনাপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শতাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। তাকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে কিছু লোক আপনাকে বলবে, উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার মাঝে জাহেলি যুগে দ্বন্দ্ব ছিল। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু খলিফা হয়ে তাকে অব্যাহতি দিয়ে সেই দ্বন্দ্বের শোধ নেন!
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিরা এমন ছিলেন? আল্লাহর শপথ, তারা যদি এমনই হতেন, তাহলে তারা মক্কা থেকেই বের হতে পারতেন না; দিগ্বিজয় করতে পারতেন না। এই বিষয়ে আপনি অনেক ব্যাখ্যা দেখতে পাবেন। তবে সঠিক ব্যাখ্যাটি আমি জানতে পেরেছি।
অব্যাহতি দেওয়ার পর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে বললেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, 'আমাকে অব্যাহতি দিলেন কেন?' উমার বললেন, 'আবু সালমান (খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের উপনাম), আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'আমাকে কেন অব্যাহতি দিলেন?' উমার বললেন, 'ইবনুল ওয়ালিদ, আল্লাহর শপথ, আমি শুধু এই আশঙ্কায় তোমাকে অব্যাহতি দিয়েছি যে, মানুষ তোমার ব্যাপারে ফিতনায় পতিত হবে। মানুষ ধারণা করতে শুরু করেছে, তুমিই তাদেরকে বিজয়ী করো। আমি তাদের আকিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে আশঙ্কা করছি। তাই তাদেরকে দেখিয়ে দিতে চাইছি, যদি আমি তোমাকে অব্যাহতি দিই, তবু বিজয় আমাদেরই হবে; যতক্ষণ আমরা মুমিন থাকব।' [১]
এই ব্যাখ্যা উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ব্যাখ্যাটিই হক।
কখনো আপনি এমন ব্যাখ্যা ও ঘটনা পড়তে পারেন, যেগুলো সহিহ নয়, বোধগম্য হয় না। সেসব ঘটনায় সম্মানিত সাহাবিদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম, হক কখনো সংশয়, সন্দেহ, ধারণা কিংবা প্রবল ধারণার সম্ভাবনা রাখে না। হকের সাথে সম্পর্ক শুধু অকাট্যতার।
কেউ কেউ বলেন, 'এই কথাটি অনেকাংশে বাস্তব।' প্রকৃতপক্ষে এমন কথাও হক নয়। ১০০তে ৮০ ভাগ কিংবা ৫০ ভাগ বাস্তব বিষয় হক হতে পারে না। বরং হক চিরকাল ১০০তে ১০০ ভাগই সত্য হয়।
পূর্বে আমরা বলেছি, কোনো বিষয় অকাট্য ও বাস্তবানুগ হলে তার জন্য দলিল-প্রমাণ আবশ্যক। দলিলকে উপেক্ষা করা হলে, তা হয় 'তাকলিদ' বা অনুসরণ। যদি কেউ আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে আকিদা পোষণের ক্ষেত্রে কারও অন্ধ অনুসরণ করে, তাহলে কি তার আকিদা গ্রহণযোগ্য হবে?
মনে করুন, কেউ আপনাকে বলল, 'আল্লাহ তাআলা রহিম (চিরদয়াময়) নন। কারণ তিনি আমাদের নানা ধরনের বিপদাপদ ও রোগব্যাধি দেন।' তখন আপনি তাকে বললেন, 'আপনি ঠিক বলেছেন। আমি এখন থেকে আপনার অনুসরণ করছি।' কিয়ামতের দিন যদি আল্লাহ আপনাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কেন এই বিশ্বাস পোষণ করেছ যে, আমি রহিম নই?' আপনি হয়তো বলবেন, 'হে রব, আমি অমুকের অনুসরণ করেছি। সে আমাকে এমন কথা বলেছিল; আমি তাকে সত্যায়ন করেছি।' তখন যদি আল্লাহ বলেন, 'তোমার বিবেক কোথায় ছিল? হিদায়াত পাওয়ার জন্য তোমার বিবেককে কাজে লাগালে না কেন?' তখন আপনি কী উত্তর দিবেন?
এজন্য আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে অন্ধ অনুসরণ গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এভাবে বিশ্বাস তৈরি হতে পারে না। এক্ষেত্রে দলিল-প্রমাণই মূল। জ্ঞানতাত্ত্বিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে। যদি আপনাকে কোনো ঘটনা শোনানো হয়, তাহলে জিজ্ঞেস করুন, 'কোত্থেকে বর্ণনা করছেন?' শুধু সহিহ বর্ণনাই গ্রহণ করবেন। যদি কোনো কিছু দাবি করেন, তাহলে দলিল পেশ করবেন। প্রবল ধারণার ভিত্তিতে কোনো বিষয় সাব্যস্ত হবে না।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَا فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে—যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। পরে কিন্তু নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদের অনুতপ্ত হতে হবে।[১]
হকের জন্য দলিল প্রয়োজন, প্রয়োজন বাস্তবানুগ ও অকাট্য হওয়া। যদি আপনার আকিদা, চিন্তাভাবনাকে বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও অকাট্য করতে পারেন, তাহলে আপনি সফল।
আল্লাহ তাআলা হক, তাঁর কথা হক, জান্নাত হক, জাহান্নام হক, আমলের হিসাব হক, আজাব হক, পুলসিরাত হক, হাউজে কাউসার হক। এই হকের অর্থ এসবই সুসাব্যস্ত ও বিরাজমান।
দৃষ্টি অবনত রাখাও হক। এই হকের অর্থ হলো, যদি আপনি তা বাস্তবায়ন করেন; দৃষ্টিকে অবনত রাখেন, তাহলে আপনি এর সুফল ভোগ করবেন।
আমানত হক। আপনি যদি আমানতদার (বিশ্বস্ত) হন, তবে মানুষ আপনার ওপর আস্থা রাখবে। আমানত একটি সম্পদ।
মোটকথা আপনি যা-ই বাস্তবায়ন করবেন, তারই সুফল লাভ করবেন। কারণ সময় অত্যন্ত মূল্যবান, আর জীবনের অপর নাম বাস্তবায়ন। আপনি যদি মসজিদ কমিটির বিশিষ্ট সদস্য হন, কিন্তু দায়িত্ব পালন না করেন, তবে কিছুই অর্জন করতে পারবেন না। আপনার সমস্ত চলাফেরা হবে উদ্দেশ্যহীন। সুতরাং বাস্তবায়নই মূল বিষয়।
আপনি যদি বলেন, 'আখিরাতে জান্নাত চিরস্থায়ী, পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী'; তবে দেখতে হবে, আপনার বিশ্বাসের সাথে আমলের মিল আছে কিনা। কখনো এমন হতে পারে, আকিদা হক, কিন্তু তার প্রয়োগ বাতিল।
কোনো ডাক্তার যদি ধুমপান করতে করতে আপনাকে বলে, 'ধুমপান করবেন না; ধুমপানের কারণে ফুসফুসে ক্যান্সার, ধমনিতে সংকীর্ণতা ও চাপ সৃষ্টি হয়'; তাহলে কি আপনি তার কথা গ্রহণ করবেন? তার এই বক্তব্য বাতিল। যদি সে নিজের কথায় বিশ্বাস করত, তাহলে নিজে ধুমপান করত না।
সুতারাং হক শব্দের অর্থ ব্যাপক। আল্লাহ তাআলা হক; এর অর্থ হলো, তিনি অবশ্যই হককে প্রকাশিত করবেন। আপনি যদি হকের ওপর থাকেন, তাহলে বিলম্বে হলেও আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি থাকেন বাতিলের ওপর, তাহলে অবশ্যই তিনি আপনাকে অপদস্থ করবেন। তাই সবসময় হকের সাথে থাকুন।
তবে এক্ষেত্রে একটি অসুবিধা রয়েছে, যা হয়তো আপনার কাছেও স্পষ্ট। তা হলো, আল্লাহ তাআলা মানুষকে ছাড় দেন। আপনি অনেক ক্ষেত্রেই যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারবেন। আপনাকে ইচ্ছাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভুল করতেই যদি আল্লাহ আপনাকে শাস্তি দিতেন, তাহলে আপনি আল্লাহর ভালোবাসা কিংবা আনুগত্য স্বীকার করে নয়; বরং শাস্তির ভয়ে সঠিক পথে আসতেন। তখন আপনি স্বাধীন থাকতেন না। আপনি হতেন পরিচালিত। স্বাধীন কিংবা ইচ্ছাধিকার পাওয়ার অর্থ হলো, আপনি হারাম সম্পদ ভক্ষণ করতে পারবেন, ১০ বছর উপভোগ করতে পারবেন।
তারপর আপনার ওপর শাস্তি নেমে আসবে। আপনি হয়তো কোনো হারাম সম্পর্কে জড়ালেন। সাময়িকভাবে আপনি হয়তো কোনো বিপদে পড়বেন না। আমার পরিচিত এক ব্যক্তি এক নারীর সাথে হারাম সম্পর্কে লিপ্ত ছিল। তার বড়সড় ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। রয়েছে বেশ কিছু অফিস, আমদানি বাণিজ্য, সামাজিক অবস্থান, বাড়ি-গাড়ি, ইউরোপ-আমেরিকা সফর। কিন্তু মুমিন হিসেবে আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, তার এই বিশাল সাম্রাজ্য কিছুদিন পরই তছনছ হয়ে যাবে। যদিও তার ধারণা, সে কোনো মন্দ কাজ করছে না।
মনে করুন, কোনো আরোহী ব্রেকহীন গাড়িতে আরোহণ করে মুক্ত বাতাসে সমতল রাস্তায় চলছে। তাকে যদি বলা হয়, 'রাস্তার শেষে রয়েছে একটি মোড়। তোমার গাড়ির তো ব্রেক নেই; দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী।' সে যদি বিশ্বাস করে, তার গাড়িতে ব্রেক নেই, তাহলে হয়তো দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ
কখনো নয়, তোমরা যদি নিশ্চিতভাবে জানতে! তোমরা অবশ্যই জাহান্নাম দেখবে; তোমরা তা দেখবে চাক্ষুষভাবে [১]
আপনি যখন দেওয়ালের ওপাশে ধোঁয়া উঠতে দেখেন, তখন শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলেন, 'আগুন ছাড়া ধোঁয়া হতে পারে না।' দেওয়ালের পেছনে গিয়ে আগুনের শিখা দেখতে পেলেন। প্রথমটি হলো জ্ঞান। আর যখন সচক্ষে আগুন দেখলেন, তখন তা হলো চাক্ষুষ জ্ঞান। তারপর যখন 'আপনার হাতে আগুনের তাপ লাগল, তখন তা হলো নিশ্চিত জ্ঞান।
অতএব আমাদের হক জানতে হবে। হক আকিদা পোষণ করতে হবে, হক বলতে হবে, হকের ওপর অবিচল থাকার জন্য সঠিক পথে চলতে হবে। তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তাআলা আমাদের সম্মানিত করবেন।
আল্লাহ যখন হক প্রতিষ্ঠা করবেন, তখন তাঁর অনুগত বান্দাদের ক্ষমা করবেন। তিনি ছাড়া ক্ষমা করার কেউ নেই। আমার সাথে এই আয়াতটি ভেবে দেখুন-
وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ﴾
আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্যকে ডেকো না। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। একমাত্র তাঁর সত্তা ছাড়া সবকিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই এবং তাঁরই কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে তোমাদের [১]
সারকথা হলো, বিশ্বজগতে পরম সত্য কেবল একটিই আছে। আর তা হলো 'আল্লাহ'। যা কিছু আপনাকে তাঁর নিকটবর্তী করবে, তা-ই হক। আর যা আপনাকে তাঁর থেকে দূরে ঠেলে দেবে, তা-ই বাতিল। তাই আল্লাহকে চিনতে হবে, তাঁর পথ চিনতে হবে। তাঁর পথে চলতে হবে। এটিই হক। এছাড়া সবই বাতিল।
আপনারা হয়তো নিজের চোখে দেখে থাকবেন, বাতিল হয়তো দীর্ঘসময় টিকে থাকে। কিন্তু তারপর মাকড়সার জালের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাতিলের চিন্তা বাতিল, তার সূচনাও বাতিল, বাতিলের প্রয়োগও বাতিল। যদি পিলার ছাড়া দেওয়াল তৈরি করা হয়, তাহলে সবাই বলবে, এই দেওয়াল যতক্ষণই টিকে থাকুক; খুব তাড়াতাড়ি ধসে পড়বে। ধ্বংস ও বিলুপ্তি বাতিলের অবধারিত বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا ۞
বলুন, হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। আর বাতিল তো বিলুপ্ত হবারই ছিল [১]
আল্লাহ যদি আপনার সাথে থাকেন, তবে আপনার বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারবে না, আর যদি তিনি আপনার বিরুদ্ধে থাকেন, তাহলে আপনার পাশে আর কে থাকবে?
হে রব, যে আপনাকে পেয়েছে, তার হারানোর কিছু নেই, আর যে আপনাকে হারিয়েছে, তার পাওয়ার কিছু নেই।
টিকাঃ
[১] সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ২২
[১] সুরা ইউনুস, আয়াত: ৩২
[১] রূপরেখা, পথ ও পন্থা।
[২] পরবর্তী বিবরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, লেখক এখানে ইরাকের কথা বলেছেন।
[১] সুরা নাহল, আয়াত: ১১২
[২] সুরা হুদ, আয়াত : ১১৭
[১] আহলুল কিতাব বলা হয় ইহুদি-খ্রিষ্টানসহ পূর্ববর্তী সকল সত্য কিতাবধারী উম্মাহকে。
[২] সহিহুল বুখারি: ১৪৫৮; সহিহ মুসলিম: ১৯; মুসতাখরাজ আবি আওয়ানা ৩৪০১; সহিহ্বল জামি : ২২৯২
[১] সুরা হিজর, আয়াত: ৮৫
[২] সুরা রুম, আয়াত: ৮১
[৩] সুরা সাদ, আয়াত: ২৭
[১] সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৮৬-৮৭
[১] এটা কেবলই শাব্দিক অনুবাদ। বাস্তবে এই হাতের অস্তিত্ব বা আকৃতি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। এটাই সমস্ত হকপন্থি আলিমের মত。
[২] সুরা ফাতহ, আয়াত: ১০
[৩] সুরা আনফাল, আয়াত : ১৭
[৪] সুরা হুদ, আয়াত: ১২৩
[১] সুরা হুদ, আয়াত: ৫৫-৫৬
[১] সুরা ইউনুস, আয়াত : ৩২
[২] সুরা যুমার, আয়াত : ১৯
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ২৪
[১] সুরা সাজদা, আয়াত: ১৩
[২] সহিহ মুসলিম: ২৭৪৯; মুসনাদু আহমাদ: ৮০৮২; রিয়াযুস সালিহিন ৪২২; মিশকাতুল মাসাবিহ : ২৩২৮
[৩] আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ৬৫৯০; শুআবুল ঈমান ৬৩১৪; মিশকাতুল মাসাবিহ: ৪৮৭৪; হাদিসটির সনদ দুর্বল।
[১] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৫৪
[২] সুরা হিজর, আয়াত: ২৪
[১] সুরা সাদ, আয়াত: ২৬
[২] দেখুন, সুরা সাদ: ২১-২৬ তাফসিরসহ
[১] অর্থাৎ এমন শাস্তির মাধ্যমে, যার ফলে তারা দ্বীনমুখী হওয়ার পরিবর্তে উলটো দ্বীনবিমুখ হবে।
[১] মূল দুআটি আরও বড়। এখানে কেবল তার ছোট অংশ উঠে এসেছে। পুরো দুআটি দেখুন-সহিহ মুসলিম: ৭৭1; জামিউত তিরমিযি: ৩৪২২; সুনানু আবি দাউদ: ৭৬০; সহিহ ইবনি খ্যাইমা: ৪৬২
[১] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ২৬
[১] সুরা আনআম, আয়াত: ৮১-৮২
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ২
[১] সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৫
[১] তারিখুত তবারি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৬৮; তারিখু দিমাশক, খণ্ড: ১৬, পৃষ্ঠা: ২৬৮; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪৭
[১] সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬
[১] সুরা তাকাসুর, আয়াত: ৫-৭
[১] সুরা কাসাস, আয়াত: ৮৮
[১] সূরা ইসরা, আয়াত: ৮১
📄 আল-আদল : الْعَدْلُ
আমাদের শরীরে প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান যথাযথ। চোখ, কান, নাক, ঠোঁট; মুখাবয়বের প্রতিটি অঙ্গ নিখুঁতভাবে প্রতিস্থাপিত। হাতপায়ের অবস্থানও যথাযথ। মহান রব আমাদের অত্যন্ত নিখুঁত ও সুষমভাবে সৃষ্টি করেছেন।
বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ির মাঝামাঝি যা থাকে, তা-ই হয় ন্যায়সংগত, মধ্যপন্থা। সাধারণত বৈদ্যুতিক সুইচ স্থাপন করা হয় উপযুক্ত স্থানে। বাবা-মা, সন্তান; বাড়ির সবাই তা সহজেই ব্যবহার করতে পারে। যদি উঁচুতে স্থাপন করা হতো, তাহলে মই প্রয়োজন হতো। আবার নিচু জায়গান স্থাপন করা হলে, লাইট জ্বালানোর জন্য উবু হতে হতো। তাই উঁচু ও নিচুর মাঝামাঝি যে স্থানটিতে সুইচ লাগানো হয়, সেই স্থানটিই হলো মধ্যবর্তী।
আরবি ‘আদল’ (عَدْلٌ) শব্দ থেকে নির্গত একটি শব্দ হলো ‘ইতিদাল’ (اِعْتِدَالٌ)। ‘ইতিদাল’ অর্থ-মধ্যপন্থা অবলম্বন করা, ভারসাম্য রক্ষা করা। বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির মধ্যবর্তী পন্থাকেই বলে ‘ইতিদাল’।
মানুষ যদি পানির গ্লাসে থাকা সকল ব্যাকটেরিয়া দেখতে পেত, তাহলে পানি পান করতে পারত না। আমরা যদি খালি চোখে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিস দেখতে পেতাম, তাহলে আমাদের জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে যেত। আবার দৃষ্টিশক্তি যদি এত বেশি দুর্বল হতো যে, বিপজ্জনক জিনিসও দেখা যায় না; তাহলেও জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ত।
প্রথম অবস্থাটি হলো বাড়াবাড়ি, আর দ্বিতীয় অবস্থাটি হলো ছাড়াছাড়ি। আর মানুষকে যে দৃষ্টিশক্তি দেওয়া হয়েছে, তা হলো মধ্যম অবস্থা। আল্লাহ তাআলা মানুষকে ন্যায়সংগতভাবেই সৃষ্টি করেছেন।
আমাদের শ্রবণশক্তির কথাও বলতে পারি। এমন অনেক শব্দ আছে, যা আমরা শুনতে পাই না। যদি শুনতে পেতাম, তাহলে রাতে আমরা ঘুমাতে পারতাম না। শব্দতরঙ্গ ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভের মতো তা অপরিবর্তিত থাকে না।
নাসা বৃহস্পতি গ্রহে অভিযান চালিয়েছে। যে স্পেসক্রাফটটি প্রেরণ করা হয়েছিল, সেটি ছয় বছর ঘণ্টায় ২৪ হাজার মাইল গতিতে উড়ে বৃহস্পতিতে পৌঁছেছে। তারপর সেখান থেকে রেডিওর মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ হ্রাস পায় না; বরং তার ব্যাপ্তি শুরুর মতোই থাকে। এজন্য এই তরঙ্গের মাধ্যমে রেডিও, ফ্যাক্স ও টেলেক্স সম্প্রচার করা হয়। সাধারণ শব্দতরঙ্গ দূরত্বের কারণে হ্রাস পায়। শব্দতরঙ্গ যদি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গের মতো হতো, তাহলে যেকোনো শহরে বসে সারা পৃথিবীর আওয়াজ শুনতে পেতেন। সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, লোহা-লক্করের আওয়াজ, কল-কারখানার শব্দ; সব শুনতে পেতেন। তখন জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ত।
সুতরাং শ্রবণেন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা ও শব্দতরঙ্গের হ্রাসপ্রাপ্ত হওয়া সৃষ্টির সুষম বণ্টন; মধ্যপন্থা অবলম্বন। অসহনীয় শব্দ ও শুনতে-না-পারার মতো অতি ক্ষীণ আওয়াজের মধ্যবর্তী একটি অবস্থা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ .
নিশ্চয় আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি পরিমিতভাবে।
আমাদের দৃষ্টিশক্তি পরিমিত, শ্রবণশক্তিও পরিমিত। অনেক সময় মানুষের হাত আহত হয়। কখনো ফ্রিজের দরজা ধরলে বিদ্যুৎ অনুভূত হয়। মানুষের সেন্সরি নার্ভ (সংবেদশীল স্নায়ু) যদি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় ঘুমন্ত থাকে, তবে মানবজীবন দুষ্কর হয়ে পড়বে। দেহের প্রতিটি স্নায়ুর ক্ষেত্রেই বিষয়টি এমন।
কনুইয়ের অস্থিসন্ধি এমন ভারসাম্যপূর্ণ জায়গায় স্থাপিত, যাতে সহজে আহার গ্রহণ করা যায়। কনুইয়ের অস্থিসন্ধি না থাকলে বিড়ালের মতো উবু হয়ে খেতে হতো। কনুয়েই স্থানে অন্য কোনো ভারসাম্যপূর্ণ বিকল্প হতে পারে না।
يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ فِي أَي صُورَةٍ مَّا شَاءَ رَكَّبَكَ
হে মানুষ, কোন জিনিস তোমাকে ধোঁকায় ফেলেছে তোমার মহান রবের ব্যাপারে-যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, সুগঠিত করেছেন এবং সুষম করেছেন? যে আকৃতিতে চেয়েছেন, তাতেই তিনি তোমাকে গঠিত করেছেন। [১]
মানবদেহের প্রতিটি জিনিস-ইন্দ্রিয়, স্নায়ু, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, হৃৎপিণ্ড, ধমনি; সবকিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন অত্যন্ত নিখুঁত ও সুষমভাবে।
কাপড়ের বুননেও ইতিদাল বা ভারসাম্য রয়েছে। ভারসাম্য না থাকলে একটি কাপড় একবার পরলেই নষ্ট হয়ে যেত। একজন মানুষ একটুকরো কাপড় নিয়ে কাটল, মাপ দিল। একমাস পর জামা তৈরি হলো। তারপর শুধু একবার জামাটি পরতে পারল- এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। আপনি দেখবেন, কাপড়ের সুতা শক্ত, সুবিন্যস্ত, সুষম; একবছর, দুবছর পর্যন্ত পরতে পারবেন। উপভোগ করবেন। তারপর হয়তো পুরোনো হবে। সুতরাং সুতার স্থিতিস্থাপকতাও ভারসাম্যপূর্ণ, সুষম।
মুরগি প্রতিদিন ডিম দেয়। যদি মাসে একটি ডিম দিত, তবে ডিমের দাম অনেক বেশি হতো। গাভির খাদ্যের দাম যদি দুধের চেয়ে বেশি হতো, তাহলে কেউ গাভি পুষত না। গাভির খাদ্যের দাম দুধের দামের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ।
আপনি হাজার বছর এই পথে হাঁটতে পারেন। শুধু আল্লাহর বাণী- 'নিশ্চয় আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি পরিমিতভাবে'-এর সত্যতাই অনুভব করবেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো সীমলঙ্ঘন নেই; নেই কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি। বরং তিনি প্রতিটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন ভারসাম্যপূর্ণরূপে, সুষমভাবে।
সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের কথা ভাবতে পারি। এই দূরত্বও ভারসাম্যপূর্ণ। সূর্য যদি পৃথিবীর বেশি কাছে থাকত, তাহলে পৃথিবী উনুনে পরিণত হতো। আবার যদি বেশি দূরে থাকত, তাহলে পৃথিবী পরিণত হতো হিমায়িত কবরস্থানে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ بِحُسْبَانٍ *
সূর্য ও চন্দ্র আবর্তন করে নির্ধারিত কক্ষপথে [১]
শিশু মাতৃগর্ভে নয় মাস অবস্থান করে। যদি পাঁচ বছর অবস্থান করত, তাহলে মায়ের জন্য তা অসহনীয় হয়ে যেত। আবার যদি এক সপ্তাহ থাকত, তাহলে সন্তান হতো মৃত। সন্তানের মৃত্যুও সহ্য করার মতো নয়।
নারীর ডিম্বাশয় যদি পুরুষের মতো দীর্ঘকাল ডিম্বাণু উৎপাদন করত, তাহলে ৮৫ বছর বয়সেও নারী গর্ভবতী হতো এবং প্রসব-যাতনা ভোগ করত। যে বয়সে তার দাঁত পড়ে যেত, সে বয়সেও আপনি তার থেকে সন্তানের আশা করতেন। তাই ডিম্বাণু উৎপাদনের সময়কালেও ভারসাম্য রয়েছে। সাধারণত নারীরা ৪৫ কিংবা ৫০ বছর বয়সে উপনীত হলে গর্ভধারণ করতে পারে না। এই ব্যবস্থা আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীদের প্রতি রহমত। এটিও তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন; সুষম বণ্টন।
এছাড়া আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, রাত-দিন; সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টিতে এমন উদাহরণ অসংখ্য। দিন যদি হতো ৫০ ঘণ্টা, অথচ আপনি কাজ করতে পারেন আট ঘণ্টা, তবে কেমন হতো? দোকান খুলতেন, আবার বন্ধ করে বাড়িতে যেতেন, দিনের বেলায়ই ঘুমাতেন। ওদিকে অন্য কেউ হয়তো কাজ করত। তারপর আবার দোকানে ফিরতেন। জীবন হয়ে যেত দুর্বিষহ। আবার যদি রাত-দিন উভয়টিই ৫০ ঘণ্টা হতো, তবে ঘুমাতেন, ঘুম থেকে জেগে কাজে যেতেন, তারপর আবার ঘুমাতেন, ঘুম থেকে উঠে পুনরায় কাজ করতেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ اللَّيْلَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بضيَاءٍ أَفَلَا تَسْمَعُونَ قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَّهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فِيهِ أَفَلَا تُبْصِرُونَ وَمِنْ رَحْمَتِهِ جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ )
আপনি বলুন, আল্লাহ যদি রাতকে তোমাদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত অবিরাম করেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য আছে, যে তোমাদের আলো এনে দিতে পারবে? তবুও কি তোমরা শুনবে না? বলুন, আল্লাহ যদি দিনকে তোমাদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত দীর্ঘ করে দেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া কি কোনো উপাস্য আছে, যে তোমাদের এমন রাত এনে দিতে পারবে-যে রাত তোমরা যাপন করবে? তোমরা কি তবুও ভেবে দেখবে না? তিনি তাঁর অনুগ্রহে তোমাদের জন্য রাত ও দিন বানিয়েছেন, যাতে তোমরা বিশ্রাম নিতে পারো এবং আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধান করতে পারো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।[১]
তাই আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে—রাত ও দিনের দৈর্ঘ্য, পৃথিবী থেকে চাঁদ ও সূর্যের দূরত্ব, পৃথিবী ও চাঁদের আকার অত্যন্ত পরিমিত, সুষম। পৃথিবীর আকার যদি বর্তমান আকারের চেয়ে পাঁচগুণ বড় হতো, তাহলে আপনার ওজনও পাঁচগুণ বেড়ে যেত; চলাফেরা কষ্টকর হয়ে যেত। কারণ মানুষের ওজন পৃথিবীর ওজনের সাথে সম্পৃক্ত। এর প্রমাণ হলো, চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষের ওজন পৃথিবীর ওজনের এক ষষ্ঠাংশ।
সুতরাং পৃথিবীর আকার, পুরুত্ব, আকর্ষণ, সূর্য ও চন্দ্র থেকে পৃথিবীর দূরত্ব, পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি; সবকিছুই পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ।
গম যদি তরমুজের মতো ক্রমান্বয়ে পরিপক্ক হতো, তাহলে আমাদের একটি একটি করে শীষ দেখতে হতো-কাটার উপযুক্ত হয়েছে কিনা। এখন গম বোনার তিন মাস পর পাকে; একদিনেই কেটে ফেলা যায়। কিন্তু ফল পাকে ধীরে ধীরে।
আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ, ভারসাম্য রক্ষাকারী। তিনি সূক্ষ্মদর্শী, ভারসাম্যপূর্ণ, প্রজ্ঞাবান। তাই সুচিন্তিত একটি মাত্রায় সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।
কল্পনা করুন, তরমুজের খোসা যদি হতো টমেটোর খোসার মতো তাহলে হয়তো জীবনে একটি তরমুজও খেতে পারতেন না। কারণ তরমুজ স্থানান্তর করা দুষ্কর হয়ে পড়ত। আবার টমেটোর খোসা যদি হতো তরমুজের মতো, তাহলে পুরো টমেটোই খোসা হয়ে যেত। প্রতিটি ফলের খোসা, আকার, আকৃতি, স্বাদ, মিষ্টতা; সবই ভারসাম্যপূর্ণ।
'আল-আদল' এর প্রথম অর্থ-আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষাকারী, ন্যায়পরায়ণ। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন চূড়ান্ত প্রজ্ঞার আলোকে। কুরআনুল কারিমের একটি আয়াতে এ মর্ম ফুটে উঠেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ وَيَوْمَ يَقُولُ كُن فَيَكُونُ ...
তিনি সেই সত্তা, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং যেদিন তিনি (কিয়ামতকে) বলবেন, 'হয়ে যাও', তখনই তা হয়ে যাবে।[১]
অর্থাৎ তিনি আসমান ও জমিনের প্রত্যেকটি জিনিসকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেন, যাতে কোনো কম-বেশি নেই। আমরা আমাদের খাদ্য ও আমাদের সৃষ্টির ব্যাপারে ভেবে দেখি-
فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ إِلَى طَعَامِهِ أَنَّا صَبَبْنَا الْمَاءَ صَبًّا ثُمَّ شَقَقْنَا الْأَرْضَ شَقًّا فَأَنْبَتْنَا فِيهَا حَبًّا وَعِنَبًا وَقَضْبًا * وَزَيْتُونَا وَنَخْلًا وَحَدَائِقَ غُلْبًا وَفَاكِهَةً وَأَبًّا مَّتَاعًا لَّكُمْ وَلِأَنْعَامِكُمْ
মানুষ যেন তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করে, আমি প্রবল ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করি, তারপর জমিনকে যথাযথভাবে বিদীর্ণ করি। তারপর তাতে ফলাই শস্য, আঙুর, শাক-সবজি, যাইতুন ও খেজুর, নিবিড়-ঘন বাগান, ফল ও ঘাস, তোমাদের ও তোমাদের গবাদি পশুর ভোগের জন্য।
فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ * إِنَّهُ عَلَى رَجْعِهِ لَقَادِرٌ
অতএব মানুষ যেন লক্ষ করে, কোন জিনিস থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি (বীর্য) থেকে। যা বেরিয়ে আসে মেরুদণ্ড ও পাঁজরের মাঝ থেকে। নিশ্চয় তিনি তাকে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম। [১]
أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ * وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ * وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ * وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ *
তারা কি তবে তাকিয়ে দেখে না উটগুলোর দিকে, কীভাবে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে? আকাশের দিকে, কীভাবে তা উঁচু করা হয়েছে? পাহাড়গুলোর দিকে, কীভাবে সেগুলো স্থাপন করা হয়েছে? পৃথিবীর দিকে, কীভাবে তাকে বিস্তৃত করা হয়েছে?[২]
আল্লাহ তাআলা তাঁর আদেশের ক্ষেত্রেও ন্যায়পরায়ণ। তিনি আমাদের বছরে ৩০ দিন সিয়াম পালনের আদেশ দিয়েছেন। তিনি যদি ছয় মাস সিয়াম পালনের আদেশ দিতেন, তবে তা মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যেত। এর প্রমাণ হলো, রামাদানের শেষ পাঁচদিন মানুষের মনে হয়, প্রতিটি দিন যেন একমাস। তাই ৩০ দিনই ভারসাম্যপূর্ণ সময়সীমা।
তিনি আমাদের দৈনিক পাঁচবার সালাত আদায়ের আদেশ দিয়েছেন। যদি তিনি ৫০ বার সালাত আদায় করতে বলতেন এবং প্রতিবার ৫০ রাকাত আদায় করতে বলতেন, তাহলে আমাদের পক্ষে তা অসম্ভব হয়ে পড়ত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ...
আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না। [৩]
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে জীবনে একবার হজের আদেশ দিয়েছেন। যাকাতে ৪০ ভাগের একভাগ ব্যয় করার আদেশ দিয়েছেন। অথচ আমরা দেখতে পাই, ক্ষেত্রবিশেষ ট্যাক্স শতকরা ৮০ টাকা থেকে ৯৩ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়-যা অধিকাংশ মানুষের কাছে বেশি। অন্য দিকে যাকাত দিতে হয় ৪০ ভাগের একভাগ; শতকরা আড়াই টাকা, হাজারে ২৫ টাকা, লাখে আড়াই হাজার টাকা। এই অঙ্ক সহজসাধ্য। সুতরাং যাকাত, সিয়াম, হজ; আল্লাহর সকল আদেশই ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায়সংগত।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে দৃষ্টি অবনত রাখার আদেশ দিয়েছেন। কেউ যদি রাস্তায় চলতে চলতে মোড়ের সামনে আসে এবং মোড় পার হতেই কোনো নারীর ওপর দৃষ্টি পড়ে, তাহলে এতে কোনো গুনাহ হবে না। কারণ সে তখন অসতর্ক ছিল। তাই প্রথমবার দৃষ্টিতে পড়লে কোন অসুবিধা নেই; দ্বিতীয়বার তাকালে গুনাহ হবে।
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ ...
আপনি মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে।[১]
যদি তিনি অবনত রাখার আদেশ না দিয়ে দৃষ্টিপাত না করার আদেশ দিতেন, তবে আমরা সবাই গুনাহগার হতাম।
সিয়ামরত অবস্থায় যদি আপনি সফর করতে চান, তাহলে আল্লাহ আপনাকে সিয়াম পালন না করার সুযোগ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
أَيَّامًا مَعْدُودَاتٍ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ...
এই সিয়াম নির্দিষ্ট কয়েকদিনের জন্য, তবে তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ থাকে কিংবা সফরে থাকে, (এবং এই কারণে সিয়াম পালন করতে না পারে) তাহলে সে অন্য দিনগুলোতে সিয়াম পালন করে নেবে।[২]
এরকমভাবে আপনি যদি মুসাফির হন, তবে আল্লাহ আপনাকে সালাত কসর করার আদেশ দিয়েছেন; অর্থাৎ চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ সালাত দুই রাকাত আদায় করতে বলেছেন। হানাফি আলিমদের মতে সফররত অবস্থায় সালাত কসর করা ওয়াজিব।
বাসস্টেশন, এয়ারপোর্ট কিংবা রেলস্টেশনে আপনি উদ্বিগ্ন থাকতে পারেন। তাই তিনি আদেশ দিয়েছেন, যুহরের সালাত দুই রাকাত আদায় করো। অতএব শরিয়ত ভারসাম্যপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে যেমন ভারসাম্য রক্ষা করেন, ন্যায়সংগত আচরণ করেন; ঠিক তেমনই আদেশ-নির্দেশের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রাখেন, ন্যায়বিচার করেন।
আল্লাহ তাআলার 'আল-আদল' (الْعَدْلُ) নামের ক্ষেত্রে বান্দা হিসেবে আমাদের করণীয় কী?
আল্লাহ তাআলার সুন্দর নামগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের দুটি বড় উদ্দেশ্য থাকা উচিত-
প্রথম উদ্দেশ্য আমরা যেন আল্লাহকে চিনতে পারি। পুরো জীবনে আল্লাহকে চিনতে পারার চেয়ে উত্তম লক্ষ্য আর কী হতে পারে! যে মহান সত্তার দয়ায় আমি চিরকাল থাকব, তাকে কি চিনব না?
দুনিয়ার রীতি হলো, বিয়ে করার পূর্বে সবাই তার জীবনসঙ্গীর ব্যাপারে জানতে চেষ্টা করে। সেই দাম্পত্য হয়তো থাকে মাত্র ৫০ কি ৬০ বছর। অথচ আল্লাহ তাআলার সাথে আমাদের থাকতে হবে চিরকাল। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ কি আছে এমন-যে পরিচয় পাওয়ার উপযুক্ত? আল্লাহকে চিনতে পারার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় কি আছে?
আল্লাহ তাআলার সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। তিনি সেই নামে আমাদের ডাকতে বলেছেন। এখন আমরা যদি বলি, ইয়া লাতিফ! ইয়া রহিম! ইয়া কাদির!; তবে কি আমাদের এই নামগুলোর অর্থ জানা উচিত নয়?
এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছে, যারা অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে যায়। তারপর যখন ডাক্তার তাকে বলে, আপনার সুস্থ হওয়ার কোনো আশা নেই, তখন সে ভেঙে পড়ে। কারণ সে জানে না যে, রোগ যত কঠিন হোক, ডাক্তার যত সুনিশ্চিত কথা বলুক, আল্লাহ আরোগ্য দান করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা যেমন রোগ সৃষ্টি করেছেন, আরোগ্যও সৃষ্টি করেছেন। তিনি দুর্বলতা থেকে শক্তি সৃষ্টি করেন, সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করেন, হতাশা থেকে আশার আলো দেখান।
মানুষ যখন আল্লাহ তাআলাকে ‘ইয়া কাদির!’ (হে সর্বশক্তিমান!) নামে ডাকার পরও হতাশ হয়, তখন বুঝতে হবে, সে ‘আল-কাদির’ (الْقَادِرُ) এর অর্থই জানে না। মোটকথা আপনি যখন ‘আল-কাদির’ এর অর্থ জানবেন, তখন হতাশা আপনার থেকে দূরে পালাবে।
আমি বলি, যখন আপনি নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করবেন—আল্লাহ তাআলা আপনাকে সবচেয়ে কঠিন ব্যাধি থেকে কোনো মাধ্যম ছাড়াই আরোগ্য দান করতে পারেন, তখন আপনার সেই বিশ্বাসই হবে নির্ভেজাল ঈমান। আল্লাহ যখন আছেন, তখন মানুষ কি চিন্তিত হতে পারে, ভয় পেতে পারে? বরং মানুষ থাকবে নিশ্চিন্ত। আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন, সুদৃঢ় করবেন, আরোগ্য দান করবেন। কুরআনে বর্ণিত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বক্তব্য শুনুন—
قَالَ أَفَرَأَيْتُم مَّا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ ۞ أَنتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ ۞ فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِّي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ ۞ الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ ۞ وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ ۞ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ ۞ وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ ۞ وَالَّذِي أَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ ۞ رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ ۞ وَاجْعَل لِّي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ ۞ وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ
ইবরাহিম বলল, তোমরা কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছ, তোমরা কীসের পূজা করছ? তোমরা ও তোমাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদারা? এরা সব আমার শত্রু, সৃষ্টিজগতের রব (এক আল্লাহ) ছাড়া। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনিই আমাকে পথ প্রদর্শন করেছেন। তিনিই আমাকে খাওয়ান ও পান করান। আর আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। তিনি আমাকে মৃত্যু দেবেন, তারপর আবার জীবিত করবেন। বিচার দিবসে তিনিই আমার অপরাধগুলো ক্ষমা করবেন বলে আমি আশা রাখি। হে আমার রব, আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন আর সৎকর্মশীলদের দলভুক্ত করুন। পরবর্তীদের মধ্যে আমার সুখ্যাতি অব্যাহত রাখুন। আমাকে সেসব লোকের দলভুক্ত করুন, যারা হবে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতের অধিকারী [১]
তিনি সৃষ্টি করেন, সুপথ প্রদর্শন করেন, রিজিক দান করেন, আরোগ্য দান করেন, জীবন দান করেন তিনি, মৃত্যুও দেন তিনি। ক্ষমাও করেন তিনি। তিনিই রাব্বুল আলামিন; বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এমন কোনো ব্যক্তি কখনো পুরোপুরি হতাশ হতে পারে না, চিন্তিতও হতে পারে না। কেননা আল্লাহ সবসময় তার সাথেই রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَقَالَ اللَّهُ إِنِّي مَعَكُمْ لَئِنْ أَقَمْتُمُ الصَّلَاةَ وَآتَيْتُمُ الزَّكَاةَ وَآمَنتُم بِرُسُلِي وَعَزَّرْتُمُوهُمْ وَأَقْرَضْتُمُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا لَأُكَفِّرَنَّ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَلَأُدْخِلَنَّكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ فَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ )
আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সাথে আছি। যদি তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত প্রদান করো, আমার রাসুলদের বিশ্বাস করো ও তাদের সাহায্য করো এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর; তবে অবশ্যই আমি তোমাদের পাপগুলো মোচন করে দেব এবং তোমাদের সেই জান্নাতে প্রবেশ করাব-যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদীনালা। কিন্তু এরপরও তোমাদের মধ্য থেকে যে লোক কুফরি করবে, সে অবশ্যই বিচ্যুত হবে সরল পথ থেকে।[২]
সমাজে যার কিছুটা অবস্থান কিংবা ক্ষমতা আছে, সে মানুষকে বলে, 'আমি তোমার সাথে আছি, ভয় পেয়ো না। কিছু লাগলে কল দিয়ো।' অভয় পাওয়া সেই ব্যক্তি যখন অন্যায়ভাবে কারও সাথে লড়াই জুড়ে দেয়, তখন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির অভয়ের কথা ভেবে নিশ্চিন্ত থাকে।
দুনিয়ার সামান্য ক্ষমতাশালী ব্যক্তির অভয় পেয়ে যদি মানুষের এমন অবস্থা হয়, তবে মুমিন ব্যক্তির অবস্থা কেমন হওয়া উচিত, যাকে আল্লাহ অভয় দিয়ে বলেছেন, 'আমি তোমাদের সাথে আছি। যদি তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো, আমার রাসুলকে বিশ্বাস করো ও তাদের সাহায্য করো এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করো; তবে অবশ্যই আমি তোমাদের পাপগুলো মোচন করে দেব এবং তোমাদের সেই জান্নাতে স্থান দেব-যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়।'[১]
তাই বলছি, কেন আল্লাহ তাআলার নামগুলো জানবেন? কারণ সেই নামে তাঁকে ডাকবেন, তাঁর কাছে চাইবেন। তখন আপনি জানতে পারবেন আল্লাহ রহিম; পরম করুণাময়। আল্লাহর কোনো ফয়সালা সাময়িকভাবে কঠোর মনে হলেও তার মধ্যে রহমত ও দয়া নিহিত রয়েছে। আল্লাহ ‘আল-কাদির’ (সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী)। আপনি যখন জানবেন, আল্লাহ তাআলা আপনার রোগ নিরাময় করতে সক্ষম, তখনই আপনি মুমিন। আপনার হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
পশ্চিমা বিশ্বে কেন আত্মহত্যার হার এত বেশি? কারণ তারা আল্লাহকে চিনে না। বিপরীতে তুলনামূলক অনুন্নত দেশগুলোতে জীবনযাত্রার মান নিম্ন ও কঠিন হওয়ার পরও আত্মহত্যার হার অনেক কম। কারণ আর কিছু নয়; আল্লাহর প্রতি ঈমান।
ইউনিভার্সিটিতে আমাদের একজন সাইকোলোজির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ইউরোপের একটি মানসিক ব্যাধি শীর্ষক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমাদের তিনি বলেছেন, সম্মেলনে আমি বলেছি, ‘আমাদের দেশে মানসিক রোগের হার অনেক কম। কারণ আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি, তাঁর সিদ্ধান্ত ও ভাগ্যের উপর সন্তুষ্ট থাকি।’
প্রকৃতপক্ষে মুমিন বলে, ‘আল্লাহ এমনটি চান’, ‘এটাই আল্লাহর ইচ্ছা’, ‘আল্লাহ যা চান, তাই হয়; তিনি না চাইলে হয় না’। সহিহুল বুখারি ও সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
আল্লাহ তাআলা যা নিয়ে নেবেন, তা তাঁর। আর যা আপনাকে দেবেন, তা তাঁর পক্ষ হতে আপনার জন্য অনুগ্রহ। আপনি যদি এই বিশ্বাস করেন, তাহলে কিছুতেই কোনো সমস্যা হবে না।
কোনো পরিবারে ছোট শিশু মারা গেলে দুঃসহ বেদনা সৃষ্টি হয়। আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার আবু তালহা রায়িয়াল্লাহু আনহুর এক ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ল। বর্ণনাকারী বলেন, (সেই রোগেই) তার মৃত্যু হলো। আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বাড়ির বাইরে (সফরে) ছিলেন। তখন তার স্ত্রী উম্মু সুলাইম তার পরিবারের লোকদের বললেন, 'যতক্ষণ আমি না বলি, ততক্ষণ তোমরা আবু তালহাকে তার ছেলের মৃত্যু সংবাদ দিয়ো না।' আবু তালহা বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'তার ছেলের অবস্থা কেমন?' উম্মু সুলাইম বললেন, 'তার আত্মা শান্ত হয়েছে এবং আশা করি সে এখন আরাম পাচ্ছে।' আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু ভাবলেন, তার স্ত্রী সত্য বলেছেন। উম্মু সুলাইম রাতের খাবার নিয়ে এলেন, তিনি খাবার খেলেন। তারপর উম্মু সুলাইম আগের চেয়ে উত্তমরূপে সাজগোজ করলেন। আবু তালহা তার সাথে মিলিত হলেন। উম্মু সুলাইম যখন দেখলেন, আবু তালহা পরিতৃপ্ত, তখন তাকে বললেন, 'আবু তালহা, কেউ যদি কোনো জিনিস রাখতে দেয়, তারপর তা নিয়ে নেয়, তবে কি সে ফেরাতে পারে?' আবু তালহা বললেন, 'না।' উম্মু সুলাইম বললেন, 'তাহলে আপনার ছেলের ব্যাপারে মনে করুন (আল্লাহ তাকে নিয়ে নিয়েছেন)।' আবু তালহা রেগে গিয়ে বললেন, 'তুমি আমাকে আগে বলোনি, এখন আমি অপবিত্র, এখন সংবাদটা দিলে।' তিনি রাত যাপন করলেন এবং গোসল করলেন। তারপর তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে (ফজরের) সালাত আদায় করলেন এবং নবিজিকে রাতের ঘটনা জানালেন। তখন নবিজি বললেন, 'আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা তোমাদের এ রাতের মধ্যে বারাকাহ দেবেন।' বর্ণিত আছে, পরে আবু তালহা দম্পতির নয়জন সন্তান হয়েছিল। তারা সবাই কুরআনের হাফিয ছিল।[১]
একটি মুমিন পরিবারে ও ঈমানহীন পরিবারে সন্তানের মৃত্যুবরণের মাঝে এটিই পার্থক্য। এমনকি দেখা যায়, অনেক মা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন পর্যন্ত হয়ে যায়।
অতএব আমরা আল্লাহ তাআলার নামগুলো জানব-এর মাধ্যমে সৌভাগ্য অর্জন করার জন্য। আপনি আল্লাহর সাথে থাকবেন অনন্তকাল। দুনিয়াতে যদি তাকে চিনতে পারেন, তবে তা হবে প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।
দ্বিতীয় উদ্দেশ্য
এই নামগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? মুমিন হিসেবে এ নামগুলো থেকে আপনি কীভাবে উপকৃত হবেন? কারণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও।'
বান্দা হিসেবে 'আল-আদল' নামের ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হলো, বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি উভয়টি পরিহার করে চলা। যেমন: জৈবিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে পাপাচার অর্থাৎ বাড়াবাড়ি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আবার একেবারে নিষ্ক্রিয়তা অর্থাৎ ছাড়াছাড়িও ত্যাগ করতে হবে।
সমাজে আমরা এমন কিছু মানুষ দেখি, যাদের বলা হয় 'প্লেবয়'। তারা প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে ডুবে থাকে, হিংস্র হয়ে ওঠে, মানুষের সম্ভ্রম নষ্ট করে। আবার এমন মানুষও আছে, যে দুনিয়ার কোনো জিনিসের প্রতিই আগ্রহ দেখায় না; এমনকি পারিবারিক বিষয়গুলোও এড়িয়ে চলে।
এক নারী আমিরুল মুমিনিন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলেছিলেন, 'আমার স্বামী বেশি বেশি সালাত আদায় করেন আর সিয়াম পালন করেন।' উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু ভাবলেন, স্ত্রী হয়তো তার স্বামীর প্রশংসা করছে। তিনি বললেন, 'আল্লাহ আপনার স্বামীকে বারাকাহ দান করুন।' তখন কেউ একজন বললেন, 'আমিরুল মুমিনিন, তিনি তার স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করছেন; প্রশংসা নয়।' উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন ওই লোককে ডেকে এনে উপদেশ দিলেন। বললেন, 'তোমার ওপর তোমার পরিবারেরও হক রয়েছে।'[১]
উসমান ইবনু মাজউন রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে এমন একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একদিন উসমান ইবনু মাজউন রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী বিষণ্ণ ও মলিন মুখে আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে গেলেন। আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা তার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমার স্বামী এত বেশি সালাত আদায় আর সিয়াম পালন করেন যে, আমার জন্য তার কোনো সময়ই নেই। তিনি দিনে সিয়াম পালন আর রাতে সালাত আদায় করে কাটিয়ে দেয়। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান ইবনু মাজউন রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে নবিজি বললেন, 'হে উসমান, তুমি কি আমার সুন্নাহ এড়িয়ে চলছ?' তিনি বললেন, 'না, আল্লাহর শপথ হে আল্লাহর রাসুল! বরং আমি তো আপনার সুন্নাহরই অনুসারী।' তিনি বললেন, 'আমি (রাতে) ঘুমাই এবং সালাত আদায় করি, সিয়াম পালন করি এবং ইফতারও করি, নারীদের বিবাহও করি। হে উসমান, আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তোমার প্রতি তোমার পরিবারের হক রয়েছে। পরের দিন উসমান ইবনু মাজউনের স্ত্রী প্রফুল্ল ও হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে এলেন। তিনি তার অবস্থা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিলেন, 'সবাই যা পায়, আমিও তাই পেয়েছি।' [১]
তাই আমরা যখন 'আল-আদল' নামটি জানব, তখন আমরা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে বেঁচে থাকতে পারব। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ *
যারা নিজ লজ্জাস্থানকে সংযত রাখে, তবে তাদের স্ত্রী ও তাদের মালিকানাধীন দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে দোষ নেই। কিন্তু এর বাইরে অন্যদের কামনা করলে তারা হবে সীমালঙ্ঘনকারী [২]
দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই অবস্থান ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সংগত।
সন্তানের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। সন্তানের হাতে এত বেশি অর্থ তুলে দেবেন না-যার কারণে সে নষ্ট হয়ে যায়। আবার তাকে এতটা বঞ্চিতও করবেন না-যার কারণে তারা আপনার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। বরং তাকে যথেষ্ট পরিমাণ খরচ দিন, তার প্রয়োজন পূরণ করুন। যদি তাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দেন, তাহলে আপনি বাড়াবাড়ির করলেন, যদি প্রয়োজনের চেয়ে কম দেন, তবে ছাড়াছাড়িতে জড়িয়ে পড়লেন।
একবার হিন্দা বিনতু উতবা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ ব্যক্তি।
তিনি আমার এবং আমার সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় করেন না। তবে আমি তাকে না জানিয়ে তার সম্পদ থেকে প্রয়োজনীয় খরচ গ্রহণ করে থাকি। এতে কি আমার কোনো পাপ হবে?’ তখন নবিজি বললেন, ‘তোমার ও তোমার সন্তানের জন্য যতটুকু যথেষ্ট হয়, তা ন্যায়সংগতভাবে নিতে পার।’ [১] ‘ন্যায়সংগতভাবে’ এর মানে হলো, শরিয়তের দৃষ্টিতে যা বেশিও নয়, কমও নয়।
যুদ্ধের ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। হিংস্র পশুর মতো হওয়া যাবে না, আবার ভয় পেয়ে বসে থাকাও যাবে না। বরং মধ্যবর্তী পন্থা; অর্থাৎ সাহসিকতা অবলম্বন করতে হবে। একইভাবে বুদ্ধির ক্ষেত্রে ধূর্ততা, ধোঁকা ও চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকতে হবে; বেঁচে থাকতে হবে বোকামি ও নির্বুদ্ধিতা থেকে। বরং অনুসরণ করতে হবে এই প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী-
| আমি ধোঁকাবাজ নই; ধোঁকাবাজও আমাকে ধোঁকা দিতে পারে না।
অর্থাৎ এত সরল নই যে, ধোঁকায় পড়ব; আবার এত মন্দও নই যে, ধোঁকা দেব।
এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا ...
এভাবেই আমি তোমাদের বানিয়েছি মধ্যপন্থি উম্মত। [২]
আমরা সবসময় বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করার চেষ্টা করব। দেখুন, সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আপনি চাইলেই কঠোর হতে পারেন। কঠোরতার জন্য তো খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। তাকে দুটো থাপ্পড় লাগিয়ে দিলেই হলো। কিন্তু এর ফলে কী হবে, তার মনটাই ভেঙে যাবে। সে ঠিকই আপনার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে থাকবে।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা শিক্ষা দাও, কিন্তু নির্দয় হয়ো না। [১]
আবার সন্তানকে এত বেশি ছাড় দেওয়া যাবে না, যাতে সে সীমলঙ্ঘন করে ফেলে। বরং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হলো, সন্তান আপনার প্রতি আগ্রহী থাকবে, আবার আপনাকে ভয়ও পাবে। এই অবস্থানে থাকা সুকঠিন। প্রান্তিক অবস্থান গ্রহণ করা সবসময় সহজ। নিংড়ে ফেলার মতো নরম হওয়া যেমন সহজ, তেমন ভেঙে ফেলার মতো শক্ত হওয়াও সহজ।
আপনার মাঝে এবং মানুষের মাঝে এমন অবস্থান থাকতে হবে-যেন তারা কঠিন হলে আপনি ছাড় দিতে পারেন; তারা ছাড় দিলে আপনি কঠিন হতে পারেন। আপনার চারপাশে যারা থাকে, তারা যেন একইসাথে আপনার সঙ্গ কামনা করে এবং ভয়ও পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شهيدًا ...
এভাবেই আমি তোমাদের বানিয়েছি মধ্যপন্থি উম্মত-যাতে তোমরা অন্যদের ব্যাপারে সাক্ষী হও আর রাসুল হয়ে যান তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষী।[২]
পূর্বে আমরা আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্দেশের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার আলোচনা করেছি। এখন আমরা কর্মের ক্ষেত্রে আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতা ও ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে আলোচনা করব। আপনাকে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতে হবে, বিশ্বজগতে পুরোপুরি ভারসাম্য বজায় রয়েছে।
মনে করুন, কোনো ব্যক্তি সঠিকভাবে ব্যবসা করছে। তার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানও ঠিক আছে। মূল্যও নির্ধারিত ও স্বাভাবিক। তার কাছে কাগজপত্রও আছে। তারপরও কোনো কর্মকর্তা এসে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে তাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দিল।
এটা কি সুস্পষ্ট জুলুম নয়?
শুধু এই ঘটনাটি বাহ্যিকভাবে জুলমই। কিন্তু এই ঘটনার সাথে যদি এই মানুষটির পারিবারিক জীবনকে যুক্ত করি, তার পরিবারের সাথে, প্রতিবেশীর সাথে, তার ঊর্ধ্বতন ও অধঃস্তন ব্যক্তিদের সাথে তার আচরণকে যুক্ত করি, তাহলে এই ঘটনার মাঝে আমরা চূড়ান্ত ন্যায়পরায়ণতা দেখতে পাব। অথবা হতে পারে, ব্যবসায়ী দৃষ্টিকোণ থেকে এমন হিসাব পাওয়া যাবে, যাতে কোনো জুলুম নেই। তবে জুলুম রয়েছে দলিলপত্রে।
১০ বছর আগে একটি ঘটনা ঘটেছিল। বাজারে দুজন লোকের মাঝে ঝগড়া লেগেছিল। একজনের কাছে অস্ত্র ছিল। ঝগড়ার একপর্যায়ে সে গুলি করে বসল। কিন্তু যাকে গুলি করেছিল, তার গায়ে লাগেনি। একব্যক্তি ঝগড়ার আওয়াজ শুনে দোকান থেকে উঁকি দিয়ে দেখছিল। গুলি লক্ষভ্রষ্ট হয়ে তার মেরুদণ্ডে এসে লেগেছিল। চিরদিনের জন্য সে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল।
একব্যক্তি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'উস্তায, আপনি তো আমাদের আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার কথা বলেছিলেন। কিন্তু একি করলেন তিনি? তিনি ছিলেন একজন সৎ ব্যবসায়ী। রিজিকের সন্ধানে পরিবারের ভরণপোষণ যোগানোর জন্য দোকান খুলে বসেছিলেন। কাপড়ের ব্যবসা ছিল তার। তার তো কোনো অপরাধ ছিল না। সে শুধু বাকবিতণ্ডা শুনে দোকান থেকে মাথা বের করেছিল। আচমকা গুলি এসে লাগল তার মেরুদণ্ডে। কোথায় আল্লাহর ন্যায়বিচার?
আমি বললাম, 'আল্লাহর শপথ! আমি জানি, আল্লাহ ন্যায়বিচারক। কিন্তু আপনি এই ঘটনার বহু শাখা-প্রশাখার মধ্য থেকে একটি শাখা হয়তো আমাকে শুনিয়েছেন। হয়তো এই ঘটনার আরও বহু ডালপালা রয়েছে, যেগুলোর কথা আমরা জানি না। আমি বিষয়টি আল্লাহর ন্যায়বিচারের সামনেই সমর্পণ করব।'
শপথ আল্লাহর, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই! আপাতদৃষ্টিতে এটি দুর্ঘটনা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
এই ঘটনার ২০ দিন পর মায়দানের এক বন্ধু আমাকে বললেন, 'আমাদের এক প্রতিবেশী তার ভাইয়ের এতিম সন্তানদের দায়িত্ব নিয়েছিল। তার কাছে (বাড়ির মূল্য বাবদ) এতিম ছেলেগুলোর ২০ হাজার টাকা পাওনা ছিল। কিন্তু সে তাদের টাকাগুলো দিতে অস্বীকার করে বসে। তারা তখন শাইখ হুসাইন খাত্তাবের কাছে অভিযোগ জানাল। শাইখ সেই প্রতিবেশীকে এবং তার ভাতিজাদের ডেকে আনলেন। কিন্তু সে তার মতের ওপরই অটল রইল। তখন শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'বাবারা, তিনি তোমাদের চাচা। চাচার বিরুদ্ধে অভিযোগ কোরো না। এই অভিযোগ তোমাদের জন্য শোভা পায় না। তোমরা বরং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করো।'
এই ঘটনাটি ঘটেছিল রাত আটটায়। পরদিন সেই প্রতিবেশী দোকান থেকে উঁকি দিয়ে দুজন লোকের ঝগড়া দেখছিল। হঠাৎ গুলি লেগে চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে।
এক ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন, 'আচ্ছা, আমি এখনো যে পাপ করিনি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেওয়া কি যৌক্তিক?' আমি উত্তর দিয়েছিলাম, 'এই শাস্তি ছিল পুরোনো পাপের জন্য। আল্লাহর নিরঙ্কুশ ন্যায়পরায়ণতার প্রতি বিশ্বাস রাখা উচিত।'
কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'হে আদম সন্তান, তোমার পাপের কারণে তোমার ওপর শাস্তি আসে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের হোঁচট খাওয়া, রগে টান লাগা ও কাঠের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া; সবই তোমাদের কর্মের প্রতিফল। আর আল্লাহ অনেক পাপই মাফ করে দেন।' [১]
একবার আমি এক ভাইয়ের সাথে গাড়িতে উঠেছিলাম। সে অন্য একটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে বসল। গাড়িটির বডি ও বিভিন্ন পার্টস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, গাড়ির মালিক হয়তো রেগে গিয়ে বকাবকি করবে। সে গাড়ি থেকে নেমে এল। আমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, 'মাফ করে দিলাম।'
আল্লাহর শপথ! আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। আমার বন্ধু যখন ফিরে এল, তখন দেখি, তার চোখে পানি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'ঘটনা কী?' সে বলল, 'একবছর আগে এক ব্যক্তি আমার গাড়ির সাথে তার গাড়ি লাগিয়ে দিয়েছিল। তার গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি, গাড়িতে পর্দানশীন কয়েকজন নারী বসে আছে। তাদের কিছু বলতে মন সায় দিল না। তখন ড্রাইভারকে বলেছিলাম, 'মাফ করে দিলাম।' আজ একবছর পর আমার রব আমার সাথে সেই আচরণই করলেন, যে আচরণ আমি করেছিলাম সেই লোকটির সাথে।'
অন্তরের অন্তস্তল থেকে বিশ্বাস করতে হবে, 'যেমন কর্ম করবে, তেমনই ফল পাবে।'
মনে রাখবেন, 'সদাচার কখনো পুরোনো হয় না, পাপ কখনো বিস্মৃত হয় না, প্রতিদান দেনেওয়ালা কখনো মৃত্যুবরণ করে না।'
আপনাকে মা-বাবার প্রতি সদাচারী হতে হবে। তাহলে আল্লাহ আপনার সন্তানদের মনে আপনার প্রতি সদাচারী হওয়ার ইচ্ছা দান করবেন। মা-বাবার সেবা করবেন; আপনিও সেবা পাবেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দরিদ্র বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন, 'হে বিলাল, তুমি খরচ করে যাও। আরশের অধিপতির কাছে কম হয়ে যাওয়ার ভয় কোরো না।' [১]
খরচ করুন, আল্লাহও আপনার জন্য খরচ করবেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনাদের প্রত্যেকের কাছেই এমন শতাধিক; হাজারো গল্প আছে-মানুষ যেমন আচরণ করে, অন্যের থেকে ঠিক তেমন আচরণই পায়।
এই ঘটনাটি প্রায় সবাই জানি। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ভীষণ ভালোবাসত। তারা দুজন একদিন মুরগির গোশত খাচ্ছিল। এমন সময় একজন ভিক্ষুক দরজায় কড়া নাড়াল। স্ত্রী তখন ভিক্ষুককে মুরগির গোশত দিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু স্বামী তাকে তিরস্কার করল। ধমক দিয়ে বলল, 'তাড়িয়ে দাও!' স্বামীর কথা শুনে স্ত্রী ভিক্ষুককে তাড়িয়ে দিল।
এই ঘটনার দু-তিনবছর পর তাদের সম্পর্কের অবনতি হলো। অবনতির একপর্যায়ে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিল। অন্য এক ব্যক্তির সাথে স্ত্রীর বিয়ে হলো। নতুন স্বামীর সাথে সে সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতে লাগল। তারপর আরও পাঁচ-ছয় বছর অতিবাহিত হলো। একদিন দ্বিতীয় স্বামীর সাথে বসে স্ত্রী মুরগির গোশত খাচ্ছিল। এমন সময় কেউ একজন দরজার কড়া নাড়াল। স্ত্রী দরজা খোলার জন্য এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার সামনে গিয়ে হকচকিয়ে গেল। স্বামী বলল, 'কী হয়েছে?' স্ত্রী বলল, 'ভিক্ষুক এসেছে।' স্বামী বলল, 'তাতে ঘাবড়ানোর কী আছে?' স্ত্রী বলল, 'জানেন, এই ভিক্ষুক কে? আমার প্রথম স্বামী!' তখন দ্বিতীয় স্বামী বলল, 'জানো আমি কে? আমি প্রথম ভিক্ষুক!'
এমন ঘটনা সত্যিই অহরহ ঘটে চলেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে সবকিছু পূর্ণ ন্যায়পরায়ণতার সাথে ঘটে। আপনাকে একটি উপদেশ দিচ্ছি-
যখনই কোনো জুলুমের কথা শুনবেন, বলবেন, 'আমি হয়তো ঘটনার অনেক অধ্যায়ের মাঝ থেকে একটি কিংবা কয়েকটি অধ্যায় শুনলাম। হয়তো আমার অজানা আরও কোনো অধ্যায় বাকি আছে, যা শুনলে আমি এর মাঝে ন্যায়পরায়ণতাই দেখতে পেতাম।' তাই তাড়াহুড়া করবেন না। ঘটনার পূর্বাপর জেনে মন্তব্য করুন। বলুন, 'আল্লাহ ভালো জানেন', 'আপনার রবই তাঁর বান্দাদের খবর জানা এবং দেখার জন্য যথেষ্ট', 'আল্লাহই জানেন, আমরা কিছুই জানি না।'
তবে সবক্ষেত্রে পাপের কারণেই যে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আসে, তা কিন্তু নয়। যেমন: কেউ দৃষ্টিশক্তি হারাল কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করল, তখন এই কথা বলা যাবে না যে, তার পাপের কারণেই এমন হয়েছে। কারণ সমস্ত কল্যাণ আল্লাহর হাতে। হয়তো দৃষ্টিহীনতা ও পঙ্গুত্বই তার জন্য কল্যাণকর।
অতএব দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ, তাঁর আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ, তাঁর সমস্ত কর্মের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ। আমি আবারও সেই হাদিসটি উল্লেখ করছি-
তোমাদের হোঁচট খাওয়া, রগে টান লাগা ও কাঠের খোঁচা লাগা; সবই তোমাদের কর্মের প্রতিফল। আর আল্লাহ অনেক পাপই মাফ করে দেন।[১]
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
১৭১ তোমরা যেকোনো বিপদেই আক্রান্ত হও না কেন, তা তোমাদের কৃতকর্মের কারণেই। আর তিনি বহু পাপ মাফ করে দেন [১]।
وَتِلْكَ الْقُرَىٰ أَهْلَكْنَاهُمْ لَمَّا ظَلَمُوا وَجَعَلْنَا لِمَهْلِكِهِم مَّوْعِدًا
সেসব জনপদের অধিবাসীরা যখন অন্যায় করেছিল, তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম এবং তাদের ধ্বংসের জন্য নির্ধারণ করেছিলাম একটি সময় [২]।
আপনারা অনেক সময় বিভিন্ন দেশে ভূমিকম্প হওয়ার সংবাদ পাঠ করেন। আমি চাই, আপনারা বুঝুন, ভূমিকম্প কি শুধুই ভূপৃষ্ঠের বিচ্যুতির ফলে সৃষ্ট কম্পন?
উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে সুন্দর শহর ছিল এ্যাগাডির। এ্যাগাডির আটলান্টিক সাগরের উপকূলে অবস্থিত ছিল। কিন্তু শহরটি ছিল অশ্লীলতা, পাপাচার ও উলঙ্গপনার আখড়া। নাইটক্লাব, বার ও পতিতালয়গুলো ছিল পাপের সাগরে নিমজ্জিত, যা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে হঠাৎ ভূমিকম্প হয় এ্যাগাডিরে। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮। মাত্র তিন সেকেন্ডে এ্যাগাডির এক বিরান সমতলভূমিতে পরিণত হয়েছিল। আমি মনে করি, এই ভূমিকম্প ছিল আল্লাহর প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ
আল্লাহ দৃষ্টান্ত পেশ করছেন এমন এক জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। সেখানে সব জায়গা থেকে প্রচুর জীবনোপকরণ আসত। এরপর তারা আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা শুরু করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ আস্বাদন করালেন [৩]।
সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টি, নির্দেশ ও কর্ম; সর্বক্ষেত্রেই ‘আদল’; ভারসাম্যরক্ষাকারী, ন্যায়পরায়ণ। মুমিন হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো, মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং সকল কাজে ন্যায়সংগত আচরণ করা।
টিকাঃ
১) সুরা কামার, আয়াত: ৪৯
[১] সুরা ইনফিতার, আয়াত: ৬-৮
[১] সুরা আর-রাহমান, আয়াত: ৫
[১] সুরা কাসাস, আয়াত: ৭১-৭৩
[১] সুরা আনআম, আয়াত: ৭৩
[২] সূরা আবাসা, আয়াত: ২৪-৩২
[১] সুরা তারিক, আয়াত: ৫-৮
[২] সুরা গাশিয়া, আয়াত: ১৭-২০
[৩] সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬
১) সুরা নূর, আয়াত: ৩০
২) সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৪
[১] সুরা শুআরা, আয়াত: ৭৫-৮৫
[২] সুরা মায়িদা, আয়াত: ১২
[১] প্রাগুক্ত
[১] সহিহুল বুখারি: ১৩০১; সহিহু ইবনি হিব্বান: ৬০৯; রিয়াযুস সালিহিন: ৪৪
[১] মুসনাদুল ফারুক, ইবনু কাসির, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৮৬; আল-ইস্তিআব ফি মারিফাতিল আসহাব, খন্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১৩২০; আখবারুল কুজাত, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৭৬; আল-জাওহারাতুন নাইয়ারাহ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২৬
[১] সুনানু আবি দাউদ: ১৩৬৯; সহিহ ইবনি খুযাইমা: ২১০৫; সহিহুল জামি: ৭৯৪৬; মুসনাদু আহমাদ : ২৬৩০৮; মুসনাদুল বাযযার: ৪৮; হাদিসটি সহিহ।
[২] সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৫-৭
[১] সহিহুল বুখারি: ২২১১, ৫৩৬৪, ৭১৮০; সহিহ মুসলিম: ৪৩৬৯, সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৩২, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২২৯৩
[২] সূরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩
[১] মুসনাদু আবি দাউদ আত-তায়ালিসি: ২৬৫৯; মুসনাদুল হারিস: ৪৩; শুআবুল ঈমান, বাইহাকি : ১৬১৪; কানযুল উম্মাল: ২৯৩৩০; হাদিসটির সনদ দুর্বল।
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩
[১] মায়দান-দামেশকের একটি অঞ্চল। উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনু আব্দিল মালিকের শাসনকালে এই অঞ্চলটি আবাদ করা হয়।
[১] শুআবুল ঈমান: ৯৩৫৭; কানযুল উম্মাল: ৬৬৯৩; তাফসির ইবনি কাসির, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৬৩; তাফসিরুত তবারি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৭৫; হাদিসটি সনদের দিক থেকে মুরসাল তথা সূত্রবিচ্ছিন্ন। তবে এর অর্থ বিশুদ্ধ।
১) আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ২৫৭৫; মুসনাদুল বাযযার: ১৩৬৬; সহিহত তারগিব ওয়াত তারহিব :৯৩৩; শুআবুল ইমান: ৩০৬৭; সহিহল জামি: ১৫১২; হাদিসটি সহিহ।
[১] শুআবুল ঈমান: ৯৩৫৭; কানযুল উম্মাল: ৬৬৯৩; তাফসির ইবনি কাসির, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৬৩; তাফসিরুত তবারি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৭৫; হাদিসটি সনদের দিক থেকে মুরসাল তথা সূত্রবিচ্ছিন্ন। তবে এর অর্থ বিশুদ্ধ।
[১] সুরা শুরা, আয়াত: ৩০
[২] সুরা কাহফ, আয়াত: ৫৯
[৩] সুরা নাহল, আয়াত: ১১২
📄 আল-বাদি : الْبَدِيعُ
আমার কাছে পাখির বিশ্বকোষ আছে। বইটির ভূমিকায় লেখক বলেছেন, 'আজ পর্যন্ত তৈরি হওয়া উন্নত প্রযুক্তির বিমানের কোনোটিই পাখির স্তরে পৌঁছতে পারবে না।' মানুষ যত কিছুই তৈরি করুক, যদি গভীরভাবে লক্ষ করেন, তবে দেখবেন- সবক্ষেত্রেই সে প্রকৃতির কোনো অভূতপূর্ব সৃষ্টির অনুসরণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন ভূতপূর্ব কোনো দৃষ্টান্ত ছাড়া বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করলেন, তখন কেউ কি বলেছে-পৃথিবী হতে হবে গোলাকার, বলের মতো। কেউ কি বলেছে-পৃথিবীকে নিজের চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে হবে, সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করতে হবে?
আলো কে সৃষ্টি করলেন? কে সূর্যকে করলেন উত্তপ্ত, প্রজ্জ্বলিত? কে পানিকে তার বৈশিষ্ট্য দিলেন, বাতাসকে তার বৈশিষ্ট্য দান করলেন? কে সকল উপাদানকে দান করলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য? সব উপাদান যদি একই মাত্রার তাপে গলে যেত, তাহলে দেখা যেত-সমগ্র বিশ্ব গ্যাসে আচ্ছন্ন কিংবা শক্ত অথবা তরল হয়ে আছে। যদি এই বিশ্বজগতের ছায়াপথ, ধূমকেতু, অগণিত গ্রহ-নক্ষত্র-এসবের মধ্যকার দূরত্ব, ভারসাম্যপূর্ণ গতিময়তা, অতিসূক্ষ্ম বিন্যাস সবকিছু নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন, তবে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
উদাহরণ হিসেবে আমরা সামনে দৃশ্যমান গাছের পাতার কথা ভাবি। আপনি কি মনে করেন, আমরা এমন একটি পাতা আঁকতে পারব-যার কোনো অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই? সেই পাতাটি হোক ছোট বা বড়, মসৃণ বা অমসৃণ, ডোরাকাটা কিংবা রেখা টানা, গাঢ় রঙের কিংবা উজ্জ্বল রঙের অথবা মিশ্র বর্ণের। আপনি যদি নানা ধরনের পাতা আঁকেন, তাহলে সেই পাতাগুলো কি একই রকম হবে? এমনকি একটি গাছের পাতাও কি একরকম হয়? আল্লাহর শপথ! একটি যাইতুন গাছের দুটি পাতাও যদি সাদৃশ্যপূর্ণ হতো, তাহলে আমার রবের নাম আল-ওয়াসি (الواسع) যার নিদর্শন সর্বব্যাপী বিরাজমান-হতো না!
মানুষের চেহারার কথাও আমরা বলতে পারি। পৃথিবীতে সাড়ে ৭ বিলিয়ন মানুষ বাস করে।[১] পুরো পৃথিবীতে কি এমন একজন মানুষ আছে, যার সাথে অন্য কোনো মানুষের চেহারার পুরোপুরি মিল আছে? অসম্ভব। ফিঙ্গারপ্রিন্টের কথা যদি বাদও দেওয়া হয়, তারপরও প্রতিটি মানুষের শরীরে বিশেষ ঘ্রাণ রয়েছে। সেই ঘ্রাণ অনুসরণ করেই প্রশিক্ষিত কুকুর অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারে। একজন মানুষের ঘ্রাণের সাথে আরেকজনের কোনো মিল নেই। এমনকি দেখা গেছে একই পরিবেশে থাকা এবং একই খাদ্য গ্রহণ করা যমজ ভাইবোনদেরকেও শরীরের ঘ্রাণ দিয়ে আলাদা করতে পেরেছে প্রশিক্ষিত কুকুর।
শরীরের ঘ্রাণের মতো প্রতিটি মানুষের সুরও ভিন্ন ভিন্ন। চোখের মণি ভিন্ন, আঙুলের ছাপ ভিন্ন। প্রত্যেকের রক্তের প্লাজমাও ভিন্ন। আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী মানবদেহে টিস্যু বা কোষ জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। রক্তের গ্রুপ যদিও সীমিত কিন্তু মানবদেহের টিস্যুর ধরন অসীম। পৃথিবীতে শুধু আপনার টিস্যুই আপনার মতো; আপনার মতো আর কেউ নেই। এটি কি 'বাদউন' নয়?
কোনো শিল্পীকে যদি মানুষের চেহারা আঁকতে বলা হয়, তাহলে দুটি, তিনটি, দশটি হয়তো আঁকতে পারবে। খানিক বাদেই তার মস্তিষ্ক থেকে সৃজনশীলতা শেষ হয়ে যাবে। গাড়ি নির্মাতারা গাড়ির আকৃতি তৈরি করে। কখনো বাঁকা করে, কখনো লম্বালম্বিভাবে, কখনো-বা আড়াআড়ি আকৃতিতে। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই আগের ডিজাইনেই ফিরে আসে। কারণ তাদের সৃজনশীলতা খুবই সীমিত। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা হলেন আসমান ও জমিনের 'বাদি' (بَدِيع)। তার প্রতিটি সৃষ্টিই অনন্য ও অভূতপূর্ব।
আল্লাহ তাআলার 'আল-বাদি' (اَلْبَدِيع) নাম কুরআনুল কারিমেও বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَإِذَا قَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ (۱۱۷)
তিনি আসমান ও জমিনের অনুপম সৃষ্টিকর্তা। যখন তিনি কোনোকিছু সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার জন্য কেবল বলেন, 'হও'; আর তাতেই তা হয়ে যায়।[১]
আল-বাদি (بَدِیع) শব্দটি নির্গত হয়েছে বাদউন (بدع) ক্রিয়ামূল থেকে। বাদউন অর্থ পূর্বের দৃষ্টান্ত ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি করা। এক কথায় বলতে পারি, বাদউন মানে মৌলিক বা অভূতপূর্ব কিছু সৃষ্টি করা, সম্পূর্ণ নতুন কিছু সৃষ্টি করা। একই ধরনের আরেকটি শব্দ হলো ইবদা (إبداع)।
আমরা যদি মানবসৃষ্ট জিনিসগুলো খুঁজে দেখি, তাহলে দেখব-ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, জেনে বা অজান্তে মানুষের সব সৃষ্টিই অনুকরণ মাত্র। মানুষ যদি বলে, আমি সাবমেরিন সৃষ্টি করেছি; তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, সাবমেরিন মাছের অনুকরণ। এরকমভাবে যখন বিমান তৈরি করে, তখন সেটি হয় পাখির অনুকরণ।
আগে মনে করা হতো, শুধু ফিঙ্গারপ্রিন্ট মানুষের একক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখন আমরা জানি, মানুষের চেহারা, চোখের মণির রং, শরীরের ঘ্রাণ, গলার স্বর, ফিঙ্গারপ্রিন্ট; সবই মানুষের একক বৈশিষ্ট্য।
আপনি যদি সমুদ্রের মাছের প্রজাতি সম্পর্কে জানেন, যদি এই সম্পর্কে লেখা সচিত্র কোনো বই পড়েন, তাহলে হতবাক হয়ে যাবেন। এখন পর্যন্ত মিলিয়ন প্রজাতির মাছ আবিষ্কৃত হয়েছে। আপনার মনে যেরকম মাছের চিত্রই উদিত হোক, তার অস্তিত্ব রয়েছে। সুচ্ছ, ফসফরাসের মতো, চোখে লম্বা পাপড়ি বিশিষ্ট, পা বিশিষ্ট, ফুল আকৃতির মাছও রয়েছে। এমন মাছও আছে, যা আত্মরক্ষার জন্য কালির মতো পদার্থ ছুড়ে লুকিয়ে পড়ে। এমন মাছও আছে, যা শত্রুকে হাজার ভোল্টের ইলেক্ট্রিক শক দিতে পারে। ছোট ছোট অর্নামেন্টাল মাছও আছে অগণিত। আপনি যদি মাছের প্রকার সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে আপনার জানা কখনো শেষ হবে না। যদি পাখির প্রজাতি, আকৃতি ও ধরন সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে দেখা যাবে, এই বিষয় শুধু কল্পনাতেই ধারণ করা সম্ভব।
এক বন্ধু আমাকে ১৮ খণ্ডে লেখা একটি বইয়ের কথা জানিয়েছিলেন, যার প্রতিটি খণ্ডের পুরুত্ব ১৮ সেন্টিমিটারের বেশি। এই বিশাল বইটি লেখা হয়েছে কেবল নানা জাতের পেঁয়াজ নিয়ে।
অনেকে বলেন, পৃথিবীতে প্রায় ৩ হাজার জাতের গম রয়েছে। কৃষি গবেষণাকেন্দ্রের একজন প্রকৌশলী আমাকে জানিয়েছেন, তাদের গবেষণাকেন্দ্রে ৩০০ জাতের আঙুর রয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি ফল, সবজি শত শত, এমনকি হাজারো জাত আছে। এসবই আল্লাহর ‘আল-বাদি’ নামটিকে ফুটিয়ে তোলে।
একবার আমি মিশরে পতঙ্গ প্রদর্শনীতে গিয়েছিলাম। বিশাল প্রাঙ্গণে বহুসংখ্যক স্টল নিয়ে প্রদর্শনীটি আয়োজিত হয়েছিল। প্রতিটি কামরার চার দেওয়ালজুড়ে ছিল নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ; যেগুলোর কোনোটির সাথে কোনোটির মিল নেই। আমার কাছে বিষয়টি আজও অকল্পনীয়। এটিই আল্লাহর বাণী— ‘তিনি আসমান ও জমিনের অনুপম সৃষ্টিকর্তা’—এর অর্থ।
নানা ধরনের গাছের পাতা, গাছের প্রজাতি, বিভিন্ন ধরনের কাঠ, নানা জাতের উদ্ভিদ, নানা রকমের ঘ্রাণ, অসংখ্য প্রজাতির মাছ, পাখি, ফল-ফুল পৃথিবীতে রয়েছে। এমনকি প্রতিটি তুষার-দানাও স্বতন্ত্র আকৃতি বিশিষ্ট।
আমরা যদি তুষার-দানা অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে বড় করে দেখি, তাহলে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখতে পাব। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে যদি তুষারের হাজারো নমুনা সংগ্রহ করেন, তবুও দেখবেন—প্রতিটি দানার আকৃতি স্বতন্ত্র। সবই আল্লাহর ‘বাদউন’—এর উদাহরণ।
আল্লাহ তাআলার ‘আল-বাদি’ নামের প্রথম অর্থ তিনি নিজ সত্তার ক্ষেত্রে ‘বাদি’; উপমা ও তুলনাহীন। কোনো কিছু তাঁর সদৃশ নয়। তিনিও কোনো কিছুর মতো নন। নিজ সত্তার ক্ষেত্রেও যেমন তিনি ‘বাদি’ তুলনাহীন, তেমনই সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তুলনাহীন। পূর্বে বিরাজমান ও জ্ঞাত আকৃতি-উপমা ছাড়াই তিনি সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করেছেন।
সারকথা হলো, আল্লাহ তাআলাই আসমান ও জমিনকে সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টি করেছেন, সমস্ত বস্তুকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। তিনি বিশ্বজগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন পূর্ববর্তী কোনো দৃষ্টান্ত কিংবা শিক্ষাগ্রহণ ছাড়া। তিনি ‘বাদি’ অর্থাৎ অভূতপূর্ব সৃষ্টিকর্তা।
টিকাঃ
[১] ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী।
[১] সুরা বাকারা, আয়াত: ১১৭
📄 উপসংহার
যে তৃষ্ণার্ত হৃদয় প্রতিক্ষায় থাকে এক পশলা বৃষ্টির, যে পথভোলা পথিক খুঁজে ফেরে পথ, সঁপে দেওয়ার তাড়নায় যে নয়নযুগল হয়ে ওঠে অশ্রুসজল, পাপে নিমজ্জিত যে অন্তর অন্বেষণ করে বেড়ায় রহমতের বারিধারা, তাদের রবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার, রবের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষুদ্র প্রয়াসই হলো 'তিনিই আমার রব'।