📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-মুহাইমিন : الْمُهَيْمِنُ

📄 আল-মুহাইমিন : الْمُهَيْمِنُ


এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব আল্লাহ তাআলার মহান নাম 'আল-মুহাইমিন' (الْمُهَيْمِنُ) নিয়ে। আবারও বলে রাখছি, আল্লাহর সুন্দর নামগুলোর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমরা ৩টি দিক আলোচনা করছি। তা হলো-
> নামের পরিচয়-সংক্রান্ত আলোচনা।
> নামের তাত্ত্বিক প্রয়োগ।
> মুমিন বান্দার সাথে এই নামের সম্পর্ক।
'আল-মুহাইমিন' নামের একটি অর্থ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণকারী। তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছুই জানেন। জানেন চোখের চোরা চাহনি; হৃদয়ের গোপন কথা। তিনি বস্তুর বাহ্যিক দিকটি যেমন দেখেন; তেমনই দেখেন এর আড়ালের সবকিছু; দেখেন দৃশ্য ও অদৃশ্যের সকল দিক, যাবতীয় বিষয়।
'আল-মুহাইমিন' নামের জন্য যে গুণ আবশ্যক; তা হলো, বস্তুর ভালোমন্দ নির্ণয়ের পরিপূর্ণ জ্ঞান ও সক্ষমতা। কারণ কিছু মানুষ এমন আছে, যারা জানে কিন্তু সক্ষমতা রাখে না। আবার কিছু মানুষের সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু তারা জানে না।
'আল-মুহাইমিন' নামের আরেকটি অবধারিত গুণ হলো, নিরবচ্ছিন্নতা ও ধারাবাহিকতা। এমন অনেক মানুষই রয়েছে, যারা সক্ষমতা ও শক্তির চূড়ান্ত পর্যায় উপনীত, কিন্তু তারা জ্ঞানের অধিকারী নন। আবার এমন মানুষও থাকে, যাদের সক্ষমতা ও জ্ঞান দুটোই রয়েছে। যদিও এই শ্রেণির মানুষ অত্যন্ত বিরল। তবে মানুষ যতই জানুক, সক্ষম হোক, ভবিষ্যতের ব্যাপারে নিশ্চয়তা সে দিতে পারে না। এমন হতে পারে যে, কোনো বিষয় আপনার আওতাধীন, কিন্তু আপনি জানেন না-ভবিষ্যতে এর পরিণতি কী হবে।
আমরা যদি বলি, 'আল-মুহাইমিন' আল্লাহর নাম। তাহলে এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ জানেন; যে জানার কোনো শেষ নেই। কারণ কোনো কিছুই তাঁর অগোচরে থাকে না। অসুস্থ নারী যদি কোনো দৈহিক অসুস্থতা নিয়ে পুরুষ ডাক্তারের কাছে যায় এবং ডাক্তার পরীক্ষা করতে গিয়ে তার প্রতি কুনজর দেয়, তবে তা হবে সুস্পষ্ট খিয়ানত। কিন্তু পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া কেউ এই খিয়ানতের কথা জানতে পারবে না।
তিনি চোখের কুনজর সম্পর্কে জানেন; জানেন সকল গোপনতম বিষয়। তিনি জানেন, কী ছিল, কী হবে; অতিসত্বর কী হতে যাচ্ছে। জানেন, যা হয়নি; তা হলে কেমন হতো।
আপনার থেকে যা গোপন রয়েছে, তা তিনি জানেন। আপনি যা প্রকাশ করেন, তা-ও তিনি জানেন। যা গোপন করেন, তা-ও জানেন। তিনি জানেন, ভূমিতে প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা বের হয়; আকাশ থেকে যা নেমে আসে এবং যা আকাশে উঠে যায়। আপনার জল্পনা-কল্পনায়, আগ্রহ-ইচ্ছায়, ওঠাবসায়, গোপনে ও প্রকাশ্যে; সর্বক্ষেত্রে তিনি আপনার সাথে রয়েছেন। আপনার সবকিছুই তিনি জানেন।
পক্ষান্তরে সবকিছুর পূর্বে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি না জানলে মানুষের পক্ষে কোনো কিছুর তত্ত্বাবধায়ন করা সম্ভব নয়। আপনি যদি বাস্তবতা না-ই জানেন, তাহলে কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন? কিন্তু যিনি 'আল-মুহাইমিন', তিনি তত্ত্বাবধানের পূর্বেই অবধারিতভাবে সবকিছু জানেন।
'আল-মুহাইমিন' সর্বজ্ঞ; সবকিছুর ওপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। কোনো কিছু তাঁকে অক্ষম করতে পারে না। তার ক্ষমতার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। সকল বিষয় তার ক্ষমতার অধীন। আমরা হয়তো অনেক বিষয়ে জ্ঞান রাখি, কিন্তু আমরা জানি না, ভবিষ্যতে কী হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَعِبْرَةً لِأُولى الأَبْصَار
আল্লাহ রাত ও দিনের আবর্তন ঘটান। নিশ্চয় এতে অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন লোকদের জন্য রয়েছে শিক্ষা।[১]
তিনি আরও বলেন-
إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاءَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ ﴾
যদি তোমাদের কোনো আঘাত লাগে, (তাহলে মনে করবে) এরকম আঘাত তো অন্যদেরও লেগেছে। আমি মানুষের মাঝে এই দিনগুলোর পালাবদল করি, যাতে আল্লাহ মুমিনদের যাচাই করতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহিদদের গ্রহণ করতে পারেন। আর আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না। [২]
'আল-মুহাইমিন' এর আবশ্যকীয় গুণাবলি সাধারণভাবে বোঝার জন্য আমি কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সফরে বের হতেন, তখন বলতেন-
اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ عَلَى الْأَهْلِ
হে আল্লাহ, সফরে আপনিই সঙ্গী। (আমার অনুপস্থিতিতে) আমার পরিবারের জিম্মাদার আপনিই! [৩]
আপনি কি বিশ্বাস করেন, কোনো মানুষের মধ্যে এমন গুণ থাকা সম্ভব? কোনো মানুষ কি একই সময়ে আপনার সাথে সফরে এবং আপনার বাড়িতে, পরিবার-পরিজনের মধ্যে রক্ষাকারীরূপে থাকতে পারবে?
অসম্ভব! হয়তো তিনি আপনার সাথে থাকবেন; নাহয় থাকবেন আপনার বাড়িতে।
আলিমগণ বলেন, 'এই দুটি গুণ কেবল আল্লাহ তাআলার মাঝেই একসাথে পাওয়া যায়। সুরক্ষা, তত্ত্বাবধান, তাওফিক, সঠিক পথপ্রদর্শন, সাহায্য ও সহায়তার মাধ্যমে তিনি আপনার সাথে থাকেন। আবার একই সময়ে আপনার অনুপস্থিতিতে তিনি বাড়িতে আপনার পরিবারের সাথেও থাকেন; তাদেরকে সব ধরনের অনিষ্ট ও বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন।
মানুষের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও সক্ষমতা একত্রিত হওয়ার ঘটনা অতি বিরল। তাই মানবসমাজে অনেকে জ্ঞানে সবার ওপরে অবস্থান করে, কিন্তু তাদের ক্ষমতা থাকে স্বল্প। আবার অনেকে ক্ষমতায় অনেক ওপরে অবস্থান করে, কিন্তু তাদের জ্ঞান থাকে সীমিত।
যদি আমরা ধরে নিই, ৫০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে একজন মানুষের মাঝেও পূর্ণ জ্ঞানের সাথে পূর্ণ ক্ষমতার মতো অতি বিরল বিষয়টি পাওয়া যাচ্ছে, তবু তার ক্ষেত্রে ত্রুটি হয়ে দাঁড়াবে ভবিষ্যত-দর্শনের অক্ষমতা। হতে পারে, ভবিষ্যতে তার চেয়ে ক্ষমতাবান কেউ এসে তার ক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে। তার চেয়ে মেধাবী কেউ এসে তার স্থান দখল করবে। সুতরাং কালেভদ্রে জ্ঞান ও সক্ষমতা একত্রিত হলেও ভবিষ্যতের জ্ঞান আপনি কখনো লাভ করতে পারবেন না।
কিন্তু যখন আপনি বলবেন, আল্লাহ তাআলা 'আল-মুহাইমিন', তখন এর অর্থ হবে-তিনি পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। যেমনটি কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
...وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
আর আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক অবগত।[১]
তাঁর জ্ঞানের কোনো শুরু-শেষ নেই; নেই তাঁর সক্ষমতার সীমা-পরিসীমা। বিশ্বজগতে অন্য কোনো দিক নেই-যা তাঁর কর্তৃত্বে অংশীদার হতে পারে। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلِ اللهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا لَهُ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ أَبْصِرْ بِهِ وَأَسْمِعْ مَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَلِي وَلَا يُشْرِكْ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا
আপনি বলুন, তারা কত বছর অবস্থান করেছিল, তা আল্লাহই ভালো জানেন। আসমান ও জমিনের অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে। তিনি কত সুন্দর দেখেন ও শোনেন। তিনি ছাড়া তাদের অন্য কোনো অভিভাবক নেই। তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরিক করেন না। [১]
বিশ্বজগতে যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য থাকত, তাহলে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যেত। প্রত্যেক উপাস্য নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং একজন আরেকজনের ওপর স্থান করে নিত। কিন্তু 'আল-মুহাইমিন' এক ও অদ্বিতীয়। তাই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, বিরোধী কিংবা প্রতিপক্ষ কোনো শক্তি নেই।
এজন্য আপনি 'আল-মুহাইমিনের' ওপর আস্থা রাখবেন- যিনি সবকিছু জানেন, সবকিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। তাঁর মতো কিছুই নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মানুষ কখনো মালিক হলেও তার মালিকানাধীন সম্পদ দিয়ে সবসময় উপকৃত হতে পারে না। মালিকানা থাকার পরও সেই সম্পদে হস্তক্ষেপের অধিকার তার থাকে না। কখনো মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ির মালিক হয়; কিন্তু সেই বাড়ি ৭০ বছরের জন্য ভাড়া দেওয়া থাকে। ফলে মালিকানা থাকা সত্ত্বেও সেটা সে ব্যবহার করতে পারে না।
পক্ষান্তরে আল্লাহর মালিকানা তাঁর সত্তার মতোই চিরন্তর ও অবিনশ্বর। এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আসমান ও জমিনের মালিকানা আল্লাহরই। আর আল্লাহ সবকিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। [২]
সমগ্র বিশ্বজগৎ-হোক কর্তৃত্বে কিংবা অধিকারে-সর্ববিবেচনায় একমাত্র আল্লাহরই মালিকানাধীন।
প্রিয় পাঠক, আল্লাহর প্রতি আপনার ঈমানের অত্যন্ত মৌলিক একটি বিষয় হলো, আপনি আল্লাহর সুন্দর নামগুলো ও উত্তম গুণাবলি সম্পর্কে জানবেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا ، مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ
আল্লাহ তাআলার ৯৯টি নাম রয়েছে। যে সেগুলো মুখস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে [১]
আল্লাহর রাসুলের এই হাদিসটি সহিহ ও মুতাওয়াতির।[২] তবে এখানে أَحْصَاهَا (মুখস্থ করবে) শব্দটির অর্থ আমাদের বুঝতে হবে। এর অর্থ শুধু এই নয় যে, গুনে গুনে শুধু ৯৯টি নাম মুখস্থ করতে হবে। বরং উদ্দেশ্য হলো, এই নামগুলো উপলব্ধি করে সেই অনুযায়ী আমল করতে হবে।
পূর্বের অধ্যায়গুলো লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, প্রতিটি নামের ক্ষেত্রে মুমিন হিসেবে আপনার কিছু করণীয় কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদি আপনি সেই অনুযায়ী আমল না করেন, তবে হাদিসে উল্লিখিত 'মুখস্থ' শব্দের দাবি আদায় হবে না। মনে হবে যেন আপনি সেই নামগুলো শিখেনইনি। এর কারণও রয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু সাল্লাম আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও।' [৩]
আমরা বুঝলাম, 'আল-মুহাইমিন' মানে এমন সত্তা-যাঁর জ্ঞানের কোনো শেষ নেই, যাঁর ক্ষমতা পূর্ণ ও অবিনশ্বর। তবে এছাড়া আরও ৪টি শাখাগত অর্থ রয়েছে। অর্থের বিবেচনায় যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো-
[প্রথম অর্থ] যদি আল্লাহ তাআলাই একমাত্র 'আল-মুহাইমিন' (সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণকারী) হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর পর্যবেক্ষণে ভালোবাসা ও স্নেহ থাকা অবধারিত। যেমন: অনেক সময় মা অসুস্থ সন্তানের শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকে। সন্তানের প্রতিটি নড়াচড়া গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। মায়ের এই স্নেহপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হয় সজ্ঞানে ও সক্ষমতার আওতায়। কিন্তু এই পর্যবেক্ষণের মূল প্রেরণা স্নেহ, মায়া ও ভালোবাসা।
এরকমভাবে আমরা যদি বলি, অমুক ব্যক্তি 'মুহাইমিন' অর্থাৎ কাউকে পর্যবেক্ষণে রাখছে, তাহলে হতে পারে—সে হিংসার বশবর্তী হয়ে, অহংকার ও ঔদ্ধত্যের বশে, ক্ষমতার বলে কিংবা উপকৃত হওয়ার আশায় পর্যবেক্ষণ করছে। এই পর্যবেক্ষণ হতে পারে স্বেচ্ছাচার ও ক্ষমতার দাপট।
এজন্য মানুষের ব্যাপারে যদি 'মুহাইমিন' শব্দ প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেটার ভিন্ন অর্থ হতে পারে। কিন্তু যখন আমরা আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে বলব, তিনি 'মুহাইমিন', তখন তাঁর পর্যবেক্ষণের অর্থ হবে বান্দার প্রতি দয়া ও ভালোবাসা।
উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কিছু সংখ্যক বন্দি এল। তিনি দেখলেন, বন্দিদের মাঝে এক নারী আছে। সে স্তন্যদান করত। বন্দিদের মাঝে কোনো শিশু পেলে সে তাকে কোলে তুলে নিয়ে দুধ খাওয়াত। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বললেন, 'তোমরা কি মনে করো, এই নারীটি তার সন্তানকে আগুনে ফেলে দিতে পারে?' আমরা বললাম, 'ফেলার ক্ষমতা থাকলেও সে কখনো ফেলবে না।' তখন তিনি বললেন, 'এই নারীটি তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়াবান, আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর এর চেয়ে বেশি দয়াবান। [১]
সুতরাং আল্লাহ তাআলার পর্যবেক্ষণ, দয়া, মায়া, ভালোবাসা; বান্দার ভবিষ্যত, আখিরাত ও কল্যাণ কামনার পর্যবেক্ষণ। এ হিসেবে 'মুহাইমিনের' প্রথম শাখাগত অর্থ-স্নেহ ও ভালোবাসা।
[দ্বিতীয় অর্থ] 'মুহাইমিনের' দ্বিতীয় অর্থ হলো, আমানত রক্ষাকারী। কারও কোনো আমানত রক্ষা করা অনেক বড় বিষয়, মহান কাজ। কারণ এই রক্ষার কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে করতে হয়। এজন্য 'মুহাইমিনের' একটি অর্থ রক্ষাকারী। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
قَالَ هَلْ آمَنُكُمْ عَلَيْهِ إِلَّا كَمَا أَمِنْتُكُمْ عَلَى أَخِيهِ مِنْ قَبْلُ فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمْ الرَّاحِمِينَ )
সে বলল, 'আমি কি তার ব্যাপারে তোমাদেরকে তেমনই বিশ্বাস করব, যেমন বিশ্বাস করেছিলাম তার ভাইয়ের ব্যাপারে? আল্লাহই উত্তম রক্ষাকারী এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু [১]
[তৃতীয় অর্থ] 'মুহাইমিন' এর তৃতীয় অর্থ হলো, আপনি যখন আল্লাহর পথে থেকে তাঁর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে কারও সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হবেন, তখন আপনিই বিজয়ী হবেন। সমস্ত ঘটনা তখন আপনাকে সত্যায়ন করবে। সব মানুষই কোনো তত্ত্ব, মত, চিন্তা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কিংবা বিশ্বাসের কথা উত্থাপন করে। কিন্তু যাপিত জীবনের ঘটনাপ্রবাহ সেই আকিদা-বিশ্বাসকেই প্রমাণিত করে, যা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।
তাই আপনি যদি কুরআনের সাথে থাকেন, তাহলে আল্লাহ তাআলার রক্ষণাবেক্ষণে থাকবেন, আপনি হবেন বিজয়ী। যেমন: কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ
আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন আর দানকে বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ কোনো অবিশ্বাসী কাফিরকে পছন্দ করেন না [২]
'আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন'-এটি একটি আয়াত। আপনি এই আয়াতে বিশ্বাস করেন। কিন্তু সুদের কারবারি আপনাকে বলে ভিন্ন কথা। ব্যাংকে টাকা না রেখে ঘরে জমিয়ে রাখা কি যৌক্তিক? ব্যাংকে রাখলে তো লাভ হবে। সেই লাভ দিয়ে জীবিকা নির্বাহও করা যাবে! মুমিন হিসেবে আপনি বলবেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন’। কিন্তু অবিশ্বাসী ব্যক্তি ভিন্ন মত উত্থাপন করবে। সে বলবে, 'অবশ্যই সম্পদ থেকে সুদ গ্রহণ করা উচিত।' তারপর সময়ের আবর্তনে, ঘটনার পরিক্রমায় সেই সুদের কারবারি তার সম্পদ খুইয়ে বসলে কে বিজয়ী হয়? আপনি!
আপনিই বিশ্বাস করেছিলেন, সুদ থেকে আসা সম্পদ কোনো না কোনোভাবে ধ্বংস হবে। সময়ের আবর্তন আপনার এই বিশ্বাসকে প্রমাণিত করেছে, আপনিই বিজয়ী হয়েছেন!
আপনি বিশ্বাস করেন, মানুষ হারাম থেকে দৃষ্টিকে অবনত রাখলে আল্লাহ তার হৃদয়ে ঈমানের মিষ্টতা দান করেন। অথচ আরেকজন তার দাম্পত্যজীবনে ভিন্ন পথে চলে। সে আপনাকে চোখের গুনাহ করতে প্রলুব্ধ করে। আপনি তাকে শোনালেন দৃষ্টি অবনত রাখার আল্লাহপ্রদত্ত আদেশ। কুরআনের আয়াতে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তারপর হয়তো সময়ের চাকা ঘুরতে থাকে, সে হতভাগার দিন কাটতে থাকে পথে পথে দুচোখ ভরে হারাম দৃশ্য দেখে। তারপর হঠাৎ চোখের পাতা ঝুলে পড়া রোগে আক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রে আপনিই ঠিক। যাপিত জীবনের ঘটনা আপনার বিশ্বাসকেই প্রমাণিত করে যে, এ আদেশ আল্লাহপ্রদত্ত আদেশ।
[চতুর্থ অর্থ] আপনি যখন কোনো মেয়েকে বিয়ের জন্য পছন্দ করেন, তখন আপনার পছন্দের কারণ হয়—তার দ্বীনদারিতা, চরিত্রের পবিত্রতা, আত্মমর্যাদা, পূণ্যময়তা ও পরিবারের দ্বীনদারিতা। দ্বীনদারিতাকে আপনি সৌন্দর্য, সম্পদ, বংশগৌরব ও পার্থিব মর্যাদার ওপর প্রাধান্য দেন। দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়ার এই মহৎ পদক্ষেপকে আপনি আল্লাহর আনুগত্য মনে করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرَاهُ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ وَلَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে কোরো না—যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। ঈমানদার কৃতদাসীও মুশরিক নারীর চেয়ে উত্তম; যদিও মুশরিক নারী তোমাদের মোহিত করে। আর মুশরিকদের কাছে তোমরা (মেয়েদের) বিয়ে দিয়ো না-যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। ঈমানদার কৃতদাসও মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম; যদিও সে তোমাদের মোহিত করে। তারা (মুশরিকরা) ডাকে জাহান্নামের দিকে আর আল্লাহ আপন অনুগ্রহে আহ্বান করেন জান্নাত ও ক্ষমার দিকে। তিনি তাঁর বিধানাবলি মানুষের জন্য বিশদরূপে বর্ণনা করেন-যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে [১]
অপরদিকে আরেক ব্যক্তি চলে প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে। তার মতে, স্ত্রী হতে হবে চোখধাঁধানো সুন্দরী; একেবারে মনের মতো। দ্বীনদারিতার কমবেশিতে কিছু যায়-আসে না।
তারপর দিন গড়াতে থাকে। আপনি দ্বীনদারিতা দেখে যে পূণ্যময়ীকে নির্বাচন করেছিলেন; দেখা যায়, তাকে নিয়ে আপনার দাম্পত্যজীবন সুখী, মায়া-ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। দিন দিন সে সুখ বৃদ্ধিই পাচ্ছে। আল্লাহ তাআলাও এই দাম্পত্যে বারাকাহ দিচ্ছেন। সন্তানসন্ততিতে আপনার ঘর মুখরিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে যে দ্বীনদারিতার ওপর সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিয়েছিল, তার জীবন দোজখে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে কে জয়ী হলো? মুমিনই জয়ী হয়েছে। এজন্যই আমাদের রব বলেছেন-
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
সেই আখিরাতের আবাস, যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য-যারা পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। আর সুপরিণতি মুত্তাকিদের জন্য। [২]
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি, আল্লাহ তাআলার পর্যবেক্ষণ, স্নেহ ও ভালোবাসার পর্যবেক্ষণ, সুরক্ষা ও বিশ্বস্ততার পর্যবেক্ষণ।
এবার কিছু ঘটনা ও প্রমাণ পেশ করব-যা এই মহান নামের অর্থকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। আল্লাহ তাআলা যখন মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামকে বললেন-
اِذْهَبَآ اِلٰى فِرْعَوْنَ اِنَّهٗ طَغٰى فَقُوْلَا لَهٗ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهٗ يَتَذَكَّرُ اَوْ يَخْشٰى
তোমরা দুজন ফিরাউনের কাছে যাও, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তার সাথে নরম ভাষায় কথা বলবে। হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা (আল্লাহকে) ভয় করবে।[১]
আপনি কি জানেন, কে এই ফিরাউন? এই সেই ফিরআউন, যে বনি ইসরাইলের সন্তানদের জবাই করেছিল এবং নারীদের জীবিত রেখে দাসী বানিয়েছিল। এমনকি সে নিজেকে রব বলে দাবি করেছিল। কে তার সামনে কথা বলার সাহস করতে পারে! কে তার উপাস্য হওয়ার মিথ্যা দাবির অসারতা তুলে ধরতে পারে?
মুসা আলাইহিস সালাম ও হারুন আলাইহিস সালামের সেই শক্তিবল ছিল না, যা দিয়ে তারা ফিরাউনের সাথে লড়তে পারতেন। এজন্য তারা আল্লাহর কাছে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা বললেন। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের অভয় বাণী শোনানো হলো। কুরআনুল কারিমে এই ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে-
قَالَا رَبَّنَآ إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى قَالَ لَا تَخَافَآ إِنَّنِي مَعَكُمَآ أَسْمَعُ وَأَرَى فَأْتِيَاهُ فَقُولَا إِنَّا رَسُولَا رَبِّكَ فَأَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا تُعَذِّبْهُمْ قَدْ جِئْنَاكَ بِآيَةٍ مِنْ رَبِّكَ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى إِنَّا قَدْ أُوحِيَ إِلَيْنَا أَنَّ الْعَذَابَ عَلَىٰ مَنْ كَذَّبَ وَتَوَلَّى
তারা বলল, 'হে আমাদের রব, আমরা তো আশঙ্কা করছি, সে আমাদের শাস্তি দিতে উদ্যত হবে কিংবা সীমালঙ্ঘন করবে।' তিনি বললেন, 'ভয় কোরো না। আমি তোমাদের সাথে আছি, আমি (সব) শুনছি এবং দেখছি। অতএব তোমরা তার কাছে যাও এবং বলো, 'আমরা তোমার রবের দূত। তুমি বনি ইসরাইলকে আমাদের সাথে যেতে দাও এবং তাদেরকে কষ্ট দিয়ো না। আমরা তোমার রবের পক্ষ থেকে নিদর্শন নিয়ে তোমার কাছে এসেছি। আর যে সৎপথ অনুসরণ করে, তার প্রতি বর্ষিত হয় শান্তি ও নিরাপত্তা। আমাদের প্রতি এ মর্মে ওহি অবতীর্ণ হয়েছে যে, শাস্তি তো তার জন্য, যে লোক (সত্য দ্বীনকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়। [১]
আল্লাহ তাআলার এই অভয় বাণী, 'আমি তোমাদের সাথেই রয়েছি; সব শুনছি এবং দেখছি।' এটাই মুসা আলাইহিস সালাম ও হারুন আলাইহিস সালামের সাহস ও মনোবল বাড়িয়ে দিল। তখন তারা নির্ভয়ে ফিরাউনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
আপনি যখন বিশ্বাস করবেন, আল্লাহ তাআলাই 'আল-মুহাইমিন'; রক্ষাকারী ও রক্ষণাবেক্ষণকারী, যখন বিশ্বাস করবেন-সবকিছুর জ্ঞান ও ক্ষমতা আল্লাহর রয়েছে, সমস্ত সৃষ্টি তাঁর অধীনে; তিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন, তখন আপনার হৃদয় প্রশান্ত হবে, মন হবে শান্ত। আপনার প্রাণ ও দেহ শান্তি লাভ করবে।
একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম খাইবারের ইহুদিদের কাছে অবস্থান করছিলেন। ইহুদিরা সেদিন পাথর ফেলে আল্লাহর রাসুলকে হত্যা করার চক্রান্ত করেছিল। তখন কে তাকে সেই জায়গা থেকে সরে পড়তে বলেছিলেন? আল্লাহ! তারা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাআলা নবিজিকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। এখানে 'মুহাইমিন' অর্থ-তাদের কথা তিনি জানতেন।
বদর যুদ্ধের পর উমাইর ইবনু ওয়াহব সাফওয়ান ইবনু উমাইয়ার সাথে বসে কথা বলছিল। উমাইর বলল, 'আমার মন চায়, আমি যদি মদিনায় গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করে তোমাদের মনে শান্তি দিতে পারতাম। যদি আমার ঋণ না থাকত এবং আমার সন্তানসন্ততির ওপর দারিদ্রের আশঙ্কা না করতাম, তাহলে তা-ই করতাম।' তার কথা শুনে সাফওয়ান বলল, 'তোমার ঋণের বোঝা যত বড়ই হোক, তা পরিশোধের দায়িত্ব আমার। আর তোমার সন্তান এখন থেকে আমার সন্তান। তুমি তোমার ইচ্ছা পূরণ করো।' তখন উমাইর তার তরবারিতে বিষ মাখিয়ে কাঁধে ঝোলাল। তারপর উট ছোটাল মদিনার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে তার সাথে উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর দেখা হলো। তিনি 'আল্লাহর শত্রু উমাইর' বলে হাঁক ছেড়ে তাকে তরবারির ফিতা দিয়ে বেঁধে ফেললেন। তারপর তাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে উপস্থিত করে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, এই যে আল্লাহর শত্রু উমাইর! সে মন্দ উদ্দেশ্যে এসেছে।'
নবিজি বললেন, 'উমার, তাকে ছেড়ে দাও।' উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ছেড়ে দিলেন। নবিজি উমাইরকে বললেন, 'উমাইর, আমার কাছে এসো।' উমাইর তার কাছে গেল। তিনি বললেন, 'আমাদের সালাম দাও।' উমাইর বলল, 'শুভ সকাল মুহাম্মাদ!' নবিজি বললেন, 'তুমি বলো, আসসালামু আলাইকুম!' উমাইর বলল, 'এটিই আমাদের সালাম।' নবিজি বললেন, 'আমাদের কাছে কেন এসেছ?' সে উত্তর দিল, 'আমার ভাইকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে এসেছি।' নবিজি বললেন, 'তোমার কাঁধে যে তরবারি?' সে বলল, 'এই তরবারি ধ্বংস হোক! বদরের দিন কি সে আমাদের কোনো উপকার করতে পেরেছে?' নবিজি উমাইরকে বললেন, 'তুমি কি সাফওয়ানকে বলোনি, যদি আমার ঋণ না থাকত এবং আমার সন্তানসন্ততির ওপর দারিদ্রের আশঙ্কা না করতাম, তাহলে মদিনায় গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করে তোমাদের শান্তি দিতাম।' নবিজির কথা শুনে উমাইর বিস্মিত হয়ে বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। অর্থাৎ সে ইসলাম গ্রহণ করল।[১]
আল্লাহ তাআলা 'মুহাইমিন'। তাই তিনি অতি গোপন এই পরামর্শের কথা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিয়েছেন।
একবার খাওলা বিনতু সালাবা রাযিয়াল্লাহু আনহা নবিজির কাছে অভিযোগ করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি যখন যুবতী ছিলাম, আত্মীয়স্বজন, অর্থ ও সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলাম, তখন অমুক ব্যক্তি আমাকে বিয়ে করেছিল। তাকে আমি অনেক সন্তান উপহার দিয়েছি। তারপর যখন আমি বার্ধ্যক্যে উপনীত হলাম এবং সন্তান জন্মদানে অক্ষম হলাম, তখন সে আমার সাথে যিহার করেছে। তার ঔরসে আমার কয়েকটি সন্তান রয়েছে। যদি আমি তাদেরকে তার কাছে রেখে আসি, তাহলে তারা নষ্ট হয়ে যাবে। আবার যদি আমার কাছে নিয়ে আসি, তাহলে ক্ষুধায় কষ্ট পাবে।' তখন নবিজি বললেন, 'আমার মনে হয় এতে তালাক হয়েছে।[২]
তোমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে।'
এই সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَسْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
(হে রাসুল!) আল্লাহ সেই নারীর কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর ব্যাপারে আপনার সাথে বাদানুবাদ করেছে এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা [১]
ইসলামের মহান ব্যক্তিত্ব উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খাওলা বিনতু সালাবা রাযিয়াল্লাহু আনহার পাশ দিয়ে যেতেন, তখন তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বাহন থেকে নেমে পড়তেন এবং মনোযোগ সহকারে তার কথা শুনতেন। একবার কেউ তাকে বলেছিল, 'আপনি আমিরুল মুমিনিন হয়ে এই মহিলার কথা এমন গুরুত্ব দিয়ে শোনেন?' তখন তিনি বলেছিলেন, 'কীভাবে না শুনে থাকি, আল্লাহ তাআলা সাত আসমানের ওপর থেকে তার কথা শুনেছেন!”[২]
এর থেকেও প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা 'মুহাইমিন'। তিনি সবকিছু শোনেন।
মুসা আলাইহিস সালাম ফিরাউনকে বলেছিলেন, 'আমি আল্লাহর রাসুল'। সে বলেছিল, 'আমি তোমাদের বড় রব'।[৩] ফিরাউনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সেসময়ে ফিরাউন ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ, তার সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য, তার সভ্যতা ছিল সবচেয়ে উন্নত সভ্যতা। মুসা আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে সব জাদুকরদের জড়ো করেছিল সে। তাদেরকে বহু উপহার-উপঢৌকনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। জাদুকররা মুসা আলাইহিস সালামের 'জাদু'কে ব্যর্থ করার দাবি করেছিল।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
قَالَ بَلْ أَلْقُوا فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى فَأَوْجَسَ فِي نفسه خِيفَةً مُوسَى قُلْنَا لَا تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا ) صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى
মুসা বলল, 'বরং তোমরাই নিক্ষেপ করো।' তাদের জাদুর প্রভাবে তার মনে হলো, তাদের রশি ও লাঠিগুলো ছুটোছুটি করছে। তখন মুসা তার মনে কিছুটা ভয় অনুভব করল। আমি বললাম, 'ভয় পেয়ো না, তুমিই বিজয়ী হবে। তোমার ডান হাতে যা আছে, তা নিক্ষেপ করো, (দেখবে) তারা যা কিছু তৈরি করেছে, এটা সেগুলোকে গিলে ফেলবে। তারা যা করেছে, তা তো কেবল জাদুকরের কৌশল। আর জাদুকর যেখানেই আসুক (জাদুবিদ্যায় যতই পারদর্শী হোক), সফল হবে না।[১]
ফিরাউনের বিরুদ্ধে জাদুকরদের সাথে মোকাবেলায় কে বিজয়ী হয়েছিল? মুসা আলাইহিস সালাম। আল্লাহ তাআলাই তাকে বিজয়ী করেছিলেন। তিনিই রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলাই সবকিছুর রক্ষাকারী; 'মুহাইমিন'।
এভাবে কুরআনুল কারিমের অনেক ঘটনার দ্বারাই প্রমাণিত হয় আল্লাহর 'মুহাইমিন' নাম; সবগুলো ঘটনা ও আয়াতই তাঁর অসীম জ্ঞান, সর্বময় ও চিরস্থায়ী ক্ষমতা, স্নেহ-ভালোবাসা, সুরক্ষা ও সত্যায়নের পরিচয় তুলে ধরে।
কাফিররা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্য বিশাল অগ্নিকুণ্ডের আয়োজন করেছিল। অনেকদিন যাবত লাকড়ি জোগাড় করেছিল। আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল কয়েক সপ্তাহ। অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানে ফেলার জন্য তাকে চড়িয়েছিল কপিকলে। তখন তারা ছিল ক্ষমতাশালী। তাদের হাতে ছিল সবকিছু। তারা বলছিল, 'আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে?' তারা কি জানে না, আল্লাহই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী'।
যখন তারা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে সেই অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করল, আল্লাহ তাআলা তিনটি শব্দ বললেন-
يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ
হে আগুন, ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।[১]
আগুন শুধু শীতল হলে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম শরীর জমে ঠান্ডায় মৃত্যুবরণ করতেন। সেজন্য আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'শীতল ও নিরাপদ'। তারপর বলেছেন, 'ইবরাহিমের জন্য'। যদি তিনি 'ইবরাহিমের জন্য' না বলতেন, তবে পৃথিবীতে কিয়ামত পর্যন্ত আগুনের জ্বালানোর ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যেত।
কাজেই প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা 'আল-মুহাইমিন'; রক্ষণাবেক্ষণকারী, রক্ষাকারী, সর্বময় জ্ঞানের অধিকারী।
এক্ষেত্রে মুসা আলাইহিস সালামের মায়ের ঘটনা আমরা দেখতে পারি। সন্তানের জন্য তিনি কী ত্যাগই না করেছিলেন! কলিজার টুকরো সন্তানকে বাক্সে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া কি কোনো মায়ের পক্ষে সম্ভব? কিন্তু তিনি আল্লাহর আদেশকে মেনে নিয়ে নির্দ্বিধায় এটা করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা তাকে দুটি আদেশ, দুটি নিষেধ এবং দুটি সুসংবাদ দান করেছিলেন-
وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ أُمِّ مُوسَىٰ أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ
আমি মুসার মায়ের কাছে আদেশ পাঠালাম, 'তাকে বুকের দুধ পান করাও। (তবে) যখন তার জন্য (বিপদের) আশঙ্কা করবে, তখন তাকে নদীতে ফেলে দিয়ো। ভয় পেয়ো না এবং দুঃখও কোরো না। আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে বানাব একজন রাসুল।[২]
'তাকে বুকের দুধ পান করাও' এবং 'তাকে নদীতে ফেলে দিয়ো'- এই দুটি আদেশ।
'ভয় পেয়ো না' এবং 'দুঃখও কোরো না' - এই দুটি নিষেধ।
'আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে একজন রাসুল বানাব।' এই দুটি সুসংবাদ।
তারপর কে সেই বাক্সটিকে ফিরাউনের তীরে ভাসিয়ে নিলেন? যিনি সবকিছু জানেন; সবকিছু পরিচালনা করেন। যখন বাক্স খোলা হলো, তখন কে ফিরাউনের স্ত্রীর হৃদয়ে ভালোবাসা ঢেলে দিলেন? আল্লাহ তাআলা। সুতরাং তিনিই 'মুহাইমিন'।
কুরআনুল কারিমে বর্ণিত প্রতিটি ঘটনাই আল্লাহ তাআলার সুন্দর নামগুলোকে প্রমাণ করে। ইউনুস আলাইহিস সালামের ঘটনা আমরা স্মরণ করতে পারি। দুনিয়াতে যত বিপর্যয়ই আসুক, পৃথিবীর বুকে যত বড় বিপদই হোক, আমি বিশ্বাস করি না যে, রাতের অমানিশায় সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে মাছের পেটের ঘোর আঁধারের চেয়ে বড় কোনো বিপদ থাকতে পারে।
ইউনুস আলাইহিস সালাম ছিলেন তিমি মাছের পেটে। তিমি মাছ যখন মুখ খোলে, তখন একবেলার খাবার হিসেবে প্রায় চার টন মাছ তার মুখে ঢুকে যায়। একটি তিমি মাছের গড় ওজন হয় প্রায় ১৫০ টন! ফলে তার পেটের আকার হয় একটি বড়সড় ঘরের মতো। ইউনুস আলাইহিস সালাম হঠাৎ নিজেকে রাতের আঁধারের মতো সমুদ্রের গভীরে তিমি মাছের পেটের অন্ধকারে আবিষ্কার করেন।
তিমি মাছের পেটে কি কোনো ফ্যাক্স, টেলিফোন কিংবা টেলিগ্রাম থাকে? এসবের কিছুই থাকে না। তিনি অন্ধকারের মাঝে আল্লাহকে ডেকেছিলেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে সেই কাহিনি-
وَذَا النُّونِ إِذ ذَّهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَن لَّن نَّقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَىٰ فِي الظُّلُمَاتِ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنَجِّي الْمُؤْمِنِينَ ﴿
যুন-নুন (ইউনুসের) কথাও স্মরণ করুন, যখন সে (নিজ সম্প্রদায়ের ওপর) ক্ষুব্ধ হয়ে চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল, আমি তার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তারপর সে অন্ধকারের মাঝে (আমাকে) ডাক দিয়ে বলেছিল, 'আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। নিশ্চয় আমি ছিলাম জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।' তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুরাবস্থা থেকে উদ্ধার করলাম। মুমিনদের আমি এভাবেই রক্ষা করি।[১]
এই ঘটনাও কি আপনার হৃদয় প্রশান্ত হয় না-যার শেষ হয়েছে মুমিনদের সুসংবাদ দিয়ে-'মুমিনদের আমি এভাবেই রক্ষা করি!'
যেকোনো যুগে, যেকোনো পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলাই 'মুহাইমিন'; রক্ষাকারী। আপনিও 'মুহাইমিনের' সাথে থাকুন; প্রশান্তির সাথে এগিয়ে চলুন জীবনের গতিপথে।
মায়ের কোলের ছোট্ট শিশুকে দেখুন; স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারে না। খাদ্যের সংস্থান ও শিক্ষার নিরাপত্তার জন্য বাবা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। সন্তান নিশ্চিন্তে বাবার কাছে তার নানা আবদার তুলে ধরে। বাবা তার আবদার পূরণের জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন। মানুষ যখন 'মুহাইমিনের' সাথে থাকে, তখন সে সবকিছু করতে সক্ষম হয়।
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম মুখে কোনো কথা বলেননি। তার ঘটনা যেন আমাদের বলে-
'একনিষ্ঠভাবে শুধু আল্লাহর কাছে চেয়ে যাও। তোমার চাওয়া হতে পারে দুনিয়ার কিংবা আখিরাতের কল্যাণ। কোনো কথা না বলে চুপ থাকার চেষ্টা করে যাও। দেখবে, আল্লাহ তোমার ডাকে সাড়া দিয়েছেন।'
তার মানে তিনি আমাদের না বলা কথাও শোনেন; মনের গোপন ইচ্ছাও জানেন।
إِذْ نَادَىٰ رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا
যখন সে (যাকারিয়া) তার রবকে ডেকেছিল গোপনে, নিভৃতে।খ
তার নিভৃতের ডাক সাত আসমান ভেদ করে পৌঁছে গিয়েছিল রবের সমীপে।
আল্লাহ তাআলা তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। কারণ তিনিই 'মুহাইমিন'।
হুনাইনের যুদ্ধে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লামের সেই সাহাবিরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন, যারা তার সাথে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। হুনাইনের দিন তারা মূলত মুখে কিছু বলেননি।
... وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ ...
আর হুনাইন যুদ্ধের দিনেও, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উল্লসিত করেছিল।[১]
তারা মনে মনে ভেবেছিলেন, আজ আমরা সংখ্যায় কম নই যে, পরাজিত হব। সাহাবিদের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার, সাথে ছিলেন স্বয়ং নবিজি। যুদ্ধটি হয়েছিল মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পরেই। অবস্থানগত দিক থেকে তারা সুবিধাজনক স্থানে ছিলেন। তারপরও-
فَلَمْ تُغْنِ عَنكُمْ شَيًْا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُم مُّدْبِرِينَ..
কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজেই আসেনি এবং জমিন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের কাছে সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল। তারপর তোমরা পিছু হটেছিলে।[২]
আল্লাহ তাআলাই 'আল-মুহাইমিন'; পর্যবেক্ষণকারী, রক্ষাকারী, সর্বজ্ঞানী। তিনি তাদের আত্মমুগ্ধতার কথা জানতেন। তাই তাদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের হৃদয়ের নিয়ন্ত্রণও আল্লাহর হাতে। তিনি হৃদয়ে ভয় সঞ্চারিত করেন, তিনিই প্রশান্তি ঢেলে দেন। তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই হৃদয় পরিবর্তন করেন।
হিজরতের সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাওর গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার সাথে ছিলেন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু। কাফিররা যখন গুহার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছিল, তখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, তারা তাদের পায়ের দিকে তাকালেই আমাদের দেখে ফেলবে।' তিনি বলেছিলেন, 'আবু বকর, এমন দুজনের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ?'[১]
দ্বিতীয়বারের অবস্থা ছিল আরও কঠিন। আবু বকর বললেন, 'তারা আমাকে নিশ্চিতভাবে দেখে ফেলেছে।' তাদের একজনের চোখ আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চোখে পড়েছে। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'আবু বকর, তুমি কি আল্লাহর এই বাণী পাঠ করোনি-
وَإِن تَدْعُوهُمْ إِلَى الْهُدَى لَا يَسْمَعُوا وَتَرَاهُمْ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ وَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ
আপনি যদি তাদেরকে হিদায়াতের পথে ডাকেন, তারা শোনে না। আর আপনি দেখবেন, তারা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তারা কিছুই দেখে না।[২]
আল্লাহ তাআলাই 'মুহাইমিন' (রক্ষাকারী)। সামান্য মাকড়সার জাল দিয়ে তিনি ইসলামের মহান দাওয়াতকে রক্ষা করেছেন।[৩]
এ-ও আল্লাহর কুদরত ও ক্ষমতার বড়ত্বের বহিঃপ্রকাশ যে, তিনি বড় ও মহান জিনিসকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ মাধ্যম দিয়ে রক্ষা করেন। কখনো তুচ্ছ কোনো মাধ্যম দ্বারা মানুষকে মৃত্যু দেন; কখনো বা হিফাজত করেন তুচ্ছ কোনো মাধ্যমের দ্বারা; যাতে আমাদের সামনে তাঁর কুদরত ও ক্ষমতার পূর্ণতা প্রকাশ পায়।
আহযাবের যুদ্ধে সমগ্র আরব উপদ্বীপ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একত্রিত হয়েছিল। ইহুদিরা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল; প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। ইসলামের ধ্বংস হয়ে দাঁড়িয়েছিল কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। এমন কি দুর্বল ঈমানের অধিকারী কেউ কেউ বলতে শুরু করেছিল, 'তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মাদ) আমাদের প্রতিশ্রুতি দেয় যে, আমাদের জন্য কিসরা ও কায়সারের সাম্রাজ্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। অথচ এখন আমরা নিরাপদে আমাদের প্রয়োজনও পূরণ করতে পারছি না'।[১]
আল্লাহ তাআলা তখন কাফিরদের ওপর প্রচণ্ড ঝড়োহাওয়া বইয়ে দিলেন। ঝড়ের ঝাপটায় তাদের আগুন নিভে গেল, তাবু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, হাড়িপাতিল উলটে পড়ল। যুদ্ধে মুমিনদের সাহায্য করার জন্য আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট। তিনিই 'মুহাইমিন'; রক্ষাকারী। সবকিছু তাঁরই হাতে। বাতাসের নিয়ন্ত্রণও তাঁরই হাতে। মহান আল্লাহ সত্য বলেছেন-
... وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ ...
আপনার রবের বাহিনী সম্পর্কে শুধু তিনিই জানেন।[২]
ঝড়ের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে; হৃদয়ের নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে। তিনিই হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার ঘটান; হৃদয় থেকে ভয় দূর করেন। সবকিছু তাঁরই হাতে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলযান আরএমএস টাইটানিক নির্মিত হয়েছিল ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে। জাহাজটি দুটি স্তরে নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে একটি স্তর ফুটো হয়ে গেলে অন্য স্তর জাহাজটিকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সেই জাহাজ কিছুতেই ডুববে না। জাহাজ নির্মাণের পর একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে জাহাজটি সাগরে ডুবে যাওয়া অসম্ভব বলে প্রচার করা হয়।
টাইটানিক ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসবহুল জাহাজ। বলা হয়, টাইটানিকের আসবাবপত্র, ধনসম্পদ ও সোনা-রুপার কারুকাজ ছিল বর্ণনাতীত। রেস্টুরেন্ট, হলরুম, অপেরা, বিলাসবহুল কেবিন, সুইমিংপুল; এককথায় বলা যায়, টাইটানিক ছিল একটি ভাসমান শহর। প্রথম ভ্রমণে টাইটানিকের যাত্রী হয়েছিল ইউরোপের সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ। বলা হয়, আরোহী নারীদের অংলকারের পরিমাণ ছিল কয়েকশ মিলিয়ন। সমুদ্রের মাঝে ডুবন্ত বরফের পাহাড়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে সেই জাহাজটি দুই টুকরো হয়ে গিয়েছিল।
যতদূর মনে পড়ে, একবছর আগে আমি আল-আরাবি ম্যাগাজিনে একটি প্রবন্ধে পড়েছি, গবেষক ও অনুসন্ধানকারীরা জাহাজটির ডুবে যাওয়ার স্থান খুঁজে পেয়েছে। টাইটানিকের সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত অবস্থার কয়েকটি ছবিও দেখেছি। সেসময় জনৈক যাজক মন্তব্য করেছিলেন, 'এই দুর্ঘটনা পৃথিবীর জন্য আসমানি শিক্ষা।'
একটি উন্নত দেশ আছে যারা নিজেদেরকে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করে। তারা কয়েক বছর আগে একটি মহাকাশযান তৈরি করেছিল। তাতে থাকবে সাতজন নভোচারী। তারা মহাকাশযানটির নাম দিয়েছিল 'চ্যালেঞ্জার'। কিন্তু উৎক্ষেপণের সত্তর সেকেন্ড পর মহাকাশযানটি অগ্নিগোলকে পরিণত হয়।
তাহলে 'মুহাইমিন'; রক্ষাকারী কে? তারা কি কাউন্টডাউন করেনি? সমস্ত যন্ত্রাংশ সঠিকভাবে স্থাপন করেনি? কে মুহাইমিন? আপনিও মুহাইমিনের সাথে থাকুন; নিরাপদ জীবন যাপন করুন।
আমার এক বন্ধু আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়েছিল। সে একবার সিরিয়ার দামেশকের এক প্রান্তে একটি ফার্মে গিয়েছিল। ফার্মে দুটি অংশ ছিল সহোদর দুই ভাইয়ের। এক ভাইয়ের ফসল আশ্চর্যজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। অপর ভাইয়ের ফসলের বর্ধন ছিল অতি সামান্য। আমার বন্ধুটি প্রথম জনের কাছে গিয়ে বলল, 'তোমার বাগান এমন কেন?' সে বলল, 'আল্লাহর শপথ, আমার ভাই যেভাবে বাগানের দেখাশোনা করে, আমি ঠিক সেভাবেই দেখাশোনা করি। এমনকি একই চাষী উভয় বাগানে কাজ করে।' তাহলে রহস্য কী? সে বলল, 'আমার আরেক ভাই কিছুদিন পূর্বে মারা গেছে। তার কয়েকজন এতিম সন্তান আছে। আমি মনে মনে ঠিক করেছিলাম, এই বাগানে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক তাদেরকে দিয়ে দেব। কিন্তু দ্বিতীয় ভাই এমন কোনো নিয়ত করেনি।
এই ঘটনাটিও প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা এই মালিকের নিয়ত সম্পর্কে জানতেন। তাই তার ফসল দ্বিগুণ করে দিয়েছেন। অপরজনের নিয়তও জানতেন। তাই তার ফসল কমিয়ে দিয়েছেন।
আরেকজন বন্ধু আমাকে দামেশকের এক অঞ্চলের কয়েকটি খামারের ঘটনা শুনিয়েছিলেন। এক রাখাল একপাল মেষ নিয়ে সেই খামারগুলোতে আসত পানি পান করানোর জন্য। সব খামারিই রাখালকে তাড়িয়ে দিত। শুধু একটি খামার ছিল, যেখানে রাখালকে স্বাগত জানানো হতো এবং মেষপালকে সন্তুষ্টচিত্তে পানি পান করানো হতো। সেই অঞ্চলের একলোক আমাকে আল্লাহর শপথ করে বলেছিল, 'সেই খামারের কূপ ছাড়া অন্য সাতটি কূপের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। সেই খামারের মালিক শুধু যে রাখালদের অনুমতি দিয়েছিল তাই নয়, বরং সে কয়েকটি চৌবাচ্চা বানিয়ে দিয়েছিল, যাতে মেষপাল স্বচ্ছন্দে পানি পান করতে পারে।'
পানির উৎসারণ আল্লাহর হাতে। চ্যালেঞ্জার ও টাইটানিকের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে। মেঘের পরিচালনা তাঁর হাতে, জলযানের ভেসে থাকা তাঁর হাতে, তিমি মাছের জীবনও তাঁর হাতে। সমগ্র বিশ্বের সবকিছুই তাঁর হাতে।
কখনো মানুষ কোনো কোনো স্থানে নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। হয়তো সে দুর্গম কোনো জায়গায় গেল, যেখানে অজগর সাপের আনাগোনা রয়েছে। সেই মানুষটি হয়তো দেখবে, অজগর এক জায়গায় ঠায় বসে আছে, কোনো নড়াচড়া নেই, তাকে আক্রমণও করছে না।
কখনো কয়েকদিনের ভুখা ক্ষ্যাপা কুকুর দেখবেন, যে কোনো আল্লাহভীরু পুণ্যবান মানুষের সামনে পড়লে পোষা কুকুরের মতো চুপচাপ বসে থাকে। সুতরাং মুহাইমিন কে? আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ
আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক।[১]
আল্লাহই নিয়ন্ত্রণকারী। তাঁর সমস্ত সৃষ্টির ওপর তিনিই কর্তৃত্ববান। কোনো জিনিস এমন নেই যে, তিনি তা সৃষ্টি করে ছেড়ে দিয়েছেন। এজন্যই তিনি তাঁর পবিত্র কালামে বলেছেন, 'আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক'।[২]
দামেশকের এক মার্কেটে একবার আগুন লেগেছিল। অধিকাংশ দোকানের সবকিছু পুড়ে গিয়েছিল। শুধু একটি দোকান ছিল অক্ষত। সেই দোকান পর্যন্ত এসে আগুন নিভে গিয়েছিল। কারণ আগুনের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে।
৫০ বছর আগে আমাদের দেশে একবার পঙ্গপাল এসেছিল। কাঁচাপাকা সব ধরনের ফসল খেয়ে ফেলেছিল। খামারিদের দেখাশোনা ও পঙ্গপালের বিষয়ে দায়িত্বশীল এক ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন, 'পঙ্গপালের আক্রমণে গাছপালার ছালবাকল পর্যন্ত ছিল না। পঙ্গপাল গাছের ফল, পাতা, বাকল; সব খেয়ে ফেলেছিল। কিন্তু হঠাৎ একটি বাগান দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন জান্নাতের বাগান। বাগানে ঢুকে আমরা বাগানের মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, 'এমন হলো কী করে?' সে বলল, 'আমি বিশেষ ঔষধ ব্যবহার করি।' তার উত্তর শুনে আমরা রেগে গেলাম। তার কাছে পঙ্গপাল তাড়ানোর ঔষধ আছে, অথচ মুসলিম ভাইদের দিচ্ছে না! সে বলল, 'জনাব, তারা এই ঔষধ ব্যবহার করে না। আমার সেই ঔষধ হলো যাকাত। আমি এ বাগানের (উৎপাদিত ফসলের) যাকাত দিই।'
এই দৃষ্টান্তগুলো মানুষের জীবন থেকে নেওয়া। বিশ্বজগতের শত-সহস্র, নিযুত-কোটি বিষয়; সবকিছু আল্লাহর হাতে। সুতরাং আল্লাহ তাআলাকে 'মুহাইমিন' হিসেবে জানা জ্ঞান ও গৌরবের।
যখন আপনি তাকে 'মুহাইমিন' হিসেবে জানবেন, তখন তিনি ছাড়া অন্য কারও কাছে কোনো আশা-প্রত্যাশা থাকবে না। আপনি অন্য কারও মাধ্যম গ্রহণ করবেন না। আপনি তাঁর কাছে হবেন চূড়ান্ত বিনয়ী, অবনত, মুখাপেক্ষী। আপনি থাকবেন পরিপূর্ণ নিরাপদ।
পক্ষান্তরে আপনি যদি তাঁকে 'মুহাইমিন' রূপে না জানেন; যদি মনে করেন, কোনো মানুষ 'মুহাইমিন', তাহলে আপনি তার সামনে হয়ে যাবেন ছোট্ট শিশুর মতো। আপনি তার সামনে নত হতেই থাকবেন, সেও আপনাকে অপদস্থ করতেই থাকবে, পায়ের নিচে পিষতে থাকবে।
মনে করুন, কারও হৃদরোগ হয়েছে। চিকিৎসকগণ একমত হয়েছেন, বিদেশে নিয়ে অস্ত্রপাচার করতেই হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্ট্রেচারে শুয়ে আছে সে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। সে বলছে, 'হে রব, এই হৃৎপিণ্ড আপনিই সৃষ্টি করেছেন। রব, আপনার কাছে আমার আবেদন, অপারেশন যেন করতে না হয়।' অপারেশনের পূর্বে চেকআপ করে দেখা গেল, সবকিছু স্বাভাবিক!
ঠিক এমনই এক ঘটনা ঘটেছে ১২ বছর পূর্বে সিরিয়ার দামেশক শহরে। এখন পর্যন্ত সে সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। শিরার ব্লক কে খুলে দিল? কার হাতে শিরা বন্ধ করার কিংবা খুলে দেওয়ার ক্ষমতা? আল্লাহ আপনার হৃৎপিণ্ডের রক্ষাকারী 'মুহাইমিন'।
কিডনির কার্যক্রম হঠাৎ থেমে যায়। কেন থেমে যায়? কে থামিয়ে দেন? কে আবার সচল করেন?
আল্লাহ তাআলা! তিনিই 'মুহাইমিন'। হৃৎপিণ্ড, কিডনি, শিরা-উপশিরা, ধমনি, পাকস্থলী, পেশি, কানের বৃত্তাকার নালি, কান, চোখ, জিহ্বা; মানুষের প্রতিটি অঙ্গের নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে।
এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاءُ وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
বলুন, সার্বভৌম রাজত্বের অধিকারী হে আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন। যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন এবং যাকে চান সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। যাবতীয় কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয় আপনি সব বিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান।[১]
কে সেই সত্তা, যিনি হাড়ের মধ্যকার কোষকে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির হাত থেকে রক্ষা করেন? আল্লাহ তাআলা!
একজন পূর্ণ সুস্থ ও সবল মানুষ; যার খাদ্যাভাস সুষম, শরীরচর্চাও করেন, নড়াচড়াও করেন, হঠাৎ এমন একজন মানুষের দেহের বহিরাংশে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা দেয়। কেন?
দেহের অস্থিকোষের নিয়ন্ত্রণকারী কে? কে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কিংবা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখেন? আল্লাহ তাআলা।
এমনকি স্ত্রীর মনমানসিকতাও আল্লাহর হাতে। শাইখ শারানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর আচরণ দেখে জানতে পারি, আল্লাহর কাছে আমার অবস্থান কেমন।’ [১]
কোনোদিন তাকে মনে হয়, যেন আসমানের ফেরেশতা। আবার কখনো কখনো সেই অশুভ সময়ের কথা ভাবি, যখন তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। তার হৃদয় কোমল হওয়া কিংবা কঠোর হওয়া আল্লাহর হাতে। তাকে অনুগত করার কিংবা অবাধ্য করার ক্ষমতা তাঁরই হাতে। এমনকি সন্তানসন্ততির বিষয়ও একই।
আপনার ক্রেতা, ব্যবসা, নির্বাচনী নেতা, অনুসৃত ব্যক্তিবর্গ সবাই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। আপনার গাড়ির প্রশংসা করতে গিয়ে যদি নির্মাতার প্রশংসা করেন এবং আল্লাহকে ভুলে যান, হতে পারে, প্রশংসা করতে করতেই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হবেন। আপনার যানবাহনের নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে। সংক্রামক ব্যাধির ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেই।’[২]
কিন্তু আমরা দেখতে পাই, এমন অনেক রোগব্যাধি রয়েছে, যেগুলো সংক্রমিত হয়। তাহলে এই হাদিসের অর্থ কী?
এর অর্থ হলো, সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে, সেই ব্যাধিকে মানুষের সাথে সম্পর্কিত করা যাবে না; বরং আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জীবাণুকে সংক্রমিত হওয়ার অনুমতি দেন, শুধু তখনই সেই জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে। তিনি অনুমতি না দিলে, কিছুতেই সংক্রমিত হতে পারে না।
এসব জ্ঞানগত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। বাকি রইল সর্বশেষ প্রায়োগিক বিষয়।
আমরা যদি নিজেদের আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করতে চাই, তাহলে নিজের নফস সম্পর্কে, নফসের অবস্থা সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। জানতে হবে, নফস সুস্থ না অসুস্থ; নফসে কোনো বক্রতা, অহংকার, আত্মমুগ্ধতা, ধোঁকা কিংবা সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা রয়েছে কিনা। আল্লাহর প্রতি তার ঈমান কি যথেষ্ট নাকি যথেষ্ট নয়? জানতে হবে, তার আয় ও ব্যয়ের খাত, অন্যের সাথে তার আচরণ ও উচ্চারণ।
'মুহাইমিন'-এর প্রকৃত বান্দা হতে হলে আপনাকে জানতে হবে, আল্লাহর কাছে আপনার অবস্থান দুর্বল নাকি সবল, ভালো নাকি মন্দ। আপনার উপার্জনে কোনো সন্দেহ রয়েছে কিনা, সম্পর্কে কোনো হারামের মিশ্রণ রয়েছে কিনা, অন্যের হক আদায়ে ত্রুটি রয়েছে কিনা। আপনাকে জানতে হবে সব। আর জানার জন্য আপনাকে জ্ঞানের মজলিসে যেতে হবে। কারণ জ্ঞান অর্জন হয় (শিক্ষাগ্রহণের) মাধ্যমে।
প্রিয় ভাই, আপনাকে জানতে হবে- কোনটি হারাম, কোনটি হালাল; কোনটি জায়িয, কোনটি নাজায়িয; কোনটি নিন্দনীয়, কোন গুণ প্রশংসনীয়। জ্ঞানের মজলিসে উপস্থিত হলে আপনি এসব জানতে পারবেন। জ্ঞান অর্জন করলে আপনি 'আল-মুহাইমিন' নামের এক-তৃতীয়াংশের হক আদায় করতে পারবেন।
এখন আপনাকে আত্মার পরিশুদ্ধির চেষ্টায় নিয়োজিত হতে হবে। নিয়োজিত হতে হবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখার সাধনায়, হৃদয়কে আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে পবিত্র করার সাধনায়। চিন্তাকে পবিত্র করতে হবে ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস, ধারণা ও মিথ্যা কল্পকথা থেকে।
আল্লাহ আপনার হৃদয়ের পর্যবেক্ষণ করবেন, হৃদয়ের অলিগলির সুপ্ত কথাও তিনি জানবেন, তাঁর গুণাবলিকে আপনার মাঝে স্থাপিত করবেন, আপনার মাঝে সংরক্ষণ করবেন। কারণ আমাদের আখলাক ও আচরণের মাঝে পালাক্রমে পরিবর্তন ঘটে। জুমার দিনে আমাদের অবস্থা থাকে সন্তোষজনক। তারপর শনিবারে আমাদের আখলাক নষ্ট হয়ে যায়। রবিবারে আমরা সালাত ত্যাগ করি। তারপর আবার জুমার দিন আসতে আসতে আমরা আল্লাহর গুণাবলি বাদ দিয়ে ভিন্ন কিছুতে পরিণত হই।
আপনাকে নিজের অবস্থা জানতে হবে, নিজের কর্মকাণ্ড সংশোধন করতে হবে, নিজেকে অবিচল রাখতে হবে সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সত্য-সরল পথে। কারণ আপনি আল্লাহকে জ্ঞানার্জন, আত্মসংশোধন ও অবিচলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে এর চেয়ে উঁচু স্তর হলো, মানুষকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান করবেন, মুসলিম ভাইদের অবস্থা জেনে সংশোধনের চেষ্টা করবেন, তাদের সাথে আচরণের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন এবং নিজেকে সংশোধন করবেন।
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَنفَالِ قُلِ الْأَنفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ ۖ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴿١﴾
তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, 'তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো [১]।
উপরিউক্ত আয়াতের অর্থও নিজেকে সংশোধন করুন। কিন্তু যদি আপনি নিজের অসুস্থতা না জানেন, নিজের ত্রুটিবিচ্যুতি না বুঝেন, হৃদয়ের অপবিত্রতা ও অসুবিধা সম্পর্কে অজ্ঞ হন, তাহলে নিজেকে কীভাবে সংশোধন করবেন?
তাই জানা হলো মূলভিত্তি। জানতে হলে ইলম অর্জন করতে হবে। সংশোধন করতে হলে সান্নিধ্য গ্রহণ করতে হবে। অবিচল থাকতে হলে সত্যকে আঁকড়ে ধরতে হবে। তাহলে আপনি 'আল-মুহাইমিনের' গুণে গুণান্বিত হতে পারবেন।
তারপর আল্লাহ তাআলা যেহেতু আপনাকে সবসময় পর্যবেক্ষণ করছেন, সেহেতু আপনার করণীয় কী?
'আল-মুহাইমিন' নামকে জীবনে বাস্তবায়নের অন্যতম পদ্ধতি হলো, আল্লাহর ব্যাপারে লজ্জাশীল থাকতে হবে। আল্লাহ 'আল-মুহাইমিন' (সর্বদা পর্যবেক্ষণকারী), তাই তাঁর প্রতি লজ্জাশীল হতে হবে।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا ﴿١﴾
হে লোক সকল, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো; যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকেই সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে।
আর তাদের থেকে বহু নরনারী পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহকে ভয় করো, যার অসিলা দিয়ে তোমরা একে অন্যের কাছে (নিজেদের হক) চেয়ে থাকো। আর সতর্ক হও আত্মীয়তা রক্ষার বিষয়ে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের পর্যবেক্ষণ করছেন [১]
তিনি সর্বশক্তিমান, তাই তাঁর ওপর ভরসা করতে হবে। তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তাই ভবিষ্যতের ব্যাপারে আস্থা রাখতে হবে।
لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَالٍ *
মানুষের জন্য তার সামনে ও পেছনে থাকে একের পর এক আগমনকারী ফেরেশতাগণ; তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। কোনো সম্প্রদায়কে যদি আল্লাহ বিপদ দিতে চান, তাহলে কেউ তা ফেরাতে পারে না। তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক নেই।[২]।
সুতরাং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ পরিবর্তন না করবেন, ততক্ষণ কিছুই পরিবর্তিত হবে না। যতক্ষণ আপনি তার আনুগত্যে অবিচল থাকবেন, ততক্ষণ আপনি উত্তরোত্তর কল্যাণ লাভ করবেন; এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উন্নীত হবেন, আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা উন্নত হতে থাকবে।

টিকাঃ
[১] সুরা নূর, আয়াত: ৪৪
[২] সুরা আলি-ইমরান: ১৪০
[৩] সহিহ মুসলিম: ১৩৪২; জামিউত তিরমিযি: ৩৪৩৯; মুআত্তা মালিক: ৩৪; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক: ৯২৩২; মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা: ২৯৬০৬; মুসনাদ আহমাদ: ২০৭৮১
[১] সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৬
[১] সূরা কাহফ, আয়াত: ২৬
[২] সূরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৮৯
[১] সহিহুল বুখারি: ২৭৩৬; সহিহ মুসলিম: ২৬৭৭; জামিউত তিরমিযি: ৩৫০৬
[২] মুতাওয়াতির হাদিস বলা হয়, অবিচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত সহিহ হাদিসকে।
[৩] এটিকে হাদিস বলে প্রচার করা হলেও এটি মূলত কোনো হাদিস নয়। ইমাম ইবনুল রাহিমাহুল্লাহসহ গ্রহণযোগ্য আলিমগণ এই মত ব্যক্ত করেছেন। দেখুন: মাদারিজস সালিকিন, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২২৬, ২২৭; যেসব গ্রন্থে এটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে এর সনদ উল্লেখ করা হয়নি।
[১] সহিহুল বুখারি : ৫৯৯৯; সহিহ মুসলিম: ২৭৫৪; শারহুস সুন্নাহ: ৪১৮২; মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৩৭০
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৬৪
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৬
[১] সুরা বাকারা, আয়াত: ২২১
[২] সুরা কসাস, আয়াত: ৮৩
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ৪৩-৪৪
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ৪৫-৪৮
[১] আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ১১৭; মারিফাতুস সাহাবাহ: ৫২৬৭; উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ: ৪০৯৬; মাগাযি, ওয়াকিদি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা ১২৬; বর্ণনাটি সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে এসেছে। এছাড়া হাদিসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোতে এটি পাওয়া যায়নি।
[২] স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বলে, তুমি আমার মায়ের মতো অথবা বোনের মতো, কিংবা তোমার অমুক অভঙ্গটি তাদের অঙ্গের মতো, তাহলে শরিয়তের ভাষায় একে বলা হয় 'যিহার'। যদি স্বামী এমনটা বলে, তবে তার জন্য স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক করা বৈধ নয়, যতক্ষণ না সে নিচের ৩টি কাফফারার কোনো একটি আদায় করে-এক. একটি দাস মুক্ত করা। দুই. দুই মাস ধরে সিয়াম রাখা। তিন. ৬০ জন গরিব লোককে দই বেলা খাবার খাওয়ানো। দেখুন-সুরা মুজাদালাহ, আয়াত: ৩-৪
[১] সুরা মুজাদালাহ, আয়াত: ১
[২] তাফসিরুল কুরতুবি, খণ্ড: ১৭, পৃষ্ঠা: ২৬৯; ফাতহুল বায়ান ফি মাকাসিদিল কুরআন, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১০; আল-লুবাব ফি উলুমিল কিতাব, খণ্ড: ১৮, পৃষ্ঠা: ৫১৪
[৩] সুরা নাযিয়াত, আয়াত: ২৪
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ৬৬-৬৯
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৬৯; শব্দ তিনটি হলো-এক. শীতল। দুই. নিরাপদ। তিন. ইবরাহিমের জন্য।
[২] সুরা কাসাস, আয়াত: ৭।
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭-৮৮
[১] সুরা তাওবা, আয়াত: ২৫
[২] সুরা তাওবা, আয়াত: ২৫
[১] সহিহ্বল বুখারি: ৪৬৬৩; সহিহ মুসলিম: ২৩৮১; জামিউত তিরমিযি : ৩০৯৬
[২] সুরা আরাফ, আয়াত: ১৯৮
[৩] সাওর গৃহায় অবস্থানকালে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা মাকড়সার জালের মাধ্যমে কাফিরদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছিলেন।
[১] সিরাত ইবনি হিশাম, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৭৩-১৭৪; দারুল কিতাব আল-আরাবি।
[২] সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত: ৩১
[১] সুরা যুমার, আয়াত: ৬২
[২] সুরা যুমার, আয়াত: ৬২
[১] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ২৬
[১] শারানি রাহিমাহুল্লাহর এমন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্যসূত্রে পাওয়া যায়নি। তবে ফুজাইল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ থেকে কাছাকাছি একটি বাণী পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমি যখন আল্লাহর অবাধ্য হই, তখন এর কুপ্রভাব আমার বাহন, সেবক ও স্ত্রীর মাঝে দেখতে পাই। [দেখুন-আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা: ২১৫]
[২] সহিহুল বুখারি: ৫৭0৭, ৫৭17; সহিহ মুসলিম: ২২২০; জামিউত তিরমিযি: ১৬15; সুনানু আবি দাউদ: ৩৯১১
[১] সুরা আনফাল, আয়াত : ১
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১
[২] সুরা রাদ, আয়াত: ১১

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আত-তাওয়াব : التَّوَّابُ

📄 আত-তাওয়াব : التَّوَّابُ


মনে করুন, আপনি একটি স্কুল বানালেন। বেশ কিছু ছাত্র ভর্তি হলো। চমৎকার সব নিয়মকানুন চালু করলেন। আপনি সেখানে লেকচার দেন। ছাত্ররা পড়া মুখস্থ করে। দেখতে দেখতে ঘনিয়ে আসে পরীক্ষার সময়। যথাসময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ফলাফল প্রকাশের সময় দেখা গেল মনোযোগী ও পরিশ্রমী ছাত্ররা পাস করেছে আর অলস ও অমনোযোগীরা ফেইল করেছে।
আপনি একজন ন্যায়পরায়ণ প্রতিষ্ঠাতা। একমাস পর নতুন বছরের শুরুতে ছাত্রদের ফলাফল দেখেন। তখন ফেইল করা ছাত্রটিকে আলাদা করেন, তাকে ডেকে এনে উপদেশ দেন। তারপরও সে মনোযোগী হলো না। এবার তাকে ধমক দেন, অভিভাবক ডেকে এনে চাপ দেন পড়ালেখার জন্য। অবশেষে তার মধ্যে পরিবর্তন আসে। সে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে শুরু করে। একপর্যায়ে সে-ও সফলদের মাঝে জায়গা করে নেয়।
যদি এই অমনোযোগী ছাত্রটিকে ছেড়ে দিতেন, তার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী আচরণ করতেন, তাহলে আপনি ন্যায়পরায়ণতার সর্বোচ্চ পর্যায়েই থাকতেন। কিন্তু যখন আপনি সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই খোঁজখবর নিয়ে তাকে উপদেশ দিলেন, তার ওপর চাপ দিলেন; এর ফলে সে নিজেকে শুধরে নিয়ে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে শুরু করল এবং সফল হলো, তখন কিন্তু আপনি দয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হলেন।
ন্যায়সংগত নিয়ম প্রয়োগ করলে আপনি ন্যায়পরায়ণতার শীর্ষে অবস্থান করবেন। কিন্তু খোঁজখবর নিয়ে, কখনো উপদেশ ও উৎসাহ দিয়ে, কখনো ধমক ও শাস্তি দিয়ে যদি তাকে শোধরানোর সুযোগ দেন এবং এতে সে সফল হয়, তাহলে এর মাধ্যমে আপনি সর্বোচ্চ দয়া দেখালেন।
ধরুন, আপনার ছেলেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠালেন। তার পেছনে খরচ করলেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। কিন্তু তেমন খোঁজখবর নিলেন না তার। ৫ বছর পর দেখা গেল, সে আপনার কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করেছে নিজের প্রবৃত্তির পেছনে। কোনো পড়াশোনাই সে করেনি। ৫ বছর পর পালিয়ে এসেছে মুখে চুনকালি মেখে। এখন যদি আপনি তাকে বলেন, 'আমি তোমার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেছি। অথচ তুমি সবকিছু জলে ফেলেছ!' তাহলে আপনি ন্যায়সংগত আচরণই করবেন।
অপরদিকে যদি তার খোঁজখবর নিয়ে-কখনো তার কাছে গিয়ে, কখনো ডেকে পাঠিয়ে; কখনো হাতখরচ কম পাঠিয়ে, ধমক দিয়ে; কখনো উৎসাহ বাড়িয়ে, সাহস জুগিয়ে আবার লেখাপড়া করান এবং অবশেষে ৪ বছর পর সে ডিগ্রির সার্টিফিকেট নিয়ে বাড়িতে ফেরে, তাহলে আপনি তার সাথে সর্বোচ্চ দয়ার আচরণ করলেন।
৬ মাস মেয়াদি কোনো ইন্টার্ন কর্মকর্তাকে আপনি সহযোগিতা করতে পারেন। শুধু পর্যবেক্ষণে রেখে রেকর্ড করতে পারেন তার ভুলগুলো। একপর্যায়ে যখন তার ভুলের পরিমাণ বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে যাবে, তখন স্বচ্ছন্দে তাকে বরখাস্ত করতে পারেন। কারণ ইন্টার্নির ৬ মাসের মধ্যেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এমনটি যদি করেন, তাহলে তার সাথে ন্যায়সংগত আচরণই হবে। কারণ তাকে ৬ মাসের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু যদি এই কর্মকর্তার সাথে দয়ার আচরণ করতে চান, তাহলে যখনই সে ভুল করবে, তখনই তাকে বলবেন, 'এটা ওভাবে নয়, এভাবে করুন।' তাতে সে ধীরে ধীরে নিজেকে শুধরে নিতে পারবে। কিছুদিন পর তাকে আপনার ভালো লাগতে শুরু করবে। আপনি তাকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেবেন।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে দিয়েছেন বিবেক। পুরো বিশ্বজগৎকে তিনি তাঁর দয়ার নিদর্শনরূপে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে বিবেক দিয়েছেন, প্রদান করেছেন স্বভাবজাত দ্বীন ও শরিয়ত। প্রবৃত্তির চাহিদা দিয়ে ইচ্ছাধিকার দান করেছেন। তারপর শক্তি দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এখন যদি মানুষ জাহান্নামবাসী হয়, তাহলে আমরা বলব, 'আল্লাহ তার সাথে ন্যায়ের আচরণ করেছেন।'
কিন্তু এই মানুষটি যদি যৌবনের শুরুতে অন্যায় ও অসৎকাজে লিপ্ত হয়, তারপর আল্লাহ তাকে শিক্ষা দেন; কখনো ভীতি প্রদর্শন করেন, জীবনকে সংকীর্ণ করে দেন; কখনো নেককার বান্দাদের সান্নিধ্য দান করেন, তার হৃদয় উন্মুক্ত করে দেন; এই মানুষটিই হয়তো ভালো হয়ে যাবে। অবশেষে সে হয়ে যাবে জান্নাতের বাসিন্দা। এক্ষেত্রে আল্লাহ তার সাথে কী আচরণ করলেন? দয়ার আচরণ!
আল্লাহ তাআলার একটি গুণবাচক নাম 'আত-তাওয়াব' (التَّوَّاب)। এই নামটি আমরা কীভাবে বুঝব? নামটি আমরা বুঝব আল্লাহর অফুরন্ত দয়ার আলোকে। তিনি আমাদের বিবেক দিয়েছেন, দান করেছেন ইচ্ছাধিকার; আমাদের মধ্যে প্রবৃত্তির চাহিদাও দিয়েছেন। পুরো বিশ্বজগৎকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর নাম ও গুণাবলির নিদর্শনরূপে। তারপর আমাদের শক্তি দিয়েছেন এবং আমাদের মধ্যে প্রদান করেছেন সুউচ্চ স্বভাব-ধর্ম। সবশেষে ঘোষণা দিয়েছেন-
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ
যে সৎকাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই করে; আর যে মন্দকাজ করে, তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না [১]
মূলত এই ঘোষণা হলো ন্যায়পরায়ণতা। কিন্তু তারপরই রয়েছে তাঁর অফুরন্ত দয়া। আপনার বিপদাপদে, ওঠাবসায়, জল্পনা-কল্পনায়, আশা-আকাঙ্ক্ষায়, গোপনে-প্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলা আপনার সাথেই থাকেন। আপনার ব্যক্তিগত প্রতিটি বিষয় তাঁর সাথে সম্পৃক্ত। প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহ আপনাকে কিছু শিক্ষা দেন।
যদি আপনি তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে তিনি আপনাকে ফিরে আসার শিক্ষা দেন। যদি তাঁর অভিমুখী হন, তাহলে আপনাকে তাঁর আলোয় আলোকিত করেন। আর যদি সীমালঙ্ঘন করেন, তাহলে শাস্তি দেবেন। যদি সদাচার করেন, তাহলে সম্মানিত করবেন।
আপনার চারপাশে যারা রয়েছে, তাদের দৈনন্দিন খোঁজখবর নেওয়া ছাড়া আপনি কখনো দয়াশীল হতে পারবেন না। এমনকি আল্লাহর প্রতি দাওয়াহর ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমন।
যারা ইসলামের জ্ঞান শিক্ষা দেন, তাদের মধ্যেও দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছেন। তারা হলেন-এক. মুআল্লিম বা শিক্ষক। দুই. মুরব্বি বা পথপ্রদর্শক।[১]
মুআল্লিম কেবল পাঠদান করেই তার দায়িত্ব শেষ করেন। কে পরিশ্রমী, কে পড়া বুঝল, কে পড়া শিখল বা শিখল না, কে পিছিয়ে পড়ল কিংবা এগিয়ে গেল, কে উপস্থিত-অনুপস্থিত-তা নিয়ে তিনি ভাবেন না। পাঠদান পর্যন্তই তার দায়িত্ব শেষ। শিক্ষাক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিকে বলা হয় মুআল্লিম বা শিক্ষক। কিন্তু মুরব্বি বা পথপ্রদর্শকের ব্যাপারটি ভিন্ন। তিনি শ্রেণিকক্ষের বাইরেও খোঁজখবর রাখেন।
আমাকে একজন বলেছিল, আপনি আমাদের শরিয়ত, তরিকত ও হাকিকতের জ্ঞানের কথা বলেন। শরিয়ত ও তরিকতের জ্ঞানের পার্থক্য আমার কাছে একদম স্পষ্ট। কিন্তু তরিকত ও হাকিকতের জ্ঞানের পার্থক্য পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
আমি তরিকত ও হাকিকতের জ্ঞানের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনুভব করলাম, পার্থক্যটি বেশ সূক্ষ্ম। তখন আমার মনে চমৎকার একটি উদাহরণ এল। তাকে বললাম, 'মনে করুন, বিশাল বড় একটি পাহাড় দেখা যাচ্ছে। যাতে রয়েছে বেশ কিছু টিলা, উপত্যকা ও চলার পথ। পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে রাজকীয় এক প্রাসাদ। মানুষের মন যা কিছু কামনা করে, সবই সেখানে বিদ্যমান।
এবার ৩ শ্রেণির আলিমের কথা ধরুন। যাদের মধ্যে একজন আপনার কাছে বর্ণনা করবেন—প্রাসাদটিতে ৩০০টি রুম আছে, সেন্ট্রাল হিটিং ও এয়ারকন্ডিশনিং ব্যবস্থা আছে; আছে নানা পদের বাহারি খাবার, মনোরম বাগান ও বিলাসবহুল স্লিপিং রুম। তিনি শুধু আপনাকে প্রাসাদের বিবরণ জানাবেন। কিন্তু তিনি হয়তো হাত ধরে আপনাকে সেখানে পৌঁছাবেন না কিংবা রাস্তাটা পুরোপুরি দেখিয়ে দেবেন না। এ শ্রেণির আলিম হলেন শরিয়তের আলিম। তিনি আপনাকে কেবল বলবেন, প্রাসাদে রুম হিটার রয়েছে; অথচ আপনার তখন শীত লাগছে, উন্নতার প্রয়োজন। তিনি বলবেন, সেখানে সুস্বাদু খাবার আছে, সম্পূর্ণ আরামের ব্যবস্থা রয়েছে; অথচ আপনি তখন ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত।
অপরদিকে তরিকতের আলিম প্রাসাদে যাওয়ার একটি রাস্তা জানেন। তিনি জানেন কোন রাস্তায় গেলে, কোন বাহনে চড়লে প্রাসাদে পৌঁছতে পারবেন, মাঝপথে বাধা এলে কীভাবে প্রতিহত করবেন। তিনি আপনাকে সেখানে পৌঁছানোর পথ বলে দেবেন ঠিক, কিন্তু হাত ধরে সেখানে পৌঁছে দেবেন না। ফলে আপনি তখন নিজ জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকবেন।
অপরদিকে হাকিকতের আলিম আপনাকে হাতে ধরে সেই প্রাসাদে প্রবেশ করিয়ে দেবেন।
যিনি আপনার কাছে প্রাসাদের বিবরণ তুলে ধরবেন, তিনি শরিয়তের আলিম। যিনি আপনাকে আপনার জায়গায় দাঁড় করিয়ে শুধু প্রাসাদে পথ দেখিয়ে দেবেন, তিনি হলেন তরিকতের আলিম। আর যিনি আপনাকে হাতে ধরে প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন, প্রাসাদে প্রবেশ করাবেন, তিনি হলেন হাকিকতের আলিম।'
আমরা যদি ঈমানের পরিভাষার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি, তাহলেও দেখা যায় ঈমানের তিনটি স্তর রয়েছে। যেমন-এক. ইসলাম। দুই. ঈমান। তিন. ইহসান।
প্রাসাদে প্রবেশ করে সব ধরনের আনন্দ-বিনোদন উপভোগ করা হলো ইহসান। প্রকৃতপক্ষে এটিই চূড়ান্ত লক্ষ্য। কারণ আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন জান্নাতের জন্য; চিরকালীন সুখ ও সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়ার জন্য। এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
إِلَّا مَنْ رَحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ ...
তবে যাদের প্রতি আপনার রব দয়া করেন, তাদের কথা ভিন্ন। এজন্যই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন [১]
এর কারণ একটিই, আল্লাহর ইবাদত করা। তাঁর বান্দা হিসেবে আমাদের সৃষ্টির মূলতন্ত্র এটি। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ )
আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।[১]
আমরা আল্লাহর ইবাদত করব, এটিই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
আমরা অবাধ্যতার পথে হাঁটি, ভোগ-বিলাস ও প্রবৃত্তির পূজায় আমগ্ন ডুবে থাকি। যদি আল্লাহপ্রদত্ত বিধানের আলোকে বিচার করি, তাহলে আমাদের শেষ পরিণাম হবে—জাহান্নাম। কিন্তু তা-ই হয় কি? আমাদের রব আমাদেরকে এভাবে ছেড়ে দেন না; বরং তিনি আমাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেন, সত্যের বাণী শোনান। তারপরও যদি আমরা সাড়া না দেই, তখন আমাদের পার্থিব দুঃখ-দুর্দশায় ফেলেন, কঠিন শাস্তিতে নিপতিত করেন।
বিষয়টি এভাবে বুঝতে পারেন—চিকিৎসক কখনো ২৫০ মিলিগ্রাম ঔষধ দেন। যদি কাজ না করে, তাহলে ৫০০ মিলিগ্রাম দেন। তারপর উপকার না হলে ক্রমান্বয়ে ৭৫০, ১০০০ মিলিগ্রাম করে দেন। ঔষধের প্রভাব যত দুর্বল প্রমাণিত হতে থাকে, তিনি পরিমাণ তত বাড়াতে থাকেন। বান্দাকে সংশোধন করার জন্য আল্লাহর পদ্ধতিটিও এরকম।
এবার আসি ‘আত-তাওয়াব’ (আরবী টেক্সট) নামের অর্থ ব্যাখ্যা করার বিষয়টিতে। এর পূর্বে যে বিষয়টি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ; তা হলো, আল্লাহ আমাদের সাথে দয়া ও রহমতের আচরণ করেন। তিনি যদি আমাদের সাথে ন্যায়পরায়ণতার নিরিখে আচরণ করতেন, তাহলে আমরা জাহান্নামের উপযুক্ত হতাম। কিন্তু তিনি আমাদের সাথে দয়ার আচরণ করে আমাদেরকে জান্নাতের উপযুক্ত করেন।
এজন্যই তিনি ‘আত-তাওয়াব’। তিনি আপনাকে ত্যাগ করেন না; বরং সবসময় সব অবস্থায় আপনাকে দেখেন, আপনার উচ্চারিত ও অব্যক্ত সব কথা শোনেন। আপনার স্থিরতা বা চলাফেরা, জল্পনা-কল্পনা, অতীত-ভবিষ্যৎ ও বর্তমান বাস্তবতা সবকিছু তিনি পর্যবেক্ষণ করেন।
আপনি হারাম সম্পদ ভক্ষণ করলেন; আপনাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি আপনার সম্পদ থেকে ১০ গুণ কমিয়ে দেবেন। মুসলিমদের জানমালের ক্ষেত্রে আপনি সীমালঙ্ঘন করলেন; তিনি আপনাকে অমিমাংসিত সমস্যায় ফেলবেন। সেই সমস্যায় পতিত হয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় আপনি কয়েক বছর অতিবাহিত করবেন। তারপর তিনি আপনার মনে এই উপলব্ধি এনে দেবেন-'আমার এই কঠিন গুনাহের কারণে আমি এমন সমস্যায় পড়েছি।'
সুতরাং তাওবার মূল কথা হলো, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে প্রতিপালন করেন, সংশোধন করেন-যাতে সে দুনিয়াতে সম্মানের অধিকারী হয় আর বিচার দিবসে লাভ করে পরম প্রার্থিত জান্নাত।
'তাওয়াব' (تَوَّابُ) শব্দটি ফা'আল (فَعَّال) শব্দ-কাঠামো অনুযায়ী নির্গত হয়েছে। আরবি ভাষায় ফা'আল শব্দ-কাঠামোটি ফায়িল বা কর্তার অতিশয়তার অর্থ প্রদান করে। যেমন: তাওবা থেকে সাধারণ শব্দ-কাঠামো অনুযায়ী গঠিত কর্তা 'আত-তাইব' (التَّائِب) এর অর্থ একবার তাওবাকারী। পক্ষান্তরে 'আত-তাওয়াব' (التَّوَّابُ)-এর অর্থ বারবার কিংবা বহুবার তাওবাকারী। আমরা যখন আল্লাহর এই গুণবাচক নামটি অতিশয়তার অর্থ প্রদানকারী শব্দ-কাঠামো অনুযায়ী উল্লেখ করব, তখন এর উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ তাআলা বারবার তাঁর বান্দার তাওবা কবুল করেন; অথবা গুনাহ যত বড়ই হোক, গুনাহ থেকে তাওবা করলে তিনি এই তাওবা কবুল করেন। আরবি ভাষায় এই নিয়মটি বহুল পরিচিত।
আরবি ভাষায় তাওবা (تَوْبَةٌ)-এর শাব্দিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা। যেমন-
تَابَ الْعَبْدُ إِلَى رَبِّهِ
অর্থ : বান্দা তার রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করল। অর্থাৎ গুনাহ ত্যাগ করে আল্লাহর কাছে ফিরে এল।
পক্ষান্তরে তাওবা ক্রিয়ার কর্তা যদি হন আল্লাহ, তাহলে অর্থ হয় ভিন্ন। যেমন-
تَابَ اللهُ عَلَى عَبْدِهِ
অর্থ : আল্লাহ তাঁর বান্দার দিকে কল্যাণ ও ইহসান, ক্ষমা ও দয়া নিয়ে ফিরলেন।
'আল্লাহু তাওয়াব' (আল্লাহ তাওবা কবুলকারী)-এর একটি অর্থ এটি। কিন্তু এর নিগূঢ় অর্থ আমরা দেখতে পাই আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে-
... ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
এরপর তিনি তাদের প্রতি কল্যাণকামী হলেন যাতে তারা তাওবা করে। নিশ্চয় আল্লাহ অতিশয় কল্যাণকামী, চিরদয়াময় [১]
এই আয়াতে تَابَ عَلَيْهِمْ (তাদের প্রতি কল্যাণকামী হলেন)-এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো, তাদের কষ্টকর অবস্থায় ফেলা হয়েছিল, যেন তারা তাওবার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। আল্লাহ যদি তাদের ধন-সম্পদ, সুন্দর বাসস্থান, আনন্দ-বিনোদন, প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের অবারিত সুযোগ দিতেন এবং ত্রুটি-বিচ্যুতির মধ্যে ছেড়ে দিতেন, তাহলে আল্লাহর 'তাওয়াব' নামটি যথার্থ হতো না। তাদেরকে অসহনীয় কষ্টের সম্মুখীন করা হয়েছে এই কারণে, তারা যেন তাওবা করে এবং তিনি তাদের তাওবা কবুল করে নেন।
আমার পরিচিত এক ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য করে অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। একবার তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আমেরিকায় ট্যুর দেবেন। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি আমেরিকা গিয়ে সব ধরনের গুনাহ করার; প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভ্রমণের নির্ধারিত তারিখের কয়েকদিন পূর্বে হঠাৎ পিঠে ভীষণ ব্যথা অনুভব করলেন। বাধ্য হয়ে হাসপাতালে গেলেন। মেরুদণ্ড এক্সরে করে দেখা গেল অস্থিমজ্জায় টিউমার হয়েছে। রিপোর্ট শুনে তার হাত-পা অবশ হয়ে এল। ভ্রমণ বাদ দিয়ে ফিরে গেলেন সিরিয়ায়। এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদ, এক জ্ঞানের আসর থেকে আরেক আসরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। অবশেষে তিনি আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে তাওবা করেছিলেন।
মূলত আল্লাহ তাকে এই রোগ দিয়ে তাওবার প্রতি আগ্রহী করেছেন। তিনি যদি তাকে সুস্থতা, শক্তি ও অর্থ-বৈভবের মাঝে ছেড়ে দিতেন আর সে দুমাস পর প্রমোদভ্রমণ থেকে ফিরে এসে তার ব্যবসায় যোগ দিত, তাহলে পরের বছর সে ইউরোপ ভ্রমণে যেত। এমনটি হলে আল্লাহ তাআলা 'তাওয়াব' হতেন না।
আমি অত্যন্ত মেধাবী এক ব্যক্তিকে চিনি, যিনি আগে দ্বীন-শরিয়ত ও আলিমদের নিয়ে বিদ্রুপ করতেন। তার মতে ধর্ম হচ্ছে একটি কুসংস্কার ও মানসিক বিকার। তিনি ছিলেন দর্শনের শিক্ষক। হঠাৎ একদিন দেখলাম, তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন এসেছে। দেখে মনে হলো, যেন তিনি দ্বীনের পথে ফিরে এসেছেন। তার পরিবর্তনের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন-
এক বছর হলো আমি ও আমার স্ত্রী আল্লাহর কাছে তাওবা করেছি। আমার স্ত্রী হিজাব পরা শুরু করেছে, আল্লাহর আদেশ মেনে চলছে। আমি ৬ মাস যাবত মসজিদে আপনার মজলিসে অংশ নিচ্ছি। তার কথা শুনে আমি খুব আনন্দিত হলাম। তাদের প্রত্যাবর্তনের কারণ জানতে চাইলাম। সে বলল, আমার মেয়ে দূরারোগ্য এক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। আমি মেয়েটিকে খুব ভালোবাসতাম। তার চিকিৎসায় আমি কার্পণ্য করিনি। এদেশ-ওদেশ করে শেষ পর্যন্ত আমার বাড়িটিও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। সবশেষে আমার মন আমাকে বলল, 'তুমি ও তোমার স্ত্রী যদি আল্লাহর কাছে তাওবা করো, তাহলে আল্লাহ তোমার মেয়েকে সুস্থ করে দেবেন।' মনের আহ্বাবানে সাড়া দিয়ে আমি আল্লাহর কাছে তাওবা করলাম। আল্লাহ তাআলা আমার মেয়েকে সুস্থ করে দিলেন। এরপর থেকে এক বছর ধরে আমি কুরআনের মজলিসে অংশ নিচ্ছি।
প্রিয় পাঠক, আল্লাহর শপথ! আমার বর্ণনা করা প্রতিটি ঘটনার মধ্যেই আপনি অনুভব করবেন-আল্লাহর দয়ার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তিনি যদি বান্দাদের অপরাধ, বিচ্যুতি, অবাধ্যতা, প্রবৃত্তির কামনায় ডুবে যাওয়া, হারাম ভক্ষণ, অন্যের অধিকার হরণ ইত্যাদি হাজারো অন্যায় কাজে লিপ্ত রাখেন, তাহলে তারা জাহান্নামে যাওয়ার উপযুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি তাদের প্রতি দয়া করেন। আর তাই তাদেরকে বিপদে ফেলেন, যাতে তারা তাওবা করে ফিরে আসে তাঁর দিকে।
এক লোকের ধ্যান-জ্ঞান ছিল মুমিনদের আকিদা-বিশ্বাস নষ্ট করা। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত—আল্লাহ বলতে কেউ নেই; ধর্ম একটি কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলা তাকে একটি মেয়ে দান করলেন। সে তাকে সীমাহীন ভালোবাসত। একবার মেয়েটির জ্বর এল। দেরি না করে সে তাকে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিলেন। কিন্তু ঔষধ খাওয়ার পরও জ্বর কমল না। তারপর একে একে অনেক ডাক্তারের কাছে গেল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। শেষে একজন বড় ডাক্তার বললেন, 'আপনার মেয়ের রোগটা খুবই রেয়ার। লাখে একজনের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়। মৃত্যু পর্যন্ত তাকে এই রোগটা বয়ে বেড়াতে হবে।'
ডাক্তারের কথা শুনে সে খুবই কষ্ট পেল। কয়েকদিনের মধ্যে তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করত সে। তার আশঙ্কা হলো, অফিসে গেলে তার অনুপস্থিতিতে মেয়েটি মারা যেতে পারে। তাই সে মেয়েকে নিয়েই অফিসে যেতে শুরু করল। কিন্তু অফিস কর্তৃপক্ষ তাকে এমনটা করার অনুমতি দিলো না।
ঘটনাটি আমি শুনেছি সেই লোকের স্ত্রীর কাছে। তার স্ত্রী বলেন, এমন কঠিন পরিস্থিতিতে দু-তিন মাস কেটে যাওয়ার পর একদিন সে বলল, 'আমি গোসল করব।' তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন জীবনে প্রথমবার গোসল করছে। গোসল করে সে সালাতে দাঁড়িয়ে গেল।' স্ত্রীর ভাষ্যমতে সে বলেছিল, 'হে আল্লাহ, তারা বলে আপনি আছেন। আপনি যদি থেকেই থাকেন, তাহলে আমার মেয়েকে সুস্থ করে দিন, নাহলে তাকে কিংবা আমাকে মৃত্যু দিন!'
গোসল করে সে দু-রাকাত সালাত আদায় করল। সালাতে অঝোরে কাঁদল। সালাত শেষে সালাম ফিরিয়েই দেখল, তার মেয়ের গায়ের তাপমাত্রা কমে গেছে। আল্লাহ তাআলা নিজ কুদরতে তাকে সুস্থ করে দিয়েছেন।
এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আমাদের জীবনে। একবার শনিবারের ধর্মীয় প্রোগ্রাম শেষে এক যুবক আমার সাথে দেখা করার অনুমতি চাইল। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সে এসে আমাকে তার বিপর্যস্ত জীবনের কাহিনি বলল—
'উস্তায, আল্লাহর শপথ! এমন কোনো গুনাহ নেই—যা আমি জীবনে করিনি। আমি বড় হয়েছি ধর্মহীন এক পরিবারে। এমন একজনের সান্নিধ্যে বড় হয়েছি, যিনি আমার অন্তরে বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন—আল্লাহ বলে কেউ নেই। তাই তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।'
তারপর যুবকটি আমাকে তার জীবনের সফলতার কথা বলতে লাগল। কীভাবে ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছে, এরপর বিচ্যুতি ও অধঃপতনের পথে যাত্রা করেছে; সবকিছু সবিস্তারে তুলে ধরল। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। তারপর একদিন হঠাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা নেমে এল; সেই পরীক্ষা তাকে আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংস করে দিল। নিজেকে উপার্জনহীন অবস্থায় আবিষ্কার করল সে। স্ত্রী, সন্তানসন্ততি এমনকি সে নিজেও আক্রান্ত হলো কঠিন এক রোগে। খাবার কিংবা ঔষধ কেনার টাকা পর্যন্ত ছিল না তার কাছে।
সেসময়কার অবস্থা বর্ণনা করে সে বলল, 'আল্লাহর শপথ! তখন প্রতি মুহূর্তে যেন আমার মাথায় হাতুড়িপেটা চলছিল। তারপর একদিন এক মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। মুয়াজ্জিন তখন আজান দিচ্ছেন। নিজের অজান্তেই মসজিদে প্রবেশ করলাম আমি। জীবনের প্রথম সালাত পড়েছি সেদিন। অনেক কেঁদেছি সেদিন। আল্লাহর কাছে তাওবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।'
এরকম দু-তিনটি ঘটনা আমি নিজে শুনেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সাথেই এমন কোনো না কোনো ঘটনা ঘটে।
অনেক ভাই মসজিদে আসে বড় রকমের বিপদে পড়ে। আল্লাহ তাদেরকে বিপদগুলো দেন। তখন তারা তাওবা করে, আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেন, তাদেরকে ক্ষমা করে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।
অনেক মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। অপারেশন থিয়েটারে শুয়ে আল্লাহকে বলে, 'হে রব, যদি আমাকে এই রোগ থেকে সুস্থতা দান করেন, তাহলে আমি বাকি জীবন আপনার অবাধ্য হব না!' তখন আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা দান করেন; সে-ও তার প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকে। আল্লাহ যদি তাকে এই দুরারোগ্য ব্যাধি না দিতেন, তাহলে সে তাওবা করত না।
বিশ্বাস করুন, এমন ঘটনা ১০-২০টি নয়, শত শতও নয়; বরং হাজারো ঘটনা আমার কাছে পৌঁছেছে। আর আমরা যদি খোঁজ করি, তাহলে এই সংখ্যা কেমন হতে পারে! এটিই 'আত-তাওয়াব' এর অর্থ।
... ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا ...
তারপর তিনি তাদের প্রতি কল্যাণকামী হলেন, যাতে তারা তাওবা করে।
এই আয়াতের অর্থও এটিই। এই অধ্যায়ে এটিই সবচেয়ে সুন্দর আয়াত। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বিপদাপদ দেন, যাতে তারা তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ হয়। কিন্তু তাওবার ক্ষেত্রে কৃতিত্বের অধিকারী কে? যে বাধ্য হয়ে তার রবের কাছে ফিরে আসে, সে? নাকি যে তার রবের কাছে ফিরে আসে সুখ-সমৃদ্ধিতে থেকে, সে? সুখ-শান্তিতে থেকে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাতেই প্রকৃত কৃতিত্ব!
বিপদে পড়ার পর যে তাওবা করে, আল্লাহ তার প্রতিও সদয় হন। কিন্তু বিপদে পড়ে নয়; বরং সুখের সময়ই তাঁকে চিনতে হবে। চিনতে হবে—যখন আপনি থাকবেন স্বচ্ছল ও সামর্থ্যবান।
... ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا ...
তারপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা তাওবা করে।[১]
এই আয়াতে আল্লাহর অনুগ্রহের কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছে, তারপর উল্লেখ করা হয়েছে বান্দার তাওবার (ক্ষমা প্রার্থনা) কথা।
পক্ষান্তরে আরেক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে—
إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তবে যারা তাওবা করে, (নিজেদের) সংশোধন করে এবং (যা গোপন করেছিল তা) বর্ণনা করে, আমি তাদের তাওবা কবুল করি। আর আমি তাওবা কবুলকারী, চির দয়াময়।[২]
এই আয়াতে আগে বান্দার তাওবার কথা এসেছে, পরে এসেছে আল্লাহর তাওবার কথা। যদি বান্দার তাওবার আগে আল্লাহর তাওবা আসে, তাহলে এর উদ্দেশ্য—বান্দার ওপর আপতিত বিপদাপদ। অপরদিকে যদি বান্দার তাওবার পর আল্লাহর তাওবা আসে, তাহলে এর উদ্দ্যেশ্য—তাওবা কবুল করা। আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করেন, তারপর আপনার তাওবা কবুল করেন। আপনি তাওবা করার প্রেরণা এবং সেই তাওবা কবুল হওয়ার আশার মাঝে বেঁচে থাকেন।
মনে রাখবেন, দ্বীনের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে থাকা মানেই বিপদের অপেক্ষায় থাকা। কোনো বিপদ, দুর্যোগ-দুর্বিপাক কিংবা সংকট আসার আগে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ, প্রজ্ঞাবানের কাজ।
অনেকে বলে, 'আল্লাহ তাওবার শুরুতে বান্দাকে বিপদ দেন, যাতে সে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ হয়। আর তাওবা পূর্ণ করেন তাওবা কবুল করে এবং তাওবার ওপর অবিচল রেখে।'
বান্দা কখনো বলে, 'হে আমার রব, আমি তাওবা করলাম। আর কখনো এই গুনাহ করব না।' কিন্তু সে এটা বলে না, 'হে আমার রব, আমাকে তাওবার ওপর অটল রাখুন।' কিংবা এটাও বলে না, 'হে হৃদয়-অবিচলকারী, আমার হৃদয়কে আপনার দ্বীনে অটল রাখুন, আপনার আনুগত্যে অবিচল রাখুন।'
এভাবে তাওবা করলে তাওবাকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। তাওবার ওপর অবিচল থাকার ক্ষমতা নিজেরই রয়েছে বলে মনে হয়। তাই দেখা যায়, তাওবা করার পরও আল্লাহ বান্দার প্রতিরোধ-ক্ষমতা দুর্বল করে দেন; সে আবার গুনাহে লিপ্ত হয়। এজন্য তাওবা কবুল করা এবং তাওবার ওপর অবিচল রাখা আল্লাহরই হাতে।
মানুষ যখন তাওবা করার পর পুনরায় গুনাহ করে, তখন তার ভারসাম্য একেবারে ধসে পড়ে। তাওবার পূর্বে লক্ষবার গুনাহ করা তাওবার পর একবার গুনাহ করার চেয়ে তুচ্ছ। আপনি যদি তাওবার পরও গুনাহ করেন, তাহলে আপনার আত্মিক শক্তি বিনষ্ট হয়ে যাবে। আপনি অনুভব করবেন, আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার এ পথ বুঝি চলার মতো নয়। আল্লাহ তাআলার এই বাণী আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে-
وَاللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَيُرِيدُ الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الشَّهَوَاتِ أَن تَمِيلُوا مَيْلًا عَظِيمًا
আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিতে চান। কিন্তু যারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তারা চায়-তোমরা বহুদূর বিচ্যুত হয়ে যাও। [১]
হাদিসে এসেছে-
তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি পানির সন্ধান পেয়ে, বন্ধ্যা নারী সন্তান পেয়ে কিংবা পথহারা ব্যক্তি পথ পেয়ে যতটা খুশি হয়, বান্দার তাওবায় আল্লাহ তাআলা এর চেয়ে বেশি খুশি হন। [১]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে নিজ বাহনের ওপর আরোহী ছিল। তারপর তার বাহনটি হারিয়ে যায়। তার খাদ্য-পানীয়ও ছিল বাহনটির ওপর। এরপর নিরাশ হয়ে সে গাছের ছায়ায় এসে বিশ্রাম করে এবং বাহনের ব্যাপারে একেবারে নিরাশ হয়ে যায়। এমন সময় হঠাৎ উটটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়। অমনি সে তার লাগাম ধরে ফেলে। তারপর আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে ওঠে, 'হে আল্লাহ, তুমি আমার বান্দা, আমি তোমার রব!' আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে ভুল বলে ফেলে।[২]
এই ব্যক্তি তার উট পেয়ে যতটা না আনন্দিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বান্দার তাওবায় এর চেয়েও বেশি আনন্দিত হন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ক্ষমা করতে চান। গুনাহগার বান্দা যখন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, একজন ফেরেশতা তখন আসমান ও জমিনে ঘোষণা দেয়-'তোমরা অমুক ব্যক্তিকে স্বাগতম জানাও। সে আল্লাহর সাথে সন্ধি করে নিয়েছে।'
আপনি দুনিয়াদারদের সাথে বসুন কিংবা পাপাচারী, প্রবৃত্তির অনুসরণকারীদের সাথে বসুন; সেই পাপাচারী আপনাকে তার দিকে টেনে নিতে চাইবে। সে চাইবে, আপনিও যেন তার মতো হয়ে যান। সে বলবে, 'চিন্তা-ভাবনা আমার কাঁধে ছেড়ে দাও। আল্লাহ তো 'তাওয়াব' (তাওবা কবুলকারী), 'রাহিম' (চিরদয়াময়)। এত যাচাই-বাছাই করার কিছু নেই। আল্লাহ এত যাচাই-বাছাই করেন না।'
এ নিয়েই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিতে চান।
কিন্তু যারা প্রবৃত্তির আনুগত্য করে, তারা চায়—তোমরা বহুদূর বিচ্যুত হয়ে যাও।[১]' এজন্য আল্লাহ্‌প্রদত্ত ইচ্ছাকে ভালো মনে করতে হবে। কারণ তিনি আপনার-আমার- আমাদের সবার জন্যই কল্যাণ ও চিরস্থায়ী সুখ কামনা করেন।
পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ রয়েছে, যারা কিছুদিন পরই অসহনীয় শাস্তির সম্মুখীন হবে; অথচ সে হয়তো গাড়িতে আয়েশ করে বসে আছে। আবার এমন মানুষও আছেন, যিনি কিছু সময় পরই সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন; অথচ দুনিয়াতে তিনি চলাফেরা করেন পায়ে হেঁটে। চলার পথে এ দুজনের দেখা হয়ে গেল কোথাও। দুজনের মধ্যে সফল কে? চর্মচোখে বিলাসবহুল গাড়িতে আরোহনকারী ব্যক্তিটি সফল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সফল পায়ে হেঁটে চলা ব্যক্তি।
কল্পনা করুন, প্রাসাদের মতো বিশাল এক বাড়ি, যেখানে আনন্দ-উপভোগের সবকিছুই রয়েছে। বাড়িটির মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলার। সেই বাড়িতে পৌঁছার একটিমাত্র রাস্তাই রয়েছে। সেই রাস্তায় একজন লোক পায়ে হেঁটে চলেছে বাড়িটির মালিকানা লাভের জন্য। আরেকজন লোক যাচ্ছে দ্রুতগামী গাড়িতে করে; তাকে খোলা মাঠে সবার সামনে ফাঁসি দেওয়া হবে। পথিমধ্যে এ দুজনের দেখা হলো। এমন পরিস্থিতিতে কে সুখে আছে?
চর্মচোখে মনে হবে, গাড়িতে আরোহী ব্যক্তিটি সুখে আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাবে, পায়ে হেঁটে চলা ব্যক্তিটি সুখে আছে। কারণ, সবকিছু বিবেচনা হয় চূড়ান্ত পরিণতির আলোকে।
আল্লাহ তাআলার এই বাণীসমূহ সূর্যের মতোই স্পষ্ট—
.... قُلْ تَمَتَّعُوا فَإِنَّ مَصِيرَكُمْ إِلَى النَّارِ
আপনি বলুন, 'তোমরা উপভোগ করে নাও। জাহান্নামের দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল।'[২]
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُم بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ قَالَ وَمَن كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَىٰ عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ
স্মরণ করুন, যখন ইবরাহিম বলেছিল, 'হে রব, একে (মক্কানগরীকে) একটি নিরাপদ শহর বানিয়ে দিন এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও বিচারদিবসে বিশ্বাস করবে, তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দিন ফলমূল দিয়ে।' তিনি (আল্লাহ) বলেছিলেন, 'আর যে অবিশ্বাস করবে, তাকেও কিছুদিনের জন্য এসব উপভোগ করতে দেব, তারপর তাকে ঠেলে দেব জাহান্নামের শাস্তির দিকে; তা কতই না মন্দ গন্তব্যস্থল!' [১]
لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ
দেশে দেশে কাফিরদের অবাধ বিচরণ যেন আপনাকে বিভ্রান্ত না করে। (এটা তো) স্বল্পসময়ের উপভোগ মাত্র। এরপর তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আর তা কতই না মন্দ নিবাস![২]
قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا
আপনি বলে দিন, 'পার্থিব ভোগসামগ্রী খুবই সামান্য। আর মুত্তাকিদের জন্য আখিরাত উত্তম। তোমাদের প্রতি অণু পরিমাণ জুলুমও করা হবে না।'[৩]
وَمَا أُوتِيتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى أَفَلَا تَعْقِلُونَ * أَفَمَنْ وَعَدْنَاهُ وَعْدًا حَسَنًا فَهُوَ لَاقِيهِ كَمَنْ مَتَّعْنَاهُ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ثُمَّ هُوَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْمُحْضَرِينَ
তোমাদের যা দেওয়া হয়েছে, তা কেবল পার্থিব ভোগসামগ্রী ও শোভাবর্ধক। পক্ষান্তরে আল্লাহর কাছে যা আছে, তা হলো উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। তবু কি তোমরা বোঝো না? যাকে আমি উত্তম (প্রতিদানের) প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যা সে পাবেই; সে কি ওই ব্যক্তির মতো-যাকে আমি পার্থিব জীবনের ভোগসামগ্রী দিয়েছি এবং এর জন্য তাকে কিয়ামতের দিন হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে?[১]
مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ ۞
তোমাদের কী হলো? কেমন বিচার করছ তোমরা?[২]
أَفَمَن كَانَ مُؤْمِنًا كَمَن كَانَ فَاسِقًا لَّا يَسْتَوُونَ ۞
একজন মুমিন কি একজন পাপাচারীর মতো হয়? তারা তো সমান হয় না [৩]
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ ۞
আমি কি মুসলিমদের অপরাধীর মতো গণ্য করব?[৪]
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَن نَّجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَّحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ ۞
দুষ্কৃতিকারীরা কি মনে করে, আমি জীবন-মৃত্যুর দিক থেকে তাদেরকে সেই লোকদের মতো করে দেব-যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে? তাদের সিদ্ধান্ত কতই না মন্দ![৫]
'তাওয়াব' নামের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে কল্যাণ দান করেন। 'তাওয়াব' নামটির কারণেই বৃষ্টি বর্ষিত হয়। 'তাওয়াব' নামের বদৌলতে আমরা বুকভরে শ্বাস নিই। পৃথিবীর সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছে শুধু 'তাওয়াব' নামের কারণে। এটি হলো 'তাওয়াব'-এর প্রথম অর্থ।
দ্বিতীয় অর্থটি হলো, আল্লাহ তাআলার ইশারা ও আদেশে বান্দাকে বিপদাপদ দান করা হয়। এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
فَإِن كَذَّبُوكَ فَقُل رَّبُّكُمْ ذُو رَحْمَةٍ وَاسِعَةٍ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُهُ عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ )
এসব বিষয়ে যদি তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করে, তাহলে আপনি বলে দিন- 'তোমার রব অসীম দয়ার অধিকারী। আর অপরাধী সম্প্রদায় থেকে তাঁর শাস্তির বিধান কখনোই ফিরিয়ে নেওয়া হবে না।' [১]
আয়াতটির প্রতি লক্ষ করে দেখুন, কত চমৎকার, কত সূক্ষ্ম অর্থবহ! আয়াতে উল্লিখিত এই দয়া কী?
তিনি বলেছেন, 'আর অপরাধী সম্প্রদায় থেকে তাঁর শাস্তির বিধান কখনোই ফিরিয়ে নেওয়া হবে না।' এটিও তাঁর দয়া ও রহমত। অপরাধী সম্প্রদায় থেকে শাস্তির বিধান ফিরিয়ে না নেওয়াও তাঁর রহমতের নমুনা।
মনে করুন, একজন আলিমের একটি মেধাবী ছেলে আছে। কিন্তু মেধা থাকলে কী হবে, ছেলেটি পড়ালেখায় একেবারেই অমনোযোগী। তখন বাবা তাকে শাসন করলেন এবং পড়ালেখার জন্য চাপ দিলেন। এক পর্যায়ে সে পরীক্ষায় ভালো করতে শুরু করল। এরপর থেকে তিনি সবসময় ছেলের পড়ালেখার খবর নিতে লাগলেন। অবশেষে সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট নিয়ে সে ডাক্তার হলো। চেম্বারে বসতে লাগল। প্রতিদিন তার কাছে ৩০-৪০ জন রোগী আসে। প্রতি মাসে ভালো উপার্জন করে সে। অতীতের কথা স্মরণ করে একদিন সে বলতে লাগল, 'হে আল্লাহ, ছেলেবেলায় আমার বাবা যে আমাকে শাসন করেছিলেন, সেজন্য তাকে সর্বোত্তম বিনিময় দান করুন। তিনি না থাকলে আমি আজ ডাক্তার হতে পারতাম না।'
কিন্তু এখানে চিত্র যদি ভিন্ন হতো-ছেলে যদি বলত, 'আমি পড়ব না।' আর বাবাও যদি ছেলেকে শাসন না করে ছেড়ে দিতেন, তাহলে সে পিছিয়ে পড়ত। সে বলত, 'বাবা কেন আমাকে মারেনি, শাসন করেনি? কেন আমাকে পড়ালেখার জন্য চাপ দেয়নি, বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি?' বাবার অজ্ঞতাপ্রসূত সরলতা ছেলেকে বাবার প্রতি বিদ্বেষী করে তোলে। আর বিচক্ষণতাপ্রসূত কঠোরতা ছেলের মনে বাবার প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়।
আরও উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরুন, কোনো মানুষ বিপথগামী হলো। আল্লাহ তাআলা তাকে বিপর্যয়ে ফেললেন, ভীতিপ্রদর্শন করলেন, নানা ধরনের সমস্যা দিলেন। সমস্যায় পড়ে সে সঠিক পথে ফিরে এল। এখন সে আল্লাহর নৈকট্য ও হিদায়াতের স্বাদ আস্বাদন করে মহাসৌভাগ্য অনুভব করে। সে বলে, 'হে আল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা আপনার। আপনি আমাকে বিপদ দিয়েছেন বলেই আজ আমি আপনার কাছে ফিরে এসেছি।'
বিপদগ্রস্ত কয়েকজন ভাইকে আমি বলেছি, 'সেই আল্লাহর শপথ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই! অচিরেই একটি সময় আসবে, যখন এই বিপদাপদের রহস্য উন্মোচিত হবে। তখন যদি ভালোবাসায় আল্লাহর প্রতি বিগলিত না হও, তবে জেনে রেখো এই দ্বীন অসত্য।'
প্রতিটি মানুষের জানতে হবে, আল্লাহ তাআলা তাওয়াব। তাওয়াব মানে যিনি আমাদের ভালোবাসেন।
মানুষ হয়তো মন্দ চিন্তা নিয়ে রাস্তায় চলতে থাকে। হঠাৎ সে দুর্ঘটনার শিকার হয়। আল্লাহ বলেন, 'হে আমার বান্দা, কোথায় চলছ তুমি?' হয়তো সে ভুল পথে হাঁটে, দৃষ্টির হিফাজত করে না। হঠাৎ সে দুর্ঘটনায় পতিত হয়; মাথা ফেটে যায়। আল্লাহ তাআলা তাওয়াব!
হারাম পন্থায় মানুষ হয়তো কিছু অর্থ আত্মসাৎ করে। কিন্তু সেজন্য আল্লাহ তার ১০ গুণ অর্থ বরবাদ করে দেন। মিস্ত্রি কোনো বিকল যন্ত্র ঠিক করে গ্রাহকের কাছে বেশি দাম চেয়ে বলে, '১০ হাজার টাকা।' গ্রাহক হয়তো জানে না সেটা। প্রতিবেশী তাকে তিরস্কার করলে সে উত্তর দেয়, 'এভাবেই অর্থ উপার্জন করতে হয়।' তারপর কয়েকদিন যেতে না যেতেই তার ছেলের চোখে লোহার গুঁড়ো ঢোকে। চিকিৎসা বাবদ খরচ হয় ৬০ হাজার টাকা। এভাবে তার হারাম লাভ নিমিষেই চলে যায়; তার শিক্ষা হয়। আল্লাহ তাআলা তাওয়াব!
এক ভাই পাইকারি কাপড়ের ব্যবসা করেন। একদিন এক ক্রেতা তার কাছ থেকে ৬টি কাপড় কিনতে চায়। সে তখন তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলে, 'আমি খুচরা বিক্রি করি না।' লোকটি তখন তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যায়। ব্যবসায়ী ভাইটি আমাকে আল্লাহর শপথ করে বলে, 'এরপর টানা ২৩ দিন আমার দোকানে কোনো ক্রেতা আসেনি।' আল্লাহ তাআলা তাওয়াব!
পিতল কিংবা লোহার দিকে তাকিয়ে দেখুন। যত হাতুড়ি-পেটা করা হয়, পিতল-লোহা তত বেশি উজ্জ্বল হয়, সুন্দর হয়। মুমিন বান্দাও এমন। তার ওপর যত বিপদাপদ আসতে থাকে, সে আল্লাহর প্রতি তত অনুগত হয়, তত সুন্দর হয় তার কথা। তার কোনো অহংকার থাকে না। একেই বলে আল্লাহপ্রদত্ত শিক্ষা।
এটিই তাওয়াবের অর্থ। তিনি আপনার চিকিৎসা করেন; আপনি হয়ে যান ফেরেশতার মতো পবিত্র।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'মুমিন নর-নারীর ওপর, তার সন্তানসন্ততি ও ধন-সম্পদের ওপর বিপদাপদ লেগেই থাকে। অবশেষে আল্লাহর সাথে সে গুনাহমুক্ত অবস্থায় মিলিত হয়।' [১]
প্রিয় ভাই, সেই আল্লাহর শপথ—যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই! আমি আপনাদের কল্যাণকামী। আমি আগে বলতাম, আমার দাওয়াহর সারনির্যাস ২টি কথা— » হয়তো আপনি আল্লাহর দিকে দৌড়ে যাবেন। » নাহলে তিনি আপনাকে দৌড়িয়ে নেবেন।
আল্লাহ আপনাকে কীভাবে তাঁর দিকে নেবেন, তিনিই ভালো জানেন। তিনি জানেন কীভাবে ভীতিপ্রদর্শন করবেন, কীভাবে আপনার পা-কে কম্পিত করবেন, দুঃসংবাদ শুনিয়ে কীভাবে বেহুঁশ করবেন আপনাকে। তাই আপনি নিজেই তাঁর দিকে ধাবিত হোন। সেটাই আপনার জন্য উত্তম। তাড়াতেই বছরের মারফতী আমার পরিচিত এক ভাই, নিজের ওপর সে অনেক জুলুম করেছে। তার এক কল্যাণকামী প্রতিবেশী তাকে উপদেশ দিত, কিন্তু সে তার কথা শুনত না। গুনাহগার অবস্থায়ই সে মৃত্যুবরণ করল।
মৃত্যুর পর একজন স্বপ্নে দেখল, লোকটি ছেঁড়া মোটা জামা গায়ে দিয়ে একটি পুকুরের চারপাশে ঘুরছে আর বলছে, 'অমুক আমাকে উপদেশ দিয়েছে, কিন্তু আমি তার উপদেশ গ্রহণ করিনি। আপনারা আমার মতো হবেন না। কেউ যদি আপনাদের উপদেশ দেন, তাহলে আপনারা তার উপদেশ গ্রহণ করুন।'
যতক্ষণ মানুষের হৃদস্পন্দন থাকে, ততক্ষণ তার হৃদস্পন্দন যেন তাকে বলতে থাকে- 'তোমার জন্য তাওবার দরজা খোলা আছে।'
তিনি ছিলেন এক বিরাট কারখানার মালিক। একদিন আমার কাছে এলেন। আমাকে তার এই ঘটনাটি বললেন, '১০ বছর আগে হঠাৎ লক্ষ করলাম, আমার টাকা হারিয়ে যাচ্ছে। একদিন পকেটে ২ হাজার টাকা রেখেছিলাম; কিছুক্ষণ পর দেখি নেই। কারখানায় এক শ্রমিক এই কাজ করত। সে-ই চুরি করত। আমি একমাস পর্যবেক্ষণ করলাম। প্রতিদিনই টাকা নাহয় কারখানার মাল চুরি হচ্ছিল। তারপর হঠাৎ চুরি থেমে গেল।
এই ঘটনার ১০ বছর পর একদিন এক যুবক আমার দরজায় কড়া নাড়ল। তার মুখে সুন্নতি দাড়ি। দরজা খুললে সে বলল, 'আমি অমুক, চিনতে পেরেছেন?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, তুমি তো আমাদের কারখানায় কাজ করতে।' সে বলল, 'আমি আপনার টাকা চুরি করতাম, কারখানার মালও চুরি করতাম। তারপর আল্লাহর কাছে তাওবা করেছি। আজ আমি আপনার হক ফিরিয়ে দিতে এসেছি।' আমি তাকে বললাম, 'আল্লাহ তোমার তাওবা দেখেছেন, তোমার ফিরে আসা দেখেছেন। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি যেকোনো সময় চাইলে আমার কারখানায় ফিরে আসতে পারো।'
যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ সমাধান সহজ; সবকিছু সেরে উঠতে পারে। আপনি আপনার পূর্বের ঋণগুলো পরিশোধ করতে পারবেন, হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন তার হক। যার গিবত করেছেন, তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারবেন। হয়তো আপনি আল্লাহর কাছে স্বেচ্ছায় তাওবা করতে পারবেন, নয়তো আল্লাহ আপনাকে তাঁর কাছে ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ করবেন। তবে স্বেচ্ছায় তাঁর কাছে ফিরে আসাই সবচেয়ে উত্তম ও সুন্দর।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার রাতের তৃতীয় প্রহরে তার উম্মতের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে দুআ করেছেন। জবাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়েছে, 'আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম; তবে যারা জুলুম করেছে, তাদের ছাড়া। কারণ অবশ্যই আমি তাদের থেকে মাজলুমের প্রতিশোধ নেব।' [১]
আল্লাহ ও বান্দার মাঝে যা হয়েছে, আল্লাহ তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কিন্তু বান্দাদের পরস্পরের বিষয়ে অবশ্যই সমাধান করতে হবে।
আশা করি, সবাই নিজের ব্যাপারে মুহাসাবা (হিসাব) নেবেন। সবচেয়ে সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যিনি সবক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশমতো চলেন। সবচেয়ে সৌভাগ্যবান তিনিই, যিনি সবক্ষেত্রে আল্লাহর আনুগত্য করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
... وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا )
যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।[২]
তিনি আরও বলেন-
... إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ )
তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ।[৩]
'তাওয়াব' অর্থ কেবল এটা নয়, আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে ন্যায়বিচার করেন; বরং তিনি দয়ার আচরণও করেন। যত্নশীল বাবা প্রতিদিন সন্তানকে ডেকে তার পড়াশোনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, খোঁজখবর রাখেন। বাবা যদি ছেলেকে নিজের ওপর ছেড়ে দেন, তাহলে সে পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করে, তখন বাবা যদি বলেন, 'আমার যা দায়িত্ব ছিল, তা আমি পালন করেছি।' ছেলে তখন বলতে পারে, 'আপনি দায়িত্ব পালন করেছেন ঠিক, কিন্তু আমার প্রতি যত্নশীল ছিলেন না। আপনি বরং ন্যায়সংগত আচরণ করেছেন। যদি যত্নশীল হতেন, তাহলে আমাকে ছেড়ে দিতেন না।'
আমাদের রব তাওয়াব। তিনি আপনাকে আমানত দিয়েছেন, বিবেক দিয়েছেন, অস্তিত্ব দিয়েছেন; দিয়েছেন ইচ্ছাধিকার, প্রবৃত্তির চাহিদা ও শরিয়ত। তারপরও আপনার চারপাশের মানুষজন আপনাকে উপদেশ দিতে থাকে।
একবার আমাদের এক ভাইয়ের বেশ কিছু টাকার প্রয়োজন পড়ে। একটি বাড়ি খুব পছন্দ হয়েছে তার। কিন্তু বাড়িটির দাম ভীষণ চড়া, ২৫ লক্ষ টাকা। প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা এটা। তার কাছে তখন আছে মাত্র ১০ লক্ষ টাকা মানে লাগবে আরও ১৫ লক্ষ। ব্যাংকে তার ডিপোজিট ছিল। সে ডিপোজিটের মুনাফা নিতে গেল ব্যাংকে। ডিপোজিটের মুনাফা মূলত সুদ। সেই ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন অমুসলিম। ম্যানেজার বললেন, 'স্যার, আপনি তো একজন মুসলিম। এই টাকাটা আপনার ধর্মে হারাম। হারাম টাকা নেওয়ার দরকার নেই; আপনি পবিত্র থাকুন।'
আমার ভাই এই ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, 'ম্যানেজারের কথা শুনে আমি কাঁদতে লাগলাম। হায়, আমি আমার দ্বীনের ব্যাপারে একজন অমুসলিমের কাছ থেকে উপদেশ শুনছি!' মনে মনে বললাম, 'হে আল্লাহ, আমি ওয়াদা করছি-আপনার নাফরমানি করে আমি এই বাড়ি কিনব না।'
ব্যাংক থেকে বের হয়ে আমি আমার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখি, এক পুরোনো বন্ধু আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কুশলাদি বিনিময়ের পর সে আমাকে বলল, 'আমি কুয়েত যেতে চাচ্ছি। আমার কাছে ৬০ লাখ টাকা আছে। আপাতত এই টাকাগুলো আমার লাগবে না। আমি তোমার কাছে এগুলো দু-বছরের জন্য জমা রাখতে চাই। তুমি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারো।' আল্লাহর শপথ, আল্লাহর নাফরমানি না করার ওয়াদা করার মাত্র আধ ঘণ্টা পরের ঘটনা এটি।
দেখুন, আল্লাহ তাআলা কীভাবে এই ভাইকে রক্ষা করলেন! আল্লাহ তাকে কোনো বিপদ দেননি। একজন অমুসলিমের মাধ্যমে তাকে উপদেশ দিয়েছেন, যাতে সে পবিত্র থাকে।
আল্লাহ তাআলা প্রজ্ঞাবান। আপনি যদি ইশারায় আসেন, তাহলে মুখে বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি মুখের কথায়ই চলে আসেন, তাহলে মারধরেরও প্রয়োজন নেই। মানুষ যখন অনুভূতিশীল হবে, তখন সে ইশারার মাধ্যমে বুঝতে পারবে। আবার কখনো মানুষ বিপদে পড়ার পরও বোঝে না। তখন তার প্রয়োজন হয় প্রকাশ্য শিক্ষা কিংবা লাঞ্ছনাকর আজাব বা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহর কাছে বান্দার অবস্থান যত উন্নত হয়, সংশোধনের জন্য ইশারাও তত যথেষ্ট হয়।
তাওয়াব অর্থ আল্লাহ তাআলা আমাদের কখনোই ছেড়ে দেন না। বরং তিনি আমাদের চান; আমরা তাঁর কাছে কাঙ্ক্ষিত। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন সুখ দান করার জন্য, আমাদের প্রতি দয়া করার জন্য, দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যবান করার জন্য।
মনে রাখবেন, বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। আর যদি আপনি বুদ্ধিমান না হন; আল্লাহর ইশারা না বোঝেন, তাহলে আল্লাহ আপনাকে ফিরে আসতে বাধ্য করবেন। মাঝে মাঝে লক্ষ করি, আমার অনেক ভাই মজলিস ত্যাগ করে চলে যায়। কয়েক মাস পর তারা আবার ফিরে আসে। আমার বিশ্বাস, অবশ্যই তারা কোনো বিপদে পড়েই আবার ফিরে এসেছে।
প্রিয় পাঠক, নেক আমলে অবিচল থাকুন। কেননা আল্লাহ তাআলা নেক আমলে অবিচল বান্দাকে ভালোবাসেন। বিক্ষুব্ধ তরঙ্গে দোদুল্যমান ছোট নৌকার মতো হবেন না; বরং হোন সুস্থির জাহাজের মতো।
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُم مَّن قَضَىٰ نَحْبَهُ وَمِنْهُم مَّن يَنتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا )
মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর সাথে করা প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে। তাদের মধ্যে কেউ মৃত্যুবরণ করেছে আর কেউ আছে প্রতীক্ষায়। কিন্তু তারা (তাদের সংকল্প) কোনোভাবেই পরিবর্তন করেনি [১]
আপনি যদি বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তার সাথে অঙ্গীকার করেন, তাহলে আর কিছু বাকি থাকে না। যদি আপনি আল্লাহর কাছে আনুগত্য, জ্ঞানার্জন ও মানুষের সেবার ওয়াদা করেন, তাহলে সেই ওয়াদার ওপর অবিচল থাকুন।

টিকাঃ
[১] সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৪৬
[১] ইংরেজি Mentor (মেন্টর) শব্দটি এর কাছাকাছি অর্থ দেয়।
[১] সুরা হুদ, আয়াত: ১১৯
[১] সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬
[১] সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৮
[২] তাবুকের যুদ্ধে ৩ জন সাহাবি অনুপস্থিত ছিলেন। তারা ছিলেন প্রকৃত মুসলিম। এজন্য তারা নিজেদের ভুলও স্বীকার করেন। এই কাজের শাস্তি হিসেবে ৫০ দিনের জন্য তাদেরকে বয়কট করা হয়। এ সময়টা তারা কাটান সীমাহীন দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে আল্লাহ তাদের ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। সেই ৩ জন সাহাবি হলেন-কাব ইবনু মালিক, হিলাল ইবনু উমাইয়া ও মুরারাহ ইবনুর রাবি রাযিয়াল্লাহু আনহুম। [সহিহুল বুখারি: ৪৪১৮; সহিহ মুসলিম: ২৭৬৯]
[১] সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৮
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬০
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ২৭
[১] কানযুল উম্মাল: ১০১৬২; আল-জামিউস সগির, ইমাম সুয়ুতি: ১০১০৩; ইলালুদ দারাকুতনি: ১৩৪১; হাদিসটির সনদ দুর্বল।
[২] সহিহ মুসলিম: ২৭৪৭; শারহুস সুন্নাহ, ইমাম বাগাবি: ১৩০৩; মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৩৩২।
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ২৭
[২] সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩০
[১] সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৬
[২] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৯৬-১৯৭
[৩] সুরা নিসা, আয়াত: ৭৭
[১] সুরা কাসাস, আয়াত: ৬০-৬১
[২] সুরা কলম, আয়াত: ৩৬
[৩] সুরা হা-মিম সাজদা, আয়াত: ১৮
[৪] সুরা কলম, আয়াত: ৩৫
[৫] সুরা জাসিয়া, আয়াত: ২১
[১] সুরা আনআম, আয়াত: ১৪৭
[১] জামিউত তিরিমিযি : ২৩৯৯; সহিহ্বল জামি: ৫৮১১; রিয়াযুস সালিহিন: ৪৯; হাদিসটি হাসান সহিহ।
[১] সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩০১৩; মিশকাতুল মাসাবিহ : ২৬০৩; আল-মুসনাদুল জামি : ৫৬৩৮; হাদিসটির সনদ দুর্বল।
[২] সুরা আহযাব, আয়াত: ৭১
[৩] সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩
[১] সুরা আহযাব, আয়াত: ৩২

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-মুমিন : الْمُؤْمِنُ

📄 আল-মুমিন : الْمُؤْمِنُ


প্রিয় মুমিন ভাই, আপনি যদি কিছু না-ও করেন, তবু আল্লাহ তাআলার প্রতি আপনার ঈমান আসবে। মনে করে দেখুন, শয়তান নিজে আল্লাহকে সম্বোধন করে কী বলেছিল!
সে বলেছিল, 'আপনার ক্ষমতার শপথ!'
শয়তানের এই সম্বোধন থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর প্রতি তার ঈমান ছিল। তা সত্ত্বেও সে যাবতীয় কুফরের মূলভিত্তি। তাই আল্লাহর সুন্দর নামগুলো, তাঁর প্রভুত্ব, গুণাবলি ও শ্রেষ্ঠত্বের নানাদিক জানা ছাড়া তাঁর প্রতি ঈমান আনা যথেষ্ট নয়।
আল্লাহকে শুধু 'খালিক' (الْخَالِقُ) বা সৃষ্টিকর্তারূপে বিশ্বাস করাও যথেষ্ট নয়। কারণ আমাদের রব বলেছেন-
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ
আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন, 'কে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, চন্দ্র ও সূর্যকে কে করেছেন অনুগত?' তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ।' তাহলে তারা কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে? [১]
সুতরাং আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনার অপরিহার্য অংশ এবং মুমিনের কর্তব্য হলো, মুমিন ব্যক্তি তাঁর সুন্দর নামগুলো জানবে। দুনিয়াতেও আমরা এর দৃষ্টান্ত দেখতে পাই।
মনে করুন, আপনি জানেন অমুক ব্যক্তি আপনার প্রতিবেশী। কিন্তু এতটুকু জানা যথেষ্ট হয় না, বরং আপনি তাঁর ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে চান। আপনি তার জ্ঞান সম্পর্কে জানতে চান, তার চরিত্র-মাধুর্য সম্পর্কে জানতে চান; জানতে চান তার কাজকর্ম ও অবস্থান সম্পর্কে। মানুষের মধ্যেই এমন জানার আগ্রহ থাকে।
আল্লাহর নামগুলো ও গুণাবলি জানা ছাড়া তাঁর পরিচয় সঠিকভাবে জানা যায় না। এজন্য আল্লাহর সুন্দর নাম ও উত্তম গুণাবলি জানা তাঁর প্রতি ঈমানের অপরিহার্য বিষয়।
প্রকৃতপক্ষে পুরো বিশ্বজগৎই আল্লাহ তাআলার নামগুলোর বিমূর্ত রূপ। বিশ্বজগতের মধ্য দিয়ে আল্লাহর নামগুলো ভাস্বর হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা আল্লাহ তাআলাকে অনুধাবন করতে পারি না। এ মর্মে কুরআনুল কারিমে তিনি বলেছেন-
لَّا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
কোনো দৃষ্টি তাঁর নাগাল পায় না, কিন্তু সকল দৃষ্টি তিনি নিজের নাগালেই রাখেন। তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ। [১]
দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলাকে দেখা অসম্ভব, কিন্তু সৃষ্টির মাঝে আপনি তার সত্তার পরিচয় লাভ করতে পারবেন। কারণ সৃষ্টি সৃষ্টিকর্তার প্রতি ইঙ্গিত করে। অগণিত তারকারাজি সজ্জিত আকাশ, অসংখ্য গিরিপথ ছড়িয়ে থাকা পৃথিবীও কি একজন মহাপ্রজ্ঞাবান, সর্বজ্ঞ সত্তার অস্তিত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে না?
প্রিয় ভাই, আল্লাহ তাআলাকে চেনা কেন আমাদের জন্য আবশ্যক?
আমরা যেন তাঁর ইবাদত করতে পারি।
আমরা কেন তাঁর ইবাদত করব?
দুনিয়া ও আখিরাতে যেন তাঁর নৈকট্য লাভ করে সৌভাগ্যবান হতে পারি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন সৌভাগ্যবান করার জন্য। তাঁকে ছাড়া আমরা সৌভাগ্যবান হতে পারব না। তাঁর ব্যাপারে ভালোভাবে না জানলে সৌভাগ্যবান হতে পারব না। আর যদি তাঁর মহত্ত্ব সম্পর্কে না জানি, তাহলে আমাদের জ্ঞানও ভালো হবে না। এজন্য আমাদের রব একজন জাহান্নামির বর্ণনা করে বলেছেন-
إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ
সে তো মহান আল্লাহর সত্তায় বিশ্বাসী ছিল না [১]
আপনাকে মহান আল্লাহর মহত্ত্ব সম্পর্কে জানতে হবে। যদি আপনি আল্লাহর মহত্ত্ব সম্পর্কে না জানেন, তাহলে তাঁর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে বসবেন, তাঁর নির্দেশ অমান্য করে ফেলবেন। অপরদিকে যদি আল্লাহর মহত্ত্ব সম্পর্কে জানেন, তাহলে তাঁর ব্যাপারে সেই আচরণই করবেন-যা তাঁর মহত্ত্ব ও পূর্ণতার উপযুক্ত।
এক্ষেত্রে অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন: আপনার কাছে যদি উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তার পক্ষ থেকে স্বাক্ষরিত কোনো নির্দেশ আসে, তাহলে সেই নির্দেশের প্রতি আপনার শ্রদ্ধা-সম্মান ও গুরুত্ব থাকবে অনেক বেশি। যদি তার থেকেও বড় কোনো কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আসে, তাহলে সেই নির্দেশের প্রতি গুরুত্ব থাকবে আরও বেশি। অর্থাৎ পদমর্যাদা যত বেশি হবে, তার প্রতি আপনার শ্রদ্ধা-সম্মানও তত বেশি হবে। যদি কোনো সেনাপ্রধান আপনাকে কোনো নির্দেশ দেয়, তাহলে সেই নির্দেশের প্রতি আপনার মনোভাব কেমন হবে? এটাও তো হবে তার পদমর্যাদা অনুযায়ী।
মোটকথা আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে আপনাকে আরও জানতে হবে; যেন আপনি তাঁর আনুগত্য করতে পারেন, হতে পারেন তাঁর অভিমুখী। তাঁর নিয়ামতের প্রত্যাশা করা, তাঁর ভীতিপ্রদর্শনে ভীত হওয়া আপনার জন্য সহজ হয়। আপনি তখনই তাঁর নিয়ামতের প্রত্যাশা করতে পারবেন, তাঁর অভিমুখী হবেন, তাঁর পথে অগ্রসর হতে পারবেন, তাঁর ফয়সালা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেবেন, তাঁর নির্দেশ সন্তুষ্টচিত্তে মানতে সক্ষম হবেন—যখন তাকে চিনতে পারবেন, তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হবেন, দেখতে পাবেন বহু প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের ছটা, তাঁর দয়ামায়া, কোমলতা ও ন্যায়বিচারের চরম পরাকাষ্ঠা।
তাই যখন তাকে চিনবেন, তখন তাঁর সামনে বিনয়ী হবেন, আত্মসমর্পন করবেন। তাঁর নির্দেশ পালন করতে দ্বিধা হবে না। তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকবেন। তাঁর বান্দাদের প্রতিও মনোনিবেশ করবেন, তাদের সেবা করবেন।
তাই আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলাকে চেনা খুব জরুরি। 'আল্লাহ তাআলা সমগ্র বিশ্বজগতের 'সৃষ্টিকর্তা'—শুধু এতটুকু জানা অতি সাধারণ জ্ঞান। এই জ্ঞান আপনাকে হারাম বিষয়গুলো থেকে দূরে রাখতে পারবে না। সামগ্রিকভাবে এতটুকু জ্ঞান আপনাকে আল্লাহর আনুগত্যে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যর্থ হবে। আপনি হয়তো বলবেন, আল্লাহ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা; অথচ আপনার সামনে বহু বিরোধ বিদ্যমান থাকবে, থাকবে বহু বিচ্যুতি ও পার্থিব কামনা-বাসনা।
পক্ষান্তরে যদি আপনি আল্লাহকে জানেন, তবে আপনার অবস্থা হবে ভিন্ন। আপনার এই জ্ঞান যত বাড়তে থাকবে, আল্লাহর প্রতি আপনার বিনয়, আনুগত্য, ভয়, নিবেদন, সমর্পণ, সন্তুষ্টি, ত্যাগ ও একনিষ্ঠতাও তত বাড়বে। অর্থাৎ আপনার আমল হবে জ্ঞানের পরিমাণ অনুযায়ী এবং সৌভাগ্যও হবে আমলের পরিমাণ অনুযায়ী।
এই বিবেচনায় আমরা বলতে পারি, সমগ্র দ্বীনকে ৩টি শব্দে ব্যক্ত করা যায়। তা হলো—এক. জ্ঞান বা মারেফত। দুই. আনুগত্য। তিন. সৌভাগ্য।
মারেফত অনুযায়ী আপনি আল্লাহর আনুগত্য করবেন এবং আনুগত্যের পরিমাণ অনুযায়ী সৌভাগ্য লাভ করবেন।
সুতরাং এই সুন্দর নামগুলোর সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা জানাই যথেষ্ট নয়; বরং সৃষ্টিজগৎ থেকে এই নামগুলোর হাজারো দলিল-প্রমাণ খুঁজে বের করা উচিত। এজন্য আল্লাহকে চিনতে পারার একটি নিদর্শন হলো, দীর্ঘ সময় আপনার মুখে আল্লাহর নামগুলো উচ্চারিত হবে।
আমি আশা করি, এই বিষয়ে আপনি ব্যক্তিগতভাবে গবেষণা করবেন। আল্লাহর নামগুলোর সুস্পষ্ট প্রমাণ আবিষ্কারের জন্য এই মহাবিশ্বে আপনার পরিভ্রমণ হবে। আমাদের প্রতিটি মূহূর্ত আল্লাহর কোনো একটি নামের সাথে অতিবাহিত করা উচিত।
প্রিয় পাঠক, খুলির মাঝে মস্তিষ্কের অবস্থান 'আস-সালাম' (নিরাপত্তাদানকারী) নামের নিদর্শন। মেরুদণ্ডের হাড়ের মাঝে স্পাইনাল কর্ডের অবস্থান 'আস-সালাম' নামের নিদর্শন। অস্থিমজ্জায় লোহিত কণিকার কার্যক্রম, বুকের মাঝে হৃৎপিণ্ডের অবস্থান, অক্ষিগোলকে চোখের অবস্থান, নারীদেহে গর্ভাশয়ের অবস্থান, চামড়া, পেশীর ভেতরে ধমনি ও বাইরে শিরার অবস্থান, হৃৎপিণ্ডে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, একটি ধমনি ব্লক হলে অন্য ধমনি খুলে যাওয়া, দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকার পর হাড় পুনরায় সেরে ওঠা, আঘাত কিংবা ক্ষত সেরে ওঠা-এসবই আল্লাহর 'আস-সালাম' নামের নিদর্শন। মানব-সৃষ্টির মাঝে এমন বহু নিদর্শন বিদ্যমান রয়েছে। উদ্ভিদজগতেও রয়েছে 'আস-সালাম' নামের বহুনিদর্শন। গাছ যদি পানিশূন্য হয়ে পড়ে, তাহলে প্রথমে পাতার পানি শেষ হয়, তারপর শেষ হয় ডালপালার পানি। ডালপালার পানির শেষ হওয়ার পর শেষ হয় কাণ্ডের পানি। প্রাণীর যে পশম শীত-গ্রীষ্মে সুরক্ষা দেয়, তা-ও 'আস-সালাম' নামের প্রমাণ। এভাবে ভাবতে ভাবতে একসময় আপনি পৌঁছে যাবেন আল্লাহর পরিচয়ের গভীরতম স্তরে, অর্জন করবেন আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের বিস্তৃত জ্ঞান।
এই পর্যায়ে আমরা আলোচনা করব আল্লাহ তাআলার 'আল-মুমিন' )الْمُؤْمِنِ( নাম নিয়ে।
দুনিয়ার রাজা-বাদশা চায় না, কোনো প্রজার নাম তার নামের মতো হোক; অথচ রাজা-বাদশাগণ আমাদের মতোই মানুষ। আমাদের মতো তারা পানাহার করে, ঘুমায়। আমাদের মতোই তাদের শরীর রয়েছে। তারাও পিপাসার্ত হয়, রাগান্বিত হয়, উত্তেজিত হয়। আমাদের মতো অসুস্থ হয়; মৃত্যুবরণ করে।
শারীরিক দৃষ্টিকোণ থেকে একজন রাজা ও একজন প্রজার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারপরও প্রজাদের কেউ তার নাম ধারণ করলে তার সম্মান ও অহমিকায় লাগে। অথচ আমরা আল্লাহকে চেনার পরও, তাঁর নির্দেশ পালন করার পরও তিনি আমাদের নাম দিয়েছেন মুমিন। অথচ তাঁর নিজের নামও 'আল-মুমিন'। আল্লাহ তাআলা বলেন-
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴿﴾
তিনি আল্লাহ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনিই অধিপতি, চিরপবিত্র, শান্তিদাতা, নিরাপত্তাদাতা, পরাক্রমশালী, প্রতাপশালী, নিরঙ্কুশ বড়ত্বের অধিকারী। তারা (তাঁর সাথে) যা কিছু শরিক করে, তা থেকে তিনি চিরপবিত্র।[১]
কিন্তু এই নামটি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আল্লাহ তাআলা 'মুমিন'; যার শাব্দিক অর্থ বিশ্বাসী। আমরা আল্লাহর প্রতি 'মুমিন' (বিশ্বাসী), আল্লাহর রাসুলের প্রতি 'মুমিন'। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কার প্রতি 'মুমিন'?
'মুমিন' (مُؤْمِنِ) শব্দটি নির্গত হয়েছে 'আমনুন' (أَمْن) ও 'আমানুন' (آمن) ক্রিয়ামূল থেকে। 'মুমিন' শব্দটির দুটি অর্থ রয়েছে—
১. 'তাসদিক' (تصدیق) বা সত্যায়ন করা। সালাতে ইমাম যখন সুরা ফাতিহা পাঠ করেন এবং তা শেষ হলে আমরা বলি, 'আমিন'; তখন আমরা মূলত ইমামের বক্তব্যকে সত্যায়ন করি।
এ হিসেবে 'মুমিন' শব্দটি হয়তো এসেছে 'তাসদিক' (সত্যায়ন) থেকে। কুরআনের একটি আয়াত 'তাসদিক' বা সত্যায়নের অর্থকে জোরদার করে। আয়াতটি হলো—
قَالُوا يَا أَبَانَا إِنَّا ذَهَبْنَا نَسْتَبِقُ وَتَرَكْنَا يُوسُفَ عِندَ مَتَاعِنَا فَأَكَلَهُ الذِّئْبُ وَمَا أَنتَ بِمُؤْمِنٍ لَّنَا وَلَوْ كُنَّا صَادِقِينَ ﴿﴾
তারা বলল, 'বাবা, আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করতে গিয়েছিলাম এবং ইউসুফকে রেখে গিয়েছিলাম আমাদের মালপত্রের কাছে। কিন্তু এরপর তাকে বাঘে খেয়ে ফেলে। আপনি তো আমাদের (কথা) বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী।[২]
এই আয়াতে 'মুমিন' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে 'তাসদিক' বা সত্যায়নের অর্থে।
২. অপর অর্থটি আসে 'আমনুন' বা নিরাপত্তা থেকে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
الَّذِي أَطْعَمَهُم مِّن جُوعٍ وَآمَنَهُم مِّنْ خَوْفٍ )
যিনি ক্ষুধায় তাদেরকে আহার দিয়েছেন আর তাদেরকে দিয়েছেন ভয় থেকে নিরাপত্তা [১]
সুতরাং আল্লাহ তাআলার 'আল-মুমিন' নামটি গ্রহণ করা হয়েছে 'তাসদিক' (সত্যায়ন) কিংবা 'আমনুন' (নিরাপত্তা) থেকে।
'তাসদিক' বা সত্যায়নের অর্থে আমরা আল্লাহর এই নামকে কীভাবে বুঝব?
বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ নিজের সত্তাকে কখনোই চিনতে পারে না। মানুষ যখন নিজের সত্তা চিনতে না পারার অক্ষমতা নিয়ে তার স্তরের চেয়ে ঊর্ধ্বের কোনো বিষয়ে জানতে প্রবৃত্ত হয়, তখন সে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হায়, মানুষ যদি জানত তার কী সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাহলে সে এই স্পর্ধা আর করত না!
এই মানুষ তার আওতার বাইরের বিষয় জানতে চায়; অথচ নিজের বাস্তবতাই জানে না, জানে না তার সক্ষমতার সীমা-পরিসীমা। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে পারে, তার সমস্ত কাজ সহজসাধ্য হয়। এটাই বাস্তবতা।
'আল-মুমিন' নামের প্রথম অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজ সত্তার ব্যাপারে সম্যকভাবে জানেন। তাঁর গুণবাচক নামগুলো ও তাঁর সমস্ত সক্ষমতা ও মহিমার ব্যাপারেও সুষ্পষ্টভাবে জানেন।
দ্বিতীয় অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলগণকে সত্যায়ন করেন। তিনি নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লামকে রাসুলরূপে পাঠিয়েছেন এবং তাকে সত্যবাদী সাব্যস্ত করেছেন; মুজিযার কারণে মানুষ তাকে সত্যবাদী মনে করেছে। তিনি মুসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেছেন এবং তাকে সত্যবাদী সাব্যস্ত করেছেন; মুজিযা দেখে মানুষ তাকে সত্যায়ন করেছে। ঈসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করে তাকে মুজিযা দান করেছেন, যাতে মানুষ তাকে সত্যবাদী মনে করে। অর্থাৎ মুমিনদের আল্লাহ যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁর কাজগুলো সেই প্রতিশ্রুতির সত্যায়ন রূপেই প্রতিভাত হয়।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যখন আপনি উত্তম জীবনযাপন করেন, তখন তিনি আপনাকে সত্যায়ন করবেন। এক্ষেত্রে তাঁর কাজ তাঁর প্রতিশ্রুতির সত্যায়নরূপে দেখা দেবে। আল্লাহ কর্তৃক নবিদের সত্যায়ন করার অর্থ হলো, তিনি তাদের এমন প্রমাণ দান করেন-যা দেখে মানুষ তাদেরকে সত্যায়ন করে।
প্রিয় পাঠক, আপনি যখন কুরআন তিলাওয়াত করেন, তখন কোন জিনিস আপনাকে কুরআনের সাথে জড়িয়ে রাখে? কেন আপনি কুরআন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন না?
এর কারণ হলো, তখন আপনার যাপিত জীবনের সমস্ত ঘটনাকে কুরআন সত্যায়ন করে। বেচাকেনার পেশায় নিয়োজিত হলে আপনি প্রশান্তি অনুভব করবেন, কেননা আল্লাহ তাআলা আপনার উত্তম আয়ের বন্দোবস্ত করবেন। মানুষকে আপনার দিকে টেনে নিয়ে আসবেন। যদি আপনি সৎ ও বিশ্বস্ত হন, তাহলে আল্লাহ আপনাকে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা দান করবেন। আল্লাহ আপনাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যদি আপনি তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন, তবে আপনার জীবনের সবকিছু তাঁর প্রতিশ্রুতিকে সত্যায়ন করবে।
এজন্য 'আল-মুমিন'-এর একটি অর্থ হলো, তিনি তাঁর নবিদের সত্যায়িত করেন, তাদেরকে মুজিযার মাধ্যমে শক্তিশালী করেন। তিনি কুরআনকেও সত্যায়নকারী সাব্যস্ত করেন এই অর্থে-আপনি যদি তাঁর প্রতি ঈমান আনেন এবং নেক আমল করেন, তাহলে তিনি আপনাকে উত্তম জীবন দান করবেন। কুরআনের মাধ্যমেই আপনি এই উত্তম জীবনকে সত্যায়ন করবেন। সংকীর্ণ জীবনও এর মাধ্যমে সত্যায়িত হবে।
আপনি যদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা অনুযায়ী চলেন, তাহলে দেখতে পাবেন-সবকিছুই কুরআনের বাণী দ্বারা সত্যায়িত। এজন্য আল্লাহ 'মুমিন'; তিনি তার বান্দাদের সত্যায়িত করেন। কারণ আল্লাহর সমস্ত কাজ, তাঁর শাস্তি ও প্রতিদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে সত্যায়িত করে।
এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ
নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের রক্ষা করেন। কোনো বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে আল্লাহ পছন্দ করেন না।[১]
আপনি এমন অনেক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন-যখন আল্লাহ আপনার জন্য অচেনা কোনো ব্যক্তিকে নিযুক্ত করে দেন; আল্লাহপ্রদত্ত অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি আপনাকে রক্ষা করেন। তখন অনুভব করবেন, আপনি হিদায়াত ও সুপথপ্রাপ্ত। অনুভব করবেন, আপনার সঠিক দৃষ্টি রয়েছে; রয়েছে কার্যকর দূরদর্শিতা। বিভিন্ন ঘটনায় আপনার বিশ্লেষণ সঠিক হয়। কারণ আপনি আল্লাহর নির্দেশের অনুসরণ করেন। তাই আপনার জীবনের ঘটনাপ্রবাহ আল্লাহর বাণীর সত্যায়ন রূপে প্রতিভাত হয়। এটি হলো 'আল-মুমিন'-এর একটি অর্থ।
আমাদের দ্বীনের চমৎকার একটি ব্যাপার হলো, আপনি যেখানেই থাকুন, যেভাবেই থাকুন; পরিস্থিতি যত পরিবর্তিত হোক, যত নিত্যনতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন প্রকাশিত হোক; এই দ্বীন আপনাকে বিশ্বজগৎ, জীবন ও মানুষের ব্যাখ্যা দেবে। যত নতুন ও অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটুক না কেন, সবই আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত বিশ্বজগৎ, জীবন ও মানুষের ব্যাখ্যার আওতায় থাকবে।
যখন আপনি কুরআন তিলাওয়াত করবেন, তখন কিছুতেই আপনি এমন ঘটনার সম্মুখীন হবেন না-যার ব্যাপারে কুরআন আপনাকে কোনো সমাধান দেয়নি। হয়তো আপনি কোনো ঘটনার নিজস্ব ব্যাখ্যা দিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হবে সেখানে এমন কোনো বিষয় রয়ে গেছে, যা আপনার দৃষ্টিভঙ্গিকে নাকচ করছে। এমন অনেক দর্শনের আগমন ঘটেছে, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ যেগুলোকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছে। পক্ষান্তরে যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করেন, তাহলে এমন কোনো ঘটনা আপনার জীবনে ঘটবে না, যা কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে পারে।
এটি অতিসূক্ষ্ম একটি বিষয়। কারণ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ বছর পূর্বে। এই সাড়ে চৌদ্দশ বছরে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে। মানবজাতি সৃষ্টির থেকে একধাপে ৫০ বছর আগ পর্যন্ত এবং আরেক ধাপে ৫০ বছর আগে থেকে আজকের দিন পর্যন্ত কুরআনের সমস্ত দর্শনই সঠিক ও সুসাব্যস্ত প্রমাণিত হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়-কুরআন তিলাওয়াত করলে আপনি নিশ্চিন্ত হবেন, প্রশান্তি লাভ করবেন।
বিশ্বজগতের সমস্ত সৃষ্টি, ছায়াপথ, গ্রহ-নক্ষত্র, তরুলতা, জীবজন্তু, মানবজাতি; সবকিছুর গতিময়তা ও স্পন্দন আল্লাহর কালামের সত্যায়নকারীরূপে উদ্ভাসিত হয়। তাই আল্লাহ তাআলা 'আল-মুমিন'। তাঁর কালাম 'আল-কুরআন' আপনাকে সত্যায়ন করায়। এটি 'আল-মুমিন'-এর একটি অর্থ।
আরেকটি অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা মানুষকে 'আমান' বা নিরাপত্তা দান করেন। এটি কীভাবে দেন?
এই অর্থটি একটু সূক্ষ্ম। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ: লোহা কখনো শক্ত হয়, আবার কখনো নরম হয়। লোহার রড দিয়ে ভবন নির্মাণ করার পর কি আপনি আশঙ্কায় থাকেন-খানিক বাদে রড নরম হয়ে যাবে, ধসে পড়বে ভবনটি? আল্লাহ তাআলা লোহার নির্দিষ্ট কিছু প্রকৃতি নির্ধারণ করেছেন। ভিন্ন অবস্থায় লোহা ভিন্ন প্রকৃতি ধারণ করে। লোহাকে সিমেন্ট-ইট-সুরকির সাথে মিলিয়ে ভবন নির্মাণ করে যখন সেই ভবনের বহুতলে অবস্থান করেন, তখন কিন্তু আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। আপনাকে তখন কোন জিনিসটি নিশ্চয়তা দেয়? লোহার স্থিতিস্থাপকতার গুণ আপনাকে এই নিশ্চয়তা দেয়। লোহার এই গুণ যদি পাল্টে যেত, তবে বহুতল ভবন ধসে পড়ত চোখের পলকে। সুতরাং আমরা বলতে পারি, বিভিন্ন বস্তুর বৈশিষ্ট্যি মানুষকে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা দেয়।
পৃথিবীতে ভূকম্পনের স্থিতিশীলতা অব্যাহত রয়েছে সৃষ্টির শুরু থেকে। পৃথিবীর ঘূর্ণনের সময় যদি সামান্য পরিমাণ কম্পনও সৃষ্টি হয়, তাহলে সমস্ত ভবন ধসে পড়বে; ধ্বংস হবে সবকিছু। পৃথিবীর কক্ষপথের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার। এমন গতি সত্ত্বেও পৃথিবীতে আশ্চর্যজনক স্থিতি বিরাজ করছে। এই স্থিতির গুরুত্ব জানানোর জন্য যেন মাঝে মাঝে কোনো শহরে শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়, মুহূর্তেই ওলটপালট হয়ে যায় পুরো শহর। ঘূর্ণন ও গতিশীলতা সত্ত্বেও পৃথিবীর স্থিতিশীলতা আল্লাহর এই বাণীকে সত্যায়িত করে-
أَمَّن جَعَلَ الْأَرْضَ قَرَارًا وَجَعَلَ خِلَالَهَا أَنْهَارًا وَجَعَلَ لَهَا رَوَاسِيَ وَجَعَلَ بَيْنَ الْبَحْرَيْنِ حَاجِزًا أَإِلَهٌ مَّعَ اللَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ﴿٦১﴾
নাকি তিনি—যিনি পৃথিবীকে করেছেন স্থিতিশীল এবং তার মাঝে সৃষ্টি করেছেন নদনদী। তাতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা আর দুই সমুদ্রের মাঝে রেখেছেন একটি অন্তরায়। আছে কি আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্য? বরং তাদের অধিকাংশই (সত্য) জানে না।[১]
তিনিই আল্লাহ, যিনি আপনাকে এ সমস্ত অবস্থায় আমান ও নিরাপত্তা দান করেছেন।
মনে করুন, কোনো নিরাপদ ভবনের ১০ তলায় আপনি একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। আপনি জানেন, ফ্ল্যাটটি স্থিতিশীল ও বসবাসযোগ্য। কিন্তু সেই নিরাপদ ভবনই যদি ভূমিকম্পের কবলে পড়ে, তাহলে সমস্ত নিরাপত্তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। যদি সেখানে স্থিতিশীলতা না থাকে, তবে হারিয়ে যাবে জীবনের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা।
ধরুন, কোনো ফসল ফলানোর জন্য তরমুজের বীজ কিনে আনলেন। তারপর চাষও করলেন। কিন্তু সমস্ত তরমুজ ধরল একবারে। তাহলে কিন্তু অবস্থা বেগতিক হয়ে পড়বে। বীজের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বজায় থাকাও একটি নিয়ামত; এক ধরনের নিশ্চয়তা। আবার সব বীজ একরকম বৈশিষ্ট্যের নয়।
প্রতিটি উদ্ভিদ ও তৃণলতার আছে হাজারো রকমফের। কোনো জাতের ফল দেরিতে আসে, কোনোটির আসে তাড়াতাড়ি। কোনো জাতের হয়তো কৃত্রিমভাবে প্রজনন ঘটাতে হয়, আবার কোনোটি হয় আপনা-আপনি। কোনো ফসল স্থানান্তর করা যায়, কোনোটি-বা দ্রুতই নষ্ট হয়ে যায়। কোনো ফল হয়তো ডাইনিং টেবিলে আসে, আবার কোনো ফল লড়াই করে নির্দিষ্ট রোগব্যাধির বিরুদ্ধে।
এমনকি বীজেরও থাকে সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য। আপনি যখন বীজ বপন করেন, তখন কোন জিনিস আপনাকে ফসলের নিশ্চয়তা দেয়? বৈশিষ্ট্যের স্থায়িত্ব আপনাকে নিশ্চিত করে। তাহলে আমরা বলতে পারি, বস্তুর বৈশিষ্ট্যের স্থায়িত্ব মানুষকে 'আমান' ও নিরাপত্তা দেয়।
সূর্য সবসময় পূর্বদিগন্তে উদিত হয়; এর কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। সূর্য উদিত হওয়ার জন্য আমাদের কোনো দুআর প্রয়োজন হয় না। আমাদের বলতে হয় না— 'হে রব, আজ সূর্য ওঠেনি। দয়া করে সূর্য উদিত করুন'। প্রতিদিন একই নিয়মে সূর্য উদিত হচ্ছে এবং অস্ত যাচ্ছে।
কবে থেকে চলছে এ নিয়ম? ৫০ কিংবা ৬০ বছর ধরে?
কতদিন ধরে চলবে? আগামী ১০০ কিংবা ১ হাজার বছর?
আগামী ১ লক্ষ বছর থেকে দুনিয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত?
এর চেয়ে অতিসূক্ষ বিষয় মিনিট ও সেকেন্ডের হিসাব। পুরো পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করে। বেশকিছু গ্রহ-নক্ষত্রের ওপর নির্ভর করে সময় ঠিক করা হয়। এই সময়ই সারাবিশ্বে প্রসিদ্ধ। কেউ হয়তো বলে, আমি বিগব্যাং ক্লক দেখে আমার ঘড়ির সময় ঠিক করেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রসিদ্ধ ঘড়িটির সময় তাহলে কীভাবে ঠিক করা হয়? আমাদের হাতের ঘড়ি যদি সেই ঘড়ি দেখে ঠিক করা হয়, তাহলে সেই ঘড়িটি ঠিক করা হয় কী দেখে? সেই ঘড়ির সময় ঠিক করা হয় নক্ষত্রের অবস্থান দেখে। সুতরাং ঘূর্ণনের স্থায়িত্ব, গতিশীলতা ও দ্রুততার স্থায়িত্ব মানুষকে সুনির্ধারিত ব্যবস্থা দেয়—যার মাধ্যমে মানুষ নিরাপদ অনুভব করে।
আমরা বলতে পারি, ধাতব বস্তুর স্থিতিস্থাপকতার গুণ অপরিবর্তিত। ধরুন, কোনো ব্যক্তি লাখ টাকা খরচ করে স্বর্ণের চুড়ি কিনল। কিছুদিন পর সেই স্বর্ণের চুড়ি লোহার চুড়িতে রূপান্তরিত হলো। এমনটি কখনো হতে পারে না। সোনা-রুপা, লোহা-এলুমিনিয়াম; সবই আপন অবস্থায় বহাল থাকে। ধাতব বস্তুর এই স্থিতিশীলতা মানুষকে নিরাপত্তা দেয়। এটি অনেক বড় নিয়ামত; কিন্তু আমরা তা অনুধাবন করি না। কারণ এটি আমাদের কাছে অতি স্বাভাবিক বিষয়। বলা হয়, অতি কাছে থাকাও দৃষ্টির আড়ালে থাকার মতো। এই নিয়ামত আমাদের কাছে এত বেশি সাধারণ যে, বড় নিয়ামত হওয়া সত্ত্বেও যেন তা আমাদের আড়ালেই রয়ে গেছে।
তাই আল্লাহর একটি নাম 'আল-মুমিন'। আপনি যখন তাঁর কিতাব তিলাওয়াত করবেন, তখন সবকিছু তাঁর বাণীর সত্যায়নকারীরূপে দেখা দেবে। তিনি 'আল-মুমিন' বলেই ধাতব বস্তুর বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত রাখার মাধ্যমে মানুষকে নিরাপত্তা দান করেন।
প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ও গতিশীলতা সুসাব্যস্ত বিষয়। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণও সুসাব্যস্ত। একইভাবে সুসাব্যস্ত মানবদেহের কার্যক্রম। পৃথিবীর একপ্রান্তে কোনো চিকিৎসক হয়তো একটি ঔষধ তৈরি করছেন; সেই ঔষধ ব্যবহৃত হচ্ছে পৃথিবীর অপর প্রান্তে। সেই ঔষধটি কাজ করছে এই শরীরে। এর থেকে কী বুঝতে পারি?
আমরা বুঝতে পারি, সমস্ত আদমসন্তানের দেহ একই ধাঁচে গড়া। এখানেও রয়েছে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা। এক্ষেত্রে আমরা হার্ট বা হৃৎপিণ্ডকেও উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করতে পারি।
এমন চিকিৎসকের সাক্ষাৎ আপনি পেতে পারেন, যিনি আমেরিকায় কার্ডিওলজি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য গিয়েছেন। তিনি যদি আফ্রিকা, এশিয়া, ওশেনিয়া, ইউরোপ কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে গিয়ে হার্ট খুলে দেখেন, তাহলে দেখতে পাবেন-শিরা-উপশিরা; সবই সনিপুণভাবে রয়েছে। চিকিৎসাবিদ্যা শেখার জন্য একজন মানুষকে বিশ্লেষণ করাই যথেষ্ট। কারণ যতজন মানুষের চিকিৎসাই করা হবে, তাদের সবার শিরা-উপশিরা, ধমনি ও মাংসপেশি একই ধাঁচের। প্রাকৃতিক ব্যবস্থার স্থিতির মতো উপাদানসমূহের বৈশিষ্ট্যও স্থিতিশীল।
কখনো আল্লাহ তাআলা উপাদানগুলোকে বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যও দান করেন। যেমন: আগুন জ্বালিয়ে দেয়; আবার পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। অর্থাৎ তিনি প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসের জন্য ঝুঁকির দাবি অনুযায়ী জিনিস দান করেন। এজন্যই আল্লাহর নাম 'আল-মুমিন'; তিনি মানুষকে 'আমান' বা নিরাপত্তা দান করেন।
বিজ্ঞানীরা ব্যথাকে বলেন আগام সতর্কতা। মানুষ দাঁতের প্রতি যত্নবান না হওয়ার কারণে দাঁতব্যথায় আক্রান্ত হয়; চিকিৎসা নিতে দন্তচিকিৎসকের কাছে যায়। তখন চিকিৎসক তার দাঁতটি রক্ষা করেন। যদি ব্যথা অনুভব করার মতো কোনো স্নায়ু না থাকত, তাহলে এই দাঁতটির কোন সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া হতো না। এজন্য ব্যথা একটি অন্যতম সতর্কব্যবস্থা। পৃথিবীর সমস্ত ক্ষতিকর বস্তু বা বিষয়ের জন্যই আল্লাহ তাআলা সুরক্ষাব্যবস্থা রেখেছেন।
মানুষ যখন আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাআলা তখন তাকে গুনাহের বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করেন। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই কাছে সাহায্য চাই [১]
আপনি যদি মুমিন ও মুশরিক বা কাফির-জীবনের মাঝে মৌলিক পার্থক্য দেখতে চান, তাহলে দেখবেন মৌলিক পার্থক্য হলো, 'আমান' বা নিরাপত্তা।
এই ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُم بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالْأَمْنِ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
তোমরা যাদেরকে শরিক সাব্যস্ত করো, আমি কোন যুক্তিতে তাদের ভয় করব-যেখানে তোমরা আল্লাহর সাথে এমনসব বস্তুকে শরিক করতে ভয় পাও না, যাদের সম্পর্কে তিনি তোমাদের কাছে কোনো প্রমাণ পাঠাননি? সুতরাং তোমাদের জানা থাকলে বলো, দুই দলের মধ্যে কোন দল নিরাপত্তা লাভের বেশি হকদার?[২]
আপনি দেখবেন, দুনিয়াদারদের হৃদয় শূন্য। তাদের হৃদয় হয়ে আছে ভয়ভীতি, দুশ্চিন্তা-উদ্বিগ্নতা ও সম্ভাব্য বিপদের ভাগাড়। কিন্তু যখন মহান রবের প্রতি ঈমান আনবেন, তখন তিনি আপনার হৃদয় নিশ্চয়তা ও প্রশান্তিতে পূর্ণ করে দেবেন। আপনার হৃদয় পূর্ণ করে দেবেন তাঁর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি, তাঁর মারিফাত তথা পরিচয় দিয়ে। এসবই আল্লাহর 'আল-মুমিন' নামের বহিঃপ্রকাশ।
এখানে আরেকটি বিষয় আলোচিত হতে পারে। তা হলো, আখিরাতে আপনি কীভাবে আল্লাহর আজাব থেকে 'আমান' বা নিরাপত্তা লাভ করতে পারবেন?
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, বিবেকবুদ্ধি দান করেছেন; প্রদান করেছেন স্বভাবজাত চাহিদা ও কামনা, ভালোমন্দ নির্বাচনের শক্তি ও যোগ্যতা। এসবই আখিরাতে মুক্তি লাভের উপাদান। আল্লাহর অভিমুখী হলে আপনি উদ্বিগ্নতা, অসুস্থতা, সংকীর্ণতা ও ভয়ভীতি থেকে নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা অনুভব করবেন। কারণ আল্লাহই মানুষের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার উৎস। বিভিন্ন বিষয় আপনাকে উৎকণ্ঠিত করতে পারে।
কিন্তু আপনি যখন আল্লাহর 'আল-মুমিন' নাম নিয়ে চলবেন, তাঁর আদেশ মেনে চলবেন, তখন আপনি শান্তি ও নিরপত্তার মাঝে থাকবেন। তিনি আপন সত্তার ব্যাপারে সম্যক অবগত। এমনও মানুষ রয়েছে, যে নিজের সক্ষমতার কথা জানে না। ফলে সে কোনো কাজ করে অনুতপ্ত হয়ে বলে, 'আমি তো জানতাম না। কিন্তু আমাদের রব সবই জানেন। তাঁর সমস্ত নামই সুন্দর, তাঁর সব গুণই শ্রেষ্ঠ। তিনি সবকিছুই জানেন।'
এটি হচ্ছে 'আল-মুমিন' নামের প্রথম অর্থ। আপনি যেমন তাঁর প্রতি 'মুমিন' (বিশ্বাসী), ঠিক তেমনই তিনি নিজেও নিজ সত্তার প্রতি 'মুমিন'।
আমাদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের জ্ঞান সম্পর্কে অবগত এমন ব্যক্তিরা হলেন আলিম। এমন ব্যক্তির অনুসরণ করবেন।
আবার এমন মানুষও আছে, যারা নিজেদের কাজের ব্যাপারে অবগত নন। এমন মানুষ হলো উদাসীন। তাদের জাগিয়ে তুলুন।
এমন মানুষও আছে, যারা জ্ঞানের অপব্যাবহার করে। এ ধরনের মানুষ দুষ্ট প্রকৃতির। এমন মানুষকে সতর্ক করুন।
আবার এমন মানুষও আছে, যাদের কোনো জ্ঞান নেই। এমন মানুষ হলো অজ্ঞ; তাকে শিক্ষা দিন।
মুমিন বলতে প্রথমোক্ত শ্রেণিকে বোঝানো হচ্ছে।
দ্বিতীয় অর্থটি হলো, সত্যায়ন করা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে আপনাকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, পৃথিবী ও আপনার যাপিত জীবনের ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত হওয়ার চেয়ে আল্লাহর কাছে বিশ্বজগৎ ধ্বংস হওয়াও সামান্য। বিষয়। তিনি আপনাকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহর সাহায্য অবশ্যম্ভাবী। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—আপনাকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করবেন, রিজিক দান করবেন, নিশ্চয়তা দেবেন, ক্ষমতা দান করবেন, আপনার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—আপনাকে তাঁর প্রতিনিধি বানাবেন, সর্বাবস্থায় সাহায্যে করবেন।
কুরআনুল কারিম থেকে আপনি এমন কিছু আয়াত বাছাই করুন, যেসব আয়াতে ঈমানের ফলাফল ও প্রতিদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যখনই কোনো আয়াত তিলাওয়াত করবেন, দেখতে পাবেন সবকিছু সেই আয়াতের কথাকে বাস্তবায়ন করছে। কারণ আল্লাহর কালাম সত্য। মানুষের সমস্ত কাজ আল্লাহর কালামকে সত্যায়ন করবে। এটি হলো 'আল-মুমিন'-এর দ্বিতীয় অর্থ।
তৃতীয় অর্থটি হলো, তিনি নিরাপত্তা দান করেন। এক্ষেত্রে আমরা মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কথা উল্লেখ করতে পারি। চোখের কথা ধরুন। আপনি যদি দিনের বেলায় গাড়ি নিয়ে বের হন, তাহলে নিরাপদ অনুভব করবেন। কারণ দিনের বেলায় দৃষ্টি বহুদূর প্রসারিত হয়। পক্ষান্তরে রাতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়; আপনি তখন অনিশ্চয়তা বোধ করবেন। রাতের সফরে সবসময় অনিশ্চয়তা সঙ্গী হয়; নানাবিধ আকস্মিক পরিস্থিতির সম্ভাবনা থাকে। কারণ যানবাহনের আলোয় সবকিছু দেখা যায় না। সেই আলোতে দৃষ্টির পরিধিও থাকে সীমাবদ্ধ। দৃষ্টি যত দীর্ঘ হয়, নিরাপত্তাও তত বেশি হয়।
আল্লাহ আপনাকে চোখ দিয়েছেন পথ দেখার জন্য। তিনি আপনাকে কান দিয়েছেন; রাতে কোনো শব্দ হলে সেটা শোনার জন্য। অর্থাৎ চোখ যেমন নিরাপত্তা লাভের মাধ্যম, কানও তাই।
খাবার যদি দুর্গন্ধ ছড়ায়, তখন বোঝা যায়, খাবারটি নষ্ট হয়ে গেছে। হয়তো এজন্য আল্লাহ নাককে মুখের ওপর রেখেছেন, যাতে আপনার খাবার হয় নিরাপদ।
তিনি আপনাকে হাত দিয়েছেন, যা দিয়ে আপনি ক্ষতি রোধ করেন। আপনাকে তিনি পা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে আপনি একস্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে পারেন। এসবই আপনার নিরাপত্তা বিধানের জন্য। এটি হলো 'আল-মুমিন' এর তৃতীয় অর্থ।
প্রশ্ন আসতে পারে—আল্লাহ তাআলার নামগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ক কী?
এই সম্পর্কের বেশ কয়েকটি দিক রয়েছে। আল্লাহ তাআলা 'মুমিন', তাই সবকিছু তাঁর কালাম কুরআনের সত্যায়নকারীরূপে প্রতিভাত হয়। এটি হলো সম্পর্কের একটি দিক।
আরেকটি দিক হলো, আল্লাহ তাআলা আমাদের নিরাপত্তা দিয়েছেন, দান করেছেন ইন্দ্রিয়শক্তি, নানা ধরনের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, বিভিন্ন উপকরণের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতির অপরিবর্তনশীল ব্যবস্থা।
দুদিন পূর্বে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন, 'মানুষের হৃৎপিণ্ড কিছুটা বাম পাশে থাকে। কিন্তু যদি কারও হৃৎপিণ্ড ডানপাশে থাকে কিংবা অন্য কোনো জায়গায় থাকে, তাহলে কেমন হবে?' সেই ডাক্তার যখন আমেরিকায় পড়েছেন, তখন তিনি পড়েছেন—হৃৎপিণ্ড বুকের বামপাশে থাকে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এসে তিনি দেখতে পেলেন, একজনের হৃৎপিণ্ড ডানপাশে![১] এমনটি তো তিনি পড়েননি।
শিরা-উপশিরাসহ শরীরিক সবদিক দিয়ে সকল মানুষের গঠন একই রকম। এই সাদৃশ্য ও ঐক্য আমাদের বড় ধরনের সুরক্ষা প্রদান করে। যেমনটি একটু আগেই উল্লেখ করেছি, পৃথিবী আপন কক্ষপথে প্রদক্ষিণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট। একইভাবে প্রতিদিন পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিচরণ করে। কিন্তু বৃষ্টিকে আল্লাহ সুনির্দিষ্ট করেননি; বরং পরিবর্তনশীল করেছেন। আমরা বৃষ্টি চেয়ে সালাত আদায় করি, আমাদের গুনাহের জন্য তাওবা করি।
মহান রব কিছু জিনিসকে সুনির্দিষ্ট করেছেন, কিছু জিনিসকে করেছেন অনির্দিষ্ট। পৃথিবীকে তার আপন কক্ষপথে এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে পূর্ব-পশ্চিমে বিচরণকে সুনির্দিষ্ট করেছেন, চাঁদকে সুনির্দিষ্ট করেছেন; সুনির্দিষ্ট করেছেন প্রকৃতির নিয়ম, বীজ ও উপাদানের বৈশিষ্ট্যকে। সবকিছুর ভিত্তিকে সুনির্দিষ্ট করেছেন। কিন্তু রিজিক রেখেছেন তাঁর হাতে। রিজিককে তিনি তাঁর দিকে ফিরে আসার, তাঁর অভিমুখী হওয়ার মাধ্যম করেছেন, যাতে আপনি গুনাহ থেকে তাওবা করেন।
এই পর্যায়ে একটি প্রশ্ন চলে আসে। তা হলো, মুমিন হিসেবে আল্লাহর কোন গুণে গুণান্বিত হওয়া উচিত?
আলিমগণ বলেন, 'মুমিন হিসেবে সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো, আপনার সমস্ত কাজ যেন আপনার কথার সত্যায়ন করে।' মুমিন হিসেবে আপনার মাঝে দ্বৈত অবস্থা সৃষ্টি হয়। একটি বাহ্যিক, অপরটি অভ্যন্তরীণ; একটি বিষয় আপনি বিশ্বাস করেন, আরেকটি মুখে প্রকাশ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَهُ إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الْإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوا يَقْتَرِفُونَ )
তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সব পাপ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় যারা গুনাহগার, অতিসত্বর তারা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি পাবে।[১]
আপনার বাহ্যিক অবস্থা হয়তো ঠিক আছে। সালাত, সিয়াম, হজ, যাকাত; দ্বীনের এসব মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর আমল করেন। কিন্তু মনের ভেতরে যদি হিংসা, পরনিন্দা, অহংকার, মিথ্যা, বিদ্বেষ, শত্রুতা-এসব থাকে, তাহলে সবই গোপন পাপ।
এজন্য মুমিন হিসেবে আপনার কর্তব্য হলো, আপনার কাজ যেন আপনার কথার সত্যায়ন করে। গোপন-প্রকাশ্য বলতে কিছু যেন না থাকে। দুটোই যেন এক হয়। ভেতর ও বাহির যেন না থাকে, যেন না থাকে গোপন ও প্রকাশ্যের বৈপরীত্য। আপনি যদি আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হতে চান, যদি উন্নত পর্যায়ে উন্নীত হতে চান, তাহলে আপনার কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে।
পাশাপাশি মানুষ যেন আপনার থেকে নিরাপদ থাকে। আপনি যেন কারও কষ্টের কারণ না হয়ে যান। এ বিষয়ে সবসময় সজাগ ও সতর্ক থাকা চাই।
আবু শুরাইহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর শপথ; সেই ব্যক্তি মুমিন নয়! আল্লাহর শপথ; সেই ব্যক্তি মুমিন নয়! জিজ্ঞেস করা হলো, 'হে আল্লাহর রাসুল, কে সেই ব্যক্তি? তিনি বললেন, 'যে ব্যক্তির প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ নয়।'[২]
এমন অনেক ভয়ংকর মানুষ আছে, যাকে একটি মাত্র শব্দ বলে ফেললে পরিণতির ভয়ে আপনি রাতে ঘুমাতে পারবেন না। অথচ মুমিন বান্দা হবে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার আশ্রয়স্থল। তার কারণে অপর মুসলিম ভাই কোনো ক্ষতি, কষ্ট, চক্রান্ত ও ধোঁকায় পড়বে না। কারণ মুমিনমাত্রই তো নিরাপত্তার কেন্দ্র। আপনি যদি তার সাথে কোনো ভুল আচরণ করে ফেলেন কিংবা তার সামনে অনুচিত কথা বলে ফেলেন, তবু আপনি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে পারবেন। সে আপনার ব্যাপারে মনে কিছু রাখবে না।
হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত, আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়।' কীভাবে আল্লাহকে কষ্ট দেওয়া হয়? আল্লাহ বলেন, 'তারা সময়কে গালি দেয়; অথচ আমিই সময়ের নিয়ন্ত্রণকারী। আমার হাতেই সবকিছু। আমিই দিন ও রাতের আবর্তন ঘটাই।' [১]
তারপরও দেখবেন, মানুষ প্রকাশ্যে আল্লাহর নাফরমানি করে; অথচ আল্লাহ তাদের দোষ গোপন রাখেন। বান্দা আল্লাহকে ভুলে যায়, কিন্তু আল্লাহ বান্দাকে ভোলেন না। বান্দারা প্রকাশ্যে আল্লাহর অবাধ্য হয়; আল্লাহ তাদের পাপ গোপন রাখেন, তাদেরকে রিজিক দান করেন, হিফাজত করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই হয় বান্দার সাথে আল্লাহর আচরণ।
সুতরাং মুমিন হিসেবে আপনার প্রথম গুণটি হলো, আপনার কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে। দ্বৈত চরিত্র থেকে যেন আপনি মুক্ত থাকেন; আপনার ভেতর-বাহির, গোপন-প্রকাশ্য যেন না থাকে। আপনার নির্জনবাসও যেন লোকারণ্যে থাকার মতো হয়।
মুমিন হিসেবে দ্বিতীয় গুণ হলো, সমস্ত মানুষ যেন আপনার থেকে নিরাপদ থাকে। যেমন : আপনি যখন আপনার মেয়েকে কোনো মুমিন ব্যক্তির কাছে বিয়ে দেন, তখন আশঙ্কা করেন না যে, সে আপনার মেয়েকে না খাইয়ে রাখবে, তার ওপর জুলুম করবে, তাকে লাঞ্ছিত করবে কিংবা আঘাত করবে।
মুমিন-জীবনের প্রতিটি দিক থেকে শুধু কল্যাণই প্রকাশ পাবে। আপনি যদি কোনো মুমিনকে ব্যবসায় অংশীদার করেন, তাহলে হিসেবে গড়মিল করার আশঙ্কা করবেন না। আপনার আড়ালে সে নিজের জন্য ভিন্ন হিসাব খুলে বসবে না। মুমিনের কাছে কোনো যন্ত্র কিংবা আসবাব রাখলে আপনার অগোচরে তা পালটে ফেলার ভয় করবেন না। আশা করা যায়, সে ভালোটি রেখে আপনাকে মন্দটি ধরিয়ে দেবে না, মিথ্যা বলবে না। মুমিন তার কাজেকর্মে, কথাবার্তায়, পেশায়-চাকুরিতে, বৈবাহিক জীবনে ও ব্যবসার অংশীদারিত্বে; মোটকথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরাপদ হবে। এভাবে সে তার চারপাশের সবাইকে নিরাপদ রাখবে।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, মুসলিমগণ যার মুখ ও হাত থেকে নিরাপদ থাকে এবং যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে।' [১]
মুমিন আপনার পাওনা টাকা অস্বীকার করবে, এমনটা আপনার চিন্তায়ও কখনো আসবে না। কারণ আপনিও মুমিন; তাই আল্লাহর এই বাণীকে বিশ্বাস করেন-
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ
তিনি আল্লাহ-যিনি ছাড়া নেই কোনো উপাস্য। তিনিই অধিপতি, চিরপবিত্র, শান্তিদাতা ও নিরাপত্তাদাতা, পরাক্রমশালী, প্রতাপশালী, নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের অধিকারী। তারা যাদের অংশীদার সাব্যস্ত করে, তা থেকে আল্লাহ পুরোপুরি পবিত্র। [২]
আল্লাহ আপন কাজের ক্ষেত্রে বান্দাদের জন্য নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল। আখিরাতে তিনি বান্দাদের জন্য যেসব নিয়ামত প্রস্তুত করে রখেছেন, সেক্ষেত্রে তিনিই সুরক্ষাকেন্দ্র। আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ
সেখানে তাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং সেখান থেকে তাদের বেরও করা হবে না।[৩]
আপনি মুমিন। আপনাকে যদি বলা হয়, এটি জাহান্নাম; তাহলে আপনি সৃষ্টিজগতের কথা চিন্তা করার মাধ্যমে, আল্লাহর আনুগত্য, সৃষ্টির সেবা, দান-সাদাকা ও কুরবানির মাধ্যমে, সালাত আদায় ও রামাদানের সিয়াম পালনের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে বেঁচে থাকবেন। তিনি জাহান্নামে আজাব থেকে নিরাপদ থাকার জন্য অনেক মাধ্যম রেখেছেন।
ঠিক একইভাবে মুমিনের কাছেও সবাই নিরাপদ থাকে। আপনার প্রতিবেশী আপনার কাছে নিরাপত্তা বোধ করে। আপনার ক্রেতা আপনার কাছে নিশ্চয়তা পায়। আপনি তার কল্যাণ কামনা করবেন, তাকে মিথ্যা বলবেন না, তার সাথে প্রতারণার আশ্রয় নেবেন না। আপনি হবেন বিশ্বস্ত। নবিগণ আসমানি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে বিশ্বস্ত ছিলেন। মুমিনকে যে ব্যাপারে বিশ্বস্ত মনে করা হবে, সে সেই বিষয়ে বিশ্বস্ত থাকবে। আপনার সন্তান আপনার কাছে আমানত, আপনার স্ত্রী আপনার কাছে আমানত। কিন্তু আমি আপনার কাছে আশা করছি, আপনি মানুষকে এমনভাবে আল্লাহর দিকে আহ্বান করবেন, যাতে মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর আজাব থেকে নিরাপত্তা লাভ করে। কারণ এটি ছিল নবিদের কাজ। আর এই নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
মনে করুন, কোনো ভীতসন্ত্রস্ত মানুষকে ভয় পাওয়া মানুষ থেকে নিরাপত্তা দিলেন। আপনি বললেন, 'তাকে আমার হাতে ছেড়ে দিন।' একথা বলে আপনি তাকে উদ্ধার করলেন। কোনো অসহায়-দুস্থ মানুষ; অপারেশন করার মতো অর্থ তার কাছে নেই। এমন মানুষকে আপনি বললেন, 'অপারেশন করতে যত টাকা লাগে আমি দেব, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।' এটিও একটি উত্তম কাজ। এই কাজের মাধ্যমে আপনি তাকে দুনিয়াতে নিরাপত্তা দিলেন। কিন্তু সেই মানুষটি যদি নেক আমল না করে; সরল পথে না চলে মারা যায় এবং তার ঠিকানা হয় জাহান্নাম। আপনার সবচেয়ে বড় করণীয় ছিল, তাকে জাহান্নামের আজাব থেকে নিরাপত্তা দেওয়া। আপনি তার সামনে আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরবেন। সে যদি আল্লাহকে চিনে তাঁর নির্দেশের ওপর অবিচল থাকে এবং নেক আমল করে, তাহলে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।
সুতরাং আপনার সবচেয়ে বড় ও মহৎ কাজ হলো, মানুষকে আল্লাহ তাআলার প্রতি আহ্বান করা, তাঁর আনুগত্যের প্রতি আহ্বান করা; যাতে মানুষ কিয়ামতের দিন তাঁর আজাব থেকে নিরাপত্তা লাভ করে। দুনিয়ার আজাব, দুঃখ-কষ্ট কঠিন। কিন্তু দুনিয়ার আজাবের বিনিময়ে যদি আল্লাহ আপনার জন্য এমন জান্নাতের ফয়সালা করেন-যার ব্যাপ্তি আসমান ও জমিন পর্যন্ত, তাহলে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট আজাব মেনে নেওয়া অতি সহজ। পক্ষান্তরে কোনো মানুষের জন্য জাহান্নামে যাওয়ার চেয়ে ভয়াবহ কিছু হতে পারে না। তাই মানুষের জন্য জাহান্নام থেকে মুক্তির মাধ্যম হওয়াই সবচেয়ে বড় কাজ; নবিদের কাজ।
এই কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত বান্দাদের নাম দিয়েছেন 'মুমিন'। তিনি বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تُطِيعُوا فَرِيقًا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّوكُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ ﴾
হে মুমিনগণ, যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, যদি তোমরা তাদের কোনো একটি দলের আনুগত্য করো, তাহলে ঈমান আনার পর তারা তোমাদের আবার কাফির বানিয়ে ছাড়বে।[১]
তিনি রাজাধিরাজ। তারপরও তিনি আপনাকে 'মুমিন' নাম রাখার অনুমতি দিয়েছেন। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তা হলো-
১. তিনি সত্তাগতভাবে 'মুমিন'।
২. তাঁর সমস্ত কাজ তাঁর কথার সত্যায়ন করে।
তাই আপনি যখন কুরআন পড়বেন, তখন আকস্মিক কোনো বিষয়ের মুখোমুখি হবেন না। আপনার এই আশঙ্কা থাকবে না যে, কোনো বিষয় কুরআনের বক্তব্যের বিপরীত হবে; আর আপনি মানুষের সামনে অপদস্থ হবেন। এমন কখনো হবে না।
আল্লাহর বক্তব্য বিশ্বাস করলে আপনি এই আশঙ্কা করবেন না-ভবিষ্যতে এমন বাস্তবতা সামনে আসবে, যা এই আয়াতের বক্তব্যকে অসত্য প্রমাণ করবে। এমনটা হওয়া অসম্ভব। কারণ আল্লাহ তাআলা 'আল-মুমিন'। তাঁর সমস্ত কাজ তাঁর কথার সত্যায়ন করে।
৩. তিনি আপনাকে নিরাপত্তা দান করেন।
হতে পারে সেই নিরাপত্তা ইন্দ্রিয়শক্তিতে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, খাদ্য ও পানীয়ে কিংবা নির্মল বায়ুতে। অথবা হতে পারে বস্তুর প্রকৃতি অপরিবর্তিত থাকার মধ্যে, উদ্ভিদের জীবনপ্রণালি, বিভিন্ন জিনিসের গঠন কিংবা কার্যক্রমের মাঝে।
এখন মুমিন হিসেবে আপনার কাজও আপনার কথা অনুযায়ী হতে হবে। মানুষ আপনার কাছে নিরাপত্তা পাবে। আপনাকে হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। আপনার পক্ষ থেকে অপ্রত্যাশিত বিষয়ের অবতারণা হবে না, কোনো ধোঁকা-প্রতারণা প্রকাশ পাবে না। কারণ মুসলিমরা তাদের শর্ত পূর্ণ করতে বাধ্য।
প্রতিদিন আমরা হাজারো বিশ্বাসঘাতকতার গল্প শুনি। শুনি কত শত অংশীদারের খিয়ানতের কথা, স্বামী-স্ত্রীর প্রতারণার কথা। এমনসব ঘটনা, ধোঁকা ও কষ্ট দেওয়ার কথা শোনা যায় অহরহ—যা আমাদের অস্থির করে তোলে। কিন্তু মুমিনের আখলাক এমন নয়। কারণ মুমিনের সবকিছু হয় নিরাপদ।
কিন্তু আল্লাহ তাআলা তো তার বান্দাদের মনে ভয়ও সৃষ্টি করেন। তাহলে 'আল-মুমিন' (নিরাপত্তাদানকারী) নামের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কী হবে?
তিনি সমস্ত সৃষ্টির জন্য নিরাপত্তার আধার। আবার একইসাথে তিনি বান্দাদের মনে ভয়ও এনে দেন। মুসা আলাইহিস সালামের বক্তব্য উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ قَالَ رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
সে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় সেখান থেকে বের হলো সন্তর্পণে এবং বলল, 'হে আমার রব, আমাকে অত্যাচারী জাতির হাত থেকে রক্ষা করুন।'[১]
এই বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। মানুষ যখন নিরাপদ থাকে, তখন দুনিয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে সে আল্লাহকে ভুলে যায়। আটকে থাকে দুনিয়ার মোহে। অর্থসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, দালানকোঠা, সামাজিক অবস্থান তাকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। সে অনুভব করে, দুনিয়া অনেক প্রশস্ত; সে সুরক্ষিতই রয়েছে। এই রোগের প্রতিষেধক কী?
আল্লাহ তখন মানুষের মনে ভয় সঞ্চারিত করেন। যখন বান্দা ভীত হয়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেয়; তখন সে আল্লাহর আশ্রয়ে নিরাপদ বোধ করে। আল্লাহ তাআলা নিজে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আপনাকে ভীত করেন; স্বচ্ছলতা দেওয়ার জন্য দারিদ্র্য দেন; বঞ্চিত করেন দান করার জন্য; কষ্ট দেন সুখ দেওয়ার জন্য; অপদস্থ করেন সম্মানিত করার জন্য।
আলিমগণ বলেন, 'আল্লাহর দ্বৈত নামগুলো দুটি একসাথে উল্লেখ করা আবশ্যক। যেমন : 'আল-মুইযযু (المُعزّ)' ; সম্মানদানকারী, 'আল-মুযিল্লু' (المُذِلّ)' ; অপদস্থকারী, 'আদ-দাররু' (الضّارّ)' ; ক্ষতিসাধনকারী, 'আন-নাফিউ' (النافِعُ)' ; কল্যাণদানকারী; 'আল-মুহ'ই' (المُحْيِ)' ; জীবনদানকারী, 'আল-মুমিতু' (المُمِيتُ)' ; মৃত্যুদানকারী, 'আল-খাফিদু' (الخَافِضُ)' ; অবনতকারী ও ‘আর-রাফিউ' (الرّافِعُ)' ; উন্নতকারী ইত্যাদি।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন বলবেন, 'হে আদমসন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার সেবা করোনি।' বান্দা বলবে, 'হে রব, আমি কীভাবে আপনার সেবা করব, আপনি তো রাব্বুল আলামিন; বিশ্বজগতের প্রতিপালক।' আল্লাহ বলবেন, 'তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছে? কিন্তু তুমি তার সেবা করোনি। তুমি কি জানতে না, যদি তুমি তার সেবা-শুশ্রুষা করতে, তবে তুমি আমাকে তার কাছে পেতে।' [১]
আল্লাহ যদি আপনার কিছু সুস্থতা নিয়ে নেন, তবে তিনি আপনাকে দয়াপরবশ হয়ে তার বদলে কিছু বিনিময় দান করেন। অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে আপনি লক্ষ করবেন, তার মন পরিষ্কার থাকে, চেহারা থাকে উজ্জ্বল। সে তখন আল্লাহর বিশেষ রহমতের মধ্যে থাকে। আল্লাহ তার সামান্য সুস্থতা নিয়ে নেন; বিনিময়ে দান করেন রহমত।
তাই আল্লাহ তাআলা কোনোকিছু নিয়ে নেন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য, পরীক্ষা করেন প্রতিদান দেওয়ার জন্য, ক্ষতি করেন উপকার করার জন্য; অবনত করেন উন্নত করতে, বঞ্চিত করেন দান করতে; ভীত করেন নিশ্চিন্ত করার জন্য। এই ভয়ই আপনাকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়। ভয় পেয়ে যখন আপনি তার রহমতের ছায়ায় যান, তখন প্রশান্তি ও নিশ্চয়তা অনুভব করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের হৃদয়ে এনে দেন স্বস্তি ও প্রশান্তি।
আল্লাহর তাআলার মহিমা ও বড়ত্বের পরিচয় হিসেবে এই নামগুলো অতি সংক্ষিপ্ত। পক্ষান্তরে বিশ্বজগতের নানা দলিল-প্রমাণের আলোকে এর আলোচনা অত্যন্ত ব্যাপ্ত। এটা এমনই বিস্তৃত যে, কোনো কূলকিনারা নেই। কারণ সমগ্র বিশ্বই এই নামগুলোকে দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে।
আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে যখন আপনি বিশ্বজগৎ নিয়ে ভাববেন, তখন আপনার কাছে আল্লাহর ক্ষমতা ও কুদরত তত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। যেমন: আপনাকে যদি এখন 'আল-লতিফ' (সূক্ষ্মদর্শী) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, মানব-সৃষ্টির ক্ষেত্রে 'আল-লাতিফ' নামের কোনো প্রমাণ কি আছে আপনার কাছে?
বাতাস ৩০০ জন যাত্রীসহ বিমানকে বয়ে নিয়ে যায়, যার ওজন হয় ৩৫০ টন। অথচ বাতাসকে দেখা যায় না। দৃশ্যমান এমন কোনো নড়াচড়াও হয় না-যা থেকে তার ওজন বোঝা যাবে। কোনো যানবাহনে চড়ে জানালা দিয়ে হাত বের করলে বাতাসের শক্তি অনুভব করতে পারবেন। কিন্তু মহাশক্তি সত্ত্বেও বাতাস সূক্ষ্ম। এই বাতাস আল্লাহর 'আল-লাতিফ' (সূক্ষ্মদর্শী) নামের পরিচয় তুলে ধরে।
পানি স্বচ্ছ। তার কোনো বর্ণ নেই; নেই কোনো স্বাদ কিংবা ঘ্রাণ। এই পানিই এমন পরিমাণে বাষ্পীভূত হয়, সব প্রয়োজনে আপনাকে সাহায্য করতে পারে। এর থেকেও 'আল-লতিফ' নামের পরিচয় পাওয়া যায়। এভাবে প্রতিটি নামেরই বহু প্রমাণ, নিদর্শন, দৃষ্টান্ত রয়েছে আমাদের সামনে।
আমরা যখন রাস্তায় হেঁটে চলি, তখন আমাদের সামনে চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত হয় এবং আমাদের দৃষ্টিতে আল্লাহর বড়ত্ব আরও বেড়ে যায়। বেড়ে যায় তার প্রতি আমাদের বিনয়, আনুগত্য ও অভিমুখিতা। এটিই ঈমানের রহস্য। ঈমান হৃদয়ে বিরাজ করে, মুখে উচ্চারিত হয় এবং কাজ তাকে সত্যায়ন করে।
ঈমানের প্রকাশ ক্ষেত্র তিনটি-এক. আত্মিক পরিতৃপ্তি। দুই. মৌখিক স্বীকৃতি। তিন. কাজেকর্মে বাস্তবায়ন।
আপনি মুমিনকে পাবেন চরিত্রবান, সত্যবাদী, পরিচ্ছন্ন, দয়াশীল, প্রতিশ্রুতি পূরণকারীরূপে। মুমিন উচ্চ মর্যাদার প্রত্যাশা করে না। তার গুণাবলি হয় উন্নত। এসবই মুমিনের বাহ্যিক অবস্থা। পক্ষান্তরে যদি আপনি তার হৃদয় চিরে দেখেন, তবে সেখানে পাবেন নিশ্চিন্ততা, নিশ্চয়তা, আত্মিক প্রশান্তি, আল্লাহর প্রতি সমর্পণ, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি, তাঁর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরতা।
মুমিনের মুখে থাকে আল্লাহর জিকির, সেই মুখেই মানুষের জন্য প্রচারিত হয় নিরাপত্তার অভয় বাণী। সে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয় সত্যের আলোকচ্ছটা, মানুষকে দেখায় আল্লাহর পথ। এজন্যই 'আল-মুমিন' সেই সত্তার নাম-যিনি ছাড়া নেই কোনো উপাস্য, যিনি অধিপতি, চিরপবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা।
সারকথা হলো, 'আল-মুমিন' নামটি আল্লাহর সমস্ত কর্মকথাকে সত্য হিসেবে প্রমাণ করে। আপনি যখন আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবেন এবং তাঁর কিতাব পাঠ করবেন, তখন কখনো এমন কোনো ঘটনার সম্মুখীন হবেন না-যা তাঁর কিতাবের বিপরীত অর্থ ধারণ করে। তিনি তাঁর সৃষ্টি ও কর্মের মধ্য দিয়ে আপনাকে নিরাপত্তা দান করেন।
তাই মুমিন হিসেবে আপনারও দুটি গুণ অর্জন করতে হবে—এক. আপনার কথা ও কাজে মিল থাকা চাই। দুই. আপনার কাছে মানুষ যেন নিরাপদে থাকে।
আপনি যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে নিরাপত্তার বিপরীত কিছু দেখতে পান; যদি দেখতে পান, তিনি আপনাকে সন্ত্রস্ত করছেন, তবে মনে করবেন, তিনি আপনাকে ভীত করছেন নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। আপনাকে বঞ্চিত করছেন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য, আপনাকে অপদস্থ করছেন সম্মানিত করার জন্য।

টিকাঃ
[১] সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬১
[১] সূরা আনআম, আয়াত: ১০৩
[১] সুরা হাক্কাহ, আয়াত: ৩৩
[১] সুরা হাশর, আয়াত: ২৩
[২] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১৭
[১] সুরা কুরাইশ, আয়াত: ৪
[১] সুরা হজ, আয়াত: ৩৮
[১] সুরা নামল, আয়াত: ৬১
[১] সুরা ফাতিহা, আয়াত: ৫
[২] সুরা আনআম, আয়াত: ৮১
[১] চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ভাষায় একে 'ডেক্সট্রোকার্ডিয়া' বলা হয়। গড়ে প্রতি ১২ হাজার মানুষের মাঝে একজনের এই সমস্যা দেখা যায়।
[১] সুরা আনআম, আয়াত : ১২০
[২] সহিহুল বুখারি : ৬০১৬; সহিহ মুসলিম : ৭৬; মিশকাতুল মাসাবিহ : ৪৯৬২
[১] সহিহ্বল বুখারি : ৪৮২৬; সহিহ মুসলিম: ২২৪৬; সুনানু আবি দাউদ : ৫২৭৪
[১] জামিউত তিরমিযি: ২৬২৭
[২] সুরা হাশর, আয়াত: ২৩
[৩] সুরা হিজর, আয়াত: ৪৮
[১] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত : ১০০
[১] সুরা কাসাস, আয়াত: ২১
[১] সহিহ মুসলিম: ৬৪৫০; সুনানুন নাসায়ি: ১৪৮২; সুনানু আবি দাউদ: ১১৯৪

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-হক : الْحَقُّ

📄 আল-হক : الْحَقُّ


আল্লাহর নাম ‘আল-হক’ (الْحَقُّ ) শব্দটি বহুল প্রচলিত। আল্লাহ তাআলা ‘আল-হক’। তাঁর কালাম হক (সত্য), তাঁর প্রতিশ্রুতি হক, তাঁর সমস্ত কাজও হক (ন্যায়সংগত)।
এবার আমরা ‘আল-হক’ শব্দটি নিয়ে আলোচনা করব। এর পূর্বে কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করছি—
মনে করুন, আপনার কাছে একটি বৈদ্যুতিক মেশিন আছে। মেশিনটির জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন। আপনি একটি সকেটের কাছে গিয়ে তাতে প্লাগ লাগালেন। কিন্তু প্লাগ লাগানোর পরও মেশিনটি চালু হলো না। তখন আপনি অন্য একটি সকেটে প্লাগটি প্রবেশ করালেন এবং মেশিনটি চলতে শুরু করল। এর দ্বারা বোঝা গেল, প্রথম সকেটটিতে বিদ্যুৎ নেই। সুতরাং দ্বিতীয় সকেটটি ‘হক’ এবং প্রথম সকেটটি ‘বাতিল’। এখানে ‘হক’ অর্থ কী?
‘হক’ এর অর্থ হলো, বিরাজমান বিষয় কিংবা বস্তুটি বিরাজমান। বাস্তবতা হলো, আল্লাহ তাআলা ‘হক’ (সতত বিরাজমান)। তিনি ছাড়া অন্য কারও অভিমুখী হলে আপনি দেখতে পাবেন—সবই মরীচিকা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, অন্তঃসারশূন্য কথা ও ধারণাপ্রসূত শব্দমালা। আপনি যদি আল্লাহর অভিমুখী হন, তাহলে সবকিছু পাবেন। সুতরাং ‘আল-হকে’র প্রথম অর্থ—বিরাজমান জিনিস। আর হকের বিপরীত শব্দ ‘বাতিলে’র প্রথম অর্থ—অস্তিত্বহীন জিনিস।
মানুষ যখন আপনাকে কোনো ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) দেয় এবং সেই ওয়াদা পূরণ করে, তখন তার ওয়াদা হক (সত্য) হয়। পক্ষান্তরে যদি ওয়াদা পূরণ না করে, তাহলে তার ওয়াদা হয় বাতিল (মিথ্যা)।
আল্লাহ তাআলা জিনদের অসাধ্য সাধনের শক্তি দেননি। এজন্য যদি বিশ্বাস করেন, জিনরা মানুষকে কল্যাণ-অকল্যাণ দিতে পারে, উন্নতি দান করতে পারে, বিপদ থেকে মুক্তি দিতে পারে, তাহলে আপনার এই বিশ্বাস হবে বাতিল। কারণ এই বিশ্বাস বাস্তবতার পরিপন্থি। আবার আপনি যদি বলেন, অমুক ব্যক্তি এই এই কাজ করতে পারে, অথচ বাস্তবে সে সাধারণ বান্দামাত্র; যার এমন কিছু করার ক্ষমতা নেই, তাহলে আপনার কথাটি হবে বাতিল।
সুতরাং বিরাজমান জিনিস, বিরাজমান জিনিসের অস্তিত্বে বিশ্বাস পোষণ ও স্বীকৃতি প্রদানই হক। পক্ষান্তরে যে জিনিসের অস্তিত্ব নেই, তার অস্তিত্বে বিশ্বাস হলো বাতিল বিশ্বাস। এমনিভাবে বাতিল বিশ্বাসের কথা বললে সেই কথাও বাতিল বলে বিবেচিত হয়। হক সতত বিরাজমান এবং বাতিল অস্তিত্বহীন।
মোটকথা আকিদা-বিশ্বাস যদি বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেই আকিদাকে বলা হয় হক; আর বাস্তবতার পরিপন্থি হলে সেই আকিদা বাতিল। একইভাবে কোনো বক্তব্য কিংবা কথা যদি বিরাজমান বিষয়ের সাথে সমঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন সেই বক্তব্য বা কথা হক; বিপরীত হলে বাতিল।
মানবজীবনে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো, এমন কিছুতে বিশ্বাস করা-যা কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না কিংবা এমন আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করা, যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। এমনিভাবে বাস্তবতা-পরিপন্থি কথা সবচেয়ে বিপজ্জনক। এর থেকে বোঝা যায়, বাতিল মানুষকে ধ্বংস করে।
মনে করুন, আপনি কোনো আকিদা পোষণ করেন। দীর্ঘদিন পর সারাবিশ্বের কাছে প্রকাশিত হলো, আপনার সেই আকিদাটি ছিল বাতিল। সেই বিশ্বাস মানুষের কোনো উপকার করেনি; বরং ক্ষতিই বাড়িয়েছে।
আপনি যদি হকের সাথে থাকেন, তাহলে বড় সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন। কারণ আপনি তখন থাকবেন বিরাজমান ও সুসাব্যস্ত বিষয়ের সাথে। এটিই এই অধ্যায়ের মূলকথা।
বিরাজমান বিষয়টি হয়তো 'ওয়াজিবুল উজুদ' (অবধারিতভাবে বিরাজমান) সত্তা হবে কিংবা সম্ভাব্য-বিরাজমান হবে। আমাদের মহান রব 'ওয়াজিবুল উজুদ' (অবধারিতভাবে বিরাজমান) সত্তা। তিনি অবধারিতভাবে বিরাজমান ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। মানব-বিবেক একজন সৃষ্টিকর্তা, অভিনব সৃষ্টিকারী, রূপকার, মহাপ্রজ্ঞাবান, মহাজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান উপাস্য ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে এই গুণ মেনে নিতে পারে না।
সুতরাং সতত বিরাজমান সত্তা অবধারিতভাবে বিরাজমান। পক্ষান্তরে সম্ভাব্য বিরাজমান সত্তার উদাহরণ আমরা মানুষরা। আমাদের অস্তিত্ব সম্ভাব্য; আমাদের অস্তিত্ব থাকতেও পারে; না-ও থাকতে পারে। আমাদের অস্তিত্ব কেবল তখন বিরাজমান থাকতে পারে, যখন 'অবধারিতভাবে বিরাজমান সত্তা' ইচ্ছা করেন। এজন্য আল্লাহ তাআলা যা চান, তা-ই হয়; তিনি যা চান না, তা হয় না।
وَقَالَ الشَّيْطَانُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدتُّكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ وَمَا كَانَ لِي عَلَيْكُم مِّن سُلْطَانٍ إِلَّا أَن دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي فَلَا تَلُومُونِي وَلُومُوا أَنفُسَكُم مَّا أَنَا بِمُصْرِخِكُمْ وَمَا أَنتُم بِمُصْرِخِيَّ إِنِّي كَفَرْتُ بِمَا أَشْرَكْتُمُونِ مِن قَبْلُ إِنَّ الظَّالِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
যখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, 'আল্লাহ তোমাদের সাথে সত্য ওয়াদা করেছিলেন। আর আমিও তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছিলাম। তবে আমি আমার সে ওয়াদা ভঙ্গ করেছি। আমি তোমাদের ডাক দিয়েছিলাম আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। এছাড়া তোমাদের ওপর তো আমার কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। অতএব তোমরা আমাকে তিরস্কার কোরো না, বরং নিজেদেরই তিরস্কার করো। (এখন) আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারব না, তোমরাও আমাকে সাহায্য করতে পারবে না। আগে তোমরা যে আমাকে (আল্লাহর সাথে) শরিক করেছিলে, আমি (এখন) তা অস্বীকার করছি। অবশ্যই অন্যায়কারীদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি [১]
সুতরাং শয়তানের প্রতিশ্রুতি বাতিল (মিথ্যা)। কখনো শয়তান আপনাকে ভয় দেখাতে পারে। তার ভয় দেখানোও বাতিল। কখনো আপনাকে দারিদ্র্যের ভীতিপ্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু তার ভীতিপ্রদর্শনও বাতিল। এখানে হক-বাতিলের বিষয়টি চিন্তাভাবনার সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং পরিণতির সাথে সম্পৃক্ত।
মনে করুন, আলেপ্পোতে আপনার বড় অঙ্কের টাকা পাওনা আছে। শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে আপনি টাকাগুলো হস্তগত করতে পারবেন। টাকাগুলো পেলেই আপনার সব সমস্যার সমাধান হবে। আপনি স্টেশনে গিয়ে আলেপ্পোর ট্রেনে উঠলেন। ট্রেনে বসে আপনি হাজারটা ভুল করতে পারেন। কিন্তু ট্রেন যতক্ষণ আলেপ্পোর পথে আছে, ততক্ষণ এই নিশ্চয়তা আছে, আপনি দুপুর ১২টার আগেই আপনার গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন। সুতরাং আপনি হকের মাঝেই রয়েছেন।
অপর দিকে আপনি যদি ‘দারাআ’গামী ট্রেনে চেপে বসেন, তাহলে সেই ট্রেনটি আপনার জন্য বাতিল। কারণ এই ট্রেনে আপনি কখনো গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন না। যদিও এই ট্রেনটি আলেপ্পোগামী ট্রেনের মতোই; কিন্তু এটি আপনাকে নিয়ে যাবে আপনার গন্তব্যের বিপরীত দিকে।
হক ও বাতিলে পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে খানিকটা অপ্রস্তুত অনুভব করছি। কারণ পার্থক্যটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর।
আল্লাহ তাআলা ‘আল-হক’। কারণ তিনি সতত বিরাজমান। তিনি এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির অস্তিত্ব সবসময় সম্ভাব্য। তাঁর অস্তিত্ব থাকতেও পারে; না-ও থাকতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ‘ওয়াজিবুল উজুদ’; অবধারিতভাবে বিরাজমান। আপনি যদি তাঁর অস্তিত্বে বিশ্বাস রাখেন, তাহলে আপনার আকিদা-বিশ্বাস হক। যদি তাঁর অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেন, তবে আপনার স্বীকৃতিও হবে হক।
পক্ষান্তরে যদি বিশ্বাস করেন, কোনো সৃষ্টি আপনার উপকার কিংবা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে, তাহলে আপনার এই বিশ্বাস হবে বাতিল। যদি এমন কথা বলেন, তাহলে আপনার কথা হবে বাতিল। এজন্য বিরাজমান সত্তা হলেন হক, তাঁর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন হক, তাঁর অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেওয়াও হক।
এই আলোকোজ্জ্বল ভাবনা আমাদের আরেকটি ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। আমাদের মনে এই চিন্তার উদয় হয়, বিশ্বজগতে ‘আল-হক’ বহুজন হতে পারে না; বরং ‘আল-হক’ একজনই। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ )
সুতরাং তিনিই আল্লাহ, তোমাদের প্রকৃত রব। হকের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী থাকতে পারে? অতএব তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ? [১]
কুরআনুল কারিমে যা রয়েছে, আপনি যদি এর বিপরীত আকিদা রাখেন, তাহলে অকাট্য দলিলের আলোকে আপনি পথভ্রষ্ট। (আল্লাহ তাআলা আমাদের এর থেকে হিফাজত করুন!)
আপনি যদি বিশ্বাস করেন, মৃত্যু স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া না হওয়ার সাথে সম্পর্কিত, তাহলে এই বিশ্বাস হবে বাতিল। কারণ নির্ধারিত সময় শেষ হলেই মানুষ মৃত্যুবরণ করে। তবে আমরা অস্বীকার করি না যে, স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়াও আবশ্যক। কিন্তু স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়ার সাথে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই।
এক সম্মানিত ভাই আমার কাছে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন-
আমার জন্ম হয়েছে একটি বাড়িতে। আমার দুজন চাচা ছিলেন। আমরা এবং আমাদের দুই চাচা সেই বাড়ির তিনটি ঘরে থাকতাম। মঙ্গলবার চারটার সময় আমি জন্মগ্রহণ করি। আমাদের রুমের সাথেই যে চাচা থাকতেন, তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তার চিকিৎসার জন্য চারজন ডাক্তার উপস্থিত হয়েছিলেন। আকস্মিকভাবে সবাই একমত হলেন যে, আমার চাচি এক ঘণ্টার বেশি বাঁচবেন না। সেদিনের পর বহুদিন অতিবাহিত হয়েছে। আমি বড় হয়েছি। স্কুল-কলেজে পড়ালেখা শেষ করেছি। আমার বাবার সাথে কাজে যোগ দিয়েছি। বাবা ইন্তিকাল করেছেন। আমি বিয়ে করে সংসারী হয়েছি। সেই বাড়ি থেকে নতুন বাড়িতে উঠেছি। অন্য আরেকটি বাড়ি কিনেছি, যেখানে আমি বর্তমানে থাকছি। আমার বয়স এখন ৫৪ বছর। আমার সেই চাচি সেদিন আমাকে দেখতে এসেছিলেন। যদিও চারজন চিকিৎসক বলেছিলেন, তিনি একঘণ্টা পরই মারা যাবেন, তারপরও তিনি ৫৪ বছর ধরে বেঁচে আছেন। সুতরাং চিকিৎসকদের কথা ছিল বাতিল।
চিকিৎসকের জ্ঞান রয়েছে; জ্ঞানের আলোকে সে বলে, তবু সে মানুষটা বহুদিন বাঁচতে পারে। তারপর যখন মানুষের জীবনের সফর শেষ হয়, চিকিৎসক হতবুদ্ধ হয়, চিকিৎসা-জ্ঞান তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
সম্মানিত পাঠক, এখন আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। আপনি কি জানেন, বিজয়ী কে?
বিজয়ী সেই ব্যক্তি—যার বিশ্বাস বাস্তবতা অনুযায়ী হয়, যার কথা হয় বাস্তবতার অনুকূল। যার ওঠাবসা, চলাফেরা হয় আল্লাহ তাআলার মানহাজ [১] অনুযায়ী। একটি উদাহরণ উপস্থাপন করি।
মনে করুন, অত্যন্ত উপকারী, দামী ও জটিল মেকানিজমের একটি মেশিন রয়েছে। আপনি সেই মেশিনটি ম্যানুফ্যাকচারার কোম্পানির নির্দেশনা অনুযায়ী চালাতে সীমাহীন আগ্রহী। মেশিনটির জায়গায় যদি আমরা নিজেদের চিন্তা করি, তাহলে কেমন হবে?
আমি আশা করি, প্রত্যেক পাঠক নিজের ধর্মচিন্তা সম্পর্কে এই বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন—
আপনার চিন্তা কি বিশুদ্ধ?
আপনার আকিদা কি সহিহ?
আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে আপনার আকিদা-বিশ্বাস কি সহিহ?
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে আপনার আকিদা কি সহিহ?
সমকালীন প্রেক্ষাপটে আপনার মতামত কি সঠিক?
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে দীর্ঘ ১৪ বছর গৃহযুদ্ধ হয়েছে। [২] ১৪ বছর পর এই যুদ্ধের আগুন নিভেছে। এই গৃহযুদ্ধকে আরব-দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। আমরা বলতে পারি, সেই দেশটি আরব শক্তিগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।
একইভাবে আমরা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে সাম্প্রদায়িক কিংবা আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করতে পারি। আমরা বলতে পারি, দেশটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র-যা অন্যান্য দেশের প্রতিযোগী ছিল। আবার কুরআন, দ্বীন ও শারয়ি দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করতে পারি।
যেমন কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন-
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُّطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ )
আল্লাহ দৃষ্টান্ত পেশ করছেন এমন এক জনপদের-যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। সেখানে সব জায়গা থেকে প্রচুর জীবনোপকরণ আসত। এরপর তারা আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা শুরু করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ আস্বাদন করালেন।[১]
এই দ্বীনি ব্যাখ্যা সঠিক, নাকি অন্য ব্যাখ্যাগুলো?
এই ব্যাখ্যা বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তার ব্যাখ্যা! আপনি যদি অন্য ব্যাখ্যাগুলোর অভিমুখী হন, তাহলে আপনি বাতিল ব্যাখ্যায় পতিত হবেন।
অনেক সময় ভূমিকম্প হয়, পুরো শহর ধসে পড়ে। এর সরল ব্যাখ্যা হলো, ভূ-অভ্যন্তরে যখন একটি শীলা অন্য একটি শীলার ওপর উঠে আসে, তখন ভূমিকম্প হয়। পৃথিবী-পৃষ্ঠের অংশবিশেষের হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন বা আন্দোলনই ভূমিকম্প। এটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। কিন্তু এই ব্যাখ্যা দ্বীনি ব্যাখ্যার বিপরীত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَى بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ )
জনপদগুলোর অধিবাসীরা সৎকর্মশীল থাকা অবস্থায় আপনার রব অন্যায়ভাবে সেসব জনপদকে ধ্বংস করেন না।[২]
হকের পরিচয় লাভ না করলে, আকিদা হক না হলে, আপনার কথাবার্তা, চলাফেরা হক না হলে আপনি সফল হতে পারবেন না।
আপনি যদি নানা ধরনের বিপদে থাকেন এবং বলেন আপনার ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়, তবে এই ব্যাখ্যা বাতিল হবে। ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে আপনি বলতে পারেন, আমাকে অনেক মানুষ হিংসা করে। তাদের হিংসা আমাকে বিপদে ফেলেছে। এই ব্যাখ্যাটিও বাতিল। কারণ উদাসীন কিংবা উপযুক্ত না হলে কোনো মানুষকে অন্য কেউ বিপদে ফেলতে পারে না।
জীবনের একটি দিনে আপনি হাজারো বাতিলের মুখোমুখি হতে পারেন। তবে হককে চিনতে পারা, হককে বিশ্বাস করা এবং হকের কথা বলার মাঝেই সফলতা নিহিত রয়েছে। আপনি যদি হককে চিনতে না পারেন, তাহলে হকের ওপর থাকতে পারবেন না। যদি হককে চিনতে না পারেন, তাহলে হককে বিশ্বাস করতে পারবেন না; হকের কথা বলতে পারবেন না।
আল্লাহ তাআলাকে চিনতে পারাই দ্বীনের মূলভিত্তি। এজন্যই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শাসনকর্তা হিসেবে ইয়েমেনে পাঠিয়েছেন, তখন বলেছিলেন-
'তুমি এক আহলুল কিতাব [১] সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ। তাই প্রথমে তুমি তাদের আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেবে। যখন তারা আল্লাহকে চিনবে, তখন তাদেরকে জানিয়ে দেবে-আল্লাহ তাদের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করে দিয়েছেন।' [২]
মনে করুন, যদি কোনো ব্যক্তি তার কাজে ভুল পন্থা অবলম্বন করে, তাহলে আমরা বলব, তার এই পন্থাটি বাতিল। কেউ যদি ভিত্তি ঠিক রেখে ভবন নির্মাণ করে, তাহলে বলব, এই ভবনটি 'হক'। কারণ এই ভবনটি স্থায়িত্ব লাভ করবে। কিন্তু কেউ যদি ভবন নির্মাণের সময় মূলভিত ঠিক না রাখে, তাহলে আমরা বলব ভবনটি 'বাতিল'। কেন?
কারণ ভবনটি অচিরেই ধসে পড়বে। তাহলে এখানেও হক অর্থ ‘বিরাজমান বস্তু’। তবে এর সাথে আরেকটি অর্থ যুক্ত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَإِنَّ السَّاعَةَ لَآتِيَةٌ فَاصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ
আসমান-জমিন ও উভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু আমি সৃষ্টি করেছি যথার্থভাবে। আর কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী। অতএব আপনি (তাদের দোষত্রুটি) সুন্দরভাবে এড়িয়ে যান।[১]
أَوَلَمْ يَتَفَكَّرُوا فِي أَنفُسِهِم مَّا خَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُّسَمًّى وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ بِلقَاءِ رَبِّهِمْ لَكَافِرُونَ *
তারা কি নিজেদের ব্যাপারে ভেবে দেখে না? আল্লাহ তো আসমান- জমিন ও উভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন যথার্থভাবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। কিন্তু অনেক মানুষই তাদের রবের সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করে।[২]
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا ذَلِكَ ظَنُّ الَّذِينَ كَفَرُوا فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ كَفَرُوا مِنَ النَّارِ
আসমান-জমিন ও উভয়ের মধ্যবর্তী কোনোকিছু আমি অহেতুক সৃষ্টি করিনি। এটা তো (অহেতুক সৃষ্টি) কাফিরদের ধারণা। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ [৩]
বাতিল অস্থায়ী আর হক চিরস্থায়ী। এখন আমরা এই অর্থের সাথে আরেকটি বিষয় যুক্ত করতে পারি। বিরাজমান জিনিস হক। এর চেয়ে উচ্চ পর্যায় হলো অবধারিতভাবে বিরাজমান এবং সর্বদা বিরাজমান সত্তা। তাঁর সাথে অন্য কেউ বা কিছু বিরাজমান নেই। সুতরাং তিনি অবধারিত, সর্বকালীন, একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই গুণগুলো আল্লাহ তাআলার জন্যই সাব্যস্ত।
আল্লাহ তাআলা সতত বিরাজমান, অবধারিতভাবে বিরাজমান এবং শাশ্বতরূপে বিরাজমান। তাঁর পরে কিছু নেই। তিনি তাঁর অস্তিত্বে একক ও পরিপূর্ণ। আপনি যদি তাকে চিনতে পারেন, তাহলে সবকিছু চিনতে পারলেন। তাঁর পরিচয় না পেলে কোনো পরিচয় কাজে আসবে না।
আল্লাহর শপথ, আপনি যদি দুনিয়ার অঢেল সম্পদও অর্জন করেন, জীবনের সর্বোচ্চ শিখরেও উপনীত হন, তাঁর পরিচয় না পেলে আপনি কিছুই অর্জন করতে পারবেন না। কারণ আপনার অস্তিত্ব নিজস্ব নয়। আপনার অস্তিত্ব যদি নিজস্ব হতো, তাহলে কোনো বাধা থাকত না। কিন্তু আপনার অস্তিত্বের সম্পর্ক অবধারিতভাবে বিরাজমান অস্তিত্বের সাথে। তিনি যদি চান, এক লহমায় আপনার অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতে পারেন।
একবার দামেশকের এক মসজিদে আমাদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। আমাদের এক পরিচিত ভাই কার্ড পাঠিয়ে দাওয়াত দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান ছিল শুক্রবার দরসের পর। আমি সেই মসজিদে গেলাম। প্রবেশদ্বারের সামনে আমন্ত্রিত মেহমানদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অনেকে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি একজন একজন করে সবার সাথে হাত মেলালাম। যিনি আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন তার সাথে দেখা হলো। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এই অনুষ্ঠানে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে?' সে উত্তর দিল, 'আমার চাচা, তিনি আমার শশুরও।' আমি বললাম, 'তিনি কোথায়?' তিনি বললেন, 'মসজিদের ভেতরে।'
মসজিদের আঙিনায় প্রবেশ করতেই দেখলাম, পৌরুষদীপ্ত হাস্যোজ্জ্বল এক ব্যক্তি বসে আছেন। গায়ে চমৎকার পোশাক। আমি তাকে আগে থেকে চিনতাম না। তিনি আমাকে উয় অভ্যর্থনা জানালেন। আমার অনেক প্রশংসা করলেন। তারপর আমি অনুষ্ঠানে আমার নির্ধারিত জায়গায় প্রবেশ করলাম। সেসময় একজন অতিথি আলোচনা করছিলেন। তার আলোচনার মধ্যেই দুজন অতিথি কেঁপে উঠলেন। হঠাৎ এভাবে কেঁপে ওঠার কারণ বুঝতে পারলাম না।
তারপর আমি ২০ মিনিটে আমার আলোচনা পেশ করলাম। আলোচনা শেষে একজন আমাকে কানে কানে বলল, 'মসজিদের প্রাঙ্গনে যিনি আপনাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, তিনি একটু আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। আপনার আলোচনা শুনতে পারেন নি!'
পাঠক, অবাক হবেন না। কারণ আমরা 'ওয়াজিবুল উজুদ' (অবধারিতভাবে বিরাজমান সত্তা) নই; আমরা সম্ভাব্য বিরাজমান প্রাণীমাত্র। 'ওয়াজিবুল উজুদ' মুহূর্তেই তার অস্তিত্ব শেষ করে দিয়েছেন। তিনি আমার আলোচনা শোনার অপেক্ষায় ছিলেন। আমি মঞ্চে প্রবেশের পরপরই তিনি মারা গেছেন। আল্লাহর শপথ, আমাদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না।
অনুষ্ঠান শেষ হলো। আমরা হাসপাতালে গেলাম। জরুরি বিভাগে ঢুকে দেখি, তার নিথর দেহ পড়ে আছে। রুহ চলে গেছে মহান রবের কাছে। আমরা অবধারিতভাবে বিরাজমান নই, আমাদের অস্তিত্ব সম্ভাব্য। আমরা হক নই। হক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। আমরা হক হলে আমাদের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য হতো-
فَلَوْلَا إِنْ كُنْتُمْ غَيْرَ مَدِينِينَ تَرْجِعُونَهَا إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
আচ্ছা, যদি তোমাদের শেষ বিচার বলতে কিছু না-ই থেকে থাকে, তবে তার (মুমূর্ষু ব্যক্তির) প্রাণ ফেরত আনো দেখি, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো?[১]
বৃষ্টি এলে আমরা খুশি হই। কেমন হতো, যদি আকাশ থেকে আর বৃষ্টিবর্ষণ না হতো? আমাদের অস্তিত্বের কী হতো তখন?
আমরা দেখতে পেতাম, সমস্ত নদী-নালা শুকিয়ে গেছে। গাছপালা, তরুলতা মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। তারপর আমাদের অবস্থা কী হতো? আমাদের অস্তিত্ব কী নিজস্ব?
না, আমাদের অস্তিত্ব ওয়াজিবুল উজুদের ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত।
মানুষ মনে করে, সে বিরাজমান; অবধারিতভাবে বিরাজমান। যখন বিশ্বাস করে, সে শুধু নিজ যোগ্যতায় কাজ করে অর্থ উপার্জন করে, তখন কী নির্বুদ্ধিতার পরিচয়ই না দেয় সে। এই বিশ্বাস বাতিল। আপনি যখন আল্লাহর পরিচয় লাভ করবেন, তখন আপনার দৃষ্টিতে নিজেকে ছোট মনে হবে, আল্লাহ তাআলাকে মনে হবে সুমহান। সুতরাং মুমিন কে? সে-ই মুমিন, যে শুধু আল্লাহকেই দেখতে পায়।
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ ...
যারা আপনার হাতে বাইআত তথা আনুগত্যের শপথ করে, বাস্তবে তারা আল্লাহর কাছেই বাইআত করে। আল্লাহর হাত [১] আছে তাদের হাতের ওপরে।[২]
فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى وَلِيُبْلِيَ الْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَاءً حَسَنًا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ )
সেদিন তোমরা তাদের হত্যা করোনি, বরং আল্লাহই তাদের হত্যা করেছেন। আর আপনি যখন কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি, বরং বাস্তবে আল্লাহই তা নিক্ষেপ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে মুমিনদেরকে উত্তম প্রতিদান দেওয়ার জন্যই (তাদের হাতে এই কাজ করিয়েছেন তিনি)। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবই জানেন।[৩]
وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ فَاعْبُدُهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ وَمَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ )
আল্লাহর কাছে রয়েছে আসমান ও জমিনের অদৃশ্য জ্ঞান এবং তাঁর কাছেই সকল বিষয় ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতএব তুমি তাঁর ইবাদত করো এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখো। তোমরা যা করো, তোমাদের রব সে সম্পর্কে অনবহিত নন।[৪]
فَكِيدُونِي جَمِيعًا ثُمَّ لَا تُنْظِرُونِ إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ رَبِّي وَرَبِّكُم مَّا مِن دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ )
অতএব তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করো এবং আমাকে একটুও অবকাশ দিয়ো না। আমি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছি, যিনি আমার রব এবং তোমাদেরও রব। প্রত্যেক প্রাণীর কপালের চুলগুচ্ছ তাঁরই হাতে (অর্থাৎ সব প্রাণী তাঁরই নিয়ন্ত্রণে)। নিশ্চয় আমার রব সঠিক পথেই রয়েছেন [১]
আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, মানুষ কেন এমন বিষয় নিয়ে কথা বলে, যা নিয়ে সে তুষ্ট নয়?
কারণ সে আল্লাহ তাআলাকেই সবকিছু মনে করেনি। সে মনে করেছে, আল্লাহ মহান, অমুক ব্যক্তিও মহান। সে বিশ্বাস করেছে অফিসের বস, দলের নেতা ও অন্যান্য মানুষ তাকে উন্নতি কিংবা অবনতি দিতে পারে। তার উপকার কিংবা অপকার করতে পারে। তাওহিদ যত কমতে থাকবে, শিরকও তত বাড়তে থাকবে। আপনার আকিদা-বিশ্বাস ঠিক থাকবে না।
আকিদা-বিশ্বাসের এই বিষয়টি সম্পৃক্ত চিরস্থায়ী জীবনের সাথে। সুতরাং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-
আপনাকে জানতে হবে, আপনি কি হকের ওপর রয়েছেন?
আপনার আকিদা কি হক?
আপনার চিন্তাভাবনা কি হক?
আপনার কর্ম, অবস্থান কি হক?
আপনি কি হক অনুযায়ী দিয়েছেন, নাকি না-হক ভাবে?
আপনার রাগ-ক্রোধ কি হক ছিল?
আপনি কি হকের প্রতি সন্তুষ্ট থেকেছেন?
ক্রোধ কিংবা সন্তুষ্টিও হক অনুযায়ী হতে হবে। সম্পর্ক রক্ষা কিংবা সম্পর্কচ্ছেদও হতে হবে হকের আলোকে।
আপনি যখন জানবেন, 'আল-হক' হলেন অবধারিতভাবে বিরাজমান সত্তা, চিরস্থায়ী সত্তা, তিনি তাঁর অস্তিত্বে একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ; তিনি ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে, তখন আপনি সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। একমাত্র মহান রবের অভিমুখী হবেন।
সুতরাং জ্ঞানের মজলিসে উপস্থিত হওয়া, দু-রাকাত সালাত আদায় করা এবং দু-টাকা দান করার চেয়ে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বাসের পরিণতি চূড়ান্ত, চিরস্থায়ী। বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব হক-বাতিলের দ্বন্দ্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ
সুতরাং তিনিই আল্লাহ, তোমাদের প্রকৃত রব। হকের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী থাকতে পারে? অতএব তোমরা কোথায় ফিরে যাচ্ছ? [১]
আপনি যদি অনিশ্চিত বিশ্বাসে বিশ্বাসী হন, তাহলে কী আপনি জান্নাতের প্রতি বিশ্বাসী? আল্লাহর শপথ, আমার প্রবল ধারণা-এই বিশ্বাসও বাতিল বলে বিবেচিত হবে।
আপনি কি বিশ্বাস করেন, আল্লাহ আপনাকে সবকিছু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন না? তিনি কি আমাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেবেন না? তিনি কি আমাদের বোধ ও বিবেকের পরিমাণ অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না?
তাহলে এমন আকিদা-বিশ্বাস বাতিল। আপনি কি আল্লাহর এই কালামে বিশ্বাস করেন-
أَفَمَنْ حَقَّ عَلَيْهِ كَلِمَةُ الْعَذَابِ أَفَأَنتَ تُنقِذُ مَن فِي النَّارِ
যার ওপর শাস্তির আদেশ কার্যকর হয়ে গেছে, আপনি কি সেই জাহান্নামিকে রক্ষা করতে পারবেন? [২]
অনেক সময় অবিন্যস্ত অধ্যয়নে, স্থূল বক্তব্যে, ভুল আসরের ফাঁদে পড়ে মানুষের মনমস্তিষ্ক বাতিলের প্রতি ধাবিত হয়। তখন সে বাতিল কাজ করে। আমরা যদি জিজ্ঞেস করি, 'ভাই, তুমি মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছ কেন?' সে বলে, 'আমার কয়েকটি সন্তান আছে, আমি কী করব বলুন?' তার এই বক্তব্যও বাতিল। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলাই জীবিকা দানকারী, ক্ষমতাশালী, মহাশক্তিমান। নিশ্চয় প্রতিটি সৎকাজের প্রতিদান রয়েছে, অসৎ কাজের জন্য রয়েছে শাস্তি।
এজন্য আকিদা-বিশ্বাসকে সমস্ত ভুল-ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আকিদা-সংক্রান্ত এমনই একটি বিষয়ে নবিগণকে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন: ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা। এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বর্ণিত হয়েছে—
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَن رَّأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ ﴿২৪﴾
মূলত এই নারী তার (ইউসুফ আলাইহিস সালামের) ব্যাপারে কুচিন্তা করেছিল আর সেও তাকে নিয়ে কুচিন্তা করত, যদি না সে তার রবের নিদর্শন দেখতে পেত। এভাবে তাকে নিদর্শন দেখানো হয়েছিল, যাতে আমি তাকে অন্যায় ও অপকর্ম থেকে দূরে রাখতে পারি। সে আমার নিষ্ঠাবান বান্দাদের অন্যতম।[১]
প্রিয় পাঠক, ইউসুফ আলাইহিস সালাম একজন নবি ছিলেন। নবি কখনো ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারেন না—শুধু এমন আকিদা বাতিল। কেউ যদি—
لَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا
এই অংশ ব্যাখ্যা করে—'মূলত এই নারী তাকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল আর সে তাকে প্রতিরোধ করেছিল', তাহলে এই ব্যাখ্যাও ভুল হবে। বরং আমরা যদি সম্পূর্ণ আয়াত পাঠ করি, তাহলে সঠিক ব্যাখ্যাটি বুঝতে পারব। আয়াতের বাকি অংশ এই—'সেও তাকে নিয়ে কুচিন্তা করত, যদি না সে তার রবের নিদর্শন দেখতে পেত।' অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা করা হয়েছিল। নবিদের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে এটিই সঠিক ব্যাখ্যা। এটিই হক তাফসির।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের হৃদয়ে বিশেষ নূর দান করেন, যা মুমিনের সামনে হককে হকরূপে এবং বাতিলকে বাতিলরপে উদ্ভাসিত করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَوْ شِئْنَا لَآتَيْنَا كُلُّ نَفْسٍ هُدَاهَا وَلَكِنْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ )
যদি আমি চাইতাম, তবে প্রত্যেককেই সঠিক পথের সন্ধান দিতাম। কিন্তু আমার এ কথা অবধারিত সত্য যে, নিশ্চয়ই আমি জিন ও মানুষ উভয়কে দিয়েই জাহান্নাম পূর্ণ করব [১]
সুতরাং কুরআনকেও 'হক'ভাবে বুঝতে হবে, 'বাতিল'ভাবে নয়। একইভাবে নবিজির হাদিসও বুঝতে হবে 'হক'ভাবে।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, শপথ সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা যদি গুনাহ না করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের অপসারিত করবেন এবং এমন জাতির আবির্ভাব ঘটাবেন-যারা গুনাহ করবে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, আর তিনিও তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।[২]
হাদিসের অর্থ তো স্পষ্ট, কিন্তু এর উদ্দেশ্য কী? হাদিসের মানে কি এই যে, আমরা গুনাহে লিপ্ত হব?
না হাদিসের উদ্দেশ্য এমন নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো, আমরা যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছি যে, আমাদের গুনাহের কোন অনুভূতিই নেই, তাহলে আমরা হয়ে পড়ব মৃত মানুষের মতো। তখন আল্লাহ তাআলা আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। যেমন: কেউ হয়তো রাতভর গিবত তথা পরনিন্দা করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে। অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, গিবত ব্যভিচারের চেয়েও ভয়ংকর। [৩]
মানুষ যদি গুনাহ করে এবং তার মধ্যে গুনাহের কোনো অনুভূতিও না থাকে, তাহলে সে মৃত (তার হৃদয় মরে গেছে)। পক্ষান্তরে মুমিনের সারারাত থাকে নেক আমলে পূর্ণ। অতএব আল্লাহর ব্যাপারে আপনার বিশ্বাসকে ঠিক করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
... يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ ...
তারা আল্লাহ সম্পর্কে অন্যায়ভাবে অজ্ঞতাসুলভ ধারণা পোষণ করছিল [১]
এমন মানুষও রয়েছে, আল্লাহর ব্যাপারে যার অধিকাংশ ধারণাই ভুল, অধিকাংশ বিশ্বাস ও অনুধাবনই ভ্রান্তিপূর্ণ। যেমন: কেউ কেউ বলে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন রাস্তায় হাঁটছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি পৌঁছে গেলেন তার পালকপুত্র যাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ঘরের দরজায়। নবিজি দরজায় কড়া নাড়লেন। দরজা খুলে দেওয়া হলো। নবিজির সামনে যাইনাব রাযিয়াল্লাহু আনহাকে দেখা গেল বস্ত্রহীন অবস্থায়। তার চুল কোমর অব্দি নেমে এসেছিল। নবিজি তাকে দেখে মুগ্ধ হলেন। বললেন, সুবহানাল্লাহ!
এমন আজগুবি ঘটনা কোথা থেকে জেনেছেন? কে বর্ণনা করেছে এমন ঘটনা? এ ঘটনার সত্যতা কি যাচাই করেছেন? সর্বশ্রেষ্ঠ নবি এমন কাজ করতে পারেন? একজন মুমিন হিসেবে আপনি কি এমন কাজ করতে পারবেন? তাই এ ঘটনা সম্পূর্ণ বাতিল, বানোয়াট।
وَلَقَدْ عَلِمْنَا الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنكُمْ وَلَقَدْ عَلِمْنَا الْمُسْتَأْخِرِينَ )
যারা তোমাদের পূর্বে গত গেছে, আমি তাদের ব্যাপারে জানি এবং যারা পেছনে রয়ে গেছে, জানি তাদের সম্পর্কেও [২]
আবার কেউ ধারণা করে, জনৈকা সুন্দরী নারী সাহাবিদের মাঝে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত রূপবতী। সাহাবিদের কেউ কেউ রুকু-সিজদার সময় তার সৌন্দর্য দেখার জন্য পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আবার কেউ দাঁড়িয়েছিলেন তার সামনে। তখন উপরিউক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই উদ্ভট তাফসির সম্পূর্ণ বাতিল। সম্মানিত সাহাবিগণ এমন অপবাদের বহু ঊর্ধ্বে।
সুতরাং আপনাকে হক জানতে হবে; জানতে হবে হকের সাথে সম্পৃক্ত সবকিছু। আর এর জন্য আপনাকে আল্লাহ তাআলার সুন্দর নামগুলো ও তাঁর শ্রেষ্ঠ গুণাবলি জানতে হবে; জানতে হবে নবিদের সাথে সম্পৃক্ত সবকিছু।
আল্লাহর নবি দাউদ আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বলা হয়, তাঁর ৯২জন স্ত্রী ছিল। তারপরও তিনি তার এক সেনাপতির স্ত্রীকে পছন্দ করেছিলেন। তিনি তখন নির্দেশ দিলেন, সেই সেনাপতিকে যুদ্ধের সম্মুখভাগে এগিয়ে দিতে, যাতে সে মারা যায় এবং তিনি তার স্ত্রীকে গ্রহণ করতে পারেন। তখন আল্লাহ তাআলা দাউদ আলাইহিস সালামকে তিরস্কার করে বললেন-
﴿ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى...﴾
তুমি প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না।[১]
এই উদ্ভট তাফসিরও সঠিক নয়; বরং দাউদ আলাইহিস সালাম মানুষের সমস্যার সমাধান না করে ইবাদতে মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তখন আল্লাহ তার কাছে দুজন ফেরেশতা পাঠালেন। তারা দেওয়াল ডিঙিয়ে দাউদ আলাইহিস সালামের ইবাদতের জায়গায় ঢুকে পড়ল এবং দুজনে বিচার চাইল। তখন দাউদ আলাইহিস সালাম একজনের কথা শুনেই বললেন, 'সে তোমার প্রতি অবিচার করেছে।' তিনি মূলত তাড়াতাড়ি ইবাদতে ফিরে যেতে চাইছিলেন। এজন্য আল্লাহ তাকে যে প্রবৃত্তি থেকে নিষেধ করেছিলেন, সে প্রবৃত্তি ছিল ইবাদতের প্রবৃত্তি। তার ইচ্ছা ছিল, তাড়াতাড়ি আল্লাহমুখী হওয়ার।[২]
সুতরাং আমাদের সেই তাফসিরটিই গ্রহণ করতে হবে, যা সত্য এবং নবিদের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, মহান দ্বীনের সাথে মানানসই। আমরা সঠিক আকিদা পোষণ করব, সঠিক কথা বলব এবং সঠিকভাবে সামঞ্জস্য বিধান করব-যাতে আমরা হকের ওপর অবিচল থাকতে পারি।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেল, হক মানে বাস্তবানুগ কথা। সুতরাং আপনি এমন কোনো কথা গ্রহণ করবেন না, যা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক মিথ্যাবাদী আছে, 'যারা বলে, কোনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালো না থাকলে, স্ত্রী সাদা ও কালো রঙের দুটি মেষ জবাই করবে। তাহলে স্বামী সেই স্ত্রীকে ভালোবাসবে।' এমন কথা বাতিল, পুরোপুরি মিথ্যা।
ধরুন, কোনো বাড়িতে গুনাহের কাজ হয়। তখন তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা হলো শরীরে সরু তরবারি কিংবা শিক প্রবেশ করানোর মাধ্যমে।[১] এর দৃষ্টান্ত অনেকটা এমন— কোনো অসুস্থ ব্যক্তির পেটে ব্যথা হচ্ছে। পেটব্যথা নিয়ে তিনি গেলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার তাকে অপেক্ষা করতে বলে একটি রশি টানালেন। তারপর সেই রশির ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। অসুস্থ ব্যক্তিটি সেই অদ্ভুত কসরত দেখতে লাগল। অথচ তখন তার প্রয়োজন চিকিৎসা ও ঔষধ। ডাক্তার বাজিকরের মতো দড়ির ওপর হাঁটলে রোগীর কী উপকার হবে!
আমি এসব উদাহরণের কথা বলছি, কারণ আরোগ্য, আত্মিক প্রশান্তি, ভারসাম্য, চিরস্থায়ী সুখ আমাদের অতি প্রয়োজন। এমন চিরন্তন সত্য আমাদেরও প্রয়োজন— কালের পরিক্রমায় যা ভুল বলে প্রকাশ পাবে না। কেউ হয়তো দীর্ঘদিন পর্যন্ত কোনো আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করতে পারে। সবশেষে প্রকাশ পায়, সেই আকিদা বাতিল। সঠিক হওয়ার কোনো ভিত্তিই নেই। এসব বিবেচনায় আল্লাহ তাআলাই হক। হক শব্দটি তাঁর জন্যই সাজে।
আপনার আকিদা যদি বাস্তবানুগ হয়, তাহলে সেই আকিদা হক।
আপনার কথা যদি বাস্তবানুগ হয়, তাহলে সেই কথাও হক।
আপনার জ্ঞান, কল্পনা, বিশ্বাস, অবস্থান, দান করা ও বিরত থাকা, সম্পর্ক রক্ষা করা কিংবা ছেদ করা, ক্রোধ কিংবা আনন্দ সবই হতে হবে হক অনুযায়ী।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রসিকতা করতেন। কিন্তু তার রসিকতাও হতো হক; সত্য। সুতরাং আপনিও রসিকতা করতে পারেন। তবে সেই রসিকতা হতে হবে সত্য। আপনার রসিকতা যেন কারও অনুভূতিতে আঘাত না করে, কোনো ব্যক্তি কিংবা পেশাকে অপদস্থ না করে।
আশা করি, ‘হক’ শব্দটি স্পষ্ট হয়েছে। এই শব্দটি কুরআনুল কারিমে শতবারেরও অধিক বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলাই হক; চিরন্তন সত্য। আল্লাহর মাধ্যম ছাড়া কোনো কিছুর কোনো অস্তিত্ব নেই। যখন আল্লাহ চান কোনো কিছু বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখনই তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তিনি সেই জিনিসটিকে আদেশ করেন, ‘হও, তখনই তা হয়ে যায়।’ তিনি আদেশ করেন, ‘বিলুপ্ত হও, তখনই তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।’
সুতরাং আল্লাহ তাআলা ছাড়া যা কিছু রয়েছে, সবই সম্ভাব্য বিরাজমান। যদি সেগুলো অস্তিত্ব লাভ করে, আল্লাহর মাধ্যমেই করে। যদি বহাল থাকে, তবে আল্লাহর মাধ্যমেই থাকে। আবার যখন শেষ হয়ে যায়, আল্লাহর মাধ্যমেই শেষ হয়ে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআয় বলতেন—
اللَّهُمَّ أَنَا بِكَ وَإِلَيْكَ
আল্ল-হুম্মা আনা- বিকা ওয়া ইলাইক।
অর্থ : হে আল্লাহ আপনার মাধ্যমে (বেঁচে আছি) আর ফিরে যাব আপনারই কাছে।[১]
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ ...
আপনি বলুন, ‘হে আল্লাহ, হে বিশ্বজগতের অধিপতি!’
তিনি বিশ্বজগতের মালিক। পৃথিবীর সবকিছুর মালিক তিনি। আপনার চোখের মালিকও তিনি। আপনি ততক্ষণই চোখ দিয়ে দেখতে পারবেন, যতক্ষণ তিনি দেখার অনুমতি দেবেন। তিনি চাইলে যেকোনো মুহূর্তে আপনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলতে পারেন। এমনকি বাহ্যিক কোনো কারণ ছাড়াই আপনি অন্ধ হয়ে যেতে পারেন।
আপনার চোখ, কান; সবকিছুর মালিক তিনি। এক ভাই আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়েছেন। এক মানসিক হাসপাতালে একটি ভয়ংকর বিভাগ রয়েছে, যার ক্রমিক নং ছয়। সেই বিভাগের রোগীরা গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে, মলমূত্র, রক্ত, চুল; সবকিছু খেয়ে ফেলে। কোনো কিছু অক্ষত থাকে না তাদের কাছে। তাদের শরীরে প্রচন্ড শক্তি; কিন্তু শরীর পরিচালনাকারী মস্তিষ্ক অচল।
আপনার হয়তো একটি কর্মক্ষেত্র রয়েছে, রয়েছে সুস্থ বিবেক। সেই বিবেকের মাধ্যমে আপনি কোনো পেশায় নিয়োজিত আছেন। নিখুঁতভাবে সেই পেশায় কাজ করে যাচ্ছেন। সবই কিন্তু হচ্ছে আল্লাহর দয়ায়। তিনি যদি আপনাকে দেওয়া সবকিছু ফিরিয়ে নেন, তাহলে আপনি শেষ। তখন আপনার কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।
মনে করুন, আপনি একটি বাড়ি নির্মাণ করলেন। সুন্দরভাবে সাজালেন। তারপর হঠাৎ একদিন আপনার মানসিক সমস্যা দেখা দিল। আপনার পরিবার সহ্য করতে না পেরে আপনাকে রেখে এল মানসিক হাসপাতালে। অথচ আপনিই ছিলেন বাড়ির মালিক। আপনার কষ্টার্জিত টাকায় বাড়ি কিনেছিলেন। তিলতিল করে গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এখন আপনি কোনো কিছুর মালিক নন। মানুষ যখন তার বিবেক হারিয়ে ফেলে, তখন তার শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলে।
আপনার দুটি কিডনি রয়েছে। কিডনি দুটি ঠিকমতো কাজ করছে। এখন পর্যন্ত কিডনির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বাহ্যিক কোনো কারণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু হঠাৎ দুটি কিডনিরই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেল। দুর্বিষহ হয়ে উঠল আপনার জীবন। প্রতি সপ্তাহে দুদিন ডাক্তার দেখাতে হয়। প্রতিবার ডাক্তার দেখাতে সময় লাগে সাত ঘণ্টা। কখনো হাতে, কখনো পায়ে কঠিন স্নায়বিক বৈকল্য দেখা দেয়।
তখন আপনার আশা-আকাঙ্ক্ষা কোথায় হারিয়ে যায়? আপনি কি আপনার কিডনির মালিক? আপনার হৃৎপিণ্ডের ভাল্বের মালিক কি আপনি?
না, আপনার সবকিছুর মালিক আল্লাহ তাআলা।
আমার এক যুবক বয়সী আত্মীয়ের রক্তস্বল্পতা দেখা দিয়েছিল। তার পরিবার ছিল বিত্তশালী। খাওয়া-দাওয়াও ছিল উন্নত। ছেলেটি নিজেও মেডিকেল সাইন্সের ছাত্র। কিন্তু চিকিৎসকরা তার অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ে। অবশেষে জানা যায়, প্লীহায় কোনো গোলমাল রয়েছে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা গেল, প্লীহায় কোনো কমতি নেই। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় তার প্লীহা অতিরিক্ত সক্রিয়। প্রাণীর দেহে প্লীহা বেশকিছু কাজ করে। যেমন, স্বল্পমেয়াদী রক্ত সঞ্চয় করে, রক্তে বিদ্যমান ভারী ধাতু, ব্যাকটেরিয়া, বর্জ্য পদার্থ এবং ক্ষত ও পোড়া জায়গায় টিস্যু ভাঙার সময় গঠিত পদার্থ থেকে রক্তকে বিশুদ্ধ করে, শরীরের রোগ-প্রতিরোধ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমার আত্মীয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি অতিরিক্ত সক্রিয় ছিল। ফলে কিছুদিন পর সে মৃত্যুবরণ করে।
আমাদের সবার জীবন আল্লাহর হাতে। তিনি আমাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ পরিমিতভাবে পরিচালনা করেন। তাই আমাদের প্লীহা ঠিকমতো কাজ করে, ইনসুলিন ঠিক থাকে, হার্টের ভাল্ব ঠিক থাকে, রক্তনালিতে ব্লক দেখা দেয় না, কিডনি বিকল হয়ে পড়ে না।
আপনি জানেন কি, মস্তিষ্কে একবিন্দু পরিমাণ রক্ত জমলেই প্যারালাইসিস হতে পারে? অথবা ছোট্ট একটা ধমনি চর্বি দিয়ে আটকে গেলে স্ট্রোক করে আপনার হাসপাতালে পৌঁছতে হবে?
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاءُ وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴿২৬﴾
বলুন, 'হে আল্লাহ, সার্বভৌম রাজত্বের অধিকারী। আপনি যাকে চান, তাকে ক্ষমতা দান করেন; আর যার থেকে চান, রাজত্ব কেড়ে নেন। যাকে চান সম্মানিত করেন, আবার যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। আপনার হাতেই সমস্ত কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সবকিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।[২]
কখনো হয়তো আল্লাহ তাআলা আপনাকে দুনিয়া দান করেন। কিন্তু দুনিয়ার সাথে সংকীর্ণতাও দেন। তখন অর্থ-সম্পদের কোনো মূল্য থাকে না। আল্লাহ যদি আপনাকে সম্পদ দেন এবং আপনার থেকে প্রশান্তি ছিনিয়ে নেন, তাহলে আপনার জীবন হবে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতাময়। যদি অর্থ-সম্পদ দিয়ে আপনার থেকে সুস্থতা, নিশ্চিন্ততা ও স্থিরতা ছিনিয়ে নেন, তাহলে আপনার জীবনের কোনো মূল্যই থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلَا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُمْ بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا ۚ فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالْأَمْنِ ۖ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ ۗ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُولَٰئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ ﴿٨٢﴾
তোমরা যেসব বস্তুকে (আল্লাহর) অংশীদার সাব্যস্ত করেছ, আমি কীভাবেই-বা তাদের ভয় করি, যখন তোমরা ওইসব জিনিসকে আল্লাহর শরিক বানাতে ভয় করছ না, যাদের ব্যাপারে তিনি তোমাদের প্রতি কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি? সুতরাং তোমাদের কাছে যদি কিছু জ্ঞান থাকে, তবে (বলো), দুই দলের মধ্যে কোন দল নির্ভয়ে থাকার বেশি উপযুক্ত? যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে জুলুমের (শিরকের) সাথে মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই সুপথগামী। [১]
প্রিয় ভাই, আপনার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হক (সত্য) ও হাকিকত (বাস্তবতা) চিনতে পারা। প্রমাণের ভিত্তিতে বাস্তবানুগ প্রতিটি কথাই হক। প্রমাণ ছাড়া মেনে নেওয়া মানে অন্যের অনুসরণ করা।
সুতরাং যদি কেউ বলে 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই'—তাহলে এই কথাটি প্রকৃতপক্ষে হক। কিন্তু এই কথাটির যদি কোনো প্রমাণ না জানা থাকে, তাহলে তা হবে প্রমাণবিহীন কথা। অতএব হক বলা হবে সেই কথাকেই, যা দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে বাস্তবানুগ হবে।
এখন হকের প্রতি আপনার বিশ্বাস যদি অকাট্য না হয়, তাহলে সেই বিশ্বাসের কোনো মূল্যই থাকবে না।
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুত্তাকিদের জন্য এটি পথনির্দেশিকা। [২]
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ )
মুমিন তো তারা, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, এরপর তাতে কোনো সন্দেহ পোষণ করে না এবং নিজেদের অর্থ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। তারাই প্রকৃত সত্যবাদী [১]
আপনার বিশ্বাসে যদি কোনো সন্দেহ কিংবা সংশয় অথবা অনিশ্চয়তা থাকে, অথবা কোনো কিছুর প্রতি আপনার বিশ্বাস ১০০তে ৩০ পার্সেন্ট থাকে, তাহলে একে বলা হয় 'সংশয়'।
যদি ১০০তে ৫০ পার্সেন্ট থাকে, তাহলে তাকে বলা হয় 'সন্দেহ'।
আর ১০০তে ৯০ পার্সেন্ট হলে তাকে বলা হয় 'প্রবল ধারণা'।
যদি আপনার বিশ্বাস থাকে ১০০তে ১০০, তাহলে সেই বিশ্বাসকে বলা হবে ঈমান।
জান্নাত, জাহান্নাম, বিচার-দিবসের প্রতি আপনার ঈমান অকাট্য। সুদি লেনদেনকারীর সম্পদ অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে, ব্যভিচারী অচিরেই দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হবে; যে ব্যক্তি হারাম থেকে দৃষ্টিকে রক্ষা করে না, তার পরিবারে অশান্তি দেখা দেবে; যার হারাম সম্পদ রয়েছে, আল্লাহ অচিরেই সেই সম্পদ ধ্বংস করে দেবেন, আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে; ইত্যাকার বিষয়গুলোতে যদি আপনি ১০০তে ১০০ ভাগ অকাট্য বিশ্বাস পোষণ করেন, তাহলে আপনি হকের ওপর আছেন। হক সংশয়, সন্দেহ, ধারণা কিংবা প্রবল ধারণার সাথে মিলিত হতে পারে না।
হক কখনো সংশয়, সন্দেহ, ধারণা কিংবা প্রবল ধারণার সম্ভাবনা রাখে না। হকের সাথে সম্পর্ক শুধু অকাট্যতার।
প্রতিটি অকাট্য বক্তব্যই বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাস্তবতার পরিপন্থি যেকোনো কথাই বাতিল। এই মূলনীতি হাজারো ভ্রান্ত আকিদা, বানোয়াট কাহিনি ও অবাস্তব বিষয়কে দ্বীন থেকে দূরীভূত করে দেয়।
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খিলাফতকালে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেনাপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শতাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। তাকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে কিছু লোক আপনাকে বলবে, উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার মাঝে জাহেলি যুগে দ্বন্দ্ব ছিল। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু খলিফা হয়ে তাকে অব্যাহতি দিয়ে সেই দ্বন্দ্বের শোধ নেন!
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিরা এমন ছিলেন? আল্লাহর শপথ, তারা যদি এমনই হতেন, তাহলে তারা মক্কা থেকেই বের হতে পারতেন না; দিগ্বিজয় করতে পারতেন না। এই বিষয়ে আপনি অনেক ব্যাখ্যা দেখতে পাবেন। তবে সঠিক ব্যাখ্যাটি আমি জানতে পেরেছি।
অব্যাহতি দেওয়ার পর খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে বললেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, 'আমাকে অব্যাহতি দিলেন কেন?' উমার বললেন, 'আবু সালমান (খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের উপনাম), আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'আমাকে কেন অব্যাহতি দিলেন?' উমার বললেন, 'ইবনুল ওয়ালিদ, আল্লাহর শপথ, আমি শুধু এই আশঙ্কায় তোমাকে অব্যাহতি দিয়েছি যে, মানুষ তোমার ব্যাপারে ফিতনায় পতিত হবে। মানুষ ধারণা করতে শুরু করেছে, তুমিই তাদেরকে বিজয়ী করো। আমি তাদের আকিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে আশঙ্কা করছি। তাই তাদেরকে দেখিয়ে দিতে চাইছি, যদি আমি তোমাকে অব্যাহতি দিই, তবু বিজয় আমাদেরই হবে; যতক্ষণ আমরা মুমিন থাকব।' [১]
এই ব্যাখ্যা উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ব্যাখ্যাটিই হক।
কখনো আপনি এমন ব্যাখ্যা ও ঘটনা পড়তে পারেন, যেগুলো সহিহ নয়, বোধগম্য হয় না। সেসব ঘটনায় সম্মানিত সাহাবিদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম, হক কখনো সংশয়, সন্দেহ, ধারণা কিংবা প্রবল ধারণার সম্ভাবনা রাখে না। হকের সাথে সম্পর্ক শুধু অকাট্যতার।
কেউ কেউ বলেন, 'এই কথাটি অনেকাংশে বাস্তব।' প্রকৃতপক্ষে এমন কথাও হক নয়। ১০০তে ৮০ ভাগ কিংবা ৫০ ভাগ বাস্তব বিষয় হক হতে পারে না। বরং হক চিরকাল ১০০তে ১০০ ভাগই সত্য হয়।
পূর্বে আমরা বলেছি, কোনো বিষয় অকাট্য ও বাস্তবানুগ হলে তার জন্য দলিল-প্রমাণ আবশ্যক। দলিলকে উপেক্ষা করা হলে, তা হয় 'তাকলিদ' বা অনুসরণ। যদি কেউ আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে আকিদা পোষণের ক্ষেত্রে কারও অন্ধ অনুসরণ করে, তাহলে কি তার আকিদা গ্রহণযোগ্য হবে?
মনে করুন, কেউ আপনাকে বলল, 'আল্লাহ তাআলা রহিম (চিরদয়াময়) নন। কারণ তিনি আমাদের নানা ধরনের বিপদাপদ ও রোগব্যাধি দেন।' তখন আপনি তাকে বললেন, 'আপনি ঠিক বলেছেন। আমি এখন থেকে আপনার অনুসরণ করছি।' কিয়ামতের দিন যদি আল্লাহ আপনাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কেন এই বিশ্বাস পোষণ করেছ যে, আমি রহিম নই?' আপনি হয়তো বলবেন, 'হে রব, আমি অমুকের অনুসরণ করেছি। সে আমাকে এমন কথা বলেছিল; আমি তাকে সত্যায়ন করেছি।' তখন যদি আল্লাহ বলেন, 'তোমার বিবেক কোথায় ছিল? হিদায়াত পাওয়ার জন্য তোমার বিবেককে কাজে লাগালে না কেন?' তখন আপনি কী উত্তর দিবেন?
এজন্য আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে অন্ধ অনুসরণ গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এভাবে বিশ্বাস তৈরি হতে পারে না। এক্ষেত্রে দলিল-প্রমাণই মূল। জ্ঞানতাত্ত্বিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে। যদি আপনাকে কোনো ঘটনা শোনানো হয়, তাহলে জিজ্ঞেস করুন, 'কোত্থেকে বর্ণনা করছেন?' শুধু সহিহ বর্ণনাই গ্রহণ করবেন। যদি কোনো কিছু দাবি করেন, তাহলে দলিল পেশ করবেন। প্রবল ধারণার ভিত্তিতে কোনো বিষয় সাব্যস্ত হবে না।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَا فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে—যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। পরে কিন্তু নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদের অনুতপ্ত হতে হবে।[১]
হকের জন্য দলিল প্রয়োজন, প্রয়োজন বাস্তবানুগ ও অকাট্য হওয়া। যদি আপনার আকিদা, চিন্তাভাবনাকে বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও অকাট্য করতে পারেন, তাহলে আপনি সফল।
আল্লাহ তাআলা হক, তাঁর কথা হক, জান্নাত হক, জাহান্নام হক, আমলের হিসাব হক, আজাব হক, পুলসিরাত হক, হাউজে কাউসার হক। এই হকের অর্থ এসবই সুসাব্যস্ত ও বিরাজমান।
দৃষ্টি অবনত রাখাও হক। এই হকের অর্থ হলো, যদি আপনি তা বাস্তবায়ন করেন; দৃষ্টিকে অবনত রাখেন, তাহলে আপনি এর সুফল ভোগ করবেন।
আমানত হক। আপনি যদি আমানতদার (বিশ্বস্ত) হন, তবে মানুষ আপনার ওপর আস্থা রাখবে। আমানত একটি সম্পদ।
মোটকথা আপনি যা-ই বাস্তবায়ন করবেন, তারই সুফল লাভ করবেন। কারণ সময় অত্যন্ত মূল্যবান, আর জীবনের অপর নাম বাস্তবায়ন। আপনি যদি মসজিদ কমিটির বিশিষ্ট সদস্য হন, কিন্তু দায়িত্ব পালন না করেন, তবে কিছুই অর্জন করতে পারবেন না। আপনার সমস্ত চলাফেরা হবে উদ্দেশ্যহীন। সুতরাং বাস্তবায়নই মূল বিষয়।
আপনি যদি বলেন, 'আখিরাতে জান্নাত চিরস্থায়ী, পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী'; তবে দেখতে হবে, আপনার বিশ্বাসের সাথে আমলের মিল আছে কিনা। কখনো এমন হতে পারে, আকিদা হক, কিন্তু তার প্রয়োগ বাতিল।
কোনো ডাক্তার যদি ধুমপান করতে করতে আপনাকে বলে, 'ধুমপান করবেন না; ধুমপানের কারণে ফুসফুসে ক্যান্সার, ধমনিতে সংকীর্ণতা ও চাপ সৃষ্টি হয়'; তাহলে কি আপনি তার কথা গ্রহণ করবেন? তার এই বক্তব্য বাতিল। যদি সে নিজের কথায় বিশ্বাস করত, তাহলে নিজে ধুমপান করত না।
সুতারাং হক শব্দের অর্থ ব্যাপক। আল্লাহ তাআলা হক; এর অর্থ হলো, তিনি অবশ্যই হককে প্রকাশিত করবেন। আপনি যদি হকের ওপর থাকেন, তাহলে বিলম্বে হলেও আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি থাকেন বাতিলের ওপর, তাহলে অবশ্যই তিনি আপনাকে অপদস্থ করবেন। তাই সবসময় হকের সাথে থাকুন।
তবে এক্ষেত্রে একটি অসুবিধা রয়েছে, যা হয়তো আপনার কাছেও স্পষ্ট। তা হলো, আল্লাহ তাআলা মানুষকে ছাড় দেন। আপনি অনেক ক্ষেত্রেই যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারবেন। আপনাকে ইচ্ছাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভুল করতেই যদি আল্লাহ আপনাকে শাস্তি দিতেন, তাহলে আপনি আল্লাহর ভালোবাসা কিংবা আনুগত্য স্বীকার করে নয়; বরং শাস্তির ভয়ে সঠিক পথে আসতেন। তখন আপনি স্বাধীন থাকতেন না। আপনি হতেন পরিচালিত। স্বাধীন কিংবা ইচ্ছাধিকার পাওয়ার অর্থ হলো, আপনি হারাম সম্পদ ভক্ষণ করতে পারবেন, ১০ বছর উপভোগ করতে পারবেন।
তারপর আপনার ওপর শাস্তি নেমে আসবে। আপনি হয়তো কোনো হারাম সম্পর্কে জড়ালেন। সাময়িকভাবে আপনি হয়তো কোনো বিপদে পড়বেন না। আমার পরিচিত এক ব্যক্তি এক নারীর সাথে হারাম সম্পর্কে লিপ্ত ছিল। তার বড়সড় ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। রয়েছে বেশ কিছু অফিস, আমদানি বাণিজ্য, সামাজিক অবস্থান, বাড়ি-গাড়ি, ইউরোপ-আমেরিকা সফর। কিন্তু মুমিন হিসেবে আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, তার এই বিশাল সাম্রাজ্য কিছুদিন পরই তছনছ হয়ে যাবে। যদিও তার ধারণা, সে কোনো মন্দ কাজ করছে না।
মনে করুন, কোনো আরোহী ব্রেকহীন গাড়িতে আরোহণ করে মুক্ত বাতাসে সমতল রাস্তায় চলছে। তাকে যদি বলা হয়, 'রাস্তার শেষে রয়েছে একটি মোড়। তোমার গাড়ির তো ব্রেক নেই; দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী।' সে যদি বিশ্বাস করে, তার গাড়িতে ব্রেক নেই, তাহলে হয়তো দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ
কখনো নয়, তোমরা যদি নিশ্চিতভাবে জানতে! তোমরা অবশ্যই জাহান্নাম দেখবে; তোমরা তা দেখবে চাক্ষুষভাবে [১]
আপনি যখন দেওয়ালের ওপাশে ধোঁয়া উঠতে দেখেন, তখন শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলেন, 'আগুন ছাড়া ধোঁয়া হতে পারে না।' দেওয়ালের পেছনে গিয়ে আগুনের শিখা দেখতে পেলেন। প্রথমটি হলো জ্ঞান। আর যখন সচক্ষে আগুন দেখলেন, তখন তা হলো চাক্ষুষ জ্ঞান। তারপর যখন 'আপনার হাতে আগুনের তাপ লাগল, তখন তা হলো নিশ্চিত জ্ঞান।
অতএব আমাদের হক জানতে হবে। হক আকিদা পোষণ করতে হবে, হক বলতে হবে, হকের ওপর অবিচল থাকার জন্য সঠিক পথে চলতে হবে। তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তাআলা আমাদের সম্মানিত করবেন।
আল্লাহ যখন হক প্রতিষ্ঠা করবেন, তখন তাঁর অনুগত বান্দাদের ক্ষমা করবেন। তিনি ছাড়া ক্ষমা করার কেউ নেই। আমার সাথে এই আয়াতটি ভেবে দেখুন-
وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا آخَرَ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ﴾
আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্যকে ডেকো না। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। একমাত্র তাঁর সত্তা ছাড়া সবকিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই এবং তাঁরই কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে তোমাদের [১]
সারকথা হলো, বিশ্বজগতে পরম সত্য কেবল একটিই আছে। আর তা হলো 'আল্লাহ'। যা কিছু আপনাকে তাঁর নিকটবর্তী করবে, তা-ই হক। আর যা আপনাকে তাঁর থেকে দূরে ঠেলে দেবে, তা-ই বাতিল। তাই আল্লাহকে চিনতে হবে, তাঁর পথ চিনতে হবে। তাঁর পথে চলতে হবে। এটিই হক। এছাড়া সবই বাতিল।
আপনারা হয়তো নিজের চোখে দেখে থাকবেন, বাতিল হয়তো দীর্ঘসময় টিকে থাকে। কিন্তু তারপর মাকড়সার জালের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাতিলের চিন্তা বাতিল, তার সূচনাও বাতিল, বাতিলের প্রয়োগও বাতিল। যদি পিলার ছাড়া দেওয়াল তৈরি করা হয়, তাহলে সবাই বলবে, এই দেওয়াল যতক্ষণই টিকে থাকুক; খুব তাড়াতাড়ি ধসে পড়বে। ধ্বংস ও বিলুপ্তি বাতিলের অবধারিত বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا ۞
বলুন, হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। আর বাতিল তো বিলুপ্ত হবারই ছিল [১]
আল্লাহ যদি আপনার সাথে থাকেন, তবে আপনার বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারবে না, আর যদি তিনি আপনার বিরুদ্ধে থাকেন, তাহলে আপনার পাশে আর কে থাকবে?
হে রব, যে আপনাকে পেয়েছে, তার হারানোর কিছু নেই, আর যে আপনাকে হারিয়েছে, তার পাওয়ার কিছু নেই।

টিকাঃ
[১] সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ২২
[১] সুরা ইউনুস, আয়াত: ৩২
[১] রূপরেখা, পথ ও পন্থা।
[২] পরবর্তী বিবরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, লেখক এখানে ইরাকের কথা বলেছেন।
[১] সুরা নাহল, আয়াত: ১১২
[২] সুরা হুদ, আয়াত : ১১৭
[১] আহলুল কিতাব বলা হয় ইহুদি-খ্রিষ্টানসহ পূর্ববর্তী সকল সত্য কিতাবধারী উম্মাহকে。
[২] সহিহুল বুখারি: ১৪৫৮; সহিহ মুসলিম: ১৯; মুসতাখরাজ আবি আওয়ানা ৩৪০১; সহিহ্বল জামি : ২২৯২
[১] সুরা হিজর, আয়াত: ৮৫
[২] সুরা রুম, আয়াত: ৮১
[৩] সুরা সাদ, আয়াত: ২৭
[১] সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৮৬-৮৭
[১] এটা কেবলই শাব্দিক অনুবাদ। বাস্তবে এই হাতের অস্তিত্ব বা আকৃতি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। এটাই সমস্ত হকপন্থি আলিমের মত。
[২] সুরা ফাতহ, আয়াত: ১০
[৩] সুরা আনফাল, আয়াত : ১৭
[৪] সুরা হুদ, আয়াত: ১২৩
[১] সুরা হুদ, আয়াত: ৫৫-৫৬
[১] সুরা ইউনুস, আয়াত : ৩২
[২] সুরা যুমার, আয়াত : ১৯
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ২৪
[১] সুরা সাজদা, আয়াত: ১৩
[২] সহিহ মুসলিম: ২৭৪৯; মুসনাদু আহমাদ: ৮০৮২; রিয়াযুস সালিহিন ৪২২; মিশকাতুল মাসাবিহ : ২৩২৮
[৩] আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ৬৫৯০; শুআবুল ঈমান ৬৩১৪; মিশকাতুল মাসাবিহ: ৪৮৭৪; হাদিসটির সনদ দুর্বল।
[১] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৫৪
[২] সুরা হিজর, আয়াত: ২৪
[১] সুরা সাদ, আয়াত: ২৬
[২] দেখুন, সুরা সাদ: ২১-২৬ তাফসিরসহ
[১] অর্থাৎ এমন শাস্তির মাধ্যমে, যার ফলে তারা দ্বীনমুখী হওয়ার পরিবর্তে উলটো দ্বীনবিমুখ হবে।
[১] মূল দুআটি আরও বড়। এখানে কেবল তার ছোট অংশ উঠে এসেছে। পুরো দুআটি দেখুন-সহিহ মুসলিম: ৭৭1; জামিউত তিরমিযি: ৩৪২২; সুনানু আবি দাউদ: ৭৬০; সহিহ ইবনি খ্যাইমা: ৪৬২
[১] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ২৬
[১] সুরা আনআম, আয়াত: ৮১-৮২
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ২
[১] সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৫
[১] তারিখুত তবারি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৬৮; তারিখু দিমাশক, খণ্ড: ১৬, পৃষ্ঠা: ২৬৮; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪৭
[১] সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬
[১] সুরা তাকাসুর, আয়াত: ৫-৭
[১] সুরা কাসাস, আয়াত: ৮৮
[১] সূরা ইসরা, আয়াত: ৮১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00