📄 আল-বাসির : সর্বদ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা
মিশমিশে কালো এক অন্ধকার পথ। সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ছোট্ট একটি কালো পিঁপড়া। পথিক জানতেও পারবে না, কখন সে নিজের অজান্তে পিঁপড়াটিকে মাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এমন এক সত্তা আছেন, যিনি দেখার জন্য আলোর মুখাপেক্ষী নন, যার দৃষ্টি থেকে আড়াল হতে পারে না কোনোকিছুই। তিনি মহান আল্লাহ, আল-বাসির।
আল-বাসির—যিনি দ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা। শব্দটি এসেছে ‘আল-বাসার’ থেকে। আল-বাসার অর্থ চোখ, দর্শনেন্দ্রিয়। এর আরেক অর্থ দৃষ্টিশক্তি; দেখার জন্য প্রয়োজনীয় আলো, যা দ্বারা দর্শনযোগ্য বস্তুসমূহ অবলোকন করা যায়। দৃষ্টি যত তীক্ষ্ণই হোক না কেন, বস্তুর ওপর আলো না পড়লে কিছু দেখা সম্ভব নয়। একই অবস্থা মানব-মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেধা ও স্মৃতিশক্তি যত ধারালোই হোক না কেন, কোনো বিষয় সূর্যের মতো পরিষ্কার হলেও আল্লাহ প্রদত্ত আলোকময় দিকনির্দেশনা ছাড়া কখনোই প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো, তবে তিনি তোমাদের দান করবেন ন্যায়-অন্যায় পৃথক করার শক্তি; তোমাদের পাপগুলো মুছে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ যে অতিশয় করুণাময়![১]
কুরআনে অন্যত্র তিনি বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো। নিজগুণে তিনি তোমাদের দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন। সেই সাথে তোমাদের দান করবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে এবং তিনি তোমাদের ক্ষমা করবেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [২]
অর্থাৎ, যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথের আলোকবর্তিকা না থাকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান বাণী না থাকে, তাহলে অবশ্যই আপনি পথ হারিয়ে ফেলবেন, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবেন। হয়তো আপনি নিজেই অকল্যাণ ও ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলবেন কিংবা অন্য কেউ আপনাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।
অতএব, বাসির অর্থ দ্রষ্টা, চোখের জ্যোতিসম্পন্ন; আল-বাসিরের দৃষ্টি তাঁর বান্দাদের সমস্ত কিছু পরিব্যাপ্ত করে আছে।
দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি
নিজের নিরাপত্তা, অস্তিত্বের সংরক্ষণ এবং নিজ কল্যাণের প্রতি আগ্রহ মানুষের মজ্জাগত। সবাই নিরাপত্তা চায়, পেতে চায় দীর্ঘায়ু। তাই যে পথে ক্ষতি, বিপদ বা কষ্টদায়ক কিছু রয়েছে, স্বভাবতই মানুষ সেদিকে পা বাড়াতে ইচ্ছুক নয়। কারণ, সে নিজের ভালো-মন্দ ও লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখে। সুখ-দুঃখ, উপকার-অপকারের সঠিক বোধই তাকে বিপদসংকুল পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
কিন্তু মানুষের দূর্ভাগ্য চরমে পৌঁছে যায়, যখন তার দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি ঘটে; যখন সে কল্যাণকে অকল্যাণ মনে করে আর ধ্বংসকে আপন করে নেয়।
যারা দিনরাত পাপাচারে ডুবে থাকে, তারা কেন নিষিদ্ধ কাজের পেছনেই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে চলে? কেন তারা আপন রবের বিধিবিধান অমান্য করে নিজেদের নিক্ষেপ করেছে ধ্বংসকুণ্ডে? কারণ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গিয়েছে, তারা নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক বিকারের শিকার হয়েছে। তারা ভেবে নিয়েছে, এমন লাগামহীন জীবনই তাদের মনে অনাবিল সুখ এনে দেবে। হারাম পথে উপার্জনই তাদের নিশ্চয়তা দেবে অঢেল সম্পদের।
যদি তাদের সুস্থ মানসিকতা থাকত, তারা যদি জানত, আল্লাহর আনুগত্যেই রয়েছে একমাত্র সুখ; যদি তারা বুঝত, আল্লাহর প্রতি একাগ্রতাই কেবল পারে প্রশান্তি ও তৃপ্তি দিতে, তাহলে তারা কখনোই ঐ অন্ধকার জগতে পা বাড়াত না।
তাহলে আল্লাহর আনুগত্যকারী, একজন সৎ মুমিন আর আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত একজন পাপীর মাঝে মৌলিক পার্থক্য কোথায়? মূল পার্থক্য দৃষ্টিভঙ্গিতে। একজন সুখ ও সাফল্য খোঁজে অন্ধকার জগতে, নর্দমার নোংরা জলে। আরেকজন সুখ, সমৃদ্ধি ও সফলতা খোঁজে আল্লাহর আনুগত্যে; নিঝুম রাতের নীরবতায় রবের সান্নিধ্যে সিজদায় লুটিয়ে।
মিসরের সম্রাজ্ঞী (আযিযে মিশরের প্রিয়তমা স্ত্রী) ইউসুফ আলাইহিস সালামকে আবেদন জানিয়েছিল সকলের চোখ এড়িয়ে হারাম পথে কামনা পূর্ণ করার। তখন কী করেছিলেন নবি ইউসুফ? তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর আশ্রয়। তিনি জানতেন তার রব আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। তিনি নিশ্চয়ই এসব কিছু দেখছেন। তিনি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দেবেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সেদিন লোভনীয় হারামে জড়াতে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু কী পার্থক্য তাদের দুজনার মাঝে? এত বিশাল পদমর্যাদার অধিকারী, রূপ-লাবণ্যে যার কোনো কমতি নেই, অর্থ-বৈভব যার কাছে অতি তুচ্ছ-সে কেন কুপ্রবৃত্তির লালসায় বিভোর হয়ে ছিল? সে কেন কামনার বশবর্তী হয়ে নবি ইউসুফকে জোরপূর্বক কাছে পেতে চাইছিল? আর এমন লোভনীয় প্রস্তাব হাতের কাছে পেয়েও ইউসুফ আলাইহিস সালাম কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন? কেন দৌড়ে পালাচ্ছিলেন মিসরের রূপবতী সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে? কারণ একটাই-দৃষ্টিভঙ্গি। একজন সুখ খুঁজেছিল প্রবৃত্তির তাড়নায়, আরেকজন সফলতা চেয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে।
যখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ হবে, আপনার সকল কাজ এমনিতেই সুশোভিত হবে, আপনি পাবেন সাফল্যের সন্ধান। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই।
এজন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন-
اللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتَّبَاعَهُ، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلاً وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ
হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সামনে সত্যকে সত্যরূপে দেখিয়ে দিন এবং সত্যের অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবেই দেখিয়ে দিন এবং তা পরিহার করার তাওফিক দিন [১]
কত মানুষ আছে তারা সত্যকে বাতিল আর বাতিলকে সত্য মনে করে। তাই হৃদয়-জগতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ঝলক নুরের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রথমে আপনি মন-মানসিকতা বদলে ফেলুন এবং দৃঢ় শপথ নিন, 'সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেব, সত্যকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরব।'
মাঝে মাঝে আমার এমন কিছু যুবকের সাথে দেখা হয় যারা এই বয়সেই দ্বীন মেনে চলে, সৎ ও ঈমানী জীবন যাপন করে। তাদের সাথে দেখা হলেই আমি একটি কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে বলি, 'আল্লাহ আপনাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামতটি দান করেছেন তা হলো হিদায়াতের নিয়ামত। আল্লাহ আপনাকে এক বিশেষ নুর দিয়েছেন, যা আপনার সামনে সত্যকে তুলে ধরে এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে উপস্থাপন করে।'
মানুষ যখন আল্লাহর সান্নিধ্যে যায়, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁর আদেশ বাস্তবায়নে কর্মতৎপর হয়ে ওঠে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে এই আলোর ঝলক দেন। যা তার সারা জীবনের জন্য অমূল্য পাথেয় হয়ে কাজ করে।
তিনি মহাদ্রষ্টা, পরিব্যাপ্ত তাঁর দৃষ্টি
আল-বাসির আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। যিনি দেখেন সৃষ্টি জগতের সবকিছু; সামনে-পিছনে, ভেতরে-বাহিরে, প্রকাশ্যে-আড়ালে সর্বাবস্থায়ই তিনি সবকিছু দেখেন। শুধু তিনিই দেখতে পান বস্তুর প্রকৃত অবস্থা।
প্রকৃত অবস্থা না জানলে কাউকে 'বাসির' বলা যায় না। আপনি অর্ধশত কোটি টাকা দিয়ে এক খণ্ড হীরা কিনে আনলেন। এরপর তা কাদায় রেখে দিলেন। কাদা থেকে তুলে সূর্যের আলোয় রাখলে দেখা যাবে তা কর্দমাক্ত। কিন্তু এটা বাহ্যিক দৃষ্টি, বাইরে কাদা লাগলেও ভেতরে কিন্তু সেটা ঠিকই মহামূল্যবান এক হীরা। 'বাসার' দ্বারা যে দৃষ্টি বোঝায় তা হলো প্রকৃত অবস্থা দর্শন।
অনেক জিনিস আমাদের দৃষ্টিতে লুকায়িত, প্রচ্ছন্ন থাকে, কিন্তু আল্লাহর সামনে সব কিছুই স্পষ্ট। আমরা হয়তো কাদায় পড়ে থাকা হীরাকে একটি নোংরা জিনিস মনে করতে পারি, কিন্তু আল্লাহ জানেন সেটা মহামূল্যবান বস্তু।
আপনার দৃষ্টিতে হয়তো একজন মানুষকে বাহ্যিকভাবে অসুন্দর লাগল, স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি আপনি তেমন আগ্রহী হবেন না। কিন্তু হতে পারে লোকটি পৃথিবীর সর্বাধিক জ্ঞানীদের একজন। আপনি যদি তার ভেতরের অবস্থা জানতে পারেন তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন।
ইতিহাসের পাতায় এমন হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে। আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে তার শারীরিক গড়ন নিয়ে বলা হয়েছে, 'তিনি ছিলেন বেঁটে; চিবুক ছিল দৃষ্টিকটু, পা-দুটো বাঁকা, চোখ কোটরের ভেতরে, গলা কিছুটা স্ফীত; গায়ের রং বাদামী। এক কথায়, মানুষের কাছে অসুন্দর লাগার মতো যত কারণ থাকতে পারে তার সবকটা বৈশিষ্ট্যই তার মাঝে দেখা যেত।'
কিন্তু এই লোকটিই যখন রাগান্বিত হতেন, তখন একশো তরবারির খাপ খোলা হতো। কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করত না যে, কেন তিনি রেগেছেন।
ওপরে বর্ণিত বাহ্যিক আকৃতির মানুষটা হয়তো অতি সাধারণ, কিন্তু এর আড়ালে যে আহনাফ লুকিয়ে আছেন তিনি বিখ্যাত তাবিয়ি আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ।
আপনার ঘরে একটি ইয়াতিম শিশু রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইয়াতিমকে ধমক দিতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। আর আপনি যদি তাকে মারেন, যে দেখবে সে-ই তিরস্কার করবে। মানুষ আপনাকে ঘৃণার চোখে দেখবে। কিন্তু বাস্তবেই যদি সে এমন কোনো অপরাধ করে থাকে, যার সংশোধনের জন্য তাকে শাসন করা আবশ্যক এবং মানুষও সেটা জানে, তাহলে আপনাকে আর ভুল বুঝবে না। মনে করবে আপনি ঠিকই করছেন।
অভ্যন্তরীণ অবস্থা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় তারা আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে চলে আসবে। পরক্ষণে সত্য জেনে আবার তাদের ভুল ভাঙবে। আল্লাহ তাআলা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তা প্রকৃত অবস্থা জেনেই গ্রহণ করেন। কারণ, তিনি আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। আসল ঘটনা তার সামনে প্রচ্ছন্ন ও আবৃত থাকে না। আল্লাহর সামনে সবকিছু দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট।
সব দেখছেন যিনি
আল্লাহ আপনার সবকিছু জানেন। আপনার ইচ্ছা, কামনা-বাসনা এবং স্বাভাবিক প্রবৃত্তি সবকিছু। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা, সত্যনিষ্ঠা এবং কল্যাণপ্রিয়তা আল্লাহ দেখেন। আপনি সংকটে আছেন, কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, সেটাও কিন্তু আপনার রব দেখছেন। আপনার মুখ ফসকে একটি কথা বেরিয়ে গেল, আপনি কষ্ট পেলেন। আল্লাহ ঠিকই জানেন যে, আপনি এই কথা বলতে চাননি। এভাবে আপনার সুখ-দুখের সবকিছু আল্লাহ জানেন, দেখেন ও শোনেন। এটা আপনার জন্য বড় সান্ত্বনা; আনন্দের সংবাদ; আপনার রব আপনার সবকিছুর খবর রাখেন।
আপনি কোনো এক অফিসের কর্মচারী। টানা ৩ ঘণ্টা কাজ করার কারণে কিছুটা ক্লান্তি ও একঘেয়েমি চলে এসেছে আপনার মাঝে। তাই আপনি অল্প সময়ের জন্য একটু বারান্দার দিকে গেলেন। কিন্তু বের হতেই দেখলেন আপনার বস সামনে দাঁড়ানো। আপনাকে বের হতে দেখেই সে রাগে ফেটে পড়বে, দু-চারটা গালি দিতেও কার্পণ্য করবে না। কারণ, সে দেখেছে আপনার বাহ্যিক অবস্থা আর ভেবে নিয়েছে আপনি কাজ বাদ দিয়ে শুধু এদিক-ওদিক পায়চারিই করছেন। এর আগে যে একটানা ৩ ঘণ্টা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন তা সে দেখেনি। আসলে সে অসহায়; এটা তার সীমাবদ্ধতা যে, সে বাহ্যিক অবস্থা দেখতে পেলেও অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানতে সক্ষম নয়।
কিন্তু আনন্দিত হোন আল্লাহর প্রতি। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা তিনি জেনেছেন। আপনার বস যে আপনাকে তিরস্কার করেছে, আল্লাহ জানেন, তার এই আচরণ অন্যায়। আল্লাহ দেখেছেন, আপনি এই লোকটির জন্য এতক্ষণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আপনি অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
জনৈক সালাফ বলেছেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর; তাঁর অবিনশ্বর সত্তার জন্য। সকল প্রশংসা, গুণগান তাঁর জন্য, তাঁর অতিপ্রাকৃতিক জ্ঞানের জন্য। তাঁর কাছে কোনো সংবাদ পৌঁছানোর প্রয়োজন হয় না। তাঁর কাছে প্রমাণ করার জন্য সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না; শপথ করার প্রয়োজন হয় না। তিনি জানেন সবকিছু।'
সীমিত জ্ঞানের কারণেই মানুষ সন্দেহপ্রবণ
মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত। তারা কোনো কিছু দেখেই, চিন্তা-ভাবনা না করেই, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই নিজেকে সন্দিহান বিষয় থেকে সবসময় নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কাউকে দেবেন না। আপনাকে নিয়ে কোনো অহেতুক আলোচনার সূত্রপাত হওয়ার আগেই তার শেকড় উপড়ে ফেলুন। দেখুন আল্লাহর নবির অনুপম আদর্শ। নবিজি মসজিদে নববিতে ইতিকাফরত ছিলেন। রাতে উম্মুল মুমিনিন সাফিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহা দেখা করতে আসেন। নবিজি তার সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ সেখান দিয়ে দুজন সাহাবি গেলেন। নবিজি তাদের ডেকে বললেন, 'দাঁড়াও। ও হলো সাফিয়াহ; আমার স্ত্রী।' তারা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা আপনার ব্যাপারে কি কোনো সন্দেহ পোষণ করতে পারি?' নবিজি বললেন, 'না। তবে শয়তান যেন তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেজন্যই বলে দিলাম।' [১]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বাসির, সর্বদ্রষ্টা; তিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষের জ্ঞান নিতান্তই অল্প। তারা সামান্য কিছু দেখেই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত। তাই আপনার দায়িত্ব হলো, যেকোনো বিষয় অস্পষ্ট না রেখে খোলাসা করে দেওয়া। আপনি নিজেকে সন্দেহভাজন অবস্থানে রাখবেন আর ভাববেন, আল্লাহ তো আমাকে জানেন—এটা যথেষ্ট নয়; সুন্নাহ সমর্থিত পন্থাও নয়। বরং করণীয় এবং সুন্নাহ হলো, আপনার দিক থেকে অপবাদ, সমালোচনা বা সন্দেহের কোনো বিষয় এলে সঙ্গে সঙ্গে তা প্রতিহত করা।
আপনি গায়রে মাহরাম কোনো নারীর ঘরে ঢুকলেন একান্তে, নির্জনে। আপনি বরফের মতো স্বচ্ছ। হয়তো ফেরেশতার চেয়েও বেশি পবিত্র। আপনি একদম খাঁটি ও সৎ একজন ব্যক্তি। আপনার প্রবৃত্তির লাগাম সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে। তবু আপনার সাথে ঐ গায়রে মাহরাম নারীর নির্জন উপস্থিতি মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবে। অপবাদ, সমালোচনার সূত্রপাত ঘটানোর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
আপনি কোনো শপিং সেন্টারের একটি দোকানে গিয়ে দেখলেন সেখানে কেউ নেই। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওখান থেকে বের হয়ে চলে আসুন। এটা সন্দেহজনক স্থান, দোকানির অনুপস্থিতিতে সেখানে আপনার উপস্থিতি মানুষের মধ্যে সন্দেহ জাগিয়ে তুলবে। বলবেন না যে, দোকানির জন্য অপেক্ষা করছি। বিপদসংকুল জায়গা থেকে যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্বে থাকুন। নতুবা আপনি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হবেন।
অবশ্য এসবই বান্দার সীমাবদ্ধতা। ওদিকে আল্লাহর জ্ঞান অপরিসীম, দৃষ্টির ফাঁকফোকর দিয়ে যে খিয়ানত করা হয় তা তিনি দেখতে পান।
আপনি আপনার রুমে বসে আছেন। সামনে কাচের জানালা, তার সামনে অন্য কারো বারান্দা। আপনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ঠিক তখনই কোনো নারী বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আপনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নারীটির দিকে। পৃথিবীর কেউ জানবে না, কোনো মানুষ কখনো আপনাকে এর জন্য জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে না; কিন্তু কেউ না দেখলেও আল্লাহ ঠিকই দেখেছেন আপনার চোখের খিয়ানত, তিনিই এর হিসাব নেবেন কড়ায় গণ্ডায়।
আপনি যে শহরে বসবাস করছেন, শহরের লোকজনের সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন, আপনার উদারতা ও মহত্ত্বের কারণে তাদের ভালো মানুষ মনে করছেন। কিন্তু কোন শহরের মানুষ কতটুকু ভালো, কোন শহরটা পাপের রাজ্য-সে সংবাদ জানেন শুধু আল্লাহ। পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থা দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে, চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে। আপনি পশ্চিমাদের সংস্কৃতি স্বচক্ষে দেখেও বিশ্বাস করতে পারবেন না। একবার পশ্চিমা এক নারীর ব্যাপারে গণমাধ্যম বেশ গরম হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত সে সংসদ পদপ্রার্থীও ছিল। সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার মাধ্যমের সমস্ত সুযোগ ব্যবহার করে নিজের অবৈধ প্রেম, জীবনসঙ্গীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরকীয়ার কথা খুব গর্বের সাথেই পেশ করেছিল দুনিয়াবাসীর সামনে। যা আমাদের সমাজে কল্পনাও করা যায় না। তো কোন শহরের লোকজন ভালো আর কোন শহর পাপের নরকরাজ্য তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِن بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا *
নূহের পর আমি অসংখ্য মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি। বান্দাদের পাপাচারের খবর রাখা এবং তা পর্যবেক্ষণের জন্য আপনার প্রতিপালকই যথেষ্ট [১]
আল্লাহর আল-বাসির নামটি বান্দার মধ্যে এমন অনুভূতি জাগ্রত করে যে, সে সবসময় আল্লাহর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই অবস্থান করছে। এজন্য আল্লাহর নবি বলেছেন, শ্রেষ্ঠ ঈমান হলো, তুমি এটা বিশ্বাস করবে যে, তুমি আল্লাহর সাথেই আছ।
'আমি সদা আল্লাহর পর্যবেক্ষণে আছি'—এই অনুভূতি সর্বদা জাগরুক থাকাই হচ্ছে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, 'তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার মতো না হও, তাহলে মনের মধ্যে এই বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'
অর্থাৎ প্রকাশ্যে, গোপনে, লোকালয়ে, নির্জনে, নীরবতায়, জনসমাগমে-সর্বাবস্থায় আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।
আল্লাহ তাআলা দ্রষ্টা। তিনি আপনার জন্য সৃষ্টি করেছেন দৃষ্টিশক্তি। দু-চোখের মধ্যে আল্লাহ অসীম নিয়ামত দিয়েছেন। কর্নিয়া, আইরিশ, লেন্স, রেটিনা-সহ আরো কত কত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের এই চোখ। চোখ দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন।
নিজের নফসকে প্রশ্ন করুন, আল্লাহ তাআলা আমাদের কেন দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন? হারাম দৃষ্টিপাতের জন্য? ঈমান-বিধ্বংসী হারাম বস্তুসমূহের স্বাদ নেওয়ার জন্য? নাকি মহাবিশ্বের পরতে পরতে মহান আল্লাহর সৃষ্টিনৈপুণ্য ও অসীম নিয়ামতের প্রাচুর্য দেখার জন্য?
যে চোখ নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তু থেকে পবিত্র থাকে, যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেয়, যে চোখ আল্লাহর জন্য বিগলিত হয়, যে চোখ আল্লাহর আযাবের ভয়ে সিক্ত হয়, সেই চোখ আর যে চোখ হারামের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে—এই দুই চোখ কি কখনো সমান হতে পারে?
মহান রবের প্রতি বিনীত হোন
মহান স্রষ্টা, সবকিছুর দ্রষ্টা আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন আপনার চোখ সৃষ্টিতে। এই চোখ দিয়ে আপনি দেখছেন পৃথিবীর সবকিছু; সব রংয়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারছেন অনায়াসে। প্রিয়জনের প্রিয়মুখ, সন্তানসন্ততি, মা-বাবার দিকে তাকিয়ে লাভ করছেন তৃপ্তি। পবিত্র কুরআনের দিকে তাকিয়ে ধন্য করছেন আপনার চোখ; শীতল করছেন আপনার অন্তরাত্মা। এই চোখ দ্বারা এত নিয়ামত ভোগ করে এই চোখেরই স্রষ্টার সাথে নাফরমানি করা কি সাজে? চোখের স্রষ্টার প্রতি অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
হারামের জগতে আর কত দিন ঘোরাঘুরি? আল্লাহর অবাধ্যতায় আর কতকাল লাগামহীন জীবনযাপন?
এই চোখকে ব্যবহার করুন তার স্রষ্টাকে পাওয়ার কাজে। দু-চোখভরে দেখুন— জগৎ ও মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নিয়ামতরাজি, মিটমিট করে জ্বলতে থাকা হাজারো তারার মেলা, মখমলের মতো নরম জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো, ফুলের পাপড়িতে লেগে থাকা অপরূপ সৌন্দর্য! এসবের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখুন, খুঁজে পাবেন আপনার স্রষ্টার অপার মাহাত্ম্য!
আমাদের প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার রব আমাকে নয়টি বিষয়ের আদেশ প্রদান করেছেন।
সেই নয়টির মধ্যে একটি হলো— 'আমার নীরবতা যেন হয় চিন্তার মগ্নতা, আমার কথা যেন হয় আল্লাহর স্মরণ এবং আমার দৃষ্টি যেন হয় শিক্ষার উপকরণ।'
সবসময় মনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। যিনি আপনার চোখ ও দৃষ্টিশক্তি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি আপনাকে দেখবেন না? আল্লাহ বলেন—
أَيَحْسَبُ أَن لَّمْ يَرَهُ أَحَدٌ أَلَمْ نَجْعَل لَّهُ عَيْنَيْنِ *
মানুষ কি মনে করে, তাকে কেউ দেখছে না? আমি কি তাকে দুটি চোখ দান করিনি? [১]
অর্থাৎ যিনি আপনার চোখ সৃষ্টি করেছেন তিনি আপনার চোখের দৃষ্টি ও অন্তরের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে বেখবর নন!
সুমহান রব আরো বলেন-
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ
(হে নবি!) আপনি নির্ভর করুন পরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর, যিনি আপনাকে দেখতে পান, যখন আপনি সালাতে দাঁড়িয়ে যান এবং সালাত আদায়কারীদের সাথে ওঠাবসা করেন।[২]
ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে, জানালার কাচ আর পর্দা টেনে দিয়ে, পৃথিবীর সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে আপনি লিপ্ত হচ্ছেন মহান রবের অবাধ্যতায়। হারাম সম্পর্কের আঁচল ধরে, অবৈধভাবে তারুণ্যের শক্তি একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছেন স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল-সাদার জগতে। পচা, দুর্গন্ধময় জগতের নিকৃষ্ট ভাগাড়ে ডুব দিচ্ছেন। আপনি কখনো ভেবেছেন, এই ভবনের ছাদ ভেদ করে, জানালা, দরজা আর দেওয়ালের প্রাচীর ভেদ করে আল্লাহর দৃষ্টি আপনার দিকে তাকিয়ে আছে! তিনি চাইলে এক মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারেন আপনার মূল্যবান চোখদুটি। অবশ করে দিতে পারেন আপনার শক্তিশালী দুটো হাত। বন্ধ দুয়ারের নিচ দিয়ে আসা অক্সিজেন বন্ধ করে দিয়ে টেনে দিতে পারেন আপনার অবাধ্যতার ইতি! কিন্তু তিনি আপনাকে সুযোগ দেন, যেন আপনি ফিরে আসেন। তিনি পথ চেয়ে থাকেন, আপনি কোনো একদিন ফিরবেন বলে!
ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পাপাচারী পাপের কাছাকাছি হওয়ার সময় যদি বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন, তাহলে সে আল্লাহর সামনে কী পরিমাণ দুঃসাহসী! কত বড় দুর্ভাগা! আর যদি মনে করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন না, তাহলে সে কত বড় কাফির, কত বড় গণ্ডমূর্খ! আল্লাহ তাকে দেখছেন জেনেও যদি পাপ করে ফেলে, তাহলে সেও কত বড় মূর্খ! কত বড় দুর্ভাগা!'
জ্ঞানীরা বলেছেন, মানুষ আল্লাহর চোখ থেকে যা লুকোতে পারে না তা যদি মানুষের কাছ থেকে লুকায়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহর সাথে তামাশা করে। আর মানুষ যখন বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা সর্বদ্রষ্টা, তিনি তার সবকিছুর ব্যাপারে খবর রাখেন, তখন তার হৃদয়-আত্মা আলোকিত হয়।
সালাফে সালিহিনের কেউ কেউ বলতেন, 'আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তোমার যদি পাপ করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে এমন কোথাও গিয়ে পাপ করো, যেখানে আল্লাহ তোমায় দেখতে পাবেন না!'
জীবনে যেখানেই যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, নিশ্চিত বিশ্বাস রাখুন, আপনি রয়েছেন আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিসীমার ভেতরেই। তিনি আপনার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। আপনি যখন সুখ অনুভব করছেন, জীবনের আনন্দঘন মুহূর্ত উপভোগ করছেন, তিনি দেখছেন আপনার হাসি; আপনার উচ্ছ্বাস। তখন তাঁর সামনে মাথা নত করে আদায় করুন শুকরিয়াজ্ঞাপক সিজদা।
আবার যখন আপনি ভেসে যাচ্ছেন পাপের অন্ধকার জগতে, ভুলে যাচ্ছেন গন্তব্যের কথা, ডুবে যাচ্ছেন অন্যায়-অপরাধের নর্দমায়, ভেসে যাচ্ছেন আল্লাহর অবাধ্যতার গড্ডলিকা প্রবাহে, তখনো তিনি আপনাকে দেখছেন। আপনি তাঁকে দেখতে পাবেন না; কিন্তু তিনি আপনার দিকে ঠিকই তাকিয়ে আছেন। এরপর তো ফিরে যেতে হবে তাঁরই দিকে। তাই করজোড়ে মিনতি করুন—
হে আল্লাহ, আপনি আল-বাসির, সম্যক ও মহাদ্রষ্টা। আপনি আমার প্রকাশ্য-গোপন সকল দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। আপনার হাতেই আমার জীবনের লাগাম। আমি ভিক্ষা চাইছি আপনার সম্মুখে। আমার হৃদয় ভরিয়ে দিন আলোতে; চোখে দান করুন জ্যোতি, যেন এর দ্বারা আমি আপনার অসীম নিয়ামতের মহিমা দেখতে পাই। প্রকাশ্যে-গোপনে, লোকালয়ে-নির্জনে সর্বাবস্থায় আপনার সামনে আদব ও সৌজন্য রক্ষা করতে চলতে পারি। আমি যেন চলি আপনার নির্ধারিত সীমারেখার গণ্ডিতে, আপনার আদেশের চৌহদ্দির ভেতরে। আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন আপনার প্রিয় বান্দাদের কাফেলায়। আমিন।
টিকাঃ
[১] সুরা আনফাল, আয়াত: ২৯
[২] সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৮
[১] তাফসির ইবনু কাসির, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪৮
[১] সহিহ বুখারি : ২০৩৫
[১] সূরা ইসরা, আয়াত: ১৭
[১] সুরা বালাদ, আয়াত: ৭-৮
[২] সুরা শুআরা, আয়াত: ২১৭-২১৯
মিশমিশে কালো এক অন্ধকার পথ। সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ছোট্ট একটি কালো পিঁপড়া। পথিক জানতেও পারবে না, কখন সে নিজের অজান্তে পিঁপড়াটিকে মাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এমন এক সত্তা আছেন, যিনি দেখার জন্য আলোর মুখাপেক্ষী নন, যার দৃষ্টি থেকে আড়াল হতে পারে না কোনোকিছুই। তিনি মহান আল্লাহ, আল-বাসির।
আল-বাসির—যিনি দ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা। শব্দটি এসেছে ‘আল-বাসার’ থেকে। আল-বাসার অর্থ চোখ, দর্শনেন্দ্রিয়। এর আরেক অর্থ দৃষ্টিশক্তি; দেখার জন্য প্রয়োজনীয় আলো, যা দ্বারা দর্শনযোগ্য বস্তুসমূহ অবলোকন করা যায়। দৃষ্টি যত তীক্ষ্ণই হোক না কেন, বস্তুর ওপর আলো না পড়লে কিছু দেখা সম্ভব নয়। একই অবস্থা মানব-মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেধা ও স্মৃতিশক্তি যত ধারালোই হোক না কেন, কোনো বিষয় সূর্যের মতো পরিষ্কার হলেও আল্লাহ প্রদত্ত আলোকময় দিকনির্দেশনা ছাড়া কখনোই প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো, তবে তিনি তোমাদের দান করবেন ন্যায়-অন্যায় পৃথক করার শক্তি; তোমাদের পাপগুলো মুছে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ যে অতিশয় করুণাময়![১]
কুরআনে অন্যত্র তিনি বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো। নিজগুণে তিনি তোমাদের দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন। সেই সাথে তোমাদের দান করবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে এবং তিনি তোমাদের ক্ষমা করবেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [২]
অর্থাৎ, যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথের আলোকবর্তিকা না থাকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান বাণী না থাকে, তাহলে অবশ্যই আপনি পথ হারিয়ে ফেলবেন, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবেন। হয়তো আপনি নিজেই অকল্যাণ ও ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলবেন কিংবা অন্য কেউ আপনাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।
অতএব, বাসির অর্থ দ্রষ্টা, চোখের জ্যোতিসম্পন্ন; আল-বাসিরের দৃষ্টি তাঁর বান্দাদের সমস্ত কিছু পরিব্যাপ্ত করে আছে।
দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি
নিজের নিরাপত্তা, অস্তিত্বের সংরক্ষণ এবং নিজ কল্যাণের প্রতি আগ্রহ মানুষের মজ্জাগত। সবাই নিরাপত্তা চায়, পেতে চায় দীর্ঘায়ু। তাই যে পথে ক্ষতি, বিপদ বা কষ্টদায়ক কিছু রয়েছে, স্বভাবতই মানুষ সেদিকে পা বাড়াতে ইচ্ছুক নয়। কারণ, সে নিজের ভালো-মন্দ ও লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখে। সুখ-দুঃখ, উপকার-অপকারের সঠিক বোধই তাকে বিপদসংকুল পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
কিন্তু মানুষের দূর্ভাগ্য চরমে পৌঁছে যায়, যখন তার দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি ঘটে; যখন সে কল্যাণকে অকল্যাণ মনে করে আর ধ্বংসকে আপন করে নেয়।
যারা দিনরাত পাপাচারে ডুবে থাকে, তারা কেন নিষিদ্ধ কাজের পেছনেই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে চলে? কেন তারা আপন রবের বিধিবিধান অমান্য করে নিজেদের নিক্ষেপ করেছে ধ্বংসকুণ্ডে? কারণ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গিয়েছে, তারা নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক বিকারের শিকার হয়েছে। তারা ভেবে নিয়েছে, এমন লাগামহীন জীবনই তাদের মনে অনাবিল সুখ এনে দেবে। হারাম পথে উপার্জনই তাদের নিশ্চয়তা দেবে অঢেল সম্পদের।
যদি তাদের সুস্থ মানসিকতা থাকত, তারা যদি জানত, আল্লাহর আনুগত্যেই রয়েছে একমাত্র সুখ; যদি তারা বুঝত, আল্লাহর প্রতি একাগ্রতাই কেবল পারে প্রশান্তি ও তৃপ্তি দিতে, তাহলে তারা কখনোই ঐ অন্ধকার জগতে পা বাড়াত না।
তাহলে আল্লাহর আনুগত্যকারী, একজন সৎ মুমিন আর আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত একজন পাপীর মাঝে মৌলিক পার্থক্য কোথায়? মূল পার্থক্য দৃষ্টিভঙ্গিতে। একজন সুখ ও সাফল্য খোঁজে অন্ধকার জগতে, নর্দমার নোংরা জলে। আরেকজন সুখ, সমৃদ্ধি ও সফলতা খোঁজে আল্লাহর আনুগত্যে; নিঝুম রাতের নীরবতায় রবের সান্নিধ্যে সিজদায় লুটিয়ে।
মিসরের সম্রাজ্ঞী (আযিযে মিশরের প্রিয়তমা স্ত্রী) ইউসুফ আলাইহিস সালামকে আবেদন জানিয়েছিল সকলের চোখ এড়িয়ে হারাম পথে কামনা পূর্ণ করার। তখন কী করেছিলেন নবি ইউসুফ? তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর আশ্রয়। তিনি জানতেন তার রব আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। তিনি নিশ্চয়ই এসব কিছু দেখছেন। তিনি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দেবেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সেদিন লোভনীয় হারামে জড়াতে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু কী পার্থক্য তাদের দুজনার মাঝে? এত বিশাল পদমর্যাদার অধিকারী, রূপ-লাবণ্যে যার কোনো কমতি নেই, অর্থ-বৈভব যার কাছে অতি তুচ্ছ-সে কেন কুপ্রবৃত্তির লালসায় বিভোর হয়ে ছিল? সে কেন কামনার বশবর্তী হয়ে নবি ইউসুফকে জোরপূর্বক কাছে পেতে চাইছিল? আর এমন লোভনীয় প্রস্তাব হাতের কাছে পেয়েও ইউসুফ আলাইহিস সালাম কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন? কেন দৌড়ে পালাচ্ছিলেন মিসরের রূপবতী সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে? কারণ একটাই-দৃষ্টিভঙ্গি। একজন সুখ খুঁজেছিল প্রবৃত্তির তাড়নায়, আরেকজন সফলতা চেয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে।
যখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ হবে, আপনার সকল কাজ এমনিতেই সুশোভিত হবে, আপনি পাবেন সাফল্যের সন্ধান। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই।
এজন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন-
اللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتَّبَاعَهُ، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلاً وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ
হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সামনে সত্যকে সত্যরূপে দেখিয়ে দিন এবং সত্যের অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবেই দেখিয়ে দিন এবং তা পরিহার করার তাওফিক দিন [১]
কত মানুষ আছে তারা সত্যকে বাতিল আর বাতিলকে সত্য মনে করে। তাই হৃদয়-জগতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ঝলক নুরের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রথমে আপনি মন-মানসিকতা বদলে ফেলুন এবং দৃঢ় শপথ নিন, 'সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেব, সত্যকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরব।'
মাঝে মাঝে আমার এমন কিছু যুবকের সাথে দেখা হয় যারা এই বয়সেই দ্বীন মেনে চলে, সৎ ও ঈমানী জীবন যাপন করে। তাদের সাথে দেখা হলেই আমি একটি কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে বলি, 'আল্লাহ আপনাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামতটি দান করেছেন তা হলো হিদায়াতের নিয়ামত। আল্লাহ আপনাকে এক বিশেষ নুর দিয়েছেন, যা আপনার সামনে সত্যকে তুলে ধরে এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে উপস্থাপন করে।'
মানুষ যখন আল্লাহর সান্নিধ্যে যায়, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁর আদেশ বাস্তবায়নে কর্মতৎপর হয়ে ওঠে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে এই আলোর ঝলক দেন। যা তার সারা জীবনের জন্য অমূল্য পাথেয় হয়ে কাজ করে।
তিনি মহাদ্রষ্টা, পরিব্যাপ্ত তাঁর দৃষ্টি
আল-বাসির আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। যিনি দেখেন সৃষ্টি জগতের সবকিছু; সামনে-পিছনে, ভেতরে-বাহিরে, প্রকাশ্যে-আড়ালে সর্বাবস্থায়ই তিনি সবকিছু দেখেন। শুধু তিনিই দেখতে পান বস্তুর প্রকৃত অবস্থা।
প্রকৃত অবস্থা না জানলে কাউকে 'বাসির' বলা যায় না। আপনি অর্ধশত কোটি টাকা দিয়ে এক খণ্ড হীরা কিনে আনলেন। এরপর তা কাদায় রেখে দিলেন। কাদা থেকে তুলে সূর্যের আলোয় রাখলে দেখা যাবে তা কর্দমাক্ত। কিন্তু এটা বাহ্যিক দৃষ্টি, বাইরে কাদা লাগলেও ভেতরে কিন্তু সেটা ঠিকই মহামূল্যবান এক হীরা। 'বাসার' দ্বারা যে দৃষ্টি বোঝায় তা হলো প্রকৃত অবস্থা দর্শন।
অনেক জিনিস আমাদের দৃষ্টিতে লুকায়িত, প্রচ্ছন্ন থাকে, কিন্তু আল্লাহর সামনে সব কিছুই স্পষ্ট। আমরা হয়তো কাদায় পড়ে থাকা হীরাকে একটি নোংরা জিনিস মনে করতে পারি, কিন্তু আল্লাহ জানেন সেটা মহামূল্যবান বস্তু।
আপনার দৃষ্টিতে হয়তো একজন মানুষকে বাহ্যিকভাবে অসুন্দর লাগল, স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি আপনি তেমন আগ্রহী হবেন না। কিন্তু হতে পারে লোকটি পৃথিবীর সর্বাধিক জ্ঞানীদের একজন। আপনি যদি তার ভেতরের অবস্থা জানতে পারেন তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন।
ইতিহাসের পাতায় এমন হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে। আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে তার শারীরিক গড়ন নিয়ে বলা হয়েছে, 'তিনি ছিলেন বেঁটে; চিবুক ছিল দৃষ্টিকটু, পা-দুটো বাঁকা, চোখ কোটরের ভেতরে, গলা কিছুটা স্ফীত; গায়ের রং বাদামী। এক কথায়, মানুষের কাছে অসুন্দর লাগার মতো যত কারণ থাকতে পারে তার সবকটা বৈশিষ্ট্যই তার মাঝে দেখা যেত।'
কিন্তু এই লোকটিই যখন রাগান্বিত হতেন, তখন একশো তরবারির খাপ খোলা হতো। কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করত না যে, কেন তিনি রেগেছেন।
ওপরে বর্ণিত বাহ্যিক আকৃতির মানুষটা হয়তো অতি সাধারণ, কিন্তু এর আড়ালে যে আহনাফ লুকিয়ে আছেন তিনি বিখ্যাত তাবিয়ি আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ।
আপনার ঘরে একটি ইয়াতিম শিশু রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইয়াতিমকে ধমক দিতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। আর আপনি যদি তাকে মারেন, যে দেখবে সে-ই তিরস্কার করবে। মানুষ আপনাকে ঘৃণার চোখে দেখবে। কিন্তু বাস্তবেই যদি সে এমন কোনো অপরাধ করে থাকে, যার সংশোধনের জন্য তাকে শাসন করা আবশ্যক এবং মানুষও সেটা জানে, তাহলে আপনাকে আর ভুল বুঝবে না। মনে করবে আপনি ঠিকই করছেন।
অভ্যন্তরীণ অবস্থা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় তারা আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে চলে আসবে। পরক্ষণে সত্য জেনে আবার তাদের ভুল ভাঙবে। আল্লাহ তাআলা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তা প্রকৃত অবস্থা জেনেই গ্রহণ করেন। কারণ, তিনি আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। আসল ঘটনা তার সামনে প্রচ্ছন্ন ও আবৃত থাকে না। আল্লাহর সামনে সবকিছু দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট।
সব দেখছেন যিনি
আল্লাহ আপনার সবকিছু জানেন। আপনার ইচ্ছা, কামনা-বাসনা এবং স্বাভাবিক প্রবৃত্তি সবকিছু। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা, সত্যনিষ্ঠা এবং কল্যাণপ্রিয়তা আল্লাহ দেখেন। আপনি সংকটে আছেন, কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, সেটাও কিন্তু আপনার রব দেখছেন। আপনার মুখ ফসকে একটি কথা বেরিয়ে গেল, আপনি কষ্ট পেলেন। আল্লাহ ঠিকই জানেন যে, আপনি এই কথা বলতে চাননি। এভাবে আপনার সুখ-দুখের সবকিছু আল্লাহ জানেন, দেখেন ও শোনেন। এটা আপনার জন্য বড় সান্ত্বনা; আনন্দের সংবাদ; আপনার রব আপনার সবকিছুর খবর রাখেন।
আপনি কোনো এক অফিসের কর্মচারী। টানা ৩ ঘণ্টা কাজ করার কারণে কিছুটা ক্লান্তি ও একঘেয়েমি চলে এসেছে আপনার মাঝে। তাই আপনি অল্প সময়ের জন্য একটু বারান্দার দিকে গেলেন। কিন্তু বের হতেই দেখলেন আপনার বস সামনে দাঁড়ানো। আপনাকে বের হতে দেখেই সে রাগে ফেটে পড়বে, দু-চারটা গালি দিতেও কার্পণ্য করবে না। কারণ, সে দেখেছে আপনার বাহ্যিক অবস্থা আর ভেবে নিয়েছে আপনি কাজ বাদ দিয়ে শুধু এদিক-ওদিক পায়চারিই করছেন। এর আগে যে একটানা ৩ ঘণ্টা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন তা সে দেখেনি। আসলে সে অসহায়; এটা তার সীমাবদ্ধতা যে, সে বাহ্যিক অবস্থা দেখতে পেলেও অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানতে সক্ষম নয়।
কিন্তু আনন্দিত হোন আল্লাহর প্রতি। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা তিনি জেনেছেন। আপনার বস যে আপনাকে তিরস্কার করেছে, আল্লাহ জানেন, তার এই আচরণ অন্যায়। আল্লাহ দেখেছেন, আপনি এই লোকটির জন্য এতক্ষণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আপনি অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
জনৈক সালাফ বলেছেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর; তাঁর অবিনশ্বর সত্তার জন্য। সকল প্রশংসা, গুণগান তাঁর জন্য, তাঁর অতিপ্রাকৃতিক জ্ঞানের জন্য। তাঁর কাছে কোনো সংবাদ পৌঁছানোর প্রয়োজন হয় না। তাঁর কাছে প্রমাণ করার জন্য সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না; শপথ করার প্রয়োজন হয় না। তিনি জানেন সবকিছু।'
সীমিত জ্ঞানের কারণেই মানুষ সন্দেহপ্রবণ
মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত। তারা কোনো কিছু দেখেই, চিন্তা-ভাবনা না করেই, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই নিজেকে সন্দিহান বিষয় থেকে সবসময় নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কাউকে দেবেন না। আপনাকে নিয়ে কোনো অহেতুক আলোচনার সূত্রপাত হওয়ার আগেই তার শেকড় উপড়ে ফেলুন। দেখুন আল্লাহর নবির অনুপম আদর্শ। নবিজি মসজিদে নববিতে ইতিকাফরত ছিলেন। রাতে উম্মুল মুমিনিন সাফিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহা দেখা করতে আসেন। নবিজি তার সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ সেখান দিয়ে দুজন সাহাবি গেলেন। নবিজি তাদের ডেকে বললেন, 'দাঁড়াও। ও হলো সাফিয়াহ; আমার স্ত্রী।' তারা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা আপনার ব্যাপারে কি কোনো সন্দেহ পোষণ করতে পারি?' নবিজি বললেন, 'না। তবে শয়তান যেন তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেজন্যই বলে দিলাম।' [১]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বাসির, সর্বদ্রষ্টা; তিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষের জ্ঞান নিতান্তই অল্প। তারা সামান্য কিছু দেখেই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত। তাই আপনার দায়িত্ব হলো, যেকোনো বিষয় অস্পষ্ট না রেখে খোলাসা করে দেওয়া। আপনি নিজেকে সন্দেহভাজন অবস্থানে রাখবেন আর ভাববেন, আল্লাহ তো আমাকে জানেন—এটা যথেষ্ট নয়; সুন্নাহ সমর্থিত পন্থাও নয়। বরং করণীয় এবং সুন্নাহ হলো, আপনার দিক থেকে অপবাদ, সমালোচনা বা সন্দেহের কোনো বিষয় এলে সঙ্গে সঙ্গে তা প্রতিহত করা।
আপনি গায়রে মাহরাম কোনো নারীর ঘরে ঢুকলেন একান্তে, নির্জনে। আপনি বরফের মতো স্বচ্ছ। হয়তো ফেরেশতার চেয়েও বেশি পবিত্র। আপনি একদম খাঁটি ও সৎ একজন ব্যক্তি। আপনার প্রবৃত্তির লাগাম সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে। তবু আপনার সাথে ঐ গায়রে মাহরাম নারীর নির্জন উপস্থিতি মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবে। অপবাদ, সমালোচনার সূত্রপাত ঘটানোর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
আপনি কোনো শপিং সেন্টারের একটি দোকানে গিয়ে দেখলেন সেখানে কেউ নেই। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওখান থেকে বের হয়ে চলে আসুন। এটা সন্দেহজনক স্থান, দোকানির অনুপস্থিতিতে সেখানে আপনার উপস্থিতি মানুষের মধ্যে সন্দেহ জাগিয়ে তুলবে। বলবেন না যে, দোকানির জন্য অপেক্ষা করছি। বিপদসংকুল জায়গা থেকে যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্বে থাকুন। নতুবা আপনি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হবেন।
অবশ্য এসবই বান্দার সীমাবদ্ধতা। ওদিকে আল্লাহর জ্ঞান অপরিসীম, দৃষ্টির ফাঁকফোকর দিয়ে যে খিয়ানত করা হয় তা তিনি দেখতে পান।
আপনি আপনার রুমে বসে আছেন। সামনে কাচের জানালা, তার সামনে অন্য কারো বারান্দা। আপনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ঠিক তখনই কোনো নারী বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আপনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নারীটির দিকে। পৃথিবীর কেউ জানবে না, কোনো মানুষ কখনো আপনাকে এর জন্য জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে না; কিন্তু কেউ না দেখলেও আল্লাহ ঠিকই দেখেছেন আপনার চোখের খিয়ানত, তিনিই এর হিসাব নেবেন কড়ায় গণ্ডায়।
আপনি যে শহরে বসবাস করছেন, শহরের লোকজনের সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন, আপনার উদারতা ও মহত্ত্বের কারণে তাদের ভালো মানুষ মনে করছেন। কিন্তু কোন শহরের মানুষ কতটুকু ভালো, কোন শহরটা পাপের রাজ্য-সে সংবাদ জানেন শুধু আল্লাহ। পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থা দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে, চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে। আপনি পশ্চিমাদের সংস্কৃতি স্বচক্ষে দেখেও বিশ্বাস করতে পারবেন না। একবার পশ্চিমা এক নারীর ব্যাপারে গণমাধ্যম বেশ গরম হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত সে সংসদ পদপ্রার্থীও ছিল। সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার মাধ্যমের সমস্ত সুযোগ ব্যবহার করে নিজের অবৈধ প্রেম, জীবনসঙ্গীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরকীয়ার কথা খুব গর্বের সাথেই পেশ করেছিল দুনিয়াবাসীর সামনে। যা আমাদের সমাজে কল্পনাও করা যায় না। তো কোন শহরের লোকজন ভালো আর কোন শহর পাপের নরকরাজ্য তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِن بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا *
নূহের পর আমি অসংখ্য মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি। বান্দাদের পাপাচারের খবর রাখা এবং তা পর্যবেক্ষণের জন্য আপনার প্রতিপালকই যথেষ্ট [১]
আল্লাহর আল-বাসির নামটি বান্দার মধ্যে এমন অনুভূতি জাগ্রত করে যে, সে সবসময় আল্লাহর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই অবস্থান করছে। এজন্য আল্লাহর নবি বলেছেন, শ্রেষ্ঠ ঈমান হলো, তুমি এটা বিশ্বাস করবে যে, তুমি আল্লাহর সাথেই আছ।
'আমি সদা আল্লাহর পর্যবেক্ষণে আছি'—এই অনুভূতি সর্বদা জাগরুক থাকাই হচ্ছে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, 'তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার মতো না হও, তাহলে মনের মধ্যে এই বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'
অর্থাৎ প্রকাশ্যে, গোপনে, লোকালয়ে, নির্জনে, নীরবতায়, জনসমাগমে-সর্বাবস্থায় আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।
আল্লাহ তাআলা দ্রষ্টা। তিনি আপনার জন্য সৃষ্টি করেছেন দৃষ্টিশক্তি। দু-চোখের মধ্যে আল্লাহ অসীম নিয়ামত দিয়েছেন। কর্নিয়া, আইরিশ, লেন্স, রেটিনা-সহ আরো কত কত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের এই চোখ। চোখ দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন।
নিজের নফসকে প্রশ্ন করুন, আল্লাহ তাআলা আমাদের কেন দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন? হারাম দৃষ্টিপাতের জন্য? ঈমান-বিধ্বংসী হারাম বস্তুসমূহের স্বাদ নেওয়ার জন্য? নাকি মহাবিশ্বের পরতে পরতে মহান আল্লাহর সৃষ্টিনৈপুণ্য ও অসীম নিয়ামতের প্রাচুর্য দেখার জন্য?
যে চোখ নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তু থেকে পবিত্র থাকে, যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেয়, যে চোখ আল্লাহর জন্য বিগলিত হয়, যে চোখ আল্লাহর আযাবের ভয়ে সিক্ত হয়, সেই চোখ আর যে চোখ হারামের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে—এই দুই চোখ কি কখনো সমান হতে পারে?
মহান রবের প্রতি বিনীত হোন
মহান স্রষ্টা, সবকিছুর দ্রষ্টা আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন আপনার চোখ সৃষ্টিতে। এই চোখ দিয়ে আপনি দেখছেন পৃথিবীর সবকিছু; সব রংয়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারছেন অনায়াসে। প্রিয়জনের প্রিয়মুখ, সন্তানসন্ততি, মা-বাবার দিকে তাকিয়ে লাভ করছেন তৃপ্তি। পবিত্র কুরআনের দিকে তাকিয়ে ধন্য করছেন আপনার চোখ; শীতল করছেন আপনার অন্তরাত্মা। এই চোখ দ্বারা এত নিয়ামত ভোগ করে এই চোখেরই স্রষ্টার সাথে নাফরমানি করা কি সাজে? চোখের স্রষ্টার প্রতি অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
হারামের জগতে আর কত দিন ঘোরাঘুরি? আল্লাহর অবাধ্যতায় আর কতকাল লাগামহীন জীবনযাপন?
এই চোখকে ব্যবহার করুন তার স্রষ্টাকে পাওয়ার কাজে। দু-চোখভরে দেখুন— জগৎ ও মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নিয়ামতরাজি, মিটমিট করে জ্বলতে থাকা হাজারো তারার মেলা, মখমলের মতো নরম জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো, ফুলের পাপড়িতে লেগে থাকা অপরূপ সৌন্দর্য! এসবের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখুন, খুঁজে পাবেন আপনার স্রষ্টার অপার মাহাত্ম্য!
আমাদের প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার রব আমাকে নয়টি বিষয়ের আদেশ প্রদান করেছেন।
সেই নয়টির মধ্যে একটি হলো— 'আমার নীরবতা যেন হয় চিন্তার মগ্নতা, আমার কথা যেন হয় আল্লাহর স্মরণ এবং আমার দৃষ্টি যেন হয় শিক্ষার উপকরণ।'
সবসময় মনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। যিনি আপনার চোখ ও দৃষ্টিশক্তি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি আপনাকে দেখবেন না? আল্লাহ বলেন—
أَيَحْسَبُ أَن لَّمْ يَرَهُ أَحَدٌ أَلَمْ نَجْعَل لَّهُ عَيْنَيْنِ *
মানুষ কি মনে করে, তাকে কেউ দেখছে না? আমি কি তাকে দুটি চোখ দান করিনি? [১]
অর্থাৎ যিনি আপনার চোখ সৃষ্টি করেছেন তিনি আপনার চোখের দৃষ্টি ও অন্তরের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে বেখবর নন!
সুমহান রব আরো বলেন-
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ
(হে নবি!) আপনি নির্ভর করুন পরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর, যিনি আপনাকে দেখতে পান, যখন আপনি সালাতে দাঁড়িয়ে যান এবং সালাত আদায়কারীদের সাথে ওঠাবসা করেন।[২]
ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে, জানালার কাচ আর পর্দা টেনে দিয়ে, পৃথিবীর সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে আপনি লিপ্ত হচ্ছেন মহান রবের অবাধ্যতায়। হারাম সম্পর্কের আঁচল ধরে, অবৈধভাবে তারুণ্যের শক্তি একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছেন স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল-সাদার জগতে। পচা, দুর্গন্ধময় জগতের নিকৃষ্ট ভাগাড়ে ডুব দিচ্ছেন। আপনি কখনো ভেবেছেন, এই ভবনের ছাদ ভেদ করে, জানালা, দরজা আর দেওয়ালের প্রাচীর ভেদ করে আল্লাহর দৃষ্টি আপনার দিকে তাকিয়ে আছে! তিনি চাইলে এক মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারেন আপনার মূল্যবান চোখদুটি। অবশ করে দিতে পারেন আপনার শক্তিশালী দুটো হাত। বন্ধ দুয়ারের নিচ দিয়ে আসা অক্সিজেন বন্ধ করে দিয়ে টেনে দিতে পারেন আপনার অবাধ্যতার ইতি! কিন্তু তিনি আপনাকে সুযোগ দেন, যেন আপনি ফিরে আসেন। তিনি পথ চেয়ে থাকেন, আপনি কোনো একদিন ফিরবেন বলে!
ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পাপাচারী পাপের কাছাকাছি হওয়ার সময় যদি বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন, তাহলে সে আল্লাহর সামনে কী পরিমাণ দুঃসাহসী! কত বড় দুর্ভাগা! আর যদি মনে করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন না, তাহলে সে কত বড় কাফির, কত বড় গণ্ডমূর্খ! আল্লাহ তাকে দেখছেন জেনেও যদি পাপ করে ফেলে, তাহলে সেও কত বড় মূর্খ! কত বড় দুর্ভাগা!'
জ্ঞানীরা বলেছেন, মানুষ আল্লাহর চোখ থেকে যা লুকোতে পারে না তা যদি মানুষের কাছ থেকে লুকায়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহর সাথে তামাশা করে। আর মানুষ যখন বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা সর্বদ্রষ্টা, তিনি তার সবকিছুর ব্যাপারে খবর রাখেন, তখন তার হৃদয়-আত্মা আলোকিত হয়।
সালাফে সালিহিনের কেউ কেউ বলতেন, 'আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তোমার যদি পাপ করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে এমন কোথাও গিয়ে পাপ করো, যেখানে আল্লাহ তোমায় দেখতে পাবেন না!'
জীবনে যেখানেই যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, নিশ্চিত বিশ্বাস রাখুন, আপনি রয়েছেন আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিসীমার ভেতরেই। তিনি আপনার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। আপনি যখন সুখ অনুভব করছেন, জীবনের আনন্দঘন মুহূর্ত উপভোগ করছেন, তিনি দেখছেন আপনার হাসি; আপনার উচ্ছ্বাস। তখন তাঁর সামনে মাথা নত করে আদায় করুন শুকরিয়াজ্ঞাপক সিজদা।
আবার যখন আপনি ভেসে যাচ্ছেন পাপের অন্ধকার জগতে, ভুলে যাচ্ছেন গন্তব্যের কথা, ডুবে যাচ্ছেন অন্যায়-অপরাধের নর্দমায়, ভেসে যাচ্ছেন আল্লাহর অবাধ্যতার গড্ডলিকা প্রবাহে, তখনো তিনি আপনাকে দেখছেন। আপনি তাঁকে দেখতে পাবেন না; কিন্তু তিনি আপনার দিকে ঠিকই তাকিয়ে আছেন। এরপর তো ফিরে যেতে হবে তাঁরই দিকে। তাই করজোড়ে মিনতি করুন—
হে আল্লাহ, আপনি আল-বাসির, সম্যক ও মহাদ্রষ্টা। আপনি আমার প্রকাশ্য-গোপন সকল দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। আপনার হাতেই আমার জীবনের লাগাম। আমি ভিক্ষা চাইছি আপনার সম্মুখে। আমার হৃদয় ভরিয়ে দিন আলোতে; চোখে দান করুন জ্যোতি, যেন এর দ্বারা আমি আপনার অসীম নিয়ামতের মহিমা দেখতে পাই। প্রকাশ্যে-গোপনে, লোকালয়ে-নির্জনে সর্বাবস্থায় আপনার সামনে আদব ও সৌজন্য রক্ষা করতে চলতে পারি। আমি যেন চলি আপনার নির্ধারিত সীমারেখার গণ্ডিতে, আপনার আদেশের চৌহদ্দির ভেতরে। আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন আপনার প্রিয় বান্দাদের কাফেলায়। আমিন।
টিকাঃ
[১] সুরা আনফাল, আয়াত: ২৯
[২] সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৮
[১] তাফসির ইবনু কাসির, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪৮
[১] সহিহ বুখারি : ২০৩৫
[১] সূরা ইসরা, আয়াত: ১৭
[১] সুরা বালাদ, আয়াত: ৭-৮
[২] সুরা শুআরা, আয়াত: ২১৭-২১৯
📄 আস-সালাম : السَّلَامُ
কুরআনুল কারিমের কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ তাআলার গুণবাচক নাম 'আস-সালাম' (السَّلَامُ) উল্লেখিত হয়েছে। আয়াতগুলো হলো-
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ
তিনি আল্লাহ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনিই অধিপতি, চিরপবিত্র, শান্তিদাতা, নিরাপত্তাদাতা, পরাক্রমশালী, প্রতাপশালী, নিরঙ্কুশ বড়ত্বের অধিকারী। তারা (তাঁর সাথে) যা কিছু শরিক করে, তা থেকে তিনি চিরপবিত্র।[১]
অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে-
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
আল্লাহ ডাকেন শান্তির নিবাসের দিকে এবং যাকে চান, তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।[২]
আল্লাহ তাআলার আহ্বানের সারসংক্ষেপ হলো শান্তির নিবাস। এ মর্মে অন্য আয়াতে এসেছে-
وَأَمَّا إِن كَانَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ فَسَلَامٌ لَّكَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ )
যদি সে হয় ডানদিকের (তাওহিদপন্থি) একজন, তাহলে (তাকে বলা হবে) তোমার জন্য ডানপন্থিদের পক্ষ থেকে সালাম।[১]
وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا )
তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক-যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে, যেদিন সে মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন সে পুনরুজ্জীবিত হবে।[২]
কুরআনুল কারিমের এই আয়াতগুলোসহ আরও বেশকিছু আয়াতে 'আস-সালাম' শব্দটি উল্লিখিত হয়েছে। এবার এর অর্থ জানা যাক।
আলিমগণ বলেন, 'আস-সালাম' (السلام) শব্দটির অর্থ-তিনি সালামাতের অধিকারী। 'সালাম' (سلام)-এর শাব্দিকউৎস 'সালামাত' (سلامة)। 'সালামাত' অর্থ আল্লাহ তাআলার সত্তা সমস্ত ত্রুটি থেকে মুক্ত; তাঁর গুণাবলি সব অপূর্ণতা থেকে মুক্ত; তাঁর কাজ অন্যায়-অকল্যাণ থেকে মুক্ত।
'তাঁর কাজ অন্যায়-অকল্যাণ থেকে মুক্ত'-এই কথাটির অর্থ জানার সময় আমাদের একটু সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করতে হবে। এই অর্থ শুনে আমাদের মনে প্রশ্নের উদয় হতে পারে-পৃথিবীতে কী তবে অন্যায় নেই? তাহলে আলিমগণ আল্লাহ তাআলার এই মহান নামের ব্যাখ্যায় কী করে বলেন, 'তাঁর কাজ অন্যায়-অকল্যাণ থেকে মুক্ত?'
এই প্রশ্নের উত্তরে আমি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। পাঠক যদি বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে পারেন, তাহলে আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করতে সক্ষম হবেন। আর আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণের ফলাফল একমাত্র জান্নাত।
আল্লাহর কর্মসমূহ কি 'নিরেট অন্যায়' থেকে মুক্ত? 'নিরেট অন্যায়' কী; যে অন্যায় আমরা করে থাকি সেটা?
বিষয়টি নিচের উদাহরণের আলোকে বুঝতে সহজ হবে। যদি কোনো মানুষের অ্যাপেন্ডিক্সে তীব্র ব্যথা হয়, তবে সার্জন কি অপারেশনের জন্য ছুরি হাতে নেবে না? হ্যাঁ, সার্জন ছুরি নিয়ে তার পেট কেটে রক্ত বের করবে। রোগীকে অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে অবশ করা হবে। অ্যানেস্থেসিয়ার প্রভাব শেষ হলে মানুষটি ব্যথা অনুভব করবে। কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই তার শরীর কাটতে হয়েছে। হিতাকাঙ্ক্ষী ডাক্তার কি ব্যথাযুক্ত অ্যাপেন্ডিক্স সমূলে বের করার জন্য ছুরি দিয়ে পেট কাটেনি? মূলত এমন পরিস্থিতিতে অ্যাপেন্ডিক্স পুরোপুরি কেটে ফেলার মধ্যে লোকটির সুস্থতা ও আরাম নিহিত থাকে।
এর বিপরীতে কোনো মানুষ যদি আরেকজনকে কোনো কারণ কিংবা অপরাধ ছাড়াই ছুরি দিয়ে আঘাত করে বসে, তাহলে আমরা বলব, এটি 'নিরেট অন্যায়' হয়েছে। শুধু কষ্ট দেওয়ার জন্যই সে এমন আঘাত করেছে। পক্ষান্তরে যখন ব্যথাযুক্ত অ্যাপেন্ডিক্স পুরোপুরি কেটে ফেলার জন্য পেট কাটা হয়, তখন এটি 'নিরেট অন্যায়' থাকে না। এই ক্ষতি করা হয় কল্যাণের উদ্দেশ্যে; ব্যথা দেওয়া হয় আরাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে; গায়ের চামড়া কাটা হয় মনের প্রশান্তির লক্ষ্যে। তাই আমরা বলি, আল্লাহ তাআলার 'আস-সালাম' নামের অর্থ হলো, তিনি সমস্ত অন্যায় থেকে মুক্ত।
আল্লাহ তাআলার সত্তা সমস্ত ত্রুটি থেকে মুক্ত, তাঁর গুণাবলি সব অপূর্ণতা থেকে মুক্ত, তাঁর কর্ম সকল অন্যায় থেকে মুক্ত। যখন নিরেট অকল্যাণের উদ্দেশ্যে অকল্যাণ সাধন করা হয়, তখন সেটি 'নিরেট অকল্যাণ'। নাহলে তা অকল্যাণ নয়।
প্রিয় পাঠক, আপনাকে এই আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করতে হবে-বিশ্বজগতে সম্পূর্ণ অকল্যাণ বলতে কিছু নেই। কারণ আমাদের সামনে ঘটমান অকল্যাণের পেছনে অবধারিতভাবে ভালো ফলাফল প্রাপ্তির কারণ বিদ্যমান।
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অনন্ত সৌভাগ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে। মানুষ যখন তার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তার চলার পথ সংশোধন করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। তার পরিশোধন, নিবারণ ও আত্ম-উন্নয়ন আবশ্যক হয়ে পড়ে। এমন কাজ করতে হয়, যা তাকে ফিরিয়ে দেবে মহৎ উদ্দেশ্যে। তাই যারা বিশ্বাস করে, এমন অনেক অনিষ্ট আছে—যা কেবল ক্ষতি করার উদ্দেশ্যেই সংঘটিত হয়ে থাকে, তারা কোনোদিনই আল্লাহ তাআলাকে চিনতে পারবে না। কারণ কুরআনুল কারিমে আছে—
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاءُ وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আপনি বলুন, সার্বভৌম রাজত্বের অধিকারী, হে আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। আপনারই হাতে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান।[১]
একটি উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। ধরুন, একজন বাবা যদি দেখেন তার সন্তান বিপথগামী হয়ে গেছে কিংবা গুরুতর কোনো অপরাধ করেছে; যদি দেখেন অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে কিংবা বড় ধরনের কোনো পাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে অথবা আপন ভাইয়ের প্রতি জুলুম করেছে, তাহলে পুরো পৃথিবীতে এমন বাবা কি পাওয়া যাবে—যিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন? তিনি কি তার সন্তানকে সংশোধন করবেন না? স্বাভাবিকভাবে সেসময় বাবা তার সন্তানকে তিরস্কার করবেন, প্রহার করবেন, সতর্ক করবেন।
এর বিপরীতে এমন বাবাও কি পৃথিবীতে আছেন—যিনি তার সম্পূর্ণ নিরপরাধ প্রিয় সন্তানকে অযথা কষ্ট দেবেন? এমন বাবা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কোনো দয়ামায়া কিংবা বোধবুদ্ধি নেই—এমন অতিসাধারণ বাবাও এরকম দোষে দুষ্ট হন না সাধারণত। তাহলে যে মহান আল্লাহ পৃথিবীর সকল বাবাকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ব্যাপারে আমরা কেমন ধারণা পোষণ করতে পারি?
এজন্যই 'নিরেট অকল্যাণ' বলতে পৃথিবীতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। সমস্ত বিপদাপদ মানুষের কর্মফল ছাড়া কিছু নয়। বিচ্যুতি যত তীব্র হয়, এর সংশোধনও তত দীর্ঘায়িত হতে থাকে।
এই ছিল আল্লাহ তাআলার মহান নাম 'আস-সালাম'-এর প্রথম পরিচয়। যার থেকে আমরা জানতে পারলাম-তাঁর সত্তা সমস্ত দোষ থেকে মুক্ত; তাঁর গুণাবলি মুক্ত সব অপূর্ণতা থেকে এবং তাঁর কর্মসমূহ পবিত্র সকল নিরেট অন্যায় থেকে। আমাদের দুচোখে দেখা প্রতিটি অকল্যাণই দূরবর্তী কোনো কল্যাণের উদ্দেশ্যে সাধিত হয়।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কোনো মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা করতে গিয়ে সমস্ত সম্পদ হারিয়ে ফেলতে পারে। সেই ব্যক্তির দৃষ্টিতে এই দুরারোগ্য ব্যাধি ও সম্পদের ব্যয় ভয়াবহ ক্ষতি। কিন্তু এই ব্যাধিই হয়তো তার জন্য আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসার মাধ্যম হয়। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে পরকালীন কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে। তাহলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যখন এই মহান উদ্দেশ্যের জন্য সম্পদ ব্যয় করতে বাধ্য হয়, তখন এটি হয় দূরবর্তী কল্যাণের কারণ।
আল্লাহ তাআলার মহান নাম 'আস-সালাম'-এর দ্বিতীয় অর্থটি হলো, তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য নিরাপত্তার অধিকারী। বিশ্বজগতে সমস্ত নিরাপত্তা তাঁর সাথে সম্পৃক্ত। এই পর্যায়ে আমি আপনাদের সামনে একটি বিষয়ে তুলে ধরব।
আল্লাহ শপথ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই! আমরা সকলেই আল্লাহর সুন্দর নামগুলো সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে চাই। তাত্ত্বিক আলোচনা বাদ দিন, বাদ দিন তাঁর ব্যাপারে আলিমদের বক্তব্য এবং আল্লাহর নাম 'আস-সালাম' হওয়ার সমস্ত কার্যকারণ। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি কি এই বিশ্বজগতে এমন নিদর্শন দেখতে পান না-যা আপনাকে নিশ্চিত করে, আল্লাহ তাআলাই আস-সালাম?
আমি আমাদের জীবন থেকে, আমাদের শারীরিক গঠন থেকে এমন কিছু উদাহরণ নির্বাচন করেছি, যা থেকে আপনারা জানতে পারবেন-এই বিশ্বচরাচর আল্লাহর সুন্দর নামগুলোরই বহিঃপ্রকাশ, তাঁর শ্রেষ্ঠ গুণাবলির নিদর্শন।
মানুষের হাড় ভেঙে গেলে কীভাবে জোড়া লাগে? সবাই জানে, হাড়ের কোষসমূহে পচন ধরে। হাড় যখন বৃদ্ধি পায়, তখন তা আল্লাহর নির্দেশে নির্দিষ্ট একটি সীমা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই 'আল-কাবিদ' (সংকোচনকারী) ও 'আল-বাসিত' (প্রসারণকারী)। আমাদের প্রতি আল্লাহর একটি রহমত হচ্ছে, মানুষের শরীর বৃদ্ধি পেয়ে যখন একটি পরিমিত সীমা পর্যন্ত পৌঁছে, তখন বৃদ্ধি থেমে যায়। আবার এমন গুরুতর রোগও রয়েছে, যার কারণে মানুষের শারীরিক বৃদ্ধি হতেই থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে জাইগ্যান্টিজম। তো একটি নির্দিষ্ট সীমায় হাড়ের বৃদ্ধি থেমে যাওয়া আল্লাহর বড় রহমত।
চিকিৎসা-বিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো হাড় ভেঙে গেলে হাড়ের বিশেষ কিছু কোষ জেগে ওঠে। আমাদের অজান্তেই ভাঙা অংশ নিজে নিজে সেরে ওঠে এবং অন্যান্য কোষের সাথে মিলিত হতে থাকে। ভাঙা হাড় সেরে না উঠলে আমরা কী করতাম? হাড়ের এই সেরে ওঠা আল্লাহর 'আস-সালাম' নামকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন সবচেয়ে সুন্দর গঠনে। আমাদের দেহে আরোগ্য লাভের সুব্যবস্থা করে রেখেছেন।
আপনি যখন কোমল পায়ে হেঁটে চলেন, তখন কেন আপনি ধপাস করে পড়ে যান না, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? আমাদের দেহে নিজস্ব ভারসাম্য ব্যবস্থা রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা আমাদের (মস্তিষ্ক ও) অন্তঃকর্ণে স্থাপন করেছেন। অন্তঃকর্ণে অর্ধবৃত্তাকার ৩টি নালি রয়েছে, যার ভেতরের ফোলা অংশকে অ্যাম্পুলা বলে। অ্যাম্পুলার ভেতরে সংবেদী রোম থাকে। এই সংবেদী রোমগুলোই আমাদের দৈহিক অবস্থানের বার্তা দিতে সাহায্য করে। সংবেদী রোমের চারদিকে ঘিরে থাকে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ ওটোলিথ দানা। সংবেদী রোমের চারদিকে ওটোলিথ دানা যুক্ত এই আবরণকে ক্যুপুলা বলে। যদি আমরা হাঁটার সময় পা পিছলে কোনো একদিকে হেলে যাই, ক্যুপুলাও সেদিকে হেলে যায়। ফলে সংবেদী রোমও বেঁকে যায়। তখন এটি সিগন্যাল আকারে ভেস্টিবুলার স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। তখন যেদিকে হেলে পড়েছি। মস্তিষ্ক তার অপর পাশের পেশিকে সংকুচিত হওয়ার নির্দেশ দেয়। ফলে আমরা পড়ে যাই না। এভাবেই কান আমাদের দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে। আমাদের নিরাপত্তার জন্যই আল্লাহ কানে এই ব্যবস্থা দিয়েছেন। এজন্যই তাঁর নাম 'আস-সালাম' (নিরাপত্তা-দানকারী)।[১]
দাঁতে অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু স্নায়ু রয়েছে, যেন আমরা তাড়াতাড়ি ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে দাঁত পুরোপুরি হারানোর আগেই চিকিৎসা নিতে পারি। এর মাঝেও আল্লাহর 'আস-সালাম' (নিরাপত্তা-দানকারী) নামটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আল্লাহ আমাদের শরীরে এক বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছেন। সেই সেনাবাহিনীর নাম ইমিউনিটি সিস্টেম (রোগপ্রতিরোধ-ক্ষমতা)। রক্তে বিদ্যমান কিছু শ্বেতকণিকা শত্রুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে, কিছু শ্বেতকণিকা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শত্রুবিনাশী উপাদান তৈরি করে। আবার কিছু শ্বেতকণিকা সেই উপাদান গ্রহণ করে সক্রিয় হয় এবং শত্রু-জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই মহাকর্মযজ্ঞ চলে আমাদের অজান্তেই। আমাদের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ তাআলা এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রেখেছেন। জীবাণুর অবস্থান অবগত হওয়া, তা বিনাশে উপাদান তৈরি করা এবং আরও নানা উপায়ে অনুপ্রবেশকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারি রাখার ক্ষমতাও আল্লাহ আমাদের মাঝে দিয়েছেন। সারাবিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখা এইডস রোগ মূলত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে হয়ে থাকে। তো, আল্লাহ তাআলা কেন মানুষের মাঝে ইমিউনিটি সিস্টেম সৃষ্টি করেছেন? মানুষের নিরাপত্তার জন্য, এর মাঝে ভাস্বর হয়ে ওঠে আল্লাহর মহান নাম 'আস-সালাম'।
আল্লাহ তাআলা হৃৎপিন্ডে বিশেষায়িত বিদ্যুৎক্ষেত্র স্থাপন করেছেন।[১] মানুষের দেহের মাংসপেশিগুলো সংবেদন-স্নায়ু ও মোটর স্নায়ুর সাথে সংযুক্ত। পুরো দেহেই সংবেদন স্নায়ু ছড়িয়ে আছে, যা চারপাশের অনুভূতি মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়। মস্তিষ্ক থেকে মোটর-স্নায়ুর মাধ্যমে শরীরের সমস্ত মাংশপেশীতে নির্দেশনা পৌঁছে যায়। এ থেকে বোঝা যায়, শরীরের প্রতিটি মাংশপেশী স্নায়ুর সংকেত পেয়ে নড়াচড়া করে। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে পক্ষাঘাত আসে কোত্থেকে? মস্তিষ্কের যে অঞ্চল থেকে নড়াচড়ার সংকেত পাওয়া যায়, সেই অঞ্চলের ধমনি সংকীর্ণ হয়ে গেলে (স্ট্রোক) মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। তবে হৃৎপিন্ডের মাংশপেশী মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণের অধীন নয়। আল্লাহ তাআলা হৃৎপেশীতে স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করেছেন। কারণ, হৃৎপিন্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এরচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যদি একটি বিদ্যুৎ-উৎপাদনকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তৎক্ষণাৎ আরেকটি কেন্দ্র কাজ করা শুরু করে। বিষয়টি অনেকটা উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার মতো। যদি মূল উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে কোনো ত্রুটি কিংবা বিঘ্নতা ঘটে, তাহলে অতিরিক্ত কেন্দ্রগুলো কাজ করে। হৃৎপিন্ডে বিশেষায়িত বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে মোট তিনটি। প্রথমটি (এসএ নোড) অকেজো হয়ে পড়লে দ্বিতীয়টি (এভি নোড) কাজ করা শুরু করে। দ্বিতীয়টিও নষ্ট হলে, অন্যগুলো (বান্ডল অব হিজ, পারকিনজি ফাইবার) কাজ করতে থাকে। আল্লাহ কেন এই অতিরিক্ত ব্যবস্থা রেখেছেন? আমাদের নিরাপত্তার জন্য।
কিডনি স্পেশালিস্ট একজন ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন, মানবদেহের দুটি কিডনীর মধ্যে একটি কিডনী যদি কেটে ফেলা হয় তাহলে বাকি সুস্থ কিডনিই সারা শরীরের রক্ত পরিশোধন করতে পারবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের নিরাপত্তার জন্যই প্রয়োজনের চেয়ে বিশগুণ ক্ষমতাসম্পন্ন কিডনি দান করেছেন। তাই যখন 'আস-সালাম' নাম পাঠ করি, তখন স্মরণ করতে হবে, তিনি আমাদের নিরাপদ রাখার জন্য সব রকমের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
শরীরের রক্তনালি ধমনি[১] ও শিরা[২]-এই দুইভাগে বিভক্ত যার সংযোগ ঘটে কৈশিক জালিকার মাধ্যমে[৩]। আল্লাহ ধমনিকে স্থাপন করেছেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অভ্যন্তরে, আর শিরাকে স্থাপন করেছেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বহিরাংশে। ধমনি সরাসরি হৃৎপিন্ডের সাথে সংযুক্ত। হৃৎপিন্ডে কোনো ক্ষত হলে মানুষের তার দেহের সম্পূর্ণ রক্ত হারিয়ে ফেলবে। কারণ, হৃৎদপিন্ড অনেকটা পাম্পের মতো। মানুষ যদি তার দেহের কোনো ধমনি কেটে ফেলে তাহলে কী ঘটবে জানেন? আমাকে একজন ভাসকুলার সার্জন বলেছেন, সার্জারি চলাকালে যদি ধমনি কোনোভাবে উন্মুক্ত হয়ে যায়, তাহলে চাপের তীব্রতায় রক্ত অনেক সময় রুমের ছাদ পর্যন্ত ছিটকে যায়। তাই এই ধমনির সুরক্ষার জন্য আল্লাহ তাআলা ধমনিকে রেখেছেন অভ্যন্তরে, আর শিরাকে স্থাপন করেছেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাইরে। এজন্যই অধিকাংশ ক্ষেত্রে যখন দেহে সুঁচ ফোটানো হয়, তখন ডাক্তারগণ ধমনিতে নয়; বরং শিরায় ফোটাতে বলেন। কে সেই সত্তা, যিনি ধমনিকে ভেতর দিকে স্থাপন করেছেন আর শিরাকে স্থাপন করেছেন বাইরের দিকে? আল্লাহর মহান নাম ‘আস-সালাম’ আপনার নিরাপত্তা বিধানের জন্য নিশ্চয়তা দিচ্ছে, তিনিই প্রতিটি রক্তনালি রেখেছেন যথাস্থানে।
মানুষ অনেক সময় ক্ষুধার তীব্রতায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে যায়। ধরুন, আপনার কাছে কিছু শস্যদানা ও তেল আছে। আপনার যত জ্ঞানই থাকুক না কেন, আপনি কি এই শস্য কিংবা তেলকে মাংসে রূপান্তরিত করতে পারবেন? মানুষের পক্ষে এ অসম্ভব। কিন্তু মানবদেহে এক অতি আশ্চর্যজনক ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় শস্যদ্রব্য তেলচর্বিতে রূপান্তরিত হয়। দ্রব্য রূপান্তরের এই স্থিতিস্থাপকতা আপনার নিরাপত্তার জন্যই। মানুষ যখন ক্ষুধার্ত হয়, তখন তার শরীরের চিনি ও চর্বি ক্ষয় হতে থাকে। চর্বি ক্ষয় হওয়ার পরও যখন ক্ষুধার্ত হয়, তখন মাংসপেশি ক্ষয় হতে থাকে। অনেক সময় মাংসপেশি ক্ষয় হতে হতে হাড়সর্বস্ব হয়ে যায়, হাড়ের ওপর থাকে শুধু চামড়া। এক যুবক একবার আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ানের রাজদরবারে প্রবেশ করেছিল। আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ান অল্পবয়স্ক যুবকটিকে দেখে রেগে গিয়ে বললেন, বালকদের মতো এই অল্পবয়স্ক লোকটি আমাদের দরবারে কেন এসেছে? যুবকটি বলল, আমির! আপনার দরবারে প্রবেশ করলে আপনার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে না, তবে আমি সম্মানিত হব। আমরা (অভাবের) এমন একটি বছর অতিক্রম করেছি বছর আমাদের (শরীরের) চর্বি খেয়ে ফেলেছে (চর্বি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে)। তারপরের বছর আমাদের মাংস (পেশি) ভক্ষণ করেছে, এরপরের বছর আমাদের হাড় ছুঁয়ে গিয়েছে।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, (খাবার না খেলে প্রথমে কার্বোহাইটেডের ভাণ্ডার ফুরিয়ে যায়। এরপর) মানুষের দেহে সঞ্চিত তেলও চর্বি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তারপর ক্ষয়প্রাপ্ত হয় মাংসপেশি; শুধু হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশি বাকি থাকে। কে দিয়েছেন এই বিন্যাস? এসবই মানুষের নিরাপত্তার জন্য। এটিই ‘আস-সালাম’-এর অর্থ।
এখানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় রয়েছে। ঘুমের সময় শরীরের উপরিভাগের ভর হাড়ের নিচে থাকা মাংশপেশির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের কারণে রক্ত সঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষের দেহে চাপ অনুভব করার জন্য বিভিন্ন কেন্দ্র সৃষ্টি করেছেন। এই কেন্দ্রগুলো যখন দেহের চাপ, ধমনি ও শিরার সংকীর্ণতা ও রক্ত সঞ্চালনে দুর্বলতা অনুভব করে, তখন ঘুমন্ত অবস্থাতেই মস্তিষ্ক শরীরকে পাশ ফেরার নির্দেশ দেয়। সুরা কাহফের ঘুমন্ত গুহাবাসী যুবকদের বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ وَكَلْبُهُم بَاسِطٌ ذِرَاعَيْهِ بِالْوَصِيدِ لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَيْهِمْ لَوَلَّيْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَلَمُلِئَتَ مِنْهُمْ رُعْبًا
আপনি তাদেরকে (দেখলে) মনে করতেন, তারা জেগে আছে। অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত। আমি তাদেরকে ডানে ও বাঁয়ে এপাশ-ওপাশ করাতাম। তাদের কুকুরটি (গুহার) প্রবেশপথে সামনের পাদুটি বিছিয়ে (প্রহরারত) থাকত। আপনি যদি তাদের দিকে তাকাতেন, তাহলে অবশ্যই (ভয় পেয়ে) পেছনে ফিরে পালিয়ে যেতেন এবং তাদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন [১]।
আয়াতে উল্লিখিত পন্থায় একবার ডানে, আরেকবার বামে পাশ ফেরানো হয়, আপনার নিরাপত্তার জন্য।
ঘুমের সময় যখন আপনার মুখের লালা বেড়ে যায়, তখন মস্তিষ্কে সংবাদ পৌঁছে যায়। মস্তিষ্ক তখন লালা গিলে ফেলার নির্দেশ দেয় ঘুমের মাঝেই অতিরিক্ত লালা চলে যায় পাকস্থলিতে। আল্লাহর 'আস-সালাম' নামের এই তো নিদর্শন।
আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা বিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দিয়ে নয়; বরং দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনার মধ্যদিয়ে আল্লাহর সুমহান নামসমূহকে বোঝানোর চেষ্টা করব। হয়তো এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করবেন।
আপনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ অঙ্গ মস্তিষ্ককে আল্লাহ কোথায় স্থাপন করেছেন? মাথার খুলিতে। মস্তিষ্কের মাঝে কী দিয়েছেন? স্তরে স্তরে বিন্যস্ত পর্দা (মেনিনজেস)। মস্তিষ্ক ও খুলির মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে কী দিয়ে পূর্ণ করেছেন? বিশেষ তরল পদার্থ দিয়ে। এই তরল পদার্থের কাজ কী? মানুষ যদি মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয় কিংবা পড়ে গিয়ে মাথায় ব্যথা পায়, তখন এই তরল পদার্থ আঘাত শুষে নেয়। তরল পদার্থে আঘাতের কম্পন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আঘাত কিংবা চাপ তরলের পুরো উপরিভাগে ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মস্তিষ্ককে রেখেছেন সুরক্ষিত বাক্সে। সেই বাক্স ও মস্তিষ্কের মাঝে তরলপূর্ণ ফাঁকা জায়গা রেখেছেন। ফাঁকা জায়গাগুলো আঘাত শুষে নেয়। এই ফাঁকা জায়গা না থাকলে সামান্য আঘাতেই মানুষের মাথা ফেটে যেত। অর্থাৎ এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আপনার নিরাপত্তার জন্য।
তিনি স্পাইনাল কর্ড কোথায় রেখেছেন? মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এই জিনিসটি তিনি রেখেছেন মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর বেষ্টনীর মাঝে।
হৃৎপিণ্ডকে কোথায় স্থাপন করেছেন? হাড়ের খাঁচার মাঝে। জরায়ু বা গর্ভাশয়কে কোথায় রেখেছেন? গর্ভাশয় রেখেছেন শ্রোণিদেশের অস্থিচক্রের মাঝে। আল্লাহ বলেন-
ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ
তারপর আমি তাকে বীর্যরূপে প্রতিস্থাপন করেছি এক নিরাপদ আধারে [১]
গর্ভাশয়ের অবস্থান নারীদেহের ঠিক মধ্যস্থলে। মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রক্তের লোহিত কণিকা। এই লোহিত কণিকা উৎপাদন-কারখানা স্থাপন করা হয়েছে লাল অস্থিমজ্জায়[২]। এ কি মানুষের নিরাপত্তার জন্য নয়?
চোখকে স্থাপন করা হয়েছে অক্ষিকোটরে। চোখের জন্য এমন এক কোটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা তাকে আঘাত থেকে রক্ষা করে। সাধারণত মানুষের চেহারায় যদি আঘাত লাগে, তাহলে সেই আঘাত চোখ পর্যন্ত পৌঁছে না। কারণ চোখ অবস্থান করে কোটরের ভেতর। অক্ষিকোটরে চোখ, খুলিতে মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ডের হাড়ে স্পাইনাল কর্ড, বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ড, অস্থিমজ্জায় লোহিতকণিকা উৎপাদনকেন্দ্র, অস্থিবেষ্টিত গর্ভাশয়... কী অপূর্ব সুনিপুণ স্থাপন!
এটি আল্লাহর তাআলার প্রজ্ঞারই বর্হিপ্রকাশ। গর্ভাশয় যখন গর্ভবতী নারীর নিরাপত্তার জন্য সংকুচিত হয়, তখন কী ঘটে? প্রসবের সময় গর্ভাশয় ক্রমবর্ধমান হারে সংকুচিত হতে থাকে। শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়, তখন গর্ভাশয় সংকুচিত হয় তীব্রভাবে। কেন এমনটি হয়? কারণ, শিশু যখন গর্ভাশয় থেকে বের হয়, তখন হাজার হাজার সূক্ষ্ম ধমনি ছিঁড়ে যায়। প্রসবের পর যদি গর্ভাশয় কোমলভাবে সংকোচন হতো, তাহলে মা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যেত। (প্রসবের পর) ডাক্তার কিংবা ধাত্রী গর্ভাশয় স্পর্শ করে দেখেন, যদি গর্ভাশয় যথাযথ শক্ত থাকে, তাহলে একে নিরাপদ প্রসব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার অতিরিক্ত সংকোচন হলেও বাচ্চা সমস্যায় ভুগতে পারে। সংকোচন পর্যাপ্ত না হলে নানাবিধ সমস্যা (যেমন দীর্ঘায়িত প্রসব কষ্ট) হতে পারে।
প্রিয় পাঠক! আল্লাহর শপথ! যদি আমরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস; এমনকি বছরের পর বছরও মানুষ ও প্রাণীর সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহর মহান নাম 'আস-সালাম'-এর মাহাত্ম্য নিয়ে আলোচনা করতে থাকি, তবুও সে আলোচনা শেষ হবে না।
কয়েকদিন আগে আমাকে একজন ডাক্তার বলেছেন, অণ্ডকোষে আল্লাহ যে শুক্রাণু রেখেছেন, তার পরিপক্ক হতে ৭৪ দিনের মতো সময় লাগে। শুক্রাণু যখন অণ্ডকোষে সংরক্ষিত থাকে, তখন তার কর্মক্ষমতা বন্ধ থাকে। শুক্রাণু যখন গর্ভাশয়ে স্থিত হওয়ার জন্য শুক্রাশয় থেকে সবেগে বের হয়, তখন তার কার্যক্রম শুরু হয়। শুক্রের এই বৈশিষ্ট্য না হলে পুরুষরা সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে পড়ত। কারণ, শুক্রাণুর আয়ুষ্কাল মাত্র পাঁচদিন। অণ্ডকোষে শুক্রাণু তৈরি হওয়ার পর সেগুলোর নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। তারপর যখন গর্ভাশয়ে স্থিত হওয়ার জন্য শুক্রাশয় থেকে সবেগে বের হয়, তখন শুক্রাণু কর্মক্ষম হয়ে ওঠে এবং নারীর জননপথে পাঁচদিন পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। কে এই ব্যবস্থা করেছেন? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
প্রিয় পাঠক! আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের যে পাঠ আমরা শুরু করেছি, এক্ষেত্রে আমরা তাত্ত্বিক সংজ্ঞা এবং ব্যাবহারিক প্রমাণ—দুটোই তুলে ধরব। মানুষ, প্রাণী, লতাপাতা ও আপনার চিরচেনা গাছের সৃষ্টি নিয়ে স্বাধীন চিন্তায় অবগাহন করব। যে গাছটির বয়স পঞ্চাশ বছর, জন্মের পর থেকে প্রতি বছর আপনি যে গাছের ফল খাচ্ছেন, সেই গাছটিরও একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা রয়েছে, নকশা রয়েছে। গাছটির রূপরেখা অনেকটা এমন—আপনি যখন গাছটির যত্ন নেন না, আকাশেও কোনো বৃষ্টির দেখা মেলে না, তখন গাছটির পাতার রস ফুরিয়ে যেতে থাকে। একসময় যখন পাতার রস নিঃশেষ হয়ে যায়, পাতাগুলো শুকিয়ে যায়। কেউ যদি কোনো গাছে পানি না দেয়, তাহলে সর্বপ্রথম গাছের পাতায় থাকা রস ও পানি শেষ হতে থাকে। পাতার পানি নিঃশেষ হলে পাতা শুকিয়ে যায়। তখনো যদি পানি না দেওয়া হয়, তাহলে শেষ হয় ডালের পানি। তারপরও পানি না পেলে শেষ হয় কাণ্ডের পানি। সবশেষে ফুরোয় শিকড়ের পানি।
গাছের ক্ষেত্রে যদি এই চিত্রটি বিপরীত হতো, তাহলে পানি না দেওয়া হলে দুসপ্তাহেই গাছ মরে যেত। কারণ, তখন সর্বপ্রথম শেষ হতো শিকড়ের পানি। শিকড় শুকিয়ে যেত; ফলে গাছও মরে যেত। কে প্রথমে পাতার পানি শুষে নেয়ার নির্দেশ দিলো গাছকে? কে এই রূপরেখা গড়ে দিয়েছেন? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। শস্যবীজ আল্লাহর নিরাপত্তার চমৎকার এক নিদর্শন। শস্যবীজ বছরের পর বছর প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে টিকে থাকে। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ পিরামিড থেকে গম নিয়ে বপন করেছিল। সেই গম থেকেও অঙ্কুর হয়েছে। গমের বীজ এমনভাবে গঠিত যে, তার মাঝে অঙ্কুর বহুকাল জীবিত থাকে। এমনকি প্রায় ৬ হাজার বছর পরও জীবন্ত অঙ্কুর পাওয়া গেছে। যার ফলে পিরামিডে পাওয়া গমও অঙ্কুরিত হয়েছে।
সৃষ্টিজগতে উদ্ভিদ-প্রাণী সবার জীবনে যে জিনিসের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি দেখতে পাই তা হলো পানি। জমাট বেঁধে যদি পানির ঘনত্ব বেড়ে যেত, তাহলে সবকিছু সমুদ্রগর্ভে ডুবে যেত, শেষ হয়ে যেত ভূপৃষ্ঠে প্রাণের অস্তিত্ব। কিন্তু পানি একমাত্র উপাদান, যা ঠান্ডা করলে ঘনত্ব আরও কমে যায়। যদি পরিস্থিতি এর বিপরীত হতো, তাহলে সমস্ত সমুদ্র জমাট বেঁধে যেত, বাষ্পশূন্য হয়ে যেত পৃথিবী। ফলে তৃণলতা, গাছপালা, ফসল সবকিছু মরে যেত। ধীরে ধীরে নিঃশেষ যেত প্রাণী ও মানুষ। এই ব্যবস্থা আমাদের নিরাপত্তার জন্য আস-সালাম (নিরাপত্তাদাতা) নামেরই নিদর্শন এটি। পানির স্পর্শ পেয়ে মাটিতে বোনা বীজগুলো সজীব হয়ে উঠতে থাকে। এক সময় মাটি ভেদ করে সবুজের আহ্বান নিয়ে আকাশ পানে উঠে দাঁড়ায়। আল্লাহর এই বাণীটি পাঠ করুন-
وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الرَّجْعِ ۞ وَالْأَرْضِ ذَاتِ الصَّدْعِ ۞
শপথ বৃষ্টিবাহী (মেঘাচ্ছন্ন) আকাশের। এবং শপথ ফেটে যাওয়া জমিনের [১]
রুটির খামিরে দেওয়া পানি থেকে শুরু করে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, আসবাবপত্র, মৌচাক, মৌচাকের গঠন সবকিছু থেকে জানা যায়, আল্লাহর আস-সালাম (নিরাপত্তাদাতা) নামটি তাঁর সৃষ্টির মাঝে, এমনকি খাদ্য-পানীয়ের মাঝেও ভাস্বর হয়ে আছে। আমাদের রব আযযা ওয়া জাল্লা বলেছেন-
الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفَاوُتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِنْ فُطُورٍ
যিনি সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে। পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে আপনি কোনো খুঁত দেখতে পাবেন না। আবার দৃষ্টি ফেরান। কোনো ত্রুটি দেখতে পান কি?[১]
অর্থাৎ তাঁর সমস্ত সৃষ্টি নিখুঁত। তিনি আরও বলেছেন-
قَالَ فَمَن رَّبُّكُمَا يَا مُوسَى قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى
সে (ফিরআউন) বলল, হে মুসা, তাহলে তোমাদের রব কে? মুসা বলল, তিনিই আমাদের রব যিনি প্রতিটি বস্তুকে তার নিজস্ব আকৃতি দান করেছেন, তারপর (সঠিক) পথ দেখিয়েছেন।[২]
ভেবে দেখুন, পরিযায়ী পাখিরা দূরদেশে ভ্রমণ করে থাকে তাদের নিরাপত্তার জন্য। পাখিগুলো প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। এমনকি কোনো কোনো প্রজাতির পাখি লাগাতার ৮৬ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে পারে। পৃথিবীতে কোনো বিমান কি একটানা ৮৬ ঘণ্টা উড়তে পারবে?
আল্লাহ্ মাছকে এমন ব্যবস্থা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে সে জানতে পারে, সে পানির কোন স্তরে রয়েছে। প্রতিটি জলজ প্রাণীর মাঝেই পানির চাপ বোঝার ক্ষমতা রয়েছে।
আমাদের চারপাশের গৃহপালিত প্রাণীগুলোর প্রতি লক্ষ করুন। দেখবেন, তারা আশ্চর্যজনক নানা উপায়ে নিরাপদ থাকছে। এ সবই আল্লাহ তাআলার 'আস-সালাম' নামের নিদর্শন।
এর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা গেল— ‘আস-সালাম’ মানে আল্লাহ তাআলার সত্তা সমস্ত দোষ থেকে নিরাপদ, তাঁর গুণাবলি সমস্ত ত্রুটি থেকে নিরাপদ, তাঁর যাবতীয় কাজ অকল্যাণ থেকে নিরাপদ।
মূলত ‘আস-সালাম’ সেই সত্তার নাম—যিনি তাঁর সৃষ্টিকুলের জন্য নিরাপত্তাদানকারী। তাই বিশ্বজগতে যত নিরাপত্তা রয়েছে, সবই তাঁর দিকে সম্পর্কিত। মুমিন বান্দাদের জন্য তিনি আজাব থেকে নিরাপত্তাদানকারী; বিপদ থেকে মুক্তিদাতা।
এ মর্মে কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন— (৫৯) قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِينَ اصْطَفَى ...
বলুন, সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর এবং শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর মনোনীত বান্দাদের ওপর।[১]
আল্লাহ তাআলা ‘আস-সালাম’। এজন্যই তাঁর সত্তা এবং তাঁর বান্দাগণ সমস্ত কষ্ট ও ক্ষতি থেকে নিরাপদ।
এই মহান নামের আরেকটি অর্থ হলো, আল্লাহর জিকির। এটা মনে স্বস্তি ও প্রশান্তি এনে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— (۲۸) ... أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
জেনে রেখো আল্লাহর জিকিরেই অন্তরগুলো প্রশান্তি লাভ করে।[২]
কখনো হৃদয়ে শূন্যতা ভর করে, আবার কখনো মনে বিরাজ করে ভয় ও অস্থিরতা।
এই শূন্যতা ও অস্থিরতা দূর হয় শুধু আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে। দুনিয়াতে সবকিছু খুঁজে দেখুন। পুরো দুনিয়ায় এমন কিছু নেই-যা আপনাকে সুখ ও প্রশান্তি দিতে পারে। সুখ ও প্রশান্তি রয়েছে একমাত্র আল্লাহর জিকির ও স্মরণে।
কখনো কখনো হৃদয়ে মরিচা পড়ে। যদি প্রশ্ন করা হয়, সেই মরিচা দূর করার উপায় কী? তাহলে উত্তরে বলব, 'আল্লাহর জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত।'
আপনি যখন মহান আল্লাহর 'আস-সালাম' নামের জিকির করবেন, তখন অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব করবেন। যখন 'আস-সালাম' নাম স্মরণ করবেন, তখন আপনার মনের ভয় ও অস্থিরতা দূর হয়ে যাবে; দূর হয়ে যাবে হৃদয়ের শূন্যতা ও একাকিত্ববোধ।
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহ জিকির ও স্মরণ থেকে দূরে থাকে, তারা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। তাদের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। তারা আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে শরিক করে বসে। তাই আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে ঢেলে দেন ভয় ও অস্থিরতা।
মুমিন ও কাফিরের মধ্যে এটাই হলো পার্থক্য। মুমিন বান্দা সবসময় থাকে শান্ত ও প্রশান্ত। কোনোকিছুতেই সে বিচলিত হয় না। কাফিরের মনজুড়ে থাকে ভয় ও শঙ্কা। সে সর্বদা অস্থিরতায় ছটফট করতে থাকে।
এজন্য আপনি যখন 'আস-সালাম' নাম স্মরণ করবেন, তখন এই নাম আপনাকে দেবে অনাবিল প্রশান্তি এবং সুখময় অনুভূতি। যখন এই নামের জিকির করবেন, তখন মহান আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করবেন। বুঝতে পারবেন-তিনি আপনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছেন, আপনি তাঁর সুরক্ষা ও তত্ত্বাবধানে রয়েছেন, লাভ করছেন তাঁর তাওফিক ও সহায়তা।
'আস-সালাম' মানে আপনি যখন আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক গড়তে চাইবেন, তখন নিজিকে সব ধরনের দোষত্রুটি থেকে পবিত্র করবেন। পবিত্র মন নিয়ে মহান রবের জিকির করবেন। তাঁর স্মরণে, তাঁর ইবাদতে নিজেকে মিটিয়ে দিয়ে লাভ করবেন অগণিত সাওয়াব ও প্রতিশ্রুত জান্নাত।
এই পর্যায়ে আমরা একটি সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। 'আস-সালাম' নামের প্রথম অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলার সুমহান সত্তা সমস্ত দোষ থেকে পবিত্র, তাঁর গুণাবলি পবিত্র সমস্ত ত্রুটি থেকে, তাঁর যাবতীয় কর্ম পবিত্র সমস্ত অকল্যাণ থেকে। কোন অকল্যাণ থেকে মুক্ত? নিরেট অকল্যাণ থেকে। পক্ষান্তরে কল্যাণের উদ্দেশ্যে সাধিত অকল্যাণ মূলত চিকিৎসার মতো।
'আস-সালাম' নামের দ্বিতীয় অর্থ হলো, তিনি নিরাপত্তার অধিকারী। অর্থাৎ তিনিই তাঁর বান্দাদের নিরাপত্তা দান করেন। হয়তো তাদেরকে সৃষ্টির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দান করেন। যেমনটি আমরা কিছুক্ষণ আগে আলোচনা করলাম। নয়তো তাদের মনে নিরাপত্তা এনে দেন। এজন্য আল্লাহর জিকির ও স্মরণ মনে প্রশান্তি ও স্বস্তি এনে দেয়।
আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক হৃদয়কে কৃপণতা, লোভ, ক্রোধ হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকারের মতো দোষত্রুটি থেকে মুক্ত করে। এই দোষগুলো মানুষের দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আপনি যখন আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলবেন, তখন এই দোষগুলো থেকে পবিত্র হয়ে যাবেন। কারণ তিনি আপনার দেহের নিরাপত্তাদানকারী। আপনাকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও নানারকম ব্যবস্থা দিয়েছেন; দান করেছেন কোষ ও টিস্যু। হাড়, স্নায়ু, পেশি, ধমনি, শিরার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম বড় বড় বিজ্ঞানীকে হতাবাক করে দেয়।
যদি আপনি ভীত হন এবং তাঁকে স্মরণ করেন, তাহলে আপনার মনে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। যদি তাঁর সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন, তাহলে তিনি আপনাকে সমস্ত দোষত্রুটি থেকে মুক্ত রাখবেন এবং আপনার হৃদয়কেও করবেন পরিশুদ্ধ। কারণ তাঁর একটি নাম 'আস-সালাম'।
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের শান্তির পথ দেখান। প্রতিটি মানুষের একটি পরিবার আছে। হতে পারে তার বাড়িতে ঝগড়াবিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ, রাগ, ঘৃণা, বিবাহবিচ্ছেদের মতো ব্যাপার ঘটে। আপনি যদি এক্ষেত্রে কুরআনুল কারিমের নির্দেশনা ও নববি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাহলে আল্লাহ তাআলা আপনাকে ঘর-সংসারের ক্ষেত্রে শান্তির পথ প্রদর্শন করবেন। আপনি দেখবেন আত্মিক প্রশান্তি, অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া, প্রেম-ভালোবাসার প্রাচুর্য বিরাজ করছে। কারণ আপনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর অনুসরণ করছেন।
যখন বাড়িতে প্রবেশ করবেন, তখন আপনার পরিবারকে সালাম দিন; বলুন-'আসসালামু আলাইকুম!' এতে শয়তান পালিয়ে যাবে। শয়তান মানুষের ঘরবাড়িতে ঢুকে থাকে। বাড়ির অধিবাসীরা সালাম না দিয়ে এবং দুআ না পড়ে[১] ঘরে প্রবেশ করলে, শয়তান তার সঙ্গীসাথিদের ডেকে বলে, 'আমাদের রাতযাপনের ব্যবস্থা হয়ে গেছে।' তখন সেই ঘরে সারারাত নানা ধরনের সমস্যা হতে থাকে। ঘরের অধিবাসীরা যখন বিসমিল্লাহ না বলেই খাওয়া শুরু করে, তখন শয়তান ঘোষণা করে, 'আমাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থাও হয়ে গেছে।'[২]
আল্লাহ তাআলার 'আস-সালাম' নাম এবং তিনি শান্তির পথ দেখান-এ দুটোর একটি অর্থ হচ্ছে তিনি আপনাকে নেককার নারী নির্বাচনের আদেশ দিয়েছেন। আপনি যদি নেককার হওয়ার কারণে কোনো নারীকে নির্বাচন করেন, তাহলে তাকে নিয়ে আপনি সুখী হতে পারবেন। কিন্তু যদি দ্বীনি অবস্থার ওপর সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেন, তাহলে দুজনেই কষ্টের মধ্যে পড়বেন। কারণ যদিও সৌন্দর্য লক্ষণীয়, কিন্তু শুধু সৌন্দর্যকে যদি আপনি তার দ্বীনদারিতার ওপর প্রাধান্য দেন, তবে এটা আপনার কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কাজের ক্ষেত্রে শান্তির পথ দেখানোর একটি ক্ষেত্র-সুদকে হারাম করা। সুদের লেনদেন করার কারণে আপনার ওপর বড় ধরনের ঋণের বোঝা চেপে বসতে পারে। যার ফলে আপনি নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত হতে পারেন। আপনার বেচাকেনা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সর্বসান্ত হয়ে যেতে পারেন। আপনি যদি এক্ষেত্রে নববি সুন্নাহ ও আল্লাহর নির্দেশ মানতেন, তাহলে এমন বিপদে পড়তেন না।
সুতরাং তিনি ব্যবসার ক্ষেত্রে শান্তির পথ দেখান, বিয়ের ক্ষেত্রে শান্তির পথ দেখান, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেখান শান্তির পথ। এটিই 'আস-সালাম' নামের সারকথা।
আপনি যদি কুরআনুল কারিমের বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন করেন, সর্বক্ষেত্রে সর্বদিকে তা আপনাকে শান্তির দিকে আহ্বান করবে। পৌঁছে দেবে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুত চিরন্তন সুখের নিবাসে। সেই সুখের নিবাস হলো জান্নাত।
তিনিই আস-সালাম। নিরাপত্তাদাতা ও পরম শান্তিদাতা। তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আপনি সুখে-শান্তিতে বসবাস করেন। অনুভব করেন, বিশ্বজগতের রব আপনার সাথেই রয়েছেন। তিনি কখনো আপনাকে ত্যাগ করেন না, ছেড়ে দেন না শত্রুর হাতে বরং তিনি আপনাকে সুরক্ষা দেন, সাহায্য করেন। কারণ আপনি এর মূল্য পরিশোধ করেছেন।
এ বিষয়ে কুরআনুল কারিম থেকে জানা যায়-
وَقَالَ اللَّهُ إِنِّي مَعَكُمْ طَلَئِنْ أَقَمْتُمُ الصَّلَاةَ وَآتَيْتُمُ الزَّكَاةَ وَآمَنتُم بِرُسُلِي وَعَزَّرْتُمُوهُمْ وَأَقْرَضْتُمُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا لَأُكَفِّرَنَّ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَلَأُدْخِلَنَّكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ فَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ
আল্লাহ বলেন, 'আমি তোমাদের সাথে আছি। যদি তোমরা সালাত কায়েম করো, আমার রাসুলদের প্রতি ঈমান আনো, তাদের সাহায্য করো এবং আল্লাহকে উত্তমপন্থায় ঋণ দিতে থাকো-তবে অবশ্যই আমি তোমাদের গুনাহগুলো মিটিয়ে দেব এবং অবশ্যই তোমাদের প্রবেশ করাব এমন উদ্যানসমূহে-যার তলদেশ দিয়ে নদীনালা প্রবাহিত হয়। এরপরও তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি কুফরি করবে, সে অবশ্যই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হবে।'[১]
'সালামাত' (নিরাপত্তা) শব্দটি 'আস-সালাম' থেকে এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক নির্বুদ্ধিতামূলক কর্মকাণ্ড-হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, ঘৃণা, অহংকার ইত্যাদি দোষত্রুটি থেকে নিরাপত্তা দেয়। আপনি যদি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করেন, তাহলে তিনি আপনাকে এসব ধ্বংসাত্মক দোষ থেকে পবিত্র করবেন।
'আস-সালাম' অর্থ-আপনি যখন তার দেওয়া শরিয়ত অনুযায়ী চলবেন, তখন তিনি আপনাকে শান্তির পথ দেখাবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ ...
নিশ্চয় এই কুরআন সেই পথের দিশা দেয়-যা সুপ্রতিষ্ঠিত [১]
আপনি যদি দুনিয়াতে কুরআনুল কারিমের বিধান বাস্তবায়িত করেন, কুরআন আপনাকে দুনিয়াতে শান্তি ও নিরাপত্তা দেবে। যদি আল্লাহর অভিমুখী হন, তবে তিনি আপনাকে হৃদয়ের প্রশান্তি দান করবেন। যদি আপনি তাকে আপনার জীবনের সবকিছু সোপর্দ করেন, তাহলে তিনি আপনাকে দান করবেন আখিরাতের নিরাপত্তা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَام ...
তিনিই আল্লাহ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি মহান অধিপতি, চিরপবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা।[২]
আপনি যদি কোনো মন্দ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করেন, তবে সে আপনার জীবন বরবাদ করে দেবে। মানুষ কখনো পাপাচারী নারীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়।
এমনই একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে এক লোক আমাকে বলেছিলেন, তার স্ত্রীকে তিনি প্রথম দেখেছিলেন এক নাইটক্লাবে। প্রথম দেখায় তাকে ভালো লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত এই ভালো লাগা বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। বিয়ের পর তাদের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব- কলহ। কারণ তার স্ত্রী ছিলেন উচ্ছঙ্খল প্রকৃতির। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি তাকে কোত্থেকে বিয়ে করে এনেছেন? তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করুন।' আমার পরামর্শ অনুযায়ী তিনি স্ত্রীর পরিবারের কাছে গেলেন। তখন পরিবারের লোকেরা স্ত্রীকে বুঝিয়ে রাজি করাল। কিন্তু স্ত্রী দাবি করল, মোটা অঙ্কের টাকা দিলে সে স্বামীর কাছে ফিরে যাবে। তারপর সে স্বামীর সাথে ফিরে এল। কিন্তু গোপনে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিল। কোর্টের লোকদের সাথে যোগসাজশ করে মামলার নোটিশ নিজের কাছে রেখে দিল, স্বামীকে কিছুই জানালো না।
এভাবে মামলার সময় শেষ হয়ে গেল। রায় গেল স্বামীর বিরুদ্ধে। মোহর অনাদায়ের অপবাদে তাকে যেতে হলো জেলে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সবকিছু জেনে সে একরাতে স্ত্রী, শাশুড়ি ও শ্যালিকাকে হত্যা করার চেষ্টা করল। তারপর নিজেই আত্মহত্যা করে বসল। কিন্তু তাদের আঘাত ততটা গুরুতর ছিল না। স্থানীয় লোকজন তাদেরকে হাসাপাতালে নিয়ে গেল। তিনজনেই বেঁচে গেল। তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।
খারাপ জায়গায় পছন্দ হওয়া কোনো মেয়েকে বিয়ে করলে মানুষ শান্তি পেতে পারে না; বরং জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। দামেশকে মাত্র ছয় মাস আগে এই ঘটনা ঘটেছে।
এজন্য যদি কেউ আল্লাহ তাআলার বিধানকে আঁকড়ে ধরে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার বিয়ে ও দাম্পত্যে, আমলে, রিজিকে, স্বাস্থ্যে, সন্তানসন্ততিতে বারাকাহ দান করেন। তাকে দেখান শান্তির পথ।
এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন-
.... فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى )
যে আমার হিদায়াতের অনুসরণ করবে, সে পথহারা হবে না এবং দুর্ভাগাও হবে না।[১]
জেনে রাখুন, আল্লাহর সাথে থাকার মাঝেই যাবতীয় কল্যাণ। সমস্ত শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী চলা, আল্লাহকে চেনা, তাঁর ইবাদত করা, তাঁর কিতাব বোঝা, তাঁর শরিয়ত পালন ও বাস্তবায়ন এবং তাঁর নির্দেশ আঁকড়ে ধরার মাঝে।
এছাড়া কুরআনুল কারিমে ভিন্ন একটি অর্থে 'আস-সালাম' শব্দটি বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ ...
আল্লাহ ডাকেন দারুস সালাম; শান্তি-নিরাপত্তার নিবাসের দিকে।[১]
কী এই 'দারুস সালাম' বা শান্তি-নিরাপত্তার নিবাস?
এই শান্তি ও নিরাপত্তার নিবাস হলো জান্নাত। তাতে কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই, হিংসা-বিদ্বেষ নেই; নেই কোনো রোগব্যাধি, ভয়, দুশ্চিন্তা, হানাহানি, ঝগড়া-বিবাদ।
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَىٰ وَزِيَادَةٌ *
আল্লাহ ডাকেন দারুস সালাম; শান্তি-নিরাপত্তার নিবাসের দিকে। আর তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথ দেখান। যারা সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ ও বাড়তি পুরস্কার [২]
অন্য এক আয়াতে 'আস-সালাম' শব্দটি আরেক অর্থে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَمَّا إِنْ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ فَسَلَامٌ لَّكَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ )
আর যদি সে ডান পথের অনুসারী হয়, তাহলে (তাকে বলা হবে) তোমার জন্য ডানপন্থিদের পক্ষ থেকে সালাম [১]
আল্লাহ তাআলা আপনাকে এই ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও শান্তির কথা জানাচ্ছেন। তারা বলবে, আমরা অনেক সুখে-শান্তিতে আছি। ডান পাশের লোকেরা জান্নাতে শান্তিতে থাকবে।
কুরআনুল কারিমে আরও বর্ণিত হয়েছে-
وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا )
তার প্রতি বর্ষিত হবে শান্তি-যেদিন সে জন্মগ্রহণ করে এবং যেদিন মৃত্যুবরণ করবে আর যেদিন সে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে-সেদিন [২]
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তিন সময়ে মানুষ সবচেয়ে একাকী হয়। তা হলো-এক. জন্মের দিন। দুই. মৃত্যুর দিন। তিন. কিয়ামতের দিন।'
সেদিনের পূর্বে মানুষ মায়ের গর্ভে সুখে থাকে, সব ধরনের কষ্ট ও ঝামেলা থেকে থাকে মুক্ত। এমন অবস্থা থেকে দুনিয়াতে আসে। স্বাভাবিকভাবে সে একটি সংকীর্ণ স্থান থেকে সুপ্রশস্ত জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। দুনিয়ার সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কেঁদে ওঠে।
তারপর যেদিন সে মৃত্যুবরণ করে, সেদিন স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য; সবকিছু ছেড়ে চলে যায়। সপ্তাহে হয়তো তার একটি দিন ছিল, যেদিন সে বন্ধু-বান্ধবের সাথে মিলিত হতো। ছিল কিছু শখ ও আগ্রহের বিষয়। তারপর যখন তার হৃদস্পন্দন থেমে যায়, তখন সবাই তাকে নিয়ে কবরে রেখে আসে। সবকিছু ছেড়ে সে চলে যায় চিরদিনের জন্য।
এই মানুষটিই তো ঘর সাজিয়েছিল। ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল তার, একান্ত সময় কাটানোর ঘর। সেই ঘরে সে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখত। নানাজনের দেওয়া উপহারগুলোও হয়তো থাকত। তার পরিবারের লোকজন হয়তো সেই রুমে যেতে চাইত, কিন্তু জীবিত থাকতে সে অনুমতি দিত না। মৃত্যুর পর যখন সে আমানত অর্পণ করে দুনিয়া ত্যাগ করে, তখন পরিবারের লোকেরা তার রুমের দরজা খোলে, তার গাড়িটি নিয়ে নেয়, তার দোকানটি খোলে; নতুন করে সাজায়, বেচাকেনা করে। এভাবেই চলতে থাকে দুনিয়া। এজন্যই বলা হয়েছে, 'যেদিন সে মৃত্যুবরণ করবে।'
আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত-
একবার তিনি জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কাঁদলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?' তিনি বললেন, 'জাহান্নামের কথা মনে পড়ায় কাঁদছি। আপনি কি কিয়ামতের দিন আপনার পরিবারের কথা মনে রাখবেন?' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, '(হ্যাঁ), অবশ্য ৩টি স্থানে কেউ কারও কথা মনে রাখবে না-
১. মিজানের স্থানে; যতক্ষণ পর্যন্ত না জানতে পারবে-তার আমলের পরিমাণ কম হবে নাকি বেশি।
২. আমলনামা প্রাপ্তির স্থানে; যখন বলা হবে- 'তোমার আমলনামা পাঠ করো।' তখন সবাই দুশ্চিন্তায় থাকবে-আমলনামা ডানহাতে পাচ্ছে না বামহাতে; নাকি পেছন দিক থেকে পাচ্ছে।
৩. পুলসিরাতের কাছে; যখন তা জাহান্নামের ওপর স্থাপন করা হবে। কিয়ামতের দিন মা তার সন্তানকে দেখতে পাবে। মা বলবে, 'হে আমার সন্তান, আমি কি তোমাকে গর্ভে ধারণ করিনি? আমার বুকের দুধ পান করাইনি? কোলেপিঠে করে মানুষ করিনি? তোমার কাছে কোনো নেকি আছে-যা আমার উপকারে আসবে?' সন্তান বলবে, 'আহ মা, আপনি যে কষ্টের কথা বলছেন, আমিও একই কষ্টে আছি। আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারব না।'
এক ব্যক্তি আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে স্বপ্নে দেখলেন। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'সালামান! সালামান!' লোকটি তখন আনন্দ চিত্তে ঘুম থেকে জেগে উঠল। আরেকজনকে বললেন তার স্বপ্নের কথা। তিনি তখন জানালেন, তোমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো, তুমি আল্লাহর এই বক্তব্যের অর্থ জানো না-
وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
যখন মূর্খরা তাদেরকে (অভদ্রভাবে) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে— 'সালাম'; শান্তি।[১]
এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা নেককার বানিয়েছেন। যখন কেউ তাদেরকে সম্বোধন করে কিছু বলে—তাদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চায়—তখন তারা তাকে বলে, 'সালাম। আমরা বিতর্কে জড়াতে চাই না।'
এখানে সালাম অর্থ কী?
আলিমগণ বলেন, সালাম অর্থ হলো, মূর্খ লোকদের প্রতিউত্তরে তারা এমন কথা বলেন, যাতে কোনো দোষ নেই, কোনো ভুল নেই; নেই কোনো কঠোরতা ও মূর্খতাপ্রসূত উচ্চারণ, অতিকথন ও অপমান-লাঞ্ছনা। বরং তাদের কথা হয় নম্র, কোমল, সঠিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ।
শুধু 'সালাম' বা শান্তি শব্দটি দুর্ব্যবহারকারীর কোনো কাজে আসে না বরং পুণ্যবান ব্যক্তিদের দায়িত্ব হলো, তারা তাকে উপদেশ দেবে। আল্লাহ তাআলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন—
... وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ...
আপনি যদি কর্কশ ও কঠোর প্রকৃতির হতেন, তবে অবশ্যই তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে যেত।[২]
সে কথায় কোনো কঠোরতা নেই, কোনো অজ্ঞতাপ্রসূত উচ্চারণ নেই; নেই কোনো সীমালঙ্ঘন, মিথ্যাচার, লুকোছাপা, ধোঁকা ও প্রতারণা-এমন কথাই সালামের অন্তর্গত।
'যখন মূর্খরা তাদেরকে (অভদ্রভাবে) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে-সালাম; শান্তি'-এর অর্থ এটা নয় যে, মূর্খদের অভদ্র সম্বোধনে আপনি বলবেন 'সালাম' বরং আলিমগণ বলেন, 'তাদের উত্তরে আপনি যে কথা বলবেন-তা ভুলত্রুটি, কঠোরতা, বাড়াবাড়ি, সীমালঙ্ঘন ও অপমান থেকে মুক্ত হবে।'
'আস-সালাম' এই মহান নামের আলোকে মুমিনের কর্তব্য কী?
একজন প্রকৃত মুমিন প্রকাশ্য ও গোপন শরিয়তের সব ধরনের বিরুদ্ধাচরণ থেকে মুক্ত থাকবে; মুক্ত থাকবে গোপন ও প্রকাশ্য সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَهُ ...
তোমরা গোপন ও প্রকাশ্য গুনাহ ত্যাগ করো। [১]
মুমিন বান্দা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে, দোষত্রুটি থেকেও মুক্ত হবে। তাই 'আস-সালাম' নামের সাথে আমাদের সম্পর্কও যেন এমনই হয়। আমাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-
يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ *
যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো উপকারে আসবে না। তবে ওই ব্যক্তির কথা আলাদা-যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে। [২]
'কালব সালিম' (قُلْب سلیم) বা বিশুদ্ধ হৃদয় হলো সেই অন্তর-যা সংশয় ও শিরক থেকে নিরাপদ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا ...
তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনার পর তাতে সন্দেহ পোষণ করে না [১]
সুতরাং সেই ব্যক্তিই নিরাপদ-যার হৃদয় সংশয়, শিরক, নিফাক (কপটতা), বিরোধ, রিয়া (লোকদেখানো), তোষামোদ থেকে মুক্ত। যার হৃদয় প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে মুক্ত। যার বিবেক সন্দেহ-সংশয় থেকে মুক্ত। যিনি সংশয়, শিরক, নিফাক, রিয়া ও তোষামোদকে ছুড়ে ফেলতে পারে পদতলে। 'আস-সালাম' নামের দাবি অনুযায়ী এসবই মুমিনের কর্তব্য।
পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা তাঁর এই মহান নামের দাবিতে যা করবেন, আমাদের আলোচনায় সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আপনি যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেন, বিশ্বজগতের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এই সম্পর্কে জানতে পারেন, জ্ঞান অর্জনের মজলিসে বসেন, প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন; যদি দৃষ্টিকে হারাম থেকে অবনত রাখতে পারেন, শ্রবণকে বিরত রাখতে পারেন গান শোনা থেকে; যদি পরনারীর সাথে মেলামেশা না করেন, শরিয়তের কোনো বিধান অমান্য না করেন-তাহলে আল্লাহর কাছে আপনার কী প্রতিদান থাকবে, জানেন?
আলিমগণ এই বিষয়ে বলেন, 'যে বান্দা আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করে; আল্লাহমুখী হয়, আল্লাহর ওপর হক হলো-তিনি তাকে রক্ষা করবেন, নিরাপদ রাখবেন। দুনিয়াতে তাকে কষ্টদায়ক বিষয় থেকে রক্ষা করবেন এবং কল্যাণকর বিষয় উপহার দেবেন।
আপনি যখন মুমিন হবেন, তখন অনেক বড় বড় বিপদাপদ থাকবে। মুমিন যেমন স্পর্শকাতর, তেমন আমাদের মহান রবও পরম দয়ালু চিকিৎসক। তিনি একান্তে আপনাকে সতর্ক করবেন। তিনি আপনার থেকে যন্ত্রণাদায়ক ও অপমানজনক শাস্তি রোধ করবেন। আপনার দরিদ্রতা দূর করবেন-যা অনেক সময় কুফর, বিরোধ, দাম্পত্য-অনাস্থা, এমনকি হত্যাকাণ্ডেও পরিণত হয়। এজন্য মুমিন যখন আল্লাহর আদেশের ওপর অবিচল থাকবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে কষ্টদায়ক বিষয় থেকে রক্ষা করবেন এবং অফুরান নিয়ামত দান করবেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'পুরো দুনিয়াই উপভোগের উপকরণ। তবে সবচেয়ে উত্তম উপকরণ হলো পুণ্যবতী স্ত্রী।' [১]।
মুমিনকে আল্লাহ তাআলা নিষ্কলুষ সুখ্যাতি দান করেন, দান করেন উন্নত চরিত্র, প্রশংসিত ও সর্বজনপ্রিয় জীবন। এসবই আল্লাহর আদেশের ওপর অবিচলতার ফলশ্রুতি।
'আস-সালাম' (নিরাপত্তাদাতা) সব থেকে আপনাকে রক্ষা করেন। এগুলো দুনিয়ার নিরাপত্তা। তাহলে দ্বীনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা কী?
দ্বীনের নিরাপত্তা হয় তিনটি ক্ষেত্রে। তা হলো—এক. শরিয়ত। দুই. তরিকত। তিন. হাকিকত। [২]
শরিয়তের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা তার বিবেককে বিদআত ও সন্দেহ-সংশয় থেকে নিরাপদ রাখেন, হৃদয়কে নিরাপদ রাখেন প্রবৃত্তির কুপ্ররোচনা থেকে। তার বিবেকে তখন কোনো বিদআত থাকবে না, বড় কোনো ভুল থাকবে না-থাকবে না ভ্রান্ত ও ভুল আকিদা-বিশ্বাস।
তরিকতের ক্ষেত্রে তার বিবেক প্রবৃত্তি ও ক্রোধের কাছে বন্দি থাকবে না; বরং বিবেক হবে নিয়ন্ত্রক। বিবেকই সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করবে, প্রবৃত্তি হবে বিবেকের অনুগামী। এটি হলো তরিকতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা।
পক্ষান্তরে হাকিকতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা হলো, আপনি শুধু আল্লাহর প্রতিই লক্ষ রাখবেন, অন্য কারও প্রতি নয়।
এজন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—
প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার মুখ ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।
একজন আলিম বলেন, 'কেউ যদি নিজের নফস তথা প্রবৃত্তি থেকে নিরাপদ না থাকে, তাহলে মানুষ কীভাবে তার কাছে নিরাপদে থাকবে!
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর 'আস-সালাম' নামের গুণাবলি অর্জনের তাওফিক দান করুন।
টিকাঃ
[১] সুরা হাশর, আয়াত: ২৩
[২] সুরা ইউনুস, আয়াত: ২৫
[১] সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৯০-৯১
[২] সুরা মারইয়াম, আয়াত: ১৫
[১] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত : ২৬
[১] অন্তঃকর্ণে দুটি অংশ রয়েছে। ইউট্রিকুলাস এবং স্যাকুলাস। ইউট্রিকুলাস আমাদের ভারসাম্য রক্ষায় এবং স্যাকুলাস শ্রবণে সাহায্য করে। ইউট্রিকুলাস তিনটি অর্ধ বৃত্তাকার নালি দিয়ে গঠিত। নালিগুলো পরস্পরের সাথে সমকোণে অবস্থান করে। এই তিনটি নালি তিনটি মাত্রায় অবস্থান করে। ফলে আমরা যখন ত্রিমাত্রিক তলে চলাচল করি তখন তিনটি অর্ধ বৃত্তাকার নালি তিনদিকে কাজ করে এবং আমাদের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। নালিগুলো এন্ডোলিম্ফ নামক তরলে পূর্ণ। নালিগুলোর মাঝে একটি ফোলা অংশ থাকে, যাকে অ্যাম্পুলা বলা হয়।
[১] হৃৎপিন্ডের ডান অ্যাট্রিয়াম প্রাচীরের ওপর দিকে অবস্থিত, বিশেষায়িত কার্ডিয়াক পেশিগুচ্ছ দ্বারা গঠিত, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি ছোট অংশ রয়েছে, যা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহ ছড়িয়ে দিয়ে হৃৎস্পন্দন সৃষ্টি করে এবং স্পন্দনের ছন্দময়তা বজায় রাখে। একে পেসমেকার বলে।
[১] যেসব রক্তবাহী নালি হৃৎপিণ্ড থেকে উৎপন্ন হয়ে দেহের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহ করে সেগুলোকে ধমনী বলে।
[২] যেসব রক্তবাহী নালির মাধ্যমে রক্ত দেহের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে হৃৎপিন্ডে ফিরে আসে সেগুলোকে শিরা বলে।
[৩] ধমনি ক্রমান্বয়ে শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে শেষে কিছু সুক্ষ্ম নালি তৈরি করে, যেগুলো মূলত ধমনির অংশবিশেষ। সেই সুক্ষ্ম নালিগুলোকে কৌশিক নালি বা কৌশিক জালিকা বলা হয়।
[১] সুরা কাহফ, আয়াত: ১৮
[১] সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৩
[২] মানবদেহে যখন লোহিত কণিকার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন কিডনি থেকে একধরনের বিশেষ হরমোন নিঃসরিত হয়। সেই হরমোনের উপস্থিতি টের পেয়ে অস্থিমজ্জার ভেতরে লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন হতে শুরু করে।
[১] সুরা তারিক, আয়াত: ১১-১২
[১] সুরা মুলক, আয়াত: ৩
[২] সুরা ত-হা, আয়াত: ৪৯-৫০
[১] সুরা নামল, আয়াত: ৫৯
[২] সুরা রাদ, আয়াত: ২৮
[১] নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করে, তখন সে যেন বলে- بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا বিস্মিল্লা-হি ওয়ালাজনা- ওয়া বিস্মিল্লা-হি খরজনা- ওয়া 'আলাল্ল-হি রব্বিনা- তাওয়াক্কাল্লা-। অর্থ : আল্লাহর নামে প্রবেশ করি এবং আল্লাহর নামেই বের হই। আর আমরা কেবল আমাদের প্রতিপালক আল্লাহরই ওপর ভরসা করি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'এরপর সে যেন তার পরিবারের লোকদের সালাম দেয়।' [সুনানু আবি দাউদ: ৫০৯৬; তুহফাতুল আখইয়ার, পৃষ্ঠা: ২৮-ইবনু বায রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।]
[২] জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, তখন শয়তান (হতাশ হয়ে) তার সঙ্গীদের বলে, 'এখানে তোমাদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা নেই, খাবারও নেই।' আর যখন সে আল্লাহর নাম না নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে, তখন শয়তান বলে, তোমরা রাতযাপনের জায়গা পেয়ে গেলে। আর খাবার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ না করলে শয়তান বলে, তোমরা রাতযাপনের জায়গাও পেলে, রাতের খাবারও পেয়ে গেলে। [সহিহ মুসলিম: ২০১৮; সুনানুন নাসায়ি: ৯৯৩৫; আল-আদাবুল মুফরাদ: ১০৯৬]
[১] সুরা মায়িদা, আয়াত: ১২
[১] সুরা ইসরা, আয়াত: ৯
[২] সুরা হাশর, আয়াত: ২৩
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ১২৩
[১] সুরা ইউনুস, আয়াত: ২৫
[২] সুরা ইউনুস, আয়াত: ২৫-২৬
[১] সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৯০-৯১
[২] সূরা মারইয়াম, আয়াত : ১৫
[১] সুরা হাক্কাহ, আয়াত: ১৯
[২] সুনানু আবি দাউদ: ৪৭৫৫; মুস্তাদরাকুল হাকিম: ৮৭২২; মিশকাতুল মাসাবিহ: ৫৫৬০; আলবানি রাহিমাহুল্লাহর মতে, এর সনদ দুর্বল।
[১] সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩
[২] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৫৯
[১] সুরা আনআম, আয়াত: ১২০
[২] সুরা শুআরা, আয়াত: ৮৮-৮৯
[১] সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৫
[১] সহিহ মুসলিম: ১৪৬৭
[২] শরিয়ত হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক আনীত ইসলামের যাবতীয় বিধিবিধান ও আদেশ-নিষেধ।
তরিকত হচ্ছে, আত্মশুদ্ধি অর্জন ও গুনাহমুক্ত জীবন গঠনের মাধ্যমে ইসলামি শরিয়তকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের পথ ও পন্থা।
হাকিকত হচ্ছে, তরিকত অর্জনের মাধ্যমে অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর অস্তিতকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা।
উল্লেখ্য, এই ৩টি বিষয় একটি অপরটির বিপরীত নয়; বরং এগুলোর একটি অপরটির ওপর নির্ভরশীল। কাজেই একটি ছাড়া অপরটি অর্জিত হয় না। [৫]
[১] সহিহুল বুখারি : ১০; সহিহ মুসলিম : ৪১; জামিউত তিরমিযি: ২৬২৭; সুনানু আবি দাউদ: ২৪৮১
📄 আল-মুহাইমিন : الْمُهَيْمِنُ
এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব আল্লাহ তাআলার মহান নাম 'আল-মুহাইমিন' (الْمُهَيْمِنُ) নিয়ে। আবারও বলে রাখছি, আল্লাহর সুন্দর নামগুলোর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমরা ৩টি দিক আলোচনা করছি। তা হলো-
> নামের পরিচয়-সংক্রান্ত আলোচনা।
> নামের তাত্ত্বিক প্রয়োগ।
> মুমিন বান্দার সাথে এই নামের সম্পর্ক।
'আল-মুহাইমিন' নামের একটি অর্থ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণকারী। তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছুই জানেন। জানেন চোখের চোরা চাহনি; হৃদয়ের গোপন কথা। তিনি বস্তুর বাহ্যিক দিকটি যেমন দেখেন; তেমনই দেখেন এর আড়ালের সবকিছু; দেখেন দৃশ্য ও অদৃশ্যের সকল দিক, যাবতীয় বিষয়।
'আল-মুহাইমিন' নামের জন্য যে গুণ আবশ্যক; তা হলো, বস্তুর ভালোমন্দ নির্ণয়ের পরিপূর্ণ জ্ঞান ও সক্ষমতা। কারণ কিছু মানুষ এমন আছে, যারা জানে কিন্তু সক্ষমতা রাখে না। আবার কিছু মানুষের সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু তারা জানে না।
'আল-মুহাইমিন' নামের আরেকটি অবধারিত গুণ হলো, নিরবচ্ছিন্নতা ও ধারাবাহিকতা। এমন অনেক মানুষই রয়েছে, যারা সক্ষমতা ও শক্তির চূড়ান্ত পর্যায় উপনীত, কিন্তু তারা জ্ঞানের অধিকারী নন। আবার এমন মানুষও থাকে, যাদের সক্ষমতা ও জ্ঞান দুটোই রয়েছে। যদিও এই শ্রেণির মানুষ অত্যন্ত বিরল। তবে মানুষ যতই জানুক, সক্ষম হোক, ভবিষ্যতের ব্যাপারে নিশ্চয়তা সে দিতে পারে না। এমন হতে পারে যে, কোনো বিষয় আপনার আওতাধীন, কিন্তু আপনি জানেন না-ভবিষ্যতে এর পরিণতি কী হবে।
আমরা যদি বলি, 'আল-মুহাইমিন' আল্লাহর নাম। তাহলে এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ জানেন; যে জানার কোনো শেষ নেই। কারণ কোনো কিছুই তাঁর অগোচরে থাকে না। অসুস্থ নারী যদি কোনো দৈহিক অসুস্থতা নিয়ে পুরুষ ডাক্তারের কাছে যায় এবং ডাক্তার পরীক্ষা করতে গিয়ে তার প্রতি কুনজর দেয়, তবে তা হবে সুস্পষ্ট খিয়ানত। কিন্তু পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া কেউ এই খিয়ানতের কথা জানতে পারবে না।
তিনি চোখের কুনজর সম্পর্কে জানেন; জানেন সকল গোপনতম বিষয়। তিনি জানেন, কী ছিল, কী হবে; অতিসত্বর কী হতে যাচ্ছে। জানেন, যা হয়নি; তা হলে কেমন হতো।
আপনার থেকে যা গোপন রয়েছে, তা তিনি জানেন। আপনি যা প্রকাশ করেন, তা-ও তিনি জানেন। যা গোপন করেন, তা-ও জানেন। তিনি জানেন, ভূমিতে প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা বের হয়; আকাশ থেকে যা নেমে আসে এবং যা আকাশে উঠে যায়। আপনার জল্পনা-কল্পনায়, আগ্রহ-ইচ্ছায়, ওঠাবসায়, গোপনে ও প্রকাশ্যে; সর্বক্ষেত্রে তিনি আপনার সাথে রয়েছেন। আপনার সবকিছুই তিনি জানেন।
পক্ষান্তরে সবকিছুর পূর্বে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি না জানলে মানুষের পক্ষে কোনো কিছুর তত্ত্বাবধায়ন করা সম্ভব নয়। আপনি যদি বাস্তবতা না-ই জানেন, তাহলে কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন? কিন্তু যিনি 'আল-মুহাইমিন', তিনি তত্ত্বাবধানের পূর্বেই অবধারিতভাবে সবকিছু জানেন।
'আল-মুহাইমিন' সর্বজ্ঞ; সবকিছুর ওপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান। কোনো কিছু তাঁকে অক্ষম করতে পারে না। তার ক্ষমতার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। সকল বিষয় তার ক্ষমতার অধীন। আমরা হয়তো অনেক বিষয়ে জ্ঞান রাখি, কিন্তু আমরা জানি না, ভবিষ্যতে কী হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَعِبْرَةً لِأُولى الأَبْصَار
আল্লাহ রাত ও দিনের আবর্তন ঘটান। নিশ্চয় এতে অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন লোকদের জন্য রয়েছে শিক্ষা।[১]
তিনি আরও বলেন-
إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاءَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ ﴾
যদি তোমাদের কোনো আঘাত লাগে, (তাহলে মনে করবে) এরকম আঘাত তো অন্যদেরও লেগেছে। আমি মানুষের মাঝে এই দিনগুলোর পালাবদল করি, যাতে আল্লাহ মুমিনদের যাচাই করতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহিদদের গ্রহণ করতে পারেন। আর আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না। [২]
'আল-মুহাইমিন' এর আবশ্যকীয় গুণাবলি সাধারণভাবে বোঝার জন্য আমি কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সফরে বের হতেন, তখন বলতেন-
اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ عَلَى الْأَهْلِ
হে আল্লাহ, সফরে আপনিই সঙ্গী। (আমার অনুপস্থিতিতে) আমার পরিবারের জিম্মাদার আপনিই! [৩]
আপনি কি বিশ্বাস করেন, কোনো মানুষের মধ্যে এমন গুণ থাকা সম্ভব? কোনো মানুষ কি একই সময়ে আপনার সাথে সফরে এবং আপনার বাড়িতে, পরিবার-পরিজনের মধ্যে রক্ষাকারীরূপে থাকতে পারবে?
অসম্ভব! হয়তো তিনি আপনার সাথে থাকবেন; নাহয় থাকবেন আপনার বাড়িতে।
আলিমগণ বলেন, 'এই দুটি গুণ কেবল আল্লাহ তাআলার মাঝেই একসাথে পাওয়া যায়। সুরক্ষা, তত্ত্বাবধান, তাওফিক, সঠিক পথপ্রদর্শন, সাহায্য ও সহায়তার মাধ্যমে তিনি আপনার সাথে থাকেন। আবার একই সময়ে আপনার অনুপস্থিতিতে তিনি বাড়িতে আপনার পরিবারের সাথেও থাকেন; তাদেরকে সব ধরনের অনিষ্ট ও বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন।
মানুষের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও সক্ষমতা একত্রিত হওয়ার ঘটনা অতি বিরল। তাই মানবসমাজে অনেকে জ্ঞানে সবার ওপরে অবস্থান করে, কিন্তু তাদের ক্ষমতা থাকে স্বল্প। আবার অনেকে ক্ষমতায় অনেক ওপরে অবস্থান করে, কিন্তু তাদের জ্ঞান থাকে সীমিত।
যদি আমরা ধরে নিই, ৫০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে একজন মানুষের মাঝেও পূর্ণ জ্ঞানের সাথে পূর্ণ ক্ষমতার মতো অতি বিরল বিষয়টি পাওয়া যাচ্ছে, তবু তার ক্ষেত্রে ত্রুটি হয়ে দাঁড়াবে ভবিষ্যত-দর্শনের অক্ষমতা। হতে পারে, ভবিষ্যতে তার চেয়ে ক্ষমতাবান কেউ এসে তার ক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে। তার চেয়ে মেধাবী কেউ এসে তার স্থান দখল করবে। সুতরাং কালেভদ্রে জ্ঞান ও সক্ষমতা একত্রিত হলেও ভবিষ্যতের জ্ঞান আপনি কখনো লাভ করতে পারবেন না।
কিন্তু যখন আপনি বলবেন, আল্লাহ তাআলা 'আল-মুহাইমিন', তখন এর অর্থ হবে-তিনি পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। যেমনটি কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
...وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
আর আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক অবগত।[১]
তাঁর জ্ঞানের কোনো শুরু-শেষ নেই; নেই তাঁর সক্ষমতার সীমা-পরিসীমা। বিশ্বজগতে অন্য কোনো দিক নেই-যা তাঁর কর্তৃত্বে অংশীদার হতে পারে। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلِ اللهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا لَهُ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ أَبْصِرْ بِهِ وَأَسْمِعْ مَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَلِي وَلَا يُشْرِكْ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا
আপনি বলুন, তারা কত বছর অবস্থান করেছিল, তা আল্লাহই ভালো জানেন। আসমান ও জমিনের অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে। তিনি কত সুন্দর দেখেন ও শোনেন। তিনি ছাড়া তাদের অন্য কোনো অভিভাবক নেই। তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরিক করেন না। [১]
বিশ্বজগতে যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য থাকত, তাহলে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যেত। প্রত্যেক উপাস্য নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং একজন আরেকজনের ওপর স্থান করে নিত। কিন্তু 'আল-মুহাইমিন' এক ও অদ্বিতীয়। তাই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, বিরোধী কিংবা প্রতিপক্ষ কোনো শক্তি নেই।
এজন্য আপনি 'আল-মুহাইমিনের' ওপর আস্থা রাখবেন- যিনি সবকিছু জানেন, সবকিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। তাঁর মতো কিছুই নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মানুষ কখনো মালিক হলেও তার মালিকানাধীন সম্পদ দিয়ে সবসময় উপকৃত হতে পারে না। মালিকানা থাকার পরও সেই সম্পদে হস্তক্ষেপের অধিকার তার থাকে না। কখনো মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ির মালিক হয়; কিন্তু সেই বাড়ি ৭০ বছরের জন্য ভাড়া দেওয়া থাকে। ফলে মালিকানা থাকা সত্ত্বেও সেটা সে ব্যবহার করতে পারে না।
পক্ষান্তরে আল্লাহর মালিকানা তাঁর সত্তার মতোই চিরন্তর ও অবিনশ্বর। এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আসমান ও জমিনের মালিকানা আল্লাহরই। আর আল্লাহ সবকিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। [২]
সমগ্র বিশ্বজগৎ-হোক কর্তৃত্বে কিংবা অধিকারে-সর্ববিবেচনায় একমাত্র আল্লাহরই মালিকানাধীন।
প্রিয় পাঠক, আল্লাহর প্রতি আপনার ঈমানের অত্যন্ত মৌলিক একটি বিষয় হলো, আপনি আল্লাহর সুন্দর নামগুলো ও উত্তম গুণাবলি সম্পর্কে জানবেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا ، مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ
আল্লাহ তাআলার ৯৯টি নাম রয়েছে। যে সেগুলো মুখস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে [১]
আল্লাহর রাসুলের এই হাদিসটি সহিহ ও মুতাওয়াতির।[২] তবে এখানে أَحْصَاهَا (মুখস্থ করবে) শব্দটির অর্থ আমাদের বুঝতে হবে। এর অর্থ শুধু এই নয় যে, গুনে গুনে শুধু ৯৯টি নাম মুখস্থ করতে হবে। বরং উদ্দেশ্য হলো, এই নামগুলো উপলব্ধি করে সেই অনুযায়ী আমল করতে হবে।
পূর্বের অধ্যায়গুলো লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, প্রতিটি নামের ক্ষেত্রে মুমিন হিসেবে আপনার কিছু করণীয় কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদি আপনি সেই অনুযায়ী আমল না করেন, তবে হাদিসে উল্লিখিত 'মুখস্থ' শব্দের দাবি আদায় হবে না। মনে হবে যেন আপনি সেই নামগুলো শিখেনইনি। এর কারণও রয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু সাল্লাম আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও।' [৩]
আমরা বুঝলাম, 'আল-মুহাইমিন' মানে এমন সত্তা-যাঁর জ্ঞানের কোনো শেষ নেই, যাঁর ক্ষমতা পূর্ণ ও অবিনশ্বর। তবে এছাড়া আরও ৪টি শাখাগত অর্থ রয়েছে। অর্থের বিবেচনায় যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো-
[প্রথম অর্থ] যদি আল্লাহ তাআলাই একমাত্র 'আল-মুহাইমিন' (সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণকারী) হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর পর্যবেক্ষণে ভালোবাসা ও স্নেহ থাকা অবধারিত। যেমন: অনেক সময় মা অসুস্থ সন্তানের শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকে। সন্তানের প্রতিটি নড়াচড়া গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। মায়ের এই স্নেহপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হয় সজ্ঞানে ও সক্ষমতার আওতায়। কিন্তু এই পর্যবেক্ষণের মূল প্রেরণা স্নেহ, মায়া ও ভালোবাসা।
এরকমভাবে আমরা যদি বলি, অমুক ব্যক্তি 'মুহাইমিন' অর্থাৎ কাউকে পর্যবেক্ষণে রাখছে, তাহলে হতে পারে—সে হিংসার বশবর্তী হয়ে, অহংকার ও ঔদ্ধত্যের বশে, ক্ষমতার বলে কিংবা উপকৃত হওয়ার আশায় পর্যবেক্ষণ করছে। এই পর্যবেক্ষণ হতে পারে স্বেচ্ছাচার ও ক্ষমতার দাপট।
এজন্য মানুষের ব্যাপারে যদি 'মুহাইমিন' শব্দ প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেটার ভিন্ন অর্থ হতে পারে। কিন্তু যখন আমরা আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে বলব, তিনি 'মুহাইমিন', তখন তাঁর পর্যবেক্ষণের অর্থ হবে বান্দার প্রতি দয়া ও ভালোবাসা।
উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কিছু সংখ্যক বন্দি এল। তিনি দেখলেন, বন্দিদের মাঝে এক নারী আছে। সে স্তন্যদান করত। বন্দিদের মাঝে কোনো শিশু পেলে সে তাকে কোলে তুলে নিয়ে দুধ খাওয়াত। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বললেন, 'তোমরা কি মনে করো, এই নারীটি তার সন্তানকে আগুনে ফেলে দিতে পারে?' আমরা বললাম, 'ফেলার ক্ষমতা থাকলেও সে কখনো ফেলবে না।' তখন তিনি বললেন, 'এই নারীটি তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়াবান, আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর এর চেয়ে বেশি দয়াবান। [১]
সুতরাং আল্লাহ তাআলার পর্যবেক্ষণ, দয়া, মায়া, ভালোবাসা; বান্দার ভবিষ্যত, আখিরাত ও কল্যাণ কামনার পর্যবেক্ষণ। এ হিসেবে 'মুহাইমিনের' প্রথম শাখাগত অর্থ-স্নেহ ও ভালোবাসা।
[দ্বিতীয় অর্থ] 'মুহাইমিনের' দ্বিতীয় অর্থ হলো, আমানত রক্ষাকারী। কারও কোনো আমানত রক্ষা করা অনেক বড় বিষয়, মহান কাজ। কারণ এই রক্ষার কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে করতে হয়। এজন্য 'মুহাইমিনের' একটি অর্থ রক্ষাকারী। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
قَالَ هَلْ آمَنُكُمْ عَلَيْهِ إِلَّا كَمَا أَمِنْتُكُمْ عَلَى أَخِيهِ مِنْ قَبْلُ فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمْ الرَّاحِمِينَ )
সে বলল, 'আমি কি তার ব্যাপারে তোমাদেরকে তেমনই বিশ্বাস করব, যেমন বিশ্বাস করেছিলাম তার ভাইয়ের ব্যাপারে? আল্লাহই উত্তম রক্ষাকারী এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু [১]
[তৃতীয় অর্থ] 'মুহাইমিন' এর তৃতীয় অর্থ হলো, আপনি যখন আল্লাহর পথে থেকে তাঁর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে কারও সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হবেন, তখন আপনিই বিজয়ী হবেন। সমস্ত ঘটনা তখন আপনাকে সত্যায়ন করবে। সব মানুষই কোনো তত্ত্ব, মত, চিন্তা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কিংবা বিশ্বাসের কথা উত্থাপন করে। কিন্তু যাপিত জীবনের ঘটনাপ্রবাহ সেই আকিদা-বিশ্বাসকেই প্রমাণিত করে, যা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।
তাই আপনি যদি কুরআনের সাথে থাকেন, তাহলে আল্লাহ তাআলার রক্ষণাবেক্ষণে থাকবেন, আপনি হবেন বিজয়ী। যেমন: কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ
আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন আর দানকে বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ কোনো অবিশ্বাসী কাফিরকে পছন্দ করেন না [২]
'আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন'-এটি একটি আয়াত। আপনি এই আয়াতে বিশ্বাস করেন। কিন্তু সুদের কারবারি আপনাকে বলে ভিন্ন কথা। ব্যাংকে টাকা না রেখে ঘরে জমিয়ে রাখা কি যৌক্তিক? ব্যাংকে রাখলে তো লাভ হবে। সেই লাভ দিয়ে জীবিকা নির্বাহও করা যাবে! মুমিন হিসেবে আপনি বলবেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন’। কিন্তু অবিশ্বাসী ব্যক্তি ভিন্ন মত উত্থাপন করবে। সে বলবে, 'অবশ্যই সম্পদ থেকে সুদ গ্রহণ করা উচিত।' তারপর সময়ের আবর্তনে, ঘটনার পরিক্রমায় সেই সুদের কারবারি তার সম্পদ খুইয়ে বসলে কে বিজয়ী হয়? আপনি!
আপনিই বিশ্বাস করেছিলেন, সুদ থেকে আসা সম্পদ কোনো না কোনোভাবে ধ্বংস হবে। সময়ের আবর্তন আপনার এই বিশ্বাসকে প্রমাণিত করেছে, আপনিই বিজয়ী হয়েছেন!
আপনি বিশ্বাস করেন, মানুষ হারাম থেকে দৃষ্টিকে অবনত রাখলে আল্লাহ তার হৃদয়ে ঈমানের মিষ্টতা দান করেন। অথচ আরেকজন তার দাম্পত্যজীবনে ভিন্ন পথে চলে। সে আপনাকে চোখের গুনাহ করতে প্রলুব্ধ করে। আপনি তাকে শোনালেন দৃষ্টি অবনত রাখার আল্লাহপ্রদত্ত আদেশ। কুরআনের আয়াতে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তারপর হয়তো সময়ের চাকা ঘুরতে থাকে, সে হতভাগার দিন কাটতে থাকে পথে পথে দুচোখ ভরে হারাম দৃশ্য দেখে। তারপর হঠাৎ চোখের পাতা ঝুলে পড়া রোগে আক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রে আপনিই ঠিক। যাপিত জীবনের ঘটনা আপনার বিশ্বাসকেই প্রমাণিত করে যে, এ আদেশ আল্লাহপ্রদত্ত আদেশ।
[চতুর্থ অর্থ] আপনি যখন কোনো মেয়েকে বিয়ের জন্য পছন্দ করেন, তখন আপনার পছন্দের কারণ হয়—তার দ্বীনদারিতা, চরিত্রের পবিত্রতা, আত্মমর্যাদা, পূণ্যময়তা ও পরিবারের দ্বীনদারিতা। দ্বীনদারিতাকে আপনি সৌন্দর্য, সম্পদ, বংশগৌরব ও পার্থিব মর্যাদার ওপর প্রাধান্য দেন। দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়ার এই মহৎ পদক্ষেপকে আপনি আল্লাহর আনুগত্য মনে করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرَاهُ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ وَلَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে কোরো না—যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। ঈমানদার কৃতদাসীও মুশরিক নারীর চেয়ে উত্তম; যদিও মুশরিক নারী তোমাদের মোহিত করে। আর মুশরিকদের কাছে তোমরা (মেয়েদের) বিয়ে দিয়ো না-যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। ঈমানদার কৃতদাসও মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম; যদিও সে তোমাদের মোহিত করে। তারা (মুশরিকরা) ডাকে জাহান্নামের দিকে আর আল্লাহ আপন অনুগ্রহে আহ্বান করেন জান্নাত ও ক্ষমার দিকে। তিনি তাঁর বিধানাবলি মানুষের জন্য বিশদরূপে বর্ণনা করেন-যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে [১]
অপরদিকে আরেক ব্যক্তি চলে প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে। তার মতে, স্ত্রী হতে হবে চোখধাঁধানো সুন্দরী; একেবারে মনের মতো। দ্বীনদারিতার কমবেশিতে কিছু যায়-আসে না।
তারপর দিন গড়াতে থাকে। আপনি দ্বীনদারিতা দেখে যে পূণ্যময়ীকে নির্বাচন করেছিলেন; দেখা যায়, তাকে নিয়ে আপনার দাম্পত্যজীবন সুখী, মায়া-ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। দিন দিন সে সুখ বৃদ্ধিই পাচ্ছে। আল্লাহ তাআলাও এই দাম্পত্যে বারাকাহ দিচ্ছেন। সন্তানসন্ততিতে আপনার ঘর মুখরিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে যে দ্বীনদারিতার ওপর সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিয়েছিল, তার জীবন দোজখে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে কে জয়ী হলো? মুমিনই জয়ী হয়েছে। এজন্যই আমাদের রব বলেছেন-
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
সেই আখিরাতের আবাস, যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য-যারা পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। আর সুপরিণতি মুত্তাকিদের জন্য। [২]
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি, আল্লাহ তাআলার পর্যবেক্ষণ, স্নেহ ও ভালোবাসার পর্যবেক্ষণ, সুরক্ষা ও বিশ্বস্ততার পর্যবেক্ষণ।
এবার কিছু ঘটনা ও প্রমাণ পেশ করব-যা এই মহান নামের অর্থকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। আল্লাহ তাআলা যখন মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামকে বললেন-
اِذْهَبَآ اِلٰى فِرْعَوْنَ اِنَّهٗ طَغٰى فَقُوْلَا لَهٗ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهٗ يَتَذَكَّرُ اَوْ يَخْشٰى
তোমরা দুজন ফিরাউনের কাছে যাও, সে তো সীমালঙ্ঘন করেছে। তোমরা তার সাথে নরম ভাষায় কথা বলবে। হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা (আল্লাহকে) ভয় করবে।[১]
আপনি কি জানেন, কে এই ফিরাউন? এই সেই ফিরআউন, যে বনি ইসরাইলের সন্তানদের জবাই করেছিল এবং নারীদের জীবিত রেখে দাসী বানিয়েছিল। এমনকি সে নিজেকে রব বলে দাবি করেছিল। কে তার সামনে কথা বলার সাহস করতে পারে! কে তার উপাস্য হওয়ার মিথ্যা দাবির অসারতা তুলে ধরতে পারে?
মুসা আলাইহিস সালাম ও হারুন আলাইহিস সালামের সেই শক্তিবল ছিল না, যা দিয়ে তারা ফিরাউনের সাথে লড়তে পারতেন। এজন্য তারা আল্লাহর কাছে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা বললেন। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের অভয় বাণী শোনানো হলো। কুরআনুল কারিমে এই ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে-
قَالَا رَبَّنَآ إِنَّنَا نَخَافُ أَنْ يَفْرُطَ عَلَيْنَا أَوْ أَنْ يَطْغَى قَالَ لَا تَخَافَآ إِنَّنِي مَعَكُمَآ أَسْمَعُ وَأَرَى فَأْتِيَاهُ فَقُولَا إِنَّا رَسُولَا رَبِّكَ فَأَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا تُعَذِّبْهُمْ قَدْ جِئْنَاكَ بِآيَةٍ مِنْ رَبِّكَ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى إِنَّا قَدْ أُوحِيَ إِلَيْنَا أَنَّ الْعَذَابَ عَلَىٰ مَنْ كَذَّبَ وَتَوَلَّى
তারা বলল, 'হে আমাদের রব, আমরা তো আশঙ্কা করছি, সে আমাদের শাস্তি দিতে উদ্যত হবে কিংবা সীমালঙ্ঘন করবে।' তিনি বললেন, 'ভয় কোরো না। আমি তোমাদের সাথে আছি, আমি (সব) শুনছি এবং দেখছি। অতএব তোমরা তার কাছে যাও এবং বলো, 'আমরা তোমার রবের দূত। তুমি বনি ইসরাইলকে আমাদের সাথে যেতে দাও এবং তাদেরকে কষ্ট দিয়ো না। আমরা তোমার রবের পক্ষ থেকে নিদর্শন নিয়ে তোমার কাছে এসেছি। আর যে সৎপথ অনুসরণ করে, তার প্রতি বর্ষিত হয় শান্তি ও নিরাপত্তা। আমাদের প্রতি এ মর্মে ওহি অবতীর্ণ হয়েছে যে, শাস্তি তো তার জন্য, যে লোক (সত্য দ্বীনকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়। [১]
আল্লাহ তাআলার এই অভয় বাণী, 'আমি তোমাদের সাথেই রয়েছি; সব শুনছি এবং দেখছি।' এটাই মুসা আলাইহিস সালাম ও হারুন আলাইহিস সালামের সাহস ও মনোবল বাড়িয়ে দিল। তখন তারা নির্ভয়ে ফিরাউনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
আপনি যখন বিশ্বাস করবেন, আল্লাহ তাআলাই 'আল-মুহাইমিন'; রক্ষাকারী ও রক্ষণাবেক্ষণকারী, যখন বিশ্বাস করবেন-সবকিছুর জ্ঞান ও ক্ষমতা আল্লাহর রয়েছে, সমস্ত সৃষ্টি তাঁর অধীনে; তিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন, তখন আপনার হৃদয় প্রশান্ত হবে, মন হবে শান্ত। আপনার প্রাণ ও দেহ শান্তি লাভ করবে।
একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম খাইবারের ইহুদিদের কাছে অবস্থান করছিলেন। ইহুদিরা সেদিন পাথর ফেলে আল্লাহর রাসুলকে হত্যা করার চক্রান্ত করেছিল। তখন কে তাকে সেই জায়গা থেকে সরে পড়তে বলেছিলেন? আল্লাহ! তারা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাআলা নবিজিকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। এখানে 'মুহাইমিন' অর্থ-তাদের কথা তিনি জানতেন।
বদর যুদ্ধের পর উমাইর ইবনু ওয়াহব সাফওয়ান ইবনু উমাইয়ার সাথে বসে কথা বলছিল। উমাইর বলল, 'আমার মন চায়, আমি যদি মদিনায় গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করে তোমাদের মনে শান্তি দিতে পারতাম। যদি আমার ঋণ না থাকত এবং আমার সন্তানসন্ততির ওপর দারিদ্রের আশঙ্কা না করতাম, তাহলে তা-ই করতাম।' তার কথা শুনে সাফওয়ান বলল, 'তোমার ঋণের বোঝা যত বড়ই হোক, তা পরিশোধের দায়িত্ব আমার। আর তোমার সন্তান এখন থেকে আমার সন্তান। তুমি তোমার ইচ্ছা পূরণ করো।' তখন উমাইর তার তরবারিতে বিষ মাখিয়ে কাঁধে ঝোলাল। তারপর উট ছোটাল মদিনার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে তার সাথে উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর দেখা হলো। তিনি 'আল্লাহর শত্রু উমাইর' বলে হাঁক ছেড়ে তাকে তরবারির ফিতা দিয়ে বেঁধে ফেললেন। তারপর তাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে উপস্থিত করে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, এই যে আল্লাহর শত্রু উমাইর! সে মন্দ উদ্দেশ্যে এসেছে।'
নবিজি বললেন, 'উমার, তাকে ছেড়ে দাও।' উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ছেড়ে দিলেন। নবিজি উমাইরকে বললেন, 'উমাইর, আমার কাছে এসো।' উমাইর তার কাছে গেল। তিনি বললেন, 'আমাদের সালাম দাও।' উমাইর বলল, 'শুভ সকাল মুহাম্মাদ!' নবিজি বললেন, 'তুমি বলো, আসসালামু আলাইকুম!' উমাইর বলল, 'এটিই আমাদের সালাম।' নবিজি বললেন, 'আমাদের কাছে কেন এসেছ?' সে উত্তর দিল, 'আমার ভাইকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে এসেছি।' নবিজি বললেন, 'তোমার কাঁধে যে তরবারি?' সে বলল, 'এই তরবারি ধ্বংস হোক! বদরের দিন কি সে আমাদের কোনো উপকার করতে পেরেছে?' নবিজি উমাইরকে বললেন, 'তুমি কি সাফওয়ানকে বলোনি, যদি আমার ঋণ না থাকত এবং আমার সন্তানসন্ততির ওপর দারিদ্রের আশঙ্কা না করতাম, তাহলে মদিনায় গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করে তোমাদের শান্তি দিতাম।' নবিজির কথা শুনে উমাইর বিস্মিত হয়ে বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। অর্থাৎ সে ইসলাম গ্রহণ করল।[১]
আল্লাহ তাআলা 'মুহাইমিন'। তাই তিনি অতি গোপন এই পরামর্শের কথা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিয়েছেন।
একবার খাওলা বিনতু সালাবা রাযিয়াল্লাহু আনহা নবিজির কাছে অভিযোগ করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি যখন যুবতী ছিলাম, আত্মীয়স্বজন, অর্থ ও সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলাম, তখন অমুক ব্যক্তি আমাকে বিয়ে করেছিল। তাকে আমি অনেক সন্তান উপহার দিয়েছি। তারপর যখন আমি বার্ধ্যক্যে উপনীত হলাম এবং সন্তান জন্মদানে অক্ষম হলাম, তখন সে আমার সাথে যিহার করেছে। তার ঔরসে আমার কয়েকটি সন্তান রয়েছে। যদি আমি তাদেরকে তার কাছে রেখে আসি, তাহলে তারা নষ্ট হয়ে যাবে। আবার যদি আমার কাছে নিয়ে আসি, তাহলে ক্ষুধায় কষ্ট পাবে।' তখন নবিজি বললেন, 'আমার মনে হয় এতে তালাক হয়েছে।[২]
তোমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে।'
এই সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَسْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
(হে রাসুল!) আল্লাহ সেই নারীর কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর ব্যাপারে আপনার সাথে বাদানুবাদ করেছে এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা [১]
ইসলামের মহান ব্যক্তিত্ব উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খাওলা বিনতু সালাবা রাযিয়াল্লাহু আনহার পাশ দিয়ে যেতেন, তখন তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বাহন থেকে নেমে পড়তেন এবং মনোযোগ সহকারে তার কথা শুনতেন। একবার কেউ তাকে বলেছিল, 'আপনি আমিরুল মুমিনিন হয়ে এই মহিলার কথা এমন গুরুত্ব দিয়ে শোনেন?' তখন তিনি বলেছিলেন, 'কীভাবে না শুনে থাকি, আল্লাহ তাআলা সাত আসমানের ওপর থেকে তার কথা শুনেছেন!”[২]
এর থেকেও প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা 'মুহাইমিন'। তিনি সবকিছু শোনেন।
মুসা আলাইহিস সালাম ফিরাউনকে বলেছিলেন, 'আমি আল্লাহর রাসুল'। সে বলেছিল, 'আমি তোমাদের বড় রব'।[৩] ফিরাউনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সেসময়ে ফিরাউন ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ, তার সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য, তার সভ্যতা ছিল সবচেয়ে উন্নত সভ্যতা। মুসা আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে সব জাদুকরদের জড়ো করেছিল সে। তাদেরকে বহু উপহার-উপঢৌকনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। জাদুকররা মুসা আলাইহিস সালামের 'জাদু'কে ব্যর্থ করার দাবি করেছিল।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
قَالَ بَلْ أَلْقُوا فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى فَأَوْجَسَ فِي نفسه خِيفَةً مُوسَى قُلْنَا لَا تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا ) صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى
মুসা বলল, 'বরং তোমরাই নিক্ষেপ করো।' তাদের জাদুর প্রভাবে তার মনে হলো, তাদের রশি ও লাঠিগুলো ছুটোছুটি করছে। তখন মুসা তার মনে কিছুটা ভয় অনুভব করল। আমি বললাম, 'ভয় পেয়ো না, তুমিই বিজয়ী হবে। তোমার ডান হাতে যা আছে, তা নিক্ষেপ করো, (দেখবে) তারা যা কিছু তৈরি করেছে, এটা সেগুলোকে গিলে ফেলবে। তারা যা করেছে, তা তো কেবল জাদুকরের কৌশল। আর জাদুকর যেখানেই আসুক (জাদুবিদ্যায় যতই পারদর্শী হোক), সফল হবে না।[১]
ফিরাউনের বিরুদ্ধে জাদুকরদের সাথে মোকাবেলায় কে বিজয়ী হয়েছিল? মুসা আলাইহিস সালাম। আল্লাহ তাআলাই তাকে বিজয়ী করেছিলেন। তিনিই রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলাই সবকিছুর রক্ষাকারী; 'মুহাইমিন'।
এভাবে কুরআনুল কারিমের অনেক ঘটনার দ্বারাই প্রমাণিত হয় আল্লাহর 'মুহাইমিন' নাম; সবগুলো ঘটনা ও আয়াতই তাঁর অসীম জ্ঞান, সর্বময় ও চিরস্থায়ী ক্ষমতা, স্নেহ-ভালোবাসা, সুরক্ষা ও সত্যায়নের পরিচয় তুলে ধরে।
কাফিররা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্য বিশাল অগ্নিকুণ্ডের আয়োজন করেছিল। অনেকদিন যাবত লাকড়ি জোগাড় করেছিল। আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল কয়েক সপ্তাহ। অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানে ফেলার জন্য তাকে চড়িয়েছিল কপিকলে। তখন তারা ছিল ক্ষমতাশালী। তাদের হাতে ছিল সবকিছু। তারা বলছিল, 'আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে?' তারা কি জানে না, আল্লাহই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী'।
যখন তারা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে সেই অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করল, আল্লাহ তাআলা তিনটি শব্দ বললেন-
يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ
হে আগুন, ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।[১]
আগুন শুধু শীতল হলে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম শরীর জমে ঠান্ডায় মৃত্যুবরণ করতেন। সেজন্য আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'শীতল ও নিরাপদ'। তারপর বলেছেন, 'ইবরাহিমের জন্য'। যদি তিনি 'ইবরাহিমের জন্য' না বলতেন, তবে পৃথিবীতে কিয়ামত পর্যন্ত আগুনের জ্বালানোর ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যেত।
কাজেই প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা 'আল-মুহাইমিন'; রক্ষণাবেক্ষণকারী, রক্ষাকারী, সর্বময় জ্ঞানের অধিকারী।
এক্ষেত্রে মুসা আলাইহিস সালামের মায়ের ঘটনা আমরা দেখতে পারি। সন্তানের জন্য তিনি কী ত্যাগই না করেছিলেন! কলিজার টুকরো সন্তানকে বাক্সে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া কি কোনো মায়ের পক্ষে সম্ভব? কিন্তু তিনি আল্লাহর আদেশকে মেনে নিয়ে নির্দ্বিধায় এটা করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা তাকে দুটি আদেশ, দুটি নিষেধ এবং দুটি সুসংবাদ দান করেছিলেন-
وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ أُمِّ مُوسَىٰ أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ
আমি মুসার মায়ের কাছে আদেশ পাঠালাম, 'তাকে বুকের দুধ পান করাও। (তবে) যখন তার জন্য (বিপদের) আশঙ্কা করবে, তখন তাকে নদীতে ফেলে দিয়ো। ভয় পেয়ো না এবং দুঃখও কোরো না। আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে বানাব একজন রাসুল।[২]
'তাকে বুকের দুধ পান করাও' এবং 'তাকে নদীতে ফেলে দিয়ো'- এই দুটি আদেশ।
'ভয় পেয়ো না' এবং 'দুঃখও কোরো না' - এই দুটি নিষেধ।
'আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে একজন রাসুল বানাব।' এই দুটি সুসংবাদ।
তারপর কে সেই বাক্সটিকে ফিরাউনের তীরে ভাসিয়ে নিলেন? যিনি সবকিছু জানেন; সবকিছু পরিচালনা করেন। যখন বাক্স খোলা হলো, তখন কে ফিরাউনের স্ত্রীর হৃদয়ে ভালোবাসা ঢেলে দিলেন? আল্লাহ তাআলা। সুতরাং তিনিই 'মুহাইমিন'।
কুরআনুল কারিমে বর্ণিত প্রতিটি ঘটনাই আল্লাহ তাআলার সুন্দর নামগুলোকে প্রমাণ করে। ইউনুস আলাইহিস সালামের ঘটনা আমরা স্মরণ করতে পারি। দুনিয়াতে যত বিপর্যয়ই আসুক, পৃথিবীর বুকে যত বড় বিপদই হোক, আমি বিশ্বাস করি না যে, রাতের অমানিশায় সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে মাছের পেটের ঘোর আঁধারের চেয়ে বড় কোনো বিপদ থাকতে পারে।
ইউনুস আলাইহিস সালাম ছিলেন তিমি মাছের পেটে। তিমি মাছ যখন মুখ খোলে, তখন একবেলার খাবার হিসেবে প্রায় চার টন মাছ তার মুখে ঢুকে যায়। একটি তিমি মাছের গড় ওজন হয় প্রায় ১৫০ টন! ফলে তার পেটের আকার হয় একটি বড়সড় ঘরের মতো। ইউনুস আলাইহিস সালাম হঠাৎ নিজেকে রাতের আঁধারের মতো সমুদ্রের গভীরে তিমি মাছের পেটের অন্ধকারে আবিষ্কার করেন।
তিমি মাছের পেটে কি কোনো ফ্যাক্স, টেলিফোন কিংবা টেলিগ্রাম থাকে? এসবের কিছুই থাকে না। তিনি অন্ধকারের মাঝে আল্লাহকে ডেকেছিলেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে সেই কাহিনি-
وَذَا النُّونِ إِذ ذَّهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَن لَّن نَّقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَىٰ فِي الظُّلُمَاتِ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنَجِّي الْمُؤْمِنِينَ ﴿
যুন-নুন (ইউনুসের) কথাও স্মরণ করুন, যখন সে (নিজ সম্প্রদায়ের ওপর) ক্ষুব্ধ হয়ে চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল, আমি তার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তারপর সে অন্ধকারের মাঝে (আমাকে) ডাক দিয়ে বলেছিল, 'আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। নিশ্চয় আমি ছিলাম জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।' তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুরাবস্থা থেকে উদ্ধার করলাম। মুমিনদের আমি এভাবেই রক্ষা করি।[১]
এই ঘটনাও কি আপনার হৃদয় প্রশান্ত হয় না-যার শেষ হয়েছে মুমিনদের সুসংবাদ দিয়ে-'মুমিনদের আমি এভাবেই রক্ষা করি!'
যেকোনো যুগে, যেকোনো পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলাই 'মুহাইমিন'; রক্ষাকারী। আপনিও 'মুহাইমিনের' সাথে থাকুন; প্রশান্তির সাথে এগিয়ে চলুন জীবনের গতিপথে।
মায়ের কোলের ছোট্ট শিশুকে দেখুন; স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারে না। খাদ্যের সংস্থান ও শিক্ষার নিরাপত্তার জন্য বাবা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। সন্তান নিশ্চিন্তে বাবার কাছে তার নানা আবদার তুলে ধরে। বাবা তার আবদার পূরণের জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন। মানুষ যখন 'মুহাইমিনের' সাথে থাকে, তখন সে সবকিছু করতে সক্ষম হয়।
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম মুখে কোনো কথা বলেননি। তার ঘটনা যেন আমাদের বলে-
'একনিষ্ঠভাবে শুধু আল্লাহর কাছে চেয়ে যাও। তোমার চাওয়া হতে পারে দুনিয়ার কিংবা আখিরাতের কল্যাণ। কোনো কথা না বলে চুপ থাকার চেষ্টা করে যাও। দেখবে, আল্লাহ তোমার ডাকে সাড়া দিয়েছেন।'
তার মানে তিনি আমাদের না বলা কথাও শোনেন; মনের গোপন ইচ্ছাও জানেন।
إِذْ نَادَىٰ رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا
যখন সে (যাকারিয়া) তার রবকে ডেকেছিল গোপনে, নিভৃতে।খ
তার নিভৃতের ডাক সাত আসমান ভেদ করে পৌঁছে গিয়েছিল রবের সমীপে।
আল্লাহ তাআলা তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। কারণ তিনিই 'মুহাইমিন'।
হুনাইনের যুদ্ধে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লামের সেই সাহাবিরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন, যারা তার সাথে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। হুনাইনের দিন তারা মূলত মুখে কিছু বলেননি।
... وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ ...
আর হুনাইন যুদ্ধের দিনেও, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উল্লসিত করেছিল।[১]
তারা মনে মনে ভেবেছিলেন, আজ আমরা সংখ্যায় কম নই যে, পরাজিত হব। সাহাবিদের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার, সাথে ছিলেন স্বয়ং নবিজি। যুদ্ধটি হয়েছিল মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পরেই। অবস্থানগত দিক থেকে তারা সুবিধাজনক স্থানে ছিলেন। তারপরও-
فَلَمْ تُغْنِ عَنكُمْ شَيًْا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُم مُّدْبِرِينَ..
কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজেই আসেনি এবং জমিন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের কাছে সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল। তারপর তোমরা পিছু হটেছিলে।[২]
আল্লাহ তাআলাই 'আল-মুহাইমিন'; পর্যবেক্ষণকারী, রক্ষাকারী, সর্বজ্ঞানী। তিনি তাদের আত্মমুগ্ধতার কথা জানতেন। তাই তাদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের হৃদয়ের নিয়ন্ত্রণও আল্লাহর হাতে। তিনি হৃদয়ে ভয় সঞ্চারিত করেন, তিনিই প্রশান্তি ঢেলে দেন। তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই হৃদয় পরিবর্তন করেন।
হিজরতের সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাওর গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার সাথে ছিলেন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু। কাফিররা যখন গুহার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছিল, তখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, তারা তাদের পায়ের দিকে তাকালেই আমাদের দেখে ফেলবে।' তিনি বলেছিলেন, 'আবু বকর, এমন দুজনের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ?'[১]
দ্বিতীয়বারের অবস্থা ছিল আরও কঠিন। আবু বকর বললেন, 'তারা আমাকে নিশ্চিতভাবে দেখে ফেলেছে।' তাদের একজনের চোখ আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চোখে পড়েছে। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, 'আবু বকর, তুমি কি আল্লাহর এই বাণী পাঠ করোনি-
وَإِن تَدْعُوهُمْ إِلَى الْهُدَى لَا يَسْمَعُوا وَتَرَاهُمْ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ وَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ
আপনি যদি তাদেরকে হিদায়াতের পথে ডাকেন, তারা শোনে না। আর আপনি দেখবেন, তারা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তারা কিছুই দেখে না।[২]
আল্লাহ তাআলাই 'মুহাইমিন' (রক্ষাকারী)। সামান্য মাকড়সার জাল দিয়ে তিনি ইসলামের মহান দাওয়াতকে রক্ষা করেছেন।[৩]
এ-ও আল্লাহর কুদরত ও ক্ষমতার বড়ত্বের বহিঃপ্রকাশ যে, তিনি বড় ও মহান জিনিসকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ মাধ্যম দিয়ে রক্ষা করেন। কখনো তুচ্ছ কোনো মাধ্যম দ্বারা মানুষকে মৃত্যু দেন; কখনো বা হিফাজত করেন তুচ্ছ কোনো মাধ্যমের দ্বারা; যাতে আমাদের সামনে তাঁর কুদরত ও ক্ষমতার পূর্ণতা প্রকাশ পায়।
আহযাবের যুদ্ধে সমগ্র আরব উপদ্বীপ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একত্রিত হয়েছিল। ইহুদিরা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল; প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। ইসলামের ধ্বংস হয়ে দাঁড়িয়েছিল কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। এমন কি দুর্বল ঈমানের অধিকারী কেউ কেউ বলতে শুরু করেছিল, 'তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মাদ) আমাদের প্রতিশ্রুতি দেয় যে, আমাদের জন্য কিসরা ও কায়সারের সাম্রাজ্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। অথচ এখন আমরা নিরাপদে আমাদের প্রয়োজনও পূরণ করতে পারছি না'।[১]
আল্লাহ তাআলা তখন কাফিরদের ওপর প্রচণ্ড ঝড়োহাওয়া বইয়ে দিলেন। ঝড়ের ঝাপটায় তাদের আগুন নিভে গেল, তাবু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, হাড়িপাতিল উলটে পড়ল। যুদ্ধে মুমিনদের সাহায্য করার জন্য আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট। তিনিই 'মুহাইমিন'; রক্ষাকারী। সবকিছু তাঁরই হাতে। বাতাসের নিয়ন্ত্রণও তাঁরই হাতে। মহান আল্লাহ সত্য বলেছেন-
... وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ ...
আপনার রবের বাহিনী সম্পর্কে শুধু তিনিই জানেন।[২]
ঝড়ের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে; হৃদয়ের নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে। তিনিই হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার ঘটান; হৃদয় থেকে ভয় দূর করেন। সবকিছু তাঁরই হাতে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলযান আরএমএস টাইটানিক নির্মিত হয়েছিল ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে। জাহাজটি দুটি স্তরে নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে একটি স্তর ফুটো হয়ে গেলে অন্য স্তর জাহাজটিকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সেই জাহাজ কিছুতেই ডুববে না। জাহাজ নির্মাণের পর একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে জাহাজটি সাগরে ডুবে যাওয়া অসম্ভব বলে প্রচার করা হয়।
টাইটানিক ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসবহুল জাহাজ। বলা হয়, টাইটানিকের আসবাবপত্র, ধনসম্পদ ও সোনা-রুপার কারুকাজ ছিল বর্ণনাতীত। রেস্টুরেন্ট, হলরুম, অপেরা, বিলাসবহুল কেবিন, সুইমিংপুল; এককথায় বলা যায়, টাইটানিক ছিল একটি ভাসমান শহর। প্রথম ভ্রমণে টাইটানিকের যাত্রী হয়েছিল ইউরোপের সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ। বলা হয়, আরোহী নারীদের অংলকারের পরিমাণ ছিল কয়েকশ মিলিয়ন। সমুদ্রের মাঝে ডুবন্ত বরফের পাহাড়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে সেই জাহাজটি দুই টুকরো হয়ে গিয়েছিল।
যতদূর মনে পড়ে, একবছর আগে আমি আল-আরাবি ম্যাগাজিনে একটি প্রবন্ধে পড়েছি, গবেষক ও অনুসন্ধানকারীরা জাহাজটির ডুবে যাওয়ার স্থান খুঁজে পেয়েছে। টাইটানিকের সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত অবস্থার কয়েকটি ছবিও দেখেছি। সেসময় জনৈক যাজক মন্তব্য করেছিলেন, 'এই দুর্ঘটনা পৃথিবীর জন্য আসমানি শিক্ষা।'
একটি উন্নত দেশ আছে যারা নিজেদেরকে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করে। তারা কয়েক বছর আগে একটি মহাকাশযান তৈরি করেছিল। তাতে থাকবে সাতজন নভোচারী। তারা মহাকাশযানটির নাম দিয়েছিল 'চ্যালেঞ্জার'। কিন্তু উৎক্ষেপণের সত্তর সেকেন্ড পর মহাকাশযানটি অগ্নিগোলকে পরিণত হয়।
তাহলে 'মুহাইমিন'; রক্ষাকারী কে? তারা কি কাউন্টডাউন করেনি? সমস্ত যন্ত্রাংশ সঠিকভাবে স্থাপন করেনি? কে মুহাইমিন? আপনিও মুহাইমিনের সাথে থাকুন; নিরাপদ জীবন যাপন করুন।
আমার এক বন্ধু আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়েছিল। সে একবার সিরিয়ার দামেশকের এক প্রান্তে একটি ফার্মে গিয়েছিল। ফার্মে দুটি অংশ ছিল সহোদর দুই ভাইয়ের। এক ভাইয়ের ফসল আশ্চর্যজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। অপর ভাইয়ের ফসলের বর্ধন ছিল অতি সামান্য। আমার বন্ধুটি প্রথম জনের কাছে গিয়ে বলল, 'তোমার বাগান এমন কেন?' সে বলল, 'আল্লাহর শপথ, আমার ভাই যেভাবে বাগানের দেখাশোনা করে, আমি ঠিক সেভাবেই দেখাশোনা করি। এমনকি একই চাষী উভয় বাগানে কাজ করে।' তাহলে রহস্য কী? সে বলল, 'আমার আরেক ভাই কিছুদিন পূর্বে মারা গেছে। তার কয়েকজন এতিম সন্তান আছে। আমি মনে মনে ঠিক করেছিলাম, এই বাগানে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক তাদেরকে দিয়ে দেব। কিন্তু দ্বিতীয় ভাই এমন কোনো নিয়ত করেনি।
এই ঘটনাটিও প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা এই মালিকের নিয়ত সম্পর্কে জানতেন। তাই তার ফসল দ্বিগুণ করে দিয়েছেন। অপরজনের নিয়তও জানতেন। তাই তার ফসল কমিয়ে দিয়েছেন।
আরেকজন বন্ধু আমাকে দামেশকের এক অঞ্চলের কয়েকটি খামারের ঘটনা শুনিয়েছিলেন। এক রাখাল একপাল মেষ নিয়ে সেই খামারগুলোতে আসত পানি পান করানোর জন্য। সব খামারিই রাখালকে তাড়িয়ে দিত। শুধু একটি খামার ছিল, যেখানে রাখালকে স্বাগত জানানো হতো এবং মেষপালকে সন্তুষ্টচিত্তে পানি পান করানো হতো। সেই অঞ্চলের একলোক আমাকে আল্লাহর শপথ করে বলেছিল, 'সেই খামারের কূপ ছাড়া অন্য সাতটি কূপের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। সেই খামারের মালিক শুধু যে রাখালদের অনুমতি দিয়েছিল তাই নয়, বরং সে কয়েকটি চৌবাচ্চা বানিয়ে দিয়েছিল, যাতে মেষপাল স্বচ্ছন্দে পানি পান করতে পারে।'
পানির উৎসারণ আল্লাহর হাতে। চ্যালেঞ্জার ও টাইটানিকের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে। মেঘের পরিচালনা তাঁর হাতে, জলযানের ভেসে থাকা তাঁর হাতে, তিমি মাছের জীবনও তাঁর হাতে। সমগ্র বিশ্বের সবকিছুই তাঁর হাতে।
কখনো মানুষ কোনো কোনো স্থানে নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। হয়তো সে দুর্গম কোনো জায়গায় গেল, যেখানে অজগর সাপের আনাগোনা রয়েছে। সেই মানুষটি হয়তো দেখবে, অজগর এক জায়গায় ঠায় বসে আছে, কোনো নড়াচড়া নেই, তাকে আক্রমণও করছে না।
কখনো কয়েকদিনের ভুখা ক্ষ্যাপা কুকুর দেখবেন, যে কোনো আল্লাহভীরু পুণ্যবান মানুষের সামনে পড়লে পোষা কুকুরের মতো চুপচাপ বসে থাকে। সুতরাং মুহাইমিন কে? আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ
আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক।[১]
আল্লাহই নিয়ন্ত্রণকারী। তাঁর সমস্ত সৃষ্টির ওপর তিনিই কর্তৃত্ববান। কোনো জিনিস এমন নেই যে, তিনি তা সৃষ্টি করে ছেড়ে দিয়েছেন। এজন্যই তিনি তাঁর পবিত্র কালামে বলেছেন, 'আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক'।[২]
দামেশকের এক মার্কেটে একবার আগুন লেগেছিল। অধিকাংশ দোকানের সবকিছু পুড়ে গিয়েছিল। শুধু একটি দোকান ছিল অক্ষত। সেই দোকান পর্যন্ত এসে আগুন নিভে গিয়েছিল। কারণ আগুনের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে।
৫০ বছর আগে আমাদের দেশে একবার পঙ্গপাল এসেছিল। কাঁচাপাকা সব ধরনের ফসল খেয়ে ফেলেছিল। খামারিদের দেখাশোনা ও পঙ্গপালের বিষয়ে দায়িত্বশীল এক ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন, 'পঙ্গপালের আক্রমণে গাছপালার ছালবাকল পর্যন্ত ছিল না। পঙ্গপাল গাছের ফল, পাতা, বাকল; সব খেয়ে ফেলেছিল। কিন্তু হঠাৎ একটি বাগান দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন জান্নাতের বাগান। বাগানে ঢুকে আমরা বাগানের মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, 'এমন হলো কী করে?' সে বলল, 'আমি বিশেষ ঔষধ ব্যবহার করি।' তার উত্তর শুনে আমরা রেগে গেলাম। তার কাছে পঙ্গপাল তাড়ানোর ঔষধ আছে, অথচ মুসলিম ভাইদের দিচ্ছে না! সে বলল, 'জনাব, তারা এই ঔষধ ব্যবহার করে না। আমার সেই ঔষধ হলো যাকাত। আমি এ বাগানের (উৎপাদিত ফসলের) যাকাত দিই।'
এই দৃষ্টান্তগুলো মানুষের জীবন থেকে নেওয়া। বিশ্বজগতের শত-সহস্র, নিযুত-কোটি বিষয়; সবকিছু আল্লাহর হাতে। সুতরাং আল্লাহ তাআলাকে 'মুহাইমিন' হিসেবে জানা জ্ঞান ও গৌরবের।
যখন আপনি তাকে 'মুহাইমিন' হিসেবে জানবেন, তখন তিনি ছাড়া অন্য কারও কাছে কোনো আশা-প্রত্যাশা থাকবে না। আপনি অন্য কারও মাধ্যম গ্রহণ করবেন না। আপনি তাঁর কাছে হবেন চূড়ান্ত বিনয়ী, অবনত, মুখাপেক্ষী। আপনি থাকবেন পরিপূর্ণ নিরাপদ।
পক্ষান্তরে আপনি যদি তাঁকে 'মুহাইমিন' রূপে না জানেন; যদি মনে করেন, কোনো মানুষ 'মুহাইমিন', তাহলে আপনি তার সামনে হয়ে যাবেন ছোট্ট শিশুর মতো। আপনি তার সামনে নত হতেই থাকবেন, সেও আপনাকে অপদস্থ করতেই থাকবে, পায়ের নিচে পিষতে থাকবে।
মনে করুন, কারও হৃদরোগ হয়েছে। চিকিৎসকগণ একমত হয়েছেন, বিদেশে নিয়ে অস্ত্রপাচার করতেই হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্ট্রেচারে শুয়ে আছে সে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। সে বলছে, 'হে রব, এই হৃৎপিণ্ড আপনিই সৃষ্টি করেছেন। রব, আপনার কাছে আমার আবেদন, অপারেশন যেন করতে না হয়।' অপারেশনের পূর্বে চেকআপ করে দেখা গেল, সবকিছু স্বাভাবিক!
ঠিক এমনই এক ঘটনা ঘটেছে ১২ বছর পূর্বে সিরিয়ার দামেশক শহরে। এখন পর্যন্ত সে সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। শিরার ব্লক কে খুলে দিল? কার হাতে শিরা বন্ধ করার কিংবা খুলে দেওয়ার ক্ষমতা? আল্লাহ আপনার হৃৎপিণ্ডের রক্ষাকারী 'মুহাইমিন'।
কিডনির কার্যক্রম হঠাৎ থেমে যায়। কেন থেমে যায়? কে থামিয়ে দেন? কে আবার সচল করেন?
আল্লাহ তাআলা! তিনিই 'মুহাইমিন'। হৃৎপিণ্ড, কিডনি, শিরা-উপশিরা, ধমনি, পাকস্থলী, পেশি, কানের বৃত্তাকার নালি, কান, চোখ, জিহ্বা; মানুষের প্রতিটি অঙ্গের নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে।
এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاءُ وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
বলুন, সার্বভৌম রাজত্বের অধিকারী হে আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন। যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন এবং যাকে চান সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। যাবতীয় কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয় আপনি সব বিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান।[১]
কে সেই সত্তা, যিনি হাড়ের মধ্যকার কোষকে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির হাত থেকে রক্ষা করেন? আল্লাহ তাআলা!
একজন পূর্ণ সুস্থ ও সবল মানুষ; যার খাদ্যাভাস সুষম, শরীরচর্চাও করেন, নড়াচড়াও করেন, হঠাৎ এমন একজন মানুষের দেহের বহিরাংশে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা দেয়। কেন?
দেহের অস্থিকোষের নিয়ন্ত্রণকারী কে? কে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কিংবা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখেন? আল্লাহ তাআলা।
এমনকি স্ত্রীর মনমানসিকতাও আল্লাহর হাতে। শাইখ শারানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর আচরণ দেখে জানতে পারি, আল্লাহর কাছে আমার অবস্থান কেমন।’ [১]
কোনোদিন তাকে মনে হয়, যেন আসমানের ফেরেশতা। আবার কখনো কখনো সেই অশুভ সময়ের কথা ভাবি, যখন তার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। তার হৃদয় কোমল হওয়া কিংবা কঠোর হওয়া আল্লাহর হাতে। তাকে অনুগত করার কিংবা অবাধ্য করার ক্ষমতা তাঁরই হাতে। এমনকি সন্তানসন্ততির বিষয়ও একই।
আপনার ক্রেতা, ব্যবসা, নির্বাচনী নেতা, অনুসৃত ব্যক্তিবর্গ সবাই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। আপনার গাড়ির প্রশংসা করতে গিয়ে যদি নির্মাতার প্রশংসা করেন এবং আল্লাহকে ভুলে যান, হতে পারে, প্রশংসা করতে করতেই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হবেন। আপনার যানবাহনের নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে। সংক্রামক ব্যাধির ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেই।’[২]
কিন্তু আমরা দেখতে পাই, এমন অনেক রোগব্যাধি রয়েছে, যেগুলো সংক্রমিত হয়। তাহলে এই হাদিসের অর্থ কী?
এর অর্থ হলো, সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে, সেই ব্যাধিকে মানুষের সাথে সম্পর্কিত করা যাবে না; বরং আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জীবাণুকে সংক্রমিত হওয়ার অনুমতি দেন, শুধু তখনই সেই জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে। তিনি অনুমতি না দিলে, কিছুতেই সংক্রমিত হতে পারে না।
এসব জ্ঞানগত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। বাকি রইল সর্বশেষ প্রায়োগিক বিষয়।
আমরা যদি নিজেদের আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করতে চাই, তাহলে নিজের নফস সম্পর্কে, নফসের অবস্থা সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। জানতে হবে, নফস সুস্থ না অসুস্থ; নফসে কোনো বক্রতা, অহংকার, আত্মমুগ্ধতা, ধোঁকা কিংবা সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা রয়েছে কিনা। আল্লাহর প্রতি তার ঈমান কি যথেষ্ট নাকি যথেষ্ট নয়? জানতে হবে, তার আয় ও ব্যয়ের খাত, অন্যের সাথে তার আচরণ ও উচ্চারণ।
'মুহাইমিন'-এর প্রকৃত বান্দা হতে হলে আপনাকে জানতে হবে, আল্লাহর কাছে আপনার অবস্থান দুর্বল নাকি সবল, ভালো নাকি মন্দ। আপনার উপার্জনে কোনো সন্দেহ রয়েছে কিনা, সম্পর্কে কোনো হারামের মিশ্রণ রয়েছে কিনা, অন্যের হক আদায়ে ত্রুটি রয়েছে কিনা। আপনাকে জানতে হবে সব। আর জানার জন্য আপনাকে জ্ঞানের মজলিসে যেতে হবে। কারণ জ্ঞান অর্জন হয় (শিক্ষাগ্রহণের) মাধ্যমে।
প্রিয় ভাই, আপনাকে জানতে হবে- কোনটি হারাম, কোনটি হালাল; কোনটি জায়িয, কোনটি নাজায়িয; কোনটি নিন্দনীয়, কোন গুণ প্রশংসনীয়। জ্ঞানের মজলিসে উপস্থিত হলে আপনি এসব জানতে পারবেন। জ্ঞান অর্জন করলে আপনি 'আল-মুহাইমিন' নামের এক-তৃতীয়াংশের হক আদায় করতে পারবেন।
এখন আপনাকে আত্মার পরিশুদ্ধির চেষ্টায় নিয়োজিত হতে হবে। নিয়োজিত হতে হবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখার সাধনায়, হৃদয়কে আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে পবিত্র করার সাধনায়। চিন্তাকে পবিত্র করতে হবে ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস, ধারণা ও মিথ্যা কল্পকথা থেকে।
আল্লাহ আপনার হৃদয়ের পর্যবেক্ষণ করবেন, হৃদয়ের অলিগলির সুপ্ত কথাও তিনি জানবেন, তাঁর গুণাবলিকে আপনার মাঝে স্থাপিত করবেন, আপনার মাঝে সংরক্ষণ করবেন। কারণ আমাদের আখলাক ও আচরণের মাঝে পালাক্রমে পরিবর্তন ঘটে। জুমার দিনে আমাদের অবস্থা থাকে সন্তোষজনক। তারপর শনিবারে আমাদের আখলাক নষ্ট হয়ে যায়। রবিবারে আমরা সালাত ত্যাগ করি। তারপর আবার জুমার দিন আসতে আসতে আমরা আল্লাহর গুণাবলি বাদ দিয়ে ভিন্ন কিছুতে পরিণত হই।
আপনাকে নিজের অবস্থা জানতে হবে, নিজের কর্মকাণ্ড সংশোধন করতে হবে, নিজেকে অবিচল রাখতে হবে সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সত্য-সরল পথে। কারণ আপনি আল্লাহকে জ্ঞানার্জন, আত্মসংশোধন ও অবিচলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে এর চেয়ে উঁচু স্তর হলো, মানুষকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান করবেন, মুসলিম ভাইদের অবস্থা জেনে সংশোধনের চেষ্টা করবেন, তাদের সাথে আচরণের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন এবং নিজেকে সংশোধন করবেন।
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَنفَالِ قُلِ الْأَنفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ ۖ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴿١﴾
তারা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, 'তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো [১]।
উপরিউক্ত আয়াতের অর্থও নিজেকে সংশোধন করুন। কিন্তু যদি আপনি নিজের অসুস্থতা না জানেন, নিজের ত্রুটিবিচ্যুতি না বুঝেন, হৃদয়ের অপবিত্রতা ও অসুবিধা সম্পর্কে অজ্ঞ হন, তাহলে নিজেকে কীভাবে সংশোধন করবেন?
তাই জানা হলো মূলভিত্তি। জানতে হলে ইলম অর্জন করতে হবে। সংশোধন করতে হলে সান্নিধ্য গ্রহণ করতে হবে। অবিচল থাকতে হলে সত্যকে আঁকড়ে ধরতে হবে। তাহলে আপনি 'আল-মুহাইমিনের' গুণে গুণান্বিত হতে পারবেন।
তারপর আল্লাহ তাআলা যেহেতু আপনাকে সবসময় পর্যবেক্ষণ করছেন, সেহেতু আপনার করণীয় কী?
'আল-মুহাইমিন' নামকে জীবনে বাস্তবায়নের অন্যতম পদ্ধতি হলো, আল্লাহর ব্যাপারে লজ্জাশীল থাকতে হবে। আল্লাহ 'আল-মুহাইমিন' (সর্বদা পর্যবেক্ষণকারী), তাই তাঁর প্রতি লজ্জাশীল হতে হবে।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا ﴿١﴾
হে লোক সকল, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো; যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকেই সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে।
আর তাদের থেকে বহু নরনারী পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহকে ভয় করো, যার অসিলা দিয়ে তোমরা একে অন্যের কাছে (নিজেদের হক) চেয়ে থাকো। আর সতর্ক হও আত্মীয়তা রক্ষার বিষয়ে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের পর্যবেক্ষণ করছেন [১]
তিনি সর্বশক্তিমান, তাই তাঁর ওপর ভরসা করতে হবে। তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তাই ভবিষ্যতের ব্যাপারে আস্থা রাখতে হবে।
لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَالٍ *
মানুষের জন্য তার সামনে ও পেছনে থাকে একের পর এক আগমনকারী ফেরেশতাগণ; তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। কোনো সম্প্রদায়কে যদি আল্লাহ বিপদ দিতে চান, তাহলে কেউ তা ফেরাতে পারে না। তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক নেই।[২]।
সুতরাং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ পরিবর্তন না করবেন, ততক্ষণ কিছুই পরিবর্তিত হবে না। যতক্ষণ আপনি তার আনুগত্যে অবিচল থাকবেন, ততক্ষণ আপনি উত্তরোত্তর কল্যাণ লাভ করবেন; এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উন্নীত হবেন, আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা উন্নত হতে থাকবে।
টিকাঃ
[১] সুরা নূর, আয়াত: ৪৪
[২] সুরা আলি-ইমরান: ১৪০
[৩] সহিহ মুসলিম: ১৩৪২; জামিউত তিরমিযি: ৩৪৩৯; মুআত্তা মালিক: ৩৪; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক: ৯২৩২; মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা: ২৯৬০৬; মুসনাদ আহমাদ: ২০৭৮১
[১] সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৬
[১] সূরা কাহফ, আয়াত: ২৬
[২] সূরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৮৯
[১] সহিহুল বুখারি: ২৭৩৬; সহিহ মুসলিম: ২৬৭৭; জামিউত তিরমিযি: ৩৫০৬
[২] মুতাওয়াতির হাদিস বলা হয়, অবিচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত সহিহ হাদিসকে।
[৩] এটিকে হাদিস বলে প্রচার করা হলেও এটি মূলত কোনো হাদিস নয়। ইমাম ইবনুল রাহিমাহুল্লাহসহ গ্রহণযোগ্য আলিমগণ এই মত ব্যক্ত করেছেন। দেখুন: মাদারিজস সালিকিন, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২২৬, ২২৭; যেসব গ্রন্থে এটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে এর সনদ উল্লেখ করা হয়নি।
[১] সহিহুল বুখারি : ৫৯৯৯; সহিহ মুসলিম: ২৭৫৪; শারহুস সুন্নাহ: ৪১৮২; মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৩৭০
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৬৪
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৬
[১] সুরা বাকারা, আয়াত: ২২১
[২] সুরা কসাস, আয়াত: ৮৩
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ৪৩-৪৪
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ৪৫-৪৮
[১] আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ১১৭; মারিফাতুস সাহাবাহ: ৫২৬৭; উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ: ৪০৯৬; মাগাযি, ওয়াকিদি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা ১২৬; বর্ণনাটি সিরাতের বিভিন্ন কিতাবে এসেছে। এছাড়া হাদিসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোতে এটি পাওয়া যায়নি।
[২] স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বলে, তুমি আমার মায়ের মতো অথবা বোনের মতো, কিংবা তোমার অমুক অভঙ্গটি তাদের অঙ্গের মতো, তাহলে শরিয়তের ভাষায় একে বলা হয় 'যিহার'। যদি স্বামী এমনটা বলে, তবে তার জন্য স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক করা বৈধ নয়, যতক্ষণ না সে নিচের ৩টি কাফফারার কোনো একটি আদায় করে-এক. একটি দাস মুক্ত করা। দুই. দুই মাস ধরে সিয়াম রাখা। তিন. ৬০ জন গরিব লোককে দই বেলা খাবার খাওয়ানো। দেখুন-সুরা মুজাদালাহ, আয়াত: ৩-৪
[১] সুরা মুজাদালাহ, আয়াত: ১
[২] তাফসিরুল কুরতুবি, খণ্ড: ১৭, পৃষ্ঠা: ২৬৯; ফাতহুল বায়ান ফি মাকাসিদিল কুরআন, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১০; আল-লুবাব ফি উলুমিল কিতাব, খণ্ড: ১৮, পৃষ্ঠা: ৫১৪
[৩] সুরা নাযিয়াত, আয়াত: ২৪
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ৬৬-৬৯
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৬৯; শব্দ তিনটি হলো-এক. শীতল। দুই. নিরাপদ। তিন. ইবরাহিমের জন্য।
[২] সুরা কাসাস, আয়াত: ৭।
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭-৮৮
[১] সুরা তাওবা, আয়াত: ২৫
[২] সুরা তাওবা, আয়াত: ২৫
[১] সহিহ্বল বুখারি: ৪৬৬৩; সহিহ মুসলিম: ২৩৮১; জামিউত তিরমিযি : ৩০৯৬
[২] সুরা আরাফ, আয়াত: ১৯৮
[৩] সাওর গৃহায় অবস্থানকালে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা মাকড়সার জালের মাধ্যমে কাফিরদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছিলেন।
[১] সিরাত ইবনি হিশাম, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৭৩-১৭৪; দারুল কিতাব আল-আরাবি।
[২] সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত: ৩১
[১] সুরা যুমার, আয়াত: ৬২
[২] সুরা যুমার, আয়াত: ৬২
[১] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ২৬
[১] শারানি রাহিমাহুল্লাহর এমন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্যসূত্রে পাওয়া যায়নি। তবে ফুজাইল ইবনু ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ থেকে কাছাকাছি একটি বাণী পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমি যখন আল্লাহর অবাধ্য হই, তখন এর কুপ্রভাব আমার বাহন, সেবক ও স্ত্রীর মাঝে দেখতে পাই। [দেখুন-আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড : ১০, পৃষ্ঠা: ২১৫]
[২] সহিহুল বুখারি: ৫৭0৭, ৫৭17; সহিহ মুসলিম: ২২২০; জামিউত তিরমিযি: ১৬15; সুনানু আবি দাউদ: ৩৯১১
[১] সুরা আনফাল, আয়াত : ১
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১
[২] সুরা রাদ, আয়াত: ১১
📄 আত-তাওয়াব : التَّوَّابُ
মনে করুন, আপনি একটি স্কুল বানালেন। বেশ কিছু ছাত্র ভর্তি হলো। চমৎকার সব নিয়মকানুন চালু করলেন। আপনি সেখানে লেকচার দেন। ছাত্ররা পড়া মুখস্থ করে। দেখতে দেখতে ঘনিয়ে আসে পরীক্ষার সময়। যথাসময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ফলাফল প্রকাশের সময় দেখা গেল মনোযোগী ও পরিশ্রমী ছাত্ররা পাস করেছে আর অলস ও অমনোযোগীরা ফেইল করেছে।
আপনি একজন ন্যায়পরায়ণ প্রতিষ্ঠাতা। একমাস পর নতুন বছরের শুরুতে ছাত্রদের ফলাফল দেখেন। তখন ফেইল করা ছাত্রটিকে আলাদা করেন, তাকে ডেকে এনে উপদেশ দেন। তারপরও সে মনোযোগী হলো না। এবার তাকে ধমক দেন, অভিভাবক ডেকে এনে চাপ দেন পড়ালেখার জন্য। অবশেষে তার মধ্যে পরিবর্তন আসে। সে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে শুরু করে। একপর্যায়ে সে-ও সফলদের মাঝে জায়গা করে নেয়।
যদি এই অমনোযোগী ছাত্রটিকে ছেড়ে দিতেন, তার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী আচরণ করতেন, তাহলে আপনি ন্যায়পরায়ণতার সর্বোচ্চ পর্যায়েই থাকতেন। কিন্তু যখন আপনি সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই খোঁজখবর নিয়ে তাকে উপদেশ দিলেন, তার ওপর চাপ দিলেন; এর ফলে সে নিজেকে শুধরে নিয়ে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে শুরু করল এবং সফল হলো, তখন কিন্তু আপনি দয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হলেন।
ন্যায়সংগত নিয়ম প্রয়োগ করলে আপনি ন্যায়পরায়ণতার শীর্ষে অবস্থান করবেন। কিন্তু খোঁজখবর নিয়ে, কখনো উপদেশ ও উৎসাহ দিয়ে, কখনো ধমক ও শাস্তি দিয়ে যদি তাকে শোধরানোর সুযোগ দেন এবং এতে সে সফল হয়, তাহলে এর মাধ্যমে আপনি সর্বোচ্চ দয়া দেখালেন।
ধরুন, আপনার ছেলেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠালেন। তার পেছনে খরচ করলেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। কিন্তু তেমন খোঁজখবর নিলেন না তার। ৫ বছর পর দেখা গেল, সে আপনার কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করেছে নিজের প্রবৃত্তির পেছনে। কোনো পড়াশোনাই সে করেনি। ৫ বছর পর পালিয়ে এসেছে মুখে চুনকালি মেখে। এখন যদি আপনি তাকে বলেন, 'আমি তোমার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেছি। অথচ তুমি সবকিছু জলে ফেলেছ!' তাহলে আপনি ন্যায়সংগত আচরণই করবেন।
অপরদিকে যদি তার খোঁজখবর নিয়ে-কখনো তার কাছে গিয়ে, কখনো ডেকে পাঠিয়ে; কখনো হাতখরচ কম পাঠিয়ে, ধমক দিয়ে; কখনো উৎসাহ বাড়িয়ে, সাহস জুগিয়ে আবার লেখাপড়া করান এবং অবশেষে ৪ বছর পর সে ডিগ্রির সার্টিফিকেট নিয়ে বাড়িতে ফেরে, তাহলে আপনি তার সাথে সর্বোচ্চ দয়ার আচরণ করলেন।
৬ মাস মেয়াদি কোনো ইন্টার্ন কর্মকর্তাকে আপনি সহযোগিতা করতে পারেন। শুধু পর্যবেক্ষণে রেখে রেকর্ড করতে পারেন তার ভুলগুলো। একপর্যায়ে যখন তার ভুলের পরিমাণ বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে যাবে, তখন স্বচ্ছন্দে তাকে বরখাস্ত করতে পারেন। কারণ ইন্টার্নির ৬ মাসের মধ্যেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এমনটি যদি করেন, তাহলে তার সাথে ন্যায়সংগত আচরণই হবে। কারণ তাকে ৬ মাসের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু যদি এই কর্মকর্তার সাথে দয়ার আচরণ করতে চান, তাহলে যখনই সে ভুল করবে, তখনই তাকে বলবেন, 'এটা ওভাবে নয়, এভাবে করুন।' তাতে সে ধীরে ধীরে নিজেকে শুধরে নিতে পারবে। কিছুদিন পর তাকে আপনার ভালো লাগতে শুরু করবে। আপনি তাকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেবেন।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে দিয়েছেন বিবেক। পুরো বিশ্বজগৎকে তিনি তাঁর দয়ার নিদর্শনরূপে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে বিবেক দিয়েছেন, প্রদান করেছেন স্বভাবজাত দ্বীন ও শরিয়ত। প্রবৃত্তির চাহিদা দিয়ে ইচ্ছাধিকার দান করেছেন। তারপর শক্তি দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এখন যদি মানুষ জাহান্নামবাসী হয়, তাহলে আমরা বলব, 'আল্লাহ তার সাথে ন্যায়ের আচরণ করেছেন।'
কিন্তু এই মানুষটি যদি যৌবনের শুরুতে অন্যায় ও অসৎকাজে লিপ্ত হয়, তারপর আল্লাহ তাকে শিক্ষা দেন; কখনো ভীতি প্রদর্শন করেন, জীবনকে সংকীর্ণ করে দেন; কখনো নেককার বান্দাদের সান্নিধ্য দান করেন, তার হৃদয় উন্মুক্ত করে দেন; এই মানুষটিই হয়তো ভালো হয়ে যাবে। অবশেষে সে হয়ে যাবে জান্নাতের বাসিন্দা। এক্ষেত্রে আল্লাহ তার সাথে কী আচরণ করলেন? দয়ার আচরণ!
আল্লাহ তাআলার একটি গুণবাচক নাম 'আত-তাওয়াব' (التَّوَّاب)। এই নামটি আমরা কীভাবে বুঝব? নামটি আমরা বুঝব আল্লাহর অফুরন্ত দয়ার আলোকে। তিনি আমাদের বিবেক দিয়েছেন, দান করেছেন ইচ্ছাধিকার; আমাদের মধ্যে প্রবৃত্তির চাহিদাও দিয়েছেন। পুরো বিশ্বজগৎকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর নাম ও গুণাবলির নিদর্শনরূপে। তারপর আমাদের শক্তি দিয়েছেন এবং আমাদের মধ্যে প্রদান করেছেন সুউচ্চ স্বভাব-ধর্ম। সবশেষে ঘোষণা দিয়েছেন-
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ
যে সৎকাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই করে; আর যে মন্দকাজ করে, তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না [১]
মূলত এই ঘোষণা হলো ন্যায়পরায়ণতা। কিন্তু তারপরই রয়েছে তাঁর অফুরন্ত দয়া। আপনার বিপদাপদে, ওঠাবসায়, জল্পনা-কল্পনায়, আশা-আকাঙ্ক্ষায়, গোপনে-প্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলা আপনার সাথেই থাকেন। আপনার ব্যক্তিগত প্রতিটি বিষয় তাঁর সাথে সম্পৃক্ত। প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহ আপনাকে কিছু শিক্ষা দেন।
যদি আপনি তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে তিনি আপনাকে ফিরে আসার শিক্ষা দেন। যদি তাঁর অভিমুখী হন, তাহলে আপনাকে তাঁর আলোয় আলোকিত করেন। আর যদি সীমালঙ্ঘন করেন, তাহলে শাস্তি দেবেন। যদি সদাচার করেন, তাহলে সম্মানিত করবেন।
আপনার চারপাশে যারা রয়েছে, তাদের দৈনন্দিন খোঁজখবর নেওয়া ছাড়া আপনি কখনো দয়াশীল হতে পারবেন না। এমনকি আল্লাহর প্রতি দাওয়াহর ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমন।
যারা ইসলামের জ্ঞান শিক্ষা দেন, তাদের মধ্যেও দুই শ্রেণির মানুষ রয়েছেন। তারা হলেন-এক. মুআল্লিম বা শিক্ষক। দুই. মুরব্বি বা পথপ্রদর্শক।[১]
মুআল্লিম কেবল পাঠদান করেই তার দায়িত্ব শেষ করেন। কে পরিশ্রমী, কে পড়া বুঝল, কে পড়া শিখল বা শিখল না, কে পিছিয়ে পড়ল কিংবা এগিয়ে গেল, কে উপস্থিত-অনুপস্থিত-তা নিয়ে তিনি ভাবেন না। পাঠদান পর্যন্তই তার দায়িত্ব শেষ। শিক্ষাক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিকে বলা হয় মুআল্লিম বা শিক্ষক। কিন্তু মুরব্বি বা পথপ্রদর্শকের ব্যাপারটি ভিন্ন। তিনি শ্রেণিকক্ষের বাইরেও খোঁজখবর রাখেন।
আমাকে একজন বলেছিল, আপনি আমাদের শরিয়ত, তরিকত ও হাকিকতের জ্ঞানের কথা বলেন। শরিয়ত ও তরিকতের জ্ঞানের পার্থক্য আমার কাছে একদম স্পষ্ট। কিন্তু তরিকত ও হাকিকতের জ্ঞানের পার্থক্য পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
আমি তরিকত ও হাকিকতের জ্ঞানের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনুভব করলাম, পার্থক্যটি বেশ সূক্ষ্ম। তখন আমার মনে চমৎকার একটি উদাহরণ এল। তাকে বললাম, 'মনে করুন, বিশাল বড় একটি পাহাড় দেখা যাচ্ছে। যাতে রয়েছে বেশ কিছু টিলা, উপত্যকা ও চলার পথ। পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে রাজকীয় এক প্রাসাদ। মানুষের মন যা কিছু কামনা করে, সবই সেখানে বিদ্যমান।
এবার ৩ শ্রেণির আলিমের কথা ধরুন। যাদের মধ্যে একজন আপনার কাছে বর্ণনা করবেন—প্রাসাদটিতে ৩০০টি রুম আছে, সেন্ট্রাল হিটিং ও এয়ারকন্ডিশনিং ব্যবস্থা আছে; আছে নানা পদের বাহারি খাবার, মনোরম বাগান ও বিলাসবহুল স্লিপিং রুম। তিনি শুধু আপনাকে প্রাসাদের বিবরণ জানাবেন। কিন্তু তিনি হয়তো হাত ধরে আপনাকে সেখানে পৌঁছাবেন না কিংবা রাস্তাটা পুরোপুরি দেখিয়ে দেবেন না। এ শ্রেণির আলিম হলেন শরিয়তের আলিম। তিনি আপনাকে কেবল বলবেন, প্রাসাদে রুম হিটার রয়েছে; অথচ আপনার তখন শীত লাগছে, উন্নতার প্রয়োজন। তিনি বলবেন, সেখানে সুস্বাদু খাবার আছে, সম্পূর্ণ আরামের ব্যবস্থা রয়েছে; অথচ আপনি তখন ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত।
অপরদিকে তরিকতের আলিম প্রাসাদে যাওয়ার একটি রাস্তা জানেন। তিনি জানেন কোন রাস্তায় গেলে, কোন বাহনে চড়লে প্রাসাদে পৌঁছতে পারবেন, মাঝপথে বাধা এলে কীভাবে প্রতিহত করবেন। তিনি আপনাকে সেখানে পৌঁছানোর পথ বলে দেবেন ঠিক, কিন্তু হাত ধরে সেখানে পৌঁছে দেবেন না। ফলে আপনি তখন নিজ জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকবেন।
অপরদিকে হাকিকতের আলিম আপনাকে হাতে ধরে সেই প্রাসাদে প্রবেশ করিয়ে দেবেন।
যিনি আপনার কাছে প্রাসাদের বিবরণ তুলে ধরবেন, তিনি শরিয়তের আলিম। যিনি আপনাকে আপনার জায়গায় দাঁড় করিয়ে শুধু প্রাসাদে পথ দেখিয়ে দেবেন, তিনি হলেন তরিকতের আলিম। আর যিনি আপনাকে হাতে ধরে প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন, প্রাসাদে প্রবেশ করাবেন, তিনি হলেন হাকিকতের আলিম।'
আমরা যদি ঈমানের পরিভাষার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি, তাহলেও দেখা যায় ঈমানের তিনটি স্তর রয়েছে। যেমন-এক. ইসলাম। দুই. ঈমান। তিন. ইহসান।
প্রাসাদে প্রবেশ করে সব ধরনের আনন্দ-বিনোদন উপভোগ করা হলো ইহসান। প্রকৃতপক্ষে এটিই চূড়ান্ত লক্ষ্য। কারণ আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন জান্নাতের জন্য; চিরকালীন সুখ ও সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়ার জন্য। এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
إِلَّا مَنْ رَحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ ...
তবে যাদের প্রতি আপনার রব দয়া করেন, তাদের কথা ভিন্ন। এজন্যই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন [১]
এর কারণ একটিই, আল্লাহর ইবাদত করা। তাঁর বান্দা হিসেবে আমাদের সৃষ্টির মূলতন্ত্র এটি। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ )
আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।[১]
আমরা আল্লাহর ইবাদত করব, এটিই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
আমরা অবাধ্যতার পথে হাঁটি, ভোগ-বিলাস ও প্রবৃত্তির পূজায় আমগ্ন ডুবে থাকি। যদি আল্লাহপ্রদত্ত বিধানের আলোকে বিচার করি, তাহলে আমাদের শেষ পরিণাম হবে—জাহান্নাম। কিন্তু তা-ই হয় কি? আমাদের রব আমাদেরকে এভাবে ছেড়ে দেন না; বরং তিনি আমাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেন, সত্যের বাণী শোনান। তারপরও যদি আমরা সাড়া না দেই, তখন আমাদের পার্থিব দুঃখ-দুর্দশায় ফেলেন, কঠিন শাস্তিতে নিপতিত করেন।
বিষয়টি এভাবে বুঝতে পারেন—চিকিৎসক কখনো ২৫০ মিলিগ্রাম ঔষধ দেন। যদি কাজ না করে, তাহলে ৫০০ মিলিগ্রাম দেন। তারপর উপকার না হলে ক্রমান্বয়ে ৭৫০, ১০০০ মিলিগ্রাম করে দেন। ঔষধের প্রভাব যত দুর্বল প্রমাণিত হতে থাকে, তিনি পরিমাণ তত বাড়াতে থাকেন। বান্দাকে সংশোধন করার জন্য আল্লাহর পদ্ধতিটিও এরকম।
এবার আসি ‘আত-তাওয়াব’ (আরবী টেক্সট) নামের অর্থ ব্যাখ্যা করার বিষয়টিতে। এর পূর্বে যে বিষয়টি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ; তা হলো, আল্লাহ আমাদের সাথে দয়া ও রহমতের আচরণ করেন। তিনি যদি আমাদের সাথে ন্যায়পরায়ণতার নিরিখে আচরণ করতেন, তাহলে আমরা জাহান্নামের উপযুক্ত হতাম। কিন্তু তিনি আমাদের সাথে দয়ার আচরণ করে আমাদেরকে জান্নাতের উপযুক্ত করেন।
এজন্যই তিনি ‘আত-তাওয়াব’। তিনি আপনাকে ত্যাগ করেন না; বরং সবসময় সব অবস্থায় আপনাকে দেখেন, আপনার উচ্চারিত ও অব্যক্ত সব কথা শোনেন। আপনার স্থিরতা বা চলাফেরা, জল্পনা-কল্পনা, অতীত-ভবিষ্যৎ ও বর্তমান বাস্তবতা সবকিছু তিনি পর্যবেক্ষণ করেন।
আপনি হারাম সম্পদ ভক্ষণ করলেন; আপনাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি আপনার সম্পদ থেকে ১০ গুণ কমিয়ে দেবেন। মুসলিমদের জানমালের ক্ষেত্রে আপনি সীমালঙ্ঘন করলেন; তিনি আপনাকে অমিমাংসিত সমস্যায় ফেলবেন। সেই সমস্যায় পতিত হয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় আপনি কয়েক বছর অতিবাহিত করবেন। তারপর তিনি আপনার মনে এই উপলব্ধি এনে দেবেন-'আমার এই কঠিন গুনাহের কারণে আমি এমন সমস্যায় পড়েছি।'
সুতরাং তাওবার মূল কথা হলো, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে প্রতিপালন করেন, সংশোধন করেন-যাতে সে দুনিয়াতে সম্মানের অধিকারী হয় আর বিচার দিবসে লাভ করে পরম প্রার্থিত জান্নাত।
'তাওয়াব' (تَوَّابُ) শব্দটি ফা'আল (فَعَّال) শব্দ-কাঠামো অনুযায়ী নির্গত হয়েছে। আরবি ভাষায় ফা'আল শব্দ-কাঠামোটি ফায়িল বা কর্তার অতিশয়তার অর্থ প্রদান করে। যেমন: তাওবা থেকে সাধারণ শব্দ-কাঠামো অনুযায়ী গঠিত কর্তা 'আত-তাইব' (التَّائِب) এর অর্থ একবার তাওবাকারী। পক্ষান্তরে 'আত-তাওয়াব' (التَّوَّابُ)-এর অর্থ বারবার কিংবা বহুবার তাওবাকারী। আমরা যখন আল্লাহর এই গুণবাচক নামটি অতিশয়তার অর্থ প্রদানকারী শব্দ-কাঠামো অনুযায়ী উল্লেখ করব, তখন এর উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ তাআলা বারবার তাঁর বান্দার তাওবা কবুল করেন; অথবা গুনাহ যত বড়ই হোক, গুনাহ থেকে তাওবা করলে তিনি এই তাওবা কবুল করেন। আরবি ভাষায় এই নিয়মটি বহুল পরিচিত।
আরবি ভাষায় তাওবা (تَوْبَةٌ)-এর শাব্দিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা। যেমন-
تَابَ الْعَبْدُ إِلَى رَبِّهِ
অর্থ : বান্দা তার রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করল। অর্থাৎ গুনাহ ত্যাগ করে আল্লাহর কাছে ফিরে এল।
পক্ষান্তরে তাওবা ক্রিয়ার কর্তা যদি হন আল্লাহ, তাহলে অর্থ হয় ভিন্ন। যেমন-
تَابَ اللهُ عَلَى عَبْدِهِ
অর্থ : আল্লাহ তাঁর বান্দার দিকে কল্যাণ ও ইহসান, ক্ষমা ও দয়া নিয়ে ফিরলেন।
'আল্লাহু তাওয়াব' (আল্লাহ তাওবা কবুলকারী)-এর একটি অর্থ এটি। কিন্তু এর নিগূঢ় অর্থ আমরা দেখতে পাই আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে-
... ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
এরপর তিনি তাদের প্রতি কল্যাণকামী হলেন যাতে তারা তাওবা করে। নিশ্চয় আল্লাহ অতিশয় কল্যাণকামী, চিরদয়াময় [১]
এই আয়াতে تَابَ عَلَيْهِمْ (তাদের প্রতি কল্যাণকামী হলেন)-এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো, তাদের কষ্টকর অবস্থায় ফেলা হয়েছিল, যেন তারা তাওবার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। আল্লাহ যদি তাদের ধন-সম্পদ, সুন্দর বাসস্থান, আনন্দ-বিনোদন, প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের অবারিত সুযোগ দিতেন এবং ত্রুটি-বিচ্যুতির মধ্যে ছেড়ে দিতেন, তাহলে আল্লাহর 'তাওয়াব' নামটি যথার্থ হতো না। তাদেরকে অসহনীয় কষ্টের সম্মুখীন করা হয়েছে এই কারণে, তারা যেন তাওবা করে এবং তিনি তাদের তাওবা কবুল করে নেন।
আমার পরিচিত এক ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য করে অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। একবার তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আমেরিকায় ট্যুর দেবেন। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি আমেরিকা গিয়ে সব ধরনের গুনাহ করার; প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভ্রমণের নির্ধারিত তারিখের কয়েকদিন পূর্বে হঠাৎ পিঠে ভীষণ ব্যথা অনুভব করলেন। বাধ্য হয়ে হাসপাতালে গেলেন। মেরুদণ্ড এক্সরে করে দেখা গেল অস্থিমজ্জায় টিউমার হয়েছে। রিপোর্ট শুনে তার হাত-পা অবশ হয়ে এল। ভ্রমণ বাদ দিয়ে ফিরে গেলেন সিরিয়ায়। এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদ, এক জ্ঞানের আসর থেকে আরেক আসরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। অবশেষে তিনি আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে তাওবা করেছিলেন।
মূলত আল্লাহ তাকে এই রোগ দিয়ে তাওবার প্রতি আগ্রহী করেছেন। তিনি যদি তাকে সুস্থতা, শক্তি ও অর্থ-বৈভবের মাঝে ছেড়ে দিতেন আর সে দুমাস পর প্রমোদভ্রমণ থেকে ফিরে এসে তার ব্যবসায় যোগ দিত, তাহলে পরের বছর সে ইউরোপ ভ্রমণে যেত। এমনটি হলে আল্লাহ তাআলা 'তাওয়াব' হতেন না।
আমি অত্যন্ত মেধাবী এক ব্যক্তিকে চিনি, যিনি আগে দ্বীন-শরিয়ত ও আলিমদের নিয়ে বিদ্রুপ করতেন। তার মতে ধর্ম হচ্ছে একটি কুসংস্কার ও মানসিক বিকার। তিনি ছিলেন দর্শনের শিক্ষক। হঠাৎ একদিন দেখলাম, তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন এসেছে। দেখে মনে হলো, যেন তিনি দ্বীনের পথে ফিরে এসেছেন। তার পরিবর্তনের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন-
এক বছর হলো আমি ও আমার স্ত্রী আল্লাহর কাছে তাওবা করেছি। আমার স্ত্রী হিজাব পরা শুরু করেছে, আল্লাহর আদেশ মেনে চলছে। আমি ৬ মাস যাবত মসজিদে আপনার মজলিসে অংশ নিচ্ছি। তার কথা শুনে আমি খুব আনন্দিত হলাম। তাদের প্রত্যাবর্তনের কারণ জানতে চাইলাম। সে বলল, আমার মেয়ে দূরারোগ্য এক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। আমি মেয়েটিকে খুব ভালোবাসতাম। তার চিকিৎসায় আমি কার্পণ্য করিনি। এদেশ-ওদেশ করে শেষ পর্যন্ত আমার বাড়িটিও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। সবশেষে আমার মন আমাকে বলল, 'তুমি ও তোমার স্ত্রী যদি আল্লাহর কাছে তাওবা করো, তাহলে আল্লাহ তোমার মেয়েকে সুস্থ করে দেবেন।' মনের আহ্বাবানে সাড়া দিয়ে আমি আল্লাহর কাছে তাওবা করলাম। আল্লাহ তাআলা আমার মেয়েকে সুস্থ করে দিলেন। এরপর থেকে এক বছর ধরে আমি কুরআনের মজলিসে অংশ নিচ্ছি।
প্রিয় পাঠক, আল্লাহর শপথ! আমার বর্ণনা করা প্রতিটি ঘটনার মধ্যেই আপনি অনুভব করবেন-আল্লাহর দয়ার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তিনি যদি বান্দাদের অপরাধ, বিচ্যুতি, অবাধ্যতা, প্রবৃত্তির কামনায় ডুবে যাওয়া, হারাম ভক্ষণ, অন্যের অধিকার হরণ ইত্যাদি হাজারো অন্যায় কাজে লিপ্ত রাখেন, তাহলে তারা জাহান্নামে যাওয়ার উপযুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি তাদের প্রতি দয়া করেন। আর তাই তাদেরকে বিপদে ফেলেন, যাতে তারা তাওবা করে ফিরে আসে তাঁর দিকে।
এক লোকের ধ্যান-জ্ঞান ছিল মুমিনদের আকিদা-বিশ্বাস নষ্ট করা। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত—আল্লাহ বলতে কেউ নেই; ধর্ম একটি কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তাআলা তাকে একটি মেয়ে দান করলেন। সে তাকে সীমাহীন ভালোবাসত। একবার মেয়েটির জ্বর এল। দেরি না করে সে তাকে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিলেন। কিন্তু ঔষধ খাওয়ার পরও জ্বর কমল না। তারপর একে একে অনেক ডাক্তারের কাছে গেল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। শেষে একজন বড় ডাক্তার বললেন, 'আপনার মেয়ের রোগটা খুবই রেয়ার। লাখে একজনের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়। মৃত্যু পর্যন্ত তাকে এই রোগটা বয়ে বেড়াতে হবে।'
ডাক্তারের কথা শুনে সে খুবই কষ্ট পেল। কয়েকদিনের মধ্যে তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করত সে। তার আশঙ্কা হলো, অফিসে গেলে তার অনুপস্থিতিতে মেয়েটি মারা যেতে পারে। তাই সে মেয়েকে নিয়েই অফিসে যেতে শুরু করল। কিন্তু অফিস কর্তৃপক্ষ তাকে এমনটা করার অনুমতি দিলো না।
ঘটনাটি আমি শুনেছি সেই লোকের স্ত্রীর কাছে। তার স্ত্রী বলেন, এমন কঠিন পরিস্থিতিতে দু-তিন মাস কেটে যাওয়ার পর একদিন সে বলল, 'আমি গোসল করব।' তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন জীবনে প্রথমবার গোসল করছে। গোসল করে সে সালাতে দাঁড়িয়ে গেল।' স্ত্রীর ভাষ্যমতে সে বলেছিল, 'হে আল্লাহ, তারা বলে আপনি আছেন। আপনি যদি থেকেই থাকেন, তাহলে আমার মেয়েকে সুস্থ করে দিন, নাহলে তাকে কিংবা আমাকে মৃত্যু দিন!'
গোসল করে সে দু-রাকাত সালাত আদায় করল। সালাতে অঝোরে কাঁদল। সালাত শেষে সালাম ফিরিয়েই দেখল, তার মেয়ের গায়ের তাপমাত্রা কমে গেছে। আল্লাহ তাআলা নিজ কুদরতে তাকে সুস্থ করে দিয়েছেন।
এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আমাদের জীবনে। একবার শনিবারের ধর্মীয় প্রোগ্রাম শেষে এক যুবক আমার সাথে দেখা করার অনুমতি চাইল। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সে এসে আমাকে তার বিপর্যস্ত জীবনের কাহিনি বলল—
'উস্তায, আল্লাহর শপথ! এমন কোনো গুনাহ নেই—যা আমি জীবনে করিনি। আমি বড় হয়েছি ধর্মহীন এক পরিবারে। এমন একজনের সান্নিধ্যে বড় হয়েছি, যিনি আমার অন্তরে বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন—আল্লাহ বলে কেউ নেই। তাই তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো।'
তারপর যুবকটি আমাকে তার জীবনের সফলতার কথা বলতে লাগল। কীভাবে ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছে, এরপর বিচ্যুতি ও অধঃপতনের পথে যাত্রা করেছে; সবকিছু সবিস্তারে তুলে ধরল। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। তারপর একদিন হঠাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা নেমে এল; সেই পরীক্ষা তাকে আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংস করে দিল। নিজেকে উপার্জনহীন অবস্থায় আবিষ্কার করল সে। স্ত্রী, সন্তানসন্ততি এমনকি সে নিজেও আক্রান্ত হলো কঠিন এক রোগে। খাবার কিংবা ঔষধ কেনার টাকা পর্যন্ত ছিল না তার কাছে।
সেসময়কার অবস্থা বর্ণনা করে সে বলল, 'আল্লাহর শপথ! তখন প্রতি মুহূর্তে যেন আমার মাথায় হাতুড়িপেটা চলছিল। তারপর একদিন এক মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। মুয়াজ্জিন তখন আজান দিচ্ছেন। নিজের অজান্তেই মসজিদে প্রবেশ করলাম আমি। জীবনের প্রথম সালাত পড়েছি সেদিন। অনেক কেঁদেছি সেদিন। আল্লাহর কাছে তাওবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।'
এরকম দু-তিনটি ঘটনা আমি নিজে শুনেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সাথেই এমন কোনো না কোনো ঘটনা ঘটে।
অনেক ভাই মসজিদে আসে বড় রকমের বিপদে পড়ে। আল্লাহ তাদেরকে বিপদগুলো দেন। তখন তারা তাওবা করে, আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেন, তাদেরকে ক্ষমা করে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।
অনেক মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। অপারেশন থিয়েটারে শুয়ে আল্লাহকে বলে, 'হে রব, যদি আমাকে এই রোগ থেকে সুস্থতা দান করেন, তাহলে আমি বাকি জীবন আপনার অবাধ্য হব না!' তখন আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা দান করেন; সে-ও তার প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকে। আল্লাহ যদি তাকে এই দুরারোগ্য ব্যাধি না দিতেন, তাহলে সে তাওবা করত না।
বিশ্বাস করুন, এমন ঘটনা ১০-২০টি নয়, শত শতও নয়; বরং হাজারো ঘটনা আমার কাছে পৌঁছেছে। আর আমরা যদি খোঁজ করি, তাহলে এই সংখ্যা কেমন হতে পারে! এটিই 'আত-তাওয়াব' এর অর্থ।
... ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا ...
তারপর তিনি তাদের প্রতি কল্যাণকামী হলেন, যাতে তারা তাওবা করে।
এই আয়াতের অর্থও এটিই। এই অধ্যায়ে এটিই সবচেয়ে সুন্দর আয়াত। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বিপদাপদ দেন, যাতে তারা তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ হয়। কিন্তু তাওবার ক্ষেত্রে কৃতিত্বের অধিকারী কে? যে বাধ্য হয়ে তার রবের কাছে ফিরে আসে, সে? নাকি যে তার রবের কাছে ফিরে আসে সুখ-সমৃদ্ধিতে থেকে, সে? সুখ-শান্তিতে থেকে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাতেই প্রকৃত কৃতিত্ব!
বিপদে পড়ার পর যে তাওবা করে, আল্লাহ তার প্রতিও সদয় হন। কিন্তু বিপদে পড়ে নয়; বরং সুখের সময়ই তাঁকে চিনতে হবে। চিনতে হবে—যখন আপনি থাকবেন স্বচ্ছল ও সামর্থ্যবান।
... ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا ...
তারপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা তাওবা করে।[১]
এই আয়াতে আল্লাহর অনুগ্রহের কথা আগে উল্লেখ করা হয়েছে, তারপর উল্লেখ করা হয়েছে বান্দার তাওবার (ক্ষমা প্রার্থনা) কথা।
পক্ষান্তরে আরেক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে—
إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তবে যারা তাওবা করে, (নিজেদের) সংশোধন করে এবং (যা গোপন করেছিল তা) বর্ণনা করে, আমি তাদের তাওবা কবুল করি। আর আমি তাওবা কবুলকারী, চির দয়াময়।[২]
এই আয়াতে আগে বান্দার তাওবার কথা এসেছে, পরে এসেছে আল্লাহর তাওবার কথা। যদি বান্দার তাওবার আগে আল্লাহর তাওবা আসে, তাহলে এর উদ্দেশ্য—বান্দার ওপর আপতিত বিপদাপদ। অপরদিকে যদি বান্দার তাওবার পর আল্লাহর তাওবা আসে, তাহলে এর উদ্দ্যেশ্য—তাওবা কবুল করা। আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করেন, তারপর আপনার তাওবা কবুল করেন। আপনি তাওবা করার প্রেরণা এবং সেই তাওবা কবুল হওয়ার আশার মাঝে বেঁচে থাকেন।
মনে রাখবেন, দ্বীনের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে থাকা মানেই বিপদের অপেক্ষায় থাকা। কোনো বিপদ, দুর্যোগ-দুর্বিপাক কিংবা সংকট আসার আগে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ, প্রজ্ঞাবানের কাজ।
অনেকে বলে, 'আল্লাহ তাওবার শুরুতে বান্দাকে বিপদ দেন, যাতে সে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ হয়। আর তাওবা পূর্ণ করেন তাওবা কবুল করে এবং তাওবার ওপর অবিচল রেখে।'
বান্দা কখনো বলে, 'হে আমার রব, আমি তাওবা করলাম। আর কখনো এই গুনাহ করব না।' কিন্তু সে এটা বলে না, 'হে আমার রব, আমাকে তাওবার ওপর অটল রাখুন।' কিংবা এটাও বলে না, 'হে হৃদয়-অবিচলকারী, আমার হৃদয়কে আপনার দ্বীনে অটল রাখুন, আপনার আনুগত্যে অবিচল রাখুন।'
এভাবে তাওবা করলে তাওবাকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। তাওবার ওপর অবিচল থাকার ক্ষমতা নিজেরই রয়েছে বলে মনে হয়। তাই দেখা যায়, তাওবা করার পরও আল্লাহ বান্দার প্রতিরোধ-ক্ষমতা দুর্বল করে দেন; সে আবার গুনাহে লিপ্ত হয়। এজন্য তাওবা কবুল করা এবং তাওবার ওপর অবিচল রাখা আল্লাহরই হাতে।
মানুষ যখন তাওবা করার পর পুনরায় গুনাহ করে, তখন তার ভারসাম্য একেবারে ধসে পড়ে। তাওবার পূর্বে লক্ষবার গুনাহ করা তাওবার পর একবার গুনাহ করার চেয়ে তুচ্ছ। আপনি যদি তাওবার পরও গুনাহ করেন, তাহলে আপনার আত্মিক শক্তি বিনষ্ট হয়ে যাবে। আপনি অনুভব করবেন, আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার এ পথ বুঝি চলার মতো নয়। আল্লাহ তাআলার এই বাণী আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে-
وَاللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَيُرِيدُ الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الشَّهَوَاتِ أَن تَمِيلُوا مَيْلًا عَظِيمًا
আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিতে চান। কিন্তু যারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তারা চায়-তোমরা বহুদূর বিচ্যুত হয়ে যাও। [১]
হাদিসে এসেছে-
তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি পানির সন্ধান পেয়ে, বন্ধ্যা নারী সন্তান পেয়ে কিংবা পথহারা ব্যক্তি পথ পেয়ে যতটা খুশি হয়, বান্দার তাওবায় আল্লাহ তাআলা এর চেয়ে বেশি খুশি হন। [১]
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে নিজ বাহনের ওপর আরোহী ছিল। তারপর তার বাহনটি হারিয়ে যায়। তার খাদ্য-পানীয়ও ছিল বাহনটির ওপর। এরপর নিরাশ হয়ে সে গাছের ছায়ায় এসে বিশ্রাম করে এবং বাহনের ব্যাপারে একেবারে নিরাশ হয়ে যায়। এমন সময় হঠাৎ উটটি তার কাছে এসে দাঁড়ায়। অমনি সে তার লাগাম ধরে ফেলে। তারপর আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে ওঠে, 'হে আল্লাহ, তুমি আমার বান্দা, আমি তোমার রব!' আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে ভুল বলে ফেলে।[২]
এই ব্যক্তি তার উট পেয়ে যতটা না আনন্দিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বান্দার তাওবায় এর চেয়েও বেশি আনন্দিত হন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ক্ষমা করতে চান। গুনাহগার বান্দা যখন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, একজন ফেরেশতা তখন আসমান ও জমিনে ঘোষণা দেয়-'তোমরা অমুক ব্যক্তিকে স্বাগতম জানাও। সে আল্লাহর সাথে সন্ধি করে নিয়েছে।'
আপনি দুনিয়াদারদের সাথে বসুন কিংবা পাপাচারী, প্রবৃত্তির অনুসরণকারীদের সাথে বসুন; সেই পাপাচারী আপনাকে তার দিকে টেনে নিতে চাইবে। সে চাইবে, আপনিও যেন তার মতো হয়ে যান। সে বলবে, 'চিন্তা-ভাবনা আমার কাঁধে ছেড়ে দাও। আল্লাহ তো 'তাওয়াব' (তাওবা কবুলকারী), 'রাহিম' (চিরদয়াময়)। এত যাচাই-বাছাই করার কিছু নেই। আল্লাহ এত যাচাই-বাছাই করেন না।'
এ নিয়েই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিতে চান।
কিন্তু যারা প্রবৃত্তির আনুগত্য করে, তারা চায়—তোমরা বহুদূর বিচ্যুত হয়ে যাও।[১]' এজন্য আল্লাহ্প্রদত্ত ইচ্ছাকে ভালো মনে করতে হবে। কারণ তিনি আপনার-আমার- আমাদের সবার জন্যই কল্যাণ ও চিরস্থায়ী সুখ কামনা করেন।
পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ রয়েছে, যারা কিছুদিন পরই অসহনীয় শাস্তির সম্মুখীন হবে; অথচ সে হয়তো গাড়িতে আয়েশ করে বসে আছে। আবার এমন মানুষও আছেন, যিনি কিছু সময় পরই সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন; অথচ দুনিয়াতে তিনি চলাফেরা করেন পায়ে হেঁটে। চলার পথে এ দুজনের দেখা হয়ে গেল কোথাও। দুজনের মধ্যে সফল কে? চর্মচোখে বিলাসবহুল গাড়িতে আরোহনকারী ব্যক্তিটি সফল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সফল পায়ে হেঁটে চলা ব্যক্তি।
কল্পনা করুন, প্রাসাদের মতো বিশাল এক বাড়ি, যেখানে আনন্দ-উপভোগের সবকিছুই রয়েছে। বাড়িটির মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলার। সেই বাড়িতে পৌঁছার একটিমাত্র রাস্তাই রয়েছে। সেই রাস্তায় একজন লোক পায়ে হেঁটে চলেছে বাড়িটির মালিকানা লাভের জন্য। আরেকজন লোক যাচ্ছে দ্রুতগামী গাড়িতে করে; তাকে খোলা মাঠে সবার সামনে ফাঁসি দেওয়া হবে। পথিমধ্যে এ দুজনের দেখা হলো। এমন পরিস্থিতিতে কে সুখে আছে?
চর্মচোখে মনে হবে, গাড়িতে আরোহী ব্যক্তিটি সুখে আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাবে, পায়ে হেঁটে চলা ব্যক্তিটি সুখে আছে। কারণ, সবকিছু বিবেচনা হয় চূড়ান্ত পরিণতির আলোকে।
আল্লাহ তাআলার এই বাণীসমূহ সূর্যের মতোই স্পষ্ট—
.... قُلْ تَمَتَّعُوا فَإِنَّ مَصِيرَكُمْ إِلَى النَّارِ
আপনি বলুন, 'তোমরা উপভোগ করে নাও। জাহান্নামের দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল।'[২]
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُم بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ قَالَ وَمَن كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَىٰ عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ
স্মরণ করুন, যখন ইবরাহিম বলেছিল, 'হে রব, একে (মক্কানগরীকে) একটি নিরাপদ শহর বানিয়ে দিন এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও বিচারদিবসে বিশ্বাস করবে, তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দিন ফলমূল দিয়ে।' তিনি (আল্লাহ) বলেছিলেন, 'আর যে অবিশ্বাস করবে, তাকেও কিছুদিনের জন্য এসব উপভোগ করতে দেব, তারপর তাকে ঠেলে দেব জাহান্নামের শাস্তির দিকে; তা কতই না মন্দ গন্তব্যস্থল!' [১]
لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ
দেশে দেশে কাফিরদের অবাধ বিচরণ যেন আপনাকে বিভ্রান্ত না করে। (এটা তো) স্বল্পসময়ের উপভোগ মাত্র। এরপর তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আর তা কতই না মন্দ নিবাস![২]
قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا
আপনি বলে দিন, 'পার্থিব ভোগসামগ্রী খুবই সামান্য। আর মুত্তাকিদের জন্য আখিরাত উত্তম। তোমাদের প্রতি অণু পরিমাণ জুলুমও করা হবে না।'[৩]
وَمَا أُوتِيتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى أَفَلَا تَعْقِلُونَ * أَفَمَنْ وَعَدْنَاهُ وَعْدًا حَسَنًا فَهُوَ لَاقِيهِ كَمَنْ مَتَّعْنَاهُ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ثُمَّ هُوَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْمُحْضَرِينَ
তোমাদের যা দেওয়া হয়েছে, তা কেবল পার্থিব ভোগসামগ্রী ও শোভাবর্ধক। পক্ষান্তরে আল্লাহর কাছে যা আছে, তা হলো উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। তবু কি তোমরা বোঝো না? যাকে আমি উত্তম (প্রতিদানের) প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যা সে পাবেই; সে কি ওই ব্যক্তির মতো-যাকে আমি পার্থিব জীবনের ভোগসামগ্রী দিয়েছি এবং এর জন্য তাকে কিয়ামতের দিন হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে?[১]
مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ ۞
তোমাদের কী হলো? কেমন বিচার করছ তোমরা?[২]
أَفَمَن كَانَ مُؤْمِنًا كَمَن كَانَ فَاسِقًا لَّا يَسْتَوُونَ ۞
একজন মুমিন কি একজন পাপাচারীর মতো হয়? তারা তো সমান হয় না [৩]
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ ۞
আমি কি মুসলিমদের অপরাধীর মতো গণ্য করব?[৪]
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَن نَّجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَّحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ ۞
দুষ্কৃতিকারীরা কি মনে করে, আমি জীবন-মৃত্যুর দিক থেকে তাদেরকে সেই লোকদের মতো করে দেব-যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে? তাদের সিদ্ধান্ত কতই না মন্দ![৫]
'তাওয়াব' নামের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে কল্যাণ দান করেন। 'তাওয়াব' নামটির কারণেই বৃষ্টি বর্ষিত হয়। 'তাওয়াব' নামের বদৌলতে আমরা বুকভরে শ্বাস নিই। পৃথিবীর সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছে শুধু 'তাওয়াব' নামের কারণে। এটি হলো 'তাওয়াব'-এর প্রথম অর্থ।
দ্বিতীয় অর্থটি হলো, আল্লাহ তাআলার ইশারা ও আদেশে বান্দাকে বিপদাপদ দান করা হয়। এ মর্মে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে-
فَإِن كَذَّبُوكَ فَقُل رَّبُّكُمْ ذُو رَحْمَةٍ وَاسِعَةٍ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُهُ عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ )
এসব বিষয়ে যদি তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করে, তাহলে আপনি বলে দিন- 'তোমার রব অসীম দয়ার অধিকারী। আর অপরাধী সম্প্রদায় থেকে তাঁর শাস্তির বিধান কখনোই ফিরিয়ে নেওয়া হবে না।' [১]
আয়াতটির প্রতি লক্ষ করে দেখুন, কত চমৎকার, কত সূক্ষ্ম অর্থবহ! আয়াতে উল্লিখিত এই দয়া কী?
তিনি বলেছেন, 'আর অপরাধী সম্প্রদায় থেকে তাঁর শাস্তির বিধান কখনোই ফিরিয়ে নেওয়া হবে না।' এটিও তাঁর দয়া ও রহমত। অপরাধী সম্প্রদায় থেকে শাস্তির বিধান ফিরিয়ে না নেওয়াও তাঁর রহমতের নমুনা।
মনে করুন, একজন আলিমের একটি মেধাবী ছেলে আছে। কিন্তু মেধা থাকলে কী হবে, ছেলেটি পড়ালেখায় একেবারেই অমনোযোগী। তখন বাবা তাকে শাসন করলেন এবং পড়ালেখার জন্য চাপ দিলেন। এক পর্যায়ে সে পরীক্ষায় ভালো করতে শুরু করল। এরপর থেকে তিনি সবসময় ছেলের পড়ালেখার খবর নিতে লাগলেন। অবশেষে সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট নিয়ে সে ডাক্তার হলো। চেম্বারে বসতে লাগল। প্রতিদিন তার কাছে ৩০-৪০ জন রোগী আসে। প্রতি মাসে ভালো উপার্জন করে সে। অতীতের কথা স্মরণ করে একদিন সে বলতে লাগল, 'হে আল্লাহ, ছেলেবেলায় আমার বাবা যে আমাকে শাসন করেছিলেন, সেজন্য তাকে সর্বোত্তম বিনিময় দান করুন। তিনি না থাকলে আমি আজ ডাক্তার হতে পারতাম না।'
কিন্তু এখানে চিত্র যদি ভিন্ন হতো-ছেলে যদি বলত, 'আমি পড়ব না।' আর বাবাও যদি ছেলেকে শাসন না করে ছেড়ে দিতেন, তাহলে সে পিছিয়ে পড়ত। সে বলত, 'বাবা কেন আমাকে মারেনি, শাসন করেনি? কেন আমাকে পড়ালেখার জন্য চাপ দেয়নি, বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি?' বাবার অজ্ঞতাপ্রসূত সরলতা ছেলেকে বাবার প্রতি বিদ্বেষী করে তোলে। আর বিচক্ষণতাপ্রসূত কঠোরতা ছেলের মনে বাবার প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়।
আরও উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরুন, কোনো মানুষ বিপথগামী হলো। আল্লাহ তাআলা তাকে বিপর্যয়ে ফেললেন, ভীতিপ্রদর্শন করলেন, নানা ধরনের সমস্যা দিলেন। সমস্যায় পড়ে সে সঠিক পথে ফিরে এল। এখন সে আল্লাহর নৈকট্য ও হিদায়াতের স্বাদ আস্বাদন করে মহাসৌভাগ্য অনুভব করে। সে বলে, 'হে আল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা আপনার। আপনি আমাকে বিপদ দিয়েছেন বলেই আজ আমি আপনার কাছে ফিরে এসেছি।'
বিপদগ্রস্ত কয়েকজন ভাইকে আমি বলেছি, 'সেই আল্লাহর শপথ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই! অচিরেই একটি সময় আসবে, যখন এই বিপদাপদের রহস্য উন্মোচিত হবে। তখন যদি ভালোবাসায় আল্লাহর প্রতি বিগলিত না হও, তবে জেনে রেখো এই দ্বীন অসত্য।'
প্রতিটি মানুষের জানতে হবে, আল্লাহ তাআলা তাওয়াব। তাওয়াব মানে যিনি আমাদের ভালোবাসেন।
মানুষ হয়তো মন্দ চিন্তা নিয়ে রাস্তায় চলতে থাকে। হঠাৎ সে দুর্ঘটনার শিকার হয়। আল্লাহ বলেন, 'হে আমার বান্দা, কোথায় চলছ তুমি?' হয়তো সে ভুল পথে হাঁটে, দৃষ্টির হিফাজত করে না। হঠাৎ সে দুর্ঘটনায় পতিত হয়; মাথা ফেটে যায়। আল্লাহ তাআলা তাওয়াব!
হারাম পন্থায় মানুষ হয়তো কিছু অর্থ আত্মসাৎ করে। কিন্তু সেজন্য আল্লাহ তার ১০ গুণ অর্থ বরবাদ করে দেন। মিস্ত্রি কোনো বিকল যন্ত্র ঠিক করে গ্রাহকের কাছে বেশি দাম চেয়ে বলে, '১০ হাজার টাকা।' গ্রাহক হয়তো জানে না সেটা। প্রতিবেশী তাকে তিরস্কার করলে সে উত্তর দেয়, 'এভাবেই অর্থ উপার্জন করতে হয়।' তারপর কয়েকদিন যেতে না যেতেই তার ছেলের চোখে লোহার গুঁড়ো ঢোকে। চিকিৎসা বাবদ খরচ হয় ৬০ হাজার টাকা। এভাবে তার হারাম লাভ নিমিষেই চলে যায়; তার শিক্ষা হয়। আল্লাহ তাআলা তাওয়াব!
এক ভাই পাইকারি কাপড়ের ব্যবসা করেন। একদিন এক ক্রেতা তার কাছ থেকে ৬টি কাপড় কিনতে চায়। সে তখন তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলে, 'আমি খুচরা বিক্রি করি না।' লোকটি তখন তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যায়। ব্যবসায়ী ভাইটি আমাকে আল্লাহর শপথ করে বলে, 'এরপর টানা ২৩ দিন আমার দোকানে কোনো ক্রেতা আসেনি।' আল্লাহ তাআলা তাওয়াব!
পিতল কিংবা লোহার দিকে তাকিয়ে দেখুন। যত হাতুড়ি-পেটা করা হয়, পিতল-লোহা তত বেশি উজ্জ্বল হয়, সুন্দর হয়। মুমিন বান্দাও এমন। তার ওপর যত বিপদাপদ আসতে থাকে, সে আল্লাহর প্রতি তত অনুগত হয়, তত সুন্দর হয় তার কথা। তার কোনো অহংকার থাকে না। একেই বলে আল্লাহপ্রদত্ত শিক্ষা।
এটিই তাওয়াবের অর্থ। তিনি আপনার চিকিৎসা করেন; আপনি হয়ে যান ফেরেশতার মতো পবিত্র।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'মুমিন নর-নারীর ওপর, তার সন্তানসন্ততি ও ধন-সম্পদের ওপর বিপদাপদ লেগেই থাকে। অবশেষে আল্লাহর সাথে সে গুনাহমুক্ত অবস্থায় মিলিত হয়।' [১]
প্রিয় ভাই, সেই আল্লাহর শপথ—যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই! আমি আপনাদের কল্যাণকামী। আমি আগে বলতাম, আমার দাওয়াহর সারনির্যাস ২টি কথা— » হয়তো আপনি আল্লাহর দিকে দৌড়ে যাবেন। » নাহলে তিনি আপনাকে দৌড়িয়ে নেবেন।
আল্লাহ আপনাকে কীভাবে তাঁর দিকে নেবেন, তিনিই ভালো জানেন। তিনি জানেন কীভাবে ভীতিপ্রদর্শন করবেন, কীভাবে আপনার পা-কে কম্পিত করবেন, দুঃসংবাদ শুনিয়ে কীভাবে বেহুঁশ করবেন আপনাকে। তাই আপনি নিজেই তাঁর দিকে ধাবিত হোন। সেটাই আপনার জন্য উত্তম। তাড়াতেই বছরের মারফতী আমার পরিচিত এক ভাই, নিজের ওপর সে অনেক জুলুম করেছে। তার এক কল্যাণকামী প্রতিবেশী তাকে উপদেশ দিত, কিন্তু সে তার কথা শুনত না। গুনাহগার অবস্থায়ই সে মৃত্যুবরণ করল।
মৃত্যুর পর একজন স্বপ্নে দেখল, লোকটি ছেঁড়া মোটা জামা গায়ে দিয়ে একটি পুকুরের চারপাশে ঘুরছে আর বলছে, 'অমুক আমাকে উপদেশ দিয়েছে, কিন্তু আমি তার উপদেশ গ্রহণ করিনি। আপনারা আমার মতো হবেন না। কেউ যদি আপনাদের উপদেশ দেন, তাহলে আপনারা তার উপদেশ গ্রহণ করুন।'
যতক্ষণ মানুষের হৃদস্পন্দন থাকে, ততক্ষণ তার হৃদস্পন্দন যেন তাকে বলতে থাকে- 'তোমার জন্য তাওবার দরজা খোলা আছে।'
তিনি ছিলেন এক বিরাট কারখানার মালিক। একদিন আমার কাছে এলেন। আমাকে তার এই ঘটনাটি বললেন, '১০ বছর আগে হঠাৎ লক্ষ করলাম, আমার টাকা হারিয়ে যাচ্ছে। একদিন পকেটে ২ হাজার টাকা রেখেছিলাম; কিছুক্ষণ পর দেখি নেই। কারখানায় এক শ্রমিক এই কাজ করত। সে-ই চুরি করত। আমি একমাস পর্যবেক্ষণ করলাম। প্রতিদিনই টাকা নাহয় কারখানার মাল চুরি হচ্ছিল। তারপর হঠাৎ চুরি থেমে গেল।
এই ঘটনার ১০ বছর পর একদিন এক যুবক আমার দরজায় কড়া নাড়ল। তার মুখে সুন্নতি দাড়ি। দরজা খুললে সে বলল, 'আমি অমুক, চিনতে পেরেছেন?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, তুমি তো আমাদের কারখানায় কাজ করতে।' সে বলল, 'আমি আপনার টাকা চুরি করতাম, কারখানার মালও চুরি করতাম। তারপর আল্লাহর কাছে তাওবা করেছি। আজ আমি আপনার হক ফিরিয়ে দিতে এসেছি।' আমি তাকে বললাম, 'আল্লাহ তোমার তাওবা দেখেছেন, তোমার ফিরে আসা দেখেছেন। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি যেকোনো সময় চাইলে আমার কারখানায় ফিরে আসতে পারো।'
যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ সমাধান সহজ; সবকিছু সেরে উঠতে পারে। আপনি আপনার পূর্বের ঋণগুলো পরিশোধ করতে পারবেন, হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন তার হক। যার গিবত করেছেন, তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারবেন। হয়তো আপনি আল্লাহর কাছে স্বেচ্ছায় তাওবা করতে পারবেন, নয়তো আল্লাহ আপনাকে তাঁর কাছে ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ করবেন। তবে স্বেচ্ছায় তাঁর কাছে ফিরে আসাই সবচেয়ে উত্তম ও সুন্দর।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার রাতের তৃতীয় প্রহরে তার উম্মতের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে দুআ করেছেন। জবাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়েছে, 'আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম; তবে যারা জুলুম করেছে, তাদের ছাড়া। কারণ অবশ্যই আমি তাদের থেকে মাজলুমের প্রতিশোধ নেব।' [১]
আল্লাহ ও বান্দার মাঝে যা হয়েছে, আল্লাহ তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কিন্তু বান্দাদের পরস্পরের বিষয়ে অবশ্যই সমাধান করতে হবে।
আশা করি, সবাই নিজের ব্যাপারে মুহাসাবা (হিসাব) নেবেন। সবচেয়ে সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যিনি সবক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশমতো চলেন। সবচেয়ে সৌভাগ্যবান তিনিই, যিনি সবক্ষেত্রে আল্লাহর আনুগত্য করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
... وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا )
যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।[২]
তিনি আরও বলেন-
... إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ )
তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ।[৩]
'তাওয়াব' অর্থ কেবল এটা নয়, আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে ন্যায়বিচার করেন; বরং তিনি দয়ার আচরণও করেন। যত্নশীল বাবা প্রতিদিন সন্তানকে ডেকে তার পড়াশোনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন, খোঁজখবর রাখেন। বাবা যদি ছেলেকে নিজের ওপর ছেড়ে দেন, তাহলে সে পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করে, তখন বাবা যদি বলেন, 'আমার যা দায়িত্ব ছিল, তা আমি পালন করেছি।' ছেলে তখন বলতে পারে, 'আপনি দায়িত্ব পালন করেছেন ঠিক, কিন্তু আমার প্রতি যত্নশীল ছিলেন না। আপনি বরং ন্যায়সংগত আচরণ করেছেন। যদি যত্নশীল হতেন, তাহলে আমাকে ছেড়ে দিতেন না।'
আমাদের রব তাওয়াব। তিনি আপনাকে আমানত দিয়েছেন, বিবেক দিয়েছেন, অস্তিত্ব দিয়েছেন; দিয়েছেন ইচ্ছাধিকার, প্রবৃত্তির চাহিদা ও শরিয়ত। তারপরও আপনার চারপাশের মানুষজন আপনাকে উপদেশ দিতে থাকে।
একবার আমাদের এক ভাইয়ের বেশ কিছু টাকার প্রয়োজন পড়ে। একটি বাড়ি খুব পছন্দ হয়েছে তার। কিন্তু বাড়িটির দাম ভীষণ চড়া, ২৫ লক্ষ টাকা। প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা এটা। তার কাছে তখন আছে মাত্র ১০ লক্ষ টাকা মানে লাগবে আরও ১৫ লক্ষ। ব্যাংকে তার ডিপোজিট ছিল। সে ডিপোজিটের মুনাফা নিতে গেল ব্যাংকে। ডিপোজিটের মুনাফা মূলত সুদ। সেই ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন অমুসলিম। ম্যানেজার বললেন, 'স্যার, আপনি তো একজন মুসলিম। এই টাকাটা আপনার ধর্মে হারাম। হারাম টাকা নেওয়ার দরকার নেই; আপনি পবিত্র থাকুন।'
আমার ভাই এই ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, 'ম্যানেজারের কথা শুনে আমি কাঁদতে লাগলাম। হায়, আমি আমার দ্বীনের ব্যাপারে একজন অমুসলিমের কাছ থেকে উপদেশ শুনছি!' মনে মনে বললাম, 'হে আল্লাহ, আমি ওয়াদা করছি-আপনার নাফরমানি করে আমি এই বাড়ি কিনব না।'
ব্যাংক থেকে বের হয়ে আমি আমার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখি, এক পুরোনো বন্ধু আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কুশলাদি বিনিময়ের পর সে আমাকে বলল, 'আমি কুয়েত যেতে চাচ্ছি। আমার কাছে ৬০ লাখ টাকা আছে। আপাতত এই টাকাগুলো আমার লাগবে না। আমি তোমার কাছে এগুলো দু-বছরের জন্য জমা রাখতে চাই। তুমি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারো।' আল্লাহর শপথ, আল্লাহর নাফরমানি না করার ওয়াদা করার মাত্র আধ ঘণ্টা পরের ঘটনা এটি।
দেখুন, আল্লাহ তাআলা কীভাবে এই ভাইকে রক্ষা করলেন! আল্লাহ তাকে কোনো বিপদ দেননি। একজন অমুসলিমের মাধ্যমে তাকে উপদেশ দিয়েছেন, যাতে সে পবিত্র থাকে।
আল্লাহ তাআলা প্রজ্ঞাবান। আপনি যদি ইশারায় আসেন, তাহলে মুখে বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি মুখের কথায়ই চলে আসেন, তাহলে মারধরেরও প্রয়োজন নেই। মানুষ যখন অনুভূতিশীল হবে, তখন সে ইশারার মাধ্যমে বুঝতে পারবে। আবার কখনো মানুষ বিপদে পড়ার পরও বোঝে না। তখন তার প্রয়োজন হয় প্রকাশ্য শিক্ষা কিংবা লাঞ্ছনাকর আজাব বা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহর কাছে বান্দার অবস্থান যত উন্নত হয়, সংশোধনের জন্য ইশারাও তত যথেষ্ট হয়।
তাওয়াব অর্থ আল্লাহ তাআলা আমাদের কখনোই ছেড়ে দেন না। বরং তিনি আমাদের চান; আমরা তাঁর কাছে কাঙ্ক্ষিত। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন সুখ দান করার জন্য, আমাদের প্রতি দয়া করার জন্য, দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যবান করার জন্য।
মনে রাখবেন, বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। আর যদি আপনি বুদ্ধিমান না হন; আল্লাহর ইশারা না বোঝেন, তাহলে আল্লাহ আপনাকে ফিরে আসতে বাধ্য করবেন। মাঝে মাঝে লক্ষ করি, আমার অনেক ভাই মজলিস ত্যাগ করে চলে যায়। কয়েক মাস পর তারা আবার ফিরে আসে। আমার বিশ্বাস, অবশ্যই তারা কোনো বিপদে পড়েই আবার ফিরে এসেছে।
প্রিয় পাঠক, নেক আমলে অবিচল থাকুন। কেননা আল্লাহ তাআলা নেক আমলে অবিচল বান্দাকে ভালোবাসেন। বিক্ষুব্ধ তরঙ্গে দোদুল্যমান ছোট নৌকার মতো হবেন না; বরং হোন সুস্থির জাহাজের মতো।
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُم مَّن قَضَىٰ نَحْبَهُ وَمِنْهُم مَّن يَنتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا )
মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর সাথে করা প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে। তাদের মধ্যে কেউ মৃত্যুবরণ করেছে আর কেউ আছে প্রতীক্ষায়। কিন্তু তারা (তাদের সংকল্প) কোনোভাবেই পরিবর্তন করেনি [১]
আপনি যদি বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তার সাথে অঙ্গীকার করেন, তাহলে আর কিছু বাকি থাকে না। যদি আপনি আল্লাহর কাছে আনুগত্য, জ্ঞানার্জন ও মানুষের সেবার ওয়াদা করেন, তাহলে সেই ওয়াদার ওপর অবিচল থাকুন।
টিকাঃ
[১] সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৪৬
[১] ইংরেজি Mentor (মেন্টর) শব্দটি এর কাছাকাছি অর্থ দেয়।
[১] সুরা হুদ, আয়াত: ১১৯
[১] সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬
[১] সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৮
[২] তাবুকের যুদ্ধে ৩ জন সাহাবি অনুপস্থিত ছিলেন। তারা ছিলেন প্রকৃত মুসলিম। এজন্য তারা নিজেদের ভুলও স্বীকার করেন। এই কাজের শাস্তি হিসেবে ৫০ দিনের জন্য তাদেরকে বয়কট করা হয়। এ সময়টা তারা কাটান সীমাহীন দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে আল্লাহ তাদের ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে উল্লিখিত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। সেই ৩ জন সাহাবি হলেন-কাব ইবনু মালিক, হিলাল ইবনু উমাইয়া ও মুরারাহ ইবনুর রাবি রাযিয়াল্লাহু আনহুম। [সহিহুল বুখারি: ৪৪১৮; সহিহ মুসলিম: ২৭৬৯]
[১] সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৮
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬০
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ২৭
[১] কানযুল উম্মাল: ১০১৬২; আল-জামিউস সগির, ইমাম সুয়ুতি: ১০১০৩; ইলালুদ দারাকুতনি: ১৩৪১; হাদিসটির সনদ দুর্বল।
[২] সহিহ মুসলিম: ২৭৪৭; শারহুস সুন্নাহ, ইমাম বাগাবি: ১৩০৩; মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৩৩২।
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ২৭
[২] সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩০
[১] সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৬
[২] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৯৬-১৯৭
[৩] সুরা নিসা, আয়াত: ৭৭
[১] সুরা কাসাস, আয়াত: ৬০-৬১
[২] সুরা কলম, আয়াত: ৩৬
[৩] সুরা হা-মিম সাজদা, আয়াত: ১৮
[৪] সুরা কলম, আয়াত: ৩৫
[৫] সুরা জাসিয়া, আয়াত: ২১
[১] সুরা আনআম, আয়াত: ১৪৭
[১] জামিউত তিরিমিযি : ২৩৯৯; সহিহ্বল জামি: ৫৮১১; রিয়াযুস সালিহিন: ৪৯; হাদিসটি হাসান সহিহ।
[১] সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩০১৩; মিশকাতুল মাসাবিহ : ২৬০৩; আল-মুসনাদুল জামি : ৫৬৩৮; হাদিসটির সনদ দুর্বল।
[২] সুরা আহযাব, আয়াত: ৭১
[৩] সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩
[১] সুরা আহযাব, আয়াত: ৩২