📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-খাবির : সর্বজ্ঞ, মহাবিজ্ঞ, পরিজ্ঞাত

📄 আল-খাবির : সর্বজ্ঞ, মহাবিজ্ঞ, পরিজ্ঞাত


ছোট্ট শিশুর দাঁত তুলতে হবে। দন্ত-চিকিৎসক সবটুকু কৌশল ব্যয় করে আলতোভাবে দাঁত তোলার চেষ্টা করে যায়। শিশুটি যেন ব্যথা না পায় সেজন্য তার সাথে মজার মজার কথা বলতে থাকে। তবুও কি পারে বাচ্চাটিকে ভুলিয়ে রাখতে? হয়তো দাঁত উপড়ে ফেলার অসহনীয় যন্ত্রণা অথবা চেতনানাশক ইঞ্জেকশন পুশ করার নিদারুণ কষ্ট—দুটির কোনো একটি বাচ্চাটিকে কাঁদিয়েই ছাড়ে! কিন্তু আল্লাহ যখন এই শিশুটির দুধদাঁত পরিবর্তন করতে চান, কোনো রকম কষ্ট ছাড়াই দাঁতের গোড়া নড়বড়ে করে দেন। মজার খেলনার মতো বাচ্চা নিজেই দাঁতটি তুলে ফেলে। কোনো ব্যথা-বেদনা ছাড়াই পড়ে যায় সেই দাঁত। যিনি অতি আদর করে এমন আলতোভাবে সোনামণির দাঁত তুলে দেন তিনিই আল-খাবির; মহাবিজ্ঞ রব।

আল-খাবির এমন সত্তা যিনি সবকিছু জানেন; কোনো কিছুই তাঁর অবগতির বাইরে থাকতে পারে না। সকল বিষয়ের মূল উপাদান, স্বভাব-প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্যাবলি এবং সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর তত্ত্ব ও তথ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত তিনি। কোনো লুকায়িত ব্যাপার তাঁর কাছে অস্পষ্ট থাকে না। রোগ এবং রোগের চিকিৎসাও তিনি জানেন। সকল বস্তুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। চর্মচোখে আমরা যা কিছু দেখতে পাই বা না পাই, তিনি তার সবকিছুই দেখেন। ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ এবং অন্তরের মধ্যে লুকায়িত কোনো খবরও যার কাছে অস্পষ্ট থাকে না তিনি আল-খাবির’। পৃথিবী ও মহাবিশ্বের কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টির অগোচরে ঘটতে পারে না। ক্ষুদ্রকায় একটি পিপীলিকাও তাঁর অবগতির বাইরে চলাফেরা করতে পারে না, গর্তে আশ্রয় নিতে পারে না। বিপদাপদে কেউ অস্থির হয়ে উঠুক, পিপাসায় ছটফট করুক কিংবা শান্ত-প্রশান্ত থাকুক, তার খবরও তিনি রাখেন।
কেউ ভাবতে পারেন এগুলো তো আল-আলিম, মহাপরিজ্ঞাত সত্তার বৈশিষ্ট্য। আল-খাবিরের সাথে এসবের কী সম্পর্ক? কিন্তু বাস্তবে আলিম এবং খাবিরের মাঝে বিস্তর ফারাক।
আমি সবার সামনে একটি গ্লাস উঠিয়ে অন্য জায়গায় রাখলাম। আপনি দেখলেন, আমি গ্লাস উঠিয়ে রেখেছি। তাহলে এ ব্যাপারে আপনার অবগতি রয়েছে। আপনি বিষয়টি জেনেছেন। কিন্তু আমি কেন গ্লাসটি উঠিয়েছি, কেনই বা তা সরিয়ে অন্য কোথাও রেখেছি-সে ব্যাপারে, আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনি কিছুই বলতে পারবেন না।
কিন্তু আল-খাবির হলেন সেই সত্তা যিনি বাহ্যিক অবগতির সাথে সাথে তার অভ্যন্তরীণ রহস্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সমানভাবে অবগত।
মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন-

... وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ))

তোমরা যা করো, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সম্যক অবহিত [১]

আপনি কৌশল করে অসৎ উদ্দেশ্যে একটি কাজ করলেন। পৃথিবীর কেউ জানল না আপনার মনের অভিপ্রায়। সকলে ভাবল আপনি বেশ ভালো একটি কাজ করেছেন। অথবা প্রকাশ্যে আপনি কাউকে অভিনন্দন জানালেন অথচ ভেতরে ভেতরে আপনি তাকে প্রচণ্ড রকম ঘৃণা করেন। কখনো কারো সামনে আপনি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন, অথচ আপনার অন্তর্জগৎ তার প্রতি বিদ্বেষে ভরপুর। বাইরের পৃথিবীর কেউ জানে না আপনার আসল পরিচয়। কিন্তু আপনার অন্তরের অতলান্তের ঐ সংবাদটুকুও যিনি জানেন তিনি আল-আলিম (সম্যক অবগত) হওয়ার পাশাপাশি আল-খাবির তথা মহাবিজ্ঞ।
কারো বাসায় তার স্ত্রীর বান্ধবী বেড়াতে এলো। স্ত্রীর সাথেই সে বসল। তখন স্বামী খুব বিনয়ের সাথে বলল, 'তোমরা এখানে এসো। এই ঘরটি বেশ উন্ন; এখানে দারুণ সময় কাটবে তোমাদের।' এখন খেয়াল করে দেখুন। স্বামী যে আবেদন করেছে সেটাই কি বাস্তব নাকি 'ডাল মে কুচ কালা হ্যায়'? বাস্তবেই সে কি অতিথির সমাদর করতে চায়? না তার অন্তরে জেগে ওঠা কোনো কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে চায়? অতিথি বুঝবে না; স্ত্রীও বুঝবে না। কিন্তু প্রতিটি কাজের ভেতর-বাহির, হেতু, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট এবং খুঁটিনাটি সব বিষয়ে যিনি অবগত তিনি আল-খাবির।
আপনি প্রায়ই অনেক বিপদগ্রস্ত লোক দেখতে পাবেন, যারা সমাজে অত্যন্ত নেককার হিসেবে পরিচিত। আপনার অজান্তেই আপনার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে, এত ভালো মানুষটির এমন বিপদ কীভাবে হলো? কিন্তু আপনি তার আসল রহস্য জানেন না। ভালো মানুষটিরও কেন বিপদ হবে? তাকেও কেন মসিবত গ্রাস করবে, তা আপনি জানতে পারেন না, কিন্তু আল্লাহ জানেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপন করুণায় কোনো মহৎ উদ্দেশ্যেই তাকে বিপদ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা যেহেতু আপনার সবকিছুর সম্পর্কে সম্যক অবহিত; কল্যাণ-অকল্যাণ, ভালো-মন্দ এবং আপনার বর্তমান-ভবিষ্যতের ব্যাপারেও অবগত, তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে যদি কোনো মসিবত নেমে আসে, তাতে কখনো বিচলিত হবেন না। কে জানে এই সাময়িক বিপদের সেতু পার হলেই সামনে রয়েছে সৌভাগ্যের সবুজ বাগান! কত মানুষ আছে ঘর থেকে নিয়ে মসজিদ পর্যন্ত; নির্জনতা থেকে লোকালয় আর বাজার-ঘাট পর্যন্ত সবার মুখে মুখে তার প্রশংসা। আপাদমস্তক নেককার একজন মানুষ। মহান আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে অঢেল সম্পদও দান করেছেন তাকে। কিন্তু কেউ কি জানে, তার এই সৌভাগ্যের স্থায়িত্ব কতদিনের? তার এই অবস্থা কি স্থায়ী হবে, না অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে—সে কথা কি কেউ বলতে পারে? কেবল আল্লাহই জানেন, অতীত-বর্তমানের সব সংবাদ। যা ঘটেনি তা যদি ঘটত তাহলে কী হতো? অথবা যদি সামনে তা ঘটে তাহলে কী হবে? সেসব বিষয় সম্পর্কেও সম্যক অবহিত মহান রব আল-খাবির, সম্যক অবগত, মহাবিজ্ঞ।
অন্তরের প্রবণতা এবং প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে এত গভীরভাবে আর কেউ কি জানতে পারে?

মানুষের জ্ঞান নিতান্ত সীমিত

একদিন এক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ প্রবল বেগে ঘূর্ণিঝড় শুরু হলো। দেখলাম ঝড়ের প্রকোপে একটি প্রাচীর বিধ্বস্ত হওয়ার উপক্রম। প্রাচীর-নির্মাতারা কি জানত এখানে এত গতিবেগে বাতাস বইতে পারে? অবশ্যই তারা জানত না। জানলে তারা সর্বসাধ্য ব্যয় করে বিপদসীমার চেয়েও মজবুত করে তা নির্মাণ করত। মানুষ কীভাবে জানবে? কোনো কিছু সম্পর্কে জানতে হলে তো সে ব্যাপারে আগে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।
জটিল পরিস্থিতিতে ক্ষয়-ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য আমরা নানা উপায় খুঁজতে থাকি। বিপদ-আপদ ও দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয়। যেমন: কোনো যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হলে তাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে তা নির্ণয় করার জন্য অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়।
গাড়ির কোম্পানি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে কোনো চালক ছাড়াই একটি গাড়ি ছেড়ে দেয়। গাড়ির সামনে থাকে সিমেন্ট আর কংক্রিটের তৈরি মজবুত প্রাচীর। হাই স্পিডে ছুটে গিয়ে দেওয়ালের সাথে গাড়িটির বিশাল সংঘর্ষ হয়। তখন কোম্পানি পর্যবেক্ষণ করে, যে ধাতু দ্বারা গাড়ির বডি তৈরি করা হয়েছে তাতে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতির এই মারাত্মক সংঘর্ষের প্রতিক্রিয়া কেমন? এবং সংঘর্ষ কোন পর্যন্ত পৌঁছেছে? এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এরপরও তা কত ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে! আর যে কোম্পানি কোনো পরীক্ষা করা ছাড়াই গাড়ি তৈরি করেছে, তাদের গাড়ি তো সামান্য কোনো সমস্যার কারণেও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
মানুষের জ্ঞান কত সীমিত! কেমন বিপর্যয় ঘটতে পারে তা জানতেও তাদের অপেক্ষা করতে হয় বিপর্যয়ের আগপর্যন্ত।

আল্লাহর জ্ঞান পরিব্যাপ্ত ও পরিপূর্ণ

মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি নিতান্তই সীমিত ও অসম্পূর্ণ; কিন্তু আল্লাহ তাআলার জ্ঞান সম্পূর্ণ ও চিরায়ত। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা সবই অর্জিত ও শ্রমলব্ধ। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অনাদি, অনন্ত। আদিকাল থেকে মানুষের দৈহিক গঠন, শারীরিক অবকাঠামো এক ও অভিন্ন। তাতে কি এই সুদীর্ঘকালেও কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়েছে? অথচ আপনি লক্ষ করলে দেখবেন, ১৯৯০ সালে তৈরি হওয়া গাড়ি আর ১৯৯৫ সাথে তৈরি হওয়া গাড়ি দুটির মাঝে এত বেশি ব্যবধান যা আমাদের বিস্মিত করে তোলে। প্রথমে যে ট্রেনটি আবিষ্কার করা হয়েছিল, তার সামনের দিকে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকত। চলাচলের সময় সে লোকজনকে সতর্ক করত। আর সেই ট্রেনের গতি একজন মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে খুব বেশি ছিল না। অথচ বর্তমানের একটি ট্রেন ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার বেগে ছোটে। এখন থেকে পঞ্চাশ বছর আগের টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি প্রযুক্তিতেও আপনি একই চিত্র লক্ষ করবেন। এভাবে প্রতিনিয়তই বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নতি ও অগ্রগতির ফলে নতুন নতুন অনেক কিছু আবিষ্কৃত হচ্ছে, যা পূর্বের আবিষ্কারগুলোকে নিতান্ত ছেলেখেলায় পরিণত করছে। প্রতিটি গবেষণা-প্রযুক্তিতে যে ত্রুটি থেকে যায়, পরবর্তী গবেষণা সেটার ত্রুটি সংশোধন করে দেয়।
রোগজীবাণু বিধ্বংসী কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের শুরুতে সেটা মানুষ বা প্রাণীর শরীরে স্থাপন করে দেখা হয়, ভ্যাকসিনটা জীবাণু ধ্বংস করতে পেরেছে নাকি পারেনি? এভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই বিজ্ঞানীরা ওষুধপত্র আবিষ্কার করে থাকে। কিন্তু মহান আল্লাহ সেই অনাদি থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত কখনো কোনো গবেষণা, অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই আসমান, জমিন এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের অভিনব অস্তিত্বদান করেছেন। এজন্যই মানুষের গবেষণার সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান, উদ্ভাবন-আবিষ্কারকে বলা হয় পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান।

মাতৃগর্ভে মহাবিজ্ঞ রবের প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনা

মাতৃগর্ভে শিশু প্রতিপালনের যে চমৎকার ব্যবস্থাপনা তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন তা দেখে যে-কারো মেধা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে।
মাতৃদুগ্ধে আয়রনের কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ রক্তের লৌহকণিকা বা হিমোগ্লোবিন তৈরি হওয়ার প্রধান উপাদানই হচ্ছে আয়রন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যদি আমরা একটি দুধের শিশুর রক্ত পরীক্ষা করি তাহলে দেখতে পাব, তাতে যথেষ্ট পরিমাণ হিমোগ্লোবিন রয়েছে। দুই বছর বয়স হওয়ার পর শিশু বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণের পূর্বপর্যন্ত শিশুর রক্তে যে পরিমাণ লৌহকণিকার প্রয়োজন, মায়ের দুধই তা সরবরাহ করার জন্য যথেষ্ট। যে মহান সত্তা এমন অসাধারণ ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছেন তিনি আল-খাবির।

হৃৎপিন্ডের ওপরের ও নিচের প্রকোষ্ঠ-অলিন্দ ও নিলয়ের মাঝে কে ছিদ্র সৃষ্টি করেছেন? মানবদেহে রক্ত সংবহনের সাধারণ প্রক্রিয়া হলো ফুসফুস থেকে অলিন্দে রক্ত প্রবেশ করে। কিন্তু মাতৃগর্ভস্থ শিশুর ফুসফুস নিষ্ক্রিয় থাকে, সেখানে না আছে কোনো বাতাস, না আছে শ্বাস-প্রশ্বাস। যেহেতু তার ফুসফুস নিষ্ক্রিয়, তাই তার রক্ত ফুসফুস থেকে অলিন্দে সঞ্চালিত না হয়ে বরং বিশেষ গহ্বরের মাধ্যমে এক অলিন্দ থেকে আরেক অলিন্দে সঞ্চালন করে। যখন শিশুটির জন্ম হয় তখন একটি রক্তপিণ্ড এসে ঐ ছিদ্রটিকে বন্ধ করে দেয়। তখন থেকে আবার স্বাভাবিক গতিতেই অলিন্দ থেকে ফুসফুস, ফুসফুস থেকে আরেক অলিন্দ হয়ে তা নিলয়ে রক্ত সঞ্চালন করে। যে মহান প্রভু এই ব্যবস্থাপনা করেছেন নিশ্চয় তিনি আল-খাবির, মহাবিজ্ঞ।
আপনি যখন হাতের নখ কাটেন, মাথার চুল কাটান, তখন কি কোনো ব্যথা অনুভব করেন? অথচ শরীরের অন্য যেকোনো স্থানেই কোনোরূপ আচড় লাগলে আপনি ব্যথায় কাতরে উঠবেন। চুল-নখ আপনার দেহের অঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও তা কাটতে কোনো ব্যথা লাগে না। কেননা, আল্লাহ তাআলা নখ ও চুলে অনুভূতি সঞ্চারক স্নায়ুতন্তু (নিউরন) সৃষ্টি করেননি। নখ ও চুলেও যদি তিনি নিউরন সৃষ্টি করতেন, তাহলে প্রতিবার চুল-নখ কাটার সময় আমাদের হাসপাতালে যেতে হতো, চেতনানাশক ইঞ্জেকশন নিতে হতো। অনুভূতি-তত্ত্ব তিনি সৃষ্টি করেছেন শরীরের হাড়-মাংসে। তাই হাড় ভেঙে গেলে মানুষ মারাত্মক ও অসহনীয় ব্যথা অনুভব করে। বেদনায় কাতরাতে থাকে। এভাবে শুধু মানুষ নয়; প্রাণিদেহেও যদি আপনি গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে যান, আপনি বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। আল্লাহর কুদরতের অপার কারিশমা দেখে আপনার মেধা-বুদ্ধি জমে যাবে, বিশ্বাসী হৃদয় তাঁর সম্মুখে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে।
এই অসাধারণ ও অতিপ্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা যিনি করেন, তিনি আল-খাবির।
আপনার বাড়ির পাশের বাগানের মালীকে দেখেছেন, কত যত্ন করে গাছগুলোকে পরিচর্যা করে। সে যদি গাছে পানি দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে? প্রথমেই গাছের সবুজ, লকলকে পাতাগুলো শুকিয়ে যাবে। পাতার রস শুকানোর পর ডালের রস শুকিয়ে যাবে। তারপর গাছের কাণ্ড শুকিয়ে যাবে। অতঃপর শিকড়ের পানি শুকাতে শুকাতে সর্বশেষ শিকড়ের মাথার পানি শুকিয়ে যাবে। গাছে যখন রস বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না, কেবল তখনই গাছটি মরে যাবে, পরিণত হবে শুকনো কাঠে। একটি গাছের পত্র-পল্লব, শাখা-প্রশাখা, কাণ্ড ও শিকড়ে পর্যন্ত তিনি রস ছড়িয়ে রেখেছেন। তাই আমরা একবার, দুবার পানি দেওয়া বন্ধ করলেও তাতে গাছের কোনো ক্ষতি হয় না; গাছটি মরে যায় না। যদি একবারেই গাছের সব রস শুকিয়ে যেত, তাহলে মাত্র একবার পানি দেওয়া বন্ধ করলেই পৃথিবীর সব গাছ মরে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা অসাধারণ বিচক্ষণতায় বৃক্ষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রস ছড়িয়ে দিয়েছেন।
কারণ তিনি আল-খাবির; শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞার অধিকারী।

যিনি অন্তরের খবরও জানেন

ডাক্তার চিকিৎসার স্বার্থে রোগীর সতরও দেখতে পারে। কিন্তু সে যদি কামনার বশবর্তী হয়ে আক্রান্ত স্থান ব্যতীত অন্য কিছু দেখে, তবু ঐ মহিলা-রোগী কখনো জানতেও পারবে না, সে আসলে ডাক্তারবেশী এক লম্পট ও দুশ্চরিত্র, যার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বীভৎস এক চেহারা! কিন্তু এই আসল চেহারা যিনি মুহূর্তের মাঝে উন্মুক্ত করে দিতে পারেন তিনি সম্যক জ্ঞাত পবিত্র এক সত্তা মহান আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন-

يَعْلَمُ خَابِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ )

চোখের অপব্যবহার এবং অন্তরে যা গোপন রয়েছে সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত [১]

কাফির, মুমিন নির্বিশেষ সকল মানুষের প্রতিই তিনি ইনসাফ ও ন্যায়-নিষ্ঠাপূর্ণ আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই অমুসলিমের সাথে উত্তম আচরণও আল্লাহর নৈকট্যলাভের মাধ্যম। কিন্তু যখন আপনি কোনো অমুসলিমের সাথে সুব্যবহার ও সৌজন্যমূলক আচরণ করছেন, সেটা কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছেন না অন্য কোনো কারণে? তাঁর ভয়ে কম্পিত হয়ে নাকি দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য? জনসম্মুখে আপনি খুব ভণিতা-অভিনয় করে চক্ষু অবনত করে পথ চলছেন, কিন্তু একটু সুযোগ পেলেই, একটু আড়াল হলেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করছেন হারামের দিকে। কেউ তা জানতে পারবে না; কিন্তু তিনি জানেন আপনার অন্তরের সব খবর।

বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত সকল স্থানে আপনার আল্লাহভীতি, তাকওয়া- পরহেজগারির চর্চা। কিন্তু রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে স্মার্ট ফোন কিংবা কম্পিউটারের স্ক্রিনে আপনি ভেসে যাচ্ছেন নগ্নতার জোয়ারে, ডুবে যাচ্ছেন ধ্বংসের অতল গহ্বরে। আপনার এই লৌকিকতা আর ধূর্ততার খোলস কেউ উন্মোচন করতে পারে না। কিন্তু মহাবিজ্ঞ রব আল-খাবির আপনার চেয়েও বেশি অবগত আপনার ছলচাতুরির ব্যাপারে। যেকোনো মুহূর্তে তিনি আপনার মুখোশ খুলে দিতে পারেন সকলের সামনে; যাদের সামনে লৌকিকতার চাদরে আপনি ঢেকে রেখেছেন শঠতার ভয়ানক আকৃতি। সুমহান আল্লাহ বলেন—

قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ

মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে; এটাই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যকভাবে অবহিত।[১]

আল-খাবিরের সাথে হৃদয়ের বন্ধন

প্রতি মুহূর্তে আপনার প্রতিটি কাজের তিনি পর্যবেক্ষক। প্রকাশ্যে, গোপনে, জনতার মাঝে, লোকচক্ষুর আড়ালে এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের ব্যাপারে তিনি সম্যক অবগত। আপনি যা কিছুই লুকিয়ে রাখুন না কেন, তাঁর সামনে আপনার সবকিছুই উন্মুক্ত। আপনার কোনো রহস্যই তাঁর অগোচরে থাকতে পারে না। গোপন পাপ আপনার কোমর ভেঙে দিয়েছে। প্রকাশ্য অপরাধ আপনার ঈমানি দেহ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মহাবিজ্ঞ রবের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করুন। আপনি আবার ঈমানি শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠবেন। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবেন না। এটাই আল-খাবির তথা মহাবিজ্ঞ সত্তার বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণের প্রথম ফল।
ইমাম কুশাইরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'মহান আল্লাহর আল-খাবির নামের প্রতি আদব প্রদর্শন প্রত্যেক মুমিনের জন্য আবশ্যক।' প্রতিটি কথাবার্তা ও কাজকর্ম সম্পর্কে তিনি অবহিত-এই বিশ্বাস যার অন্তরে বদ্ধমূল হবে, সে আপন কথাবার্তায়, কাজে-কর্মে সতর্ক হয়ে যাবে। প্রতিটি পদক্ষেপে আস্থাশীল হবে এটা ভেবে যে, আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা কখনোই হাতছাড়া হবে না। আর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেননি তা কস্মিনকালেও সে অর্জন করতে পারবে না। আল-খাবির নামের প্রতি আপনার ঈমান যত বেশি দৃঢ় হবে, পার্থিব সকল বিষয় আপনার কাছে তত সহজ হয়ে যাবে। কারণ আপনার দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হবে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে সবই তিনি জানেন ও দেখেন। পক্ষান্তরে, যারা পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহকে বাহ্যিক কার্যকারণ বা প্রাকৃতিক কারণ মনে করে তারা সর্বদা অস্থিরতায় ভোগে।
আপনার হৃদয়ে যখন মহাবিজ্ঞ রবের প্রতি বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হবে, আপনি যখন হৃদয়ের গভীর থেকে উপলব্ধি করবেন, আল্লাহ আপনার সকল বিষয় পর্যবেক্ষণ করছেন, তখন আপনি অপার্থিব এক আত্মিক শক্তি ও মনোবল অনুভব করবেন। অন্তরের বদ্ধমূল এই বিশ্বাসই অতি সংগোপনে আপনার সব প্রয়োজন তুলে ধরবে আপনার রবের কাছে। গায়েব থেকেই আপনার সকল চাওয়া-পাওয়া পূরণ হয়ে যাবে। কারণ মানুষ যা মুখে উচ্চারণ করে আল্লাহ তা শ্রবণ করেন; আর মানুষ যা অন্তর দিয়ে কামনা করে সে সম্পর্কেও আল্লাহ বেখবর নন।
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সন্তান চেয়ে আল্লাহর তাআলার কাছে যে দুআ করেছিলেন, তা চুপিসারেই করেছিলেন। হৃদয়ের গহীন থেকে প্রার্থনা করেছিলেন মহান রবের নিকটে।

إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا ۞

যখন তিনি তার রবকে চুপিসারে ডেকেছিলেন [১]

আল্লাহর জ্ঞানের প্রতি তার ছিল অগাধ বিশ্বাস। তাই হৃদয়ের সে ডাকেই সাড়া দিয়েছিলেন, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, মহাবিজ্ঞ আল্লাহ তাআলা।

মহাবিজ্ঞ রব আল-খাবিরের ওপর আপনার বিশ্বাস আছে তো?

পৃথিবী প্রতিনিয়তই উন্নতি ও উৎকর্ষের দিকে ধাবমান। জীবনযাত্রার মান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন-প্রকরণে প্রতিটি মুহূর্তেই সাধিত হচ্ছে ব্যাপক পরিবর্তন।

এই পরিবর্তিত বিশ্বে মহাবিজ্ঞ রব আল-খাবিরের প্রতি, তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ বিধান ও নির্দেশাবলির প্রতি আপনার আস্থা কতটুকু?
বৈধ পথায় আয়-উপার্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় শরিয়ত কর্তৃক প্রজ্ঞা ও ভারসাম্যপূর্ণ কিছু মূলনীতি প্রণয়ন করে দেওয়া হয়েছে। এসব মূলনীতির প্রতি লক্ষ রেখে বৈধভাবে সম্পদ উপার্জনের অনেক পদ্ধতিই শরিয়ত অনুমোদন করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছে শরিয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ হাজারো পন্থা।
আপনি হয়তো ভাবছেন, শরিয়তের মূলনীতির আলোকে ফিকহের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ উপার্জনের যেসব পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো সময়োপযোগী নয়। পাশাপাশি এসব পদ্ধতি প্রয়োগ করে লাভবান হওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এর বিপরীতে শরিয়ত বহির্ভূত আধুনিক পদ্ধতির ব্যবসা-বাণিজ্য বেশি ফলপ্রসূ। আবার তা অনিবার্য লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই চিন্তা থেকেই আপনি হারাম পদ্ধতির বাণিজ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। দেখবেন, আকস্মিকভাবেই একদিন আপনার ব্যবসা বিরাট ক্ষতির মুখে পতিত হয়েছে।
অতএব, প্রচুর অর্থ উপার্জনের জন্যও আপনাকে শারয়ি বিধানের সামনেই আত্মসমর্পণ করতে হবে। ব্যবসার লাভ-লোকসান শুধু মেধা-বুদ্ধির ওপরই নির্ভর করে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওফিকেরও প্রয়োজন হয়। আর আল্লাহর তাওফিকপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য আল্লাহর আনুগত্য পূর্বশর্ত। যে ব্যক্তি মনে করে, শরিয়তসম্মত উপায়ে ব্যবসা কিংবা চাকরি না করে হারাম পন্থা অনুসরণ করলে অল্প সময়ে অনেক বেশি অর্থ-কড়ি কামানো যাবে, নান্দনিক বাড়ি আর দৃষ্টিনন্দন গাড়ি কেনা যাবে, সে ব্যক্তি মূলত নির্বোধ ও পথভ্রষ্ট।। সে জানে না, আল্লাহ তাআলা মহাবিজ্ঞ, তাঁর বিধানেই রয়েছে সমূহ কল্যাণের নিশ্চয়তা। তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারী নিশ্চিত হতভাগা। সৌভাগ্যের চাবিকাঠি তাঁর আনুগত্যের মাঝেই নিহিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيَ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ ۖ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا

আপনি নিজেকে ধৈর্য সহকারে রাখবেন তাদের সংসর্গে, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় ডাকে তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। পার্থিব জীবনের শোভা ও চাকচিক্য কামনা করে আপনি তাদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। আপনি তার আনুগত্য করবেন না, যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশিমতো চলে এবং যার কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে যায় [১]।

যখনই আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত পথে চলবেন, তখনই সৌভাগ্যের ফলবান বৃক্ষ থেকে ছিঁড়তে পারবেন সুমিষ্ট পাকা ফল। আর আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে বিপথগামী হলেই চরম পর্যায়ের লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে। কারণ আপনি মহাবিজ্ঞ প্রভুর নির্দেশ অমান্য করেছেন।
আপনি অনেক দামি ও মূল্যবান একটি মেশিন কিনলেন, যার অপারেটিং সিস্টেম বেশ জটিল। স্বাভাবিকভাবেই আপনি ধরে নেবেন মেশিনটির আবিষ্কারক ও নির্মাতাই এর অপারেটিং সিস্টেম সম্বন্ধে সবচেয়ে বেশি অবগত। তখন আপনি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গাইডবুক সংগ্রহ করে নির্দেশনা মোতাবেক মেশিন চালিয়ে নেবেন।
দুনিয়াবি সামান্য একটা মেশিনের ক্ষেত্রে যদি আপনার এত গুরুত্ব ও আগ্রহ থেকে থাকে, তাহলে আপনার এই আশ্চর্য দেহ এবং তার মধ্যে অবস্থিত হৃদয় ও আত্মার মেশিন পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনি কেন এত উদাসীন? অথচ হৃদয়-আত্মা এবং মানবদেহের নিগূঢ় রহস্যাবলি আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। যার সবকিছু পরিপূর্ণভাবে এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। যেখানে রহস্যের কোনো শেষ নেই। হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, গর্ভস্থ ভ্রূণের ক্রমবিকাশ ও পরিচর্যার পদ্ধতি ইত্যাদি যা কিছু আবিষ্কার হয়েছে, তাতেই চিন্তাশীল গবেষকরা হতভম্ব হয়েছেন।
আপনার দেহে অবস্থিত আত্মার সাথে দুনিয়াবি মেশিনের কোনো তুলনাই চলে না। চিন্তা-চেতনা, উপলব্ধি, প্রেরণা, প্রত্যাশা, কামনা ইত্যাদির সমাবেশ হলো মানবাত্মা। এই আত্মা এবং তার ধারক মানবদেহ পৃথিবীর অন্য যেকোনো কিছুর তুলনায় অত্যন্ত জটিল। এর জন্য কি একটি নির্দেশিকার প্রয়োজন নেই? মেশিনের অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা ও আবিষ্কারক ছাড়া আর কেউ জানে না। তেমনিভাবে মানবদেহ আর মানবাত্মার পরিচালনা পদ্ধতিও আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানেন না।

তাই দেহ-আত্মার এই অমূল্য মেশিনকে পরিচালনা করার জন্য গাইডবুক তাঁর কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হবে, যিনি এটার অভিনব স্রষ্টা, সম্যক দ্রষ্টা। জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর কাছ থেকেই দীপ্তি গ্রহণ করতে হবে, যিনি এ জীবনের অস্তিত্ব দানকারী এবং মহাবিজ্ঞ অভিভাবক। আল-খাবির বলেন-

وَأَسِرُّوا قَوْلَكُمْ أَوِ اجْهَرُوا بِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الخَبِيرُ

তোমরা তোমাদের কথা গোপনেই বলো অথবা প্রকাশ্যে বলো, তিনি তো অন্তর্যামী। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি (সৃষ্টি সম্বন্ধে) জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত [১]

ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এই পৃথিবীতে আপনার সবচেয়ে কাছের জিনিস হলো নিজ দেহ ও আত্মা।' তাই আত্মার জগতে কীসের আনাগোনা বা লুকোচুরি চলছে—সে বিষয়ে আপনাকে থাকতে হবে সদা জাগ্রত। আপনি আবিষ্কার করুন, আপনার মনে যেসব জল্পনা-কল্পনা, কামনা-বাসনা জেগে উঠছে, তার উৎস কোথায়? আপনার হৃদয় না প্রবৃত্তি? নাকি শয়তানের ফাঁদ? আপনি বোঝার চেষ্টা করুন, দেহসত্তার ভেতরের এসব কল্পনা-অনুভূতি কি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ঐশীপ্রেরণা নাকি শয়তানের কুমন্ত্রণা? আপনি যে আমলটি করছেন, তাতে কি আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করছেন না লৌকিকতার ফাঁদে আটকা পড়ে যাচ্ছেন?
প্রত্যেক বান্দার জন্য নিজের ঈমান, আমল ও মনোজগৎ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। হৃদয়ের সকল প্রবণতা, চারিত্রিক শিষ্টতা এবং আত্মার পরিশুদ্ধির ব্যাপারে সজাগ থাকা আবশ্যক।
কোনো জটিল ব্যাপার সমাধানের প্রধান ও পূর্বশর্তই হলো, সেটাকে জটিল হিসেবে জানতে পারা। এরপর তার সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা। আপনি যদি গুনাহ বর্জন করতে চান, তাহলে প্রথমেই আপনাকে জানতে হবে গুনাহ কী? তাই আত্মার পরিশুদ্ধির পথে সর্বপ্রথম অপরিহার্য দায়িত্ব হলো-আত্মা, প্রবৃত্তির চাহিদা-কামনার ব্যাপারে পূর্ণ অবগতি লাভ করা। আর ধূর্ত নফসের প্রবঞ্চনার শিকার না হওয়া।

আপনি যখন জেনে ফেলবেন অন্তর্জগতের গোপন ফাঁদ, যখন বুঝতে পারবেন হৃদয়ের সবুজ বাগানে ফেরেশতার পরিচর্যা বা শয়তানের আনাগোনা, যখন বুঝতে সক্ষম হবেন ইখলাসপূর্ণ ইবাদত ও লোকদেখানো ইবাদতের পার্থক্য, আখিরাতের নেশায় মত্ততার স্বাদ এবং দুনিয়ার খড়কুটোর পেছনে মোহগ্রস্ত হওয়ার পরিণাম—তখন সৃষ্টিজগতের মধ্যে আপনিই হবেন সবচেয়ে বড় বিচক্ষণ; মহাবিজ্ঞ আল-খাবির রবের সাথে হবে আপনার হৃদয়ের বন্ধুত্ব। মানুষের মাঝেই হয়তো আপনার বসবাস; কিন্তু আপনি অলংকৃত করবেন ফেরেশতাদের বরকতময় সমাবেশ।
তাই সম্যক অবগত, সর্বদ্রষ্টা, মহাবিজ্ঞ মালিক আল-খাবিরের সামনে নিজেকে সর্বদা উপস্থিত মনে করুন; যার কাছে আপনার কোনো কিছুই গোপন থাকতে পারে না।
সতর্ক হোন, আপনার সবচেয়ে কাছের দেহ ও আত্মার ব্যাপারে। আবিষ্কার করুন হৃদয়রাজ্যের কুমন্ত্রণা এবং ঐশীপ্রেরণার মাঝে বিভাজন-রেখা। মহাবিজ্ঞ রবের প্রজ্ঞাময় ব্যবস্থাপনায় হোন তৃপ্ত, প্রফুল্ল। দেখবেন, আপনার হৃদয়-আত্মা আল-খাবিরের প্রতি ঈমানে টইটম্বুর। জান্নাতি ঝরনার আর্দ্রতামাখা সমীরণ শীতল করে দেবে আপনার জীবন।

টিকাঃ
[১] সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৩
[১] সুরা মুমিন, আয়াত: ১৯
[১] সুরা নূর, আয়াত : ৩০
[১] সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৩
[১] সুরা কাহফ, আয়াত: ২৮
[১] সুরা মূলক, আয়াত : ১৩-১৪

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আর-রাকিব : মহাপর্যবেক্ষণকারী, নিরীক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক

📄 আর-রাকিব : মহাপর্যবেক্ষণকারী, নিরীক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক


রাতের বেলা ময়লা ফেলতে বেরিয়েছেন আপনি। ডাস্টবিনটা বেশ দূরে। অতদূর না গিয়ে ময়লা ফেললেন ঠিক প্রতিবেশীর বাড়ির দোরগোড়ায়। এদিকটা বেশ অন্ধকার। কে কী করছে বোঝার উপায় নেই। ভাবছেন, কেউ জানবে না, কে করল কাজটা। অথচ একজন ঠিকই দেখেছেন, আপনার এই হীন কর্ম। তিনি আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী আল্লাহ।

আপনি যদি জানতে পারেন সর্বদা আপনাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে; আপনার উপরস্থ কেউ সবসময় আপনাকে চোখে চোখে রাখছে, তখন আপনি কী করবেন? নিশ্চয় খুব সতর্ক হয়ে যাবেন। সুস্থ বিবেকসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার একজন স্রষ্টা রয়েছে। একজন বিশ্বাসী মুমিন হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার স্রষ্টা মহান আল্লাহ; যিনি মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী। অতএব, নিশ্চিত বিশ্বাস করুন, আপনি ২৪ ঘণ্টা রয়েছেন আপনার স্রষ্টার পর্যবেক্ষণের অধীনে। আপনার মতোই একজন মানুষের উপস্থিতি, পর্যবেক্ষণ টের পেয়ে আপনি চমকে ওঠেন, পরিণামের ভয়ে আঁতকে ওঠেন, নিয়ন্ত্রিত হয়ে যান; তাহলে মহান পর্যবেক্ষকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আওতায় আপনি কীভাবে লাগামহীন হয়ে পড়েন? আপনার রব বলেন-

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا )

হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকেও সৃষ্টি করেছেন; যিনি তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন (রাকিব)।

মহামহিমাময় আর-রাকিবের সান্নিধ্যে

একবার আমি এক দোকানে ঢুকে আমার প্রয়োজনীয় একটি বস্তু চাইলাম। কিন্তু দোকানদার সেটা দিতে পারল না। আমি বেরিয়ে যাব, এমন সময় দোকানি বলল, একটু কষ্ট করে যদি গুদামে যেতেন, সেখানে পাওয়া যেতে পারে। দোকান ছিল নিচতলায় আর গুদাম চতুর্থ তলায়। গিয়ে দেখলাম সেখানে একজন হিসাবরক্ষক ও ব্যবস্থাপক টেবিলের সামনে বসে আছে। আর দুটি সিসি ক্যামেরা তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার বুঝতে দেরি হলো না, নিচতলায় মালিক তাকে মনিটরে পর্যবেক্ষণ করছে।
তো এই হিসাবরক্ষক তার দিকে তাকিয়ে থাকা ক্যামেরার কারণে একটু নড়াচড়াও করতে পারছে না। মালিকের পর্যবেক্ষণের কারণে কাজের সময়ে তার একটু খাওয়াদাওয়া অথবা অন্য কোনো প্রয়োজনে উঠে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আরেকবার এক ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখলাম সবগুলো রুম স্বচ্ছ কাচ দিয়ে তৈরি করা। যেন জিএম সকলকে নজরদারির আওতায় রাখতে পারে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের নজরদারি আর পর্যবেক্ষণের ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত যেন অনৈতিক কাজ করার শক্তিই সে হারিয়ে ফেলেছে।
আবার ধরুন ট্রাফিক আইনের কথা। কোনো কোনো দেশে ট্রাফিক আইন খুবই কড়া। কেউ সর্বোচ্চ গতিসীমা অতিক্রম করলেই সাথে সাথে তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারিতে তা বাস্তবায়নও করা হয়। এই নজরদারির কারণে কোনো ড্রাইভারের সর্বোচ্চ গতিসীমা লঙ্ঘন করার কোনো সুযোগ নেই।
সামান্য মানুষের পর্যবেক্ষণে কত তটস্থ থাকেন আপনি! অথচ আপনার ওপর রয়েছে মহাশক্তিধরের পর্যবেক্ষণ; যিনি নজর রাখেন আপনার ওপর, উপরস্থ কর্মকর্তার ওপর, সবার ওপর, তিনি আপনার রব, আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী।
আর-রাকিব শব্দটি অভিধানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়—

এক. আর-রাকিব অর্থ অপেক্ষমাণ। আল্লাহ বলেছেন-

وَارْتَقِبُوا إِنِّي مَعَكُمْ رَقِيبٌ

সুতরাং তোমরা অপেক্ষা করো, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ [১]

এখানে 'অপেক্ষমাণ' বলতে গতিবিধি পর্যবেক্ষণকে বোঝানো হয়েছে। যেমন : আল্লাহ বলেন-

إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ

নিশ্চয় আপনার প্রতিপালক (বান্দাদের) গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন।[২]

দুই. আর-রাকিব অর্থ সংরক্ষক।
বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-

ارْقُبُوا مُحَمَّدًا فِي أَهْلِ بَيْتِهِ

তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা সংরক্ষণ করো তার পরিবারবর্গের মাধ্যমে [৩]

অর্থাৎ তার পরিবারের প্রতি সদাচরণ কর। তাদের হক আদায়ে যত্নবান হও।
তিন. আর-রাকিবের আরেক অর্থ প্রহরী, অগ্রবর্তী সৈনিক, আদর্শ প্রতিনিধি; পিতার যোগ্য বংশধর।
যে ফেরেশতা আমলনামা সংরক্ষণ করেন তাকেও বলা হয় 'রাকিব' তথা প্রহরী বা প্রতিনিধি।
আল্লাহ তাআলা বলেন-

مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ

মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য নিযুক্ত রয়েছে তৎপর প্রহরী [১]

আল্লাহর সাথে যখন ব্যবহৃত হয় আর-রাকিব, তখন তার অর্থ হয় মহাপর্যবেক্ষক। যিনি সবকিছু জানেন; সবকিছু দেখেন। রাত্রে ঘুমানোর সময় আপনি কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। মনে মনে ঠিক করলেন, আগামীকাল অমুক কাজটি করবেন। আপনার এই কল্পনা আপনি ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঠিকই সব জানেন। কুরআনে বর্ণিত-

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ

আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, আমি তা জানি। আমি তো তার গ্রীবাস্থিত ধমনির চেয়েও নিকটবর্তী [২]

আপনার নীরবতা এবং উচ্চৈঃস্বর তার কাছে সমান। জনসম্মুখে আপনার ঘোষণা এবং নিঃশব্দ উচ্চারণ তার কাছে একই। মুখ ফুটে বের হওয়া আর অন্তরে লুকিয়ে রাখা সবই তার কাছে সমান। কারণ তিনি আর-রাকিব, পর্যবেক্ষণকারী।

আল্লাহর এই নামটি আপনার সবচেয়ে কাছের নাম। আপনি যখনই বিশ্বাস করে ফেলবেন, আল্লাহ আপনার সবকিছু দেখছেন, তখন নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর হুকুম আঁকড়ে ধরবেন। আর আল্লাহর হুকুম যদি আপনি আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হন, নিশ্চিত আপনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে মুক্তি পেয়ে যাবেন। আল্লাহ বলেন-

مَّا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا

যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং ঈমান আনয়ন করো, তাহলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহর কী লাভ? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞ [১]

আল্লাহর এই নামটি এবং এই নামের প্রতি ঈমান আপনার সৌভাগ্যের সিঁড়ি। এই একটি নামই একজন মুমিনের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে যথেষ্ট। মুমিন যখন এই নামের ওপর ঈমান আনে, তখন সে আল্লাহর হুকুমের সামনে নত হয়; আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।
আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আর-রাকিব আপনাকে দেখছেন।
আপনি ঘরে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি হাসপাতালে রোগী দেখছেন, রোগীকে সেবা দিচ্ছেন, আপনি কিন্তু রয়েছেন তাঁর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে।
আপনি যদি একজন আইনজীবী হয়ে থাকেন, নিজের আত্মার হিসাব নিন। আপনি মক্কেলের কাছ থেকে যে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক নিয়েছেন, তার হক আদায় করেছেন তো? সংশ্লিষ্ট আইনের সকল ধারা, উপধারা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গভীরভাবে পড়াশোনা করেই মামলায় হাত দিয়েছেন তো? নাকি কোনো রকম চোখ বুলিয়েই হাজির হয়েছেন কোর্ট-চত্বরে?

আপনি একজন ডাক্তার। রোগীর কাছ থেকে ফি নিয়েছেন আপনার চাহিদামতো। কিন্তু তার হক আদায় করছেন কতটুকু? এটা কি শুধু আপনার অর্থ উপার্জনের বাণিজ্য নাকি আপনি সেবার মানসিকতাও লালন করেন? আপনি রোগীর অস্থিরতা, সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করছেন তো? নাকি তাকে উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দিচ্ছেন? ভুলে যাবেন না, আপনার প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে! আপনি রয়েছেন সরাসরি আপনার মালিকের পর্যবেক্ষণ সীমানায়!
যাদের অস্থি-মজ্জা এবং অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুতে আর-রাকিবের উপস্থিতি, তারা কখনো বেখেয়াল হয় না। তারা সর্বদা সৌহার্দপূর্ণ, কোমল আচরণ করে। নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিতেই বেশি ভালোবাসে। আপনার সামনে ফলমূলের একটি বড় থালা রাখা হলো, আর-রাকিবের প্রতি ঈমানের দাবি হলো, আপনি আরেক ভাইকে অগ্রাধিকার দেবেন। তার দিকেই সুমিষ্ট ফলটি এগিয়ে দেবেন। আনারের বড় টসটসে দানাগুলো তার দিকে বাড়িয়ে দেবেন। কারণ, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। তিনি আপনার কাজ এবং অন্তরের ইচ্ছাও লক্ষ করছেন।
কুরআনে বর্ণিত-

ع إِنَّ اللَّهَ عَالِمُ غَيْبِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ )

নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল অদৃশ্য বিষয়ে অবগত আছেন। অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে তিনি সবিশেষ অবহিত।[১]

আল্লাহ আপনার অনন্য সঙ্গী

আপনার বন্ধুকে আপনি প্রচণ্ড ভালোবাসেন, তার সাথে চলাফেরা, ওঠাবসা করতে পছন্দ করেন। কিন্তু আপনার যত কাছের বন্ধুই হোক না কেন, তার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি আপনি সহ্য করতে পারবেন না। আপনি তার সাথে চলতে চলতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়বেন। খুব কাছের বন্ধুর উপস্থিতিও কখনো কখনো অসহ্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু আল্লাহ আপনার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আপনি কখনো আল্লাহর উপস্থিতিতে বিরক্ত হয়েছেন? কারণ আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঙ্গ দান করেন অতি সূক্ষ্ম ও সুকোমলভাবে। তাই আপনি টের পান না তাঁর উপস্থিতি। অথচ তিনি রয়েছেন আপনার সাথে, সবখানে; ঘরে-বাইরে, দেশে-বিদেশে, নির্জনে-প্রকাশ্যে সর্বদা তিনি রয়েছেন আপনার সঙ্গী হয়ে।
তাই আপনিও সদা-সর্বদা আল্লাহকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে নিন। ভেবে নিন আল্লাহ আপনার সামনেই রয়েছেন। হাদিসে এটাকে বলা হয়েছে 'ইহসান'। আপনি উন্নীত হোন ইহসানের উচ্চতায়।
কোনো শ্রদ্ধেয় বড় ব্যক্তিত্বের সাথে সাক্ষাতের সময় আপনি সাধারণত নিজেকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পোশাক-পরিচ্ছদ, আদবকেতা ঠিক আছে কি না সেদিকে খুব গুরুত্ব প্রদান করেন। এরপর তার সাথে সাক্ষাতের সময় ভদ্রতার সাথে শ্রদ্ধাজড়িত কণ্ঠে শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানিয়ে থাকেন। কিন্তু আল্লাহর মতো মহান ও পবিত্র সত্তা সর্বদা আপনার সাথে রয়েছেন, তাঁর প্রতি আপনি কি এতটুকুও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন? একান্ত তাঁর জন্য আদব ঠিক রাখেন?
অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি আল্লাহর ভয়ে তটস্থ থাকবে তার জীবন ও জীবনধারা তত বেশি সুন্দর ও কেতাদুরস্ত হবে। কারণ, আল্লাহ সর্বদাই আপনার সাথে রয়েছেন; সর্বদা তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এক বেদুইন ব্যক্তি নবিজির কাছে এসে আবেদন করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি সুরা শিক্ষা দিন যা সবদিক থেকে পরিপূর্ণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে 'সুরা যিলযাল' পড়িয়ে দিলেন। যার শেষটা ছিল-

فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًا يَرَهُ

কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে তা-ও সে দেখতে পাবে।[১]

অতঃপর বেদুইন লোকটি বলল, ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য-সহ পাঠিয়েছেন—এর বেশি আমার আর প্রয়োজন নেই। এরপর লোকটি চলে গেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লোকটি সফলকাম হয়েছে, লোকটি কামিয়াব হয়েছে।[১]
আপনি চিন্তা করে দেখুন লোকটি সম্পর্কে আল্লাহর নবি এই মন্তব্য কেন করলেন? কারণ আপনি যদি জানতে পারেন আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ এবং অণু-পরিমাণ কর্মও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তখন আপনি কি পারবেন কারো সাথে প্রতারণা করতে? কারো সাথে মিথ্যা বলতে? পারবেন কারো ক্ষতি করতে? কিংবা কোনো অনৈতিক কাজ করতে? একজন মানুষের নজরদারিতে থেকেই যেখানে আপনি সজাগ হয়ে যান, অতি সন্তর্পণে সবকিছু সামাল দেবার চেষ্টা করেন, সেখানে মহান স্রষ্টার সামনে কীভাবে আপনি লাগামহীন হবেন?
এই একটি নাম এবং তার অন্তর্নিহিত আবেদন ও বার্তা আপনাকে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য করবে। প্রবৃত্তির লিপ্সা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি জোগাবে। আর যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখে ফেলল, সে দ্বীনের শক্ত বুনিয়াদের ওপর ঈমানি জীবনের দালান দাঁড় করিয়ে ফেলল। তাই আল্লাহর এই পরম সুন্দর নাম 'আর-রাকিব'-এর তন্ময়তায় মগ্ন থাকা হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা; আজীবনের উত্তম নসিহত।

লুকোনোর কোনো জায়গা নেই

ইমাম রাযি রাহিমাহুল্লাহ একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। জনৈক শাইখ তার এক ছোট্ট ছাত্রকে খুব বেশি স্নেহ করতেন। এতে অন্য ছাত্ররা কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়। শাইখ একদিন ভাবলেন, তাদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সবাইকে একত্র করে প্রত্যেকের হাতে একটি করে পাখি দিলেন এবং বললেন, তোমরা নিজেদের পাখিটি এমন জায়গায় নিয়ে জবাই করবে, যেখানে কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না।
প্রত্যেকেই একেক দিকে চলে গেল; যেন কেউ কাউকে দেখতে না পায়। ছাত্ররা সবাই নিজের মতো করে লুকিয়ে লুকিয়ে যার যার পাখি জবাই করে নিয়ে এলো। কিন্তু সেই ছোট্ট ছাত্রটি ফিরে এলো পাখিটি জবাই না করেই।

বিনীত সুরে উস্তাযকে বলল, শাইখ! আপনি বলেছেন, এমন স্থানে গিয়ে পাখিটি জবাই করতে, যেখান কেউ দেখবে না। কিন্তু আমি এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাইনি যেখানে আল্লাহ আমাকে দেখতে পাবেন না!
শাইখ মুচকি হেসে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার বুঝলে তো! এ কারণেই আমি ওকে একটু বেশিই স্নেহ করি।
তাই আপনি যেখানেই লুকিয়ে থাকুন না কেন, যেখানেই আত্মগোপন করুন না কেন, আল্লাহর শক্তিশালী দৃষ্টি থেকে দূরে কোথাও যেতে পারবেন না।[১]

আল্লাহ তাআলা আপনার দিকে সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রেখে এই কথাটিই শিক্ষা দিতে চান যে, হে বান্দা! তুমি কি আমার ব্যাপারে লজ্জা করো না? তুমি একদিন আমার সামনে উপস্থিত হবে, সেদিনটিকে তুমি কি ভয় করো না? তোমার ফিরে আসার সময় কি এখনো হয়নি?
আপনি সালাতে দাঁড়ানোর সময় কল্পনা করুন, আল্লাহ আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। সালাতে দাঁড়ানোর পূর্বেই পাক-পবিত্র ও উত্তম পোশাক পরে নিন। সামান্য কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আপনি আপনার উন্নত মানের পোশাক পরে বের হন। অথচ সালাত আদায়ের সময় যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ান, তখন আপনি পরেন নিম্নমানের পোশাক। কেন আপনার এই দ্বৈত নীতি? আপনি কি আল্লাহর সামনে উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না? আপনি কি বিশ্বাস করেন না, সালাতে দাঁড়ানো মানে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সামনেই দাঁড়ানো? সালাফগণ সালাতের পূর্বে চুল-দাড়ি আঁচড়িয়ে পরিপাটি হয়ে নিতেন। কারণ তারা উপস্থিত হতে যাচ্ছেন মহান রবের সামনে। মহামহিম আল্লাহ বলেন-

يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ )

হে আদম সন্তান, তোমরা সালাতের সময় সৌন্দর্য গ্রহণ করো। তোমরা পানাহার করো কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।[২]

এই আলোচনা দ্বারা আমি আপনার সমালোচনা করছি না। আমি শুধু আপনার ঘুমন্ত চেতনাকে একটু জাগিয়ে তুলতে চাচ্ছি। আপনি দুনিয়াবি কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় যদি সুন্দর ও পরিপাটি পোশাক পরতে পারেন, তবে আল্লাহর সামনে কেন পারবেন না? মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর। জুমআর দিন মুমিনের ঈদ; আনন্দোৎসব। আর আপনি হলেন সেই উৎসবের দিনে আল্লাহর ঘরের মেহমান। আপনিই বলুন, এমন বরকতপূর্ণ মাহফিলে নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও নিম্নমানের পোশাক পরে যাওয়া কি সমীচীন?
তাই নবিজির সুন্নাহ হলো, জুমআর দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে, উত্তম পোশাক পরিধান করে মসজিদে গমন করা।

রাখাল-বালকের আল্লাহভীরুতা

আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার সাথি-সঙ্গীদের নিয়ে মদিনার অদূরে কোথাও যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দুপুর বেলা এক স্থানে যাত্রাবিরতি নিলেন বিশ্রামের জন্য। সবাই মিলে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য দস্তরখান বিছিয়েছেন। ঠিক সে সময় দেখা গেল, একপাল বকরী-সহ এক রাখাল যাচ্ছে।
ইবনু উমারের ইচ্ছে হলো, তিনি রাখালের আল্লাহভীরুতা পরীক্ষা করে দেখবেন। তাই রাখালকে ডেকে বললেন, এসো আমাদের সাথে খাবারে শরিক হও।
রাখাল উত্তর দিলো, আমি খেতে পারব না এখন। আমি আজ সিয়াম রেখেছি।
ইবনু উমার বললেন, তুমি একটা বকরী আমাদের কাছে বিক্রি করে দিতে পারো। আমরা তোমার বকরীর উপযুক্ত দাম দিয়ে দেবো। তা দিয়ে তুমি ইফতার কিনে খেতে পারবে।
রাখাল বলল, এই বকরী তো আমার নয়, আমার মালিকের।
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি তোমার মালিককে গিয়ে বলবে, পালের একটা বকরীকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে!
রাখাল তখন আসমানের দিকে আঙুল তুলে বলল, আমি না-হয় মিথ্যা বলে মালিকের চোখে ফাঁকি দেবো। কিন্তু আমার মালিকের যিনি মালিক (আরশের অধিপতি), তাকে আমি কীভাবে ফাঁকি দেবো? মাফ করবেন, এ কাজ আমাকে দিয়ে সম্ভব নয়!
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রাখালের তাকওয়া দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন।। এই রাখাল কতটুকুই বা শিক্ষিত ছিল? বাহ্যিকভাবে তার শিক্ষাদীক্ষা ছিল শূন্যের কোঠায়। কিন্তু সে দ্বীনের মূল আকিদা-বিশ্বাসের গোড়ায় পৌঁছুতে পেরেছে। আপনার বাড়িতে বিশাল বড় লাইব্রেরি রয়েছে। আলমারিগুলো বইপত্রে বোঝাই। আপনার লাইব্রেরি দেখে সকলেই আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় গদগদ হয়ে যায়। কিন্তু আপনি আল্লাহকে ভয় করেন না, আপনি যে আল্লাহর পর্যবেক্ষণের সীমানায় রয়েছেন তা ভুলে যাচ্ছেন। হারাম অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকছেন না, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখুন, আল্লাহর কাছে আপনার এই জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই। পক্ষান্তরে এই অশিক্ষিত রাখাল আল্লাহর কাছে আপনার চেয়ে অনেক বেশি প্রিয়; অনেক বেশি মর্যাদাবান। আজ এই রাখালের মতো ইস্পাতদৃঢ় ঈমান খুব প্রয়োজন আমাদের। আর-রাকিবের প্রতি এমন অগাধ আস্থা ভীষণ দরকার।
এমন দম্পতির দেখা মেলা ভার যারা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল; এমন সন্তানসন্ততি ও পরিবার-পরিজন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যারা সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির গুণে গুণান্বিত। আজ সততা, বিশ্বস্ততার বড়ই অভাব। চারদিকে শুধু বিশ্বাসভঙ্গের জয়জয়কার, খিয়ানত ও মিথ্যা অভিনয়ের দৌরাত্ম্য। আপনি দেখবেন কত দাঈ রয়েছে, দিনের বেলায় তারা মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করছে; সবাইকে ভালো ভালো উপদেশ দিচ্ছে-

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ ...

হে মানব-সকল, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো।[১]

কিন্তু সেই তারাই আবার রাতের বেলায় পাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যে কারণে মানুষ তাদের কথা গ্রহণ করছে না।
তাই সততা ও আত্মার শুদ্ধতা হলো সবচেয়ে বড় জিনিস। অন্তর থেকেই যদি দ্বীনি চেতনা আপনাকে পথ দেখাতে না পারে, তাহলে তা নিছক অভিনয় ও শঠতা বৈ কিছু নয়।

আপনি নিজেই নিজের হিসাব কষে দেখুন। আপনি কি আমানতদারিতা রক্ষা করে চলেন? কারো সাথে আপনার লেনদেন হলো, তার নথিপত্র, সাক্ষী সব উপস্থিত। তাই সময়মতো আপনি অপরপক্ষের পাওনা বুঝিয়ে দিলেন। আপনি কি ভেবে নিয়েছেন, এটা আমানতদারিতা? শুধু এতটুকু কাজ আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ যেখানে দলিল-পত্র বা সাক্ষী বিদ্যমান সেখানে আপনি পাওনা বুঝিয়ে দিতে বাধ্য। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ না করলে তারা আপনার নামে আদালতে মামলা ঠুকে দেবে। আর আদালত আপনার কাছ থেকে তা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে ছাড়বে।
আল্লাহর কাছে প্রকৃত আমানতদার তো সেই ব্যক্তি, যে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই পাওনাদারের পাওনা বুঝিয়ে দেয়। দুনিয়ার কেউ জানবে না, পাওনাদার নিজেও হয়তো জানতে পারবে না, কিন্তু শুধু আল্লাহর ভয়েই তার পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার নাম আমানতদারিতা। আমি একবার সালাতের পর মসজিদে বসে আছি। এমন সময় একটি চিঠি এলো আমার নামে। খুলে দেখলাম চিঠিতে লেখা, শাইখ! আমাদের এখানে এক লোক মারা গেছেন। আমি তার কাছ থেকে ২০ হাজার পাউন্ড ধার করেছিলাম। কিন্তু এটা তার পরিবারের কেউ জানত না। তবু আমি পুরোটাই পরিশোধ করে দিয়েছি।
এটাই হলো আমানতদারিতা। কেউ জানে না; তারপরও কেবল আল্লাহর ভয়ে সে হকদারের হক আদায় করেছে। কারণ আল্লাহ মহান পর্যবেক্ষক, আর-রাকিব। অনেক মানুষই এভাবে অন্যের কাছে তাদের সম্পদ রেখে মারা যায়, স্ত্রী বা সন্তানেরা কেউ জানতে পারে না। ফলে মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদও মৃত্যুবরণ করে। সন্তানেরা বলে, আমরা আমাদের বাবার অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে কিছুই জানি না।
কিন্তু যারা বিশ্বাস করে আসমানি এই সতর্ক বার্তায়- 'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সবকিছুর পর্যবেক্ষক'-তারা কখনো মৃতের হক লুকোতে পারে না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের কাছে গিয়ে সম্পদ বুঝিয়ে দেয়।
একজন ঈমানদার ব্যবসায়ী কি কখনো তার পণ্যে ভেজাল মেশাতে পারে? পণ্যের কোনো দোষ থাকলে তা ক্রেতার কাছে গোপন করতে পারে?

মনে করুন, আপনি একজন তেল-বিক্রেতা। আপনার তেলের পাত্রে যদি একটি ইঁদুর মরে পড়ে থাকে, তবে আপনি কি ঐ তেল আল্লাহর বান্দাদের খাওয়াতে পারবেন? মহান রবের ওপর যদি আপনার ঈমান থেকে থাকে, তাহলে কীভাবে আপনি এই দোষ গোপন করে তা মানুষের কাছে বিক্রি করবেন?
মানুষের খাদ্যজাত গরু-ছাগলকে মোটাতাজাকরণে ব্যবহার করা হয় স্টেরয়েড হরমোন ও ইউরিয়ার মতো কিছু বিষাক্ত উপাদান। এরপর তা চড়া দামে বিক্রি করা হয় ভোক্তা আর ক্রেতাদের কাছে। আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সামান্য ভয়টুকু যাদের মধ্যে আছে, তারা কখনো মানুষ কিংবা পশুপাখির খাবারে এসব মেশাতে পারবে না!
দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই আমরা মুখোমুখি হই কত ধরনের খিয়ানত, ছলচাতুরি ও বিশ্বাসঘাতকতার। খাবারে ভেজালের সংমিশ্রণ, পণ্যমূল্য বাড়িয়ে বলার প্রতারণা, শঠতা ও লেনদেনে অস্বচ্ছতা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর জীবন থেকে মুক্তি পেতে গেলে অবশ্যই সকলকে আর-রাকিব নামটির মর্ম উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আল্লাহকে যে আর-রাকিব হিসেবে বিশ্বাস করে, তার জন্য আর কোনো পরিদর্শক বা নিয়ন্ত্রকের প্রয়োজন হয় না। কারণ আর-রাকিবের প্রতি বিশ্বাসই তাকে কর্মস্থলে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন করতে বাধ্য করে।
আমার পরিচিত এক ভাই ছিল, সে প্রতিদিন দুই-এক ঘণ্টা দেরি করে অফিসে যেত; আবার কাজের মাঝখানেও কিছু সময় বিশ্রাম নিত। মাস শেষে সে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বরাবর ছুটি চেয়ে দরখাস্ত করল। দরখাস্ত মঞ্জুরও হয়ে গেল। কিন্তু সে পরদিন থেকে অফিস করতে লাগল ছুটি না কাটিয়ে। ম্যানেজিং ডিরেক্টর জানতে চাইল, কী ব্যাপার? তুমি ছুটি নিয়ে আবার অফিসে এলে কেন?
সে উত্তর দিলো, স্যার! আমি প্রতিদিন অফিসে কিছুটা দেরি করে আসতাম। আমি আমার দেরি হওয়া সময়গুলো হিসাব করে দেখলাম, এক মাসে আমি যতটুকু দেরি করেছি তা তিনদিনের সমান।

অফিসের এমডি চোখের সামনে এই অনুপম আদর্শ এবং বিরল সততা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কারণ, যে সমাজে সে বাস করে, সে সমাজে সৎ মানুষ পাওয়া নিতান্তই দুষ্কর।
ঐ ভাইটি পরে আমাকে বলেছে, শাইখ! আমি যখন আপনার পরবর্তী দারসে হাজির হলাম, তখন দেখি আমাদের এমডি স্যারও দারসে এসেছেন!
আলহামদুলিল্লাহ। এটাও একটা খুশির সংবাদ। তার সততার নমুনা দেখে আরেক ভাই সত্যের সন্ধান পেয়েছে।
এজন্যই আমি ভাইদের খুব গুরুত্ব সহকারে একটি কথা বলে থাকি, আপনারা আল্লাহর নাম 'আর-রাকিব'-এর অর্থ অনুযায়ী নিজ জীবন পরিচালনা করুন। দেখবেন আপনার চলাফেরা, ওঠা-বসা, কথা-বার্তা সবকিছুই হয়ে যাবে নীরব এক দাওয়াত।
সরকারি হাসপাতালের অনেক ডাক্তার ভাইদের সাথে আমার পরিচয় আছে। হাসপাতালে তারা ফ্রি চিকিৎসা করেন। হার্ট, ব্রেইন ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অস্ত্রোপচার-সহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের দায়িত্ববোধ দেখুন। একজন রোগী দুই হাজার টাকা ভিজিট দিয়ে চিকিৎসা করায়, আরেকজন মানুষ ফ্রিতে চিকিৎসা নিতে আসে; অথচ তারা এই দুজনের চিকিৎসায় কোনো পার্থক্য করেন না। ফ্রি হওয়ার কারণে একজন অভাবী মানুষকে পর্যাপ্ত সেবাটুকু দিতে কখনো কার্পণ্য করেন না।
এক আল্লাহভীরু আলিমকে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে আমরা রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় নজরের হিফাজত করতে পারি?
আলিম উত্তর দিলেন, মনে রাখবে তোমার দৃষ্টি খিয়ানত করার আগেই আল্লাহ তোমাকে দেখে ফেলেছেন, তাঁর দৃষ্টি তোমাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তার সামনে গিয়েই তোমাকে দাঁড়াতে হবে; দৃষ্টির সামান্য খিয়ানতেরও হিসাব দিতে হবে!
আপনার মনে হতে পারে বর্তমান সময়ে কীভাবে দৃষ্টি হিফাজত করা সম্ভব? নারীরা সৌন্দর্য প্রদর্শন করে রাস্তায় চলাফেরা করে! অফিসে, মার্কেটে, শপিংয়ে সবখানেই তাদের অবাধ বিচরণ!

আপনার সান্ত্বনার জন্য বলছি, এই যুগেও আপনার মতো অনেক টগবগে যুবক রয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানের সামনে মাথা নত করে। মহামহিম আর-রাকিবকে ভালোবেসে তারা হারাম দৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে। লিফটে উঠতে গিয়ে যদি দেখে ভেতরে কেবল একজন মেয়ে, তখন তৃতীয় কোনো ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকে কিংবা লিফট ছেড়ে সিঁড়ি বেয়েই ওপরে উঠতে শুরু করে। লিফটে অল্প সময়ের জন্যও গায়রে মাহরামের সাথে নির্জনে থাকা তারা অপছন্দ করে। আপনার মতো একজন যুবক হয়ে সে যদি এভাবে আত্মসংযমের পথ বেছে নিতে পারে, তবে আপনি কেন পারবেন না? আল্লাহর এই আয়াতকে অন্তরে খোদাই করে নিন—

أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى *

সে কি বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তাকে দেখছেন? [১]

আল্লাহর নামের প্রতি বান্দার আদব

নিজের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, অনুভূতি-উপলব্ধি এবং প্রতিটি পদক্ষেপের মুহূর্তে মন-মস্তিষ্কে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির চেতনা লালন প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। তাই সব কাজে আল্লাহকে স্মরণ রাখুন।
ইবনু আতাউল্লাহ ইস্কান্দারি বলেন, 'সর্বোত্তম ইবাদত হলো সদা সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা।'
বিখ্যাত মনীষী আবু হাফস আমর ইবনু সালামা নিসাপুরি[২] বলেন, 'যখন তুমি মানুষের সামনে বসবে, তখন নিজ হৃদয়-আত্মার জন্য উপদেশদাতা হয়ে যাবে। তোমার সামনে লোকজনের ভিড় যেন তোমাকে প্রতারিত না করে; তারা দেখে তোমার বাহ্যিক অবস্থা; কিন্তু আল্লাহ পর্যবেক্ষণ করেন তোমার আত্মিক ও অভ্যন্তরের অবস্থা।'
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ এক লোককে বললেন, 'সর্বদা আল্লাহর ‘ধ্যানে মগ্ন থাকো!’
লোকটি বলল, ‘সেটা কীভাবে করব?’
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ উত্তর দিলেন, ‘সর্বদা এমনভাবে থাকো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ!’
চমৎকার এই দুআটি স্মৃতির কোটরে রেখে দিন-

اَللَّهُمَّ اجْعَلْنَا نَخْشَاكَ كأَنَّنَا نَرَاكَ

হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়ে আপনার ভয় দান করুন। আমাদেরকে এমন মগ্নতা দান করুন, যেন অনুভবে মনে হয়, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি!
আল্লাহর মুরাকাবা বা আল্লাহর ধ্যানে মগ্নতা একটি বিশাল মর্যাদার স্তর; যে ব্যক্তি এ স্তরে উন্নীত হতে পারল, সে তো জান্নাতে পৌঁছে গেল। দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত সুখ-সাফল্য ধরা দিলো তার দোরগোড়ায়। তাই আল্লাহর আদেশের ওপর অটল-অবিচল থাকুন। মগ্ন থাকুন তাঁর ধ্যানে। আপনি ভুলে গেলেও তিনি আপনাকে ভুলবেন না। তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি থেকে কোথায় পালাবেন আপনি?

টিকাঃ
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ১
[১] সুরা হ্রদ, আয়াত: ৯৩
[২] সুরা ফাজর, আয়াত : ১৪
[৩] সহিহ বুখারি: ৩৭১৩
[১] সুরা কাফ, আয়াত: ১৮
[২] সুরা কাফ, আয়াত: ১৬
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১৪৭
[১] সুরা ফাতির, আয়াত: ৩৮
[১] সূরা যিলযাল, আয়াত: ৭-৮
[১] সুনানুন নাসায়ি: ৭১৬; মুসনাদু আহমাদ: ৬৫৭৫
[১] ইতহাফ সাদাতিল মুতকিনিন বিশারহি ইহইয়াই উলুমিদ্দিন, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা : ১৮১
[২] সূরা আরাফ, আয়াত: ৩১
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১
[১] সূরা আলাক, আয়াত: ১৪
[২] মৃত্যু: ২৬৪ হিজরি

রাতের বেলা ময়লা ফেলতে বেরিয়েছেন আপনি। ডাস্টবিনটা বেশ দূরে। অতদূর না গিয়ে ময়লা ফেললেন ঠিক প্রতিবেশীর বাড়ির দোরগোড়ায়। এদিকটা বেশ অন্ধকার। কে কী করছে বোঝার উপায় নেই। ভাবছেন, কেউ জানবে না, কে করল কাজটা। অথচ একজন ঠিকই দেখেছেন, আপনার এই হীন কর্ম। তিনি আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী আল্লাহ।

আপনি যদি জানতে পারেন সর্বদা আপনাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে; আপনার উপরস্থ কেউ সবসময় আপনাকে চোখে চোখে রাখছে, তখন আপনি কী করবেন? নিশ্চয় খুব সতর্ক হয়ে যাবেন। সুস্থ বিবেকসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার একজন স্রষ্টা রয়েছে। একজন বিশ্বাসী মুমিন হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার স্রষ্টা মহান আল্লাহ; যিনি মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী। অতএব, নিশ্চিত বিশ্বাস করুন, আপনি ২৪ ঘণ্টা রয়েছেন আপনার স্রষ্টার পর্যবেক্ষণের অধীনে। আপনার মতোই একজন মানুষের উপস্থিতি, পর্যবেক্ষণ টের পেয়ে আপনি চমকে ওঠেন, পরিণামের ভয়ে আঁতকে ওঠেন, নিয়ন্ত্রিত হয়ে যান; তাহলে মহান পর্যবেক্ষকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আওতায় আপনি কীভাবে লাগামহীন হয়ে পড়েন? আপনার রব বলেন-

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا )

হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকেও সৃষ্টি করেছেন; যিনি তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন (রাকিব)।

মহামহিমাময় আর-রাকিবের সান্নিধ্যে

একবার আমি এক দোকানে ঢুকে আমার প্রয়োজনীয় একটি বস্তু চাইলাম। কিন্তু দোকানদার সেটা দিতে পারল না। আমি বেরিয়ে যাব, এমন সময় দোকানি বলল, একটু কষ্ট করে যদি গুদামে যেতেন, সেখানে পাওয়া যেতে পারে। দোকান ছিল নিচতলায় আর গুদাম চতুর্থ তলায়। গিয়ে দেখলাম সেখানে একজন হিসাবরক্ষক ও ব্যবস্থাপক টেবিলের সামনে বসে আছে। আর দুটি সিসি ক্যামেরা তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার বুঝতে দেরি হলো না, নিচতলায় মালিক তাকে মনিটরে পর্যবেক্ষণ করছে।
তো এই হিসাবরক্ষক তার দিকে তাকিয়ে থাকা ক্যামেরার কারণে একটু নড়াচড়াও করতে পারছে না। মালিকের পর্যবেক্ষণের কারণে কাজের সময়ে তার একটু খাওয়াদাওয়া অথবা অন্য কোনো প্রয়োজনে উঠে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আরেকবার এক ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখলাম সবগুলো রুম স্বচ্ছ কাচ দিয়ে তৈরি করা। যেন জিএম সকলকে নজরদারির আওতায় রাখতে পারে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের নজরদারি আর পর্যবেক্ষণের ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত যেন অনৈতিক কাজ করার শক্তিই সে হারিয়ে ফেলেছে।
আবার ধরুন ট্রাফিক আইনের কথা। কোনো কোনো দেশে ট্রাফিক আইন খুবই কড়া। কেউ সর্বোচ্চ গতিসীমা অতিক্রম করলেই সাথে সাথে তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারিতে তা বাস্তবায়নও করা হয়। এই নজরদারির কারণে কোনো ড্রাইভারের সর্বোচ্চ গতিসীমা লঙ্ঘন করার কোনো সুযোগ নেই।
সামান্য মানুষের পর্যবেক্ষণে কত তটস্থ থাকেন আপনি! অথচ আপনার ওপর রয়েছে মহাশক্তিধরের পর্যবেক্ষণ; যিনি নজর রাখেন আপনার ওপর, উপরস্থ কর্মকর্তার ওপর, সবার ওপর, তিনি আপনার রব, আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী।
আর-রাকিব শব্দটি অভিধানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়—

এক. আর-রাকিব অর্থ অপেক্ষমাণ। আল্লাহ বলেছেন-

وَارْتَقِبُوا إِنِّي مَعَكُمْ رَقِيبٌ

সুতরাং তোমরা অপেক্ষা করো, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ [১]

এখানে 'অপেক্ষমাণ' বলতে গতিবিধি পর্যবেক্ষণকে বোঝানো হয়েছে। যেমন : আল্লাহ বলেন-

إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ

নিশ্চয় আপনার প্রতিপালক (বান্দাদের) গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন।[২]

দুই. আর-রাকিব অর্থ সংরক্ষক।
বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-

ارْقُبُوا مُحَمَّدًا فِي أَهْلِ بَيْتِهِ

তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা সংরক্ষণ করো তার পরিবারবর্গের মাধ্যমে [৩]

অর্থাৎ তার পরিবারের প্রতি সদাচরণ কর। তাদের হক আদায়ে যত্নবান হও।
তিন. আর-রাকিবের আরেক অর্থ প্রহরী, অগ্রবর্তী সৈনিক, আদর্শ প্রতিনিধি; পিতার যোগ্য বংশধর।
যে ফেরেশতা আমলনামা সংরক্ষণ করেন তাকেও বলা হয় 'রাকিব' তথা প্রহরী বা প্রতিনিধি।
আল্লাহ তাআলা বলেন-

مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ

মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য নিযুক্ত রয়েছে তৎপর প্রহরী [১]

আল্লাহর সাথে যখন ব্যবহৃত হয় আর-রাকিব, তখন তার অর্থ হয় মহাপর্যবেক্ষক। যিনি সবকিছু জানেন; সবকিছু দেখেন। রাত্রে ঘুমানোর সময় আপনি কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। মনে মনে ঠিক করলেন, আগামীকাল অমুক কাজটি করবেন। আপনার এই কল্পনা আপনি ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঠিকই সব জানেন। কুরআনে বর্ণিত-

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ

আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, আমি তা জানি। আমি তো তার গ্রীবাস্থিত ধমনির চেয়েও নিকটবর্তী [২]

আপনার নীরবতা এবং উচ্চৈঃস্বর তার কাছে সমান। জনসম্মুখে আপনার ঘোষণা এবং নিঃশব্দ উচ্চারণ তার কাছে একই। মুখ ফুটে বের হওয়া আর অন্তরে লুকিয়ে রাখা সবই তার কাছে সমান। কারণ তিনি আর-রাকিব, পর্যবেক্ষণকারী।

আল্লাহর এই নামটি আপনার সবচেয়ে কাছের নাম। আপনি যখনই বিশ্বাস করে ফেলবেন, আল্লাহ আপনার সবকিছু দেখছেন, তখন নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর হুকুম আঁকড়ে ধরবেন। আর আল্লাহর হুকুম যদি আপনি আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হন, নিশ্চিত আপনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে মুক্তি পেয়ে যাবেন। আল্লাহ বলেন-

مَّا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا

যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং ঈমান আনয়ন করো, তাহলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহর কী লাভ? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞ [১]

আল্লাহর এই নামটি এবং এই নামের প্রতি ঈমান আপনার সৌভাগ্যের সিঁড়ি। এই একটি নামই একজন মুমিনের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে যথেষ্ট। মুমিন যখন এই নামের ওপর ঈমান আনে, তখন সে আল্লাহর হুকুমের সামনে নত হয়; আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।
আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আর-রাকিব আপনাকে দেখছেন।
আপনি ঘরে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি হাসপাতালে রোগী দেখছেন, রোগীকে সেবা দিচ্ছেন, আপনি কিন্তু রয়েছেন তাঁর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে।
আপনি যদি একজন আইনজীবী হয়ে থাকেন, নিজের আত্মার হিসাব নিন। আপনি মক্কেলের কাছ থেকে যে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক নিয়েছেন, তার হক আদায় করেছেন তো? সংশ্লিষ্ট আইনের সকল ধারা, উপধারা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গভীরভাবে পড়াশোনা করেই মামলায় হাত দিয়েছেন তো? নাকি কোনো রকম চোখ বুলিয়েই হাজির হয়েছেন কোর্ট-চত্বরে?

আপনি একজন ডাক্তার। রোগীর কাছ থেকে ফি নিয়েছেন আপনার চাহিদামতো। কিন্তু তার হক আদায় করছেন কতটুকু? এটা কি শুধু আপনার অর্থ উপার্জনের বাণিজ্য নাকি আপনি সেবার মানসিকতাও লালন করেন? আপনি রোগীর অস্থিরতা, সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করছেন তো? নাকি তাকে উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দিচ্ছেন? ভুলে যাবেন না, আপনার প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে! আপনি রয়েছেন সরাসরি আপনার মালিকের পর্যবেক্ষণ সীমানায়!
যাদের অস্থি-মজ্জা এবং অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুতে আর-রাকিবের উপস্থিতি, তারা কখনো বেখেয়াল হয় না। তারা সর্বদা সৌহার্দপূর্ণ, কোমল আচরণ করে। নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিতেই বেশি ভালোবাসে। আপনার সামনে ফলমূলের একটি বড় থালা রাখা হলো, আর-রাকিবের প্রতি ঈমানের দাবি হলো, আপনি আরেক ভাইকে অগ্রাধিকার দেবেন। তার দিকেই সুমিষ্ট ফলটি এগিয়ে দেবেন। আনারের বড় টসটসে দানাগুলো তার দিকে বাড়িয়ে দেবেন। কারণ, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। তিনি আপনার কাজ এবং অন্তরের ইচ্ছাও লক্ষ করছেন।
কুরআনে বর্ণিত-

ع إِنَّ اللَّهَ عَالِمُ غَيْبِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ )

নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল অদৃশ্য বিষয়ে অবগত আছেন। অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে তিনি সবিশেষ অবহিত।[১]

আল্লাহ আপনার অনন্য সঙ্গী

আপনার বন্ধুকে আপনি প্রচণ্ড ভালোবাসেন, তার সাথে চলাফেরা, ওঠাবসা করতে পছন্দ করেন। কিন্তু আপনার যত কাছের বন্ধুই হোক না কেন, তার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি আপনি সহ্য করতে পারবেন না। আপনি তার সাথে চলতে চলতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়বেন। খুব কাছের বন্ধুর উপস্থিতিও কখনো কখনো অসহ্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু আল্লাহ আপনার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আপনি কখনো আল্লাহর উপস্থিতিতে বিরক্ত হয়েছেন? কারণ আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঙ্গ দান করেন অতি সূক্ষ্ম ও সুকোমলভাবে। তাই আপনি টের পান না তাঁর উপস্থিতি। অথচ তিনি রয়েছেন আপনার সাথে, সবখানে; ঘরে-বাইরে, দেশে-বিদেশে, নির্জনে-প্রকাশ্যে সর্বদা তিনি রয়েছেন আপনার সঙ্গী হয়ে।
তাই আপনিও সদা-সর্বদা আল্লাহকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে নিন। ভেবে নিন আল্লাহ আপনার সামনেই রয়েছেন। হাদিসে এটাকে বলা হয়েছে 'ইহসান'। আপনি উন্নীত হোন ইহসানের উচ্চতায়।
কোনো শ্রদ্ধেয় বড় ব্যক্তিত্বের সাথে সাক্ষাতের সময় আপনি সাধারণত নিজেকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পোশাক-পরিচ্ছদ, আদবকেতা ঠিক আছে কি না সেদিকে খুব গুরুত্ব প্রদান করেন। এরপর তার সাথে সাক্ষাতের সময় ভদ্রতার সাথে শ্রদ্ধাজড়িত কণ্ঠে শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানিয়ে থাকেন। কিন্তু আল্লাহর মতো মহান ও পবিত্র সত্তা সর্বদা আপনার সাথে রয়েছেন, তাঁর প্রতি আপনি কি এতটুকুও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন? একান্ত তাঁর জন্য আদব ঠিক রাখেন?
অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি আল্লাহর ভয়ে তটস্থ থাকবে তার জীবন ও জীবনধারা তত বেশি সুন্দর ও কেতাদুরস্ত হবে। কারণ, আল্লাহ সর্বদাই আপনার সাথে রয়েছেন; সর্বদা তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এক বেদুইন ব্যক্তি নবিজির কাছে এসে আবেদন করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি সুরা শিক্ষা দিন যা সবদিক থেকে পরিপূর্ণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে 'সুরা যিলযাল' পড়িয়ে দিলেন। যার শেষটা ছিল-

فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًا يَرَهُ

কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে তা-ও সে দেখতে পাবে।[১]

অতঃপর বেদুইন লোকটি বলল, ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য-সহ পাঠিয়েছেন—এর বেশি আমার আর প্রয়োজন নেই। এরপর লোকটি চলে গেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লোকটি সফলকাম হয়েছে, লোকটি কামিয়াব হয়েছে।[১]
আপনি চিন্তা করে দেখুন লোকটি সম্পর্কে আল্লাহর নবি এই মন্তব্য কেন করলেন? কারণ আপনি যদি জানতে পারেন আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ এবং অণু-পরিমাণ কর্মও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তখন আপনি কি পারবেন কারো সাথে প্রতারণা করতে? কারো সাথে মিথ্যা বলতে? পারবেন কারো ক্ষতি করতে? কিংবা কোনো অনৈতিক কাজ করতে? একজন মানুষের নজরদারিতে থেকেই যেখানে আপনি সজাগ হয়ে যান, অতি সন্তর্পণে সবকিছু সামাল দেবার চেষ্টা করেন, সেখানে মহান স্রষ্টার সামনে কীভাবে আপনি লাগামহীন হবেন?
এই একটি নাম এবং তার অন্তর্নিহিত আবেদন ও বার্তা আপনাকে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য করবে। প্রবৃত্তির লিপ্সা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি জোগাবে। আর যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখে ফেলল, সে দ্বীনের শক্ত বুনিয়াদের ওপর ঈমানি জীবনের দালান দাঁড় করিয়ে ফেলল। তাই আল্লাহর এই পরম সুন্দর নাম 'আর-রাকিব'-এর তন্ময়তায় মগ্ন থাকা হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা; আজীবনের উত্তম নসিহত।

লুকোনোর কোনো জায়গা নেই

ইমাম রাযি রাহিমাহুল্লাহ একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। জনৈক শাইখ তার এক ছোট্ট ছাত্রকে খুব বেশি স্নেহ করতেন। এতে অন্য ছাত্ররা কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়। শাইখ একদিন ভাবলেন, তাদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সবাইকে একত্র করে প্রত্যেকের হাতে একটি করে পাখি দিলেন এবং বললেন, তোমরা নিজেদের পাখিটি এমন জায়গায় নিয়ে জবাই করবে, যেখানে কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না।
প্রত্যেকেই একেক দিকে চলে গেল; যেন কেউ কাউকে দেখতে না পায়। ছাত্ররা সবাই নিজের মতো করে লুকিয়ে লুকিয়ে যার যার পাখি জবাই করে নিয়ে এলো। কিন্তু সেই ছোট্ট ছাত্রটি ফিরে এলো পাখিটি জবাই না করেই।

বিনীত সুরে উস্তাযকে বলল, শাইখ! আপনি বলেছেন, এমন স্থানে গিয়ে পাখিটি জবাই করতে, যেখান কেউ দেখবে না। কিন্তু আমি এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাইনি যেখানে আল্লাহ আমাকে দেখতে পাবেন না!
শাইখ মুচকি হেসে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার বুঝলে তো! এ কারণেই আমি ওকে একটু বেশিই স্নেহ করি।
তাই আপনি যেখানেই লুকিয়ে থাকুন না কেন, যেখানেই আত্মগোপন করুন না কেন, আল্লাহর শক্তিশালী দৃষ্টি থেকে দূরে কোথাও যেতে পারবেন না।[১]

আল্লাহ তাআলা আপনার দিকে সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রেখে এই কথাটিই শিক্ষা দিতে চান যে, হে বান্দা! তুমি কি আমার ব্যাপারে লজ্জা করো না? তুমি একদিন আমার সামনে উপস্থিত হবে, সেদিনটিকে তুমি কি ভয় করো না? তোমার ফিরে আসার সময় কি এখনো হয়নি?
আপনি সালাতে দাঁড়ানোর সময় কল্পনা করুন, আল্লাহ আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। সালাতে দাঁড়ানোর পূর্বেই পাক-পবিত্র ও উত্তম পোশাক পরে নিন। সামান্য কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আপনি আপনার উন্নত মানের পোশাক পরে বের হন। অথচ সালাত আদায়ের সময় যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ান, তখন আপনি পরেন নিম্নমানের পোশাক। কেন আপনার এই দ্বৈত নীতি? আপনি কি আল্লাহর সামনে উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না? আপনি কি বিশ্বাস করেন না, সালাতে দাঁড়ানো মানে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সামনেই দাঁড়ানো? সালাফগণ সালাতের পূর্বে চুল-দাড়ি আঁচড়িয়ে পরিপাটি হয়ে নিতেন। কারণ তারা উপস্থিত হতে যাচ্ছেন মহান রবের সামনে। মহামহিম আল্লাহ বলেন-

يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ )

হে আদম সন্তান, তোমরা সালাতের সময় সৌন্দর্য গ্রহণ করো। তোমরা পানাহার করো কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।[২]

এই আলোচনা দ্বারা আমি আপনার সমালোচনা করছি না। আমি শুধু আপনার ঘুমন্ত চেতনাকে একটু জাগিয়ে তুলতে চাচ্ছি। আপনি দুনিয়াবি কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় যদি সুন্দর ও পরিপাটি পোশাক পরতে পারেন, তবে আল্লাহর সামনে কেন পারবেন না? মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর। জুমআর দিন মুমিনের ঈদ; আনন্দোৎসব। আর আপনি হলেন সেই উৎসবের দিনে আল্লাহর ঘরের মেহমান। আপনিই বলুন, এমন বরকতপূর্ণ মাহফিলে নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও নিম্নমানের পোশাক পরে যাওয়া কি সমীচীন?
তাই নবিজির সুন্নাহ হলো, জুমআর দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে, উত্তম পোশাক পরিধান করে মসজিদে গমন করা।

রাখাল-বালকের আল্লাহভীরুতা

আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার সাথি-সঙ্গীদের নিয়ে মদিনার অদূরে কোথাও যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দুপুর বেলা এক স্থানে যাত্রাবিরতি নিলেন বিশ্রামের জন্য। সবাই মিলে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য দস্তরখান বিছিয়েছেন। ঠিক সে সময় দেখা গেল, একপাল বকরী-সহ এক রাখাল যাচ্ছে।
ইবনু উমারের ইচ্ছে হলো, তিনি রাখালের আল্লাহভীরুতা পরীক্ষা করে দেখবেন। তাই রাখালকে ডেকে বললেন, এসো আমাদের সাথে খাবারে শরিক হও।
রাখাল উত্তর দিলো, আমি খেতে পারব না এখন। আমি আজ সিয়াম রেখেছি।
ইবনু উমার বললেন, তুমি একটা বকরী আমাদের কাছে বিক্রি করে দিতে পারো। আমরা তোমার বকরীর উপযুক্ত দাম দিয়ে দেবো। তা দিয়ে তুমি ইফতার কিনে খেতে পারবে।
রাখাল বলল, এই বকরী তো আমার নয়, আমার মালিকের।
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি তোমার মালিককে গিয়ে বলবে, পালের একটা বকরীকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে!
রাখাল তখন আসমানের দিকে আঙুল তুলে বলল, আমি না-হয় মিথ্যা বলে মালিকের চোখে ফাঁকি দেবো। কিন্তু আমার মালিকের যিনি মালিক (আরশের অধিপতি), তাকে আমি কীভাবে ফাঁকি দেবো? মাফ করবেন, এ কাজ আমাকে দিয়ে সম্ভব নয়!
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রাখালের তাকওয়া দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন।। এই রাখাল কতটুকুই বা শিক্ষিত ছিল? বাহ্যিকভাবে তার শিক্ষাদীক্ষা ছিল শূন্যের কোঠায়। কিন্তু সে দ্বীনের মূল আকিদা-বিশ্বাসের গোড়ায় পৌঁছুতে পেরেছে। আপনার বাড়িতে বিশাল বড় লাইব্রেরি রয়েছে। আলমারিগুলো বইপত্রে বোঝাই। আপনার লাইব্রেরি দেখে সকলেই আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় গদগদ হয়ে যায়। কিন্তু আপনি আল্লাহকে ভয় করেন না, আপনি যে আল্লাহর পর্যবেক্ষণের সীমানায় রয়েছেন তা ভুলে যাচ্ছেন। হারাম অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকছেন না, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখুন, আল্লাহর কাছে আপনার এই জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই। পক্ষান্তরে এই অশিক্ষিত রাখাল আল্লাহর কাছে আপনার চেয়ে অনেক বেশি প্রিয়; অনেক বেশি মর্যাদাবান। আজ এই রাখালের মতো ইস্পাতদৃঢ় ঈমান খুব প্রয়োজন আমাদের। আর-রাকিবের প্রতি এমন অগাধ আস্থা ভীষণ দরকার।
এমন দম্পতির দেখা মেলা ভার যারা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল; এমন সন্তানসন্ততি ও পরিবার-পরিজন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যারা সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির গুণে গুণান্বিত। আজ সততা, বিশ্বস্ততার বড়ই অভাব। চারদিকে শুধু বিশ্বাসভঙ্গের জয়জয়কার, খিয়ানত ও মিথ্যা অভিনয়ের দৌরাত্ম্য। আপনি দেখবেন কত দাঈ রয়েছে, দিনের বেলায় তারা মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করছে; সবাইকে ভালো ভালো উপদেশ দিচ্ছে-

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ ...

হে মানব-সকল, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো।[১]

কিন্তু সেই তারাই আবার রাতের বেলায় পাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যে কারণে মানুষ তাদের কথা গ্রহণ করছে না।
তাই সততা ও আত্মার শুদ্ধতা হলো সবচেয়ে বড় জিনিস। অন্তর থেকেই যদি দ্বীনি চেতনা আপনাকে পথ দেখাতে না পারে, তাহলে তা নিছক অভিনয় ও শঠতা বৈ কিছু নয়।

আপনি নিজেই নিজের হিসাব কষে দেখুন। আপনি কি আমানতদারিতা রক্ষা করে চলেন? কারো সাথে আপনার লেনদেন হলো, তার নথিপত্র, সাক্ষী সব উপস্থিত। তাই সময়মতো আপনি অপরপক্ষের পাওনা বুঝিয়ে দিলেন। আপনি কি ভেবে নিয়েছেন, এটা আমানতদারিতা? শুধু এতটুকু কাজ আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ যেখানে দলিল-পত্র বা সাক্ষী বিদ্যমান সেখানে আপনি পাওনা বুঝিয়ে দিতে বাধ্য। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ না করলে তারা আপনার নামে আদালতে মামলা ঠুকে দেবে। আর আদালত আপনার কাছ থেকে তা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে ছাড়বে।
আল্লাহর কাছে প্রকৃত আমানতদার তো সেই ব্যক্তি, যে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই পাওনাদারের পাওনা বুঝিয়ে দেয়। দুনিয়ার কেউ জানবে না, পাওনাদার নিজেও হয়তো জানতে পারবে না, কিন্তু শুধু আল্লাহর ভয়েই তার পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার নাম আমানতদারিতা। আমি একবার সালাতের পর মসজিদে বসে আছি। এমন সময় একটি চিঠি এলো আমার নামে। খুলে দেখলাম চিঠিতে লেখা, শাইখ! আমাদের এখানে এক লোক মারা গেছেন। আমি তার কাছ থেকে ২০ হাজার পাউন্ড ধার করেছিলাম। কিন্তু এটা তার পরিবারের কেউ জানত না। তবু আমি পুরোটাই পরিশোধ করে দিয়েছি।
এটাই হলো আমানতদারিতা। কেউ জানে না; তারপরও কেবল আল্লাহর ভয়ে সে হকদারের হক আদায় করেছে। কারণ আল্লাহ মহান পর্যবেক্ষক, আর-রাকিব। অনেক মানুষই এভাবে অন্যের কাছে তাদের সম্পদ রেখে মারা যায়, স্ত্রী বা সন্তানেরা কেউ জানতে পারে না। ফলে মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদও মৃত্যুবরণ করে। সন্তানেরা বলে, আমরা আমাদের বাবার অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে কিছুই জানি না।
কিন্তু যারা বিশ্বাস করে আসমানি এই সতর্ক বার্তায়- 'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সবকিছুর পর্যবেক্ষক'-তারা কখনো মৃতের হক লুকোতে পারে না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের কাছে গিয়ে সম্পদ বুঝিয়ে দেয়।
একজন ঈমানদার ব্যবসায়ী কি কখনো তার পণ্যে ভেজাল মেশাতে পারে? পণ্যের কোনো দোষ থাকলে তা ক্রেতার কাছে গোপন করতে পারে?

মনে করুন, আপনি একজন তেল-বিক্রেতা। আপনার তেলের পাত্রে যদি একটি ইঁদুর মরে পড়ে থাকে, তবে আপনি কি ঐ তেল আল্লাহর বান্দাদের খাওয়াতে পারবেন? মহান রবের ওপর যদি আপনার ঈমান থেকে থাকে, তাহলে কীভাবে আপনি এই দোষ গোপন করে তা মানুষের কাছে বিক্রি করবেন?
মানুষের খাদ্যজাত গরু-ছাগলকে মোটাতাজাকরণে ব্যবহার করা হয় স্টেরয়েড হরমোন ও ইউরিয়ার মতো কিছু বিষাক্ত উপাদান। এরপর তা চড়া দামে বিক্রি করা হয় ভোক্তা আর ক্রেতাদের কাছে। আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সামান্য ভয়টুকু যাদের মধ্যে আছে, তারা কখনো মানুষ কিংবা পশুপাখির খাবারে এসব মেশাতে পারবে না!
দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই আমরা মুখোমুখি হই কত ধরনের খিয়ানত, ছলচাতুরি ও বিশ্বাসঘাতকতার। খাবারে ভেজালের সংমিশ্রণ, পণ্যমূল্য বাড়িয়ে বলার প্রতারণা, শঠতা ও লেনদেনে অস্বচ্ছতা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর জীবন থেকে মুক্তি পেতে গেলে অবশ্যই সকলকে আর-রাকিব নামটির মর্ম উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আল্লাহকে যে আর-রাকিব হিসেবে বিশ্বাস করে, তার জন্য আর কোনো পরিদর্শক বা নিয়ন্ত্রকের প্রয়োজন হয় না। কারণ আর-রাকিবের প্রতি বিশ্বাসই তাকে কর্মস্থলে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন করতে বাধ্য করে।
আমার পরিচিত এক ভাই ছিল, সে প্রতিদিন দুই-এক ঘণ্টা দেরি করে অফিসে যেত; আবার কাজের মাঝখানেও কিছু সময় বিশ্রাম নিত। মাস শেষে সে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বরাবর ছুটি চেয়ে দরখাস্ত করল। দরখাস্ত মঞ্জুরও হয়ে গেল। কিন্তু সে পরদিন থেকে অফিস করতে লাগল ছুটি না কাটিয়ে। ম্যানেজিং ডিরেক্টর জানতে চাইল, কী ব্যাপার? তুমি ছুটি নিয়ে আবার অফিসে এলে কেন?
সে উত্তর দিলো, স্যার! আমি প্রতিদিন অফিসে কিছুটা দেরি করে আসতাম। আমি আমার দেরি হওয়া সময়গুলো হিসাব করে দেখলাম, এক মাসে আমি যতটুকু দেরি করেছি তা তিনদিনের সমান।

অফিসের এমডি চোখের সামনে এই অনুপম আদর্শ এবং বিরল সততা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কারণ, যে সমাজে সে বাস করে, সে সমাজে সৎ মানুষ পাওয়া নিতান্তই দুষ্কর।
ঐ ভাইটি পরে আমাকে বলেছে, শাইখ! আমি যখন আপনার পরবর্তী দারসে হাজির হলাম, তখন দেখি আমাদের এমডি স্যারও দারসে এসেছেন!
আলহামদুলিল্লাহ। এটাও একটা খুশির সংবাদ। তার সততার নমুনা দেখে আরেক ভাই সত্যের সন্ধান পেয়েছে।
এজন্যই আমি ভাইদের খুব গুরুত্ব সহকারে একটি কথা বলে থাকি, আপনারা আল্লাহর নাম 'আর-রাকিব'-এর অর্থ অনুযায়ী নিজ জীবন পরিচালনা করুন। দেখবেন আপনার চলাফেরা, ওঠা-বসা, কথা-বার্তা সবকিছুই হয়ে যাবে নীরব এক দাওয়াত।
সরকারি হাসপাতালের অনেক ডাক্তার ভাইদের সাথে আমার পরিচয় আছে। হাসপাতালে তারা ফ্রি চিকিৎসা করেন। হার্ট, ব্রেইন ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অস্ত্রোপচার-সহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের দায়িত্ববোধ দেখুন। একজন রোগী দুই হাজার টাকা ভিজিট দিয়ে চিকিৎসা করায়, আরেকজন মানুষ ফ্রিতে চিকিৎসা নিতে আসে; অথচ তারা এই দুজনের চিকিৎসায় কোনো পার্থক্য করেন না। ফ্রি হওয়ার কারণে একজন অভাবী মানুষকে পর্যাপ্ত সেবাটুকু দিতে কখনো কার্পণ্য করেন না।
এক আল্লাহভীরু আলিমকে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে আমরা রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় নজরের হিফাজত করতে পারি?
আলিম উত্তর দিলেন, মনে রাখবে তোমার দৃষ্টি খিয়ানত করার আগেই আল্লাহ তোমাকে দেখে ফেলেছেন, তাঁর দৃষ্টি তোমাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তার সামনে গিয়েই তোমাকে দাঁড়াতে হবে; দৃষ্টির সামান্য খিয়ানতেরও হিসাব দিতে হবে!
আপনার মনে হতে পারে বর্তমান সময়ে কীভাবে দৃষ্টি হিফাজত করা সম্ভব? নারীরা সৌন্দর্য প্রদর্শন করে রাস্তায় চলাফেরা করে! অফিসে, মার্কেটে, শপিংয়ে সবখানেই তাদের অবাধ বিচরণ!

আপনার সান্ত্বনার জন্য বলছি, এই যুগেও আপনার মতো অনেক টগবগে যুবক রয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানের সামনে মাথা নত করে। মহামহিম আর-রাকিবকে ভালোবেসে তারা হারাম দৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে। লিফটে উঠতে গিয়ে যদি দেখে ভেতরে কেবল একজন মেয়ে, তখন তৃতীয় কোনো ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকে কিংবা লিফট ছেড়ে সিঁড়ি বেয়েই ওপরে উঠতে শুরু করে। লিফটে অল্প সময়ের জন্যও গায়রে মাহরামের সাথে নির্জনে থাকা তারা অপছন্দ করে। আপনার মতো একজন যুবক হয়ে সে যদি এভাবে আত্মসংযমের পথ বেছে নিতে পারে, তবে আপনি কেন পারবেন না? আল্লাহর এই আয়াতকে অন্তরে খোদাই করে নিন—

أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى *

সে কি বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তাকে দেখছেন? [১]

আল্লাহর নামের প্রতি বান্দার আদব

নিজের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, অনুভূতি-উপলব্ধি এবং প্রতিটি পদক্ষেপের মুহূর্তে মন-মস্তিষ্কে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির চেতনা লালন প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। তাই সব কাজে আল্লাহকে স্মরণ রাখুন।
ইবনু আতাউল্লাহ ইস্কান্দারি বলেন, 'সর্বোত্তম ইবাদত হলো সদা সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা।'
বিখ্যাত মনীষী আবু হাফস আমর ইবনু সালামা নিসাপুরি[২] বলেন, 'যখন তুমি মানুষের সামনে বসবে, তখন নিজ হৃদয়-আত্মার জন্য উপদেশদাতা হয়ে যাবে। তোমার সামনে লোকজনের ভিড় যেন তোমাকে প্রতারিত না করে; তারা দেখে তোমার বাহ্যিক অবস্থা; কিন্তু আল্লাহ পর্যবেক্ষণ করেন তোমার আত্মিক ও অভ্যন্তরের অবস্থা।'
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ এক লোককে বললেন, 'সর্বদা আল্লাহর ‘ধ্যানে মগ্ন থাকো!’
লোকটি বলল, ‘সেটা কীভাবে করব?’
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ উত্তর দিলেন, ‘সর্বদা এমনভাবে থাকো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ!’
চমৎকার এই দুআটি স্মৃতির কোটরে রেখে দিন-

اَللَّهُمَّ اجْعَلْنَا نَخْشَاكَ كأَنَّنَا نَرَاكَ

হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়ে আপনার ভয় দান করুন। আমাদেরকে এমন মগ্নতা দান করুন, যেন অনুভবে মনে হয়, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি!
আল্লাহর মুরাকাবা বা আল্লাহর ধ্যানে মগ্নতা একটি বিশাল মর্যাদার স্তর; যে ব্যক্তি এ স্তরে উন্নীত হতে পারল, সে তো জান্নাতে পৌঁছে গেল। দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত সুখ-সাফল্য ধরা দিলো তার দোরগোড়ায়। তাই আল্লাহর আদেশের ওপর অটল-অবিচল থাকুন। মগ্ন থাকুন তাঁর ধ্যানে। আপনি ভুলে গেলেও তিনি আপনাকে ভুলবেন না। তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি থেকে কোথায় পালাবেন আপনি?

টিকাঃ
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ১
[১] সুরা হ্রদ, আয়াত: ৯৩
[২] সুরা ফাজর, আয়াত : ১৪
[৩] সহিহ বুখারি: ৩৭১৩
[১] সুরা কাফ, আয়াত: ১৮
[২] সুরা কাফ, আয়াত: ১৬
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১৪৭
[১] সুরা ফাতির, আয়াত: ৩৮
[১] সূরা যিলযাল, আয়াত: ৭-৮
[১] সুনানুন নাসায়ি: ৭১৬; মুসনাদু আহমাদ: ৬৫৭৫
[১] ইতহাফ সাদাতিল মুতকিনিন বিশারহি ইহইয়াই উলুমিদ্দিন, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা : ১৮১
[২] সূরা আরাফ, আয়াত: ৩১
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১
[১] সূরা আলাক, আয়াত: ১৪
[২] মৃত্যু: ২৬৪ হিজরি

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-বাসির : সর্বদ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা

📄 আল-বাসির : সর্বদ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা


মিশমিশে কালো এক অন্ধকার পথ। সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ছোট্ট একটি কালো পিঁপড়া। পথিক জানতেও পারবে না, কখন সে নিজের অজান্তে পিঁপড়াটিকে মাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এমন এক সত্তা আছেন, যিনি দেখার জন্য আলোর মুখাপেক্ষী নন, যার দৃষ্টি থেকে আড়াল হতে পারে না কোনোকিছুই। তিনি মহান আল্লাহ, আল-বাসির।

আল-বাসির—যিনি দ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা। শব্দটি এসেছে ‘আল-বাসার’ থেকে। আল-বাসার অর্থ চোখ, দর্শনেন্দ্রিয়। এর আরেক অর্থ দৃষ্টিশক্তি; দেখার জন্য প্রয়োজনীয় আলো, যা দ্বারা দর্শনযোগ্য বস্তুসমূহ অবলোকন করা যায়। দৃষ্টি যত তীক্ষ্ণই হোক না কেন, বস্তুর ওপর আলো না পড়লে কিছু দেখা সম্ভব নয়। একই অবস্থা মানব-মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেধা ও স্মৃতিশক্তি যত ধারালোই হোক না কেন, কোনো বিষয় সূর্যের মতো পরিষ্কার হলেও আল্লাহ প্রদত্ত আলোকময় দিকনির্দেশনা ছাড়া কখনোই প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ

হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো, তবে তিনি তোমাদের দান করবেন ন্যায়-অন্যায় পৃথক করার শক্তি; তোমাদের পাপগুলো মুছে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ যে অতিশয় করুণাময়![১]

কুরআনে অন্যত্র তিনি বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো। নিজগুণে তিনি তোমাদের দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন। সেই সাথে তোমাদের দান করবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে এবং তিনি তোমাদের ক্ষমা করবেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [২]

অর্থাৎ, যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথের আলোকবর্তিকা না থাকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান বাণী না থাকে, তাহলে অবশ্যই আপনি পথ হারিয়ে ফেলবেন, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবেন। হয়তো আপনি নিজেই অকল্যাণ ও ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলবেন কিংবা অন্য কেউ আপনাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।
অতএব, বাসির অর্থ দ্রষ্টা, চোখের জ্যোতিসম্পন্ন; আল-বাসিরের দৃষ্টি তাঁর বান্দাদের সমস্ত কিছু পরিব্যাপ্ত করে আছে।

দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি

নিজের নিরাপত্তা, অস্তিত্বের সংরক্ষণ এবং নিজ কল্যাণের প্রতি আগ্রহ মানুষের মজ্জাগত। সবাই নিরাপত্তা চায়, পেতে চায় দীর্ঘায়ু। তাই যে পথে ক্ষতি, বিপদ বা কষ্টদায়ক কিছু রয়েছে, স্বভাবতই মানুষ সেদিকে পা বাড়াতে ইচ্ছুক নয়। কারণ, সে নিজের ভালো-মন্দ ও লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখে। সুখ-দুঃখ, উপকার-অপকারের সঠিক বোধই তাকে বিপদসংকুল পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

কিন্তু মানুষের দূর্ভাগ্য চরমে পৌঁছে যায়, যখন তার দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি ঘটে; যখন সে কল্যাণকে অকল্যাণ মনে করে আর ধ্বংসকে আপন করে নেয়।
যারা দিনরাত পাপাচারে ডুবে থাকে, তারা কেন নিষিদ্ধ কাজের পেছনেই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে চলে? কেন তারা আপন রবের বিধিবিধান অমান্য করে নিজেদের নিক্ষেপ করেছে ধ্বংসকুণ্ডে? কারণ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গিয়েছে, তারা নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক বিকারের শিকার হয়েছে। তারা ভেবে নিয়েছে, এমন লাগামহীন জীবনই তাদের মনে অনাবিল সুখ এনে দেবে। হারাম পথে উপার্জনই তাদের নিশ্চয়তা দেবে অঢেল সম্পদের।
যদি তাদের সুস্থ মানসিকতা থাকত, তারা যদি জানত, আল্লাহর আনুগত্যেই রয়েছে একমাত্র সুখ; যদি তারা বুঝত, আল্লাহর প্রতি একাগ্রতাই কেবল পারে প্রশান্তি ও তৃপ্তি দিতে, তাহলে তারা কখনোই ঐ অন্ধকার জগতে পা বাড়াত না।
তাহলে আল্লাহর আনুগত্যকারী, একজন সৎ মুমিন আর আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত একজন পাপীর মাঝে মৌলিক পার্থক্য কোথায়? মূল পার্থক্য দৃষ্টিভঙ্গিতে। একজন সুখ ও সাফল্য খোঁজে অন্ধকার জগতে, নর্দমার নোংরা জলে। আরেকজন সুখ, সমৃদ্ধি ও সফলতা খোঁজে আল্লাহর আনুগত্যে; নিঝুম রাতের নীরবতায় রবের সান্নিধ্যে সিজদায় লুটিয়ে।
মিসরের সম্রাজ্ঞী (আযিযে মিশরের প্রিয়তমা স্ত্রী) ইউসুফ আলাইহিস সালামকে আবেদন জানিয়েছিল সকলের চোখ এড়িয়ে হারাম পথে কামনা পূর্ণ করার। তখন কী করেছিলেন নবি ইউসুফ? তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর আশ্রয়। তিনি জানতেন তার রব আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। তিনি নিশ্চয়ই এসব কিছু দেখছেন। তিনি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দেবেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সেদিন লোভনীয় হারামে জড়াতে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু কী পার্থক্য তাদের দুজনার মাঝে? এত বিশাল পদমর্যাদার অধিকারী, রূপ-লাবণ্যে যার কোনো কমতি নেই, অর্থ-বৈভব যার কাছে অতি তুচ্ছ-সে কেন কুপ্রবৃত্তির লালসায় বিভোর হয়ে ছিল? সে কেন কামনার বশবর্তী হয়ে নবি ইউসুফকে জোরপূর্বক কাছে পেতে চাইছিল? আর এমন লোভনীয় প্রস্তাব হাতের কাছে পেয়েও ইউসুফ আলাইহিস সালাম কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন? কেন দৌড়ে পালাচ্ছিলেন মিসরের রূপবতী সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে? কারণ একটাই-দৃষ্টিভঙ্গি। একজন সুখ খুঁজেছিল প্রবৃত্তির তাড়নায়, আরেকজন সফলতা চেয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে।

যখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ হবে, আপনার সকল কাজ এমনিতেই সুশোভিত হবে, আপনি পাবেন সাফল্যের সন্ধান। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই।
এজন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন-

اللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتَّبَاعَهُ، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلاً وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ

হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সামনে সত্যকে সত্যরূপে দেখিয়ে দিন এবং সত্যের অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবেই দেখিয়ে দিন এবং তা পরিহার করার তাওফিক দিন [১]

কত মানুষ আছে তারা সত্যকে বাতিল আর বাতিলকে সত্য মনে করে। তাই হৃদয়-জগতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ঝলক নুরের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রথমে আপনি মন-মানসিকতা বদলে ফেলুন এবং দৃঢ় শপথ নিন, 'সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেব, সত্যকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরব।'
মাঝে মাঝে আমার এমন কিছু যুবকের সাথে দেখা হয় যারা এই বয়সেই দ্বীন মেনে চলে, সৎ ও ঈমানী জীবন যাপন করে। তাদের সাথে দেখা হলেই আমি একটি কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে বলি, 'আল্লাহ আপনাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামতটি দান করেছেন তা হলো হিদায়াতের নিয়ামত। আল্লাহ আপনাকে এক বিশেষ নুর দিয়েছেন, যা আপনার সামনে সত্যকে তুলে ধরে এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে উপস্থাপন করে।'
মানুষ যখন আল্লাহর সান্নিধ্যে যায়, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁর আদেশ বাস্তবায়নে কর্মতৎপর হয়ে ওঠে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে এই আলোর ঝলক দেন। যা তার সারা জীবনের জন্য অমূল্য পাথেয় হয়ে কাজ করে।

তিনি মহাদ্রষ্টা, পরিব্যাপ্ত তাঁর দৃষ্টি

আল-বাসির আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। যিনি দেখেন সৃষ্টি জগতের সবকিছু; সামনে-পিছনে, ভেতরে-বাহিরে, প্রকাশ্যে-আড়ালে সর্বাবস্থায়ই তিনি সবকিছু দেখেন। শুধু তিনিই দেখতে পান বস্তুর প্রকৃত অবস্থা।

প্রকৃত অবস্থা না জানলে কাউকে 'বাসির' বলা যায় না। আপনি অর্ধশত কোটি টাকা দিয়ে এক খণ্ড হীরা কিনে আনলেন। এরপর তা কাদায় রেখে দিলেন। কাদা থেকে তুলে সূর্যের আলোয় রাখলে দেখা যাবে তা কর্দমাক্ত। কিন্তু এটা বাহ্যিক দৃষ্টি, বাইরে কাদা লাগলেও ভেতরে কিন্তু সেটা ঠিকই মহামূল্যবান এক হীরা। 'বাসার' দ্বারা যে দৃষ্টি বোঝায় তা হলো প্রকৃত অবস্থা দর্শন।
অনেক জিনিস আমাদের দৃষ্টিতে লুকায়িত, প্রচ্ছন্ন থাকে, কিন্তু আল্লাহর সামনে সব কিছুই স্পষ্ট। আমরা হয়তো কাদায় পড়ে থাকা হীরাকে একটি নোংরা জিনিস মনে করতে পারি, কিন্তু আল্লাহ জানেন সেটা মহামূল্যবান বস্তু।
আপনার দৃষ্টিতে হয়তো একজন মানুষকে বাহ্যিকভাবে অসুন্দর লাগল, স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি আপনি তেমন আগ্রহী হবেন না। কিন্তু হতে পারে লোকটি পৃথিবীর সর্বাধিক জ্ঞানীদের একজন। আপনি যদি তার ভেতরের অবস্থা জানতে পারেন তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন।
ইতিহাসের পাতায় এমন হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে। আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে তার শারীরিক গড়ন নিয়ে বলা হয়েছে, 'তিনি ছিলেন বেঁটে; চিবুক ছিল দৃষ্টিকটু, পা-দুটো বাঁকা, চোখ কোটরের ভেতরে, গলা কিছুটা স্ফীত; গায়ের রং বাদামী। এক কথায়, মানুষের কাছে অসুন্দর লাগার মতো যত কারণ থাকতে পারে তার সবকটা বৈশিষ্ট্যই তার মাঝে দেখা যেত।'
কিন্তু এই লোকটিই যখন রাগান্বিত হতেন, তখন একশো তরবারির খাপ খোলা হতো। কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করত না যে, কেন তিনি রেগেছেন।
ওপরে বর্ণিত বাহ্যিক আকৃতির মানুষটা হয়তো অতি সাধারণ, কিন্তু এর আড়ালে যে আহনাফ লুকিয়ে আছেন তিনি বিখ্যাত তাবিয়ি আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ।
আপনার ঘরে একটি ইয়াতিম শিশু রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইয়াতিমকে ধমক দিতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। আর আপনি যদি তাকে মারেন, যে দেখবে সে-ই তিরস্কার করবে। মানুষ আপনাকে ঘৃণার চোখে দেখবে। কিন্তু বাস্তবেই যদি সে এমন কোনো অপরাধ করে থাকে, যার সংশোধনের জন্য তাকে শাসন করা আবশ্যক এবং মানুষও সেটা জানে, তাহলে আপনাকে আর ভুল বুঝবে না। মনে করবে আপনি ঠিকই করছেন।

অভ্যন্তরীণ অবস্থা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় তারা আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে চলে আসবে। পরক্ষণে সত্য জেনে আবার তাদের ভুল ভাঙবে। আল্লাহ তাআলা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তা প্রকৃত অবস্থা জেনেই গ্রহণ করেন। কারণ, তিনি আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। আসল ঘটনা তার সামনে প্রচ্ছন্ন ও আবৃত থাকে না। আল্লাহর সামনে সবকিছু দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট।

সব দেখছেন যিনি

আল্লাহ আপনার সবকিছু জানেন। আপনার ইচ্ছা, কামনা-বাসনা এবং স্বাভাবিক প্রবৃত্তি সবকিছু। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা, সত্যনিষ্ঠা এবং কল্যাণপ্রিয়তা আল্লাহ দেখেন। আপনি সংকটে আছেন, কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, সেটাও কিন্তু আপনার রব দেখছেন। আপনার মুখ ফসকে একটি কথা বেরিয়ে গেল, আপনি কষ্ট পেলেন। আল্লাহ ঠিকই জানেন যে, আপনি এই কথা বলতে চাননি। এভাবে আপনার সুখ-দুখের সবকিছু আল্লাহ জানেন, দেখেন ও শোনেন। এটা আপনার জন্য বড় সান্ত্বনা; আনন্দের সংবাদ; আপনার রব আপনার সবকিছুর খবর রাখেন।
আপনি কোনো এক অফিসের কর্মচারী। টানা ৩ ঘণ্টা কাজ করার কারণে কিছুটা ক্লান্তি ও একঘেয়েমি চলে এসেছে আপনার মাঝে। তাই আপনি অল্প সময়ের জন্য একটু বারান্দার দিকে গেলেন। কিন্তু বের হতেই দেখলেন আপনার বস সামনে দাঁড়ানো। আপনাকে বের হতে দেখেই সে রাগে ফেটে পড়বে, দু-চারটা গালি দিতেও কার্পণ্য করবে না। কারণ, সে দেখেছে আপনার বাহ্যিক অবস্থা আর ভেবে নিয়েছে আপনি কাজ বাদ দিয়ে শুধু এদিক-ওদিক পায়চারিই করছেন। এর আগে যে একটানা ৩ ঘণ্টা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন তা সে দেখেনি। আসলে সে অসহায়; এটা তার সীমাবদ্ধতা যে, সে বাহ্যিক অবস্থা দেখতে পেলেও অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানতে সক্ষম নয়।
কিন্তু আনন্দিত হোন আল্লাহর প্রতি। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা তিনি জেনেছেন। আপনার বস যে আপনাকে তিরস্কার করেছে, আল্লাহ জানেন, তার এই আচরণ অন্যায়। আল্লাহ দেখেছেন, আপনি এই লোকটির জন্য এতক্ষণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আপনি অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
জনৈক সালাফ বলেছেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর; তাঁর অবিনশ্বর সত্তার জন্য। সকল প্রশংসা, গুণগান তাঁর জন্য, তাঁর অতিপ্রাকৃতিক জ্ঞানের জন্য। তাঁর কাছে কোনো সংবাদ পৌঁছানোর প্রয়োজন হয় না। তাঁর কাছে প্রমাণ করার জন্য সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না; শপথ করার প্রয়োজন হয় না। তিনি জানেন সবকিছু।'

সীমিত জ্ঞানের কারণেই মানুষ সন্দেহপ্রবণ

মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত। তারা কোনো কিছু দেখেই, চিন্তা-ভাবনা না করেই, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই নিজেকে সন্দিহান বিষয় থেকে সবসময় নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কাউকে দেবেন না। আপনাকে নিয়ে কোনো অহেতুক আলোচনার সূত্রপাত হওয়ার আগেই তার শেকড় উপড়ে ফেলুন। দেখুন আল্লাহর নবির অনুপম আদর্শ। নবিজি মসজিদে নববিতে ইতিকাফরত ছিলেন। রাতে উম্মুল মুমিনিন সাফিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহা দেখা করতে আসেন। নবিজি তার সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ সেখান দিয়ে দুজন সাহাবি গেলেন। নবিজি তাদের ডেকে বললেন, 'দাঁড়াও। ও হলো সাফিয়াহ; আমার স্ত্রী।' তারা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা আপনার ব্যাপারে কি কোনো সন্দেহ পোষণ করতে পারি?' নবিজি বললেন, 'না। তবে শয়তান যেন তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেজন্যই বলে দিলাম।' [১]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বাসির, সর্বদ্রষ্টা; তিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষের জ্ঞান নিতান্তই অল্প। তারা সামান্য কিছু দেখেই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত। তাই আপনার দায়িত্ব হলো, যেকোনো বিষয় অস্পষ্ট না রেখে খোলাসা করে দেওয়া। আপনি নিজেকে সন্দেহভাজন অবস্থানে রাখবেন আর ভাববেন, আল্লাহ তো আমাকে জানেন—এটা যথেষ্ট নয়; সুন্নাহ সমর্থিত পন্থাও নয়। বরং করণীয় এবং সুন্নাহ হলো, আপনার দিক থেকে অপবাদ, সমালোচনা বা সন্দেহের কোনো বিষয় এলে সঙ্গে সঙ্গে তা প্রতিহত করা।
আপনি গায়রে মাহরাম কোনো নারীর ঘরে ঢুকলেন একান্তে, নির্জনে। আপনি বরফের মতো স্বচ্ছ। হয়তো ফেরেশতার চেয়েও বেশি পবিত্র। আপনি একদম খাঁটি ও সৎ একজন ব্যক্তি। আপনার প্রবৃত্তির লাগাম সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে। তবু আপনার সাথে ঐ গায়রে মাহরাম নারীর নির্জন উপস্থিতি মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবে। অপবাদ, সমালোচনার সূত্রপাত ঘটানোর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

আপনি কোনো শপিং সেন্টারের একটি দোকানে গিয়ে দেখলেন সেখানে কেউ নেই। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওখান থেকে বের হয়ে চলে আসুন। এটা সন্দেহজনক স্থান, দোকানির অনুপস্থিতিতে সেখানে আপনার উপস্থিতি মানুষের মধ্যে সন্দেহ জাগিয়ে তুলবে। বলবেন না যে, দোকানির জন্য অপেক্ষা করছি। বিপদসংকুল জায়গা থেকে যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্বে থাকুন। নতুবা আপনি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হবেন।
অবশ্য এসবই বান্দার সীমাবদ্ধতা। ওদিকে আল্লাহর জ্ঞান অপরিসীম, দৃষ্টির ফাঁকফোকর দিয়ে যে খিয়ানত করা হয় তা তিনি দেখতে পান।
আপনি আপনার রুমে বসে আছেন। সামনে কাচের জানালা, তার সামনে অন্য কারো বারান্দা। আপনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ঠিক তখনই কোনো নারী বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আপনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নারীটির দিকে। পৃথিবীর কেউ জানবে না, কোনো মানুষ কখনো আপনাকে এর জন্য জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে না; কিন্তু কেউ না দেখলেও আল্লাহ ঠিকই দেখেছেন আপনার চোখের খিয়ানত, তিনিই এর হিসাব নেবেন কড়ায় গণ্ডায়।
আপনি যে শহরে বসবাস করছেন, শহরের লোকজনের সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন, আপনার উদারতা ও মহত্ত্বের কারণে তাদের ভালো মানুষ মনে করছেন। কিন্তু কোন শহরের মানুষ কতটুকু ভালো, কোন শহরটা পাপের রাজ্য-সে সংবাদ জানেন শুধু আল্লাহ। পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থা দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে, চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে। আপনি পশ্চিমাদের সংস্কৃতি স্বচক্ষে দেখেও বিশ্বাস করতে পারবেন না। একবার পশ্চিমা এক নারীর ব্যাপারে গণমাধ্যম বেশ গরম হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত সে সংসদ পদপ্রার্থীও ছিল। সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার মাধ্যমের সমস্ত সুযোগ ব্যবহার করে নিজের অবৈধ প্রেম, জীবনসঙ্গীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরকীয়ার কথা খুব গর্বের সাথেই পেশ করেছিল দুনিয়াবাসীর সামনে। যা আমাদের সমাজে কল্পনাও করা যায় না। তো কোন শহরের লোকজন ভালো আর কোন শহর পাপের নরকরাজ্য তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِن بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا *

নূহের পর আমি অসংখ্য মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি। বান্দাদের পাপাচারের খবর রাখা এবং তা পর্যবেক্ষণের জন্য আপনার প্রতিপালকই যথেষ্ট [১]

আল্লাহর আল-বাসির নামটি বান্দার মধ্যে এমন অনুভূতি জাগ্রত করে যে, সে সবসময় আল্লাহর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই অবস্থান করছে। এজন্য আল্লাহর নবি বলেছেন, শ্রেষ্ঠ ঈমান হলো, তুমি এটা বিশ্বাস করবে যে, তুমি আল্লাহর সাথেই আছ।
'আমি সদা আল্লাহর পর্যবেক্ষণে আছি'—এই অনুভূতি সর্বদা জাগরুক থাকাই হচ্ছে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, 'তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার মতো না হও, তাহলে মনের মধ্যে এই বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'
অর্থাৎ প্রকাশ্যে, গোপনে, লোকালয়ে, নির্জনে, নীরবতায়, জনসমাগমে-সর্বাবস্থায় আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।
আল্লাহ তাআলা দ্রষ্টা। তিনি আপনার জন্য সৃষ্টি করেছেন দৃষ্টিশক্তি। দু-চোখের মধ্যে আল্লাহ অসীম নিয়ামত দিয়েছেন। কর্নিয়া, আইরিশ, লেন্স, রেটিনা-সহ আরো কত কত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের এই চোখ। চোখ দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন।
নিজের নফসকে প্রশ্ন করুন, আল্লাহ তাআলা আমাদের কেন দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন? হারাম দৃষ্টিপাতের জন্য? ঈমান-বিধ্বংসী হারাম বস্তুসমূহের স্বাদ নেওয়ার জন্য? নাকি মহাবিশ্বের পরতে পরতে মহান আল্লাহর সৃষ্টিনৈপুণ্য ও অসীম নিয়ামতের প্রাচুর্য দেখার জন্য?
যে চোখ নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তু থেকে পবিত্র থাকে, যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেয়, যে চোখ আল্লাহর জন্য বিগলিত হয়, যে চোখ আল্লাহর আযাবের ভয়ে সিক্ত হয়, সেই চোখ আর যে চোখ হারামের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে—এই দুই চোখ কি কখনো সমান হতে পারে?

মহান রবের প্রতি বিনীত হোন

মহান স্রষ্টা, সবকিছুর দ্রষ্টা আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন আপনার চোখ সৃষ্টিতে। এই চোখ দিয়ে আপনি দেখছেন পৃথিবীর সবকিছু; সব রংয়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারছেন অনায়াসে। প্রিয়জনের প্রিয়মুখ, সন্তানসন্ততি, মা-বাবার দিকে তাকিয়ে লাভ করছেন তৃপ্তি। পবিত্র কুরআনের দিকে তাকিয়ে ধন্য করছেন আপনার চোখ; শীতল করছেন আপনার অন্তরাত্মা। এই চোখ দ্বারা এত নিয়ামত ভোগ করে এই চোখেরই স্রষ্টার সাথে নাফরমানি করা কি সাজে? চোখের স্রষ্টার প্রতি অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
হারামের জগতে আর কত দিন ঘোরাঘুরি? আল্লাহর অবাধ্যতায় আর কতকাল লাগামহীন জীবনযাপন?
এই চোখকে ব্যবহার করুন তার স্রষ্টাকে পাওয়ার কাজে। দু-চোখভরে দেখুন— জগৎ ও মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নিয়ামতরাজি, মিটমিট করে জ্বলতে থাকা হাজারো তারার মেলা, মখমলের মতো নরম জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো, ফুলের পাপড়িতে লেগে থাকা অপরূপ সৌন্দর্য! এসবের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখুন, খুঁজে পাবেন আপনার স্রষ্টার অপার মাহাত্ম্য!
আমাদের প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার রব আমাকে নয়টি বিষয়ের আদেশ প্রদান করেছেন।
সেই নয়টির মধ্যে একটি হলো— 'আমার নীরবতা যেন হয় চিন্তার মগ্নতা, আমার কথা যেন হয় আল্লাহর স্মরণ এবং আমার দৃষ্টি যেন হয় শিক্ষার উপকরণ।'
সবসময় মনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। যিনি আপনার চোখ ও দৃষ্টিশক্তি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি আপনাকে দেখবেন না? আল্লাহ বলেন—

أَيَحْسَبُ أَن لَّمْ يَرَهُ أَحَدٌ أَلَمْ نَجْعَل لَّهُ عَيْنَيْنِ *

মানুষ কি মনে করে, তাকে কেউ দেখছে না? আমি কি তাকে দুটি চোখ দান করিনি? [১]

অর্থাৎ যিনি আপনার চোখ সৃষ্টি করেছেন তিনি আপনার চোখের দৃষ্টি ও অন্তরের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে বেখবর নন!
সুমহান রব আরো বলেন-

وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ

(হে নবি!) আপনি নির্ভর করুন পরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর, যিনি আপনাকে দেখতে পান, যখন আপনি সালাতে দাঁড়িয়ে যান এবং সালাত আদায়কারীদের সাথে ওঠাবসা করেন।[২]

ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে, জানালার কাচ আর পর্দা টেনে দিয়ে, পৃথিবীর সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে আপনি লিপ্ত হচ্ছেন মহান রবের অবাধ্যতায়। হারাম সম্পর্কের আঁচল ধরে, অবৈধভাবে তারুণ্যের শক্তি একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছেন স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল-সাদার জগতে। পচা, দুর্গন্ধময় জগতের নিকৃষ্ট ভাগাড়ে ডুব দিচ্ছেন। আপনি কখনো ভেবেছেন, এই ভবনের ছাদ ভেদ করে, জানালা, দরজা আর দেওয়ালের প্রাচীর ভেদ করে আল্লাহর দৃষ্টি আপনার দিকে তাকিয়ে আছে! তিনি চাইলে এক মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারেন আপনার মূল্যবান চোখদুটি। অবশ করে দিতে পারেন আপনার শক্তিশালী দুটো হাত। বন্ধ দুয়ারের নিচ দিয়ে আসা অক্সিজেন বন্ধ করে দিয়ে টেনে দিতে পারেন আপনার অবাধ্যতার ইতি! কিন্তু তিনি আপনাকে সুযোগ দেন, যেন আপনি ফিরে আসেন। তিনি পথ চেয়ে থাকেন, আপনি কোনো একদিন ফিরবেন বলে!
ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পাপাচারী পাপের কাছাকাছি হওয়ার সময় যদি বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন, তাহলে সে আল্লাহর সামনে কী পরিমাণ দুঃসাহসী! কত বড় দুর্ভাগা! আর যদি মনে করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন না, তাহলে সে কত বড় কাফির, কত বড় গণ্ডমূর্খ! আল্লাহ তাকে দেখছেন জেনেও যদি পাপ করে ফেলে, তাহলে সেও কত বড় মূর্খ! কত বড় দুর্ভাগা!'
জ্ঞানীরা বলেছেন, মানুষ আল্লাহর চোখ থেকে যা লুকোতে পারে না তা যদি মানুষের কাছ থেকে লুকায়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহর সাথে তামাশা করে। আর মানুষ যখন বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা সর্বদ্রষ্টা, তিনি তার সবকিছুর ব্যাপারে খবর রাখেন, তখন তার হৃদয়-আত্মা আলোকিত হয়।
সালাফে সালিহিনের কেউ কেউ বলতেন, 'আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তোমার যদি পাপ করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে এমন কোথাও গিয়ে পাপ করো, যেখানে আল্লাহ তোমায় দেখতে পাবেন না!'
জীবনে যেখানেই যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, নিশ্চিত বিশ্বাস রাখুন, আপনি রয়েছেন আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিসীমার ভেতরেই। তিনি আপনার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। আপনি যখন সুখ অনুভব করছেন, জীবনের আনন্দঘন মুহূর্ত উপভোগ করছেন, তিনি দেখছেন আপনার হাসি; আপনার উচ্ছ্বাস। তখন তাঁর সামনে মাথা নত করে আদায় করুন শুকরিয়াজ্ঞাপক সিজদা।
আবার যখন আপনি ভেসে যাচ্ছেন পাপের অন্ধকার জগতে, ভুলে যাচ্ছেন গন্তব্যের কথা, ডুবে যাচ্ছেন অন্যায়-অপরাধের নর্দমায়, ভেসে যাচ্ছেন আল্লাহর অবাধ্যতার গড্ডলিকা প্রবাহে, তখনো তিনি আপনাকে দেখছেন। আপনি তাঁকে দেখতে পাবেন না; কিন্তু তিনি আপনার দিকে ঠিকই তাকিয়ে আছেন। এরপর তো ফিরে যেতে হবে তাঁরই দিকে। তাই করজোড়ে মিনতি করুন—
হে আল্লাহ, আপনি আল-বাসির, সম্যক ও মহাদ্রষ্টা। আপনি আমার প্রকাশ্য-গোপন সকল দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। আপনার হাতেই আমার জীবনের লাগাম। আমি ভিক্ষা চাইছি আপনার সম্মুখে। আমার হৃদয় ভরিয়ে দিন আলোতে; চোখে দান করুন জ্যোতি, যেন এর দ্বারা আমি আপনার অসীম নিয়ামতের মহিমা দেখতে পাই। প্রকাশ্যে-গোপনে, লোকালয়ে-নির্জনে সর্বাবস্থায় আপনার সামনে আদব ও সৌজন্য রক্ষা করতে চলতে পারি। আমি যেন চলি আপনার নির্ধারিত সীমারেখার গণ্ডিতে, আপনার আদেশের চৌহদ্দির ভেতরে। আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন আপনার প্রিয় বান্দাদের কাফেলায়। আমিন।

টিকাঃ
[১] সুরা আনফাল, আয়াত: ২৯
[২] সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৮
[১] তাফসির ইবনু কাসির, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪৮
[১] সহিহ বুখারি : ২০৩৫
[১] সূরা ইসরা, আয়াত: ১৭
[১] সুরা বালাদ, আয়াত: ৭-৮
[২] সুরা শুআরা, আয়াত: ২১৭-২১৯

মিশমিশে কালো এক অন্ধকার পথ। সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ছোট্ট একটি কালো পিঁপড়া। পথিক জানতেও পারবে না, কখন সে নিজের অজান্তে পিঁপড়াটিকে মাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এমন এক সত্তা আছেন, যিনি দেখার জন্য আলোর মুখাপেক্ষী নন, যার দৃষ্টি থেকে আড়াল হতে পারে না কোনোকিছুই। তিনি মহান আল্লাহ, আল-বাসির।

আল-বাসির—যিনি দ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা। শব্দটি এসেছে ‘আল-বাসার’ থেকে। আল-বাসার অর্থ চোখ, দর্শনেন্দ্রিয়। এর আরেক অর্থ দৃষ্টিশক্তি; দেখার জন্য প্রয়োজনীয় আলো, যা দ্বারা দর্শনযোগ্য বস্তুসমূহ অবলোকন করা যায়। দৃষ্টি যত তীক্ষ্ণই হোক না কেন, বস্তুর ওপর আলো না পড়লে কিছু দেখা সম্ভব নয়। একই অবস্থা মানব-মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেধা ও স্মৃতিশক্তি যত ধারালোই হোক না কেন, কোনো বিষয় সূর্যের মতো পরিষ্কার হলেও আল্লাহ প্রদত্ত আলোকময় দিকনির্দেশনা ছাড়া কখনোই প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ

হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো, তবে তিনি তোমাদের দান করবেন ন্যায়-অন্যায় পৃথক করার শক্তি; তোমাদের পাপগুলো মুছে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ যে অতিশয় করুণাময়![১]

কুরআনে অন্যত্র তিনি বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো। নিজগুণে তিনি তোমাদের দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন। সেই সাথে তোমাদের দান করবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে এবং তিনি তোমাদের ক্ষমা করবেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [২]

অর্থাৎ, যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথের আলোকবর্তিকা না থাকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান বাণী না থাকে, তাহলে অবশ্যই আপনি পথ হারিয়ে ফেলবেন, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবেন। হয়তো আপনি নিজেই অকল্যাণ ও ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলবেন কিংবা অন্য কেউ আপনাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।
অতএব, বাসির অর্থ দ্রষ্টা, চোখের জ্যোতিসম্পন্ন; আল-বাসিরের দৃষ্টি তাঁর বান্দাদের সমস্ত কিছু পরিব্যাপ্ত করে আছে।

দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি

নিজের নিরাপত্তা, অস্তিত্বের সংরক্ষণ এবং নিজ কল্যাণের প্রতি আগ্রহ মানুষের মজ্জাগত। সবাই নিরাপত্তা চায়, পেতে চায় দীর্ঘায়ু। তাই যে পথে ক্ষতি, বিপদ বা কষ্টদায়ক কিছু রয়েছে, স্বভাবতই মানুষ সেদিকে পা বাড়াতে ইচ্ছুক নয়। কারণ, সে নিজের ভালো-মন্দ ও লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখে। সুখ-দুঃখ, উপকার-অপকারের সঠিক বোধই তাকে বিপদসংকুল পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

কিন্তু মানুষের দূর্ভাগ্য চরমে পৌঁছে যায়, যখন তার দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি ঘটে; যখন সে কল্যাণকে অকল্যাণ মনে করে আর ধ্বংসকে আপন করে নেয়।
যারা দিনরাত পাপাচারে ডুবে থাকে, তারা কেন নিষিদ্ধ কাজের পেছনেই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে চলে? কেন তারা আপন রবের বিধিবিধান অমান্য করে নিজেদের নিক্ষেপ করেছে ধ্বংসকুণ্ডে? কারণ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গিয়েছে, তারা নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক বিকারের শিকার হয়েছে। তারা ভেবে নিয়েছে, এমন লাগামহীন জীবনই তাদের মনে অনাবিল সুখ এনে দেবে। হারাম পথে উপার্জনই তাদের নিশ্চয়তা দেবে অঢেল সম্পদের।
যদি তাদের সুস্থ মানসিকতা থাকত, তারা যদি জানত, আল্লাহর আনুগত্যেই রয়েছে একমাত্র সুখ; যদি তারা বুঝত, আল্লাহর প্রতি একাগ্রতাই কেবল পারে প্রশান্তি ও তৃপ্তি দিতে, তাহলে তারা কখনোই ঐ অন্ধকার জগতে পা বাড়াত না।
তাহলে আল্লাহর আনুগত্যকারী, একজন সৎ মুমিন আর আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত একজন পাপীর মাঝে মৌলিক পার্থক্য কোথায়? মূল পার্থক্য দৃষ্টিভঙ্গিতে। একজন সুখ ও সাফল্য খোঁজে অন্ধকার জগতে, নর্দমার নোংরা জলে। আরেকজন সুখ, সমৃদ্ধি ও সফলতা খোঁজে আল্লাহর আনুগত্যে; নিঝুম রাতের নীরবতায় রবের সান্নিধ্যে সিজদায় লুটিয়ে।
মিসরের সম্রাজ্ঞী (আযিযে মিশরের প্রিয়তমা স্ত্রী) ইউসুফ আলাইহিস সালামকে আবেদন জানিয়েছিল সকলের চোখ এড়িয়ে হারাম পথে কামনা পূর্ণ করার। তখন কী করেছিলেন নবি ইউসুফ? তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর আশ্রয়। তিনি জানতেন তার রব আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। তিনি নিশ্চয়ই এসব কিছু দেখছেন। তিনি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দেবেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সেদিন লোভনীয় হারামে জড়াতে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু কী পার্থক্য তাদের দুজনার মাঝে? এত বিশাল পদমর্যাদার অধিকারী, রূপ-লাবণ্যে যার কোনো কমতি নেই, অর্থ-বৈভব যার কাছে অতি তুচ্ছ-সে কেন কুপ্রবৃত্তির লালসায় বিভোর হয়ে ছিল? সে কেন কামনার বশবর্তী হয়ে নবি ইউসুফকে জোরপূর্বক কাছে পেতে চাইছিল? আর এমন লোভনীয় প্রস্তাব হাতের কাছে পেয়েও ইউসুফ আলাইহিস সালাম কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন? কেন দৌড়ে পালাচ্ছিলেন মিসরের রূপবতী সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে? কারণ একটাই-দৃষ্টিভঙ্গি। একজন সুখ খুঁজেছিল প্রবৃত্তির তাড়নায়, আরেকজন সফলতা চেয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে।

যখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ হবে, আপনার সকল কাজ এমনিতেই সুশোভিত হবে, আপনি পাবেন সাফল্যের সন্ধান। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই।
এজন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন-

اللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتَّبَاعَهُ، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلاً وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ

হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সামনে সত্যকে সত্যরূপে দেখিয়ে দিন এবং সত্যের অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবেই দেখিয়ে দিন এবং তা পরিহার করার তাওফিক দিন [১]

কত মানুষ আছে তারা সত্যকে বাতিল আর বাতিলকে সত্য মনে করে। তাই হৃদয়-জগতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ঝলক নুরের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রথমে আপনি মন-মানসিকতা বদলে ফেলুন এবং দৃঢ় শপথ নিন, 'সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেব, সত্যকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরব।'
মাঝে মাঝে আমার এমন কিছু যুবকের সাথে দেখা হয় যারা এই বয়সেই দ্বীন মেনে চলে, সৎ ও ঈমানী জীবন যাপন করে। তাদের সাথে দেখা হলেই আমি একটি কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে বলি, 'আল্লাহ আপনাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামতটি দান করেছেন তা হলো হিদায়াতের নিয়ামত। আল্লাহ আপনাকে এক বিশেষ নুর দিয়েছেন, যা আপনার সামনে সত্যকে তুলে ধরে এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে উপস্থাপন করে।'
মানুষ যখন আল্লাহর সান্নিধ্যে যায়, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁর আদেশ বাস্তবায়নে কর্মতৎপর হয়ে ওঠে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে এই আলোর ঝলক দেন। যা তার সারা জীবনের জন্য অমূল্য পাথেয় হয়ে কাজ করে।

তিনি মহাদ্রষ্টা, পরিব্যাপ্ত তাঁর দৃষ্টি

আল-বাসির আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। যিনি দেখেন সৃষ্টি জগতের সবকিছু; সামনে-পিছনে, ভেতরে-বাহিরে, প্রকাশ্যে-আড়ালে সর্বাবস্থায়ই তিনি সবকিছু দেখেন। শুধু তিনিই দেখতে পান বস্তুর প্রকৃত অবস্থা।

প্রকৃত অবস্থা না জানলে কাউকে 'বাসির' বলা যায় না। আপনি অর্ধশত কোটি টাকা দিয়ে এক খণ্ড হীরা কিনে আনলেন। এরপর তা কাদায় রেখে দিলেন। কাদা থেকে তুলে সূর্যের আলোয় রাখলে দেখা যাবে তা কর্দমাক্ত। কিন্তু এটা বাহ্যিক দৃষ্টি, বাইরে কাদা লাগলেও ভেতরে কিন্তু সেটা ঠিকই মহামূল্যবান এক হীরা। 'বাসার' দ্বারা যে দৃষ্টি বোঝায় তা হলো প্রকৃত অবস্থা দর্শন।
অনেক জিনিস আমাদের দৃষ্টিতে লুকায়িত, প্রচ্ছন্ন থাকে, কিন্তু আল্লাহর সামনে সব কিছুই স্পষ্ট। আমরা হয়তো কাদায় পড়ে থাকা হীরাকে একটি নোংরা জিনিস মনে করতে পারি, কিন্তু আল্লাহ জানেন সেটা মহামূল্যবান বস্তু।
আপনার দৃষ্টিতে হয়তো একজন মানুষকে বাহ্যিকভাবে অসুন্দর লাগল, স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি আপনি তেমন আগ্রহী হবেন না। কিন্তু হতে পারে লোকটি পৃথিবীর সর্বাধিক জ্ঞানীদের একজন। আপনি যদি তার ভেতরের অবস্থা জানতে পারেন তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন।
ইতিহাসের পাতায় এমন হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে। আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে তার শারীরিক গড়ন নিয়ে বলা হয়েছে, 'তিনি ছিলেন বেঁটে; চিবুক ছিল দৃষ্টিকটু, পা-দুটো বাঁকা, চোখ কোটরের ভেতরে, গলা কিছুটা স্ফীত; গায়ের রং বাদামী। এক কথায়, মানুষের কাছে অসুন্দর লাগার মতো যত কারণ থাকতে পারে তার সবকটা বৈশিষ্ট্যই তার মাঝে দেখা যেত।'
কিন্তু এই লোকটিই যখন রাগান্বিত হতেন, তখন একশো তরবারির খাপ খোলা হতো। কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করত না যে, কেন তিনি রেগেছেন।
ওপরে বর্ণিত বাহ্যিক আকৃতির মানুষটা হয়তো অতি সাধারণ, কিন্তু এর আড়ালে যে আহনাফ লুকিয়ে আছেন তিনি বিখ্যাত তাবিয়ি আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ।
আপনার ঘরে একটি ইয়াতিম শিশু রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইয়াতিমকে ধমক দিতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। আর আপনি যদি তাকে মারেন, যে দেখবে সে-ই তিরস্কার করবে। মানুষ আপনাকে ঘৃণার চোখে দেখবে। কিন্তু বাস্তবেই যদি সে এমন কোনো অপরাধ করে থাকে, যার সংশোধনের জন্য তাকে শাসন করা আবশ্যক এবং মানুষও সেটা জানে, তাহলে আপনাকে আর ভুল বুঝবে না। মনে করবে আপনি ঠিকই করছেন।

অভ্যন্তরীণ অবস্থা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় তারা আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে চলে আসবে। পরক্ষণে সত্য জেনে আবার তাদের ভুল ভাঙবে। আল্লাহ তাআলা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তা প্রকৃত অবস্থা জেনেই গ্রহণ করেন। কারণ, তিনি আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। আসল ঘটনা তার সামনে প্রচ্ছন্ন ও আবৃত থাকে না। আল্লাহর সামনে সবকিছু দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট।

সব দেখছেন যিনি

আল্লাহ আপনার সবকিছু জানেন। আপনার ইচ্ছা, কামনা-বাসনা এবং স্বাভাবিক প্রবৃত্তি সবকিছু। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা, সত্যনিষ্ঠা এবং কল্যাণপ্রিয়তা আল্লাহ দেখেন। আপনি সংকটে আছেন, কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, সেটাও কিন্তু আপনার রব দেখছেন। আপনার মুখ ফসকে একটি কথা বেরিয়ে গেল, আপনি কষ্ট পেলেন। আল্লাহ ঠিকই জানেন যে, আপনি এই কথা বলতে চাননি। এভাবে আপনার সুখ-দুখের সবকিছু আল্লাহ জানেন, দেখেন ও শোনেন। এটা আপনার জন্য বড় সান্ত্বনা; আনন্দের সংবাদ; আপনার রব আপনার সবকিছুর খবর রাখেন।
আপনি কোনো এক অফিসের কর্মচারী। টানা ৩ ঘণ্টা কাজ করার কারণে কিছুটা ক্লান্তি ও একঘেয়েমি চলে এসেছে আপনার মাঝে। তাই আপনি অল্প সময়ের জন্য একটু বারান্দার দিকে গেলেন। কিন্তু বের হতেই দেখলেন আপনার বস সামনে দাঁড়ানো। আপনাকে বের হতে দেখেই সে রাগে ফেটে পড়বে, দু-চারটা গালি দিতেও কার্পণ্য করবে না। কারণ, সে দেখেছে আপনার বাহ্যিক অবস্থা আর ভেবে নিয়েছে আপনি কাজ বাদ দিয়ে শুধু এদিক-ওদিক পায়চারিই করছেন। এর আগে যে একটানা ৩ ঘণ্টা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন তা সে দেখেনি। আসলে সে অসহায়; এটা তার সীমাবদ্ধতা যে, সে বাহ্যিক অবস্থা দেখতে পেলেও অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানতে সক্ষম নয়।
কিন্তু আনন্দিত হোন আল্লাহর প্রতি। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা তিনি জেনেছেন। আপনার বস যে আপনাকে তিরস্কার করেছে, আল্লাহ জানেন, তার এই আচরণ অন্যায়। আল্লাহ দেখেছেন, আপনি এই লোকটির জন্য এতক্ষণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আপনি অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
জনৈক সালাফ বলেছেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর; তাঁর অবিনশ্বর সত্তার জন্য। সকল প্রশংসা, গুণগান তাঁর জন্য, তাঁর অতিপ্রাকৃতিক জ্ঞানের জন্য। তাঁর কাছে কোনো সংবাদ পৌঁছানোর প্রয়োজন হয় না। তাঁর কাছে প্রমাণ করার জন্য সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না; শপথ করার প্রয়োজন হয় না। তিনি জানেন সবকিছু।'

সীমিত জ্ঞানের কারণেই মানুষ সন্দেহপ্রবণ

মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত। তারা কোনো কিছু দেখেই, চিন্তা-ভাবনা না করেই, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই নিজেকে সন্দিহান বিষয় থেকে সবসময় নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কাউকে দেবেন না। আপনাকে নিয়ে কোনো অহেতুক আলোচনার সূত্রপাত হওয়ার আগেই তার শেকড় উপড়ে ফেলুন। দেখুন আল্লাহর নবির অনুপম আদর্শ। নবিজি মসজিদে নববিতে ইতিকাফরত ছিলেন। রাতে উম্মুল মুমিনিন সাফিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহা দেখা করতে আসেন। নবিজি তার সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ সেখান দিয়ে দুজন সাহাবি গেলেন। নবিজি তাদের ডেকে বললেন, 'দাঁড়াও। ও হলো সাফিয়াহ; আমার স্ত্রী।' তারা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা আপনার ব্যাপারে কি কোনো সন্দেহ পোষণ করতে পারি?' নবিজি বললেন, 'না। তবে শয়তান যেন তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেজন্যই বলে দিলাম।' [১]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বাসির, সর্বদ্রষ্টা; তিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষের জ্ঞান নিতান্তই অল্প। তারা সামান্য কিছু দেখেই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত। তাই আপনার দায়িত্ব হলো, যেকোনো বিষয় অস্পষ্ট না রেখে খোলাসা করে দেওয়া। আপনি নিজেকে সন্দেহভাজন অবস্থানে রাখবেন আর ভাববেন, আল্লাহ তো আমাকে জানেন—এটা যথেষ্ট নয়; সুন্নাহ সমর্থিত পন্থাও নয়। বরং করণীয় এবং সুন্নাহ হলো, আপনার দিক থেকে অপবাদ, সমালোচনা বা সন্দেহের কোনো বিষয় এলে সঙ্গে সঙ্গে তা প্রতিহত করা।
আপনি গায়রে মাহরাম কোনো নারীর ঘরে ঢুকলেন একান্তে, নির্জনে। আপনি বরফের মতো স্বচ্ছ। হয়তো ফেরেশতার চেয়েও বেশি পবিত্র। আপনি একদম খাঁটি ও সৎ একজন ব্যক্তি। আপনার প্রবৃত্তির লাগাম সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে। তবু আপনার সাথে ঐ গায়রে মাহরাম নারীর নির্জন উপস্থিতি মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবে। অপবাদ, সমালোচনার সূত্রপাত ঘটানোর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

আপনি কোনো শপিং সেন্টারের একটি দোকানে গিয়ে দেখলেন সেখানে কেউ নেই। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওখান থেকে বের হয়ে চলে আসুন। এটা সন্দেহজনক স্থান, দোকানির অনুপস্থিতিতে সেখানে আপনার উপস্থিতি মানুষের মধ্যে সন্দেহ জাগিয়ে তুলবে। বলবেন না যে, দোকানির জন্য অপেক্ষা করছি। বিপদসংকুল জায়গা থেকে যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্বে থাকুন। নতুবা আপনি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হবেন।
অবশ্য এসবই বান্দার সীমাবদ্ধতা। ওদিকে আল্লাহর জ্ঞান অপরিসীম, দৃষ্টির ফাঁকফোকর দিয়ে যে খিয়ানত করা হয় তা তিনি দেখতে পান।
আপনি আপনার রুমে বসে আছেন। সামনে কাচের জানালা, তার সামনে অন্য কারো বারান্দা। আপনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ঠিক তখনই কোনো নারী বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আপনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নারীটির দিকে। পৃথিবীর কেউ জানবে না, কোনো মানুষ কখনো আপনাকে এর জন্য জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে না; কিন্তু কেউ না দেখলেও আল্লাহ ঠিকই দেখেছেন আপনার চোখের খিয়ানত, তিনিই এর হিসাব নেবেন কড়ায় গণ্ডায়।
আপনি যে শহরে বসবাস করছেন, শহরের লোকজনের সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন, আপনার উদারতা ও মহত্ত্বের কারণে তাদের ভালো মানুষ মনে করছেন। কিন্তু কোন শহরের মানুষ কতটুকু ভালো, কোন শহরটা পাপের রাজ্য-সে সংবাদ জানেন শুধু আল্লাহ। পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থা দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে, চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে। আপনি পশ্চিমাদের সংস্কৃতি স্বচক্ষে দেখেও বিশ্বাস করতে পারবেন না। একবার পশ্চিমা এক নারীর ব্যাপারে গণমাধ্যম বেশ গরম হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত সে সংসদ পদপ্রার্থীও ছিল। সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার মাধ্যমের সমস্ত সুযোগ ব্যবহার করে নিজের অবৈধ প্রেম, জীবনসঙ্গীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরকীয়ার কথা খুব গর্বের সাথেই পেশ করেছিল দুনিয়াবাসীর সামনে। যা আমাদের সমাজে কল্পনাও করা যায় না। তো কোন শহরের লোকজন ভালো আর কোন শহর পাপের নরকরাজ্য তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِن بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا *

নূহের পর আমি অসংখ্য মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি। বান্দাদের পাপাচারের খবর রাখা এবং তা পর্যবেক্ষণের জন্য আপনার প্রতিপালকই যথেষ্ট [১]

আল্লাহর আল-বাসির নামটি বান্দার মধ্যে এমন অনুভূতি জাগ্রত করে যে, সে সবসময় আল্লাহর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই অবস্থান করছে। এজন্য আল্লাহর নবি বলেছেন, শ্রেষ্ঠ ঈমান হলো, তুমি এটা বিশ্বাস করবে যে, তুমি আল্লাহর সাথেই আছ।
'আমি সদা আল্লাহর পর্যবেক্ষণে আছি'—এই অনুভূতি সর্বদা জাগরুক থাকাই হচ্ছে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, 'তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার মতো না হও, তাহলে মনের মধ্যে এই বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'
অর্থাৎ প্রকাশ্যে, গোপনে, লোকালয়ে, নির্জনে, নীরবতায়, জনসমাগমে-সর্বাবস্থায় আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।
আল্লাহ তাআলা দ্রষ্টা। তিনি আপনার জন্য সৃষ্টি করেছেন দৃষ্টিশক্তি। দু-চোখের মধ্যে আল্লাহ অসীম নিয়ামত দিয়েছেন। কর্নিয়া, আইরিশ, লেন্স, রেটিনা-সহ আরো কত কত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের এই চোখ। চোখ দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন।
নিজের নফসকে প্রশ্ন করুন, আল্লাহ তাআলা আমাদের কেন দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন? হারাম দৃষ্টিপাতের জন্য? ঈমান-বিধ্বংসী হারাম বস্তুসমূহের স্বাদ নেওয়ার জন্য? নাকি মহাবিশ্বের পরতে পরতে মহান আল্লাহর সৃষ্টিনৈপুণ্য ও অসীম নিয়ামতের প্রাচুর্য দেখার জন্য?
যে চোখ নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তু থেকে পবিত্র থাকে, যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেয়, যে চোখ আল্লাহর জন্য বিগলিত হয়, যে চোখ আল্লাহর আযাবের ভয়ে সিক্ত হয়, সেই চোখ আর যে চোখ হারামের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে—এই দুই চোখ কি কখনো সমান হতে পারে?

মহান রবের প্রতি বিনীত হোন

মহান স্রষ্টা, সবকিছুর দ্রষ্টা আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন আপনার চোখ সৃষ্টিতে। এই চোখ দিয়ে আপনি দেখছেন পৃথিবীর সবকিছু; সব রংয়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারছেন অনায়াসে। প্রিয়জনের প্রিয়মুখ, সন্তানসন্ততি, মা-বাবার দিকে তাকিয়ে লাভ করছেন তৃপ্তি। পবিত্র কুরআনের দিকে তাকিয়ে ধন্য করছেন আপনার চোখ; শীতল করছেন আপনার অন্তরাত্মা। এই চোখ দ্বারা এত নিয়ামত ভোগ করে এই চোখেরই স্রষ্টার সাথে নাফরমানি করা কি সাজে? চোখের স্রষ্টার প্রতি অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
হারামের জগতে আর কত দিন ঘোরাঘুরি? আল্লাহর অবাধ্যতায় আর কতকাল লাগামহীন জীবনযাপন?
এই চোখকে ব্যবহার করুন তার স্রষ্টাকে পাওয়ার কাজে। দু-চোখভরে দেখুন— জগৎ ও মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নিয়ামতরাজি, মিটমিট করে জ্বলতে থাকা হাজারো তারার মেলা, মখমলের মতো নরম জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো, ফুলের পাপড়িতে লেগে থাকা অপরূপ সৌন্দর্য! এসবের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখুন, খুঁজে পাবেন আপনার স্রষ্টার অপার মাহাত্ম্য!
আমাদের প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার রব আমাকে নয়টি বিষয়ের আদেশ প্রদান করেছেন।
সেই নয়টির মধ্যে একটি হলো— 'আমার নীরবতা যেন হয় চিন্তার মগ্নতা, আমার কথা যেন হয় আল্লাহর স্মরণ এবং আমার দৃষ্টি যেন হয় শিক্ষার উপকরণ।'
সবসময় মনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। যিনি আপনার চোখ ও দৃষ্টিশক্তি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি আপনাকে দেখবেন না? আল্লাহ বলেন—

أَيَحْسَبُ أَن لَّمْ يَرَهُ أَحَدٌ أَلَمْ نَجْعَل لَّهُ عَيْنَيْنِ *

মানুষ কি মনে করে, তাকে কেউ দেখছে না? আমি কি তাকে দুটি চোখ দান করিনি? [১]

অর্থাৎ যিনি আপনার চোখ সৃষ্টি করেছেন তিনি আপনার চোখের দৃষ্টি ও অন্তরের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে বেখবর নন!
সুমহান রব আরো বলেন-

وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ

(হে নবি!) আপনি নির্ভর করুন পরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর, যিনি আপনাকে দেখতে পান, যখন আপনি সালাতে দাঁড়িয়ে যান এবং সালাত আদায়কারীদের সাথে ওঠাবসা করেন।[২]

ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে, জানালার কাচ আর পর্দা টেনে দিয়ে, পৃথিবীর সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে আপনি লিপ্ত হচ্ছেন মহান রবের অবাধ্যতায়। হারাম সম্পর্কের আঁচল ধরে, অবৈধভাবে তারুণ্যের শক্তি একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছেন স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল-সাদার জগতে। পচা, দুর্গন্ধময় জগতের নিকৃষ্ট ভাগাড়ে ডুব দিচ্ছেন। আপনি কখনো ভেবেছেন, এই ভবনের ছাদ ভেদ করে, জানালা, দরজা আর দেওয়ালের প্রাচীর ভেদ করে আল্লাহর দৃষ্টি আপনার দিকে তাকিয়ে আছে! তিনি চাইলে এক মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারেন আপনার মূল্যবান চোখদুটি। অবশ করে দিতে পারেন আপনার শক্তিশালী দুটো হাত। বন্ধ দুয়ারের নিচ দিয়ে আসা অক্সিজেন বন্ধ করে দিয়ে টেনে দিতে পারেন আপনার অবাধ্যতার ইতি! কিন্তু তিনি আপনাকে সুযোগ দেন, যেন আপনি ফিরে আসেন। তিনি পথ চেয়ে থাকেন, আপনি কোনো একদিন ফিরবেন বলে!
ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পাপাচারী পাপের কাছাকাছি হওয়ার সময় যদি বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন, তাহলে সে আল্লাহর সামনে কী পরিমাণ দুঃসাহসী! কত বড় দুর্ভাগা! আর যদি মনে করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন না, তাহলে সে কত বড় কাফির, কত বড় গণ্ডমূর্খ! আল্লাহ তাকে দেখছেন জেনেও যদি পাপ করে ফেলে, তাহলে সেও কত বড় মূর্খ! কত বড় দুর্ভাগা!'
জ্ঞানীরা বলেছেন, মানুষ আল্লাহর চোখ থেকে যা লুকোতে পারে না তা যদি মানুষের কাছ থেকে লুকায়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহর সাথে তামাশা করে। আর মানুষ যখন বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা সর্বদ্রষ্টা, তিনি তার সবকিছুর ব্যাপারে খবর রাখেন, তখন তার হৃদয়-আত্মা আলোকিত হয়।
সালাফে সালিহিনের কেউ কেউ বলতেন, 'আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তোমার যদি পাপ করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে এমন কোথাও গিয়ে পাপ করো, যেখানে আল্লাহ তোমায় দেখতে পাবেন না!'
জীবনে যেখানেই যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, নিশ্চিত বিশ্বাস রাখুন, আপনি রয়েছেন আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিসীমার ভেতরেই। তিনি আপনার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। আপনি যখন সুখ অনুভব করছেন, জীবনের আনন্দঘন মুহূর্ত উপভোগ করছেন, তিনি দেখছেন আপনার হাসি; আপনার উচ্ছ্বাস। তখন তাঁর সামনে মাথা নত করে আদায় করুন শুকরিয়াজ্ঞাপক সিজদা।
আবার যখন আপনি ভেসে যাচ্ছেন পাপের অন্ধকার জগতে, ভুলে যাচ্ছেন গন্তব্যের কথা, ডুবে যাচ্ছেন অন্যায়-অপরাধের নর্দমায়, ভেসে যাচ্ছেন আল্লাহর অবাধ্যতার গড্ডলিকা প্রবাহে, তখনো তিনি আপনাকে দেখছেন। আপনি তাঁকে দেখতে পাবেন না; কিন্তু তিনি আপনার দিকে ঠিকই তাকিয়ে আছেন। এরপর তো ফিরে যেতে হবে তাঁরই দিকে। তাই করজোড়ে মিনতি করুন—
হে আল্লাহ, আপনি আল-বাসির, সম্যক ও মহাদ্রষ্টা। আপনি আমার প্রকাশ্য-গোপন সকল দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। আপনার হাতেই আমার জীবনের লাগাম। আমি ভিক্ষা চাইছি আপনার সম্মুখে। আমার হৃদয় ভরিয়ে দিন আলোতে; চোখে দান করুন জ্যোতি, যেন এর দ্বারা আমি আপনার অসীম নিয়ামতের মহিমা দেখতে পাই। প্রকাশ্যে-গোপনে, লোকালয়ে-নির্জনে সর্বাবস্থায় আপনার সামনে আদব ও সৌজন্য রক্ষা করতে চলতে পারি। আমি যেন চলি আপনার নির্ধারিত সীমারেখার গণ্ডিতে, আপনার আদেশের চৌহদ্দির ভেতরে। আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন আপনার প্রিয় বান্দাদের কাফেলায়। আমিন।

টিকাঃ
[১] সুরা আনফাল, আয়াত: ২৯
[২] সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৮
[১] তাফসির ইবনু কাসির, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪৮
[১] সহিহ বুখারি : ২০৩৫
[১] সূরা ইসরা, আয়াত: ১৭
[১] সুরা বালাদ, আয়াত: ৭-৮
[২] সুরা শুআরা, আয়াত: ২১৭-২১৯

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আস-সালাম : السَّلَامُ

📄 আস-সালাম : السَّلَامُ


কুরআনুল কারিমের কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ তাআলার গুণবাচক নাম 'আস-সালাম' (السَّلَامُ) উল্লেখিত হয়েছে। আয়াতগুলো হলো-
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ
তিনি আল্লাহ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনিই অধিপতি, চিরপবিত্র, শান্তিদাতা, নিরাপত্তাদাতা, পরাক্রমশালী, প্রতাপশালী, নিরঙ্কুশ বড়ত্বের অধিকারী। তারা (তাঁর সাথে) যা কিছু শরিক করে, তা থেকে তিনি চিরপবিত্র।[১]
অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে-
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
আল্লাহ ডাকেন শান্তির নিবাসের দিকে এবং যাকে চান, তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।[২]
আল্লাহ তাআলার আহ্বানের সারসংক্ষেপ হলো শান্তির নিবাস। এ মর্মে অন্য আয়াতে এসেছে-
وَأَمَّا إِن كَانَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ فَسَلَامٌ لَّكَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ )
যদি সে হয় ডানদিকের (তাওহিদপন্থি) একজন, তাহলে (তাকে বলা হবে) তোমার জন্য ডানপন্থিদের পক্ষ থেকে সালাম।[১]
وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا )
তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক-যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে, যেদিন সে মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন সে পুনরুজ্জীবিত হবে।[২]
কুরআনুল কারিমের এই আয়াতগুলোসহ আরও বেশকিছু আয়াতে 'আস-সালাম' শব্দটি উল্লিখিত হয়েছে। এবার এর অর্থ জানা যাক।
আলিমগণ বলেন, 'আস-সালাম' (السلام) শব্দটির অর্থ-তিনি সালামাতের অধিকারী। 'সালাম' (سلام)-এর শাব্দিকউৎস 'সালামাত' (سلامة)। 'সালামাত' অর্থ আল্লাহ তাআলার সত্তা সমস্ত ত্রুটি থেকে মুক্ত; তাঁর গুণাবলি সব অপূর্ণতা থেকে মুক্ত; তাঁর কাজ অন্যায়-অকল্যাণ থেকে মুক্ত।
'তাঁর কাজ অন্যায়-অকল্যাণ থেকে মুক্ত'-এই কথাটির অর্থ জানার সময় আমাদের একটু সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করতে হবে। এই অর্থ শুনে আমাদের মনে প্রশ্নের উদয় হতে পারে-পৃথিবীতে কী তবে অন্যায় নেই? তাহলে আলিমগণ আল্লাহ তাআলার এই মহান নামের ব্যাখ্যায় কী করে বলেন, 'তাঁর কাজ অন্যায়-অকল্যাণ থেকে মুক্ত?'
এই প্রশ্নের উত্তরে আমি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। পাঠক যদি বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে পারেন, তাহলে আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করতে সক্ষম হবেন। আর আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণের ফলাফল একমাত্র জান্নাত।
আল্লাহর কর্মসমূহ কি 'নিরেট অন্যায়' থেকে মুক্ত? 'নিরেট অন্যায়' কী; যে অন্যায় আমরা করে থাকি সেটা?
বিষয়টি নিচের উদাহরণের আলোকে বুঝতে সহজ হবে। যদি কোনো মানুষের অ্যাপেন্ডিক্সে তীব্র ব্যথা হয়, তবে সার্জন কি অপারেশনের জন্য ছুরি হাতে নেবে না? হ্যাঁ, সার্জন ছুরি নিয়ে তার পেট কেটে রক্ত বের করবে। রোগীকে অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে অবশ করা হবে। অ্যানেস্থেসিয়ার প্রভাব শেষ হলে মানুষটি ব্যথা অনুভব করবে। কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই তার শরীর কাটতে হয়েছে। হিতাকাঙ্ক্ষী ডাক্তার কি ব্যথাযুক্ত অ্যাপেন্ডিক্স সমূলে বের করার জন্য ছুরি দিয়ে পেট কাটেনি? মূলত এমন পরিস্থিতিতে অ্যাপেন্ডিক্স পুরোপুরি কেটে ফেলার মধ্যে লোকটির সুস্থতা ও আরাম নিহিত থাকে।
এর বিপরীতে কোনো মানুষ যদি আরেকজনকে কোনো কারণ কিংবা অপরাধ ছাড়াই ছুরি দিয়ে আঘাত করে বসে, তাহলে আমরা বলব, এটি 'নিরেট অন্যায়' হয়েছে। শুধু কষ্ট দেওয়ার জন্যই সে এমন আঘাত করেছে। পক্ষান্তরে যখন ব্যথাযুক্ত অ্যাপেন্ডিক্স পুরোপুরি কেটে ফেলার জন্য পেট কাটা হয়, তখন এটি 'নিরেট অন্যায়' থাকে না। এই ক্ষতি করা হয় কল্যাণের উদ্দেশ্যে; ব্যথা দেওয়া হয় আরাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে; গায়ের চামড়া কাটা হয় মনের প্রশান্তির লক্ষ্যে। তাই আমরা বলি, আল্লাহ তাআলার 'আস-সালাম' নামের অর্থ হলো, তিনি সমস্ত অন্যায় থেকে মুক্ত।
আল্লাহ তাআলার সত্তা সমস্ত ত্রুটি থেকে মুক্ত, তাঁর গুণাবলি সব অপূর্ণতা থেকে মুক্ত, তাঁর কর্ম সকল অন্যায় থেকে মুক্ত। যখন নিরেট অকল্যাণের উদ্দেশ্যে অকল্যাণ সাধন করা হয়, তখন সেটি 'নিরেট অকল্যাণ'। নাহলে তা অকল্যাণ নয়।
প্রিয় পাঠক, আপনাকে এই আকিদা-বিশ্বাস পোষণ করতে হবে-বিশ্বজগতে সম্পূর্ণ অকল্যাণ বলতে কিছু নেই। কারণ আমাদের সামনে ঘটমান অকল্যাণের পেছনে অবধারিতভাবে ভালো ফলাফল প্রাপ্তির কারণ বিদ্যমান।
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অনন্ত সৌভাগ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে। মানুষ যখন তার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তার চলার পথ সংশোধন করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। তার পরিশোধন, নিবারণ ও আত্ম-উন্নয়ন আবশ্যক হয়ে পড়ে। এমন কাজ করতে হয়, যা তাকে ফিরিয়ে দেবে মহৎ উদ্দেশ্যে। তাই যারা বিশ্বাস করে, এমন অনেক অনিষ্ট আছে—যা কেবল ক্ষতি করার উদ্দেশ্যেই সংঘটিত হয়ে থাকে, তারা কোনোদিনই আল্লাহ তাআলাকে চিনতে পারবে না। কারণ কুরআনুল কারিমে আছে—
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاءُ وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আপনি বলুন, সার্বভৌম রাজত্বের অধিকারী, হে আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। আপনারই হাতে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান।[১]
একটি উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। ধরুন, একজন বাবা যদি দেখেন তার সন্তান বিপথগামী হয়ে গেছে কিংবা গুরুতর কোনো অপরাধ করেছে; যদি দেখেন অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে কিংবা বড় ধরনের কোনো পাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে অথবা আপন ভাইয়ের প্রতি জুলুম করেছে, তাহলে পুরো পৃথিবীতে এমন বাবা কি পাওয়া যাবে—যিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন? তিনি কি তার সন্তানকে সংশোধন করবেন না? স্বাভাবিকভাবে সেসময় বাবা তার সন্তানকে তিরস্কার করবেন, প্রহার করবেন, সতর্ক করবেন।
এর বিপরীতে এমন বাবাও কি পৃথিবীতে আছেন—যিনি তার সম্পূর্ণ নিরপরাধ প্রিয় সন্তানকে অযথা কষ্ট দেবেন? এমন বাবা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কোনো দয়ামায়া কিংবা বোধবুদ্ধি নেই—এমন অতিসাধারণ বাবাও এরকম দোষে দুষ্ট হন না সাধারণত। তাহলে যে মহান আল্লাহ পৃথিবীর সকল বাবাকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ব্যাপারে আমরা কেমন ধারণা পোষণ করতে পারি?
এজন্যই 'নিরেট অকল্যাণ' বলতে পৃথিবীতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। সমস্ত বিপদাপদ মানুষের কর্মফল ছাড়া কিছু নয়। বিচ্যুতি যত তীব্র হয়, এর সংশোধনও তত দীর্ঘায়িত হতে থাকে।
এই ছিল আল্লাহ তাআলার মহান নাম 'আস-সালাম'-এর প্রথম পরিচয়। যার থেকে আমরা জানতে পারলাম-তাঁর সত্তা সমস্ত দোষ থেকে মুক্ত; তাঁর গুণাবলি মুক্ত সব অপূর্ণতা থেকে এবং তাঁর কর্মসমূহ পবিত্র সকল নিরেট অন্যায় থেকে। আমাদের দুচোখে দেখা প্রতিটি অকল্যাণই দূরবর্তী কোনো কল্যাণের উদ্দেশ্যে সাধিত হয়।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কোনো মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা করতে গিয়ে সমস্ত সম্পদ হারিয়ে ফেলতে পারে। সেই ব্যক্তির দৃষ্টিতে এই দুরারোগ্য ব্যাধি ও সম্পদের ব্যয় ভয়াবহ ক্ষতি। কিন্তু এই ব্যাধিই হয়তো তার জন্য আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসার মাধ্যম হয়। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে পরকালীন কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে। তাহলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যখন এই মহান উদ্দেশ্যের জন্য সম্পদ ব্যয় করতে বাধ্য হয়, তখন এটি হয় দূরবর্তী কল্যাণের কারণ।
আল্লাহ তাআলার মহান নাম 'আস-সালাম'-এর দ্বিতীয় অর্থটি হলো, তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য নিরাপত্তার অধিকারী। বিশ্বজগতে সমস্ত নিরাপত্তা তাঁর সাথে সম্পৃক্ত। এই পর্যায়ে আমি আপনাদের সামনে একটি বিষয়ে তুলে ধরব।
আল্লাহ শপথ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই! আমরা সকলেই আল্লাহর সুন্দর নামগুলো সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে চাই। তাত্ত্বিক আলোচনা বাদ দিন, বাদ দিন তাঁর ব্যাপারে আলিমদের বক্তব্য এবং আল্লাহর নাম 'আস-সালাম' হওয়ার সমস্ত কার্যকারণ। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি কি এই বিশ্বজগতে এমন নিদর্শন দেখতে পান না-যা আপনাকে নিশ্চিত করে, আল্লাহ তাআলাই আস-সালাম?
আমি আমাদের জীবন থেকে, আমাদের শারীরিক গঠন থেকে এমন কিছু উদাহরণ নির্বাচন করেছি, যা থেকে আপনারা জানতে পারবেন-এই বিশ্বচরাচর আল্লাহর সুন্দর নামগুলোরই বহিঃপ্রকাশ, তাঁর শ্রেষ্ঠ গুণাবলির নিদর্শন।
মানুষের হাড় ভেঙে গেলে কীভাবে জোড়া লাগে? সবাই জানে, হাড়ের কোষসমূহে পচন ধরে। হাড় যখন বৃদ্ধি পায়, তখন তা আল্লাহর নির্দেশে নির্দিষ্ট একটি সীমা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই 'আল-কাবিদ' (সংকোচনকারী) ও 'আল-বাসিত' (প্রসারণকারী)। আমাদের প্রতি আল্লাহর একটি রহমত হচ্ছে, মানুষের শরীর বৃদ্ধি পেয়ে যখন একটি পরিমিত সীমা পর্যন্ত পৌঁছে, তখন বৃদ্ধি থেমে যায়। আবার এমন গুরুতর রোগও রয়েছে, যার কারণে মানুষের শারীরিক বৃদ্ধি হতেই থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে জাইগ্যান্টিজম। তো একটি নির্দিষ্ট সীমায় হাড়ের বৃদ্ধি থেমে যাওয়া আল্লাহর বড় রহমত।
চিকিৎসা-বিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো হাড় ভেঙে গেলে হাড়ের বিশেষ কিছু কোষ জেগে ওঠে। আমাদের অজান্তেই ভাঙা অংশ নিজে নিজে সেরে ওঠে এবং অন্যান্য কোষের সাথে মিলিত হতে থাকে। ভাঙা হাড় সেরে না উঠলে আমরা কী করতাম? হাড়ের এই সেরে ওঠা আল্লাহর 'আস-সালাম' নামকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন সবচেয়ে সুন্দর গঠনে। আমাদের দেহে আরোগ্য লাভের সুব্যবস্থা করে রেখেছেন।
আপনি যখন কোমল পায়ে হেঁটে চলেন, তখন কেন আপনি ধপাস করে পড়ে যান না, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? আমাদের দেহে নিজস্ব ভারসাম্য ব্যবস্থা রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা আমাদের (মস্তিষ্ক ও) অন্তঃকর্ণে স্থাপন করেছেন। অন্তঃকর্ণে অর্ধবৃত্তাকার ৩টি নালি রয়েছে, যার ভেতরের ফোলা অংশকে অ্যাম্পুলা বলে। অ্যাম্পুলার ভেতরে সংবেদী রোম থাকে। এই সংবেদী রোমগুলোই আমাদের দৈহিক অবস্থানের বার্তা দিতে সাহায্য করে। সংবেদী রোমের চারদিকে ঘিরে থাকে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ ওটোলিথ দানা। সংবেদী রোমের চারদিকে ওটোলিথ دানা যুক্ত এই আবরণকে ক্যুপুলা বলে। যদি আমরা হাঁটার সময় পা পিছলে কোনো একদিকে হেলে যাই, ক্যুপুলাও সেদিকে হেলে যায়। ফলে সংবেদী রোমও বেঁকে যায়। তখন এটি সিগন্যাল আকারে ভেস্টিবুলার স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। তখন যেদিকে হেলে পড়েছি। মস্তিষ্ক তার অপর পাশের পেশিকে সংকুচিত হওয়ার নির্দেশ দেয়। ফলে আমরা পড়ে যাই না। এভাবেই কান আমাদের দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে। আমাদের নিরাপত্তার জন্যই আল্লাহ কানে এই ব্যবস্থা দিয়েছেন। এজন্যই তাঁর নাম 'আস-সালাম' (নিরাপত্তা-দানকারী)।[১]
দাঁতে অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু স্নায়ু রয়েছে, যেন আমরা তাড়াতাড়ি ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে দাঁত পুরোপুরি হারানোর আগেই চিকিৎসা নিতে পারি। এর মাঝেও আল্লাহর 'আস-সালাম' (নিরাপত্তা-দানকারী) নামটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আল্লাহ আমাদের শরীরে এক বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছেন। সেই সেনাবাহিনীর নাম ইমিউনিটি সিস্টেম (রোগপ্রতিরোধ-ক্ষমতা)। রক্তে বিদ্যমান কিছু শ্বেতকণিকা শত্রুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে, কিছু শ্বেতকণিকা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শত্রুবিনাশী উপাদান তৈরি করে। আবার কিছু শ্বেতকণিকা সেই উপাদান গ্রহণ করে সক্রিয় হয় এবং শত্রু-জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই মহাকর্মযজ্ঞ চলে আমাদের অজান্তেই। আমাদের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ তাআলা এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রেখেছেন। জীবাণুর অবস্থান অবগত হওয়া, তা বিনাশে উপাদান তৈরি করা এবং আরও নানা উপায়ে অনুপ্রবেশকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারি রাখার ক্ষমতাও আল্লাহ আমাদের মাঝে দিয়েছেন। সারাবিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখা এইডস রোগ মূলত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে হয়ে থাকে। তো, আল্লাহ তাআলা কেন মানুষের মাঝে ইমিউনিটি সিস্টেম সৃষ্টি করেছেন? মানুষের নিরাপত্তার জন্য, এর মাঝে ভাস্বর হয়ে ওঠে আল্লাহর মহান নাম 'আস-সালাম'।
আল্লাহ তাআলা হৃৎপিন্ডে বিশেষায়িত বিদ্যুৎক্ষেত্র স্থাপন করেছেন।[১] মানুষের দেহের মাংসপেশিগুলো সংবেদন-স্নায়ু ও মোটর স্নায়ুর সাথে সংযুক্ত। পুরো দেহেই সংবেদন স্নায়ু ছড়িয়ে আছে, যা চারপাশের অনুভূতি মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়। মস্তিষ্ক থেকে মোটর-স্নায়ুর মাধ্যমে শরীরের সমস্ত মাংশপেশীতে নির্দেশনা পৌঁছে যায়। এ থেকে বোঝা যায়, শরীরের প্রতিটি মাংশপেশী স্নায়ুর সংকেত পেয়ে নড়াচড়া করে। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে পক্ষাঘাত আসে কোত্থেকে? মস্তিষ্কের যে অঞ্চল থেকে নড়াচড়ার সংকেত পাওয়া যায়, সেই অঞ্চলের ধমনি সংকীর্ণ হয়ে গেলে (স্ট্রোক) মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। তবে হৃৎপিন্ডের মাংশপেশী মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণের অধীন নয়। আল্লাহ তাআলা হৃৎপেশীতে স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করেছেন। কারণ, হৃৎপিন্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এরচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যদি একটি বিদ্যুৎ-উৎপাদনকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তৎক্ষণাৎ আরেকটি কেন্দ্র কাজ করা শুরু করে। বিষয়টি অনেকটা উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার মতো। যদি মূল উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে কোনো ত্রুটি কিংবা বিঘ্নতা ঘটে, তাহলে অতিরিক্ত কেন্দ্রগুলো কাজ করে। হৃৎপিন্ডে বিশেষায়িত বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে মোট তিনটি। প্রথমটি (এসএ নোড) অকেজো হয়ে পড়লে দ্বিতীয়টি (এভি নোড) কাজ করা শুরু করে। দ্বিতীয়টিও নষ্ট হলে, অন্যগুলো (বান্ডল অব হিজ, পারকিনজি ফাইবার) কাজ করতে থাকে। আল্লাহ কেন এই অতিরিক্ত ব্যবস্থা রেখেছেন? আমাদের নিরাপত্তার জন্য।
কিডনি স্পেশালিস্ট একজন ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন, মানবদেহের দুটি কিডনীর মধ্যে একটি কিডনী যদি কেটে ফেলা হয় তাহলে বাকি সুস্থ কিডনিই সারা শরীরের রক্ত পরিশোধন করতে পারবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের নিরাপত্তার জন্যই প্রয়োজনের চেয়ে বিশগুণ ক্ষমতাসম্পন্ন কিডনি দান করেছেন। তাই যখন 'আস-সালাম' নাম পাঠ করি, তখন স্মরণ করতে হবে, তিনি আমাদের নিরাপদ রাখার জন্য সব রকমের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
শরীরের রক্তনালি ধমনি[১] ও শিরা[২]-এই দুইভাগে বিভক্ত যার সংযোগ ঘটে কৈশিক জালিকার মাধ্যমে[৩]। আল্লাহ ধমনিকে স্থাপন করেছেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অভ্যন্তরে, আর শিরাকে স্থাপন করেছেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বহিরাংশে। ধমনি সরাসরি হৃৎপিন্ডের সাথে সংযুক্ত। হৃৎপিন্ডে কোনো ক্ষত হলে মানুষের তার দেহের সম্পূর্ণ রক্ত হারিয়ে ফেলবে। কারণ, হৃৎদপিন্ড অনেকটা পাম্পের মতো। মানুষ যদি তার দেহের কোনো ধমনি কেটে ফেলে তাহলে কী ঘটবে জানেন? আমাকে একজন ভাসকুলার সার্জন বলেছেন, সার্জারি চলাকালে যদি ধমনি কোনোভাবে উন্মুক্ত হয়ে যায়, তাহলে চাপের তীব্রতায় রক্ত অনেক সময় রুমের ছাদ পর্যন্ত ছিটকে যায়। তাই এই ধমনির সুরক্ষার জন্য আল্লাহ তাআলা ধমনিকে রেখেছেন অভ্যন্তরে, আর শিরাকে স্থাপন করেছেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাইরে। এজন্যই অধিকাংশ ক্ষেত্রে যখন দেহে সুঁচ ফোটানো হয়, তখন ডাক্তারগণ ধমনিতে নয়; বরং শিরায় ফোটাতে বলেন। কে সেই সত্তা, যিনি ধমনিকে ভেতর দিকে স্থাপন করেছেন আর শিরাকে স্থাপন করেছেন বাইরের দিকে? আল্লাহর মহান নাম ‘আস-সালাম’ আপনার নিরাপত্তা বিধানের জন্য নিশ্চয়তা দিচ্ছে, তিনিই প্রতিটি রক্তনালি রেখেছেন যথাস্থানে।
মানুষ অনেক সময় ক্ষুধার তীব্রতায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে যায়। ধরুন, আপনার কাছে কিছু শস্যদানা ও তেল আছে। আপনার যত জ্ঞানই থাকুক না কেন, আপনি কি এই শস্য কিংবা তেলকে মাংসে রূপান্তরিত করতে পারবেন? মানুষের পক্ষে এ অসম্ভব। কিন্তু মানবদেহে এক অতি আশ্চর্যজনক ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় শস্যদ্রব্য তেলচর্বিতে রূপান্তরিত হয়। দ্রব্য রূপান্তরের এই স্থিতিস্থাপকতা আপনার নিরাপত্তার জন্যই। মানুষ যখন ক্ষুধার্ত হয়, তখন তার শরীরের চিনি ও চর্বি ক্ষয় হতে থাকে। চর্বি ক্ষয় হওয়ার পরও যখন ক্ষুধার্ত হয়, তখন মাংসপেশি ক্ষয় হতে থাকে। অনেক সময় মাংসপেশি ক্ষয় হতে হতে হাড়সর্বস্ব হয়ে যায়, হাড়ের ওপর থাকে শুধু চামড়া। এক যুবক একবার আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ানের রাজদরবারে প্রবেশ করেছিল। আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ান অল্পবয়স্ক যুবকটিকে দেখে রেগে গিয়ে বললেন, বালকদের মতো এই অল্পবয়স্ক লোকটি আমাদের দরবারে কেন এসেছে? যুবকটি বলল, আমির! আপনার দরবারে প্রবেশ করলে আপনার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে না, তবে আমি সম্মানিত হব। আমরা (অভাবের) এমন একটি বছর অতিক্রম করেছি বছর আমাদের (শরীরের) চর্বি খেয়ে ফেলেছে (চর্বি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে)। তারপরের বছর আমাদের মাংস (পেশি) ভক্ষণ করেছে, এরপরের বছর আমাদের হাড় ছুঁয়ে গিয়েছে।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, (খাবার না খেলে প্রথমে কার্বোহাইটেডের ভাণ্ডার ফুরিয়ে যায়। এরপর) মানুষের দেহে সঞ্চিত তেলও চর্বি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তারপর ক্ষয়প্রাপ্ত হয় মাংসপেশি; শুধু হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশি বাকি থাকে। কে দিয়েছেন এই বিন্যাস? এসবই মানুষের নিরাপত্তার জন্য। এটিই ‘আস-সালাম’-এর অর্থ।
এখানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় রয়েছে। ঘুমের সময় শরীরের উপরিভাগের ভর হাড়ের নিচে থাকা মাংশপেশির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের কারণে রক্ত সঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষের দেহে চাপ অনুভব করার জন্য বিভিন্ন কেন্দ্র সৃষ্টি করেছেন। এই কেন্দ্রগুলো যখন দেহের চাপ, ধমনি ও শিরার সংকীর্ণতা ও রক্ত সঞ্চালনে দুর্বলতা অনুভব করে, তখন ঘুমন্ত অবস্থাতেই মস্তিষ্ক শরীরকে পাশ ফেরার নির্দেশ দেয়। সুরা কাহফের ঘুমন্ত গুহাবাসী যুবকদের বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ وَكَلْبُهُم بَاسِطٌ ذِرَاعَيْهِ بِالْوَصِيدِ لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَيْهِمْ لَوَلَّيْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَلَمُلِئَتَ مِنْهُمْ رُعْبًا
আপনি তাদেরকে (দেখলে) মনে করতেন, তারা জেগে আছে। অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত। আমি তাদেরকে ডানে ও বাঁয়ে এপাশ-ওপাশ করাতাম। তাদের কুকুরটি (গুহার) প্রবেশপথে সামনের পাদুটি বিছিয়ে (প্রহরারত) থাকত। আপনি যদি তাদের দিকে তাকাতেন, তাহলে অবশ্যই (ভয় পেয়ে) পেছনে ফিরে পালিয়ে যেতেন এবং তাদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন [১]।
আয়াতে উল্লিখিত পন্থায় একবার ডানে, আরেকবার বামে পাশ ফেরানো হয়, আপনার নিরাপত্তার জন্য।
ঘুমের সময় যখন আপনার মুখের লালা বেড়ে যায়, তখন মস্তিষ্কে সংবাদ পৌঁছে যায়। মস্তিষ্ক তখন লালা গিলে ফেলার নির্দেশ দেয় ঘুমের মাঝেই অতিরিক্ত লালা চলে যায় পাকস্থলিতে। আল্লাহর 'আস-সালাম' নামের এই তো নিদর্শন।
আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা বিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দিয়ে নয়; বরং দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনার মধ্যদিয়ে আল্লাহর সুমহান নামসমূহকে বোঝানোর চেষ্টা করব। হয়তো এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করবেন।
আপনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ অঙ্গ মস্তিষ্ককে আল্লাহ কোথায় স্থাপন করেছেন? মাথার খুলিতে। মস্তিষ্কের মাঝে কী দিয়েছেন? স্তরে স্তরে বিন্যস্ত পর্দা (মেনিনজেস)। মস্তিষ্ক ও খুলির মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে কী দিয়ে পূর্ণ করেছেন? বিশেষ তরল পদার্থ দিয়ে। এই তরল পদার্থের কাজ কী? মানুষ যদি মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয় কিংবা পড়ে গিয়ে মাথায় ব্যথা পায়, তখন এই তরল পদার্থ আঘাত শুষে নেয়। তরল পদার্থে আঘাতের কম্পন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আঘাত কিংবা চাপ তরলের পুরো উপরিভাগে ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মস্তিষ্ককে রেখেছেন সুরক্ষিত বাক্সে। সেই বাক্স ও মস্তিষ্কের মাঝে তরলপূর্ণ ফাঁকা জায়গা রেখেছেন। ফাঁকা জায়গাগুলো আঘাত শুষে নেয়। এই ফাঁকা জায়গা না থাকলে সামান্য আঘাতেই মানুষের মাথা ফেটে যেত। অর্থাৎ এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আপনার নিরাপত্তার জন্য।
তিনি স্পাইনাল কর্ড কোথায় রেখেছেন? মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এই জিনিসটি তিনি রেখেছেন মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর বেষ্টনীর মাঝে।
হৃৎপিণ্ডকে কোথায় স্থাপন করেছেন? হাড়ের খাঁচার মাঝে। জরায়ু বা গর্ভাশয়কে কোথায় রেখেছেন? গর্ভাশয় রেখেছেন শ্রোণিদেশের অস্থিচক্রের মাঝে। আল্লাহ বলেন-
‏ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ
তারপর আমি তাকে বীর্যরূপে প্রতিস্থাপন করেছি এক নিরাপদ আধারে [১]
গর্ভাশয়ের অবস্থান নারীদেহের ঠিক মধ্যস্থলে। মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রক্তের লোহিত কণিকা। এই লোহিত কণিকা উৎপাদন-কারখানা স্থাপন করা হয়েছে লাল অস্থিমজ্জায়[২]। এ কি মানুষের নিরাপত্তার জন্য নয়?
চোখকে স্থাপন করা হয়েছে অক্ষিকোটরে। চোখের জন্য এমন এক কোটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা তাকে আঘাত থেকে রক্ষা করে। সাধারণত মানুষের চেহারায় যদি আঘাত লাগে, তাহলে সেই আঘাত চোখ পর্যন্ত পৌঁছে না। কারণ চোখ অবস্থান করে কোটরের ভেতর। অক্ষিকোটরে চোখ, খুলিতে মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ডের হাড়ে স্পাইনাল কর্ড, বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ড, অস্থিমজ্জায় লোহিতকণিকা উৎপাদনকেন্দ্র, অস্থিবেষ্টিত গর্ভাশয়... কী অপূর্ব সুনিপুণ স্থাপন!
এটি আল্লাহর তাআলার প্রজ্ঞারই বর্হিপ্রকাশ। গর্ভাশয় যখন গর্ভবতী নারীর নিরাপত্তার জন্য সংকুচিত হয়, তখন কী ঘটে? প্রসবের সময় গর্ভাশয় ক্রমবর্ধমান হারে সংকুচিত হতে থাকে। শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়, তখন গর্ভাশয় সংকুচিত হয় তীব্রভাবে। কেন এমনটি হয়? কারণ, শিশু যখন গর্ভাশয় থেকে বের হয়, তখন হাজার হাজার সূক্ষ্ম ধমনি ছিঁড়ে যায়। প্রসবের পর যদি গর্ভাশয় কোমলভাবে সংকোচন হতো, তাহলে মা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যেত। (প্রসবের পর) ডাক্তার কিংবা ধাত্রী গর্ভাশয় স্পর্শ করে দেখেন, যদি গর্ভাশয় যথাযথ শক্ত থাকে, তাহলে একে নিরাপদ প্রসব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার অতিরিক্ত সংকোচন হলেও বাচ্চা সমস্যায় ভুগতে পারে। সংকোচন পর্যাপ্ত না হলে নানাবিধ সমস্যা (যেমন দীর্ঘায়িত প্রসব কষ্ট) হতে পারে।
প্রিয় পাঠক! আল্লাহর শপথ! যদি আমরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস; এমনকি বছরের পর বছরও মানুষ ও প্রাণীর সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহর মহান নাম 'আস-সালাম'-এর মাহাত্ম্য নিয়ে আলোচনা করতে থাকি, তবুও সে আলোচনা শেষ হবে না।
কয়েকদিন আগে আমাকে একজন ডাক্তার বলেছেন, অণ্ডকোষে আল্লাহ যে শুক্রাণু রেখেছেন, তার পরিপক্ক হতে ৭৪ দিনের মতো সময় লাগে। শুক্রাণু যখন অণ্ডকোষে সংরক্ষিত থাকে, তখন তার কর্মক্ষমতা বন্ধ থাকে। শুক্রাণু যখন গর্ভাশয়ে স্থিত হওয়ার জন্য শুক্রাশয় থেকে সবেগে বের হয়, তখন তার কার্যক্রম শুরু হয়। শুক্রের এই বৈশিষ্ট্য না হলে পুরুষরা সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে পড়ত। কারণ, শুক্রাণুর আয়ুষ্কাল মাত্র পাঁচদিন। অণ্ডকোষে শুক্রাণু তৈরি হওয়ার পর সেগুলোর নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। তারপর যখন গর্ভাশয়ে স্থিত হওয়ার জন্য শুক্রাশয় থেকে সবেগে বের হয়, তখন শুক্রাণু কর্মক্ষম হয়ে ওঠে এবং নারীর জননপথে পাঁচদিন পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। কে এই ব্যবস্থা করেছেন? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
প্রিয় পাঠক! আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের যে পাঠ আমরা শুরু করেছি, এক্ষেত্রে আমরা তাত্ত্বিক সংজ্ঞা এবং ব্যাবহারিক প্রমাণ—দুটোই তুলে ধরব। মানুষ, প্রাণী, লতাপাতা ও আপনার চিরচেনা গাছের সৃষ্টি নিয়ে স্বাধীন চিন্তায় অবগাহন করব। যে গাছটির বয়স পঞ্চাশ বছর, জন্মের পর থেকে প্রতি বছর আপনি যে গাছের ফল খাচ্ছেন, সেই গাছটিরও একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা রয়েছে, নকশা রয়েছে। গাছটির রূপরেখা অনেকটা এমন—আপনি যখন গাছটির যত্ন নেন না, আকাশেও কোনো বৃষ্টির দেখা মেলে না, তখন গাছটির পাতার রস ফুরিয়ে যেতে থাকে। একসময় যখন পাতার রস নিঃশেষ হয়ে যায়, পাতাগুলো শুকিয়ে যায়। কেউ যদি কোনো গাছে পানি না দেয়, তাহলে সর্বপ্রথম গাছের পাতায় থাকা রস ও পানি শেষ হতে থাকে। পাতার পানি নিঃশেষ হলে পাতা শুকিয়ে যায়। তখনো যদি পানি না দেওয়া হয়, তাহলে শেষ হয় ডালের পানি। তারপরও পানি না পেলে শেষ হয় কাণ্ডের পানি। সবশেষে ফুরোয় শিকড়ের পানি।
গাছের ক্ষেত্রে যদি এই চিত্রটি বিপরীত হতো, তাহলে পানি না দেওয়া হলে দুসপ্তাহেই গাছ মরে যেত। কারণ, তখন সর্বপ্রথম শেষ হতো শিকড়ের পানি। শিকড় শুকিয়ে যেত; ফলে গাছও মরে যেত। কে প্রথমে পাতার পানি শুষে নেয়ার নির্দেশ দিলো গাছকে? কে এই রূপরেখা গড়ে দিয়েছেন? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। শস্যবীজ আল্লাহর নিরাপত্তার চমৎকার এক নিদর্শন। শস্যবীজ বছরের পর বছর প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে টিকে থাকে। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ পিরামিড থেকে গম নিয়ে বপন করেছিল। সেই গম থেকেও অঙ্কুর হয়েছে। গমের বীজ এমনভাবে গঠিত যে, তার মাঝে অঙ্কুর বহুকাল জীবিত থাকে। এমনকি প্রায় ৬ হাজার বছর পরও জীবন্ত অঙ্কুর পাওয়া গেছে। যার ফলে পিরামিডে পাওয়া গমও অঙ্কুরিত হয়েছে।
সৃষ্টিজগতে উদ্ভিদ-প্রাণী সবার জীবনে যে জিনিসের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি দেখতে পাই তা হলো পানি। জমাট বেঁধে যদি পানির ঘনত্ব বেড়ে যেত, তাহলে সবকিছু সমুদ্রগর্ভে ডুবে যেত, শেষ হয়ে যেত ভূপৃষ্ঠে প্রাণের অস্তিত্ব। কিন্তু পানি একমাত্র উপাদান, যা ঠান্ডা করলে ঘনত্ব আরও কমে যায়। যদি পরিস্থিতি এর বিপরীত হতো, তাহলে সমস্ত সমুদ্র জমাট বেঁধে যেত, বাষ্পশূন্য হয়ে যেত পৃথিবী। ফলে তৃণলতা, গাছপালা, ফসল সবকিছু মরে যেত। ধীরে ধীরে নিঃশেষ যেত প্রাণী ও মানুষ। এই ব্যবস্থা আমাদের নিরাপত্তার জন্য আস-সালাম (নিরাপত্তাদাতা) নামেরই নিদর্শন এটি। পানির স্পর্শ পেয়ে মাটিতে বোনা বীজগুলো সজীব হয়ে উঠতে থাকে। এক সময় মাটি ভেদ করে সবুজের আহ্বান নিয়ে আকাশ পানে উঠে দাঁড়ায়। আল্লাহর এই বাণীটি পাঠ করুন-
وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الرَّجْعِ ۞ وَالْأَرْضِ ذَاتِ الصَّدْعِ ۞
শপথ বৃষ্টিবাহী (মেঘাচ্ছন্ন) আকাশের। এবং শপথ ফেটে যাওয়া জমিনের [১]
রুটির খামিরে দেওয়া পানি থেকে শুরু করে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, আসবাবপত্র, মৌচাক, মৌচাকের গঠন সবকিছু থেকে জানা যায়, আল্লাহর আস-সালাম (নিরাপত্তাদাতা) নামটি তাঁর সৃষ্টির মাঝে, এমনকি খাদ্য-পানীয়ের মাঝেও ভাস্বর হয়ে আছে। আমাদের রব আযযা ওয়া জাল্লা বলেছেন-
الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفَاوُتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِنْ فُطُورٍ
যিনি সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে। পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে আপনি কোনো খুঁত দেখতে পাবেন না। আবার দৃষ্টি ফেরান। কোনো ত্রুটি দেখতে পান কি?[১]
অর্থাৎ তাঁর সমস্ত সৃষ্টি নিখুঁত। তিনি আরও বলেছেন-
قَالَ فَمَن رَّبُّكُمَا يَا مُوسَى قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى
সে (ফিরআউন) বলল, হে মুসা, তাহলে তোমাদের রব কে? মুসা বলল, তিনিই আমাদের রব যিনি প্রতিটি বস্তুকে তার নিজস্ব আকৃতি দান করেছেন, তারপর (সঠিক) পথ দেখিয়েছেন।[২]
ভেবে দেখুন, পরিযায়ী পাখিরা দূরদেশে ভ্রমণ করে থাকে তাদের নিরাপত্তার জন্য। পাখিগুলো প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। এমনকি কোনো কোনো প্রজাতির পাখি লাগাতার ৮৬ ঘণ্টা পর্যন্ত উড়তে পারে। পৃথিবীতে কোনো বিমান কি একটানা ৮৬ ঘণ্টা উড়তে পারবে?
আল্লাহ্‌ মাছকে এমন ব্যবস্থা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে সে জানতে পারে, সে পানির কোন স্তরে রয়েছে। প্রতিটি জলজ প্রাণীর মাঝেই পানির চাপ বোঝার ক্ষমতা রয়েছে।
আমাদের চারপাশের গৃহপালিত প্রাণীগুলোর প্রতি লক্ষ করুন। দেখবেন, তারা আশ্চর্যজনক নানা উপায়ে নিরাপদ থাকছে। এ সবই আল্লাহ তাআলার 'আস-সালাম' নামের নিদর্শন।
এর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা গেল— ‘আস-সালাম’ মানে আল্লাহ তাআলার সত্তা সমস্ত দোষ থেকে নিরাপদ, তাঁর গুণাবলি সমস্ত ত্রুটি থেকে নিরাপদ, তাঁর যাবতীয় কাজ অকল্যাণ থেকে নিরাপদ।
মূলত ‘আস-সালাম’ সেই সত্তার নাম—যিনি তাঁর সৃষ্টিকুলের জন্য নিরাপত্তাদানকারী। তাই বিশ্বজগতে যত নিরাপত্তা রয়েছে, সবই তাঁর দিকে সম্পর্কিত। মুমিন বান্দাদের জন্য তিনি আজাব থেকে নিরাপত্তাদানকারী; বিপদ থেকে মুক্তিদাতা।
এ মর্মে কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন— (৫৯) قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِينَ اصْطَفَى ...
বলুন, সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর এবং শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর মনোনীত বান্দাদের ওপর।[১]
আল্লাহ তাআলা ‘আস-সালাম’। এজন্যই তাঁর সত্তা এবং তাঁর বান্দাগণ সমস্ত কষ্ট ও ক্ষতি থেকে নিরাপদ।
এই মহান নামের আরেকটি অর্থ হলো, আল্লাহর জিকির। এটা মনে স্বস্তি ও প্রশান্তি এনে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— (۲۸) ... أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
জেনে রেখো আল্লাহর জিকিরেই অন্তরগুলো প্রশান্তি লাভ করে।[২]
কখনো হৃদয়ে শূন্যতা ভর করে, আবার কখনো মনে বিরাজ করে ভয় ও অস্থিরতা।
এই শূন্যতা ও অস্থিরতা দূর হয় শুধু আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে। দুনিয়াতে সবকিছু খুঁজে দেখুন। পুরো দুনিয়ায় এমন কিছু নেই-যা আপনাকে সুখ ও প্রশান্তি দিতে পারে। সুখ ও প্রশান্তি রয়েছে একমাত্র আল্লাহর জিকির ও স্মরণে।
কখনো কখনো হৃদয়ে মরিচা পড়ে। যদি প্রশ্ন করা হয়, সেই মরিচা দূর করার উপায় কী? তাহলে উত্তরে বলব, 'আল্লাহর জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত।'
আপনি যখন মহান আল্লাহর 'আস-সালাম' নামের জিকির করবেন, তখন অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব করবেন। যখন 'আস-সালাম' নাম স্মরণ করবেন, তখন আপনার মনের ভয় ও অস্থিরতা দূর হয়ে যাবে; দূর হয়ে যাবে হৃদয়ের শূন্যতা ও একাকিত্ববোধ।
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহ জিকির ও স্মরণ থেকে দূরে থাকে, তারা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। তাদের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। তারা আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে শরিক করে বসে। তাই আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে ঢেলে দেন ভয় ও অস্থিরতা।
মুমিন ও কাফিরের মধ্যে এটাই হলো পার্থক্য। মুমিন বান্দা সবসময় থাকে শান্ত ও প্রশান্ত। কোনোকিছুতেই সে বিচলিত হয় না। কাফিরের মনজুড়ে থাকে ভয় ও শঙ্কা। সে সর্বদা অস্থিরতায় ছটফট করতে থাকে।
এজন্য আপনি যখন 'আস-সালাম' নাম স্মরণ করবেন, তখন এই নাম আপনাকে দেবে অনাবিল প্রশান্তি এবং সুখময় অনুভূতি। যখন এই নামের জিকির করবেন, তখন মহান আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করবেন। বুঝতে পারবেন-তিনি আপনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছেন, আপনি তাঁর সুরক্ষা ও তত্ত্বাবধানে রয়েছেন, লাভ করছেন তাঁর তাওফিক ও সহায়তা।
'আস-সালাম' মানে আপনি যখন আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক গড়তে চাইবেন, তখন নিজিকে সব ধরনের দোষত্রুটি থেকে পবিত্র করবেন। পবিত্র মন নিয়ে মহান রবের জিকির করবেন। তাঁর স্মরণে, তাঁর ইবাদতে নিজেকে মিটিয়ে দিয়ে লাভ করবেন অগণিত সাওয়াব ও প্রতিশ্রুত জান্নাত।
এই পর্যায়ে আমরা একটি সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। 'আস-সালাম' নামের প্রথম অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলার সুমহান সত্তা সমস্ত দোষ থেকে পবিত্র, তাঁর গুণাবলি পবিত্র সমস্ত ত্রুটি থেকে, তাঁর যাবতীয় কর্ম পবিত্র সমস্ত অকল্যাণ থেকে। কোন অকল্যাণ থেকে মুক্ত? নিরেট অকল্যাণ থেকে। পক্ষান্তরে কল্যাণের উদ্দেশ্যে সাধিত অকল্যাণ মূলত চিকিৎসার মতো।
'আস-সালাম' নামের দ্বিতীয় অর্থ হলো, তিনি নিরাপত্তার অধিকারী। অর্থাৎ তিনিই তাঁর বান্দাদের নিরাপত্তা দান করেন। হয়তো তাদেরকে সৃষ্টির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দান করেন। যেমনটি আমরা কিছুক্ষণ আগে আলোচনা করলাম। নয়তো তাদের মনে নিরাপত্তা এনে দেন। এজন্য আল্লাহর জিকির ও স্মরণ মনে প্রশান্তি ও স্বস্তি এনে দেয়।
আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক হৃদয়কে কৃপণতা, লোভ, ক্রোধ হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকারের মতো দোষত্রুটি থেকে মুক্ত করে। এই দোষগুলো মানুষের দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আপনি যখন আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলবেন, তখন এই দোষগুলো থেকে পবিত্র হয়ে যাবেন। কারণ তিনি আপনার দেহের নিরাপত্তাদানকারী। আপনাকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও নানারকম ব্যবস্থা দিয়েছেন; দান করেছেন কোষ ও টিস্যু। হাড়, স্নায়ু, পেশি, ধমনি, শিরার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম বড় বড় বিজ্ঞানীকে হতাবাক করে দেয়।
যদি আপনি ভীত হন এবং তাঁকে স্মরণ করেন, তাহলে আপনার মনে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। যদি তাঁর সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন, তাহলে তিনি আপনাকে সমস্ত দোষত্রুটি থেকে মুক্ত রাখবেন এবং আপনার হৃদয়কেও করবেন পরিশুদ্ধ। কারণ তাঁর একটি নাম 'আস-সালাম'।
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের শান্তির পথ দেখান। প্রতিটি মানুষের একটি পরিবার আছে। হতে পারে তার বাড়িতে ঝগড়াবিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ, রাগ, ঘৃণা, বিবাহবিচ্ছেদের মতো ব্যাপার ঘটে। আপনি যদি এক্ষেত্রে কুরআনুল কারিমের নির্দেশনা ও নববি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাহলে আল্লাহ তাআলা আপনাকে ঘর-সংসারের ক্ষেত্রে শান্তির পথ প্রদর্শন করবেন। আপনি দেখবেন আত্মিক প্রশান্তি, অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া, প্রেম-ভালোবাসার প্রাচুর্য বিরাজ করছে। কারণ আপনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর অনুসরণ করছেন।
যখন বাড়িতে প্রবেশ করবেন, তখন আপনার পরিবারকে সালাম দিন; বলুন-'আসসালামু আলাইকুম!' এতে শয়তান পালিয়ে যাবে। শয়তান মানুষের ঘরবাড়িতে ঢুকে থাকে। বাড়ির অধিবাসীরা সালাম না দিয়ে এবং দুআ না পড়ে[১] ঘরে প্রবেশ করলে, শয়তান তার সঙ্গীসাথিদের ডেকে বলে, 'আমাদের রাতযাপনের ব্যবস্থা হয়ে গেছে।' তখন সেই ঘরে সারারাত নানা ধরনের সমস্যা হতে থাকে। ঘরের অধিবাসীরা যখন বিসমিল্লাহ না বলেই খাওয়া শুরু করে, তখন শয়তান ঘোষণা করে, 'আমাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থাও হয়ে গেছে।'[২]
আল্লাহ তাআলার 'আস-সালাম' নাম এবং তিনি শান্তির পথ দেখান-এ দুটোর একটি অর্থ হচ্ছে তিনি আপনাকে নেককার নারী নির্বাচনের আদেশ দিয়েছেন। আপনি যদি নেককার হওয়ার কারণে কোনো নারীকে নির্বাচন করেন, তাহলে তাকে নিয়ে আপনি সুখী হতে পারবেন। কিন্তু যদি দ্বীনি অবস্থার ওপর সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেন, তাহলে দুজনেই কষ্টের মধ্যে পড়বেন। কারণ যদিও সৌন্দর্য লক্ষণীয়, কিন্তু শুধু সৌন্দর্যকে যদি আপনি তার দ্বীনদারিতার ওপর প্রাধান্য দেন, তবে এটা আপনার কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কাজের ক্ষেত্রে শান্তির পথ দেখানোর একটি ক্ষেত্র-সুদকে হারাম করা। সুদের লেনদেন করার কারণে আপনার ওপর বড় ধরনের ঋণের বোঝা চেপে বসতে পারে। যার ফলে আপনি নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত হতে পারেন। আপনার বেচাকেনা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সর্বসান্ত হয়ে যেতে পারেন। আপনি যদি এক্ষেত্রে নববি সুন্নাহ ও আল্লাহর নির্দেশ মানতেন, তাহলে এমন বিপদে পড়তেন না।
সুতরাং তিনি ব্যবসার ক্ষেত্রে শান্তির পথ দেখান, বিয়ের ক্ষেত্রে শান্তির পথ দেখান, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেখান শান্তির পথ। এটিই 'আস-সালাম' নামের সারকথা।
আপনি যদি কুরআনুল কারিমের বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন করেন, সর্বক্ষেত্রে সর্বদিকে তা আপনাকে শান্তির দিকে আহ্বান করবে। পৌঁছে দেবে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুত চিরন্তন সুখের নিবাসে। সেই সুখের নিবাস হলো জান্নাত।
তিনিই আস-সালাম। নিরাপত্তাদাতা ও পরম শান্তিদাতা। তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আপনি সুখে-শান্তিতে বসবাস করেন। অনুভব করেন, বিশ্বজগতের রব আপনার সাথেই রয়েছেন। তিনি কখনো আপনাকে ত্যাগ করেন না, ছেড়ে দেন না শত্রুর হাতে বরং তিনি আপনাকে সুরক্ষা দেন, সাহায্য করেন। কারণ আপনি এর মূল্য পরিশোধ করেছেন।
এ বিষয়ে কুরআনুল কারিম থেকে জানা যায়-
وَقَالَ اللَّهُ إِنِّي مَعَكُمْ طَلَئِنْ أَقَمْتُمُ الصَّلَاةَ وَآتَيْتُمُ الزَّكَاةَ وَآمَنتُم بِرُسُلِي وَعَزَّرْتُمُوهُمْ وَأَقْرَضْتُمُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا لَأُكَفِّرَنَّ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَلَأُدْخِلَنَّكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ فَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ
আল্লাহ বলেন, 'আমি তোমাদের সাথে আছি। যদি তোমরা সালাত কায়েম করো, আমার রাসুলদের প্রতি ঈমান আনো, তাদের সাহায্য করো এবং আল্লাহকে উত্তমপন্থায় ঋণ দিতে থাকো-তবে অবশ্যই আমি তোমাদের গুনাহগুলো মিটিয়ে দেব এবং অবশ্যই তোমাদের প্রবেশ করাব এমন উদ্যানসমূহে-যার তলদেশ দিয়ে নদীনালা প্রবাহিত হয়। এরপরও তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি কুফরি করবে, সে অবশ্যই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হবে।'[১]
'সালামাত' (নিরাপত্তা) শব্দটি 'আস-সালাম' থেকে এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক নির্বুদ্ধিতামূলক কর্মকাণ্ড-হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, ঘৃণা, অহংকার ইত্যাদি দোষত্রুটি থেকে নিরাপত্তা দেয়। আপনি যদি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করেন, তাহলে তিনি আপনাকে এসব ধ্বংসাত্মক দোষ থেকে পবিত্র করবেন।
'আস-সালাম' অর্থ-আপনি যখন তার দেওয়া শরিয়ত অনুযায়ী চলবেন, তখন তিনি আপনাকে শান্তির পথ দেখাবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ ...
নিশ্চয় এই কুরআন সেই পথের দিশা দেয়-যা সুপ্রতিষ্ঠিত [১]
আপনি যদি দুনিয়াতে কুরআনুল কারিমের বিধান বাস্তবায়িত করেন, কুরআন আপনাকে দুনিয়াতে শান্তি ও নিরাপত্তা দেবে। যদি আল্লাহর অভিমুখী হন, তবে তিনি আপনাকে হৃদয়ের প্রশান্তি দান করবেন। যদি আপনি তাকে আপনার জীবনের সবকিছু সোপর্দ করেন, তাহলে তিনি আপনাকে দান করবেন আখিরাতের নিরাপত্তা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَام ...
তিনিই আল্লাহ-যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি মহান অধিপতি, চিরপবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা।[২]
আপনি যদি কোনো মন্দ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করেন, তবে সে আপনার জীবন বরবাদ করে দেবে। মানুষ কখনো পাপাচারী নারীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়।
এমনই একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে এক লোক আমাকে বলেছিলেন, তার স্ত্রীকে তিনি প্রথম দেখেছিলেন এক নাইটক্লাবে। প্রথম দেখায় তাকে ভালো লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত এই ভালো লাগা বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। বিয়ের পর তাদের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব- কলহ। কারণ তার স্ত্রী ছিলেন উচ্ছঙ্খল প্রকৃতির। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি তাকে কোত্থেকে বিয়ে করে এনেছেন? তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করুন।' আমার পরামর্শ অনুযায়ী তিনি স্ত্রীর পরিবারের কাছে গেলেন। তখন পরিবারের লোকেরা স্ত্রীকে বুঝিয়ে রাজি করাল। কিন্তু স্ত্রী দাবি করল, মোটা অঙ্কের টাকা দিলে সে স্বামীর কাছে ফিরে যাবে। তারপর সে স্বামীর সাথে ফিরে এল। কিন্তু গোপনে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিল। কোর্টের লোকদের সাথে যোগসাজশ করে মামলার নোটিশ নিজের কাছে রেখে দিল, স্বামীকে কিছুই জানালো না।
এভাবে মামলার সময় শেষ হয়ে গেল। রায় গেল স্বামীর বিরুদ্ধে। মোহর অনাদায়ের অপবাদে তাকে যেতে হলো জেলে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সবকিছু জেনে সে একরাতে স্ত্রী, শাশুড়ি ও শ্যালিকাকে হত্যা করার চেষ্টা করল। তারপর নিজেই আত্মহত্যা করে বসল। কিন্তু তাদের আঘাত ততটা গুরুতর ছিল না। স্থানীয় লোকজন তাদেরকে হাসাপাতালে নিয়ে গেল। তিনজনেই বেঁচে গেল। তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।
খারাপ জায়গায় পছন্দ হওয়া কোনো মেয়েকে বিয়ে করলে মানুষ শান্তি পেতে পারে না; বরং জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। দামেশকে মাত্র ছয় মাস আগে এই ঘটনা ঘটেছে।
এজন্য যদি কেউ আল্লাহ তাআলার বিধানকে আঁকড়ে ধরে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার বিয়ে ও দাম্পত্যে, আমলে, রিজিকে, স্বাস্থ্যে, সন্তানসন্ততিতে বারাকাহ দান করেন। তাকে দেখান শান্তির পথ।
এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন-
.... فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى )
যে আমার হিদায়াতের অনুসরণ করবে, সে পথহারা হবে না এবং দুর্ভাগাও হবে না।[১]
জেনে রাখুন, আল্লাহর সাথে থাকার মাঝেই যাবতীয় কল্যাণ। সমস্ত শান্তি ও নিরাপত্তা রয়েছে আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী চলা, আল্লাহকে চেনা, তাঁর ইবাদত করা, তাঁর কিতাব বোঝা, তাঁর শরিয়ত পালন ও বাস্তবায়ন এবং তাঁর নির্দেশ আঁকড়ে ধরার মাঝে।
এছাড়া কুরআনুল কারিমে ভিন্ন একটি অর্থে 'আস-সালাম' শব্দটি বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ ...
আল্লাহ ডাকেন দারুস সালাম; শান্তি-নিরাপত্তার নিবাসের দিকে।[১]
কী এই 'দারুস সালাম' বা শান্তি-নিরাপত্তার নিবাস?
এই শান্তি ও নিরাপত্তার নিবাস হলো জান্নাত। তাতে কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই, হিংসা-বিদ্বেষ নেই; নেই কোনো রোগব্যাধি, ভয়, দুশ্চিন্তা, হানাহানি, ঝগড়া-বিবাদ।
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَىٰ وَزِيَادَةٌ *
আল্লাহ ডাকেন দারুস সালাম; শান্তি-নিরাপত্তার নিবাসের দিকে। আর তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথ দেখান। যারা সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ ও বাড়তি পুরস্কার [২]
অন্য এক আয়াতে 'আস-সালাম' শব্দটি আরেক অর্থে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَمَّا إِنْ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ فَسَلَامٌ لَّكَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ )
আর যদি সে ডান পথের অনুসারী হয়, তাহলে (তাকে বলা হবে) তোমার জন্য ডানপন্থিদের পক্ষ থেকে সালাম [১]
আল্লাহ তাআলা আপনাকে এই ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও শান্তির কথা জানাচ্ছেন। তারা বলবে, আমরা অনেক সুখে-শান্তিতে আছি। ডান পাশের লোকেরা জান্নাতে শান্তিতে থাকবে।
কুরআনুল কারিমে আরও বর্ণিত হয়েছে-
وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا )
তার প্রতি বর্ষিত হবে শান্তি-যেদিন সে জন্মগ্রহণ করে এবং যেদিন মৃত্যুবরণ করবে আর যেদিন সে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে-সেদিন [২]
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তিন সময়ে মানুষ সবচেয়ে একাকী হয়। তা হলো-এক. জন্মের দিন। দুই. মৃত্যুর দিন। তিন. কিয়ামতের দিন।'
সেদিনের পূর্বে মানুষ মায়ের গর্ভে সুখে থাকে, সব ধরনের কষ্ট ও ঝামেলা থেকে থাকে মুক্ত। এমন অবস্থা থেকে দুনিয়াতে আসে। স্বাভাবিকভাবে সে একটি সংকীর্ণ স্থান থেকে সুপ্রশস্ত জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। দুনিয়ার সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কেঁদে ওঠে।
তারপর যেদিন সে মৃত্যুবরণ করে, সেদিন স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য; সবকিছু ছেড়ে চলে যায়। সপ্তাহে হয়তো তার একটি দিন ছিল, যেদিন সে বন্ধু-বান্ধবের সাথে মিলিত হতো। ছিল কিছু শখ ও আগ্রহের বিষয়। তারপর যখন তার হৃদস্পন্দন থেমে যায়, তখন সবাই তাকে নিয়ে কবরে রেখে আসে। সবকিছু ছেড়ে সে চলে যায় চিরদিনের জন্য।
এই মানুষটিই তো ঘর সাজিয়েছিল। ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল তার, একান্ত সময় কাটানোর ঘর। সেই ঘরে সে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখত। নানাজনের দেওয়া উপহারগুলোও হয়তো থাকত। তার পরিবারের লোকজন হয়তো সেই রুমে যেতে চাইত, কিন্তু জীবিত থাকতে সে অনুমতি দিত না। মৃত্যুর পর যখন সে আমানত অর্পণ করে দুনিয়া ত্যাগ করে, তখন পরিবারের লোকেরা তার রুমের দরজা খোলে, তার গাড়িটি নিয়ে নেয়, তার দোকানটি খোলে; নতুন করে সাজায়, বেচাকেনা করে। এভাবেই চলতে থাকে দুনিয়া। এজন্যই বলা হয়েছে, 'যেদিন সে মৃত্যুবরণ করবে।'
আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত-
একবার তিনি জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কাঁদলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?' তিনি বললেন, 'জাহান্নামের কথা মনে পড়ায় কাঁদছি। আপনি কি কিয়ামতের দিন আপনার পরিবারের কথা মনে রাখবেন?' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, '(হ্যাঁ), অবশ্য ৩টি স্থানে কেউ কারও কথা মনে রাখবে না-
১. মিজানের স্থানে; যতক্ষণ পর্যন্ত না জানতে পারবে-তার আমলের পরিমাণ কম হবে নাকি বেশি।
২. আমলনামা প্রাপ্তির স্থানে; যখন বলা হবে- 'তোমার আমলনামা পাঠ করো।' তখন সবাই দুশ্চিন্তায় থাকবে-আমলনামা ডানহাতে পাচ্ছে না বামহাতে; নাকি পেছন দিক থেকে পাচ্ছে।
৩. পুলসিরাতের কাছে; যখন তা জাহান্নামের ওপর স্থাপন করা হবে। কিয়ামতের দিন মা তার সন্তানকে দেখতে পাবে। মা বলবে, 'হে আমার সন্তান, আমি কি তোমাকে গর্ভে ধারণ করিনি? আমার বুকের দুধ পান করাইনি? কোলেপিঠে করে মানুষ করিনি? তোমার কাছে কোনো নেকি আছে-যা আমার উপকারে আসবে?' সন্তান বলবে, 'আহ মা, আপনি যে কষ্টের কথা বলছেন, আমিও একই কষ্টে আছি। আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারব না।'
এক ব্যক্তি আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে স্বপ্নে দেখলেন। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'সালামান! সালামান!' লোকটি তখন আনন্দ চিত্তে ঘুম থেকে জেগে উঠল। আরেকজনকে বললেন তার স্বপ্নের কথা। তিনি তখন জানালেন, তোমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো, তুমি আল্লাহর এই বক্তব্যের অর্থ জানো না-
وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
যখন মূর্খরা তাদেরকে (অভদ্রভাবে) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে— 'সালাম'; শান্তি।[১]
এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা নেককার বানিয়েছেন। যখন কেউ তাদেরকে সম্বোধন করে কিছু বলে—তাদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চায়—তখন তারা তাকে বলে, 'সালাম। আমরা বিতর্কে জড়াতে চাই না।'
এখানে সালাম অর্থ কী?
আলিমগণ বলেন, সালাম অর্থ হলো, মূর্খ লোকদের প্রতিউত্তরে তারা এমন কথা বলেন, যাতে কোনো দোষ নেই, কোনো ভুল নেই; নেই কোনো কঠোরতা ও মূর্খতাপ্রসূত উচ্চারণ, অতিকথন ও অপমান-লাঞ্ছনা। বরং তাদের কথা হয় নম্র, কোমল, সঠিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ।
শুধু 'সালাম' বা শান্তি শব্দটি দুর্ব্যবহারকারীর কোনো কাজে আসে না বরং পুণ্যবান ব্যক্তিদের দায়িত্ব হলো, তারা তাকে উপদেশ দেবে। আল্লাহ তাআলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন—
... وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ...
আপনি যদি কর্কশ ও কঠোর প্রকৃতির হতেন, তবে অবশ্যই তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে যেত।[২]
সে কথায় কোনো কঠোরতা নেই, কোনো অজ্ঞতাপ্রসূত উচ্চারণ নেই; নেই কোনো সীমালঙ্ঘন, মিথ্যাচার, লুকোছাপা, ধোঁকা ও প্রতারণা-এমন কথাই সালামের অন্তর্গত।
'যখন মূর্খরা তাদেরকে (অভদ্রভাবে) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে-সালাম; শান্তি'-এর অর্থ এটা নয় যে, মূর্খদের অভদ্র সম্বোধনে আপনি বলবেন 'সালাম' বরং আলিমগণ বলেন, 'তাদের উত্তরে আপনি যে কথা বলবেন-তা ভুলত্রুটি, কঠোরতা, বাড়াবাড়ি, সীমালঙ্ঘন ও অপমান থেকে মুক্ত হবে।'
'আস-সালাম' এই মহান নামের আলোকে মুমিনের কর্তব্য কী?
একজন প্রকৃত মুমিন প্রকাশ্য ও গোপন শরিয়তের সব ধরনের বিরুদ্ধাচরণ থেকে মুক্ত থাকবে; মুক্ত থাকবে গোপন ও প্রকাশ্য সমস্ত দোষ-ত্রুটি থেকে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَهُ ...
তোমরা গোপন ও প্রকাশ্য গুনাহ ত্যাগ করো। [১]
মুমিন বান্দা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবে, দোষত্রুটি থেকেও মুক্ত হবে। তাই 'আস-সালাম' নামের সাথে আমাদের সম্পর্কও যেন এমনই হয়। আমাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-
يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ *
যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো উপকারে আসবে না। তবে ওই ব্যক্তির কথা আলাদা-যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে। [২]
'কালব সালিম' (قُلْب سلیم) বা বিশুদ্ধ হৃদয় হলো সেই অন্তর-যা সংশয় ও শিরক থেকে নিরাপদ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا ...
তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনার পর তাতে সন্দেহ পোষণ করে না [১]
সুতরাং সেই ব্যক্তিই নিরাপদ-যার হৃদয় সংশয়, শিরক, নিফাক (কপটতা), বিরোধ, রিয়া (লোকদেখানো), তোষামোদ থেকে মুক্ত। যার হৃদয় প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে মুক্ত। যার বিবেক সন্দেহ-সংশয় থেকে মুক্ত। যিনি সংশয়, শিরক, নিফাক, রিয়া ও তোষামোদকে ছুড়ে ফেলতে পারে পদতলে। 'আস-সালাম' নামের দাবি অনুযায়ী এসবই মুমিনের কর্তব্য।
পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা তাঁর এই মহান নামের দাবিতে যা করবেন, আমাদের আলোচনায় সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আপনি যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেন, বিশ্বজগতের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এই সম্পর্কে জানতে পারেন, জ্ঞান অর্জনের মজলিসে বসেন, প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন; যদি দৃষ্টিকে হারাম থেকে অবনত রাখতে পারেন, শ্রবণকে বিরত রাখতে পারেন গান শোনা থেকে; যদি পরনারীর সাথে মেলামেশা না করেন, শরিয়তের কোনো বিধান অমান্য না করেন-তাহলে আল্লাহর কাছে আপনার কী প্রতিদান থাকবে, জানেন?
আলিমগণ এই বিষয়ে বলেন, 'যে বান্দা আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করে; আল্লাহমুখী হয়, আল্লাহর ওপর হক হলো-তিনি তাকে রক্ষা করবেন, নিরাপদ রাখবেন। দুনিয়াতে তাকে কষ্টদায়ক বিষয় থেকে রক্ষা করবেন এবং কল্যাণকর বিষয় উপহার দেবেন।
আপনি যখন মুমিন হবেন, তখন অনেক বড় বড় বিপদাপদ থাকবে। মুমিন যেমন স্পর্শকাতর, তেমন আমাদের মহান রবও পরম দয়ালু চিকিৎসক। তিনি একান্তে আপনাকে সতর্ক করবেন। তিনি আপনার থেকে যন্ত্রণাদায়ক ও অপমানজনক শাস্তি রোধ করবেন। আপনার দরিদ্রতা দূর করবেন-যা অনেক সময় কুফর, বিরোধ, দাম্পত্য-অনাস্থা, এমনকি হত্যাকাণ্ডেও পরিণত হয়। এজন্য মুমিন যখন আল্লাহর আদেশের ওপর অবিচল থাকবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে কষ্টদায়ক বিষয় থেকে রক্ষা করবেন এবং অফুরান নিয়ামত দান করবেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'পুরো দুনিয়াই উপভোগের উপকরণ। তবে সবচেয়ে উত্তম উপকরণ হলো পুণ্যবতী স্ত্রী।' [১]।
মুমিনকে আল্লাহ তাআলা নিষ্কলুষ সুখ্যাতি দান করেন, দান করেন উন্নত চরিত্র, প্রশংসিত ও সর্বজনপ্রিয় জীবন। এসবই আল্লাহর আদেশের ওপর অবিচলতার ফলশ্রুতি।
'আস-সালাম' (নিরাপত্তাদাতা) সব থেকে আপনাকে রক্ষা করেন। এগুলো দুনিয়ার নিরাপত্তা। তাহলে দ্বীনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা কী?
দ্বীনের নিরাপত্তা হয় তিনটি ক্ষেত্রে। তা হলো—এক. শরিয়ত। দুই. তরিকত। তিন. হাকিকত। [২]
শরিয়তের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা তার বিবেককে বিদআত ও সন্দেহ-সংশয় থেকে নিরাপদ রাখেন, হৃদয়কে নিরাপদ রাখেন প্রবৃত্তির কুপ্ররোচনা থেকে। তার বিবেকে তখন কোনো বিদআত থাকবে না, বড় কোনো ভুল থাকবে না-থাকবে না ভ্রান্ত ও ভুল আকিদা-বিশ্বাস।
তরিকতের ক্ষেত্রে তার বিবেক প্রবৃত্তি ও ক্রোধের কাছে বন্দি থাকবে না; বরং বিবেক হবে নিয়ন্ত্রক। বিবেকই সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করবে, প্রবৃত্তি হবে বিবেকের অনুগামী। এটি হলো তরিকতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা।
পক্ষান্তরে হাকিকতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা হলো, আপনি শুধু আল্লাহর প্রতিই লক্ষ রাখবেন, অন্য কারও প্রতি নয়।
এজন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—
প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার মুখ ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।
একজন আলিম বলেন, 'কেউ যদি নিজের নফস তথা প্রবৃত্তি থেকে নিরাপদ না থাকে, তাহলে মানুষ কীভাবে তার কাছে নিরাপদে থাকবে!
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর 'আস-সালাম' নামের গুণাবলি অর্জনের তাওফিক দান করুন।

টিকাঃ
[১] সুরা হাশর, আয়াত: ২৩
[২] সুরা ইউনুস, আয়াত: ২৫
[১] সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৯০-৯১
[২] সুরা মারইয়াম, আয়াত: ১৫
[১] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত : ২৬
[১] অন্তঃকর্ণে দুটি অংশ রয়েছে। ইউট্রিকুলাস এবং স্যাকুলাস। ইউট্রিকুলাস আমাদের ভারসাম্য রক্ষায় এবং স্যাকুলাস শ্রবণে সাহায্য করে। ইউট্রিকুলাস তিনটি অর্ধ বৃত্তাকার নালি দিয়ে গঠিত। নালিগুলো পরস্পরের সাথে সমকোণে অবস্থান করে। এই তিনটি নালি তিনটি মাত্রায় অবস্থান করে। ফলে আমরা যখন ত্রিমাত্রিক তলে চলাচল করি তখন তিনটি অর্ধ বৃত্তাকার নালি তিনদিকে কাজ করে এবং আমাদের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। নালিগুলো এন্ডোলিম্ফ নামক তরলে পূর্ণ। নালিগুলোর মাঝে একটি ফোলা অংশ থাকে, যাকে অ্যাম্পুলা বলা হয়।
[১] হৃৎপিন্ডের ডান অ্যাট্রিয়াম প্রাচীরের ওপর দিকে অবস্থিত, বিশেষায়িত কার্ডিয়াক পেশিগুচ্ছ দ্বারা গঠিত, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি ছোট অংশ রয়েছে, যা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহ ছড়িয়ে দিয়ে হৃৎস্পন্দন সৃষ্টি করে এবং স্পন্দনের ছন্দময়তা বজায় রাখে। একে পেসমেকার বলে।
[১] যেসব রক্তবাহী নালি হৃৎপিণ্ড থেকে উৎপন্ন হয়ে দেহের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহ করে সেগুলোকে ধমনী বলে।
[২] যেসব রক্তবাহী নালির মাধ্যমে রক্ত দেহের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে হৃৎপিন্ডে ফিরে আসে সেগুলোকে শিরা বলে।
[৩] ধমনি ক্রমান্বয়ে শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে শেষে কিছু সুক্ষ্ম নালি তৈরি করে, যেগুলো মূলত ধমনির অংশবিশেষ। সেই সুক্ষ্ম নালিগুলোকে কৌশিক নালি বা কৌশিক জালিকা বলা হয়।
[১] সুরা কাহফ, আয়াত: ১৮
[১] সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৩
[২] মানবদেহে যখন লোহিত কণিকার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন কিডনি থেকে একধরনের বিশেষ হরমোন নিঃসরিত হয়। সেই হরমোনের উপস্থিতি টের পেয়ে অস্থিমজ্জার ভেতরে লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন হতে শুরু করে।
[১] সুরা তারিক, আয়াত: ১১-১২
[১] সুরা মুলক, আয়াত: ৩
[২] সুরা ত-হা, আয়াত: ৪৯-৫০
[১] সুরা নামল, আয়াত: ৫৯
[২] সুরা রাদ, আয়াত: ২৮
[১] নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করে, তখন সে যেন বলে- بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا বিস্মিল্লা-হি ওয়ালাজনা- ওয়া বিস্মিল্লা-হি খরজনা- ওয়া 'আলাল্ল-হি রব্বিনা- তাওয়াক্কাল্লা-। অর্থ : আল্লাহর নামে প্রবেশ করি এবং আল্লাহর নামেই বের হই। আর আমরা কেবল আমাদের প্রতিপালক আল্লাহরই ওপর ভরসা করি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'এরপর সে যেন তার পরিবারের লোকদের সালাম দেয়।' [সুনানু আবি দাউদ: ৫০৯৬; তুহফাতুল আখইয়ার, পৃষ্ঠা: ২৮-ইবনু বায রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।]
[২] জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন, 'যখন কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, তখন শয়তান (হতাশ হয়ে) তার সঙ্গীদের বলে, 'এখানে তোমাদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা নেই, খাবারও নেই।' আর যখন সে আল্লাহর নাম না নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে, তখন শয়তান বলে, তোমরা রাতযাপনের জায়গা পেয়ে গেলে। আর খাবার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ না করলে শয়তান বলে, তোমরা রাতযাপনের জায়গাও পেলে, রাতের খাবারও পেয়ে গেলে। [সহিহ মুসলিম: ২০১৮; সুনানুন নাসায়ি: ৯৯৩৫; আল-আদাবুল মুফরাদ: ১০৯৬]
[১] সুরা মায়িদা, আয়াত: ১২
[১] সুরা ইসরা, আয়াত: ৯
[২] সুরা হাশর, আয়াত: ২৩
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ১২৩
[১] সুরা ইউনুস, আয়াত: ২৫
[২] সুরা ইউনুস, আয়াত: ২৫-২৬
[১] সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৯০-৯১
[২] সূরা মারইয়াম, আয়াত : ১৫
[১] সুরা হাক্কাহ, আয়াত: ১৯
[২] সুনানু আবি দাউদ: ৪৭৫৫; মুস্তাদরাকুল হাকিম: ৮৭২২; মিশকাতুল মাসাবিহ: ৫৫৬০; আলবানি রাহিমাহুল্লাহর মতে, এর সনদ দুর্বল।
[১] সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩
[২] সুরা আলি-ইমরান, আয়াত: ১৫৯
[১] সুরা আনআম, আয়াত: ১২০
[২] সুরা শুআরা, আয়াত: ৮৮-৮৯
[১] সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৫
[১] সহিহ মুসলিম: ১৪৬৭
[২] শরিয়ত হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক আনীত ইসলামের যাবতীয় বিধিবিধান ও আদেশ-নিষেধ।
তরিকত হচ্ছে, আত্মশুদ্ধি অর্জন ও গুনাহমুক্ত জীবন গঠনের মাধ্যমে ইসলামি শরিয়তকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের পথ ও পন্থা।
হাকিকত হচ্ছে, তরিকত অর্জনের মাধ্যমে অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর অস্তিতকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা।
উল্লেখ্য, এই ৩টি বিষয় একটি অপরটির বিপরীত নয়; বরং এগুলোর একটি অপরটির ওপর নির্ভরশীল। কাজেই একটি ছাড়া অপরটি অর্জিত হয় না। [৫]
[১] সহিহুল বুখারি : ১০; সহিহ মুসলিম : ৪১; জামিউত তিরমিযি: ২৬২৭; সুনানু আবি দাউদ: ২৪৮১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00