📄 আর-রাযযাক : মহান রিযিকদাতা
গহীন জঙ্গলের কোনো এক গাছের চূড়ায় কাকের বাসা। সেখানে রয়েছে দুর্বল অসহায় ছোট্টপ্রাণ এক ছানা। মাত্রই ডিম ফুটে বেরিয়েছে। ক্ষুধায় খুব কষ্ট হয় ওর। নীড়ের খড়কুটোর ফাঁক দিয়ে সে তাকিয়ে থাকে আলো-ঝলমল পৃথিবীর দিকে। ওর দিকে তাকানোর কেউ নেই, নিজের মা পর্যন্ত চেনে না ওকে। কিন্তু সপ্ত আকাশ ভেদ করে, পরম মমতা দিয়ে কেউ দেখছেন ছোট্ট সেই মিষ্টি ছানাটিকে। পরম স্নেহে ওর কাছে খাবার পৌঁছে দেন তিনি। তিনি আর-রাযযাক; মহান রিযিকদাতা।
☆☆☆
তিনি মহান রিযিকদাতা; রিযিক দান করেন সমগ্র সৃষ্টিকে। সৃষ্টিকুলের যত প্রয়োজন, যত চাহিদা-সব তিনিই পূরণ করেন, তা পরিমাণে যত বেশিই হোক না কেন! সীমাহীন দানে কুণ্ঠাবোধ করেন না কখনো। তাই তো তিনি শুধু রিযিকদাতা নন; বরং মহান রিযিকদাতা, যার বদান্যতা বান্দার কল্পনাকেও হার মানায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَكَأَيِّن مِّن دَابَّةٍ لَّا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ *
এমন কত জীবজন্তু আছে যারা নিজেদের খাবার নিজেরা সঞ্চয় করতে পারে না। আল্লাহই রিযিক দান করেন তাদের ও তোমাদের। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ [১]
আল্লাহর নবি দাউদ আলাইহিস সালাম দুআ করতেন- হে আল্লাহ! আপনি তো এমন সত্তা, যিনি কাকের বাসায় ছোট্ট কাকের ছানাটিকেও রিযিক দান করেন!'[২]
রিযিক লাভের উপায়
আপনি যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়কারীদের একজন হয়ে থাকেন তো আপনার জন্যে সুসংবাদ! আল্লাহ তাআলা সালাত আদায়ের জন্যে রিযিক প্রদানের প্রতিজ্ঞা করেছেন। আর-রাযযাক বলেন-
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى *
(হে মুহাম্মাদ!) আপনার পরিবারবর্গকে সালাত আদায়ের আদেশ দিন এবং তাতে অটল-অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিযিক চাই না; আমিই আপনাকে রিযিক দান করি। আর সুসংবাদ কেবল মুত্তাকিদের জন্য [৩]
কাজেই রিযিক বৃদ্ধি করতে চাইলে অবশ্যই সালাত আদায় করতে হবে বিনয়, একাগ্রতা ও খুশু-খুযুর সাথে। খুশু-খুযুবিহীন সালাত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। মনে রাখবেন, এটি কিন্তু সালাতের আদব নয়; বরং সালাতের ফরয[৪]। আল্লাহ বলেন-
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ )
মুমিনগণ সফল, যারা খুশু-খুযুর সাথে সালাত আদায় করে [১]।
আল্লাহই আপনার রিযিকদাতা, তাই সকল কাজে ফিরে আসুন তাঁরই দিকে। তাঁর কাছ থেকেই চেয়ে নিন সবকিছু। বান্দার আকুল চাওয়া আল্লাহ ভালোবাসেন। ঘরের হারানো চাবিটা, জুতার ছিঁড়ে যাওয়া ফিতাটা, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সামান্য বস্তুগুলোও চেয়ে নিন তাঁর কাছ থেকে।
মুসা আলাইহিস সালাম এক্ষেত্রে আমাদের বড় আদর্শ। তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন-
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ ...
মুসা যখন আমার নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হলো এবং তার প্রতিপালক তার সঙ্গে কথা বললেন, তখন সে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে দর্শন দিন। আমি আপনাকে দেখব।'[২]
আল্লাহকে দেখার বাসনা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া। আবার যখন তিনি ক্ষুধার কষ্টে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তখন নিজের অসহায়ত্বের সবটুকু প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে চেয়েছিলেন খাবার ও আশ্রয়। আল্লাহ বলেন-
ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
অতঃপর সে ছায়ার নিচে আশ্রয় গ্রহণ করে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন, আমি তো কেবল তারই মুখাপেক্ষী।'[৩]
তাই ছোট-বড় সবকিছুর জন্য আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করুন। আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য আয়াত নাযিল করে রিযিকের নিশ্চয়তা দিয়েছেন, জানিয়েছেন।
রিযিকের দায়িত্ব একান্তই তাঁর। তবু মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে; পেরেশান হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাদেরকে চিন্তিত হতে বলেছেন আখিরাতের ব্যাপারে; জান্নাত অর্জনের ব্যাপারে। অথচ তারা কেবল দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়ায় আর জান্নাতের কথা বেমালুম ভুলে যায়।
এজন্য আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'তুমি রিযিক অন্বেষণে আদিষ্ট নও; কিন্তু জান্নাত অন্বেষণে আদিষ্ট।'
অর্থাৎ, রিযিকের সন্ধান না করায় তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে না; কিন্তু জান্নাতের অনুসন্ধান না করলে তোমাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
কী বিস্ময়কর! মানুষকে যে জিনিসের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে, মানুষ তা নিয়ে কতই না ব্যস্ত! অথচ রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে গ্রহণ করেছেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে-
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ ثُمَّ رَزَقَكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ هَلْ مِن شُرَكَابِكُم مَّن يَفْعَلُ مِن ذَلِكُم مِّن شَيْءٍ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ
আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর রিযিক দিয়েছেন। তিনিই তোমাদের মৃত্যু দেবেন এবং পরে জীবিত করবেন। তোমাদের দেব- দেবীগুলোর মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এসবের কোনো কিছু করতে পারে? তারা যাদেরকে শরিক করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, মহান।[১]
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْنًا كَبِيرًا *
দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমি তাদের রিযিক দিই; তোমাদেরও রিযিক দিই। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।[২]
وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ فَوَرَبِّ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ لَحَقِّ مِثْلَ مَا أَنَّكُمْ تَنطِقُونَ
আকাশেই রয়েছে তোমাদের রিযিক ও প্রতিশ্রুত সবকিছু। আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিপালকের শপথ! তোমাদের কথাবার্তার মতোই এসব সত্য।[১]
কত হৃদয়গ্রাহী ও দৃঢ় ভাষায় আল্লাহ আমাদের রিযিকের নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। তারপরও আমরা দুনিয়ার সামান্য কিছু প্রাপ্তির জন্য আখিরাতকে বেচে দিই। অথচ আখিরাতের হিসাব বড়ই কঠিন-
وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى )
মানুষ যতটুকু কর্ম করবে তার চেয়ে বেশি কিছুই পাবে না।[২]
কিন্তু বাস্তবে আখিরাতের চিন্তা না করে আমরা উল্টো পথে রিযিকের জন্যে ছুটছি।
অকারণ দুশ্চিন্তা
অর্থহীন দুই ভাইয়ের গল্প বলি। বড় ভাইটি হঠাৎ মারা যায়। মৃত্যুর সময় রেখে যায় পাঁচ সন্তান। তার তেমন কোনো ধন-সম্পদ ছিল না। বড় ভাই মারা যাওয়ায় তার সন্তানদের দেখভালের দায়িত্ব ছোট ভাইয়ের ওপর বর্তায়। সে দুশ্চিন্তায় কাঁদতে শুরু করে। এক শাইখের সাথে তার পরিচয় ছিল। শাইখ তাকে এ অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার! কাঁদছো কেন?' উত্তরে সে বলল, 'আমার ভাই মারা গেছে। তার পাঁচটা সন্তানের দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। অথচ ওদের খরচ বহনের কোনো ব্যবস্থা রেখে যায়নি সে।'
-সে কি কিছুই রেখে যায়নি?
-হ্যাঁ, সামান্য কিছু সম্পদ রেখে গেছে। ওগুলো দিয়ে বছর দুয়েকের মতো তাদের খরচ চলবে।
-বেশ তো! যখন এই বছর দুয়েকের খরচা শেষ হবে তখন আবার কান্না শুরু কোরো। এখন নাহয় নিশ্চিন্তে থাকো।
পরে দেখা গেল, এক বছর শেষ হওয়ার তিন মাস আগেই লোকটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
আমার পরিচিত এক লোক ছিলেন। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে একবার তার বাড়িটি ভেঙে ফেলার ফরমান আসে। এর পরিবর্তে অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে তাকে উপযুক্ত আরেকটি বাড়ি প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তারপরও বাড়িভাঙার খবর শুনেই সে ভেঙে পড়ে। দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা আর দুঃখে তার মন খানখান হয়ে যায়। পরবর্তীতে জানা গেল, সেই বাড়িটি ভাঙার পূর্বেই লোকটা মারা গেছে। তাহলে ভবিষ্যৎ নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করে কী লাভ হলো? অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কোনো মানেই হয় না।
রিযিক যেভাবে আসে
আপনি কি দৈনিক খানাপিনা করাকেই একমাত্র রিযিক ভেবে বসে আছেন? নিঃসন্দেহে এটা রিযিক। কিন্তু রিযিক তো কেবল এতটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রিযিক দু-প্রকার। দেহের রিযিক ও আত্মার খোরাক। তিনি স্বীয় করুণায় আপনার মুখে খাবার তুলে দিয়ে আপনার দেহকে সতেজ রাখেন। আবার তিনিই প্রিয় বান্দাদের অন্তরে বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের বোধ ঢেলে দিয়ে খোরাক জোগান আত্মার।
ধনীকে দেন সম্পদের প্রাচুর্য, আর গরিবকে দেন রিযিকদাতার সামনে মিনতি করার সুযোগ। বস্তুগত সম্পদ না পেলেও আল্লাহ তাকে দান করেন আত্মিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি, আল্লাহর ফয়সালায় সবর ও সন্তুষ্টির পরম প্রাপ্তি। তুলনা করলে দেখা যাবে তারা দুজন প্রায় সমান। একজনের রয়েছে বস্তুগত সমৃদ্ধি; কিন্তু সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ঝক্কি, মানসিক অশান্তি। আরেক জনের বস্তুগত সংকট; কিন্তু হৃদয় ও আত্মার জগতে সে বাদশাহ।
অফুরন্ত ভান্ডার
বান্দা যখন আল্লাহর কাছে রিযিক প্রত্যাশা করে তখন আল্লাহ তাকে রিযিক প্রদান করেন। হয়তো রাস্তা দিয়ে চলতে ফিরতে বেকার কেউ চাকরির সন্ধান পেয়ে যেতে পারে। আপনার আশপাশে তাকালে এমন হাজারটা দৃষ্টান্ত পাবেন। বিখ্যাত বুযুর্গ হাতিম আসাম রাহিমাহুল্লাহর কাছে এক লোক এসে জিজ্ঞেস করে, 'আপনার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয় কোথা থেকে?' হাতিম আসাম রাহিমাহুল্লাহ উত্তর দেন, 'আল্লাহর খাদ্যভান্ডার থেকে।' লোকটি একট চটে গিয়ে বলে, 'আল্লাহ কি আসমান থেকে আপনার ওপর রুটি ফেলে দেন? তা না হলে এই কথার অর্থ কী?'
হাতিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'যদি জমিন না থাকত তাহলে আল্লাহ অবশ্যই বান্দার কোলে রুটি ফেলতেন। কিন্তু যেহেতু জমিন সৃষ্টি করেছেন, তাই তিনি এই জমিন থেকেই আমার রিযিকের ব্যবস্থা করেন।'
আপনি যখন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবেন আল্লাহই একমাত্র রিযিকদাতা, মহান শক্তিধর, তখন অবশ্যই সব কাজে আপনি আল্লাহকে স্মরণ করবেন আলাদা আলাদাভাবে। রোগ-ব্যাধি ভালো হয়ে গেলে আপনি নিশ্চয় বলবেন, আল্লাহই আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আপনি তখন এর-ওর পেছনে দৌড়াবেন না। আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে প্রয়োজন ব্যক্ত করবেন না।
জনৈক ইবাদতগুজার ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'আপনার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয় কোথা থেকে?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি এমন এক মালিকের ভান্ডার থেকে খাবার পাই, যার ভান্ডারে কখনো কোনো চোর-ডাকাত ঢুকতে পারে না, পোকামাকড়ও খেয়ে নষ্ট করতে পারে না।'
আল্লাহর ধনভান্ডার সর্বদা উন্মুক্ত; কারো জন্য তা রুদ্ধ নয়। তাঁর ভান্ডার সর্বদা পরিপূর্ণ; কখনো তাতে ঘাটতি হয় না। ছোট-বড় সকল বস্তু রয়েছে সেখানে। আল্লাহ বলেন-
وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا عِندَنَا خَزَابِنُهُ وَمَا نُنَزِّلُهُ إِلَّا بِقَدَرٍ مَّعْلُومٍ
আমার নিকটেই রয়েছে প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার এবং আমি তা পরিজ্ঞাত পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি।১১
টমাস রবার্ট ম্যালথাসের তত্ত্ব
পৃথিবীর ইতিহাসে জনসংখ্যাবৃদ্ধির তত্ত্ব ইসলামের মানদণ্ডে বাতিল। এই তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টমাস রবার্ট ম্যালথাস। তাঁর ধারণা ছিল, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে খাদ্য উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় থাকবে না; যা নিশ্চিত দুর্ভিক্ষ ডেকে আনবে এবং খাদ্য না পেয়ে বাড়তি জনসংখ্যা বিলীন হয়ে যাবে।
আসলে এমন কথা কেবল সেসব লোকই বলতে পারে, যারা আল্লাহর কুদরত উপলব্ধি করতে অক্ষম।
আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সংকোচন, সংকট বা দুর্ভিক্ষ এলে তা মানুষের পরীক্ষা, শাস্তি কিংবা সংশোধনের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। মানুষ যখন কোনো কিছুতে সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন সে অক্ষমতার কারণেই সংকটে পতিত হয়। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে সংকট এলে তা অক্ষমতার কারণে হতে পারে না। তিনি সংশোধনের উদ্দেশ্যে শাস্তি দেওয়ার জন্য কিংবা পরীক্ষা নিতে এমনটি করে থাকেন।
জনৈক নেককার ব্যক্তির স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনার স্বামী আপনাকে কী পরিমাণ ভরণ-পোষণ দেয়?' তখন সে উত্তর দিলো, 'তিনি আমাকে কিছুই দেন না; কেবল ওজন করেন।' অর্থাৎ, দাতা তো একমাত্র আল্লাহ, স্বামী কেবল পরিমাপ করে পৌঁছে দেন।
একবার আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় পেয়ে গেলে দুনিয়ার কোনো কিছু হারানোর ব্যথা আপনাকে পর্যুদস্ত করতে পারবে না। কখনো যদি কোনো কিছু হাতছাড়া হওয়ায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন, তাহলে বুঝে নেবেন আপনি আসলে আল্লাহকেই এখনো চিনতে পারেননি। যে আল্লাহর পরিচয় পেয়েছে, যে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে গেছে, সে ব্যথিত হলেও তা তাকে আফসোসের দিকে ঠেলে দেয় না। কত মানুষ জমি বিক্রি করে দেওয়ার কিছুদিন পর জমির দাম হয়ে যায় দ্বিগুণ। তখন সে হা-হুতাশ শুরু করে দেয়, অস্থির হয়ে ওঠে। হায়! জমিটুকু যদি আজ থাকত, তাহলে আমার কপাল খুলে যেত!
বর্তমানের যা কিছু জটিল রোগ, তার অধিকাংশই আসে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অনুতাপ, উৎকণ্ঠা এবং মনস্তাত্বিক কারণে।
প্রার্থনা কেবল তাঁরই কাছে
একবার জনৈক উমাইয়া খলিফা কিছু উপহার দেওয়ার জন্যে একজন বড় আলিমকে তলব করলেন। খলিফা মসজিদে বসে ছিলেন। আলিম তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। খলিফা বললেন, 'আপনার প্রয়োজন ব্যক্ত করুন।' আলিম উত্তর দিলেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে আমি চাই না। তাঁরই ঘরে বসে তিনি ছাড়া অন্য কারো কাছে চাইতে আমি লজ্জাবোধ করি।'
তারপর মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরে খলিফা আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'এবার আপনার প্রয়োজন পেশ করুন।' আলিম আরো শক্ত জবাব দিয়ে বললেন, 'যিনি মালিক তাঁর কাছেই তো চাইলাম না; তাহলে যে মালিক নয় তার কাছে কী করে চাইব?'
খলিফা খুবই পীড়াপীড়ি করলেন। উপায় না দেখে আলিম বললেন, 'আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই।' খলিফা বললেন, 'সে ক্ষমতা আমার নেই। আলিম উত্তর দিলেন, তাহলে আপনার কাছে আমার কোনো প্রয়োজনও নেই।'[১]
এটা একজন মুমিনের আত্মমর্যাদাবোধের দাবি। অভাবী নিজ প্রয়োজন কারো কাছে ব্যক্ত করা থেকে বিরত থাকলে সেটাই উত্তম।
এক মনীষী বলেছেন, 'যেমনিভাবে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তেমনি আল্লাহ ছাড়া কোনো রিযিকদাতাও নেই। তিনি যখন দান করেন, অকাতরে দান করেন। এত বেশি দেন যে, বান্দা অবাক না হয়ে পারে না।'
আপনি দেখবেন কত মেধাবী, বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান লোক আছে, তাদের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা খুবই সামান্য। আবার কত বোকা, অবিবেচক লোককেও দেখবেন, তাদের প্রাচুর্যের কোনো অভাব নেই। এর থেকে বোঝা যায় যে, মেধা-বুদ্ধি, ব্যবস্থাপনা ও দৌড়ঝাঁপের সাথে রিযিকের মৌলিক কোনো সম্পর্ক নেই। অবশ্য আল্লাহর পথে অটল-অবিচল থাকা, তাঁর আনুগত্য করা-এগুলো আল্লাহর রহমত বর্ষণ করে। কিন্তু রিযিকের মূল হিসাব আল্লাহর ব্যবস্থাপনার সাথে। তাই দেখা যায়, অনেক নেককার মুমিন কষ্টে জীবনযাপন করলেও কাফির মুশরিকদের প্রাচুর্যের অভাব হয় না। এর দ্বারা তিনি মুমিনদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, তাদের পরীক্ষা নেন।
মহামহিম আল্লাহ বলেন-
وَأَن لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاءٌ غَدَقًا )
তারা যদি সত্যপথে প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাহলে আমি তাদেরকে অবিরল ধারায় পানি বর্ষণের দ্বারা সমৃদ্ধ করতাম [১]
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ )
যদি সেইসব জনপদের লোকজন ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল; সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি [২]
পাপের শাস্তিস্বরূপ কখনো কখনো মানুষের রিযিক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ধরা যাক, আপনার দুটি ছেলে। একজন খুবই ভদ্র। টাকা-পয়সা কখনো অপচয় করে না। বড়দের সম্মান করে চলে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। ঠিকমতো পড়াশোনা করে। আরেক ছেলে ভীষণ অভদ্র। পড়াশোনা তো করেই না, বরং নানারকম অনৈতিক কাজকর্ম এবং নিষিদ্ধ স্থানে যাওয়া-আসা করা তার বহুদিনের অভ্যাস। এখন দুই ছেলেকে টাকা-পয়সা কিংবা হাতখরচ দেওয়ার সময় আপনি কি সমান-সমান দেবেন? কখনোই না। অভদ্র ছেলেটিকে আপনি শুধু গাড়িভাড়া দিয়েই ক্ষান্ত থাকবেন, যেটা না দিলেই নয়। কারণ তার হাতে অতিরিক্ত টাকা-পয়সা থাকা মানেই তা কোনো অনৈতিক ও নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে ব্যয় হওয়া। কিন্তু যে ছেলেটি ভদ্র তাকে আপনি প্রয়োজনের চেয়েও বেশি টাকা দিয়ে রাখবেন। হয়তো তাকে এক্ষেত্রে স্বাধীনতাও দিয়ে রাখবেন, 'বাবা! তোমার যখন যা প্রয়োজন পড়ে, এটা দিয়ে কিনে নিয়ো।' আপনি জানেন, সে আপনার পক্ষ থেকে স্বাধীনতা, টাকা-পয়সা পাওয়ার পরও কোনো অনৈতিক কাজে জড়াবে না। ঠিক একইভাবে আল্লাহ তাআলাও কখনো কখনো পাপিষ্ঠ ও অন্যায় ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত ব্যক্তির রিযিক সংকুচিত করে দেন, যেন সে তার অন্যায়-অপরাধে একেবারে বেপরোয়া হয়ে না পড়ে। কারণ আল্লাহ যদি তার প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের রশি টেনে না ধরেন, তাহলে সে অবাধ্যতা ও উগ্রতায় সীমা ছাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ খুব চমৎকারভাবে সত্য প্রকাশ করে বলেছেন-
۞ وَلَوْ بَسَطَ اللَّهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهِ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ وَلَكِن يُنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَّا يَشَاءُ إِنَّهُ بِعِبَادِهِ خَبِيرٌ بَصِيرٌ ۞
আল্লাহ তাঁর সকল বান্দাকে প্রাচুর্য দিলে, নিশ্চয় তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছামতোই নাযিল করে থাকেন। তিনি বান্দাদের ব্যাপারে সম্যক অবগত [১]
আপনার কোনো এক দ্বীনি ভাই, যার সাথে আপনার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। ভালোবাসার আতিশয্যে আপনি তাকে বলে ফেললেন, 'কোনো প্রয়োজনে শুধু আমাকে জানাবে; যা দরকার হয় আমার কাছ থেকেই নেবে; অন্য কাউকে বলবে না।' আপনার প্রিয় ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব অন্য কারো সামনে অবনত হোক তা আপনি পছন্দ করেন না। তাহলে ভেবে দেখুন, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে সীমাহীন ভালোবাসেন, সেখানে তিনি কীভাবে তাঁর বান্দার অন্য কারো কাছে নত হওয়া পছন্দ করবেন? তিনি আমাদের অনেক বেশি ভালোবাসেন বলেই অন্য কারো কাছে প্রয়োজন ব্যক্ত করতে নিষেধ করেছেন।
কিছুদিন আগে সদ্য-পাশ-করা একজন ডাক্তার আমাকে একটি কাহিনি শোনালো। সে তখন ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ করে একটি চেম্বার খুলেছে মাত্র। কিন্তু পরিচিতি বেশি না থাকায় রোগী তেমন একটা আসত না। একবার তার মায়ের চিকিৎসার জন্য মোটা অঙ্কের টাকার প্রয়োজন দেখা দিলো। মা তখন দামেশকে চিকিৎসাধীন। অথচ তার চেম্বার অন্য একটি শহরে। মায়ের চিকিৎসার জন্য যত টাকার প্রয়োজন সেই পরিমাণটা উল্লেখ করে সে আল্লাহর কাছে আকুলভাবে দুআ করল। ঠিক তার পরদিনই তার চেম্বারে রোগীদের ভিড় লেগে গেল। আর সেদিনই সম্পূর্ণ টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল!
আপনার কাছে কারো পাওনা রয়েছে, কিন্তু আপনার পরিশোধের মতো সামর্থ্য নেই; আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! আমার কাছে নেই; তুমিই পরিশোধ করে দাও।' এভাবে আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নেওয়ার অভ্যাস করুন।
আপনার স্ত্রী কঠোর সুভাবের। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! তাকে নরম ও কোমল স্বভাবের বানিয়ে দাও।' আপনার সহকর্মী বা ব্যাবসায়িক পার্টনার কুটিল ও বদমেজাজি। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! তার মনকে সোজা করে দাও; কোমল বানিয়ে দাও।' আপনার সন্তান একরোখা, রগচটা; কারো কথায়ই কর্ণপাত করে না। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে সুমতি দান করো। তার চরিত্র মার্জিত করে দাও।'
আপনি যখন আপনার প্রয়োজন সরাসরি আল্লাহর কাছে চাইবেন, অন্য কারো কাছে ব্যক্ত করবেন না, তখন আল্লাহ তাআলা সরাসরি আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করে দেবেন। আর যখন অন্য কারো কাছে চাইবেন, তখন কারো মাধ্যমে আল্লাহ আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন। আপনি যার কাছে চাইবেন হয়তো আল্লাহ তাআলা তার মনকে আপনার জন্য নরম করে দেবেন। সে দয়াপরবশ হয়ে আপনার চাওয়া পূরণ করবে।
হাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ নামে এক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মানুষের বিপদাপদে পাশে দাঁড়াতেন। সাধ্যমতো দান-সাদাকা ও উপকার করার চেষ্টা করতেন। তার পাশের বাড়িতে থাকতেন এক বিধবা নারী। সাথে কয়েকটা এতিম সন্তান। একরাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। মহিলাটি তখন আল্লাহর কাছে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! হে পরম করুণাময়! আপনি আমাদের অভাব-অনটন দূর করে দিন। আমাদের আর্থিক সচ্ছলতা দান করুন।' পাশের বাড়ি থেকে হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ শুনতে পেলেন বিধবার এই উচ্চৈঃস্বরের দুআ। দুঃখে ভরে উঠল তার মন। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর তিনি দশটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে সেই প্রতিবেশীর ঘরে কড়া নাড়লেন। স্বর্ণমুদ্রার থলেটি মহিলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'এটা রেখে দিন। আপনার প্রয়োজনের সময় কাজে লাগবে।'
থলেটি সে গ্রহণ করলেও তার পাশে বসে থাকা ছোট কন্যা রীতিমতো চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করল। আল্লাহ ও বান্দার মাঝের গোপন বিষয় বাইরের মানুষ জেনে যাওয়াতে এই সাহায্য এসেছে-এটা তার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল।[১] বান্দার করুণার পাত্র হওয়ার চেয়ে আল্লাহর কাছে করুণা ভিক্ষা করাই যে মুমিনের কাছে সবচেয়ে প্রিয়!
যারা প্রকৃত মুমিন তারা তাদের সকল ব্যথা-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট আল্লাহর কাছেই পেশ করে। দেখুন আল্লাহর নবি ইয়াকুব আলাইহিস সালামের আকুতি-
إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ )
আমি তো আমার দুঃখ ও বেদনা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি। আর আমি আল্লাহর নিকট থেকে যা জানি তোমরা তা জানো না [১]
আল্লাহর কাছে চাওয়ার পর যদি তাৎক্ষণিক আপনার চাওয়া পূরণ না হয়, এতে হতাশ হবেন না। অনেক সময় আল্লাহ না দিয়ে পরীক্ষা করেন। বান্দার অন্তরে আল্লাহর জন্য কতটুকু জায়গা রয়েছে তা তিনি যাচাই করে দেখেন। দুনিয়াবি কত কাজে মানুষ একটু সুখের জন্য কত অসহনীয় কষ্ট সহ্য করে। তাহলে আখিরাতের বিশাল প্রাপ্তির সামনে ক্ষণিকের না পাওয়া কি সহনীয় হতে পারে না?
একবার একটি ব্যাংকের সামনে জনতার ভিড় দেখলাম; পাঁচশোর মতো লোক দীর্ঘ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচণ্ড গরম, সময় দুপুর আড়াইটা। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'ভাই, কী হয়েছে এখানে?'
উত্তর এলো, 'সন্ধ্যা ছটায় গাড়ি রিজার্ভেশনের রেজিস্ট্রি হবে।'
সন্ধ্যা ছটায় রেজিস্ট্রি। আর এই তীব্র গরমের মধ্যে তারা দাঁড়িয়ে আছে দুপুর আড়াইটা থেকে! দুনিয়ার জন্য মানুষ কত কষ্টই না করে!
আরেক ভদ্রলোক আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়েছেন। আমি যতদূর জানি, তিনি যথেষ্ট গণ্যমান্য ও গুরুত্বসম্পন্ন এক ব্যক্তি। সবসময় হারাম বস্তু থেকে নিজের দৃষ্টি হিফাজত করে চলেন। একবার কোনো একটা সেমিনারে যোগ দেওয়ার জন্য ইউরোপ গমন করেন তিনি। সাইপ্রাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লার্নাকায় সুইডিশ বিমান থেকে হঠাৎ অনেকগুলো মেয়েকে একসাথে নামতে দেখলেন। তাদের পরনে ছোট ইউনিফর্ম। তিনি তার দৃষ্টির হিফাজত করতে পারলেন না সেদিন। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। এরপর একটি ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছে গেলেন গন্তব্যে। ভাড়া পরিশোধের সময় ভিনদেশি মুদ্রা দিতে গেলে ড্রাইভার তাকে থানায় নিয়ে গেল। থানায় ঢুকে ড্রাইভারটি পুলিশ অফিসারের সাথে কী যেন বলল। অমনি দুজন পুলিশ কর্মকর্তা এসে ভদ্রলোকটিকে গ্রেফতার করে ফেলল। আটকে রাখল একটি ছোট্ট খাঁচার মতো কক্ষে।
এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্যে তিনি তার দৃষ্টির খিয়ানতকেই দায়ী মনে করলেন। নিজেকে ধিক্কার দিলেন, এই বিপদ তার পাপের শাস্তি ছাড়া আর কিছুই নয়!
একবার রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, দামি পোশাক পরিহিত কেতাদুরস্ত এক লোক কী যেন ট্রাফিক জটিলতায় পুলিশের সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করছে। একটু পরে আরেকজন পুলিশ অফিসার এলো। এসেই লোকটার দুই গালে সজোরে দুটি চড় বসিয়ে দিলো। আমি একেবারে থ হয়ে গেলাম।
আল্লাহ কতভাবেই না মানুষকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন! কাউকে এমনিতেই মাফ করে দেন। আবার কাউকে জনসম্মুখে লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।
অনেক মানুষ আছে, তারা আল্লাহর কাছে কেবল মূল্যবান বস্তুই প্রার্থনা করে- 'হে আল্লাহ! আমাকে জান্নাত দান করুন।' 'হে আল্লাহ! আমার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার পূর্বে আপনি আমাকে মৃত্যু দেবেন না।' 'হে আল্লাহ! আমাকে কুরআন বোঝার তাওফিক দিন' ইত্যাদি। এর বিপরীতে কিছু মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহর কাছে খুব সামান্য ও তুচ্ছ বস্তুও প্রার্থনা করে- 'হে আল্লাহ! এ মাসে ভাড়াটিয়া ঘর ছেড়ে দেবে। আপনি আমাকে নতুন ভাড়াটিয়ার ব্যবস্থা করে দিন।' প্রত্যেকেই প্রত্যেকের প্রয়োজন ও অন্তরের ঝোঁক অনুযায়ী একেক জিনিস আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে থাকে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেকে তার নিজ নিজ প্রয়োজন যেন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। লবণ ফুরিয়ে গেলে বা জুতার ফিতা ছিড়ে গেলেও যেন সে আল্লাহর কাছ থেকে তা চেয়ে নেয়।' [১]
যিনি আত্মার রিযিকদাতা
আল্লাহ তাআলা আমাদের দৈহিক প্রয়োজন মিটিয়ে দেন তা আমরা সবাই উপলব্ধি করি। খাদ্য, পানি এবং অন্যান্য বস্তু-সামগ্রী দিয়ে আল্লাহ তাআলা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজন মিটিয়ে দিচ্ছেন। ঠিক তেমনিভাবে প্রতিনিয়তই আমাদের রুহ ও আত্মার খোরাক দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখছেন। আমাদের কোনো অসংগতির কারণে তিনি যেমন কখনো কখনো রিযিক বন্ধ করে দেন, তেমনিভাবে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে কখনো কখনো আত্মার রিযিকও সংকুচিত করে দেন। যাদের অন্তর ও অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে তারা তা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু যারা আত্মভোলা, উদাসীন তারা এসবের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না।
আপনি সালাত পড়ছেন কিন্তু তাতে খুশু-খুযু, বিনয় ও নিবিষ্টতা আসছে না, তাহলে বুঝে নিন, আল্লাহ আপনার রুহ ও আত্মার খোরাক সংকুচিত করে দিয়েছেন। এক ভাই এসে বললেন, হিসাব-নিকাশে যত ধরনের ভুল-ভ্রান্তি হয়, সালাতে দাঁড়ালে সবকিছুর কথা মনে পড়ে। এর অর্থ হলো, হৃদয় এবং আল্লাহর মাঝে এক পর্দার আড়াল তৈরি হয়েছে। তাই তার মন আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট না হয়ে দুনিয়াবি চিন্তায় মজে থাকে।
আল্লাহ কেন আপনার রিযিক সংকুচিত করছেন, তার দুটি কারণ হতে পারে-
এক. আপনি কারো হক নষ্ট করেছেন; কিন্তু তাকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেননি।
আল্লাহ বলেন, 'যখন আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন, তার রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক তো আমাকে হীন করেছেন। না, কখনো নয়; বরং তোমরা ইয়াতিমকে সম্মান করো না এবং অভাবীদের খাদ্যদানে পরস্পরকে উৎসাহিত করো না। তোমরা উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য সম্পদ সম্পূর্ণরূপে ভক্ষণ করে ফেলো। তোমরা ধন-সম্পদ অতিশয় ভালোবাসো।[১]
অন্যকে বঞ্চিত করায় আপনার এবং আপনার রবের মাঝে বাধা তৈরি হয়েছে। প্রত্যেক পাপেরই কুফল রয়েছে। প্রত্যেক পাপই আল্লাহর সাথে সম্পর্কের পথে একেকটি বাধা।
দুই. মাঝে মাঝে এমন হয় যে, আপনি আল্লাহর পথেই বহাল আছেন। আল্লাহর হুকুমের অধীনেই আপনার জীবন পরিচালনা করছেন। তবুও আল্লাহ আপনার রিযিক সংকুচিত করছেন। এর কারণ, আল্লাহ আপনার পিপাসাকে তীব্র করে তুলছেন। আপনি একটি আমল করার কারণে আল্লাহর কাছে একটি স্তরে উপনীত হচ্ছেন। কিছুদিন পর এই আমলটি আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তখন আপনার স্তর যা ছিল তার চেয়ে আর উন্নত হচ্ছে না। আল্লাহ তাআলা চান আপনার স্তর আরো উন্নত হোক। তখন তিনি আপনার আত্মার রিযিক তথা প্রশান্তি, দীপ্তি এবং উপলব্ধির স্বাদ সংকুচিত করে দিচ্ছেন। এতে অস্থির হয়ে নতুন উদ্যমে, পূর্বের চেয়ে আরো বেশি আমলে মনোনিবেশ করছেন, আরো বেশি নিবিষ্টতার সাথে ইবাদত করতে শুরু করছেন। এতে আপনার যে মর্যাদা ছিল, আল্লাহ তাআলা তা আরো অনেক উন্নত করে দিচ্ছেন।
জীবনে বিভিন্ন কারণেই মানুষ খুশি হয়। আপনি যাচাই করে দেখুন-কার জন্য খুশি হচ্ছেন, আল্লাহর জন্য না দুনিয়ার জন্য?
খুশিতে আপনার চেহারা ঝলমল করছে, জ্বলজ্বল করে উঠেছে চোখের তারা। সহাস্য বদনে খুব উৎফুল্ল হয়ে নিজের খুশি প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। আগে চিন্তা করে দেখুন, কেন আপনি এত উৎফুল্ল। যদি এমন হয়, আল্লাহর সাথে আপনার বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, আপনি ইবাদতে খুব তৃপ্তি পেয়েছেন, জান্নাতের কোনো নিয়ামত আপনাকে পুলকিত করে তুলেছে-আর এসব কারণেই আপনি প্রচণ্ড খুশি হয়েছেন, তাহলে এটা নিশ্চয় আপনার ঈমানের নিদর্শন। যে খুশি আল্লাহর জন্য নিবেদিত তা নিশ্চয় ঈমানের আলামত।
আর যদি এমন হয়, আপনি ব্যবসায় মোটা অঙ্কের লাভ করেছেন বা নতুন কোনো উপার্জনের সন্ধান পেয়েছেন, তাই আপনি এত খুশি; তাহলে জেনে রাখুন, আপনার এই খুশি অন্য কিছুর বার্তা দিয়ে যায়। যে খুশি আল্লাহর জন্য নয়, তা কখনো সৌভাগ্যের লক্ষণ হতে পারে না।
দুনিয়া বা দুনিয়ার মানুষ যদি আপনার খুশির কারণ হয়, তাহলে আপনি দুনিয়াদার। আর আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ যদি আপনাকে খুশি করে, তাহলে আপনি ঈমানদার। ইমাম হাসান আল-বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'যখন তুমি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করো, আল্লাহর যিকির করো কিংবা নবিজির ওপর দরুদ পাঠ করো, কিন্তু কোনো স্বাদ বা তৃপ্তি অনুভব করতে পারো না; তাহলে জেনে রেখো, তোমার অন্তর পর্দা দ্বারা আবৃত। আল্লাহ আর তোমার মাঝে রয়েছে গাঢ় আচ্ছাদন।'
মহান আল্লাহ বলেন-
كَلَّا إِنَّهُمْ عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ (3)
কখনো না। সেদিন তারা তাদের পালনকর্তা থেকে পর্দার অন্তরালে থাকবে [১]
উল্লিখিত অন্তরাল তো আখিরাতের পর্দা। কিন্তু দুনিয়াতেও পর্দা রয়েছে। অন্তরের পর্দা; যা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরিতে বাধা প্রদান করে। আপনি যদি কখনো অন্তরে পর্দা অনুভব করেন, আপনার অন্তর আল্লাহর ব্যাপারে পাষাণ হয়ে যায়, তাহলে সাথে সাথেই সতর্ক হয়ে যান। খুঁজে বের করুন, কেন আপনার অন্তর আল্লাহর ব্যাপারে পাষাণ হয়ে গেল।
হয়তো আপনি আল্লাহর ব্যাপারে কোনো মন্দ ধারণা পোষণ করেন, তাঁর রাসুলের ব্যাপারে কোনো অবান্তর চিন্তা নিয়ে পড়ে আছেন। হয়তো আপনার অজান্তেই কোনো অনৈতিক বিশ্বাস জেঁকে বসেছে আপনার হৃদয়সত্তায়। কারণটা আবিষ্কার করে সাথে সাথেই তা দূর করার চেষ্টা করুন।
অন্তরের পর্দা কখনো পুরু হতে পারে, আবার কখনো পাতলাও হতে পারে। আপনার হৃদয়ের পর্দা যদি হয় মোটা, তবে নিঃসন্দেহে আপনার জটিলতা অনেক বেশি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, সূর্য উদিত হয়ে গেছে। আপনার ফজর সালাত কাযা হয়ে গেছে। তারপরও আপনার মনে কোনো অনুশোচনা জাগল না, তাহলে বুঝবেন, অবস্থা খুবই গুরুতর।
আর যদি অনুশোচনার তাপে আপনার মন পুড়ে যেতে চায়, আল্লাহর সামনে লজ্জায় আপনি সংকুচিত হয়ে যান এবং ব্যথায় আপনার হৃদয় কেঁদে ওঠে, তাহলে আপনি আপনার অন্তরের প্রহরায় থাকুন, যেন তা দুর্ভাগ্যের করাল গ্রাসে পরিণত না হয়।
দাউদ আত-তায়ি রাহিমাহুল্লাহ একজন মুত্তাকি ছিলেন। একবার এক লোক তার সাথে সাক্ষাতে আসে। তিনি তখন বেশ প্রসন্ন। লোকটি জিজ্ঞেস করে, যখনই আপনার কাছে আসি, আপনাকে সবসময় বিমর্ষ, চিন্তিত দেখি। কিন্তু আজ আপনি বেশ প্রফুল্ল!
দাউদ আত-তায়ি উত্তর দিলেন, গত রাতে আল্লাহ আমার তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। তাই আজকের দিনটি আমি ঈদের দিনের মতো খুশিতে যাপন করছি। লোকটি বলল, তাহলে আপনার ইফতার করার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি?
দাউদ আত-তায়ি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আমি এ খাবার চাই না। যে খাবার মানুষের হাতে হাতে আসে সে খাবার এবং যে খাবার হৃদয়ের তৃষ্ণা মিটায়-এ দুয়ের মাঝে অনেক ব্যবধান।
অর্থাৎ খাবারও দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটা বস্তুগত খাবার, যা ভক্ষণ করা যায়। আরেকটা হলো আত্মিক খাবার, যা হৃদয়ে দীপ্তির ঝলক বিচ্ছুরিত করে।
আল্লাহর স্মরণে সীমাহীন সুখ
মানুষ যদি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুতে সুখ ও সাফল্য খোঁজে, তবে তা কঠিন বিপদ ডেকে আনে। আল্লাহ সত্য, তিনি সত্য সংবাদই প্রদান করেন। আল্লাহই ঘোষণা দিচ্ছেন-
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا
যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে, অবশ্যই তার জীবনযাপন হবে সংকুচিত এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো ছিলাম চক্ষুষ্মান [১]
তখন আল্লাহ উত্তরে বলেন-
قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنسَى )
এভাবেই আমার নিদর্শনাবলি তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। তাই আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হলো।
অতএব, সবসময় আল্লাহকে স্মরণ রাখুন। সুখ খুঁজে নিন তাঁর আনুগত্যে। সৌভাগ্য অর্জন করুন তাঁরই নৈকট্যে।
আর-রাযযাকের পরশে
তিনি আপনার জন্য যা ভালোবেসেছেন, তা-ই আপনাকে দান করেছেন। অতএব, তার বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকুন। যে বাবা-মায়ের ঔরসে তিনি আপনার অস্তিত্ব দান করেছেন, সন্তুষ্ট থাকুন তাদের নিয়ে। আপনার জন্য যেমন বাবা-মা প্রয়োজন ছিল, ঠিক তেমনই তিনি আপনাকে দিয়েছেন।
আপনার বন্ধুর বাবা সন্তানকে খুব আদর করে, তার মনটা খুব কোমল, সে অনেক উন্নত চরিত্রের অধিকারী; আর আপনার বাবা কর্কশ, বদমেজাজি। বন্ধুর বাবা উচ্চশিক্ষিত, সম্পদশালী, বড় পদমর্যাদার অধিকারী; আর আপনার বাবা মূর্খ, হতদরিদ্র-এসব চিন্তা করে কখনো মন খারাপ করবেন না। কারণ, মহান আল্লাহ তাঁর শাশ্বত প্রজ্ঞা ও অসীম জ্ঞানের আলোকেই তাদেরকে আপনার জন্য নির্বাচন করেছেন। অতএব, তাদেরকে সৌভাগ্য মনে করুন। আল্লাহর জন্য হলেও তাদের ভালোবাসুন।
ঠিক একইভাবে আপনার দৈহিক গঠন, রূপ-সৌন্দর্য এবং শারীরিক আকৃতির ব্যাপারেও আল্লাহর পছন্দে খুশি থাকুন। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর অভিযোগ করে, সে সত্যিকার মুমিন হতে পারে না। পিতা, মাতা, দৈহিক আকার-আকৃতি, স্ত্রী-পরিজন, ঘর-বাড়ি, ধন-সম্পদ সবকিছুর ক্ষেত্রেই আল্লাহ আপনার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন। এতে আপনি যে আত্মিক প্রশান্তি পাবেন তা অন্য কোথাও কল্পনা করাও সম্ভব নয়। অমুসলিম, অবিশ্বাসী মানুষগুলো সারা জীবন অস্থিরতা ও জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্যেই দিন কাটায়। স্ত্রী মনমতো না হলে, হতাশ হয়ে পড়ে। কোনোকিছুতেই তার জীবনের দুঃখ আর ঘোচে না। কিন্তু মুমিন আল্লাহর পছন্দে খুশি হয়, তাই সে সহজে হতাশ হয় না। আপনার স্ত্রী যদি আপনার মনমতো না-ও হয়, তবুও বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ তাআলা তার মাঝেই আপনার কল্যাণ রেখেছেন। তাকে নিয়েই খুশি থাকুন সবসময়।
এক লোকের বদমেজাজি স্ত্রী ছিল। তার বন্ধুরা পরামর্শ দিলো, বউকে তালাক দিয়ে দাও। কিন্তু সে উত্তরে বলল, আমি তাকে তালাক দিয়ে অন্য কোনো মুসলিম ভাইকে ধোঁকা দিতে পারব না। অর্থাৎ সে আল্লাহর ফয়সালায় খুশি ছিল। তার কাছে স্ত্রীর যতটুকু সমস্যা ছিল, সেটাকে সে অন্য মুসলিম ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা ভালো মনে করেনি।
সার কথা, আপনি সদা সর্বদা আল্লাহর ফয়সালা ও বণ্টনে খুশি থাকুন। আল্লাহর সান্নিধ্যেই সৌভাগ্য অর্জন করুন। আর-রাযযাক আপনাকে যে রিযিক দিয়েছেন, তাতে তৃপ্ত হোন। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা আপনার হাতে যে সম্পদ দিয়েছেন, তাকে আমানত মনে করুন। তা আপনার মালিকানা নয়; আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কাছে রাখা আমানত। অতএব, তা খরচের পদ্ধতি ও খাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ীই খরচ করুন। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন-
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا
যখন তারা ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং এ দুয়ের মাঝে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে।[১]
টিকাঃ
[১] সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৬০
[২] আল-মাজালিস, দাইনুরি : ১৩৫৩; বুগইয়াতুত তলিব, খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা : ৩৪২৯
[৩] সুরা ত-হা, আয়াত: ১৩২
[৪] সালাত আদায় হয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর নিকট তা কবুল হওয়া এক নয়। খুশু-খুযুবিহীন সালাত আদায় হয়ে গেলেও আল্লাহর নিকট তা কবুল হয় না—এই হিসেবে খুশু-খুযুকে সালাতের ফরয তথা অত্যাবশ্যক বলা হয়েছে।
[১] সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২
[২] সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪৩
[৩] সুরা কাসাস, আয়াত: ২৪
[১] সূরা রুম, আয়াত: ৪০
[২] সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩১
[১] সুরা যারিয়াত, আয়াত: ২২-২৩
[২] সুরা নাজম, আয়াত: ৩৯
[১] সুরা হিজর, আয়াত: ২১
[১] মুজালাসা ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮৪
[১] সুরা জিন, আয়াত: ১৬
[২] সুরা আরাফ, আয়াত: ৯৬
[১] সুরা শুরা, আয়াত: ২৭
[১] আলফু কিসসাহ: ৮৬৮
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৬
[১] জামি তিরমিজি: ৩৬০৪
[১] সুরা ফজর, আয়াত: ১৬-২০
[১] সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৫
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ১২৪-১২৫
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ১২৬
[১] সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৭
📄 আল-খাবির : সর্বজ্ঞ, মহাবিজ্ঞ, পরিজ্ঞাত
ছোট্ট শিশুর দাঁত তুলতে হবে। দন্ত-চিকিৎসক সবটুকু কৌশল ব্যয় করে আলতোভাবে দাঁত তোলার চেষ্টা করে যায়। শিশুটি যেন ব্যথা না পায় সেজন্য তার সাথে মজার মজার কথা বলতে থাকে। তবুও কি পারে বাচ্চাটিকে ভুলিয়ে রাখতে? হয়তো দাঁত উপড়ে ফেলার অসহনীয় যন্ত্রণা অথবা চেতনানাশক ইঞ্জেকশন পুশ করার নিদারুণ কষ্ট—দুটির কোনো একটি বাচ্চাটিকে কাঁদিয়েই ছাড়ে! কিন্তু আল্লাহ যখন এই শিশুটির দুধদাঁত পরিবর্তন করতে চান, কোনো রকম কষ্ট ছাড়াই দাঁতের গোড়া নড়বড়ে করে দেন। মজার খেলনার মতো বাচ্চা নিজেই দাঁতটি তুলে ফেলে। কোনো ব্যথা-বেদনা ছাড়াই পড়ে যায় সেই দাঁত। যিনি অতি আদর করে এমন আলতোভাবে সোনামণির দাঁত তুলে দেন তিনিই আল-খাবির; মহাবিজ্ঞ রব।
আল-খাবির এমন সত্তা যিনি সবকিছু জানেন; কোনো কিছুই তাঁর অবগতির বাইরে থাকতে পারে না। সকল বিষয়ের মূল উপাদান, স্বভাব-প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্যাবলি এবং সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর তত্ত্ব ও তথ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত তিনি। কোনো লুকায়িত ব্যাপার তাঁর কাছে অস্পষ্ট থাকে না। রোগ এবং রোগের চিকিৎসাও তিনি জানেন। সকল বস্তুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। চর্মচোখে আমরা যা কিছু দেখতে পাই বা না পাই, তিনি তার সবকিছুই দেখেন। ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ এবং অন্তরের মধ্যে লুকায়িত কোনো খবরও যার কাছে অস্পষ্ট থাকে না তিনি আল-খাবির’। পৃথিবী ও মহাবিশ্বের কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টির অগোচরে ঘটতে পারে না। ক্ষুদ্রকায় একটি পিপীলিকাও তাঁর অবগতির বাইরে চলাফেরা করতে পারে না, গর্তে আশ্রয় নিতে পারে না। বিপদাপদে কেউ অস্থির হয়ে উঠুক, পিপাসায় ছটফট করুক কিংবা শান্ত-প্রশান্ত থাকুক, তার খবরও তিনি রাখেন।
কেউ ভাবতে পারেন এগুলো তো আল-আলিম, মহাপরিজ্ঞাত সত্তার বৈশিষ্ট্য। আল-খাবিরের সাথে এসবের কী সম্পর্ক? কিন্তু বাস্তবে আলিম এবং খাবিরের মাঝে বিস্তর ফারাক।
আমি সবার সামনে একটি গ্লাস উঠিয়ে অন্য জায়গায় রাখলাম। আপনি দেখলেন, আমি গ্লাস উঠিয়ে রেখেছি। তাহলে এ ব্যাপারে আপনার অবগতি রয়েছে। আপনি বিষয়টি জেনেছেন। কিন্তু আমি কেন গ্লাসটি উঠিয়েছি, কেনই বা তা সরিয়ে অন্য কোথাও রেখেছি-সে ব্যাপারে, আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনি কিছুই বলতে পারবেন না।
কিন্তু আল-খাবির হলেন সেই সত্তা যিনি বাহ্যিক অবগতির সাথে সাথে তার অভ্যন্তরীণ রহস্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সমানভাবে অবগত।
মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন-
... وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ))
তোমরা যা করো, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সম্যক অবহিত [১]
আপনি কৌশল করে অসৎ উদ্দেশ্যে একটি কাজ করলেন। পৃথিবীর কেউ জানল না আপনার মনের অভিপ্রায়। সকলে ভাবল আপনি বেশ ভালো একটি কাজ করেছেন। অথবা প্রকাশ্যে আপনি কাউকে অভিনন্দন জানালেন অথচ ভেতরে ভেতরে আপনি তাকে প্রচণ্ড রকম ঘৃণা করেন। কখনো কারো সামনে আপনি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন, অথচ আপনার অন্তর্জগৎ তার প্রতি বিদ্বেষে ভরপুর। বাইরের পৃথিবীর কেউ জানে না আপনার আসল পরিচয়। কিন্তু আপনার অন্তরের অতলান্তের ঐ সংবাদটুকুও যিনি জানেন তিনি আল-আলিম (সম্যক অবগত) হওয়ার পাশাপাশি আল-খাবির তথা মহাবিজ্ঞ।
কারো বাসায় তার স্ত্রীর বান্ধবী বেড়াতে এলো। স্ত্রীর সাথেই সে বসল। তখন স্বামী খুব বিনয়ের সাথে বলল, 'তোমরা এখানে এসো। এই ঘরটি বেশ উন্ন; এখানে দারুণ সময় কাটবে তোমাদের।' এখন খেয়াল করে দেখুন। স্বামী যে আবেদন করেছে সেটাই কি বাস্তব নাকি 'ডাল মে কুচ কালা হ্যায়'? বাস্তবেই সে কি অতিথির সমাদর করতে চায়? না তার অন্তরে জেগে ওঠা কোনো কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে চায়? অতিথি বুঝবে না; স্ত্রীও বুঝবে না। কিন্তু প্রতিটি কাজের ভেতর-বাহির, হেতু, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট এবং খুঁটিনাটি সব বিষয়ে যিনি অবগত তিনি আল-খাবির।
আপনি প্রায়ই অনেক বিপদগ্রস্ত লোক দেখতে পাবেন, যারা সমাজে অত্যন্ত নেককার হিসেবে পরিচিত। আপনার অজান্তেই আপনার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে, এত ভালো মানুষটির এমন বিপদ কীভাবে হলো? কিন্তু আপনি তার আসল রহস্য জানেন না। ভালো মানুষটিরও কেন বিপদ হবে? তাকেও কেন মসিবত গ্রাস করবে, তা আপনি জানতে পারেন না, কিন্তু আল্লাহ জানেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপন করুণায় কোনো মহৎ উদ্দেশ্যেই তাকে বিপদ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা যেহেতু আপনার সবকিছুর সম্পর্কে সম্যক অবহিত; কল্যাণ-অকল্যাণ, ভালো-মন্দ এবং আপনার বর্তমান-ভবিষ্যতের ব্যাপারেও অবগত, তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে যদি কোনো মসিবত নেমে আসে, তাতে কখনো বিচলিত হবেন না। কে জানে এই সাময়িক বিপদের সেতু পার হলেই সামনে রয়েছে সৌভাগ্যের সবুজ বাগান! কত মানুষ আছে ঘর থেকে নিয়ে মসজিদ পর্যন্ত; নির্জনতা থেকে লোকালয় আর বাজার-ঘাট পর্যন্ত সবার মুখে মুখে তার প্রশংসা। আপাদমস্তক নেককার একজন মানুষ। মহান আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে অঢেল সম্পদও দান করেছেন তাকে। কিন্তু কেউ কি জানে, তার এই সৌভাগ্যের স্থায়িত্ব কতদিনের? তার এই অবস্থা কি স্থায়ী হবে, না অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে—সে কথা কি কেউ বলতে পারে? কেবল আল্লাহই জানেন, অতীত-বর্তমানের সব সংবাদ। যা ঘটেনি তা যদি ঘটত তাহলে কী হতো? অথবা যদি সামনে তা ঘটে তাহলে কী হবে? সেসব বিষয় সম্পর্কেও সম্যক অবহিত মহান রব আল-খাবির, সম্যক অবগত, মহাবিজ্ঞ।
অন্তরের প্রবণতা এবং প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে এত গভীরভাবে আর কেউ কি জানতে পারে?
মানুষের জ্ঞান নিতান্ত সীমিত
একদিন এক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ প্রবল বেগে ঘূর্ণিঝড় শুরু হলো। দেখলাম ঝড়ের প্রকোপে একটি প্রাচীর বিধ্বস্ত হওয়ার উপক্রম। প্রাচীর-নির্মাতারা কি জানত এখানে এত গতিবেগে বাতাস বইতে পারে? অবশ্যই তারা জানত না। জানলে তারা সর্বসাধ্য ব্যয় করে বিপদসীমার চেয়েও মজবুত করে তা নির্মাণ করত। মানুষ কীভাবে জানবে? কোনো কিছু সম্পর্কে জানতে হলে তো সে ব্যাপারে আগে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।
জটিল পরিস্থিতিতে ক্ষয়-ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য আমরা নানা উপায় খুঁজতে থাকি। বিপদ-আপদ ও দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয়। যেমন: কোনো যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হলে তাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে তা নির্ণয় করার জন্য অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়।
গাড়ির কোম্পানি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে কোনো চালক ছাড়াই একটি গাড়ি ছেড়ে দেয়। গাড়ির সামনে থাকে সিমেন্ট আর কংক্রিটের তৈরি মজবুত প্রাচীর। হাই স্পিডে ছুটে গিয়ে দেওয়ালের সাথে গাড়িটির বিশাল সংঘর্ষ হয়। তখন কোম্পানি পর্যবেক্ষণ করে, যে ধাতু দ্বারা গাড়ির বডি তৈরি করা হয়েছে তাতে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতির এই মারাত্মক সংঘর্ষের প্রতিক্রিয়া কেমন? এবং সংঘর্ষ কোন পর্যন্ত পৌঁছেছে? এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এরপরও তা কত ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে! আর যে কোম্পানি কোনো পরীক্ষা করা ছাড়াই গাড়ি তৈরি করেছে, তাদের গাড়ি তো সামান্য কোনো সমস্যার কারণেও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
মানুষের জ্ঞান কত সীমিত! কেমন বিপর্যয় ঘটতে পারে তা জানতেও তাদের অপেক্ষা করতে হয় বিপর্যয়ের আগপর্যন্ত।
আল্লাহর জ্ঞান পরিব্যাপ্ত ও পরিপূর্ণ
মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি নিতান্তই সীমিত ও অসম্পূর্ণ; কিন্তু আল্লাহ তাআলার জ্ঞান সম্পূর্ণ ও চিরায়ত। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা সবই অর্জিত ও শ্রমলব্ধ। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অনাদি, অনন্ত। আদিকাল থেকে মানুষের দৈহিক গঠন, শারীরিক অবকাঠামো এক ও অভিন্ন। তাতে কি এই সুদীর্ঘকালেও কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়েছে? অথচ আপনি লক্ষ করলে দেখবেন, ১৯৯০ সালে তৈরি হওয়া গাড়ি আর ১৯৯৫ সাথে তৈরি হওয়া গাড়ি দুটির মাঝে এত বেশি ব্যবধান যা আমাদের বিস্মিত করে তোলে। প্রথমে যে ট্রেনটি আবিষ্কার করা হয়েছিল, তার সামনের দিকে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকত। চলাচলের সময় সে লোকজনকে সতর্ক করত। আর সেই ট্রেনের গতি একজন মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে খুব বেশি ছিল না। অথচ বর্তমানের একটি ট্রেন ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার বেগে ছোটে। এখন থেকে পঞ্চাশ বছর আগের টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি প্রযুক্তিতেও আপনি একই চিত্র লক্ষ করবেন। এভাবে প্রতিনিয়তই বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নতি ও অগ্রগতির ফলে নতুন নতুন অনেক কিছু আবিষ্কৃত হচ্ছে, যা পূর্বের আবিষ্কারগুলোকে নিতান্ত ছেলেখেলায় পরিণত করছে। প্রতিটি গবেষণা-প্রযুক্তিতে যে ত্রুটি থেকে যায়, পরবর্তী গবেষণা সেটার ত্রুটি সংশোধন করে দেয়।
রোগজীবাণু বিধ্বংসী কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের শুরুতে সেটা মানুষ বা প্রাণীর শরীরে স্থাপন করে দেখা হয়, ভ্যাকসিনটা জীবাণু ধ্বংস করতে পেরেছে নাকি পারেনি? এভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই বিজ্ঞানীরা ওষুধপত্র আবিষ্কার করে থাকে। কিন্তু মহান আল্লাহ সেই অনাদি থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত কখনো কোনো গবেষণা, অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই আসমান, জমিন এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের অভিনব অস্তিত্বদান করেছেন। এজন্যই মানুষের গবেষণার সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান, উদ্ভাবন-আবিষ্কারকে বলা হয় পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান।
মাতৃগর্ভে মহাবিজ্ঞ রবের প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনা
মাতৃগর্ভে শিশু প্রতিপালনের যে চমৎকার ব্যবস্থাপনা তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন তা দেখে যে-কারো মেধা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে।
মাতৃদুগ্ধে আয়রনের কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ রক্তের লৌহকণিকা বা হিমোগ্লোবিন তৈরি হওয়ার প্রধান উপাদানই হচ্ছে আয়রন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যদি আমরা একটি দুধের শিশুর রক্ত পরীক্ষা করি তাহলে দেখতে পাব, তাতে যথেষ্ট পরিমাণ হিমোগ্লোবিন রয়েছে। দুই বছর বয়স হওয়ার পর শিশু বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণের পূর্বপর্যন্ত শিশুর রক্তে যে পরিমাণ লৌহকণিকার প্রয়োজন, মায়ের দুধই তা সরবরাহ করার জন্য যথেষ্ট। যে মহান সত্তা এমন অসাধারণ ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছেন তিনি আল-খাবির।
হৃৎপিন্ডের ওপরের ও নিচের প্রকোষ্ঠ-অলিন্দ ও নিলয়ের মাঝে কে ছিদ্র সৃষ্টি করেছেন? মানবদেহে রক্ত সংবহনের সাধারণ প্রক্রিয়া হলো ফুসফুস থেকে অলিন্দে রক্ত প্রবেশ করে। কিন্তু মাতৃগর্ভস্থ শিশুর ফুসফুস নিষ্ক্রিয় থাকে, সেখানে না আছে কোনো বাতাস, না আছে শ্বাস-প্রশ্বাস। যেহেতু তার ফুসফুস নিষ্ক্রিয়, তাই তার রক্ত ফুসফুস থেকে অলিন্দে সঞ্চালিত না হয়ে বরং বিশেষ গহ্বরের মাধ্যমে এক অলিন্দ থেকে আরেক অলিন্দে সঞ্চালন করে। যখন শিশুটির জন্ম হয় তখন একটি রক্তপিণ্ড এসে ঐ ছিদ্রটিকে বন্ধ করে দেয়। তখন থেকে আবার স্বাভাবিক গতিতেই অলিন্দ থেকে ফুসফুস, ফুসফুস থেকে আরেক অলিন্দ হয়ে তা নিলয়ে রক্ত সঞ্চালন করে। যে মহান প্রভু এই ব্যবস্থাপনা করেছেন নিশ্চয় তিনি আল-খাবির, মহাবিজ্ঞ।
আপনি যখন হাতের নখ কাটেন, মাথার চুল কাটান, তখন কি কোনো ব্যথা অনুভব করেন? অথচ শরীরের অন্য যেকোনো স্থানেই কোনোরূপ আচড় লাগলে আপনি ব্যথায় কাতরে উঠবেন। চুল-নখ আপনার দেহের অঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও তা কাটতে কোনো ব্যথা লাগে না। কেননা, আল্লাহ তাআলা নখ ও চুলে অনুভূতি সঞ্চারক স্নায়ুতন্তু (নিউরন) সৃষ্টি করেননি। নখ ও চুলেও যদি তিনি নিউরন সৃষ্টি করতেন, তাহলে প্রতিবার চুল-নখ কাটার সময় আমাদের হাসপাতালে যেতে হতো, চেতনানাশক ইঞ্জেকশন নিতে হতো। অনুভূতি-তত্ত্ব তিনি সৃষ্টি করেছেন শরীরের হাড়-মাংসে। তাই হাড় ভেঙে গেলে মানুষ মারাত্মক ও অসহনীয় ব্যথা অনুভব করে। বেদনায় কাতরাতে থাকে। এভাবে শুধু মানুষ নয়; প্রাণিদেহেও যদি আপনি গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে যান, আপনি বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। আল্লাহর কুদরতের অপার কারিশমা দেখে আপনার মেধা-বুদ্ধি জমে যাবে, বিশ্বাসী হৃদয় তাঁর সম্মুখে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে।
এই অসাধারণ ও অতিপ্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা যিনি করেন, তিনি আল-খাবির।
আপনার বাড়ির পাশের বাগানের মালীকে দেখেছেন, কত যত্ন করে গাছগুলোকে পরিচর্যা করে। সে যদি গাছে পানি দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে? প্রথমেই গাছের সবুজ, লকলকে পাতাগুলো শুকিয়ে যাবে। পাতার রস শুকানোর পর ডালের রস শুকিয়ে যাবে। তারপর গাছের কাণ্ড শুকিয়ে যাবে। অতঃপর শিকড়ের পানি শুকাতে শুকাতে সর্বশেষ শিকড়ের মাথার পানি শুকিয়ে যাবে। গাছে যখন রস বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না, কেবল তখনই গাছটি মরে যাবে, পরিণত হবে শুকনো কাঠে। একটি গাছের পত্র-পল্লব, শাখা-প্রশাখা, কাণ্ড ও শিকড়ে পর্যন্ত তিনি রস ছড়িয়ে রেখেছেন। তাই আমরা একবার, দুবার পানি দেওয়া বন্ধ করলেও তাতে গাছের কোনো ক্ষতি হয় না; গাছটি মরে যায় না। যদি একবারেই গাছের সব রস শুকিয়ে যেত, তাহলে মাত্র একবার পানি দেওয়া বন্ধ করলেই পৃথিবীর সব গাছ মরে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা অসাধারণ বিচক্ষণতায় বৃক্ষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রস ছড়িয়ে দিয়েছেন।
কারণ তিনি আল-খাবির; শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞার অধিকারী।
যিনি অন্তরের খবরও জানেন
ডাক্তার চিকিৎসার স্বার্থে রোগীর সতরও দেখতে পারে। কিন্তু সে যদি কামনার বশবর্তী হয়ে আক্রান্ত স্থান ব্যতীত অন্য কিছু দেখে, তবু ঐ মহিলা-রোগী কখনো জানতেও পারবে না, সে আসলে ডাক্তারবেশী এক লম্পট ও দুশ্চরিত্র, যার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বীভৎস এক চেহারা! কিন্তু এই আসল চেহারা যিনি মুহূর্তের মাঝে উন্মুক্ত করে দিতে পারেন তিনি সম্যক জ্ঞাত পবিত্র এক সত্তা মহান আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَعْلَمُ خَابِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ )
চোখের অপব্যবহার এবং অন্তরে যা গোপন রয়েছে সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত [১]
কাফির, মুমিন নির্বিশেষ সকল মানুষের প্রতিই তিনি ইনসাফ ও ন্যায়-নিষ্ঠাপূর্ণ আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই অমুসলিমের সাথে উত্তম আচরণও আল্লাহর নৈকট্যলাভের মাধ্যম। কিন্তু যখন আপনি কোনো অমুসলিমের সাথে সুব্যবহার ও সৌজন্যমূলক আচরণ করছেন, সেটা কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছেন না অন্য কোনো কারণে? তাঁর ভয়ে কম্পিত হয়ে নাকি দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য? জনসম্মুখে আপনি খুব ভণিতা-অভিনয় করে চক্ষু অবনত করে পথ চলছেন, কিন্তু একটু সুযোগ পেলেই, একটু আড়াল হলেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করছেন হারামের দিকে। কেউ তা জানতে পারবে না; কিন্তু তিনি জানেন আপনার অন্তরের সব খবর।
বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত সকল স্থানে আপনার আল্লাহভীতি, তাকওয়া- পরহেজগারির চর্চা। কিন্তু রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে স্মার্ট ফোন কিংবা কম্পিউটারের স্ক্রিনে আপনি ভেসে যাচ্ছেন নগ্নতার জোয়ারে, ডুবে যাচ্ছেন ধ্বংসের অতল গহ্বরে। আপনার এই লৌকিকতা আর ধূর্ততার খোলস কেউ উন্মোচন করতে পারে না। কিন্তু মহাবিজ্ঞ রব আল-খাবির আপনার চেয়েও বেশি অবগত আপনার ছলচাতুরির ব্যাপারে। যেকোনো মুহূর্তে তিনি আপনার মুখোশ খুলে দিতে পারেন সকলের সামনে; যাদের সামনে লৌকিকতার চাদরে আপনি ঢেকে রেখেছেন শঠতার ভয়ানক আকৃতি। সুমহান আল্লাহ বলেন—
قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে; এটাই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যকভাবে অবহিত।[১]
আল-খাবিরের সাথে হৃদয়ের বন্ধন
প্রতি মুহূর্তে আপনার প্রতিটি কাজের তিনি পর্যবেক্ষক। প্রকাশ্যে, গোপনে, জনতার মাঝে, লোকচক্ষুর আড়ালে এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের ব্যাপারে তিনি সম্যক অবগত। আপনি যা কিছুই লুকিয়ে রাখুন না কেন, তাঁর সামনে আপনার সবকিছুই উন্মুক্ত। আপনার কোনো রহস্যই তাঁর অগোচরে থাকতে পারে না। গোপন পাপ আপনার কোমর ভেঙে দিয়েছে। প্রকাশ্য অপরাধ আপনার ঈমানি দেহ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মহাবিজ্ঞ রবের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করুন। আপনি আবার ঈমানি শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠবেন। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবেন না। এটাই আল-খাবির তথা মহাবিজ্ঞ সত্তার বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণের প্রথম ফল।
ইমাম কুশাইরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'মহান আল্লাহর আল-খাবির নামের প্রতি আদব প্রদর্শন প্রত্যেক মুমিনের জন্য আবশ্যক।' প্রতিটি কথাবার্তা ও কাজকর্ম সম্পর্কে তিনি অবহিত-এই বিশ্বাস যার অন্তরে বদ্ধমূল হবে, সে আপন কথাবার্তায়, কাজে-কর্মে সতর্ক হয়ে যাবে। প্রতিটি পদক্ষেপে আস্থাশীল হবে এটা ভেবে যে, আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা কখনোই হাতছাড়া হবে না। আর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেননি তা কস্মিনকালেও সে অর্জন করতে পারবে না। আল-খাবির নামের প্রতি আপনার ঈমান যত বেশি দৃঢ় হবে, পার্থিব সকল বিষয় আপনার কাছে তত সহজ হয়ে যাবে। কারণ আপনার দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হবে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে সবই তিনি জানেন ও দেখেন। পক্ষান্তরে, যারা পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহকে বাহ্যিক কার্যকারণ বা প্রাকৃতিক কারণ মনে করে তারা সর্বদা অস্থিরতায় ভোগে।
আপনার হৃদয়ে যখন মহাবিজ্ঞ রবের প্রতি বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হবে, আপনি যখন হৃদয়ের গভীর থেকে উপলব্ধি করবেন, আল্লাহ আপনার সকল বিষয় পর্যবেক্ষণ করছেন, তখন আপনি অপার্থিব এক আত্মিক শক্তি ও মনোবল অনুভব করবেন। অন্তরের বদ্ধমূল এই বিশ্বাসই অতি সংগোপনে আপনার সব প্রয়োজন তুলে ধরবে আপনার রবের কাছে। গায়েব থেকেই আপনার সকল চাওয়া-পাওয়া পূরণ হয়ে যাবে। কারণ মানুষ যা মুখে উচ্চারণ করে আল্লাহ তা শ্রবণ করেন; আর মানুষ যা অন্তর দিয়ে কামনা করে সে সম্পর্কেও আল্লাহ বেখবর নন।
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সন্তান চেয়ে আল্লাহর তাআলার কাছে যে দুআ করেছিলেন, তা চুপিসারেই করেছিলেন। হৃদয়ের গহীন থেকে প্রার্থনা করেছিলেন মহান রবের নিকটে।
إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا ۞
যখন তিনি তার রবকে চুপিসারে ডেকেছিলেন [১]
আল্লাহর জ্ঞানের প্রতি তার ছিল অগাধ বিশ্বাস। তাই হৃদয়ের সে ডাকেই সাড়া দিয়েছিলেন, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, মহাবিজ্ঞ আল্লাহ তাআলা।
মহাবিজ্ঞ রব আল-খাবিরের ওপর আপনার বিশ্বাস আছে তো?
পৃথিবী প্রতিনিয়তই উন্নতি ও উৎকর্ষের দিকে ধাবমান। জীবনযাত্রার মান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন-প্রকরণে প্রতিটি মুহূর্তেই সাধিত হচ্ছে ব্যাপক পরিবর্তন।
এই পরিবর্তিত বিশ্বে মহাবিজ্ঞ রব আল-খাবিরের প্রতি, তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ বিধান ও নির্দেশাবলির প্রতি আপনার আস্থা কতটুকু?
বৈধ পথায় আয়-উপার্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় শরিয়ত কর্তৃক প্রজ্ঞা ও ভারসাম্যপূর্ণ কিছু মূলনীতি প্রণয়ন করে দেওয়া হয়েছে। এসব মূলনীতির প্রতি লক্ষ রেখে বৈধভাবে সম্পদ উপার্জনের অনেক পদ্ধতিই শরিয়ত অনুমোদন করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছে শরিয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ হাজারো পন্থা।
আপনি হয়তো ভাবছেন, শরিয়তের মূলনীতির আলোকে ফিকহের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ উপার্জনের যেসব পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো সময়োপযোগী নয়। পাশাপাশি এসব পদ্ধতি প্রয়োগ করে লাভবান হওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এর বিপরীতে শরিয়ত বহির্ভূত আধুনিক পদ্ধতির ব্যবসা-বাণিজ্য বেশি ফলপ্রসূ। আবার তা অনিবার্য লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই চিন্তা থেকেই আপনি হারাম পদ্ধতির বাণিজ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। দেখবেন, আকস্মিকভাবেই একদিন আপনার ব্যবসা বিরাট ক্ষতির মুখে পতিত হয়েছে।
অতএব, প্রচুর অর্থ উপার্জনের জন্যও আপনাকে শারয়ি বিধানের সামনেই আত্মসমর্পণ করতে হবে। ব্যবসার লাভ-লোকসান শুধু মেধা-বুদ্ধির ওপরই নির্ভর করে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওফিকেরও প্রয়োজন হয়। আর আল্লাহর তাওফিকপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য আল্লাহর আনুগত্য পূর্বশর্ত। যে ব্যক্তি মনে করে, শরিয়তসম্মত উপায়ে ব্যবসা কিংবা চাকরি না করে হারাম পন্থা অনুসরণ করলে অল্প সময়ে অনেক বেশি অর্থ-কড়ি কামানো যাবে, নান্দনিক বাড়ি আর দৃষ্টিনন্দন গাড়ি কেনা যাবে, সে ব্যক্তি মূলত নির্বোধ ও পথভ্রষ্ট।। সে জানে না, আল্লাহ তাআলা মহাবিজ্ঞ, তাঁর বিধানেই রয়েছে সমূহ কল্যাণের নিশ্চয়তা। তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারী নিশ্চিত হতভাগা। সৌভাগ্যের চাবিকাঠি তাঁর আনুগত্যের মাঝেই নিহিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيَ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ ۖ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
আপনি নিজেকে ধৈর্য সহকারে রাখবেন তাদের সংসর্গে, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় ডাকে তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। পার্থিব জীবনের শোভা ও চাকচিক্য কামনা করে আপনি তাদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। আপনি তার আনুগত্য করবেন না, যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশিমতো চলে এবং যার কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে যায় [১]।
যখনই আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত পথে চলবেন, তখনই সৌভাগ্যের ফলবান বৃক্ষ থেকে ছিঁড়তে পারবেন সুমিষ্ট পাকা ফল। আর আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে বিপথগামী হলেই চরম পর্যায়ের লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে। কারণ আপনি মহাবিজ্ঞ প্রভুর নির্দেশ অমান্য করেছেন।
আপনি অনেক দামি ও মূল্যবান একটি মেশিন কিনলেন, যার অপারেটিং সিস্টেম বেশ জটিল। স্বাভাবিকভাবেই আপনি ধরে নেবেন মেশিনটির আবিষ্কারক ও নির্মাতাই এর অপারেটিং সিস্টেম সম্বন্ধে সবচেয়ে বেশি অবগত। তখন আপনি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গাইডবুক সংগ্রহ করে নির্দেশনা মোতাবেক মেশিন চালিয়ে নেবেন।
দুনিয়াবি সামান্য একটা মেশিনের ক্ষেত্রে যদি আপনার এত গুরুত্ব ও আগ্রহ থেকে থাকে, তাহলে আপনার এই আশ্চর্য দেহ এবং তার মধ্যে অবস্থিত হৃদয় ও আত্মার মেশিন পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনি কেন এত উদাসীন? অথচ হৃদয়-আত্মা এবং মানবদেহের নিগূঢ় রহস্যাবলি আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। যার সবকিছু পরিপূর্ণভাবে এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। যেখানে রহস্যের কোনো শেষ নেই। হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, গর্ভস্থ ভ্রূণের ক্রমবিকাশ ও পরিচর্যার পদ্ধতি ইত্যাদি যা কিছু আবিষ্কার হয়েছে, তাতেই চিন্তাশীল গবেষকরা হতভম্ব হয়েছেন।
আপনার দেহে অবস্থিত আত্মার সাথে দুনিয়াবি মেশিনের কোনো তুলনাই চলে না। চিন্তা-চেতনা, উপলব্ধি, প্রেরণা, প্রত্যাশা, কামনা ইত্যাদির সমাবেশ হলো মানবাত্মা। এই আত্মা এবং তার ধারক মানবদেহ পৃথিবীর অন্য যেকোনো কিছুর তুলনায় অত্যন্ত জটিল। এর জন্য কি একটি নির্দেশিকার প্রয়োজন নেই? মেশিনের অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা ও আবিষ্কারক ছাড়া আর কেউ জানে না। তেমনিভাবে মানবদেহ আর মানবাত্মার পরিচালনা পদ্ধতিও আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানেন না।
তাই দেহ-আত্মার এই অমূল্য মেশিনকে পরিচালনা করার জন্য গাইডবুক তাঁর কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হবে, যিনি এটার অভিনব স্রষ্টা, সম্যক দ্রষ্টা। জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর কাছ থেকেই দীপ্তি গ্রহণ করতে হবে, যিনি এ জীবনের অস্তিত্ব দানকারী এবং মহাবিজ্ঞ অভিভাবক। আল-খাবির বলেন-
وَأَسِرُّوا قَوْلَكُمْ أَوِ اجْهَرُوا بِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الخَبِيرُ
তোমরা তোমাদের কথা গোপনেই বলো অথবা প্রকাশ্যে বলো, তিনি তো অন্তর্যামী। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি (সৃষ্টি সম্বন্ধে) জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত [১]
ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এই পৃথিবীতে আপনার সবচেয়ে কাছের জিনিস হলো নিজ দেহ ও আত্মা।' তাই আত্মার জগতে কীসের আনাগোনা বা লুকোচুরি চলছে—সে বিষয়ে আপনাকে থাকতে হবে সদা জাগ্রত। আপনি আবিষ্কার করুন, আপনার মনে যেসব জল্পনা-কল্পনা, কামনা-বাসনা জেগে উঠছে, তার উৎস কোথায়? আপনার হৃদয় না প্রবৃত্তি? নাকি শয়তানের ফাঁদ? আপনি বোঝার চেষ্টা করুন, দেহসত্তার ভেতরের এসব কল্পনা-অনুভূতি কি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ঐশীপ্রেরণা নাকি শয়তানের কুমন্ত্রণা? আপনি যে আমলটি করছেন, তাতে কি আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করছেন না লৌকিকতার ফাঁদে আটকা পড়ে যাচ্ছেন?
প্রত্যেক বান্দার জন্য নিজের ঈমান, আমল ও মনোজগৎ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। হৃদয়ের সকল প্রবণতা, চারিত্রিক শিষ্টতা এবং আত্মার পরিশুদ্ধির ব্যাপারে সজাগ থাকা আবশ্যক।
কোনো জটিল ব্যাপার সমাধানের প্রধান ও পূর্বশর্তই হলো, সেটাকে জটিল হিসেবে জানতে পারা। এরপর তার সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা। আপনি যদি গুনাহ বর্জন করতে চান, তাহলে প্রথমেই আপনাকে জানতে হবে গুনাহ কী? তাই আত্মার পরিশুদ্ধির পথে সর্বপ্রথম অপরিহার্য দায়িত্ব হলো-আত্মা, প্রবৃত্তির চাহিদা-কামনার ব্যাপারে পূর্ণ অবগতি লাভ করা। আর ধূর্ত নফসের প্রবঞ্চনার শিকার না হওয়া।
আপনি যখন জেনে ফেলবেন অন্তর্জগতের গোপন ফাঁদ, যখন বুঝতে পারবেন হৃদয়ের সবুজ বাগানে ফেরেশতার পরিচর্যা বা শয়তানের আনাগোনা, যখন বুঝতে সক্ষম হবেন ইখলাসপূর্ণ ইবাদত ও লোকদেখানো ইবাদতের পার্থক্য, আখিরাতের নেশায় মত্ততার স্বাদ এবং দুনিয়ার খড়কুটোর পেছনে মোহগ্রস্ত হওয়ার পরিণাম—তখন সৃষ্টিজগতের মধ্যে আপনিই হবেন সবচেয়ে বড় বিচক্ষণ; মহাবিজ্ঞ আল-খাবির রবের সাথে হবে আপনার হৃদয়ের বন্ধুত্ব। মানুষের মাঝেই হয়তো আপনার বসবাস; কিন্তু আপনি অলংকৃত করবেন ফেরেশতাদের বরকতময় সমাবেশ।
তাই সম্যক অবগত, সর্বদ্রষ্টা, মহাবিজ্ঞ মালিক আল-খাবিরের সামনে নিজেকে সর্বদা উপস্থিত মনে করুন; যার কাছে আপনার কোনো কিছুই গোপন থাকতে পারে না।
সতর্ক হোন, আপনার সবচেয়ে কাছের দেহ ও আত্মার ব্যাপারে। আবিষ্কার করুন হৃদয়রাজ্যের কুমন্ত্রণা এবং ঐশীপ্রেরণার মাঝে বিভাজন-রেখা। মহাবিজ্ঞ রবের প্রজ্ঞাময় ব্যবস্থাপনায় হোন তৃপ্ত, প্রফুল্ল। দেখবেন, আপনার হৃদয়-আত্মা আল-খাবিরের প্রতি ঈমানে টইটম্বুর। জান্নাতি ঝরনার আর্দ্রতামাখা সমীরণ শীতল করে দেবে আপনার জীবন।
টিকাঃ
[১] সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৩
[১] সুরা মুমিন, আয়াত: ১৯
[১] সুরা নূর, আয়াত : ৩০
[১] সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৩
[১] সুরা কাহফ, আয়াত: ২৮
[১] সুরা মূলক, আয়াত : ১৩-১৪
📄 আর-রাকিব : মহাপর্যবেক্ষণকারী, নিরীক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক
রাতের বেলা ময়লা ফেলতে বেরিয়েছেন আপনি। ডাস্টবিনটা বেশ দূরে। অতদূর না গিয়ে ময়লা ফেললেন ঠিক প্রতিবেশীর বাড়ির দোরগোড়ায়। এদিকটা বেশ অন্ধকার। কে কী করছে বোঝার উপায় নেই। ভাবছেন, কেউ জানবে না, কে করল কাজটা। অথচ একজন ঠিকই দেখেছেন, আপনার এই হীন কর্ম। তিনি আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী আল্লাহ।
আপনি যদি জানতে পারেন সর্বদা আপনাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে; আপনার উপরস্থ কেউ সবসময় আপনাকে চোখে চোখে রাখছে, তখন আপনি কী করবেন? নিশ্চয় খুব সতর্ক হয়ে যাবেন। সুস্থ বিবেকসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার একজন স্রষ্টা রয়েছে। একজন বিশ্বাসী মুমিন হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার স্রষ্টা মহান আল্লাহ; যিনি মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী। অতএব, নিশ্চিত বিশ্বাস করুন, আপনি ২৪ ঘণ্টা রয়েছেন আপনার স্রষ্টার পর্যবেক্ষণের অধীনে। আপনার মতোই একজন মানুষের উপস্থিতি, পর্যবেক্ষণ টের পেয়ে আপনি চমকে ওঠেন, পরিণামের ভয়ে আঁতকে ওঠেন, নিয়ন্ত্রিত হয়ে যান; তাহলে মহান পর্যবেক্ষকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আওতায় আপনি কীভাবে লাগামহীন হয়ে পড়েন? আপনার রব বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا )
হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকেও সৃষ্টি করেছেন; যিনি তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন (রাকিব)।
মহামহিমাময় আর-রাকিবের সান্নিধ্যে
একবার আমি এক দোকানে ঢুকে আমার প্রয়োজনীয় একটি বস্তু চাইলাম। কিন্তু দোকানদার সেটা দিতে পারল না। আমি বেরিয়ে যাব, এমন সময় দোকানি বলল, একটু কষ্ট করে যদি গুদামে যেতেন, সেখানে পাওয়া যেতে পারে। দোকান ছিল নিচতলায় আর গুদাম চতুর্থ তলায়। গিয়ে দেখলাম সেখানে একজন হিসাবরক্ষক ও ব্যবস্থাপক টেবিলের সামনে বসে আছে। আর দুটি সিসি ক্যামেরা তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার বুঝতে দেরি হলো না, নিচতলায় মালিক তাকে মনিটরে পর্যবেক্ষণ করছে।
তো এই হিসাবরক্ষক তার দিকে তাকিয়ে থাকা ক্যামেরার কারণে একটু নড়াচড়াও করতে পারছে না। মালিকের পর্যবেক্ষণের কারণে কাজের সময়ে তার একটু খাওয়াদাওয়া অথবা অন্য কোনো প্রয়োজনে উঠে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আরেকবার এক ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখলাম সবগুলো রুম স্বচ্ছ কাচ দিয়ে তৈরি করা। যেন জিএম সকলকে নজরদারির আওতায় রাখতে পারে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের নজরদারি আর পর্যবেক্ষণের ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত যেন অনৈতিক কাজ করার শক্তিই সে হারিয়ে ফেলেছে।
আবার ধরুন ট্রাফিক আইনের কথা। কোনো কোনো দেশে ট্রাফিক আইন খুবই কড়া। কেউ সর্বোচ্চ গতিসীমা অতিক্রম করলেই সাথে সাথে তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারিতে তা বাস্তবায়নও করা হয়। এই নজরদারির কারণে কোনো ড্রাইভারের সর্বোচ্চ গতিসীমা লঙ্ঘন করার কোনো সুযোগ নেই।
সামান্য মানুষের পর্যবেক্ষণে কত তটস্থ থাকেন আপনি! অথচ আপনার ওপর রয়েছে মহাশক্তিধরের পর্যবেক্ষণ; যিনি নজর রাখেন আপনার ওপর, উপরস্থ কর্মকর্তার ওপর, সবার ওপর, তিনি আপনার রব, আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী।
আর-রাকিব শব্দটি অভিধানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়—
এক. আর-রাকিব অর্থ অপেক্ষমাণ। আল্লাহ বলেছেন-
وَارْتَقِبُوا إِنِّي مَعَكُمْ رَقِيبٌ
সুতরাং তোমরা অপেক্ষা করো, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ [১]
এখানে 'অপেক্ষমাণ' বলতে গতিবিধি পর্যবেক্ষণকে বোঝানো হয়েছে। যেমন : আল্লাহ বলেন-
إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ
নিশ্চয় আপনার প্রতিপালক (বান্দাদের) গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন।[২]
দুই. আর-রাকিব অর্থ সংরক্ষক।
বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
ارْقُبُوا مُحَمَّدًا فِي أَهْلِ بَيْتِهِ
তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা সংরক্ষণ করো তার পরিবারবর্গের মাধ্যমে [৩]
অর্থাৎ তার পরিবারের প্রতি সদাচরণ কর। তাদের হক আদায়ে যত্নবান হও।
তিন. আর-রাকিবের আরেক অর্থ প্রহরী, অগ্রবর্তী সৈনিক, আদর্শ প্রতিনিধি; পিতার যোগ্য বংশধর।
যে ফেরেশতা আমলনামা সংরক্ষণ করেন তাকেও বলা হয় 'রাকিব' তথা প্রহরী বা প্রতিনিধি।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য নিযুক্ত রয়েছে তৎপর প্রহরী [১]
আল্লাহর সাথে যখন ব্যবহৃত হয় আর-রাকিব, তখন তার অর্থ হয় মহাপর্যবেক্ষক। যিনি সবকিছু জানেন; সবকিছু দেখেন। রাত্রে ঘুমানোর সময় আপনি কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। মনে মনে ঠিক করলেন, আগামীকাল অমুক কাজটি করবেন। আপনার এই কল্পনা আপনি ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঠিকই সব জানেন। কুরআনে বর্ণিত-
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, আমি তা জানি। আমি তো তার গ্রীবাস্থিত ধমনির চেয়েও নিকটবর্তী [২]
আপনার নীরবতা এবং উচ্চৈঃস্বর তার কাছে সমান। জনসম্মুখে আপনার ঘোষণা এবং নিঃশব্দ উচ্চারণ তার কাছে একই। মুখ ফুটে বের হওয়া আর অন্তরে লুকিয়ে রাখা সবই তার কাছে সমান। কারণ তিনি আর-রাকিব, পর্যবেক্ষণকারী।
আল্লাহর এই নামটি আপনার সবচেয়ে কাছের নাম। আপনি যখনই বিশ্বাস করে ফেলবেন, আল্লাহ আপনার সবকিছু দেখছেন, তখন নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর হুকুম আঁকড়ে ধরবেন। আর আল্লাহর হুকুম যদি আপনি আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হন, নিশ্চিত আপনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে মুক্তি পেয়ে যাবেন। আল্লাহ বলেন-
مَّا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا
যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং ঈমান আনয়ন করো, তাহলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহর কী লাভ? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞ [১]
আল্লাহর এই নামটি এবং এই নামের প্রতি ঈমান আপনার সৌভাগ্যের সিঁড়ি। এই একটি নামই একজন মুমিনের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে যথেষ্ট। মুমিন যখন এই নামের ওপর ঈমান আনে, তখন সে আল্লাহর হুকুমের সামনে নত হয়; আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।
আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আর-রাকিব আপনাকে দেখছেন।
আপনি ঘরে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি হাসপাতালে রোগী দেখছেন, রোগীকে সেবা দিচ্ছেন, আপনি কিন্তু রয়েছেন তাঁর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে।
আপনি যদি একজন আইনজীবী হয়ে থাকেন, নিজের আত্মার হিসাব নিন। আপনি মক্কেলের কাছ থেকে যে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক নিয়েছেন, তার হক আদায় করেছেন তো? সংশ্লিষ্ট আইনের সকল ধারা, উপধারা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গভীরভাবে পড়াশোনা করেই মামলায় হাত দিয়েছেন তো? নাকি কোনো রকম চোখ বুলিয়েই হাজির হয়েছেন কোর্ট-চত্বরে?
আপনি একজন ডাক্তার। রোগীর কাছ থেকে ফি নিয়েছেন আপনার চাহিদামতো। কিন্তু তার হক আদায় করছেন কতটুকু? এটা কি শুধু আপনার অর্থ উপার্জনের বাণিজ্য নাকি আপনি সেবার মানসিকতাও লালন করেন? আপনি রোগীর অস্থিরতা, সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করছেন তো? নাকি তাকে উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দিচ্ছেন? ভুলে যাবেন না, আপনার প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে! আপনি রয়েছেন সরাসরি আপনার মালিকের পর্যবেক্ষণ সীমানায়!
যাদের অস্থি-মজ্জা এবং অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুতে আর-রাকিবের উপস্থিতি, তারা কখনো বেখেয়াল হয় না। তারা সর্বদা সৌহার্দপূর্ণ, কোমল আচরণ করে। নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিতেই বেশি ভালোবাসে। আপনার সামনে ফলমূলের একটি বড় থালা রাখা হলো, আর-রাকিবের প্রতি ঈমানের দাবি হলো, আপনি আরেক ভাইকে অগ্রাধিকার দেবেন। তার দিকেই সুমিষ্ট ফলটি এগিয়ে দেবেন। আনারের বড় টসটসে দানাগুলো তার দিকে বাড়িয়ে দেবেন। কারণ, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। তিনি আপনার কাজ এবং অন্তরের ইচ্ছাও লক্ষ করছেন।
কুরআনে বর্ণিত-
ع إِنَّ اللَّهَ عَالِمُ غَيْبِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ )
নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল অদৃশ্য বিষয়ে অবগত আছেন। অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে তিনি সবিশেষ অবহিত।[১]
আল্লাহ আপনার অনন্য সঙ্গী
আপনার বন্ধুকে আপনি প্রচণ্ড ভালোবাসেন, তার সাথে চলাফেরা, ওঠাবসা করতে পছন্দ করেন। কিন্তু আপনার যত কাছের বন্ধুই হোক না কেন, তার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি আপনি সহ্য করতে পারবেন না। আপনি তার সাথে চলতে চলতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়বেন। খুব কাছের বন্ধুর উপস্থিতিও কখনো কখনো অসহ্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু আল্লাহ আপনার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আপনি কখনো আল্লাহর উপস্থিতিতে বিরক্ত হয়েছেন? কারণ আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঙ্গ দান করেন অতি সূক্ষ্ম ও সুকোমলভাবে। তাই আপনি টের পান না তাঁর উপস্থিতি। অথচ তিনি রয়েছেন আপনার সাথে, সবখানে; ঘরে-বাইরে, দেশে-বিদেশে, নির্জনে-প্রকাশ্যে সর্বদা তিনি রয়েছেন আপনার সঙ্গী হয়ে।
তাই আপনিও সদা-সর্বদা আল্লাহকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে নিন। ভেবে নিন আল্লাহ আপনার সামনেই রয়েছেন। হাদিসে এটাকে বলা হয়েছে 'ইহসান'। আপনি উন্নীত হোন ইহসানের উচ্চতায়।
কোনো শ্রদ্ধেয় বড় ব্যক্তিত্বের সাথে সাক্ষাতের সময় আপনি সাধারণত নিজেকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পোশাক-পরিচ্ছদ, আদবকেতা ঠিক আছে কি না সেদিকে খুব গুরুত্ব প্রদান করেন। এরপর তার সাথে সাক্ষাতের সময় ভদ্রতার সাথে শ্রদ্ধাজড়িত কণ্ঠে শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানিয়ে থাকেন। কিন্তু আল্লাহর মতো মহান ও পবিত্র সত্তা সর্বদা আপনার সাথে রয়েছেন, তাঁর প্রতি আপনি কি এতটুকুও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন? একান্ত তাঁর জন্য আদব ঠিক রাখেন?
অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি আল্লাহর ভয়ে তটস্থ থাকবে তার জীবন ও জীবনধারা তত বেশি সুন্দর ও কেতাদুরস্ত হবে। কারণ, আল্লাহ সর্বদাই আপনার সাথে রয়েছেন; সর্বদা তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এক বেদুইন ব্যক্তি নবিজির কাছে এসে আবেদন করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি সুরা শিক্ষা দিন যা সবদিক থেকে পরিপূর্ণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে 'সুরা যিলযাল' পড়িয়ে দিলেন। যার শেষটা ছিল-
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًا يَرَهُ
কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে তা-ও সে দেখতে পাবে।[১]
অতঃপর বেদুইন লোকটি বলল, ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য-সহ পাঠিয়েছেন—এর বেশি আমার আর প্রয়োজন নেই। এরপর লোকটি চলে গেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লোকটি সফলকাম হয়েছে, লোকটি কামিয়াব হয়েছে।[১]
আপনি চিন্তা করে দেখুন লোকটি সম্পর্কে আল্লাহর নবি এই মন্তব্য কেন করলেন? কারণ আপনি যদি জানতে পারেন আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ এবং অণু-পরিমাণ কর্মও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তখন আপনি কি পারবেন কারো সাথে প্রতারণা করতে? কারো সাথে মিথ্যা বলতে? পারবেন কারো ক্ষতি করতে? কিংবা কোনো অনৈতিক কাজ করতে? একজন মানুষের নজরদারিতে থেকেই যেখানে আপনি সজাগ হয়ে যান, অতি সন্তর্পণে সবকিছু সামাল দেবার চেষ্টা করেন, সেখানে মহান স্রষ্টার সামনে কীভাবে আপনি লাগামহীন হবেন?
এই একটি নাম এবং তার অন্তর্নিহিত আবেদন ও বার্তা আপনাকে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য করবে। প্রবৃত্তির লিপ্সা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি জোগাবে। আর যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখে ফেলল, সে দ্বীনের শক্ত বুনিয়াদের ওপর ঈমানি জীবনের দালান দাঁড় করিয়ে ফেলল। তাই আল্লাহর এই পরম সুন্দর নাম 'আর-রাকিব'-এর তন্ময়তায় মগ্ন থাকা হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা; আজীবনের উত্তম নসিহত।
লুকোনোর কোনো জায়গা নেই
ইমাম রাযি রাহিমাহুল্লাহ একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। জনৈক শাইখ তার এক ছোট্ট ছাত্রকে খুব বেশি স্নেহ করতেন। এতে অন্য ছাত্ররা কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়। শাইখ একদিন ভাবলেন, তাদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সবাইকে একত্র করে প্রত্যেকের হাতে একটি করে পাখি দিলেন এবং বললেন, তোমরা নিজেদের পাখিটি এমন জায়গায় নিয়ে জবাই করবে, যেখানে কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না।
প্রত্যেকেই একেক দিকে চলে গেল; যেন কেউ কাউকে দেখতে না পায়। ছাত্ররা সবাই নিজের মতো করে লুকিয়ে লুকিয়ে যার যার পাখি জবাই করে নিয়ে এলো। কিন্তু সেই ছোট্ট ছাত্রটি ফিরে এলো পাখিটি জবাই না করেই।
বিনীত সুরে উস্তাযকে বলল, শাইখ! আপনি বলেছেন, এমন স্থানে গিয়ে পাখিটি জবাই করতে, যেখান কেউ দেখবে না। কিন্তু আমি এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাইনি যেখানে আল্লাহ আমাকে দেখতে পাবেন না!
শাইখ মুচকি হেসে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার বুঝলে তো! এ কারণেই আমি ওকে একটু বেশিই স্নেহ করি।
তাই আপনি যেখানেই লুকিয়ে থাকুন না কেন, যেখানেই আত্মগোপন করুন না কেন, আল্লাহর শক্তিশালী দৃষ্টি থেকে দূরে কোথাও যেতে পারবেন না।[১]
আল্লাহ তাআলা আপনার দিকে সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রেখে এই কথাটিই শিক্ষা দিতে চান যে, হে বান্দা! তুমি কি আমার ব্যাপারে লজ্জা করো না? তুমি একদিন আমার সামনে উপস্থিত হবে, সেদিনটিকে তুমি কি ভয় করো না? তোমার ফিরে আসার সময় কি এখনো হয়নি?
আপনি সালাতে দাঁড়ানোর সময় কল্পনা করুন, আল্লাহ আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। সালাতে দাঁড়ানোর পূর্বেই পাক-পবিত্র ও উত্তম পোশাক পরে নিন। সামান্য কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আপনি আপনার উন্নত মানের পোশাক পরে বের হন। অথচ সালাত আদায়ের সময় যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ান, তখন আপনি পরেন নিম্নমানের পোশাক। কেন আপনার এই দ্বৈত নীতি? আপনি কি আল্লাহর সামনে উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না? আপনি কি বিশ্বাস করেন না, সালাতে দাঁড়ানো মানে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সামনেই দাঁড়ানো? সালাফগণ সালাতের পূর্বে চুল-দাড়ি আঁচড়িয়ে পরিপাটি হয়ে নিতেন। কারণ তারা উপস্থিত হতে যাচ্ছেন মহান রবের সামনে। মহামহিম আল্লাহ বলেন-
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ )
হে আদম সন্তান, তোমরা সালাতের সময় সৌন্দর্য গ্রহণ করো। তোমরা পানাহার করো কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।[২]
এই আলোচনা দ্বারা আমি আপনার সমালোচনা করছি না। আমি শুধু আপনার ঘুমন্ত চেতনাকে একটু জাগিয়ে তুলতে চাচ্ছি। আপনি দুনিয়াবি কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় যদি সুন্দর ও পরিপাটি পোশাক পরতে পারেন, তবে আল্লাহর সামনে কেন পারবেন না? মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর। জুমআর দিন মুমিনের ঈদ; আনন্দোৎসব। আর আপনি হলেন সেই উৎসবের দিনে আল্লাহর ঘরের মেহমান। আপনিই বলুন, এমন বরকতপূর্ণ মাহফিলে নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও নিম্নমানের পোশাক পরে যাওয়া কি সমীচীন?
তাই নবিজির সুন্নাহ হলো, জুমআর দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে, উত্তম পোশাক পরিধান করে মসজিদে গমন করা।
রাখাল-বালকের আল্লাহভীরুতা
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার সাথি-সঙ্গীদের নিয়ে মদিনার অদূরে কোথাও যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দুপুর বেলা এক স্থানে যাত্রাবিরতি নিলেন বিশ্রামের জন্য। সবাই মিলে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য দস্তরখান বিছিয়েছেন। ঠিক সে সময় দেখা গেল, একপাল বকরী-সহ এক রাখাল যাচ্ছে।
ইবনু উমারের ইচ্ছে হলো, তিনি রাখালের আল্লাহভীরুতা পরীক্ষা করে দেখবেন। তাই রাখালকে ডেকে বললেন, এসো আমাদের সাথে খাবারে শরিক হও।
রাখাল উত্তর দিলো, আমি খেতে পারব না এখন। আমি আজ সিয়াম রেখেছি।
ইবনু উমার বললেন, তুমি একটা বকরী আমাদের কাছে বিক্রি করে দিতে পারো। আমরা তোমার বকরীর উপযুক্ত দাম দিয়ে দেবো। তা দিয়ে তুমি ইফতার কিনে খেতে পারবে।
রাখাল বলল, এই বকরী তো আমার নয়, আমার মালিকের।
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি তোমার মালিককে গিয়ে বলবে, পালের একটা বকরীকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে!
রাখাল তখন আসমানের দিকে আঙুল তুলে বলল, আমি না-হয় মিথ্যা বলে মালিকের চোখে ফাঁকি দেবো। কিন্তু আমার মালিকের যিনি মালিক (আরশের অধিপতি), তাকে আমি কীভাবে ফাঁকি দেবো? মাফ করবেন, এ কাজ আমাকে দিয়ে সম্ভব নয়!
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রাখালের তাকওয়া দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন।। এই রাখাল কতটুকুই বা শিক্ষিত ছিল? বাহ্যিকভাবে তার শিক্ষাদীক্ষা ছিল শূন্যের কোঠায়। কিন্তু সে দ্বীনের মূল আকিদা-বিশ্বাসের গোড়ায় পৌঁছুতে পেরেছে। আপনার বাড়িতে বিশাল বড় লাইব্রেরি রয়েছে। আলমারিগুলো বইপত্রে বোঝাই। আপনার লাইব্রেরি দেখে সকলেই আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় গদগদ হয়ে যায়। কিন্তু আপনি আল্লাহকে ভয় করেন না, আপনি যে আল্লাহর পর্যবেক্ষণের সীমানায় রয়েছেন তা ভুলে যাচ্ছেন। হারাম অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকছেন না, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখুন, আল্লাহর কাছে আপনার এই জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই। পক্ষান্তরে এই অশিক্ষিত রাখাল আল্লাহর কাছে আপনার চেয়ে অনেক বেশি প্রিয়; অনেক বেশি মর্যাদাবান। আজ এই রাখালের মতো ইস্পাতদৃঢ় ঈমান খুব প্রয়োজন আমাদের। আর-রাকিবের প্রতি এমন অগাধ আস্থা ভীষণ দরকার।
এমন দম্পতির দেখা মেলা ভার যারা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল; এমন সন্তানসন্ততি ও পরিবার-পরিজন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যারা সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির গুণে গুণান্বিত। আজ সততা, বিশ্বস্ততার বড়ই অভাব। চারদিকে শুধু বিশ্বাসভঙ্গের জয়জয়কার, খিয়ানত ও মিথ্যা অভিনয়ের দৌরাত্ম্য। আপনি দেখবেন কত দাঈ রয়েছে, দিনের বেলায় তারা মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করছে; সবাইকে ভালো ভালো উপদেশ দিচ্ছে-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ ...
হে মানব-সকল, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো।[১]
কিন্তু সেই তারাই আবার রাতের বেলায় পাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যে কারণে মানুষ তাদের কথা গ্রহণ করছে না।
তাই সততা ও আত্মার শুদ্ধতা হলো সবচেয়ে বড় জিনিস। অন্তর থেকেই যদি দ্বীনি চেতনা আপনাকে পথ দেখাতে না পারে, তাহলে তা নিছক অভিনয় ও শঠতা বৈ কিছু নয়।
আপনি নিজেই নিজের হিসাব কষে দেখুন। আপনি কি আমানতদারিতা রক্ষা করে চলেন? কারো সাথে আপনার লেনদেন হলো, তার নথিপত্র, সাক্ষী সব উপস্থিত। তাই সময়মতো আপনি অপরপক্ষের পাওনা বুঝিয়ে দিলেন। আপনি কি ভেবে নিয়েছেন, এটা আমানতদারিতা? শুধু এতটুকু কাজ আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ যেখানে দলিল-পত্র বা সাক্ষী বিদ্যমান সেখানে আপনি পাওনা বুঝিয়ে দিতে বাধ্য। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ না করলে তারা আপনার নামে আদালতে মামলা ঠুকে দেবে। আর আদালত আপনার কাছ থেকে তা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে ছাড়বে।
আল্লাহর কাছে প্রকৃত আমানতদার তো সেই ব্যক্তি, যে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই পাওনাদারের পাওনা বুঝিয়ে দেয়। দুনিয়ার কেউ জানবে না, পাওনাদার নিজেও হয়তো জানতে পারবে না, কিন্তু শুধু আল্লাহর ভয়েই তার পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার নাম আমানতদারিতা। আমি একবার সালাতের পর মসজিদে বসে আছি। এমন সময় একটি চিঠি এলো আমার নামে। খুলে দেখলাম চিঠিতে লেখা, শাইখ! আমাদের এখানে এক লোক মারা গেছেন। আমি তার কাছ থেকে ২০ হাজার পাউন্ড ধার করেছিলাম। কিন্তু এটা তার পরিবারের কেউ জানত না। তবু আমি পুরোটাই পরিশোধ করে দিয়েছি।
এটাই হলো আমানতদারিতা। কেউ জানে না; তারপরও কেবল আল্লাহর ভয়ে সে হকদারের হক আদায় করেছে। কারণ আল্লাহ মহান পর্যবেক্ষক, আর-রাকিব। অনেক মানুষই এভাবে অন্যের কাছে তাদের সম্পদ রেখে মারা যায়, স্ত্রী বা সন্তানেরা কেউ জানতে পারে না। ফলে মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদও মৃত্যুবরণ করে। সন্তানেরা বলে, আমরা আমাদের বাবার অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে কিছুই জানি না।
কিন্তু যারা বিশ্বাস করে আসমানি এই সতর্ক বার্তায়- 'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সবকিছুর পর্যবেক্ষক'-তারা কখনো মৃতের হক লুকোতে পারে না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের কাছে গিয়ে সম্পদ বুঝিয়ে দেয়।
একজন ঈমানদার ব্যবসায়ী কি কখনো তার পণ্যে ভেজাল মেশাতে পারে? পণ্যের কোনো দোষ থাকলে তা ক্রেতার কাছে গোপন করতে পারে?
মনে করুন, আপনি একজন তেল-বিক্রেতা। আপনার তেলের পাত্রে যদি একটি ইঁদুর মরে পড়ে থাকে, তবে আপনি কি ঐ তেল আল্লাহর বান্দাদের খাওয়াতে পারবেন? মহান রবের ওপর যদি আপনার ঈমান থেকে থাকে, তাহলে কীভাবে আপনি এই দোষ গোপন করে তা মানুষের কাছে বিক্রি করবেন?
মানুষের খাদ্যজাত গরু-ছাগলকে মোটাতাজাকরণে ব্যবহার করা হয় স্টেরয়েড হরমোন ও ইউরিয়ার মতো কিছু বিষাক্ত উপাদান। এরপর তা চড়া দামে বিক্রি করা হয় ভোক্তা আর ক্রেতাদের কাছে। আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সামান্য ভয়টুকু যাদের মধ্যে আছে, তারা কখনো মানুষ কিংবা পশুপাখির খাবারে এসব মেশাতে পারবে না!
দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই আমরা মুখোমুখি হই কত ধরনের খিয়ানত, ছলচাতুরি ও বিশ্বাসঘাতকতার। খাবারে ভেজালের সংমিশ্রণ, পণ্যমূল্য বাড়িয়ে বলার প্রতারণা, শঠতা ও লেনদেনে অস্বচ্ছতা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর জীবন থেকে মুক্তি পেতে গেলে অবশ্যই সকলকে আর-রাকিব নামটির মর্ম উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আল্লাহকে যে আর-রাকিব হিসেবে বিশ্বাস করে, তার জন্য আর কোনো পরিদর্শক বা নিয়ন্ত্রকের প্রয়োজন হয় না। কারণ আর-রাকিবের প্রতি বিশ্বাসই তাকে কর্মস্থলে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন করতে বাধ্য করে।
আমার পরিচিত এক ভাই ছিল, সে প্রতিদিন দুই-এক ঘণ্টা দেরি করে অফিসে যেত; আবার কাজের মাঝখানেও কিছু সময় বিশ্রাম নিত। মাস শেষে সে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বরাবর ছুটি চেয়ে দরখাস্ত করল। দরখাস্ত মঞ্জুরও হয়ে গেল। কিন্তু সে পরদিন থেকে অফিস করতে লাগল ছুটি না কাটিয়ে। ম্যানেজিং ডিরেক্টর জানতে চাইল, কী ব্যাপার? তুমি ছুটি নিয়ে আবার অফিসে এলে কেন?
সে উত্তর দিলো, স্যার! আমি প্রতিদিন অফিসে কিছুটা দেরি করে আসতাম। আমি আমার দেরি হওয়া সময়গুলো হিসাব করে দেখলাম, এক মাসে আমি যতটুকু দেরি করেছি তা তিনদিনের সমান।
অফিসের এমডি চোখের সামনে এই অনুপম আদর্শ এবং বিরল সততা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কারণ, যে সমাজে সে বাস করে, সে সমাজে সৎ মানুষ পাওয়া নিতান্তই দুষ্কর।
ঐ ভাইটি পরে আমাকে বলেছে, শাইখ! আমি যখন আপনার পরবর্তী দারসে হাজির হলাম, তখন দেখি আমাদের এমডি স্যারও দারসে এসেছেন!
আলহামদুলিল্লাহ। এটাও একটা খুশির সংবাদ। তার সততার নমুনা দেখে আরেক ভাই সত্যের সন্ধান পেয়েছে।
এজন্যই আমি ভাইদের খুব গুরুত্ব সহকারে একটি কথা বলে থাকি, আপনারা আল্লাহর নাম 'আর-রাকিব'-এর অর্থ অনুযায়ী নিজ জীবন পরিচালনা করুন। দেখবেন আপনার চলাফেরা, ওঠা-বসা, কথা-বার্তা সবকিছুই হয়ে যাবে নীরব এক দাওয়াত।
সরকারি হাসপাতালের অনেক ডাক্তার ভাইদের সাথে আমার পরিচয় আছে। হাসপাতালে তারা ফ্রি চিকিৎসা করেন। হার্ট, ব্রেইন ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অস্ত্রোপচার-সহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের দায়িত্ববোধ দেখুন। একজন রোগী দুই হাজার টাকা ভিজিট দিয়ে চিকিৎসা করায়, আরেকজন মানুষ ফ্রিতে চিকিৎসা নিতে আসে; অথচ তারা এই দুজনের চিকিৎসায় কোনো পার্থক্য করেন না। ফ্রি হওয়ার কারণে একজন অভাবী মানুষকে পর্যাপ্ত সেবাটুকু দিতে কখনো কার্পণ্য করেন না।
এক আল্লাহভীরু আলিমকে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে আমরা রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় নজরের হিফাজত করতে পারি?
আলিম উত্তর দিলেন, মনে রাখবে তোমার দৃষ্টি খিয়ানত করার আগেই আল্লাহ তোমাকে দেখে ফেলেছেন, তাঁর দৃষ্টি তোমাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তার সামনে গিয়েই তোমাকে দাঁড়াতে হবে; দৃষ্টির সামান্য খিয়ানতেরও হিসাব দিতে হবে!
আপনার মনে হতে পারে বর্তমান সময়ে কীভাবে দৃষ্টি হিফাজত করা সম্ভব? নারীরা সৌন্দর্য প্রদর্শন করে রাস্তায় চলাফেরা করে! অফিসে, মার্কেটে, শপিংয়ে সবখানেই তাদের অবাধ বিচরণ!
আপনার সান্ত্বনার জন্য বলছি, এই যুগেও আপনার মতো অনেক টগবগে যুবক রয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানের সামনে মাথা নত করে। মহামহিম আর-রাকিবকে ভালোবেসে তারা হারাম দৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে। লিফটে উঠতে গিয়ে যদি দেখে ভেতরে কেবল একজন মেয়ে, তখন তৃতীয় কোনো ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকে কিংবা লিফট ছেড়ে সিঁড়ি বেয়েই ওপরে উঠতে শুরু করে। লিফটে অল্প সময়ের জন্যও গায়রে মাহরামের সাথে নির্জনে থাকা তারা অপছন্দ করে। আপনার মতো একজন যুবক হয়ে সে যদি এভাবে আত্মসংযমের পথ বেছে নিতে পারে, তবে আপনি কেন পারবেন না? আল্লাহর এই আয়াতকে অন্তরে খোদাই করে নিন—
أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى *
সে কি বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তাকে দেখছেন? [১]
আল্লাহর নামের প্রতি বান্দার আদব
নিজের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, অনুভূতি-উপলব্ধি এবং প্রতিটি পদক্ষেপের মুহূর্তে মন-মস্তিষ্কে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির চেতনা লালন প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। তাই সব কাজে আল্লাহকে স্মরণ রাখুন।
ইবনু আতাউল্লাহ ইস্কান্দারি বলেন, 'সর্বোত্তম ইবাদত হলো সদা সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা।'
বিখ্যাত মনীষী আবু হাফস আমর ইবনু সালামা নিসাপুরি[২] বলেন, 'যখন তুমি মানুষের সামনে বসবে, তখন নিজ হৃদয়-আত্মার জন্য উপদেশদাতা হয়ে যাবে। তোমার সামনে লোকজনের ভিড় যেন তোমাকে প্রতারিত না করে; তারা দেখে তোমার বাহ্যিক অবস্থা; কিন্তু আল্লাহ পর্যবেক্ষণ করেন তোমার আত্মিক ও অভ্যন্তরের অবস্থা।'
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ এক লোককে বললেন, 'সর্বদা আল্লাহর ‘ধ্যানে মগ্ন থাকো!’
লোকটি বলল, ‘সেটা কীভাবে করব?’
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ উত্তর দিলেন, ‘সর্বদা এমনভাবে থাকো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ!’
চমৎকার এই দুআটি স্মৃতির কোটরে রেখে দিন-
اَللَّهُمَّ اجْعَلْنَا نَخْشَاكَ كأَنَّنَا نَرَاكَ
হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়ে আপনার ভয় দান করুন। আমাদেরকে এমন মগ্নতা দান করুন, যেন অনুভবে মনে হয়, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি!
আল্লাহর মুরাকাবা বা আল্লাহর ধ্যানে মগ্নতা একটি বিশাল মর্যাদার স্তর; যে ব্যক্তি এ স্তরে উন্নীত হতে পারল, সে তো জান্নাতে পৌঁছে গেল। দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত সুখ-সাফল্য ধরা দিলো তার দোরগোড়ায়। তাই আল্লাহর আদেশের ওপর অটল-অবিচল থাকুন। মগ্ন থাকুন তাঁর ধ্যানে। আপনি ভুলে গেলেও তিনি আপনাকে ভুলবেন না। তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি থেকে কোথায় পালাবেন আপনি?
টিকাঃ
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ১
[১] সুরা হ্রদ, আয়াত: ৯৩
[২] সুরা ফাজর, আয়াত : ১৪
[৩] সহিহ বুখারি: ৩৭১৩
[১] সুরা কাফ, আয়াত: ১৮
[২] সুরা কাফ, আয়াত: ১৬
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১৪৭
[১] সুরা ফাতির, আয়াত: ৩৮
[১] সূরা যিলযাল, আয়াত: ৭-৮
[১] সুনানুন নাসায়ি: ৭১৬; মুসনাদু আহমাদ: ৬৫৭৫
[১] ইতহাফ সাদাতিল মুতকিনিন বিশারহি ইহইয়াই উলুমিদ্দিন, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা : ১৮১
[২] সূরা আরাফ, আয়াত: ৩১
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১
[১] সূরা আলাক, আয়াত: ১৪
[২] মৃত্যু: ২৬৪ হিজরি
রাতের বেলা ময়লা ফেলতে বেরিয়েছেন আপনি। ডাস্টবিনটা বেশ দূরে। অতদূর না গিয়ে ময়লা ফেললেন ঠিক প্রতিবেশীর বাড়ির দোরগোড়ায়। এদিকটা বেশ অন্ধকার। কে কী করছে বোঝার উপায় নেই। ভাবছেন, কেউ জানবে না, কে করল কাজটা। অথচ একজন ঠিকই দেখেছেন, আপনার এই হীন কর্ম। তিনি আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী আল্লাহ।
আপনি যদি জানতে পারেন সর্বদা আপনাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে; আপনার উপরস্থ কেউ সবসময় আপনাকে চোখে চোখে রাখছে, তখন আপনি কী করবেন? নিশ্চয় খুব সতর্ক হয়ে যাবেন। সুস্থ বিবেকসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার একজন স্রষ্টা রয়েছে। একজন বিশ্বাসী মুমিন হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার স্রষ্টা মহান আল্লাহ; যিনি মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী। অতএব, নিশ্চিত বিশ্বাস করুন, আপনি ২৪ ঘণ্টা রয়েছেন আপনার স্রষ্টার পর্যবেক্ষণের অধীনে। আপনার মতোই একজন মানুষের উপস্থিতি, পর্যবেক্ষণ টের পেয়ে আপনি চমকে ওঠেন, পরিণামের ভয়ে আঁতকে ওঠেন, নিয়ন্ত্রিত হয়ে যান; তাহলে মহান পর্যবেক্ষকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আওতায় আপনি কীভাবে লাগামহীন হয়ে পড়েন? আপনার রব বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا )
হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকেও সৃষ্টি করেছেন; যিনি তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন (রাকিব)।
মহামহিমাময় আর-রাকিবের সান্নিধ্যে
একবার আমি এক দোকানে ঢুকে আমার প্রয়োজনীয় একটি বস্তু চাইলাম। কিন্তু দোকানদার সেটা দিতে পারল না। আমি বেরিয়ে যাব, এমন সময় দোকানি বলল, একটু কষ্ট করে যদি গুদামে যেতেন, সেখানে পাওয়া যেতে পারে। দোকান ছিল নিচতলায় আর গুদাম চতুর্থ তলায়। গিয়ে দেখলাম সেখানে একজন হিসাবরক্ষক ও ব্যবস্থাপক টেবিলের সামনে বসে আছে। আর দুটি সিসি ক্যামেরা তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার বুঝতে দেরি হলো না, নিচতলায় মালিক তাকে মনিটরে পর্যবেক্ষণ করছে।
তো এই হিসাবরক্ষক তার দিকে তাকিয়ে থাকা ক্যামেরার কারণে একটু নড়াচড়াও করতে পারছে না। মালিকের পর্যবেক্ষণের কারণে কাজের সময়ে তার একটু খাওয়াদাওয়া অথবা অন্য কোনো প্রয়োজনে উঠে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আরেকবার এক ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখলাম সবগুলো রুম স্বচ্ছ কাচ দিয়ে তৈরি করা। যেন জিএম সকলকে নজরদারির আওতায় রাখতে পারে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের নজরদারি আর পর্যবেক্ষণের ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত যেন অনৈতিক কাজ করার শক্তিই সে হারিয়ে ফেলেছে।
আবার ধরুন ট্রাফিক আইনের কথা। কোনো কোনো দেশে ট্রাফিক আইন খুবই কড়া। কেউ সর্বোচ্চ গতিসীমা অতিক্রম করলেই সাথে সাথে তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারিতে তা বাস্তবায়নও করা হয়। এই নজরদারির কারণে কোনো ড্রাইভারের সর্বোচ্চ গতিসীমা লঙ্ঘন করার কোনো সুযোগ নেই।
সামান্য মানুষের পর্যবেক্ষণে কত তটস্থ থাকেন আপনি! অথচ আপনার ওপর রয়েছে মহাশক্তিধরের পর্যবেক্ষণ; যিনি নজর রাখেন আপনার ওপর, উপরস্থ কর্মকর্তার ওপর, সবার ওপর, তিনি আপনার রব, আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী।
আর-রাকিব শব্দটি অভিধানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়—
এক. আর-রাকিব অর্থ অপেক্ষমাণ। আল্লাহ বলেছেন-
وَارْتَقِبُوا إِنِّي مَعَكُمْ رَقِيبٌ
সুতরাং তোমরা অপেক্ষা করো, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ [১]
এখানে 'অপেক্ষমাণ' বলতে গতিবিধি পর্যবেক্ষণকে বোঝানো হয়েছে। যেমন : আল্লাহ বলেন-
إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ
নিশ্চয় আপনার প্রতিপালক (বান্দাদের) গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন।[২]
দুই. আর-রাকিব অর্থ সংরক্ষক।
বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
ارْقُبُوا مُحَمَّدًا فِي أَهْلِ بَيْتِهِ
তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা সংরক্ষণ করো তার পরিবারবর্গের মাধ্যমে [৩]
অর্থাৎ তার পরিবারের প্রতি সদাচরণ কর। তাদের হক আদায়ে যত্নবান হও।
তিন. আর-রাকিবের আরেক অর্থ প্রহরী, অগ্রবর্তী সৈনিক, আদর্শ প্রতিনিধি; পিতার যোগ্য বংশধর।
যে ফেরেশতা আমলনামা সংরক্ষণ করেন তাকেও বলা হয় 'রাকিব' তথা প্রহরী বা প্রতিনিধি।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য নিযুক্ত রয়েছে তৎপর প্রহরী [১]
আল্লাহর সাথে যখন ব্যবহৃত হয় আর-রাকিব, তখন তার অর্থ হয় মহাপর্যবেক্ষক। যিনি সবকিছু জানেন; সবকিছু দেখেন। রাত্রে ঘুমানোর সময় আপনি কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। মনে মনে ঠিক করলেন, আগামীকাল অমুক কাজটি করবেন। আপনার এই কল্পনা আপনি ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঠিকই সব জানেন। কুরআনে বর্ণিত-
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, আমি তা জানি। আমি তো তার গ্রীবাস্থিত ধমনির চেয়েও নিকটবর্তী [২]
আপনার নীরবতা এবং উচ্চৈঃস্বর তার কাছে সমান। জনসম্মুখে আপনার ঘোষণা এবং নিঃশব্দ উচ্চারণ তার কাছে একই। মুখ ফুটে বের হওয়া আর অন্তরে লুকিয়ে রাখা সবই তার কাছে সমান। কারণ তিনি আর-রাকিব, পর্যবেক্ষণকারী।
আল্লাহর এই নামটি আপনার সবচেয়ে কাছের নাম। আপনি যখনই বিশ্বাস করে ফেলবেন, আল্লাহ আপনার সবকিছু দেখছেন, তখন নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর হুকুম আঁকড়ে ধরবেন। আর আল্লাহর হুকুম যদি আপনি আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হন, নিশ্চিত আপনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে মুক্তি পেয়ে যাবেন। আল্লাহ বলেন-
مَّا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا
যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং ঈমান আনয়ন করো, তাহলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহর কী লাভ? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞ [১]
আল্লাহর এই নামটি এবং এই নামের প্রতি ঈমান আপনার সৌভাগ্যের সিঁড়ি। এই একটি নামই একজন মুমিনের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে যথেষ্ট। মুমিন যখন এই নামের ওপর ঈমান আনে, তখন সে আল্লাহর হুকুমের সামনে নত হয়; আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।
আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আর-রাকিব আপনাকে দেখছেন।
আপনি ঘরে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি হাসপাতালে রোগী দেখছেন, রোগীকে সেবা দিচ্ছেন, আপনি কিন্তু রয়েছেন তাঁর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে।
আপনি যদি একজন আইনজীবী হয়ে থাকেন, নিজের আত্মার হিসাব নিন। আপনি মক্কেলের কাছ থেকে যে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক নিয়েছেন, তার হক আদায় করেছেন তো? সংশ্লিষ্ট আইনের সকল ধারা, উপধারা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গভীরভাবে পড়াশোনা করেই মামলায় হাত দিয়েছেন তো? নাকি কোনো রকম চোখ বুলিয়েই হাজির হয়েছেন কোর্ট-চত্বরে?
আপনি একজন ডাক্তার। রোগীর কাছ থেকে ফি নিয়েছেন আপনার চাহিদামতো। কিন্তু তার হক আদায় করছেন কতটুকু? এটা কি শুধু আপনার অর্থ উপার্জনের বাণিজ্য নাকি আপনি সেবার মানসিকতাও লালন করেন? আপনি রোগীর অস্থিরতা, সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করছেন তো? নাকি তাকে উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দিচ্ছেন? ভুলে যাবেন না, আপনার প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে! আপনি রয়েছেন সরাসরি আপনার মালিকের পর্যবেক্ষণ সীমানায়!
যাদের অস্থি-মজ্জা এবং অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুতে আর-রাকিবের উপস্থিতি, তারা কখনো বেখেয়াল হয় না। তারা সর্বদা সৌহার্দপূর্ণ, কোমল আচরণ করে। নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিতেই বেশি ভালোবাসে। আপনার সামনে ফলমূলের একটি বড় থালা রাখা হলো, আর-রাকিবের প্রতি ঈমানের দাবি হলো, আপনি আরেক ভাইকে অগ্রাধিকার দেবেন। তার দিকেই সুমিষ্ট ফলটি এগিয়ে দেবেন। আনারের বড় টসটসে দানাগুলো তার দিকে বাড়িয়ে দেবেন। কারণ, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। তিনি আপনার কাজ এবং অন্তরের ইচ্ছাও লক্ষ করছেন।
কুরআনে বর্ণিত-
ع إِنَّ اللَّهَ عَالِمُ غَيْبِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ )
নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল অদৃশ্য বিষয়ে অবগত আছেন। অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে তিনি সবিশেষ অবহিত।[১]
আল্লাহ আপনার অনন্য সঙ্গী
আপনার বন্ধুকে আপনি প্রচণ্ড ভালোবাসেন, তার সাথে চলাফেরা, ওঠাবসা করতে পছন্দ করেন। কিন্তু আপনার যত কাছের বন্ধুই হোক না কেন, তার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি আপনি সহ্য করতে পারবেন না। আপনি তার সাথে চলতে চলতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়বেন। খুব কাছের বন্ধুর উপস্থিতিও কখনো কখনো অসহ্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু আল্লাহ আপনার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আপনি কখনো আল্লাহর উপস্থিতিতে বিরক্ত হয়েছেন? কারণ আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঙ্গ দান করেন অতি সূক্ষ্ম ও সুকোমলভাবে। তাই আপনি টের পান না তাঁর উপস্থিতি। অথচ তিনি রয়েছেন আপনার সাথে, সবখানে; ঘরে-বাইরে, দেশে-বিদেশে, নির্জনে-প্রকাশ্যে সর্বদা তিনি রয়েছেন আপনার সঙ্গী হয়ে।
তাই আপনিও সদা-সর্বদা আল্লাহকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে নিন। ভেবে নিন আল্লাহ আপনার সামনেই রয়েছেন। হাদিসে এটাকে বলা হয়েছে 'ইহসান'। আপনি উন্নীত হোন ইহসানের উচ্চতায়।
কোনো শ্রদ্ধেয় বড় ব্যক্তিত্বের সাথে সাক্ষাতের সময় আপনি সাধারণত নিজেকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পোশাক-পরিচ্ছদ, আদবকেতা ঠিক আছে কি না সেদিকে খুব গুরুত্ব প্রদান করেন। এরপর তার সাথে সাক্ষাতের সময় ভদ্রতার সাথে শ্রদ্ধাজড়িত কণ্ঠে শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানিয়ে থাকেন। কিন্তু আল্লাহর মতো মহান ও পবিত্র সত্তা সর্বদা আপনার সাথে রয়েছেন, তাঁর প্রতি আপনি কি এতটুকুও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন? একান্ত তাঁর জন্য আদব ঠিক রাখেন?
অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি আল্লাহর ভয়ে তটস্থ থাকবে তার জীবন ও জীবনধারা তত বেশি সুন্দর ও কেতাদুরস্ত হবে। কারণ, আল্লাহ সর্বদাই আপনার সাথে রয়েছেন; সর্বদা তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এক বেদুইন ব্যক্তি নবিজির কাছে এসে আবেদন করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি সুরা শিক্ষা দিন যা সবদিক থেকে পরিপূর্ণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে 'সুরা যিলযাল' পড়িয়ে দিলেন। যার শেষটা ছিল-
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًا يَرَهُ
কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে তা-ও সে দেখতে পাবে।[১]
অতঃপর বেদুইন লোকটি বলল, ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য-সহ পাঠিয়েছেন—এর বেশি আমার আর প্রয়োজন নেই। এরপর লোকটি চলে গেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লোকটি সফলকাম হয়েছে, লোকটি কামিয়াব হয়েছে।[১]
আপনি চিন্তা করে দেখুন লোকটি সম্পর্কে আল্লাহর নবি এই মন্তব্য কেন করলেন? কারণ আপনি যদি জানতে পারেন আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ এবং অণু-পরিমাণ কর্মও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তখন আপনি কি পারবেন কারো সাথে প্রতারণা করতে? কারো সাথে মিথ্যা বলতে? পারবেন কারো ক্ষতি করতে? কিংবা কোনো অনৈতিক কাজ করতে? একজন মানুষের নজরদারিতে থেকেই যেখানে আপনি সজাগ হয়ে যান, অতি সন্তর্পণে সবকিছু সামাল দেবার চেষ্টা করেন, সেখানে মহান স্রষ্টার সামনে কীভাবে আপনি লাগামহীন হবেন?
এই একটি নাম এবং তার অন্তর্নিহিত আবেদন ও বার্তা আপনাকে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য করবে। প্রবৃত্তির লিপ্সা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি জোগাবে। আর যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখে ফেলল, সে দ্বীনের শক্ত বুনিয়াদের ওপর ঈমানি জীবনের দালান দাঁড় করিয়ে ফেলল। তাই আল্লাহর এই পরম সুন্দর নাম 'আর-রাকিব'-এর তন্ময়তায় মগ্ন থাকা হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা; আজীবনের উত্তম নসিহত।
লুকোনোর কোনো জায়গা নেই
ইমাম রাযি রাহিমাহুল্লাহ একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। জনৈক শাইখ তার এক ছোট্ট ছাত্রকে খুব বেশি স্নেহ করতেন। এতে অন্য ছাত্ররা কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়। শাইখ একদিন ভাবলেন, তাদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সবাইকে একত্র করে প্রত্যেকের হাতে একটি করে পাখি দিলেন এবং বললেন, তোমরা নিজেদের পাখিটি এমন জায়গায় নিয়ে জবাই করবে, যেখানে কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না।
প্রত্যেকেই একেক দিকে চলে গেল; যেন কেউ কাউকে দেখতে না পায়। ছাত্ররা সবাই নিজের মতো করে লুকিয়ে লুকিয়ে যার যার পাখি জবাই করে নিয়ে এলো। কিন্তু সেই ছোট্ট ছাত্রটি ফিরে এলো পাখিটি জবাই না করেই।
বিনীত সুরে উস্তাযকে বলল, শাইখ! আপনি বলেছেন, এমন স্থানে গিয়ে পাখিটি জবাই করতে, যেখান কেউ দেখবে না। কিন্তু আমি এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাইনি যেখানে আল্লাহ আমাকে দেখতে পাবেন না!
শাইখ মুচকি হেসে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার বুঝলে তো! এ কারণেই আমি ওকে একটু বেশিই স্নেহ করি।
তাই আপনি যেখানেই লুকিয়ে থাকুন না কেন, যেখানেই আত্মগোপন করুন না কেন, আল্লাহর শক্তিশালী দৃষ্টি থেকে দূরে কোথাও যেতে পারবেন না।[১]
আল্লাহ তাআলা আপনার দিকে সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রেখে এই কথাটিই শিক্ষা দিতে চান যে, হে বান্দা! তুমি কি আমার ব্যাপারে লজ্জা করো না? তুমি একদিন আমার সামনে উপস্থিত হবে, সেদিনটিকে তুমি কি ভয় করো না? তোমার ফিরে আসার সময় কি এখনো হয়নি?
আপনি সালাতে দাঁড়ানোর সময় কল্পনা করুন, আল্লাহ আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। সালাতে দাঁড়ানোর পূর্বেই পাক-পবিত্র ও উত্তম পোশাক পরে নিন। সামান্য কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আপনি আপনার উন্নত মানের পোশাক পরে বের হন। অথচ সালাত আদায়ের সময় যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ান, তখন আপনি পরেন নিম্নমানের পোশাক। কেন আপনার এই দ্বৈত নীতি? আপনি কি আল্লাহর সামনে উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না? আপনি কি বিশ্বাস করেন না, সালাতে দাঁড়ানো মানে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সামনেই দাঁড়ানো? সালাফগণ সালাতের পূর্বে চুল-দাড়ি আঁচড়িয়ে পরিপাটি হয়ে নিতেন। কারণ তারা উপস্থিত হতে যাচ্ছেন মহান রবের সামনে। মহামহিম আল্লাহ বলেন-
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ )
হে আদম সন্তান, তোমরা সালাতের সময় সৌন্দর্য গ্রহণ করো। তোমরা পানাহার করো কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।[২]
এই আলোচনা দ্বারা আমি আপনার সমালোচনা করছি না। আমি শুধু আপনার ঘুমন্ত চেতনাকে একটু জাগিয়ে তুলতে চাচ্ছি। আপনি দুনিয়াবি কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় যদি সুন্দর ও পরিপাটি পোশাক পরতে পারেন, তবে আল্লাহর সামনে কেন পারবেন না? মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর। জুমআর দিন মুমিনের ঈদ; আনন্দোৎসব। আর আপনি হলেন সেই উৎসবের দিনে আল্লাহর ঘরের মেহমান। আপনিই বলুন, এমন বরকতপূর্ণ মাহফিলে নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও নিম্নমানের পোশাক পরে যাওয়া কি সমীচীন?
তাই নবিজির সুন্নাহ হলো, জুমআর দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে, উত্তম পোশাক পরিধান করে মসজিদে গমন করা।
রাখাল-বালকের আল্লাহভীরুতা
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার সাথি-সঙ্গীদের নিয়ে মদিনার অদূরে কোথাও যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দুপুর বেলা এক স্থানে যাত্রাবিরতি নিলেন বিশ্রামের জন্য। সবাই মিলে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য দস্তরখান বিছিয়েছেন। ঠিক সে সময় দেখা গেল, একপাল বকরী-সহ এক রাখাল যাচ্ছে।
ইবনু উমারের ইচ্ছে হলো, তিনি রাখালের আল্লাহভীরুতা পরীক্ষা করে দেখবেন। তাই রাখালকে ডেকে বললেন, এসো আমাদের সাথে খাবারে শরিক হও।
রাখাল উত্তর দিলো, আমি খেতে পারব না এখন। আমি আজ সিয়াম রেখেছি।
ইবনু উমার বললেন, তুমি একটা বকরী আমাদের কাছে বিক্রি করে দিতে পারো। আমরা তোমার বকরীর উপযুক্ত দাম দিয়ে দেবো। তা দিয়ে তুমি ইফতার কিনে খেতে পারবে।
রাখাল বলল, এই বকরী তো আমার নয়, আমার মালিকের।
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি তোমার মালিককে গিয়ে বলবে, পালের একটা বকরীকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে!
রাখাল তখন আসমানের দিকে আঙুল তুলে বলল, আমি না-হয় মিথ্যা বলে মালিকের চোখে ফাঁকি দেবো। কিন্তু আমার মালিকের যিনি মালিক (আরশের অধিপতি), তাকে আমি কীভাবে ফাঁকি দেবো? মাফ করবেন, এ কাজ আমাকে দিয়ে সম্ভব নয়!
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রাখালের তাকওয়া দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন।। এই রাখাল কতটুকুই বা শিক্ষিত ছিল? বাহ্যিকভাবে তার শিক্ষাদীক্ষা ছিল শূন্যের কোঠায়। কিন্তু সে দ্বীনের মূল আকিদা-বিশ্বাসের গোড়ায় পৌঁছুতে পেরেছে। আপনার বাড়িতে বিশাল বড় লাইব্রেরি রয়েছে। আলমারিগুলো বইপত্রে বোঝাই। আপনার লাইব্রেরি দেখে সকলেই আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় গদগদ হয়ে যায়। কিন্তু আপনি আল্লাহকে ভয় করেন না, আপনি যে আল্লাহর পর্যবেক্ষণের সীমানায় রয়েছেন তা ভুলে যাচ্ছেন। হারাম অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকছেন না, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখুন, আল্লাহর কাছে আপনার এই জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই। পক্ষান্তরে এই অশিক্ষিত রাখাল আল্লাহর কাছে আপনার চেয়ে অনেক বেশি প্রিয়; অনেক বেশি মর্যাদাবান। আজ এই রাখালের মতো ইস্পাতদৃঢ় ঈমান খুব প্রয়োজন আমাদের। আর-রাকিবের প্রতি এমন অগাধ আস্থা ভীষণ দরকার।
এমন দম্পতির দেখা মেলা ভার যারা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল; এমন সন্তানসন্ততি ও পরিবার-পরিজন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যারা সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির গুণে গুণান্বিত। আজ সততা, বিশ্বস্ততার বড়ই অভাব। চারদিকে শুধু বিশ্বাসভঙ্গের জয়জয়কার, খিয়ানত ও মিথ্যা অভিনয়ের দৌরাত্ম্য। আপনি দেখবেন কত দাঈ রয়েছে, দিনের বেলায় তারা মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করছে; সবাইকে ভালো ভালো উপদেশ দিচ্ছে-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ ...
হে মানব-সকল, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো।[১]
কিন্তু সেই তারাই আবার রাতের বেলায় পাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যে কারণে মানুষ তাদের কথা গ্রহণ করছে না।
তাই সততা ও আত্মার শুদ্ধতা হলো সবচেয়ে বড় জিনিস। অন্তর থেকেই যদি দ্বীনি চেতনা আপনাকে পথ দেখাতে না পারে, তাহলে তা নিছক অভিনয় ও শঠতা বৈ কিছু নয়।
আপনি নিজেই নিজের হিসাব কষে দেখুন। আপনি কি আমানতদারিতা রক্ষা করে চলেন? কারো সাথে আপনার লেনদেন হলো, তার নথিপত্র, সাক্ষী সব উপস্থিত। তাই সময়মতো আপনি অপরপক্ষের পাওনা বুঝিয়ে দিলেন। আপনি কি ভেবে নিয়েছেন, এটা আমানতদারিতা? শুধু এতটুকু কাজ আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ যেখানে দলিল-পত্র বা সাক্ষী বিদ্যমান সেখানে আপনি পাওনা বুঝিয়ে দিতে বাধ্য। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ না করলে তারা আপনার নামে আদালতে মামলা ঠুকে দেবে। আর আদালত আপনার কাছ থেকে তা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে ছাড়বে।
আল্লাহর কাছে প্রকৃত আমানতদার তো সেই ব্যক্তি, যে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই পাওনাদারের পাওনা বুঝিয়ে দেয়। দুনিয়ার কেউ জানবে না, পাওনাদার নিজেও হয়তো জানতে পারবে না, কিন্তু শুধু আল্লাহর ভয়েই তার পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার নাম আমানতদারিতা। আমি একবার সালাতের পর মসজিদে বসে আছি। এমন সময় একটি চিঠি এলো আমার নামে। খুলে দেখলাম চিঠিতে লেখা, শাইখ! আমাদের এখানে এক লোক মারা গেছেন। আমি তার কাছ থেকে ২০ হাজার পাউন্ড ধার করেছিলাম। কিন্তু এটা তার পরিবারের কেউ জানত না। তবু আমি পুরোটাই পরিশোধ করে দিয়েছি।
এটাই হলো আমানতদারিতা। কেউ জানে না; তারপরও কেবল আল্লাহর ভয়ে সে হকদারের হক আদায় করেছে। কারণ আল্লাহ মহান পর্যবেক্ষক, আর-রাকিব। অনেক মানুষই এভাবে অন্যের কাছে তাদের সম্পদ রেখে মারা যায়, স্ত্রী বা সন্তানেরা কেউ জানতে পারে না। ফলে মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদও মৃত্যুবরণ করে। সন্তানেরা বলে, আমরা আমাদের বাবার অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে কিছুই জানি না।
কিন্তু যারা বিশ্বাস করে আসমানি এই সতর্ক বার্তায়- 'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সবকিছুর পর্যবেক্ষক'-তারা কখনো মৃতের হক লুকোতে পারে না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের কাছে গিয়ে সম্পদ বুঝিয়ে দেয়।
একজন ঈমানদার ব্যবসায়ী কি কখনো তার পণ্যে ভেজাল মেশাতে পারে? পণ্যের কোনো দোষ থাকলে তা ক্রেতার কাছে গোপন করতে পারে?
মনে করুন, আপনি একজন তেল-বিক্রেতা। আপনার তেলের পাত্রে যদি একটি ইঁদুর মরে পড়ে থাকে, তবে আপনি কি ঐ তেল আল্লাহর বান্দাদের খাওয়াতে পারবেন? মহান রবের ওপর যদি আপনার ঈমান থেকে থাকে, তাহলে কীভাবে আপনি এই দোষ গোপন করে তা মানুষের কাছে বিক্রি করবেন?
মানুষের খাদ্যজাত গরু-ছাগলকে মোটাতাজাকরণে ব্যবহার করা হয় স্টেরয়েড হরমোন ও ইউরিয়ার মতো কিছু বিষাক্ত উপাদান। এরপর তা চড়া দামে বিক্রি করা হয় ভোক্তা আর ক্রেতাদের কাছে। আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সামান্য ভয়টুকু যাদের মধ্যে আছে, তারা কখনো মানুষ কিংবা পশুপাখির খাবারে এসব মেশাতে পারবে না!
দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই আমরা মুখোমুখি হই কত ধরনের খিয়ানত, ছলচাতুরি ও বিশ্বাসঘাতকতার। খাবারে ভেজালের সংমিশ্রণ, পণ্যমূল্য বাড়িয়ে বলার প্রতারণা, শঠতা ও লেনদেনে অস্বচ্ছতা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর জীবন থেকে মুক্তি পেতে গেলে অবশ্যই সকলকে আর-রাকিব নামটির মর্ম উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আল্লাহকে যে আর-রাকিব হিসেবে বিশ্বাস করে, তার জন্য আর কোনো পরিদর্শক বা নিয়ন্ত্রকের প্রয়োজন হয় না। কারণ আর-রাকিবের প্রতি বিশ্বাসই তাকে কর্মস্থলে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন করতে বাধ্য করে।
আমার পরিচিত এক ভাই ছিল, সে প্রতিদিন দুই-এক ঘণ্টা দেরি করে অফিসে যেত; আবার কাজের মাঝখানেও কিছু সময় বিশ্রাম নিত। মাস শেষে সে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বরাবর ছুটি চেয়ে দরখাস্ত করল। দরখাস্ত মঞ্জুরও হয়ে গেল। কিন্তু সে পরদিন থেকে অফিস করতে লাগল ছুটি না কাটিয়ে। ম্যানেজিং ডিরেক্টর জানতে চাইল, কী ব্যাপার? তুমি ছুটি নিয়ে আবার অফিসে এলে কেন?
সে উত্তর দিলো, স্যার! আমি প্রতিদিন অফিসে কিছুটা দেরি করে আসতাম। আমি আমার দেরি হওয়া সময়গুলো হিসাব করে দেখলাম, এক মাসে আমি যতটুকু দেরি করেছি তা তিনদিনের সমান।
অফিসের এমডি চোখের সামনে এই অনুপম আদর্শ এবং বিরল সততা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কারণ, যে সমাজে সে বাস করে, সে সমাজে সৎ মানুষ পাওয়া নিতান্তই দুষ্কর।
ঐ ভাইটি পরে আমাকে বলেছে, শাইখ! আমি যখন আপনার পরবর্তী দারসে হাজির হলাম, তখন দেখি আমাদের এমডি স্যারও দারসে এসেছেন!
আলহামদুলিল্লাহ। এটাও একটা খুশির সংবাদ। তার সততার নমুনা দেখে আরেক ভাই সত্যের সন্ধান পেয়েছে।
এজন্যই আমি ভাইদের খুব গুরুত্ব সহকারে একটি কথা বলে থাকি, আপনারা আল্লাহর নাম 'আর-রাকিব'-এর অর্থ অনুযায়ী নিজ জীবন পরিচালনা করুন। দেখবেন আপনার চলাফেরা, ওঠা-বসা, কথা-বার্তা সবকিছুই হয়ে যাবে নীরব এক দাওয়াত।
সরকারি হাসপাতালের অনেক ডাক্তার ভাইদের সাথে আমার পরিচয় আছে। হাসপাতালে তারা ফ্রি চিকিৎসা করেন। হার্ট, ব্রেইন ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অস্ত্রোপচার-সহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের দায়িত্ববোধ দেখুন। একজন রোগী দুই হাজার টাকা ভিজিট দিয়ে চিকিৎসা করায়, আরেকজন মানুষ ফ্রিতে চিকিৎসা নিতে আসে; অথচ তারা এই দুজনের চিকিৎসায় কোনো পার্থক্য করেন না। ফ্রি হওয়ার কারণে একজন অভাবী মানুষকে পর্যাপ্ত সেবাটুকু দিতে কখনো কার্পণ্য করেন না।
এক আল্লাহভীরু আলিমকে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে আমরা রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় নজরের হিফাজত করতে পারি?
আলিম উত্তর দিলেন, মনে রাখবে তোমার দৃষ্টি খিয়ানত করার আগেই আল্লাহ তোমাকে দেখে ফেলেছেন, তাঁর দৃষ্টি তোমাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তার সামনে গিয়েই তোমাকে দাঁড়াতে হবে; দৃষ্টির সামান্য খিয়ানতেরও হিসাব দিতে হবে!
আপনার মনে হতে পারে বর্তমান সময়ে কীভাবে দৃষ্টি হিফাজত করা সম্ভব? নারীরা সৌন্দর্য প্রদর্শন করে রাস্তায় চলাফেরা করে! অফিসে, মার্কেটে, শপিংয়ে সবখানেই তাদের অবাধ বিচরণ!
আপনার সান্ত্বনার জন্য বলছি, এই যুগেও আপনার মতো অনেক টগবগে যুবক রয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানের সামনে মাথা নত করে। মহামহিম আর-রাকিবকে ভালোবেসে তারা হারাম দৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে। লিফটে উঠতে গিয়ে যদি দেখে ভেতরে কেবল একজন মেয়ে, তখন তৃতীয় কোনো ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকে কিংবা লিফট ছেড়ে সিঁড়ি বেয়েই ওপরে উঠতে শুরু করে। লিফটে অল্প সময়ের জন্যও গায়রে মাহরামের সাথে নির্জনে থাকা তারা অপছন্দ করে। আপনার মতো একজন যুবক হয়ে সে যদি এভাবে আত্মসংযমের পথ বেছে নিতে পারে, তবে আপনি কেন পারবেন না? আল্লাহর এই আয়াতকে অন্তরে খোদাই করে নিন—
أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى *
সে কি বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তাকে দেখছেন? [১]
আল্লাহর নামের প্রতি বান্দার আদব
নিজের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, অনুভূতি-উপলব্ধি এবং প্রতিটি পদক্ষেপের মুহূর্তে মন-মস্তিষ্কে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির চেতনা লালন প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। তাই সব কাজে আল্লাহকে স্মরণ রাখুন।
ইবনু আতাউল্লাহ ইস্কান্দারি বলেন, 'সর্বোত্তম ইবাদত হলো সদা সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা।'
বিখ্যাত মনীষী আবু হাফস আমর ইবনু সালামা নিসাপুরি[২] বলেন, 'যখন তুমি মানুষের সামনে বসবে, তখন নিজ হৃদয়-আত্মার জন্য উপদেশদাতা হয়ে যাবে। তোমার সামনে লোকজনের ভিড় যেন তোমাকে প্রতারিত না করে; তারা দেখে তোমার বাহ্যিক অবস্থা; কিন্তু আল্লাহ পর্যবেক্ষণ করেন তোমার আত্মিক ও অভ্যন্তরের অবস্থা।'
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ এক লোককে বললেন, 'সর্বদা আল্লাহর ‘ধ্যানে মগ্ন থাকো!’
লোকটি বলল, ‘সেটা কীভাবে করব?’
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ উত্তর দিলেন, ‘সর্বদা এমনভাবে থাকো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ!’
চমৎকার এই দুআটি স্মৃতির কোটরে রেখে দিন-
اَللَّهُمَّ اجْعَلْنَا نَخْشَاكَ كأَنَّنَا نَرَاكَ
হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়ে আপনার ভয় দান করুন। আমাদেরকে এমন মগ্নতা দান করুন, যেন অনুভবে মনে হয়, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি!
আল্লাহর মুরাকাবা বা আল্লাহর ধ্যানে মগ্নতা একটি বিশাল মর্যাদার স্তর; যে ব্যক্তি এ স্তরে উন্নীত হতে পারল, সে তো জান্নাতে পৌঁছে গেল। দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত সুখ-সাফল্য ধরা দিলো তার দোরগোড়ায়। তাই আল্লাহর আদেশের ওপর অটল-অবিচল থাকুন। মগ্ন থাকুন তাঁর ধ্যানে। আপনি ভুলে গেলেও তিনি আপনাকে ভুলবেন না। তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি থেকে কোথায় পালাবেন আপনি?
টিকাঃ
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ১
[১] সুরা হ্রদ, আয়াত: ৯৩
[২] সুরা ফাজর, আয়াত : ১৪
[৩] সহিহ বুখারি: ৩৭১৩
[১] সুরা কাফ, আয়াত: ১৮
[২] সুরা কাফ, আয়াত: ১৬
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১৪৭
[১] সুরা ফাতির, আয়াত: ৩৮
[১] সূরা যিলযাল, আয়াত: ৭-৮
[১] সুনানুন নাসায়ি: ৭১৬; মুসনাদু আহমাদ: ৬৫৭৫
[১] ইতহাফ সাদাতিল মুতকিনিন বিশারহি ইহইয়াই উলুমিদ্দিন, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা : ১৮১
[২] সূরা আরাফ, আয়াত: ৩১
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১
[১] সূরা আলাক, আয়াত: ১৪
[২] মৃত্যু: ২৬৪ হিজরি
📄 আল-বাসির : সর্বদ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা
মিশমিশে কালো এক অন্ধকার পথ। সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ছোট্ট একটি কালো পিঁপড়া। পথিক জানতেও পারবে না, কখন সে নিজের অজান্তে পিঁপড়াটিকে মাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এমন এক সত্তা আছেন, যিনি দেখার জন্য আলোর মুখাপেক্ষী নন, যার দৃষ্টি থেকে আড়াল হতে পারে না কোনোকিছুই। তিনি মহান আল্লাহ, আল-বাসির।
আল-বাসির—যিনি দ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা। শব্দটি এসেছে ‘আল-বাসার’ থেকে। আল-বাসার অর্থ চোখ, দর্শনেন্দ্রিয়। এর আরেক অর্থ দৃষ্টিশক্তি; দেখার জন্য প্রয়োজনীয় আলো, যা দ্বারা দর্শনযোগ্য বস্তুসমূহ অবলোকন করা যায়। দৃষ্টি যত তীক্ষ্ণই হোক না কেন, বস্তুর ওপর আলো না পড়লে কিছু দেখা সম্ভব নয়। একই অবস্থা মানব-মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেধা ও স্মৃতিশক্তি যত ধারালোই হোক না কেন, কোনো বিষয় সূর্যের মতো পরিষ্কার হলেও আল্লাহ প্রদত্ত আলোকময় দিকনির্দেশনা ছাড়া কখনোই প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো, তবে তিনি তোমাদের দান করবেন ন্যায়-অন্যায় পৃথক করার শক্তি; তোমাদের পাপগুলো মুছে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ যে অতিশয় করুণাময়![১]
কুরআনে অন্যত্র তিনি বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো। নিজগুণে তিনি তোমাদের দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন। সেই সাথে তোমাদের দান করবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে এবং তিনি তোমাদের ক্ষমা করবেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [২]
অর্থাৎ, যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথের আলোকবর্তিকা না থাকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান বাণী না থাকে, তাহলে অবশ্যই আপনি পথ হারিয়ে ফেলবেন, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবেন। হয়তো আপনি নিজেই অকল্যাণ ও ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলবেন কিংবা অন্য কেউ আপনাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।
অতএব, বাসির অর্থ দ্রষ্টা, চোখের জ্যোতিসম্পন্ন; আল-বাসিরের দৃষ্টি তাঁর বান্দাদের সমস্ত কিছু পরিব্যাপ্ত করে আছে।
দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি
নিজের নিরাপত্তা, অস্তিত্বের সংরক্ষণ এবং নিজ কল্যাণের প্রতি আগ্রহ মানুষের মজ্জাগত। সবাই নিরাপত্তা চায়, পেতে চায় দীর্ঘায়ু। তাই যে পথে ক্ষতি, বিপদ বা কষ্টদায়ক কিছু রয়েছে, স্বভাবতই মানুষ সেদিকে পা বাড়াতে ইচ্ছুক নয়। কারণ, সে নিজের ভালো-মন্দ ও লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখে। সুখ-দুঃখ, উপকার-অপকারের সঠিক বোধই তাকে বিপদসংকুল পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
কিন্তু মানুষের দূর্ভাগ্য চরমে পৌঁছে যায়, যখন তার দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি ঘটে; যখন সে কল্যাণকে অকল্যাণ মনে করে আর ধ্বংসকে আপন করে নেয়।
যারা দিনরাত পাপাচারে ডুবে থাকে, তারা কেন নিষিদ্ধ কাজের পেছনেই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে চলে? কেন তারা আপন রবের বিধিবিধান অমান্য করে নিজেদের নিক্ষেপ করেছে ধ্বংসকুণ্ডে? কারণ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গিয়েছে, তারা নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক বিকারের শিকার হয়েছে। তারা ভেবে নিয়েছে, এমন লাগামহীন জীবনই তাদের মনে অনাবিল সুখ এনে দেবে। হারাম পথে উপার্জনই তাদের নিশ্চয়তা দেবে অঢেল সম্পদের।
যদি তাদের সুস্থ মানসিকতা থাকত, তারা যদি জানত, আল্লাহর আনুগত্যেই রয়েছে একমাত্র সুখ; যদি তারা বুঝত, আল্লাহর প্রতি একাগ্রতাই কেবল পারে প্রশান্তি ও তৃপ্তি দিতে, তাহলে তারা কখনোই ঐ অন্ধকার জগতে পা বাড়াত না।
তাহলে আল্লাহর আনুগত্যকারী, একজন সৎ মুমিন আর আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত একজন পাপীর মাঝে মৌলিক পার্থক্য কোথায়? মূল পার্থক্য দৃষ্টিভঙ্গিতে। একজন সুখ ও সাফল্য খোঁজে অন্ধকার জগতে, নর্দমার নোংরা জলে। আরেকজন সুখ, সমৃদ্ধি ও সফলতা খোঁজে আল্লাহর আনুগত্যে; নিঝুম রাতের নীরবতায় রবের সান্নিধ্যে সিজদায় লুটিয়ে।
মিসরের সম্রাজ্ঞী (আযিযে মিশরের প্রিয়তমা স্ত্রী) ইউসুফ আলাইহিস সালামকে আবেদন জানিয়েছিল সকলের চোখ এড়িয়ে হারাম পথে কামনা পূর্ণ করার। তখন কী করেছিলেন নবি ইউসুফ? তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর আশ্রয়। তিনি জানতেন তার রব আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। তিনি নিশ্চয়ই এসব কিছু দেখছেন। তিনি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দেবেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সেদিন লোভনীয় হারামে জড়াতে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু কী পার্থক্য তাদের দুজনার মাঝে? এত বিশাল পদমর্যাদার অধিকারী, রূপ-লাবণ্যে যার কোনো কমতি নেই, অর্থ-বৈভব যার কাছে অতি তুচ্ছ-সে কেন কুপ্রবৃত্তির লালসায় বিভোর হয়ে ছিল? সে কেন কামনার বশবর্তী হয়ে নবি ইউসুফকে জোরপূর্বক কাছে পেতে চাইছিল? আর এমন লোভনীয় প্রস্তাব হাতের কাছে পেয়েও ইউসুফ আলাইহিস সালাম কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন? কেন দৌড়ে পালাচ্ছিলেন মিসরের রূপবতী সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে? কারণ একটাই-দৃষ্টিভঙ্গি। একজন সুখ খুঁজেছিল প্রবৃত্তির তাড়নায়, আরেকজন সফলতা চেয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে।
যখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ হবে, আপনার সকল কাজ এমনিতেই সুশোভিত হবে, আপনি পাবেন সাফল্যের সন্ধান। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই।
এজন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন-
اللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتَّبَاعَهُ، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلاً وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ
হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সামনে সত্যকে সত্যরূপে দেখিয়ে দিন এবং সত্যের অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবেই দেখিয়ে দিন এবং তা পরিহার করার তাওফিক দিন [১]
কত মানুষ আছে তারা সত্যকে বাতিল আর বাতিলকে সত্য মনে করে। তাই হৃদয়-জগতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ঝলক নুরের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রথমে আপনি মন-মানসিকতা বদলে ফেলুন এবং দৃঢ় শপথ নিন, 'সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেব, সত্যকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরব।'
মাঝে মাঝে আমার এমন কিছু যুবকের সাথে দেখা হয় যারা এই বয়সেই দ্বীন মেনে চলে, সৎ ও ঈমানী জীবন যাপন করে। তাদের সাথে দেখা হলেই আমি একটি কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে বলি, 'আল্লাহ আপনাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামতটি দান করেছেন তা হলো হিদায়াতের নিয়ামত। আল্লাহ আপনাকে এক বিশেষ নুর দিয়েছেন, যা আপনার সামনে সত্যকে তুলে ধরে এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে উপস্থাপন করে।'
মানুষ যখন আল্লাহর সান্নিধ্যে যায়, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁর আদেশ বাস্তবায়নে কর্মতৎপর হয়ে ওঠে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে এই আলোর ঝলক দেন। যা তার সারা জীবনের জন্য অমূল্য পাথেয় হয়ে কাজ করে।
তিনি মহাদ্রষ্টা, পরিব্যাপ্ত তাঁর দৃষ্টি
আল-বাসির আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। যিনি দেখেন সৃষ্টি জগতের সবকিছু; সামনে-পিছনে, ভেতরে-বাহিরে, প্রকাশ্যে-আড়ালে সর্বাবস্থায়ই তিনি সবকিছু দেখেন। শুধু তিনিই দেখতে পান বস্তুর প্রকৃত অবস্থা।
প্রকৃত অবস্থা না জানলে কাউকে 'বাসির' বলা যায় না। আপনি অর্ধশত কোটি টাকা দিয়ে এক খণ্ড হীরা কিনে আনলেন। এরপর তা কাদায় রেখে দিলেন। কাদা থেকে তুলে সূর্যের আলোয় রাখলে দেখা যাবে তা কর্দমাক্ত। কিন্তু এটা বাহ্যিক দৃষ্টি, বাইরে কাদা লাগলেও ভেতরে কিন্তু সেটা ঠিকই মহামূল্যবান এক হীরা। 'বাসার' দ্বারা যে দৃষ্টি বোঝায় তা হলো প্রকৃত অবস্থা দর্শন।
অনেক জিনিস আমাদের দৃষ্টিতে লুকায়িত, প্রচ্ছন্ন থাকে, কিন্তু আল্লাহর সামনে সব কিছুই স্পষ্ট। আমরা হয়তো কাদায় পড়ে থাকা হীরাকে একটি নোংরা জিনিস মনে করতে পারি, কিন্তু আল্লাহ জানেন সেটা মহামূল্যবান বস্তু।
আপনার দৃষ্টিতে হয়তো একজন মানুষকে বাহ্যিকভাবে অসুন্দর লাগল, স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি আপনি তেমন আগ্রহী হবেন না। কিন্তু হতে পারে লোকটি পৃথিবীর সর্বাধিক জ্ঞানীদের একজন। আপনি যদি তার ভেতরের অবস্থা জানতে পারেন তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন।
ইতিহাসের পাতায় এমন হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে। আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে তার শারীরিক গড়ন নিয়ে বলা হয়েছে, 'তিনি ছিলেন বেঁটে; চিবুক ছিল দৃষ্টিকটু, পা-দুটো বাঁকা, চোখ কোটরের ভেতরে, গলা কিছুটা স্ফীত; গায়ের রং বাদামী। এক কথায়, মানুষের কাছে অসুন্দর লাগার মতো যত কারণ থাকতে পারে তার সবকটা বৈশিষ্ট্যই তার মাঝে দেখা যেত।'
কিন্তু এই লোকটিই যখন রাগান্বিত হতেন, তখন একশো তরবারির খাপ খোলা হতো। কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করত না যে, কেন তিনি রেগেছেন।
ওপরে বর্ণিত বাহ্যিক আকৃতির মানুষটা হয়তো অতি সাধারণ, কিন্তু এর আড়ালে যে আহনাফ লুকিয়ে আছেন তিনি বিখ্যাত তাবিয়ি আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ।
আপনার ঘরে একটি ইয়াতিম শিশু রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইয়াতিমকে ধমক দিতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। আর আপনি যদি তাকে মারেন, যে দেখবে সে-ই তিরস্কার করবে। মানুষ আপনাকে ঘৃণার চোখে দেখবে। কিন্তু বাস্তবেই যদি সে এমন কোনো অপরাধ করে থাকে, যার সংশোধনের জন্য তাকে শাসন করা আবশ্যক এবং মানুষও সেটা জানে, তাহলে আপনাকে আর ভুল বুঝবে না। মনে করবে আপনি ঠিকই করছেন।
অভ্যন্তরীণ অবস্থা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় তারা আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে চলে আসবে। পরক্ষণে সত্য জেনে আবার তাদের ভুল ভাঙবে। আল্লাহ তাআলা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তা প্রকৃত অবস্থা জেনেই গ্রহণ করেন। কারণ, তিনি আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। আসল ঘটনা তার সামনে প্রচ্ছন্ন ও আবৃত থাকে না। আল্লাহর সামনে সবকিছু দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট।
সব দেখছেন যিনি
আল্লাহ আপনার সবকিছু জানেন। আপনার ইচ্ছা, কামনা-বাসনা এবং স্বাভাবিক প্রবৃত্তি সবকিছু। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা, সত্যনিষ্ঠা এবং কল্যাণপ্রিয়তা আল্লাহ দেখেন। আপনি সংকটে আছেন, কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, সেটাও কিন্তু আপনার রব দেখছেন। আপনার মুখ ফসকে একটি কথা বেরিয়ে গেল, আপনি কষ্ট পেলেন। আল্লাহ ঠিকই জানেন যে, আপনি এই কথা বলতে চাননি। এভাবে আপনার সুখ-দুখের সবকিছু আল্লাহ জানেন, দেখেন ও শোনেন। এটা আপনার জন্য বড় সান্ত্বনা; আনন্দের সংবাদ; আপনার রব আপনার সবকিছুর খবর রাখেন।
আপনি কোনো এক অফিসের কর্মচারী। টানা ৩ ঘণ্টা কাজ করার কারণে কিছুটা ক্লান্তি ও একঘেয়েমি চলে এসেছে আপনার মাঝে। তাই আপনি অল্প সময়ের জন্য একটু বারান্দার দিকে গেলেন। কিন্তু বের হতেই দেখলেন আপনার বস সামনে দাঁড়ানো। আপনাকে বের হতে দেখেই সে রাগে ফেটে পড়বে, দু-চারটা গালি দিতেও কার্পণ্য করবে না। কারণ, সে দেখেছে আপনার বাহ্যিক অবস্থা আর ভেবে নিয়েছে আপনি কাজ বাদ দিয়ে শুধু এদিক-ওদিক পায়চারিই করছেন। এর আগে যে একটানা ৩ ঘণ্টা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন তা সে দেখেনি। আসলে সে অসহায়; এটা তার সীমাবদ্ধতা যে, সে বাহ্যিক অবস্থা দেখতে পেলেও অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানতে সক্ষম নয়।
কিন্তু আনন্দিত হোন আল্লাহর প্রতি। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা তিনি জেনেছেন। আপনার বস যে আপনাকে তিরস্কার করেছে, আল্লাহ জানেন, তার এই আচরণ অন্যায়। আল্লাহ দেখেছেন, আপনি এই লোকটির জন্য এতক্ষণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আপনি অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
জনৈক সালাফ বলেছেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর; তাঁর অবিনশ্বর সত্তার জন্য। সকল প্রশংসা, গুণগান তাঁর জন্য, তাঁর অতিপ্রাকৃতিক জ্ঞানের জন্য। তাঁর কাছে কোনো সংবাদ পৌঁছানোর প্রয়োজন হয় না। তাঁর কাছে প্রমাণ করার জন্য সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না; শপথ করার প্রয়োজন হয় না। তিনি জানেন সবকিছু।'
সীমিত জ্ঞানের কারণেই মানুষ সন্দেহপ্রবণ
মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত। তারা কোনো কিছু দেখেই, চিন্তা-ভাবনা না করেই, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই নিজেকে সন্দিহান বিষয় থেকে সবসময় নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কাউকে দেবেন না। আপনাকে নিয়ে কোনো অহেতুক আলোচনার সূত্রপাত হওয়ার আগেই তার শেকড় উপড়ে ফেলুন। দেখুন আল্লাহর নবির অনুপম আদর্শ। নবিজি মসজিদে নববিতে ইতিকাফরত ছিলেন। রাতে উম্মুল মুমিনিন সাফিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহা দেখা করতে আসেন। নবিজি তার সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ সেখান দিয়ে দুজন সাহাবি গেলেন। নবিজি তাদের ডেকে বললেন, 'দাঁড়াও। ও হলো সাফিয়াহ; আমার স্ত্রী।' তারা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা আপনার ব্যাপারে কি কোনো সন্দেহ পোষণ করতে পারি?' নবিজি বললেন, 'না। তবে শয়তান যেন তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেজন্যই বলে দিলাম।' [১]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বাসির, সর্বদ্রষ্টা; তিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষের জ্ঞান নিতান্তই অল্প। তারা সামান্য কিছু দেখেই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত। তাই আপনার দায়িত্ব হলো, যেকোনো বিষয় অস্পষ্ট না রেখে খোলাসা করে দেওয়া। আপনি নিজেকে সন্দেহভাজন অবস্থানে রাখবেন আর ভাববেন, আল্লাহ তো আমাকে জানেন—এটা যথেষ্ট নয়; সুন্নাহ সমর্থিত পন্থাও নয়। বরং করণীয় এবং সুন্নাহ হলো, আপনার দিক থেকে অপবাদ, সমালোচনা বা সন্দেহের কোনো বিষয় এলে সঙ্গে সঙ্গে তা প্রতিহত করা।
আপনি গায়রে মাহরাম কোনো নারীর ঘরে ঢুকলেন একান্তে, নির্জনে। আপনি বরফের মতো স্বচ্ছ। হয়তো ফেরেশতার চেয়েও বেশি পবিত্র। আপনি একদম খাঁটি ও সৎ একজন ব্যক্তি। আপনার প্রবৃত্তির লাগাম সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে। তবু আপনার সাথে ঐ গায়রে মাহরাম নারীর নির্জন উপস্থিতি মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবে। অপবাদ, সমালোচনার সূত্রপাত ঘটানোর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
আপনি কোনো শপিং সেন্টারের একটি দোকানে গিয়ে দেখলেন সেখানে কেউ নেই। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওখান থেকে বের হয়ে চলে আসুন। এটা সন্দেহজনক স্থান, দোকানির অনুপস্থিতিতে সেখানে আপনার উপস্থিতি মানুষের মধ্যে সন্দেহ জাগিয়ে তুলবে। বলবেন না যে, দোকানির জন্য অপেক্ষা করছি। বিপদসংকুল জায়গা থেকে যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্বে থাকুন। নতুবা আপনি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হবেন।
অবশ্য এসবই বান্দার সীমাবদ্ধতা। ওদিকে আল্লাহর জ্ঞান অপরিসীম, দৃষ্টির ফাঁকফোকর দিয়ে যে খিয়ানত করা হয় তা তিনি দেখতে পান।
আপনি আপনার রুমে বসে আছেন। সামনে কাচের জানালা, তার সামনে অন্য কারো বারান্দা। আপনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ঠিক তখনই কোনো নারী বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আপনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নারীটির দিকে। পৃথিবীর কেউ জানবে না, কোনো মানুষ কখনো আপনাকে এর জন্য জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে না; কিন্তু কেউ না দেখলেও আল্লাহ ঠিকই দেখেছেন আপনার চোখের খিয়ানত, তিনিই এর হিসাব নেবেন কড়ায় গণ্ডায়।
আপনি যে শহরে বসবাস করছেন, শহরের লোকজনের সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন, আপনার উদারতা ও মহত্ত্বের কারণে তাদের ভালো মানুষ মনে করছেন। কিন্তু কোন শহরের মানুষ কতটুকু ভালো, কোন শহরটা পাপের রাজ্য-সে সংবাদ জানেন শুধু আল্লাহ। পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থা দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে, চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে। আপনি পশ্চিমাদের সংস্কৃতি স্বচক্ষে দেখেও বিশ্বাস করতে পারবেন না। একবার পশ্চিমা এক নারীর ব্যাপারে গণমাধ্যম বেশ গরম হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত সে সংসদ পদপ্রার্থীও ছিল। সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার মাধ্যমের সমস্ত সুযোগ ব্যবহার করে নিজের অবৈধ প্রেম, জীবনসঙ্গীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরকীয়ার কথা খুব গর্বের সাথেই পেশ করেছিল দুনিয়াবাসীর সামনে। যা আমাদের সমাজে কল্পনাও করা যায় না। তো কোন শহরের লোকজন ভালো আর কোন শহর পাপের নরকরাজ্য তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِن بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا *
নূহের পর আমি অসংখ্য মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি। বান্দাদের পাপাচারের খবর রাখা এবং তা পর্যবেক্ষণের জন্য আপনার প্রতিপালকই যথেষ্ট [১]
আল্লাহর আল-বাসির নামটি বান্দার মধ্যে এমন অনুভূতি জাগ্রত করে যে, সে সবসময় আল্লাহর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই অবস্থান করছে। এজন্য আল্লাহর নবি বলেছেন, শ্রেষ্ঠ ঈমান হলো, তুমি এটা বিশ্বাস করবে যে, তুমি আল্লাহর সাথেই আছ।
'আমি সদা আল্লাহর পর্যবেক্ষণে আছি'—এই অনুভূতি সর্বদা জাগরুক থাকাই হচ্ছে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, 'তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার মতো না হও, তাহলে মনের মধ্যে এই বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'
অর্থাৎ প্রকাশ্যে, গোপনে, লোকালয়ে, নির্জনে, নীরবতায়, জনসমাগমে-সর্বাবস্থায় আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।
আল্লাহ তাআলা দ্রষ্টা। তিনি আপনার জন্য সৃষ্টি করেছেন দৃষ্টিশক্তি। দু-চোখের মধ্যে আল্লাহ অসীম নিয়ামত দিয়েছেন। কর্নিয়া, আইরিশ, লেন্স, রেটিনা-সহ আরো কত কত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের এই চোখ। চোখ দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন।
নিজের নফসকে প্রশ্ন করুন, আল্লাহ তাআলা আমাদের কেন দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন? হারাম দৃষ্টিপাতের জন্য? ঈমান-বিধ্বংসী হারাম বস্তুসমূহের স্বাদ নেওয়ার জন্য? নাকি মহাবিশ্বের পরতে পরতে মহান আল্লাহর সৃষ্টিনৈপুণ্য ও অসীম নিয়ামতের প্রাচুর্য দেখার জন্য?
যে চোখ নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তু থেকে পবিত্র থাকে, যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেয়, যে চোখ আল্লাহর জন্য বিগলিত হয়, যে চোখ আল্লাহর আযাবের ভয়ে সিক্ত হয়, সেই চোখ আর যে চোখ হারামের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে—এই দুই চোখ কি কখনো সমান হতে পারে?
মহান রবের প্রতি বিনীত হোন
মহান স্রষ্টা, সবকিছুর দ্রষ্টা আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন আপনার চোখ সৃষ্টিতে। এই চোখ দিয়ে আপনি দেখছেন পৃথিবীর সবকিছু; সব রংয়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারছেন অনায়াসে। প্রিয়জনের প্রিয়মুখ, সন্তানসন্ততি, মা-বাবার দিকে তাকিয়ে লাভ করছেন তৃপ্তি। পবিত্র কুরআনের দিকে তাকিয়ে ধন্য করছেন আপনার চোখ; শীতল করছেন আপনার অন্তরাত্মা। এই চোখ দ্বারা এত নিয়ামত ভোগ করে এই চোখেরই স্রষ্টার সাথে নাফরমানি করা কি সাজে? চোখের স্রষ্টার প্রতি অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
হারামের জগতে আর কত দিন ঘোরাঘুরি? আল্লাহর অবাধ্যতায় আর কতকাল লাগামহীন জীবনযাপন?
এই চোখকে ব্যবহার করুন তার স্রষ্টাকে পাওয়ার কাজে। দু-চোখভরে দেখুন— জগৎ ও মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নিয়ামতরাজি, মিটমিট করে জ্বলতে থাকা হাজারো তারার মেলা, মখমলের মতো নরম জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো, ফুলের পাপড়িতে লেগে থাকা অপরূপ সৌন্দর্য! এসবের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখুন, খুঁজে পাবেন আপনার স্রষ্টার অপার মাহাত্ম্য!
আমাদের প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার রব আমাকে নয়টি বিষয়ের আদেশ প্রদান করেছেন।
সেই নয়টির মধ্যে একটি হলো— 'আমার নীরবতা যেন হয় চিন্তার মগ্নতা, আমার কথা যেন হয় আল্লাহর স্মরণ এবং আমার দৃষ্টি যেন হয় শিক্ষার উপকরণ।'
সবসময় মনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। যিনি আপনার চোখ ও দৃষ্টিশক্তি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি আপনাকে দেখবেন না? আল্লাহ বলেন—
أَيَحْسَبُ أَن لَّمْ يَرَهُ أَحَدٌ أَلَمْ نَجْعَل لَّهُ عَيْنَيْنِ *
মানুষ কি মনে করে, তাকে কেউ দেখছে না? আমি কি তাকে দুটি চোখ দান করিনি? [১]
অর্থাৎ যিনি আপনার চোখ সৃষ্টি করেছেন তিনি আপনার চোখের দৃষ্টি ও অন্তরের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে বেখবর নন!
সুমহান রব আরো বলেন-
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ
(হে নবি!) আপনি নির্ভর করুন পরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর, যিনি আপনাকে দেখতে পান, যখন আপনি সালাতে দাঁড়িয়ে যান এবং সালাত আদায়কারীদের সাথে ওঠাবসা করেন।[২]
ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে, জানালার কাচ আর পর্দা টেনে দিয়ে, পৃথিবীর সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে আপনি লিপ্ত হচ্ছেন মহান রবের অবাধ্যতায়। হারাম সম্পর্কের আঁচল ধরে, অবৈধভাবে তারুণ্যের শক্তি একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছেন স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল-সাদার জগতে। পচা, দুর্গন্ধময় জগতের নিকৃষ্ট ভাগাড়ে ডুব দিচ্ছেন। আপনি কখনো ভেবেছেন, এই ভবনের ছাদ ভেদ করে, জানালা, দরজা আর দেওয়ালের প্রাচীর ভেদ করে আল্লাহর দৃষ্টি আপনার দিকে তাকিয়ে আছে! তিনি চাইলে এক মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারেন আপনার মূল্যবান চোখদুটি। অবশ করে দিতে পারেন আপনার শক্তিশালী দুটো হাত। বন্ধ দুয়ারের নিচ দিয়ে আসা অক্সিজেন বন্ধ করে দিয়ে টেনে দিতে পারেন আপনার অবাধ্যতার ইতি! কিন্তু তিনি আপনাকে সুযোগ দেন, যেন আপনি ফিরে আসেন। তিনি পথ চেয়ে থাকেন, আপনি কোনো একদিন ফিরবেন বলে!
ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পাপাচারী পাপের কাছাকাছি হওয়ার সময় যদি বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন, তাহলে সে আল্লাহর সামনে কী পরিমাণ দুঃসাহসী! কত বড় দুর্ভাগা! আর যদি মনে করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন না, তাহলে সে কত বড় কাফির, কত বড় গণ্ডমূর্খ! আল্লাহ তাকে দেখছেন জেনেও যদি পাপ করে ফেলে, তাহলে সেও কত বড় মূর্খ! কত বড় দুর্ভাগা!'
জ্ঞানীরা বলেছেন, মানুষ আল্লাহর চোখ থেকে যা লুকোতে পারে না তা যদি মানুষের কাছ থেকে লুকায়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহর সাথে তামাশা করে। আর মানুষ যখন বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা সর্বদ্রষ্টা, তিনি তার সবকিছুর ব্যাপারে খবর রাখেন, তখন তার হৃদয়-আত্মা আলোকিত হয়।
সালাফে সালিহিনের কেউ কেউ বলতেন, 'আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তোমার যদি পাপ করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে এমন কোথাও গিয়ে পাপ করো, যেখানে আল্লাহ তোমায় দেখতে পাবেন না!'
জীবনে যেখানেই যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, নিশ্চিত বিশ্বাস রাখুন, আপনি রয়েছেন আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিসীমার ভেতরেই। তিনি আপনার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। আপনি যখন সুখ অনুভব করছেন, জীবনের আনন্দঘন মুহূর্ত উপভোগ করছেন, তিনি দেখছেন আপনার হাসি; আপনার উচ্ছ্বাস। তখন তাঁর সামনে মাথা নত করে আদায় করুন শুকরিয়াজ্ঞাপক সিজদা।
আবার যখন আপনি ভেসে যাচ্ছেন পাপের অন্ধকার জগতে, ভুলে যাচ্ছেন গন্তব্যের কথা, ডুবে যাচ্ছেন অন্যায়-অপরাধের নর্দমায়, ভেসে যাচ্ছেন আল্লাহর অবাধ্যতার গড্ডলিকা প্রবাহে, তখনো তিনি আপনাকে দেখছেন। আপনি তাঁকে দেখতে পাবেন না; কিন্তু তিনি আপনার দিকে ঠিকই তাকিয়ে আছেন। এরপর তো ফিরে যেতে হবে তাঁরই দিকে। তাই করজোড়ে মিনতি করুন—
হে আল্লাহ, আপনি আল-বাসির, সম্যক ও মহাদ্রষ্টা। আপনি আমার প্রকাশ্য-গোপন সকল দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। আপনার হাতেই আমার জীবনের লাগাম। আমি ভিক্ষা চাইছি আপনার সম্মুখে। আমার হৃদয় ভরিয়ে দিন আলোতে; চোখে দান করুন জ্যোতি, যেন এর দ্বারা আমি আপনার অসীম নিয়ামতের মহিমা দেখতে পাই। প্রকাশ্যে-গোপনে, লোকালয়ে-নির্জনে সর্বাবস্থায় আপনার সামনে আদব ও সৌজন্য রক্ষা করতে চলতে পারি। আমি যেন চলি আপনার নির্ধারিত সীমারেখার গণ্ডিতে, আপনার আদেশের চৌহদ্দির ভেতরে। আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন আপনার প্রিয় বান্দাদের কাফেলায়। আমিন।
টিকাঃ
[১] সুরা আনফাল, আয়াত: ২৯
[২] সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৮
[১] তাফসির ইবনু কাসির, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪৮
[১] সহিহ বুখারি : ২০৩৫
[১] সূরা ইসরা, আয়াত: ১৭
[১] সুরা বালাদ, আয়াত: ৭-৮
[২] সুরা শুআরা, আয়াত: ২১৭-২১৯
মিশমিশে কালো এক অন্ধকার পথ। সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ছোট্ট একটি কালো পিঁপড়া। পথিক জানতেও পারবে না, কখন সে নিজের অজান্তে পিঁপড়াটিকে মাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এমন এক সত্তা আছেন, যিনি দেখার জন্য আলোর মুখাপেক্ষী নন, যার দৃষ্টি থেকে আড়াল হতে পারে না কোনোকিছুই। তিনি মহান আল্লাহ, আল-বাসির।
আল-বাসির—যিনি দ্রষ্টা, মহাদ্রষ্টা। শব্দটি এসেছে ‘আল-বাসার’ থেকে। আল-বাসার অর্থ চোখ, দর্শনেন্দ্রিয়। এর আরেক অর্থ দৃষ্টিশক্তি; দেখার জন্য প্রয়োজনীয় আলো, যা দ্বারা দর্শনযোগ্য বস্তুসমূহ অবলোকন করা যায়। দৃষ্টি যত তীক্ষ্ণই হোক না কেন, বস্তুর ওপর আলো না পড়লে কিছু দেখা সম্ভব নয়। একই অবস্থা মানব-মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেধা ও স্মৃতিশক্তি যত ধারালোই হোক না কেন, কোনো বিষয় সূর্যের মতো পরিষ্কার হলেও আল্লাহ প্রদত্ত আলোকময় দিকনির্দেশনা ছাড়া কখনোই প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো, তবে তিনি তোমাদের দান করবেন ন্যায়-অন্যায় পৃথক করার শক্তি; তোমাদের পাপগুলো মুছে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ যে অতিশয় করুণাময়![১]
কুরআনে অন্যত্র তিনি বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো। নিজগুণে তিনি তোমাদের দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন। সেই সাথে তোমাদের দান করবেন আলো, যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে এবং তিনি তোমাদের ক্ষমা করবেন; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [২]
অর্থাৎ, যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথের আলোকবর্তিকা না থাকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান বাণী না থাকে, তাহলে অবশ্যই আপনি পথ হারিয়ে ফেলবেন, অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবেন। হয়তো আপনি নিজেই অকল্যাণ ও ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলবেন কিংবা অন্য কেউ আপনাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।
অতএব, বাসির অর্থ দ্রষ্টা, চোখের জ্যোতিসম্পন্ন; আল-বাসিরের দৃষ্টি তাঁর বান্দাদের সমস্ত কিছু পরিব্যাপ্ত করে আছে।
দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি
নিজের নিরাপত্তা, অস্তিত্বের সংরক্ষণ এবং নিজ কল্যাণের প্রতি আগ্রহ মানুষের মজ্জাগত। সবাই নিরাপত্তা চায়, পেতে চায় দীর্ঘায়ু। তাই যে পথে ক্ষতি, বিপদ বা কষ্টদায়ক কিছু রয়েছে, স্বভাবতই মানুষ সেদিকে পা বাড়াতে ইচ্ছুক নয়। কারণ, সে নিজের ভালো-মন্দ ও লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখে। সুখ-দুঃখ, উপকার-অপকারের সঠিক বোধই তাকে বিপদসংকুল পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
কিন্তু মানুষের দূর্ভাগ্য চরমে পৌঁছে যায়, যখন তার দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি ঘটে; যখন সে কল্যাণকে অকল্যাণ মনে করে আর ধ্বংসকে আপন করে নেয়।
যারা দিনরাত পাপাচারে ডুবে থাকে, তারা কেন নিষিদ্ধ কাজের পেছনেই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে চলে? কেন তারা আপন রবের বিধিবিধান অমান্য করে নিজেদের নিক্ষেপ করেছে ধ্বংসকুণ্ডে? কারণ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গিয়েছে, তারা নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক বিকারের শিকার হয়েছে। তারা ভেবে নিয়েছে, এমন লাগামহীন জীবনই তাদের মনে অনাবিল সুখ এনে দেবে। হারাম পথে উপার্জনই তাদের নিশ্চয়তা দেবে অঢেল সম্পদের।
যদি তাদের সুস্থ মানসিকতা থাকত, তারা যদি জানত, আল্লাহর আনুগত্যেই রয়েছে একমাত্র সুখ; যদি তারা বুঝত, আল্লাহর প্রতি একাগ্রতাই কেবল পারে প্রশান্তি ও তৃপ্তি দিতে, তাহলে তারা কখনোই ঐ অন্ধকার জগতে পা বাড়াত না।
তাহলে আল্লাহর আনুগত্যকারী, একজন সৎ মুমিন আর আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত একজন পাপীর মাঝে মৌলিক পার্থক্য কোথায়? মূল পার্থক্য দৃষ্টিভঙ্গিতে। একজন সুখ ও সাফল্য খোঁজে অন্ধকার জগতে, নর্দমার নোংরা জলে। আরেকজন সুখ, সমৃদ্ধি ও সফলতা খোঁজে আল্লাহর আনুগত্যে; নিঝুম রাতের নীরবতায় রবের সান্নিধ্যে সিজদায় লুটিয়ে।
মিসরের সম্রাজ্ঞী (আযিযে মিশরের প্রিয়তমা স্ত্রী) ইউসুফ আলাইহিস সালামকে আবেদন জানিয়েছিল সকলের চোখ এড়িয়ে হারাম পথে কামনা পূর্ণ করার। তখন কী করেছিলেন নবি ইউসুফ? তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহর আশ্রয়। তিনি জানতেন তার রব আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। তিনি নিশ্চয়ই এসব কিছু দেখছেন। তিনি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দেবেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সেদিন লোভনীয় হারামে জড়াতে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু কী পার্থক্য তাদের দুজনার মাঝে? এত বিশাল পদমর্যাদার অধিকারী, রূপ-লাবণ্যে যার কোনো কমতি নেই, অর্থ-বৈভব যার কাছে অতি তুচ্ছ-সে কেন কুপ্রবৃত্তির লালসায় বিভোর হয়ে ছিল? সে কেন কামনার বশবর্তী হয়ে নবি ইউসুফকে জোরপূর্বক কাছে পেতে চাইছিল? আর এমন লোভনীয় প্রস্তাব হাতের কাছে পেয়েও ইউসুফ আলাইহিস সালাম কেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন? কেন দৌড়ে পালাচ্ছিলেন মিসরের রূপবতী সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে? কারণ একটাই-দৃষ্টিভঙ্গি। একজন সুখ খুঁজেছিল প্রবৃত্তির তাড়নায়, আরেকজন সফলতা চেয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে।
যখন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বিশুদ্ধ হবে, আপনার সকল কাজ এমনিতেই সুশোভিত হবে, আপনি পাবেন সাফল্যের সন্ধান। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই।
এজন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন-
اللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتَّبَاعَهُ، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلاً وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ
হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সামনে সত্যকে সত্যরূপে দেখিয়ে দিন এবং সত্যের অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবেই দেখিয়ে দিন এবং তা পরিহার করার তাওফিক দিন [১]
কত মানুষ আছে তারা সত্যকে বাতিল আর বাতিলকে সত্য মনে করে। তাই হৃদয়-জগতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ঝলক নুরের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রথমে আপনি মন-মানসিকতা বদলে ফেলুন এবং দৃঢ় শপথ নিন, 'সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেব, সত্যকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরব।'
মাঝে মাঝে আমার এমন কিছু যুবকের সাথে দেখা হয় যারা এই বয়সেই দ্বীন মেনে চলে, সৎ ও ঈমানী জীবন যাপন করে। তাদের সাথে দেখা হলেই আমি একটি কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে বলি, 'আল্লাহ আপনাকে সবচেয়ে বড় যে নিয়ামতটি দান করেছেন তা হলো হিদায়াতের নিয়ামত। আল্লাহ আপনাকে এক বিশেষ নুর দিয়েছেন, যা আপনার সামনে সত্যকে তুলে ধরে এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে উপস্থাপন করে।'
মানুষ যখন আল্লাহর সান্নিধ্যে যায়, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং তাঁর আদেশ বাস্তবায়নে কর্মতৎপর হয়ে ওঠে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে এই আলোর ঝলক দেন। যা তার সারা জীবনের জন্য অমূল্য পাথেয় হয়ে কাজ করে।
তিনি মহাদ্রষ্টা, পরিব্যাপ্ত তাঁর দৃষ্টি
আল-বাসির আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। যিনি দেখেন সৃষ্টি জগতের সবকিছু; সামনে-পিছনে, ভেতরে-বাহিরে, প্রকাশ্যে-আড়ালে সর্বাবস্থায়ই তিনি সবকিছু দেখেন। শুধু তিনিই দেখতে পান বস্তুর প্রকৃত অবস্থা।
প্রকৃত অবস্থা না জানলে কাউকে 'বাসির' বলা যায় না। আপনি অর্ধশত কোটি টাকা দিয়ে এক খণ্ড হীরা কিনে আনলেন। এরপর তা কাদায় রেখে দিলেন। কাদা থেকে তুলে সূর্যের আলোয় রাখলে দেখা যাবে তা কর্দমাক্ত। কিন্তু এটা বাহ্যিক দৃষ্টি, বাইরে কাদা লাগলেও ভেতরে কিন্তু সেটা ঠিকই মহামূল্যবান এক হীরা। 'বাসার' দ্বারা যে দৃষ্টি বোঝায় তা হলো প্রকৃত অবস্থা দর্শন।
অনেক জিনিস আমাদের দৃষ্টিতে লুকায়িত, প্রচ্ছন্ন থাকে, কিন্তু আল্লাহর সামনে সব কিছুই স্পষ্ট। আমরা হয়তো কাদায় পড়ে থাকা হীরাকে একটি নোংরা জিনিস মনে করতে পারি, কিন্তু আল্লাহ জানেন সেটা মহামূল্যবান বস্তু।
আপনার দৃষ্টিতে হয়তো একজন মানুষকে বাহ্যিকভাবে অসুন্দর লাগল, স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি আপনি তেমন আগ্রহী হবেন না। কিন্তু হতে পারে লোকটি পৃথিবীর সর্বাধিক জ্ঞানীদের একজন। আপনি যদি তার ভেতরের অবস্থা জানতে পারেন তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন।
ইতিহাসের পাতায় এমন হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে। আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে তার শারীরিক গড়ন নিয়ে বলা হয়েছে, 'তিনি ছিলেন বেঁটে; চিবুক ছিল দৃষ্টিকটু, পা-দুটো বাঁকা, চোখ কোটরের ভেতরে, গলা কিছুটা স্ফীত; গায়ের রং বাদামী। এক কথায়, মানুষের কাছে অসুন্দর লাগার মতো যত কারণ থাকতে পারে তার সবকটা বৈশিষ্ট্যই তার মাঝে দেখা যেত।'
কিন্তু এই লোকটিই যখন রাগান্বিত হতেন, তখন একশো তরবারির খাপ খোলা হতো। কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করত না যে, কেন তিনি রেগেছেন।
ওপরে বর্ণিত বাহ্যিক আকৃতির মানুষটা হয়তো অতি সাধারণ, কিন্তু এর আড়ালে যে আহনাফ লুকিয়ে আছেন তিনি বিখ্যাত তাবিয়ি আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ।
আপনার ঘরে একটি ইয়াতিম শিশু রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইয়াতিমকে ধমক দিতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। আর আপনি যদি তাকে মারেন, যে দেখবে সে-ই তিরস্কার করবে। মানুষ আপনাকে ঘৃণার চোখে দেখবে। কিন্তু বাস্তবেই যদি সে এমন কোনো অপরাধ করে থাকে, যার সংশোধনের জন্য তাকে শাসন করা আবশ্যক এবং মানুষও সেটা জানে, তাহলে আপনাকে আর ভুল বুঝবে না। মনে করবে আপনি ঠিকই করছেন।
অভ্যন্তরীণ অবস্থা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় তারা আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে চলে আসবে। পরক্ষণে সত্য জেনে আবার তাদের ভুল ভাঙবে। আল্লাহ তাআলা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তা প্রকৃত অবস্থা জেনেই গ্রহণ করেন। কারণ, তিনি আল-বাসির, সর্বদ্রষ্টা। আসল ঘটনা তার সামনে প্রচ্ছন্ন ও আবৃত থাকে না। আল্লাহর সামনে সবকিছু দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট।
সব দেখছেন যিনি
আল্লাহ আপনার সবকিছু জানেন। আপনার ইচ্ছা, কামনা-বাসনা এবং স্বাভাবিক প্রবৃত্তি সবকিছু। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা, সত্যনিষ্ঠা এবং কল্যাণপ্রিয়তা আল্লাহ দেখেন। আপনি সংকটে আছেন, কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, সেটাও কিন্তু আপনার রব দেখছেন। আপনার মুখ ফসকে একটি কথা বেরিয়ে গেল, আপনি কষ্ট পেলেন। আল্লাহ ঠিকই জানেন যে, আপনি এই কথা বলতে চাননি। এভাবে আপনার সুখ-দুখের সবকিছু আল্লাহ জানেন, দেখেন ও শোনেন। এটা আপনার জন্য বড় সান্ত্বনা; আনন্দের সংবাদ; আপনার রব আপনার সবকিছুর খবর রাখেন।
আপনি কোনো এক অফিসের কর্মচারী। টানা ৩ ঘণ্টা কাজ করার কারণে কিছুটা ক্লান্তি ও একঘেয়েমি চলে এসেছে আপনার মাঝে। তাই আপনি অল্প সময়ের জন্য একটু বারান্দার দিকে গেলেন। কিন্তু বের হতেই দেখলেন আপনার বস সামনে দাঁড়ানো। আপনাকে বের হতে দেখেই সে রাগে ফেটে পড়বে, দু-চারটা গালি দিতেও কার্পণ্য করবে না। কারণ, সে দেখেছে আপনার বাহ্যিক অবস্থা আর ভেবে নিয়েছে আপনি কাজ বাদ দিয়ে শুধু এদিক-ওদিক পায়চারিই করছেন। এর আগে যে একটানা ৩ ঘণ্টা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন তা সে দেখেনি। আসলে সে অসহায়; এটা তার সীমাবদ্ধতা যে, সে বাহ্যিক অবস্থা দেখতে পেলেও অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানতে সক্ষম নয়।
কিন্তু আনন্দিত হোন আল্লাহর প্রতি। আপনার হৃদয়ের স্বচ্ছতা তিনি জেনেছেন। আপনার বস যে আপনাকে তিরস্কার করেছে, আল্লাহ জানেন, তার এই আচরণ অন্যায়। আল্লাহ দেখেছেন, আপনি এই লোকটির জন্য এতক্ষণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আপনি অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
জনৈক সালাফ বলেছেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর; তাঁর অবিনশ্বর সত্তার জন্য। সকল প্রশংসা, গুণগান তাঁর জন্য, তাঁর অতিপ্রাকৃতিক জ্ঞানের জন্য। তাঁর কাছে কোনো সংবাদ পৌঁছানোর প্রয়োজন হয় না। তাঁর কাছে প্রমাণ করার জন্য সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না; শপথ করার প্রয়োজন হয় না। তিনি জানেন সবকিছু।'
সীমিত জ্ঞানের কারণেই মানুষ সন্দেহপ্রবণ
মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত। তারা কোনো কিছু দেখেই, চিন্তা-ভাবনা না করেই, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই নিজেকে সন্দিহান বিষয় থেকে সবসময় নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কাউকে দেবেন না। আপনাকে নিয়ে কোনো অহেতুক আলোচনার সূত্রপাত হওয়ার আগেই তার শেকড় উপড়ে ফেলুন। দেখুন আল্লাহর নবির অনুপম আদর্শ। নবিজি মসজিদে নববিতে ইতিকাফরত ছিলেন। রাতে উম্মুল মুমিনিন সাফিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহা দেখা করতে আসেন। নবিজি তার সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ সেখান দিয়ে দুজন সাহাবি গেলেন। নবিজি তাদের ডেকে বললেন, 'দাঁড়াও। ও হলো সাফিয়াহ; আমার স্ত্রী।' তারা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা আপনার ব্যাপারে কি কোনো সন্দেহ পোষণ করতে পারি?' নবিজি বললেন, 'না। তবে শয়তান যেন তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেজন্যই বলে দিলাম।' [১]
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বাসির, সর্বদ্রষ্টা; তিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষের জ্ঞান নিতান্তই অল্প। তারা সামান্য কিছু দেখেই বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত। তাই আপনার দায়িত্ব হলো, যেকোনো বিষয় অস্পষ্ট না রেখে খোলাসা করে দেওয়া। আপনি নিজেকে সন্দেহভাজন অবস্থানে রাখবেন আর ভাববেন, আল্লাহ তো আমাকে জানেন—এটা যথেষ্ট নয়; সুন্নাহ সমর্থিত পন্থাও নয়। বরং করণীয় এবং সুন্নাহ হলো, আপনার দিক থেকে অপবাদ, সমালোচনা বা সন্দেহের কোনো বিষয় এলে সঙ্গে সঙ্গে তা প্রতিহত করা।
আপনি গায়রে মাহরাম কোনো নারীর ঘরে ঢুকলেন একান্তে, নির্জনে। আপনি বরফের মতো স্বচ্ছ। হয়তো ফেরেশতার চেয়েও বেশি পবিত্র। আপনি একদম খাঁটি ও সৎ একজন ব্যক্তি। আপনার প্রবৃত্তির লাগাম সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে। তবু আপনার সাথে ঐ গায়রে মাহরাম নারীর নির্জন উপস্থিতি মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেবে। অপবাদ, সমালোচনার সূত্রপাত ঘটানোর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
আপনি কোনো শপিং সেন্টারের একটি দোকানে গিয়ে দেখলেন সেখানে কেউ নেই। তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওখান থেকে বের হয়ে চলে আসুন। এটা সন্দেহজনক স্থান, দোকানির অনুপস্থিতিতে সেখানে আপনার উপস্থিতি মানুষের মধ্যে সন্দেহ জাগিয়ে তুলবে। বলবেন না যে, দোকানির জন্য অপেক্ষা করছি। বিপদসংকুল জায়গা থেকে যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্বে থাকুন। নতুবা আপনি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হবেন।
অবশ্য এসবই বান্দার সীমাবদ্ধতা। ওদিকে আল্লাহর জ্ঞান অপরিসীম, দৃষ্টির ফাঁকফোকর দিয়ে যে খিয়ানত করা হয় তা তিনি দেখতে পান।
আপনি আপনার রুমে বসে আছেন। সামনে কাচের জানালা, তার সামনে অন্য কারো বারান্দা। আপনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ঠিক তখনই কোনো নারী বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আপনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নারীটির দিকে। পৃথিবীর কেউ জানবে না, কোনো মানুষ কখনো আপনাকে এর জন্য জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে না; কিন্তু কেউ না দেখলেও আল্লাহ ঠিকই দেখেছেন আপনার চোখের খিয়ানত, তিনিই এর হিসাব নেবেন কড়ায় গণ্ডায়।
আপনি যে শহরে বসবাস করছেন, শহরের লোকজনের সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন, আপনার উদারতা ও মহত্ত্বের কারণে তাদের ভালো মানুষ মনে করছেন। কিন্তু কোন শহরের মানুষ কতটুকু ভালো, কোন শহরটা পাপের রাজ্য-সে সংবাদ জানেন শুধু আল্লাহ। পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থা দেখলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে, চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে। আপনি পশ্চিমাদের সংস্কৃতি স্বচক্ষে দেখেও বিশ্বাস করতে পারবেন না। একবার পশ্চিমা এক নারীর ব্যাপারে গণমাধ্যম বেশ গরম হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত সে সংসদ পদপ্রার্থীও ছিল। সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার মাধ্যমের সমস্ত সুযোগ ব্যবহার করে নিজের অবৈধ প্রেম, জীবনসঙ্গীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরকীয়ার কথা খুব গর্বের সাথেই পেশ করেছিল দুনিয়াবাসীর সামনে। যা আমাদের সমাজে কল্পনাও করা যায় না। তো কোন শহরের লোকজন ভালো আর কোন শহর পাপের নরকরাজ্য তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنَ الْقُرُونِ مِن بَعْدِ نُوحٍ وَكَفَى بِرَبِّكَ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا *
নূহের পর আমি অসংখ্য মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি। বান্দাদের পাপাচারের খবর রাখা এবং তা পর্যবেক্ষণের জন্য আপনার প্রতিপালকই যথেষ্ট [১]
আল্লাহর আল-বাসির নামটি বান্দার মধ্যে এমন অনুভূতি জাগ্রত করে যে, সে সবসময় আল্লাহর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই অবস্থান করছে। এজন্য আল্লাহর নবি বলেছেন, শ্রেষ্ঠ ঈমান হলো, তুমি এটা বিশ্বাস করবে যে, তুমি আল্লাহর সাথেই আছ।
'আমি সদা আল্লাহর পর্যবেক্ষণে আছি'—এই অনুভূতি সর্বদা জাগরুক থাকাই হচ্ছে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, 'তুমি এমনভাবে ইবাদত করো, যেন আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি আল্লাহকে দেখতে পাওয়ার মতো না হও, তাহলে মনের মধ্যে এই বিশ্বাস রাখবে যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।'
অর্থাৎ প্রকাশ্যে, গোপনে, লোকালয়ে, নির্জনে, নীরবতায়, জনসমাগমে-সর্বাবস্থায় আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।
আল্লাহ তাআলা দ্রষ্টা। তিনি আপনার জন্য সৃষ্টি করেছেন দৃষ্টিশক্তি। দু-চোখের মধ্যে আল্লাহ অসীম নিয়ামত দিয়েছেন। কর্নিয়া, আইরিশ, লেন্স, রেটিনা-সহ আরো কত কত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের এই চোখ। চোখ দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন।
নিজের নফসকে প্রশ্ন করুন, আল্লাহ তাআলা আমাদের কেন দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন? হারাম দৃষ্টিপাতের জন্য? ঈমান-বিধ্বংসী হারাম বস্তুসমূহের স্বাদ নেওয়ার জন্য? নাকি মহাবিশ্বের পরতে পরতে মহান আল্লাহর সৃষ্টিনৈপুণ্য ও অসীম নিয়ামতের প্রাচুর্য দেখার জন্য?
যে চোখ নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তু থেকে পবিত্র থাকে, যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেয়, যে চোখ আল্লাহর জন্য বিগলিত হয়, যে চোখ আল্লাহর আযাবের ভয়ে সিক্ত হয়, সেই চোখ আর যে চোখ হারামের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে—এই দুই চোখ কি কখনো সমান হতে পারে?
মহান রবের প্রতি বিনীত হোন
মহান স্রষ্টা, সবকিছুর দ্রষ্টা আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন আপনার চোখ সৃষ্টিতে। এই চোখ দিয়ে আপনি দেখছেন পৃথিবীর সবকিছু; সব রংয়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারছেন অনায়াসে। প্রিয়জনের প্রিয়মুখ, সন্তানসন্ততি, মা-বাবার দিকে তাকিয়ে লাভ করছেন তৃপ্তি। পবিত্র কুরআনের দিকে তাকিয়ে ধন্য করছেন আপনার চোখ; শীতল করছেন আপনার অন্তরাত্মা। এই চোখ দ্বারা এত নিয়ামত ভোগ করে এই চোখেরই স্রষ্টার সাথে নাফরমানি করা কি সাজে? চোখের স্রষ্টার প্রতি অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
হারামের জগতে আর কত দিন ঘোরাঘুরি? আল্লাহর অবাধ্যতায় আর কতকাল লাগামহীন জীবনযাপন?
এই চোখকে ব্যবহার করুন তার স্রষ্টাকে পাওয়ার কাজে। দু-চোখভরে দেখুন— জগৎ ও মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নিয়ামতরাজি, মিটমিট করে জ্বলতে থাকা হাজারো তারার মেলা, মখমলের মতো নরম জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলো, ফুলের পাপড়িতে লেগে থাকা অপরূপ সৌন্দর্য! এসবের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখুন, খুঁজে পাবেন আপনার স্রষ্টার অপার মাহাত্ম্য!
আমাদের প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার রব আমাকে নয়টি বিষয়ের আদেশ প্রদান করেছেন।
সেই নয়টির মধ্যে একটি হলো— 'আমার নীরবতা যেন হয় চিন্তার মগ্নতা, আমার কথা যেন হয় আল্লাহর স্মরণ এবং আমার দৃষ্টি যেন হয় শিক্ষার উপকরণ।'
সবসময় মনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। যিনি আপনার চোখ ও দৃষ্টিশক্তি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি আপনাকে দেখবেন না? আল্লাহ বলেন—
أَيَحْسَبُ أَن لَّمْ يَرَهُ أَحَدٌ أَلَمْ نَجْعَل لَّهُ عَيْنَيْنِ *
মানুষ কি মনে করে, তাকে কেউ দেখছে না? আমি কি তাকে দুটি চোখ দান করিনি? [১]
অর্থাৎ যিনি আপনার চোখ সৃষ্টি করেছেন তিনি আপনার চোখের দৃষ্টি ও অন্তরের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে বেখবর নন!
সুমহান রব আরো বলেন-
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ
(হে নবি!) আপনি নির্ভর করুন পরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর, যিনি আপনাকে দেখতে পান, যখন আপনি সালাতে দাঁড়িয়ে যান এবং সালাত আদায়কারীদের সাথে ওঠাবসা করেন।[২]
ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে, জানালার কাচ আর পর্দা টেনে দিয়ে, পৃথিবীর সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে আপনি লিপ্ত হচ্ছেন মহান রবের অবাধ্যতায়। হারাম সম্পর্কের আঁচল ধরে, অবৈধভাবে তারুণ্যের শক্তি একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছেন স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল-সাদার জগতে। পচা, দুর্গন্ধময় জগতের নিকৃষ্ট ভাগাড়ে ডুব দিচ্ছেন। আপনি কখনো ভেবেছেন, এই ভবনের ছাদ ভেদ করে, জানালা, দরজা আর দেওয়ালের প্রাচীর ভেদ করে আল্লাহর দৃষ্টি আপনার দিকে তাকিয়ে আছে! তিনি চাইলে এক মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারেন আপনার মূল্যবান চোখদুটি। অবশ করে দিতে পারেন আপনার শক্তিশালী দুটো হাত। বন্ধ দুয়ারের নিচ দিয়ে আসা অক্সিজেন বন্ধ করে দিয়ে টেনে দিতে পারেন আপনার অবাধ্যতার ইতি! কিন্তু তিনি আপনাকে সুযোগ দেন, যেন আপনি ফিরে আসেন। তিনি পথ চেয়ে থাকেন, আপনি কোনো একদিন ফিরবেন বলে!
ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পাপাচারী পাপের কাছাকাছি হওয়ার সময় যদি বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন, তাহলে সে আল্লাহর সামনে কী পরিমাণ দুঃসাহসী! কত বড় দুর্ভাগা! আর যদি মনে করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন না, তাহলে সে কত বড় কাফির, কত বড় গণ্ডমূর্খ! আল্লাহ তাকে দেখছেন জেনেও যদি পাপ করে ফেলে, তাহলে সেও কত বড় মূর্খ! কত বড় দুর্ভাগা!'
জ্ঞানীরা বলেছেন, মানুষ আল্লাহর চোখ থেকে যা লুকোতে পারে না তা যদি মানুষের কাছ থেকে লুকায়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহর সাথে তামাশা করে। আর মানুষ যখন বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা সর্বদ্রষ্টা, তিনি তার সবকিছুর ব্যাপারে খবর রাখেন, তখন তার হৃদয়-আত্মা আলোকিত হয়।
সালাফে সালিহিনের কেউ কেউ বলতেন, 'আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তোমার যদি পাপ করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে এমন কোথাও গিয়ে পাপ করো, যেখানে আল্লাহ তোমায় দেখতে পাবেন না!'
জীবনে যেখানেই যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, নিশ্চিত বিশ্বাস রাখুন, আপনি রয়েছেন আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিসীমার ভেতরেই। তিনি আপনার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। আপনি যখন সুখ অনুভব করছেন, জীবনের আনন্দঘন মুহূর্ত উপভোগ করছেন, তিনি দেখছেন আপনার হাসি; আপনার উচ্ছ্বাস। তখন তাঁর সামনে মাথা নত করে আদায় করুন শুকরিয়াজ্ঞাপক সিজদা।
আবার যখন আপনি ভেসে যাচ্ছেন পাপের অন্ধকার জগতে, ভুলে যাচ্ছেন গন্তব্যের কথা, ডুবে যাচ্ছেন অন্যায়-অপরাধের নর্দমায়, ভেসে যাচ্ছেন আল্লাহর অবাধ্যতার গড্ডলিকা প্রবাহে, তখনো তিনি আপনাকে দেখছেন। আপনি তাঁকে দেখতে পাবেন না; কিন্তু তিনি আপনার দিকে ঠিকই তাকিয়ে আছেন। এরপর তো ফিরে যেতে হবে তাঁরই দিকে। তাই করজোড়ে মিনতি করুন—
হে আল্লাহ, আপনি আল-বাসির, সম্যক ও মহাদ্রষ্টা। আপনি আমার প্রকাশ্য-গোপন সকল দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। আপনার হাতেই আমার জীবনের লাগাম। আমি ভিক্ষা চাইছি আপনার সম্মুখে। আমার হৃদয় ভরিয়ে দিন আলোতে; চোখে দান করুন জ্যোতি, যেন এর দ্বারা আমি আপনার অসীম নিয়ামতের মহিমা দেখতে পাই। প্রকাশ্যে-গোপনে, লোকালয়ে-নির্জনে সর্বাবস্থায় আপনার সামনে আদব ও সৌজন্য রক্ষা করতে চলতে পারি। আমি যেন চলি আপনার নির্ধারিত সীমারেখার গণ্ডিতে, আপনার আদেশের চৌহদ্দির ভেতরে। আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন আপনার প্রিয় বান্দাদের কাফেলায়। আমিন।
টিকাঃ
[১] সুরা আনফাল, আয়াত: ২৯
[২] সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৮
[১] তাফসির ইবনু কাসির, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪৮
[১] সহিহ বুখারি : ২০৩৫
[১] সূরা ইসরা, আয়াত: ১৭
[১] সুরা বালাদ, আয়াত: ৭-৮
[২] সুরা শুআরা, আয়াত: ২১৭-২১৯