📄 আল-کارিম : মহানুভব, পরমদাতা
যদি আপনার ভেতরে বসবাস করে এমন একটি হৃদয়, যা উত্তম ভাবনা এবং মুসলিমদের কল্যাণ চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকে, তাহলে এটা আল্লাহর কাছে মহৎ একটি গুণ। তিনি বান্দার মহৎ গুণাবলি ভালোবাসেন।
তিনি মানুষের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং দৈহিক গঠন দেখেন না। কে বেঁটে, কে লম্বা, কার চোখ বড়, কার চোখ ছোট, কার নাক উঁচু, কার চোখ কোটরে, কার ভ্রূদ্বয় আলাদা, কারটা যুক্ত, কার চোয়াল মসৃণ—এসবের প্রতি আল্লাহ লক্ষ করেন না। তিনি তো কারিম, মহানুভব; তাই মহৎ তাঁর দৃষ্টি।
☆☆☆
আল-কারিম। আরবি كرم (কারাম) শব্দ থেকে এর উৎপত্তি; যার অর্থ মহানুভবতা, মহত্ত্ব। আরবি ভাষাবিদগণ বলেন, 'প্রত্যেকটি প্রশংসনীয় ও উত্তম গুণই 'কারাম', এবং যে ব্যক্তি সেই গুণের অধিকারী সে 'কারিম'। মানুষ মনে করে শুধু বদান্যতা ও উদারতাই 'কারাম' শব্দের অর্থ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা সকল উত্তম গুণের নাম।
অতএব, সহনশীলতা মহানুভবতা, বদান্যতা মহানুভবতা, অনুগ্রহ মহানুভবতা, ধৈর্য মহানুভবতা, আত্মমর্যাদাবোধও মহানুভবতা। এক কথায় মানুষ যতগুলো উত্তম ও মহৎ গুণাবলি দ্বারা নিজের জীবনকে শোভিত ও অলংকৃত করে তার সবগুলোর সমষ্টি ও গোষ্ঠিগত নামই হলো মহানুভবতা।
মানুষকে কিছু দান করা বা শুধু বদান্যতার নামই মহানুভবতা নয়; বরং সহনশীল ব্যক্তি মহানুভব, দয়ালু ও পরোপকারী ব্যক্তি মহানুভব, অকৃত্রিম ও খাঁটি লোক মহানুভব, মানুষ ও সৃষ্টির প্রতি প্রেমময় ব্যক্তি মহানুভব, ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি মহানুভব। আরবিতে মূল্যবান পাথরসমূহ, যেমন, হীরা, জহরত, মণি-মুক্তা - এগুলোকে 'হাজারুন কারিম' বলা হয়। অর্থাৎ মূল্যবান পাথর।
কারিমের আরো অনেক অর্থ রয়েছে-
সুশ্রী চেহারা ও আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন বোঝাতে 'কারিম' শব্দ ব্যবহৃত হয়। আজিজে মিসর-এর স্ত্রী ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কুপ্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। রাজপ্রাসাদের নারীদের মধ্যে সমালোচনা ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। আজিজে মিসর-এর স্ত্রী বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে এক রাজকীয় ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নারীরা সকলে উপস্থিত হওয়ার পর সে ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাদের সামনে পেশ করে। ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখে তারা হতচকিত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা সেদিকে ইঙ্গিত করে বলেন-
فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّكَاً وَآتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِّنْهُنَّ سِكِّينًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلَّا مَلَكُ كَرِيمٌ
স্ত্রী-লোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল। তাদের জন্য আসন প্রস্তুত করল এবং তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দিলো (তাদের আপ্যায়নে পরিবেশিত ফলমূল কেটে খাওয়ার জন্য) এবং ইউসুফ আলাইহিস সালামকে বলল, 'তাদের সামনে বের হও।' তারা যখন তাকে দেখল, তখন তার গরিমায় অভিভূত হয়ে নিজেদের হাত কেটে ফেলল। তারা বলে উঠল, 'অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নয়; এ তো কোনো সুদর্শন ফেরেশতা। [১]
বংশীয় কৌলিন্য ও আভিজাত্য বোঝাতেও কারিম শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
الْكَرِيمُ ابْنُ الْكَرِيمِ ابْنُ الْكَرِيمِ ابْنُ الْكَرِيمِ يُوسُفُ بْنُ يَعْقُوبَ بْنِ إِسْحَاقَ بْنِ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِمُ السَّلَامِ
অর্থাৎ, ইউসুফ আলাইহিস সালাম অভিজাত বংশ-পরম্পরায় জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি নিজেই একজন নবি, তার বাবা ইয়াকুব আলাইহিস সালাম, তার দাদা ইসহাক আলাইহিস সালাম, দাদার বাবা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম (১
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বহু জায়গায় জান্নাতকে 'আল-মাকামুল কারিম' আখ্যা দিয়েছেন। যেখানে নেই কোনো কষ্ট-ক্লেশ, ভয়-শঙ্কা; নেই কারো প্রতি কারো হিংসা-বিদ্বেষ। চিরশান্তির আবাসন-মাকামুন কারিম।
আল-কারিম শব্দের আরেকটি অর্থ প্রয়োজনীয় ও প্রিয় বস্তু। যাতে রয়েছে প্রচুর কল্যাণ; সকলেই তার মুখাপেক্ষী।
কুরআনকে বলা হয় কিতাবুন কারিম বা মহাগ্রন্থ। পূর্ণ কুরআনই মানবতার সমূহ কল্যাণ। দুনিয়া ও আখিরাতের আলোকবর্তিকা। তার প্রতিটি তত্ত্ব ও তথ্যই পরম বাস্তব এবং প্রতিষ্ঠিত সত্য। বিশুদ্ধ শিক্ষা, দরদপূর্ণ উপদেশ, অনন্য দৃষ্টান্ত এবং মানবতার প্রতি হিতকামনায় পূর্ণ। তার সামনে বা পিছনে কোথাও বাতিল এসে ভিড়তে পারে না। তাতে নেই কোনো ধরনের আজগুবি বা মিথ্যার পসরা। ত্রুটি, অসংলগ্নতা বা বৈপরীত্যের লেশমাত্র নেই কুরআনুল কারিমে। সর্বদিক থেকে পূর্ণ ও নিখুঁত গুণবিশিষ্ট মহাগ্রন্থই আল কুরআনুল কারিম।
আরবরা তাদের মূল্যবান সম্পদকে ডাকে 'কারিম' বলে। মরু-জাহাজ উট, বিস্তীর্ণ মরুখণ্ডের উত্তপ্ত বালুতে সফরের একমাত্র অবলম্বন। উটই বালুসমুদ্রের মাঝ দিয়ে আরোহীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আবার পিপাসার মুহূর্তে দেয় নির্মল, স্বচ্ছ দুধ। তাই মরুর দুলালদের নিকট 'মরুজাহাজে'র গুরুত্ব কোনোভাবেই সমুদ্র-জাহাজ থেকে কম নয়। এজন্য খুব আদর করে তারা উটকে স্মরণ করে 'নাকাতুন কারিমা' বলে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামেনের গভর্নর হিসেবে প্রেরণের সময় যেসব নসিহত করেছিলেন, তন্মধ্যে একটি ছিল, 'যাকাত উসুলের ক্ষেত্রে মানুষের অতি মূল্যবান সম্পদের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।' অর্থাৎ মধ্যম প্রকৃতির সম্পদ গ্রহণ করবে। বেছে বেছে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উটগুলো যাকাতের নামে কেড়ে নেওয়া যাবে না। এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মূল্যবান সম্পদকে 'কারিম' বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আঙুর খুবই উপকারী ও সুস্বাদু ফল। দৃষ্টিনন্দন থোকায় ঝুলে থাকা পাকা আঙুর অনেকের প্রিয় ফল। তাই আঙুরকে বলা হয় 'কারাম'।
উত্তম আখলাক-চরিত্র, মার্জিত ও শ্লীল আচরণ-অভ্যাসকে বলা হয় 'মাকারিমুল আখলাক'।
মোটকথা, কারিম শব্দটি খুবই অর্থবহ এবং সমগ্র উত্তম গুণাবলির সমাহার। অতএব, কারিম শব্দটি যখন ব্যবহৃত হবে আল্লাহর নামে, তখন তার অর্থ হবে ঐ মহান সত্তা; যিনি সকল উত্তম ও মহৎ গুণাবলির আধার। আল কুরআনকে যখন বলা হবে কারিম, তখন তার অর্থ হবে, মহান আল্লাহ কর্তৃক মানবতার কল্যাণে অবতীর্ণ, তাঁর পবিত্র বাণী মহাগ্রন্থ আল কুরআন।
মহান আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ ﴿
হে মানুষ, কীসে তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করল?[১]
অর্থাৎ মহান রবের ব্যাপারে তোমাকে কীসে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে? আল্লাহর ব্যাপারে কি মানুষ ধোঁকায় পড়তে পারে? অথচ এমন মহান সত্তার ব্যাপারে ধোঁকায় নিপতিত হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
আপনি কারো ওপর জুলুম করলেন। আদালতে আপনার নামে মামলা হলো। আপনি জানেন যে, আপনি অপরাধী। তারপরও মামলা নিজের অনূকুলে আনার জন্য জজকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিলেন, আর মামলা জিতেও নিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কী হলো? আপনি ঐ জজের বাহ্যিক সততায় ধোঁকা খেলেন। আপনি ভাবলেন, সে তো উপকারই করেছে। আল্লাহর হুকুম ছুড়ে ফেলে আপনি যে কাজ করলেন, এতে আপনি আসলে আল্লাহর ব্যাপারে ধোঁকা খেয়েছেন। আপনি আল্লাহকে চিনতে পারেননি। আপনি ভেবে নিয়েছেন আল্লাহ আপনার জন্য যে ফয়সালা করেছেন তা ন্যায়সংগত। আসলে আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করেননি, আপনি আল্লাহকে দুর্বল মনে করেছেন। আপনার এই একটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আল্লাহর কুদরত, অনুগ্রহ, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারকে নাকচ করে দিলেন। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদের কখনো ভুলে যান না? তাঁর আনুগত্যে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের তিনি জাহান্নামের আগুনে দেবেন না। আপনি কি ভুলে গেছেন, যারা আল্লাহর সাথে শত্রুতা পোষণ করে, যারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে, তিনি তাদেরকে জান্নাত দেবেন না? আপনি আল্লাহকে ভুল বুঝেছেন। আল্লাহর ব্যাপারে নির্বুদ্ধিতা ও মূর্খতাপূর্ণ ধারণা করে বসে আছেন। আপনি ধোঁকায় নিপতিত হয়েছেন আপনার রবের ব্যাপারে!
বান্দার প্রতি মহান রবের মহানুভবতা
আপনার অফিসে চাকুরি করে একজন কর্মচারী। সে তার নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সর্বাত্মক চেষ্টা ব্যয় করে আপনার কাজ করে দেয়। আপনি তার ওপর খুশি হয়ে এই নিষ্ঠার প্রতিদান হিসেবে তাকে উপহার দেন। আপনি তার কাছ থেকে উপকার পেয়েছেন বলেই তাকে উপহার দিয়েছেন। কোনো বিনিময় ছাড়া, আপনার কোনো কাজ করে দেওয়া ছাড়া এমনি এমনি তাকে প্রতিদান দেননি। তবুও সমাজের লোক আপনাকে মহানুভব, উদার বলেই চিনবে।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কারিম, মহানুভব হলেন আল্লাহ। তিনি মানুষকে নিয়ামতে ভরিয়ে দেন কোনো বিনিময় ছাড়াই। তিনি আমাদের অস্তিত্ব দান করেছেন, পরম যত্নে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এতে আমাদের কোনো আবেদন বা আবদার ছিল না। আবেদন, নিবেদন ছাড়াই নিজ অনুগ্রহে তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন আমাদের জীবন। এতে আমাদের কোনো হক ছিল না।
বান্দার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি উদার ও মহানুভব। আপনি কারো সাথে কোনো ভুল করে ফেললেন। ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমাও চেয়ে নিলেন। সে ক্ষমা করে দিলো। কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই সে বলে ফেলবে, 'ভুলে যেয়ো না, তুমি কিন্তু এমন একটা কাজ করেছিলে!' এরপর সপ্তাহ খানেক হয়তো আপনি স্বস্তিতে থাকবেন। সে আবার বলবে, 'তুমি কিন্তু একবার এমন একটা কাজ করেছিলে।' তখন বিরক্তি চেপে রেখে আপনিও বলতে বাধ্য হন, 'হ্যাঁ! তবে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।' এভাবেই যখন-তখন সে আপনার ভুলত্রুটি মনে করিয়ে দিতে পারে।
তাই রাব্বে কারিমের কাছে দুহাত তুলে দুআ করুন— ‘আল্লাহুম্মা আনতা আফুউউন কারিম!’
আপনার দুআ শেষ হতে না হতেই তিনি তাঁর মহান ক্ষমার চাদরে আপনাকে আবৃত করবেন। তাঁর ক্ষমা মানুষের ক্ষমার মতো নয় যে, বারবার মনে করিয়ে আপনাকে খোঁটা দেবেন। ক্ষমা প্রার্থনার কারণে শুধু আপনার অপরাধের মার্জনাই করা হবে না; বরং দুনিয়াতে যেন মানুষ আপনার পাপের কথা চর্চা করতে না পারে, সেজন্য মানুষের অন্তর থেকেও সেটা ভুলিয়ে দেন।
বান্দা যখন নিষ্ঠা ও অনুশোচনার সাথে আন্তরিকভাবে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তাআলা সকলের অন্তর থেকে তা ভুলিয়ে দেন। আমলনামা লেখায় দায়িত্বরত ফেরেশতা এবং অন্যান্য ফেরেশতাকে তা ভুলিয়ে দেন। জমিনের প্রতিটি স্থানকেই তার গুনাহের কথা ভুলিয়ে দেন। শুধু তা-ই নয়, বরং তাকে তার নিজ গুনাহের কথা ভুলিয়ে দেন। মুমিন বান্দার মধ্যেও কখনো কখনো মূর্খতা বিদ্যমান থাকে কিন্তু আল্লাহ তাকে সে কথা ভুলিয়ে রাখেন, এতে সে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে।
আপনি হাজার বার কারো উপকার করলেন। কিন্তু একদিন আকস্মিকভাবেই আপনার অধঃপতন হলো। দেখবেন সেই লোকটি আপনার অগণিত উপকারের কথা ভুলে গিয়ে ঐ পতনটাকেই আঁকড়ে ধরবে। খুব ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মানুষের সামনে প্রচার করে বেড়াবে, আপনাকে হেয় করবে। অথচ আপনার হাজারো ভালো কাজের সামনে এই সামান্য বিচ্যুতি নিতান্তই নগণ্য। এ কারনেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে খারাপ প্রতিবেশী থেকে পানাহ চাই। যে অন্যের গুণ দেখলে লুকিয়ে ফেলে আর দোষ পেলে প্রচার করে বেড়ায়। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পানাহ চাই খারাপ শাসক থেকে, যে আমার ভালো কাজে সৌজন্যবোধ ও কৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয় না এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তা ক্ষমা করে না।’
অথচ আল্লাহ তাআলা পাপ ক্ষমা করে দেন, দোষত্রুটি ঢেকে রাখেন। তাই মানুষ শত ভুলত্রুটি ও পাপ করা সত্ত্বেও জনসম্মুখে নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়াতে পারে। কোনো এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি একবার বলেছিলেন, ‘মানুষ যদি আমার বদভ্যাস ও পাপ সম্পর্কে জানত, তাহলে তারা আমার দিকে ফিরেও তাকাত না। আমার থেকে দূরে সরে যেত এবং আমার সান্নিধ্যকে বিরক্তিকর মনে করত।'
আল্লাহ কত মহান যে, তিনি বান্দার দোষত্রুটি আড়াল করে দিয়েছেন। মানুষও মানুষের দোষ লুকায়। কিন্তু ঠিকই কানে কানে ফিসফিস করে, 'জানো, অমুক লোকটা কিন্তু এই এই অপরাধ করেছে।' কিন্তু আল্লাহ বান্দার পাপকে উপেক্ষা করবেন। উপেক্ষা করার অর্থ না জানা নয়; বরং তিনি বান্দার পাপ সম্পর্কে জানার পরও তা এড়িয়ে যান।
বলা হয়েছে-
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ )
আপনি কখনো মনে করবেন না, জালিমরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ উদাসীন। তবে তিনি তাদেরকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়েছেন, যেদিন তাদের চক্ষু হবে স্থির। [১]
নবিজিও ছিলেন কারিম, উদারচিত্ত, মহানুভব। কারিম মূলত আল্লাহর গুণ। যারা আল্লাহর প্রকৃত বান্দা, তাদের মধ্যেও আল্লাহ তাআলা নিজ গুণের কিঞ্চিৎ বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তখন মানুষকেও বলা হয় কারিম। মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহর এই মহান গুণ নিজেদের চরিত্রে ধারণ করে তারা মানুষের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। উত্তম পদ্ধতিতে এড়িয়ে যায়।
আর নীচ প্রকৃতির লোকেরা মানুষের দোষ-ত্রুটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করে। পান থেকে চুন খসতেই চোখ রাঙানি দেয়। মানুষের চলার পথ সংকীর্ণ করে তোলে। কারণে অকারণে অন্যকে লজ্জা দেয়। কিন্তু মুমিন কখনো অশ্লীল হয় না, কারো দোষচর্চা করে না এবং কাউকে গালি দেয় না। কারণ মুমিন তো মহানুভব, উদার মনের অধিকারী।
মহান আল্লাহই প্রকৃত মহানুভব, কারিম। তাই বান্দা যখন ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন তিনি বান্দাকে তার অসংখ্য গুনাহ, বদঅভ্যাস এবং লজ্জাজনক কাজগুলো স্মরণ করিয়ে দেন না। বরং বান্দাকে ক্ষমা করে দেন।
একবার আমি দামেশকের একটি উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে যাই। পাহাড়টি অনেক উঁচু। সেখানে অনেক ঘরবাড়িও রয়েছে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। আমার মনে হলো, এসব বাড়িঘর কত উঁচুতে! এখানে আল্লাহর ইবাদত করা হয় নাকি তাঁর নাফরমানি করা হয়-সে কথা তিনি ছাড়া কেউ জানেন না। তারপরও আল্লাহ তাদেরকে অগণিত রিযিক দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা কারিম, মহানুভব; তাই বান্দা সামান্য ইবাদত নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হলেও আল্লাহ তাকে অঢেল পুরস্কার দান করেন।
কোনো মানুষ আরেকজনকে এক লোকমা খাবার খাওয়াল। এই এক লোকমা খাবারই কিয়ামতের দিন উহুদ পাহাড়ের মতো বিশাল হয়ে উঠবে। আল্লাহ তাআলা এক লোকমার বদৌলতে তাকে উহুদ পাহাড়ের সমান বিনিময় দেবেন। পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্রের আইন কি এমন আছে যে, কেউ কাউকে এক টাকা দিয়ে বিনিময়ে পাঁচ বিলিয়ন নেবে? কিন্তু আখিরাতে আল্লাহ তাআলা এর চেয়ে লক্ষ-কোটি গুণ বেশি দান করবেন মুমিন বান্দাদেরকে। আপনি কাউকে সামান্য কিছু দিলেন, সামান্য ইবাদত নিয়ে আল্লাহর সম্মুখে হাজির হলেন, আপনার সম্পদের যৎসামান্যই আল্লাহর পথে ব্যয় করলেন কিংবা একটু সবরের মাধ্যমে আপনার কুপ্রবৃত্তি অবদমিত করে রাখলেন-এই এতটুকুর বিনিময়ে আল্লাহ আপনাকে দেবেন বিশাল জান্নাত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ )
তোমরা ধাবমান হও আপন প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের মতো, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য [১]
এই নগণ্য, দুর্বল ও অধম বান্দাকে তিনি সম্মান দিয়ে বলেছেন-
.... وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ )
তোমরা আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করো, আমি তোমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করব। আর তোমরা কেবল আমাকেই ভয় করো।১৯
আমাদের আসলেই কি কোনো প্রতিশ্রুতি রয়েছে? আল্লাহর সাথে আমাদের কি কোনো তুলনা চলে? তবুও আল্লাহ তাআলা কত মহান! তিনি আমাদের সমকক্ষ সাথির মতো করেই সম্বোধন করেছেন। এটা আমাদের প্রতি আল্লাহর মহত্ত্বের প্রকাশ।
আল কুরআনের বহু স্থানে তিনি আমাদেরকে আদেশ প্রদানের সাথে সাথে সেই আদেশের কারণ ও হেতুও উল্লেখ করে দিয়েছেন। এর দ্বারা বস্তুত তিনি আমাদের সম্মানিত করেছেন। যেমন-
اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ )
আপনি তিলাওয়াত করুন কিতাব থেকে, যা আপনার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয় এবং সালাত কায়েম করুন। সালাত অবশ্যই বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে। তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন [২]
আমরা আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাদের শুধু সালাতের আদেশ প্রদান করেই কথা শেষ করে দিতে পারতেন। কিন্তু নির্দেশ প্রদানের পাশাপাশি তিনি এই নির্দেশের অন্তর্নিহিত হেতুও আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। এতে তিনি আমাদের প্রতি মহত্ত্বেরই পরিচয় দিয়েছেন।
কোনো শক্তিধর লোক দুর্বল কাউকে কোনো আদেশ করলে, 'এই কাজটি করো' জাতীয় আদেশ করেই ক্ষান্ত হন। কোনো কারণ দর্শানোর গরজবোধ করেন না। কারণ সে নিজেকে ভাবে সম্মানিত, শক্তিধর। তার আদেশ মাথা পেতে মেনে নেওয়া ছাড়া দুর্বলের আর কোনো পথ নেই। কিন্তু আল্লাহ এত মহান হওয়া সত্ত্বেও আমাদেরকে আদেশ করার সময় কারণ বর্ণনা করেছেন। আরো বর্ণিত হয়েছে-
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ﴿١٠٣﴾
আপনি তাদের সম্পদের যাকাত গ্রহণ করুন। এই যাকাত তাদের সম্পদকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে। আর আপনি তাদের জন্য দুআ করুন। কারণ আপনার দুআ তাদের জন্য প্রশান্তিদায়ক। আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।[১]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴿١٨٣﴾
হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।[২]
তিনি আমাদেরকে তাঁর প্রতিশ্রুতির স্থল এবং ভালোবাসার পাত্র বানিয়েও সম্মানিত করেছেন। অথচ আমাদের মধ্যে তার ভালোবাসার পাত্র হওয়ার কী-ই বা যোগ্যতা রয়েছে? আল্লাহ বলেন-
...يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ...﴿٥٤﴾
তিনি তাদের ভালোবাসেন, তারাও তাঁকে ভালোবাসবে।[৩]
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا ﴿٩٦﴾
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, দয়াময় অবশ্যই তাদের জন্য সৃষ্টি করে দেবেন ভালোবাসা।[৪]
আল্লাহ পুরো দুনিয়াটাই দিয়ে দিয়েছেন আমাদের।
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
সেই সুমহান সত্তা, যিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের কল্যাণে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেছেন এবং সেটাকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেছেন। তিনি সকল বিষয়ে সবিশেষ অবহিত [১]
লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তাআলা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন আমাদের জন্য। মানুষের জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে জরুরি জিনিস অক্সিজেনকে আল্লাহ সহজলভ্য করে দিয়েছেন। আপনি যেখানেই থাকুন, যেখানেই যান, প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে কোনো মানা নেই। এই যে বাজার থেকে আপেল, আঙুর, কমলা কিনছেন, ব্যবসায়ী বা কৃষককে প্রতি কেজির মূল্য দিচ্ছেন। কিন্তু আসলেই কি আপনি আপেলের মূল্য দিচ্ছেন? আপেলের মূল্য দেওয়ার ক্ষমতা কি মানুষের আছে?
কৃষক বা ব্যবসায়ীকে যে মূল্য দেওয়া হচ্ছে তা মূলত সেবা ও শ্রমের মূল্য। কৃষক অতি যত্নের সাথে ফলের চাষ করেছে। সময়মতো পানি সেচ ও পরিচর্যা করে বড় করেছে এবং পরিপক্ক হওয়ার পর জমিন থেকে ফল তুলেছে। গুদামজাত ও সংরক্ষণ করেছে। এরপর গাড়িতে করে আপনার সামনে এনে হাজির করেছে। তাই ফল ক্রয়ের সময় আপনি প্রতি কেজির যে মূল্য দিচ্ছেন তা মূলত তাদের এইসব শ্রমের মূল্যায়ন। আর যে আপেল আপনি ক্রয় করলেন তা এক অমূল্য বস্তু; তার কোনো মূল্যই হতে পারে না। সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাদান। একইভাবে শুধু দুনিয়া নয়; তিনি আখিরাতেরও মালিক বানিয়েছেন মুমিনদের।
দুনিয়াতে এমন মানুষ আপনার খুব কমই মিলবে, যে অনুগ্রহ প্রদর্শনের পর আর কখনো তার স্মৃতিচারণ করবে না। যদি কখনো আপনার ওপর রহম করে থাকে, আপনার ওপর তার কোনো অবদান থেকে থাকে, বারবারই সে তার সস্মৃতিচারণ করবে। আমি তোমার জন্য অনেক কিছু করেছি, তোমার তখন কোনো উপায় ছিল না; আমিই তোমাকে রক্ষা করেছি ইত্যাদি নানাভাবে আপনাকে খোঁটা দিতে থাকবে। খোঁটা না দিলেও সেসবের স্মৃতিচারণ তো অবশ্যই করবে। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে কত কিছু দান করেন, তিনি কখনো খোঁটা দেন না। তিনি অনুগ্রহের বিনিময়ে বান্দাকে কোনো ধরনের পেরেশানিতেও ফেলেন না।
কিন্তু কোনো মানুষের কাছ থেকে অনুদান নিতে গেলে সে আপনার নাভিশ্বাস উঠিয়ে ছাড়বে। দরখাস্ত জমা দাও, জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে এসো, দুদিন পরে এসো, আমরা বিষয়টি দেখছি ইত্যাদি নানা ধরনের দৌড়াদৌড়িতে আপনাকে ক্লান্ত বানিয়ে ছাড়ে। কিন্তু মহান আল্লাহ আপনার প্রতি উদারতা প্রদর্শন করেন, আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করে দেন। এতে কোনো দলিল-দস্তাবেজের প্রয়োজন হয় না। তিনি যখন দান করেন, তখন অঢেল দান করেন। যখন তাঁর নাফরমানি করা হয়, তখনও তিনি উদারতার পরিচয় দেন। তিনি এতই মহানুভব যে, পাপী বান্দাকেও তার অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হতে দেন না। মহামহিম আল্লাহ বলেন-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।(১)
তিনি কারিম তাই কারো আশা-প্রত্যাশা তাঁর কাছে অবহেলিত হয় না। আপনার কাছে একজন মানুষ এসে অত্যন্ত কাকুতি-মিনতি করে তার প্রয়োজন পেশ করল। চোখের পানিতে গাল ভিজিয়ে ফেলল। কিন্তু আপনার পাষাণ হৃদয়ে কোনো মমতার উদ্রেক হলো না। আপনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। বলুন সে কি আর আপনাকে তার ভালোবাসার তালিকায় রাখবে? তার কল্পনার দর্পণে কখনো যদি আপনি ভেসে ওঠেন, তবে উঠবেন একটা পাষণ্ডর আকৃতিতে। কারণ এমন অসহায়ত্ব ও মিনতি প্রকাশ করা সত্ত্বেও আপনি তার সামান্য আশাকে পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়; বরং আপনি নির্দয়ের মতো তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
হয়তো আপনিই কারো কাছে নিজের প্রয়োজন পেশ করলেন। সে আপনাকে ফিরিয়ে দিলো না ঠিকই; কিন্তু পরবর্তীতে জনসম্মুখে সে আপনাকে লাঞ্ছিত করবে। খোঁটা দিয়ে না হলেও, অনুগ্রহের স্মৃতিচারণ করে আপনাকে বিব্রত করবে। যারা দুয়েকবার মানুষকে উপকার করে থাকে—তাদের এমন আচরণ আপনি অহরহই দেখতে পাবেন।
কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর সম্মুখে তার প্রয়োজন তুলে ধরে, চোখের পানি ঝরিয়ে বিনয়াবনত মস্তকে তাঁর কাছে আবেদন করে, আল্লাহ কি কখনো তাকে ফিরিয়ে দেন? চোখ থেকে বেয়ে পড়া তপ্ত অশ্রুকে অবমূল্যায়ন করেন? কখনোই না। মহান আল্লাহ তো সকলের আশা-প্রত্যাশার বিশ্বস্ত ঠিকানা, চাওয়া-পাওয়ার পরম আশ্রয়। তিনি সর্বদাই অনুগ্রহ ও দানের শিশিরে সিক্ত করেন বান্দার জীবন। তিনি মহাশক্তিধর, উদারহস্ত। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই খরচ করেন।
তিনি অত্যন্ত মহানুভব ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। তাই বান্দা যখন তাঁর সম্মুখে দুই হাত তুলে প্রার্থনা করে, দু-চোখের অশ্রু ঝরায়, হৃদয়ের সব কলুষতা থেকে পবিত্র হয়ে বিনয় ও কোমলতার সুরে তাঁকে ডাকে—তিনি ঐ হাত দুটিকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।
মানুষ চাওয়ার কারণে বিরক্ত হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির ওপর ক্রোধান্বিত হন, যে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ব্যক্ত করে না।
আল্লাহ তাআলা মহানুভব, তাই তিনি উত্তম চরিত্র ও মহৎ গুণাবলিকে অত্যধিক ভালোবাসেন। আর হীন স্বভাবকে প্রচণ্ড ঘৃণা করেন।
আপনি যদি সদা সর্বদা অনর্থক কাজ-কর্ম ও অশ্লীল ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত থাকেন, অন্য কারো হকের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে শুধু স্বার্থপরের মতো জীবনযাপন করেন—এতে মূলত আপনি নিজের চারিত্রিক হীনতা ও মানবিক অধঃপতনেরই পরিচয় প্রকাশ করছেন। আল্লাহর কাছে এ ধরনের স্বভাব ঘৃণ্য।
যদি আপনার ভেতরে বসবাস করে এমন একটি হৃদয়, যা উত্তম ভাবনা এবং মুসলিমদের কল্যাণ চিন্তায় বিভোর থাকে, তাহলে এটা আল্লাহর কাছে মহৎ গুণ। তিনি ভালোবাসেন মহৎ গুণকে। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'আল্লাহ তোমাদের চেহারা-সুরত, দেহকান্তি এবং সম্পদের প্রতি লক্ষ করেন না; বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল।'[১]
মানুষের অন্তরই আল্লাহর দৃষ্টিপাতের প্রধান স্থান।
মানুষ সম্পদশালী ও দাপটের অধিকারী ব্যক্তির কাছে যায়। আল্লাহর সম্পদ ও প্রতাপের সাথে ঐ ব্যক্তির দাপটের কোনো তুলনাই চলে না। সে নগণ্য, দুর্বল ও নীচ স্বভাবের হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তার সামনে অবনত হয়। অনেক অনুনয়-বিনয় করে, চোখের পানি ফেলে তার কাছে নিজের প্রয়োজন ব্যক্ত করে। অথচ সে প্রায়ই কিছু না দিয়ে মানুষকে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু আল্লাহর কাছে প্রয়োজন পেশ করলে তা কখনো অপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে দেন না। শুধু তা-ই নয়, তিনি এত বেশি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন যে, অন্যের কাছে প্রয়োজন পেশ করা, অন্য কারো সামনে মাথা নত করাকে একদমই পছন্দ করেন না।
বিপদে-আপদে, দুরবস্থা-সংকটে যারা তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করে, তিনি তাদের অবজ্ঞা করেন না। পরম করুণা ও ভালোবাসায় টেনে নেন নিরাপদ আশ্রয়ে।
তাই কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখুন। তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন। জীবনের আশা-ভরসা, চাওয়া-পাওয়া সবকিছুকে তাঁর সাথেই জুড়ে দিন। মানুষের কাছ থেকে কোনো কিছু পাওয়ার কথা ভুলে যান। জীবনের কোনো কিছুকে তাদের সাথে সম্পৃক্ত করা থেকে বিরত থাকুন।
মহান ব্যক্তি অটুট রাখে সম্পর্ক
মহৎ লোক কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করে না। আপনি তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটালেও সে সম্পর্ক জোড়া লাগিয়ে দেয়। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে সে আপনাকে দেখতে আসবে; সেবা-শুশ্রুষা করবে। আপনি কোনো সফর থেকে ফিরলে সে আপনার সাক্ষাতে আসবে। আপনি অর্থনৈতিক সংকট বা অসচ্ছলতায় পতিত হলে সে আপনাকে সাহায্য করবে। আপনি চাওয়া ব্যতিরেকে সে আপনার প্রতি অনুগ্রহ করবে। কারিম বা মহৎ লোক তো সে-ই, যে প্রার্থনা ছাড়াই প্রয়োজন পূর্ণ করে দেয়।
আপনার একজন ভাই আছেন, আত্মমর্যাদাবোধ এবং সামাজিক অবস্থাসম্পন্ন। লোকে তাকে বিশেষ সম্মানের দৃষ্টিতেই দেখে। কিন্তু তার অর্থনৈতিক অভাব দেখা দিলো। আপনি তখন বেশ সচ্ছল, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে যথেষ্ট ফুর্তিতেই দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু আপনার ভাই অভাব-দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও চরম আত্মমর্যাদাবোধের কারণে আপনার কাছে প্রয়োজন প্রকাশ করতে পারে না। আপনি যদি তার চাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন, তাহলে আপনি তার ওপর জুলুম করলেন।
অপরদিকে মহানুভব আল্লাহর কথা ভেবে দেখুন। অনেক সাধারণ মানুষ রয়েছে যারা অভাবী, হতদরিদ্র। তাদের কাজকর্ম কথা-বার্তা সবই অমার্জিত। দ্বীন-ধর্মের পথ থেকে বহুদূরে। আবার সালাতেরও ধার ধারে না। কিন্তু আল্লাহ কি তাদেরকে বর্জন করেন? তাদের রিযিক বন্ধ করে দেন? না, বরং কখনো কখনো আল্লাহ তাদের সম্মানিতও করেন। তাদের সংকট দূর করে দেন। ঘুমের ঘোরে তাকে উত্তম কিছুর স্বপ্ন দেখান। ঘুম থেকে জেগেই সে জীবনের মোড় পরিবর্তন করে ফেলে। সে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল ঠিকই, কিন্তু আল্লাহ তার সাথে নতুন করে সম্পর্ক জুড়েছেন।
‘আল-কারিম’ থেকে বান্দার জন্য শিক্ষা
প্রকৃত কারিম ও মহানুভব আল্লাহ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। বান্দার মহানুভবতা তুলনামূলক ও আপেক্ষিক। আল্লাহই শুধু এমন সত্তা যিনি নাছোড়বান্দা মুমিনদের প্রার্থনা খুব ভালোবাসেন। ওদিকে দুনিয়ায় একজন মানুষও পাওয়া যাবে না, যার পেছনে কেউ পড়ে থাকলে সে খুশি হবে!
কারিম বা মহৎ হওয়ার শর্তই হলো, দুর্ব্যবহারকারীদের ক্ষমা করে দেওয়া এবং সমগ্র মানুষ ও বিশ্ব মানবতার প্রতি নিজের অবদান ও কল্যাণ পৌঁছে দেওয়া।
পৃথিবীর সমৃদ্ধ দেশগুলোর দিকে লক্ষ করুন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, নানা ধরনের খাদ্য-সামগ্রী এবং সীমাহীন নাগরিক সুবিধার মধ্যে তারা অতি উন্নত জীবনযাপন করছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তারা পৃথিবীর সব সুখ-ঐশ্বর্য ভোগ করছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখায় ভিন্ন চিত্র। যে প্রশাসন তাদেরকে এই উন্নত নাগরিক সভ্যতা সরবরাহ করছে, সে বা তারা মূলত অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠির মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে। তাদের সুখ-সমৃদ্ধি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল ভিত্তিই হলো অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীকে নির্দয়ভাবে শোষণ। তাদের নাগরিক সুবিধা ও জীবন-মানের প্রয়োজন মানেই হলো—জোরপূর্বক দুর্বল জাতি-গোষ্ঠির অর্থ চুরি ও তাদের সম্পদ ছিনতাই। তারা নিজেদের মুক্তমনা, উদারচিত্ত, মহানুভব যত ভূষণে ভূষিত করুক না কেন, তারা কখনোই মহানুভব হতে পারে না। স্বার্থান্ধ, শোষক, দাম্ভিক কখনো মহৎ হতে পারে না।
আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত কারিম ও মহৎ হতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপনার অবদান, অনুগ্রহ, কল্যাণ মানবজাতিকে অতিক্রম করে প্রাণীদেরও ছুঁয়ে যায়।
পোল্ট্রিফার্মের মুরগির ছানাগুলোও আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে। কিন্তু ইউরোপ- আমেরিকার লোকেরা যখন দেখে তাদের দেশে মুরগির উৎপাদন দেশের খাদ্য-চাহিদার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে, তখন সেগুলো নির্দয়ভাবে আগুনে জ্বালিয়ে ভস্ম করে ফেলে। তাদের উন্নত সভ্যতা আর উচ্চ শিক্ষা এমনটাই তাদের শিখিয়েছে। কোনো মুসলিম কখনো কি এমন কাজ করতে পারে? কী অপরাধ ঐ মুরগির বাচ্চাগুলোর? কেন ওদের বড় হতে দেওয়া হলো না? বড় হওয়ার পর আপনি সেগুলো আল্লাহর নামে জবাই করে খেতে পারেন, মাংস অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারেন কিংবা খাদ্যসংকটে থাকা তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন। এর কারণে আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করবেন। কিন্তু আপনি আগুনে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেবেন-এটা কোন ধরনের সভ্যতা? এমন হীন কাজ করে কেউ মহান হতে পারে?
আপনি কারিম এবং মহাত্মার অধিকারী তখনই হতে পারবেন, যখন আপনার অবদান, আপনার সদাচরণ, আপনার কল্যাণ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে এবং সমগ্র সৃষ্টিকেই ছুঁয়ে যাবে।
একটি ব্যাপারে আল্লাহর শপথ করেই আপনাকে অনুরোধ করছি-কখনো কোনো অমুসলিমের সাথে অনর্থক দুর্ব্যবহার করবেন না। কেননা একজন অগ্নিপূজক, পৌত্তলিক বা নাস্তিকের সাথে দুর্ব্যবহারের কুপ্রভাব একজন মুসলিমের সাথে দুর্ব্যবহারের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। একজন ধর্মবিদ্বেষী বা বিধর্মী ইসলামকে জানার সুযোগ পায় মুসলিমদের আচার-ব্যবহার ও মার্জিত সামাজিকতায়। আর আপনার দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি তাকে ইসলাম থেকে বহু দূরে সরিয়ে দিলেন।
মানব-সন্তানদের মধ্যে মহানুভব ও মহাত্মা সে-ই, যে মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়, তাদের দোষত্রুটি ঢেকে দেয়, প্রতিশোধপ্রবণতা বর্জন করে এবং দান-দাক্ষিণ্য ও অনুগ্রহ-উপহারে তাদের ভরিয়ে দেয়।
স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা মহানুভবতার পরিচয়
এক লোকের কাছে একবার খুবই আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা শুনি। সে তার বাসার ময়লা-আবর্জনার ব্যাগ ডাস্টবিনে ফেলতে গিয়েছিল। সেখানে সে একটা ব্যাগ দেখল, যার মধ্যে কিছু একটা নড়াচড়া করছে। ভয়ে ভয়ে ব্যাগটার মুখ খুলতেই দেখা মিলল এক ফুটফুটে নবজাতকের। যতদূর ধারণা করা যায়, বাচ্চাটিকে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা আগে ফেলে রাখা হয়েছে। সে বাচ্চাটিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেল। উন্নতির প্রয়োজনে তাকে ইনকিউবেটরে রাখা হলো কিছুক্ষণ। এরপর তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল লোকটি।
আপন সন্তানের মতোই সে পরিচর্যা শুরু করছিল বাচ্চাটির। একটু বড় হওয়ার পর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলো। আমি তার কাছে শুনেছিলাম যে, প্রাইমারি, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সে বাচ্চাটিকে অতি যত্নের সাথে লালন-পালন করেছিল সে। ছেলেটিকে মানুষ করতে কোনো কমতি রাখা হয়নি তার পক্ষ থেকে। এখন এই সুপ্রতিষ্ঠিত ছেলেটি নিজের গাড়ি হাকিয়ে কোথাও যাওয়ার পথে পালক বাবার সাথে দেখা হলো। তিনি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করলে ছেলেটি যদি কিছুক্ষণ ভেবে, মাথা চুলকে দ্বিধান্বিত হয়ে শেষমেষ রাজি হয় বিষয়টা কেমন হবে? পালক বাবাকে সামান্য সাহায্য করতে এত চিন্তা করলে নিশ্চয়ই সেটা অকৃতজ্ঞতাই মনে হবে!
একজন মানুষের অনুগ্রহের প্রতিদানে কৃতজ্ঞতা না দেখানো যদি অপরাধ হয়, তাহলে সমগ্র জগৎসমূহের স্রষ্টা যিনি, তার ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া বা কালক্ষেপণ করা কতটা গুরুতর অপরাধ হবে? সাহাবিদের জীবনী থেকে চমকপ্রদ একটি ঘটনা শুনুন। মৃতার যুদ্ধ। যায়েদ ইবনুল হারিসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রেরণ করেন। শত্রুপক্ষে ছিল দুই লক্ষ খ্রিষ্টান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই যুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে তিন জন আমির নিযুক্ত করে দিয়েছিলেন। যখন উভয়পক্ষে তুমুল যুদ্ধ লেগে যায় তখন আল্লাহ তাআলা যুদ্ধক্ষেত্র নবিজির সামনে তুলে ধরেন। তিনি সাহাবিদের কাছে যুদ্ধের বর্ণনা দিতে থাকেন। নবিজি বলেন, এখন পতাকা গ্রহণ করেছে যায়েদ। সে জিহাদ করতে করতে শহিদ হয়ে গেছে। আমি জান্নাতে তার স্থান দেখতে পাচ্ছি। এখন ঝান্ডা ধরেছে জাফর। পতাকা নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে সেও শহিদ হয়ে গেছে। আমি জান্নাতে তার স্থান দেখতে পাচ্ছি। এখন পতাকা নিয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা। সেও পতাকা ধরে যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়ে গেছে। আমি জান্নাতে তার স্থান দেখতে পাচ্ছি। তবে তার অবস্থান তার অপর দুই সাথির চেয়ে একটু নিচে। কারণ সে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছিল।
অর্থাৎ, আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রাযিয়াল্লাহু আনহুর অন্তরে অনাকাঙ্কিত একটু দ্বিধা সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি সাথে সাথেই নিজ আত্মাকে তখন ভর্ৎসনা করেছিলেন এই কথা বলে-
হে নফস, তোমাকে আল্লাহর কসম দিচ্ছি, তুমি ঘোড়া থেকে নেমে আক্রমণ করো। কী হলো তোমার, তুমি জান্নাতকে অপছন্দ করছ? হে আত্মা! তুমি যদি শহিদ হতে না পারো, তবুও তোমার মৃত্যু তো হবে নিশ্চয়! যে শাহাদাতের স্বপ্ন তুমি এতদিন দেখেছিলে, আজ তুমি তার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে; তাদের দুজনের পথ যদি ধরো পেয়ে যাবে হিদায়াত [১]
আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইখলাসের সাথেই যুদ্ধ করেছিলেন। তবুও যেহেতু সামান্য দ্বিধা-সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল-এ কারণেই তার স্থান তার অপর দুই সাথির স্থানের চেয়ে নিচে হয়েছে।
অতএব, আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে কোনো দ্বিধা-সংশয়ের স্থান নেই। বিনা বাক্য ব্যয়ে এবং কালক্ষেপণ না করেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে হবে সম্পূর্ণ নিঃসংকোচে; স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে কোনোরূপ দ্বিধা-সংশয় হয়ে গেল কি না-এই ভয়ে সাহাবিগণ ভীত থাকতেন।
নবিজির প্রিয় সাহাবি হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন নবিজির গোপন তথ্যের সংরক্ষক। কারা কারা সাহাবির বেশ ধরে মুনাফেকি করত, রাসুলুল্লাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত, তাদের সকলের তালিকা জানতেন হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, ইসলামের বীরযোদ্ধা, ন্যায়পরায়ণতার মূর্তপ্রতীক উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি মাঝে মাঝে হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করতেন, 'হুযায়ফা! তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি ঐ তালিকায় আমার নাম পেয়েছ?'[১] তিনি এটা কৌতুক করে জিজ্ঞেস করেননি। বাস্তবেই তিনি আল্লাহর ভয়ে শঙ্কিত ছিলেন, খাঁটি হৃদয়েই তিনি জানতে চেয়েছেন। আল্লাহর মহত্ত্ব ও প্রতাপের সামনে, আখিরাতের ভয়ে সবসময়ই তিনি নিজের নফসের হিসাব-নিকাশ করতেন। তিনি ভাবতেন, জানি না হয়তো আমি অবহেলাকারী, হয়তো আমি মুনাফিক। যদি সুদূর বাগদাদে একটি খচ্চরও পা পিছলে পড়ে যায়, তাহলে আল্লাহ আমার হিসাব নেবেন।
একবার আজারবাইজানের শাসকের পক্ষ থেকে একজন দূত এলো উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। তার আসতে আসতে রাত হয়ে যায়। রাত্রি বেলায় উমারের দরজার কড়া নাড়া তার কাছে অনুচিত মনে হলে সে মসজিদে চলে যায়। মসজিদে গিয়ে দেখতে পায় এক ব্যক্তি সালাত পড়ছে এবং কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে দুআ করছে, 'হে আল্লাহ! আপনি কি আমার তাওবা কবুল করেছেন? যদি কবুল করেন, আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারি। নাকি আপনি আমার তাওবা ফিরিয়ে দিয়েছেন? তা-ই যদি হয়, তবে আমি আপনার সামনে কেঁদেই যাব।'
সালাত শেষ হওয়ার পর দূত তাকে জিজ্ঞেস করল, 'কে আপনি?'
তিনি বললেন, 'আমি উমার।'
'আপনি রাত্রে ঘুমান না?'
'দেখো ভাই, যদি আমি ঘুমিয়ে রাত কাটিয়ে দিই, তবে তো আমি আমার রবের সামনে নিজেকে ক্ষয় করে ফেললাম। আর যদি দিনে ঘুমিয়ে যাই, তবে তো আমার প্রজাদের হক নষ্ট করে ফেললাম।'
অতঃপর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু দূতকে সাথে করে নিয়ে বাসায় গেলেন। স্ত্রী উম্ম কুলসুমকে জিজ্ঞেস করলেন, মেহমানকে দেওয়ার মতো কী খাবার আছে? স্ত্রী উত্তর দেয়, রুটি আর লবণ ছাড়া কিছুই নেই।
সে জমানায় নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকেরাও মাংস-রুটি খেত। অথচ আমিরুল মুমিনিনের ঘরে শুধু রুটি আর লবণ ছাড়া কিছুই নেই। তাই তিনি মেহমানকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কোনো গরিব মুসলিমের ঘরে খেতে চাও? নাকি আমার এখানে খেতে চাও?
মেহমান বলল, না, আল্লাহর কসম! আপনি খলিফা। আমি বরং আপনার এখানেই মেহমান হতে চাই।
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী উদ্দেশ্যে এসেছিলে যেন?
'আজারবাইজানের শাসকের পক্ষ থেকে আপনার জন্য এই উপহার নিয়ে এসেছি। এ কথা বলে সে একটি মূল্যবান পাত্র উমারের দিকে বাড়িয়ে দিলো। তাতে ছিল সমাজের অভিজাত শ্রেণির জন্য বানানো উন্নত মানের মিষ্টিজাতীয় খাবার।'
'তোমাদের দেশের সাধারণ মুসলিমরাও কি এমন খাবার খায়?'
'জি না। এটা কেবল সমাজের ধনী আর অভিজাত নাগরিকদের জন্য বিশেষভাবে বানানো।'
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, যে খাবার গরিব সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা খেতে পারে না, উমারের পেটের জন্য সেই খাবার হারাম। এই খাবার মদিনার গরিব মুসলিম নাগরিকদের মাঝে বিলিয়ে দাও। এরপর তিনি আজারবাইজানের শাসককে কঠোর ভাষায় দূত মারফত এক পত্রাদেশ পাঠালেন— 'সাধারণ মুসলিম জনগণ যে খাবার খায়, তুমিও সেই খাবারই খাবে।' [১]
একবার উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রাস্তায় একটি হৃষ্টপুষ্ট উট দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এটা কার উট? লোকেরা উত্তর দিলো, আপনার ছেলে আব্দুল্লাহর। তিনি বললেন, তাকে ডেকে নিয়ে এসো।
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত হলেন। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু কঠিন ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন, এই উটটি কার? ছেলে উত্তর দিলেন, আমি আমার নিজের পয়সা দিয়েই এটা কিনেছি। মোটা-তাজা করার জন্য চারণভূমিতে পাঠিয়েছি; যেন একটু হৃষ্টপুষ্ট হলে তা বিক্রি করে জীবিকার প্রয়োজন পূরণ করতে পারি। এতে আমার অপরাধটা কোথায়? আমি ভুল কী করেছি?
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, বেশ করেছ! কিন্তু তুমি আমিরুল মুমিনিনের ছেলে। সেই সুবাদে তোমার উট বাড়তি সুবিধা ভোগ করে মোটা-তাজা হয়েছে। চারণভূমিতে ভালো ঘাসের জায়গায় লোকেরা বলেছে, 'উটটিকে সুযোগ করে দাও, এটা আমিরুল মুমিনিনের ছেলের।' পানির ঘাটে গিয়ে বলেছে, 'এই উটের প্রতি সবাই বিশেষ খেয়াল রাখো, ওটা আমিরুল মুমিনিনের ছেলের।' এভাবেই তোমার উট হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। এক্ষুনি উটটি বিক্রি করে দাও। বিক্রিত অর্থ থেকে কেবল তোমার পুঁজিটুকু নেবে আর বাকিটা বাইতুল মালে জমা করে দেবে। [১]
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার সাথি-সঙ্গীদের সাথে বসে ছিলেন। সাথিদের কেউ একজন বলল, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহর পর আপনার মতো শ্রেষ্ঠ ও মহৎ লোক আর কাউকে আমরা দেখিনি। তার দাবি খুবই চমকপ্রদ ছিল। সে হিসেবে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে 'বারাকাল্লাহ ফি হায়াতিক' বা 'জাযাকাল্লাহু খয়রান'- জাতীয় কোনো কথা বলে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তিনি তার দিকে রক্তলাল চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, যেন আস্ত খেয়ে ফেলবেন!
অবস্থা বেগতিক দেখে তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, 'না, আল্লাহর কসম! আমরা আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি দেখেছি।' তিনি কিছুটা শান্ত হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, 'কে তিনি?' সে উত্তর দিলো, 'আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু।' তখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, 'তোমরা সবাই মিথ্যে বলেছ; এই একজন শুধু সত্য বলেছে।'
লক্ষ করুন, প্রথমজনের কথায় যারা চুপ করে ছিল, তিনি তাদেরকেও মিথ্যাবাদী বলেছেন। এরপর যোগ করেছেন, 'আমি মাঝে মাঝে উটের পাল থেকে হারিয়ে যেতাম। আর আবু বকর ছিল মেশকের চেয়েও সুবাসিত।'
একবার তিনি তার এক গভর্নরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'মানুষ যখন কোনো চোর বা ডাকাত ধরে তোমার কাছে নিয়ে আসবে, তখন তুমি কীভাবে বিচার করবে?'
গভর্নর বলল, 'আমি তার হাত কেটে দেবো।'
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তেমনি তোমার শাসনাধীন অঞ্চলের কোনো নাগরিক কখনো ক্ষুধার্ত বা বেকার থাকলে আমিও তোমার হাত কেটে দেবো।' [১]
তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টি পরিচালনার দায়ভার অর্পণ করেছেন আমাদের ওপর, যেন আমরা তাদের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারি, তাদের পরিধেয় বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে পারি এবং তাদের পেশা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি। অতএব, আমরা যদি তাদের এই প্রাপ্য বুঝিয়ে দিই, তাহলে এর মাধ্যমে আল্লাহর শোকর আদায় করতে পারব।
জেনে রেখো! এই হাতগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে কাজের জন্য। তাই এই হাত যখন হালালের মধ্যে কোনো কাজ খুঁজে পাবে না, তখন হারামের মধ্যেই কর্মক্ষেত্র খুঁজে নেবে। সুতরাং এই হাতগুলো হারামে জড়ানোর আগেই হালাল পথে কাজে লাগিয়ে দাও।' [২]
এমন মহান ছিলেন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু। তা সত্ত্বেও তিনি ভয় পেতেন, তিনি মুনাফিকদের কাতারে শামিল হয়ে গিয়েছেন কি না।
সকল চাওয়া রবের কাছে
মুসা আলাইহিস সালাম একদা আল্লাহর নিকট দুআ করলেন, 'হে রব, মাঝে মাঝে আমার এমন কিছু প্রয়োজন দেখা দেয়, যা আপনার কাছে চাইতে লজ্জাবোধ করি।' আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে জবাব দিলেন, 'হে মুসা! আমাকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে কিছু চাইবে না। তোমার যত প্রয়োজন সবকিছু আমার কাছেই প্রার্থনা করবে। খাওয়ার লবণ বা বকরির ঘাসই হোক না কেন, সকল প্রয়োজনে আমার দুয়ারেই হাত পাতবে।' [৩]
আল্লাহ তাআলা বান্দার অনুনয়-বিনয়ের সাথে দুআ করাকে খুব পছন্দ করেন। তাই শেষরাত্রে উঠে পড়ুন। রাতের শান্ত, নিস্তব্ধ শেষ প্রহরে সালাতে দাঁড়িয়ে যান। দু-হাত তুলে অনুনয়-বিনয় করে, হৃদয়-আত্মা আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়ে দুআ করুন। কারণ আল্লাহ এই ধরনের দুআ পছন্দ করেন।
আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, একবার রাতে এক লোক তার কাছে এসেছিল কোনো প্রয়োজনের কথা জানাতে। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, বাতিটা উঁচু করে ধরো। সে বাতিটা উঁচু করে ধরলো। তিনি বললেন, এবার বলো তুমি কী চাও?
তিনি সরাসরি প্রয়োজনের কথা জিজ্ঞেস করতে পারতেন। তা না করে বাতি ওপরে তুলতে বলেছেন। এর পিছনে কী রহস্য? কারণ আলোর সামনে লোকটির চেহারা চেনা গেলে সে লজ্জা পাবে এবং তার প্রয়োজন জানাতে সংকোচবোধ করবে। এমনই ছিল আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর বুদ্ধিমত্তার চিত্র।
পূর্ববর্তী জনৈক আলিম ছিলেন। তিনি ভিক্ষুককে কখনো হাতে করে কিছু দিতেন না। টেবিলের ওপর রেখে দিতেন। সেখান থেকে ভিক্ষুক তুলে নিয়ে যেত। তিনি জানতেন, দাতার হাত ওপরের হাত, গ্রহীতার হাত নিচে। অতএব, একজন মুমিনের হাত যেন নিচু না হয়, সেজন্য তিনি হাতে করে কিছু উঠিয়ে দিতেন না।
প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহর মহান সিফাত আল-কারিম। এই সিফাত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরকেও আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হতে হবে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়ার নির্দেশ করেছেন। আর আল্লাহর মহানুভবতা ও মহত্ত্বের সিফাত হলো—
'যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, তুমি তার সাথে সম্পর্ক জুড়ে রাখো। কেউ তোমার সাথে অন্যায় করলে তাকে ক্ষমা করে দাও। কেউ তোমাকে বঞ্চিত করলেও তুমি তার পূর্ণ প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে।'
তোমার নীরবতা যেন হয় চিন্তার মগ্নতা; তোমার কথা এবং উচ্চারণ যেন হয় আল্লাহর যিকির।' [১]
টিকাঃ
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৩১
[১] সহিহ বুখারি: ৩৩৮২
[১] সুরা ইনফিতার, আয়াত: ৬
[১] সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহিহাহ, খণ্ড : ৭; পৃষ্ঠা : ৩৭৭
[১] সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪২
[১] সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৩৩
[২] সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫
[১] সুরা তাওবা, আয়াত: ১০৩
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩
[৩] সুরা মায়িদা, আয়াত: ৫৪
[৪] সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৯৬
[১] সুরা বাকারা, আয়াত : ২৯
(১) সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩
[১] সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪
[১] সিরাতু ইবনি হিশام, খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৫৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৪২৩; তবে এই ঘটনার কোনো সনদ পাওয়া যায় না।
[১] আল-মারিফাতু ওয়াত তারিখ, ফাসাবি, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৭৬৯
[১] আয-যায়লুর রাব্বানি: ৩৭০
[১] আল-কুদওয়াহ উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃষ্ঠা: ৬৯.
[১] আলফু কিসসাহ, পৃষ্ঠা: ৩৮৫
[২] আলফু কিসসাহ, পৃষ্ঠা: ৩৮৫
[৩] জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ২২৫; এটি একটি ইসরাইলি বর্ণনা।
[১] আলফু কিসসাহ, পৃষ্ঠা: ৪৮২
📄 আর-রাযযাক : মহান রিযিকদাতা
গহীন জঙ্গলের কোনো এক গাছের চূড়ায় কাকের বাসা। সেখানে রয়েছে দুর্বল অসহায় ছোট্টপ্রাণ এক ছানা। মাত্রই ডিম ফুটে বেরিয়েছে। ক্ষুধায় খুব কষ্ট হয় ওর। নীড়ের খড়কুটোর ফাঁক দিয়ে সে তাকিয়ে থাকে আলো-ঝলমল পৃথিবীর দিকে। ওর দিকে তাকানোর কেউ নেই, নিজের মা পর্যন্ত চেনে না ওকে। কিন্তু সপ্ত আকাশ ভেদ করে, পরম মমতা দিয়ে কেউ দেখছেন ছোট্ট সেই মিষ্টি ছানাটিকে। পরম স্নেহে ওর কাছে খাবার পৌঁছে দেন তিনি। তিনি আর-রাযযাক; মহান রিযিকদাতা।
☆☆☆
তিনি মহান রিযিকদাতা; রিযিক দান করেন সমগ্র সৃষ্টিকে। সৃষ্টিকুলের যত প্রয়োজন, যত চাহিদা-সব তিনিই পূরণ করেন, তা পরিমাণে যত বেশিই হোক না কেন! সীমাহীন দানে কুণ্ঠাবোধ করেন না কখনো। তাই তো তিনি শুধু রিযিকদাতা নন; বরং মহান রিযিকদাতা, যার বদান্যতা বান্দার কল্পনাকেও হার মানায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَكَأَيِّن مِّن دَابَّةٍ لَّا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ *
এমন কত জীবজন্তু আছে যারা নিজেদের খাবার নিজেরা সঞ্চয় করতে পারে না। আল্লাহই রিযিক দান করেন তাদের ও তোমাদের। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ [১]
আল্লাহর নবি দাউদ আলাইহিস সালাম দুআ করতেন- হে আল্লাহ! আপনি তো এমন সত্তা, যিনি কাকের বাসায় ছোট্ট কাকের ছানাটিকেও রিযিক দান করেন!'[২]
রিযিক লাভের উপায়
আপনি যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়কারীদের একজন হয়ে থাকেন তো আপনার জন্যে সুসংবাদ! আল্লাহ তাআলা সালাত আদায়ের জন্যে রিযিক প্রদানের প্রতিজ্ঞা করেছেন। আর-রাযযাক বলেন-
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى *
(হে মুহাম্মাদ!) আপনার পরিবারবর্গকে সালাত আদায়ের আদেশ দিন এবং তাতে অটল-অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিযিক চাই না; আমিই আপনাকে রিযিক দান করি। আর সুসংবাদ কেবল মুত্তাকিদের জন্য [৩]
কাজেই রিযিক বৃদ্ধি করতে চাইলে অবশ্যই সালাত আদায় করতে হবে বিনয়, একাগ্রতা ও খুশু-খুযুর সাথে। খুশু-খুযুবিহীন সালাত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। মনে রাখবেন, এটি কিন্তু সালাতের আদব নয়; বরং সালাতের ফরয[৪]। আল্লাহ বলেন-
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ )
মুমিনগণ সফল, যারা খুশু-খুযুর সাথে সালাত আদায় করে [১]।
আল্লাহই আপনার রিযিকদাতা, তাই সকল কাজে ফিরে আসুন তাঁরই দিকে। তাঁর কাছ থেকেই চেয়ে নিন সবকিছু। বান্দার আকুল চাওয়া আল্লাহ ভালোবাসেন। ঘরের হারানো চাবিটা, জুতার ছিঁড়ে যাওয়া ফিতাটা, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সামান্য বস্তুগুলোও চেয়ে নিন তাঁর কাছ থেকে।
মুসা আলাইহিস সালাম এক্ষেত্রে আমাদের বড় আদর্শ। তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন-
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ ...
মুসা যখন আমার নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হলো এবং তার প্রতিপালক তার সঙ্গে কথা বললেন, তখন সে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে দর্শন দিন। আমি আপনাকে দেখব।'[২]
আল্লাহকে দেখার বাসনা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া। আবার যখন তিনি ক্ষুধার কষ্টে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তখন নিজের অসহায়ত্বের সবটুকু প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে চেয়েছিলেন খাবার ও আশ্রয়। আল্লাহ বলেন-
ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
অতঃপর সে ছায়ার নিচে আশ্রয় গ্রহণ করে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন, আমি তো কেবল তারই মুখাপেক্ষী।'[৩]
তাই ছোট-বড় সবকিছুর জন্য আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করুন। আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য আয়াত নাযিল করে রিযিকের নিশ্চয়তা দিয়েছেন, জানিয়েছেন।
রিযিকের দায়িত্ব একান্তই তাঁর। তবু মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে; পেরেশান হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাদেরকে চিন্তিত হতে বলেছেন আখিরাতের ব্যাপারে; জান্নাত অর্জনের ব্যাপারে। অথচ তারা কেবল দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়ায় আর জান্নাতের কথা বেমালুম ভুলে যায়।
এজন্য আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'তুমি রিযিক অন্বেষণে আদিষ্ট নও; কিন্তু জান্নাত অন্বেষণে আদিষ্ট।'
অর্থাৎ, রিযিকের সন্ধান না করায় তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে না; কিন্তু জান্নাতের অনুসন্ধান না করলে তোমাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
কী বিস্ময়কর! মানুষকে যে জিনিসের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে, মানুষ তা নিয়ে কতই না ব্যস্ত! অথচ রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে গ্রহণ করেছেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে-
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ ثُمَّ رَزَقَكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ هَلْ مِن شُرَكَابِكُم مَّن يَفْعَلُ مِن ذَلِكُم مِّن شَيْءٍ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ
আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর রিযিক দিয়েছেন। তিনিই তোমাদের মৃত্যু দেবেন এবং পরে জীবিত করবেন। তোমাদের দেব- দেবীগুলোর মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এসবের কোনো কিছু করতে পারে? তারা যাদেরকে শরিক করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, মহান।[১]
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْنًا كَبِيرًا *
দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমি তাদের রিযিক দিই; তোমাদেরও রিযিক দিই। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।[২]
وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ فَوَرَبِّ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ لَحَقِّ مِثْلَ مَا أَنَّكُمْ تَنطِقُونَ
আকাশেই রয়েছে তোমাদের রিযিক ও প্রতিশ্রুত সবকিছু। আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিপালকের শপথ! তোমাদের কথাবার্তার মতোই এসব সত্য।[১]
কত হৃদয়গ্রাহী ও দৃঢ় ভাষায় আল্লাহ আমাদের রিযিকের নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। তারপরও আমরা দুনিয়ার সামান্য কিছু প্রাপ্তির জন্য আখিরাতকে বেচে দিই। অথচ আখিরাতের হিসাব বড়ই কঠিন-
وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى )
মানুষ যতটুকু কর্ম করবে তার চেয়ে বেশি কিছুই পাবে না।[২]
কিন্তু বাস্তবে আখিরাতের চিন্তা না করে আমরা উল্টো পথে রিযিকের জন্যে ছুটছি।
অকারণ দুশ্চিন্তা
অর্থহীন দুই ভাইয়ের গল্প বলি। বড় ভাইটি হঠাৎ মারা যায়। মৃত্যুর সময় রেখে যায় পাঁচ সন্তান। তার তেমন কোনো ধন-সম্পদ ছিল না। বড় ভাই মারা যাওয়ায় তার সন্তানদের দেখভালের দায়িত্ব ছোট ভাইয়ের ওপর বর্তায়। সে দুশ্চিন্তায় কাঁদতে শুরু করে। এক শাইখের সাথে তার পরিচয় ছিল। শাইখ তাকে এ অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার! কাঁদছো কেন?' উত্তরে সে বলল, 'আমার ভাই মারা গেছে। তার পাঁচটা সন্তানের দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। অথচ ওদের খরচ বহনের কোনো ব্যবস্থা রেখে যায়নি সে।'
-সে কি কিছুই রেখে যায়নি?
-হ্যাঁ, সামান্য কিছু সম্পদ রেখে গেছে। ওগুলো দিয়ে বছর দুয়েকের মতো তাদের খরচ চলবে।
-বেশ তো! যখন এই বছর দুয়েকের খরচা শেষ হবে তখন আবার কান্না শুরু কোরো। এখন নাহয় নিশ্চিন্তে থাকো।
পরে দেখা গেল, এক বছর শেষ হওয়ার তিন মাস আগেই লোকটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
আমার পরিচিত এক লোক ছিলেন। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে একবার তার বাড়িটি ভেঙে ফেলার ফরমান আসে। এর পরিবর্তে অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে তাকে উপযুক্ত আরেকটি বাড়ি প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তারপরও বাড়িভাঙার খবর শুনেই সে ভেঙে পড়ে। দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা আর দুঃখে তার মন খানখান হয়ে যায়। পরবর্তীতে জানা গেল, সেই বাড়িটি ভাঙার পূর্বেই লোকটা মারা গেছে। তাহলে ভবিষ্যৎ নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করে কী লাভ হলো? অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কোনো মানেই হয় না।
রিযিক যেভাবে আসে
আপনি কি দৈনিক খানাপিনা করাকেই একমাত্র রিযিক ভেবে বসে আছেন? নিঃসন্দেহে এটা রিযিক। কিন্তু রিযিক তো কেবল এতটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রিযিক দু-প্রকার। দেহের রিযিক ও আত্মার খোরাক। তিনি স্বীয় করুণায় আপনার মুখে খাবার তুলে দিয়ে আপনার দেহকে সতেজ রাখেন। আবার তিনিই প্রিয় বান্দাদের অন্তরে বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের বোধ ঢেলে দিয়ে খোরাক জোগান আত্মার।
ধনীকে দেন সম্পদের প্রাচুর্য, আর গরিবকে দেন রিযিকদাতার সামনে মিনতি করার সুযোগ। বস্তুগত সম্পদ না পেলেও আল্লাহ তাকে দান করেন আত্মিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি, আল্লাহর ফয়সালায় সবর ও সন্তুষ্টির পরম প্রাপ্তি। তুলনা করলে দেখা যাবে তারা দুজন প্রায় সমান। একজনের রয়েছে বস্তুগত সমৃদ্ধি; কিন্তু সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ঝক্কি, মানসিক অশান্তি। আরেক জনের বস্তুগত সংকট; কিন্তু হৃদয় ও আত্মার জগতে সে বাদশাহ।
অফুরন্ত ভান্ডার
বান্দা যখন আল্লাহর কাছে রিযিক প্রত্যাশা করে তখন আল্লাহ তাকে রিযিক প্রদান করেন। হয়তো রাস্তা দিয়ে চলতে ফিরতে বেকার কেউ চাকরির সন্ধান পেয়ে যেতে পারে। আপনার আশপাশে তাকালে এমন হাজারটা দৃষ্টান্ত পাবেন। বিখ্যাত বুযুর্গ হাতিম আসাম রাহিমাহুল্লাহর কাছে এক লোক এসে জিজ্ঞেস করে, 'আপনার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয় কোথা থেকে?' হাতিম আসাম রাহিমাহুল্লাহ উত্তর দেন, 'আল্লাহর খাদ্যভান্ডার থেকে।' লোকটি একট চটে গিয়ে বলে, 'আল্লাহ কি আসমান থেকে আপনার ওপর রুটি ফেলে দেন? তা না হলে এই কথার অর্থ কী?'
হাতিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'যদি জমিন না থাকত তাহলে আল্লাহ অবশ্যই বান্দার কোলে রুটি ফেলতেন। কিন্তু যেহেতু জমিন সৃষ্টি করেছেন, তাই তিনি এই জমিন থেকেই আমার রিযিকের ব্যবস্থা করেন।'
আপনি যখন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবেন আল্লাহই একমাত্র রিযিকদাতা, মহান শক্তিধর, তখন অবশ্যই সব কাজে আপনি আল্লাহকে স্মরণ করবেন আলাদা আলাদাভাবে। রোগ-ব্যাধি ভালো হয়ে গেলে আপনি নিশ্চয় বলবেন, আল্লাহই আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আপনি তখন এর-ওর পেছনে দৌড়াবেন না। আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে প্রয়োজন ব্যক্ত করবেন না।
জনৈক ইবাদতগুজার ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'আপনার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয় কোথা থেকে?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি এমন এক মালিকের ভান্ডার থেকে খাবার পাই, যার ভান্ডারে কখনো কোনো চোর-ডাকাত ঢুকতে পারে না, পোকামাকড়ও খেয়ে নষ্ট করতে পারে না।'
আল্লাহর ধনভান্ডার সর্বদা উন্মুক্ত; কারো জন্য তা রুদ্ধ নয়। তাঁর ভান্ডার সর্বদা পরিপূর্ণ; কখনো তাতে ঘাটতি হয় না। ছোট-বড় সকল বস্তু রয়েছে সেখানে। আল্লাহ বলেন-
وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا عِندَنَا خَزَابِنُهُ وَمَا نُنَزِّلُهُ إِلَّا بِقَدَرٍ مَّعْلُومٍ
আমার নিকটেই রয়েছে প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার এবং আমি তা পরিজ্ঞাত পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি।১১
টমাস রবার্ট ম্যালথাসের তত্ত্ব
পৃথিবীর ইতিহাসে জনসংখ্যাবৃদ্ধির তত্ত্ব ইসলামের মানদণ্ডে বাতিল। এই তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টমাস রবার্ট ম্যালথাস। তাঁর ধারণা ছিল, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে খাদ্য উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় থাকবে না; যা নিশ্চিত দুর্ভিক্ষ ডেকে আনবে এবং খাদ্য না পেয়ে বাড়তি জনসংখ্যা বিলীন হয়ে যাবে।
আসলে এমন কথা কেবল সেসব লোকই বলতে পারে, যারা আল্লাহর কুদরত উপলব্ধি করতে অক্ষম।
আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সংকোচন, সংকট বা দুর্ভিক্ষ এলে তা মানুষের পরীক্ষা, শাস্তি কিংবা সংশোধনের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। মানুষ যখন কোনো কিছুতে সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন সে অক্ষমতার কারণেই সংকটে পতিত হয়। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে সংকট এলে তা অক্ষমতার কারণে হতে পারে না। তিনি সংশোধনের উদ্দেশ্যে শাস্তি দেওয়ার জন্য কিংবা পরীক্ষা নিতে এমনটি করে থাকেন।
জনৈক নেককার ব্যক্তির স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনার স্বামী আপনাকে কী পরিমাণ ভরণ-পোষণ দেয়?' তখন সে উত্তর দিলো, 'তিনি আমাকে কিছুই দেন না; কেবল ওজন করেন।' অর্থাৎ, দাতা তো একমাত্র আল্লাহ, স্বামী কেবল পরিমাপ করে পৌঁছে দেন।
একবার আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় পেয়ে গেলে দুনিয়ার কোনো কিছু হারানোর ব্যথা আপনাকে পর্যুদস্ত করতে পারবে না। কখনো যদি কোনো কিছু হাতছাড়া হওয়ায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন, তাহলে বুঝে নেবেন আপনি আসলে আল্লাহকেই এখনো চিনতে পারেননি। যে আল্লাহর পরিচয় পেয়েছে, যে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে গেছে, সে ব্যথিত হলেও তা তাকে আফসোসের দিকে ঠেলে দেয় না। কত মানুষ জমি বিক্রি করে দেওয়ার কিছুদিন পর জমির দাম হয়ে যায় দ্বিগুণ। তখন সে হা-হুতাশ শুরু করে দেয়, অস্থির হয়ে ওঠে। হায়! জমিটুকু যদি আজ থাকত, তাহলে আমার কপাল খুলে যেত!
বর্তমানের যা কিছু জটিল রোগ, তার অধিকাংশই আসে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অনুতাপ, উৎকণ্ঠা এবং মনস্তাত্বিক কারণে।
প্রার্থনা কেবল তাঁরই কাছে
একবার জনৈক উমাইয়া খলিফা কিছু উপহার দেওয়ার জন্যে একজন বড় আলিমকে তলব করলেন। খলিফা মসজিদে বসে ছিলেন। আলিম তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। খলিফা বললেন, 'আপনার প্রয়োজন ব্যক্ত করুন।' আলিম উত্তর দিলেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে আমি চাই না। তাঁরই ঘরে বসে তিনি ছাড়া অন্য কারো কাছে চাইতে আমি লজ্জাবোধ করি।'
তারপর মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরে খলিফা আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'এবার আপনার প্রয়োজন পেশ করুন।' আলিম আরো শক্ত জবাব দিয়ে বললেন, 'যিনি মালিক তাঁর কাছেই তো চাইলাম না; তাহলে যে মালিক নয় তার কাছে কী করে চাইব?'
খলিফা খুবই পীড়াপীড়ি করলেন। উপায় না দেখে আলিম বললেন, 'আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই।' খলিফা বললেন, 'সে ক্ষমতা আমার নেই। আলিম উত্তর দিলেন, তাহলে আপনার কাছে আমার কোনো প্রয়োজনও নেই।'[১]
এটা একজন মুমিনের আত্মমর্যাদাবোধের দাবি। অভাবী নিজ প্রয়োজন কারো কাছে ব্যক্ত করা থেকে বিরত থাকলে সেটাই উত্তম।
এক মনীষী বলেছেন, 'যেমনিভাবে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তেমনি আল্লাহ ছাড়া কোনো রিযিকদাতাও নেই। তিনি যখন দান করেন, অকাতরে দান করেন। এত বেশি দেন যে, বান্দা অবাক না হয়ে পারে না।'
আপনি দেখবেন কত মেধাবী, বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান লোক আছে, তাদের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা খুবই সামান্য। আবার কত বোকা, অবিবেচক লোককেও দেখবেন, তাদের প্রাচুর্যের কোনো অভাব নেই। এর থেকে বোঝা যায় যে, মেধা-বুদ্ধি, ব্যবস্থাপনা ও দৌড়ঝাঁপের সাথে রিযিকের মৌলিক কোনো সম্পর্ক নেই। অবশ্য আল্লাহর পথে অটল-অবিচল থাকা, তাঁর আনুগত্য করা-এগুলো আল্লাহর রহমত বর্ষণ করে। কিন্তু রিযিকের মূল হিসাব আল্লাহর ব্যবস্থাপনার সাথে। তাই দেখা যায়, অনেক নেককার মুমিন কষ্টে জীবনযাপন করলেও কাফির মুশরিকদের প্রাচুর্যের অভাব হয় না। এর দ্বারা তিনি মুমিনদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, তাদের পরীক্ষা নেন।
মহামহিম আল্লাহ বলেন-
وَأَن لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاءٌ غَدَقًا )
তারা যদি সত্যপথে প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাহলে আমি তাদেরকে অবিরল ধারায় পানি বর্ষণের দ্বারা সমৃদ্ধ করতাম [১]
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ )
যদি সেইসব জনপদের লোকজন ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল; সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি [২]
পাপের শাস্তিস্বরূপ কখনো কখনো মানুষের রিযিক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ধরা যাক, আপনার দুটি ছেলে। একজন খুবই ভদ্র। টাকা-পয়সা কখনো অপচয় করে না। বড়দের সম্মান করে চলে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। ঠিকমতো পড়াশোনা করে। আরেক ছেলে ভীষণ অভদ্র। পড়াশোনা তো করেই না, বরং নানারকম অনৈতিক কাজকর্ম এবং নিষিদ্ধ স্থানে যাওয়া-আসা করা তার বহুদিনের অভ্যাস। এখন দুই ছেলেকে টাকা-পয়সা কিংবা হাতখরচ দেওয়ার সময় আপনি কি সমান-সমান দেবেন? কখনোই না। অভদ্র ছেলেটিকে আপনি শুধু গাড়িভাড়া দিয়েই ক্ষান্ত থাকবেন, যেটা না দিলেই নয়। কারণ তার হাতে অতিরিক্ত টাকা-পয়সা থাকা মানেই তা কোনো অনৈতিক ও নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে ব্যয় হওয়া। কিন্তু যে ছেলেটি ভদ্র তাকে আপনি প্রয়োজনের চেয়েও বেশি টাকা দিয়ে রাখবেন। হয়তো তাকে এক্ষেত্রে স্বাধীনতাও দিয়ে রাখবেন, 'বাবা! তোমার যখন যা প্রয়োজন পড়ে, এটা দিয়ে কিনে নিয়ো।' আপনি জানেন, সে আপনার পক্ষ থেকে স্বাধীনতা, টাকা-পয়সা পাওয়ার পরও কোনো অনৈতিক কাজে জড়াবে না। ঠিক একইভাবে আল্লাহ তাআলাও কখনো কখনো পাপিষ্ঠ ও অন্যায় ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত ব্যক্তির রিযিক সংকুচিত করে দেন, যেন সে তার অন্যায়-অপরাধে একেবারে বেপরোয়া হয়ে না পড়ে। কারণ আল্লাহ যদি তার প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের রশি টেনে না ধরেন, তাহলে সে অবাধ্যতা ও উগ্রতায় সীমা ছাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ খুব চমৎকারভাবে সত্য প্রকাশ করে বলেছেন-
۞ وَلَوْ بَسَطَ اللَّهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهِ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ وَلَكِن يُنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَّا يَشَاءُ إِنَّهُ بِعِبَادِهِ خَبِيرٌ بَصِيرٌ ۞
আল্লাহ তাঁর সকল বান্দাকে প্রাচুর্য দিলে, নিশ্চয় তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছামতোই নাযিল করে থাকেন। তিনি বান্দাদের ব্যাপারে সম্যক অবগত [১]
আপনার কোনো এক দ্বীনি ভাই, যার সাথে আপনার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। ভালোবাসার আতিশয্যে আপনি তাকে বলে ফেললেন, 'কোনো প্রয়োজনে শুধু আমাকে জানাবে; যা দরকার হয় আমার কাছ থেকেই নেবে; অন্য কাউকে বলবে না।' আপনার প্রিয় ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব অন্য কারো সামনে অবনত হোক তা আপনি পছন্দ করেন না। তাহলে ভেবে দেখুন, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে সীমাহীন ভালোবাসেন, সেখানে তিনি কীভাবে তাঁর বান্দার অন্য কারো কাছে নত হওয়া পছন্দ করবেন? তিনি আমাদের অনেক বেশি ভালোবাসেন বলেই অন্য কারো কাছে প্রয়োজন ব্যক্ত করতে নিষেধ করেছেন।
কিছুদিন আগে সদ্য-পাশ-করা একজন ডাক্তার আমাকে একটি কাহিনি শোনালো। সে তখন ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ করে একটি চেম্বার খুলেছে মাত্র। কিন্তু পরিচিতি বেশি না থাকায় রোগী তেমন একটা আসত না। একবার তার মায়ের চিকিৎসার জন্য মোটা অঙ্কের টাকার প্রয়োজন দেখা দিলো। মা তখন দামেশকে চিকিৎসাধীন। অথচ তার চেম্বার অন্য একটি শহরে। মায়ের চিকিৎসার জন্য যত টাকার প্রয়োজন সেই পরিমাণটা উল্লেখ করে সে আল্লাহর কাছে আকুলভাবে দুআ করল। ঠিক তার পরদিনই তার চেম্বারে রোগীদের ভিড় লেগে গেল। আর সেদিনই সম্পূর্ণ টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল!
আপনার কাছে কারো পাওনা রয়েছে, কিন্তু আপনার পরিশোধের মতো সামর্থ্য নেই; আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! আমার কাছে নেই; তুমিই পরিশোধ করে দাও।' এভাবে আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নেওয়ার অভ্যাস করুন।
আপনার স্ত্রী কঠোর সুভাবের। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! তাকে নরম ও কোমল স্বভাবের বানিয়ে দাও।' আপনার সহকর্মী বা ব্যাবসায়িক পার্টনার কুটিল ও বদমেজাজি। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! তার মনকে সোজা করে দাও; কোমল বানিয়ে দাও।' আপনার সন্তান একরোখা, রগচটা; কারো কথায়ই কর্ণপাত করে না। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে সুমতি দান করো। তার চরিত্র মার্জিত করে দাও।'
আপনি যখন আপনার প্রয়োজন সরাসরি আল্লাহর কাছে চাইবেন, অন্য কারো কাছে ব্যক্ত করবেন না, তখন আল্লাহ তাআলা সরাসরি আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করে দেবেন। আর যখন অন্য কারো কাছে চাইবেন, তখন কারো মাধ্যমে আল্লাহ আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন। আপনি যার কাছে চাইবেন হয়তো আল্লাহ তাআলা তার মনকে আপনার জন্য নরম করে দেবেন। সে দয়াপরবশ হয়ে আপনার চাওয়া পূরণ করবে।
হাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ নামে এক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মানুষের বিপদাপদে পাশে দাঁড়াতেন। সাধ্যমতো দান-সাদাকা ও উপকার করার চেষ্টা করতেন। তার পাশের বাড়িতে থাকতেন এক বিধবা নারী। সাথে কয়েকটা এতিম সন্তান। একরাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। মহিলাটি তখন আল্লাহর কাছে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! হে পরম করুণাময়! আপনি আমাদের অভাব-অনটন দূর করে দিন। আমাদের আর্থিক সচ্ছলতা দান করুন।' পাশের বাড়ি থেকে হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ শুনতে পেলেন বিধবার এই উচ্চৈঃস্বরের দুআ। দুঃখে ভরে উঠল তার মন। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর তিনি দশটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে সেই প্রতিবেশীর ঘরে কড়া নাড়লেন। স্বর্ণমুদ্রার থলেটি মহিলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'এটা রেখে দিন। আপনার প্রয়োজনের সময় কাজে লাগবে।'
থলেটি সে গ্রহণ করলেও তার পাশে বসে থাকা ছোট কন্যা রীতিমতো চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করল। আল্লাহ ও বান্দার মাঝের গোপন বিষয় বাইরের মানুষ জেনে যাওয়াতে এই সাহায্য এসেছে-এটা তার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল।[১] বান্দার করুণার পাত্র হওয়ার চেয়ে আল্লাহর কাছে করুণা ভিক্ষা করাই যে মুমিনের কাছে সবচেয়ে প্রিয়!
যারা প্রকৃত মুমিন তারা তাদের সকল ব্যথা-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট আল্লাহর কাছেই পেশ করে। দেখুন আল্লাহর নবি ইয়াকুব আলাইহিস সালামের আকুতি-
إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ )
আমি তো আমার দুঃখ ও বেদনা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি। আর আমি আল্লাহর নিকট থেকে যা জানি তোমরা তা জানো না [১]
আল্লাহর কাছে চাওয়ার পর যদি তাৎক্ষণিক আপনার চাওয়া পূরণ না হয়, এতে হতাশ হবেন না। অনেক সময় আল্লাহ না দিয়ে পরীক্ষা করেন। বান্দার অন্তরে আল্লাহর জন্য কতটুকু জায়গা রয়েছে তা তিনি যাচাই করে দেখেন। দুনিয়াবি কত কাজে মানুষ একটু সুখের জন্য কত অসহনীয় কষ্ট সহ্য করে। তাহলে আখিরাতের বিশাল প্রাপ্তির সামনে ক্ষণিকের না পাওয়া কি সহনীয় হতে পারে না?
একবার একটি ব্যাংকের সামনে জনতার ভিড় দেখলাম; পাঁচশোর মতো লোক দীর্ঘ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচণ্ড গরম, সময় দুপুর আড়াইটা। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'ভাই, কী হয়েছে এখানে?'
উত্তর এলো, 'সন্ধ্যা ছটায় গাড়ি রিজার্ভেশনের রেজিস্ট্রি হবে।'
সন্ধ্যা ছটায় রেজিস্ট্রি। আর এই তীব্র গরমের মধ্যে তারা দাঁড়িয়ে আছে দুপুর আড়াইটা থেকে! দুনিয়ার জন্য মানুষ কত কষ্টই না করে!
আরেক ভদ্রলোক আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়েছেন। আমি যতদূর জানি, তিনি যথেষ্ট গণ্যমান্য ও গুরুত্বসম্পন্ন এক ব্যক্তি। সবসময় হারাম বস্তু থেকে নিজের দৃষ্টি হিফাজত করে চলেন। একবার কোনো একটা সেমিনারে যোগ দেওয়ার জন্য ইউরোপ গমন করেন তিনি। সাইপ্রাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লার্নাকায় সুইডিশ বিমান থেকে হঠাৎ অনেকগুলো মেয়েকে একসাথে নামতে দেখলেন। তাদের পরনে ছোট ইউনিফর্ম। তিনি তার দৃষ্টির হিফাজত করতে পারলেন না সেদিন। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। এরপর একটি ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছে গেলেন গন্তব্যে। ভাড়া পরিশোধের সময় ভিনদেশি মুদ্রা দিতে গেলে ড্রাইভার তাকে থানায় নিয়ে গেল। থানায় ঢুকে ড্রাইভারটি পুলিশ অফিসারের সাথে কী যেন বলল। অমনি দুজন পুলিশ কর্মকর্তা এসে ভদ্রলোকটিকে গ্রেফতার করে ফেলল। আটকে রাখল একটি ছোট্ট খাঁচার মতো কক্ষে।
এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্যে তিনি তার দৃষ্টির খিয়ানতকেই দায়ী মনে করলেন। নিজেকে ধিক্কার দিলেন, এই বিপদ তার পাপের শাস্তি ছাড়া আর কিছুই নয়!
একবার রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, দামি পোশাক পরিহিত কেতাদুরস্ত এক লোক কী যেন ট্রাফিক জটিলতায় পুলিশের সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করছে। একটু পরে আরেকজন পুলিশ অফিসার এলো। এসেই লোকটার দুই গালে সজোরে দুটি চড় বসিয়ে দিলো। আমি একেবারে থ হয়ে গেলাম।
আল্লাহ কতভাবেই না মানুষকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন! কাউকে এমনিতেই মাফ করে দেন। আবার কাউকে জনসম্মুখে লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।
অনেক মানুষ আছে, তারা আল্লাহর কাছে কেবল মূল্যবান বস্তুই প্রার্থনা করে- 'হে আল্লাহ! আমাকে জান্নাত দান করুন।' 'হে আল্লাহ! আমার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার পূর্বে আপনি আমাকে মৃত্যু দেবেন না।' 'হে আল্লাহ! আমাকে কুরআন বোঝার তাওফিক দিন' ইত্যাদি। এর বিপরীতে কিছু মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহর কাছে খুব সামান্য ও তুচ্ছ বস্তুও প্রার্থনা করে- 'হে আল্লাহ! এ মাসে ভাড়াটিয়া ঘর ছেড়ে দেবে। আপনি আমাকে নতুন ভাড়াটিয়ার ব্যবস্থা করে দিন।' প্রত্যেকেই প্রত্যেকের প্রয়োজন ও অন্তরের ঝোঁক অনুযায়ী একেক জিনিস আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে থাকে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেকে তার নিজ নিজ প্রয়োজন যেন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। লবণ ফুরিয়ে গেলে বা জুতার ফিতা ছিড়ে গেলেও যেন সে আল্লাহর কাছ থেকে তা চেয়ে নেয়।' [১]
যিনি আত্মার রিযিকদাতা
আল্লাহ তাআলা আমাদের দৈহিক প্রয়োজন মিটিয়ে দেন তা আমরা সবাই উপলব্ধি করি। খাদ্য, পানি এবং অন্যান্য বস্তু-সামগ্রী দিয়ে আল্লাহ তাআলা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজন মিটিয়ে দিচ্ছেন। ঠিক তেমনিভাবে প্রতিনিয়তই আমাদের রুহ ও আত্মার খোরাক দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখছেন। আমাদের কোনো অসংগতির কারণে তিনি যেমন কখনো কখনো রিযিক বন্ধ করে দেন, তেমনিভাবে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে কখনো কখনো আত্মার রিযিকও সংকুচিত করে দেন। যাদের অন্তর ও অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে তারা তা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু যারা আত্মভোলা, উদাসীন তারা এসবের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না।
আপনি সালাত পড়ছেন কিন্তু তাতে খুশু-খুযু, বিনয় ও নিবিষ্টতা আসছে না, তাহলে বুঝে নিন, আল্লাহ আপনার রুহ ও আত্মার খোরাক সংকুচিত করে দিয়েছেন। এক ভাই এসে বললেন, হিসাব-নিকাশে যত ধরনের ভুল-ভ্রান্তি হয়, সালাতে দাঁড়ালে সবকিছুর কথা মনে পড়ে। এর অর্থ হলো, হৃদয় এবং আল্লাহর মাঝে এক পর্দার আড়াল তৈরি হয়েছে। তাই তার মন আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট না হয়ে দুনিয়াবি চিন্তায় মজে থাকে।
আল্লাহ কেন আপনার রিযিক সংকুচিত করছেন, তার দুটি কারণ হতে পারে-
এক. আপনি কারো হক নষ্ট করেছেন; কিন্তু তাকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেননি।
আল্লাহ বলেন, 'যখন আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন, তার রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক তো আমাকে হীন করেছেন। না, কখনো নয়; বরং তোমরা ইয়াতিমকে সম্মান করো না এবং অভাবীদের খাদ্যদানে পরস্পরকে উৎসাহিত করো না। তোমরা উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য সম্পদ সম্পূর্ণরূপে ভক্ষণ করে ফেলো। তোমরা ধন-সম্পদ অতিশয় ভালোবাসো।[১]
অন্যকে বঞ্চিত করায় আপনার এবং আপনার রবের মাঝে বাধা তৈরি হয়েছে। প্রত্যেক পাপেরই কুফল রয়েছে। প্রত্যেক পাপই আল্লাহর সাথে সম্পর্কের পথে একেকটি বাধা।
দুই. মাঝে মাঝে এমন হয় যে, আপনি আল্লাহর পথেই বহাল আছেন। আল্লাহর হুকুমের অধীনেই আপনার জীবন পরিচালনা করছেন। তবুও আল্লাহ আপনার রিযিক সংকুচিত করছেন। এর কারণ, আল্লাহ আপনার পিপাসাকে তীব্র করে তুলছেন। আপনি একটি আমল করার কারণে আল্লাহর কাছে একটি স্তরে উপনীত হচ্ছেন। কিছুদিন পর এই আমলটি আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তখন আপনার স্তর যা ছিল তার চেয়ে আর উন্নত হচ্ছে না। আল্লাহ তাআলা চান আপনার স্তর আরো উন্নত হোক। তখন তিনি আপনার আত্মার রিযিক তথা প্রশান্তি, দীপ্তি এবং উপলব্ধির স্বাদ সংকুচিত করে দিচ্ছেন। এতে অস্থির হয়ে নতুন উদ্যমে, পূর্বের চেয়ে আরো বেশি আমলে মনোনিবেশ করছেন, আরো বেশি নিবিষ্টতার সাথে ইবাদত করতে শুরু করছেন। এতে আপনার যে মর্যাদা ছিল, আল্লাহ তাআলা তা আরো অনেক উন্নত করে দিচ্ছেন।
জীবনে বিভিন্ন কারণেই মানুষ খুশি হয়। আপনি যাচাই করে দেখুন-কার জন্য খুশি হচ্ছেন, আল্লাহর জন্য না দুনিয়ার জন্য?
খুশিতে আপনার চেহারা ঝলমল করছে, জ্বলজ্বল করে উঠেছে চোখের তারা। সহাস্য বদনে খুব উৎফুল্ল হয়ে নিজের খুশি প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। আগে চিন্তা করে দেখুন, কেন আপনি এত উৎফুল্ল। যদি এমন হয়, আল্লাহর সাথে আপনার বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, আপনি ইবাদতে খুব তৃপ্তি পেয়েছেন, জান্নাতের কোনো নিয়ামত আপনাকে পুলকিত করে তুলেছে-আর এসব কারণেই আপনি প্রচণ্ড খুশি হয়েছেন, তাহলে এটা নিশ্চয় আপনার ঈমানের নিদর্শন। যে খুশি আল্লাহর জন্য নিবেদিত তা নিশ্চয় ঈমানের আলামত।
আর যদি এমন হয়, আপনি ব্যবসায় মোটা অঙ্কের লাভ করেছেন বা নতুন কোনো উপার্জনের সন্ধান পেয়েছেন, তাই আপনি এত খুশি; তাহলে জেনে রাখুন, আপনার এই খুশি অন্য কিছুর বার্তা দিয়ে যায়। যে খুশি আল্লাহর জন্য নয়, তা কখনো সৌভাগ্যের লক্ষণ হতে পারে না।
দুনিয়া বা দুনিয়ার মানুষ যদি আপনার খুশির কারণ হয়, তাহলে আপনি দুনিয়াদার। আর আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ যদি আপনাকে খুশি করে, তাহলে আপনি ঈমানদার। ইমাম হাসান আল-বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'যখন তুমি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করো, আল্লাহর যিকির করো কিংবা নবিজির ওপর দরুদ পাঠ করো, কিন্তু কোনো স্বাদ বা তৃপ্তি অনুভব করতে পারো না; তাহলে জেনে রেখো, তোমার অন্তর পর্দা দ্বারা আবৃত। আল্লাহ আর তোমার মাঝে রয়েছে গাঢ় আচ্ছাদন।'
মহান আল্লাহ বলেন-
كَلَّا إِنَّهُمْ عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ (3)
কখনো না। সেদিন তারা তাদের পালনকর্তা থেকে পর্দার অন্তরালে থাকবে [১]
উল্লিখিত অন্তরাল তো আখিরাতের পর্দা। কিন্তু দুনিয়াতেও পর্দা রয়েছে। অন্তরের পর্দা; যা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরিতে বাধা প্রদান করে। আপনি যদি কখনো অন্তরে পর্দা অনুভব করেন, আপনার অন্তর আল্লাহর ব্যাপারে পাষাণ হয়ে যায়, তাহলে সাথে সাথেই সতর্ক হয়ে যান। খুঁজে বের করুন, কেন আপনার অন্তর আল্লাহর ব্যাপারে পাষাণ হয়ে গেল।
হয়তো আপনি আল্লাহর ব্যাপারে কোনো মন্দ ধারণা পোষণ করেন, তাঁর রাসুলের ব্যাপারে কোনো অবান্তর চিন্তা নিয়ে পড়ে আছেন। হয়তো আপনার অজান্তেই কোনো অনৈতিক বিশ্বাস জেঁকে বসেছে আপনার হৃদয়সত্তায়। কারণটা আবিষ্কার করে সাথে সাথেই তা দূর করার চেষ্টা করুন।
অন্তরের পর্দা কখনো পুরু হতে পারে, আবার কখনো পাতলাও হতে পারে। আপনার হৃদয়ের পর্দা যদি হয় মোটা, তবে নিঃসন্দেহে আপনার জটিলতা অনেক বেশি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, সূর্য উদিত হয়ে গেছে। আপনার ফজর সালাত কাযা হয়ে গেছে। তারপরও আপনার মনে কোনো অনুশোচনা জাগল না, তাহলে বুঝবেন, অবস্থা খুবই গুরুতর।
আর যদি অনুশোচনার তাপে আপনার মন পুড়ে যেতে চায়, আল্লাহর সামনে লজ্জায় আপনি সংকুচিত হয়ে যান এবং ব্যথায় আপনার হৃদয় কেঁদে ওঠে, তাহলে আপনি আপনার অন্তরের প্রহরায় থাকুন, যেন তা দুর্ভাগ্যের করাল গ্রাসে পরিণত না হয়।
দাউদ আত-তায়ি রাহিমাহুল্লাহ একজন মুত্তাকি ছিলেন। একবার এক লোক তার সাথে সাক্ষাতে আসে। তিনি তখন বেশ প্রসন্ন। লোকটি জিজ্ঞেস করে, যখনই আপনার কাছে আসি, আপনাকে সবসময় বিমর্ষ, চিন্তিত দেখি। কিন্তু আজ আপনি বেশ প্রফুল্ল!
দাউদ আত-তায়ি উত্তর দিলেন, গত রাতে আল্লাহ আমার তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। তাই আজকের দিনটি আমি ঈদের দিনের মতো খুশিতে যাপন করছি। লোকটি বলল, তাহলে আপনার ইফতার করার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি?
দাউদ আত-তায়ি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আমি এ খাবার চাই না। যে খাবার মানুষের হাতে হাতে আসে সে খাবার এবং যে খাবার হৃদয়ের তৃষ্ণা মিটায়-এ দুয়ের মাঝে অনেক ব্যবধান।
অর্থাৎ খাবারও দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটা বস্তুগত খাবার, যা ভক্ষণ করা যায়। আরেকটা হলো আত্মিক খাবার, যা হৃদয়ে দীপ্তির ঝলক বিচ্ছুরিত করে।
আল্লাহর স্মরণে সীমাহীন সুখ
মানুষ যদি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুতে সুখ ও সাফল্য খোঁজে, তবে তা কঠিন বিপদ ডেকে আনে। আল্লাহ সত্য, তিনি সত্য সংবাদই প্রদান করেন। আল্লাহই ঘোষণা দিচ্ছেন-
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا
যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে, অবশ্যই তার জীবনযাপন হবে সংকুচিত এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো ছিলাম চক্ষুষ্মান [১]
তখন আল্লাহ উত্তরে বলেন-
قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنسَى )
এভাবেই আমার নিদর্শনাবলি তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। তাই আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হলো।
অতএব, সবসময় আল্লাহকে স্মরণ রাখুন। সুখ খুঁজে নিন তাঁর আনুগত্যে। সৌভাগ্য অর্জন করুন তাঁরই নৈকট্যে।
আর-রাযযাকের পরশে
তিনি আপনার জন্য যা ভালোবেসেছেন, তা-ই আপনাকে দান করেছেন। অতএব, তার বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকুন। যে বাবা-মায়ের ঔরসে তিনি আপনার অস্তিত্ব দান করেছেন, সন্তুষ্ট থাকুন তাদের নিয়ে। আপনার জন্য যেমন বাবা-মা প্রয়োজন ছিল, ঠিক তেমনই তিনি আপনাকে দিয়েছেন।
আপনার বন্ধুর বাবা সন্তানকে খুব আদর করে, তার মনটা খুব কোমল, সে অনেক উন্নত চরিত্রের অধিকারী; আর আপনার বাবা কর্কশ, বদমেজাজি। বন্ধুর বাবা উচ্চশিক্ষিত, সম্পদশালী, বড় পদমর্যাদার অধিকারী; আর আপনার বাবা মূর্খ, হতদরিদ্র-এসব চিন্তা করে কখনো মন খারাপ করবেন না। কারণ, মহান আল্লাহ তাঁর শাশ্বত প্রজ্ঞা ও অসীম জ্ঞানের আলোকেই তাদেরকে আপনার জন্য নির্বাচন করেছেন। অতএব, তাদেরকে সৌভাগ্য মনে করুন। আল্লাহর জন্য হলেও তাদের ভালোবাসুন।
ঠিক একইভাবে আপনার দৈহিক গঠন, রূপ-সৌন্দর্য এবং শারীরিক আকৃতির ব্যাপারেও আল্লাহর পছন্দে খুশি থাকুন। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর অভিযোগ করে, সে সত্যিকার মুমিন হতে পারে না। পিতা, মাতা, দৈহিক আকার-আকৃতি, স্ত্রী-পরিজন, ঘর-বাড়ি, ধন-সম্পদ সবকিছুর ক্ষেত্রেই আল্লাহ আপনার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন। এতে আপনি যে আত্মিক প্রশান্তি পাবেন তা অন্য কোথাও কল্পনা করাও সম্ভব নয়। অমুসলিম, অবিশ্বাসী মানুষগুলো সারা জীবন অস্থিরতা ও জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্যেই দিন কাটায়। স্ত্রী মনমতো না হলে, হতাশ হয়ে পড়ে। কোনোকিছুতেই তার জীবনের দুঃখ আর ঘোচে না। কিন্তু মুমিন আল্লাহর পছন্দে খুশি হয়, তাই সে সহজে হতাশ হয় না। আপনার স্ত্রী যদি আপনার মনমতো না-ও হয়, তবুও বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ তাআলা তার মাঝেই আপনার কল্যাণ রেখেছেন। তাকে নিয়েই খুশি থাকুন সবসময়।
এক লোকের বদমেজাজি স্ত্রী ছিল। তার বন্ধুরা পরামর্শ দিলো, বউকে তালাক দিয়ে দাও। কিন্তু সে উত্তরে বলল, আমি তাকে তালাক দিয়ে অন্য কোনো মুসলিম ভাইকে ধোঁকা দিতে পারব না। অর্থাৎ সে আল্লাহর ফয়সালায় খুশি ছিল। তার কাছে স্ত্রীর যতটুকু সমস্যা ছিল, সেটাকে সে অন্য মুসলিম ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা ভালো মনে করেনি।
সার কথা, আপনি সদা সর্বদা আল্লাহর ফয়সালা ও বণ্টনে খুশি থাকুন। আল্লাহর সান্নিধ্যেই সৌভাগ্য অর্জন করুন। আর-রাযযাক আপনাকে যে রিযিক দিয়েছেন, তাতে তৃপ্ত হোন। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা আপনার হাতে যে সম্পদ দিয়েছেন, তাকে আমানত মনে করুন। তা আপনার মালিকানা নয়; আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কাছে রাখা আমানত। অতএব, তা খরচের পদ্ধতি ও খাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ীই খরচ করুন। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন-
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا
যখন তারা ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং এ দুয়ের মাঝে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে।[১]
টিকাঃ
[১] সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৬০
[২] আল-মাজালিস, দাইনুরি : ১৩৫৩; বুগইয়াতুত তলিব, খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা : ৩৪২৯
[৩] সুরা ত-হা, আয়াত: ১৩২
[৪] সালাত আদায় হয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর নিকট তা কবুল হওয়া এক নয়। খুশু-খুযুবিহীন সালাত আদায় হয়ে গেলেও আল্লাহর নিকট তা কবুল হয় না—এই হিসেবে খুশু-খুযুকে সালাতের ফরয তথা অত্যাবশ্যক বলা হয়েছে।
[১] সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২
[২] সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪৩
[৩] সুরা কাসাস, আয়াত: ২৪
[১] সূরা রুম, আয়াত: ৪০
[২] সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩১
[১] সুরা যারিয়াত, আয়াত: ২২-২৩
[২] সুরা নাজম, আয়াত: ৩৯
[১] সুরা হিজর, আয়াত: ২১
[১] মুজালাসা ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮৪
[১] সুরা জিন, আয়াত: ১৬
[২] সুরা আরাফ, আয়াত: ৯৬
[১] সুরা শুরা, আয়াত: ২৭
[১] আলফু কিসসাহ: ৮৬৮
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৬
[১] জামি তিরমিজি: ৩৬০৪
[১] সুরা ফজর, আয়াত: ১৬-২০
[১] সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৫
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ১২৪-১২৫
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ১২৬
[১] সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৭
📄 আল-খাবির : সর্বজ্ঞ, মহাবিজ্ঞ, পরিজ্ঞাত
ছোট্ট শিশুর দাঁত তুলতে হবে। দন্ত-চিকিৎসক সবটুকু কৌশল ব্যয় করে আলতোভাবে দাঁত তোলার চেষ্টা করে যায়। শিশুটি যেন ব্যথা না পায় সেজন্য তার সাথে মজার মজার কথা বলতে থাকে। তবুও কি পারে বাচ্চাটিকে ভুলিয়ে রাখতে? হয়তো দাঁত উপড়ে ফেলার অসহনীয় যন্ত্রণা অথবা চেতনানাশক ইঞ্জেকশন পুশ করার নিদারুণ কষ্ট—দুটির কোনো একটি বাচ্চাটিকে কাঁদিয়েই ছাড়ে! কিন্তু আল্লাহ যখন এই শিশুটির দুধদাঁত পরিবর্তন করতে চান, কোনো রকম কষ্ট ছাড়াই দাঁতের গোড়া নড়বড়ে করে দেন। মজার খেলনার মতো বাচ্চা নিজেই দাঁতটি তুলে ফেলে। কোনো ব্যথা-বেদনা ছাড়াই পড়ে যায় সেই দাঁত। যিনি অতি আদর করে এমন আলতোভাবে সোনামণির দাঁত তুলে দেন তিনিই আল-খাবির; মহাবিজ্ঞ রব।
আল-খাবির এমন সত্তা যিনি সবকিছু জানেন; কোনো কিছুই তাঁর অবগতির বাইরে থাকতে পারে না। সকল বিষয়ের মূল উপাদান, স্বভাব-প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্যাবলি এবং সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর তত্ত্ব ও তথ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত তিনি। কোনো লুকায়িত ব্যাপার তাঁর কাছে অস্পষ্ট থাকে না। রোগ এবং রোগের চিকিৎসাও তিনি জানেন। সকল বস্তুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। চর্মচোখে আমরা যা কিছু দেখতে পাই বা না পাই, তিনি তার সবকিছুই দেখেন। ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ এবং অন্তরের মধ্যে লুকায়িত কোনো খবরও যার কাছে অস্পষ্ট থাকে না তিনি আল-খাবির’। পৃথিবী ও মহাবিশ্বের কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টির অগোচরে ঘটতে পারে না। ক্ষুদ্রকায় একটি পিপীলিকাও তাঁর অবগতির বাইরে চলাফেরা করতে পারে না, গর্তে আশ্রয় নিতে পারে না। বিপদাপদে কেউ অস্থির হয়ে উঠুক, পিপাসায় ছটফট করুক কিংবা শান্ত-প্রশান্ত থাকুক, তার খবরও তিনি রাখেন।
কেউ ভাবতে পারেন এগুলো তো আল-আলিম, মহাপরিজ্ঞাত সত্তার বৈশিষ্ট্য। আল-খাবিরের সাথে এসবের কী সম্পর্ক? কিন্তু বাস্তবে আলিম এবং খাবিরের মাঝে বিস্তর ফারাক।
আমি সবার সামনে একটি গ্লাস উঠিয়ে অন্য জায়গায় রাখলাম। আপনি দেখলেন, আমি গ্লাস উঠিয়ে রেখেছি। তাহলে এ ব্যাপারে আপনার অবগতি রয়েছে। আপনি বিষয়টি জেনেছেন। কিন্তু আমি কেন গ্লাসটি উঠিয়েছি, কেনই বা তা সরিয়ে অন্য কোথাও রেখেছি-সে ব্যাপারে, আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনি কিছুই বলতে পারবেন না।
কিন্তু আল-খাবির হলেন সেই সত্তা যিনি বাহ্যিক অবগতির সাথে সাথে তার অভ্যন্তরীণ রহস্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সমানভাবে অবগত।
মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন-
... وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ))
তোমরা যা করো, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সম্যক অবহিত [১]
আপনি কৌশল করে অসৎ উদ্দেশ্যে একটি কাজ করলেন। পৃথিবীর কেউ জানল না আপনার মনের অভিপ্রায়। সকলে ভাবল আপনি বেশ ভালো একটি কাজ করেছেন। অথবা প্রকাশ্যে আপনি কাউকে অভিনন্দন জানালেন অথচ ভেতরে ভেতরে আপনি তাকে প্রচণ্ড রকম ঘৃণা করেন। কখনো কারো সামনে আপনি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন, অথচ আপনার অন্তর্জগৎ তার প্রতি বিদ্বেষে ভরপুর। বাইরের পৃথিবীর কেউ জানে না আপনার আসল পরিচয়। কিন্তু আপনার অন্তরের অতলান্তের ঐ সংবাদটুকুও যিনি জানেন তিনি আল-আলিম (সম্যক অবগত) হওয়ার পাশাপাশি আল-খাবির তথা মহাবিজ্ঞ।
কারো বাসায় তার স্ত্রীর বান্ধবী বেড়াতে এলো। স্ত্রীর সাথেই সে বসল। তখন স্বামী খুব বিনয়ের সাথে বলল, 'তোমরা এখানে এসো। এই ঘরটি বেশ উন্ন; এখানে দারুণ সময় কাটবে তোমাদের।' এখন খেয়াল করে দেখুন। স্বামী যে আবেদন করেছে সেটাই কি বাস্তব নাকি 'ডাল মে কুচ কালা হ্যায়'? বাস্তবেই সে কি অতিথির সমাদর করতে চায়? না তার অন্তরে জেগে ওঠা কোনো কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে চায়? অতিথি বুঝবে না; স্ত্রীও বুঝবে না। কিন্তু প্রতিটি কাজের ভেতর-বাহির, হেতু, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট এবং খুঁটিনাটি সব বিষয়ে যিনি অবগত তিনি আল-খাবির।
আপনি প্রায়ই অনেক বিপদগ্রস্ত লোক দেখতে পাবেন, যারা সমাজে অত্যন্ত নেককার হিসেবে পরিচিত। আপনার অজান্তেই আপনার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে, এত ভালো মানুষটির এমন বিপদ কীভাবে হলো? কিন্তু আপনি তার আসল রহস্য জানেন না। ভালো মানুষটিরও কেন বিপদ হবে? তাকেও কেন মসিবত গ্রাস করবে, তা আপনি জানতে পারেন না, কিন্তু আল্লাহ জানেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপন করুণায় কোনো মহৎ উদ্দেশ্যেই তাকে বিপদ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা যেহেতু আপনার সবকিছুর সম্পর্কে সম্যক অবহিত; কল্যাণ-অকল্যাণ, ভালো-মন্দ এবং আপনার বর্তমান-ভবিষ্যতের ব্যাপারেও অবগত, তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে যদি কোনো মসিবত নেমে আসে, তাতে কখনো বিচলিত হবেন না। কে জানে এই সাময়িক বিপদের সেতু পার হলেই সামনে রয়েছে সৌভাগ্যের সবুজ বাগান! কত মানুষ আছে ঘর থেকে নিয়ে মসজিদ পর্যন্ত; নির্জনতা থেকে লোকালয় আর বাজার-ঘাট পর্যন্ত সবার মুখে মুখে তার প্রশংসা। আপাদমস্তক নেককার একজন মানুষ। মহান আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে অঢেল সম্পদও দান করেছেন তাকে। কিন্তু কেউ কি জানে, তার এই সৌভাগ্যের স্থায়িত্ব কতদিনের? তার এই অবস্থা কি স্থায়ী হবে, না অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে—সে কথা কি কেউ বলতে পারে? কেবল আল্লাহই জানেন, অতীত-বর্তমানের সব সংবাদ। যা ঘটেনি তা যদি ঘটত তাহলে কী হতো? অথবা যদি সামনে তা ঘটে তাহলে কী হবে? সেসব বিষয় সম্পর্কেও সম্যক অবহিত মহান রব আল-খাবির, সম্যক অবগত, মহাবিজ্ঞ।
অন্তরের প্রবণতা এবং প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে এত গভীরভাবে আর কেউ কি জানতে পারে?
মানুষের জ্ঞান নিতান্ত সীমিত
একদিন এক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ প্রবল বেগে ঘূর্ণিঝড় শুরু হলো। দেখলাম ঝড়ের প্রকোপে একটি প্রাচীর বিধ্বস্ত হওয়ার উপক্রম। প্রাচীর-নির্মাতারা কি জানত এখানে এত গতিবেগে বাতাস বইতে পারে? অবশ্যই তারা জানত না। জানলে তারা সর্বসাধ্য ব্যয় করে বিপদসীমার চেয়েও মজবুত করে তা নির্মাণ করত। মানুষ কীভাবে জানবে? কোনো কিছু সম্পর্কে জানতে হলে তো সে ব্যাপারে আগে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।
জটিল পরিস্থিতিতে ক্ষয়-ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য আমরা নানা উপায় খুঁজতে থাকি। বিপদ-আপদ ও দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয়। যেমন: কোনো যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হলে তাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে তা নির্ণয় করার জন্য অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়।
গাড়ির কোম্পানি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে কোনো চালক ছাড়াই একটি গাড়ি ছেড়ে দেয়। গাড়ির সামনে থাকে সিমেন্ট আর কংক্রিটের তৈরি মজবুত প্রাচীর। হাই স্পিডে ছুটে গিয়ে দেওয়ালের সাথে গাড়িটির বিশাল সংঘর্ষ হয়। তখন কোম্পানি পর্যবেক্ষণ করে, যে ধাতু দ্বারা গাড়ির বডি তৈরি করা হয়েছে তাতে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতির এই মারাত্মক সংঘর্ষের প্রতিক্রিয়া কেমন? এবং সংঘর্ষ কোন পর্যন্ত পৌঁছেছে? এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এরপরও তা কত ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে! আর যে কোম্পানি কোনো পরীক্ষা করা ছাড়াই গাড়ি তৈরি করেছে, তাদের গাড়ি তো সামান্য কোনো সমস্যার কারণেও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
মানুষের জ্ঞান কত সীমিত! কেমন বিপর্যয় ঘটতে পারে তা জানতেও তাদের অপেক্ষা করতে হয় বিপর্যয়ের আগপর্যন্ত।
আল্লাহর জ্ঞান পরিব্যাপ্ত ও পরিপূর্ণ
মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি নিতান্তই সীমিত ও অসম্পূর্ণ; কিন্তু আল্লাহ তাআলার জ্ঞান সম্পূর্ণ ও চিরায়ত। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা সবই অর্জিত ও শ্রমলব্ধ। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অনাদি, অনন্ত। আদিকাল থেকে মানুষের দৈহিক গঠন, শারীরিক অবকাঠামো এক ও অভিন্ন। তাতে কি এই সুদীর্ঘকালেও কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়েছে? অথচ আপনি লক্ষ করলে দেখবেন, ১৯৯০ সালে তৈরি হওয়া গাড়ি আর ১৯৯৫ সাথে তৈরি হওয়া গাড়ি দুটির মাঝে এত বেশি ব্যবধান যা আমাদের বিস্মিত করে তোলে। প্রথমে যে ট্রেনটি আবিষ্কার করা হয়েছিল, তার সামনের দিকে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকত। চলাচলের সময় সে লোকজনকে সতর্ক করত। আর সেই ট্রেনের গতি একজন মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে খুব বেশি ছিল না। অথচ বর্তমানের একটি ট্রেন ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার বেগে ছোটে। এখন থেকে পঞ্চাশ বছর আগের টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি প্রযুক্তিতেও আপনি একই চিত্র লক্ষ করবেন। এভাবে প্রতিনিয়তই বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নতি ও অগ্রগতির ফলে নতুন নতুন অনেক কিছু আবিষ্কৃত হচ্ছে, যা পূর্বের আবিষ্কারগুলোকে নিতান্ত ছেলেখেলায় পরিণত করছে। প্রতিটি গবেষণা-প্রযুক্তিতে যে ত্রুটি থেকে যায়, পরবর্তী গবেষণা সেটার ত্রুটি সংশোধন করে দেয়।
রোগজীবাণু বিধ্বংসী কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের শুরুতে সেটা মানুষ বা প্রাণীর শরীরে স্থাপন করে দেখা হয়, ভ্যাকসিনটা জীবাণু ধ্বংস করতে পেরেছে নাকি পারেনি? এভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই বিজ্ঞানীরা ওষুধপত্র আবিষ্কার করে থাকে। কিন্তু মহান আল্লাহ সেই অনাদি থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত কখনো কোনো গবেষণা, অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই আসমান, জমিন এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের অভিনব অস্তিত্বদান করেছেন। এজন্যই মানুষের গবেষণার সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান, উদ্ভাবন-আবিষ্কারকে বলা হয় পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান।
মাতৃগর্ভে মহাবিজ্ঞ রবের প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনা
মাতৃগর্ভে শিশু প্রতিপালনের যে চমৎকার ব্যবস্থাপনা তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন তা দেখে যে-কারো মেধা হতবুদ্ধি হয়ে যাবে।
মাতৃদুগ্ধে আয়রনের কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ রক্তের লৌহকণিকা বা হিমোগ্লোবিন তৈরি হওয়ার প্রধান উপাদানই হচ্ছে আয়রন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যদি আমরা একটি দুধের শিশুর রক্ত পরীক্ষা করি তাহলে দেখতে পাব, তাতে যথেষ্ট পরিমাণ হিমোগ্লোবিন রয়েছে। দুই বছর বয়স হওয়ার পর শিশু বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণের পূর্বপর্যন্ত শিশুর রক্তে যে পরিমাণ লৌহকণিকার প্রয়োজন, মায়ের দুধই তা সরবরাহ করার জন্য যথেষ্ট। যে মহান সত্তা এমন অসাধারণ ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছেন তিনি আল-খাবির।
হৃৎপিন্ডের ওপরের ও নিচের প্রকোষ্ঠ-অলিন্দ ও নিলয়ের মাঝে কে ছিদ্র সৃষ্টি করেছেন? মানবদেহে রক্ত সংবহনের সাধারণ প্রক্রিয়া হলো ফুসফুস থেকে অলিন্দে রক্ত প্রবেশ করে। কিন্তু মাতৃগর্ভস্থ শিশুর ফুসফুস নিষ্ক্রিয় থাকে, সেখানে না আছে কোনো বাতাস, না আছে শ্বাস-প্রশ্বাস। যেহেতু তার ফুসফুস নিষ্ক্রিয়, তাই তার রক্ত ফুসফুস থেকে অলিন্দে সঞ্চালিত না হয়ে বরং বিশেষ গহ্বরের মাধ্যমে এক অলিন্দ থেকে আরেক অলিন্দে সঞ্চালন করে। যখন শিশুটির জন্ম হয় তখন একটি রক্তপিণ্ড এসে ঐ ছিদ্রটিকে বন্ধ করে দেয়। তখন থেকে আবার স্বাভাবিক গতিতেই অলিন্দ থেকে ফুসফুস, ফুসফুস থেকে আরেক অলিন্দ হয়ে তা নিলয়ে রক্ত সঞ্চালন করে। যে মহান প্রভু এই ব্যবস্থাপনা করেছেন নিশ্চয় তিনি আল-খাবির, মহাবিজ্ঞ।
আপনি যখন হাতের নখ কাটেন, মাথার চুল কাটান, তখন কি কোনো ব্যথা অনুভব করেন? অথচ শরীরের অন্য যেকোনো স্থানেই কোনোরূপ আচড় লাগলে আপনি ব্যথায় কাতরে উঠবেন। চুল-নখ আপনার দেহের অঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও তা কাটতে কোনো ব্যথা লাগে না। কেননা, আল্লাহ তাআলা নখ ও চুলে অনুভূতি সঞ্চারক স্নায়ুতন্তু (নিউরন) সৃষ্টি করেননি। নখ ও চুলেও যদি তিনি নিউরন সৃষ্টি করতেন, তাহলে প্রতিবার চুল-নখ কাটার সময় আমাদের হাসপাতালে যেতে হতো, চেতনানাশক ইঞ্জেকশন নিতে হতো। অনুভূতি-তত্ত্ব তিনি সৃষ্টি করেছেন শরীরের হাড়-মাংসে। তাই হাড় ভেঙে গেলে মানুষ মারাত্মক ও অসহনীয় ব্যথা অনুভব করে। বেদনায় কাতরাতে থাকে। এভাবে শুধু মানুষ নয়; প্রাণিদেহেও যদি আপনি গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে যান, আপনি বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। আল্লাহর কুদরতের অপার কারিশমা দেখে আপনার মেধা-বুদ্ধি জমে যাবে, বিশ্বাসী হৃদয় তাঁর সম্মুখে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে।
এই অসাধারণ ও অতিপ্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা যিনি করেন, তিনি আল-খাবির।
আপনার বাড়ির পাশের বাগানের মালীকে দেখেছেন, কত যত্ন করে গাছগুলোকে পরিচর্যা করে। সে যদি গাছে পানি দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে? প্রথমেই গাছের সবুজ, লকলকে পাতাগুলো শুকিয়ে যাবে। পাতার রস শুকানোর পর ডালের রস শুকিয়ে যাবে। তারপর গাছের কাণ্ড শুকিয়ে যাবে। অতঃপর শিকড়ের পানি শুকাতে শুকাতে সর্বশেষ শিকড়ের মাথার পানি শুকিয়ে যাবে। গাছে যখন রস বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না, কেবল তখনই গাছটি মরে যাবে, পরিণত হবে শুকনো কাঠে। একটি গাছের পত্র-পল্লব, শাখা-প্রশাখা, কাণ্ড ও শিকড়ে পর্যন্ত তিনি রস ছড়িয়ে রেখেছেন। তাই আমরা একবার, দুবার পানি দেওয়া বন্ধ করলেও তাতে গাছের কোনো ক্ষতি হয় না; গাছটি মরে যায় না। যদি একবারেই গাছের সব রস শুকিয়ে যেত, তাহলে মাত্র একবার পানি দেওয়া বন্ধ করলেই পৃথিবীর সব গাছ মরে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা অসাধারণ বিচক্ষণতায় বৃক্ষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রস ছড়িয়ে দিয়েছেন।
কারণ তিনি আল-খাবির; শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞার অধিকারী।
যিনি অন্তরের খবরও জানেন
ডাক্তার চিকিৎসার স্বার্থে রোগীর সতরও দেখতে পারে। কিন্তু সে যদি কামনার বশবর্তী হয়ে আক্রান্ত স্থান ব্যতীত অন্য কিছু দেখে, তবু ঐ মহিলা-রোগী কখনো জানতেও পারবে না, সে আসলে ডাক্তারবেশী এক লম্পট ও দুশ্চরিত্র, যার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে বীভৎস এক চেহারা! কিন্তু এই আসল চেহারা যিনি মুহূর্তের মাঝে উন্মুক্ত করে দিতে পারেন তিনি সম্যক জ্ঞাত পবিত্র এক সত্তা মহান আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَعْلَمُ خَابِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ )
চোখের অপব্যবহার এবং অন্তরে যা গোপন রয়েছে সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত [১]
কাফির, মুমিন নির্বিশেষ সকল মানুষের প্রতিই তিনি ইনসাফ ও ন্যায়-নিষ্ঠাপূর্ণ আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই অমুসলিমের সাথে উত্তম আচরণও আল্লাহর নৈকট্যলাভের মাধ্যম। কিন্তু যখন আপনি কোনো অমুসলিমের সাথে সুব্যবহার ও সৌজন্যমূলক আচরণ করছেন, সেটা কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছেন না অন্য কোনো কারণে? তাঁর ভয়ে কম্পিত হয়ে নাকি দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য? জনসম্মুখে আপনি খুব ভণিতা-অভিনয় করে চক্ষু অবনত করে পথ চলছেন, কিন্তু একটু সুযোগ পেলেই, একটু আড়াল হলেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করছেন হারামের দিকে। কেউ তা জানতে পারবে না; কিন্তু তিনি জানেন আপনার অন্তরের সব খবর।
বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত সকল স্থানে আপনার আল্লাহভীতি, তাকওয়া- পরহেজগারির চর্চা। কিন্তু রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করে স্মার্ট ফোন কিংবা কম্পিউটারের স্ক্রিনে আপনি ভেসে যাচ্ছেন নগ্নতার জোয়ারে, ডুবে যাচ্ছেন ধ্বংসের অতল গহ্বরে। আপনার এই লৌকিকতা আর ধূর্ততার খোলস কেউ উন্মোচন করতে পারে না। কিন্তু মহাবিজ্ঞ রব আল-খাবির আপনার চেয়েও বেশি অবগত আপনার ছলচাতুরির ব্যাপারে। যেকোনো মুহূর্তে তিনি আপনার মুখোশ খুলে দিতে পারেন সকলের সামনে; যাদের সামনে লৌকিকতার চাদরে আপনি ঢেকে রেখেছেন শঠতার ভয়ানক আকৃতি। সুমহান আল্লাহ বলেন—
قُل لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে; এটাই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যকভাবে অবহিত।[১]
আল-খাবিরের সাথে হৃদয়ের বন্ধন
প্রতি মুহূর্তে আপনার প্রতিটি কাজের তিনি পর্যবেক্ষক। প্রকাশ্যে, গোপনে, জনতার মাঝে, লোকচক্ষুর আড়ালে এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের ব্যাপারে তিনি সম্যক অবগত। আপনি যা কিছুই লুকিয়ে রাখুন না কেন, তাঁর সামনে আপনার সবকিছুই উন্মুক্ত। আপনার কোনো রহস্যই তাঁর অগোচরে থাকতে পারে না। গোপন পাপ আপনার কোমর ভেঙে দিয়েছে। প্রকাশ্য অপরাধ আপনার ঈমানি দেহ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মহাবিজ্ঞ রবের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করুন। আপনি আবার ঈমানি শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠবেন। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবেন না। এটাই আল-খাবির তথা মহাবিজ্ঞ সত্তার বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণের প্রথম ফল।
ইমাম কুশাইরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'মহান আল্লাহর আল-খাবির নামের প্রতি আদব প্রদর্শন প্রত্যেক মুমিনের জন্য আবশ্যক।' প্রতিটি কথাবার্তা ও কাজকর্ম সম্পর্কে তিনি অবহিত-এই বিশ্বাস যার অন্তরে বদ্ধমূল হবে, সে আপন কথাবার্তায়, কাজে-কর্মে সতর্ক হয়ে যাবে। প্রতিটি পদক্ষেপে আস্থাশীল হবে এটা ভেবে যে, আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা কখনোই হাতছাড়া হবে না। আর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেননি তা কস্মিনকালেও সে অর্জন করতে পারবে না। আল-খাবির নামের প্রতি আপনার ঈমান যত বেশি দৃঢ় হবে, পার্থিব সকল বিষয় আপনার কাছে তত সহজ হয়ে যাবে। কারণ আপনার দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হবে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে সবই তিনি জানেন ও দেখেন। পক্ষান্তরে, যারা পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহকে বাহ্যিক কার্যকারণ বা প্রাকৃতিক কারণ মনে করে তারা সর্বদা অস্থিরতায় ভোগে।
আপনার হৃদয়ে যখন মহাবিজ্ঞ রবের প্রতি বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হবে, আপনি যখন হৃদয়ের গভীর থেকে উপলব্ধি করবেন, আল্লাহ আপনার সকল বিষয় পর্যবেক্ষণ করছেন, তখন আপনি অপার্থিব এক আত্মিক শক্তি ও মনোবল অনুভব করবেন। অন্তরের বদ্ধমূল এই বিশ্বাসই অতি সংগোপনে আপনার সব প্রয়োজন তুলে ধরবে আপনার রবের কাছে। গায়েব থেকেই আপনার সকল চাওয়া-পাওয়া পূরণ হয়ে যাবে। কারণ মানুষ যা মুখে উচ্চারণ করে আল্লাহ তা শ্রবণ করেন; আর মানুষ যা অন্তর দিয়ে কামনা করে সে সম্পর্কেও আল্লাহ বেখবর নন।
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সন্তান চেয়ে আল্লাহর তাআলার কাছে যে দুআ করেছিলেন, তা চুপিসারেই করেছিলেন। হৃদয়ের গহীন থেকে প্রার্থনা করেছিলেন মহান রবের নিকটে।
إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا ۞
যখন তিনি তার রবকে চুপিসারে ডেকেছিলেন [১]
আল্লাহর জ্ঞানের প্রতি তার ছিল অগাধ বিশ্বাস। তাই হৃদয়ের সে ডাকেই সাড়া দিয়েছিলেন, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, মহাবিজ্ঞ আল্লাহ তাআলা।
মহাবিজ্ঞ রব আল-খাবিরের ওপর আপনার বিশ্বাস আছে তো?
পৃথিবী প্রতিনিয়তই উন্নতি ও উৎকর্ষের দিকে ধাবমান। জীবনযাত্রার মান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন-প্রকরণে প্রতিটি মুহূর্তেই সাধিত হচ্ছে ব্যাপক পরিবর্তন।
এই পরিবর্তিত বিশ্বে মহাবিজ্ঞ রব আল-খাবিরের প্রতি, তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ বিধান ও নির্দেশাবলির প্রতি আপনার আস্থা কতটুকু?
বৈধ পথায় আয়-উপার্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় শরিয়ত কর্তৃক প্রজ্ঞা ও ভারসাম্যপূর্ণ কিছু মূলনীতি প্রণয়ন করে দেওয়া হয়েছে। এসব মূলনীতির প্রতি লক্ষ রেখে বৈধভাবে সম্পদ উপার্জনের অনেক পদ্ধতিই শরিয়ত অনুমোদন করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছে শরিয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ হাজারো পন্থা।
আপনি হয়তো ভাবছেন, শরিয়তের মূলনীতির আলোকে ফিকহের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ উপার্জনের যেসব পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো সময়োপযোগী নয়। পাশাপাশি এসব পদ্ধতি প্রয়োগ করে লাভবান হওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এর বিপরীতে শরিয়ত বহির্ভূত আধুনিক পদ্ধতির ব্যবসা-বাণিজ্য বেশি ফলপ্রসূ। আবার তা অনিবার্য লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই চিন্তা থেকেই আপনি হারাম পদ্ধতির বাণিজ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। দেখবেন, আকস্মিকভাবেই একদিন আপনার ব্যবসা বিরাট ক্ষতির মুখে পতিত হয়েছে।
অতএব, প্রচুর অর্থ উপার্জনের জন্যও আপনাকে শারয়ি বিধানের সামনেই আত্মসমর্পণ করতে হবে। ব্যবসার লাভ-লোকসান শুধু মেধা-বুদ্ধির ওপরই নির্ভর করে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওফিকেরও প্রয়োজন হয়। আর আল্লাহর তাওফিকপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য আল্লাহর আনুগত্য পূর্বশর্ত। যে ব্যক্তি মনে করে, শরিয়তসম্মত উপায়ে ব্যবসা কিংবা চাকরি না করে হারাম পন্থা অনুসরণ করলে অল্প সময়ে অনেক বেশি অর্থ-কড়ি কামানো যাবে, নান্দনিক বাড়ি আর দৃষ্টিনন্দন গাড়ি কেনা যাবে, সে ব্যক্তি মূলত নির্বোধ ও পথভ্রষ্ট।। সে জানে না, আল্লাহ তাআলা মহাবিজ্ঞ, তাঁর বিধানেই রয়েছে সমূহ কল্যাণের নিশ্চয়তা। তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারী নিশ্চিত হতভাগা। সৌভাগ্যের চাবিকাঠি তাঁর আনুগত্যের মাঝেই নিহিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيَ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ ۖ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا
আপনি নিজেকে ধৈর্য সহকারে রাখবেন তাদের সংসর্গে, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় ডাকে তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। পার্থিব জীবনের শোভা ও চাকচিক্য কামনা করে আপনি তাদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। আপনি তার আনুগত্য করবেন না, যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার খেয়াল-খুশিমতো চলে এবং যার কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে যায় [১]।
যখনই আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত পথে চলবেন, তখনই সৌভাগ্যের ফলবান বৃক্ষ থেকে ছিঁড়তে পারবেন সুমিষ্ট পাকা ফল। আর আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে বিপথগামী হলেই চরম পর্যায়ের লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে। কারণ আপনি মহাবিজ্ঞ প্রভুর নির্দেশ অমান্য করেছেন।
আপনি অনেক দামি ও মূল্যবান একটি মেশিন কিনলেন, যার অপারেটিং সিস্টেম বেশ জটিল। স্বাভাবিকভাবেই আপনি ধরে নেবেন মেশিনটির আবিষ্কারক ও নির্মাতাই এর অপারেটিং সিস্টেম সম্বন্ধে সবচেয়ে বেশি অবগত। তখন আপনি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গাইডবুক সংগ্রহ করে নির্দেশনা মোতাবেক মেশিন চালিয়ে নেবেন।
দুনিয়াবি সামান্য একটা মেশিনের ক্ষেত্রে যদি আপনার এত গুরুত্ব ও আগ্রহ থেকে থাকে, তাহলে আপনার এই আশ্চর্য দেহ এবং তার মধ্যে অবস্থিত হৃদয় ও আত্মার মেশিন পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনি কেন এত উদাসীন? অথচ হৃদয়-আত্মা এবং মানবদেহের নিগূঢ় রহস্যাবলি আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। যার সবকিছু পরিপূর্ণভাবে এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। যেখানে রহস্যের কোনো শেষ নেই। হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, গর্ভস্থ ভ্রূণের ক্রমবিকাশ ও পরিচর্যার পদ্ধতি ইত্যাদি যা কিছু আবিষ্কার হয়েছে, তাতেই চিন্তাশীল গবেষকরা হতভম্ব হয়েছেন।
আপনার দেহে অবস্থিত আত্মার সাথে দুনিয়াবি মেশিনের কোনো তুলনাই চলে না। চিন্তা-চেতনা, উপলব্ধি, প্রেরণা, প্রত্যাশা, কামনা ইত্যাদির সমাবেশ হলো মানবাত্মা। এই আত্মা এবং তার ধারক মানবদেহ পৃথিবীর অন্য যেকোনো কিছুর তুলনায় অত্যন্ত জটিল। এর জন্য কি একটি নির্দেশিকার প্রয়োজন নেই? মেশিনের অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা ও আবিষ্কারক ছাড়া আর কেউ জানে না। তেমনিভাবে মানবদেহ আর মানবাত্মার পরিচালনা পদ্ধতিও আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানেন না।
তাই দেহ-আত্মার এই অমূল্য মেশিনকে পরিচালনা করার জন্য গাইডবুক তাঁর কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হবে, যিনি এটার অভিনব স্রষ্টা, সম্যক দ্রষ্টা। জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর কাছ থেকেই দীপ্তি গ্রহণ করতে হবে, যিনি এ জীবনের অস্তিত্ব দানকারী এবং মহাবিজ্ঞ অভিভাবক। আল-খাবির বলেন-
وَأَسِرُّوا قَوْلَكُمْ أَوِ اجْهَرُوا بِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الخَبِيرُ
তোমরা তোমাদের কথা গোপনেই বলো অথবা প্রকাশ্যে বলো, তিনি তো অন্তর্যামী। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি (সৃষ্টি সম্বন্ধে) জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত [১]
ইমাম গাযালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এই পৃথিবীতে আপনার সবচেয়ে কাছের জিনিস হলো নিজ দেহ ও আত্মা।' তাই আত্মার জগতে কীসের আনাগোনা বা লুকোচুরি চলছে—সে বিষয়ে আপনাকে থাকতে হবে সদা জাগ্রত। আপনি আবিষ্কার করুন, আপনার মনে যেসব জল্পনা-কল্পনা, কামনা-বাসনা জেগে উঠছে, তার উৎস কোথায়? আপনার হৃদয় না প্রবৃত্তি? নাকি শয়তানের ফাঁদ? আপনি বোঝার চেষ্টা করুন, দেহসত্তার ভেতরের এসব কল্পনা-অনুভূতি কি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ঐশীপ্রেরণা নাকি শয়তানের কুমন্ত্রণা? আপনি যে আমলটি করছেন, তাতে কি আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করছেন না লৌকিকতার ফাঁদে আটকা পড়ে যাচ্ছেন?
প্রত্যেক বান্দার জন্য নিজের ঈমান, আমল ও মনোজগৎ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। হৃদয়ের সকল প্রবণতা, চারিত্রিক শিষ্টতা এবং আত্মার পরিশুদ্ধির ব্যাপারে সজাগ থাকা আবশ্যক।
কোনো জটিল ব্যাপার সমাধানের প্রধান ও পূর্বশর্তই হলো, সেটাকে জটিল হিসেবে জানতে পারা। এরপর তার সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা। আপনি যদি গুনাহ বর্জন করতে চান, তাহলে প্রথমেই আপনাকে জানতে হবে গুনাহ কী? তাই আত্মার পরিশুদ্ধির পথে সর্বপ্রথম অপরিহার্য দায়িত্ব হলো-আত্মা, প্রবৃত্তির চাহিদা-কামনার ব্যাপারে পূর্ণ অবগতি লাভ করা। আর ধূর্ত নফসের প্রবঞ্চনার শিকার না হওয়া।
আপনি যখন জেনে ফেলবেন অন্তর্জগতের গোপন ফাঁদ, যখন বুঝতে পারবেন হৃদয়ের সবুজ বাগানে ফেরেশতার পরিচর্যা বা শয়তানের আনাগোনা, যখন বুঝতে সক্ষম হবেন ইখলাসপূর্ণ ইবাদত ও লোকদেখানো ইবাদতের পার্থক্য, আখিরাতের নেশায় মত্ততার স্বাদ এবং দুনিয়ার খড়কুটোর পেছনে মোহগ্রস্ত হওয়ার পরিণাম—তখন সৃষ্টিজগতের মধ্যে আপনিই হবেন সবচেয়ে বড় বিচক্ষণ; মহাবিজ্ঞ আল-খাবির রবের সাথে হবে আপনার হৃদয়ের বন্ধুত্ব। মানুষের মাঝেই হয়তো আপনার বসবাস; কিন্তু আপনি অলংকৃত করবেন ফেরেশতাদের বরকতময় সমাবেশ।
তাই সম্যক অবগত, সর্বদ্রষ্টা, মহাবিজ্ঞ মালিক আল-খাবিরের সামনে নিজেকে সর্বদা উপস্থিত মনে করুন; যার কাছে আপনার কোনো কিছুই গোপন থাকতে পারে না।
সতর্ক হোন, আপনার সবচেয়ে কাছের দেহ ও আত্মার ব্যাপারে। আবিষ্কার করুন হৃদয়রাজ্যের কুমন্ত্রণা এবং ঐশীপ্রেরণার মাঝে বিভাজন-রেখা। মহাবিজ্ঞ রবের প্রজ্ঞাময় ব্যবস্থাপনায় হোন তৃপ্ত, প্রফুল্ল। দেখবেন, আপনার হৃদয়-আত্মা আল-খাবিরের প্রতি ঈমানে টইটম্বুর। জান্নাতি ঝরনার আর্দ্রতামাখা সমীরণ শীতল করে দেবে আপনার জীবন।
টিকাঃ
[১] সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৩
[১] সুরা মুমিন, আয়াত: ১৯
[১] সুরা নূর, আয়াত : ৩০
[১] সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৩
[১] সুরা কাহফ, আয়াত: ২৮
[১] সুরা মূলক, আয়াত : ১৩-১৪
📄 আর-রাকিব : মহাপর্যবেক্ষণকারী, নিরীক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক
রাতের বেলা ময়লা ফেলতে বেরিয়েছেন আপনি। ডাস্টবিনটা বেশ দূরে। অতদূর না গিয়ে ময়লা ফেললেন ঠিক প্রতিবেশীর বাড়ির দোরগোড়ায়। এদিকটা বেশ অন্ধকার। কে কী করছে বোঝার উপায় নেই। ভাবছেন, কেউ জানবে না, কে করল কাজটা। অথচ একজন ঠিকই দেখেছেন, আপনার এই হীন কর্ম। তিনি আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী আল্লাহ।
আপনি যদি জানতে পারেন সর্বদা আপনাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে; আপনার উপরস্থ কেউ সবসময় আপনাকে চোখে চোখে রাখছে, তখন আপনি কী করবেন? নিশ্চয় খুব সতর্ক হয়ে যাবেন। সুস্থ বিবেকসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার একজন স্রষ্টা রয়েছে। একজন বিশ্বাসী মুমিন হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার স্রষ্টা মহান আল্লাহ; যিনি মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী। অতএব, নিশ্চিত বিশ্বাস করুন, আপনি ২৪ ঘণ্টা রয়েছেন আপনার স্রষ্টার পর্যবেক্ষণের অধীনে। আপনার মতোই একজন মানুষের উপস্থিতি, পর্যবেক্ষণ টের পেয়ে আপনি চমকে ওঠেন, পরিণামের ভয়ে আঁতকে ওঠেন, নিয়ন্ত্রিত হয়ে যান; তাহলে মহান পর্যবেক্ষকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আওতায় আপনি কীভাবে লাগামহীন হয়ে পড়েন? আপনার রব বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا )
হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকেও সৃষ্টি করেছেন; যিনি তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন (রাকিব)।
মহামহিমাময় আর-রাকিবের সান্নিধ্যে
একবার আমি এক দোকানে ঢুকে আমার প্রয়োজনীয় একটি বস্তু চাইলাম। কিন্তু দোকানদার সেটা দিতে পারল না। আমি বেরিয়ে যাব, এমন সময় দোকানি বলল, একটু কষ্ট করে যদি গুদামে যেতেন, সেখানে পাওয়া যেতে পারে। দোকান ছিল নিচতলায় আর গুদাম চতুর্থ তলায়। গিয়ে দেখলাম সেখানে একজন হিসাবরক্ষক ও ব্যবস্থাপক টেবিলের সামনে বসে আছে। আর দুটি সিসি ক্যামেরা তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার বুঝতে দেরি হলো না, নিচতলায় মালিক তাকে মনিটরে পর্যবেক্ষণ করছে।
তো এই হিসাবরক্ষক তার দিকে তাকিয়ে থাকা ক্যামেরার কারণে একটু নড়াচড়াও করতে পারছে না। মালিকের পর্যবেক্ষণের কারণে কাজের সময়ে তার একটু খাওয়াদাওয়া অথবা অন্য কোনো প্রয়োজনে উঠে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আরেকবার এক ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখলাম সবগুলো রুম স্বচ্ছ কাচ দিয়ে তৈরি করা। যেন জিএম সকলকে নজরদারির আওতায় রাখতে পারে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের নজরদারি আর পর্যবেক্ষণের ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত যেন অনৈতিক কাজ করার শক্তিই সে হারিয়ে ফেলেছে।
আবার ধরুন ট্রাফিক আইনের কথা। কোনো কোনো দেশে ট্রাফিক আইন খুবই কড়া। কেউ সর্বোচ্চ গতিসীমা অতিক্রম করলেই সাথে সাথে তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারিতে তা বাস্তবায়নও করা হয়। এই নজরদারির কারণে কোনো ড্রাইভারের সর্বোচ্চ গতিসীমা লঙ্ঘন করার কোনো সুযোগ নেই।
সামান্য মানুষের পর্যবেক্ষণে কত তটস্থ থাকেন আপনি! অথচ আপনার ওপর রয়েছে মহাশক্তিধরের পর্যবেক্ষণ; যিনি নজর রাখেন আপনার ওপর, উপরস্থ কর্মকর্তার ওপর, সবার ওপর, তিনি আপনার রব, আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী।
আর-রাকিব শব্দটি অভিধানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়—
এক. আর-রাকিব অর্থ অপেক্ষমাণ। আল্লাহ বলেছেন-
وَارْتَقِبُوا إِنِّي مَعَكُمْ رَقِيبٌ
সুতরাং তোমরা অপেক্ষা করো, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ [১]
এখানে 'অপেক্ষমাণ' বলতে গতিবিধি পর্যবেক্ষণকে বোঝানো হয়েছে। যেমন : আল্লাহ বলেন-
إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ
নিশ্চয় আপনার প্রতিপালক (বান্দাদের) গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন।[২]
দুই. আর-রাকিব অর্থ সংরক্ষক।
বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
ارْقُبُوا مُحَمَّدًا فِي أَهْلِ بَيْتِهِ
তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা সংরক্ষণ করো তার পরিবারবর্গের মাধ্যমে [৩]
অর্থাৎ তার পরিবারের প্রতি সদাচরণ কর। তাদের হক আদায়ে যত্নবান হও।
তিন. আর-রাকিবের আরেক অর্থ প্রহরী, অগ্রবর্তী সৈনিক, আদর্শ প্রতিনিধি; পিতার যোগ্য বংশধর।
যে ফেরেশতা আমলনামা সংরক্ষণ করেন তাকেও বলা হয় 'রাকিব' তথা প্রহরী বা প্রতিনিধি।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য নিযুক্ত রয়েছে তৎপর প্রহরী [১]
আল্লাহর সাথে যখন ব্যবহৃত হয় আর-রাকিব, তখন তার অর্থ হয় মহাপর্যবেক্ষক। যিনি সবকিছু জানেন; সবকিছু দেখেন। রাত্রে ঘুমানোর সময় আপনি কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। মনে মনে ঠিক করলেন, আগামীকাল অমুক কাজটি করবেন। আপনার এই কল্পনা আপনি ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঠিকই সব জানেন। কুরআনে বর্ণিত-
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, আমি তা জানি। আমি তো তার গ্রীবাস্থিত ধমনির চেয়েও নিকটবর্তী [২]
আপনার নীরবতা এবং উচ্চৈঃস্বর তার কাছে সমান। জনসম্মুখে আপনার ঘোষণা এবং নিঃশব্দ উচ্চারণ তার কাছে একই। মুখ ফুটে বের হওয়া আর অন্তরে লুকিয়ে রাখা সবই তার কাছে সমান। কারণ তিনি আর-রাকিব, পর্যবেক্ষণকারী।
আল্লাহর এই নামটি আপনার সবচেয়ে কাছের নাম। আপনি যখনই বিশ্বাস করে ফেলবেন, আল্লাহ আপনার সবকিছু দেখছেন, তখন নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর হুকুম আঁকড়ে ধরবেন। আর আল্লাহর হুকুম যদি আপনি আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হন, নিশ্চিত আপনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে মুক্তি পেয়ে যাবেন। আল্লাহ বলেন-
مَّا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا
যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং ঈমান আনয়ন করো, তাহলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহর কী লাভ? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞ [১]
আল্লাহর এই নামটি এবং এই নামের প্রতি ঈমান আপনার সৌভাগ্যের সিঁড়ি। এই একটি নামই একজন মুমিনের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে যথেষ্ট। মুমিন যখন এই নামের ওপর ঈমান আনে, তখন সে আল্লাহর হুকুমের সামনে নত হয়; আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।
আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আর-রাকিব আপনাকে দেখছেন।
আপনি ঘরে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি হাসপাতালে রোগী দেখছেন, রোগীকে সেবা দিচ্ছেন, আপনি কিন্তু রয়েছেন তাঁর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে।
আপনি যদি একজন আইনজীবী হয়ে থাকেন, নিজের আত্মার হিসাব নিন। আপনি মক্কেলের কাছ থেকে যে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক নিয়েছেন, তার হক আদায় করেছেন তো? সংশ্লিষ্ট আইনের সকল ধারা, উপধারা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গভীরভাবে পড়াশোনা করেই মামলায় হাত দিয়েছেন তো? নাকি কোনো রকম চোখ বুলিয়েই হাজির হয়েছেন কোর্ট-চত্বরে?
আপনি একজন ডাক্তার। রোগীর কাছ থেকে ফি নিয়েছেন আপনার চাহিদামতো। কিন্তু তার হক আদায় করছেন কতটুকু? এটা কি শুধু আপনার অর্থ উপার্জনের বাণিজ্য নাকি আপনি সেবার মানসিকতাও লালন করেন? আপনি রোগীর অস্থিরতা, সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করছেন তো? নাকি তাকে উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দিচ্ছেন? ভুলে যাবেন না, আপনার প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে! আপনি রয়েছেন সরাসরি আপনার মালিকের পর্যবেক্ষণ সীমানায়!
যাদের অস্থি-মজ্জা এবং অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুতে আর-রাকিবের উপস্থিতি, তারা কখনো বেখেয়াল হয় না। তারা সর্বদা সৌহার্দপূর্ণ, কোমল আচরণ করে। নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিতেই বেশি ভালোবাসে। আপনার সামনে ফলমূলের একটি বড় থালা রাখা হলো, আর-রাকিবের প্রতি ঈমানের দাবি হলো, আপনি আরেক ভাইকে অগ্রাধিকার দেবেন। তার দিকেই সুমিষ্ট ফলটি এগিয়ে দেবেন। আনারের বড় টসটসে দানাগুলো তার দিকে বাড়িয়ে দেবেন। কারণ, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। তিনি আপনার কাজ এবং অন্তরের ইচ্ছাও লক্ষ করছেন।
কুরআনে বর্ণিত-
ع إِنَّ اللَّهَ عَالِمُ غَيْبِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ )
নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল অদৃশ্য বিষয়ে অবগত আছেন। অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে তিনি সবিশেষ অবহিত।[১]
আল্লাহ আপনার অনন্য সঙ্গী
আপনার বন্ধুকে আপনি প্রচণ্ড ভালোবাসেন, তার সাথে চলাফেরা, ওঠাবসা করতে পছন্দ করেন। কিন্তু আপনার যত কাছের বন্ধুই হোক না কেন, তার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি আপনি সহ্য করতে পারবেন না। আপনি তার সাথে চলতে চলতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়বেন। খুব কাছের বন্ধুর উপস্থিতিও কখনো কখনো অসহ্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু আল্লাহ আপনার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আপনি কখনো আল্লাহর উপস্থিতিতে বিরক্ত হয়েছেন? কারণ আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঙ্গ দান করেন অতি সূক্ষ্ম ও সুকোমলভাবে। তাই আপনি টের পান না তাঁর উপস্থিতি। অথচ তিনি রয়েছেন আপনার সাথে, সবখানে; ঘরে-বাইরে, দেশে-বিদেশে, নির্জনে-প্রকাশ্যে সর্বদা তিনি রয়েছেন আপনার সঙ্গী হয়ে।
তাই আপনিও সদা-সর্বদা আল্লাহকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে নিন। ভেবে নিন আল্লাহ আপনার সামনেই রয়েছেন। হাদিসে এটাকে বলা হয়েছে 'ইহসান'। আপনি উন্নীত হোন ইহসানের উচ্চতায়।
কোনো শ্রদ্ধেয় বড় ব্যক্তিত্বের সাথে সাক্ষাতের সময় আপনি সাধারণত নিজেকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পোশাক-পরিচ্ছদ, আদবকেতা ঠিক আছে কি না সেদিকে খুব গুরুত্ব প্রদান করেন। এরপর তার সাথে সাক্ষাতের সময় ভদ্রতার সাথে শ্রদ্ধাজড়িত কণ্ঠে শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানিয়ে থাকেন। কিন্তু আল্লাহর মতো মহান ও পবিত্র সত্তা সর্বদা আপনার সাথে রয়েছেন, তাঁর প্রতি আপনি কি এতটুকুও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন? একান্ত তাঁর জন্য আদব ঠিক রাখেন?
অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি আল্লাহর ভয়ে তটস্থ থাকবে তার জীবন ও জীবনধারা তত বেশি সুন্দর ও কেতাদুরস্ত হবে। কারণ, আল্লাহ সর্বদাই আপনার সাথে রয়েছেন; সর্বদা তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এক বেদুইন ব্যক্তি নবিজির কাছে এসে আবেদন করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি সুরা শিক্ষা দিন যা সবদিক থেকে পরিপূর্ণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে 'সুরা যিলযাল' পড়িয়ে দিলেন। যার শেষটা ছিল-
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًا يَرَهُ
কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে তা-ও সে দেখতে পাবে।[১]
অতঃপর বেদুইন লোকটি বলল, ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য-সহ পাঠিয়েছেন—এর বেশি আমার আর প্রয়োজন নেই। এরপর লোকটি চলে গেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লোকটি সফলকাম হয়েছে, লোকটি কামিয়াব হয়েছে।[১]
আপনি চিন্তা করে দেখুন লোকটি সম্পর্কে আল্লাহর নবি এই মন্তব্য কেন করলেন? কারণ আপনি যদি জানতে পারেন আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ এবং অণু-পরিমাণ কর্মও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তখন আপনি কি পারবেন কারো সাথে প্রতারণা করতে? কারো সাথে মিথ্যা বলতে? পারবেন কারো ক্ষতি করতে? কিংবা কোনো অনৈতিক কাজ করতে? একজন মানুষের নজরদারিতে থেকেই যেখানে আপনি সজাগ হয়ে যান, অতি সন্তর্পণে সবকিছু সামাল দেবার চেষ্টা করেন, সেখানে মহান স্রষ্টার সামনে কীভাবে আপনি লাগামহীন হবেন?
এই একটি নাম এবং তার অন্তর্নিহিত আবেদন ও বার্তা আপনাকে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য করবে। প্রবৃত্তির লিপ্সা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি জোগাবে। আর যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখে ফেলল, সে দ্বীনের শক্ত বুনিয়াদের ওপর ঈমানি জীবনের দালান দাঁড় করিয়ে ফেলল। তাই আল্লাহর এই পরম সুন্দর নাম 'আর-রাকিব'-এর তন্ময়তায় মগ্ন থাকা হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা; আজীবনের উত্তম নসিহত।
লুকোনোর কোনো জায়গা নেই
ইমাম রাযি রাহিমাহুল্লাহ একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। জনৈক শাইখ তার এক ছোট্ট ছাত্রকে খুব বেশি স্নেহ করতেন। এতে অন্য ছাত্ররা কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়। শাইখ একদিন ভাবলেন, তাদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সবাইকে একত্র করে প্রত্যেকের হাতে একটি করে পাখি দিলেন এবং বললেন, তোমরা নিজেদের পাখিটি এমন জায়গায় নিয়ে জবাই করবে, যেখানে কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না।
প্রত্যেকেই একেক দিকে চলে গেল; যেন কেউ কাউকে দেখতে না পায়। ছাত্ররা সবাই নিজের মতো করে লুকিয়ে লুকিয়ে যার যার পাখি জবাই করে নিয়ে এলো। কিন্তু সেই ছোট্ট ছাত্রটি ফিরে এলো পাখিটি জবাই না করেই।
বিনীত সুরে উস্তাযকে বলল, শাইখ! আপনি বলেছেন, এমন স্থানে গিয়ে পাখিটি জবাই করতে, যেখান কেউ দেখবে না। কিন্তু আমি এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাইনি যেখানে আল্লাহ আমাকে দেখতে পাবেন না!
শাইখ মুচকি হেসে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার বুঝলে তো! এ কারণেই আমি ওকে একটু বেশিই স্নেহ করি।
তাই আপনি যেখানেই লুকিয়ে থাকুন না কেন, যেখানেই আত্মগোপন করুন না কেন, আল্লাহর শক্তিশালী দৃষ্টি থেকে দূরে কোথাও যেতে পারবেন না।[১]
আল্লাহ তাআলা আপনার দিকে সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রেখে এই কথাটিই শিক্ষা দিতে চান যে, হে বান্দা! তুমি কি আমার ব্যাপারে লজ্জা করো না? তুমি একদিন আমার সামনে উপস্থিত হবে, সেদিনটিকে তুমি কি ভয় করো না? তোমার ফিরে আসার সময় কি এখনো হয়নি?
আপনি সালাতে দাঁড়ানোর সময় কল্পনা করুন, আল্লাহ আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। সালাতে দাঁড়ানোর পূর্বেই পাক-পবিত্র ও উত্তম পোশাক পরে নিন। সামান্য কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আপনি আপনার উন্নত মানের পোশাক পরে বের হন। অথচ সালাত আদায়ের সময় যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ান, তখন আপনি পরেন নিম্নমানের পোশাক। কেন আপনার এই দ্বৈত নীতি? আপনি কি আল্লাহর সামনে উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না? আপনি কি বিশ্বাস করেন না, সালাতে দাঁড়ানো মানে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সামনেই দাঁড়ানো? সালাফগণ সালাতের পূর্বে চুল-দাড়ি আঁচড়িয়ে পরিপাটি হয়ে নিতেন। কারণ তারা উপস্থিত হতে যাচ্ছেন মহান রবের সামনে। মহামহিম আল্লাহ বলেন-
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ )
হে আদম সন্তান, তোমরা সালাতের সময় সৌন্দর্য গ্রহণ করো। তোমরা পানাহার করো কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।[২]
এই আলোচনা দ্বারা আমি আপনার সমালোচনা করছি না। আমি শুধু আপনার ঘুমন্ত চেতনাকে একটু জাগিয়ে তুলতে চাচ্ছি। আপনি দুনিয়াবি কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় যদি সুন্দর ও পরিপাটি পোশাক পরতে পারেন, তবে আল্লাহর সামনে কেন পারবেন না? মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর। জুমআর দিন মুমিনের ঈদ; আনন্দোৎসব। আর আপনি হলেন সেই উৎসবের দিনে আল্লাহর ঘরের মেহমান। আপনিই বলুন, এমন বরকতপূর্ণ মাহফিলে নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও নিম্নমানের পোশাক পরে যাওয়া কি সমীচীন?
তাই নবিজির সুন্নাহ হলো, জুমআর দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে, উত্তম পোশাক পরিধান করে মসজিদে গমন করা।
রাখাল-বালকের আল্লাহভীরুতা
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার সাথি-সঙ্গীদের নিয়ে মদিনার অদূরে কোথাও যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দুপুর বেলা এক স্থানে যাত্রাবিরতি নিলেন বিশ্রামের জন্য। সবাই মিলে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য দস্তরখান বিছিয়েছেন। ঠিক সে সময় দেখা গেল, একপাল বকরী-সহ এক রাখাল যাচ্ছে।
ইবনু উমারের ইচ্ছে হলো, তিনি রাখালের আল্লাহভীরুতা পরীক্ষা করে দেখবেন। তাই রাখালকে ডেকে বললেন, এসো আমাদের সাথে খাবারে শরিক হও।
রাখাল উত্তর দিলো, আমি খেতে পারব না এখন। আমি আজ সিয়াম রেখেছি।
ইবনু উমার বললেন, তুমি একটা বকরী আমাদের কাছে বিক্রি করে দিতে পারো। আমরা তোমার বকরীর উপযুক্ত দাম দিয়ে দেবো। তা দিয়ে তুমি ইফতার কিনে খেতে পারবে।
রাখাল বলল, এই বকরী তো আমার নয়, আমার মালিকের।
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি তোমার মালিককে গিয়ে বলবে, পালের একটা বকরীকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে!
রাখাল তখন আসমানের দিকে আঙুল তুলে বলল, আমি না-হয় মিথ্যা বলে মালিকের চোখে ফাঁকি দেবো। কিন্তু আমার মালিকের যিনি মালিক (আরশের অধিপতি), তাকে আমি কীভাবে ফাঁকি দেবো? মাফ করবেন, এ কাজ আমাকে দিয়ে সম্ভব নয়!
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রাখালের তাকওয়া দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন।। এই রাখাল কতটুকুই বা শিক্ষিত ছিল? বাহ্যিকভাবে তার শিক্ষাদীক্ষা ছিল শূন্যের কোঠায়। কিন্তু সে দ্বীনের মূল আকিদা-বিশ্বাসের গোড়ায় পৌঁছুতে পেরেছে। আপনার বাড়িতে বিশাল বড় লাইব্রেরি রয়েছে। আলমারিগুলো বইপত্রে বোঝাই। আপনার লাইব্রেরি দেখে সকলেই আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় গদগদ হয়ে যায়। কিন্তু আপনি আল্লাহকে ভয় করেন না, আপনি যে আল্লাহর পর্যবেক্ষণের সীমানায় রয়েছেন তা ভুলে যাচ্ছেন। হারাম অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকছেন না, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখুন, আল্লাহর কাছে আপনার এই জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই। পক্ষান্তরে এই অশিক্ষিত রাখাল আল্লাহর কাছে আপনার চেয়ে অনেক বেশি প্রিয়; অনেক বেশি মর্যাদাবান। আজ এই রাখালের মতো ইস্পাতদৃঢ় ঈমান খুব প্রয়োজন আমাদের। আর-রাকিবের প্রতি এমন অগাধ আস্থা ভীষণ দরকার।
এমন দম্পতির দেখা মেলা ভার যারা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল; এমন সন্তানসন্ততি ও পরিবার-পরিজন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যারা সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির গুণে গুণান্বিত। আজ সততা, বিশ্বস্ততার বড়ই অভাব। চারদিকে শুধু বিশ্বাসভঙ্গের জয়জয়কার, খিয়ানত ও মিথ্যা অভিনয়ের দৌরাত্ম্য। আপনি দেখবেন কত দাঈ রয়েছে, দিনের বেলায় তারা মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করছে; সবাইকে ভালো ভালো উপদেশ দিচ্ছে-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ ...
হে মানব-সকল, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো।[১]
কিন্তু সেই তারাই আবার রাতের বেলায় পাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যে কারণে মানুষ তাদের কথা গ্রহণ করছে না।
তাই সততা ও আত্মার শুদ্ধতা হলো সবচেয়ে বড় জিনিস। অন্তর থেকেই যদি দ্বীনি চেতনা আপনাকে পথ দেখাতে না পারে, তাহলে তা নিছক অভিনয় ও শঠতা বৈ কিছু নয়।
আপনি নিজেই নিজের হিসাব কষে দেখুন। আপনি কি আমানতদারিতা রক্ষা করে চলেন? কারো সাথে আপনার লেনদেন হলো, তার নথিপত্র, সাক্ষী সব উপস্থিত। তাই সময়মতো আপনি অপরপক্ষের পাওনা বুঝিয়ে দিলেন। আপনি কি ভেবে নিয়েছেন, এটা আমানতদারিতা? শুধু এতটুকু কাজ আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ যেখানে দলিল-পত্র বা সাক্ষী বিদ্যমান সেখানে আপনি পাওনা বুঝিয়ে দিতে বাধ্য। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ না করলে তারা আপনার নামে আদালতে মামলা ঠুকে দেবে। আর আদালত আপনার কাছ থেকে তা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে ছাড়বে।
আল্লাহর কাছে প্রকৃত আমানতদার তো সেই ব্যক্তি, যে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই পাওনাদারের পাওনা বুঝিয়ে দেয়। দুনিয়ার কেউ জানবে না, পাওনাদার নিজেও হয়তো জানতে পারবে না, কিন্তু শুধু আল্লাহর ভয়েই তার পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার নাম আমানতদারিতা। আমি একবার সালাতের পর মসজিদে বসে আছি। এমন সময় একটি চিঠি এলো আমার নামে। খুলে দেখলাম চিঠিতে লেখা, শাইখ! আমাদের এখানে এক লোক মারা গেছেন। আমি তার কাছ থেকে ২০ হাজার পাউন্ড ধার করেছিলাম। কিন্তু এটা তার পরিবারের কেউ জানত না। তবু আমি পুরোটাই পরিশোধ করে দিয়েছি।
এটাই হলো আমানতদারিতা। কেউ জানে না; তারপরও কেবল আল্লাহর ভয়ে সে হকদারের হক আদায় করেছে। কারণ আল্লাহ মহান পর্যবেক্ষক, আর-রাকিব। অনেক মানুষই এভাবে অন্যের কাছে তাদের সম্পদ রেখে মারা যায়, স্ত্রী বা সন্তানেরা কেউ জানতে পারে না। ফলে মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদও মৃত্যুবরণ করে। সন্তানেরা বলে, আমরা আমাদের বাবার অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে কিছুই জানি না।
কিন্তু যারা বিশ্বাস করে আসমানি এই সতর্ক বার্তায়- 'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সবকিছুর পর্যবেক্ষক'-তারা কখনো মৃতের হক লুকোতে পারে না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের কাছে গিয়ে সম্পদ বুঝিয়ে দেয়।
একজন ঈমানদার ব্যবসায়ী কি কখনো তার পণ্যে ভেজাল মেশাতে পারে? পণ্যের কোনো দোষ থাকলে তা ক্রেতার কাছে গোপন করতে পারে?
মনে করুন, আপনি একজন তেল-বিক্রেতা। আপনার তেলের পাত্রে যদি একটি ইঁদুর মরে পড়ে থাকে, তবে আপনি কি ঐ তেল আল্লাহর বান্দাদের খাওয়াতে পারবেন? মহান রবের ওপর যদি আপনার ঈমান থেকে থাকে, তাহলে কীভাবে আপনি এই দোষ গোপন করে তা মানুষের কাছে বিক্রি করবেন?
মানুষের খাদ্যজাত গরু-ছাগলকে মোটাতাজাকরণে ব্যবহার করা হয় স্টেরয়েড হরমোন ও ইউরিয়ার মতো কিছু বিষাক্ত উপাদান। এরপর তা চড়া দামে বিক্রি করা হয় ভোক্তা আর ক্রেতাদের কাছে। আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সামান্য ভয়টুকু যাদের মধ্যে আছে, তারা কখনো মানুষ কিংবা পশুপাখির খাবারে এসব মেশাতে পারবে না!
দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই আমরা মুখোমুখি হই কত ধরনের খিয়ানত, ছলচাতুরি ও বিশ্বাসঘাতকতার। খাবারে ভেজালের সংমিশ্রণ, পণ্যমূল্য বাড়িয়ে বলার প্রতারণা, শঠতা ও লেনদেনে অস্বচ্ছতা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর জীবন থেকে মুক্তি পেতে গেলে অবশ্যই সকলকে আর-রাকিব নামটির মর্ম উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আল্লাহকে যে আর-রাকিব হিসেবে বিশ্বাস করে, তার জন্য আর কোনো পরিদর্শক বা নিয়ন্ত্রকের প্রয়োজন হয় না। কারণ আর-রাকিবের প্রতি বিশ্বাসই তাকে কর্মস্থলে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন করতে বাধ্য করে।
আমার পরিচিত এক ভাই ছিল, সে প্রতিদিন দুই-এক ঘণ্টা দেরি করে অফিসে যেত; আবার কাজের মাঝখানেও কিছু সময় বিশ্রাম নিত। মাস শেষে সে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বরাবর ছুটি চেয়ে দরখাস্ত করল। দরখাস্ত মঞ্জুরও হয়ে গেল। কিন্তু সে পরদিন থেকে অফিস করতে লাগল ছুটি না কাটিয়ে। ম্যানেজিং ডিরেক্টর জানতে চাইল, কী ব্যাপার? তুমি ছুটি নিয়ে আবার অফিসে এলে কেন?
সে উত্তর দিলো, স্যার! আমি প্রতিদিন অফিসে কিছুটা দেরি করে আসতাম। আমি আমার দেরি হওয়া সময়গুলো হিসাব করে দেখলাম, এক মাসে আমি যতটুকু দেরি করেছি তা তিনদিনের সমান।
অফিসের এমডি চোখের সামনে এই অনুপম আদর্শ এবং বিরল সততা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কারণ, যে সমাজে সে বাস করে, সে সমাজে সৎ মানুষ পাওয়া নিতান্তই দুষ্কর।
ঐ ভাইটি পরে আমাকে বলেছে, শাইখ! আমি যখন আপনার পরবর্তী দারসে হাজির হলাম, তখন দেখি আমাদের এমডি স্যারও দারসে এসেছেন!
আলহামদুলিল্লাহ। এটাও একটা খুশির সংবাদ। তার সততার নমুনা দেখে আরেক ভাই সত্যের সন্ধান পেয়েছে।
এজন্যই আমি ভাইদের খুব গুরুত্ব সহকারে একটি কথা বলে থাকি, আপনারা আল্লাহর নাম 'আর-রাকিব'-এর অর্থ অনুযায়ী নিজ জীবন পরিচালনা করুন। দেখবেন আপনার চলাফেরা, ওঠা-বসা, কথা-বার্তা সবকিছুই হয়ে যাবে নীরব এক দাওয়াত।
সরকারি হাসপাতালের অনেক ডাক্তার ভাইদের সাথে আমার পরিচয় আছে। হাসপাতালে তারা ফ্রি চিকিৎসা করেন। হার্ট, ব্রেইন ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অস্ত্রোপচার-সহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের দায়িত্ববোধ দেখুন। একজন রোগী দুই হাজার টাকা ভিজিট দিয়ে চিকিৎসা করায়, আরেকজন মানুষ ফ্রিতে চিকিৎসা নিতে আসে; অথচ তারা এই দুজনের চিকিৎসায় কোনো পার্থক্য করেন না। ফ্রি হওয়ার কারণে একজন অভাবী মানুষকে পর্যাপ্ত সেবাটুকু দিতে কখনো কার্পণ্য করেন না।
এক আল্লাহভীরু আলিমকে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে আমরা রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় নজরের হিফাজত করতে পারি?
আলিম উত্তর দিলেন, মনে রাখবে তোমার দৃষ্টি খিয়ানত করার আগেই আল্লাহ তোমাকে দেখে ফেলেছেন, তাঁর দৃষ্টি তোমাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তার সামনে গিয়েই তোমাকে দাঁড়াতে হবে; দৃষ্টির সামান্য খিয়ানতেরও হিসাব দিতে হবে!
আপনার মনে হতে পারে বর্তমান সময়ে কীভাবে দৃষ্টি হিফাজত করা সম্ভব? নারীরা সৌন্দর্য প্রদর্শন করে রাস্তায় চলাফেরা করে! অফিসে, মার্কেটে, শপিংয়ে সবখানেই তাদের অবাধ বিচরণ!
আপনার সান্ত্বনার জন্য বলছি, এই যুগেও আপনার মতো অনেক টগবগে যুবক রয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানের সামনে মাথা নত করে। মহামহিম আর-রাকিবকে ভালোবেসে তারা হারাম দৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে। লিফটে উঠতে গিয়ে যদি দেখে ভেতরে কেবল একজন মেয়ে, তখন তৃতীয় কোনো ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকে কিংবা লিফট ছেড়ে সিঁড়ি বেয়েই ওপরে উঠতে শুরু করে। লিফটে অল্প সময়ের জন্যও গায়রে মাহরামের সাথে নির্জনে থাকা তারা অপছন্দ করে। আপনার মতো একজন যুবক হয়ে সে যদি এভাবে আত্মসংযমের পথ বেছে নিতে পারে, তবে আপনি কেন পারবেন না? আল্লাহর এই আয়াতকে অন্তরে খোদাই করে নিন—
أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى *
সে কি বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তাকে দেখছেন? [১]
আল্লাহর নামের প্রতি বান্দার আদব
নিজের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, অনুভূতি-উপলব্ধি এবং প্রতিটি পদক্ষেপের মুহূর্তে মন-মস্তিষ্কে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির চেতনা লালন প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। তাই সব কাজে আল্লাহকে স্মরণ রাখুন।
ইবনু আতাউল্লাহ ইস্কান্দারি বলেন, 'সর্বোত্তম ইবাদত হলো সদা সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা।'
বিখ্যাত মনীষী আবু হাফস আমর ইবনু সালামা নিসাপুরি[২] বলেন, 'যখন তুমি মানুষের সামনে বসবে, তখন নিজ হৃদয়-আত্মার জন্য উপদেশদাতা হয়ে যাবে। তোমার সামনে লোকজনের ভিড় যেন তোমাকে প্রতারিত না করে; তারা দেখে তোমার বাহ্যিক অবস্থা; কিন্তু আল্লাহ পর্যবেক্ষণ করেন তোমার আত্মিক ও অভ্যন্তরের অবস্থা।'
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ এক লোককে বললেন, 'সর্বদা আল্লাহর ‘ধ্যানে মগ্ন থাকো!’
লোকটি বলল, ‘সেটা কীভাবে করব?’
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ উত্তর দিলেন, ‘সর্বদা এমনভাবে থাকো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ!’
চমৎকার এই দুআটি স্মৃতির কোটরে রেখে দিন-
اَللَّهُمَّ اجْعَلْنَا نَخْشَاكَ كأَنَّنَا نَرَاكَ
হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়ে আপনার ভয় দান করুন। আমাদেরকে এমন মগ্নতা দান করুন, যেন অনুভবে মনে হয়, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি!
আল্লাহর মুরাকাবা বা আল্লাহর ধ্যানে মগ্নতা একটি বিশাল মর্যাদার স্তর; যে ব্যক্তি এ স্তরে উন্নীত হতে পারল, সে তো জান্নাতে পৌঁছে গেল। দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত সুখ-সাফল্য ধরা দিলো তার দোরগোড়ায়। তাই আল্লাহর আদেশের ওপর অটল-অবিচল থাকুন। মগ্ন থাকুন তাঁর ধ্যানে। আপনি ভুলে গেলেও তিনি আপনাকে ভুলবেন না। তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি থেকে কোথায় পালাবেন আপনি?
টিকাঃ
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ১
[১] সুরা হ্রদ, আয়াত: ৯৩
[২] সুরা ফাজর, আয়াত : ১৪
[৩] সহিহ বুখারি: ৩৭১৩
[১] সুরা কাফ, আয়াত: ১৮
[২] সুরা কাফ, আয়াত: ১৬
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১৪৭
[১] সুরা ফাতির, আয়াত: ৩৮
[১] সূরা যিলযাল, আয়াত: ৭-৮
[১] সুনানুন নাসায়ি: ৭১৬; মুসনাদু আহমাদ: ৬৫৭৫
[১] ইতহাফ সাদাতিল মুতকিনিন বিশারহি ইহইয়াই উলুমিদ্দিন, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা : ১৮১
[২] সূরা আরাফ, আয়াত: ৩১
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১
[১] সূরা আলাক, আয়াত: ১৪
[২] মৃত্যু: ২৬৪ হিজরি
রাতের বেলা ময়লা ফেলতে বেরিয়েছেন আপনি। ডাস্টবিনটা বেশ দূরে। অতদূর না গিয়ে ময়লা ফেললেন ঠিক প্রতিবেশীর বাড়ির দোরগোড়ায়। এদিকটা বেশ অন্ধকার। কে কী করছে বোঝার উপায় নেই। ভাবছেন, কেউ জানবে না, কে করল কাজটা। অথচ একজন ঠিকই দেখেছেন, আপনার এই হীন কর্ম। তিনি আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী আল্লাহ।
আপনি যদি জানতে পারেন সর্বদা আপনাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে; আপনার উপরস্থ কেউ সবসময় আপনাকে চোখে চোখে রাখছে, তখন আপনি কী করবেন? নিশ্চয় খুব সতর্ক হয়ে যাবেন। সুস্থ বিবেকসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার একজন স্রষ্টা রয়েছে। একজন বিশ্বাসী মুমিন হিসেবে আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার স্রষ্টা মহান আল্লাহ; যিনি মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী। অতএব, নিশ্চিত বিশ্বাস করুন, আপনি ২৪ ঘণ্টা রয়েছেন আপনার স্রষ্টার পর্যবেক্ষণের অধীনে। আপনার মতোই একজন মানুষের উপস্থিতি, পর্যবেক্ষণ টের পেয়ে আপনি চমকে ওঠেন, পরিণামের ভয়ে আঁতকে ওঠেন, নিয়ন্ত্রিত হয়ে যান; তাহলে মহান পর্যবেক্ষকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আওতায় আপনি কীভাবে লাগামহীন হয়ে পড়েন? আপনার রব বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا )
হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকেও সৃষ্টি করেছেন; যিনি তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাকো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন (রাকিব)।
মহামহিমাময় আর-রাকিবের সান্নিধ্যে
একবার আমি এক দোকানে ঢুকে আমার প্রয়োজনীয় একটি বস্তু চাইলাম। কিন্তু দোকানদার সেটা দিতে পারল না। আমি বেরিয়ে যাব, এমন সময় দোকানি বলল, একটু কষ্ট করে যদি গুদামে যেতেন, সেখানে পাওয়া যেতে পারে। দোকান ছিল নিচতলায় আর গুদাম চতুর্থ তলায়। গিয়ে দেখলাম সেখানে একজন হিসাবরক্ষক ও ব্যবস্থাপক টেবিলের সামনে বসে আছে। আর দুটি সিসি ক্যামেরা তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার বুঝতে দেরি হলো না, নিচতলায় মালিক তাকে মনিটরে পর্যবেক্ষণ করছে।
তো এই হিসাবরক্ষক তার দিকে তাকিয়ে থাকা ক্যামেরার কারণে একটু নড়াচড়াও করতে পারছে না। মালিকের পর্যবেক্ষণের কারণে কাজের সময়ে তার একটু খাওয়াদাওয়া অথবা অন্য কোনো প্রয়োজনে উঠে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আরেকবার এক ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখলাম সবগুলো রুম স্বচ্ছ কাচ দিয়ে তৈরি করা। যেন জিএম সকলকে নজরদারির আওতায় রাখতে পারে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের নজরদারি আর পর্যবেক্ষণের ভয়ে এতটাই আতঙ্কিত যেন অনৈতিক কাজ করার শক্তিই সে হারিয়ে ফেলেছে।
আবার ধরুন ট্রাফিক আইনের কথা। কোনো কোনো দেশে ট্রাফিক আইন খুবই কড়া। কেউ সর্বোচ্চ গতিসীমা অতিক্রম করলেই সাথে সাথে তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। ট্রাফিক পুলিশের কড়া নজরদারিতে তা বাস্তবায়নও করা হয়। এই নজরদারির কারণে কোনো ড্রাইভারের সর্বোচ্চ গতিসীমা লঙ্ঘন করার কোনো সুযোগ নেই।
সামান্য মানুষের পর্যবেক্ষণে কত তটস্থ থাকেন আপনি! অথচ আপনার ওপর রয়েছে মহাশক্তিধরের পর্যবেক্ষণ; যিনি নজর রাখেন আপনার ওপর, উপরস্থ কর্মকর্তার ওপর, সবার ওপর, তিনি আপনার রব, আর-রাকিব, মহাপর্যবেক্ষণকারী।
আর-রাকিব শব্দটি অভিধানে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়—
এক. আর-রাকিব অর্থ অপেক্ষমাণ। আল্লাহ বলেছেন-
وَارْتَقِبُوا إِنِّي مَعَكُمْ رَقِيبٌ
সুতরাং তোমরা অপেক্ষা করো, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ [১]
এখানে 'অপেক্ষমাণ' বলতে গতিবিধি পর্যবেক্ষণকে বোঝানো হয়েছে। যেমন : আল্লাহ বলেন-
إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ
নিশ্চয় আপনার প্রতিপালক (বান্দাদের) গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন।[২]
দুই. আর-রাকিব অর্থ সংরক্ষক।
বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
ارْقُبُوا مُحَمَّدًا فِي أَهْلِ بَيْتِهِ
তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা সংরক্ষণ করো তার পরিবারবর্গের মাধ্যমে [৩]
অর্থাৎ তার পরিবারের প্রতি সদাচরণ কর। তাদের হক আদায়ে যত্নবান হও।
তিন. আর-রাকিবের আরেক অর্থ প্রহরী, অগ্রবর্তী সৈনিক, আদর্শ প্রতিনিধি; পিতার যোগ্য বংশধর।
যে ফেরেশতা আমলনামা সংরক্ষণ করেন তাকেও বলা হয় 'রাকিব' তথা প্রহরী বা প্রতিনিধি।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য নিযুক্ত রয়েছে তৎপর প্রহরী [১]
আল্লাহর সাথে যখন ব্যবহৃত হয় আর-রাকিব, তখন তার অর্থ হয় মহাপর্যবেক্ষক। যিনি সবকিছু জানেন; সবকিছু দেখেন। রাত্রে ঘুমানোর সময় আপনি কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। মনে মনে ঠিক করলেন, আগামীকাল অমুক কাজটি করবেন। আপনার এই কল্পনা আপনি ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঠিকই সব জানেন। কুরআনে বর্ণিত-
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, আমি তা জানি। আমি তো তার গ্রীবাস্থিত ধমনির চেয়েও নিকটবর্তী [২]
আপনার নীরবতা এবং উচ্চৈঃস্বর তার কাছে সমান। জনসম্মুখে আপনার ঘোষণা এবং নিঃশব্দ উচ্চারণ তার কাছে একই। মুখ ফুটে বের হওয়া আর অন্তরে লুকিয়ে রাখা সবই তার কাছে সমান। কারণ তিনি আর-রাকিব, পর্যবেক্ষণকারী।
আল্লাহর এই নামটি আপনার সবচেয়ে কাছের নাম। আপনি যখনই বিশ্বাস করে ফেলবেন, আল্লাহ আপনার সবকিছু দেখছেন, তখন নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর হুকুম আঁকড়ে ধরবেন। আর আল্লাহর হুকুম যদি আপনি আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হন, নিশ্চিত আপনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে মুক্তি পেয়ে যাবেন। আল্লাহ বলেন-
مَّا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِن شَكَرْتُمْ وَآمَنتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا
যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং ঈমান আনয়ন করো, তাহলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহর কী লাভ? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞ [১]
আল্লাহর এই নামটি এবং এই নামের প্রতি ঈমান আপনার সৌভাগ্যের সিঁড়ি। এই একটি নামই একজন মুমিনের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে যথেষ্ট। মুমিন যখন এই নামের ওপর ঈমান আনে, তখন সে আল্লাহর হুকুমের সামনে নত হয়; আল্লাহকে ভয় করতে থাকে।
আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আর-রাকিব আপনাকে দেখছেন।
আপনি ঘরে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন, তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
আপনি হাসপাতালে রোগী দেখছেন, রোগীকে সেবা দিচ্ছেন, আপনি কিন্তু রয়েছেন তাঁর সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে।
আপনি যদি একজন আইনজীবী হয়ে থাকেন, নিজের আত্মার হিসাব নিন। আপনি মক্কেলের কাছ থেকে যে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক নিয়েছেন, তার হক আদায় করেছেন তো? সংশ্লিষ্ট আইনের সকল ধারা, উপধারা এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গভীরভাবে পড়াশোনা করেই মামলায় হাত দিয়েছেন তো? নাকি কোনো রকম চোখ বুলিয়েই হাজির হয়েছেন কোর্ট-চত্বরে?
আপনি একজন ডাক্তার। রোগীর কাছ থেকে ফি নিয়েছেন আপনার চাহিদামতো। কিন্তু তার হক আদায় করছেন কতটুকু? এটা কি শুধু আপনার অর্থ উপার্জনের বাণিজ্য নাকি আপনি সেবার মানসিকতাও লালন করেন? আপনি রোগীর অস্থিরতা, সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করছেন তো? নাকি তাকে উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দিচ্ছেন? ভুলে যাবেন না, আপনার প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আচরণ লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে! আপনি রয়েছেন সরাসরি আপনার মালিকের পর্যবেক্ষণ সীমানায়!
যাদের অস্থি-মজ্জা এবং অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুতে আর-রাকিবের উপস্থিতি, তারা কখনো বেখেয়াল হয় না। তারা সর্বদা সৌহার্দপূর্ণ, কোমল আচরণ করে। নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিতেই বেশি ভালোবাসে। আপনার সামনে ফলমূলের একটি বড় থালা রাখা হলো, আর-রাকিবের প্রতি ঈমানের দাবি হলো, আপনি আরেক ভাইকে অগ্রাধিকার দেবেন। তার দিকেই সুমিষ্ট ফলটি এগিয়ে দেবেন। আনারের বড় টসটসে দানাগুলো তার দিকে বাড়িয়ে দেবেন। কারণ, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। তিনি আপনার কাজ এবং অন্তরের ইচ্ছাও লক্ষ করছেন।
কুরআনে বর্ণিত-
ع إِنَّ اللَّهَ عَالِمُ غَيْبِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ )
নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল অদৃশ্য বিষয়ে অবগত আছেন। অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে তিনি সবিশেষ অবহিত।[১]
আল্লাহ আপনার অনন্য সঙ্গী
আপনার বন্ধুকে আপনি প্রচণ্ড ভালোবাসেন, তার সাথে চলাফেরা, ওঠাবসা করতে পছন্দ করেন। কিন্তু আপনার যত কাছের বন্ধুই হোক না কেন, তার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি আপনি সহ্য করতে পারবেন না। আপনি তার সাথে চলতে চলতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়বেন। খুব কাছের বন্ধুর উপস্থিতিও কখনো কখনো অসহ্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু আল্লাহ আপনার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আপনি কখনো আল্লাহর উপস্থিতিতে বিরক্ত হয়েছেন? কারণ আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঙ্গ দান করেন অতি সূক্ষ্ম ও সুকোমলভাবে। তাই আপনি টের পান না তাঁর উপস্থিতি। অথচ তিনি রয়েছেন আপনার সাথে, সবখানে; ঘরে-বাইরে, দেশে-বিদেশে, নির্জনে-প্রকাশ্যে সর্বদা তিনি রয়েছেন আপনার সঙ্গী হয়ে।
তাই আপনিও সদা-সর্বদা আল্লাহকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে নিন। ভেবে নিন আল্লাহ আপনার সামনেই রয়েছেন। হাদিসে এটাকে বলা হয়েছে 'ইহসান'। আপনি উন্নীত হোন ইহসানের উচ্চতায়।
কোনো শ্রদ্ধেয় বড় ব্যক্তিত্বের সাথে সাক্ষাতের সময় আপনি সাধারণত নিজেকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পোশাক-পরিচ্ছদ, আদবকেতা ঠিক আছে কি না সেদিকে খুব গুরুত্ব প্রদান করেন। এরপর তার সাথে সাক্ষাতের সময় ভদ্রতার সাথে শ্রদ্ধাজড়িত কণ্ঠে শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানিয়ে থাকেন। কিন্তু আল্লাহর মতো মহান ও পবিত্র সত্তা সর্বদা আপনার সাথে রয়েছেন, তাঁর প্রতি আপনি কি এতটুকুও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন? একান্ত তাঁর জন্য আদব ঠিক রাখেন?
অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি আল্লাহর ভয়ে তটস্থ থাকবে তার জীবন ও জীবনধারা তত বেশি সুন্দর ও কেতাদুরস্ত হবে। কারণ, আল্লাহ সর্বদাই আপনার সাথে রয়েছেন; সর্বদা তিনি আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এক বেদুইন ব্যক্তি নবিজির কাছে এসে আবেদন করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি সুরা শিক্ষা দিন যা সবদিক থেকে পরিপূর্ণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে 'সুরা যিলযাল' পড়িয়ে দিলেন। যার শেষটা ছিল-
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًا يَرَهُ
কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে তা-ও সে দেখতে পাবে।[১]
অতঃপর বেদুইন লোকটি বলল, ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য-সহ পাঠিয়েছেন—এর বেশি আমার আর প্রয়োজন নেই। এরপর লোকটি চলে গেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লোকটি সফলকাম হয়েছে, লোকটি কামিয়াব হয়েছে।[১]
আপনি চিন্তা করে দেখুন লোকটি সম্পর্কে আল্লাহর নবি এই মন্তব্য কেন করলেন? কারণ আপনি যদি জানতে পারেন আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ এবং অণু-পরিমাণ কর্মও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তখন আপনি কি পারবেন কারো সাথে প্রতারণা করতে? কারো সাথে মিথ্যা বলতে? পারবেন কারো ক্ষতি করতে? কিংবা কোনো অনৈতিক কাজ করতে? একজন মানুষের নজরদারিতে থেকেই যেখানে আপনি সজাগ হয়ে যান, অতি সন্তর্পণে সবকিছু সামাল দেবার চেষ্টা করেন, সেখানে মহান স্রষ্টার সামনে কীভাবে আপনি লাগামহীন হবেন?
এই একটি নাম এবং তার অন্তর্নিহিত আবেদন ও বার্তা আপনাকে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য করবে। প্রবৃত্তির লিপ্সা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি জোগাবে। আর যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখে ফেলল, সে দ্বীনের শক্ত বুনিয়াদের ওপর ঈমানি জীবনের দালান দাঁড় করিয়ে ফেলল। তাই আল্লাহর এই পরম সুন্দর নাম 'আর-রাকিব'-এর তন্ময়তায় মগ্ন থাকা হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা; আজীবনের উত্তম নসিহত।
লুকোনোর কোনো জায়গা নেই
ইমাম রাযি রাহিমাহুল্লাহ একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। জনৈক শাইখ তার এক ছোট্ট ছাত্রকে খুব বেশি স্নেহ করতেন। এতে অন্য ছাত্ররা কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়। শাইখ একদিন ভাবলেন, তাদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সবাইকে একত্র করে প্রত্যেকের হাতে একটি করে পাখি দিলেন এবং বললেন, তোমরা নিজেদের পাখিটি এমন জায়গায় নিয়ে জবাই করবে, যেখানে কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না।
প্রত্যেকেই একেক দিকে চলে গেল; যেন কেউ কাউকে দেখতে না পায়। ছাত্ররা সবাই নিজের মতো করে লুকিয়ে লুকিয়ে যার যার পাখি জবাই করে নিয়ে এলো। কিন্তু সেই ছোট্ট ছাত্রটি ফিরে এলো পাখিটি জবাই না করেই।
বিনীত সুরে উস্তাযকে বলল, শাইখ! আপনি বলেছেন, এমন স্থানে গিয়ে পাখিটি জবাই করতে, যেখান কেউ দেখবে না। কিন্তু আমি এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাইনি যেখানে আল্লাহ আমাকে দেখতে পাবেন না!
শাইখ মুচকি হেসে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার বুঝলে তো! এ কারণেই আমি ওকে একটু বেশিই স্নেহ করি।
তাই আপনি যেখানেই লুকিয়ে থাকুন না কেন, যেখানেই আত্মগোপন করুন না কেন, আল্লাহর শক্তিশালী দৃষ্টি থেকে দূরে কোথাও যেতে পারবেন না।[১]
আল্লাহ তাআলা আপনার দিকে সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রেখে এই কথাটিই শিক্ষা দিতে চান যে, হে বান্দা! তুমি কি আমার ব্যাপারে লজ্জা করো না? তুমি একদিন আমার সামনে উপস্থিত হবে, সেদিনটিকে তুমি কি ভয় করো না? তোমার ফিরে আসার সময় কি এখনো হয়নি?
আপনি সালাতে দাঁড়ানোর সময় কল্পনা করুন, আল্লাহ আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। সালাতে দাঁড়ানোর পূর্বেই পাক-পবিত্র ও উত্তম পোশাক পরে নিন। সামান্য কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আপনি আপনার উন্নত মানের পোশাক পরে বের হন। অথচ সালাত আদায়ের সময় যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ান, তখন আপনি পরেন নিম্নমানের পোশাক। কেন আপনার এই দ্বৈত নীতি? আপনি কি আল্লাহর সামনে উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না? আপনি কি বিশ্বাস করেন না, সালাতে দাঁড়ানো মানে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সামনেই দাঁড়ানো? সালাফগণ সালাতের পূর্বে চুল-দাড়ি আঁচড়িয়ে পরিপাটি হয়ে নিতেন। কারণ তারা উপস্থিত হতে যাচ্ছেন মহান রবের সামনে। মহামহিম আল্লাহ বলেন-
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ )
হে আদম সন্তান, তোমরা সালাতের সময় সৌন্দর্য গ্রহণ করো। তোমরা পানাহার করো কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।[২]
এই আলোচনা দ্বারা আমি আপনার সমালোচনা করছি না। আমি শুধু আপনার ঘুমন্ত চেতনাকে একটু জাগিয়ে তুলতে চাচ্ছি। আপনি দুনিয়াবি কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় যদি সুন্দর ও পরিপাটি পোশাক পরতে পারেন, তবে আল্লাহর সামনে কেন পারবেন না? মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর। জুমআর দিন মুমিনের ঈদ; আনন্দোৎসব। আর আপনি হলেন সেই উৎসবের দিনে আল্লাহর ঘরের মেহমান। আপনিই বলুন, এমন বরকতপূর্ণ মাহফিলে নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও নিম্নমানের পোশাক পরে যাওয়া কি সমীচীন?
তাই নবিজির সুন্নাহ হলো, জুমআর দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে, উত্তম পোশাক পরিধান করে মসজিদে গমন করা।
রাখাল-বালকের আল্লাহভীরুতা
আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার সাথি-সঙ্গীদের নিয়ে মদিনার অদূরে কোথাও যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দুপুর বেলা এক স্থানে যাত্রাবিরতি নিলেন বিশ্রামের জন্য। সবাই মিলে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য দস্তরখান বিছিয়েছেন। ঠিক সে সময় দেখা গেল, একপাল বকরী-সহ এক রাখাল যাচ্ছে।
ইবনু উমারের ইচ্ছে হলো, তিনি রাখালের আল্লাহভীরুতা পরীক্ষা করে দেখবেন। তাই রাখালকে ডেকে বললেন, এসো আমাদের সাথে খাবারে শরিক হও।
রাখাল উত্তর দিলো, আমি খেতে পারব না এখন। আমি আজ সিয়াম রেখেছি।
ইবনু উমার বললেন, তুমি একটা বকরী আমাদের কাছে বিক্রি করে দিতে পারো। আমরা তোমার বকরীর উপযুক্ত দাম দিয়ে দেবো। তা দিয়ে তুমি ইফতার কিনে খেতে পারবে।
রাখাল বলল, এই বকরী তো আমার নয়, আমার মালিকের।
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি তোমার মালিককে গিয়ে বলবে, পালের একটা বকরীকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে!
রাখাল তখন আসমানের দিকে আঙুল তুলে বলল, আমি না-হয় মিথ্যা বলে মালিকের চোখে ফাঁকি দেবো। কিন্তু আমার মালিকের যিনি মালিক (আরশের অধিপতি), তাকে আমি কীভাবে ফাঁকি দেবো? মাফ করবেন, এ কাজ আমাকে দিয়ে সম্ভব নয়!
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রাখালের তাকওয়া দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন।। এই রাখাল কতটুকুই বা শিক্ষিত ছিল? বাহ্যিকভাবে তার শিক্ষাদীক্ষা ছিল শূন্যের কোঠায়। কিন্তু সে দ্বীনের মূল আকিদা-বিশ্বাসের গোড়ায় পৌঁছুতে পেরেছে। আপনার বাড়িতে বিশাল বড় লাইব্রেরি রয়েছে। আলমারিগুলো বইপত্রে বোঝাই। আপনার লাইব্রেরি দেখে সকলেই আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় গদগদ হয়ে যায়। কিন্তু আপনি আল্লাহকে ভয় করেন না, আপনি যে আল্লাহর পর্যবেক্ষণের সীমানায় রয়েছেন তা ভুলে যাচ্ছেন। হারাম অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকছেন না, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেনে রাখুন, আল্লাহর কাছে আপনার এই জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই। পক্ষান্তরে এই অশিক্ষিত রাখাল আল্লাহর কাছে আপনার চেয়ে অনেক বেশি প্রিয়; অনেক বেশি মর্যাদাবান। আজ এই রাখালের মতো ইস্পাতদৃঢ় ঈমান খুব প্রয়োজন আমাদের। আর-রাকিবের প্রতি এমন অগাধ আস্থা ভীষণ দরকার।
এমন দম্পতির দেখা মেলা ভার যারা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল; এমন সন্তানসন্ততি ও পরিবার-পরিজন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যারা সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির গুণে গুণান্বিত। আজ সততা, বিশ্বস্ততার বড়ই অভাব। চারদিকে শুধু বিশ্বাসভঙ্গের জয়জয়কার, খিয়ানত ও মিথ্যা অভিনয়ের দৌরাত্ম্য। আপনি দেখবেন কত দাঈ রয়েছে, দিনের বেলায় তারা মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করছে; সবাইকে ভালো ভালো উপদেশ দিচ্ছে-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ ...
হে মানব-সকল, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো।[১]
কিন্তু সেই তারাই আবার রাতের বেলায় পাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যে কারণে মানুষ তাদের কথা গ্রহণ করছে না।
তাই সততা ও আত্মার শুদ্ধতা হলো সবচেয়ে বড় জিনিস। অন্তর থেকেই যদি দ্বীনি চেতনা আপনাকে পথ দেখাতে না পারে, তাহলে তা নিছক অভিনয় ও শঠতা বৈ কিছু নয়।
আপনি নিজেই নিজের হিসাব কষে দেখুন। আপনি কি আমানতদারিতা রক্ষা করে চলেন? কারো সাথে আপনার লেনদেন হলো, তার নথিপত্র, সাক্ষী সব উপস্থিত। তাই সময়মতো আপনি অপরপক্ষের পাওনা বুঝিয়ে দিলেন। আপনি কি ভেবে নিয়েছেন, এটা আমানতদারিতা? শুধু এতটুকু কাজ আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ যেখানে দলিল-পত্র বা সাক্ষী বিদ্যমান সেখানে আপনি পাওনা বুঝিয়ে দিতে বাধ্য। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ না করলে তারা আপনার নামে আদালতে মামলা ঠুকে দেবে। আর আদালত আপনার কাছ থেকে তা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে ছাড়বে।
আল্লাহর কাছে প্রকৃত আমানতদার তো সেই ব্যক্তি, যে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই পাওনাদারের পাওনা বুঝিয়ে দেয়। দুনিয়ার কেউ জানবে না, পাওনাদার নিজেও হয়তো জানতে পারবে না, কিন্তু শুধু আল্লাহর ভয়েই তার পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার নাম আমানতদারিতা। আমি একবার সালাতের পর মসজিদে বসে আছি। এমন সময় একটি চিঠি এলো আমার নামে। খুলে দেখলাম চিঠিতে লেখা, শাইখ! আমাদের এখানে এক লোক মারা গেছেন। আমি তার কাছ থেকে ২০ হাজার পাউন্ড ধার করেছিলাম। কিন্তু এটা তার পরিবারের কেউ জানত না। তবু আমি পুরোটাই পরিশোধ করে দিয়েছি।
এটাই হলো আমানতদারিতা। কেউ জানে না; তারপরও কেবল আল্লাহর ভয়ে সে হকদারের হক আদায় করেছে। কারণ আল্লাহ মহান পর্যবেক্ষক, আর-রাকিব। অনেক মানুষই এভাবে অন্যের কাছে তাদের সম্পদ রেখে মারা যায়, স্ত্রী বা সন্তানেরা কেউ জানতে পারে না। ফলে মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদও মৃত্যুবরণ করে। সন্তানেরা বলে, আমরা আমাদের বাবার অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে কিছুই জানি না।
কিন্তু যারা বিশ্বাস করে আসমানি এই সতর্ক বার্তায়- 'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সবকিছুর পর্যবেক্ষক'-তারা কখনো মৃতের হক লুকোতে পারে না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের কাছে গিয়ে সম্পদ বুঝিয়ে দেয়।
একজন ঈমানদার ব্যবসায়ী কি কখনো তার পণ্যে ভেজাল মেশাতে পারে? পণ্যের কোনো দোষ থাকলে তা ক্রেতার কাছে গোপন করতে পারে?
মনে করুন, আপনি একজন তেল-বিক্রেতা। আপনার তেলের পাত্রে যদি একটি ইঁদুর মরে পড়ে থাকে, তবে আপনি কি ঐ তেল আল্লাহর বান্দাদের খাওয়াতে পারবেন? মহান রবের ওপর যদি আপনার ঈমান থেকে থাকে, তাহলে কীভাবে আপনি এই দোষ গোপন করে তা মানুষের কাছে বিক্রি করবেন?
মানুষের খাদ্যজাত গরু-ছাগলকে মোটাতাজাকরণে ব্যবহার করা হয় স্টেরয়েড হরমোন ও ইউরিয়ার মতো কিছু বিষাক্ত উপাদান। এরপর তা চড়া দামে বিক্রি করা হয় ভোক্তা আর ক্রেতাদের কাছে। আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সামান্য ভয়টুকু যাদের মধ্যে আছে, তারা কখনো মানুষ কিংবা পশুপাখির খাবারে এসব মেশাতে পারবে না!
দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই আমরা মুখোমুখি হই কত ধরনের খিয়ানত, ছলচাতুরি ও বিশ্বাসঘাতকতার। খাবারে ভেজালের সংমিশ্রণ, পণ্যমূল্য বাড়িয়ে বলার প্রতারণা, শঠতা ও লেনদেনে অস্বচ্ছতা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর জীবন থেকে মুক্তি পেতে গেলে অবশ্যই সকলকে আর-রাকিব নামটির মর্ম উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আল্লাহকে যে আর-রাকিব হিসেবে বিশ্বাস করে, তার জন্য আর কোনো পরিদর্শক বা নিয়ন্ত্রকের প্রয়োজন হয় না। কারণ আর-রাকিবের প্রতি বিশ্বাসই তাকে কর্মস্থলে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন করতে বাধ্য করে।
আমার পরিচিত এক ভাই ছিল, সে প্রতিদিন দুই-এক ঘণ্টা দেরি করে অফিসে যেত; আবার কাজের মাঝখানেও কিছু সময় বিশ্রাম নিত। মাস শেষে সে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বরাবর ছুটি চেয়ে দরখাস্ত করল। দরখাস্ত মঞ্জুরও হয়ে গেল। কিন্তু সে পরদিন থেকে অফিস করতে লাগল ছুটি না কাটিয়ে। ম্যানেজিং ডিরেক্টর জানতে চাইল, কী ব্যাপার? তুমি ছুটি নিয়ে আবার অফিসে এলে কেন?
সে উত্তর দিলো, স্যার! আমি প্রতিদিন অফিসে কিছুটা দেরি করে আসতাম। আমি আমার দেরি হওয়া সময়গুলো হিসাব করে দেখলাম, এক মাসে আমি যতটুকু দেরি করেছি তা তিনদিনের সমান।
অফিসের এমডি চোখের সামনে এই অনুপম আদর্শ এবং বিরল সততা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। কারণ, যে সমাজে সে বাস করে, সে সমাজে সৎ মানুষ পাওয়া নিতান্তই দুষ্কর।
ঐ ভাইটি পরে আমাকে বলেছে, শাইখ! আমি যখন আপনার পরবর্তী দারসে হাজির হলাম, তখন দেখি আমাদের এমডি স্যারও দারসে এসেছেন!
আলহামদুলিল্লাহ। এটাও একটা খুশির সংবাদ। তার সততার নমুনা দেখে আরেক ভাই সত্যের সন্ধান পেয়েছে।
এজন্যই আমি ভাইদের খুব গুরুত্ব সহকারে একটি কথা বলে থাকি, আপনারা আল্লাহর নাম 'আর-রাকিব'-এর অর্থ অনুযায়ী নিজ জীবন পরিচালনা করুন। দেখবেন আপনার চলাফেরা, ওঠা-বসা, কথা-বার্তা সবকিছুই হয়ে যাবে নীরব এক দাওয়াত।
সরকারি হাসপাতালের অনেক ডাক্তার ভাইদের সাথে আমার পরিচয় আছে। হাসপাতালে তারা ফ্রি চিকিৎসা করেন। হার্ট, ব্রেইন ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অস্ত্রোপচার-সহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের দায়িত্ববোধ দেখুন। একজন রোগী দুই হাজার টাকা ভিজিট দিয়ে চিকিৎসা করায়, আরেকজন মানুষ ফ্রিতে চিকিৎসা নিতে আসে; অথচ তারা এই দুজনের চিকিৎসায় কোনো পার্থক্য করেন না। ফ্রি হওয়ার কারণে একজন অভাবী মানুষকে পর্যাপ্ত সেবাটুকু দিতে কখনো কার্পণ্য করেন না।
এক আল্লাহভীরু আলিমকে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে আমরা রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় নজরের হিফাজত করতে পারি?
আলিম উত্তর দিলেন, মনে রাখবে তোমার দৃষ্টি খিয়ানত করার আগেই আল্লাহ তোমাকে দেখে ফেলেছেন, তাঁর দৃষ্টি তোমাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তার সামনে গিয়েই তোমাকে দাঁড়াতে হবে; দৃষ্টির সামান্য খিয়ানতেরও হিসাব দিতে হবে!
আপনার মনে হতে পারে বর্তমান সময়ে কীভাবে দৃষ্টি হিফাজত করা সম্ভব? নারীরা সৌন্দর্য প্রদর্শন করে রাস্তায় চলাফেরা করে! অফিসে, মার্কেটে, শপিংয়ে সবখানেই তাদের অবাধ বিচরণ!
আপনার সান্ত্বনার জন্য বলছি, এই যুগেও আপনার মতো অনেক টগবগে যুবক রয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানের সামনে মাথা নত করে। মহামহিম আর-রাকিবকে ভালোবেসে তারা হারাম দৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে। লিফটে উঠতে গিয়ে যদি দেখে ভেতরে কেবল একজন মেয়ে, তখন তৃতীয় কোনো ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকে কিংবা লিফট ছেড়ে সিঁড়ি বেয়েই ওপরে উঠতে শুরু করে। লিফটে অল্প সময়ের জন্যও গায়রে মাহরামের সাথে নির্জনে থাকা তারা অপছন্দ করে। আপনার মতো একজন যুবক হয়ে সে যদি এভাবে আত্মসংযমের পথ বেছে নিতে পারে, তবে আপনি কেন পারবেন না? আল্লাহর এই আয়াতকে অন্তরে খোদাই করে নিন—
أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى *
সে কি বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তাকে দেখছেন? [১]
আল্লাহর নামের প্রতি বান্দার আদব
নিজের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, অনুভূতি-উপলব্ধি এবং প্রতিটি পদক্ষেপের মুহূর্তে মন-মস্তিষ্কে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির চেতনা লালন প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। তাই সব কাজে আল্লাহকে স্মরণ রাখুন।
ইবনু আতাউল্লাহ ইস্কান্দারি বলেন, 'সর্বোত্তম ইবাদত হলো সদা সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা।'
বিখ্যাত মনীষী আবু হাফস আমর ইবনু সালামা নিসাপুরি[২] বলেন, 'যখন তুমি মানুষের সামনে বসবে, তখন নিজ হৃদয়-আত্মার জন্য উপদেশদাতা হয়ে যাবে। তোমার সামনে লোকজনের ভিড় যেন তোমাকে প্রতারিত না করে; তারা দেখে তোমার বাহ্যিক অবস্থা; কিন্তু আল্লাহ পর্যবেক্ষণ করেন তোমার আত্মিক ও অভ্যন্তরের অবস্থা।'
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ এক লোককে বললেন, 'সর্বদা আল্লাহর ‘ধ্যানে মগ্ন থাকো!’
লোকটি বলল, ‘সেটা কীভাবে করব?’
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ উত্তর দিলেন, ‘সর্বদা এমনভাবে থাকো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ!’
চমৎকার এই দুআটি স্মৃতির কোটরে রেখে দিন-
اَللَّهُمَّ اجْعَلْنَا نَخْشَاكَ كأَنَّنَا نَرَاكَ
হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়ে আপনার ভয় দান করুন। আমাদেরকে এমন মগ্নতা দান করুন, যেন অনুভবে মনে হয়, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি!
আল্লাহর মুরাকাবা বা আল্লাহর ধ্যানে মগ্নতা একটি বিশাল মর্যাদার স্তর; যে ব্যক্তি এ স্তরে উন্নীত হতে পারল, সে তো জান্নাতে পৌঁছে গেল। দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত সুখ-সাফল্য ধরা দিলো তার দোরগোড়ায়। তাই আল্লাহর আদেশের ওপর অটল-অবিচল থাকুন। মগ্ন থাকুন তাঁর ধ্যানে। আপনি ভুলে গেলেও তিনি আপনাকে ভুলবেন না। তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি থেকে কোথায় পালাবেন আপনি?
টিকাঃ
[১] সুরা নিসা, আয়াত: ১
[১] সুরা হ্রদ, আয়াত: ৯৩
[২] সুরা ফাজর, আয়াত : ১৪
[৩] সহিহ বুখারি: ৩৭১৩
[১] সুরা কাফ, আয়াত: ১৮
[২] সুরা কাফ, আয়াত: ১৬
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১৪৭
[১] সুরা ফাতির, আয়াত: ৩৮
[১] সূরা যিলযাল, আয়াত: ৭-৮
[১] সুনানুন নাসায়ি: ৭১৬; মুসনাদু আহমাদ: ৬৫৭৫
[১] ইতহাফ সাদাতিল মুতকিনিন বিশারহি ইহইয়াই উলুমিদ্দিন, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা : ১৮১
[২] সূরা আরাফ, আয়াত: ৩১
[১] সুরা নিসা, আয়াত : ১
[১] সূরা আলাক, আয়াত: ১৪
[২] মৃত্যু: ২৬৪ হিজরি