📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-ওয়াহহাব : উদার দানশীল, পরম মমতাসময়

📄 আল-ওয়াহহাব : উদার দানশীল, পরম মমতাসময়


সন্ধ্যা হয়ে এলেই ঘরে ঘরে বাতি জ্বালানো হয়। এর জন্য মাসে মাসে বিদ্যুৎ বিলও দিই আমরা। অথচ দিনের বেলা সূর্য বিনামূল্যে আলোর জোগান দিয়ে যাচ্ছে। কখনো কি ভেবেছি সূর্যের আলো পাওয়ার জন্যও যদি প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকা করে বিল পরিশোধ করতে হতো, তাহলে কত ভয়ানক হতো আমাদের অবস্থা! পরম দাতা ও প্রেমময় আল্লাহ সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে সেই অতি প্রয়োজনীয় বস্তুটিই সকলের জন্য সহজলভ্য করে দিয়েছেন। বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে জানা যায়, সূর্যের স্থায়িত্ব এখনো আরো পাঁচ বিলিয়ন বছর।[১] অতএব, সূর্যের আলো নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই, আলহামদুলিল্লাহ। তিনিই আল-ওয়াহহাব যিনি বান্দাদের জন্য এমন বিশাল ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছেন।
আল্লাহর আল-ওয়াহহাব নামের মাঝে পরম দানশীলতার পাশাপাশি লুকিয়ে আছে পরম মমত্ববোধ। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যেও তিনি এই গুণ দান করেছেন।
ইসলাম কেবল কিছু সূক্ষ্ম-জ্ঞান ও গূঢ় তথ্য জানার নাম নয়; ইসলাম হলো কিছু সত্য অনুভূতি এবং বিশ্বাসের নাম। যেখানে মানব-মস্তিষ্ক আল্লাহর অস্তিত্ব, মহত্ত্ব ও তাঁর উত্তম গুণবাচক নামসমূহের বাস্তব উপলব্ধির পাশাপাশি তা হৃদয়-আত্মায় ধারণ করবে। হৃদয় থাকবে আল্লাহর প্রতি প্রেম ও ভালোবাসায় টইটম্বুর।
দেখুন, মানুষকে তার বিবেক ও মস্তিষ্কের তুলনায় ভালোবাসাই বেশি আলোড়িত করে; তার মধ্যে রোমাঞ্চ ও শিহরণ জাগায়। ভালোবাসার জন্য মানুষ জীবনের দামি-সস্তা সবই ব্যয় করতে পারে; এমনকি উৎসর্গ করতে পারে তার সবচেয়ে মূল্যবান জীবনটাকেও। কিন্তু নিছক বিবেক ও মস্তিষ্কের বিচারে সে আলোড়িত হয় না; এর দ্বারা সে হয়তো বিশ্বাসে উপনীত হয়, তৃপ্ত হয়, নিরস কিছু উপলব্ধিতে জাগ্রত হয়; কিন্তু আবেগ না থাকায় শিহরিত হয় না।
তাই যারা আল্লাহর পথের দাঈ, তাদের অপরিহার্য কর্তব্য হলো, একই মুহূর্তে বিবেক ও হৃদয় উভয়কে জাগানো। বিবেক ও যুক্তির সাথে ভালোবাসা থাকলে পূর্ণাঙ্গ সফলতা পাওয়া সম্ভব।
আপনার মধ্যে বিবেক ও হৃদয়ের সহাবস্থান। জগৎ ও বিশ্বকে জানার জন্য যখন আপনি আপনার বিবেককে কাজে লাগাবেন, আপনি আল্লাহর পরিচয় পেয়ে যাবেন। আর যখন আল্লাহর অসংখ্য ও অফুরন্ত নিয়ামত উপলব্ধি করবেন, আপনি তাঁকে ভালোবেসে ফেলবেন হৃদয় দিয়ে। আল্লাহকে ভালোবাসার দ্বারাই কেবল আপনি আপনার চিন্তাশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারবেন এবং সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন। আর তখনই আপনি হয়ে উঠবেন প্রকৃত মানুষ।
আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক অবসর গ্রহণ করবেন। সে উপলক্ষ্যে একটি বিদায়ী সভার আয়োজন করা হয়। সেদিন বিদায়ী বক্তব্যে তিনি একটা কথা বলেছিলেন, কথাটি আমি সারা জীবনেও ভুলতে পারব না। তিনি বলেছিলেন, 'মানুষের মধ্যে যদি প্রেমানুভূতি না থাকে, সে যদি কাউকে ভালোবাসতে আগ্রহ না পায় এবং কারো ভালোবাসার পাত্র হওয়ারও আকাঙ্ক্ষা না করে, তাহলে তাকে মানুষ বলা সম্ভব নয়।'
আপনার অন্তর যদি হয় রুক্ষ, পাষাণ এবং পাথরের মতো কঠিন, তাহলে মানুষের বৈশিষ্ট্য আপনার মধ্যে নেই। আপনি আপনার হৃদয়ে প্রেমবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করুন।
সাহাবিদের সীরাত অধ্যয়ন করলে আমরা দেখতে পাব, তারা দ্বীনের জন্য, আল্লাহর জন্য এবং নবিজির জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আল্লাহর নবির জন্য তারা এমন সব কুরবানি করেছেন, সাধারণ বিবেক-বুদ্ধির আলোকে যা অসম্ভব। আমাদের কারো যদি হাত কেটে যায় বা একটু ক্ষত হয় তাহলে সাথে সাথেই সে ব্যথায় চিৎকার করে উঠবে, অতি দ্রুত তা ব্যান্ডেজ করবে; চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে নেবে এবং কোনো সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণের প্রোগ্রাম থাকলে তা বাতিল করে দেবে। এক কথায় সে অস্থির হয়ে সব কিছু ভুলে শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়বে।
কিন্তু রাসুলুল্লাহর প্রিয় সাহাবি, চাচাতো ভাই জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখুন। মৃত্যুর যুদ্ধে তরবারির আঘাতে তার ডান হাত কেটে যায়। হাতের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে সাথে সাথেই তিনি বাম হাত দিয়ে পতাকা উঁচু করে রাখেন। আরেকটি আঘাতে তার বাম হাতটিও কেটে পড়ে যায়। সে দিকেও কোনো দৃষ্টি না দিয়ে কাটা দুহাতের ঊর্ধ্বাংশ দ্বারা আঁকড়ে ধরেন ইসলামের পতাকা। এভাবেই আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আল্লাহর দ্বীনের প্রতি এই যে প্রেম-ভালোবাসা এবং আত্মোৎসর্গ করার ব্যাকুলতা—এর উৎস আসলে কোথায়?
জাহিলি যুগের নারী কবি খানসা। পরবর্তীতে তিনি ইসলামের যুগও পেয়েছেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তার ভাই সাখর নিহত হওয়ায় সারা দুনিয়াকে তিনি তার বিলাপ আর শোকতাপে ভারী করে তুলেছিলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর সেই খানসার চার পুত্র একসাথে শহিদ হয়ে গেল কাদিসিয়ার যুদ্ধে। কিন্তু তার এবারের শোকের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপন ছেলেদের শাহাদাতের খবর শুনে তিনি কেবল এতটুকুই বলেছিলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাদের শহিদ করে আমাকে সম্মানিতা করেছেন। আমি আশা করি, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সাথে আমাকে একত্র করবেন তাঁর করুণার ঘর জান্নাতে।'
খুবাইব ইবনু আদি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মুশরিকরা বন্দি করে নিয়ে যায়। ঝুলিয়ে রাখে খেজুর গাছের কাঁটাযুক্ত ডালে। গাছের নিচে মুশরিকরা তির-ধনুক প্রস্তুত করছিল, মুহূর্তের মধ্যেই যা খুবাইবের কলিজা বিদ্ধ করে বেরিয়ে যাবে। এমন উপস্থিত মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থায় মুশরিক নেতা আবু সুফইয়ান তাকে ডাকল, 'খুবাইব! তোমার স্থানে মুহাম্মাদকে তির বিদ্ধ করাটা তুমি পছন্দ করবে?'
খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রী-সন্তান এবং পরিবারের লোকদের সাথে আরাম-আয়েশে থাকব আর অন্যদিকে রাসুলুল্লাহর গায়ে কাঁটা বিঁধবে-এটা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।' [১]
সাহাবিদের জীবনচরিত অধ্যয়ন করুন, আপনি হতভম্ব হয়ে যাবেন। তাদের জীবনেতিহাস পাঠ করুন, আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন।
যারাই আল্লাহর পথে ব্যয় করে, আত্মোৎসর্গ করে; যারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার সামনে ইচ্ছার লাগাম টেনে ধরে এবং আল্লাহর রাস্তায় অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে-কীসে তাদেরকে উৎসাহিত করে এমন দুঃসাহসিক অভিসারে? নিশ্চয় বিবেক-বুদ্ধির কাছে এর জবাব নেই। এমন অসম্ভব পদক্ষেপকে বাস্তবে রূপ দিতে তাদের যে জিনিস আন্দোলিত করে তা হলো ভালোবাসা। ভালোবাসাই মানুষকে সৌভাগ্যের আসনে সমাসীন করে। তাই আল্লাহকে ভালোবাসুন। দুনিয়ার কেউ তার দরজা সবসময় আপনার জন্য খুলে রাখবে না। কিন্তু আল্লাহর দুয়ার সদা-সর্বদা সবার জন্যই অবারিত, উন্মুক্ত। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন খুবই সহজ। তাঁর হৃদয় অনুগ্রহ- মমতায় পূর্ণ। তাঁর দান-প্রতিদান অসীম।
আপনি যদি আল্লাহর আল-ওয়াহহাব নামটি নিয়ে আপনার ফিতরাত দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন, তাহলে আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়-আত্মা আল্লাহর প্রেমে পূর্ণ থাকা অপরিহার্য। আপনার হৃদয়-আত্মা যখন আল্লাহর প্রেমে টইটম্বুর হবে তখন আপনি নিজের ভেতরে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের ঝলক অনুভব করবেন। আপনার মনে জাগ্রত হবে স্রষ্টার প্রতি পরম ভক্তি, পেয়ে যাবেন সরল পথের দিশা। আপনি উন্নীত হবেন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওফিকপ্রাপ্তির উচ্চ শিখরে।
মুমিনের হৃদয়ের ব্যাকুলতার কারণ তার অন্তর্নিহিত ঈমান। তাই যখনই আল্লাহর আলোচনা হয় তখনই মুমিনের অন্তর পুলকিত হয়, কেঁপে ওঠে। আল্লাহ বলেন-

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ )

নিশ্চয় মুমিন তো তারাই, আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে। আর তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই নির্ভর করে [২]

অন্তর প্রকম্পিত হওয়া, শিহরিত হওয়া—এগুলো ঈমানের আত্মিক লক্ষণ। মানুষের জীবনে ভালোবাসার দাবিদার ও ভালোবাসার কার্যকারণ তো একাধিক হতে পারে। তাহলে বাস্তবে সে কাকে ভালোবাসবে? কার ভালোবাসার সামনে সে আরেকজনের চাহিদা আর আবদারকে বিসর্জন দেবে? এক্ষেত্রে শুধু আবেগ বা মৌখিক দাবি যথেষ্ট নয়। তাই যখন হৃদয়ে ভালোবাসার দাবি বেশি হয়ে যায় তখন আল্লাহ সত্য ভালোবাসাকে যাচাই করেন এবং রীতিমতো দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করতে আদেশ করেন। সুমহান আল্লাহ বলেন-

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ )

বলুন, (হে নবি!) যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তাহলে আমাকে ভালোবাসো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন। তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [১]

অতএব, আমাদের মাঝে আল্লাহর ভালোবাসা আছে কি না, তার প্রমাণ হলো- আমরা রাসুলুল্লাহর আনুগত্য করি কি না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যেসব কাজের ব্যাপারে আমাদের নিষেধ করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকছি কি না।

কৃতজ্ঞ হোন মমতাময় রবের প্রতি

আমরা সদা মহান আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামত উপভোগ করি। কোনো মূল্য বা পারিশ্রমিক দেওয়া ছাড়াই আমরা এ সকল নিয়ামত পেয়ে যাই, তাই এগুলোর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের সময় হয়ে ওঠে না।
মনে করুন আপনি পাবলিক বাসে করে কোথাও যাচ্ছেন। গাড়িতে উঠতেই দেখা গেল আপনার একজন বন্ধু। ভাড়া পরিশোধের সময় সে নিজের পকেট থেকেই টাকা বের করে আপনার ভাড়া দিয়ে দিলো। আপনি তখন কী করবেন? নিশ্চয় কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাকে ধন্যবাদ জানাবেন। তার অনুগ্রহে খুশি হবেন। কেউ যদি আপনাকে একটু হাদিয়া দেয় আপনি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তার প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। সে কবে আপনার সাথে দেখা করবে, কবে আপনার বাসায় বেড়াতে আসবে-সেটা জিজ্ঞেস করতেও বাকি রাখেন না। আসলে মানবাত্মা এমনই, এভাবেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
কাফিররা দুনিয়াবি নিয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেই মজে থাকে কিন্তু এর পেছনে কে আছে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করে না। অথচ মুমিন এই পার্থিব নিয়ামতের গভীরে ঢুকে আবিষ্কার করে এক সত্তাকে। নিয়ামতের পথ ধরে সে পৌঁছে যায় নিয়ামত-দাতার সান্নিধ্যে।
আপনার প্রচণ্ড ক্ষুধা পেল। আপনি একজনের অতিথি হলেন। খাবারের টেবিলে সারি সারি সাজানো দেখলেন বিভিন্ন পদের খাবার। শেষ পর্বে রয়েছে মিষ্টি, ফলমূল, ঠান্ডা কোমল পানীয় এবং আইসক্রিম।
ক্ষুধার তাড়নায় গোগ্রাসে খেতে থাকলেন, খেয়ে তৃপ্ত হলেন। ক্ষুধাগ্নি নির্বাপিত হয়ে গেল।
খাওয়া শেষে অবশ্যই আপনি তাকে ধন্যবাদ জানাবেন। খাবারের শেষে তার জন্য হয়তো দুআ করবেন-
'আপনার খাবার সবসময় যেন সৎ লোকেরাই খায়।'
'আল্লাহ আপনার নিয়ামতকে স্থায়ী করে দিন।'
'আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করুন।'
'আল্লাহ আপনার মর্যাদা স্থায়ী করুন এবং আপনাকে বারাকাহ দান করুন।'
এভাবে তার আপ্যায়নে আপ্লুত হয়ে বিভিন্ন উত্তম দুআ দ্বারা আপনি তার কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করে থাকেন।
একজন মানুষের অনুগ্রহ বা সদয় আচরণ পেয়ে আপনি বিগলিত হন, তাহলে আল্লাহ যখন তাঁর অসংখ্য নিয়ামতরাজি দ্বারা আপনার জীবন ভরিয়ে দেন, তখন কীভাবে ভুলে যান সেই রবকে? কীভাবে ভুলে যান তাঁর শুকরিয়া আদায়ের কথা?
আল্লাহ বলেন, 'আমি কি তোমাকে দুটি চোখ দান করিনি? '[১]

আল্লাহ আপনাকে যে মহামূল্যবান দুটি চোখ দিয়েছেন তা দিয়ে দিব্যি আপনি দুনিয়ার সবকিছু দেখছেন। আধো আধো বোল ফোটা সন্তানের মুখ দেখছেন, আত্মীয়-সুজনের মুখ দেখছেন। গাছপালা, বনজঙ্গল, পাহাড়-পর্বত এবং ফুল-ফসল কত কিছুই দেখছেন। প্রাকৃতিক মনোরম অনেক রঙিন দৃশ্য অবলোকন করে মুগ্ধ হচ্ছেন। রাস্তায় দেখে চলছেন, হাতে বই নিয়ে চোখ বুলাচ্ছেন, হৃদয়ঙ্গম করছেন তার মর্ম। এভাবে দৃষ্টিশক্তির নিয়ামত ভোগ করছেন অহর্নিশ। আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহেই আপনাকে দান করেছেন এই মহা-নিয়ামত।
একবার ঘরের কিছু ফার্নিচার বার্নিশ করানোর জন্য একজন বার্নিশ-মিস্ত্রির কাছে গেলাম। তার সাথে কথা বলতে গেলে তিনি আমাকে তার সহযোগীর সাথে কথা বলার ইশারা করলেন। আমি সহযোগীর সাথে কথা বললাম। কথা শেষ হওয়ার পর দেখি তারা একজন অপরজনের সাথে আকার-ইঙ্গিতে কথা বলছে, কারণ বার্নিশ-মিস্ত্রি ছিলেন বোবা। এটা আমার জন্য একদম নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম, আল্লাহ তাআলা বাকশক্তির কী মহা-নিয়ামত আমাদের দান করেছেন!
মহামহিম আল্লাহ বলেন, ‘(হে মানুষ!) আমি কি তোমাকে দুটো চোখ দিইনি? সেই সাথে জিহ্বা ও দুই ঠোঁট? আমি কি তোমাকে দুই পথের (পাপ ও পুণ্যের) দিশা দিইনি?[১]
দু-চোখের মতো আল্লাহ আমাদের দান করেছেন জিহ্বা। এই জিহ্বা দ্বারা আপনি মনের ভাব প্রকাশ করেন। নিজের আনন্দ-খুশি, সুখ-দুঃখ এবং অনুভব-অনুভূতি ব্যক্ত করেন। জনসম্মুখে কুরআনের তাফসির পেশ করেন। চমৎকার কোনো গল্প শোনান। স্বজন, প্রিয়জন ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে কথাবার্তা বলেন। এক জিহ্বার দ্বারাই আপনার জীবনের এতগুলো প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হয়।
রাশিয়ার বিখ্যাত শরীরতত্ত্ববিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইভান পেট্রোভিচ পাভলোভ মনোবিজ্ঞানের একটি তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন।
ইভানের কাজ মূলত রিফ্লেক্স সিস্টেমের[২] ওপর ছিল। পরবর্তী উদাহরণও রিফ্লেক্সকে বোঝাচ্ছে।
ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নকালে মনোবিজ্ঞানের ক্লাসে আমরা শিখেছিলাম, নবজাতক শিশুরা একটির বেশি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারে না। আপনি যদি তার সামনে জ্বলন্ত কয়লা দেন, তাহলে কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই সে তাতে হাত ঢুকিয়ে দেবে। কিন্তু স্নায়ুতন্তু যখনই তাপ উপলব্ধি করবে, তখন আগুনের তাপ সহ্য করতে না পেরে শিশুটি হাত বের করে ফেলবে। এ ক্ষেত্রে সে মস্তিষ্ক থেকে সংকেত লাভ করবে না বরং স্নায়ুর উপলব্ধিই তাকে হাত বের করে ফেলতে বাধ্য করবে। কিন্তু এই বাচ্চাটিই যখন বড় হবে তখন তার মস্তিষ্কই তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখবে।
মানুষের মধ্যে এই অভিযোজন প্রক্রিয়া না থাকলে পৃথিবীতে মানুষ বেঁচে থাকতে পারত না।
মানব মস্তিষ্কের ধারাবাহিক উন্নতি ও বিকাশ নিয়ে চিন্তা করলে হতবাক হতে হয়। আল্লাহর দানের কী অপার মহিমা লুকিয়ে আছে মানবদেহের এই অংশে।
ছোট্ট শিশু যখন কিছুটা ভাবনা-কল্পনার উপযুক্ত হয়, তখন হয়তো যেকোনো পুরুষকেই আব্বু বলে ডাকে। একটু বড় হবার পর ডাক পরিবর্তন হয়, যাকে দেখে তাকেই বলতে থাকে চাচ্চু। তার মস্তিষ্কে শুধু আব্বু এবং চাচ্চুর মর্মটুকুই প্রবেশ করেছে; কিছুদিনের জন্য সবাইকে আব্বু এবং কিছু দিনের জন্য সবাইকে চাচ্চু মনে হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই সে আব্বু ও চাচ্চুর মাঝে বিভাজন রেখা আবিষ্কার করে ফেলে।
এভাবে যখন তার সামনে গাছের নাম উল্লেখ করা হয়, তখন তার কচি মস্তিষ্কে গাছের ছবি খেলে যায়। ঘরের পাশে বা রাস্তার ধারে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষগুলোকে সে শুধু গাছ হিসেবে চেনে। কিন্তু এক গাছের সাথে আরেক গাছের কী পার্থক্য তা সে উপলব্ধি করতে পারে না। আস্তে আস্তে মেধার বিকাশ ঘটে, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে সে শিখতে শুরু করে। এমনি করে সেই শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগপর্যন্ত মানব-মস্তিষ্ক যতগুলো স্তর পাড়ি দেয় তা এক অনাবিষ্কৃত বিস্ময়। মানব-মস্তিষ্কের ক্রমোন্নতি ও বিকাশ একটি সুতন্ত্র জগৎ। যে জগতে মহান আল্লাহর অসীম কুদরত লুকিয়ে আছে, যা আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সারা দেহের অসংখ্য নিয়ামতের পাশাপাশি এক মস্তিষ্কেই আল্লাহ তাআলা এমন অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে ভরিয়ে রেখেছেন, যা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে গেলে মহান রবের সামনে মস্তক নুয়ে পড়া ছাড়া কোনো পথ নেই। মুমিন আর কাফিরের পার্থক্য এই যে কাফির নিয়ামত উপভোগ করলেও উৎস নিয়ে কখনো চিন্তাভাবনা করে না। আর মুমিন যেকোনো নিয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মূল উৎস খুঁজে বের করে। নিয়ামতের পথ ধরেই সে নিয়ামতদাতার সান্নিধ্যে পৌঁছে যায়।
আপনি সারাদিন অফিসে, কর্মস্থলে বা ক্ষেত-খামারে ব্যস্ত। দিন শেষে ক্লান্ত- পরিশ্রান্ত হয়ে বাসায় ফিরলেন। বাসায় এসে দেখলেন আপনার কল্যাণময়ী সত্রী দাঁড়িয়ে আছে আপনার অপেক্ষায়। আপনার জন্য একরাশ সহানুভূতি, আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে, ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা ফুটিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, 'আসসালামু আলাইকুম।' ঘর-দোর সবকিছু পরিপাটি, খাবার টেবিলে প্রস্তুত করা খাবার দেখে হয়তো আপনার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। এমন চক্ষুশীতলকারী জীবনসঙ্গিনী পেয়ে নিজেকে অবশ্যই আপনি সৌভাগ্যবান মনে করবেন, এটা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। আল্লাহ তাআলাই এমন কল্যাণময়ী নারীকে পাঠিয়েছেন আপনার জীবনসঙ্গিনী করে। তাই প্রিয়তমার মিষ্টি হাসির পিছনে যে মহান কুদরত মুচকি হাসছে তাকে ভুলে যাবেন না।
তবে আমরা গাফিল, আমরা আত্মভোলা উদাসীন। তাই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অতলে হারিয়ে যাই। ভাবতে থাকি, 'নিশ্চয় আমার শ্রম ও বিচক্ষণতার জন্যই তাকে পেয়েছি; মাথার ঘام পায়ে ফেলে, রাত দিন এক করে উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করেছি; মোটা অঙ্কের মোহর জমিয়েছি। অতএব, আমার যা কিছু প্রাপ্তি তা আমার শ্রমের ফল।'
এই ধারণা নিঃসন্দেহে ধ্বংসাত্মক। যে জিনিস আল্লাহ আপন অনুগ্রহে আপনার জন্য উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছেন, সেটা আপনি ভেবে নিয়েছেন নিজের উপার্জন। আর ভুলে গেছেন সেই মহান সত্তাকে!
আপনার ছোট্ট সোনামণির কথা চিন্তা করুন। সারাক্ষণ সে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখে, আনন্দ-খুশিতে ভরিয়ে তোলে। এত মধুর অঙ্গভঙ্গি আর কী সুন্দর কোমল ও কচি একটি মন! কত সহজ-সরল আর নিষ্পাপ!
ছোট্ট শিশুর সরলতা ও কোমলতার প্রতি লক্ষ করুন। আপনি তাকে ধমক দিলেন, তিরস্কার করলেন। একটু পরেই দেখবেন, সে আপনাকে জড়িয়ে ধরছে, আপনার গালে চুমো দিচ্ছে। তার মধ্যে আল্লাহ তাআলা পরম সুন্দর ও কোমল একটি হৃদয় দিয়েছেন। নিষ্পাপ ও পবিত্র একটি চাহনি দিয়েছেন। শিশুর কোমল হৃদয়ে আল্লাহ ঢেলে দিয়েছেন তার বাবা-মায়ের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। তার নিষ্পাপ চাহনিতে রেখেছেন এমন ভালো লাগা যা তার পিতা-মাতাকে বিমোহিত করে।
আমরা যখন আল্লাহর নাম আল-ওয়াহহাব নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমাদের চারপাশে আল্লাহপ্রদত্ত অসংখ্য নিয়ামত দেখতে পাই। তবে নিয়ামত চোখে দেখলেও আমরা জেগে উঠি না। অথচ আল্লাহর অনুগ্রহ অবলোকন করলে সাথে সাথেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

পরম মমতাময়ের পরম দান

দান-অনুদানের পরিমাণ যত বেশি হয়, উপহার-উপঢৌকনের মান যত উন্নত হয়, দাতাকে তত সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয়। কারো দান যদি হয় দৈনন্দিন, বৈচিত্র্যময় এবং অসীম-এমন মহৎ সত্তার জন্য শুধু 'দানশীল' ভূষণ বেমানান, তিনি মহাদাতা।
আপনার আত্মাকে জিজ্ঞেস করুন, আল্লাহ আমাদের কী দিয়েছেন? আপনার অন্তর্লোক থেকেই উত্তর বেরিয়ে আসবে। সর্বপ্রথম যে নিয়ামত আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন তা আপনার অস্তিত্ব। আজ পৃথিবী নামক এই গ্রহের আপনি একজন বাসিন্দা। কোনো এক শহরের, কোনো এক গলির, কোনো একটি বাসা আপনার। আপনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বলাভ করেছেন, পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে তার আলো-বাতাস গ্রহণ করেছেন, প্রভাব সৃষ্টি করেছেন, পৃথিবীকে প্রভাবিত করেছেন। আপনি পৃথিবীতে আপনার অস্তিত্ব এবং সুস্থতার নিয়ামত ভোগ করছেন। সুস্বাদু খাবার, পানীয় দ্বারা পরিতৃপ্ত হচ্ছেন। প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছ থেকে লাভ করছেন আত্মিক প্রশান্তি ও অনাবিল সুখ। এসবই আল্লাহর বিশেষ দান।
পৃথিবীতে মানুষ ও জীব বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তুটি হলো পানি। আল্লাহ তাআলা কী মহান নৈপুণ্যের মিশেলে সৃষ্টি করেছেন এই পানি। পানির কোনো রং নেই, স্বাদ নেই; নেই কোনো গন্ধ। আশ্চর্য ধরনের তারল্য দিয়ে আল্লাহ তা সৃষ্টি করেছেন। অতি সূক্ষ্ম লোমকূপের মধ্য দিয়েও তা চলাচল করতে পারে অনায়াসে।
পানির স্বাদ যদি মিষ্টি হতো তাহলে আমাদের সব ধরনের খাবার মিষ্টি হয়ে যেত। আল্লাহ যদি পানিকে চটচটে এবং আঠালো করে তৈরি করতেন, তাহলে আমরা কী দিয়ে আমাদের কাপড়চোপড় পরিষ্কার করতাম? আল্লাহর অসীম করুণা! তিনি পানি সৃষ্টি করেছেন কোনোরূপ স্বাদ, গন্ধ বা রং ছাড়াই! যেন জীবনের যেকোনো প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা যায় ঝামেলা ছাড়াই। সাধারণ অবস্থায় ১০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরম করলে পানি বাষ্পে পরিণত হয়। তাই রান্না করার সময় যদি ৫০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় চুলা জালানো হয়, তাহলে সব খাবার পুড়ে যাবে। পানি বাষ্পে পরিণত হওয়ার জন্য আল্লাহ যে তাপমাত্রা নির্ধারণ করেছেন, যদি এর চেয়ে বেশি করতেন তাহলে আমরা অনেক সংকটে পড়ে যেতাম। শীতকালে ঘর-দোর পরিষ্কার করার জন্য পানি ঢাললে তা শুকাতে গরমকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু আল্লাহ উপযুক্ত তাপমাত্রায় তা বাষ্পে পরিণত করেন। তাই আপনি যদি মেঝেতে এক গ্লাস পানি ঢেলে দেন, দেখবেন ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই তা বাষ্পে পরিণত হয়ে মেঝে শুকিয়ে গেছে। পানির এই বৈশিষ্ট্য আল্লাহর মহাদান এবং সৃষ্টি-নৈপুণ্যের দলিল।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে শ্রবণেন্দ্রিয় দান করেছেন। আপনার কর্ণকুহরে যে আওয়াজই প্রবেশ করছে, তা আপনি শুনতে পাচ্ছেন। তার ভাব-মর্ম উপলব্ধি করছেন। এমনকি মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় কোনটা কার কণ্ঠ, একজনের কণ্ঠের সাথে আরেকজনের কণ্ঠের কী পার্থক্য-তা-ও আপনি শব্দ শুনেই বুঝতে পারছেন। আপনার দৃষ্টির আড়ালে কিন্তু শ্রবণসীমার মধ্যে যখন কাচের গ্লাস পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তখন কেবল শব্দ শুনতেই আপনি চমকে যাচ্ছেন, কেঁপে উঠছেন। আপনার শ্রবণেন্দ্রিয়ের মধ্যে এই আশ্চর্য শক্তি যিনি দান করেছেন, তিনি পরম দাতা আল-ওয়াহহাব।
আপনি দৈনন্দিন সুস্বাদু বাহারি কত খাবার গ্রহণ করছেন! কী মনকাড়া চমৎকার সব ঘ্রাণ। পোলাও, বিরিয়ানি, মাংসের কত বাহারি সুবাস। যদি এসব সুস্বাদু খাবারগুলোর ঘ্রাণ দুর্গন্ধযুক্ত হতো তাহলে কেমন হতো? রান্না করা মাংস পচে গেলে কী দুর্গন্ধই না বের হয়! খাদ্যদ্রব্য ও সুস্বাদু খাবারগুলোতে যদি এমন দুর্গন্ধ হতো, তাহলে কি কখনো তা খাওয়া সম্ভব হতো? কিন্তু মহান আল্লাহ আপন অসীম প্রজ্ঞা ও সৃষ্টির প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার কারণে উত্তম খাবারগুলোতে দান করেছেন সুঘ্রাণ। আর অখাদ্য, কুখাদ্যে এবং পচা-বাসি খাবারে দিয়েছেন দুর্গন্ধ।
প্রবহমান মনোরম বায়ু তিনিই পরিচালনা করেন। বাতাসের স্পর্শে মানুষ হৃদয়ের শীতলতা অনুভব করে। সতেজতায় ভরে যায় তার দেহ-মন। আবার কখনো আবহাওয়া পরিবর্তন হয়, বাতাসে ধূলি-কণা বা ময়লা-আবর্জনার সংমিশ্রণ থাকে, দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস প্রবাহিত হয় তখন মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যায়। পরিচ্ছন্ন, নির্মল বায়ু আল্লাহর মহাদান।
মানুষ, জীব-জন্তু, প্রাণী ও সবুজ তরুলতার জন্য আল্লাহ তাআলা পানির প্রবাহ এবং তা সংরক্ষণের চমৎকার ব্যবস্থা করেছেন। পানি-সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব মানুষের হাতে ছেড়ে দিলে তারা রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠত। এমন সুন্দর ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো না। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমি বৃষ্টি-সঞ্চারী বায়ু প্রেরণ করি, অতঃপর আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করাই। আর তোমরা এর সংরক্ষণকারী নও।' [১]
একবার আমি পানি সংরক্ষণের হিসাব কষতে গিয়ে যারপরনাই অবাক হয়েছি। গবেষণায় উঠে এসেছে, কেউ যদি এক বছরের জন্য প্রয়োজনীয় পানিটুকু সংরক্ষণ করতে চায়, তাহলে তার বাসভবনের সমপরিমাণ জায়গা নিয়ে পানি সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ আপনার বাড়ি যদি ৮০০ বর্গমিটার ক্ষেত্রফলের হয়, তাহলে এক বছরের পানি সংরক্ষণের জন্য ৮০০ ঘনমিটার আয়তনের পানি মজুদ করতে হবে। এ দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেছেন, 'আর তোমরা পানির সংরক্ষণকারী নও।'
পর্বত থেকে নেমে আসা ঝরনাধারা এবং তা থেকে সৃষ্ট নদ-নদীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা পানির ভার রক্ষণের যে বিশাল ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছেন তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। কিন্তু মহান আল্লাহর জন্য তা কঠিন কিছু নয়। তিনি মহান স্রষ্টা। সৃষ্টির প্রতি মমতাময়, উদার ও দানশীল; আল-ওয়াহহাব।

যিনি দান করেন বিনিময় ছাড়া

আপনাকে কেউ বলল, আমি তোমাকে এই বইটি উপহার দিলাম একশো টাকার বিনিময়ে। সে এখানে উপহার শব্দ ব্যবহার করলেও বাস্তবে ও শরিয়তের দৃষ্টিতে এটা বিক্রয়। শুধু শব্দের কারণে বাস্তবতা পরিবর্তন হবে না।
আরেকজন আপনাকে বলল, তোমার কাছে এই বইটি বিক্রি করলাম কোনো বিনিময় ছাড়াই। এটা উপহার। সে বিক্রি শব্দ ব্যবহার করলেও এটা উপহার। উপহার অথবা দান-এসব তখনই হতে পারে যখন তা হবে বিনিময় ছাড়া।
সম্পত্তির মালিকানা স্থানান্তর ওপর সরকার কর আরোপ করে। জনগণ এই করের হাত থেকে বাঁচার জন্য ‘প্রকাশ্যে উপহার এবং গোপনে মূল্য পরিশোধ’ নীতিতে জমি ক্রয়-বিক্রয় শুরু করে। কিছু দিন যেতে না যেতেই সরকার চালাকিটা বুঝে ফেলে। তখন সরকার উপহারের মাধ্যমে মালিকানা স্থানান্তরের ওপরও কর আরোপ করে। কারণ প্রকৃতপক্ষে এটা উপহার নয়; বিক্রয়। তার মানে উপহার বা দান তা-ই, যা বিনিময় ছাড়া করা হয়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে যা কিছু দেন তা কোনো ধরনের বিনিময় ছাড়াই প্রদান করেন। আল-গায্যালী নামের শব্দমূলে রয়েছে ‘হিবা’। আর হিবা হচ্ছে বিনিময় ছাড়া দান।

যিনি উপহার দেন নেককার সন্তান

এক ব্যক্তির কয়েকজন সন্তান আছে। একটি ছেলে নম্র, ভদ্র এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী। ধর্মীয় ও পার্থিব উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। বাবা যদি তার ব্যাপারে গর্ব করে বলে, ‘আমি অনেক কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছি। অনেক টাকা-পয়সা ব্যয় করে পড়াশোনা করিয়েছি। তাই ও আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে’। কথাটা ভুল না শুদ্ধ?
আমার দৃষ্টিতে সে ভুল বলেছে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি তাকে (ইবরাহিম আলাইহিস সালাম) দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়াকুব। তাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম এবং তাঁর বংশধর দাউদ, সুলায়মান ও আইয়ুব; ইউসুফ, মুসা ও হারুনকেও। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করি।’
অর্থাৎ কোনো বিনিময় ছাড়াই তিনি তাদেরকে দান করেছেন। বিনিময় ছাড়াই তাদেরকে হিদায়াত দিয়েছেন।
আপনি আপনার সন্তানের পিছনে একটু পরিশ্রম করেই ভেবে নিয়েছেন, সে আপনার পরিশ্রমের ফল। কিন্তু কত সন্তান এমনও রয়েছে যারা ওদের মা-বাবার চোখের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে, পরিবারে অশান্তি ডেকে আনছে। মা-বাবা যত কিছুই বলুক বা যেভাবেই শাসন করুক না কেন, তারা কোনোভাবেই সোজা হতে রাজি না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক বড় বড় আলিম রয়েছেন, যারা জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করেন, অথচ তাদের সন্তানরাই কিনা বিপথে চলে গিয়েছে। আমি মসজিদে নববির একজন ইমাম সম্পর্কে শুনেছি, তার ছেলেটা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। তার সামনে ছেলের কথা উল্লেখ করলেই তিনি আর কান্না থামাতে পারতেন না।
তাহলে বোঝা গেল, এটা নিছক নিজ হাতে উপার্জন করে নেওয়ার বস্তু নয়। সফল বাবা হওয়ার সৌভাগ্য আল্লাহ তাআলাই দান করেন। সন্তান যদি নিজে ভালো হওয়ার চেষ্টা না করে, তবে যতই তার তত্ত্বাবধান করুন না কেন, সে বিপথগামী হবেই। তাই যদি আল্লাহ তাআলা আপনাকে অনুগত, শান্ত-শিষ্ট একটি সন্তান দান করেন, তাহলে গর্ব নয়; বরং কৃতজ্ঞতায় মস্তক অবনত করুন মহান রবের সামনে। আপনার কাছ থেকে কোনো ধরনের বিনিময় নেওয়া ছাড়াই আল্লাহ এটা দান করেন।
মানুষও মাঝে মাঝে পার্থিব বিনিময় ছাড়াই কাউকে কিছু দান করে। কিন্তু বস্তুগত ও বাহ্যিক কোনো বিনিময় না নিলেও সে অন্যভাবে প্রতিদানের আশা করে। সে মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা-স্তুতির আশা করে। কখনো কখনো জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে ভারী অঙ্কের অনুদান দেয়, বাহ্যত সে কোনো প্রতিদান চায় না। কিন্তু তার অঘোষিত প্রবল ইচ্ছা থাকে জনগণের সামনে তার এই অনুদানের কথা ঘোষণা করা হোক। এই অনুদান বাহ্যত অনুদান মনে হলেও তা মূলত বিনিময় চুক্তিরই অতি সূক্ষ্মরূপ। একমাত্র আল্লাহই দান করেন কোনো প্রতিদান চাওয়া ছাড়া। দুনিয়াতে কেউ আপনাকে বিনিময় ছাড়া কিছুই দেবে না। কেবল আল্লাহর মুমিন বান্দাগণ যা করেন, বিনিময় ছাড়া করেন। তবে তারা তাদের কল্যাণমূলক কাজের প্রতিদান প্রত্যাশা করেন তাদের রবের নিকটে। আর যে রবের নিকট প্রতিদান প্রাপ্তির পূর্ণ বিশ্বাস রাখে, সে কখনো কোনো মানুষকে একটু উপকার করে প্রতিদান চেয়ে বসে না।
যারা বিচক্ষণ তারা অনুগ্রহ করে, মানুষের কাছ থেকে এর প্রতিদানের আশা করে না। তারা শুধু আল্লাহর সন্তষ্টি কামনা করে। জান্নাতের প্রত্যাশা করে। আল্লাহর কাছে তাদের জন্য যে প্রতিদান গচ্ছিত রয়েছে তার জন্যই শুধু ব্যাকুল হয়ে থাকে। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো মানুষকে নিঃস্বার্থ দানকারী বলা যায় না।
আপনাকে কেউ কিছু দান করলে আপনি হয়তো তাকেই মূল দাতা ভেবে বসে থাকবেন। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, আপনাকে দান করার অনুপ্রেরণা তার মনে কোথা থেকে এলো?
একজন আল্লাহভীরু আলিমের ঘটনা
সিরিয়ার ‘তারাবুলুস’-এ একজন বিজ্ঞ আলিম ছিলেন। তিনি ভাড়া বাসায় থাকতেন। কোনো কারণে বাড়ির মালিক তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইলেন। আইনও তার পক্ষে ছিল, সে আলিমের নামে মামলা করে তার দাবি প্রমাণও করে ফেলেছিল। অতএব, আলিমের জন্য সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আবার এই বাসা ছাড়া তার অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গাও ছিল না। এরপর যা ঘটল তা সত্যিই অবাক করা একটি ঘটনা!
তারাবুলুসেরই একজন ধনী ব্যক্তি স্বপ্নে দেখলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, অমুক লোকটির জন্য একটি বাড়ি ক্রয় করে দাও।
ঘুম থেকে পড়িমরি করে জেগে উঠল সে। তার কাছে ব্যাপারটি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। তবু আলিমকে খুঁজতে শুরু করল এবং পেয়েও গেল। আলিমের কাছে এসে আবদার জানাল, ‘আপনি আপনার মনমতো যেকোনো একটি বাড়ি পছন্দ করুন। ইনশাআল্লাহ আমি অর্থের ব্যবস্থা করব।’
মাঝে মাঝে এমন হয় যে, আপনি সরকারি, বেসরকারি কোনো অফিসে গেছেন, সেখানকার দায়িত্বরত কর্মকর্তার সামনে দাঁড়াতেই বলে দেয়, ‘ঠিক আছে, হয়ে যাবে।’ কোনো ঝামেলা ছাড়াই আপনার প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ায় আপনি আপ্লুত হন। কিন্তু ভেতর থেকে মূলত আল্লাহই এই ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহ যখন আপনাকে পরীক্ষায় ফেলতে চান, আপনার কোনো অসংগতি সংশোধন করতে চান, তখন আপনার সামনে হাজার বাধা উপস্থিত করে দেন। তখন অফিসিয়াল একটি প্রয়োজন সারতেই কারো স্বাক্ষরের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে হয়।
অতএব, আপনাকে কেউ কিছু দিলে মনে মনে নিশ্চিত বিশ্বাস করুন যে, আল্লাহ তাআলাই তার অন্তরে আপনাকে দেওয়ার প্রেরণা তৈরি করেছেন। অফিস কর্মকর্তার মনে আপনার প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলেছেন। তিনিই তার মনে আপনার প্রতি শিথিলতা প্রদর্শনের কারণ সৃষ্টি করেছেন।

কৃতজ্ঞ থাকুন মানুষের প্রতি

আপনার প্রতি কেউ অনুগ্রহ করলে, কেউ আপনাকে উপকার করলে কিংবা কেউ আপনাকে কিছু উপহার দিলে আপনি অবশ্যই তার শুকরিয়া জানাবেন। তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করবেন। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ হয় না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হয় না।'[১]
কারণ যে মানুষটি আপনার একটু উপকার করল, আপনার প্রতি অনুগ্রহ করল, সে কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ। আপনার যেমন কোনো কাজ করা না-করার ইচ্ছাশক্তি রয়েছে, তেমনি তারও রয়েছে। এটা অবশ্য ঠিক যে, আপনাকে সেবা দেওয়া বা আপনার প্রতি অনুগ্রহ করার মানসিকতা তাকে আল্লাহ তাআলাই দিয়েছেন। কিন্তু তারপর কাজ করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা তাকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। সে চাইলে কাজটি না-ও করতে পারত। সে যেহেতু কাজটি করা না করার ক্ষেত্রে স্বাধীন ছিল, তাই যখন সে আপনার কাজ করে দিলো, তখন সেও কৃতজ্ঞতা পাওয়ার যোগ্য হয়ে গেল। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কেউ আল্লাহর নামে তোমাদের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তোমরা তাকে আশ্রয় দাও। কেউ আল্লাহর নামে তোমাদের কাছে কিছু চাইলে তোমরা তা দিয়ে দাও। কেউ তোমাদের প্রতি উত্তম আচরণ বা অনুগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে প্রতিদান দাও। যদি প্রতিদান দেওয়ার মতো কোনো কিছু না পাও, তাহলে তার জন্য এত বেশি দুআ করতে থাকো, যাতে তোমাদের অন্তর সাক্ষ্য দেয় যে, তোমরা তার প্রতিদান দিতে পেরেছ।'[২]
ওপরের হাদিসে কী উত্তম শিষ্টাচারই না শিক্ষা দেওয়া হয়েছে! কিন্তু আমরা কতজন এর প্রতি লক্ষ রাখি? অনেকেই মনে করে, কেউ কোনো উপকার করলে তাকে শুধু জাযাকাল্লাহ, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন, আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন ইত্যাদি কিছু দুআ শুনিয়ে দিলেই সে তার প্রতিদান আদায় করে ফেলল। কিন্তু হাদিসের মূল শিক্ষা হলো, কেউ আপনাকে কোনো সেবা দিলে, অনুগ্রহ করলে আপনার দায়িত্ব তাকে এর বিনিময় দেওয়া। তবে একান্ত অপারগতার কারণে প্রতিদান দিতে অক্ষম হলে তার জন্য দুআ করুন। এখন দুআ করে দিলেও তা আল্লাহর নিকট বিনিময় বলেই গণ্য হবে।
আবু ফিراس রাবিআ ইবনু কাব আসলামি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে মাঝে মাঝে রাতের বেলায় অবস্থান করতাম। আমি তার কাছে ওজুর পানি এবং প্রয়োজনীয় বস্তু এনে দিতাম। (একদিন তিনি খুশি হয়ে) বললেন, 'তুমি কী পেতে চাও বলো।' আমি বললাম, 'আমি আপনার কাছে জান্নাতে আপনার সাহচর্য চাই।' তিনি বললেন, 'এ ছাড়া আর কিছু?' আমি বললাম, 'এটাই আমার নিবেদন।' তিনি বললেন, 'তাহলে তুমি অধিক পরিমাণে সিজদার মাধ্যমে (অর্থাৎ প্রচুর নফল নামায পড়ে) তোমার (এ আশা পূরণের) জন্য আমাকে সাহায্য করো।'[১]
জীবনে আপনি যে সকল ভালো কাজ করেছেন সেগুলো স্মরণ করবেন না। আবার আপনার প্রতি মানুষ যে ভালো আচরণ করেছে তা কখনো ভুলে যাবেন না। আপনি কাউকে সেবা করলেন, তখন আপনার মানবিক মহত্ত্বের দাবি আপনি তা ভুলে যাবেন। এমনভাবে ভুলে যাবেন, যেন আপনি কিছুই করেননি। কারণ, আপনি আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাওয়ার জন্যই করেছেন। তাহলে সেটা মনে রেখে লাভ কী? মনে রাখলে হয়তো কেউ আপনার অনুগ্রহ স্বীকার করবে, আপনি আপ্লুত হবেন। অথবা অস্বীকার করলে আপনি মনঃক্ষুণ্ণ হবেন। কিন্তু যে কাজ আপনি আল্লাহর জন্য করেছেন তাতে কষ্ট পাওয়ার কী আছে? আপনি কী মানুষের বাহবা পাওয়ার জন্য করেছেন? তাই নিজের অনুগ্রহকে ভুলে যান। সুমহান আল্লাহ বলেন-

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا ۞ إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا ۞

পুণ্যবান বান্দাগণ খাবারের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও ইয়াতিম, মিসকিন ও বন্দিদের খাবার দান করে এবং বলে, 'কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে খাবার দান করি। আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান আশা করি না; কোনো কৃতজ্ঞতাও কামনা করি না।'[২]

তাই আপনার অনুগ্রহকে আপনি মনে রাখার চেষ্টা করবেন না। কিন্তু আপনার প্রতি কেউ অনুগ্রহ করল আর আপনি তা ভুলে গেলেন, এটা অনেক বড় অপরাধ। আল্লাহ তাআলাই তার অন্তরে আপনার প্রতি অনুগ্রহের বোধ জাগ্রত করেছেন। কিন্তু সে কাজটি করেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি ব্যয় করে। সে বলতে পারত, 'আমার দ্বারা সম্ভব নয়। আমি কাজটি করতে পারব না।'
ইচ্ছাধিকার থাকা সত্ত্বেও সে আপনার কাজটি করে দিয়েছে। অতএব, সেও শুকরিয়া পাওয়ার যোগ্য এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়াও নবিজির নির্দেশ।
আপনি জীবনে এমন অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন যে, হঠাৎ কেউ একজন এসে আপনার কোনো কাজ করে দিয়েছে অথচ আপনি তাকে চেনেনও না। সে আপনার সামনে এসে ভালোবাসায় বিগলিত হয়ে আপনার প্রয়োজন পূরণ করে দিলো। তখন নিশ্চয় একজন ভদ্র মানুষ তাকে ধন্যবাদ জানাবে। এবং বিস্মিত হয়ে বলে উঠবে, আল্লাহুম্মা রব্বানা লাকাল হামদ।
আয়িশা সিদ্দিকা রাযিয়াল্লাহু আনহার ব্যাপারে যখন মুনাফিকরা অপবাদ ছড়িয়ে দিলো, আল্লাহর নবিও কিছুটা দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেলেন। কিন্তু পরবর্তীতে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে তার পবিত্রতার ঘোষণা দিয়ে আয়াত নাযিল করলেন। আয়াত নাযিল হওয়ার পর, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু আয়িশাকে লক্ষ করে বললেন, নবিজির কাছে যাও। তিনি সোজা জানিয়ে দিলেন, 'আমি কারো কাছে যাব না। আমি শুধু আল্লাহকেই শুকরিয়া জানাব, যিনি আমার পবিত্রতার ঘোষণা দিয়েছেন।' [১]
চাপা ক্ষোভ আর অভিমানে এতদিন তিনি অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে এসেছেন। তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রায় নীরব ভূমিকা তিনি মেনে নিতে পারেননি। পরে অভিমান ভেঙে গেলে তিনি রাসুলুল্লাহর সাথেই গিয়েছেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে, তার ব্যাপারে কুরআনে আয়াত নাযিল করা হবে, মসজিদে মসজিদে সালাতের কিরাআতে তা তিলাওয়াত করা হবে। কিন্তু তার জন্য যা ছিল কল্পনাতীত, সেটাই আল্লাহ তাআলা বাস্তব করে দেখিয়েছেন। তাই তার মনের গভীর থেকে তখন শুধু আল্লাহর জন্যই শুকরিয়া বেরিয়ে এসেছে।

কোনো একটা ব্যাপারে একবার একজন লোক রাসুলুল্লাহকে বলল, 'আল্লাহ এবং আপনি যা চাইবেন তা-ই হবে।' নবিজি সাথে সাথে লোকটিকে সংশোধন করে দিয়ে বললেন, 'তুমি আমাকে আল্লাহর সাথে শরিক করলে? বলো, আল্লাহ যা চান তা-ই হবে।' [১]
অতএব, সবকিছুর দাতা একমাত্র আল্লাহ। তিনি যা দান করেন বিনিময় ছাড়াই দান করেন। কোনো মধ্যস্থতা, কৌশল অবলম্বন করা ছাড়াই দান করেন। চাওয়া ছাড়াই দান করেন। বান্দার অবাধ্যতার কারণে নিয়ামতকে ছিনিয়ে নেন না।
তাই সব কাজের প্রকৃত প্রশংসার অধিকারী আল্লাহ। তিনিই উদার দানশীল, আল-ওয়াহহাব।
একজন মুমিন হিসেবে যখন আপনি নিশ্চিত বিশ্বাস করেন যে, সকল নিয়ামত, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আল্লাহর পক্ষ থেকেই, তখন আল্লাহর সামনে লুটিয়ে পড়ুন। তাঁর জন্যে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সিজদা আদায় করুন। হৃদয়ের গভীর থেকে শুকরিয়া জানান। আল্লাহর শোকরের তিনটি ধাপ রয়েছে। এই তিন ধাপে উত্তীর্ণ হোন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের চেতনায়।
এক. অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করুন, আমরা যে নিয়ামত ভোগ করি, সুখময় জীবন উপভোগ করি এর সবকিছুই আল্লাহর দান।
দুই. আল্লাহর প্রশংসায় নত হয়ে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে ফেলুন আপনার হৃদয়।
তিন. আল্লাহর বান্দাদের সেবায় অংশ নিন। তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দিন। দুঃখ-দুর্দশা ঘুচিয়ে চেষ্টা করুন তাদের মুখে একটু হাসি ফোটাতে।
আপনি নিশ্চিত থাকুন যিনি দুনিয়াকে অসংখ্য অনুগ্রহের ফুল-ফসলে সবুজ শ্যামল বানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আখিরাতেও আপনাকে বঞ্চিত করবেন না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ

অনুগ্রহের প্রতিদান অনুগ্রহ ছাড়া আর কী হতে পারে? [১]
বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতায় রয়েছে, ততক্ষণ আল্লাহ তার সহযোগিতায় রয়েছেন।
আমার পরিচিত এক ভাই ছিল। সে নিজের কর্মস্থলেই একটি কারিগরি কাজ করত। তার মাসিক আয় ছিল মাত্র দু-হাজার পাউন্ড। তার এক দ্বীনি ভাই হঠাৎ চাকরি হারিয়ে নিরুপায় হয়ে পড়ে। এরপর সে প্রথম ভাইটির কাছে এসে তার অসহায়ত্বের কথা জানায়। সে তাকে ফিফটি পার্সেন্ট লাভে তার সাথেই কাজ করার সুযোগ দেয়। আল্লাহর কী অপার মহিমা! প্রথম মাস থেকেই লোকটি তার গড়পড়তা আয়ের দশগুণ বেশি আয় করতে শুরু করে।
বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত দরিদ্র একজন সাহাবি। তারপরও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, 'বিলাল! খরচ করো, কখনো মহান আরশের অধিপতির সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কোরো না।'[২]

টিকাঃ
[১] প্রকৃত সত্যের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
[১] সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবাহ: ১৩
[২] সুরা আনফাল, আয়াত: ২
[১] সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৩১
[১] সুরা বালাদ, আয়াত: ৮
[১] সুরা বালাদ, আয়াত: ৮-১০
[২] রিফ্লেক্স বা প্রতিবর্ত ক্রিয়ার এই তত্ত্বটি বাইরের কিছুর সংস্পর্শে জীবের প্রতিক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করে।
[১] সুরা হিজর, আয়াত: ২২
[১] মুসনাদু আহমাদ: ১১৩০০
[২] সুনানু আবি দাউদ: ১৬৭৪
[১] সহিহ বুখারি: ৪৮৯; জামি তিরমিজি: ৩৪১৬, সুনানুন নাসায়ি: ১১৩৮, ১৬১৮, সুনানু আবি দাউদ : ১৩২০; সুনানু ইবনু মাজাহ : ৩৮৭৯; মুসনাদু আহমাদ: ১৬১৩৮; রিয়াযুস সালেহিন : ১০৮
[২] সুরা দাহর, আয়াত: ৮-৯
[১] সহিহ বুখারি: ২৬৬১
[১] সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৮০
[১] সূরা রাহমান, আয়াত : ৬০
[২] সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহিহাহ : ২৬৬১

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-আজিজ : মহাপরাক্রমশালী, অপরাজেয়, দুর্লভ

📄 আল-আজিজ : মহাপরাক্রমশালী, অপরাজেয়, দুর্লভ


পৃথিবীতে কোনো মানুষ যত বড় ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোক না কেন, কাউকে ক্ষমা করতে গিয়ে স্বজনপ্রীতি, অদূরদর্শিতা বা অন্য কোনো কারণে সে ভুল করতে পারে। এজন্য কখনো তাকে দাঁড়াতে হতে পারে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায়। তুমি তাকে কেন ক্ষমা করেছ? কেন তাকে শাস্তি দিলে না? কেন তার ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করলে? নানা প্রশ্নে জর্জরিত করা হতে পারে তাকে। কিন্তু মহান আল্লাহ এমন পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় যে, বান্দাকে ক্ষমার ক্ষেত্রে তিনি কখনো ভুল করেন না। আবার তিনি কাউকে ক্ষমা করে দিলে তাতে প্রশ্ন তোলার অধিকার কারো নেই। কারণ তিনি আল-আজিজ, মহাপরাক্রমশালী।

☆☆☆

কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামের একটি দুআ উল্লেখ করেছেন, যেখানে আল-আজিজ নামটি ব্যবহৃত হয়েছে মহাপরাক্রমশালী অর্থে—

إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

(হে আমার রব!) যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন, তবে তারা তো আপনারই বান্দা। আর যদি তাদের ক্ষমা করেন, তবে আপনি তো মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় [১]

আয়াতের প্রকাশভঙ্গি কারো কাছে অসংলগ্ন মনে হতে পারে। কারণ বাহ্যিক দৃষ্টিতে ক্ষমার সাথে পরাক্রমের সম্পর্ক নেই। বরং ক্ষমার সাথে আয়াতের প্রকাশভঙ্গি এমন হওয়াই অধিক সংগত ছিল যে- 'যদি আপনি তাদের ক্ষমা করে দেন, তবে তো আপনি ক্ষমাশীল, করুণাময়।'
কিন্তু কুরআনুল কারিমে বর্ণিত ঈসা আলাইহিস সালামের এই দুআর ভাষাশৈলী, অনন্যতা ও প্রকাশভঙ্গির অলংকার লক্ষ করুন। এখানে ক্ষমার সাথে ক্ষমাশীল এবং করুণাময় সংযুক্ত না করে বরং পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় উল্লেখ করা হয়েছে।
কারণ, আল্লাহ যদি চরম অপরাধীকেও বিনা শর্তে ক্ষমা করে দেন, তবে পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহকে বাধা দিতে পারবে কিংবা তাঁর ক্ষমা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে-

لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ

তিনি যা করেন সে বিষয়ে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না; বরং তারাই প্রশ্নের সম্মুখীন হবে [১]

এভাবে কুরআনের বহু জায়গায় আমরা পরাক্রমশালী অর্থে আল-আজিজ নামটির ব্যবহার দেখতে পাই-

... إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انتِقَامٍ

যারা আল্লাহর নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, দণ্ডদাতা (প্রতিশোধগ্রহণকারী) [২]

অর্থাৎ যারা আল্লাহর সাথে কুফরি করে, আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে অস্বীকার করে, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা এই ঔদ্ধত্যের কারণে কঠিন শাস্তি দেবেন। দুনিয়াতে তারা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আল্লাহ হলেন মহাপরাক্রমশালী, সকল শক্তিধরের চেয়ে শক্তিশালী, অসীম ক্ষমতাধর। তিনি প্রতিশোধগ্রহণকারী। অতএব, যারাই অবাধ্য হবে, সেই অবাধ্যতার শাস্তি তাদের পেতেই হবে।
নিচের আয়াতগুলোতে আল্লাহর মহাপরাক্রমের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পূর্ণ মাত্রায়-

وَلَهُ الْكِبْرِيَاءُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে গৌরব-গরিমা তাঁরই এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [১]

يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ

তারা বলে, 'আমরা মদিনায় প্রত্যাবর্তন করলে সেখান থেকে সবল ব্যক্তি অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কার করবে।' কিন্তু শক্তি তো আল্লাহরই, আর তাঁর রাসুল ও মুমিনদের। তবে মুনাফিকরা এটা জানে না।[২]

سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ

তারা যা আরোপ করে তা থেকে আপনার রব পবিত্র ও মহান, যিনি সকল ক্ষমতার অধিকারী।[৩]

قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ

সে (ইবলিস) বলল, আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি তাদের সবাইকেই পথভ্রষ্ট করব।[৪]

তিনি অপরাজেয় এবং অপ্রতিহত

মানুষ কখনো বিজয়ী হয়, কখনো তাকে পরাজয় বরণ করে নিতে হয়। কিন্তু এমন এক সত্তা আছেন, যিনি কখনো পরাজিত হন না, যাকে কেউ ঘায়েল করতে পারে না, যার ওপর অন্য কারো বিজয়ী হওয়া অসম্ভব। তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত আল-আজিজ; অপরাজেয় এক প্রভু। মহান আল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন-

... وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ )

আল্লাহ তাঁর কার্যসম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না [১]

আল্লাহ নিজে ঘোষণা করেছেন, তিনি স্বীয় কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।
মানুষ যদি জানত এবং নিশ্চিত বিশ্বাস করত যে, আল্লাহ নিজ কার্যসম্পাদনে অপ্রতিহত, তাহলে অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করত। ভরসা করত একমাত্র তাঁর ওপর। নিবিষ্ট হতো একমাত্র তাঁরই অভিমুখে। আর বর্জন করত আল্লাহ ছাড়া সমস্ত উপাস্য।

দুর্লভ ও অনন্য সেই সত্তা

কোনো সত্তা বা বস্তু দুর্লভ হিসেবে বিবেচিত হয় মানুষের প্রয়োজন অনুসারে। যেমন : কোনো দেশে একটি বিরাট খনি আবিষ্কৃত হলো। এমন খনি পৃথিবীর আর কোথাও নেই। কিন্তু সেখানকার খনিজ পদার্থ মানুষের খুব একটা কাজে আসে না। তার মানে খনি বিরল হলেও তা দুর্লভ হিসেবে বিবেচিত নয়।
আবার দেশের রাষ্ট্রপ্রধান একজনই হয়। তাই অন্যদের তুলনায় সে অনন্য। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে, তার কাছে সকল জনগণের প্রয়োজন নেই। তার দেশের প্রতিটি প্রান্তে, সীমান্ত অঞ্চলে এমন অনেক রাখাল আর যাযাবর লোক পাওয়া যাবে যারা ছোট্ট একটি তাঁবু বা কুঁড়েঘরে বাস করে। পশুপাল, প্রাকৃতিক খাবার, নদী-ঝরনার পানি-এসব নিয়েই তাদের পৃথিবী। একদিনের জন্যও রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। তাই রাষ্ট্রপ্রধানকে ঠিক দুর্লভ বা অনন্য বলা চলে না।
অপরদিকে মহান আল্লাহর ব্যাপারে চিন্তা করে দেখুন। বিশ্বজগতের সবকিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী। প্রতিটি জিন-ইনসান, উদ্ভিদ-প্রাণী, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ, ছায়াপথ, গ্যালাক্সি-সবই আল্লাহর অনুগ্রহের কাঙাল। তাঁর প্রতি সবকিছুর প্রয়োজন এতটাই তীব্র আর অধিক যে, কোনো কিছুই তাঁর নির্দেশ ব্যতীত টিকে থাকতে পারে না।
আমাদের দু-চোখের মাঝে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার নিখুঁত ব্যবস্থাপনার কথাই ধরা যাক। আমরা কোনো বস্তু তখনই দেখতে পাব, যখন বস্তুটি থেকে আলোকরশ্মি আমাদের চোখে এসে পড়ে। কিন্তু কীভাবে আমরা দেখতে পাই তা কি কখনো ভেবেছেন আপনি? আলোকরশ্মি প্রথমে আমাদের চোখের কর্নিয়া ভেদ করে পিউপিলের মধ্য দিয়ে লেন্সে গিয়ে পড়ে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, কর্নিয়া হচ্ছে খুবই স্বচ্ছ আর পাতলা একটি পর্দা, যা চোখের আবরণ হিসেবে কাজ করে। পিউপিলের আরেক নাম চোখের মণি; চোখের ঠিক মাঝখানে কালো রংয়ের ছোট্ট একটি বিন্দু। পিউপিল মূলত একটা ছিদ্র। এই ছিদ্রের পেছনেই থাকে একটি দ্বি-উত্তল লেন্স।
লেন্সের কারণে আগত আলোকরশ্মি প্রতিসরিত হয়ে রেটিনায় আছড়ে পড়ে। ফলে রেটিনার ওপর বস্তুর একটি উল্টো প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। উল্লেখ্য, চোখের পেছন দিকের একটি পাতলা স্তরের নাম রেটিনা। এখানে রয়েছে লক্ষ লক্ষ নিউরন আর অগণিত আলোক সংবেদী কোষ। রেটিনায় সৃষ্ট প্রতিবিম্বটি আলোক সংবেদী কোষগুলোকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। এ উদ্দীপনা বাইপোলার কোষ, গ্যাংলিয়ন কোষ ও অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কের ভিজুয়াল কর্টেক্সে গিয়ে পৌঁছায়। মস্তিষ্ক তখন উল্টো প্রতিবিম্বটি পুনরায় উল্টে দেয়। এতে করে আমরা বস্তুটিকে সোজা দেখতে পাই।
এভাবে শুধু চোখ নয়; আপনার নাক, কান, জিহ্বা, মস্তিষ্ক, ধমনি, হাড়, মাংস ও মাংসপেশী সবক্ষেত্রেই আপনি আল্লাহর করুণার মুখাপেক্ষী। আল্লাহর কুদরত ব্যতীত সবকিছুই স্থবির, নিশ্চল।

তাই তো আল্লাহ তাআলা হচ্ছেন আল-আজিজ, যার একটি অর্থ-অনন্য, দুর্লভ। যার সাদৃশ্য নেই, যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো কিছু নেই। তিনি এমন 'দুর্লভ' এক সত্তা, যার কোনো দৃষ্টান্ত নেই, কোনো সমকক্ষ নেই। বরং সুস্থ বিবেক- বিবেচনার দর্পণে তাঁর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা তাঁর কোনো সমকক্ষ থাকাই কল্পনাতীত।

প্রকৃত সম্মানদাতা কেবলই তিনি

আল-আজিজ নামের আরেকটি অর্থ রয়েছে, যা অতিসূক্ষ্ম ও তাৎপর্যময়। আল-আজিজ মানে সম্মানদাতা। এ অর্থের বিবেচনায় এটা আল্লাহর কর্মবাচক নাম। অর্থাৎ যিনি সম্মান দান করেন। সম্মান, অপমান সবই তাঁর কর্তৃত্বাধীন। সুমহান আল্লাহ বলেন-

قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاءُ وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ )

বলুন, 'হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন, আর যাকে ইচ্ছা তাকে আপনি লাঞ্ছিত করেন। কল্যাণ আপনার হাতেই। নিশ্চয় আপনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।[১]

আন্দালুসের শেষ সম্রাট আন্দালুস ছেড়ে যাওয়ার সময় কাঁদতে শুরু করল। তখন তার মা আয়িশা বলল, 'কাঁদো! নারীদের মতো কাঁদতে থাকো। ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্রটিকে তুমি পুরুষদের মতো রক্ষা করতে পারোনি।'
সত্যিই তো! সেই মানুষের মূল্য কোথায়, আল্লাহ যাকে বর্জন করেছেন! আল্লাহই যার ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছেন!
আপনার জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ আপনার ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও সম্মান। জীবনে মর্যাদা ও মূল্যবোধ ছাড়া বেঁচে থাকাটা খুবই কষ্টকর। যদি আপনি আল্লাহর সাথে থাকেন, আল-আজিজের সঙ্গী হোন, তবে তিনিই আপনাকে সম্মানিত করবেন। তিনিই আপনার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন।

মহান আল্লাহ বলেন-

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَن يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِن مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ )

আপনি কি দেখেন না, আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই আল্লাহকে সিজদা করে? এবং চন্দ্র-সূর্য, নক্ষত্রপুঞ্জ, পর্বতমালা, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু ও মানুষের মধ্যে আরও অনেকেই সিজদা করে? আবার অনেকের প্রতি অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে লাঞ্ছিত করেন, কেউ তাকে সম্মানিত করতে পারে না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন (১]

আল্লাহকে পরিপূর্ণভাবে কেউই জানতে পারে না। একমাত্র আল্লাহই নিজ সত্তাকে পূর্ণ ও সঠিকভাবে জানেন। আপনার দায়িত্ব হলো আল্লাহর পরিচয় জানার পর তাঁর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা; মনিব-ভৃত্যের সম্পর্কের মতো। আল্লাহর আদেশ ও বিধি-বিধানের ওপর অটল, অবিচল থাকুন; সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান- অবশ্যই আপনি পৌঁছে যাবেন আল্লাহর অতি নিকটে।

এক যুবকের বিচিত্র প্রেম

একবার এক যুবক একটি মেয়ের প্রেমে পাগল হয়েছিল। মেয়েটির বাবা ছিলেন আলিম। তিনি ছেলেটিকে বললেন, 'এক শর্তে তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে। মসজিদে কুরআনের তাফসির-বিষয়ক যে দারসগুলো অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে তোমাকে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে হবে।' মেয়ের বাবার কথামতো যুবকটি দারসে উপস্থিত হতে লাগল। একপর্যায়ে সে তাফসিরের দারসে এত বেশি মগ্ন হয়ে গেল যে, মেয়েটির কথা ভুলেই গেল।
মেয়েটি একদিন এই মর্মে চিঠি পাঠাল, 'প্রিয়, তুমি তো আমাদের ভুলেই গেলে!'
উত্তরে ছেলেটি বলল, 'তুমি আমার মিলনের কারণ! তোমার মাধ্যমেই আমি এই মোবারক দারসের সাথে মিলিত হয়েছি। আমি চাই না, তুমি আবার বিচ্ছেদের কারণ হও!'

আপনি আল্লাহর সাথে মিলিত হতে পারেন তাঁর আনুগত্যের দ্বারা। যেভাবে গোলাম তার মনিবের সাথে মিলিত হয়। আপনি তাঁর সাথে মিলিত হতে পারেন বেশি বেশি নেক আমল করার দ্বারা এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন ও সেবার মাধ্যমে। কিন্তু তাঁর জাত ও সিফাত-সত্তা ও গুণাবলির পূর্ণ অনুধাবন এবং সামগ্রিক ও পরিপূর্ণভাবে তাঁকে হৃদয়ঙ্গম করার শক্তি কারো নেই। নবি-রাসুলকেও তিনি সেই শক্তি দান করেননি।
কারণ, আল-আজিজ ঐ মহান সত্তার গুণবাচক নাম; যার বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের সামনে মানব-মস্তিষ্ক অচল; যার নিয়ামতরাজি উপলব্ধিতে বিবেক-বুদ্ধি হতচকিত; যার গুণকীর্তনে জিহ্বা ক্লান্ত; যার সৌন্দর্য বর্ণনায় মানব-প্রতিভা, ভাষা-সাহিত্য সবকিছুই অকার্যকর।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতি সংক্ষিপ্ত শব্দে আল্লাহর শাশ্বত গুণ উল্লেখ করেছেন।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন- এক রাতে নবিজিকে বিছানায় না পেয়ে আমি তাকে খুঁজতে থাকি। (অবশেষে আমি তাকে মসজিদে নববিতে খুঁজে পাই।) আমার হাতের স্পর্শ লাগে নবিজির পায়ে।[১] তখন তিনি মসজিদে নববিতে সিজদারত ছিলেন। তার দু-পা ছিল সোজা। সিজদায় তিনি এই দুআ করছিলেন-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ ، وَأَعُوذُ بِعَفْوِكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ ، لَا أَبْلُغُ ثَنَاءٌ عَلَيْكَ ، أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ

হে আল্লাহ, আমি আপনার সন্তুষ্টির দ্বারা আপনার ক্রোধ থেকে পানাহ চাই। আপনার ক্ষমার দোহাই দিয়ে আপনার শাস্তি থেকে পানাহ চাই। এবং আমি পানাহ চাই আপনার থেকে (আপনার ক্রোধ ও শাস্তিতে নিপতিত হওয়া থেকে)। আমি আপনার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে শেষ করতে পারব না। আপনি তো তেমনই, যেমনিভাবে আপনি নিজের প্রশংসা করেছেন।'[২]

আপনি যখন আল-আজিজের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করবেন এবং আপনার মন-আত্মায় তার মর্ম ধারণ করবেন, তখন আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছুই আপনার অন্তর থেকে বিদায় নেবে। আপনি আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো সামনে নত হতে পারবেন না। আল্লাহর পরাক্রমের সামনে কোনো ক্ষমতাধর খুঁজে পাবেন না। আল্লাহর শক্তি ও কুদরতের সামনে অন্য কোনো শক্তি আপনাকে পরাভূত করতে পারবে না। এমনকি আল্লাহর প্রজ্ঞা ও সুব্যবস্থাপনার সামনে অন্য কোনো প্রজ্ঞাবানও খুঁজে পাবেন না।
কেউ কেউ মনে করে সামান্য চেষ্টায় জান্নাতে চলে যাবে। তাদের দাবি নির্বুদ্ধিতাপ্রসূত। দুনিয়ার সাধারণ একজন নারীকে বিয়ে করতে গেলেও উপযুক্ত ও সম্মানজনক মোহরানা পরিশোধ করতে হয়। তাহলে আল্লাহর জান্নাত এবং সেই জান্নাতি রমণীদের মূল্য কি সামান্য হতে পারে?
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যারা কোনো স্থানে রাত্রিযাপন করতে ভয় পায় তারা সন্ধ্যায়ই যাত্রা করে। আর যারা সন্ধ্যায়ই যাত্রা করে তারা (গভীর রাতের আগেই) নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। জেনে রেখো, আল্লাহর পণ্যগুলো খুবই মূল্যবান; আর আল্লাহর পণ্য হলো জান্নাত।' [১] [২]
আল্লাহ তাআলা বলেন-

لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ

তোমরা যা ভালোবাসো তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না। তোমরা যা কিছু ব্যয় করো আল্লাহ অবশ্যই সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।[৩]

আপনার সবচেয়ে মূল্যবান সময়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত আপনার প্রিয় সম্পদ এবং যৌবনোদ্দীপ্ত শক্তি–এগুলো আল্লাহর পথেই ব্যয় করুন। কারণ, আল্লাহর পণ্য খুবই দামি।

মানুষ যেভাবে সম্মানিত হয়

প্রকৃত সম্মানিত কে? নবি-রাসুলগণ সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, কিন্তু কেন? কারণ তাদের জন্যে আল্লাহ বরাদ্দ রেখেছেন নবুওয়াত, তাদের মধ্যে দান করেছেন আপন ইলম। আর পৃথিবীর সকল মানুষ দ্বীনি ও দুনিয়াবি বিষয়ে তাদের অনুসারী। দুনিয়াবাসীর ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ, দয়া, নিয়ামত ও হিদায়াতের নুর অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা তাদের বানিয়েছেন প্রধান ফটক। তাদের সন্তুষ্ট করতে পারলে আল্লাহও সন্তুষ্ট হন; তাদেরকে ভালোবাসা আল্লাহকে ভালোবাসার নামান্তর। তাদের অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দু জুড়েই রয়েছে আল্লাহর আনুগত্য, আল্লাহর রিসালাতের প্রচার এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ প্রেম-ভালোবাসাপূর্ণ; তাই আল্লাহ তাদের শ্রেষ্ঠ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন।
দুনিয়ার একজন বাদশা। যদি তার প্রজাদের ওপর শাসনক্ষমতা এবং রাজ্যের সবকিছু নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকে, তাহলে সে নিজেকে ভাবতে থাকে শক্তিধর, পরাক্রমশালী। প্রজাদের প্রয়োজন তার কাছে যত বেশি তীব্র ও অধিক হয়, তত বেশি সে অহংকারী হয়ে ওঠে।
অথচ মুমিন বান্দা! সেও ক্ষমতাবান হয়, তার কাছেও জনগণের প্রয়োজন থাকে। কিন্তু তার মাঝে আর দ্বীনবিমুখ শাসকের মাঝে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। দ্বীনবিমুখ শাসক ক্ষমতা পেয়ে হয়ে ওঠে উদ্ধত, অহংকারী, ইতর। আর মুমিন ক্ষমতাধর হলেও সে হয় বিনয়ী; আল্লাহর সমুখে মস্তকাবনত।
আমি হৃদয়ের গভীর থেকেই আপনাকে একটি কথা বলছি, 'আপনি আল্লাহকে চিনবেন, তাঁর আনুগত্য করবেন, এরপর আবার অন্য কারো সামনে মাথা নত করবেন–এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। যদি আপনি সত্যিকার অর্থেই আল্লাহকে চিনে থাকেন তাহলে আপনি মান-সম্মান, ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা সবকিছুই খুঁজবেন কেবল আল্লাহর আনুগত্যের মাঝেই। আল্লাহ তাআলা বলেন—

... وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ )

নিশ্চয় শক্তি তো কেবল আল্লাহরই এবং তাঁর রাসুল ও মুমিনদের; কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না [১]

আপনি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে দুআ করছেন-

إِنَّهُ لَا يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ وَلَا يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ

নিশ্চয় আপনি যার বন্ধু হয়ে যান, কেউ তাকে অপদস্থ করতে পারে না। আর আপনি যার সাথে শত্রুতাপোষণ করেন, তাকে কেউ সম্মানিত করতে পারে না। হে আমাদের রব, আপনি কল্যাণের অধিকারী, সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন [২]

প্রতিদিনের দুআয়, প্রতি মুহূর্তের প্রার্থনায় আপনি রয়েছেন শক্তিধর মহান মালিক আল-আজিজের সাথে। এরপর কি আপনি কখনো লাঞ্ছিত হতে পারেন? এটা কখনো সম্ভব নয়।
আল্লাহর সঠিক পরিচিতি লাভ করুন, তাকে ভালোবাসুন। অটল অবিচল থাকুন তাঁরই পথে। দেখবেন, এই দুনিয়াতেই আল্লাহ আপনাকে তাঁর উত্তম প্রতিফলন দেখিয়ে দেবেন। হৃদয়ের গভীর থেকে আপনি অনুভব করবেন, আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন, আপনাকে গুরুত্ব দেন।
আপনি তাকে ডাকবেন, তিনি আপনার ডাকে সাড়া দেবেন। তাঁর কাছে দুআ করবেন, তিনি আপনার বিপদ-আপদ দূর করে দেবেন। আপনি তাঁর শরণাপন্ন হবেন, তিনি মানুষ ও সমগ্র সৃষ্টির হৃদয়ে আপনার প্রতি ভালোবাসা ঢেলে দেবেন। আপনি তাঁর কাছে সাহায্য চাইবেন, তিনি আপনার শত্রুদের অন্তর নরম করে দেবেন। মনের কামনা-বাসনা তাঁর সামনে তুলে ধরবেন, তিনি আপনার স্বপ্ন পূরণ করে দেবেন। আপনি তাঁর নামে কসম করবেন, তিনি আপনার কাজে বারাকাহ দান করবেন। মহান আল্লাহ বলেন-

... فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ حِينَ تَقُومُ )

আপনি তো রয়েছেন আমার চোখের সামনে। আপনি আপনার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন যখন আপনি শয্যা ত্যাগ করেন।[১]

হাসান আল-বাসরি রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি মানুষের কাছ থেকে এত সম্মান ও ভালোবাসা কীভাবে অর্জন করেছেন? তিনি উত্তরে বলেন, দুটি জিনিস দ্বারা—এক. তাদের দুনিয়ার প্রতি আমার অনাগ্রহ। দুই. আমার ইলমের প্রতি তাদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।[২]

অর্থাৎ মানুষের কাছে যে দুনিয়া রয়েছে, তা থেকে আমি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছি। তাই দুনিয়া অর্জন করতে গিয়ে আমি তাদের চোখে হেয় হইনি কখনো। পক্ষান্তরে আমার কাছে যে ইলম রয়েছে তা থেকে তারা প্রয়োজনমুক্ত নয়। তাই ইলমের প্রয়োজনে তারা আমার কাছে আসে আমার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে।
লোভী ব্যক্তি কখনো সম্মানিত হতে পারে না। মানুষের কাছে যে দুনিয়া রয়েছে তার প্রতি সামান্য লোভও আপনাকে অপদস্থ ও হেয় করে ছাড়বে। তাদের সম্পদে যদি আপনি লোভ করেন, তাহলে তারা আপনাকে ঘৃণার চোখে দেখবে। কিন্তু আল্লাহ এমন সত্তা, যিনি বান্দার চাওয়ার কারণে কখনো বিরক্ত হন না। মানুষের সম্পদ সীমিত, তাই সে সম্পদে কার্পণ্য করে। কিন্তু আল্লাহর সম্পদ অসীম, তাই তিনি দান করতে ভালোবাসেন। তিনি শক্তি ও সম্মানের রব। তাঁর কাছেই সম্পদ প্রার্থনা করুন। আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তাতে যদি আপনি লোভ করতে পারেন, তবে আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসবেন।
মানুষের কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করলে, কোনো প্রয়োজন ব্যক্ত করলে সে রেগে যায়। কিন্তু আল্লাহ এমন মহান মালিক, যিনি না চাইলে ক্রোধান্বিত হন। মানুষের সামনে নিজেকে লাঞ্ছিত করা কোনো মুমিনের জন্য একদমই বেমানান।
জুনদুব ইবনু হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

নিজেকে লাঞ্ছিত করা কোনো মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, মুমিন কীভাবে নিজেকে লাঞ্ছিত করে, ইয়া রাসুলাল্লাহ? নবিজি উত্তর দিলেন, নিজেকে এমন পরীক্ষার সম্মুখীন করা, যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সাধ্য তার নেই।[১]

তিনি আরো বলেন, 'তোমরা তোমাদের প্রয়োজন তালাশ করো আত্মমর্যাদার সাথে। কারণ সবকিছুই তার নির্ধারিত পরিমাণেই চলতে থাকবে।' [২]

খলিফার দরবারে ইমাম আবু হানিফা

একবার ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ একটি সমস্যা সমাধানে খলিফা আবু জাফর আল মানসুরের দরবারে গমন করেন। এই মহান ফকিহর আগমনে খলিফা খুবই গর্বিত হন। ইমামের কথা-বার্তা, ইলম, বিচক্ষণতা এবং ভাবগাম্ভীর্যে খলিফা মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি মনে মনে চাইতে থাকেন, প্রতিদিনই যেন এই মহান ইমাম তার দরবার অলংকৃত করেন। খলিফা খুব বিনীতভাবে আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহকে আবেদন করেন—আবু হানিফা! আমাদের দরবারে আপনাকে স্বাগত। আমরা কামনা করি, আপনি প্রতিদিনই আমাদের দরবার অলংকৃত করুন। আপনার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সদা-সর্বদা সাদর অভ্যর্থনা জারি থাকবে। ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ উত্তরে বললেন, 'আপনাদের কাছে আমার আসার কোনো প্রয়োজন দেখছি না। আপনাদের কাছে এসে তারাই তোষামোদে লিপ্ত হয়, যারা কোনো ব্যাপারে আপনাদের ভয় পায়। কিন্তু আমি আপনাদের কাছে এমন কিছু দেখি না যাতে আমার ভয় পাবার কোনো যৌক্তিকতা রয়েছে।'
যখনই আপনি মানুষের কাছে থাকা জিনিস থেকে লোভ সংবরণ করবেন, তখনই আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করে দেবেন। যত বেশি আল্লাহর সামনে নত হয়ে ধুলোয় লুটিয়ে সিজদা করবেন, তত বেশি আল্লাহ আপনাকে মর্যাদাবান করে তুলবেন।

ইমাম মালিকের আত্মমর্যাদাবোধ

খলিফা হারুনুর রশিদ রাজ-দরবারে 'নাসিহাহ' করার জন্য একজন বড় আলিম তলব করলেন। লোকেরা ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহর কাছে ছুটে গেল। তারা তাকে জানাল, খলিফা আপনাকে তলব করছেন। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বললেন, তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি আমার কাছে তার কোনো প্রয়োজন থেকে থাকে, তবে তিনি নিজেই আমার কাছে আসতে পারেন। তিনি আরো বললেন, 'ইলম অন্বেষণ করতে হয়; ইলম কাউকে অন্বেষণ করে না'।
সভাসদ ও মন্ত্রীবর্গ খলিফাকে ইমাম মালিকের উত্তর সম্পর্কে জানাল। খলিফা বললেন, 'তিনি সত্য বলেছেন, আমিই তার কাছে যাব।'
বিশাল জনতার মজলিস, ইমাম মালিকের হাদিসের দারস। খলিফা আগমন করলেন মজলিসে। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ সাথিদের বললেন, 'খলিফাকে জানিয়ে দাও, মানুষের ঘাড় টপকিয়ে সামনে আসার অনুমতি নেই। তিনি যেন মজলিসের শেষ প্রান্তে যেখানে জায়গা পান সেখানেই বসে পড়েন।' খলিফা মজলিসে পৌঁছার পর লোকেরা তাকে বসার জন্য চেয়ার এগিয়ে দিলো। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'যে আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে মর্যাদার আসনে উন্নীত করেন। আর যে অহংকার প্রদর্শন করে, আল্লাহ তার মর্যাদাকে নিচু করে দেন।'
এ কথা শুনে খলিফা বললেন, 'চেয়ার সরিয়ে নাও, আমি নিচেই বসব।' [১]

নবিজির বিনয় ও সরলতা

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের গর্দান ডিঙিয়ে সামনে যেতে নিষেধ করেছেন। তিনি নিজেও মজলিসের যেখানে জায়গা পেতেন, সেখানেই বসে পড়তেন। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, তিনি এতটাই সাধারণভাবে বসতেন যে, কোনো বেদুইন বা অপরিচিত লোক এসে তাকে চিনতে পারত না। জিজ্ঞেস করত, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে? অথচ এই পৃথিবীর বুকে নবিজির চেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাবান মানুষ আর কেউ কি আছে?
প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুয়ে আছেন মদিনায়। সেখানে অসংখ্য মানুষের ভিড় লেগে থাকে। কত রাজা-বাদশা, আমির-উমারা, শাসক-নেতা আসে। সেখানে কি কেউ রাজা-বাদশা পরিচয়ে সালাম করে? নবিজির কাছে কেউ রাজা নয়। তার কাছে সবাই সমান। নবিজির মৃত্যুর আজ প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর পার হয়েছে। তবু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজা-বাদশাদের সেখানে ছুটে আসার হেতু কী? কারণ নবিজিকে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত করেছেন। অথচ জীবদ্দশায় একজন সাধারণ মানুষ ও গোলামের সাথেও তিনি দেখিয়েছেন সর্বোচ্চ বিনয় ও কোমল আচরণ।
কোনো সাধারণ মানুষ নবিজির সাথে কথা বলতে গেলে ভয়ে শরীরে কম্পন শুরু হয়ে যেত। কিন্তু নবিজি তার সাথে কোমল আচরণ করতেন, তার ভয় দূর হয়ে যেত। সে স্বাচ্ছন্দ্যেই কথা বলতে পারত। নবিজি বলতেন, 'ভয় পেয়ো না, নিজেকে স্বাভাবিক রাখো। আমি তো কুরাইশ বংশেরই এক মায়ের গর্ভে জন্মেছি, যে কিনা শুকনো গোশত খেত আর সাধারণ জীবনযাপন করত।' [১]
নবিজির পর তার সাহাবিরাও ছিলেন বিনয় ও আনুগত্যের মূর্ত প্রতীক।
আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর কয়েকজন দরিদ্র প্রতিবেশী ছিল। তিনি তাদের বকরীর দুধ দোয়াতেন। কিন্তু যখন তিনি খলিফা হলেন, তখন প্রতিবেশীরা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। তারা ভাবল, আবু বকর এখন খলিফা, বিরাট পদমর্যাদার অধিকারী। এই পদে সমাসীন হয়ে তিনি কীভাবে বকরীর দুধ দোয়াবেন? কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, যেদিন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু খিলাফতের দায়িত্ব বুঝে নিলেন, সেদিনও প্রতিদিনের মতো প্রতিবেশীর দরজায় এসে কড়া নাড়লেন। অন্তঃপুর থেকে মা তার মেয়েকে বলল, দরজা খুলে দেখো, কে এসেছে। দরজা খুলতেই তো মেয়ের চোখ ছানাবড়া। সে মাকে ডেকে বলল, মা! তিনি আজও দুধ দোয়াতে এসেছেন! [২]
বিনয়ের এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল!
আমাদের উচিত ফিতরাত (স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য) থেকেই আল্লাহকে উপলব্ধি করা। বোঝার চেষ্টা করা, কীভাবে আল্লাহর বিধান মেনে চলব, কীভাবে আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে উৎসর্গ করব এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে কীভাবে তাকেই অগ্রাধিকার দেবো! কেউ একজন জিজ্ঞেস করেছিল, 'ফিতরাত থেকে আল্লাহকে চেনার উপায় কী?' জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, 'তুমি বিষয়টি বুঝলে অবশ্যই তার উপায় খুঁজে পেতে।'

লোকটি আবার বলল, 'আমি আপনার কথা বুঝিনি। যাকে আমি চিনি না, জানি না, তাঁর ইবাদত কীভাবে করব?
জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, 'তুমি যাকে চেনো, তার অবাধ্য হও কীভাবে?'
অর্থাৎ, তুমি যদি চেনা মানুষের অবাধ্য হতে পারো, তাহলে অচেনা সত্তার আনুগত্য কেন করতে পারবে না? অথচ তোমার ফিতরাতের মধ্যেই আল্লাহর পরিচয়!"
আল্লাহকে চেনার পরও মানুষ তাঁর নাফরমানি করে।
এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনি কখন থেকে আল্লাহর অবাধ্য হননি?'
তিনি উত্তর দিলেন, 'যখন থেকে আল্লাহকে চিনেছি তখন থেকে আর তাঁর অবাধ্য হইনি।'
আপনি দুনিয়ার সব জ্ঞান অর্জন করেছেন। জিন-ইনসানের সকল ইলম অন্বেষণ করেছেন। কিন্তু এই ইলমের পিছনে আপনার নিয়ত ছিল, সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করা। তাই একান্তে, নির্জনে আল্লাহর অবাধ্য হতে আপনার বিবেক, ইলম, তাকওয়া আপনাকে বাধা দেয়নি। তাহলে জেনে রাখুন, আপনি আল্লাহকে চিনতে পারেননি।
আল্লাহর কসম! কারো ইলম যদি আল্লাহর নাফরমানি থেকে ফেরাতে না পারে, আল্লাহর কাছে সেই ইলমের বিন্দুমাত্র কদর নেই।
গুনাহ ছোট কি বড়-সেদিকে তাকাবেন না; আল্লাহর সামনে অবাধ্যতার যে দুঃসাহস আপনি দেখিয়েছেন তাতেই ভীত-সন্ত্রস্ত থাকুন। আল্লাহর শাস্তি নেমে আসার পূর্বেই তাঁর প্রতি নিবিষ্ট হোন। তাওবা করুন একনিষ্ঠ চিত্তে।
ইসলামিক স্টাডিজে উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেটধারী এক আলিমের কথা ধরা যাক। তিনি ধর্মীয় বিরাট পদমর্যাদার অধিকারী; রচিত গ্রন্থের সংখ্যাও একশো ছাড়িয়ে গেছে। মনে করুন এমন আলিমের ঘরে প্রবেশ করল কোনো বেপর্দা গায়ের মাহরাম নারী। আলিম সাহেব তার রূপ-লাবণ্য ও চেহারার জাদুতে মোহগ্রস্ত হলেন। তাকে দেখে চোখের যিনায় লিপ্ত হলেন, তার ইলম তাকে এই হারাম কাজ থেকে বিরত রাখতে পারল না। অপরদিকে তার বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়ানো ছিল এক অশিক্ষিত দারোয়ান। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ তার হয়ে ওঠেনি।

কিন্তু আল-কুরআনের এই আয়াত সে তিলাওয়াত করেছে—

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ )

মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে; এটাই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা কিছু করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত [১]

এ আয়াতে আল্লাহর নির্দেশের কথা স্মরণ করে সে তার দৃষ্টি অবনত করেছে। তাহলে আল্লাহর কাছে সেই প্রকৃত আলিম। আর প্রথমোক্ত যে আলিম হারাম দৃষ্টি দ্বারা প্রবৃত্তির ক্ষুধা নিবারণ করেছে, আল্লাহর নিকট সে চরম মূর্খ।
মাসরুক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'মানুষের জন্য ইলম হিসেবে এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে আল্লাহকে ভয় করে। আর ইলম নিয়ে গর্ব করা, মানুষের মূর্খতার জন্য যথেষ্ট'।[২]

আল-আজিজ সত্তার সাথে বান্দার সম্পর্ক কেমন হবে?

যে মুমিন আল-আজিজের অর্থ অনুধাবন করেছে এবং এর মর্ম হৃদয়ে ধারণ করেছে, আল্লাহ ছাড়া সে অন্য কাউকে প্রকৃত সম্মান দিতে পারে না। মানুষের সাথে তার আচরণ অবশ্যই সুন্দর হবে; শ্রদ্ধাপূর্ণ হবে। কিন্তু কোনো সৃষ্টির জন্য সে প্রকৃত সম্মানের বিশ্বাস পোষণ করতে পারে না।
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যে ব্যক্তি কোনো ধনীর সামনে নত হলো, তার দ্বীনের দুই-তৃতীয়াংশ চলে গেল।[৩]

আপনি যখন কোনো ধনী ব্যক্তিকে তার ধন-সম্পদের কারণে সম্মান করলেন, তার সামনে মাথা নত করলেন, তখন আপনার ঈমানের এক-তৃতীয়াংশ বিদায় নিল। আর যখন তার গুণকীর্তন করলেন, তখন চলে গেল আপনার ঈমানের আরেক তৃতীয়াংশ। ধনী ব্যক্তির সামনে নত হতে গিয়ে এক মুহূর্তে হারিয়ে ফেললেন মূল্যবান ঈমানের দুই-তৃতীয়াংশ। এজন্য নবিজি আরো বলেছেন, 'মুমিনের মর্যাদা রাত জেগে ইবাদতে এবং তার সম্মান মানুষের প্রতি অমুখাপেক্ষী থাকায়।'[১]
মুমিন বিশ্বাস করে সে আল্লাহর বান্দা; আল্লাহ তাকে কখনোই ধ্বংস করবেন না; নিজের পরিচর্যা উঠিয়ে নিয়ে অন্য কারো হাতে তাকে সোপর্দ করবেন না।
মানুষের অন্তরে যখন আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব উদ্বেলিত হবে, সৃষ্টির সব কিছুই তখন তার কাছে নগণ্য ও হেয় মনে হবে। যার হৃদয়ে আল্লাহর বড়ত্ব, মহত্ত্ব জায়গা পাবে না, আল্লাহর সৃষ্টিই তার কাছে বড় হয়ে দেখা দেবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এ এক মহাপরীক্ষা। কত লোককে আপনি বলতে শুনবেন, 'অমুক এত বড় ক্ষমতার অধিকারী, তার শক্তি-সামর্থ্যের কোনো শেষ নেই, সে যা ইচ্ছা করে ফেলতে পারে।' আসলে আল্লাহর বড়ত্ব ও প্রতাপের অনুভূতি তার অন্তরে নেই। সে আল্লাহকে চিনতে পারেনি। তাই আল্লাহর বিপরীতে সে আল্লাহর সৃষ্টিকে শক্তিধর মনে করে বসে আছে। যত দিন পর্যন্ত আপনি এই লোককে এমন ক্ষমতাধর মনে করবেন, তত দিন পর্যন্ত আপনি আল্লাহর পরিচয় থেকে বহুদূরে। আপনি আল্লাহকে চিনতে পারেননি। মানুষ তার ঈমানের পথে যত অগ্রসর হবে, যত বেশি ঈমানের উচ্চতায় উন্নীত হবে, তত বেশি সে আল্লাহমুখী হবে। আর যারা ঈমান থেকে ছিটকে পড়বে, তারা দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াবে উদ্ভ্রান্তের মতো। আল্লাহ তাআলা বলেন-

(... فَنَذَرُ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ )

যারা পরকালে আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না, আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে দিই।[২]

সম্মানদাতা একমাত্র আল্লাহই

আপনি যখন বিশ্বাস করেন আল্লাহ একমাত্র সম্মানদানকারী, তখন কী করে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সম্মান আশা করতে পারেন? সমস্ত জিন-ইনসান এবং সমগ্র সৃষ্টি সংঘবদ্ধ হয়ে যদি আপনাকে কোনো মর্যাদায় উন্নীত করতে চায়, আল্লাহর নির্দেশ ব্যতীত কস্মিনকালেও তারা তা করতে পারবে না। আল্লাহ যদি আপনাকে মর্যাদার এক বা একাধিক স্তরে উন্নীত করতে চান, পৃথিবীর সকল শক্তি মিলেও আপনাকে সেই স্তর থেকে নামাতে পারবে না।
আপনি যত বেশি আল্লাহর অনুগত হবেন, তত বেশি তিনি আপনার সম্মান বাড়িয়ে দেবেন। আর আপনার অনুভূতি ও কার্যকলাপ দ্বারা আল্লাহকে যত বেশি তুচ্ছজ্ঞান করবেন, আপনিও আল্লাহর কাছে তত বেশি হেয় আর গুরুত্বহীন হয়ে পড়বেন। বর্তমানে মুসলিমরা আল্লাহকে গুরুত্বহীন মনে করে, তাই তারাও আল্লাহর কাছে হীন এক জাতিতে পরিণত হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর বিধি-বিধান আঁকড়ে ধরুন এবং তাতে অটল অবিচল থাকুন, আশা করা যায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনার সাথে বিশেষ অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করবেন। কিন্তু যখন সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনে সমষ্টিগতভাবে উম্মতের লোকেরা আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে তখন অবশ্যই আল্লাহ তাদের সংশোধনের উদ্দেশ্যে শাস্তি প্রদান করবেন।

এক দাপুটে হাজির করুণ পরিণতি

এক দাপুটে লোক ছিল। ভৃত্য, সেবক ও ভক্ত কোনো কিছুরই অভাব ছিল না তার। তারা সবসময় তার সাথেই থাকত। লোকটি বাইতুল্লাহ গেল হজের উদ্দেশ্যে। কিন্তু তাওয়াফের মাঝখানেও সেবক-ভক্তরা তার সঙ্গ ছাড়েনি। তার সম্মানার্থে তাওয়াফের সময় সামনে থেকে লোকজন সরিয়ে পথ করে দিচ্ছিল। যাহোক, এভাবে লোকটি তাওয়াফ, সায়ি এবং হজের অন্যান্য কার্যক্রম সমাপ্ত করে দেশে ফিরে আসে।
ঘটনার বর্ণনাকারী বলেন, পরবর্তীতে একবার আমি বাগদাদের একটি সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম। আচমকা এক ভিক্ষুককে দেখে চমকে উঠলাম। তাকে দেখে মনে হলো আগে কোথাও দেখেছি। কিছুক্ষণ ভেবে-চিন্তে আবিষ্কার করলাম, লোকটির চেহারা বাইতুল্লাহর তাওয়াফের সময় দেখা সেই লোকটির সাথে মিলে যাচ্ছে। তবে তার আগের বেশভূষা আর এখনকার বেশভূষার মাঝে আসমান-জমিন ফারাক! তখন সে ছিল বিরাট শান-শওকতের মাঝে। এখন সে রয়েছে খুবই শোচনীয় ও দুরবস্থায়। দেখলাম সে মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করছে। হয়তো আমাকে দেখে সেও একটু-আধটু চিনতে পারছিল। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম আমি। সে একটু এগিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার? আপনি আমাকে এমন গভীরভাবে দেখছেন কেন?' আমি বললাম, 'আপনি কি সেই লোকটি নন, যার সাথে তাওয়াফের সময় দেখা হয়েছিল?' সে উত্তর দিলো, 'হ্যাঁ, আমিই সেই লোক।'
'কিন্তু আপনার এই দুরবস্থা হলো কী করে?'
'কারণ যেখানে মানুষ চরম বিনয় ও আনুগত্যের পরিচয় দেয়, সেখানে আমি অহংকার দেখিয়েছি। আল্লাহর ঘর তাওয়াফের সময় কোনো অহংকার চলে না। যত ধন-সম্পদের মালিক, যত ক্ষমতাধর অথবা যত বড় রাজাই হোক না কেন, সেখানে সবাই আল্লাহর বান্দা। তাই যে স্থানে মানুষ সম্মান-মর্যাদা ও গৌরবের সাথে চলাফেরা করে সে স্থানে আল্লাহ আমাকে নীচ বানিয়ে দিয়েছেন।'
মানুষ যখনই সামান্য পরিমাণ বড়ত্ব ও অহংকার প্রকাশ করে, সাথে সাথেই আল্লাহ তার বদলা দেন এবং তাকে সেই পরিমাণ নীচ ও অপদস্থ করে দেন।
আল্লাহ তাআলা সকল গুনাহ মাফ করে দেন, কিন্তু দুটি গুনাহ এমন রয়েছে যার শাস্তি আল্লাহ দিয়েই ছাড়েন। তাই এ দুটির ধারে-কাছেও যাবেন না-এক. আল্লাহর সাথে শিরক; ঔদ্ধত্য, অহংকার। দুই. মানুষের ক্ষতিসাধন অর্থাৎ জুলুম।
আল্লাহ তাআলা বলেন-

مَن كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ وَالَّذِينَ يَمْكُرُونَ السَّيِّئَاتِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَكْرُ أُولَبِكَ هُوَ يَبُورُ )

কেউ সম্মান ও ক্ষমতা চাইলে সে জেনে রাখুক, সকল সম্মান ও ক্ষমতা তো আল্লাহরই। তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ সমুত্থিত হয় এবং সৎকর্ম সেগুলোকে উচ্চে তুলে ধরে। আর যারা মন্দ কাজের ফন্দি আঁটে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে।১]

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন-

... وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ )

সম্মান ও শক্তি তো আল্লাহরই, আর তাঁর রাসুল ও মুমিনদের। তবে মুনাফিকরা এটা জানে না।১

উপরিউক্ত দুটি আয়াত পারস্পরিক সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। কারণ প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, সকল সম্মান ও ক্ষমতা কেবল আল্লাহর। দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, সম্মান ও ক্ষমতা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনদের। তাই বাহ্যত মনে হতে পারে আয়াত দুটি পরস্পর বিরোধী। কিন্তু বাস্তবে এ দুয়ের মাঝে কোনো বিরোধ নেই। কারণ আল্লাহ তাআলাই প্রকৃত সম্মান ও ক্ষমতার মালিক। আর নবি ও মুমিনগণ আল্লাহর পথে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই সম্মান ও শক্তি অন্বেষণ করেন। আল্লাহই তাদের সম্মানিত করেন। কিন্তু আপনি যদি আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে গিয়ে সম্মান কামনা করেন, আল্লাহর বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করে মর্যাদা খুঁজে ফেরেন এবং আল্লাহ কর্তৃক সম্মানিত হওয়ার চেষ্টা না করে অন্য কোনো পন্থায় সম্মান-মর্যাদা অন্বেষণ করেন, তাহলে আপনি মূলত হীন, নিকৃষ্ট।

আল্লাহর আনুগত্যে সম্মানিত যিনি

মিসরের শাসকের স্ত্রী। সে ইউসুফ আলাইহিস সালামকে প্রলুব্ধ করতে এবং কুপ্রস্তাবে রাজি করাতে সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। এই হীন কর্মের কারণে এবং পরবর্তীতে ইউসুফ আলাইহিস সালামের ওপর মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে লাঞ্ছনার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল সে, যা একজন গোলামের জীবনের চেয়ে বেশি সুখকর ছিল না। আমাদের চারপাশে কত মানুষ দেখি যারা সম্মান-মর্যাদার উচ্চ শিখরে অবস্থান করত, কিন্তু যখন তারা আল্লাহর নাফরমানিতে সম্মান খুঁজতে শুরু করল, তিনি তাদেরকে অধঃপতনের সর্বনিম্ন গহ্বরে ছুড়ে ফেললেন।
মনিবের স্ত্রীর প্রস্তাবে ইউসুফ আলাইহিস সালাম আল্লাহর আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছিলেন, তাই আল্লাহ তাকে সম্মানের উচ্চ শিখরে উন্নীত করেছেন। আল্লাহ বলেন-

... قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَاى إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ ﴾

ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন (কুপ্রস্তাবের জবাবে), আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি, তিনি আমার প্রভু। তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না।১

আলোর পথে প্রত্যাবর্তন

এখন আপনাদের যে গল্পটা শোনাব, তা এক দরিদ্র যুবকের। এটা এতই বিস্ময়কর একটি ঘটনা যে, তার মুখে না শুনলে আমি কখনো বিশ্বাসই করতাম না। দামেশকের এক গ্রামে যুবকটির ছোট্ট একটি বইয়ের দোকান ছিল। এটাই তার জীবিকা উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। যুবকটি তখনো অবিবাহিত। যৌবনের তাড়নায় নিজেকে আর কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারছিল না সে। একদিন পাশের গ্রামের এক পতিতার সাথে তার দেখা হলো। মেয়েটা মিষ্টি কথা আর রূপ-লাবণ্যে যুবকের মন জয় করে নিল। খারাপ কাজে রাজি করিয়ে ফেলল মুহূর্তের মাঝে। যুবকটি তখন দোকানপাট সব বন্ধ করে মেয়েটার পেছন পেছন রওনা দিলো। উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে যুবকটি হজ করেছে। হাঁটতে হাঁটতে তার হজের কথা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সে বলে উঠল, 'আল্লাহর কসম! আমি আমার হজটিকে মাটি করতে পারব না।' যে-ই কথা সে-ই কাজ। সে ঐ মেয়েটিকে রেখে সোজা বাড়ি ফিরে আসে।
এই যুবক যা করেছে আল্লাহর ভয় এবং আনুগত্যের কারণেই করেছে। পরদিন সকালে সে আবার দোকান খুলে বসে। আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন দোকানে এলো এলাকার নেতৃস্থানীয় একজন ভদ্রলোক। এসেই জিজ্ঞেস করল, তুমি কি বিয়ে করেছ?
যুবক উত্তর দিলো, জি না!
লোকটি বলল, 'বিয়ের উপযুক্ত একটি মেয়ে আছে আমার। তোমার পরিবারের লোকদের এসে দেখে যেতে বলো।' যুবক মনে মনে ভাবল, নিশ্চয়ই মেয়েটির কোনো সমস্যা আছে। তা না হলে বাবা নিজেই প্রস্তাব দেবে কেন?

বাড়ি ফিরে সে পরিবারের লোকদেরকে মেয়ের বাড়িতে পাঠাল। উদ্দেশ্য ছিল তারা গিয়ে পছন্দ হলে প্রস্তাব দিয়ে আসবে। মেয়েটিকে পছন্দ হয়েছিল তাদের। ফলে কিছুদিনের মধ্যে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।
এক মাস যেতে না যেতেই যুবকটির শ্বশুর তাকে ব্যাবসায়িক অংশীদার করে নেয়। চিন্তা করুন, গ্রামের সামান্য দোকানদার মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বড় ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে কী বিস্ময়করভাবে!
সেই ভদ্রলোক দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে বহু বছর হয়ে গেছে। কিন্তু যুবক আজ বড় বড় ব্যবসায়ীর সাথে বাণিজ্যিক পার্টনার হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে। আল্লাহর আনুগত্যের কারনেই আল্লাহ তার নগদ বিনিময় দান করেছেন। একজন উম্মত হয়ে সে ইউসুফ আলাইহিস সালামের তাকওয়ার স্মৃতি জাগ্রত করেছিল। লাস্যময়ী নারীর আবেদনের সামনে যুবকটি উচ্চারণ করেছিল সেই অমর বাণী-

مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ

আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি, তিনি আমার রব। তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না। [১]

এভাবে দুনিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি আচারে-উচ্চারণে আপনি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করুন। যেকোনো হারাম কাজের মুখোমুখি হলে আল্লাহর হুকুমের সামনে নত হোন। আল্লাহর হুকুমের প্রতি আনুগত্যের ফলে ধন-সম্পদ আপনার কাছে দ্বিগুণ, তিনগুণ, শতগুণ হয়ে আসতে থাকবে।
আল্লাহর জন্য যদি বান্দা কোনো কিছু বিসর্জন দেয়, দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ অবশ্যই তার উত্তম বিনিময় দান করবেন। যত বেশি আপনি আল্লাহর অনুগত হবেন তত বেশি তিনি আপনাকে মর্যাদার উচ্চ শিখরে উন্নীত করবেন। যত বেশি আপনি তাঁর অবাধ্য হবেন, তত বেশি তিনি আপনাকে নিচে নামিয়ে দেবেন। আল্লাহকে যদি গুরুত্বহীন মনে করেন, তাহলে আপনিও আল্লাহর কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যাবেন। আর আপনি যদি তাঁকে ও তাঁর নির্দেশাবলিকে সম্মান প্রদর্শন করেন, তিনি আপনার মান-সম্মান বাড়িয়ে দেবেন। আপনার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধার বীজ বুনে দেবেন মানুষের হৃদয়ে।
বড় বড় যুগশ্রেষ্ঠ ইমামের কথাই ধরুন। ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ কিংবা ইমাম শাফিয়ি রাহিমাহুল্লাহ। আজও মজলিস, মাহফিল মোহিত হয় তাদের সুবাসিত নামের উচ্চারণে। জীবনভর তারা আল্লাহর আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছেন, এর বদৌলতে আল্লাহ তাদের ইতিহাস, স্মৃতিকে অমর করে রেখেছেন। যুগ যুগ ধরে যা সভ্য সমাজের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলতে থাকবে। মুসা আলাইহিস সালাম সম্মান, মর্যাদা ও শ্রদ্ধার উচ্চ শিখরে উন্নীত হয়েছেন। কিন্তু ফিরাউন নিমজ্জিত হয়েছে অপমান, লাঞ্ছনা আর ঘৃণার অতলে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ الْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ عَنْ آيَاتِنَا لَغَافِلُونَ *

আমি বনি ইসরাইলকে সমুদ্র পার করালাম এবং ফিরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে সীমালঙ্ঘন করে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। পরিশেষে যখন সে নিমজ্জিত হলো, তখন বলল, 'আমি তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম যার প্রতি বনি ইসরাইল বিশ্বাস স্থাপন করে। নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।' 'এখন! ইতঃপূর্বে তুমি তো অমান্য করেছ। আর তুমি ছিলে অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত। আজ আমি তোমার দেহটি সংরক্ষণ করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো। অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল।' [১]

এভাবে আল্লাহ তাআলা সম্মানিত করেছেন ইবরাহিম, মুসা ও ইউসুফ আলাইহিমুস সালামকে। সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে।
নবি-রাসুলের অনুসারীরাও আল্লাহর প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাদেরকেও সম্মানিত করেছেন। আবু বকর সিদ্দিক, উমার ফারুক, উসমান, আলি সম্মানের উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছেন। কিন্তু আবু জাহল নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। কোথায় আজ আবু জাহল, আবু লাহাব, শায়বা, উতবাহ? আল্লাহ ও আল্লাহর নবির বিরুদ্ধাচরণে নেতৃত্ব দানকারী সেই নেতারা আজ কোথায়?
আবু জাহলের ছেলে ইকরিমা ইবনু আবি জাহল, এক সময়ের ইসলামের ঘোরতর শত্রু, আল্লাহর নবির শত্রু। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যে ফিরে আসার দ্বারা ইতিহাস তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেছে? তার পিতা আবু জাহলের কুকীর্তিতে নাকি তার নিজের ঈমানি শক্তিতে?
আল্লাহর অবাধ্যতা আর হৃদয়ের কুটিলতা দ্বারা কখনো মর্যাদা অর্জন করা যায় না।
হৃদয়ের পবিত্রতা অর্জন করুন, আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করবেন। মানুষের ধন, মানুষের সম্মান সবকিছুই আপনার কাছে আমানত। আমানতের খিয়ানতের অধিকার আপনার নেই। কারো দরজার ফাঁকা দিয়ে, ছাদের ওপর থেকে কারো স্ত্রী বা কন্যার প্রতি কুদৃষ্টি দিলেন, আপনি আপনার প্রতিবেশীর আমানতের খিয়ানত করলেন। আপনার হৃদয় হয়ে গেল দুর্গন্ধময়। আল্লাহর কাছে আপনি হয়ে গেলেন ঘৃণিত।
ঈমান হলো আত্মার পবিত্রতার নাম। মানুষের হাতে যে সম্পদ রয়েছে তাতে অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে পবিত্রতা। তাই দৃষ্টি অবনত করা ঈমানের মৌলিক ও জরুরি অনুষঙ্গ। একজন মুমিন কুপ্রবৃত্তির ঘোড়ায় দৌড়ানো থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। মানুষ যখন আল্লাহর ভয়ে দৃষ্টিকে অবনত করে, আল্লাহ তার জীবনে শান্তি, সম্মান ও স্বস্তি দান করেন। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্কের বন্ধন অটুট হয়। আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত হয়ে তারা সুখময় জীবন লাভ করে।
সবাই চায় সম্মান পেতে, কিন্তু সম্মানের মূলধন হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য। তাই সম্মান-মর্যাদার সওদা বুঝে পেতে আগে আনুগত্যের মূল্য পরিশোধ করুন। বিশেষ করে যুবকদের বলি, হারাম থেকে বেঁচে থাকুন, হালাল এসে ধরা দেবে আপনার সামনে। আপনার হৃদয়-আত্মাকে কখনোই কোনো গুনাহের কল্পনা করার সুযোগ দেবেন না। আল্লাহই আপনার চাকুরির ব্যবস্থা করে দেবেন। আপনার বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। আল্লাহ এমনভাবে আপনার রিযিকের পথ করে দেবেন, যার চিন্তাও কখনো আপনার মাথায় আসেনি। আপনি যদি আইনজীবী হয়ে থাকেন, মিথ্যা বলা বন্ধ করুন। সত্য মামলা লড়ে এবং সত্যের ওপর থেকেই আল্লাহ আপনাকে আয়ের সুবন্দোবস্ত করে দেবেন। আপনি যদি ব্যবসায়ী হোন, মিথ্যা বলা ও ক্রেতা ঠকানোর অভ্যাস ত্যাগ করুন। সত্য কথা ও সততার প্রতি যত্নবান হোন, হালাল পথেই আপনি পেয়ে যাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত লাভ।
কত মানুষ মারা যায় আর তাদের জানাযায় শরিক হয় দুই-তিনজন কিংবা হাতেগোনা কিছু মানুষ। এর চেয়ে অপমান আর কী হতে পারে? অথচ কোনো বড় আলিম মৃত্যুবরণ করলে জনতার ঢল নামে তার জানাযায়। আল্লাহই তাকে এই সম্মান দিয়েছেন। কারণ, সে আল্লাহকে সম্মান করেছে, আল্লাহর বিধানের সামনে মাথা নত করেছে। আপনিও আল্লাহর বিধানকে সম্মান করুন, আল্লাহ আপনার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন।
বিকৃত মানসিকতার পাপিষ্ঠ কারো কাছে দেখলেন, অঢেল সম্পদ, অদম্য শক্তি; দেখলেন দুনিয়ার ভোগ-উপভোগের কোনো কিছুরই কমতি নেই তার। আর সঙ্গে সঙ্গে লোকটির অনুগত-অনুরক্ত হয়ে পড়লেন, ভেবে নিলেন তার আনুগত্য আপনাকে দুনিয়ার সব সুখ এনে দেবে। কিন্তু তার প্রতি ঝুঁকে আপনি আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করেছেন, আল্লাহকে ভুলে গিয়েছেন। তাই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি এবং অপমানই হবে ঐ ব্যক্তির পক্ষ থেকে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি, আপনার ভুলের সংশোধন।
মানুষের কাছে মানুষের প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু তা হতে হবে নিজের আত্মপরিচয় ও মর্যাদাবোধ অক্ষুণ্ণ রেখে। মুমিন কখনো নিজের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাবোধ বিসর্জন দিয়ে কারো কাছ থেকে প্রয়োজন পূরণের আশা করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ

যারা সীমালঙ্ঘন করেছে তোমরা তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না। অন্যথায় অগ্নি তোমাদের স্পর্শ করবে। এ অবস্থায় আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো অভিভাবক থাকবে না এবং তোমরা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না। [১]

টিকাঃ
[১] সুরা মায়িদা, আয়াত: ১১৮
[১] সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৩
[২] সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৪
[১] সূরা জাসিয়া, আয়াত: ৩৭
[২] সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৮
[৩] সুরা সাফফাত, আয়াত: ১৮০
[৪] সুরা সাদ, আয়াত: ৮২
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ২১
[১] সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ২৬
[১] সুরা হজ, আয়াত : ১৮; এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলে সিজদা দিতে হয়।
[১] সে সময়ে মসজিদে নববি ছিল মা আয়িশার ঘরের সাথে লাগোয়া এবং খেজুর গাছের পাতা ও ডালপালা দিয়ে নির্মিত ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। রাতের নিকষকালো আঁধারে সেদিন মা আয়িশা কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না। তাই অন্ধকারে হাতড়ে নবিজিকে খুঁজতে শুরু করেন।
[২] সহিহ মুসলিম: ৪৮৬
[১] জামি তিরমিজি: ২৪৫০
[২] অর্থাৎ, বিপদের আশঙ্কা এড়াতে আমরা যেমন নিরাপদ সময়ে সফর করি, ঠিক তেমনি শয়তানের চক্রান্ত ও কুমন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়ে নিরাপদে জান্নাতে পৌঁছতে হলে আমাদের অবশ্যই উদ্যমের সাথে ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্য করে যেতে হবে。
[৩] সুরা আলে-ইমরান, আয়াত : ৯২
[১] সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৮
[২] সুনানু আবি দাউদ: ১৪২৭
[১] সুরা তুর, আয়াত: ৪৮
[২] ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫
[১] জামি তিরমিজি: ২২৫৪
[২] তারিখু দিমাঙ্ক, খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা : ৫
[১] তারতিবুল মাদারিক, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৮০
[১] সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩৩১২
[২] খুলাফাউ রাশিদিন, মাহমুদ আহমাদ, পৃষ্ঠা: ৩০
[১] সুরা নূর, আয়াত: ৩০
[২] সুনানু দারিমি: ৩২১; শুআবুল ঈমান: ৭৩৪
[৩] শুআবুল ঈমান: ৮২৩২
[১] সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহিহাহ: ৮৩১
[২] সুরা ইউনুস, আয়াত: ১১
১] সুরা ফাতির, আয়াত: ১০
১] সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৮
১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ২৩
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ২৩
[১] সুরা ইউনুস, আয়াত: ৯০-৯২
[১] সুরা হুদ, আয়াত: ১১৩

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-کارিম : মহানুভব, পরমদাতা

📄 আল-کارিম : মহানুভব, পরমদাতা


যদি আপনার ভেতরে বসবাস করে এমন একটি হৃদয়, যা উত্তম ভাবনা এবং মুসলিমদের কল্যাণ চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকে, তাহলে এটা আল্লাহর কাছে মহৎ একটি গুণ। তিনি বান্দার মহৎ গুণাবলি ভালোবাসেন।
তিনি মানুষের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং দৈহিক গঠন দেখেন না। কে বেঁটে, কে লম্বা, কার চোখ বড়, কার চোখ ছোট, কার নাক উঁচু, কার চোখ কোটরে, কার ভ্রূদ্বয় আলাদা, কারটা যুক্ত, কার চোয়াল মসৃণ—এসবের প্রতি আল্লাহ লক্ষ করেন না। তিনি তো কারিম, মহানুভব; তাই মহৎ তাঁর দৃষ্টি।

☆☆☆

আল-কারিম। আরবি كرم (কারাম) শব্দ থেকে এর উৎপত্তি; যার অর্থ মহানুভবতা, মহত্ত্ব। আরবি ভাষাবিদগণ বলেন, 'প্রত্যেকটি প্রশংসনীয় ও উত্তম গুণই 'কারাম', এবং যে ব্যক্তি সেই গুণের অধিকারী সে 'কারিম'। মানুষ মনে করে শুধু বদান্যতা ও উদারতাই 'কারাম' শব্দের অর্থ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা সকল উত্তম গুণের নাম।
অতএব, সহনশীলতা মহানুভবতা, বদান্যতা মহানুভবতা, অনুগ্রহ মহানুভবতা, ধৈর্য মহানুভবতা, আত্মমর্যাদাবোধও মহানুভবতা। এক কথায় মানুষ যতগুলো উত্তম ও মহৎ গুণাবলি দ্বারা নিজের জীবনকে শোভিত ও অলংকৃত করে তার সবগুলোর সমষ্টি ও গোষ্ঠিগত নামই হলো মহানুভবতা।
মানুষকে কিছু দান করা বা শুধু বদান্যতার নামই মহানুভবতা নয়; বরং সহনশীল ব্যক্তি মহানুভব, দয়ালু ও পরোপকারী ব্যক্তি মহানুভব, অকৃত্রিম ও খাঁটি লোক মহানুভব, মানুষ ও সৃষ্টির প্রতি প্রেমময় ব্যক্তি মহানুভব, ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি মহানুভব। আরবিতে মূল্যবান পাথরসমূহ, যেমন, হীরা, জহরত, মণি-মুক্তা - এগুলোকে 'হাজারুন কারিম' বলা হয়। অর্থাৎ মূল্যবান পাথর।
কারিমের আরো অনেক অর্থ রয়েছে-
সুশ্রী চেহারা ও আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন বোঝাতে 'কারিম' শব্দ ব্যবহৃত হয়। আজিজে মিসর-এর স্ত্রী ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কুপ্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। রাজপ্রাসাদের নারীদের মধ্যে সমালোচনা ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। আজিজে মিসর-এর স্ত্রী বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে এক রাজকীয় ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নারীরা সকলে উপস্থিত হওয়ার পর সে ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাদের সামনে পেশ করে। ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখে তারা হতচকিত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা সেদিকে ইঙ্গিত করে বলেন-

فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّكَاً وَآتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِّنْهُنَّ سِكِّينًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلَّا مَلَكُ كَرِيمٌ

স্ত্রী-লোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, তখন সে তাদেরকে ডেকে পাঠাল। তাদের জন্য আসন প্রস্তুত করল এবং তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দিলো (তাদের আপ্যায়নে পরিবেশিত ফলমূল কেটে খাওয়ার জন্য) এবং ইউসুফ আলাইহিস সালামকে বলল, 'তাদের সামনে বের হও।' তারা যখন তাকে দেখল, তখন তার গরিমায় অভিভূত হয়ে নিজেদের হাত কেটে ফেলল। তারা বলে উঠল, 'অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নয়; এ তো কোনো সুদর্শন ফেরেশতা। [১]

বংশীয় কৌলিন্য ও আভিজাত্য বোঝাতেও কারিম শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

الْكَرِيمُ ابْنُ الْكَرِيمِ ابْنُ الْكَرِيمِ ابْنُ الْكَرِيمِ يُوسُفُ بْنُ يَعْقُوبَ بْنِ إِسْحَاقَ بْنِ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِمُ السَّلَامِ

অর্থাৎ, ইউসুফ আলাইহিস সালাম অভিজাত বংশ-পরম্পরায় জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি নিজেই একজন নবি, তার বাবা ইয়াকুব আলাইহিস সালাম, তার দাদা ইসহাক আলাইহিস সালাম, দাদার বাবা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম (১

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বহু জায়গায় জান্নাতকে 'আল-মাকামুল কারিম' আখ্যা দিয়েছেন। যেখানে নেই কোনো কষ্ট-ক্লেশ, ভয়-শঙ্কা; নেই কারো প্রতি কারো হিংসা-বিদ্বেষ। চিরশান্তির আবাসন-মাকামুন কারিম।
আল-কারিম শব্দের আরেকটি অর্থ প্রয়োজনীয় ও প্রিয় বস্তু। যাতে রয়েছে প্রচুর কল্যাণ; সকলেই তার মুখাপেক্ষী।
কুরআনকে বলা হয় কিতাবুন কারিম বা মহাগ্রন্থ। পূর্ণ কুরআনই মানবতার সমূহ কল্যাণ। দুনিয়া ও আখিরাতের আলোকবর্তিকা। তার প্রতিটি তত্ত্ব ও তথ্যই পরম বাস্তব এবং প্রতিষ্ঠিত সত্য। বিশুদ্ধ শিক্ষা, দরদপূর্ণ উপদেশ, অনন্য দৃষ্টান্ত এবং মানবতার প্রতি হিতকামনায় পূর্ণ। তার সামনে বা পিছনে কোথাও বাতিল এসে ভিড়তে পারে না। তাতে নেই কোনো ধরনের আজগুবি বা মিথ্যার পসরা। ত্রুটি, অসংলগ্নতা বা বৈপরীত্যের লেশমাত্র নেই কুরআনুল কারিমে। সর্বদিক থেকে পূর্ণ ও নিখুঁত গুণবিশিষ্ট মহাগ্রন্থই আল কুরআনুল কারিম।
আরবরা তাদের মূল্যবান সম্পদকে ডাকে 'কারিম' বলে। মরু-জাহাজ উট, বিস্তীর্ণ মরুখণ্ডের উত্তপ্ত বালুতে সফরের একমাত্র অবলম্বন। উটই বালুসমুদ্রের মাঝ দিয়ে আরোহীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আবার পিপাসার মুহূর্তে দেয় নির্মল, স্বচ্ছ দুধ। তাই মরুর দুলালদের নিকট 'মরুজাহাজে'র গুরুত্ব কোনোভাবেই সমুদ্র-জাহাজ থেকে কম নয়। এজন্য খুব আদর করে তারা উটকে স্মরণ করে 'নাকাতুন কারিমা' বলে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামেনের গভর্নর হিসেবে প্রেরণের সময় যেসব নসিহত করেছিলেন, তন্মধ্যে একটি ছিল, 'যাকাত উসুলের ক্ষেত্রে মানুষের অতি মূল্যবান সম্পদের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।' অর্থাৎ মধ্যম প্রকৃতির সম্পদ গ্রহণ করবে। বেছে বেছে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উটগুলো যাকাতের নামে কেড়ে নেওয়া যাবে না। এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মূল্যবান সম্পদকে 'কারিম' বলে আখ্যা দিয়েছেন।

আঙুর খুবই উপকারী ও সুস্বাদু ফল। দৃষ্টিনন্দন থোকায় ঝুলে থাকা পাকা আঙুর অনেকের প্রিয় ফল। তাই আঙুরকে বলা হয় 'কারাম'।
উত্তম আখলাক-চরিত্র, মার্জিত ও শ্লীল আচরণ-অভ্যাসকে বলা হয় 'মাকারিমুল আখলাক'।
মোটকথা, কারিম শব্দটি খুবই অর্থবহ এবং সমগ্র উত্তম গুণাবলির সমাহার। অতএব, কারিম শব্দটি যখন ব্যবহৃত হবে আল্লাহর নামে, তখন তার অর্থ হবে ঐ মহান সত্তা; যিনি সকল উত্তম ও মহৎ গুণাবলির আধার। আল কুরআনকে যখন বলা হবে কারিম, তখন তার অর্থ হবে, মহান আল্লাহ কর্তৃক মানবতার কল্যাণে অবতীর্ণ, তাঁর পবিত্র বাণী মহাগ্রন্থ আল কুরআন।
মহান আল্লাহ বলেন-

يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ ﴿

হে মানুষ, কীসে তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করল?[১]

অর্থাৎ মহান রবের ব্যাপারে তোমাকে কীসে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে? আল্লাহর ব্যাপারে কি মানুষ ধোঁকায় পড়তে পারে? অথচ এমন মহান সত্তার ব্যাপারে ধোঁকায় নিপতিত হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
আপনি কারো ওপর জুলুম করলেন। আদালতে আপনার নামে মামলা হলো। আপনি জানেন যে, আপনি অপরাধী। তারপরও মামলা নিজের অনূকুলে আনার জন্য জজকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিলেন, আর মামলা জিতেও নিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কী হলো? আপনি ঐ জজের বাহ্যিক সততায় ধোঁকা খেলেন। আপনি ভাবলেন, সে তো উপকারই করেছে। আল্লাহর হুকুম ছুড়ে ফেলে আপনি যে কাজ করলেন, এতে আপনি আসলে আল্লাহর ব্যাপারে ধোঁকা খেয়েছেন। আপনি আল্লাহকে চিনতে পারেননি। আপনি ভেবে নিয়েছেন আল্লাহ আপনার জন্য যে ফয়সালা করেছেন তা ন্যায়সংগত। আসলে আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করেননি, আপনি আল্লাহকে দুর্বল মনে করেছেন। আপনার এই একটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আল্লাহর কুদরত, অনুগ্রহ, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারকে নাকচ করে দিলেন। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদের কখনো ভুলে যান না? তাঁর আনুগত্যে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের তিনি জাহান্নামের আগুনে দেবেন না। আপনি কি ভুলে গেছেন, যারা আল্লাহর সাথে শত্রুতা পোষণ করে, যারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে, তিনি তাদেরকে জান্নাত দেবেন না? আপনি আল্লাহকে ভুল বুঝেছেন। আল্লাহর ব্যাপারে নির্বুদ্ধিতা ও মূর্খতাপূর্ণ ধারণা করে বসে আছেন। আপনি ধোঁকায় নিপতিত হয়েছেন আপনার রবের ব্যাপারে!

বান্দার প্রতি মহান রবের মহানুভবতা

আপনার অফিসে চাকুরি করে একজন কর্মচারী। সে তার নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সর্বাত্মক চেষ্টা ব্যয় করে আপনার কাজ করে দেয়। আপনি তার ওপর খুশি হয়ে এই নিষ্ঠার প্রতিদান হিসেবে তাকে উপহার দেন। আপনি তার কাছ থেকে উপকার পেয়েছেন বলেই তাকে উপহার দিয়েছেন। কোনো বিনিময় ছাড়া, আপনার কোনো কাজ করে দেওয়া ছাড়া এমনি এমনি তাকে প্রতিদান দেননি। তবুও সমাজের লোক আপনাকে মহানুভব, উদার বলেই চিনবে।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কারিম, মহানুভব হলেন আল্লাহ। তিনি মানুষকে নিয়ামতে ভরিয়ে দেন কোনো বিনিময় ছাড়াই। তিনি আমাদের অস্তিত্ব দান করেছেন, পরম যত্নে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এতে আমাদের কোনো আবেদন বা আবদার ছিল না। আবেদন, নিবেদন ছাড়াই নিজ অনুগ্রহে তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন আমাদের জীবন। এতে আমাদের কোনো হক ছিল না।
বান্দার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি উদার ও মহানুভব। আপনি কারো সাথে কোনো ভুল করে ফেললেন। ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমাও চেয়ে নিলেন। সে ক্ষমা করে দিলো। কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই সে বলে ফেলবে, 'ভুলে যেয়ো না, তুমি কিন্তু এমন একটা কাজ করেছিলে!' এরপর সপ্তাহ খানেক হয়তো আপনি স্বস্তিতে থাকবেন। সে আবার বলবে, 'তুমি কিন্তু একবার এমন একটা কাজ করেছিলে।' তখন বিরক্তি চেপে রেখে আপনিও বলতে বাধ্য হন, 'হ্যাঁ! তবে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।' এভাবেই যখন-তখন সে আপনার ভুলত্রুটি মনে করিয়ে দিতে পারে।

তাই রাব্বে কারিমের কাছে দুহাত তুলে দুআ করুন— ‘আল্লাহুম্মা আনতা আফুউউন কারিম!’
আপনার দুআ শেষ হতে না হতেই তিনি তাঁর মহান ক্ষমার চাদরে আপনাকে আবৃত করবেন। তাঁর ক্ষমা মানুষের ক্ষমার মতো নয় যে, বারবার মনে করিয়ে আপনাকে খোঁটা দেবেন। ক্ষমা প্রার্থনার কারণে শুধু আপনার অপরাধের মার্জনাই করা হবে না; বরং দুনিয়াতে যেন মানুষ আপনার পাপের কথা চর্চা করতে না পারে, সেজন্য মানুষের অন্তর থেকেও সেটা ভুলিয়ে দেন।
বান্দা যখন নিষ্ঠা ও অনুশোচনার সাথে আন্তরিকভাবে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তাআলা সকলের অন্তর থেকে তা ভুলিয়ে দেন। আমলনামা লেখায় দায়িত্বরত ফেরেশতা এবং অন্যান্য ফেরেশতাকে তা ভুলিয়ে দেন। জমিনের প্রতিটি স্থানকেই তার গুনাহের কথা ভুলিয়ে দেন। শুধু তা-ই নয়, বরং তাকে তার নিজ গুনাহের কথা ভুলিয়ে দেন। মুমিন বান্দার মধ্যেও কখনো কখনো মূর্খতা বিদ্যমান থাকে কিন্তু আল্লাহ তাকে সে কথা ভুলিয়ে রাখেন, এতে সে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে।
আপনি হাজার বার কারো উপকার করলেন। কিন্তু একদিন আকস্মিকভাবেই আপনার অধঃপতন হলো। দেখবেন সেই লোকটি আপনার অগণিত উপকারের কথা ভুলে গিয়ে ঐ পতনটাকেই আঁকড়ে ধরবে। খুব ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মানুষের সামনে প্রচার করে বেড়াবে, আপনাকে হেয় করবে। অথচ আপনার হাজারো ভালো কাজের সামনে এই সামান্য বিচ্যুতি নিতান্তই নগণ্য। এ কারনেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে খারাপ প্রতিবেশী থেকে পানাহ চাই। যে অন্যের গুণ দেখলে লুকিয়ে ফেলে আর দোষ পেলে প্রচার করে বেড়ায়। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পানাহ চাই খারাপ শাসক থেকে, যে আমার ভালো কাজে সৌজন্যবোধ ও কৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয় না এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তা ক্ষমা করে না।’
অথচ আল্লাহ তাআলা পাপ ক্ষমা করে দেন, দোষত্রুটি ঢেকে রাখেন। তাই মানুষ শত ভুলত্রুটি ও পাপ করা সত্ত্বেও জনসম্মুখে নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়াতে পারে। কোনো এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি একবার বলেছিলেন, ‘মানুষ যদি আমার বদভ্যাস ও পাপ সম্পর্কে জানত, তাহলে তারা আমার দিকে ফিরেও তাকাত না। আমার থেকে দূরে সরে যেত এবং আমার সান্নিধ্যকে বিরক্তিকর মনে করত।'
আল্লাহ কত মহান যে, তিনি বান্দার দোষত্রুটি আড়াল করে দিয়েছেন। মানুষও মানুষের দোষ লুকায়। কিন্তু ঠিকই কানে কানে ফিসফিস করে, 'জানো, অমুক লোকটা কিন্তু এই এই অপরাধ করেছে।' কিন্তু আল্লাহ বান্দার পাপকে উপেক্ষা করবেন। উপেক্ষা করার অর্থ না জানা নয়; বরং তিনি বান্দার পাপ সম্পর্কে জানার পরও তা এড়িয়ে যান।
বলা হয়েছে-

وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ )

আপনি কখনো মনে করবেন না, জালিমরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ উদাসীন। তবে তিনি তাদেরকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়েছেন, যেদিন তাদের চক্ষু হবে স্থির। [১]

নবিজিও ছিলেন কারিম, উদারচিত্ত, মহানুভব। কারিম মূলত আল্লাহর গুণ। যারা আল্লাহর প্রকৃত বান্দা, তাদের মধ্যেও আল্লাহ তাআলা নিজ গুণের কিঞ্চিৎ বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তখন মানুষকেও বলা হয় কারিম। মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহর এই মহান গুণ নিজেদের চরিত্রে ধারণ করে তারা মানুষের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। উত্তম পদ্ধতিতে এড়িয়ে যায়।
আর নীচ প্রকৃতির লোকেরা মানুষের দোষ-ত্রুটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করে। পান থেকে চুন খসতেই চোখ রাঙানি দেয়। মানুষের চলার পথ সংকীর্ণ করে তোলে। কারণে অকারণে অন্যকে লজ্জা দেয়। কিন্তু মুমিন কখনো অশ্লীল হয় না, কারো দোষচর্চা করে না এবং কাউকে গালি দেয় না। কারণ মুমিন তো মহানুভব, উদার মনের অধিকারী।
মহান আল্লাহই প্রকৃত মহানুভব, কারিম। তাই বান্দা যখন ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন তিনি বান্দাকে তার অসংখ্য গুনাহ, বদঅভ্যাস এবং লজ্জাজনক কাজগুলো স্মরণ করিয়ে দেন না। বরং বান্দাকে ক্ষমা করে দেন।
একবার আমি দামেশকের একটি উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে যাই। পাহাড়টি অনেক উঁচু। সেখানে অনেক ঘরবাড়িও রয়েছে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। আমার মনে হলো, এসব বাড়িঘর কত উঁচুতে! এখানে আল্লাহর ইবাদত করা হয় নাকি তাঁর নাফরমানি করা হয়-সে কথা তিনি ছাড়া কেউ জানেন না। তারপরও আল্লাহ তাদেরকে অগণিত রিযিক দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা কারিম, মহানুভব; তাই বান্দা সামান্য ইবাদত নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হলেও আল্লাহ তাকে অঢেল পুরস্কার দান করেন।
কোনো মানুষ আরেকজনকে এক লোকমা খাবার খাওয়াল। এই এক লোকমা খাবারই কিয়ামতের দিন উহুদ পাহাড়ের মতো বিশাল হয়ে উঠবে। আল্লাহ তাআলা এক লোকমার বদৌলতে তাকে উহুদ পাহাড়ের সমান বিনিময় দেবেন। পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্রের আইন কি এমন আছে যে, কেউ কাউকে এক টাকা দিয়ে বিনিময়ে পাঁচ বিলিয়ন নেবে? কিন্তু আখিরাতে আল্লাহ তাআলা এর চেয়ে লক্ষ-কোটি গুণ বেশি দান করবেন মুমিন বান্দাদেরকে। আপনি কাউকে সামান্য কিছু দিলেন, সামান্য ইবাদত নিয়ে আল্লাহর সম্মুখে হাজির হলেন, আপনার সম্পদের যৎসামান্যই আল্লাহর পথে ব্যয় করলেন কিংবা একটু সবরের মাধ্যমে আপনার কুপ্রবৃত্তি অবদমিত করে রাখলেন-এই এতটুকুর বিনিময়ে আল্লাহ আপনাকে দেবেন বিশাল জান্নাত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ )

তোমরা ধাবমান হও আপন প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের মতো, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য [১]

এই নগণ্য, দুর্বল ও অধম বান্দাকে তিনি সম্মান দিয়ে বলেছেন-

.... وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ )

তোমরা আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করো, আমি তোমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করব। আর তোমরা কেবল আমাকেই ভয় করো।১৯

আমাদের আসলেই কি কোনো প্রতিশ্রুতি রয়েছে? আল্লাহর সাথে আমাদের কি কোনো তুলনা চলে? তবুও আল্লাহ তাআলা কত মহান! তিনি আমাদের সমকক্ষ সাথির মতো করেই সম্বোধন করেছেন। এটা আমাদের প্রতি আল্লাহর মহত্ত্বের প্রকাশ।
আল কুরআনের বহু স্থানে তিনি আমাদেরকে আদেশ প্রদানের সাথে সাথে সেই আদেশের কারণ ও হেতুও উল্লেখ করে দিয়েছেন। এর দ্বারা বস্তুত তিনি আমাদের সম্মানিত করেছেন। যেমন-

اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ )

আপনি তিলাওয়াত করুন কিতাব থেকে, যা আপনার প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয় এবং সালাত কায়েম করুন। সালাত অবশ্যই বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে। তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন [২]

আমরা আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাদের শুধু সালাতের আদেশ প্রদান করেই কথা শেষ করে দিতে পারতেন। কিন্তু নির্দেশ প্রদানের পাশাপাশি তিনি এই নির্দেশের অন্তর্নিহিত হেতুও আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। এতে তিনি আমাদের প্রতি মহত্ত্বেরই পরিচয় দিয়েছেন।
কোনো শক্তিধর লোক দুর্বল কাউকে কোনো আদেশ করলে, 'এই কাজটি করো' জাতীয় আদেশ করেই ক্ষান্ত হন। কোনো কারণ দর্শানোর গরজবোধ করেন না। কারণ সে নিজেকে ভাবে সম্মানিত, শক্তিধর। তার আদেশ মাথা পেতে মেনে নেওয়া ছাড়া দুর্বলের আর কোনো পথ নেই। কিন্তু আল্লাহ এত মহান হওয়া সত্ত্বেও আমাদেরকে আদেশ করার সময় কারণ বর্ণনা করেছেন। আরো বর্ণিত হয়েছে-

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ﴿١٠٣﴾

আপনি তাদের সম্পদের যাকাত গ্রহণ করুন। এই যাকাত তাদের সম্পদকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে। আর আপনি তাদের জন্য দুআ করুন। কারণ আপনার দুআ তাদের জন্য প্রশান্তিদায়ক। আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।[১]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴿١٨٣﴾

হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।[২]

তিনি আমাদেরকে তাঁর প্রতিশ্রুতির স্থল এবং ভালোবাসার পাত্র বানিয়েও সম্মানিত করেছেন। অথচ আমাদের মধ্যে তার ভালোবাসার পাত্র হওয়ার কী-ই বা যোগ্যতা রয়েছে? আল্লাহ বলেন-

...يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ...﴿٥٤﴾

তিনি তাদের ভালোবাসেন, তারাও তাঁকে ভালোবাসবে।[৩]

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا ﴿٩٦﴾

যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, দয়াময় অবশ্যই তাদের জন্য সৃষ্টি করে দেবেন ভালোবাসা।[৪]

আল্লাহ পুরো দুনিয়াটাই দিয়ে দিয়েছেন আমাদের।

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

সেই সুমহান সত্তা, যিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের কল্যাণে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেছেন এবং সেটাকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেছেন। তিনি সকল বিষয়ে সবিশেষ অবহিত [১]

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তাআলা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন আমাদের জন্য। মানুষের জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে জরুরি জিনিস অক্সিজেনকে আল্লাহ সহজলভ্য করে দিয়েছেন। আপনি যেখানেই থাকুন, যেখানেই যান, প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে কোনো মানা নেই। এই যে বাজার থেকে আপেল, আঙুর, কমলা কিনছেন, ব্যবসায়ী বা কৃষককে প্রতি কেজির মূল্য দিচ্ছেন। কিন্তু আসলেই কি আপনি আপেলের মূল্য দিচ্ছেন? আপেলের মূল্য দেওয়ার ক্ষমতা কি মানুষের আছে?
কৃষক বা ব্যবসায়ীকে যে মূল্য দেওয়া হচ্ছে তা মূলত সেবা ও শ্রমের মূল্য। কৃষক অতি যত্নের সাথে ফলের চাষ করেছে। সময়মতো পানি সেচ ও পরিচর্যা করে বড় করেছে এবং পরিপক্ক হওয়ার পর জমিন থেকে ফল তুলেছে। গুদামজাত ও সংরক্ষণ করেছে। এরপর গাড়িতে করে আপনার সামনে এনে হাজির করেছে। তাই ফল ক্রয়ের সময় আপনি প্রতি কেজির যে মূল্য দিচ্ছেন তা মূলত তাদের এইসব শ্রমের মূল্যায়ন। আর যে আপেল আপনি ক্রয় করলেন তা এক অমূল্য বস্তু; তার কোনো মূল্যই হতে পারে না। সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাদান। একইভাবে শুধু দুনিয়া নয়; তিনি আখিরাতেরও মালিক বানিয়েছেন মুমিনদের।
দুনিয়াতে এমন মানুষ আপনার খুব কমই মিলবে, যে অনুগ্রহ প্রদর্শনের পর আর কখনো তার স্মৃতিচারণ করবে না। যদি কখনো আপনার ওপর রহম করে থাকে, আপনার ওপর তার কোনো অবদান থেকে থাকে, বারবারই সে তার সস্মৃতিচারণ করবে। আমি তোমার জন্য অনেক কিছু করেছি, তোমার তখন কোনো উপায় ছিল না; আমিই তোমাকে রক্ষা করেছি ইত্যাদি নানাভাবে আপনাকে খোঁটা দিতে থাকবে। খোঁটা না দিলেও সেসবের স্মৃতিচারণ তো অবশ্যই করবে। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে কত কিছু দান করেন, তিনি কখনো খোঁটা দেন না। তিনি অনুগ্রহের বিনিময়ে বান্দাকে কোনো ধরনের পেরেশানিতেও ফেলেন না।
কিন্তু কোনো মানুষের কাছ থেকে অনুদান নিতে গেলে সে আপনার নাভিশ্বাস উঠিয়ে ছাড়বে। দরখাস্ত জমা দাও, জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে এসো, দুদিন পরে এসো, আমরা বিষয়টি দেখছি ইত্যাদি নানা ধরনের দৌড়াদৌড়িতে আপনাকে ক্লান্ত বানিয়ে ছাড়ে। কিন্তু মহান আল্লাহ আপনার প্রতি উদারতা প্রদর্শন করেন, আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করে দেন। এতে কোনো দলিল-দস্তাবেজের প্রয়োজন হয় না। তিনি যখন দান করেন, তখন অঢেল দান করেন। যখন তাঁর নাফরমানি করা হয়, তখনও তিনি উদারতার পরিচয় দেন। তিনি এতই মহানুভব যে, পাপী বান্দাকেও তার অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হতে দেন না। মহামহিম আল্লাহ বলেন-

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।(১)

তিনি কারিম তাই কারো আশা-প্রত্যাশা তাঁর কাছে অবহেলিত হয় না। আপনার কাছে একজন মানুষ এসে অত্যন্ত কাকুতি-মিনতি করে তার প্রয়োজন পেশ করল। চোখের পানিতে গাল ভিজিয়ে ফেলল। কিন্তু আপনার পাষাণ হৃদয়ে কোনো মমতার উদ্রেক হলো না। আপনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। বলুন সে কি আর আপনাকে তার ভালোবাসার তালিকায় রাখবে? তার কল্পনার দর্পণে কখনো যদি আপনি ভেসে ওঠেন, তবে উঠবেন একটা পাষণ্ডর আকৃতিতে। কারণ এমন অসহায়ত্ব ও মিনতি প্রকাশ করা সত্ত্বেও আপনি তার সামান্য আশাকে পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়; বরং আপনি নির্দয়ের মতো তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

হয়তো আপনিই কারো কাছে নিজের প্রয়োজন পেশ করলেন। সে আপনাকে ফিরিয়ে দিলো না ঠিকই; কিন্তু পরবর্তীতে জনসম্মুখে সে আপনাকে লাঞ্ছিত করবে। খোঁটা দিয়ে না হলেও, অনুগ্রহের স্মৃতিচারণ করে আপনাকে বিব্রত করবে। যারা দুয়েকবার মানুষকে উপকার করে থাকে—তাদের এমন আচরণ আপনি অহরহই দেখতে পাবেন।
কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর সম্মুখে তার প্রয়োজন তুলে ধরে, চোখের পানি ঝরিয়ে বিনয়াবনত মস্তকে তাঁর কাছে আবেদন করে, আল্লাহ কি কখনো তাকে ফিরিয়ে দেন? চোখ থেকে বেয়ে পড়া তপ্ত অশ্রুকে অবমূল্যায়ন করেন? কখনোই না। মহান আল্লাহ তো সকলের আশা-প্রত্যাশার বিশ্বস্ত ঠিকানা, চাওয়া-পাওয়ার পরম আশ্রয়। তিনি সর্বদাই অনুগ্রহ ও দানের শিশিরে সিক্ত করেন বান্দার জীবন। তিনি মহাশক্তিধর, উদারহস্ত। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই খরচ করেন।
তিনি অত্যন্ত মহানুভব ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। তাই বান্দা যখন তাঁর সম্মুখে দুই হাত তুলে প্রার্থনা করে, দু-চোখের অশ্রু ঝরায়, হৃদয়ের সব কলুষতা থেকে পবিত্র হয়ে বিনয় ও কোমলতার সুরে তাঁকে ডাকে—তিনি ঐ হাত দুটিকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।
মানুষ চাওয়ার কারণে বিরক্ত হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির ওপর ক্রোধান্বিত হন, যে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ব্যক্ত করে না।
আল্লাহ তাআলা মহানুভব, তাই তিনি উত্তম চরিত্র ও মহৎ গুণাবলিকে অত্যধিক ভালোবাসেন। আর হীন স্বভাবকে প্রচণ্ড ঘৃণা করেন।
আপনি যদি সদা সর্বদা অনর্থক কাজ-কর্ম ও অশ্লীল ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত থাকেন, অন্য কারো হকের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে শুধু স্বার্থপরের মতো জীবনযাপন করেন—এতে মূলত আপনি নিজের চারিত্রিক হীনতা ও মানবিক অধঃপতনেরই পরিচয় প্রকাশ করছেন। আল্লাহর কাছে এ ধরনের স্বভাব ঘৃণ্য।
যদি আপনার ভেতরে বসবাস করে এমন একটি হৃদয়, যা উত্তম ভাবনা এবং মুসলিমদের কল্যাণ চিন্তায় বিভোর থাকে, তাহলে এটা আল্লাহর কাছে মহৎ গুণ। তিনি ভালোবাসেন মহৎ গুণকে। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'আল্লাহ তোমাদের চেহারা-সুরত, দেহকান্তি এবং সম্পদের প্রতি লক্ষ করেন না; বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল।'[১]
মানুষের অন্তরই আল্লাহর দৃষ্টিপাতের প্রধান স্থান।
মানুষ সম্পদশালী ও দাপটের অধিকারী ব্যক্তির কাছে যায়। আল্লাহর সম্পদ ও প্রতাপের সাথে ঐ ব্যক্তির দাপটের কোনো তুলনাই চলে না। সে নগণ্য, দুর্বল ও নীচ স্বভাবের হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তার সামনে অবনত হয়। অনেক অনুনয়-বিনয় করে, চোখের পানি ফেলে তার কাছে নিজের প্রয়োজন ব্যক্ত করে। অথচ সে প্রায়ই কিছু না দিয়ে মানুষকে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু আল্লাহর কাছে প্রয়োজন পেশ করলে তা কখনো অপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে দেন না। শুধু তা-ই নয়, তিনি এত বেশি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন যে, অন্যের কাছে প্রয়োজন পেশ করা, অন্য কারো সামনে মাথা নত করাকে একদমই পছন্দ করেন না।
বিপদে-আপদে, দুরবস্থা-সংকটে যারা তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করে, তিনি তাদের অবজ্ঞা করেন না। পরম করুণা ও ভালোবাসায় টেনে নেন নিরাপদ আশ্রয়ে।
তাই কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখুন। তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন। জীবনের আশা-ভরসা, চাওয়া-পাওয়া সবকিছুকে তাঁর সাথেই জুড়ে দিন। মানুষের কাছ থেকে কোনো কিছু পাওয়ার কথা ভুলে যান। জীবনের কোনো কিছুকে তাদের সাথে সম্পৃক্ত করা থেকে বিরত থাকুন।

মহান ব্যক্তি অটুট রাখে সম্পর্ক

মহৎ লোক কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করে না। আপনি তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটালেও সে সম্পর্ক জোড়া লাগিয়ে দেয়। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে সে আপনাকে দেখতে আসবে; সেবা-শুশ্রুষা করবে। আপনি কোনো সফর থেকে ফিরলে সে আপনার সাক্ষাতে আসবে। আপনি অর্থনৈতিক সংকট বা অসচ্ছলতায় পতিত হলে সে আপনাকে সাহায্য করবে। আপনি চাওয়া ব্যতিরেকে সে আপনার প্রতি অনুগ্রহ করবে। কারিম বা মহৎ লোক তো সে-ই, যে প্রার্থনা ছাড়াই প্রয়োজন পূর্ণ করে দেয়।

আপনার একজন ভাই আছেন, আত্মমর্যাদাবোধ এবং সামাজিক অবস্থাসম্পন্ন। লোকে তাকে বিশেষ সম্মানের দৃষ্টিতেই দেখে। কিন্তু তার অর্থনৈতিক অভাব দেখা দিলো। আপনি তখন বেশ সচ্ছল, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে যথেষ্ট ফুর্তিতেই দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু আপনার ভাই অভাব-দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও চরম আত্মমর্যাদাবোধের কারণে আপনার কাছে প্রয়োজন প্রকাশ করতে পারে না। আপনি যদি তার চাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন, তাহলে আপনি তার ওপর জুলুম করলেন।
অপরদিকে মহানুভব আল্লাহর কথা ভেবে দেখুন। অনেক সাধারণ মানুষ রয়েছে যারা অভাবী, হতদরিদ্র। তাদের কাজকর্ম কথা-বার্তা সবই অমার্জিত। দ্বীন-ধর্মের পথ থেকে বহুদূরে। আবার সালাতেরও ধার ধারে না। কিন্তু আল্লাহ কি তাদেরকে বর্জন করেন? তাদের রিযিক বন্ধ করে দেন? না, বরং কখনো কখনো আল্লাহ তাদের সম্মানিতও করেন। তাদের সংকট দূর করে দেন। ঘুমের ঘোরে তাকে উত্তম কিছুর স্বপ্ন দেখান। ঘুম থেকে জেগেই সে জীবনের মোড় পরিবর্তন করে ফেলে। সে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল ঠিকই, কিন্তু আল্লাহ তার সাথে নতুন করে সম্পর্ক জুড়েছেন।

‘আল-কারিম’ থেকে বান্দার জন্য শিক্ষা

প্রকৃত কারিম ও মহানুভব আল্লাহ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। বান্দার মহানুভবতা তুলনামূলক ও আপেক্ষিক। আল্লাহই শুধু এমন সত্তা যিনি নাছোড়বান্দা মুমিনদের প্রার্থনা খুব ভালোবাসেন। ওদিকে দুনিয়ায় একজন মানুষও পাওয়া যাবে না, যার পেছনে কেউ পড়ে থাকলে সে খুশি হবে!
কারিম বা মহৎ হওয়ার শর্তই হলো, দুর্ব্যবহারকারীদের ক্ষমা করে দেওয়া এবং সমগ্র মানুষ ও বিশ্ব মানবতার প্রতি নিজের অবদান ও কল্যাণ পৌঁছে দেওয়া।
পৃথিবীর সমৃদ্ধ দেশগুলোর দিকে লক্ষ করুন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, নানা ধরনের খাদ্য-সামগ্রী এবং সীমাহীন নাগরিক সুবিধার মধ্যে তারা অতি উন্নত জীবনযাপন করছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তারা পৃথিবীর সব সুখ-ঐশ্বর্য ভোগ করছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখায় ভিন্ন চিত্র। যে প্রশাসন তাদেরকে এই উন্নত নাগরিক সভ্যতা সরবরাহ করছে, সে বা তারা মূলত অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠির মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে। তাদের সুখ-সমৃদ্ধি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল ভিত্তিই হলো অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীকে নির্দয়ভাবে শোষণ। তাদের নাগরিক সুবিধা ও জীবন-মানের প্রয়োজন মানেই হলো—জোরপূর্বক দুর্বল জাতি-গোষ্ঠির অর্থ চুরি ও তাদের সম্পদ ছিনতাই। তারা নিজেদের মুক্তমনা, উদারচিত্ত, মহানুভব যত ভূষণে ভূষিত করুক না কেন, তারা কখনোই মহানুভব হতে পারে না। স্বার্থান্ধ, শোষক, দাম্ভিক কখনো মহৎ হতে পারে না।
আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত কারিম ও মহৎ হতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপনার অবদান, অনুগ্রহ, কল্যাণ মানবজাতিকে অতিক্রম করে প্রাণীদেরও ছুঁয়ে যায়।
পোল্ট্রিফার্মের মুরগির ছানাগুলোও আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে। কিন্তু ইউরোপ- আমেরিকার লোকেরা যখন দেখে তাদের দেশে মুরগির উৎপাদন দেশের খাদ্য-চাহিদার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে, তখন সেগুলো নির্দয়ভাবে আগুনে জ্বালিয়ে ভস্ম করে ফেলে। তাদের উন্নত সভ্যতা আর উচ্চ শিক্ষা এমনটাই তাদের শিখিয়েছে। কোনো মুসলিম কখনো কি এমন কাজ করতে পারে? কী অপরাধ ঐ মুরগির বাচ্চাগুলোর? কেন ওদের বড় হতে দেওয়া হলো না? বড় হওয়ার পর আপনি সেগুলো আল্লাহর নামে জবাই করে খেতে পারেন, মাংস অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারেন কিংবা খাদ্যসংকটে থাকা তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন। এর কারণে আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করবেন। কিন্তু আপনি আগুনে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেবেন-এটা কোন ধরনের সভ্যতা? এমন হীন কাজ করে কেউ মহান হতে পারে?
আপনি কারিম এবং মহাত্মার অধিকারী তখনই হতে পারবেন, যখন আপনার অবদান, আপনার সদাচরণ, আপনার কল্যাণ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে এবং সমগ্র সৃষ্টিকেই ছুঁয়ে যাবে।
একটি ব্যাপারে আল্লাহর শপথ করেই আপনাকে অনুরোধ করছি-কখনো কোনো অমুসলিমের সাথে অনর্থক দুর্ব্যবহার করবেন না। কেননা একজন অগ্নিপূজক, পৌত্তলিক বা নাস্তিকের সাথে দুর্ব্যবহারের কুপ্রভাব একজন মুসলিমের সাথে দুর্ব্যবহারের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। একজন ধর্মবিদ্বেষী বা বিধর্মী ইসলামকে জানার সুযোগ পায় মুসলিমদের আচার-ব্যবহার ও মার্জিত সামাজিকতায়। আর আপনার দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি তাকে ইসলাম থেকে বহু দূরে সরিয়ে দিলেন।

মানব-সন্তানদের মধ্যে মহানুভব ও মহাত্মা সে-ই, যে মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়, তাদের দোষত্রুটি ঢেকে দেয়, প্রতিশোধপ্রবণতা বর্জন করে এবং দান-দাক্ষিণ্য ও অনুগ্রহ-উপহারে তাদের ভরিয়ে দেয়।

স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা মহানুভবতার পরিচয়

এক লোকের কাছে একবার খুবই আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা শুনি। সে তার বাসার ময়লা-আবর্জনার ব্যাগ ডাস্টবিনে ফেলতে গিয়েছিল। সেখানে সে একটা ব্যাগ দেখল, যার মধ্যে কিছু একটা নড়াচড়া করছে। ভয়ে ভয়ে ব্যাগটার মুখ খুলতেই দেখা মিলল এক ফুটফুটে নবজাতকের। যতদূর ধারণা করা যায়, বাচ্চাটিকে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা আগে ফেলে রাখা হয়েছে। সে বাচ্চাটিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেল। উন্নতির প্রয়োজনে তাকে ইনকিউবেটরে রাখা হলো কিছুক্ষণ। এরপর তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল লোকটি।
আপন সন্তানের মতোই সে পরিচর্যা শুরু করছিল বাচ্চাটির। একটু বড় হওয়ার পর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলো। আমি তার কাছে শুনেছিলাম যে, প্রাইমারি, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সে বাচ্চাটিকে অতি যত্নের সাথে লালন-পালন করেছিল সে। ছেলেটিকে মানুষ করতে কোনো কমতি রাখা হয়নি তার পক্ষ থেকে। এখন এই সুপ্রতিষ্ঠিত ছেলেটি নিজের গাড়ি হাকিয়ে কোথাও যাওয়ার পথে পালক বাবার সাথে দেখা হলো। তিনি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করলে ছেলেটি যদি কিছুক্ষণ ভেবে, মাথা চুলকে দ্বিধান্বিত হয়ে শেষমেষ রাজি হয় বিষয়টা কেমন হবে? পালক বাবাকে সামান্য সাহায্য করতে এত চিন্তা করলে নিশ্চয়ই সেটা অকৃতজ্ঞতাই মনে হবে!
একজন মানুষের অনুগ্রহের প্রতিদানে কৃতজ্ঞতা না দেখানো যদি অপরাধ হয়, তাহলে সমগ্র জগৎসমূহের স্রষ্টা যিনি, তার ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া বা কালক্ষেপণ করা কতটা গুরুতর অপরাধ হবে? সাহাবিদের জীবনী থেকে চমকপ্রদ একটি ঘটনা শুনুন। মৃতার যুদ্ধ। যায়েদ ইবনুল হারিসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রেরণ করেন। শত্রুপক্ষে ছিল দুই লক্ষ খ্রিষ্টান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই যুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে তিন জন আমির নিযুক্ত করে দিয়েছিলেন। যখন উভয়পক্ষে তুমুল যুদ্ধ লেগে যায় তখন আল্লাহ তাআলা যুদ্ধক্ষেত্র নবিজির সামনে তুলে ধরেন। তিনি সাহাবিদের কাছে যুদ্ধের বর্ণনা দিতে থাকেন। নবিজি বলেন, এখন পতাকা গ্রহণ করেছে যায়েদ। সে জিহাদ করতে করতে শহিদ হয়ে গেছে। আমি জান্নাতে তার স্থান দেখতে পাচ্ছি। এখন ঝান্ডা ধরেছে জাফর। পতাকা নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে সেও শহিদ হয়ে গেছে। আমি জান্নাতে তার স্থান দেখতে পাচ্ছি। এখন পতাকা নিয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা। সেও পতাকা ধরে যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়ে গেছে। আমি জান্নাতে তার স্থান দেখতে পাচ্ছি। তবে তার অবস্থান তার অপর দুই সাথির চেয়ে একটু নিচে। কারণ সে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছিল।
অর্থাৎ, আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রাযিয়াল্লাহু আনহুর অন্তরে অনাকাঙ্কিত একটু দ্বিধা সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি সাথে সাথেই নিজ আত্মাকে তখন ভর্ৎসনা করেছিলেন এই কথা বলে-

হে নফস, তোমাকে আল্লাহর কসম দিচ্ছি, তুমি ঘোড়া থেকে নেমে আক্রমণ করো। কী হলো তোমার, তুমি জান্নাতকে অপছন্দ করছ? হে আত্মা! তুমি যদি শহিদ হতে না পারো, তবুও তোমার মৃত্যু তো হবে নিশ্চয়! যে শাহাদাতের স্বপ্ন তুমি এতদিন দেখেছিলে, আজ তুমি তার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে; তাদের দুজনের পথ যদি ধরো পেয়ে যাবে হিদায়াত [১]

আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইখলাসের সাথেই যুদ্ধ করেছিলেন। তবুও যেহেতু সামান্য দ্বিধা-সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল-এ কারণেই তার স্থান তার অপর দুই সাথির স্থানের চেয়ে নিচে হয়েছে।
অতএব, আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে কোনো দ্বিধা-সংশয়ের স্থান নেই। বিনা বাক্য ব্যয়ে এবং কালক্ষেপণ না করেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে হবে সম্পূর্ণ নিঃসংকোচে; স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে কোনোরূপ দ্বিধা-সংশয় হয়ে গেল কি না-এই ভয়ে সাহাবিগণ ভীত থাকতেন।

নবিজির প্রিয় সাহাবি হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন নবিজির গোপন তথ্যের সংরক্ষক। কারা কারা সাহাবির বেশ ধরে মুনাফেকি করত, রাসুলুল্লাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত, তাদের সকলের তালিকা জানতেন হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, ইসলামের বীরযোদ্ধা, ন্যায়পরায়ণতার মূর্তপ্রতীক উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি মাঝে মাঝে হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করতেন, 'হুযায়ফা! তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি ঐ তালিকায় আমার নাম পেয়েছ?'[১] তিনি এটা কৌতুক করে জিজ্ঞেস করেননি। বাস্তবেই তিনি আল্লাহর ভয়ে শঙ্কিত ছিলেন, খাঁটি হৃদয়েই তিনি জানতে চেয়েছেন। আল্লাহর মহত্ত্ব ও প্রতাপের সামনে, আখিরাতের ভয়ে সবসময়ই তিনি নিজের নফসের হিসাব-নিকাশ করতেন। তিনি ভাবতেন, জানি না হয়তো আমি অবহেলাকারী, হয়তো আমি মুনাফিক। যদি সুদূর বাগদাদে একটি খচ্চরও পা পিছলে পড়ে যায়, তাহলে আল্লাহ আমার হিসাব নেবেন।
একবার আজারবাইজানের শাসকের পক্ষ থেকে একজন দূত এলো উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। তার আসতে আসতে রাত হয়ে যায়। রাত্রি বেলায় উমারের দরজার কড়া নাড়া তার কাছে অনুচিত মনে হলে সে মসজিদে চলে যায়। মসজিদে গিয়ে দেখতে পায় এক ব্যক্তি সালাত পড়ছে এবং কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে দুআ করছে, 'হে আল্লাহ! আপনি কি আমার তাওবা কবুল করেছেন? যদি কবুল করেন, আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারি। নাকি আপনি আমার তাওবা ফিরিয়ে দিয়েছেন? তা-ই যদি হয়, তবে আমি আপনার সামনে কেঁদেই যাব।'
সালাত শেষ হওয়ার পর দূত তাকে জিজ্ঞেস করল, 'কে আপনি?'
তিনি বললেন, 'আমি উমার।'
'আপনি রাত্রে ঘুমান না?'
'দেখো ভাই, যদি আমি ঘুমিয়ে রাত কাটিয়ে দিই, তবে তো আমি আমার রবের সামনে নিজেকে ক্ষয় করে ফেললাম। আর যদি দিনে ঘুমিয়ে যাই, তবে তো আমার প্রজাদের হক নষ্ট করে ফেললাম।'

অতঃপর উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু দূতকে সাথে করে নিয়ে বাসায় গেলেন। স্ত্রী উম্ম কুলসুমকে জিজ্ঞেস করলেন, মেহমানকে দেওয়ার মতো কী খাবার আছে? স্ত্রী উত্তর দেয়, রুটি আর লবণ ছাড়া কিছুই নেই।
সে জমানায় নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকেরাও মাংস-রুটি খেত। অথচ আমিরুল মুমিনিনের ঘরে শুধু রুটি আর লবণ ছাড়া কিছুই নেই। তাই তিনি মেহমানকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কোনো গরিব মুসলিমের ঘরে খেতে চাও? নাকি আমার এখানে খেতে চাও?
মেহমান বলল, না, আল্লাহর কসম! আপনি খলিফা। আমি বরং আপনার এখানেই মেহমান হতে চাই।
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী উদ্দেশ্যে এসেছিলে যেন?
'আজারবাইজানের শাসকের পক্ষ থেকে আপনার জন্য এই উপহার নিয়ে এসেছি। এ কথা বলে সে একটি মূল্যবান পাত্র উমারের দিকে বাড়িয়ে দিলো। তাতে ছিল সমাজের অভিজাত শ্রেণির জন্য বানানো উন্নত মানের মিষ্টিজাতীয় খাবার।'
'তোমাদের দেশের সাধারণ মুসলিমরাও কি এমন খাবার খায়?'
'জি না। এটা কেবল সমাজের ধনী আর অভিজাত নাগরিকদের জন্য বিশেষভাবে বানানো।'
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, যে খাবার গরিব সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা খেতে পারে না, উমারের পেটের জন্য সেই খাবার হারাম। এই খাবার মদিনার গরিব মুসলিম নাগরিকদের মাঝে বিলিয়ে দাও। এরপর তিনি আজারবাইজানের শাসককে কঠোর ভাষায় দূত মারফত এক পত্রাদেশ পাঠালেন— 'সাধারণ মুসলিম জনগণ যে খাবার খায়, তুমিও সেই খাবারই খাবে।' [১]

একবার উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু রাস্তায় একটি হৃষ্টপুষ্ট উট দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এটা কার উট? লোকেরা উত্তর দিলো, আপনার ছেলে আব্দুল্লাহর। তিনি বললেন, তাকে ডেকে নিয়ে এসো।

আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত হলেন। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু কঠিন ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন, এই উটটি কার? ছেলে উত্তর দিলেন, আমি আমার নিজের পয়সা দিয়েই এটা কিনেছি। মোটা-তাজা করার জন্য চারণভূমিতে পাঠিয়েছি; যেন একটু হৃষ্টপুষ্ট হলে তা বিক্রি করে জীবিকার প্রয়োজন পূরণ করতে পারি। এতে আমার অপরাধটা কোথায়? আমি ভুল কী করেছি?
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, বেশ করেছ! কিন্তু তুমি আমিরুল মুমিনিনের ছেলে। সেই সুবাদে তোমার উট বাড়তি সুবিধা ভোগ করে মোটা-তাজা হয়েছে। চারণভূমিতে ভালো ঘাসের জায়গায় লোকেরা বলেছে, 'উটটিকে সুযোগ করে দাও, এটা আমিরুল মুমিনিনের ছেলের।' পানির ঘাটে গিয়ে বলেছে, 'এই উটের প্রতি সবাই বিশেষ খেয়াল রাখো, ওটা আমিরুল মুমিনিনের ছেলের।' এভাবেই তোমার উট হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। এক্ষুনি উটটি বিক্রি করে দাও। বিক্রিত অর্থ থেকে কেবল তোমার পুঁজিটুকু নেবে আর বাকিটা বাইতুল মালে জমা করে দেবে। [১]

উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার সাথি-সঙ্গীদের সাথে বসে ছিলেন। সাথিদের কেউ একজন বলল, আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহর পর আপনার মতো শ্রেষ্ঠ ও মহৎ লোক আর কাউকে আমরা দেখিনি। তার দাবি খুবই চমকপ্রদ ছিল। সে হিসেবে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে 'বারাকাল্লাহ ফি হায়াতিক' বা 'জাযাকাল্লাহু খয়রান'- জাতীয় কোনো কথা বলে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তিনি তার দিকে রক্তলাল চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, যেন আস্ত খেয়ে ফেলবেন!
অবস্থা বেগতিক দেখে তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, 'না, আল্লাহর কসম! আমরা আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি দেখেছি।' তিনি কিছুটা শান্ত হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, 'কে তিনি?' সে উত্তর দিলো, 'আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু।' তখন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, 'তোমরা সবাই মিথ্যে বলেছ; এই একজন শুধু সত্য বলেছে।'
লক্ষ করুন, প্রথমজনের কথায় যারা চুপ করে ছিল, তিনি তাদেরকেও মিথ্যাবাদী বলেছেন। এরপর যোগ করেছেন, 'আমি মাঝে মাঝে উটের পাল থেকে হারিয়ে যেতাম। আর আবু বকর ছিল মেশকের চেয়েও সুবাসিত।'

একবার তিনি তার এক গভর্নরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'মানুষ যখন কোনো চোর বা ডাকাত ধরে তোমার কাছে নিয়ে আসবে, তখন তুমি কীভাবে বিচার করবে?'
গভর্নর বলল, 'আমি তার হাত কেটে দেবো।'
উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তেমনি তোমার শাসনাধীন অঞ্চলের কোনো নাগরিক কখনো ক্ষুধার্ত বা বেকার থাকলে আমিও তোমার হাত কেটে দেবো।' [১]

তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টি পরিচালনার দায়ভার অর্পণ করেছেন আমাদের ওপর, যেন আমরা তাদের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারি, তাদের পরিধেয় বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে পারি এবং তাদের পেশা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারি। অতএব, আমরা যদি তাদের এই প্রাপ্য বুঝিয়ে দিই, তাহলে এর মাধ্যমে আল্লাহর শোকর আদায় করতে পারব।
জেনে রেখো! এই হাতগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে কাজের জন্য। তাই এই হাত যখন হালালের মধ্যে কোনো কাজ খুঁজে পাবে না, তখন হারামের মধ্যেই কর্মক্ষেত্র খুঁজে নেবে। সুতরাং এই হাতগুলো হারামে জড়ানোর আগেই হালাল পথে কাজে লাগিয়ে দাও।' [২]
এমন মহান ছিলেন উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু। তা সত্ত্বেও তিনি ভয় পেতেন, তিনি মুনাফিকদের কাতারে শামিল হয়ে গিয়েছেন কি না।

সকল চাওয়া রবের কাছে

মুসা আলাইহিস সালাম একদা আল্লাহর নিকট দুআ করলেন, 'হে রব, মাঝে মাঝে আমার এমন কিছু প্রয়োজন দেখা দেয়, যা আপনার কাছে চাইতে লজ্জাবোধ করি।' আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে জবাব দিলেন, 'হে মুসা! আমাকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে কিছু চাইবে না। তোমার যত প্রয়োজন সবকিছু আমার কাছেই প্রার্থনা করবে। খাওয়ার লবণ বা বকরির ঘাসই হোক না কেন, সকল প্রয়োজনে আমার দুয়ারেই হাত পাতবে।' [৩]

আল্লাহ তাআলা বান্দার অনুনয়-বিনয়ের সাথে দুআ করাকে খুব পছন্দ করেন। তাই শেষরাত্রে উঠে পড়ুন। রাতের শান্ত, নিস্তব্ধ শেষ প্রহরে সালাতে দাঁড়িয়ে যান। দু-হাত তুলে অনুনয়-বিনয় করে, হৃদয়-আত্মা আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়ে দুআ করুন। কারণ আল্লাহ এই ধরনের দুআ পছন্দ করেন।
আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, একবার রাতে এক লোক তার কাছে এসেছিল কোনো প্রয়োজনের কথা জানাতে। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, বাতিটা উঁচু করে ধরো। সে বাতিটা উঁচু করে ধরলো। তিনি বললেন, এবার বলো তুমি কী চাও?
তিনি সরাসরি প্রয়োজনের কথা জিজ্ঞেস করতে পারতেন। তা না করে বাতি ওপরে তুলতে বলেছেন। এর পিছনে কী রহস্য? কারণ আলোর সামনে লোকটির চেহারা চেনা গেলে সে লজ্জা পাবে এবং তার প্রয়োজন জানাতে সংকোচবোধ করবে। এমনই ছিল আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর বুদ্ধিমত্তার চিত্র।
পূর্ববর্তী জনৈক আলিম ছিলেন। তিনি ভিক্ষুককে কখনো হাতে করে কিছু দিতেন না। টেবিলের ওপর রেখে দিতেন। সেখান থেকে ভিক্ষুক তুলে নিয়ে যেত। তিনি জানতেন, দাতার হাত ওপরের হাত, গ্রহীতার হাত নিচে। অতএব, একজন মুমিনের হাত যেন নিচু না হয়, সেজন্য তিনি হাতে করে কিছু উঠিয়ে দিতেন না।
প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহর মহান সিফাত আল-কারিম। এই সিফাত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরকেও আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হতে হবে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়ার নির্দেশ করেছেন। আর আল্লাহর মহানুভবতা ও মহত্ত্বের সিফাত হলো—
'যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, তুমি তার সাথে সম্পর্ক জুড়ে রাখো। কেউ তোমার সাথে অন্যায় করলে তাকে ক্ষমা করে দাও। কেউ তোমাকে বঞ্চিত করলেও তুমি তার পূর্ণ প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবে।'
তোমার নীরবতা যেন হয় চিন্তার মগ্নতা; তোমার কথা এবং উচ্চারণ যেন হয় আল্লাহর যিকির।' [১]

টিকাঃ
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৩১
[১] সহিহ বুখারি: ৩৩৮২
[১] সুরা ইনফিতার, আয়াত: ৬
[১] সিলসিলাতুল আহাদিসিস সাহিহাহ, খণ্ড : ৭; পৃষ্ঠা : ৩৭৭
[১] সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪২
[১] সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৩৩
[২] সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫
[১] সুরা তাওবা, আয়াত: ১০৩
[২] সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩
[৩] সুরা মায়িদা, আয়াত: ৫৪
[৪] সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৯৬
[১] সুরা বাকারা, আয়াত : ২৯
(১) সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩
[১] সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪
[১] সিরাতু ইবনি হিশام, খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৫৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৪২৩; তবে এই ঘটনার কোনো সনদ পাওয়া যায় না।
[১] আল-মারিফাতু ওয়াত তারিখ, ফাসাবি, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৭৬৯
[১] আয-যায়লুর রাব্বানি: ৩৭০
[১] আল-কুদওয়াহ উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃষ্ঠা: ৬৯.
[১] আলফু কিসসাহ, পৃষ্ঠা: ৩৮৫
[২] আলফু কিসসাহ, পৃষ্ঠা: ৩৮৫
[৩] জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ২২৫; এটি একটি ইসরাইলি বর্ণনা।
[১] আলফু কিসসাহ, পৃষ্ঠা: ৪৮২

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আর-রাযযাক : মহান রিযিকদাতা

📄 আর-রাযযাক : মহান রিযিকদাতা


গহীন জঙ্গলের কোনো এক গাছের চূড়ায় কাকের বাসা। সেখানে রয়েছে দুর্বল অসহায় ছোট্টপ্রাণ এক ছানা। মাত্রই ডিম ফুটে বেরিয়েছে। ক্ষুধায় খুব কষ্ট হয় ওর। নীড়ের খড়কুটোর ফাঁক দিয়ে সে তাকিয়ে থাকে আলো-ঝলমল পৃথিবীর দিকে। ওর দিকে তাকানোর কেউ নেই, নিজের মা পর্যন্ত চেনে না ওকে। কিন্তু সপ্ত আকাশ ভেদ করে, পরম মমতা দিয়ে কেউ দেখছেন ছোট্ট সেই মিষ্টি ছানাটিকে। পরম স্নেহে ওর কাছে খাবার পৌঁছে দেন তিনি। তিনি আর-রাযযাক; মহান রিযিকদাতা।

☆☆☆

তিনি মহান রিযিকদাতা; রিযিক দান করেন সমগ্র সৃষ্টিকে। সৃষ্টিকুলের যত প্রয়োজন, যত চাহিদা-সব তিনিই পূরণ করেন, তা পরিমাণে যত বেশিই হোক না কেন! সীমাহীন দানে কুণ্ঠাবোধ করেন না কখনো। তাই তো তিনি শুধু রিযিকদাতা নন; বরং মহান রিযিকদাতা, যার বদান্যতা বান্দার কল্পনাকেও হার মানায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَكَأَيِّن مِّن دَابَّةٍ لَّا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ *

এমন কত জীবজন্তু আছে যারা নিজেদের খাবার নিজেরা সঞ্চয় করতে পারে না। আল্লাহই রিযিক দান করেন তাদের ও তোমাদের। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ [১]

আল্লাহর নবি দাউদ আলাইহিস সালাম দুআ করতেন- হে আল্লাহ! আপনি তো এমন সত্তা, যিনি কাকের বাসায় ছোট্ট কাকের ছানাটিকেও রিযিক দান করেন!'[২]

রিযিক লাভের উপায়

আপনি যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়কারীদের একজন হয়ে থাকেন তো আপনার জন্যে সুসংবাদ! আল্লাহ তাআলা সালাত আদায়ের জন্যে রিযিক প্রদানের প্রতিজ্ঞা করেছেন। আর-রাযযাক বলেন-

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى *

(হে মুহাম্মাদ!) আপনার পরিবারবর্গকে সালাত আদায়ের আদেশ দিন এবং তাতে অটল-অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিযিক চাই না; আমিই আপনাকে রিযিক দান করি। আর সুসংবাদ কেবল মুত্তাকিদের জন্য [৩]

কাজেই রিযিক বৃদ্ধি করতে চাইলে অবশ্যই সালাত আদায় করতে হবে বিনয়, একাগ্রতা ও খুশু-খুযুর সাথে। খুশু-খুযুবিহীন সালাত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। মনে রাখবেন, এটি কিন্তু সালাতের আদব নয়; বরং সালাতের ফরয[৪]। আল্লাহ বলেন-

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ )

মুমিনগণ সফল, যারা খুশু-খুযুর সাথে সালাত আদায় করে [১]।

আল্লাহই আপনার রিযিকদাতা, তাই সকল কাজে ফিরে আসুন তাঁরই দিকে। তাঁর কাছ থেকেই চেয়ে নিন সবকিছু। বান্দার আকুল চাওয়া আল্লাহ ভালোবাসেন। ঘরের হারানো চাবিটা, জুতার ছিঁড়ে যাওয়া ফিতাটা, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সামান্য বস্তুগুলোও চেয়ে নিন তাঁর কাছ থেকে।
মুসা আলাইহিস সালাম এক্ষেত্রে আমাদের বড় আদর্শ। তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন-

وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ ...

মুসা যখন আমার নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হলো এবং তার প্রতিপালক তার সঙ্গে কথা বললেন, তখন সে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে দর্শন দিন। আমি আপনাকে দেখব।'[২]

আল্লাহকে দেখার বাসনা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া। আবার যখন তিনি ক্ষুধার কষ্টে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তখন নিজের অসহায়ত্বের সবটুকু প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে চেয়েছিলেন খাবার ও আশ্রয়। আল্লাহ বলেন-

ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ

অতঃপর সে ছায়ার নিচে আশ্রয় গ্রহণ করে বলল, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন, আমি তো কেবল তারই মুখাপেক্ষী।'[৩]

তাই ছোট-বড় সবকিছুর জন্য আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করুন। আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য আয়াত নাযিল করে রিযিকের নিশ্চয়তা দিয়েছেন, জানিয়েছেন।

রিযিকের দায়িত্ব একান্তই তাঁর। তবু মানুষ অস্থির হয়ে ওঠে; পেরেশান হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাদেরকে চিন্তিত হতে বলেছেন আখিরাতের ব্যাপারে; জান্নাত অর্জনের ব্যাপারে। অথচ তারা কেবল দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়ায় আর জান্নাতের কথা বেমালুম ভুলে যায়।
এজন্য আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'তুমি রিযিক অন্বেষণে আদিষ্ট নও; কিন্তু জান্নাত অন্বেষণে আদিষ্ট।'
অর্থাৎ, রিযিকের সন্ধান না করায় তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে না; কিন্তু জান্নাতের অনুসন্ধান না করলে তোমাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
কী বিস্ময়কর! মানুষকে যে জিনিসের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে, মানুষ তা নিয়ে কতই না ব্যস্ত! অথচ রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে গ্রহণ করেছেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে-

اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ ثُمَّ رَزَقَكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ هَلْ مِن شُرَكَابِكُم مَّن يَفْعَلُ مِن ذَلِكُم مِّن شَيْءٍ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ

আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর রিযিক দিয়েছেন। তিনিই তোমাদের মৃত্যু দেবেন এবং পরে জীবিত করবেন। তোমাদের দেব- দেবীগুলোর মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে এসবের কোনো কিছু করতে পারে? তারা যাদেরকে শরিক করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, মহান।[১]

وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْنًا كَبِيرًا *

দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমি তাদের রিযিক দিই; তোমাদেরও রিযিক দিই। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।[২]

وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ فَوَرَبِّ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ لَحَقِّ مِثْلَ مَا أَنَّكُمْ تَنطِقُونَ

আকাশেই রয়েছে তোমাদের রিযিক ও প্রতিশ্রুত সবকিছু। আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিপালকের শপথ! তোমাদের কথাবার্তার মতোই এসব সত্য।[১]

কত হৃদয়গ্রাহী ও দৃঢ় ভাষায় আল্লাহ আমাদের রিযিকের নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। তারপরও আমরা দুনিয়ার সামান্য কিছু প্রাপ্তির জন্য আখিরাতকে বেচে দিই। অথচ আখিরাতের হিসাব বড়ই কঠিন-

وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى )

মানুষ যতটুকু কর্ম করবে তার চেয়ে বেশি কিছুই পাবে না।[২]

কিন্তু বাস্তবে আখিরাতের চিন্তা না করে আমরা উল্টো পথে রিযিকের জন্যে ছুটছি।

অকারণ দুশ্চিন্তা

অর্থহীন দুই ভাইয়ের গল্প বলি। বড় ভাইটি হঠাৎ মারা যায়। মৃত্যুর সময় রেখে যায় পাঁচ সন্তান। তার তেমন কোনো ধন-সম্পদ ছিল না। বড় ভাই মারা যাওয়ায় তার সন্তানদের দেখভালের দায়িত্ব ছোট ভাইয়ের ওপর বর্তায়। সে দুশ্চিন্তায় কাঁদতে শুরু করে। এক শাইখের সাথে তার পরিচয় ছিল। শাইখ তাকে এ অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ব্যাপার! কাঁদছো কেন?' উত্তরে সে বলল, 'আমার ভাই মারা গেছে। তার পাঁচটা সন্তানের দায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। অথচ ওদের খরচ বহনের কোনো ব্যবস্থা রেখে যায়নি সে।'
-সে কি কিছুই রেখে যায়নি?
-হ্যাঁ, সামান্য কিছু সম্পদ রেখে গেছে। ওগুলো দিয়ে বছর দুয়েকের মতো তাদের খরচ চলবে।
-বেশ তো! যখন এই বছর দুয়েকের খরচা শেষ হবে তখন আবার কান্না শুরু কোরো। এখন নাহয় নিশ্চিন্তে থাকো।

পরে দেখা গেল, এক বছর শেষ হওয়ার তিন মাস আগেই লোকটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
আমার পরিচিত এক লোক ছিলেন। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে একবার তার বাড়িটি ভেঙে ফেলার ফরমান আসে। এর পরিবর্তে অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে তাকে উপযুক্ত আরেকটি বাড়ি প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তারপরও বাড়িভাঙার খবর শুনেই সে ভেঙে পড়ে। দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা আর দুঃখে তার মন খানখান হয়ে যায়। পরবর্তীতে জানা গেল, সেই বাড়িটি ভাঙার পূর্বেই লোকটা মারা গেছে। তাহলে ভবিষ্যৎ নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করে কী লাভ হলো? অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কোনো মানেই হয় না।

রিযিক যেভাবে আসে

আপনি কি দৈনিক খানাপিনা করাকেই একমাত্র রিযিক ভেবে বসে আছেন? নিঃসন্দেহে এটা রিযিক। কিন্তু রিযিক তো কেবল এতটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রিযিক দু-প্রকার। দেহের রিযিক ও আত্মার খোরাক। তিনি স্বীয় করুণায় আপনার মুখে খাবার তুলে দিয়ে আপনার দেহকে সতেজ রাখেন। আবার তিনিই প্রিয় বান্দাদের অন্তরে বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের বোধ ঢেলে দিয়ে খোরাক জোগান আত্মার।
ধনীকে দেন সম্পদের প্রাচুর্য, আর গরিবকে দেন রিযিকদাতার সামনে মিনতি করার সুযোগ। বস্তুগত সম্পদ না পেলেও আল্লাহ তাকে দান করেন আত্মিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি, আল্লাহর ফয়সালায় সবর ও সন্তুষ্টির পরম প্রাপ্তি। তুলনা করলে দেখা যাবে তারা দুজন প্রায় সমান। একজনের রয়েছে বস্তুগত সমৃদ্ধি; কিন্তু সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ঝক্কি, মানসিক অশান্তি। আরেক জনের বস্তুগত সংকট; কিন্তু হৃদয় ও আত্মার জগতে সে বাদশাহ।

অফুরন্ত ভান্ডার

বান্দা যখন আল্লাহর কাছে রিযিক প্রত্যাশা করে তখন আল্লাহ তাকে রিযিক প্রদান করেন। হয়তো রাস্তা দিয়ে চলতে ফিরতে বেকার কেউ চাকরির সন্ধান পেয়ে যেতে পারে। আপনার আশপাশে তাকালে এমন হাজারটা দৃষ্টান্ত পাবেন। বিখ্যাত বুযুর্গ হাতিম আসাম রাহিমাহুল্লাহর কাছে এক লোক এসে জিজ্ঞেস করে, 'আপনার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয় কোথা থেকে?' হাতিম আসাম রাহিমাহুল্লাহ উত্তর দেন, 'আল্লাহর খাদ্যভান্ডার থেকে।' লোকটি একট চটে গিয়ে বলে, 'আল্লাহ কি আসমান থেকে আপনার ওপর রুটি ফেলে দেন? তা না হলে এই কথার অর্থ কী?'
হাতিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'যদি জমিন না থাকত তাহলে আল্লাহ অবশ্যই বান্দার কোলে রুটি ফেলতেন। কিন্তু যেহেতু জমিন সৃষ্টি করেছেন, তাই তিনি এই জমিন থেকেই আমার রিযিকের ব্যবস্থা করেন।'
আপনি যখন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবেন আল্লাহই একমাত্র রিযিকদাতা, মহান শক্তিধর, তখন অবশ্যই সব কাজে আপনি আল্লাহকে স্মরণ করবেন আলাদা আলাদাভাবে। রোগ-ব্যাধি ভালো হয়ে গেলে আপনি নিশ্চয় বলবেন, আল্লাহই আমাকে আরোগ্য দান করেছেন। আপনি তখন এর-ওর পেছনে দৌড়াবেন না। আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে প্রয়োজন ব্যক্ত করবেন না।
জনৈক ইবাদতগুজার ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'আপনার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয় কোথা থেকে?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি এমন এক মালিকের ভান্ডার থেকে খাবার পাই, যার ভান্ডারে কখনো কোনো চোর-ডাকাত ঢুকতে পারে না, পোকামাকড়ও খেয়ে নষ্ট করতে পারে না।'
আল্লাহর ধনভান্ডার সর্বদা উন্মুক্ত; কারো জন্য তা রুদ্ধ নয়। তাঁর ভান্ডার সর্বদা পরিপূর্ণ; কখনো তাতে ঘাটতি হয় না। ছোট-বড় সকল বস্তু রয়েছে সেখানে। আল্লাহ বলেন-

وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا عِندَنَا خَزَابِنُهُ وَمَا نُنَزِّلُهُ إِلَّا بِقَدَرٍ مَّعْلُومٍ

আমার নিকটেই রয়েছে প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার এবং আমি তা পরিজ্ঞাত পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি।১১

টমাস রবার্ট ম্যালথাসের তত্ত্ব

পৃথিবীর ইতিহাসে জনসংখ্যাবৃদ্ধির তত্ত্ব ইসলামের মানদণ্ডে বাতিল। এই তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টমাস রবার্ট ম্যালথাস। তাঁর ধারণা ছিল, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে খাদ্য উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় থাকবে না; যা নিশ্চিত দুর্ভিক্ষ ডেকে আনবে এবং খাদ্য না পেয়ে বাড়তি জনসংখ্যা বিলীন হয়ে যাবে।
আসলে এমন কথা কেবল সেসব লোকই বলতে পারে, যারা আল্লাহর কুদরত উপলব্ধি করতে অক্ষম।
আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সংকোচন, সংকট বা দুর্ভিক্ষ এলে তা মানুষের পরীক্ষা, শাস্তি কিংবা সংশোধনের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। মানুষ যখন কোনো কিছুতে সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন সে অক্ষমতার কারণেই সংকটে পতিত হয়। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে সংকট এলে তা অক্ষমতার কারণে হতে পারে না। তিনি সংশোধনের উদ্দেশ্যে শাস্তি দেওয়ার জন্য কিংবা পরীক্ষা নিতে এমনটি করে থাকেন।
জনৈক নেককার ব্যক্তির স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আপনার স্বামী আপনাকে কী পরিমাণ ভরণ-পোষণ দেয়?' তখন সে উত্তর দিলো, 'তিনি আমাকে কিছুই দেন না; কেবল ওজন করেন।' অর্থাৎ, দাতা তো একমাত্র আল্লাহ, স্বামী কেবল পরিমাপ করে পৌঁছে দেন।
একবার আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় পেয়ে গেলে দুনিয়ার কোনো কিছু হারানোর ব্যথা আপনাকে পর্যুদস্ত করতে পারবে না। কখনো যদি কোনো কিছু হাতছাড়া হওয়ায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন, তাহলে বুঝে নেবেন আপনি আসলে আল্লাহকেই এখনো চিনতে পারেননি। যে আল্লাহর পরিচয় পেয়েছে, যে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে গেছে, সে ব্যথিত হলেও তা তাকে আফসোসের দিকে ঠেলে দেয় না। কত মানুষ জমি বিক্রি করে দেওয়ার কিছুদিন পর জমির দাম হয়ে যায় দ্বিগুণ। তখন সে হা-হুতাশ শুরু করে দেয়, অস্থির হয়ে ওঠে। হায়! জমিটুকু যদি আজ থাকত, তাহলে আমার কপাল খুলে যেত!
বর্তমানের যা কিছু জটিল রোগ, তার অধিকাংশই আসে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অনুতাপ, উৎকণ্ঠা এবং মনস্তাত্বিক কারণে।

প্রার্থনা কেবল তাঁরই কাছে

একবার জনৈক উমাইয়া খলিফা কিছু উপহার দেওয়ার জন্যে একজন বড় আলিমকে তলব করলেন। খলিফা মসজিদে বসে ছিলেন। আলিম তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। খলিফা বললেন, 'আপনার প্রয়োজন ব্যক্ত করুন।' আলিম উত্তর দিলেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে আমি চাই না। তাঁরই ঘরে বসে তিনি ছাড়া অন্য কারো কাছে চাইতে আমি লজ্জাবোধ করি।'
তারপর মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরে খলিফা আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'এবার আপনার প্রয়োজন পেশ করুন।' আলিম আরো শক্ত জবাব দিয়ে বললেন, 'যিনি মালিক তাঁর কাছেই তো চাইলাম না; তাহলে যে মালিক নয় তার কাছে কী করে চাইব?'
খলিফা খুবই পীড়াপীড়ি করলেন। উপায় না দেখে আলিম বললেন, 'আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই।' খলিফা বললেন, 'সে ক্ষমতা আমার নেই। আলিম উত্তর দিলেন, তাহলে আপনার কাছে আমার কোনো প্রয়োজনও নেই।'[১]

এটা একজন মুমিনের আত্মমর্যাদাবোধের দাবি। অভাবী নিজ প্রয়োজন কারো কাছে ব্যক্ত করা থেকে বিরত থাকলে সেটাই উত্তম।
এক মনীষী বলেছেন, 'যেমনিভাবে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তেমনি আল্লাহ ছাড়া কোনো রিযিকদাতাও নেই। তিনি যখন দান করেন, অকাতরে দান করেন। এত বেশি দেন যে, বান্দা অবাক না হয়ে পারে না।'
আপনি দেখবেন কত মেধাবী, বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান লোক আছে, তাদের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা খুবই সামান্য। আবার কত বোকা, অবিবেচক লোককেও দেখবেন, তাদের প্রাচুর্যের কোনো অভাব নেই। এর থেকে বোঝা যায় যে, মেধা-বুদ্ধি, ব্যবস্থাপনা ও দৌড়ঝাঁপের সাথে রিযিকের মৌলিক কোনো সম্পর্ক নেই। অবশ্য আল্লাহর পথে অটল-অবিচল থাকা, তাঁর আনুগত্য করা-এগুলো আল্লাহর রহমত বর্ষণ করে। কিন্তু রিযিকের মূল হিসাব আল্লাহর ব্যবস্থাপনার সাথে। তাই দেখা যায়, অনেক নেককার মুমিন কষ্টে জীবনযাপন করলেও কাফির মুশরিকদের প্রাচুর্যের অভাব হয় না। এর দ্বারা তিনি মুমিনদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, তাদের পরীক্ষা নেন।
মহামহিম আল্লাহ বলেন-

وَأَن لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاءٌ غَدَقًا )

তারা যদি সত্যপথে প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাহলে আমি তাদেরকে অবিরল ধারায় পানি বর্ষণের দ্বারা সমৃদ্ধ করতাম [১]

وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ )

যদি সেইসব জনপদের লোকজন ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল; সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি [২]

পাপের শাস্তিস্বরূপ কখনো কখনো মানুষের রিযিক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ধরা যাক, আপনার দুটি ছেলে। একজন খুবই ভদ্র। টাকা-পয়সা কখনো অপচয় করে না। বড়দের সম্মান করে চলে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। ঠিকমতো পড়াশোনা করে। আরেক ছেলে ভীষণ অভদ্র। পড়াশোনা তো করেই না, বরং নানারকম অনৈতিক কাজকর্ম এবং নিষিদ্ধ স্থানে যাওয়া-আসা করা তার বহুদিনের অভ্যাস। এখন দুই ছেলেকে টাকা-পয়সা কিংবা হাতখরচ দেওয়ার সময় আপনি কি সমান-সমান দেবেন? কখনোই না। অভদ্র ছেলেটিকে আপনি শুধু গাড়িভাড়া দিয়েই ক্ষান্ত থাকবেন, যেটা না দিলেই নয়। কারণ তার হাতে অতিরিক্ত টাকা-পয়সা থাকা মানেই তা কোনো অনৈতিক ও নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে ব্যয় হওয়া। কিন্তু যে ছেলেটি ভদ্র তাকে আপনি প্রয়োজনের চেয়েও বেশি টাকা দিয়ে রাখবেন। হয়তো তাকে এক্ষেত্রে স্বাধীনতাও দিয়ে রাখবেন, 'বাবা! তোমার যখন যা প্রয়োজন পড়ে, এটা দিয়ে কিনে নিয়ো।' আপনি জানেন, সে আপনার পক্ষ থেকে স্বাধীনতা, টাকা-পয়সা পাওয়ার পরও কোনো অনৈতিক কাজে জড়াবে না। ঠিক একইভাবে আল্লাহ তাআলাও কখনো কখনো পাপিষ্ঠ ও অন্যায় ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত ব্যক্তির রিযিক সংকুচিত করে দেন, যেন সে তার অন্যায়-অপরাধে একেবারে বেপরোয়া হয়ে না পড়ে। কারণ আল্লাহ যদি তার প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের রশি টেনে না ধরেন, তাহলে সে অবাধ্যতা ও উগ্রতায় সীমা ছাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ খুব চমৎকারভাবে সত্য প্রকাশ করে বলেছেন-

۞ وَلَوْ بَسَطَ اللَّهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهِ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ وَلَكِن يُنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَّا يَشَاءُ إِنَّهُ بِعِبَادِهِ خَبِيرٌ بَصِيرٌ ۞

আল্লাহ তাঁর সকল বান্দাকে প্রাচুর্য দিলে, নিশ্চয় তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছামতোই নাযিল করে থাকেন। তিনি বান্দাদের ব্যাপারে সম্যক অবগত [১]

আপনার কোনো এক দ্বীনি ভাই, যার সাথে আপনার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। ভালোবাসার আতিশয্যে আপনি তাকে বলে ফেললেন, 'কোনো প্রয়োজনে শুধু আমাকে জানাবে; যা দরকার হয় আমার কাছ থেকেই নেবে; অন্য কাউকে বলবে না।' আপনার প্রিয় ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব অন্য কারো সামনে অবনত হোক তা আপনি পছন্দ করেন না। তাহলে ভেবে দেখুন, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে সীমাহীন ভালোবাসেন, সেখানে তিনি কীভাবে তাঁর বান্দার অন্য কারো কাছে নত হওয়া পছন্দ করবেন? তিনি আমাদের অনেক বেশি ভালোবাসেন বলেই অন্য কারো কাছে প্রয়োজন ব্যক্ত করতে নিষেধ করেছেন।
কিছুদিন আগে সদ্য-পাশ-করা একজন ডাক্তার আমাকে একটি কাহিনি শোনালো। সে তখন ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ করে একটি চেম্বার খুলেছে মাত্র। কিন্তু পরিচিতি বেশি না থাকায় রোগী তেমন একটা আসত না। একবার তার মায়ের চিকিৎসার জন্য মোটা অঙ্কের টাকার প্রয়োজন দেখা দিলো। মা তখন দামেশকে চিকিৎসাধীন। অথচ তার চেম্বার অন্য একটি শহরে। মায়ের চিকিৎসার জন্য যত টাকার প্রয়োজন সেই পরিমাণটা উল্লেখ করে সে আল্লাহর কাছে আকুলভাবে দুআ করল। ঠিক তার পরদিনই তার চেম্বারে রোগীদের ভিড় লেগে গেল। আর সেদিনই সম্পূর্ণ টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল!
আপনার কাছে কারো পাওনা রয়েছে, কিন্তু আপনার পরিশোধের মতো সামর্থ্য নেই; আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! আমার কাছে নেই; তুমিই পরিশোধ করে দাও।' এভাবে আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নেওয়ার অভ্যাস করুন।

আপনার স্ত্রী কঠোর সুভাবের। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! তাকে নরম ও কোমল স্বভাবের বানিয়ে দাও।' আপনার সহকর্মী বা ব্যাবসায়িক পার্টনার কুটিল ও বদমেজাজি। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! তার মনকে সোজা করে দাও; কোমল বানিয়ে দাও।' আপনার সন্তান একরোখা, রগচটা; কারো কথায়ই কর্ণপাত করে না। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, 'হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে সুমতি দান করো। তার চরিত্র মার্জিত করে দাও।'
আপনি যখন আপনার প্রয়োজন সরাসরি আল্লাহর কাছে চাইবেন, অন্য কারো কাছে ব্যক্ত করবেন না, তখন আল্লাহ তাআলা সরাসরি আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করে দেবেন। আর যখন অন্য কারো কাছে চাইবেন, তখন কারো মাধ্যমে আল্লাহ আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন। আপনি যার কাছে চাইবেন হয়তো আল্লাহ তাআলা তার মনকে আপনার জন্য নরম করে দেবেন। সে দয়াপরবশ হয়ে আপনার চাওয়া পূরণ করবে।
হাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ নামে এক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মানুষের বিপদাপদে পাশে দাঁড়াতেন। সাধ্যমতো দান-সাদাকা ও উপকার করার চেষ্টা করতেন। তার পাশের বাড়িতে থাকতেন এক বিধবা নারী। সাথে কয়েকটা এতিম সন্তান। একরাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। মহিলাটি তখন আল্লাহর কাছে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! হে পরম করুণাময়! আপনি আমাদের অভাব-অনটন দূর করে দিন। আমাদের আর্থিক সচ্ছলতা দান করুন।' পাশের বাড়ি থেকে হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ শুনতে পেলেন বিধবার এই উচ্চৈঃস্বরের দুআ। দুঃখে ভরে উঠল তার মন। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর তিনি দশটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে সেই প্রতিবেশীর ঘরে কড়া নাড়লেন। স্বর্ণমুদ্রার থলেটি মহিলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'এটা রেখে দিন। আপনার প্রয়োজনের সময় কাজে লাগবে।'
থলেটি সে গ্রহণ করলেও তার পাশে বসে থাকা ছোট কন্যা রীতিমতো চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করল। আল্লাহ ও বান্দার মাঝের গোপন বিষয় বাইরের মানুষ জেনে যাওয়াতে এই সাহায্য এসেছে-এটা তার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল।[১] বান্দার করুণার পাত্র হওয়ার চেয়ে আল্লাহর কাছে করুণা ভিক্ষা করাই যে মুমিনের কাছে সবচেয়ে প্রিয়!

যারা প্রকৃত মুমিন তারা তাদের সকল ব্যথা-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট আল্লাহর কাছেই পেশ করে। দেখুন আল্লাহর নবি ইয়াকুব আলাইহিস সালামের আকুতি-

إِنَّمَا أَشْكُو بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ )

আমি তো আমার দুঃখ ও বেদনা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি। আর আমি আল্লাহর নিকট থেকে যা জানি তোমরা তা জানো না [১]

আল্লাহর কাছে চাওয়ার পর যদি তাৎক্ষণিক আপনার চাওয়া পূরণ না হয়, এতে হতাশ হবেন না। অনেক সময় আল্লাহ না দিয়ে পরীক্ষা করেন। বান্দার অন্তরে আল্লাহর জন্য কতটুকু জায়গা রয়েছে তা তিনি যাচাই করে দেখেন। দুনিয়াবি কত কাজে মানুষ একটু সুখের জন্য কত অসহনীয় কষ্ট সহ্য করে। তাহলে আখিরাতের বিশাল প্রাপ্তির সামনে ক্ষণিকের না পাওয়া কি সহনীয় হতে পারে না?
একবার একটি ব্যাংকের সামনে জনতার ভিড় দেখলাম; পাঁচশোর মতো লোক দীর্ঘ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচণ্ড গরম, সময় দুপুর আড়াইটা। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'ভাই, কী হয়েছে এখানে?'
উত্তর এলো, 'সন্ধ্যা ছটায় গাড়ি রিজার্ভেশনের রেজিস্ট্রি হবে।'
সন্ধ্যা ছটায় রেজিস্ট্রি। আর এই তীব্র গরমের মধ্যে তারা দাঁড়িয়ে আছে দুপুর আড়াইটা থেকে! দুনিয়ার জন্য মানুষ কত কষ্টই না করে!
আরেক ভদ্রলোক আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়েছেন। আমি যতদূর জানি, তিনি যথেষ্ট গণ্যমান্য ও গুরুত্বসম্পন্ন এক ব্যক্তি। সবসময় হারাম বস্তু থেকে নিজের দৃষ্টি হিফাজত করে চলেন। একবার কোনো একটা সেমিনারে যোগ দেওয়ার জন্য ইউরোপ গমন করেন তিনি। সাইপ্রাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লার্নাকায় সুইডিশ বিমান থেকে হঠাৎ অনেকগুলো মেয়েকে একসাথে নামতে দেখলেন। তাদের পরনে ছোট ইউনিফর্ম। তিনি তার দৃষ্টির হিফাজত করতে পারলেন না সেদিন। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। এরপর একটি ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছে গেলেন গন্তব্যে। ভাড়া পরিশোধের সময় ভিনদেশি মুদ্রা দিতে গেলে ড্রাইভার তাকে থানায় নিয়ে গেল। থানায় ঢুকে ড্রাইভারটি পুলিশ অফিসারের সাথে কী যেন বলল। অমনি দুজন পুলিশ কর্মকর্তা এসে ভদ্রলোকটিকে গ্রেফতার করে ফেলল। আটকে রাখল একটি ছোট্ট খাঁচার মতো কক্ষে।
এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্যে তিনি তার দৃষ্টির খিয়ানতকেই দায়ী মনে করলেন। নিজেকে ধিক্কার দিলেন, এই বিপদ তার পাপের শাস্তি ছাড়া আর কিছুই নয়!
একবার রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, দামি পোশাক পরিহিত কেতাদুরস্ত এক লোক কী যেন ট্রাফিক জটিলতায় পুলিশের সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করছে। একটু পরে আরেকজন পুলিশ অফিসার এলো। এসেই লোকটার দুই গালে সজোরে দুটি চড় বসিয়ে দিলো। আমি একেবারে থ হয়ে গেলাম।
আল্লাহ কতভাবেই না মানুষকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন! কাউকে এমনিতেই মাফ করে দেন। আবার কাউকে জনসম্মুখে লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।
অনেক মানুষ আছে, তারা আল্লাহর কাছে কেবল মূল্যবান বস্তুই প্রার্থনা করে- 'হে আল্লাহ! আমাকে জান্নাত দান করুন।' 'হে আল্লাহ! আমার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার পূর্বে আপনি আমাকে মৃত্যু দেবেন না।' 'হে আল্লাহ! আমাকে কুরআন বোঝার তাওফিক দিন' ইত্যাদি। এর বিপরীতে কিছু মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহর কাছে খুব সামান্য ও তুচ্ছ বস্তুও প্রার্থনা করে- 'হে আল্লাহ! এ মাসে ভাড়াটিয়া ঘর ছেড়ে দেবে। আপনি আমাকে নতুন ভাড়াটিয়ার ব্যবস্থা করে দিন।' প্রত্যেকেই প্রত্যেকের প্রয়োজন ও অন্তরের ঝোঁক অনুযায়ী একেক জিনিস আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে থাকে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেকে তার নিজ নিজ প্রয়োজন যেন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। লবণ ফুরিয়ে গেলে বা জুতার ফিতা ছিড়ে গেলেও যেন সে আল্লাহর কাছ থেকে তা চেয়ে নেয়।' [১]

যিনি আত্মার রিযিকদাতা

আল্লাহ তাআলা আমাদের দৈহিক প্রয়োজন মিটিয়ে দেন তা আমরা সবাই উপলব্ধি করি। খাদ্য, পানি এবং অন্যান্য বস্তু-সামগ্রী দিয়ে আল্লাহ তাআলা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজন মিটিয়ে দিচ্ছেন। ঠিক তেমনিভাবে প্রতিনিয়তই আমাদের রুহ ও আত্মার খোরাক দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখছেন। আমাদের কোনো অসংগতির কারণে তিনি যেমন কখনো কখনো রিযিক বন্ধ করে দেন, তেমনিভাবে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে কখনো কখনো আত্মার রিযিকও সংকুচিত করে দেন। যাদের অন্তর ও অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে তারা তা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু যারা আত্মভোলা, উদাসীন তারা এসবের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না।
আপনি সালাত পড়ছেন কিন্তু তাতে খুশু-খুযু, বিনয় ও নিবিষ্টতা আসছে না, তাহলে বুঝে নিন, আল্লাহ আপনার রুহ ও আত্মার খোরাক সংকুচিত করে দিয়েছেন। এক ভাই এসে বললেন, হিসাব-নিকাশে যত ধরনের ভুল-ভ্রান্তি হয়, সালাতে দাঁড়ালে সবকিছুর কথা মনে পড়ে। এর অর্থ হলো, হৃদয় এবং আল্লাহর মাঝে এক পর্দার আড়াল তৈরি হয়েছে। তাই তার মন আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট না হয়ে দুনিয়াবি চিন্তায় মজে থাকে।
আল্লাহ কেন আপনার রিযিক সংকুচিত করছেন, তার দুটি কারণ হতে পারে-
এক. আপনি কারো হক নষ্ট করেছেন; কিন্তু তাকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেননি।
আল্লাহ বলেন, 'যখন আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন, তার রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক তো আমাকে হীন করেছেন। না, কখনো নয়; বরং তোমরা ইয়াতিমকে সম্মান করো না এবং অভাবীদের খাদ্যদানে পরস্পরকে উৎসাহিত করো না। তোমরা উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য সম্পদ সম্পূর্ণরূপে ভক্ষণ করে ফেলো। তোমরা ধন-সম্পদ অতিশয় ভালোবাসো।[১]
অন্যকে বঞ্চিত করায় আপনার এবং আপনার রবের মাঝে বাধা তৈরি হয়েছে। প্রত্যেক পাপেরই কুফল রয়েছে। প্রত্যেক পাপই আল্লাহর সাথে সম্পর্কের পথে একেকটি বাধা।

দুই. মাঝে মাঝে এমন হয় যে, আপনি আল্লাহর পথেই বহাল আছেন। আল্লাহর হুকুমের অধীনেই আপনার জীবন পরিচালনা করছেন। তবুও আল্লাহ আপনার রিযিক সংকুচিত করছেন। এর কারণ, আল্লাহ আপনার পিপাসাকে তীব্র করে তুলছেন। আপনি একটি আমল করার কারণে আল্লাহর কাছে একটি স্তরে উপনীত হচ্ছেন। কিছুদিন পর এই আমলটি আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তখন আপনার স্তর যা ছিল তার চেয়ে আর উন্নত হচ্ছে না। আল্লাহ তাআলা চান আপনার স্তর আরো উন্নত হোক। তখন তিনি আপনার আত্মার রিযিক তথা প্রশান্তি, দীপ্তি এবং উপলব্ধির স্বাদ সংকুচিত করে দিচ্ছেন। এতে অস্থির হয়ে নতুন উদ্যমে, পূর্বের চেয়ে আরো বেশি আমলে মনোনিবেশ করছেন, আরো বেশি নিবিষ্টতার সাথে ইবাদত করতে শুরু করছেন। এতে আপনার যে মর্যাদা ছিল, আল্লাহ তাআলা তা আরো অনেক উন্নত করে দিচ্ছেন।
জীবনে বিভিন্ন কারণেই মানুষ খুশি হয়। আপনি যাচাই করে দেখুন-কার জন্য খুশি হচ্ছেন, আল্লাহর জন্য না দুনিয়ার জন্য?
খুশিতে আপনার চেহারা ঝলমল করছে, জ্বলজ্বল করে উঠেছে চোখের তারা। সহাস্য বদনে খুব উৎফুল্ল হয়ে নিজের খুশি প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। আগে চিন্তা করে দেখুন, কেন আপনি এত উৎফুল্ল। যদি এমন হয়, আল্লাহর সাথে আপনার বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, আপনি ইবাদতে খুব তৃপ্তি পেয়েছেন, জান্নাতের কোনো নিয়ামত আপনাকে পুলকিত করে তুলেছে-আর এসব কারণেই আপনি প্রচণ্ড খুশি হয়েছেন, তাহলে এটা নিশ্চয় আপনার ঈমানের নিদর্শন। যে খুশি আল্লাহর জন্য নিবেদিত তা নিশ্চয় ঈমানের আলামত।
আর যদি এমন হয়, আপনি ব্যবসায় মোটা অঙ্কের লাভ করেছেন বা নতুন কোনো উপার্জনের সন্ধান পেয়েছেন, তাই আপনি এত খুশি; তাহলে জেনে রাখুন, আপনার এই খুশি অন্য কিছুর বার্তা দিয়ে যায়। যে খুশি আল্লাহর জন্য নয়, তা কখনো সৌভাগ্যের লক্ষণ হতে পারে না।
দুনিয়া বা দুনিয়ার মানুষ যদি আপনার খুশির কারণ হয়, তাহলে আপনি দুনিয়াদার। আর আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ যদি আপনাকে খুশি করে, তাহলে আপনি ঈমানদার। ইমাম হাসান আল-বাসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'যখন তুমি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করো, আল্লাহর যিকির করো কিংবা নবিজির ওপর দরুদ পাঠ করো, কিন্তু কোনো স্বাদ বা তৃপ্তি অনুভব করতে পারো না; তাহলে জেনে রেখো, তোমার অন্তর পর্দা দ্বারা আবৃত। আল্লাহ আর তোমার মাঝে রয়েছে গাঢ় আচ্ছাদন।'
মহান আল্লাহ বলেন-

كَلَّا إِنَّهُمْ عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ (3)

কখনো না। সেদিন তারা তাদের পালনকর্তা থেকে পর্দার অন্তরালে থাকবে [১]

উল্লিখিত অন্তরাল তো আখিরাতের পর্দা। কিন্তু দুনিয়াতেও পর্দা রয়েছে। অন্তরের পর্দা; যা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরিতে বাধা প্রদান করে। আপনি যদি কখনো অন্তরে পর্দা অনুভব করেন, আপনার অন্তর আল্লাহর ব্যাপারে পাষাণ হয়ে যায়, তাহলে সাথে সাথেই সতর্ক হয়ে যান। খুঁজে বের করুন, কেন আপনার অন্তর আল্লাহর ব্যাপারে পাষাণ হয়ে গেল।
হয়তো আপনি আল্লাহর ব্যাপারে কোনো মন্দ ধারণা পোষণ করেন, তাঁর রাসুলের ব্যাপারে কোনো অবান্তর চিন্তা নিয়ে পড়ে আছেন। হয়তো আপনার অজান্তেই কোনো অনৈতিক বিশ্বাস জেঁকে বসেছে আপনার হৃদয়সত্তায়। কারণটা আবিষ্কার করে সাথে সাথেই তা দূর করার চেষ্টা করুন।
অন্তরের পর্দা কখনো পুরু হতে পারে, আবার কখনো পাতলাও হতে পারে। আপনার হৃদয়ের পর্দা যদি হয় মোটা, তবে নিঃসন্দেহে আপনার জটিলতা অনেক বেশি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, সূর্য উদিত হয়ে গেছে। আপনার ফজর সালাত কাযা হয়ে গেছে। তারপরও আপনার মনে কোনো অনুশোচনা জাগল না, তাহলে বুঝবেন, অবস্থা খুবই গুরুতর।
আর যদি অনুশোচনার তাপে আপনার মন পুড়ে যেতে চায়, আল্লাহর সামনে লজ্জায় আপনি সংকুচিত হয়ে যান এবং ব্যথায় আপনার হৃদয় কেঁদে ওঠে, তাহলে আপনি আপনার অন্তরের প্রহরায় থাকুন, যেন তা দুর্ভাগ্যের করাল গ্রাসে পরিণত না হয়।

দাউদ আত-তায়ি রাহিমাহুল্লাহ একজন মুত্তাকি ছিলেন। একবার এক লোক তার সাথে সাক্ষাতে আসে। তিনি তখন বেশ প্রসন্ন। লোকটি জিজ্ঞেস করে, যখনই আপনার কাছে আসি, আপনাকে সবসময় বিমর্ষ, চিন্তিত দেখি। কিন্তু আজ আপনি বেশ প্রফুল্ল!
দাউদ আত-তায়ি উত্তর দিলেন, গত রাতে আল্লাহ আমার তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। তাই আজকের দিনটি আমি ঈদের দিনের মতো খুশিতে যাপন করছি। লোকটি বলল, তাহলে আপনার ইফতার করার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি?
দাউদ আত-তায়ি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আমি এ খাবার চাই না। যে খাবার মানুষের হাতে হাতে আসে সে খাবার এবং যে খাবার হৃদয়ের তৃষ্ণা মিটায়-এ দুয়ের মাঝে অনেক ব্যবধান।
অর্থাৎ খাবারও দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটা বস্তুগত খাবার, যা ভক্ষণ করা যায়। আরেকটা হলো আত্মিক খাবার, যা হৃদয়ে দীপ্তির ঝলক বিচ্ছুরিত করে।

আল্লাহর স্মরণে সীমাহীন সুখ

মানুষ যদি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুতে সুখ ও সাফল্য খোঁজে, তবে তা কঠিন বিপদ ডেকে আনে। আল্লাহ সত্য, তিনি সত্য সংবাদই প্রদান করেন। আল্লাহই ঘোষণা দিচ্ছেন-

وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا

যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে, অবশ্যই তার জীবনযাপন হবে সংকুচিত এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো ছিলাম চক্ষুষ্মান [১]

তখন আল্লাহ উত্তরে বলেন-

قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنسَى )

এভাবেই আমার নিদর্শনাবলি তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। তাই আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হলো।
অতএব, সবসময় আল্লাহকে স্মরণ রাখুন। সুখ খুঁজে নিন তাঁর আনুগত্যে। সৌভাগ্য অর্জন করুন তাঁরই নৈকট্যে।

আর-রাযযাকের পরশে

তিনি আপনার জন্য যা ভালোবেসেছেন, তা-ই আপনাকে দান করেছেন। অতএব, তার বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকুন। যে বাবা-মায়ের ঔরসে তিনি আপনার অস্তিত্ব দান করেছেন, সন্তুষ্ট থাকুন তাদের নিয়ে। আপনার জন্য যেমন বাবা-মা প্রয়োজন ছিল, ঠিক তেমনই তিনি আপনাকে দিয়েছেন।
আপনার বন্ধুর বাবা সন্তানকে খুব আদর করে, তার মনটা খুব কোমল, সে অনেক উন্নত চরিত্রের অধিকারী; আর আপনার বাবা কর্কশ, বদমেজাজি। বন্ধুর বাবা উচ্চশিক্ষিত, সম্পদশালী, বড় পদমর্যাদার অধিকারী; আর আপনার বাবা মূর্খ, হতদরিদ্র-এসব চিন্তা করে কখনো মন খারাপ করবেন না। কারণ, মহান আল্লাহ তাঁর শাশ্বত প্রজ্ঞা ও অসীম জ্ঞানের আলোকেই তাদেরকে আপনার জন্য নির্বাচন করেছেন। অতএব, তাদেরকে সৌভাগ্য মনে করুন। আল্লাহর জন্য হলেও তাদের ভালোবাসুন।
ঠিক একইভাবে আপনার দৈহিক গঠন, রূপ-সৌন্দর্য এবং শারীরিক আকৃতির ব্যাপারেও আল্লাহর পছন্দে খুশি থাকুন। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর অভিযোগ করে, সে সত্যিকার মুমিন হতে পারে না। পিতা, মাতা, দৈহিক আকার-আকৃতি, স্ত্রী-পরিজন, ঘর-বাড়ি, ধন-সম্পদ সবকিছুর ক্ষেত্রেই আল্লাহ আপনার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন। এতে আপনি যে আত্মিক প্রশান্তি পাবেন তা অন্য কোথাও কল্পনা করাও সম্ভব নয়। অমুসলিম, অবিশ্বাসী মানুষগুলো সারা জীবন অস্থিরতা ও জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্যেই দিন কাটায়। স্ত্রী মনমতো না হলে, হতাশ হয়ে পড়ে। কোনোকিছুতেই তার জীবনের দুঃখ আর ঘোচে না। কিন্তু মুমিন আল্লাহর পছন্দে খুশি হয়, তাই সে সহজে হতাশ হয় না। আপনার স্ত্রী যদি আপনার মনমতো না-ও হয়, তবুও বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ তাআলা তার মাঝেই আপনার কল্যাণ রেখেছেন। তাকে নিয়েই খুশি থাকুন সবসময়।
এক লোকের বদমেজাজি স্ত্রী ছিল। তার বন্ধুরা পরামর্শ দিলো, বউকে তালাক দিয়ে দাও। কিন্তু সে উত্তরে বলল, আমি তাকে তালাক দিয়ে অন্য কোনো মুসলিম ভাইকে ধোঁকা দিতে পারব না। অর্থাৎ সে আল্লাহর ফয়সালায় খুশি ছিল। তার কাছে স্ত্রীর যতটুকু সমস্যা ছিল, সেটাকে সে অন্য মুসলিম ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা ভালো মনে করেনি।
সার কথা, আপনি সদা সর্বদা আল্লাহর ফয়সালা ও বণ্টনে খুশি থাকুন। আল্লাহর সান্নিধ্যেই সৌভাগ্য অর্জন করুন। আর-রাযযাক আপনাকে যে রিযিক দিয়েছেন, তাতে তৃপ্ত হোন। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা আপনার হাতে যে সম্পদ দিয়েছেন, তাকে আমানত মনে করুন। তা আপনার মালিকানা নয়; আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কাছে রাখা আমানত। অতএব, তা খরচের পদ্ধতি ও খাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ীই খরচ করুন। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন-

وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا

যখন তারা ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং এ দুয়ের মাঝে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে।[১]

টিকাঃ
[১] সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৬০
[২] আল-মাজালিস, দাইনুরি : ১৩৫৩; বুগইয়াতুত তলিব, খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা : ৩৪২৯
[৩] সুরা ত-হা, আয়াত: ১৩২
[৪] সালাত আদায় হয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর নিকট তা কবুল হওয়া এক নয়। খুশু-খুযুবিহীন সালাত আদায় হয়ে গেলেও আল্লাহর নিকট তা কবুল হয় না—এই হিসেবে খুশু-খুযুকে সালাতের ফরয তথা অত্যাবশ্যক বলা হয়েছে।
[১] সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২
[২] সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪৩
[৩] সুরা কাসাস, আয়াত: ২৪
[১] সূরা রুম, আয়াত: ৪০
[২] সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩১
[১] সুরা যারিয়াত, আয়াত: ২২-২৩
[২] সুরা নাজম, আয়াত: ৩৯
[১] সুরা হিজর, আয়াত: ২১
[১] মুজালাসা ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮৪
[১] সুরা জিন, আয়াত: ১৬
[২] সুরা আরাফ, আয়াত: ৯৬
[১] সুরা শুরা, আয়াত: ২৭
[১] আলফু কিসসাহ: ৮৬৮
[১] সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৬
[১] জামি তিরমিজি: ৩৬০৪
[১] সুরা ফজর, আয়াত: ১৬-২০
[১] সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১৫
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ১২৪-১২৫
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ১২৬
[১] সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00