📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-হাদী তথা পথপ্রদর্শক

📄 আল-হাদী তথা পথপ্রদর্শক


আপনি অমুকের ছেলে অমুক বলেই তিনি আপনাকে পথ দেখাবেন না; বরং তিনি আপনাকে পথ দেখাতে চান বলেই আপনাকে পথ দেখাবেন।
‘তিনি যাকে চান তাকে সরলপথ দেখান।’

আল-হাদী তথা পথপ্রদর্শক

আপনি কি দিকভ্রান্ত? ভুল থেকে সঠিক আলাদা করা কি আপনার কাছে অসম্ভব লাগছে? আপনার কি একই সাথে দুটি চাকরি জুটেছে—যার কোনটা ভালো কোনটা মন্দ তা নির্ণয় করতে পারছেন না? আপনি কি দু'জন নারীর বৈশিষ্ট্যের মাঝে তুলনা করে কাকে বিবাহ করবেন সে সিদ্ধান্তে সংশয়গ্রস্ত? আপনি কি ধ্বংসের শেষ সীমায় পৌঁছে হিদায়াতের অপেক্ষা করছেন? তাহলে আল্লাহ্র নাম ‘আল-হাদী’ তথা পথপ্রদর্শকের সাথে নতুন এক অধ্যায় শুরু করা যাক।
আল্লাহ্র এই মহান নামের সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। আপনার মাঝে জেগে ওঠা বিভ্রান্তিকে থামিয়ে দিতে এ নামকেই বানিয়ে নিন আপনার পথপ্রদর্শক। এ নাম আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে সিরাতুল মুসতাকীমের দিকে।

উন্নতা

হিদায়াতের আভিধানিক অর্থ হলো ঝুঁকে পড়া। হিদায়াত হলো খারাপ থেকে ভালোর দিকে ঝুঁকে যাওয়া, ভুল পথ ছেড়ে সঠিক পথের যাত্রী হওয়া; অথবা যাযাবর জীবন-যাপন ছেড়ে জীবনের মূল-গতি ফিরিয়ে আনা।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনাকে পথ দেখান। আপনাকে পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি দিয়ে সঠিক পথের দিশা দেন। অন্ধকার গলি থেকে আলোর মূল সড়কের দিকে আপনাকে পরিচালিত করেন।
তিনি যেমন আপনাকে পথ দেখান, তেমনই আপনার প্রয়োজনীয় বস্তুকে দেখান আপনার পথ। যেসব জিনিস আপনার জীবনের জন্য অপরিহার্য—সেগুলো আপনার কাছে পৌঁছে দেন তিনি। আপনি যমীনের যে স্থানে বাস করেন, সেখানে তিনি পৌঁছে দেন পানি, খাদ্যের যোগান আর ফুসফুসের জন্য সরবরাহ করেন প্রয়োজনীয় বাতাস।
তিনি তাঁর সকল সৃষ্টিকে তাদের অবস্থা অনুযায়ী হিদায়াত দেন। অন্ধকে পথে চলার হিদায়াত দেন। বধিরকে কথা বোঝার ব্যবস্থা করে হিদায়াত দেন। অক্ষমকে নিজ গন্তব্যে পৌঁছতে সাহায্য করে হিদায়াত দেন। শিশুকে ক্ষতিকর বস্তু থেকে দূরে রাখার হিদায়াত দেন।
যেসব প্রাণী মুক, তাদের অন্তরে তিনি এমন বুঝ দিয়ে দেন, তারা জীবনধারণের জন্য যা যা লাগে—তা জেনে যায়। যেগুলো তাদের জন্য উপকারী সেগুলো তারা নেয়, যেগুলো ক্ষতিকর সেগুলো বর্জন করে আর বিপদাপদের মোকাবেলা করে। এভাবে তিনি তাদের পথ দেখান।
আল্লাহ্ মরুভূমির উদ্ভ্রান্ত পথিককে পথ চিনিয়ে দেন। অনুসন্ধিৎসু পাঠককে দেখিয়ে দেন তথ্যের মূল উৎস। বিজ্ঞানীকে দেখিয়ে দেন আবিষ্কারের পদ্ধতি। মুজতাহিদকে দেখিয়ে দেন মাস'আলার দলীল-প্রমাণ। দ্বীনের দা'ঈকে দেখিয়ে দেন সর্বোত্তম পথা। আর বাবাকে দেখিয়ে দেন আপন সন্তানকে উপদেশ দেওয়ার সর্বোত্তম উপায়।

কাকতালীয় না!

তিনি আপনাকে এমনভাবে পথ দেখান—যেটা আপনার কাছে কাকতালীয় মনে হয়। সালাতের সামান্য একটি আয়াত শুনিয়েও তিনি আপনাকে পথ দেখান। নিদ্রায় একটি স্বপ্নের মাধ্যমেও তিনি আপনাকে পথ দেখান। আপনাকে পথ দেখান তিনি হৃদয়স্পর্শী উপদেশের মাধ্যমে। হয়তো-বা কোনো বইয়ের একটি লাইনে আপনার নযর পড়ে, তার মাধ্যমেই আপনাকে তিনি দেখিয়ে দেন পথ। সামান্য একটু ভাববেন, তাতেই আল্লাহ্ পথ দেখাবেন। একঝলক ভাবনা, যা চিন্তার গভীরে যাবার আগেই আপনাকে তিনি পথ দেখাবেন। আপনাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলবেন, তাতে আপনি সঠিক পথের দিকে ছুটে যাবেন—এভাবেই তিনি পথ দেখান। ভয় দেখিয়ে পথ দেখান। ভালোবাসা দিয়ে পথ দেখান। মৃত্যুর মাধ্যমেও পথ দেখান।
তবে কুর'আন শুনে পথ খুঁজে পাওয়া—এটাই মূল হিদায়াত। এর মাধ্যমেই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর বান্দাদের হিদায়াতের সবচেয়ে বেশি ব্যবস্থা করেছেন। এই কুর'আনেই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা রেখেছেন হিদায়াতের সকল মাধ্যম—
إِنَّ هَذَا الْقُرْءَانَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ
এ কুর'আন সে পথেররই হিদায়াত দেয়—যা সরল, সুদৃঢ়।[১]
'উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-র ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সবার জানা। তিনি তার বোনের ঘরে ঢুকলেন। তার দু'চোখ থেকে তখন ঘৃণার আগুন ঝরছিল; কিন্তু এক টুকরো কাগজে লেখা সূরা ত-হা পড়লেন। তার হৃদয় 'ঈমানের মেহরাবে সিজদা করল। সেই যে সিজদা করলেন, মৃত্যু পর্যন্ত তা আর তুললেন না।
তখন তার অনুভূতি কেমন হয়েছিল? তার অন্তরে কী পরিমাণ দৃঢ়তা এসেছিল? কুর'আনের এমন কত আয়াত আছে যা নিয়ে চিন্তা করা আমরা ছেড়ে দিয়েছি। কুর'আনের এমন কত নির্দেশনা আছে যা আমাদের তালাবদ্ধ হৃদয়ে প্রভাব ফেলছে না?

লা লা

হিদায়াতের আরেক নিদর্শন হলো-আপনি এমন স্বপ্ন দেখবেন, যাতে আপনার সুস্থতার উপায় বাতলে দেওয়া হবে, সতর্কবার্তা থাকবে অথবা ভালো নির্দেশনা থাকবে। যেমন: একজন রোগী একবার স্বপ্নে দেখলেন, তার সুস্থতা হচ্ছে 'লা লা' এ শব্দ দুটিতে। সে এক শাইখকে গিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করল। শাইখ এই স্বপ্নের কোনো সন্তোষজনক জবাব খুঁজে পেলেন না। তবে তিনি দুই দিনে একবার কুর'আন খতম করবেন বলে মনস্থির করলেন। তিনি ভাবলেন, কুর'আন পড়তে গিয়ে হয়তো স্বপ্নের ব্যাখ্যা পেয়ে যাবেন। দু'দিন পর রোগী শাইখের কাছে গেলে তিনি বললেন, 'আপনার সুস্থতা যাইতুন বৃক্ষে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সূরা নূরে বলেছেন-
يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ *
এটি এমন একটি বারকাতময় গাছ থেকে প্রজ্জ্বলিত হয় যা না (লা) পশ্চিমে না (লা) পূর্বে অবস্থিত [১]
এ পথপ্রাপ্তি একটি স্বপ্নের মাধ্যমে হয়েছে।
হিদায়াতের আরেকটা প্রকার হলো-যা স্বপ্নের মাধ্যমে ব্যাখ্যাসাপেক্ষ নির্দেশনা পাওয়ার সাথে মেলে। তা হলো এমন কিছু ভালো কাজ করা যা অসুস্থ ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে যায়।
একলোক এক 'আলিমের কাছে এসে এসাইটিস রোগে আক্রান্ত থাকার কথা জানাল। এই রোগ হলে মানুষের পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং রক্তচলাচল থেমে যায়। কখনো কখনো মানুষ মারাও যায়। তিনি তাকে একটা কূপ খনন করে ওয়াকফ করতে বললেন। লোকটা কূপ খনন করার পরই সুস্থ হয়ে গেল।
এই 'আলিম জানতেন, শরীরের মাঝে রক্তের প্রবাহ থেমে যাওয়া আর যমীনে পানি আটকে থাকার মাঝে একটা মিল আছে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই সৎকাজ (কূপ খনন) তার অসুস্থতার সাথে মেলে। আর এ কাজ করলেই সে সুস্থ হবে।
এক বন্ধু একটা ঘটনা জানাল। একবার সে গাড়িতে করে সালাতে যাচ্ছিল। বেখেয়ালে তার দুই বছর বয়সী ভাতিজীকে গাড়ি চাপা দিয়ে চলে গেল। তার বাবা তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে গেল। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে চলে গেল বাচ্চাটা। ডাক্তাররা জানাল, তার মৃত্যুর সম্ভাবনা আশি শতাংশ।
এ সময় আমার বন্ধুর এক চাচাতো ভাই তাকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করল। তাকে একটি বকরি যবেহ করে সুস্থতার নিয়্যাতে তার গোশত সাদাকাহ করতে বলল। চাচাতো ভাইয়ের কথামতোই সে সব কিছু করল। পরের দিন ভোরবেলাই আই.সি.ইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) থেকে সুস্থ অবস্থায় বেরিয়ে এলো বাচ্চাটি।
আল্লাহ্ সুবহানাহু তার চাচাতো ভাইকে সাদাকাহকৃত মাংস আর বাচ্চার থেঁতলে যাওয়া মাংসের মাঝে মিল খুঁজে পাওয়ার পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। তাই তো ডাক্তারদের চিন্তারও বাইরে থেকে সুস্থতা চলে এলো।
সদুপদেশের মাধ্যমে সুপথপ্রাপ্তি হতে পারে। এক গায়কের সুকণ্ঠ ছিল। তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক সৎকর্মশীল বান্দা। তিনি তাকে বললেন, 'আপনার কণ্ঠ তো বেশ সুন্দর। আপনি যদি কুর'আন সুর করে পড়তেন তাহলে কত ভালো হতো।' লোকটি তখনই তাওবা করল।
সদুপদেশের মাধ্যমে সুপথপ্রাপ্তির ক্ষেত্রটা সুবিশাল ও সুবিস্তৃত। এর উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না।
হিদায়াত আসতে পারে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো সায়্যিদুনা ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম। তিনি রাতের অন্ধকারে নক্ষত্র দেখে তাকেই প্রভু মনে করেছিলেন। এ ঘটনা সবারই জানা। সৃষ্টিজগত সম্পর্কে একটু গভীর ভাবনাই হয়েছে তার হিদায়াতপ্রাপ্তি ও দৃঢ়বিশ্বাস অর্জনের কারণ।

আলোর ঝলক

তিনি সুউচ্চ আসমান থেকে পথহারাদের দেখেন। বিভ্রান্তির উপত্যকায় তাদের বিচরণ পরিলক্ষিত হয়। এরই মাঝে তিনি একঝলক আলো জ্বালিয়ে দেন। এ আলোতে তারা পথ খুঁজে পায়। তারা দ্বীনের ওপর দৃঢ়তা ফিরে পায়।
আপনি অমুকের ছেলে অমুক বলেই যে তিনি আপনাকে হিদায়াত দেন এমন না; বরং তিনি আপনাকে হিদায়াত দিতে চান বলেই হিদায়াত দেন।
يَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
তিনি যাকে চান তাকে সরলপথের দিকে হিদায়াত দেন [১]
আপনি আপনার অন্তরটা বিশুদ্ধ করে এই দামী ইচ্ছে অর্জনে ছুটে চলুন।
তিনি আপনাকে হিদায়াত দেবেন। তারপর আপনি ওই হিদায়াতপ্রাপ্তির ফলে যে শুকরিয়া ও 'আমাল করা দরকার তা যথাযথভাবে না করলে আবার হিদায়াত ফিরিয়েও নেবেন। সেই লোকের মতো, যাকে আল্লাহ্ তাঁর এক নিদর্শন দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন; কিন্তু 'সে তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অতঃপর শাইতান তার পেছনে লাগে আর সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।'
তিনি হয়তো আপনাকে হিদায়াত দেবেন। আপনি এর শুকরিয়া করবেন, এ অনুসারে 'আমাল করবেন। ফলে তিনি আপনাকে আরও বেশি করে হিদায়াত দেবেন। আপনি তারও শুকরিয়া করবেন এবং সে অনুযায়ী 'আমালও করবেন। তিনি আপনাকে তৃতীয়, চতুর্থ-এভাবে আরও হিদায়াত দিয়েই যাবেন। আপনার জীবন হয়ে যাবে তাঁরই কিছু হিদায়াতবার্তার মেলবন্ধন।
এই যে গুহাবাসী যুবকেরা; আল্লাহ্ তাদেরকে মু'মিন বানিয়ে হিদায়াত দিলেন। তারপর তাদেরকে 'ঈমানের ওপর ধৈর্যধারণ করার মাধ্যমে আরেকবার হিদায়াত দিলেন। আবার বাঁচার পথ দেখিয়ে দিয়ে হিদায়াত দিলেন। অবশেষে তাদেরকে বাঁচার জন্য ব্যবস্থাও তৈরি করে দিয়ে হিদায়াত দিলেন; সে ব্যবস্থাটা ছিল বহু বছর গুহায় তাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখা। আল্লাহ্ সুবহানাহু তাদের ব্যাপারে বলেন-
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ نَبَأَهُم بِالْحَقِّ إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ ءَامَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَهُمْ هُدًى
নিশ্চয় তারা এমন কতিপয় যুবক-যারা তাদের রবের ওপর 'ঈমান এনেছিল আর আমরা তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।(১)

হারিয়ে যাওয়া কম্পাস

অন্ধকারাচ্ছন্ন মরুভূমির মাঝে আপনি। বুঝতে পারছেন না, কোথায় যাবেন। মরুভূমিতে পথ না জানার মানে হলো, নিশ্চিত মৃত্যু। কারণ, আপনার কোনো পাথেয় নেই, নেই কোনো বাহনও। হঠাৎ আপনার ভেতর জেগে উঠল এক প্রগাঢ় অনুভূতি। আপনার মন আপনাকে একদিকে অগ্রসর হতে বলল। আপনি তারকা দেখে পথ খুঁজে বের করতে পারেন না। আপনার কম্পাসটাও হারিয়ে গেছে। আপনার সহচররা আপনাকে ছাড়িয়ে গেছে। আপনার মন যেদিকে যেতে বলছে সেদিকে আপনি অগ্রসর হতে লাগলেন। মরুভূমি আপনাকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ খেলা করার পর আপনি দু'চোখ ভরে দেখতে পেলেন এক ঝলক আলো। সামনেই আপনার সহচররা। জীবনের শেষবিন্দুতে এসে আপনি দেখতে পেলেন তারা সাগ্রহে আপনার জন্য অপেক্ষারত।
বলুন তো, তখন আপনার অনুভূতি কেমন হবে? আপনার মনে হঠাৎ করে এ দিকটার কথা কীভাবে এলো? কেনই বা এলো? আর কী জন্যই বা এতটা নিখুত, এতটা সূক্ষ্ম হলো?
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সে সময় আপনার মনে উদিত হওয়া ভয়াল কম্পন দেখতে পাচ্ছিলেন। আপনার আত্মার আর্তনাদ তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। আপনার অন্তরে পিপাসায় মৃত্যুবরণের যে চিত্র ভেসে উঠেছিল—তা তাঁর জানা ছিল। তাই তো এক ঝলক আলো আপনার অন্তরে জ্বালিয়ে দিলেন; যার মাধ্যমে আপনি পথ খুঁজে পাবেন আর নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন।
আপনি এই অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি নিজের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করবেন না। কেননা, হয়তো আপনি এমনটার সম্মুখীন হননি। তবে এর কাছাকাছি বা এ রকম কিছুর সম্মুখীন অনেকেই সাধারণত হয়ে থাকে। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যে দুর্ভাবনায় পতিত আত্মায় আলোর এক ঝলকানির প্রয়োজন তাতে কে হিদায়াতের বাণী ছুঁড়ে দিল?
তিনি হলেন সেই মহান পথপ্রদর্শক আল্লাহ্।
যখন আপনাকে সৃষ্টিকর্তার রক্ষণাবেক্ষণ ঘিরে রাখে তখন আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন; কারণ, যে ঘটনাই ঘটুক তার জন্য আপনার নিরাপত্তা তো প্রস্তুত।
যখন সমুদ্রের ঢেউয়ের আন্দোলন আপনার নৌকা নিয়ে খেলায় মত্ত তখন তিনি বাতাসকে আদেশ দেন, যেন তা উত্তুরে হাওয়ায় পরিণত হয়। কারণ, আপনি যে দ্বীপে গেলে উদ্ধার পাবেন তা তো আপনার দক্ষিণে। আপনার নৌকার পাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত, যদি না পথপ্রদর্শক আল্লাহ্ ওই বায়ুপ্রবাহকে যথাযথভাবে সঞ্চালিত করতেন।
ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। একটি আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বিবিধ মতামত তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি এ নিয়ে দশটি তাফসীর পড়ছেন অথচ সঠিক ব্যাখ্যাটি বের করতে পারছেন না কোনোভাবেই। শেষে সিজদায় লুটিয়ে কপালটা ধূলো-মলিন করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'ওহে দাউদের শিক্ষক, আমাকে শেখান। ওহে সুলাইমানের বুঝদানকারী, আমাকে বোঝান।'
এরপর ঘরে ফিরে এলেন তিনি। এবার প্রভুর হিদায়াতের আলোয় তার বিবেক আলোকিত হয়ে সঠিক মতটা উদ্ভাসিত হয়ে ধরা দিলো তার কাছে।
একজন যুবকের নিকট যদি আল্লাহ্র থেকে কোনো সাহায্য না আসে তাহলে প্রথমেই তার পরিশ্রম অনর্থক হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে।

তিনিই সেই পথনির্দেশক

আল্লাহর এ পথনির্দেশ শুধু মানবজাতির সাথেই সম্পৃক্ত, তা নয়। আল্লাহ্ সকল সৃষ্টিকে পথ দেখান। মহান আল্লাহ্ বলেন-
قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ، ثُمَّ هَدَى *
মুসা বললেন, আমাদের রব তিনি, যিনি প্রতিটি বস্তুকে তাঁর সৃষ্টির আকৃতি দিয়েছেন। তারপর পথ নির্দেশ করেছেন [১]
শাইখ মুহাম্মাদ রাতেব আন-নাবুলসী এ হিদায়াতের সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে বলেন, স্যালমন ফিশ আটলান্টিক মহাসাগরের তীর থেকে আমেরিকার বিভিন্ন নদীর পতনস্থলে গিয়ে ডিম পেড়ে আবার সুস্থানে ফিরে আসে। কয়েকমাস পরে ছোট মাছগুলো ডিমফুটে সরাসরি মায়ের দিকে ছুটে আসে। শত শত কিলোমিটার দূরের পথ পাড়ি দিয়ে বাচ্চা মাছগুলো সাগরে তাদের মাকে ঠিকই খুঁজে বের করে। তবে তারা কিন্তু পথ হারায় না। কে সেই সত্তা, যিনি তাদেরকে পথ দেখান? তিনিই সেই সুমহান পথনির্দেশক আল্লাহ্।
একলোক দেখতে পেল, একটা বেজী মৃত সাপ খাচ্ছে। তারপর একটা উদ্ভিদের কাছে ছুটে গিয়ে সেখান থেকে পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে। বেজীটা সাপে এক কামড় দিচ্ছে তো উদ্ভিদের লতায় এক কামড় দিচ্ছে। লোকটা উদ্ভিদের লতায় কামড় দেওয়ার রহস্য জানতে আগ্রহী হলো। ফলে সে উদ্ভিদের লতাটা টেনে অন্যত্র ফেলে দিল। এবার বেজীটা যখন সাপে কামড় দিয়ে এসে উদ্ভিদের লতা খেতে এলো, দেখল সেখানে আর লতাটা নেই। এরপর লোকটা সবিস্ময়ে দেখল, কিছুক্ষণের মধ্যে বেজীটা বিষে লাফাতে লাফাতে মারা গেল।
কে সেই সত্তা, যিনি এই বেজীকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ উদ্ভিদের পাতায় সাঁপের বিষ-প্রতিরোধক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান? তিনি সেই মহীয়ান আল্লাহ্।'
নেকড়ে হরিণের ওপর আক্রমণ করে। হরিণ মাথাটা নিচু করে নেকড়ের গলায় শিং ঢুকিয়ে দেয়। কে তাকে জানাল যে, তার মাথায় এমন ধারালো ছুরি আছে? আর কেই বা তাকে জানাল, এ কাজ করলে সে রক্ষা পাবে? তিনি সেই পথনির্দেশক আল্লাহ্।
শৈশবে আমি নিজের বিড়ালকে দেখতাম, তার ছোট বাচ্চাগুলো— যেগুলো চোখেও দেখত না—তার দিকে ছুটে আসত। তার পেটে মাথাটা গুঁজে দিয়ে দুধপান করত। কে এই অবুঝ প্রাণীকে শেখালো যে, এ দুধ পান করেই তারা বাঁচবে আর তা না করলে মারা যাবে? তিনি সেই পথনির্দেশক সুমহান আল্লাহ্।

গহ্বর

তাঁর সবচেয়ে মহান পথনির্দেশনা হলো তাঁর বান্দাদেরকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনা। পথহারাদের পথ চিনিয়ে দেওয়া। পাপে জর্জরিত যাদের আত্মা, তাদের জন্য তাওবার দরজা খুলে দেওয়া।
একলোক গহীন অন্ধকার রাতে বের হলো। তার ইচ্ছে হলো, রাজাধিরাজ আল্লাহর অবাধ্যতা করবে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ছুটে চলেছে পাপের কাদায় নেমে পড়ার জন্য; কিন্তু চূড়ান্ত মুহূর্তে আল্লাহ্ তার অন্তরে হিদায়াত পৌঁছানোর আদেশ দিলেন। সে পাপের গহ্বরে পৌঁছানোর পূর্বেই হঠাৎ তার চোখের সামনে নির্মিত কালো রঙের স্বপ্নগুলো বিবর্ণ হতে থাকে। এক তীব্র স্রোত এসে তা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। চারদিকে সব উড়ে যেতে থাকে। সে তার অনুভূতির আঙিনায় ভিন্ন পদক্ষেপ অনুভব করতে পারে। তখন সে অন্য দিকে তাকায়। এটা সেই গহ্বরের দিক না। এ দিক থেকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মিনারের মাসজিদ। পথনির্দেশক আল্লাহর সাথে তার জীবনের নতুন এক ধাপের অবতারণা ঘটে।

এক টুকরো কাগজ

আল্লাহ্ যদি আপনাকে পথ দেখাতে চান, তাহলে রাস্তায় পড়ে থাকা এক টুকরো কাগজ দিয়েও সেটা করাতে পারেন।
একলোক মদ পান করে মাতাল অবস্থায় রাস্তায় হেলেদুলে হাঁটছিল। হঠাৎ মাদকতায় নুয়ে পড়া দু'চোখে দেখতে পেল, রাস্তায় পড়ে আছে এক টুকরো কাগজ। কাগজে আল্লাহ্র নাম লেখা। এটা দেখামাত্র তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ডুকরে উঠে বলল, 'আল্লাহর নাম রাস্তায় পড়ে আছে।' কাগজটা তুলে নিল সে। ঘরে গিয়ে সেটি পরিষ্কার করে তাতে সুগন্ধি মেখে রেখে দিল। সেদিন স্বপ্নে দেখল কেউ তাকে বলছে, 'তুমি আমার নামকে ওপরে স্থান দিয়েছ। আমার মর্যাদার কসম, আমি তোমার নামকে উচ্চকিত করব।' ঘুম থেকে উঠে সে অন্তরে হিদায়াতের পরশ অনুভব করতে পেল। এভাবেই আল্লাহ উদ্দেশ্যহীন একজন সাধারণ মানুষ থেকে ইতিহাসের খ্যাতনামা একজন সৎকর্মশীল বান্দায় পরিণত করেন তাকে।
তিনি আপনাকে পথ দেখাতে চাইলে এক আওয়াজ শোনাবেন- 'আল্লাহকে ভয় করো।' আপনার অন্তরাত্মা জেগে উঠবে ভ্রান্তির ঘুম থেকে।
নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণিত ঘটনায় যে তিনজনের জন্য গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তাদের একজনের ঘটনা। সে অনেক দিন ধরে নিজের চাচাতো বোনের সাথে অপকর্ম সাধনের সুযোগ খুঁজতে থাকে। একদিন সেই সুযোগটা এসেও যায়। অপকর্ম সাধনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে চাচাতো বোন তাকে বলে, 'আল্লাহকে ভয় করো। আমার সতিত্বের মোহর শুধু এর অধিকারীকেই খুলতে দাও।' আল্লাহ্র ভয়ে সেদিন সে এই পাপাচার থেকে ফিরে আসে। 'আল্লাহকে ভয় করো' এ বাণী তার অন্তরে বিদ্যমান কামনা-বাসনাকে বিলীন করে দিয়েছিল।

নাজাতের রশি

আপনি ভুলে যাওয়ার জগতে ডুবে থাকেন, তিনি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেন। আপনি পাপের ঘুমে বিভোর হয়ে পড়েন, তিনি আপনাকে জাগিয়ে দেন। আপনি গভীর পাপকূপে পড়ে অপবিত্র হয়ে যান আর তিনি আপনাকে পবিত্র করে তোলেন। যখন কূপের তলানিতে পড়ে থাকেন আপনি তখন তিনি আপনার দিকে হিদায়াতের রশি ঝুলিয়ে দেন।
তিনি আপনাকে হিদায়াত দেন এমন ভালোবাসা দিয়ে যে, আপনার হৃদয় ভরে যায়; এমন ভয় দিয়ে, যাতে আপনার ভেতরটা কেঁপে ওঠে; এমন অসুস্থতা দিয়ে, যাতে আপনার অহংকার মুছে যায়; এমন মুখাপেক্ষী করে, যাতে আপনি অবনত হয়ে নাক ধুলোমলিন করে নিতে পারেন, এমন দারিদ্র্য দিয়ে, যাতে আপনি নুয়ে পড়েন অথবা এমন এক শূন্যতা দিয়ে, যাতে আপনার অন্তর কষ্ট পায়।
তিনি আপনাকে ফিরিয়ে নেন তাঁর দিকে। আলোর পথে। ফলে আগে আপনি দূর থেকে তাকিয়ে শুধু মাসজিদ দেখতেন; কিন্তু মাসজিদের হিদায়াতের বাণী আপনাকে স্পর্শ করত না। অথচ এখন সে মাসজিদেই আপনি নিয়মিত যাওয়া শুরু করে দিলেন। বহু বছর পরিত্যাগ করার পর তিনি আবার কুর'আনের মুসহাফ ধরতে শিখিয়ে দেন আপনার হাতকে। যে জিহ্বা দিয়ে অশালীন গান গাইতেন গুনগুন করে, সে জিহ্বাকে তিনি সিক্ত করে তোলেন তাঁর যিক্রে।
এক মাসজিদে যাওয়ার জন্য বের হলেন ঘর থেকে। হঠাৎ রাস্তা পরিবর্তন করে অন্য মাসজিদে চলে গেলেন। সালাতের পর শুনতে পেলেন, একজন দা'ঈ এমন বক্তব্য শোনাচ্ছেন-যা আপনার হৃদয়ে পরিবর্তনের ঢেউ জাগিয়ে তুলল। আপনি আপনার চলার পথ পরিবর্তন করে ফেললেন, এমনকি জীবনচলার পথও।
যে বান্দা জীবন্ত আত্মা ধারণ করে। সে আল্লাহ্র হিদায়াতের ব্যাখ্যা করতে পারে। সে জানে যে, এ নিখিল বিশ্ব আল্লাহ্রই 'ইবাদাত করে। আর আল্লাহ্ তাকে এ বিশ্বের যে কোনো কিছু দিয়েই পথ দেখাতে পারেন। আর-আল্লাহ্ না করুন-এ বিশ্বের যে কোনো কিছু দিয়েই তাকে আবার পথভ্রষ্টও করতে পারেন।
তবে আল্লাহ্ কাউকে পথভ্রষ্ট করবেন না। শুধু তাকেই করবেন, যে তার অন্তরকে হিদায়াত ও সঠিক দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
সুতরাং জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে যদি আল্লাহ্র কাছ থেকে হিদায়াত না পান।
কিছুক্ষণ আগে মরুভূমিতে পথ হারানোর যে উদাহরণটা দিলাম, তা মনে আছে আপনার? আল্লাহ্র পথ, মাসজিদ, 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি, 'আল্লাহুম্মা আন্তাস সালামু ওয়া মিনকাস সালামু'-এগুলো হারিয়ে ফেলা মরুভূমিতে পথ হারানোর থেকেও বিপদের। এই পথগুলো হারালে আমরা ওই পাখির মতো হয়ে যাবো, যে পাখি শীতকালে নিজের চলার নির্দিষ্ট পথ হারিয়ে ফেলেছে; ফলে বরফের দেশে বরফই তার উড়ন্ত স্বপ্নগুলোকে গিলে ফেলেছে।
আল্লাহ্, আপনি আমাদেরকে এমন পথনির্দেশনা দিন, যাতে আমরা মরুভূমির পথভ্রান্তি থেকে বাঁচতে পারি, আপনার কাছে পৌঁছতে পারি এবং আসমান-যমীনে বিস্তৃত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি।

টিকাঃ
[১] বানী ইসরা'ঈল, ১৭ : ০৯
[১] সূরা নূর, ২৪: ৩৫
[১] সূরা নূর, ২৪ : ৪৬
(১) সূরা কাহফ, ১৮ : ১৩
[১] সূরা ত-হা, ২০ : ৫০

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-গাফূর তথা মহা-ক্ষমাশীল

📄 আল-গাফূর তথা মহা-ক্ষমাশীল


মহা-ক্ষমাশীল সত্তা সবসময়ই ক্ষমা করে থাকেন। তিনি বদান্যতার মাধ্যমে ক্ষমা করেন। সাধারণ মানুষ যা ক্ষমা করে না-তা তিনি ক্ষমা করেন। আপনাকে অবাক করে দিয়েও তিনি ক্ষমা করেন।

আল-গাফুর তথা মহা-ক্ষমাশীল

আপনি গুনাহ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। অনুভব করছেন, গুনাহর অভিশাপ আপনার জীবনকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। অন্ধকার এক পর্দা আপনার দু'চোখে প্রজ্বলিত দিনরাত্রির আনন্দকে নিভিয়ে দিচ্ছে। আপনি অনুভব করছেন, সালাতে, দু'আয় এবং 'ইবাদাতে আপনি আর আগের মতো স্বাদ পান না। তাহলে জেনে রাখুন, এখনই সময় ক্ষমা আর নিভৃতালাপের। আল্লাহ্র মহান নাম 'আল-গাফুর' তথা মহা-ক্ষমাশীলের মাঝে ক্ষমার অর্থ খুঁজে পাওয়ার।
এখন আপনার প্রয়োজন ক্ষমার অর্থ জানা। আপনি জানবেন, আপনার রব কেমন ক্ষমাশীল, কেমন মার্জনাকারী। আর আপনার জন্য আবশ্যক হলো জীবনের প্রতিটি ধাপে এ ক্ষমার প্রয়োজনীয়তা বুঝে নেওয়া।

কারাগার

শরীর রোগাক্রান্ত হওয়ার চেয়ে আত্মা পাপাচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়াটাই বড় বিপদের। পাপের পদতলে আপনার আত্মা আর্তনাদ করছে। হ্যাঁ, আপনার শরীর পাপাচারের সময় হয়তো স্বাদ পায়; কিন্তু আপনার আত্মা তখন আল্লাহ্র কাছে পানাহ চায়।
একবার কল্পনা করুন, আপনি এক সংকীর্ণ কারাগারে আটক রয়েছেন, যেখানে প্রতিটা দেয়ালের প্রস্থ মাত্র এক মিটার। এ রকম একটা জায়গায় আপনি কী পরিমাণ শ্বাসরুদ্ধ অনুভব করবেন?
আপনি যখন গুনাহ করেন তখন আপনার আত্মাও এ রকম একটা কারাগারের মতো কারাগারে আবদ্ধ হয়ে পড়ে যেটা চারদিক থেকে ঘিরে রাখে আপনার আত্মাকে।
وَأَحَاطَتْ بِهِ، خَطِيئَتُهُ .
আর পাপসমূহ তাকে বেষ্টন করে।[১]
গুনাহগুলো তার আত্মাকে শ্বাসরোধ করে ফেলে। যদি জান্নাত বা জাহান্নাম কোনোটা নাও থাকত তবুও গুনাহই গনগনে আগুন আর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সমান হতো।
যেহেতু আমরা জানলাম, আল্লাহর মহান নামের মধ্যে রয়েছে মহা-ক্ষমাশীল, অতি-মার্জনাকারী, পাপমোচনকারী-এর মতো মহান নাম, তাঁর বৈশিষ্ট্যবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি গুনাহ মাফ করেন, অপরাধ ক্ষমা করেন, তাহলে আল্লাহর এ মহান নামের যিকিরের মাধ্যমে ধরে নিন, আপনার গুনাহগার আত্মার সংকীর্ণ কারাগারের দেয়ালেও ফাটল ধরা শুরু হলো।

আপনি কি জানেন?

আল্লাহ্র ওয়াস্তে বলছি, বলুন, 'আস্তাগফিরুল্লাহ্'।
শুধু বললে হবে না। অনুভব করুন, 'আস্তাগফিরুল্লাহ্'।
এর থেকে সুন্দর কোনো বাক্য কি থাকতে পারে, যা উচ্চারণ করা মাত্রই আপনার অন্তর থেকে সবধরনের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও ভয়ভীতি দূর হয়ে যাবে?
আপনি কি জানেন, যত বিপদই হোক, সেটা রোগ, দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা বা ব্যথা- সবই আপনার পাপের কারণেই এসেছে?
এই আয়াতটি পড়ুন-
وَ مَا أَصَبَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَ يَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ ﴿
আর তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তোমাদের হাত যা অর্জন করেছে তার কারণে এবং অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন [১]
গীবত, মিথ্যা, ধোঁকা, হিংসা, দুব্যবহার, মা-বাবার অবাধ্যতা, হারাম জিনিস দেখা, ফরয পালনে দেরী করা-এ সব আমাদের জীবনে বড় ধরনের দুঃখ-ব্যথা ও দুশ্চিন্তা নিয়ে এসেছে।
আমরা কারও কাছে ঋণ নেওয়ার জন্য শরীরের ঘাম ছোটাই। অর্থের প্রতি আমাদের এ মুখাপেক্ষিতা সৃষ্টির কারণ হয়তো আমাদেরই কোনো পাপ। আমরা যদি বিনয়ের সাথে 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' বলতাম তাহলে আল্লাহর সৃষ্টির সামনে বিনয়ী হয়ে চাওয়ার প্রয়োজন হতো না আমাদের।
আমরা মানসিক সংকীর্ণতা ও নানামুখি অস্বস্তিতে ভুগি। ভয় আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। তাই মনোরোগ-বিশেষজ্ঞের কাছে দৌড়াই। হয়তো আমাদের এ অবস্থার কারণ আমাদেরই সংঘটিত কোনো পাপকাজ। আমরা যদি সজীব অন্তর ও আল্লাহমুখী হৃদয় থেকে বলতাম- 'আস্তাগফিরুল্লাহ্', তাহলে আমাদের এত কিছুর প্রয়োজন হতো না।

আর আমার বিশ্বাসঘাতকতা?

আল্লাহ্ ক্ষমার নিদর্শন আমার সামনে এতটা স্পষ্ট, এতটা প্রকাশ্য হয়নি, যতটা হয়েছে সীরাতুন নাবীর পাতা উল্টাতে গিয়ে।
'উমার ইবনুল খাত্তাব (ইসলামগ্রহণের পূর্বে) মানুষকে দ্বীন থেকে দূরে সরানোর চেষ্টায় রত। শক্ত হাতে চাবুক ধরে আছেন। চাবুকের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছেন দাসীর পিঠ। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে নিজেই চাবুকাঘাত বন্ধ করে বলছেন— 'বিরক্তি ধরে আসায় এবারের মতো থামলাম।'
মুসলিমরা বিশ্বাস করত যে, খাত্তাবের গাধা ইসলাম গ্রহণ করলে তা বিশ্বাস করা যেতে পারে, কিন্তু 'উমারের ব্যাপারটা ছিল অসম্ভব। কারণ, ইসলামের প্রতি 'উমারের প্রবল শত্রুতা ও ঘৃণার কারণে লোকেরা এমনটাই ভাবত; কিন্তু মহা-ক্ষমাশীল আল্লাহ্ তার জন্য তাওবার দুয়ার খুলে দিলেন। তিনি পরিণত হলেন 'উমার ফারুক'-এ।
যে চাবুকাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করতেন দাস-দাসীদের, তার কী হলো? কোথায় গেল সেসব অপরাধ? আল্লাহ্ সবকিছু ক্ষমা করে দিলেন।
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু 'আনহু (ইসলামগ্রহণের পূর্বে) উহুদের যুদ্ধে মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনীর অবস্থানরত পাহাড়ে উঠলেন। তিনি পেছন থেকে অতর্কিত আক্রমণ করলে আব্দুল্লাহ্ ইবনু জুবাইর রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-সহ সেখানে থাকা তীরন্দাজ সাহাবীদের সবাই শহীদ হলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে পরিচালিত মুসলিম সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় পরাজয়ের মূল কারণ ছিলেন তিনিই। তার কারণেই নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ রক্তাক্ত হওয়ার কারণ তো খালিদ ইবনু ওয়ালিদই। যে রক্তপাতের দরুন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন—
اشتد غضب الله على قوم دموا وجه رسوله
ওই সম্প্রদায়ের ওপর আল্লাহর ক্রোধ আরও তীব্র হয়েছে যারা তাঁর রাসূলের মুখ রক্তাক্ত করেছে। [১]
কিন্তু আল্লাহ্ এ আয়াত নাযিল করলেন-
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ *
তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন বা শাস্তি দেবেন-এ বিষয়ে আপনার করণীয় কিছুই নেই; কারণ, তারা তো যালিম। [২]
পরবর্তী সময়ে এই খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-ই তাওবাকারীদের একজন হয়ে গেলেন, যাদেরকে আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন, মার্জনা করেছেন।
তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। মহা-ক্ষমাশীল আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। অতীতের সব অপকর্ম তিনি মুছে দিলেন।
উহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ের মূল কারণ থেকে তিনি হয়ে গেলেন আল্লাহ্র খোলা তরবারী।
তাহলে যে সব পবিত্র দেহের রক্ত তিনি ঝরিয়েছেন, শিরস্ত্রাণের ধারালো অংশ দিয়ে আঘাত করেছিলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র রক্ত ঝরিয়েছেন-এর সবই আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিলেন।
একলোক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলো। কৃত সকল পাপের বেদনায় তার হৃদয় কেঁদে চলেছে। সে বলল, 'আপনি সে লোকের ব্যাপারে কী বলবেন, যে সব রকম পাপের কাজই করেছে। একটাও বাদ রাখেনি। এ পাপকাজগুলো করার জন্য যেদিকেই প্রয়োজন সেদিকেই সে অগ্রসর হয়েছে। এ অবস্থায় তার কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে?' রাহমাতের নাবী বললেন, 'তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ?' লোকটি বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল।' রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, তুমি সৎকাজ করবে আর খারাপ কাজ বর্জন করবে। আল্লাহ্ এর বিনিময়ে তোমার সব খারাপ কাজকে ভালো কাজে রূপান্তরিত করে দেবেন।' লোকটি বলল, 'আর আমার বিশ্বাসঘাতকতা? আর আমার পাপগুলো?' তিনি বললেন, 'তোমার বিশ্বাসঘাতকতা, তোমার পাপাচার। (এ সবই ভালো কাজে রূপান্তরিত হবে)'[১]

আপনি কি ভুলে গেছেন?

আপনার কেন মনে হচ্ছে, এ জগতে আপনার পাপই সবচেয়ে বড়? আপনি কি ভুলে গেছেন যে, আল্লাহ্ হলেন মহা-ক্ষমাশীল, অতি-স্নেহময়?
আপনি কি ভুলে গেছেন, আপনি তাওবা করলে তিনি খুশি হন?
সাহাবীরা দেখতে পেলেন, এক ভীত-সন্ত্রস্ত মহিলা বন্দীদের মাঝে নিজ সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সন্তানকে খুঁজে পেয়ে তাকে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল সে। তারপর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সন্তানকে চুম্বন করল। সাহাবীরা তার ভালোবাসা ও আনন্দ দেখে বিস্মিত হলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
الله أشد فرحا بتوبة عبده من هذه بولدها
এই মহিলা তার সন্তানকে খুঁজে পেয়ে যতটা খুশি, তার থেকে আল্লাহ্ আরও বেশি খুশি হন quando তাঁর বান্দা তাঁর কাছে ফিরে আসে, তাওবা করে।[২]
কীসের অপেক্ষা করছেন আপনি? এখনই বলুন, 'আস্তাগফিরুল্লাহ্।'
আপনার জিহ্বা দিয়ে বলুন। অন্তর দিয়ে বলুন। হৃদয় থেকে বলুন। যে গুনাহর ব্যাপারে আপনি মনে করেন যে, ক্ষমা অসম্ভব, সেই গুনাহর জন্যই বলুন, 'আস্তাগফিরুল্লাহ্।' আপনার ভেতরটা যেন চিৎকার করে 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' ডাকে। এ চিৎকারের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে, মহা-ক্ষমাশীল আল্লাহ্ অবশ্যই আপনাকে ক্ষমা করবেন। আপনি চিৎকার করছেন সে কারণে নয়, বরং তিনি যে মহা-ক্ষমাশীল, অতি স্নেহময়-সে কারণেই।
আবু সুফিয়ান ইবনু হারব, সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া, 'ইকরামা ইবনু আবী জাহল, 'আমর ইবনুল 'আসসহ আরও অনেকে। তাদের পাপ ছিল-আল্লাহ্র সাথে শির্ক, দ্বীনের বিরুদ্ধে লড়াই, সাহাবীদের হত্যা করা। তারপরও মহা-ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু আল্লাহ্ তাদেরকে নিজ ক্ষমা দিয়ে বেষ্টন করে তাদেরকে সাহাবী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনি কি জানেন, 'সাহাবী' মানে কী? 'সাহাবী' মানে হলো নাবীদের পর শ্রেষ্ঠ মানুষ।
আল্লাহ্র এ ক্ষমা 'ইকরামা সাফওয়ান বা অন্যদেরকে কীসে রূপান্তরিত করল, দেখুন তো! ক্ষমাশীল আল্লাহ্র দয়া তাদের একেকজনকে 'সাহাবীদের হত্যাকারী' থেকে 'সম্মানিত সাহাবী'তে পরিবর্তিত করে দিল।
পাপের অনুভূতি যদি আপনার হৃদয়কে কাঁদায়। আপনার চিন্তায় কালিমা লেপন করে। আপনার কথাবার্তার গতিময়তায় ছেদ আনে। তখন হৃদয়ে যদি উচ্চারিত হয় 'আস্তাগফিরুল্লাহ্', দেখবেন সব কান্নাকাটি, গুনাহর কালিমা, নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

সেই তো সফল...

আল্লাহ্ সুবহানাহু 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' দিয়ে ক্ষমা করেন। ক্ষমা করেন তাওবার মাধ্যমে-
إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ )
তবে তারা ব্যতীত যারা তাওবা করেছে এবং নিজেকে শুধরে নিয়েছে; নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[১]
ক্ষমা করেন সৎকাজের মাধ্যমে-
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ )
নিশ্চয় ভালোকাজ বিদূরিত করে খারাপ কাজকে [২]
ক্ষমা করে দেন বিপদগ্রস্ত করে-
ما يزال البلاء بالمؤمن فى نفسه وولده وماله حتى يلقى الله تعالى وما عليه خطيئة
মু'মিনের নিজের জীবন, সন্তান, সম্পত্তি-এ সবকিছুর ওপর বিপদ এমনভাবে আসতেই থাকে যে, সে আল্লাহ্র সাথে যখন সাক্ষাৎ করে তখন তার কোনো পাপই থাকে না।[৩]
আপনি কি জানেন, দুনিয়ার এ জীবনে আপনার কী করা উচিত? যে জিনিস বার বার করেও আপনার বিরক্ত হওয়া সাজে না তা হলো 'ইস্তিগফার' পড়া। নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
طوبى لمن وجد في كتبه استغفارا كثيرا
সেই তো সফল, যার হিসাবের খাতায় বেশি ইস্তিগফার পাওয়া যাবে [৪]
আপনার হিসাবের খাতায় এত এত 'আস্তাগফিরুল্লাহ' দেখে আপনি যারপরনাই খুশি হবেন। আপনি উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠবেন-
هاؤم اقرءوا كتابيه
'নাও, আমার 'আমালনামা পড়ে দেখো [৫]'
কিয়ামতের দিন আপনি যখন আপনার বন্ধুদেরকে দেখবেন, তাদের সামনে নিজের ইস্তিগফারভর্তি খাতাটা মেলে ধরে বলবেন, 'দেখ তোমরা, আল্লাহ্ আমার এত এত 'ইস্তিগফার' কবুল করে নিয়েছেন। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।'
এ জন্য পাপের পরেই শুধু 'ইস্তিগফার' করতে হয় এমন না; বরং সৎকাজের পরও ইস্তিগফার করতে হয়।
সালাত আদায় শেষ হলেই কি আপনি 'আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ্, আস্তাগফিরুল্লাহ্' বলেন না? আপনার 'ইবাদাতগুলোয় যে ঘাটতি আছে তা তো 'ইস্তিগফার' ছাড়া পূর্ণই হয় না।

হতাশ হবেন না...

তিনি নিজের নাম 'গাফুর' তথা মহা-ক্ষমাশীল দিয়েছেন এ জন্য যে, তাঁর ক্ষমা ব্যতীত আপনি গুনাহর আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবেন। অপরাধের চাপে আপনি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়বেন। সারাক্ষণ কান্নাকাটি করতে বাধ্য হবেন।
যদি আপনি মনে করেন যে, আপনার গুনাহ বিশাল, যে শাইখের কাছে আপনি আপনার গুনাহ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, তিনি কিন্তু আপনার অসংখ্য পাপের বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কে চিন্তাও করতে পারেননি; বরং আপনার প্রশ্ন শুনেই উত্তর দিয়ে ফেলেছেন, তাহলে আপনি আপনার রবের কথা শুনুন। আদম 'আলাইহিস সালামের সময়কাল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত বান্দা যত পাপকাজ করবে তা তিনি জানেন। তিনি সকল পাপকাজের বিস্তারিত বিবরণ, পদক্ষেপ ও ভয়াবহতা সম্পর্কে জানেন। তিনি বলছেন-
قُلْ يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ- আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ্ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (১)
এবার কি মন থেকে দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে? যিনি এ কথা বলেছেন তিনি জানেন যে, আপনি এই এই দিনে এই এই পাপ কাজ করবেন। তারপরও তিনি বলেছেন যে, তিনি সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। আপনার গুনাহ নিশ্চয় আল্লাহর ক্ষমা থেকে বড় নয়। নিশ্চয় আল্লাহ্র অনুগ্রহ থেকে বিশাল নয়।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আপনি পাপকাজ করে ফেললেই সাথে সাথে 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' বলে ফেলবেন। পাপকাজে লিপ্ত হয়েছেন-মনে পড়ামাত্রই আপনি থেমে যাবেন। আল্লাহ্ বলেন-
فَإِنِ انتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴾
যদি তারা বিরত থাকে তবে আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[১]
আপনি কীভাবে বলতে পারেন- 'আমার গুনাহ ক্ষমা করুন।' অথচ আপনি তখনো গুনাহর ওপর অটল? কীভাবে আপনি পাপ মোচন করে আবার নিজের হিসাবের খাতায় তা লিখবেন? পাপের এ পথযাত্রায় অন্তত এবার আপনি থেমে যান। যেন আপনার এই 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' সত্য হয়ে যায়। যেন এবারের এ 'আস্তাগফিরুল্লাহ্'র আহ্বানে আপনার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে যায়।

সর্বোত্তম ইচ্ছে

আল্লাহ্ সুবহানাহু আপনার জন্য অনেক কিছুই ইচ্ছে করেন..
তিনি আপনাকে অস্তিত্বদানের ইচ্ছে করলেন, তাই আপনার জন্ম হলো। আপনাকে সুস্থ রাখতে চাইলেন, তাই আপনি সুস্থ হয়ে গেলেন। আপনাকে বিবেকবান করতে চাইলেন বলেই আপনি এখন বুদ্ধিমান-পড়তে পারেন, শুনতে পারেন; কিন্তু আল্লাহ্ আপনার প্রতি সর্বোত্তম যে ইচ্ছেটি পোষণ করেন, তা কী জানেন?
তিনি আপনাকে ক্ষমা করে দিতে চান।
وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴾
আর আসমান এবং যমীনে যা কিছু আছে তা আল্লাহর জন্য। তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন আর যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন। আর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [১]
কত মহান সে ইচ্ছে, যে ইচ্ছের বদৌলতে তিনি তাঁর অনুগ্রহে বেষ্টন করে আপনাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করার জন্য প্রস্তুত করছেন।
যাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দেন, তারা অন্যদের মতো রোগাক্রান্ত হয় বটে; কিন্তু রোগের কারণে তাদের মুখের মুচকি হাসিগুলো মুছে যায় না।
যাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দেন তারা হয়তো আর্থিক সংকটে পতিত হয়; কিন্তু এই সংকটে তাদের মাথা কখনো নত হয় না।
যাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দেন তাদের দু'চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে; কিন্তু তারা আল্লাহ্র দান থেকে নিরাশ হয় না।
সুতরাং আপনার সব দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা-দুঃখ-ব্যথা ঝেড়ে ফেলুন।
যাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় তারা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমায়; কারণ, তাদের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ যা ঘটতে পারে-তা হলো মৃত্যু। আর মরলেই বা কী? গুনাহমুক্ত এ জীবনে তাদের কাছে মৃত্যু তো সামান্য ভয়ের ব্যাপার। আল্লাহ্র ওয়াস্তে বলছি পড়ুন। অনুভব করুন-
وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا ۞
আর যে ব্যক্তি কোনো খারাপ কাজ করে অথবা নিজের ওপর অবিচার করে তারপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সে আল্লাহকে পায় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু হিসেবে [২]
আপনি কি তাকে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু হিসেবে পেতে চান না? তাহলে এখনই তাঁর কাছে ক্ষমা চান।

সবচেয়ে সুন্দর কথা

সেই মহা-ক্ষমাশীল সত্তা জানেন, গুনাহ আপনার জীবনকে বিনষ্ট করে দেয়, আত্মাকে বিপর্যস্ত করে, পানিকে দুর্গন্ধযুক্ত ও অপেয় করে, খাবারকে বিস্বাদ, রাতকে ভৌতিক, দিনকে বিরক্তিকর, আত্মীয়দেরকে জাহান্নামতুল্য, বন্ধুদেরকে কাঁটাসম, জীবনের ব্যস্ততাকে ভ্রান্তিময়, ঘুমকে শ্বাসরোধ আর নিঃসঙ্গতাকে ক্রন্দনের মতো। তাই তো তিনি আপনাকে বলছেন-
أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ )
তারা কি আল্লাহ্র কাছে ফিরে যাবে না এবং ক্ষমা চাইবে না? [১]
এটাই কি তাদের অবস্থার জন্য সবচেয়ে সুন্দর কথা না? তারা কি একের পর এক বিপদে বিরক্ত হয়ে যায়নি? তারা কি অন্তরের গভীর থেকে উৎসারিত মুচকি হাসির জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েনি? তাহলে কেন তারা আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চায় না?

অবাক হবেন না

মহা-ক্ষমাশীল সত্তা সবসময়ই ক্ষমা করে থাকেন। তিনি বদান্যতার মাধ্যমে ক্ষমা করেন। সাধারণ মানুষ যা ক্ষমা করে না-তা তিনি ক্ষমা করেন। আপনাকে অবাক করে দিয়েও তিনি ক্ষমা করেন।
সব সময় তিনি ক্ষমা করেন-এক সালাত থেকে অন্য সালাত, এক জুমু'আ থেকে অন্য জুমু'আ, এক রামাদান থেকে আরেক রামাদান, এক হজ থেকে আরেক হজ-সব তিনি ক্ষমা করে দেন যদি সে বান্দা কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে। এই ধারাবাহিক 'ইবাদাতগুলোর মাধ্যমে বান্দার জীবন ক্ষমা আর ক্ষমা, মার্জনা আর মার্জনা, নিবৃত্তি আর নিবৃত্তির চাদরে ঢাকা।
চিন্তা করুন, আপনি ফজরের সালাত আদায় করলেন। তারপর কর্মক্ষেত্রে গেলেন। সেখানে কবীরা গুনাহ ব্যতীত ছোট ছোট অনেক গুনাহ করে ফেললেন। তারপর যুহরের সালাতের জন্য সুন্দরভাবে ওযূ করে পূর্ণ সালাত আদায় করলেন। সালাতের শেষে- ‘আসসালামু ‘আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলার সাথে সাথে সব গুনাহ মুছে গেছে আপনার। এভাবে আপনার গুনাহ এক সালাত থেকে আরেক সালাত পর্যন্ত মুছে যায়। আমাদের রব যদি মহা-ক্ষমাশীল না হতেন তাহলে আমাদের কী হতো?
তিনি বদান্যতার সাথে ক্ষমা করেন-
বছরের এক সাওমে তিনি সারা বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।
আপনি শুধু ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ একশত বার বলুন। আপনার গুনাহ যদি সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণও হয় তাহলেও আল্লাহ্ তা ক্ষমা করে দেবেন। এর চেয়ে বদান্যতা আর কী হতে পারে বলুন তো?
সাধারণ মানুষ যা ক্ষমা করে না তিনি তা ক্ষমা করেন-
এক পতিতার জীবন ছিল গুনাহ এবং পাপাচারে ভরপুর। সে একটা কুকুরকে পানি পান করিয়েছে বলে তার সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
তিনি অবাক করে দিয়ে ক্ষমা করেন-
এর উদাহরণ হলো বদরের যুদ্ধে যারা উপস্থিত হয়েছিল তাদেরকে তাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা যা ইচ্ছা কর, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি[১]’
বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক সাহাবী হারেসা ইবনু সুরাকা রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু। তিনি যোদ্ধা হিসেবে বের হননি, যোদ্ধাদের সহকারী হিসেবে বের হয়েছিলেন। তিনি দূর থেকে যুদ্ধক্ষেত্র প্রত্যক্ষ করছিলেন। হাওযে পানি পান করতে এলে এক লক্ষ্যহীন তীর তার কণ্ঠনালীতে এসে বিদ্ধ হয়। তিনি সেখানেই মারা যান। নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় ফিরে এলে হারেসার মা তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর নাবী, আমার হারেসা সম্পর্কে বলুন। সে যদি জান্নাতে যায় তাহলে আমি ধৈর্য ধরব। আর যদি না যায় তাহলে তার ব্যাপারে আমি খুব কান্নাকাটি করব।’ নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
হারেসার মা, জান্নাতে তো অনেকগুলো জান্নাত আছে। আপনার ছেলে সুউচ্চ ফিরদাউস অর্জন করেছে [১]
ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, 'এ থেকে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের মর্যাদার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের মূল জায়গায় বা সংঘর্ষস্থলে ছিলেন না; তিনি সুদূর থেকে প্রত্যক্ষ করছিলেন। হাওয থেকে পানি পানরত অবস্থায় লক্ষ্যহীন তীর তাকে আঘাত করেছে। তাও তিনি সুউচ্চ জান্নাতুল ফিরদাউস অর্জন করেছেন। তাহলে তাদের ব্যাপারে কী বলবেন, যারা বদরের যুদ্ধে শত্রুর সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত ছিলেন?'

শুরু করে দিন

'আল-গাফুর' তথা মহা-ক্ষমাশীলের সাথে জীবনের এক নব অধ্যায়ের সূচনা হোক। আপনি এ জন্য খুশি হবেন যে, তিনি গুনাহ মাফ করেন। সুতরাং তাঁর কাছে দ্রুত ক্ষমা চান। এ ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যম হবে তাঁর আদেশগুলো মানা আর নিষেধগুলো বর্জন করা।
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ﴿
বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে থাকো তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ্ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো মাফ করবেন [২]
আল্লাহ্, আপনি আমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দিন। ছোট-বড়, প্রথম-শেষসহ সব ধরনের গুনাহ। আর আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দিন—যাদের হিসাবের খাতায় অনেক বেশি 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' থাকবে।

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, ০২: ৮১
[১] সূরা শূরা, ৪২: ৩০
[১] মুসনাদ আহমদ, ২৬০৯-৪/৩৬৯
[২] সূরা আলে-ইমরান, ০৩: ১২৮
[১] তাবারানী তার মু'জামুল কাবীর গ্রন্থে (৭২৩৫-৭/৩১৪) উল্লেখ করেছেন।
[২] সহীহ মুসলিম, ২৭৪৪-৪/২১০৩
[১] সূরা আলে-ইমরান, ০৩: ৮৯
[২] সূরা হূদ, ১১: ১১৪
[৩] তিরমিযী, ২৩৯৯-৪/৬০২
[৪] ইবনু মাজাহ, ৩৮১৮-২/১২৫৪
[৫] সুরা হাককাহ ৬৯ : ১৯
(১) সূরা যুমার, ৩৯ : ৫৩
[১] সূরা বাকারা, ০২: ১৯২
[১] সূরা আলে-ইমরান, ০৩ : ১২৯
[২] সূরা নিসা, ০৪: ১১০
[১] সূরা মায়েদা, ০৫: ৭৪
[১] সহীহ বুখারী, ৩৬৯৪
[১] সহীহ বুখারী, ২৮০৯-৪/২০
[২] সূরা আলে-ইমরান, ০৩: ৩১

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-কারী ব তথা নিকটবর্তী

📄 আল-কারী ব তথা নিকটবর্তী


একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে এক বন্ধু আমাকে দেখতে এসেছিল। চলে যাওয়ার সময় বলল— 'এই চিরকুটে এমন একটি বাক্য লিখে দাও, যেটা পড়তে পড়তে আমি রুমে যাবো।' আমি তাকে লিখে দিলাম— 'তিনি এখন তোমাকে দেখছেন।' পরে সে আমাকে জানাল যে, ওই একটি বাক্যই তাকে আল্লাহ্ ভয়ে ভীত করেছে!

আল-কারীব তথা নিকটবর্তী

আপনি কি একাকিত্ব অনুভব করছেন? প্রিয় বন্ধু কি আপনাকে লাঞ্ছিত করেছে? আপনার এবং আপনার প্রিয় মানুষের মধ্যে একটা পর্দা পড়ে গেছে? যে কারণে সে আর আপনাকে আগের মতো বুঝতে পারছে না? আপনার আত্মা কি এমন প্রিয়জনকে খুঁজছে যার কাছে মনের সব দুঃখ-ব্যথা সবকিছু খুলে বলতে চায়?
কেমন হয় যদি এমন প্রিয়জনকে ডাকেন, এমন বন্ধুকে আহ্বান করেন আর এমন সত্তার দিকে ছুটে চলেন-যিনি নৈকট্য অর্জনে ইচ্ছুকদের কখনোই ফিরিয়ে দেন না?
আল্লাহ্ আপনার খুবই কাছে; তিনি আপনার ঘাড়ের রগ থেকেও নিকটে। তাঁর নৈকট্য পেলে আপনার জীবনটা সুখ-শান্তিতে ভরে উঠবে। তাঁর একটি মহান নাম আছে। এ নাম সৌন্দর্যমণ্ডিত এবং অলঙ্কৃত। 'আল-কারীব' তথা নিকটবর্তী। আসুন, আমরা এ নামের সাথে পরিচিত হই। যেন তাঁর নৈকট্য অনুভব করতে পারি। আর একাকিত্বের রজনীগুলোতে তাঁর সাথে গোপন আলাপনের স্বাদ গ্রহণ করতে পারি।

হে আল্লাহ্

আপনাকে তিনি জানাতে চান যে, তিনি আরশের ওপর আছেন, অনুরূপ করে জানাতে চান যে, তিনি আপনার ঘাড়ের রগ থেকেও আপনার নিকটে আছেন। তিনি আপনার কথা শোনেন। আপনার কাজ দেখেন। আপনার কোনো কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাসজিদে প্রবেশ করলেন। দেখলেন সাহাবীরা উচ্চৈঃস্বরে আল্লাহ্র যিক্র করছে। সাহাবীদের উদ্দেশ্য তিনি বললেন-
اربعوا على أنفسكم، فإنكم لا تدعون أصم ولا غائبا، إنكم تدعون سميعا قريبا
তোমরা নিজেদের প্রতি অনুগ্রহ করো। তোমরা তো কোনো বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছ না। তোমরা একজন সর্বশ্রোতা ও নিকটবর্তী সত্তাকে ডাকছ[১]
বান্দা দু'আ শেষ করার সাথে সাথে তার আহ্বানে আল্লাহ্ সাড়া দেওয়ার আলামত পেয়ে যায়; কারণ, আল্লাহ্ এত কাছে যে, মানুষ কল্পনাও করতে পারে না।

আপনারই জন্য

আমার এক বন্ধু একবার আমাকে একটি ঘটনা জানিয়েছিল। একবার সালাতের জন্য সে মাসজিদে প্রবেশ করেছে। ওযুর পানি তখনো তার কানে লেগে আছে। এমতাবস্থায় প্রথম কাতারে গিয়ে এসির সামনে দাঁড়ানোর ফলে এসির ঠান্ডা বাতাস তার কানে ঢুকে গেল। এক ঘণ্টা পর তার মনে হলো, কানে কিছুটা ব্যথা করছে। সে মনে মনে কেবল একবার বলল, 'আল্লাহ্, আপনার জন্যই সহ্য করেছিলাম।' তখন কোনো ভূমিকা বা পদক্ষেপ ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যেই তার ব্যথা মিলিয়ে গেল।
তিনি কতটা নিকটে হলে আপনি ঠোঁট না নাড়িয়ে আপনার মনে মনেই কথাটি তাকে বলতে পারলেন?
সিজদারত অবস্থায় আপনি সবচেয়ে কাছে থাকেন তাঁর। তখন আপনি 'সুবহানা রব্বিয়াল আ'লা' পড়েন, আসমানের দরজাগুলো আপনার এ বিড়বিড় আওয়াজের শব্দ শুনে খুলে যায়। তাহলে চিন্তা করুন, মহান ক্ষমতাধর আল্লাহ্ কীভাবে আপনার কথা শোনেন। আপনি মনে করবেন না যে, তিনি দূরে আছেন, অথবা তাঁর থেকে কোনো কিছু গোপন আছে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের আঁধারে বের হলেন। উবাই ইবনু কা'বের দরজায় কড়া নাড়লেন। উবাই ইবনু কা'ব বেরিয়ে এলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জানালেন, 'আমার রব আমাকে আদেশ দিয়েছেন তোমাকে 'ফাতিহা' পড়ে শোনাতে। 'উবাই হতভম্ব হয়ে বললেন, 'আমার নাম বলেছেন?' রাসূলুল্লাহ্ বললেন, 'হ্যাঁ।' এ কথা শোনামাত্রই তিনি কেঁদে ফেললেন।[১]

পিঁপড়ের পদচারণা

তিনি সকল সৃষ্টির কাছেই থাকেন; তাদের দেখেন; তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
সৃষ্টিজগতের নিকটে না থাকলে কীভাবে তাদের ওপর কর্তৃত্বশীল হতে পারেন তিনি? কীভাবে তিনি রব হতে পারেন যদি তিনি নিকটবর্তীই না হন?
তাঁর এ নৈকট্য জানার, শোনার, দেখার ও বেষ্টনের। তবে এ তাঁর সত্তাগত নৈকট্য নয়; কেননা, তাঁর সত্তা তো এ ধরনের নৈকট্য থেকে পবিত্র। তাঁর নৈকট্যের একটা বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি অবতরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, আল্লাহ রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশে আসমানের দুনিয়ায় অবতরণ করে বলতে থাকেন-
هَلْ مِنْ سَائِلٍ فَأُعْطِيَهُ، هَلْ مِنْ دَاعِ فَأُجِيْبَهُ، هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرُ لَهُ
এমন কেউ আছে, যে চাইবে? আমি তাকে দান করবো। এমন কেউ আছে, আহ্বান করবে? আমি তার আহ্বানে সাড়া দেবো। এমন কেউ আছে, যে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো।[১]
এছাড়াও তাঁর নৈকট্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি গভীর অন্ধকার রাতে শৈবালযুক্ত পাথরের ওপর কালো পিঁপড়ের পদচারণাও শুনতে পান। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا *
আর এমন কোনো পাতা পড়ে না-যার ব্যাপারে তিনি জানেন না।[২]
একবার কল্পনা করে দেখুন, পৃথিবীতে গাছের সংখ্যা কত, এই গাছগুলোতে পাতার সংখ্যা। কল্পনা করুন; শীতকালে এ সব পাতা ঝরে পড়ছে। আর এ সবই আল্লাহ্ জানেন। জানেন এগুলোর সংখ্যা, আকৃতি, ধরন ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ সব কিছুই।
এক নারী একবার নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাজির হয়ে স্বামীর ব্যাপারে বাদানুবাদ করল। 'আয়িশা রাযিয়াল্লাহু 'আনহা ঘরের এক প্রান্তে। তিনি মহিলার কিছু কথা শুনতে পেলেন আর কিছু শুনতে পেলেন না। বাদানুবাদ উত্থাপন শেষ হতে দেরী, জিবরা'ঈল 'আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ওয়াহী নিয়ে উপস্থিত-
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
আল্লাহ্ অবশ্যই শুনেছেন সে নারীর কথা, যে তার স্বামীর ব্যাপারে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর কাছেও ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ্ আপনাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা [১]
আহ্! কী বিস্ময়কর নৈকট্য তাঁর। কত মহান জ্ঞান। কি সর্বব্যাপী তাঁর শ্রবণ, তাঁর দর্শন...

তিনি আপনাকে দেখছেন

আপনার হাত প্রসারিত করুন। করেছেন? এটাও তিনি দেখেছেন। আপনাকে এটি বিশ্বাস করতেই হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে এক বন্ধু আমাকে দেখতে এসেছিল। চলে যাওয়ার সময় আমাকে বলল-'এই চিরকুটে এমন একটি বাক্য লিখে দাও যেটি পড়তে পড়তে আমি রুমে যাবো।' আমি তাকে লিখে দিলাম- 'তিনি এখন তোমাকে দেখছেন।' পরে সে আমাকে জানাল, ওই বাক্যই তাকে আল্লাহ্র ভয়ে ভীত করেছে।
তাঁর নৈকট্য আপনাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে। আপনাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবেই। তাঁর নৈকট্য আপনাকে প্রশান্তি দেয়। আপনাকে প্রশান্তি দেবেই। তাঁর নৈকট্য আপনাকে উন্নতা দেয়। আপনাকে উন্নতা দেওয়া যে আবশ্যক। তাঁর নৈকট্য আপনাকে সুউচ্চ সাহসী এক বীর করে তোলে।
তাঁর বাণী শুনুন। মূসা 'আলাইহিস সালাম যখন ফিরাউনের কাছে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন তখন তিনি তাকে এবং তার ভাই হারুন 'আলাইহিমাস সালামকে উদ্দেশ্য করে বললেন-
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى ۞
আমি তো তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমি সব শুনি ও দেখি।[২]
এটাই যথেষ্ট। তাঁর উপস্থিতিই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় রক্ষক।
তিনি তাদের সাথে আছেন বলেই তারা আর ফিরাউনকে ভয় করবেন না। তারা এখন থেকে সাহসী।
আকীদার বইগুলোতে আছে, আল্লাহ্র সাহচর্য দুই ধরনের। একটি শুধু তাঁর বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য। সেটি ভালোবাসা, সাহায্য এবং সমন্বয় সাধনের সাহচর্য। দ্বিতীয়টি ব্যাপক সাহচর্য। সেটি সকল কিছুর ক্ষেত্রেই তাঁর জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও বেষ্টন বিদ্যমান থাকার সাহচর্য।
মূসা 'আলাইহিস সালাম ও হারুন 'আলাইহিস সালামের প্রতি তাঁর এ বিশেষ সাহচর্য ছিল সাহায্য ও সমন্বয় সাধনের সাহচর্য। আল্লাহ্ তাদের সাহায্য ও সমন্বয় সাধনের ও'য়াদা দেওয়ার পর তারা আবার ভয় করবেন কী করে?
মূসা 'আলাইহিস সালাম ও হারুন 'আলাইহিস সালামের মতো যে-ই জেনে-বুঝে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ করতে নিষেধ করে-তার জন্য আল্লাহ্র সাহচর্য থাকবে। এটা অন্তরে তার 'ঈমান ও রবের আদেশের প্রতি তার আনুগত্য অনুসারে প্রযুক্ত হবে। দেখবেন, যে লোকই সত্যের আদেশ দিচ্ছে আর মিথ্যাকে প্রতিহত করছে তার মাঝে শক্তি, সাহস, ধৈর্য ও আল্লাহ্ তাওফীক এত বেশি যে, আপনি নিশ্চিত হয়ে বলে ফেলবেন-আল্লাহ্র বিশেষ সাহচর্য তাকে ঘিরে আছে, তাকে শক্তিশালী করে তুলছে।

মুচকি হাসুন...

এ ব্যাপারে সবচেয়ে মহান ও জীবনঘনিষ্ঠ আয়াত হলো আল্লাহ্র বাণী-
الَّذِي يَرَنَكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ *
তিনি আপনাকে দেখেন, যখন আপনি দাঁড়ান, এবং সিজদাকারীদের মাঝে আপনার উঠাবসা [১]
যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সালাত আদায় করার জন্য দণ্ডায়মান হন, তখন কী পরিমাণ নৈকট্য অনুভব করেন আপনি? আর আপনার রব আপনাকে জানান যে, এ কাজ করলে আল্লাহ আপনাকে বিশেষ চোখে দেখবেন। মূলত তিনি সকল সৃষ্টিকে দেখতে পান; সৃষ্টি দাঁড়িয়ে থাকুক বা অন্য অবস্থায় থাকুক। সুতরাং মূল ব্যাপার হলো, বান্দা সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ্ তাকে বিশেষভাবে দেখেন; এ দেখার মাঝে থাকে ভালোবাসা, গ্রহণ করে নেওয়া, আহ্বানে সাড়া দেওয়া ও ক্ষমা করে দেওয়ার অপূর্ব সমন্বয়।
বুখারীর হাদীসের মতো করে বলুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَا أَذِنَ لِشَيْءٍ مَا أَذِنَ لِنَبِيٍّ حَسَنِ الصَّوْتِ يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ يَجْهَرُ بِهِ
আল্লাহ্ তাঁর নাবীকে সুকণ্ঠে জোর আওয়াজে কুর'আন তিলাওয়াত করতে যেভাবে শোনেন সেভাবে আর কিছুই শোনেন না[১]
ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, 'এর অর্থ হলো, আল্লাহ্ সুবহানাহু কোনো কিছুই সেভাবে শোনেন না-যেভাবে তাঁর নাবীর তিলাওয়াত শোনেন। নাবী যখন উঁচু কণ্ঠে সুন্দর করে কুর'আন পড়েন, তখন নাবীদের সচ্চরিত্র ও পরিপূর্ণ আল্লাহভীতি থাকায় তাদের গলার আওয়াজে এক ধরনের মিষ্টতা থাকে। এটাই তিলাওয়াতের চূড়ান্ত পর্যায়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর সব বান্দার-ভালো/খারাপ- তিলাওয়াত শুনে থাকেন। যেমন: 'আয়িশা রাযিয়াল্লাহু 'আনহা বলেছেন, 'মহান সেই সত্তা-যার শ্রবণশক্তি সকল আওয়াজকে বেষ্টন করে আছে।' তবে মু'মিন বান্দাদের জন্য তাদের তিলাওয়াত শোনাটা আরও মহান ব্যাপার। আল্লাহ্ সুবহানাহু বলেন-
وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَمَا تَتْلُواْ مِنْهُ مِن قُرْءَانٍ وَلَا تَعْمَلُونَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا إِذْ تُفِيضُونَ فِيهِ
আর তোমরা যে অবস্থাতেই থাক না কেন এবং কুর'আন থেকে যা কিছু তিলাওয়াত করো না কেন এবং তোমরা যা-ই 'আমাল করো না কেন, আমি তোমাদের সাক্ষী থাকি যখন তোমরা তাতে নিমগ্ন হও। [২]
পরিশেষে নাবীদের তিলাওয়াত শোনাটা সবচেয়ে চূড়ান্ত পর্যায়।'
ভয়-ভীতি আপনাকে চড় দিলেও মুচকি হাসুন। আপনার রবের নৈকট্যের কথা চিন্তা করুন। আপনি যেসব বস্তুর ভয় পান-সেগুলো আপনার থেকে ততটা কাছে নয় যতটা কাছে তিনি আছেন।
আপনার চারদিকে বিপদ এলে আশাবাদী হোন। ভেবে দেখুন, তিনি আপনার ঘাড়ের রগ থেকেও কাছে। এ ভাবনা দিয়ে দূর করে দিন সব বিপদ।
বক্তারা বলেন, একলোক মরুভূমিতে সফর করছিল। তার পথরোধ করে দাঁড়াল তরবারী হাতে এক ডাকাত। তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে সে বলল, 'আমার মালামাল নিয়ে নাও।' ডাকাত বলল, 'না, আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই। তারপর তোমার মালামাল নেবো।' লোকটা তার কাছে দুই রাকআত সালাতের জন্য অনুমতি চাইল। অনুমতি পেয়ে সালাত আদায় করতে গিয়ে সে বলল-আমি পুরো কুর'আন ভুলে গিয়েছিলাম। শুধু মনে ছিল-
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ
কে বিপদগ্রস্তের আহ্বানে সাড়া দেয়, যখন সে ডাকে? আর তার বিপদ দূর করে দেয়? [১]
আয়াতটা বার বার পড়লাম। সালাত শেষ করে দেখি, এক অশ্বারোহী কোত্থেকে যেন এসে লোকটাকে তরবারী দিয়ে এমন আঘাত করেছে যে, তার মাথাটা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

আপনি কতই না পবিত্র ও মহান

তিনি অতি নিকটবর্তী। আপনি তাঁর স্মরণে ঠোঁট দুটো নাড়ুন, অমনি আপনার আওয়াজে আসমানের দরজাগুলো খুলে যাবে।
ইউনুস 'আলাইহিস সালাম তিমির পেট থেকে আল্লাহকে ডেকে বলেছিলেন-
لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ ۞
আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি কতই না পবিত্র ও মহান। নিশ্চয় আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি। [১]
এ ক্ষীণ স্বর অন্ধকারের তিন স্তর পেরিয়ে মহাশূন্য ভেদ করে চলে গেল। আসমানের ফেরেশতারা এ আহ্বান শুনে মহান রবকে বললেন, 'আওয়াজটা চেনা, তবে জায়গাটা অচেনা।'
আল্লাহ্ হাদীসে কুদসীতে বলেন-
من ذكرني في نفسه، ذكرته في نفسي، ومن ذكرني في ملأ، ذكرته في ملإ خير منهم
যে ব্যক্তি আমাকে মনে মনে স্মরণ করবে, আমি তাকে মনে মনে স্মরণ করব। আর যে আমাকে মাজলিশের মধ্যে স্মরণ করবে। আমি তাকে এর চেয়ে উত্তম মাজলিশের মধ্যে স্মরণ করব।
কারণ, তিনি যে সবচেয়ে নিকটে।
শুধু বলুন, 'ইয়া আল্লাহ্'। জবাবটা আপনাকে স্মরণ করেই আসবে।
এটা কতই না মহান ব্যাপার যে, আপনি রাজাধিরাজকে স্মরণ করার পরক্ষণেই তিনি আপনার নামটা উল্লেখ করে বললেন, 'আমার বান্দা অমুকের ছেলে অমুক আমাকে স্মরণ করেছে।'
এ মহান দৌলতের তুলনায় পুরো দুনিয়াটাই তুচ্ছ হয়ে যায়। কী সৌভাগ্য—আল্লাহ্ স্মরণ করলেন তাঁর বান্দাকে।
তাঁর এ নৈকট্য বাড়তে থাকে। তাওবা ও সৎকর্মের মাধ্যমে আপনি তাঁর কাছে যেতেই থাকেন। আল্লাহ হাদীসে কুদসীতে বলেন-
إذا تقرب منى شبراً تقربت إليه ذراعاً، وإذا تقرب منى ذراعاً تقربت إليه باعا
সে যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে তাহলে আমি তার এক হাত কাছে আসি। সে যদি আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে তাহলে আমি তার দিকে এক বাহু কাছে আসি।[১]
তাঁর নৈকট্য অর্জনে আপনার প্রতিটি প্রচেষ্টার ফলে তিনি আপনার নৈকট্যে আসেন তাঁর দয়া, অনুগ্রহ, নি'য়ামাত আর অবারিত দানের মাধ্যমে।

তাঁর কাছে পৌঁছে যাবেন...

তাঁর নৈকট্যের আরেকটি অর্থ হলো, তিনি আশেপাশের সবকিছুর মাঝেই এমন কিছু রেখে দেবেন-যা আপনাকে তার কথা স্মরণ করাবে।
আপনি বিভিন্ন সৃষ্টজীবের গঠনপ্রণালীর মাঝে তাঁর প্রজ্ঞা দেখতে পাবেন।
আসমানগুলো কোনো খুঁটি ছাড়াই উত্থিত করার মাঝে তাঁর কুদরত দেখতে পাবেন।
আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা ও মাটি ফুঁড়ে গাছ জন্মানোর মাঝে তাঁর অনুগ্রহ দেখতে পাবেন।
পাহাড়ের সুবিশাল উচ্চতার মাঝে তাঁর বড়ত্ব দেখতে পাবেন।
ঝড়-ঝাপটা, ভূমিকম্প আর অগ্ন্যুৎপাতে আপনি তাঁর শাস্তি দেখতে পাবেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ
অচিরেই আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাব, বিশ্বজগতের প্রান্তসমূহে এবং তাদের নিজদের মধ্যে; যাতে তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে-এটা (কুর'আন) সত্য।[২]
আপনি দু'চোখ ভরে কিছু দেখলেই সেটা আপনাকে সর্বদ্রষ্টা মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।
আপনি গভীর নিশীথে ফিসফিস আওয়াজ শুনলে সেটা আপনাকে সর্বশ্রোতা মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। গোপন কোনো জ্ঞান জানতে পারলে তা আপনাকে মহাজ্ঞানী আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। প্রতিটি বস্তুর মাঝে নিদর্শন আছে। যে নিদর্শন এটি প্রমাণ করে দেয় যে, তিনিই সেই একক সত্তা।
একবার একদল শিশুর সাথে বসে আল্লাহ্র সৃষ্টির ব্যাপারে আলোচনা করছিলাম। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, 'তোমরা যদি তাঁর সৃষ্টজগতের কথা চিন্তা করো, তাহলেই তাঁর কাছে পৌঁছে যাবে।' আমি কিছুটা বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলাম। আমি বুঝতে পারলাম যে, এই শিশু আমাদের থেকেও বেশি বুঝতে পেরেছে। সে আমার থেকে কী শুনবে, এর বদলে আমার উচিত তার থেকে শোনা।
তিনি এত কাছে যে, তাঁর কাছে যেতে আপনাকে শুধু ভাবতে হবে, শুধু তাঁর নৈকট্যকে অনুভব করতে হবে, শুধু অনুভব করতে হবে যে, তিনি আপনাকে দেখছেন। তারপর বলবেন- 'আল্লাহ্'।

যদি তারা আপনার কাছে জানতে চায়

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ )
তারা যদি আপনাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে তাহলে বলুন, 'আমি নিকটেই।'[১]
যে লোকই আপনাকে জিজ্ঞেস করবে আল্লাহ্ সম্পর্কে, তাকেই আপনি সর্বপ্রথম তাঁর 'নিকটবর্তী' গুণে গুণান্বিত বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দেবেন। সুদূরের এক রবের 'ইবাদাত করার জন্য মানুষের হৃদয়সমূহ প্রস্তুত হয় না; তারা প্রস্তুত না এমন রবের 'ইবাদাতের, যে তাদের ডাক শোনে না, আর তাদের প্রয়োজন দেখে না। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে পরিচিত হতে চায় তাকে আপনি প্রথম যে পরিচয়টা জানাবেন তা হলো, তিনি 'অতি-নিকটে'। এভাবেই আপনার রব আপনাকে শিখিয়েছেন তাঁর ব্যাপারে জানাতে।
এ নৈকট্য আপনাকে শেখাবে তাঁকে ভালোবাসতে, তাঁর কাছে একাকী চাইতে, তাঁকে ভয় করতে। আবার এর পাশাপাশি আপনাকে অভ্যস্ত করবে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে এবং ফিরে যেতে। তিনি নিকটবর্তী তাই আপনার কাছে ক্ষমা ও তাওবার তাওফীক পাওয়ারও যোগ্য তিনি। কারণ, আপনার নিকটে থাকায় তিনি আপনার প্রতিটা পাপকাজ, বিশ্বাসঘাতকতা প্রত্যক্ষ করছেন। আবার তিনি নিকটে বলেই আপনার এই ক্ষমা চাওয়া এবং তাওবা করা কার্যকরী হয়ে যাবে। আপনার ক্ষমাপ্রার্থনার আহ্বান ও তাওবার আকুতি তো শুধু তিনিই শুনে থাকবেন যিনি আপনার তাওবার ব্যাপারে অবগত আছেন। তিনি তো নিকটবর্তী, সাড়া দানকারী। আল্লাহর বাণীটা ভেবে দেখুন-
( فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ )
তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও তারপর তাঁর দিকেই ফিরে চলো।[১]
যে কথাগুলো আপনাকে নিকটবর্তী মহান স্রষ্টার ব্যাপারে লজ্জিত করবে সেটা হলো কোনো একজন মহান ব্যক্তির এই কথাগুলো- 'তাকে ভালোবাসাই কি আপনার উচিত না? আপনি যখন দরজা বন্ধ করে তাঁর অবাধ্যতা করতে যান তখন তিনি দরজার নিচ দিয়ে অক্সিজেন প্রবেশ করিয়ে দেন যেন আপনি মরে না যান।'
এ নৈকট্যের সাথে আছে আল্লাহ্ দিকে বান্দার নৈকট্যের প্রচেষ্টা। তিনি বলেন-
( أُوْلَبِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ )
তারা যাদেরকে ডাকে তারাই তো তাদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে নিকটতর হতে পারে।[২]
এ যে প্রতিযোগিতা আর ছুটে চলার ক্ষেত্র, এখানে বান্দার সর্বোচ্চ কামনা শুধু নিকটে যাওয়া না, অধিকতর নিকটবর্তী হওয়া।

এত ধোঁয়াশার মাঝে...

উম্মতের এ বিপদাপদ, এত যুদ্ধের ধোঁয়াশা যা মু'মিনের অন্তরে দুঃখ-কষ্টের স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়-ই মু'মিনের প্রয়োজন পড়ে 'নিকটবর্তী' নামের তিনটি স্তর জেনে রাখার।
প্রথমত, 'ঈমান ও দৃঢ়বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর নৈকট্যকে জানা। ফলে মানবাত্মা চিৎকার করে সাধারণ মানুষকে আহ্বানের কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পাবে। কারণ, মানুষের রব তো কাছেই আছেন। তিনি সবকিছু দেখছেন, প্রত্যক্ষ করে চলছেন। কুর'আনে একটা আয়াত সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে-
إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ
নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, নিকটবর্তী [১]
এ জন্যই এ নিকটবর্তীর দুয়ারে হৃদয়ের পোড়া ও ক্ষতযুক্ত স্থানগুলো রাখা হয়। এ জায়গায় অতীতের সব কিছু পেশ করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, এত সব কষ্টের মাঝে, চারদিকে বিরাজমান বিশৃঙ্খলার ফাঁকে, ঘরভাঙা, মানুষ মরা, ফল-ফসল বিনষ্ট হওয়ার মধ্যে মানুষ অনুগ্রহ খুঁজে বেড়ায়। এমন অনুগ্রহের ছোঁয়া-যাতে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক লাঞ্ছিত হওয়া বা বিশ্বাসঘাতকতার নিরবচ্ছিন্ন আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া থেকে মানুষ বাঁচতে পারে। তাই সে সত্য রবের বাণীর সামনে দাঁড়ায়-
إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ
নিশ্চয় আল্লাহর অনুগ্রহ মুহসিনদের নিকটেই।[২]
যে মুজাহিদ বীর তার জীবন মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ্ জন্যই বিলিয়ে দিয়েছে তার এবং তার প্রভুর মাঝে এক পাতলা পর্দা আছে। যে পর্দার ওপাশ থেকে উঁকি দিচ্ছে 'ইহসান'-এর সুবাতাস। বান্দাকে শুধু এ যমীনের ফেরেশতার মতো চেষ্টা করতে হবে, যেন সে আল্লাহকে দেখতে পায়। যদি আল্লাহকে সে দেখতে নাও পায় তবে আল্লাহ্ তা'আলা তো তাকে দেখেনই। তাই একটা বুলেট নিক্ষেপ করলেও তিনি জানেন, কেন সে তা নিক্ষেপ করল বা কখন তা করল। বান্দা এভাবে এক 'ইহসান' থেকে অন্য 'ইহসান'-এর দিকে যেতেই থাকবে। আর এর পরিবর্তে আল্লাহ্র অনুগ্রহও তার কাছে আসতে থাকবে। একসময় চারিদিক থেকে অনুগ্রহ তাকে বেষ্টন করে ফেলবে। মৃত্যুর ধোঁয়াশার ভিড় থেকে সে বেরিয়ে জায়গা করে নেবে সন্তুষ্টির মেঘের রাজত্বে।
তৃতীয়ত, দিনগুলো অতিবাহিত হতে থাকে। দুঃখ-কষ্ট নিরন্তর আসতে থাকে। বিপদাপদ আরও তীব্র হয়ে যায়। সবদিক থেকেই অবরোধ জোরালো হয়। এ সময় সেই প্রচেষ্টাশীল বান্দার সামনে তৃতীয় একটি আয়াত হাজির হয়-
۞ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ ۞
তোমরা শুনে নাও, আল্লাহর সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী।[১]
তিনি যেমন তাঁর বান্দার অতি নিকটবর্তী, তেমনি তাঁর রাহমাতও তাঁর মুহসিন বান্দাদের অতি নিকটবর্তী। অনুরূপ তাঁর বাহিনীর সাহায্যও খুবই কাছে থাকে বান্দার।
۞ وَإِنَّ جُندَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ ۞
আর নিশ্চয় আমার বাহিনীই বিজয়ী।[২]
এ আয়াতের মাধ্যমে অপেক্ষারত দুর্বল হৃদয় এবং ধৈর্যরত ক্লান্ত-শ্রান্ত মনের সাথে আল্লাহ্র সংযোগ স্থাপিত হয়। তারা দিন-রাত তাঁর এ নিকটবর্তী সাহায্যের প্রত্যাশায় থাকে।

আল্লাহ্...

আল্লাহ্... আপনার ভয়েই তো চোখের পানি ফেলেছি। আমার দু’চোখের অশ্রুতে আপনার প্রতি যে ভালোবাসার আকুতি তার প্রতি আপনি অনুগ্রহ করুন।
আল্লাহ্... আপনার জন্যই তো আমার হৃদয় জ্বলে উঠেছে। আমার হৃৎস্পন্দনে ভালোবাসার এ অগ্নিশিখার প্রতি আপনি অনুগ্রহ করুন।
আল্লাহ্... আমার কথাগুলো হঠাৎ করেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। সুতরাং উচ্চারিত শব্দের প্রতি খেয়াল না করে আমার বাক্যচয়নে ভালোবাসার যে অনুভূতি তার প্রতি আপনি অনুগ্রহ করুন।
আল্লাহ্র ‘নিকটবর্তী’ নামের অভ্যন্তরে এ ঝটিকা সফর শেষে তাঁর কাছে এ আকুতি রাখি, আমাদের যেন তিনি এমন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন—যারা তাঁর নৈকট্য অনুভব করতে পারে। তিনি যেন এ মহান নাম থেকে উৎসারিত বিনয়, আনুগত্য, ভয়-ভীতি ও তাকে পর্যবেক্ষণ করার গুণাবলি ধারণ করে কাজে পরিণত করার সুযোগ দান করেন। সাথে সাথে তাঁর থেকেই শুধু অনুগ্রহ ও সাহায্য চাওয়ার সুযোগ দান করেন।
আল্লাহ্, আপনি সেই সত্তা—যাকে ডাকা হলে, অথবা যার কাছে চাওয়া হলে পাওয়া যায়। আপনার অনুগ্রহ ও হিদায়াতের ছোঁয়ায় আপনার নৈকট্য আমাদের অর্জন করতে দিন। এ নৈকট্যে যেন আপনার সাথে একান্ত আলাপনে লিপ্ত হতে পারি, হৃদয় থেকে সব অপরিচ্ছন্নতা দূর করতে পারি আর এরই মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি।

টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ৪২০৫-৫/১৩৩; সহীহ মুসলিম, ২৭০৪-৪/২০৭৬
[১] সহীহ বুখারী, ৪৯৬০ - ৬/১৭৫; সহীহ মুসলিম, ৭৯৯ - ১/৫৫০
[১] সহীহ মুসলিম, ৭৫৮-১/৫২২
[২] সূরা আন'আম, ০৬: ৫৯
[১] সূরা মুজাদালাহ, ৫৮:০১
[২] সূরা ত-হা, ২০ : ৪৬
[১] সূরা শু'আরা, ২৬: ২১৮-২১৯
[১] সহীহ বুখারী, ৭৪৮২-৯/১৪১; সহীহ মুসলিম, ৭৯২-১/৫৪৫
[২] সূরা ইউনুস, ১০: ৬১
[১] সূরা নামল, ২৭: ৬২
[১] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৭
[১] সহীহ বুখারী, ৭৪০৫-৯/১২১; সহীহ মুসলিম, ২৬৭৫-৪/২০৬১
[২] সূরা হা-মীম সাজদাহ, ৪১ : ৫৩
[১] সূরা বাকারা, ০২ : ১৮৬
[১] সূরা হুদ, ১১ : ৬১
[২] সূরা বানী ইসরা'ঈল, ১৭ : ৫৭
[১] সূরা সাবা, ৩৪ : ৫০
[২] সূরা আ'রাফ, ০৭: ৫৬
[১] সূরা বাকারা, ০২ : ২১৪
[২] সূরা সাফ্ফাত, ৩৭ : ১৭৩

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-ফাত্তাহ : কল্যাণ ও অনুগ্রহের রুদ্ধ দ্বার উন্মোচনকারী

📄 আল-ফাত্তাহ : কল্যাণ ও অনুগ্রহের রুদ্ধ দ্বার উন্মোচনকারী


সম্ভাবনার সকল দুয়ার বন্ধ হয়ে যখন মৃত্যু এসে উঁকি দেয় দু-চোখের সামনে, জীবনের সব আশা-ভরসা তখন নিঃশেষ হয়ে যায়। একদল বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কয়েক ঘণ্টা পর মৃত্যুর ঘোষণা দিলে প্রিয় মুখগুলোয় নেমে আসে শোকের কালো ছায়া। ঠিক সেই মুহূর্তে খুলে যেতে পারে করুণার রুদ্ধ দ্বার। আবছা আলোয় ভরে যেতে পারে উঠোন-ঘর, আবার জেগে উঠতে পারে নতুন জীবনের প্রত্যয় নিয়ে। সবাই যেখানে ব্যর্থ, সকল দ্বার যেখানে রুদ্ধ, তখন আকস্মিকভাবে যিনি করুণার দুয়ার খুলে দেন, মৃত হৃদয়ে পুনরায় আশার আলো জাগিয়ে তোলেন, তিনিই আল-ফাত্তাহ।

☆☆☆

আমার এক বন্ধুর বাচ্চা জন্ম নেয় সিজারের মাধ্যমে। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সিজার। ভ্যাকিউয়াম এক্সট্র্যাক্টরের মাধ্যমে বাচ্চাটিকে টেনে বের করা হয়। কিন্তু বাচ্চার মাথায় যন্ত্রটি রাখার সময় মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগে। মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যতই দিন যায়, ততই বাচ্চাটির শরীরে কাঁপুনি বাড়তে থাকে। আমার বন্ধু প্রথমে যে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলো, তার মন্তব্য ছিল এমন— ‘বাচ্চাটির মস্তিষ্কের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। সে বড় হলে অন্ধ কিংবা প্রতিবন্ধী হবে।’ আমরা তাকে পরামর্শ দিলাম, তিনি তো নতুন ডাক্তার! তুমি বরং বড় কোনো শিশু-বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাও। দামেশকের সবচেয়ে বড় শিশু-বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হলো বাচ্চাটিকে। তিনিও আগের ডাক্তারের মতো একই কথা বললেন। এভাবে আরো চার-পাঁচজন ডাক্তারকে দেখানো হলো। সবার ঐ একই মন্তব্য। যেন সবাই মিলে জোট বেঁধেছেন, কারো কথায় কোনো কমবেশ নেই, একই কথা, একই উচ্চারণ। অবশেষে নিরুপায় হয়ে বাচ্চাটিকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। কিন্তু সেখানেও ডাক্তারদের মন্তব্যের কোনো পরিবর্তন নেই। কারণ আঘাতটা ছিল মস্তিষ্কে। আর মস্তিষ্কের আঘাত সাধারণত ভালো হয় না। স্নায়ুকোষ বড় হয় না—এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের অবধারিত নিয়ম। স্নায়ুকোষ বৃদ্ধি পেলে অসহনীয় যন্ত্রণায় মানুষ মারা যেত। এটাও আল্লাহর বিশেষ রহমত যে, স্নায়ুকোষ কখনো বাড়ে না।
ডাক্তাররা সকলেই একমত হয়ে গেলেন, এই ছেলে বড় হলে নিশ্চিত অন্ধ, পাগল নয়তো প্রতিবন্ধী হবে। চিন্তা করে দেখুন, তার বাবা-মায়ের অবস্থা কতটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল তখন! কোনো মা-বাবাই চায় না, তার সন্তান এমন শাস্তির মাঝে বেঁচে থাকুক। এর চেয়ে বরং চোখের সামনে সন্তানের মৃত্যুও অনেক ভালো ছিল।
আশা-নিরাশার মাঝেই সর্বশেষ একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ডাক্তারটি কিছুটা দ্বীনদার ও ঈমানদার ছিলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ চাইলে বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে যাবে। এরপর তিনি ব্রেইনের একটি টেস্ট করলেন এবং প্রেসক্রিপশান লিখে দিলেন। আল্লাহর কী রহমত, মাত্র ছয় মাসের মাথায় বাচ্চাটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেল! তার দেহে দুশ্চিন্তা করার মতো আর কোনো সমস্যা পাওয়া গেল না। বর্তমানে ছেলেটির বয়স ১২ বছর। সে হাঁটা-চলা, খেলাধুলা সবই করতে পারে। এমনকি সে ক্লাসের ফার্স্ট বয়, সবচেয়ে বেশি মেধাবী। আপনি কি অনুভব করতে পারছেন, মহান আল্লাহর নাম কেন আল-ফাত্তাহ? কারণ ডাক্তাররা সকল দুয়ার বন্ধ করে ফেলেছিল, চিকিৎসার কোনো দুয়ার আর খোলা ছিল না। কিন্তু মহান আল্লাহ নিজ করুণায় আরোগ্যের দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছেন। বাচ্চাটিকে সুস্থ করে তুলেছেন; তার মা-বাবার আত্মাকে শীতল করেছেন।
যিনি খুলে দেন রিযিকের দুয়ার, চাকরির দুয়ার; যিনি আপনার বিয়ের সুব্যবস্থা করেন, খুলে দেন আত্মিক প্রশান্তির দরজা, হৃদয়ের একাগ্রতা আর নেক কাজের দুয়ার; তিনিই অবারিত করেন দুআ কবুলের কপাট, খুলে দেন সমস্ত রুদ্ধ দ্বার। তাঁরই সুন্দরতম নাম আল-ফাত্তাহ।

سورة الفاتحة الله لِلنَّاسِ مِن رَّحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكُ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِن بَعْدِهِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রতি কোনো অনুগ্রহের দ্বার উন্মোচিত করলে তার নিবারণকারী কেউ নেই। তিনি কিছু বন্ধ করতে চাইলে তার উন্মুক্তকারী কেউ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় [১]

আয়াতটি মুমিন-হৃদয়ের সদা গুঞ্জরিত মুগ্ধকর এক প্রতিধ্বনি। আপনি যখন উপলব্ধি করবেন, সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহর, তখন অবশ্যই আপনি তাঁর অভিমুখেই যাত্রা শুরু করবেন। তিনি যে দুয়ার উন্মোচন করেন তা রুদ্ধ করার কেউ নেই। আল্লাহ ব্যতীত যা কিছু রয়েছে তার সবকিছুই স্রেফ ছায়ামূর্তি। না পারে নিজ ইচ্ছায় নড়তে; না পারে সামনে এগুতে বা পিছু হটতে। বিশ্বনবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম, প্রিয় মানুষ, প্রিয় নবি, নবিদের সর্দার-যার কাছে স্বয়ং আল্লাহ আসমান থেকে ওহি প্রেরণ করেন, তার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ-

قُل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ

বলুন, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত আমি নিজের কোনো লাভ-ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না [২]

আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা, প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে যদি আল্লাহর এই নির্দেশ হয়, নবিই যদি নিজের লাভ-ক্ষতির ব্যাপারে অবগত না হন, তাহলে কেউ কোনো কিছুর মালিক কীভাবে হতে পারে? অতএব, আল্লাহই সবকিছুর উন্মোচনকারী, আল্লাহই সবকিছুর নিরুদ্ধকারী।

করুণার দ্বার উন্মোচনকারী

দুই পক্ষের মাঝে অধিকারের প্রশ্নে প্রত্যেকেই নিজেকে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত মনে করে। কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই অসংখ্য অভিযোগের তির নিক্ষেপ করতে থাকে একে অন্যের দিকে। তখন সুযোগসন্ধানী তৃতীয় পক্ষ মাঝখানে সমঝোতা করতে এলে যার প্রাপ্য এক কেজি তাকে দেয় দুই কেজি। সে যেহেতু শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আসে তাই অপর পক্ষের কিছু বলার থাকে না। কিন্তু কে হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত? কার দাবি সত্য? সুনির্দিষ্ট এবং সঠিকভাবে কে সিদ্ধান্ত দেবে?
এক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত কেবল আল্লাহই দিতে পারেন। তাই আল-ফাত্তাহ মেঘে ঢাকা সূর্যকে যেভাবে উন্মোচন করেন, ঠিক তেমনি সত্যকে মেলে ধরেন সকলের সামনে। শুআইব আলাইহিস সালামের মুমিন সাথিগণ উদ্ধত কাফিরদের লক্ষ্য করে বলেছিল-

قَدِ افْتَرَيْنَا عَلَى اللَّهِ كَذِبًا إِنْ عُدْنَا فِي مِلَّتِكُم بَعْدَ إِذْ نَجَّانَا اللَّهُ مِنْهَا وَمَا يَكُونُ لَنَا أَن نَّعُودَ فِيهَا إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّنَا وَسِعَ رَبُّنَا كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ )

তোমাদের ধর্মাদর্শ থেকে আল্লাহ আমাদের উদ্ধার করার পর যদি আমরা তাতে ফিরে যাই, তবে তো আমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করব। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা না করলে আর তাতে ফিরে যাওয়া আমাদের জন্য সমীচীন নয়। সব কিছুই আমাদের প্রতিপালকের জ্ঞানের অধীন, আমরা আল্লাহর ওপর নির্ভর করি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মাঝে ন্যায্য মীমাংসা করে দিন। আপনিই তো শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী। [১]

মহান আল্লাহর এই নামের সাথে আপনার সম্পর্ক উপলব্ধি করুন। যদি আপনি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন, তাহলে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবেন না। কারণ আল্লাহই সর্বোত্তম ন্যায়বিচারক। হয়তো বা মানুষ আপনার নামে অনেক কিছু বলে বেড়াবে; বিভিন্ন ভিত্তিহীন অভিযোগের তির নিক্ষেপ করবে। কিন্তু আপনি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকলে ভয়ের কোনো কারণ নেই। মহান আল্লাহর এই মূল্যবান বাণী কখনোই ভুলে যাবেন না-

فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّكَ عَلَى الْحَقِّ الْمُبِينِ )

আর কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা করুন। নিশ্চয় আপনি রয়েছেন সুস্পষ্ট সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত [১]

মহান আল্লাহ আরো বলেন-

قُلِ اللَّهُ ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ )

বলুন, আল্লাহই; (আল্লাহই নাযিল করেছেন সেই কিতাব, যা মুসা নিয়ে এসেছিল)। অতঃপর তাদেরকে তাদের নিরর্থক আলোচনার খেলায় মগ্ন হতে দিন [২]

সকল অস্পষ্টতা দূর করে আল্লাহ প্রকৃত ঘটনা উন্মোচন করেন। যে ব্যক্তি নিজেকে চিনেছে, লোকের কথায় তার কীই বা আসে যায়!
আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেন-

قُلْ يَجْمَعُ بَيْنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ يَفْتَحُ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ وَهُوَ الْفَتَّاحُ الْعَلِيمُ )

বলুন, আমাদের প্রতিপালক আমাদের সবাইকে একত্র করবেন, এরপর তিনি আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফয়সালা করে দেবেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী, সর্বজ্ঞ [৩]

আমাদের জীবনে অস্থিরতা কেন আসে

একটি বিশাল ফ্যাক্টরি। দশ জনের মতো উদ্যোক্তা আর অংশীদার মিলে ফ্যাক্টরিটি দাঁড় করানো হয়েছে। ধরুন, এখানে কর্মরত কোনো ব্যক্তিকে দশ জনের আদেশই পালন করতে হবে। সবাই একমত হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করলেও, সবার আদেশ পালন করতে গিয়ে সে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠবে। কারণ প্রত্যেকের আদেশ-নির্দেশ বিপরীতমুখী হতে পারে। কেউ আসতে বলবে তো কেউ বলবে যেতে। কেউ লাঞ্চের পর বিশ্রাম নিতে বলবে, আবার কেউ বলবে দ্রুত কাজ শুরু করতে। তারা একমত হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করার পরও কিন্তু এত ভোগান্তির শিকার হতে হবে। তাহলে যদি তারা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ না থাকে; একে অপরের সাথে ঝগড়া-কলহে লিপ্ত থাকে, তখন অবস্থা আরো কত ভয়ানক হবে তা সহজেই অনুমেয়।
অতএব, মানুষের জীবনে একাধিক অংশীদার থাকা মানেই চরম ভোগান্তি! এক জীবনে ভিন্নমুখী দাবি পূরণ করতে যাওয়াই অস্থিরতার সৃষ্টি করে। আজ মানুষের জীবনে অস্থিরতার কোনো শেষ নেই। কারণ মানুষের জীবন একজনের দাবী পূরণের দিকে নিবিষ্ট নয়। কাফির, মুশরিক ও অমুসলিমদের জীবন ঈমানশূন্য ও খাপছাড়া। কখনো নেতার মন খুশি করা, কখনো অধীনস্থের মন ভোলানো, কখনো স্ত্রীকে খুশি করা-এ জাতীয় নানান ব্যস্ততায় জীবন তার ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীদের খুশি করতে গেলে স্ত্রী ক্ষেপে যায়। স্ত্রীকে সময় দিতে গেলে বন্ধু-বান্ধব ও পার্টনাররা চটে যায়। আশপাশের লোকজন ও প্রতিবেশীদের খুশি করতে গিয়ে আল্লাহর ক্রোধে নিপতিত হয়। বিভিন্ন উৎসব অয়োজনে অংশগ্রহণ না করলে আত্মীয়-স্বজন মনঃক্ষুণ্ণ হয়। তার পুরো জীবনই অসংলগ্ন। তার জীবনে অস্থিরতা, অশান্তির কোনো শেষ নেই।
কিন্তু মুমিন বান্দার জীবন এক মালিকের সমীপে সমর্পিত। শুধু তাঁর দিকেই নিবিষ্ট, একাগ্রচিত্ত; তাঁর সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করেই সে অন্যকে খুশি করে। তাই তার জীবনে অস্থিরতা নেই। আল্লাহর প্রতি ঈমানের প্রশান্তি এবং জীবনের সুস্তি তার পরম প্রাপ্তি। আল্লাহ বলেন-

فَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا آخَرَ فَتَكُونَ مِنَ الْمُعَذِّبِينَ )

আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহকে ডাকবেন না; অন্যথায় আপনি শাস্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। [১]

আল্লাহর সাথে অন্য কারো উপাসনা করা, অন্য কাউকে ডাকা, এটাও মানবাত্মার ওপর বিরাট এক শাস্তি। জীবনের অশান্তি-অস্থিরতা সেই শান্তির বহিঃপ্রকাশ।

আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডাকার অর্থ শুধু এই নয় যে, তাকে আপনি ইলাহ নামে ডাকবেন। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা করার মতো যদি অন্য কারো ওপর ভরসা করেন, নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া-পাওয়াকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করার মতো যদি অন্য কোনো বান্দার সাথে সম্পৃক্ত করেন, আল্লাহর অবাধ্যতা করে আপনি যদি কোনো মাখলুকের আনুগত্য করেন, তাহলে প্রকৃতপক্ষে আপনি তাকে আল্লাহর মতোই ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
অথচ মানুষ যখন পবিত্র হয়, যখন তার হৃদয়-আত্মা পরিশুদ্ধ হয়, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে মর্যাদার আসনে উন্নীত করে দেন। সে দুনিয়াকে তুচ্ছ মনে করে; কিন্তু দুনিয়া তার কাছে আসে অবনত হয়ে।
হৃদয়ের পবিত্রতা এবং নফসের পরিশুদ্ধির মাধ্যমে যদি আপনি মর্যাদার আসনে উন্নীত হতে পারেন, তাহলে দুনিয়া আপনার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস দেখুন। হাদিসটি আমি কখনো ভুলতে পারি না।
যায়িদ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-

দুনিয়াই হবে যার চিন্তা-ভাবনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার একমাত্র লক্ষ্য, আল্লাহ তার সবকিছুকে বিভক্ত করে দেবেন; তার কপালে সেঁটে দেবেন দারিদ্র্যের কালিমা। দুনিয়া তার কাছে ততটুকুই ধরা দেবে, যতটুকু তার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। দুনিয়া এর বেশি তার কাছে একচুল পরিমাণও আসবে না।
আর যে বান্দার আগ্রহ-অনুরাগ, আশা-আকাঙ্ক্ষার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হবে আখিরাত, আল্লাহ তার সবকিছু গুছিয়ে দেবেন। অন্তরাত্মায় তাকে বানিয়ে দেবেন ধনী; আত্মিক প্রাচুর্যের অধিকারী। সে দুনিয়াকে মনে করবে তুচ্ছ, নগণ্য; কিন্তু দুনিয়া তাকে ধরা দেবে নত, লাঞ্ছিত হয়ে।'[১]

দুনিয়ার ভালোবাসায় যে একবার মজেছে, তিনটি বিপদ কখনো তার পিছু ছাড়বে না-হন্যে হয়ে ছুটোছুটি; যেখানে ক্লেশের কোনো শেষ নেই। অসীম আশা-আকাঙ্ক্ষা; যা অপূরণীয়ই রয়ে যাবে। আজীবন দারিদ্র্যের গ্লানি; যার কোনো অন্ত নেই।

কিছু মুমিন কখনো দুনিয়ার চাকচিক্যে মোহগ্রস্ত হয় না। মুমিনের জীবন-উপভোগ যতটুকুই থাকুক তার সম্পূর্ণটাই উত্তম। তাতে রয়েছে আত্মিক প্রশান্তি এবং হৃদয়ের পরিতৃপ্তি। তার সাথে রয়েছে জান্নাত প্রাপ্তির রঙিন কোমল স্বপ্ন; যার প্রশস্ততা আসমান-জমিন পরিব্যাপ্ত। কিন্তু কাফিরের জীবন উপভোগে রয়েছে শুধুই অস্থিরতা। অজানা ভবিষ্যতের পথে ভয়ংকর যাত্রা। অনিশ্চিত আগামীর তীব্র শঙ্কা।
মুমিন দুনিয়ার সামান্য উপকরণ পেয়েও সম্পূর্ণ তৃপ্ত। তার হৃদয় থাকে প্রশান্ত। কারণ আখিরাতে আল্লাহ তার জন্য যে সীমাহীন জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেই স্বপ্নে সে বিভোর হয়ে থাকে। তাই সামান্য প্রাপ্তিতেও তার প্রশান্তি হয় অসামান্য। কিন্তু কাফির দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস ও প্রাচুর্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করেও এক অজানা আগামীর ভয়ে সর্বদা আতঙ্কিত। ভয়-শঙ্কা-উৎকণ্ঠা তার নিত্যদিনের সঙ্গী। তার সর্বনিম্ন ভয় হলো, সম্পদ হারানোর ভয়। তাই মৃত্যু তার জন্য চরম শঙ্কার বিষয়। এত কষ্টে অর্জিত সম্পদ মৃত্যু এসে এক নিমিষেই কেড়ে নেবে—এই ভয়ে সে সর্বদা ভীতসন্ত্রস্ত। সম্পদ প্রাপ্তির পর সেই সম্পদ হারানো যে বড় কষ্টের! এজন্যই আল্লাহর কাছে দুআ করি, 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে; শত্রুর হাসির পাত্রে পরিণত হওয়া থেকে এবং নিয়ামতপ্রাপ্তির পর আবার তা ছিনিয়ে নেওয়া থেকে।'
মুমিন কখনো মৃত্যুকে ভয় পায় না। মৃত্যু তার জন্য পরম আগ্রহের বিষয়। এজন্য দেখবেন মুমিনের শেষ জীবন শুরুর জীবনের তুলনায় অধিক সুখময় হয়ে থাকে। জীবনের প্রথমদিকে মুমিন একটু দারিদ্র্য-সংকটের শিকার হয় কিন্তু জীবনের শেষ দিকে আল্লাহ তাকে স্বস্তি দান করেন। আর কাফিরকে জীবনের প্রারম্ভে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে, ভোগে-তৃপ্তিতে ভরিয়ে দেন। কিন্তু শেষ জীবনে তাকে গ্রাস করে লাঞ্ছনা, অপমান ও সীমাহীন দারিদ্র্য। তাই আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য নিচের দুআটি করা অপরিহার্য—

اللَّهُمَّ اجْعَلْ خَيْرَ أَعْمَارِنَا أَوَاخِرَهَا وَخَيْرَ أَيَّامِنَا يَوْمَ نَلْقَاكَ نَسْأَلُكَ لِقَاءٌ تَرْضَى عَنَّا فِيْهِ

হে আল্লাহ, জীবনের শেষ দিনগুলো আমাদের জন্য উত্তম বানিয়ে দিন। আর সেই দিনটিকে আমাদের জন্য সর্বোত্তম বানিয়ে দিন, যেদিন আমরা আপনার সান্নিধ্যে ধন্য হব। আমরা আপনার কাছে প্রার্থনা করি এমন সাক্ষাৎ যাতে আপনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন।

ডাক্তার যদি জানিয়ে দেয় যে, রোগীকে আর বাঁচানো যাবে না, তবুও ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। কারণ অদৃশ্যের চাবিকাঠি আল্লাহর হাতেই। কত ডাক্তার রয়েছে, রোগীর পরিবারকে বলে দিয়েছে, আর মাত্র চার ঘণ্টা পর রোগীর হায়াত শেষ। স্বজনেরা শোক প্রকাশ করতে শুরু করে। এরপরও দেখা যায়, আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে রোগীকে ভালো করে দিয়েছেন। এমনও হতে পারে যে, রোগী পরবর্তীতে ৩০ বছর হায়াত পেয়েছে, কিন্তু সেই ডাক্তার মৃত্যুবরণ করেছে আরো এক যুগ আগে।
মানুষ শুধু জানতে পারে বর্তমানের অবস্থা। ভবিষ্যৎ কী হবে বা কী হতে চলেছে—সে সম্বন্ধে আল্লাহ ছাড়া কেউ অবগত নন। কারণ অদৃশ্যের চাবিকাঠি একমাত্র তাঁর কাছেই।
খুবই নিরাপদ ও সমৃদ্ধ শহর। সম্পদ, প্রাচুর্য কোনো কিছুর অভাব নেই। মূল্যবান সব খনিজে পরিপূর্ণ। কে বিশ্বাস করবে এই শহর কখনো দাউদাউ করে আগুনে জ্বলতে পারে? কে বিশ্বাস করবে এই শহর একসময় ভূতুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে?
১৯৭৪ সনে লেবানন ছিল ভূস্বর্গ। শান্তি, নিরাপত্তা, সচ্ছলতা, ঐশ্বর্য, বিলাসিতা কোনো কিছুরই অভাব ছিল না তাদের। উন্নত বিশ্বের সকল সুযোগ-সুবিধাই সেখানে ছিল পূর্ণমাত্রায়। কিন্তু বর্তমানে কেউ লেবানন সফরে গেলে, তার বিশ্বাস করতেই কষ্ট হবে যে, এই লেবানন একসময় ভূস্বর্গ ছিল।
লেবানন ট্রাজেডির বিশ্লেষণ অনেকে অনেকভাবে করে থাকেন।
দ্বীনি চেতনা এবং কুরআনের আলোকে এর ব্যাখ্যা অন্যরকম। মহামহিম আল্লাহ বলেন-

وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّن كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللَّهِ فَأَذَاقَهَا اللَّهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِّنْهُمْ فَكَذَّبُوهُ فَأَخَذَهُمُ الْعَذَابُ وَهُمْ ظَالِمُونَ

আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের; যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। যেখানে চারদিক থেকে আসত প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর সেই জনপদ আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ। তাদের কাছে তাদের মধ্য হতেই একজন রাসুল এসেছিল, কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা মনে করে প্রত্যাখ্যান করল। তখন শান্তি তাদের এমতাবস্থায় পাকড়াও করল যে, তারা ছিল সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত। [১]

অদৃশ্যের সকল চাবিকাঠি কেবল আল্লাহর কাছেই-

عِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ

অদৃশ্যের চাবিকাঠি শুধু তাঁর নিকটেই; তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না। জলে ও স্থলে যা কিছু আছে সে সম্পর্কে তিনিই অবগত; তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না। মৃত্তিকার অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না অথবা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। [২]

আপনি যদি দৃঢ় বিশ্বাস করেন, একমাত্র আল্লাহর নিকটেই অদৃশ্যের চাবিকাঠি; তাহলে কখনোই আপনি অন্য কোনো অদৃষ্ট সংবাদদাতাকে বিশ্বাস করবেন না।
ভণ্ড, প্রতারক, মিথ্যাবাদী, গণক, জ্যোতিষী এবং জাদুকরদের আপনি অবশ্যই পরিত্যাগ করবেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এই আধুনিক যুগে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে আপনি প্রায়ই শুনবেন, সেখানে জ্যোতির্বিদ বা গণক আছে। অনেক নামিদামি সম্পদশালী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সেলিব্রিটিরা তাদের কাছে নিয়মিত আনাগোনা করে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চায়। তাদের কথাকে ঐশী বাণীর মতো সত্য মনে করে। কিন্তু জ্ঞানশূন্য এই অসহায় মানুষগুলোর জানা নেই, এগুলোর সবই আসলে ধোঁকা।
কোনো গণকের কাছে আপনি ভবিষ্যতের সংবাদ জানতে চাওয়া মানেই আপনি আল্লাহকে সঠিকভাবে চিনতে পারেননি। আর যখন আপনি গণকের কাছে গিয়ে নতজানু হয়ে বসেন; অনাগত ভবিষ্যতে ঘটবে এমন কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান, তখন আপনি চূড়ান্তভাবেই প্রমাণ করে দেন, আল্লাহর সাথে আপনার কোনো পূর্বপরিচিতি নেই। কারণ, যে ব্যক্তি আল্লাহকে চিনেছে, সে কখনো এসব প্রতারকের গ্রাসে পরিণত হতে পারে না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কোনো জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে ভাগ্যগণনা করাল এবং তাকে বিশ্বাস করল, প্রকৃতপক্ষে সে মুহাম্মাদের ওপর নাযিলকৃত দ্বীনের কুফরি করল।'[১]
কুরআনের এই আয়াতকেও সে অস্বীকার করল-

قُل لَّا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَى قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ ﴿

বলুন, আমি তোমাদের নিকট এ কথা বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভান্ডার রয়েছে; তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয়াবলি সম্বন্ধেও অবগত নই। এ কথাও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। বলুন, 'অন্ধ ও চক্ষুমান কি সমান?' তোমরা কি অনুধাবন করো না?[২]

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন-

عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِن رَّسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا ﴿

তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাত, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না। শুধু তাঁর মনোনীত রাসুল ব্যতীত। সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ রাসুলের অগ্রে ও পশ্চাতে প্রহরী নিয়োজিত করেন [৩]

কী বিস্ময়কর আয়াত! আল্লাহ ছাড়া অদৃশ্যের খবর আর কেউ জানে না। অদৃশ্যের জ্ঞান তিনি কারো নিকট প্রকাশ করেন না। অতএব, যদি আপনি এমন কোনো প্রতিবেদন পড়েন যাতে নিশ্চিতভাবেই কোনো বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, তাহলে সেটাকে বিনাবাক্য ব্যয়ে প্রত্যাখ্যান করুন। হ্যাঁ, যদি শুধু সম্ভাবনা বোঝাতে কোনো খবর প্রকাশিত হয়, তবে তা পড়তে দোষ নেই। যেমন: আবহাওয়া বার্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা বিশ্বের কোনো সংকটময় পরিস্থিতির বিশ্লেষণ; বিশ্ব যার মুখোমুখি হতে চলেছে।
যে সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে, তা তো আপনার হাতছাড়া হয়ে গেছে। যে সময়ের আশায় আপনি বুক বেঁধে রয়েছেন তা অনিশ্চিত। আপনার হাতে আছে শুধুই বর্তমান। এখনই সময় ফিরে আসার। ফিরে আসুন, তাওবা করুন আল্লাহর সম্মুখে।

আল-ফাত্তাহ খুলে দিলেন হৃদয়ের কপাট

ফিলিস্তিনের নাবলুস জামে মসজিদে তাফসিরের দারস দিতাম আমি। প্রায় ১৬ বছর যাবৎ এক বোন এই দারসে অংশ নিতেন। তার মেয়ের জামাই ছিল একদমই ইসলামবিমুখ। দ্বীন-ধর্মের সাথে তার দূরতম কোনো সম্পর্কও ছিল না। সে আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করত। পরিষ্কার ভাষায় বলতে গেলে, সে ছিল একজন নাস্তিক। ঐ বোন তার মেয়ের মাধ্যমে জামাইকে দারসে আনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকল। এভাবে দুই বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। কোনোভাবেই সে আসতে রাজি নয়। কিন্তু মেয়ে একদিনের দারসে এসে আলোচনা শুনে আবেগ-আপ্লুত হয়। সে তার মাকে কথা দেয়, অবশ্যই স্বামীকে সাথে করে নিয়ে আসবে।
পরপর দুই সপ্তাহ তার স্বামী দারসে আসে আর এতেই তার জীবনে অবিশ্বাস্য রকমের পরিবর্তন দেখা দেয়।
এর কিছুদিন পরই লোকটি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। জীবনের শেষ মুহূর্তে আল্লাহর রহমতই হয়তো তাকে কুরআনের দারসে টেনে এনেছিল। জরুরি অবস্থায় তাকে এ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ্যাম্বুলেন্সের বেডে শুয়ে থেকেই সে তার ছেলেদের উদ্দেশ্যে এক অমূল্য অসিয়ত করে।
আপন সন্তানদের সে নিজের আদলেই গড়ে তুলেছিল জীবনভর। অবিশ্বাসকেই তাদের হৃদয়ের পরম বিশ্বাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সেই আস্থাভাজন সন্তানদেরকে মৃত্যুশয্যায় সে অসিয়ত করল, 'দেখো, তোমাদেরকে এতদিন আমি যা কিছু বলেছি, তোমাদেরকে যে দীক্ষায় দীক্ষিত করেছি তার সবই ছিল মিথ্যে, বাতিল আর অর্থহীন। সত্য সেটাই যা আল-কুরআনে এসেছে!'
তার অন্তিম মুহূর্তের এই কথাগুলো আমি কখনো ভুলতে পারব না।
যে সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে তা আপনার হাতছাড়া। ভবিষ্যতের রঙিন যত স্বপ্নের ছবি আপনি আঁকছেন তার সবই অনিশ্চিত। অতীতে যা ঘটে গেছে তা নিয়ে আপনার আর কিছুই করার নেই। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে নিশ্চয়তার শিকলে বন্দি করার ক্ষমতাও আপনার নেই। আপনি শুধু বর্তমান সময়কে কাজে লাগাতে পারেন। এ জন্য কোনো কোনো ইমাম বলেছেন, হজ ফরয হওয়ার সাথে সাথেই তা আদায় করা আবশ্যক। সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য বিলম্ব করার সুযোগ নেই। অতএব, যখনই হজের সামর্থ্য হবে তখনই হজ পালন করতে হবে। কারণ জীবন আপনার হাতে নেই। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা অতি দ্রুত (ফরয) হজ আদায় করে নাও; কারণ তোমাদের কারোরই জানা নেই যে, আগামীতে সে কোন অবস্থার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।’ [১]

যখন আপনার সম্মুখে সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে তখন স্মরণ করুন আল্লাহকে!

আপনার সামনে যদি কোনো দরজা খোলা থাকে, তাহলে আপনি কি কাউকে দরজাটা খুলে দিতে বলবেন? নিশ্চয় বলবেন না। তবে বন্ধ দরজা খুলে দেওয়ার জন্য আপনি কাউকে অনুরোধ করতে পারেন।
যখন আপনার সামনে সবকিছু সংকুচিত হতে শুরু করে, আপনার চাবি হারিয়ে যায়, ব্যাগ হারিয়ে যায় অথবা মূল্যবান কিছু হারিয়ে যায় এবং সামনের পথগুলো রুদ্ধ হয়ে আসতে থাকে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করুন। কারণ, একমাত্র তিনিই খুলে দিতে পারেন বন্ধ দুয়ার।
আমার এক বন্ধু তার জীবনের বাস্তব একটি ঘটনা শুনিয়েছে—
‘লাতাকিয়াহ সমুদ্রবন্দরে জাহাজে করে আমার কিছু মালামাল আসে। সেগুলো খালাসের উদ্দেশ্যে আমি বন্দরে যাই। আমার সাথে ছিল পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র-সহ একটি ব্রিফকেস। কিন্তু বন্দরে পৌঁছার পর যখন মাল খালাস করব, তখন আবিষ্কার করলাম, ব্রিফকেসটি আমার কাছে নেই। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মনে হলো রক্ত জমে হিম হয়ে গেছে। জাহাজে আমার এবং আমার বন্ধুদের মিলিয়ে কয়েক মিলিয়ন রিয়ালের পণ্য মজুদ ছিল। কী করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ক্ষণিকের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলাম।
আমি গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মনের অজান্তেই হঠাৎ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- 'ইয়া ফাত্তাহ!' প্রায় এক ঘণ্টা যাবৎ সেখানেই নিথর দাঁড়িয়ে। মনে মনে অত্যন্ত বিনয় ও আকুতির সাথে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করি।
আমি যে গাড়িতে এসেছিলাম ব্রিফকেসটি সে গাড়িতে কি না মনে করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার কিছুই মনে পড়ল না। আল্লাহর কুদরতের কী অপার মহিমা! আচমকা একটা গাড়ি এসে আমার সামনে দাঁড়াল।
গাড়ির ড্রাইভারকে বললাম, 'এখন আমি কোথাও যাব না। আপনি চলে যান।'
ড্রাইভার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ঘণ্টাখানেক আগে আপনি আমার গাড়িতে এসেছেন। এই ব্রিফকেসটি বোধহয় আপনার!'
আমি উত্তর দিলাম, 'হ্যাঁ, এটাই তো আমার ব্রিফকেস! এক ঘণ্টা ধরে তো এটাই আমি খুঁজছি। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।'
আল্লাহর নাম নিয়ে দুআ করার বদৌলতে সে হারানো ব্রিফকেস ফিরে পেয়েছে। আমার বন্ধু ও গাড়ির ড্রাইভার দুজনই আল্লাহর বান্দা। যখন সে গাড়ির কথা মনে করার চেষ্টা করেছে, ঠিক তখনই আল্লাহ তাআলা গাড়ির ড্রাইভারকে তার কাছে পাঠিয়ে দিলেন! তার মনে যাত্রী ভাইয়ের প্রতি কল্যাণকামিতা, সহমর্মিতা এবং আল্লাহর ভয় উদ্রেক করে দিয়েছেন। তাই সে দ্রুত ব্রিফকেস-মালিকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
আপনি করুণার দ্বার উন্মোচনকারী আল-ফাত্তাহর ওপর ঈমান এনেছেন। তাই যখনই আপনার সামনে কোনো দ্বার রুদ্ধ হয়ে যাবে, তখনই গভীর শ্রদ্ধা-ভক্তি, আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে ঈমানের সাথে ডাকুন- 'ইয়া ফাত্তাহ' [১]। ইনশাআল্লাহ, তিনি আপনার পথ খুলে দেবেন।

তিনিই খুলে দেন আকাশের দরজা

মহামহিম আল্লাহ বলেন-

فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ وَفَجَّرْنَا الْأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ

অতঃপর প্রবল বারি বর্ষণে আমি আকাশের দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। আর মৃত্তিকা থেকে উৎসারিত করলাম প্রস্রবণ; অতঃপর সকল পানি মিলিত হলো এক পরিকল্পনা অনুসারে [১]

আকাশের দরজা বন্ধ থাকে। যখন বৃষ্টি বর্ষণ হয়, তখন আল্লাহ তাআলাই তা খুলে দেন। আপনি প্রায়ই সংবাদে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে শুনতে পাবেন, প্রবল বৃষ্টিপাত ও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে কিংবা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, তবে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। কখনো বলা হয়, সেপ্টেম্বরের প্রথম শুক্রবার ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এক জুমআ, দুই জুমআ, তিন জুমআ এভাবে অক্টোবর, নভেম্বর পার হয়ে যায় কিন্তু বৃষ্টির নামগন্ধও পাওয়া যায় না।
বৃষ্টি বর্ষণের কথা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। কারণ আকাশ থাকে তালাবদ্ধ। আল্লাহর কাছেই সেটার চাবিকাঠি।
কেউ যুদ্ধে জয়ী হলো। বিজিত অঞ্চল পূর্ব থেকেই তালাবদ্ধ ছিল। দুর্গ, মজবুত প্রাচীর, নিরাপত্তা বেষ্টনি ইত্যাদি নানা ব্যবস্থাপনায় তার দ্বারসমূহ ছিল রুদ্ধ। কিন্তু আল্লাহ সে অঞ্চলের তালা খুলে দিয়েছেন। মুসলিমদের বিজয় দান করেছেন। সেটা ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
তাই যিনি আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেন, বৃষ্টিতে ভরিয়ে দেন পৃথিবী, তিনিই আল-ফাত্তাহ। যিনি শক্তিশালী সৈন্যসামন্ত ঘেরা, মজবুত প্রাচীরবেষ্টিত অঞ্চলের তালা খুলে দেন; সুদৃঢ় দুর্গের লৌহকপাট উন্মুক্ত করে দেন, তিনি আল-ফাত্তাহ।
যারা আল্লাহর মুমিন বান্দা, যাদের হৃদয় ঈমানের আভায় উদ্ভাসিত এবং ঈমানের উচ্চ শিখরে উন্নীত, তাদের হৃদয়কে মহান আল্লাহ বিশেষভাবে উন্মোচিত করেন।

আল্লাহ তাদের অন্তরে প্রদীপ জ্বেলে দেন। সেই উজ্জ্বল আলোয় তারা তখন হক-বাতিলের মাঝে সুস্পষ্ট বিভাজন-রেখা দেখতে সক্ষম হন। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের হৃদয়ে অন্তর্দৃষ্টির মশাল জ্বেলে দিয়েছিলেন। সুমহান আল্লাহ বলেন-

وَكَذَلِكَ نُرِى إِبْرَاهِيمَ مَلَكُوتَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ الْمُوقِنِينَ

এভাবে আমি ইবরাহিমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর পরিচালনা ব্যবস্থা দেখাই, যাতে সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয় [১]

সবসময় অন্তর্দৃষ্টির জ্যোতি প্রত্যক্ষ করতে পারবেন না আপনি। তবু মাঝে মাঝে হৃদয়রাজ্যে সুস্পষ্ট আলোকরেখা দেখতে পাবেন। যে মনে করে ধোঁকা, প্রতারণা, মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেই সফলতা; পার্থিব জীবনে সম্মানিত হওয়াই আভিজাত্য ও মহানুভবতা, সে আসলে অন্তর্দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত, হৃদয় তার তালাবদ্ধ। আল্লাহ যদি আপনার হৃদয় জগৎকে আলোকিত করে দেন, অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেন, তাহলে অন্তর হয়ে যাবে একটি স্বচ্ছ আয়না। তাতে আপনি সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ সবকিছু দেখতে পাবেন; ঠিক আয়নায় আপনার চেহারা দেখার মতোই।
আলিমগণ বলে থাকেন, আল-ফাত্তাহ এমন মহান সত্তার নাম, যিনি অন্তর্দৃষ্টির নুরে উদ্ভাসিত করেন মুমিনদের অন্তর। আল-ফাত্তাহ এমন সত্তার নাম যিনি গুনাহগারদের জন্য খুলে দেন মাগফিরাতের দুয়ার।
নিশ্চয় আপনি এখন পাঁচ বছর আগের চেয়ে বেশি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন; মূল্যবোধে অধিক উন্নত। এভাবেই আল্লাহ আপনার অন্তর্দৃষ্টিকে দিনদিন বৃদ্ধি করতে থাকেন। এ জন্যই মুমিনদের ঈমানি অবস্থার মধ্যেও পরিলক্ষিত হয় অনেক তারতম্য। কত মুমিন রয়েছে আল্লাহর প্রতি ঈমান থাকা সত্ত্বেও দিনের বড় একটা অংশ উদাসীনতা আর অবহেলায় কাটিয়ে দেয়। এর বিপরীতে অনেক মুমিন রয়েছে, যাদের অধিকাংশ সময় আল্লাহর ইবাদতে কেটে যায়। আল্লাহ প্রদত্ত আলোয় ঝলমল করে ওঠে তাদের অন্তর্লোক।
মাঝে মাঝে মানুষ একটি বই একবার পড়ে কিছুই বুঝতে পারে না। কিন্তু কিছুদিন পর আবার যখন পড়ে, তখন সে বুঝতে শুরু করে। কিতাবের গভীরে বিচরণ করে, মুখস্থ করে এবং বিষয়বস্তু অন্যদের সামনে উপস্থাপনও করে। তখন আল্লাহ তার বক্তব্যে প্রজ্ঞা দান করেন যাতে অসংখ্য মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হয়।
দ্বীনের ক্ষেত্রে ইলমের দৌলত দান করে আল্লাহ তাআলা বান্দার ওপর অনুগ্রহের দ্বার উন্মোচন করেন। আবার একইভাবে দুনিয়াবি দিক দিয়েও তিনি বান্দার সমস্যা নিরসন করে দেন।
আপনি অভাবগ্রস্ত হলে তিনি আপনাকে অভাবমুক্ত করেন, আপনি দুর্বল হলে তিনি আপনাকে শক্তিশালী করেন, অত্যাচারের শিকার হলে শত্রুদের বিপক্ষে আপনাকে সাহায্য করেন, আপনি বিপদগ্রস্ত হলে তিনি এই বিপদ দূর করে দেন এবং তার স্থানে প্রশান্তি, তৃপ্তি দিয়ে হৃদয়কে পরিপূর্ণ করেন। তাই মানুষ আল্লাহর থেকে দূরে সরে গেলে কখনোই সফলকাম হতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى )

যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে, অবশ্যই তার জীবনযাপন হবে সংকুচিত। আর আমি তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায় [১]

শত শত, হাজার হাজার, কোটি কোটি অর্থের মালিক, সীমাহীন শক্তি ও দাপটের অধিকারী কত দুনিয়াদার রয়েছে। আমি আপনাকে আল্লাহর কসম করে বলছি, আপনি তাদেরকে তাদের অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে দেখুন। কী ভয়ানক অস্বস্তি আর সংকীর্ণতার মধ্যে তাদের জীবন কাটে। তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ তো বলেও ফেলে, 'আমি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা!'
আল্লাহ আপনার অন্তরে প্রশান্তির ফল্গুধারা বর্ষণ করেন। আপনার হৃদয়ে তাঁর সন্তুষ্টির বদ্ধ দুয়ার খুলে দেন। অন্তর্লোকে সদা সর্বদা তখন আপনি আল্লাহর সান্নিধ্য অনুভব করেন। সংকীর্ণ বাড়িতে, ভাঙা ঘরে থেকেও আপনি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট, তৃপ্ত ও কৃতজ্ঞ। নিজেকে মনে করেন সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যবান। এর বিপরীতে ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত বিশাল বাড়িতে থেকেও অনেকে হা-হুতাশ করতে থাকে।

প্রায়ই আপনি তাদেরকে এমনটা বলতে শুনবেন, আজ মার্কেটের অবস্থা একদম শোচনীয় বা এই বছর এত মিলিয়নের লোকসান হয়েছে!

তিনিই খুলে দেন তাওফিকের দুয়ার

এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আল্লাহর তাওফিক ছাড়া হতে পারে না। পৃথিবীর সর্বপ্রথম মহাকাশযানের নাম 'চ্যালেঞ্জার'। এটি আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নিল, ৯ মাস বা এক বছরের মধ্যে সাতজন নভোচারী সদস্য মহাশূন্যে ঘুরে আসবে। ফলে উড্ডয়ন-অবতরণের মাধ্যমে অতিসূক্ষ্মভাবে চ্যালেঞ্জারকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলো। মহাকাশযাত্রার সকল আয়োজন সম্পন্ন। এরপরও মহাকাশযানটি আকাশে উড়ানোর মাত্র ৭৩ সেকেন্ডের মাথায় পরিণত হলো একটি অগ্নিপিণ্ডে। কুণ্ডলি পাকানো মারাত্মক ধোঁয়া ছাড়া আর কিছুই দেখা যায়নি সেদিন। প্রাণ হারিয়েছিল নভোচারীদের সাতজনই।
তারা তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং পার্থিব সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করলেও আল্লাহর তাওফিক তাদের সাথে ছিল না, তাই তারা ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য সবসময়ই আমাদের নিচের দুআটি বেশি বেশি পড়ার বিকল্প নেই। দুআটি হলো সুরা হুদ-এর ৮৮ নং আয়াত-
وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ

আল্লাহ ছাড়া আমার কোনো শক্তি-সামর্থ্য নেই; তাঁর ওপরই আমি ভরসা করি, তাঁর প্রতিই নিবিষ্ট হই।

আপনি কোনো ফ্যাক্টরির ভিত্তিস্থাপন করুন, কোনো বিদ্যালয়ের ভিত্তিস্থাপন করুন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করুন কিংবা বিবাহের সংকল্প করুন, সকল ক্ষেত্রেই গভীর আবেগ, বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে ডাকুন, 'ইয়া ফাত্তাহ।' কখনো মনে করবেন না, আপনি অনেক বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান; আপনি আপনার সবটুকু বুদ্ধিমত্তা ব্যয় করে কাজে সফল হবেন। কখনো ভাববেন না, কোনো আইনজীবীর সাথে কথা বলে জয়ী হবেন। বরং আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট হোন।

বুদ্ধিমত্তার ফল

একজন লোককে আমি চিনতাম। লোকটি গাড়ি, বাড়ি, কল-কারখানা-সহ প্রচুর অর্থ-বিত্তের মালিক। কিন্তু জীবনের প্রতি তার অসম্ভব রকমের ক্ষোভ ও অসন্তোষ। ছিল। সবসময়ই সে বিরক্ত ও অস্থির থাকত। সে একবার অনেক হিসাব-নিকাশ করে বের করল যে, যদি সে তার ফ্যাক্টরি, বাড়ি এবং একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দেয় তাহলে কয়েক কোটি টাকা তার হাতে চলে আসবে। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ইউরোপের কোনো ব্যাংকে রেখে দিলে যে মোটা অঙ্কের সুদ আসবে, তা দিয়ে কোনো ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই রাজার হালতে তার বাকি জীবন কেটে যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। সে তার পরিকল্পনা মোতাবেক গাড়ি, বাড়ি, ফ্যাক্টরি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সব বিক্রি করে দিলো। এরপর ইউরোপের অন্যতম উন্নত দেশ সুইডেনের ভিসা সংগ্রহ করে সেখানে পাড়ি জমাল।
পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক তার ইচ্ছা ছিল অর্থগুলো ব্যাংকে রেখে দেবে। সেখান থেকে কিছু টাকা দিয়ে একটি বিলাসবহুল বাড়ি করবে, কিছু টাকা দিয়ে কিনবে একটি দৃষ্টিনন্দন গাড়ি। ব্যাংকে গচ্ছিত বাকি টাকার সুদ দিয়ে খুব সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যেই জীবন উপভোগ করা যাবে। পরিকল্পনা সব তো ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু জটিলতা দেখা দিলো অন্য জায়গায়। এত বিশাল অঙ্কের টাকা একজনের নামে ব্যাংকে রাখতে গেলে নিরাপত্তাজনিত জটিলতার সৃষ্টি হয়। তাই তার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির একাউন্টে বেশ বড়সড় একটি এমাউন্ট জমা দিলো সে। কিন্তু যার একাউন্টে রেখেছিল, পরদিন থেকেই সে তাকে না চেনার ভান করতে লাগল। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! তিল তিল করে জমানো তার এতদিনের এত বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ কয়েক মুহূর্তের মাঝেই হাতছাড়া হয়ে গেল, তাও আবার নিরাপত্তার স্বার্থেই।
প্রিয় পাঠক, এই ঘটনাটি আপনার অন্তরে গেঁথে রাখুন চিরকাল! মনে রাখবেন, আল্লাহর সাথে কোনো মেধা, বুদ্ধি বা বিচক্ষণতায় কাজ হয় না। আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোনো কিছুই সফলতার মুখ দেখে না। আল্লাহর নির্ধারিত সীমার বাইরে আপনার সর্বোচ্চ সতর্কতা বা সুনিপুণ ব্যবস্থাপনা কোনো কাজে আসবে না। কিন্তু যে বিপদ নেমে এসেছে বা যে বিপদ অনাগত—উভয় ক্ষেত্রেই দুআ অতি কার্যকরী ব্যবস্থা। তাই যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে শুধু আল্লাহর দিকেই নিবিষ্ট হোন! সেই সাথে দুআ করুন-

وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ

আল্লাহ ছাড়া আমার কোনো শক্তি-সামর্থ্য নেই; তাঁর ওপরই আমি ভরসা করি, তাঁর প্রতিই নিবিষ্ট হই।

মহান আল্লাহর নাম আল-ফাত্তাহ থেকে দুটি শিক্ষা গ্রহণ করুন-

এক. সর্বদা তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যে মগ্ন থাকুন; তিনি আপনার হৃদয়ে ইলম ও জ্ঞানের দুয়ার খুলে দেবেন।

দুই. আপনি আপনার দান-অনুদান এবং বদান্যতা ও অনুগ্রহের দুয়ার খুলে দিন আল্লাহর বান্দাদের জন্য। আপনার দানের হাত সম্প্রসারিত করুন; দান-সাদাকা থেকে কখনো গুটিয়ে ফেলবেন না। কারণ বান্দার হাত সম্প্রসারিত করাকে আল্লাহ তাআলা খুব পছন্দ করেন।

টিকাঃ
[১] সুরা ফাতির, আয়াত: ২
[২] সুরা আরাফ, আয়াত: ১৮৮
[১] সুরা আরাফ, আয়াত: ৮৯
[১] সুরা নামল, আয়াত: ৭৯
[২] সুরা আনআম, আয়াত: ৯১
[৩] সুরা সাবা, আয়াত: ২৬
[১] সুরা শুআরা, আয়াত: ২১৩
[১] সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১০৫
[১] সুরা নাহল, আয়াত: ১১২-১১৩
[২] সুরা আনআম, আয়াত: ৫৯
[১] মুসনাদু আহমাদ: ৯৫৩৬
[২] সুরা আনআম, আয়াত: ৪৮
[৩] সুরা জিন, আয়াত: ২৬-২৭
[১] মুসনাদু আহমাদ: ২৭২১
[১] যেকোনো ধরনের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য 'ইয়া ফাত্তাহ' পড়া যেতে পারে। এর দ্বারা আশা করা যায়, আল্লাহ সংকট দূর করে দেবেন। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়াকে উত্তম কিংবা সুন্নাহ মনে করা অথবা অভিনব কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করা বিদআত। যেমন: আমাদের দেশের অনেক স্থানেই বিয়ের জন্য নির্দিষ্ট-সংখ্যক বার 'ইয়া ফাত্তাহ' পড়া হয় যা সুস্পষ্ট বিদআত।
[১] সূরা কামার, আয়াত: ১১-১২
[১] সুরা আনআম, আয়াত: ৭৫
[১] সুরা ত-হা, আয়াত: ১২৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00