📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-জাব্বার তথা মহিমান্বিত

📄 আল-জাব্বার তথা মহিমান্বিত


যখন আপনার কোনো স্বপ্ন ভঙ্গ হয়, আল্লাহ্ আপনার জন্য আরও সুন্দর একটা স্বপ্ন রচনা করেন; যখন আপনার অন্তরে কোনো স্মৃতি নিভু নিভু হয়ে আসে তখনই আল্লাহ্ অসাধারণ এক স্মৃতি নিয়ে আসেন!

আল-জাব্বার তথা মহিমান্বিত

কখনো কি এমন হয়েছে যে, বিপদ-আপদ আপনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে? ভয় আপনার ওপর চেপে বসেছে? ঝড়-ঝাপটা আপনার ওপর আছড়ে পড়েছে?
দারিদ্র্য আপনার জীবনযাত্রা পরিবর্তিত করে দিয়েছে? অসুস্থতা আপনার শরীরকে জীর্ণশীর্ণ করে দিয়েছে? দুর্বলতা আপনাকে ক্লিষ্ট করেছে? বিদ্রুপের দৃষ্টি আপনাকে চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছে?
আপনার এ ভগ্ন হৃদয়, দুর্বল আত্মার জন্য এমন কিছু প্রয়োজন যা আপনার দুর্বলতা, ভগ্নতার প্রতিকার করবে। আপনি এবার পরিচিত হোন আল্লাহ্র 'আল-জাব্বার' নামটির সাথে। যেন এ নামের রাহমাতভরা অর্থে আপনার মনের ভাঙন দূর হয়। এ নামের ছায়ায় আপনার ক্ষতস্থানগুলোতে ঔষধ লাগে। আর এ নামের সুবাতাসে আপনার অশান্ত মনে শান্তির পরশ নেমে আসে।

ভগ্ন হৃদয়.. কীভাবে ভাঙল?

'আল-জাব্বার' তথা মহিমান্বিত নামের অর্থ হলো, তিনি ওই সত্তা—যিনি বান্দার শরীর ও মনের ভাঙন ঠিক করে দেন।
আল্লাহ্ আশ্রয়ে বসবাস করায় আমরা পেয়ে যাই সুখ ও সুস্বাস্থ্যের পথ্য, ব্যথার ঔষধ আর দুশ্চিন্তার এন্টিবায়োটিক।
আল্লাহ্ জানেন যে, বান্দার জীবন, শরীর ও মনে এক ধরনের ভাঙন দেখা দেবেই। এ ভাঙন তাদের হৃদয়ে দাগ রেখে যাবে। তাদের আত্মায় প্রভাব ফেলবে। তাই তো আল্লাহ্ তাঁর করুণার ছায়া দিয়ে এর প্রতিকার করেন। আর এ জন্যই তো তাঁর নাম 'আল-জাব্বার'। তিনি বান্দাদের এটা জানাতে চান যে, তিনি বান্দাদের মনে সৃষ্ট ক্ষতের প্রতিকার জানেন। ফলে বান্দারা তাঁর দিকে ছুটে যায়, তাঁর কাছে আশ্রয় নেয়।
জীবনের এ ভাঙনগুলো বিভিন্ন রকমের—
শরীরের হাড়গোড় ভেঙে যাওয়া, অপমানে অন্তর ফেটে যাওয়া, দারিদ্র্যে আত্মা নেতিয়ে পড়া, অসুস্থতায় শক্তি ফুরিয়ে যাওয়া, স্বপ্ন অর্জনের পথে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া, মাথা হেলে পড়ে এমন বিপদের সম্মুখীন হওয়া—এ ধরনের বিপদ-আপদে আসমানের দরজা খুলে যায়। নেমে আসে করুণার ছায়া আর ভালোবাসার পরম স্পর্শ।
এমন কত ইয়াতীম আছে—যার দিকে অহংকারী লোকদের দৃষ্টিপাত তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। যদি মহিমান্বিত আল্লাহ্ না থাকতেন, তাহলে তো সে নিরাশ হয়ে পড়ত।
এমন কত দুর্বল লোক আছে, যাদের জীবনযাত্রা সবল ব্যক্তির কবলে পড়ে নুয়ে পড়েছে। যদি মহিমান্বিত আল্লাহ্ না থাকতেন, তাহলে সারাটা জীবন তাদেরকে মাথাটা নিচু করেই রাখতে হতো।
এমন কত দরিদ্র লোক আছে, যাদেরকে ধনী লোক কোনো কথা দিয়ে অপদস্থ করেছে। যদি মহিমান্বিত আল্লাহ্ না থাকতেন, তাহলে এ কথা সারা জীবন তাদের জন্য কলঙ্কের দাগ হয়ে থাকত।
তিনি বিপর্যস্ত ব্যক্তির প্রতিকার করেন। দুর্বলকে সাহায্য করেন। নিচু শ্রেণির লোককে উপরে তুলে আনেন। পিছিয়ে পড়া ব্যক্তিকে এগিয়ে আনেন। তাঁর রাহমাত অন্তরের ক্ষতকে দূর করে দেয়।
আমরা এমন অনেককে চিনি যারা বাবা-মা'র কাছ থেকে অনেক বাধাগ্রস্ত হয়েছে তবু রাহমাতের চাদরে আবৃত হয়ে বেরিয়েছে।
তাদের নিয়ে বন্ধুরা ঠাট্টা-উপহাস করেছে, তবুও তারা সফল ও অগ্রসর হয়ে গেছে।
তারা ছোটবেলায় এনিমিয়া, যক্ষ্মা, বুকব্যথায় ভুগেছে। বড় হয়ে তারা শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান হয়ে গেছে।
কোথায় সেই বাধা-বিপত্তি? রোগের চিহ্ন গুলোই বা কোথায়? সব কিছুর প্রতিকার আল্লাহ্ দিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর রাহমাত সব দূর করে দিয়েছে। মহিমান্বিত আল্লাহ্ পেরেছেন সবকিছু বিলীন করে দিতে।

আমার সমস্ত ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দিন

দুই সিজদার মধ্যে আমাদের এ দু'আ বলতে বলা হয়েছে—
اللهم اغفر لي وارحمني وعافني وارزقني واجبرني
আল্লাহ্, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, দয়া করুন, নিরাপত্তা দান করুন, রিস্ক দিন আর সমস্ত ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দিন [১]
‘আমার সমস্ত ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দিন'-এই বলাটা এমন যেন দিনের মধ্যে আমরা কয়েকবার ভেঙে-চুরে যাই; কিন্তু আল্লাহ্ আমাদের ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দেন।
এই তো প্রায় আঠারো বছর আগে আমার একমাত্র বোনের মেয়েটা তার চোখের সামনে মারা গেল। এক গগনবিদারী চিৎকার শুনতে পেলাম পাশের রুম থেকে। এটাই ছিল তার শেষ চিৎকার। ফজরের আগ মুহূর্তে তার আমার বোনের ঘরে ছুটে গেলাম। তার অন্তরে তখন প্রবল দুঃখ-ব্যথা। তার দু'চোখ বেঁয়ে অশ্রুর ফোয়ারা নেমেছে। দীর্ঘনিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে শুধু। আমি তাকে দু'আটা শিখিয়ে দিলাম-
اللهم أجرني في مصيبتي وأخلف لي خيراً منها
'আল্লাহ্, আপনি আমাকে আমার এ বিপদে আশ্রয় দিন। আর আমাকে এর পরিবর্তে উত্তম প্রতিদান দিন।'
আমার বোন তার ভাঙা মন আর ব্যথিত হৃদয় নিয়েই এ দু'আ উচ্চারণ করল। তার এ ভাঙা ভাঙা কথা সেই রবের দিকে উঠে গিয়েছিল। যে রব তাঁর বান্দাদের ভাঙা হৃদয়ের ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দেন তাঁর কাছে এ প্রার্থনা উত্থিত হলো। তিনি ওই এক মেয়ের বদলে তাকে এখন অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে দিয়েছেন। তারা তার আনুগত্য করে। তার সাথে সদাচরণ করে। তিনি আমার বোনের ওপর তাঁর অপরিসীম দান ঢেলে দিয়েছেন।
যখন আপনার আত্মায় অশান্তি বিরাজ করে, আপনার স্বপ্নগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়, আপনার আত্মার দালানে ভাঙন ধরে, তখন আপনি বলুন- 'ইয়া আল্লাহ্।'

আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করুন

গত বছর এক ছাত্রের সাথে দেখা হয়েছিল। তার জিহ্বায় তোতলামি। একটা কথা কয়েকবার না বললে বলতেই পারে না। তাকে ধরে বললাম, 'তুমি যতবার সিজদায় যাবে ততবার এ দু'আ পড়বে-
وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي
আর আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করুন। তারা যেন আমার কথা বুঝতে পারে। [১]
এর একবছর পরে তার সাথে আবার দেখা। এবার তাকে বেশ সুভাষী মনে হলো। ততদিনে আমি অবশ্য আমার দেওয়া পরামর্শের কথা ভুলেই গেছি। তার কাছে এ পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলাম। সে বলল, 'ওই যে- 'ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানী' দু'আটি।'
মহিমান্বিত প্রভু তার জড়তার ক্ষয় দূর করে দিয়েছেন।
তিনি তো সেই মহিমান্বিত প্রভু, যিনি সব ধরনের দুঃখ দূর করে দেন। সব রোগের তিনি শিফা দেন। এমন কোনো বিপদ নেই যা তিনি বিদূরিত করেন না।
বান্দার মনে দুঃখ-কষ্ট জমাট বাঁধে। তার মনে হয় এ দুঃখ কখনও দূর হবে না। হঠাৎ মহিমান্বিত আল্লাহ্ এসে হৃদয়ের ক্ষতটা পূরণ করে দেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে বান্দা ভুলে যায় সব ব্যথা, সব কষ্ট। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তো শুধু ক্ষয়-ক্ষতি দূর করেই দেননি; বরং এর উত্তম বদলাও দিয়েছেন। মনে হয় সবকিছু যেন আগের মতোই আছে এখনও।
তিনি অন্তর, শরীর ও আত্মার সকল ব্যথা দূর করে দেন। তিনি সব ক্ষত মুছে দেন। তিনি পারেন চোখের অশ্রু মুছে দিতে।
যখন দুশ্চিন্তার চাপে পিষ্ট হয়ে যাবেন, বিপদাপদ আপনাকে ঘিরে ফেলবে তখন আপনি অস্থির হয়ে পড়বেন না। সালাতের জন্য কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ান। দেখবেন মুহূর্তের মধ্যেই আপনার সব দুঃখ-ব্যথা দূর হয়ে যাবে, ইন শা আল্লাহ্।

তিনি আপনার মুচকি হাসি পছন্দ করেন

মাগরীবের সালাতের পর সে বসে বসে ইস্তিগফার পড়তে লাগল। সম্বল বলতে তার পকেটে কয়েক রিয়াল মাত্র। জীবনের প্রয়োজনে এ অর্থ কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। যে ব্যক্তি তার দিকে দূর থেকেও তাকাবে, সে-ও তার দারিদ্র্য ধরতে পারবে। শরীরের কাঁটাছেড়া অংশগুলো দেখলে অনুধাবন করতে পারবে; কিন্তু সপ্তাকাশের ওপরের সেই সত্তা-যিনি তার দিকে চেয়ে আছেন-তিনি তার ভাগ্যে লিখে দিলেন যে, ওই রাত যাওয়ার আগেই তার চিন্তারও বাইরের কোনো পন্থায় তার দারিদ্র্য দূর করে দেবেন।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যে আপনার মুচকি হাসি পছন্দ করেন, সেজন্য আপনার মুখে মুচকি হাসি ফোটানোর জন্য সুব্যবস্থা করে দেন। মুচকি হাসি এসে আপনার মুখে সৃষ্ট বিপদের দুশ্চিন্তাভাব দূর করে দেয়।
যদি কারও মন খারাপ দেখেন তাহলে তার মনটা ভালো করে দিন। তার ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য আল্লাহ্ যেন আপনাকেই ব্যবহার করেন। আপনার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকবে আর আপনি ঘুমাবেন তা যেন না হয়। ঘরের উয়তার মাঝে এমন অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকবেন না যেখানে শীতের বায়ুপ্রবাহ অনেক দুর্বল লোকের শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

হুইল চেয়ার

এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা ঘটনা। এক বৃদ্ধা হারামের হাজীদের সমাগমের মাঝে হুইল চেয়ারে করে যাচ্ছিলেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন একদম। শরীরের চামড়া কুঁচকে গেছে। আমার বন্ধুটি যেন ওই বৃদ্ধার মাঝে তার মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। সে বৃদ্ধার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কাঁদল। তারপর পকেট থেকে সব টাকা-পয়সা বের করে বৃদ্ধাকে দিয়ে দিল। বৃদ্ধার জন্য দুঃখে তার অন্তরটা ফেটে যাচ্ছিল।
বন্ধু বলল, 'আমার মাথায়ই আসেনি যে, ওই বৃদ্ধার প্রতি আমি দয়া করছি বা আমাকে মহান আল্লাহ্ এর প্রতিদান দেবেন। আমার মনের কোণে যে ফাটল ধরেছিল তা আমি ঠিক করছিলাম; কিন্তু পারছিলাম না। ওই মাসটা যেতে-না-যেতেই আমার ব্যাংক একাউন্টে বিশাল পরিমাণ অর্থ এসে হাজির।'
আপনি দুর্বলদের ভাঙন রোধ করবেন আর আল্লাহ্ আপনাকে প্রতিদান দেবেন না-এমনটা ভাবছেন কীভাবে? তিনি যে প্রতিদান প্রদানকারী সুপ্রশংসিত আল্লাহ্।
অন্যেরা যদি বিষ হয় তবে আপনি ঔষধ হোন।
তারা যদি তিক্ত হয় তবে আপনি মিষ্ট হোন।
আপনি হয়ে যান সেই জানালা-যা দিয়ে সুবাতাস ঘরে প্রবেশ করে। আর সেই সুবাতাস কঠিন জীবনের ধোঁয়াশায় অভ্যস্ত হৃদয়গুলোকে প্রশান্তি এনে দেয়। আপনি মহিমান্বিত আল্লাহর এ গুণে গুণান্বিত হোন। উপরের হাত হয়ে যান-যে হাত দান করে।
নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থ ইহুদীকে দেখতে গিয়েছেন।
আবু বাক্স আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু 'আনহু অন্ধ মহিলার ঘর ঝাড়ু দিয়েছেন। তার খাবার রান্না করে দিয়েছেন।
'আব্দুল্লাহ্ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ্ মারা গেলেন। পরদিন থেকে শহরের দরিদ্ররা সকালে দুয়ারের সামনে আর খাবার পেল না। তারা তার মৃত্যুর পর জানতে পারল যে, এ খাবার 'আব্দুল্লাহ্ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ্ দিতেন।
ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-র এক শত্রু মারা গেল। লোকজন শত্রুর মৃত্যু সংবাদ ইবনু তাইমিয়ার কাছে 'সুসংবাদ' হিসেবে নিয়ে এলে তিনি সংবাদ আনয়নকারী লোকদের প্রতি রেগে গেলেন। এরপর তিনি সেই শত্রুর পরিবার-পরিজনের কাছে গিয়ে তাদের সান্ত্বনা দিলেন। বললেন, 'আমি তোমাদের বাবার মতো। তোমাদের কিছু লাগলেই আমাকে খবর দেবে।'
তারা ব্যস্ত ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে। সে কাজ ছিল ভাঙন ধরা অন্তরগুলোতে জোড়া লাগানো। আল্লাহ্ তাদেরকে এ মহান সম্মানিত কাজে ব্যবহার করতেন।

তিরাশি

আমার এক বন্ধু মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে এক লোকের সাথে তার দেখা। লোকটা উমরাহ করতে এসেছে। লোকটা তার কাছে থানার ঠিকানা জানতে চাইল। বন্ধুটি বলল যে, সে খুব ব্যস্ত। কোনো একটা কোর্সের ক্লাস শুরু হয়ে যাচ্ছে। পরের সপ্তাহেই এই কোর্সের ওপর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এতদসত্ত্বেও আমার বন্ধুটি ওই লোকটিকে গাড়িতে ওঠাল যাতে কাছাকাছি কোথাও তাকে পৌঁছে দেওয়া যায়। গাড়িতে ওঠার পর লোকটি জানাল, সে হারামে এসে নিজ মানিব্যাগ, মোবাইল, টিকিটসহ আত্ম-পরিচিতিমূলক সব কিছুই হারিয়েছে। এখন সে অজ্ঞাতনামা। খেতে পারছে না। থাকারও জায়গা নেই। কারও সাথে যোগাযোগের সুযোগও নেই। লোকটি আমার বন্ধুকে বলল, 'আমি ক্লান্ত। তিন দিন ধরে আমি পথে পথে ভিক্ষা করছি আর রাস্তায় ঘুমাচ্ছি।' এতটুকু বলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তাকে খুব বিধ্বস্ত মনে হচ্ছিল।
আমার বন্ধু তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, 'আল্লাহ্ আপনাকে এ জিনিসগুলো থেকে এ জন্য বঞ্চিত করেননি যে, আপনি অন্যের কাছে হাত পাতবেন, ছোট হবেন। আপনি শুধু তাঁর জন্য সিজদা করুন। তাঁর কাছে চান। তিনি আপনাকে ভালোবেসে সব দেবেন। তারপর সে লোকটির হাতে ৮৩ রিয়াল ধরিয়ে দিল। তার পকেটে সর্বসাকুল্যে এ কয়টি রিয়ালই ছিল। লোকটির মুখে মুচকি হাসি ফোটার পর তাকে গাড়ি থেকে কাছাকাছি কোথাও রেখে এলো।
এক সপ্তাহ পরই তার পরীক্ষা। পরীক্ষা এত কঠিন হলো যে, সে তার প্রত্যাশামতো লিখতেই পারল না। লক্ষ্যে থাকা মার্ক যে পাবে না, একরকম নিশ্চিত জেনেই সে মানসিক প্রস্তুতি সেরে নিল। অথচ রেজাল্ট দিলে দেখা গেল, সে ১০০ এর মধ্যে ৮৩ পেয়েছে। ঠিক যে পরিমাণ অর্থ সে ওই লোককে সেদিন দিয়েছিল।
হ্যাঁ, এমন অনেক কিছুর অস্তিত্ব আপনি যতই অস্বীকার করতে যাবেন ততই স্পষ্ট হয়ে আপনার কাছে ধরা দেবে। যখনই আপনি তা আর শুনতে চাইবেন না তখনই আরও জোরে-শোরে আপনার কানে তার নাম পৌঁছবে। হ্যাঁ বন্ধু, তিনি হলেন আল্লাহ্। তিনিই আমাদের রব।
আল্লাহ্ তাকে ব্যবহার করলেন ওই 'উমরাহকারীর কষ্ট দূর করার মাধ্যম হিসেবে। তারপর তাকে তার প্রতিদানও দিয়ে দিলেন।

ভৃত্যের কক্ষ

সবাই যখন রাজাদের দরজায় কড়া নাড়বে তখন আপনি রাজাধিরাজের দরজায় কড়া নাড়বেন। সবাই যখন একজন গভর্নরের আঙিনায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াবে তখন আপনি মহান প্রভুর আঙিনায় সচকিত হয়ে দাঁড়াবেন।
সবাই যখন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যাবে, তখন আপনি রাতে জেগে সালাত আদায় করবেন আর বলবেন, 'আল্লাহ্।'
তাঁর হাতেই মুক্তির চাবিকাঠি। তাঁর কাছে রয়েছে সুস্থতার এক অমূল্য ভাণ্ডার। এ ভাণ্ডার কোথায় জানেন? রাজাধিরাজ আল্লাহর কাছে।
( وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا عِندَنَا خَزَابِنُهُ )
আর আমাদের কাছেই আছে প্রতিটি বস্তুর ভাণ্ডার।[১]
সুখেরও ভাণ্ডার আছে। আছে নিরাপত্তারও। একইভাবে স্বস্তি, সন্তুষ্টি এগুলোরও ভাণ্ডার আছে। যার হাতে সবকিছুর ভাণ্ডার, সবকিছুর মালিকানা তাকে ছেড়ে আপনি কি এমন কারও 'ইবাদাত করবেন, যে নিজের ভালো-খারাপ কিছুই করতে পারে না, জীবন-মৃত্যুরও ফয়সালা দিতে পারে না?
কতই না হাস্যকর হবে, যদি কোনো লোক দুনিয়ার কোনো এক রাজার সাথে দেখা করতে গিয়ে তার সাথে কথা না বলে তার ভৃত্যের কক্ষে গিয়ে ভৃত্যের সাথে আড্ডা জমায়।
আমরা তো এর চেয়েও হাস্যকর কাজ করছি। আমরা দুনিয়া-আখিরাতের রাজার কাছে চাওয়া বাদ দিয়ে সুদূর ওয়াশিংটন বা ইংল্যান্ডে ডাক্তারদের কাছে ছুটি। কয়েক মাস কষ্ট করে, পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্যয় করে তারপর ফিরে আসি।
না, চিকিৎসা করা দোষের না। এটা শারী'য়াতসম্মত; কিন্তু সৃষ্টির সাথে সম্পর্ক গভীর হওয়া আর স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া-এখানেই যত সমস্যা।

স্বপ্ন ... আর স্মৃতি

কিছুদিন 'আল-জাব্বার' তথা মহিমান্বিতের ছায়ায় কাটান। আপনার শরীরের ক্ষতগুলোতে তাঁর নামের অর্থপরশ বুলিয়ে দিন। তাঁর নামকে বানিয়ে নিন আপনার আত্মার সকল ব্যথার উপশম। এ নামে আপনার ভেতরে ফুটিয়ে তুলুন আনন্দের ফুল। এ নাম নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যান আর মনের ভেতরের নিঃসঙ্গতাকে দূর করে দিন।
আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তায়েফ থেকে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে এলেন। নির্বোধগুলো তার পবিত্র পা দুটো প্রস্তরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। রাজাধিরাজ, দুনিয়া-আখিরাতের রাজা আল্লাহ্ তাকে দেখছেন। দেখছেন তাঁর হাবীবকে। তাঁর হাবীবের আকুতিভরা হৃদয়কে। এজন্য জিবরা'ঈল 'আলাইহিস সালাম এবং তার সাথে পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দিলেন-যেন এ কষ্টের অবসান হয়। আল্লাহ্ পাহাড়ের ফেরেশতাকে এক বিশেষ কাজে পাঠালেন। এ কাজ ছিল তায়েফের সুউচ্চ পাহাড় কাঁপিয়ে দেওয়া।
পাহাড়ের ফেরেশতা নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তার দিকে তাকালেন। দেখলেন, তিনি দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত। 'কারনুস সা'আলিব'-এ এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের হুঁশ ফিরল। দেখতে পেলেন, তার সামনে পাহাড়ের ফেরেশতা দণ্ডায়মান। পাহাড়ের ফেরেশতা বলছেন, 'মুহাম্মাদ, আল্লাহ্ আমাকে নির্দেশ করেছেন আপনার আদেশ মানার জন্য। আপনি চাইলে আমি দুই পাহাড়ের মাঝে তায়েফবাসীকে পিষ্ট করে দিতে পারি।'[১]
আল্লাহ্ যদি আপনার ব্যথার উপশম চান, তাহলে গোটা একটা শহরও তিনি ধ্বংস করে দিতে পারেন কেবল আপনারই জন্য; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটা চাননি। তিনি আল্লাহর কাছে তায়েফবাসীর জন্য ক্ষমা চাইলেন। তাদের প্রতি দয়ার্দ্র হলেন।
যখন বিদ্রুপের চাবুক নূহের হৃদয়ে আঘাত করেছিল তখন তিনি আসমানের দিকে তাকিয়ে নিরীহ গলায় তার রবের কাছে বলেছিলেন-
أَنِّي مَغْلُوبٌ فَانتَصِرْ
আমি পরাভূত (হে আমার রব)। আমাকে সাহায্য করুন।[২]
নূহ 'আলাইহিস সালামের আওয়াজের সাথে সাথে আসমানের দরজা খুলে গেল। নেমে এলো মুষলধারে বৃষ্টি। আল্লাহ্ তার নাবীর জন্য পুরো একটি কওমকে পানিতে ডুবিয়ে দিলেন।
আল্লাহ্ ছাড়া আর কে আছেন, যিনি এ রকম অন্তরের ক্ষত উপশম করতে পারেন?
কিছু লোক আছে, যাদের কাজই হলো, তারা মানসিকভাবে আপনাকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। আপনাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করবে। আপনাকে বন্ধুদের সামনে ছোট করবে। এক 'আল-জাব্বার' যদি না থাকতেন তাহলে তাদের চক্রান্ত আপনাকে পিষে ফেলত।
তারা আপনার দু'চোখে ঢুকে আপনার স্বপ্নগুলো চুরি করতে চায়। আপনার অন্তরে প্রবেশ করে স্মৃতিগুলো মুছে ফেলতে চায়। তবে যখনই আপনার একটা স্বপ্ন নিভে যায় তখনই আল্লাহ্ আপনার জন্য আরেকটা স্বপ্ন সৃষ্টি করে দেন। যখনই আপনার হৃদয় থেকে একটা স্মৃতি মুছে যায় তখনই আল্লাহ্ আরেকটা স্মৃতি আপনার মনে উদিত করেন।

এক কাপ কফি

'আল-জাব্বার' তথা মহিমান্বিত প্রভু অনেক উপশম, ব্যথানাশক ঔষধ আর ড্রেসিং রেখে দিয়েছেন আমাদের জীবনে। এর কিছু কিছু আমরা জানি বটে; কিন্তু অধিকাংশই আমরা জানি না। তবে এর সবই আল্লাহ্ এ বিশ্বজগতে শুধু আপনারই জন্য সৃষ্টি করেছেন। যেন আপনার মুখে হাসি ফোটে। আর আপনি সম্মানিত জীবনযাপন করতে পারেন। এরই সাথে নিমগ্ন হয়ে পড়তে পারেন আল্লাহ্র 'ইবাদাতে'।
আমরা যখন উপশমকারী ঔষধ গ্রহণ করি, সুষম খাবার খাই আর পরিষ্কার পানি পান করি তখন ক্ষত দূর হয়ে যায়।
যখন অন্যের মুখে মুচকি হাসি দেখি, যখন অন্য কেউ আমাদের কাঁধে হাত বুলিয়ে দেয় বা কারও কাছে ভালো কথা শুনি, তখন আমাদের আত্মা শান্তি পায়।
আমরা যখন এমন কাউকে পাই, যে আমাদের অন্তর থেকে ভালোবাসে, যে আমাদের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেয় আর যার সাথে এক কাপ কফি পান করতে পারি তখন খুবই আনন্দ পাই।
এমন অনেক কিছু আছে যেগুলো দেখলে আমাদের ভেতরের ক্ষতগুলো মুছে যায়। যেমন- প্রাকৃতিক দৃশ্য, ঝর্ণার প্রবাহ, পাখি তার ছানাকে খাওয়াচ্ছে এমন দৃশ্য।
অনুরূপ সালাত আমাদের অন্তরে জেগে ওঠা হতাশার গহ্বরকে ঢেকে ফেলে। 'সুবহানা রব্বিয়াল 'আযীম'-এমন এক আনন্দ তৈরি করে-যার স্বাদ আমরা জিহ্বায় পাই। 'সুবহানা রব্বিয়াল আ'লা' আমাদের আরশে উত্থিত করে।
শীতল জীবনে মায়ের দু'আ এনে দেয় উন্নতার ছোঁয়া। বন্ধুকে দেখতে যাওয়া জীবনের কোলাহলের মাঝে বিনোদন দেয়। প্রতিবেশী যখন আপনার খোঁজখবর নেয় তখন আপনার ভেতরের মলিন সত্তা রঙিন হয়ে ওঠে। অরেঞ্জ জুস আপনাকে মুচকি হাসায়। টুকরো মিষ্টি আলাদা স্বাদ এনে দেয়। গরম পানির গোসল সব ক্লান্তি মুছে দেয়।
এ জীবন উপশমের পন্থায় ভর্তি। আমাদের রব আমাদের সুখী করতে চান। আমাদের মুচকি হাসাতে চান। আমরা যেন সুন্দর জীবন যাপন করি—এটাই তাঁর চাওয়া।

সিজদাবনত হোন

কোন জিনিস আপনাকে আল্লাহ্ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে? তাওবাকারী, ক্রন্দনকারী এবং গভীর রাতে তিলাওয়াতকারীদের দলে যোগ দিতে কীসে আপনাকে আটকে রাখছে?
মায়ের পেটে বাচ্চার আকৃতি আল্লাহ্ জন্য সিজদারত ব্যক্তির আকৃতির মতোই।
মায়ের পেটে আপনি যেমন সিজদারত ছিলেন, তেমন সারাটা জীবনভর আপনি সিজদারত থাকুন। তবেই আল্লাহ্ আপনার রিষ্কের জন্য যথেষ্ট হবেন। আপনার জন্য সবচেয়ে সংকীর্ণ জায়গাটাও প্রশস্ত করে দেবেন। আপনাকে আচ্ছাদিত করবেন তাঁর রাহমাতে।
আপনি অন্তর দিয়ে সিজদারত হোন যদিও আপনার মাথা উঁচু থাকে।
হৃৎকম্পন দিয়ে বলুন—'রব্বিয়াল আ'লা' যদিও আপনার মুখে হাসি ফুটে থাকে।
আপনার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা যেন ফিসফিস করে বলে, 'হে ক্ষতসমূহের উপশমকারী প্রভু, আমার সব ভাঙন রোধ করে দিন।' তারপর অবাক হয়ে দেখুন এক অলৌকিক কাণ্ড;-আপনার আত্মা আবার সচল হয়ে উঠছে।
আল্লাহ্, আপনি আমাদের হৃদয়-ক্ষত মুছে দিন। আমাদের শরীরের ভাঙন রোধ করে দিন। আপনি তো সব কিছু করার ক্ষমতা রাখেন।

টিকাঃ
[১] তিরমিযী, ২৮৪
[১] সূরা ত-হা, ২০ : ২৭-২৮
[১] সূরা হিজর, ১৫: ২১
[১] মূল ঘটনা সহীহ বুখারীতে (৩২৩১-৪/১১৫) ও সহীহ মুসলিমে (১৭৯৫ – ৩/১৪২০) আছে।
[২] সূরা কামার, ৫৪: ১০

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-হাদী তথা পথপ্রদর্শক

📄 আল-হাদী তথা পথপ্রদর্শক


আপনি অমুকের ছেলে অমুক বলেই তিনি আপনাকে পথ দেখাবেন না; বরং তিনি আপনাকে পথ দেখাতে চান বলেই আপনাকে পথ দেখাবেন।
‘তিনি যাকে চান তাকে সরলপথ দেখান।’

আল-হাদী তথা পথপ্রদর্শক

আপনি কি দিকভ্রান্ত? ভুল থেকে সঠিক আলাদা করা কি আপনার কাছে অসম্ভব লাগছে? আপনার কি একই সাথে দুটি চাকরি জুটেছে—যার কোনটা ভালো কোনটা মন্দ তা নির্ণয় করতে পারছেন না? আপনি কি দু'জন নারীর বৈশিষ্ট্যের মাঝে তুলনা করে কাকে বিবাহ করবেন সে সিদ্ধান্তে সংশয়গ্রস্ত? আপনি কি ধ্বংসের শেষ সীমায় পৌঁছে হিদায়াতের অপেক্ষা করছেন? তাহলে আল্লাহ্র নাম ‘আল-হাদী’ তথা পথপ্রদর্শকের সাথে নতুন এক অধ্যায় শুরু করা যাক।
আল্লাহ্র এই মহান নামের সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। আপনার মাঝে জেগে ওঠা বিভ্রান্তিকে থামিয়ে দিতে এ নামকেই বানিয়ে নিন আপনার পথপ্রদর্শক। এ নাম আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে সিরাতুল মুসতাকীমের দিকে।

উন্নতা

হিদায়াতের আভিধানিক অর্থ হলো ঝুঁকে পড়া। হিদায়াত হলো খারাপ থেকে ভালোর দিকে ঝুঁকে যাওয়া, ভুল পথ ছেড়ে সঠিক পথের যাত্রী হওয়া; অথবা যাযাবর জীবন-যাপন ছেড়ে জীবনের মূল-গতি ফিরিয়ে আনা।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনাকে পথ দেখান। আপনাকে পথভ্রষ্টতা থেকে মুক্তি দিয়ে সঠিক পথের দিশা দেন। অন্ধকার গলি থেকে আলোর মূল সড়কের দিকে আপনাকে পরিচালিত করেন।
তিনি যেমন আপনাকে পথ দেখান, তেমনই আপনার প্রয়োজনীয় বস্তুকে দেখান আপনার পথ। যেসব জিনিস আপনার জীবনের জন্য অপরিহার্য—সেগুলো আপনার কাছে পৌঁছে দেন তিনি। আপনি যমীনের যে স্থানে বাস করেন, সেখানে তিনি পৌঁছে দেন পানি, খাদ্যের যোগান আর ফুসফুসের জন্য সরবরাহ করেন প্রয়োজনীয় বাতাস।
তিনি তাঁর সকল সৃষ্টিকে তাদের অবস্থা অনুযায়ী হিদায়াত দেন। অন্ধকে পথে চলার হিদায়াত দেন। বধিরকে কথা বোঝার ব্যবস্থা করে হিদায়াত দেন। অক্ষমকে নিজ গন্তব্যে পৌঁছতে সাহায্য করে হিদায়াত দেন। শিশুকে ক্ষতিকর বস্তু থেকে দূরে রাখার হিদায়াত দেন।
যেসব প্রাণী মুক, তাদের অন্তরে তিনি এমন বুঝ দিয়ে দেন, তারা জীবনধারণের জন্য যা যা লাগে—তা জেনে যায়। যেগুলো তাদের জন্য উপকারী সেগুলো তারা নেয়, যেগুলো ক্ষতিকর সেগুলো বর্জন করে আর বিপদাপদের মোকাবেলা করে। এভাবে তিনি তাদের পথ দেখান।
আল্লাহ্ মরুভূমির উদ্ভ্রান্ত পথিককে পথ চিনিয়ে দেন। অনুসন্ধিৎসু পাঠককে দেখিয়ে দেন তথ্যের মূল উৎস। বিজ্ঞানীকে দেখিয়ে দেন আবিষ্কারের পদ্ধতি। মুজতাহিদকে দেখিয়ে দেন মাস'আলার দলীল-প্রমাণ। দ্বীনের দা'ঈকে দেখিয়ে দেন সর্বোত্তম পথা। আর বাবাকে দেখিয়ে দেন আপন সন্তানকে উপদেশ দেওয়ার সর্বোত্তম উপায়।

কাকতালীয় না!

তিনি আপনাকে এমনভাবে পথ দেখান—যেটা আপনার কাছে কাকতালীয় মনে হয়। সালাতের সামান্য একটি আয়াত শুনিয়েও তিনি আপনাকে পথ দেখান। নিদ্রায় একটি স্বপ্নের মাধ্যমেও তিনি আপনাকে পথ দেখান। আপনাকে পথ দেখান তিনি হৃদয়স্পর্শী উপদেশের মাধ্যমে। হয়তো-বা কোনো বইয়ের একটি লাইনে আপনার নযর পড়ে, তার মাধ্যমেই আপনাকে তিনি দেখিয়ে দেন পথ। সামান্য একটু ভাববেন, তাতেই আল্লাহ্ পথ দেখাবেন। একঝলক ভাবনা, যা চিন্তার গভীরে যাবার আগেই আপনাকে তিনি পথ দেখাবেন। আপনাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলবেন, তাতে আপনি সঠিক পথের দিকে ছুটে যাবেন—এভাবেই তিনি পথ দেখান। ভয় দেখিয়ে পথ দেখান। ভালোবাসা দিয়ে পথ দেখান। মৃত্যুর মাধ্যমেও পথ দেখান।
তবে কুর'আন শুনে পথ খুঁজে পাওয়া—এটাই মূল হিদায়াত। এর মাধ্যমেই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর বান্দাদের হিদায়াতের সবচেয়ে বেশি ব্যবস্থা করেছেন। এই কুর'আনেই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা রেখেছেন হিদায়াতের সকল মাধ্যম—
إِنَّ هَذَا الْقُرْءَانَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ
এ কুর'আন সে পথেররই হিদায়াত দেয়—যা সরল, সুদৃঢ়।[১]
'উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-র ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সবার জানা। তিনি তার বোনের ঘরে ঢুকলেন। তার দু'চোখ থেকে তখন ঘৃণার আগুন ঝরছিল; কিন্তু এক টুকরো কাগজে লেখা সূরা ত-হা পড়লেন। তার হৃদয় 'ঈমানের মেহরাবে সিজদা করল। সেই যে সিজদা করলেন, মৃত্যু পর্যন্ত তা আর তুললেন না।
তখন তার অনুভূতি কেমন হয়েছিল? তার অন্তরে কী পরিমাণ দৃঢ়তা এসেছিল? কুর'আনের এমন কত আয়াত আছে যা নিয়ে চিন্তা করা আমরা ছেড়ে দিয়েছি। কুর'আনের এমন কত নির্দেশনা আছে যা আমাদের তালাবদ্ধ হৃদয়ে প্রভাব ফেলছে না?

লা লা

হিদায়াতের আরেক নিদর্শন হলো-আপনি এমন স্বপ্ন দেখবেন, যাতে আপনার সুস্থতার উপায় বাতলে দেওয়া হবে, সতর্কবার্তা থাকবে অথবা ভালো নির্দেশনা থাকবে। যেমন: একজন রোগী একবার স্বপ্নে দেখলেন, তার সুস্থতা হচ্ছে 'লা লা' এ শব্দ দুটিতে। সে এক শাইখকে গিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করল। শাইখ এই স্বপ্নের কোনো সন্তোষজনক জবাব খুঁজে পেলেন না। তবে তিনি দুই দিনে একবার কুর'আন খতম করবেন বলে মনস্থির করলেন। তিনি ভাবলেন, কুর'আন পড়তে গিয়ে হয়তো স্বপ্নের ব্যাখ্যা পেয়ে যাবেন। দু'দিন পর রোগী শাইখের কাছে গেলে তিনি বললেন, 'আপনার সুস্থতা যাইতুন বৃক্ষে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সূরা নূরে বলেছেন-
يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ *
এটি এমন একটি বারকাতময় গাছ থেকে প্রজ্জ্বলিত হয় যা না (লা) পশ্চিমে না (লা) পূর্বে অবস্থিত [১]
এ পথপ্রাপ্তি একটি স্বপ্নের মাধ্যমে হয়েছে।
হিদায়াতের আরেকটা প্রকার হলো-যা স্বপ্নের মাধ্যমে ব্যাখ্যাসাপেক্ষ নির্দেশনা পাওয়ার সাথে মেলে। তা হলো এমন কিছু ভালো কাজ করা যা অসুস্থ ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে যায়।
একলোক এক 'আলিমের কাছে এসে এসাইটিস রোগে আক্রান্ত থাকার কথা জানাল। এই রোগ হলে মানুষের পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং রক্তচলাচল থেমে যায়। কখনো কখনো মানুষ মারাও যায়। তিনি তাকে একটা কূপ খনন করে ওয়াকফ করতে বললেন। লোকটা কূপ খনন করার পরই সুস্থ হয়ে গেল।
এই 'আলিম জানতেন, শরীরের মাঝে রক্তের প্রবাহ থেমে যাওয়া আর যমীনে পানি আটকে থাকার মাঝে একটা মিল আছে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই সৎকাজ (কূপ খনন) তার অসুস্থতার সাথে মেলে। আর এ কাজ করলেই সে সুস্থ হবে।
এক বন্ধু একটা ঘটনা জানাল। একবার সে গাড়িতে করে সালাতে যাচ্ছিল। বেখেয়ালে তার দুই বছর বয়সী ভাতিজীকে গাড়ি চাপা দিয়ে চলে গেল। তার বাবা তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে গেল। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে চলে গেল বাচ্চাটা। ডাক্তাররা জানাল, তার মৃত্যুর সম্ভাবনা আশি শতাংশ।
এ সময় আমার বন্ধুর এক চাচাতো ভাই তাকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করল। তাকে একটি বকরি যবেহ করে সুস্থতার নিয়্যাতে তার গোশত সাদাকাহ করতে বলল। চাচাতো ভাইয়ের কথামতোই সে সব কিছু করল। পরের দিন ভোরবেলাই আই.সি.ইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) থেকে সুস্থ অবস্থায় বেরিয়ে এলো বাচ্চাটি।
আল্লাহ্ সুবহানাহু তার চাচাতো ভাইকে সাদাকাহকৃত মাংস আর বাচ্চার থেঁতলে যাওয়া মাংসের মাঝে মিল খুঁজে পাওয়ার পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। তাই তো ডাক্তারদের চিন্তারও বাইরে থেকে সুস্থতা চলে এলো।
সদুপদেশের মাধ্যমে সুপথপ্রাপ্তি হতে পারে। এক গায়কের সুকণ্ঠ ছিল। তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক সৎকর্মশীল বান্দা। তিনি তাকে বললেন, 'আপনার কণ্ঠ তো বেশ সুন্দর। আপনি যদি কুর'আন সুর করে পড়তেন তাহলে কত ভালো হতো।' লোকটি তখনই তাওবা করল।
সদুপদেশের মাধ্যমে সুপথপ্রাপ্তির ক্ষেত্রটা সুবিশাল ও সুবিস্তৃত। এর উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না।
হিদায়াত আসতে পারে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো সায়্যিদুনা ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম। তিনি রাতের অন্ধকারে নক্ষত্র দেখে তাকেই প্রভু মনে করেছিলেন। এ ঘটনা সবারই জানা। সৃষ্টিজগত সম্পর্কে একটু গভীর ভাবনাই হয়েছে তার হিদায়াতপ্রাপ্তি ও দৃঢ়বিশ্বাস অর্জনের কারণ।

আলোর ঝলক

তিনি সুউচ্চ আসমান থেকে পথহারাদের দেখেন। বিভ্রান্তির উপত্যকায় তাদের বিচরণ পরিলক্ষিত হয়। এরই মাঝে তিনি একঝলক আলো জ্বালিয়ে দেন। এ আলোতে তারা পথ খুঁজে পায়। তারা দ্বীনের ওপর দৃঢ়তা ফিরে পায়।
আপনি অমুকের ছেলে অমুক বলেই যে তিনি আপনাকে হিদায়াত দেন এমন না; বরং তিনি আপনাকে হিদায়াত দিতে চান বলেই হিদায়াত দেন।
يَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
তিনি যাকে চান তাকে সরলপথের দিকে হিদায়াত দেন [১]
আপনি আপনার অন্তরটা বিশুদ্ধ করে এই দামী ইচ্ছে অর্জনে ছুটে চলুন।
তিনি আপনাকে হিদায়াত দেবেন। তারপর আপনি ওই হিদায়াতপ্রাপ্তির ফলে যে শুকরিয়া ও 'আমাল করা দরকার তা যথাযথভাবে না করলে আবার হিদায়াত ফিরিয়েও নেবেন। সেই লোকের মতো, যাকে আল্লাহ্ তাঁর এক নিদর্শন দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন; কিন্তু 'সে তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অতঃপর শাইতান তার পেছনে লাগে আর সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।'
তিনি হয়তো আপনাকে হিদায়াত দেবেন। আপনি এর শুকরিয়া করবেন, এ অনুসারে 'আমাল করবেন। ফলে তিনি আপনাকে আরও বেশি করে হিদায়াত দেবেন। আপনি তারও শুকরিয়া করবেন এবং সে অনুযায়ী 'আমালও করবেন। তিনি আপনাকে তৃতীয়, চতুর্থ-এভাবে আরও হিদায়াত দিয়েই যাবেন। আপনার জীবন হয়ে যাবে তাঁরই কিছু হিদায়াতবার্তার মেলবন্ধন।
এই যে গুহাবাসী যুবকেরা; আল্লাহ্ তাদেরকে মু'মিন বানিয়ে হিদায়াত দিলেন। তারপর তাদেরকে 'ঈমানের ওপর ধৈর্যধারণ করার মাধ্যমে আরেকবার হিদায়াত দিলেন। আবার বাঁচার পথ দেখিয়ে দিয়ে হিদায়াত দিলেন। অবশেষে তাদেরকে বাঁচার জন্য ব্যবস্থাও তৈরি করে দিয়ে হিদায়াত দিলেন; সে ব্যবস্থাটা ছিল বহু বছর গুহায় তাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখা। আল্লাহ্ সুবহানাহু তাদের ব্যাপারে বলেন-
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ نَبَأَهُم بِالْحَقِّ إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ ءَامَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَهُمْ هُدًى
নিশ্চয় তারা এমন কতিপয় যুবক-যারা তাদের রবের ওপর 'ঈমান এনেছিল আর আমরা তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।(১)

হারিয়ে যাওয়া কম্পাস

অন্ধকারাচ্ছন্ন মরুভূমির মাঝে আপনি। বুঝতে পারছেন না, কোথায় যাবেন। মরুভূমিতে পথ না জানার মানে হলো, নিশ্চিত মৃত্যু। কারণ, আপনার কোনো পাথেয় নেই, নেই কোনো বাহনও। হঠাৎ আপনার ভেতর জেগে উঠল এক প্রগাঢ় অনুভূতি। আপনার মন আপনাকে একদিকে অগ্রসর হতে বলল। আপনি তারকা দেখে পথ খুঁজে বের করতে পারেন না। আপনার কম্পাসটাও হারিয়ে গেছে। আপনার সহচররা আপনাকে ছাড়িয়ে গেছে। আপনার মন যেদিকে যেতে বলছে সেদিকে আপনি অগ্রসর হতে লাগলেন। মরুভূমি আপনাকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ খেলা করার পর আপনি দু'চোখ ভরে দেখতে পেলেন এক ঝলক আলো। সামনেই আপনার সহচররা। জীবনের শেষবিন্দুতে এসে আপনি দেখতে পেলেন তারা সাগ্রহে আপনার জন্য অপেক্ষারত।
বলুন তো, তখন আপনার অনুভূতি কেমন হবে? আপনার মনে হঠাৎ করে এ দিকটার কথা কীভাবে এলো? কেনই বা এলো? আর কী জন্যই বা এতটা নিখুত, এতটা সূক্ষ্ম হলো?
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সে সময় আপনার মনে উদিত হওয়া ভয়াল কম্পন দেখতে পাচ্ছিলেন। আপনার আত্মার আর্তনাদ তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। আপনার অন্তরে পিপাসায় মৃত্যুবরণের যে চিত্র ভেসে উঠেছিল—তা তাঁর জানা ছিল। তাই তো এক ঝলক আলো আপনার অন্তরে জ্বালিয়ে দিলেন; যার মাধ্যমে আপনি পথ খুঁজে পাবেন আর নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন।
আপনি এই অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি নিজের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করবেন না। কেননা, হয়তো আপনি এমনটার সম্মুখীন হননি। তবে এর কাছাকাছি বা এ রকম কিছুর সম্মুখীন অনেকেই সাধারণত হয়ে থাকে। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যে দুর্ভাবনায় পতিত আত্মায় আলোর এক ঝলকানির প্রয়োজন তাতে কে হিদায়াতের বাণী ছুঁড়ে দিল?
তিনি হলেন সেই মহান পথপ্রদর্শক আল্লাহ্।
যখন আপনাকে সৃষ্টিকর্তার রক্ষণাবেক্ষণ ঘিরে রাখে তখন আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন; কারণ, যে ঘটনাই ঘটুক তার জন্য আপনার নিরাপত্তা তো প্রস্তুত।
যখন সমুদ্রের ঢেউয়ের আন্দোলন আপনার নৌকা নিয়ে খেলায় মত্ত তখন তিনি বাতাসকে আদেশ দেন, যেন তা উত্তুরে হাওয়ায় পরিণত হয়। কারণ, আপনি যে দ্বীপে গেলে উদ্ধার পাবেন তা তো আপনার দক্ষিণে। আপনার নৌকার পাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত, যদি না পথপ্রদর্শক আল্লাহ্ ওই বায়ুপ্রবাহকে যথাযথভাবে সঞ্চালিত করতেন।
ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। একটি আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বিবিধ মতামত তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি এ নিয়ে দশটি তাফসীর পড়ছেন অথচ সঠিক ব্যাখ্যাটি বের করতে পারছেন না কোনোভাবেই। শেষে সিজদায় লুটিয়ে কপালটা ধূলো-মলিন করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'ওহে দাউদের শিক্ষক, আমাকে শেখান। ওহে সুলাইমানের বুঝদানকারী, আমাকে বোঝান।'
এরপর ঘরে ফিরে এলেন তিনি। এবার প্রভুর হিদায়াতের আলোয় তার বিবেক আলোকিত হয়ে সঠিক মতটা উদ্ভাসিত হয়ে ধরা দিলো তার কাছে।
একজন যুবকের নিকট যদি আল্লাহ্র থেকে কোনো সাহায্য না আসে তাহলে প্রথমেই তার পরিশ্রম অনর্থক হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে।

তিনিই সেই পথনির্দেশক

আল্লাহর এ পথনির্দেশ শুধু মানবজাতির সাথেই সম্পৃক্ত, তা নয়। আল্লাহ্ সকল সৃষ্টিকে পথ দেখান। মহান আল্লাহ্ বলেন-
قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ، ثُمَّ هَدَى *
মুসা বললেন, আমাদের রব তিনি, যিনি প্রতিটি বস্তুকে তাঁর সৃষ্টির আকৃতি দিয়েছেন। তারপর পথ নির্দেশ করেছেন [১]
শাইখ মুহাম্মাদ রাতেব আন-নাবুলসী এ হিদায়াতের সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে বলেন, স্যালমন ফিশ আটলান্টিক মহাসাগরের তীর থেকে আমেরিকার বিভিন্ন নদীর পতনস্থলে গিয়ে ডিম পেড়ে আবার সুস্থানে ফিরে আসে। কয়েকমাস পরে ছোট মাছগুলো ডিমফুটে সরাসরি মায়ের দিকে ছুটে আসে। শত শত কিলোমিটার দূরের পথ পাড়ি দিয়ে বাচ্চা মাছগুলো সাগরে তাদের মাকে ঠিকই খুঁজে বের করে। তবে তারা কিন্তু পথ হারায় না। কে সেই সত্তা, যিনি তাদেরকে পথ দেখান? তিনিই সেই সুমহান পথনির্দেশক আল্লাহ্।
একলোক দেখতে পেল, একটা বেজী মৃত সাপ খাচ্ছে। তারপর একটা উদ্ভিদের কাছে ছুটে গিয়ে সেখান থেকে পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে। বেজীটা সাপে এক কামড় দিচ্ছে তো উদ্ভিদের লতায় এক কামড় দিচ্ছে। লোকটা উদ্ভিদের লতায় কামড় দেওয়ার রহস্য জানতে আগ্রহী হলো। ফলে সে উদ্ভিদের লতাটা টেনে অন্যত্র ফেলে দিল। এবার বেজীটা যখন সাপে কামড় দিয়ে এসে উদ্ভিদের লতা খেতে এলো, দেখল সেখানে আর লতাটা নেই। এরপর লোকটা সবিস্ময়ে দেখল, কিছুক্ষণের মধ্যে বেজীটা বিষে লাফাতে লাফাতে মারা গেল।
কে সেই সত্তা, যিনি এই বেজীকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ উদ্ভিদের পাতায় সাঁপের বিষ-প্রতিরোধক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান? তিনি সেই মহীয়ান আল্লাহ্।'
নেকড়ে হরিণের ওপর আক্রমণ করে। হরিণ মাথাটা নিচু করে নেকড়ের গলায় শিং ঢুকিয়ে দেয়। কে তাকে জানাল যে, তার মাথায় এমন ধারালো ছুরি আছে? আর কেই বা তাকে জানাল, এ কাজ করলে সে রক্ষা পাবে? তিনি সেই পথনির্দেশক আল্লাহ্।
শৈশবে আমি নিজের বিড়ালকে দেখতাম, তার ছোট বাচ্চাগুলো— যেগুলো চোখেও দেখত না—তার দিকে ছুটে আসত। তার পেটে মাথাটা গুঁজে দিয়ে দুধপান করত। কে এই অবুঝ প্রাণীকে শেখালো যে, এ দুধ পান করেই তারা বাঁচবে আর তা না করলে মারা যাবে? তিনি সেই পথনির্দেশক সুমহান আল্লাহ্।

গহ্বর

তাঁর সবচেয়ে মহান পথনির্দেশনা হলো তাঁর বান্দাদেরকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনা। পথহারাদের পথ চিনিয়ে দেওয়া। পাপে জর্জরিত যাদের আত্মা, তাদের জন্য তাওবার দরজা খুলে দেওয়া।
একলোক গহীন অন্ধকার রাতে বের হলো। তার ইচ্ছে হলো, রাজাধিরাজ আল্লাহর অবাধ্যতা করবে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ছুটে চলেছে পাপের কাদায় নেমে পড়ার জন্য; কিন্তু চূড়ান্ত মুহূর্তে আল্লাহ্ তার অন্তরে হিদায়াত পৌঁছানোর আদেশ দিলেন। সে পাপের গহ্বরে পৌঁছানোর পূর্বেই হঠাৎ তার চোখের সামনে নির্মিত কালো রঙের স্বপ্নগুলো বিবর্ণ হতে থাকে। এক তীব্র স্রোত এসে তা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। চারদিকে সব উড়ে যেতে থাকে। সে তার অনুভূতির আঙিনায় ভিন্ন পদক্ষেপ অনুভব করতে পারে। তখন সে অন্য দিকে তাকায়। এটা সেই গহ্বরের দিক না। এ দিক থেকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মিনারের মাসজিদ। পথনির্দেশক আল্লাহর সাথে তার জীবনের নতুন এক ধাপের অবতারণা ঘটে।

এক টুকরো কাগজ

আল্লাহ্ যদি আপনাকে পথ দেখাতে চান, তাহলে রাস্তায় পড়ে থাকা এক টুকরো কাগজ দিয়েও সেটা করাতে পারেন।
একলোক মদ পান করে মাতাল অবস্থায় রাস্তায় হেলেদুলে হাঁটছিল। হঠাৎ মাদকতায় নুয়ে পড়া দু'চোখে দেখতে পেল, রাস্তায় পড়ে আছে এক টুকরো কাগজ। কাগজে আল্লাহ্র নাম লেখা। এটা দেখামাত্র তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ডুকরে উঠে বলল, 'আল্লাহর নাম রাস্তায় পড়ে আছে।' কাগজটা তুলে নিল সে। ঘরে গিয়ে সেটি পরিষ্কার করে তাতে সুগন্ধি মেখে রেখে দিল। সেদিন স্বপ্নে দেখল কেউ তাকে বলছে, 'তুমি আমার নামকে ওপরে স্থান দিয়েছ। আমার মর্যাদার কসম, আমি তোমার নামকে উচ্চকিত করব।' ঘুম থেকে উঠে সে অন্তরে হিদায়াতের পরশ অনুভব করতে পেল। এভাবেই আল্লাহ উদ্দেশ্যহীন একজন সাধারণ মানুষ থেকে ইতিহাসের খ্যাতনামা একজন সৎকর্মশীল বান্দায় পরিণত করেন তাকে।
তিনি আপনাকে পথ দেখাতে চাইলে এক আওয়াজ শোনাবেন- 'আল্লাহকে ভয় করো।' আপনার অন্তরাত্মা জেগে উঠবে ভ্রান্তির ঘুম থেকে।
নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণিত ঘটনায় যে তিনজনের জন্য গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তাদের একজনের ঘটনা। সে অনেক দিন ধরে নিজের চাচাতো বোনের সাথে অপকর্ম সাধনের সুযোগ খুঁজতে থাকে। একদিন সেই সুযোগটা এসেও যায়। অপকর্ম সাধনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে চাচাতো বোন তাকে বলে, 'আল্লাহকে ভয় করো। আমার সতিত্বের মোহর শুধু এর অধিকারীকেই খুলতে দাও।' আল্লাহ্র ভয়ে সেদিন সে এই পাপাচার থেকে ফিরে আসে। 'আল্লাহকে ভয় করো' এ বাণী তার অন্তরে বিদ্যমান কামনা-বাসনাকে বিলীন করে দিয়েছিল।

নাজাতের রশি

আপনি ভুলে যাওয়ার জগতে ডুবে থাকেন, তিনি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেন। আপনি পাপের ঘুমে বিভোর হয়ে পড়েন, তিনি আপনাকে জাগিয়ে দেন। আপনি গভীর পাপকূপে পড়ে অপবিত্র হয়ে যান আর তিনি আপনাকে পবিত্র করে তোলেন। যখন কূপের তলানিতে পড়ে থাকেন আপনি তখন তিনি আপনার দিকে হিদায়াতের রশি ঝুলিয়ে দেন।
তিনি আপনাকে হিদায়াত দেন এমন ভালোবাসা দিয়ে যে, আপনার হৃদয় ভরে যায়; এমন ভয় দিয়ে, যাতে আপনার ভেতরটা কেঁপে ওঠে; এমন অসুস্থতা দিয়ে, যাতে আপনার অহংকার মুছে যায়; এমন মুখাপেক্ষী করে, যাতে আপনি অবনত হয়ে নাক ধুলোমলিন করে নিতে পারেন, এমন দারিদ্র্য দিয়ে, যাতে আপনি নুয়ে পড়েন অথবা এমন এক শূন্যতা দিয়ে, যাতে আপনার অন্তর কষ্ট পায়।
তিনি আপনাকে ফিরিয়ে নেন তাঁর দিকে। আলোর পথে। ফলে আগে আপনি দূর থেকে তাকিয়ে শুধু মাসজিদ দেখতেন; কিন্তু মাসজিদের হিদায়াতের বাণী আপনাকে স্পর্শ করত না। অথচ এখন সে মাসজিদেই আপনি নিয়মিত যাওয়া শুরু করে দিলেন। বহু বছর পরিত্যাগ করার পর তিনি আবার কুর'আনের মুসহাফ ধরতে শিখিয়ে দেন আপনার হাতকে। যে জিহ্বা দিয়ে অশালীন গান গাইতেন গুনগুন করে, সে জিহ্বাকে তিনি সিক্ত করে তোলেন তাঁর যিক্রে।
এক মাসজিদে যাওয়ার জন্য বের হলেন ঘর থেকে। হঠাৎ রাস্তা পরিবর্তন করে অন্য মাসজিদে চলে গেলেন। সালাতের পর শুনতে পেলেন, একজন দা'ঈ এমন বক্তব্য শোনাচ্ছেন-যা আপনার হৃদয়ে পরিবর্তনের ঢেউ জাগিয়ে তুলল। আপনি আপনার চলার পথ পরিবর্তন করে ফেললেন, এমনকি জীবনচলার পথও।
যে বান্দা জীবন্ত আত্মা ধারণ করে। সে আল্লাহ্র হিদায়াতের ব্যাখ্যা করতে পারে। সে জানে যে, এ নিখিল বিশ্ব আল্লাহ্রই 'ইবাদাত করে। আর আল্লাহ্ তাকে এ বিশ্বের যে কোনো কিছু দিয়েই পথ দেখাতে পারেন। আর-আল্লাহ্ না করুন-এ বিশ্বের যে কোনো কিছু দিয়েই তাকে আবার পথভ্রষ্টও করতে পারেন।
তবে আল্লাহ্ কাউকে পথভ্রষ্ট করবেন না। শুধু তাকেই করবেন, যে তার অন্তরকে হিদায়াত ও সঠিক দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
সুতরাং জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে যদি আল্লাহ্র কাছ থেকে হিদায়াত না পান।
কিছুক্ষণ আগে মরুভূমিতে পথ হারানোর যে উদাহরণটা দিলাম, তা মনে আছে আপনার? আল্লাহ্র পথ, মাসজিদ, 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি, 'আল্লাহুম্মা আন্তাস সালামু ওয়া মিনকাস সালামু'-এগুলো হারিয়ে ফেলা মরুভূমিতে পথ হারানোর থেকেও বিপদের। এই পথগুলো হারালে আমরা ওই পাখির মতো হয়ে যাবো, যে পাখি শীতকালে নিজের চলার নির্দিষ্ট পথ হারিয়ে ফেলেছে; ফলে বরফের দেশে বরফই তার উড়ন্ত স্বপ্নগুলোকে গিলে ফেলেছে।
আল্লাহ্, আপনি আমাদেরকে এমন পথনির্দেশনা দিন, যাতে আমরা মরুভূমির পথভ্রান্তি থেকে বাঁচতে পারি, আপনার কাছে পৌঁছতে পারি এবং আসমান-যমীনে বিস্তৃত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি।

টিকাঃ
[১] বানী ইসরা'ঈল, ১৭ : ০৯
[১] সূরা নূর, ২৪: ৩৫
[১] সূরা নূর, ২৪ : ৪৬
(১) সূরা কাহফ, ১৮ : ১৩
[১] সূরা ত-হা, ২০ : ৫০

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-গাফূর তথা মহা-ক্ষমাশীল

📄 আল-গাফূর তথা মহা-ক্ষমাশীল


মহা-ক্ষমাশীল সত্তা সবসময়ই ক্ষমা করে থাকেন। তিনি বদান্যতার মাধ্যমে ক্ষমা করেন। সাধারণ মানুষ যা ক্ষমা করে না-তা তিনি ক্ষমা করেন। আপনাকে অবাক করে দিয়েও তিনি ক্ষমা করেন।

আল-গাফুর তথা মহা-ক্ষমাশীল

আপনি গুনাহ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। অনুভব করছেন, গুনাহর অভিশাপ আপনার জীবনকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। অন্ধকার এক পর্দা আপনার দু'চোখে প্রজ্বলিত দিনরাত্রির আনন্দকে নিভিয়ে দিচ্ছে। আপনি অনুভব করছেন, সালাতে, দু'আয় এবং 'ইবাদাতে আপনি আর আগের মতো স্বাদ পান না। তাহলে জেনে রাখুন, এখনই সময় ক্ষমা আর নিভৃতালাপের। আল্লাহ্র মহান নাম 'আল-গাফুর' তথা মহা-ক্ষমাশীলের মাঝে ক্ষমার অর্থ খুঁজে পাওয়ার।
এখন আপনার প্রয়োজন ক্ষমার অর্থ জানা। আপনি জানবেন, আপনার রব কেমন ক্ষমাশীল, কেমন মার্জনাকারী। আর আপনার জন্য আবশ্যক হলো জীবনের প্রতিটি ধাপে এ ক্ষমার প্রয়োজনীয়তা বুঝে নেওয়া।

কারাগার

শরীর রোগাক্রান্ত হওয়ার চেয়ে আত্মা পাপাচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়াটাই বড় বিপদের। পাপের পদতলে আপনার আত্মা আর্তনাদ করছে। হ্যাঁ, আপনার শরীর পাপাচারের সময় হয়তো স্বাদ পায়; কিন্তু আপনার আত্মা তখন আল্লাহ্র কাছে পানাহ চায়।
একবার কল্পনা করুন, আপনি এক সংকীর্ণ কারাগারে আটক রয়েছেন, যেখানে প্রতিটা দেয়ালের প্রস্থ মাত্র এক মিটার। এ রকম একটা জায়গায় আপনি কী পরিমাণ শ্বাসরুদ্ধ অনুভব করবেন?
আপনি যখন গুনাহ করেন তখন আপনার আত্মাও এ রকম একটা কারাগারের মতো কারাগারে আবদ্ধ হয়ে পড়ে যেটা চারদিক থেকে ঘিরে রাখে আপনার আত্মাকে।
وَأَحَاطَتْ بِهِ، خَطِيئَتُهُ .
আর পাপসমূহ তাকে বেষ্টন করে।[১]
গুনাহগুলো তার আত্মাকে শ্বাসরোধ করে ফেলে। যদি জান্নাত বা জাহান্নাম কোনোটা নাও থাকত তবুও গুনাহই গনগনে আগুন আর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সমান হতো।
যেহেতু আমরা জানলাম, আল্লাহর মহান নামের মধ্যে রয়েছে মহা-ক্ষমাশীল, অতি-মার্জনাকারী, পাপমোচনকারী-এর মতো মহান নাম, তাঁর বৈশিষ্ট্যবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি গুনাহ মাফ করেন, অপরাধ ক্ষমা করেন, তাহলে আল্লাহর এ মহান নামের যিকিরের মাধ্যমে ধরে নিন, আপনার গুনাহগার আত্মার সংকীর্ণ কারাগারের দেয়ালেও ফাটল ধরা শুরু হলো।

আপনি কি জানেন?

আল্লাহ্র ওয়াস্তে বলছি, বলুন, 'আস্তাগফিরুল্লাহ্'।
শুধু বললে হবে না। অনুভব করুন, 'আস্তাগফিরুল্লাহ্'।
এর থেকে সুন্দর কোনো বাক্য কি থাকতে পারে, যা উচ্চারণ করা মাত্রই আপনার অন্তর থেকে সবধরনের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা ও ভয়ভীতি দূর হয়ে যাবে?
আপনি কি জানেন, যত বিপদই হোক, সেটা রোগ, দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা বা ব্যথা- সবই আপনার পাপের কারণেই এসেছে?
এই আয়াতটি পড়ুন-
وَ مَا أَصَبَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَ يَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ ﴿
আর তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তোমাদের হাত যা অর্জন করেছে তার কারণে এবং অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন [১]
গীবত, মিথ্যা, ধোঁকা, হিংসা, দুব্যবহার, মা-বাবার অবাধ্যতা, হারাম জিনিস দেখা, ফরয পালনে দেরী করা-এ সব আমাদের জীবনে বড় ধরনের দুঃখ-ব্যথা ও দুশ্চিন্তা নিয়ে এসেছে।
আমরা কারও কাছে ঋণ নেওয়ার জন্য শরীরের ঘাম ছোটাই। অর্থের প্রতি আমাদের এ মুখাপেক্ষিতা সৃষ্টির কারণ হয়তো আমাদেরই কোনো পাপ। আমরা যদি বিনয়ের সাথে 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' বলতাম তাহলে আল্লাহর সৃষ্টির সামনে বিনয়ী হয়ে চাওয়ার প্রয়োজন হতো না আমাদের।
আমরা মানসিক সংকীর্ণতা ও নানামুখি অস্বস্তিতে ভুগি। ভয় আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। তাই মনোরোগ-বিশেষজ্ঞের কাছে দৌড়াই। হয়তো আমাদের এ অবস্থার কারণ আমাদেরই সংঘটিত কোনো পাপকাজ। আমরা যদি সজীব অন্তর ও আল্লাহমুখী হৃদয় থেকে বলতাম- 'আস্তাগফিরুল্লাহ্', তাহলে আমাদের এত কিছুর প্রয়োজন হতো না।

আর আমার বিশ্বাসঘাতকতা?

আল্লাহ্ ক্ষমার নিদর্শন আমার সামনে এতটা স্পষ্ট, এতটা প্রকাশ্য হয়নি, যতটা হয়েছে সীরাতুন নাবীর পাতা উল্টাতে গিয়ে।
'উমার ইবনুল খাত্তাব (ইসলামগ্রহণের পূর্বে) মানুষকে দ্বীন থেকে দূরে সরানোর চেষ্টায় রত। শক্ত হাতে চাবুক ধরে আছেন। চাবুকের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছেন দাসীর পিঠ। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে নিজেই চাবুকাঘাত বন্ধ করে বলছেন— 'বিরক্তি ধরে আসায় এবারের মতো থামলাম।'
মুসলিমরা বিশ্বাস করত যে, খাত্তাবের গাধা ইসলাম গ্রহণ করলে তা বিশ্বাস করা যেতে পারে, কিন্তু 'উমারের ব্যাপারটা ছিল অসম্ভব। কারণ, ইসলামের প্রতি 'উমারের প্রবল শত্রুতা ও ঘৃণার কারণে লোকেরা এমনটাই ভাবত; কিন্তু মহা-ক্ষমাশীল আল্লাহ্ তার জন্য তাওবার দুয়ার খুলে দিলেন। তিনি পরিণত হলেন 'উমার ফারুক'-এ।
যে চাবুকাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করতেন দাস-দাসীদের, তার কী হলো? কোথায় গেল সেসব অপরাধ? আল্লাহ্ সবকিছু ক্ষমা করে দিলেন।
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু 'আনহু (ইসলামগ্রহণের পূর্বে) উহুদের যুদ্ধে মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনীর অবস্থানরত পাহাড়ে উঠলেন। তিনি পেছন থেকে অতর্কিত আক্রমণ করলে আব্দুল্লাহ্ ইবনু জুবাইর রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-সহ সেখানে থাকা তীরন্দাজ সাহাবীদের সবাই শহীদ হলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে পরিচালিত মুসলিম সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় পরাজয়ের মূল কারণ ছিলেন তিনিই। তার কারণেই নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ রক্তাক্ত হওয়ার কারণ তো খালিদ ইবনু ওয়ালিদই। যে রক্তপাতের দরুন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন—
اشتد غضب الله على قوم دموا وجه رسوله
ওই সম্প্রদায়ের ওপর আল্লাহর ক্রোধ আরও তীব্র হয়েছে যারা তাঁর রাসূলের মুখ রক্তাক্ত করেছে। [১]
কিন্তু আল্লাহ্ এ আয়াত নাযিল করলেন-
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ *
তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন বা শাস্তি দেবেন-এ বিষয়ে আপনার করণীয় কিছুই নেই; কারণ, তারা তো যালিম। [২]
পরবর্তী সময়ে এই খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-ই তাওবাকারীদের একজন হয়ে গেলেন, যাদেরকে আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন, মার্জনা করেছেন।
তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। মহা-ক্ষমাশীল আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। অতীতের সব অপকর্ম তিনি মুছে দিলেন।
উহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ের মূল কারণ থেকে তিনি হয়ে গেলেন আল্লাহ্র খোলা তরবারী।
তাহলে যে সব পবিত্র দেহের রক্ত তিনি ঝরিয়েছেন, শিরস্ত্রাণের ধারালো অংশ দিয়ে আঘাত করেছিলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র রক্ত ঝরিয়েছেন-এর সবই আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিলেন।
একলোক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলো। কৃত সকল পাপের বেদনায় তার হৃদয় কেঁদে চলেছে। সে বলল, 'আপনি সে লোকের ব্যাপারে কী বলবেন, যে সব রকম পাপের কাজই করেছে। একটাও বাদ রাখেনি। এ পাপকাজগুলো করার জন্য যেদিকেই প্রয়োজন সেদিকেই সে অগ্রসর হয়েছে। এ অবস্থায় তার কি তাওবার কোনো সুযোগ আছে?' রাহমাতের নাবী বললেন, 'তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ?' লোকটি বলল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল।' রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, তুমি সৎকাজ করবে আর খারাপ কাজ বর্জন করবে। আল্লাহ্ এর বিনিময়ে তোমার সব খারাপ কাজকে ভালো কাজে রূপান্তরিত করে দেবেন।' লোকটি বলল, 'আর আমার বিশ্বাসঘাতকতা? আর আমার পাপগুলো?' তিনি বললেন, 'তোমার বিশ্বাসঘাতকতা, তোমার পাপাচার। (এ সবই ভালো কাজে রূপান্তরিত হবে)'[১]

আপনি কি ভুলে গেছেন?

আপনার কেন মনে হচ্ছে, এ জগতে আপনার পাপই সবচেয়ে বড়? আপনি কি ভুলে গেছেন যে, আল্লাহ্ হলেন মহা-ক্ষমাশীল, অতি-স্নেহময়?
আপনি কি ভুলে গেছেন, আপনি তাওবা করলে তিনি খুশি হন?
সাহাবীরা দেখতে পেলেন, এক ভীত-সন্ত্রস্ত মহিলা বন্দীদের মাঝে নিজ সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সন্তানকে খুঁজে পেয়ে তাকে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল সে। তারপর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সন্তানকে চুম্বন করল। সাহাবীরা তার ভালোবাসা ও আনন্দ দেখে বিস্মিত হলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
الله أشد فرحا بتوبة عبده من هذه بولدها
এই মহিলা তার সন্তানকে খুঁজে পেয়ে যতটা খুশি, তার থেকে আল্লাহ্ আরও বেশি খুশি হন quando তাঁর বান্দা তাঁর কাছে ফিরে আসে, তাওবা করে।[২]
কীসের অপেক্ষা করছেন আপনি? এখনই বলুন, 'আস্তাগফিরুল্লাহ্।'
আপনার জিহ্বা দিয়ে বলুন। অন্তর দিয়ে বলুন। হৃদয় থেকে বলুন। যে গুনাহর ব্যাপারে আপনি মনে করেন যে, ক্ষমা অসম্ভব, সেই গুনাহর জন্যই বলুন, 'আস্তাগফিরুল্লাহ্।' আপনার ভেতরটা যেন চিৎকার করে 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' ডাকে। এ চিৎকারের মাধ্যমে দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে, মহা-ক্ষমাশীল আল্লাহ্ অবশ্যই আপনাকে ক্ষমা করবেন। আপনি চিৎকার করছেন সে কারণে নয়, বরং তিনি যে মহা-ক্ষমাশীল, অতি স্নেহময়-সে কারণেই।
আবু সুফিয়ান ইবনু হারব, সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া, 'ইকরামা ইবনু আবী জাহল, 'আমর ইবনুল 'আসসহ আরও অনেকে। তাদের পাপ ছিল-আল্লাহ্র সাথে শির্ক, দ্বীনের বিরুদ্ধে লড়াই, সাহাবীদের হত্যা করা। তারপরও মহা-ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু আল্লাহ্ তাদেরকে নিজ ক্ষমা দিয়ে বেষ্টন করে তাদেরকে সাহাবী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আপনি কি জানেন, 'সাহাবী' মানে কী? 'সাহাবী' মানে হলো নাবীদের পর শ্রেষ্ঠ মানুষ।
আল্লাহ্র এ ক্ষমা 'ইকরামা সাফওয়ান বা অন্যদেরকে কীসে রূপান্তরিত করল, দেখুন তো! ক্ষমাশীল আল্লাহ্র দয়া তাদের একেকজনকে 'সাহাবীদের হত্যাকারী' থেকে 'সম্মানিত সাহাবী'তে পরিবর্তিত করে দিল।
পাপের অনুভূতি যদি আপনার হৃদয়কে কাঁদায়। আপনার চিন্তায় কালিমা লেপন করে। আপনার কথাবার্তার গতিময়তায় ছেদ আনে। তখন হৃদয়ে যদি উচ্চারিত হয় 'আস্তাগফিরুল্লাহ্', দেখবেন সব কান্নাকাটি, গুনাহর কালিমা, নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

সেই তো সফল...

আল্লাহ্ সুবহানাহু 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' দিয়ে ক্ষমা করেন। ক্ষমা করেন তাওবার মাধ্যমে-
إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ )
তবে তারা ব্যতীত যারা তাওবা করেছে এবং নিজেকে শুধরে নিয়েছে; নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[১]
ক্ষমা করেন সৎকাজের মাধ্যমে-
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ )
নিশ্চয় ভালোকাজ বিদূরিত করে খারাপ কাজকে [২]
ক্ষমা করে দেন বিপদগ্রস্ত করে-
ما يزال البلاء بالمؤمن فى نفسه وولده وماله حتى يلقى الله تعالى وما عليه خطيئة
মু'মিনের নিজের জীবন, সন্তান, সম্পত্তি-এ সবকিছুর ওপর বিপদ এমনভাবে আসতেই থাকে যে, সে আল্লাহ্র সাথে যখন সাক্ষাৎ করে তখন তার কোনো পাপই থাকে না।[৩]
আপনি কি জানেন, দুনিয়ার এ জীবনে আপনার কী করা উচিত? যে জিনিস বার বার করেও আপনার বিরক্ত হওয়া সাজে না তা হলো 'ইস্তিগফার' পড়া। নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
طوبى لمن وجد في كتبه استغفارا كثيرا
সেই তো সফল, যার হিসাবের খাতায় বেশি ইস্তিগফার পাওয়া যাবে [৪]
আপনার হিসাবের খাতায় এত এত 'আস্তাগফিরুল্লাহ' দেখে আপনি যারপরনাই খুশি হবেন। আপনি উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠবেন-
هاؤم اقرءوا كتابيه
'নাও, আমার 'আমালনামা পড়ে দেখো [৫]'
কিয়ামতের দিন আপনি যখন আপনার বন্ধুদেরকে দেখবেন, তাদের সামনে নিজের ইস্তিগফারভর্তি খাতাটা মেলে ধরে বলবেন, 'দেখ তোমরা, আল্লাহ্ আমার এত এত 'ইস্তিগফার' কবুল করে নিয়েছেন। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।'
এ জন্য পাপের পরেই শুধু 'ইস্তিগফার' করতে হয় এমন না; বরং সৎকাজের পরও ইস্তিগফার করতে হয়।
সালাত আদায় শেষ হলেই কি আপনি 'আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ্, আস্তাগফিরুল্লাহ্' বলেন না? আপনার 'ইবাদাতগুলোয় যে ঘাটতি আছে তা তো 'ইস্তিগফার' ছাড়া পূর্ণই হয় না।

হতাশ হবেন না...

তিনি নিজের নাম 'গাফুর' তথা মহা-ক্ষমাশীল দিয়েছেন এ জন্য যে, তাঁর ক্ষমা ব্যতীত আপনি গুনাহর আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবেন। অপরাধের চাপে আপনি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়বেন। সারাক্ষণ কান্নাকাটি করতে বাধ্য হবেন।
যদি আপনি মনে করেন যে, আপনার গুনাহ বিশাল, যে শাইখের কাছে আপনি আপনার গুনাহ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, তিনি কিন্তু আপনার অসংখ্য পাপের বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কে চিন্তাও করতে পারেননি; বরং আপনার প্রশ্ন শুনেই উত্তর দিয়ে ফেলেছেন, তাহলে আপনি আপনার রবের কথা শুনুন। আদম 'আলাইহিস সালামের সময়কাল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত বান্দা যত পাপকাজ করবে তা তিনি জানেন। তিনি সকল পাপকাজের বিস্তারিত বিবরণ, পদক্ষেপ ও ভয়াবহতা সম্পর্কে জানেন। তিনি বলছেন-
قُلْ يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ- আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ্ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (১)
এবার কি মন থেকে দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে? যিনি এ কথা বলেছেন তিনি জানেন যে, আপনি এই এই দিনে এই এই পাপ কাজ করবেন। তারপরও তিনি বলেছেন যে, তিনি সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। আপনার গুনাহ নিশ্চয় আল্লাহর ক্ষমা থেকে বড় নয়। নিশ্চয় আল্লাহ্র অনুগ্রহ থেকে বিশাল নয়।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আপনি পাপকাজ করে ফেললেই সাথে সাথে 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' বলে ফেলবেন। পাপকাজে লিপ্ত হয়েছেন-মনে পড়ামাত্রই আপনি থেমে যাবেন। আল্লাহ্ বলেন-
فَإِنِ انتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴾
যদি তারা বিরত থাকে তবে আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[১]
আপনি কীভাবে বলতে পারেন- 'আমার গুনাহ ক্ষমা করুন।' অথচ আপনি তখনো গুনাহর ওপর অটল? কীভাবে আপনি পাপ মোচন করে আবার নিজের হিসাবের খাতায় তা লিখবেন? পাপের এ পথযাত্রায় অন্তত এবার আপনি থেমে যান। যেন আপনার এই 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' সত্য হয়ে যায়। যেন এবারের এ 'আস্তাগফিরুল্লাহ্'র আহ্বানে আপনার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে যায়।

সর্বোত্তম ইচ্ছে

আল্লাহ্ সুবহানাহু আপনার জন্য অনেক কিছুই ইচ্ছে করেন..
তিনি আপনাকে অস্তিত্বদানের ইচ্ছে করলেন, তাই আপনার জন্ম হলো। আপনাকে সুস্থ রাখতে চাইলেন, তাই আপনি সুস্থ হয়ে গেলেন। আপনাকে বিবেকবান করতে চাইলেন বলেই আপনি এখন বুদ্ধিমান-পড়তে পারেন, শুনতে পারেন; কিন্তু আল্লাহ্ আপনার প্রতি সর্বোত্তম যে ইচ্ছেটি পোষণ করেন, তা কী জানেন?
তিনি আপনাকে ক্ষমা করে দিতে চান।
وَلِلَّهِ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴾
আর আসমান এবং যমীনে যা কিছু আছে তা আল্লাহর জন্য। তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন আর যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন। আর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [১]
কত মহান সে ইচ্ছে, যে ইচ্ছের বদৌলতে তিনি তাঁর অনুগ্রহে বেষ্টন করে আপনাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করার জন্য প্রস্তুত করছেন।
যাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দেন, তারা অন্যদের মতো রোগাক্রান্ত হয় বটে; কিন্তু রোগের কারণে তাদের মুখের মুচকি হাসিগুলো মুছে যায় না।
যাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দেন তারা হয়তো আর্থিক সংকটে পতিত হয়; কিন্তু এই সংকটে তাদের মাথা কখনো নত হয় না।
যাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দেন তাদের দু'চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে; কিন্তু তারা আল্লাহ্র দান থেকে নিরাশ হয় না।
সুতরাং আপনার সব দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা-দুঃখ-ব্যথা ঝেড়ে ফেলুন।
যাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় তারা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমায়; কারণ, তাদের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ যা ঘটতে পারে-তা হলো মৃত্যু। আর মরলেই বা কী? গুনাহমুক্ত এ জীবনে তাদের কাছে মৃত্যু তো সামান্য ভয়ের ব্যাপার। আল্লাহ্র ওয়াস্তে বলছি পড়ুন। অনুভব করুন-
وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا ۞
আর যে ব্যক্তি কোনো খারাপ কাজ করে অথবা নিজের ওপর অবিচার করে তারপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সে আল্লাহকে পায় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু হিসেবে [২]
আপনি কি তাকে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু হিসেবে পেতে চান না? তাহলে এখনই তাঁর কাছে ক্ষমা চান।

সবচেয়ে সুন্দর কথা

সেই মহা-ক্ষমাশীল সত্তা জানেন, গুনাহ আপনার জীবনকে বিনষ্ট করে দেয়, আত্মাকে বিপর্যস্ত করে, পানিকে দুর্গন্ধযুক্ত ও অপেয় করে, খাবারকে বিস্বাদ, রাতকে ভৌতিক, দিনকে বিরক্তিকর, আত্মীয়দেরকে জাহান্নামতুল্য, বন্ধুদেরকে কাঁটাসম, জীবনের ব্যস্ততাকে ভ্রান্তিময়, ঘুমকে শ্বাসরোধ আর নিঃসঙ্গতাকে ক্রন্দনের মতো। তাই তো তিনি আপনাকে বলছেন-
أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ )
তারা কি আল্লাহ্র কাছে ফিরে যাবে না এবং ক্ষমা চাইবে না? [১]
এটাই কি তাদের অবস্থার জন্য সবচেয়ে সুন্দর কথা না? তারা কি একের পর এক বিপদে বিরক্ত হয়ে যায়নি? তারা কি অন্তরের গভীর থেকে উৎসারিত মুচকি হাসির জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েনি? তাহলে কেন তারা আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চায় না?

অবাক হবেন না

মহা-ক্ষমাশীল সত্তা সবসময়ই ক্ষমা করে থাকেন। তিনি বদান্যতার মাধ্যমে ক্ষমা করেন। সাধারণ মানুষ যা ক্ষমা করে না-তা তিনি ক্ষমা করেন। আপনাকে অবাক করে দিয়েও তিনি ক্ষমা করেন।
সব সময় তিনি ক্ষমা করেন-এক সালাত থেকে অন্য সালাত, এক জুমু'আ থেকে অন্য জুমু'আ, এক রামাদান থেকে আরেক রামাদান, এক হজ থেকে আরেক হজ-সব তিনি ক্ষমা করে দেন যদি সে বান্দা কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে। এই ধারাবাহিক 'ইবাদাতগুলোর মাধ্যমে বান্দার জীবন ক্ষমা আর ক্ষমা, মার্জনা আর মার্জনা, নিবৃত্তি আর নিবৃত্তির চাদরে ঢাকা।
চিন্তা করুন, আপনি ফজরের সালাত আদায় করলেন। তারপর কর্মক্ষেত্রে গেলেন। সেখানে কবীরা গুনাহ ব্যতীত ছোট ছোট অনেক গুনাহ করে ফেললেন। তারপর যুহরের সালাতের জন্য সুন্দরভাবে ওযূ করে পূর্ণ সালাত আদায় করলেন। সালাতের শেষে- ‘আসসালামু ‘আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলার সাথে সাথে সব গুনাহ মুছে গেছে আপনার। এভাবে আপনার গুনাহ এক সালাত থেকে আরেক সালাত পর্যন্ত মুছে যায়। আমাদের রব যদি মহা-ক্ষমাশীল না হতেন তাহলে আমাদের কী হতো?
তিনি বদান্যতার সাথে ক্ষমা করেন-
বছরের এক সাওমে তিনি সারা বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।
আপনি শুধু ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ একশত বার বলুন। আপনার গুনাহ যদি সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণও হয় তাহলেও আল্লাহ্ তা ক্ষমা করে দেবেন। এর চেয়ে বদান্যতা আর কী হতে পারে বলুন তো?
সাধারণ মানুষ যা ক্ষমা করে না তিনি তা ক্ষমা করেন-
এক পতিতার জীবন ছিল গুনাহ এবং পাপাচারে ভরপুর। সে একটা কুকুরকে পানি পান করিয়েছে বলে তার সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
তিনি অবাক করে দিয়ে ক্ষমা করেন-
এর উদাহরণ হলো বদরের যুদ্ধে যারা উপস্থিত হয়েছিল তাদেরকে তাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা যা ইচ্ছা কর, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি[১]’
বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক সাহাবী হারেসা ইবনু সুরাকা রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু। তিনি যোদ্ধা হিসেবে বের হননি, যোদ্ধাদের সহকারী হিসেবে বের হয়েছিলেন। তিনি দূর থেকে যুদ্ধক্ষেত্র প্রত্যক্ষ করছিলেন। হাওযে পানি পান করতে এলে এক লক্ষ্যহীন তীর তার কণ্ঠনালীতে এসে বিদ্ধ হয়। তিনি সেখানেই মারা যান। নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় ফিরে এলে হারেসার মা তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর নাবী, আমার হারেসা সম্পর্কে বলুন। সে যদি জান্নাতে যায় তাহলে আমি ধৈর্য ধরব। আর যদি না যায় তাহলে তার ব্যাপারে আমি খুব কান্নাকাটি করব।’ নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
হারেসার মা, জান্নাতে তো অনেকগুলো জান্নাত আছে। আপনার ছেলে সুউচ্চ ফিরদাউস অর্জন করেছে [১]
ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, 'এ থেকে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের মর্যাদার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের মূল জায়গায় বা সংঘর্ষস্থলে ছিলেন না; তিনি সুদূর থেকে প্রত্যক্ষ করছিলেন। হাওয থেকে পানি পানরত অবস্থায় লক্ষ্যহীন তীর তাকে আঘাত করেছে। তাও তিনি সুউচ্চ জান্নাতুল ফিরদাউস অর্জন করেছেন। তাহলে তাদের ব্যাপারে কী বলবেন, যারা বদরের যুদ্ধে শত্রুর সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত ছিলেন?'

শুরু করে দিন

'আল-গাফুর' তথা মহা-ক্ষমাশীলের সাথে জীবনের এক নব অধ্যায়ের সূচনা হোক। আপনি এ জন্য খুশি হবেন যে, তিনি গুনাহ মাফ করেন। সুতরাং তাঁর কাছে দ্রুত ক্ষমা চান। এ ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যম হবে তাঁর আদেশগুলো মানা আর নিষেধগুলো বর্জন করা।
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ﴿
বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে থাকো তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ্ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো মাফ করবেন [২]
আল্লাহ্, আপনি আমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দিন। ছোট-বড়, প্রথম-শেষসহ সব ধরনের গুনাহ। আর আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দিন—যাদের হিসাবের খাতায় অনেক বেশি 'আস্তাগফিরুল্লাহ্' থাকবে।

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, ০২: ৮১
[১] সূরা শূরা, ৪২: ৩০
[১] মুসনাদ আহমদ, ২৬০৯-৪/৩৬৯
[২] সূরা আলে-ইমরান, ০৩: ১২৮
[১] তাবারানী তার মু'জামুল কাবীর গ্রন্থে (৭২৩৫-৭/৩১৪) উল্লেখ করেছেন।
[২] সহীহ মুসলিম, ২৭৪৪-৪/২১০৩
[১] সূরা আলে-ইমরান, ০৩: ৮৯
[২] সূরা হূদ, ১১: ১১৪
[৩] তিরমিযী, ২৩৯৯-৪/৬০২
[৪] ইবনু মাজাহ, ৩৮১৮-২/১২৫৪
[৫] সুরা হাককাহ ৬৯ : ১৯
(১) সূরা যুমার, ৩৯ : ৫৩
[১] সূরা বাকারা, ০২: ১৯২
[১] সূরা আলে-ইমরান, ০৩ : ১২৯
[২] সূরা নিসা, ০৪: ১১০
[১] সূরা মায়েদা, ০৫: ৭৪
[১] সহীহ বুখারী, ৩৬৯৪
[১] সহীহ বুখারী, ২৮০৯-৪/২০
[২] সূরা আলে-ইমরান, ০৩: ৩১

📘 তিনিই আমার রব > 📄 আল-কারী ব তথা নিকটবর্তী

📄 আল-কারী ব তথা নিকটবর্তী


একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে এক বন্ধু আমাকে দেখতে এসেছিল। চলে যাওয়ার সময় বলল— 'এই চিরকুটে এমন একটি বাক্য লিখে দাও, যেটা পড়তে পড়তে আমি রুমে যাবো।' আমি তাকে লিখে দিলাম— 'তিনি এখন তোমাকে দেখছেন।' পরে সে আমাকে জানাল যে, ওই একটি বাক্যই তাকে আল্লাহ্ ভয়ে ভীত করেছে!

আল-কারীব তথা নিকটবর্তী

আপনি কি একাকিত্ব অনুভব করছেন? প্রিয় বন্ধু কি আপনাকে লাঞ্ছিত করেছে? আপনার এবং আপনার প্রিয় মানুষের মধ্যে একটা পর্দা পড়ে গেছে? যে কারণে সে আর আপনাকে আগের মতো বুঝতে পারছে না? আপনার আত্মা কি এমন প্রিয়জনকে খুঁজছে যার কাছে মনের সব দুঃখ-ব্যথা সবকিছু খুলে বলতে চায়?
কেমন হয় যদি এমন প্রিয়জনকে ডাকেন, এমন বন্ধুকে আহ্বান করেন আর এমন সত্তার দিকে ছুটে চলেন-যিনি নৈকট্য অর্জনে ইচ্ছুকদের কখনোই ফিরিয়ে দেন না?
আল্লাহ্ আপনার খুবই কাছে; তিনি আপনার ঘাড়ের রগ থেকেও নিকটে। তাঁর নৈকট্য পেলে আপনার জীবনটা সুখ-শান্তিতে ভরে উঠবে। তাঁর একটি মহান নাম আছে। এ নাম সৌন্দর্যমণ্ডিত এবং অলঙ্কৃত। 'আল-কারীব' তথা নিকটবর্তী। আসুন, আমরা এ নামের সাথে পরিচিত হই। যেন তাঁর নৈকট্য অনুভব করতে পারি। আর একাকিত্বের রজনীগুলোতে তাঁর সাথে গোপন আলাপনের স্বাদ গ্রহণ করতে পারি।

হে আল্লাহ্

আপনাকে তিনি জানাতে চান যে, তিনি আরশের ওপর আছেন, অনুরূপ করে জানাতে চান যে, তিনি আপনার ঘাড়ের রগ থেকেও আপনার নিকটে আছেন। তিনি আপনার কথা শোনেন। আপনার কাজ দেখেন। আপনার কোনো কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাসজিদে প্রবেশ করলেন। দেখলেন সাহাবীরা উচ্চৈঃস্বরে আল্লাহ্র যিক্র করছে। সাহাবীদের উদ্দেশ্য তিনি বললেন-
اربعوا على أنفسكم، فإنكم لا تدعون أصم ولا غائبا، إنكم تدعون سميعا قريبا
তোমরা নিজেদের প্রতি অনুগ্রহ করো। তোমরা তো কোনো বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছ না। তোমরা একজন সর্বশ্রোতা ও নিকটবর্তী সত্তাকে ডাকছ[১]
বান্দা দু'আ শেষ করার সাথে সাথে তার আহ্বানে আল্লাহ্ সাড়া দেওয়ার আলামত পেয়ে যায়; কারণ, আল্লাহ্ এত কাছে যে, মানুষ কল্পনাও করতে পারে না।

আপনারই জন্য

আমার এক বন্ধু একবার আমাকে একটি ঘটনা জানিয়েছিল। একবার সালাতের জন্য সে মাসজিদে প্রবেশ করেছে। ওযুর পানি তখনো তার কানে লেগে আছে। এমতাবস্থায় প্রথম কাতারে গিয়ে এসির সামনে দাঁড়ানোর ফলে এসির ঠান্ডা বাতাস তার কানে ঢুকে গেল। এক ঘণ্টা পর তার মনে হলো, কানে কিছুটা ব্যথা করছে। সে মনে মনে কেবল একবার বলল, 'আল্লাহ্, আপনার জন্যই সহ্য করেছিলাম।' তখন কোনো ভূমিকা বা পদক্ষেপ ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যেই তার ব্যথা মিলিয়ে গেল।
তিনি কতটা নিকটে হলে আপনি ঠোঁট না নাড়িয়ে আপনার মনে মনেই কথাটি তাকে বলতে পারলেন?
সিজদারত অবস্থায় আপনি সবচেয়ে কাছে থাকেন তাঁর। তখন আপনি 'সুবহানা রব্বিয়াল আ'লা' পড়েন, আসমানের দরজাগুলো আপনার এ বিড়বিড় আওয়াজের শব্দ শুনে খুলে যায়। তাহলে চিন্তা করুন, মহান ক্ষমতাধর আল্লাহ্ কীভাবে আপনার কথা শোনেন। আপনি মনে করবেন না যে, তিনি দূরে আছেন, অথবা তাঁর থেকে কোনো কিছু গোপন আছে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের আঁধারে বের হলেন। উবাই ইবনু কা'বের দরজায় কড়া নাড়লেন। উবাই ইবনু কা'ব বেরিয়ে এলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জানালেন, 'আমার রব আমাকে আদেশ দিয়েছেন তোমাকে 'ফাতিহা' পড়ে শোনাতে। 'উবাই হতভম্ব হয়ে বললেন, 'আমার নাম বলেছেন?' রাসূলুল্লাহ্ বললেন, 'হ্যাঁ।' এ কথা শোনামাত্রই তিনি কেঁদে ফেললেন।[১]

পিঁপড়ের পদচারণা

তিনি সকল সৃষ্টির কাছেই থাকেন; তাদের দেখেন; তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
সৃষ্টিজগতের নিকটে না থাকলে কীভাবে তাদের ওপর কর্তৃত্বশীল হতে পারেন তিনি? কীভাবে তিনি রব হতে পারেন যদি তিনি নিকটবর্তীই না হন?
তাঁর এ নৈকট্য জানার, শোনার, দেখার ও বেষ্টনের। তবে এ তাঁর সত্তাগত নৈকট্য নয়; কেননা, তাঁর সত্তা তো এ ধরনের নৈকট্য থেকে পবিত্র। তাঁর নৈকট্যের একটা বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি অবতরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, আল্লাহ রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশে আসমানের দুনিয়ায় অবতরণ করে বলতে থাকেন-
هَلْ مِنْ سَائِلٍ فَأُعْطِيَهُ، هَلْ مِنْ دَاعِ فَأُجِيْبَهُ، هَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرُ لَهُ
এমন কেউ আছে, যে চাইবে? আমি তাকে দান করবো। এমন কেউ আছে, আহ্বান করবে? আমি তার আহ্বানে সাড়া দেবো। এমন কেউ আছে, যে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো।[১]
এছাড়াও তাঁর নৈকট্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি গভীর অন্ধকার রাতে শৈবালযুক্ত পাথরের ওপর কালো পিঁপড়ের পদচারণাও শুনতে পান। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا *
আর এমন কোনো পাতা পড়ে না-যার ব্যাপারে তিনি জানেন না।[২]
একবার কল্পনা করে দেখুন, পৃথিবীতে গাছের সংখ্যা কত, এই গাছগুলোতে পাতার সংখ্যা। কল্পনা করুন; শীতকালে এ সব পাতা ঝরে পড়ছে। আর এ সবই আল্লাহ্ জানেন। জানেন এগুলোর সংখ্যা, আকৃতি, ধরন ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ সব কিছুই।
এক নারী একবার নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাজির হয়ে স্বামীর ব্যাপারে বাদানুবাদ করল। 'আয়িশা রাযিয়াল্লাহু 'আনহা ঘরের এক প্রান্তে। তিনি মহিলার কিছু কথা শুনতে পেলেন আর কিছু শুনতে পেলেন না। বাদানুবাদ উত্থাপন শেষ হতে দেরী, জিবরা'ঈল 'আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ওয়াহী নিয়ে উপস্থিত-
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
আল্লাহ্ অবশ্যই শুনেছেন সে নারীর কথা, যে তার স্বামীর ব্যাপারে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর কাছেও ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ্ আপনাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা [১]
আহ্! কী বিস্ময়কর নৈকট্য তাঁর। কত মহান জ্ঞান। কি সর্বব্যাপী তাঁর শ্রবণ, তাঁর দর্শন...

তিনি আপনাকে দেখছেন

আপনার হাত প্রসারিত করুন। করেছেন? এটাও তিনি দেখেছেন। আপনাকে এটি বিশ্বাস করতেই হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে এক বন্ধু আমাকে দেখতে এসেছিল। চলে যাওয়ার সময় আমাকে বলল-'এই চিরকুটে এমন একটি বাক্য লিখে দাও যেটি পড়তে পড়তে আমি রুমে যাবো।' আমি তাকে লিখে দিলাম- 'তিনি এখন তোমাকে দেখছেন।' পরে সে আমাকে জানাল, ওই বাক্যই তাকে আল্লাহ্র ভয়ে ভীত করেছে।
তাঁর নৈকট্য আপনাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে। আপনাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবেই। তাঁর নৈকট্য আপনাকে প্রশান্তি দেয়। আপনাকে প্রশান্তি দেবেই। তাঁর নৈকট্য আপনাকে উন্নতা দেয়। আপনাকে উন্নতা দেওয়া যে আবশ্যক। তাঁর নৈকট্য আপনাকে সুউচ্চ সাহসী এক বীর করে তোলে।
তাঁর বাণী শুনুন। মূসা 'আলাইহিস সালাম যখন ফিরাউনের কাছে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন তখন তিনি তাকে এবং তার ভাই হারুন 'আলাইহিমাস সালামকে উদ্দেশ্য করে বললেন-
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى ۞
আমি তো তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমি সব শুনি ও দেখি।[২]
এটাই যথেষ্ট। তাঁর উপস্থিতিই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় রক্ষক।
তিনি তাদের সাথে আছেন বলেই তারা আর ফিরাউনকে ভয় করবেন না। তারা এখন থেকে সাহসী।
আকীদার বইগুলোতে আছে, আল্লাহ্র সাহচর্য দুই ধরনের। একটি শুধু তাঁর বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য। সেটি ভালোবাসা, সাহায্য এবং সমন্বয় সাধনের সাহচর্য। দ্বিতীয়টি ব্যাপক সাহচর্য। সেটি সকল কিছুর ক্ষেত্রেই তাঁর জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও বেষ্টন বিদ্যমান থাকার সাহচর্য।
মূসা 'আলাইহিস সালাম ও হারুন 'আলাইহিস সালামের প্রতি তাঁর এ বিশেষ সাহচর্য ছিল সাহায্য ও সমন্বয় সাধনের সাহচর্য। আল্লাহ্ তাদের সাহায্য ও সমন্বয় সাধনের ও'য়াদা দেওয়ার পর তারা আবার ভয় করবেন কী করে?
মূসা 'আলাইহিস সালাম ও হারুন 'আলাইহিস সালামের মতো যে-ই জেনে-বুঝে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ করতে নিষেধ করে-তার জন্য আল্লাহ্র সাহচর্য থাকবে। এটা অন্তরে তার 'ঈমান ও রবের আদেশের প্রতি তার আনুগত্য অনুসারে প্রযুক্ত হবে। দেখবেন, যে লোকই সত্যের আদেশ দিচ্ছে আর মিথ্যাকে প্রতিহত করছে তার মাঝে শক্তি, সাহস, ধৈর্য ও আল্লাহ্ তাওফীক এত বেশি যে, আপনি নিশ্চিত হয়ে বলে ফেলবেন-আল্লাহ্র বিশেষ সাহচর্য তাকে ঘিরে আছে, তাকে শক্তিশালী করে তুলছে।

মুচকি হাসুন...

এ ব্যাপারে সবচেয়ে মহান ও জীবনঘনিষ্ঠ আয়াত হলো আল্লাহ্র বাণী-
الَّذِي يَرَنَكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ *
তিনি আপনাকে দেখেন, যখন আপনি দাঁড়ান, এবং সিজদাকারীদের মাঝে আপনার উঠাবসা [১]
যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সালাত আদায় করার জন্য দণ্ডায়মান হন, তখন কী পরিমাণ নৈকট্য অনুভব করেন আপনি? আর আপনার রব আপনাকে জানান যে, এ কাজ করলে আল্লাহ আপনাকে বিশেষ চোখে দেখবেন। মূলত তিনি সকল সৃষ্টিকে দেখতে পান; সৃষ্টি দাঁড়িয়ে থাকুক বা অন্য অবস্থায় থাকুক। সুতরাং মূল ব্যাপার হলো, বান্দা সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ্ তাকে বিশেষভাবে দেখেন; এ দেখার মাঝে থাকে ভালোবাসা, গ্রহণ করে নেওয়া, আহ্বানে সাড়া দেওয়া ও ক্ষমা করে দেওয়ার অপূর্ব সমন্বয়।
বুখারীর হাদীসের মতো করে বলুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَا أَذِنَ لِشَيْءٍ مَا أَذِنَ لِنَبِيٍّ حَسَنِ الصَّوْتِ يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ يَجْهَرُ بِهِ
আল্লাহ্ তাঁর নাবীকে সুকণ্ঠে জোর আওয়াজে কুর'আন তিলাওয়াত করতে যেভাবে শোনেন সেভাবে আর কিছুই শোনেন না[১]
ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, 'এর অর্থ হলো, আল্লাহ্ সুবহানাহু কোনো কিছুই সেভাবে শোনেন না-যেভাবে তাঁর নাবীর তিলাওয়াত শোনেন। নাবী যখন উঁচু কণ্ঠে সুন্দর করে কুর'আন পড়েন, তখন নাবীদের সচ্চরিত্র ও পরিপূর্ণ আল্লাহভীতি থাকায় তাদের গলার আওয়াজে এক ধরনের মিষ্টতা থাকে। এটাই তিলাওয়াতের চূড়ান্ত পর্যায়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর সব বান্দার-ভালো/খারাপ- তিলাওয়াত শুনে থাকেন। যেমন: 'আয়িশা রাযিয়াল্লাহু 'আনহা বলেছেন, 'মহান সেই সত্তা-যার শ্রবণশক্তি সকল আওয়াজকে বেষ্টন করে আছে।' তবে মু'মিন বান্দাদের জন্য তাদের তিলাওয়াত শোনাটা আরও মহান ব্যাপার। আল্লাহ্ সুবহানাহু বলেন-
وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَمَا تَتْلُواْ مِنْهُ مِن قُرْءَانٍ وَلَا تَعْمَلُونَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا إِذْ تُفِيضُونَ فِيهِ
আর তোমরা যে অবস্থাতেই থাক না কেন এবং কুর'আন থেকে যা কিছু তিলাওয়াত করো না কেন এবং তোমরা যা-ই 'আমাল করো না কেন, আমি তোমাদের সাক্ষী থাকি যখন তোমরা তাতে নিমগ্ন হও। [২]
পরিশেষে নাবীদের তিলাওয়াত শোনাটা সবচেয়ে চূড়ান্ত পর্যায়।'
ভয়-ভীতি আপনাকে চড় দিলেও মুচকি হাসুন। আপনার রবের নৈকট্যের কথা চিন্তা করুন। আপনি যেসব বস্তুর ভয় পান-সেগুলো আপনার থেকে ততটা কাছে নয় যতটা কাছে তিনি আছেন।
আপনার চারদিকে বিপদ এলে আশাবাদী হোন। ভেবে দেখুন, তিনি আপনার ঘাড়ের রগ থেকেও কাছে। এ ভাবনা দিয়ে দূর করে দিন সব বিপদ।
বক্তারা বলেন, একলোক মরুভূমিতে সফর করছিল। তার পথরোধ করে দাঁড়াল তরবারী হাতে এক ডাকাত। তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে সে বলল, 'আমার মালামাল নিয়ে নাও।' ডাকাত বলল, 'না, আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই। তারপর তোমার মালামাল নেবো।' লোকটা তার কাছে দুই রাকআত সালাতের জন্য অনুমতি চাইল। অনুমতি পেয়ে সালাত আদায় করতে গিয়ে সে বলল-আমি পুরো কুর'আন ভুলে গিয়েছিলাম। শুধু মনে ছিল-
أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ
কে বিপদগ্রস্তের আহ্বানে সাড়া দেয়, যখন সে ডাকে? আর তার বিপদ দূর করে দেয়? [১]
আয়াতটা বার বার পড়লাম। সালাত শেষ করে দেখি, এক অশ্বারোহী কোত্থেকে যেন এসে লোকটাকে তরবারী দিয়ে এমন আঘাত করেছে যে, তার মাথাটা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

আপনি কতই না পবিত্র ও মহান

তিনি অতি নিকটবর্তী। আপনি তাঁর স্মরণে ঠোঁট দুটো নাড়ুন, অমনি আপনার আওয়াজে আসমানের দরজাগুলো খুলে যাবে।
ইউনুস 'আলাইহিস সালাম তিমির পেট থেকে আল্লাহকে ডেকে বলেছিলেন-
لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ ۞
আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি কতই না পবিত্র ও মহান। নিশ্চয় আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি। [১]
এ ক্ষীণ স্বর অন্ধকারের তিন স্তর পেরিয়ে মহাশূন্য ভেদ করে চলে গেল। আসমানের ফেরেশতারা এ আহ্বান শুনে মহান রবকে বললেন, 'আওয়াজটা চেনা, তবে জায়গাটা অচেনা।'
আল্লাহ্ হাদীসে কুদসীতে বলেন-
من ذكرني في نفسه، ذكرته في نفسي، ومن ذكرني في ملأ، ذكرته في ملإ خير منهم
যে ব্যক্তি আমাকে মনে মনে স্মরণ করবে, আমি তাকে মনে মনে স্মরণ করব। আর যে আমাকে মাজলিশের মধ্যে স্মরণ করবে। আমি তাকে এর চেয়ে উত্তম মাজলিশের মধ্যে স্মরণ করব।
কারণ, তিনি যে সবচেয়ে নিকটে।
শুধু বলুন, 'ইয়া আল্লাহ্'। জবাবটা আপনাকে স্মরণ করেই আসবে।
এটা কতই না মহান ব্যাপার যে, আপনি রাজাধিরাজকে স্মরণ করার পরক্ষণেই তিনি আপনার নামটা উল্লেখ করে বললেন, 'আমার বান্দা অমুকের ছেলে অমুক আমাকে স্মরণ করেছে।'
এ মহান দৌলতের তুলনায় পুরো দুনিয়াটাই তুচ্ছ হয়ে যায়। কী সৌভাগ্য—আল্লাহ্ স্মরণ করলেন তাঁর বান্দাকে।
তাঁর এ নৈকট্য বাড়তে থাকে। তাওবা ও সৎকর্মের মাধ্যমে আপনি তাঁর কাছে যেতেই থাকেন। আল্লাহ হাদীসে কুদসীতে বলেন-
إذا تقرب منى شبراً تقربت إليه ذراعاً، وإذا تقرب منى ذراعاً تقربت إليه باعا
সে যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে তাহলে আমি তার এক হাত কাছে আসি। সে যদি আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে তাহলে আমি তার দিকে এক বাহু কাছে আসি।[১]
তাঁর নৈকট্য অর্জনে আপনার প্রতিটি প্রচেষ্টার ফলে তিনি আপনার নৈকট্যে আসেন তাঁর দয়া, অনুগ্রহ, নি'য়ামাত আর অবারিত দানের মাধ্যমে।

তাঁর কাছে পৌঁছে যাবেন...

তাঁর নৈকট্যের আরেকটি অর্থ হলো, তিনি আশেপাশের সবকিছুর মাঝেই এমন কিছু রেখে দেবেন-যা আপনাকে তার কথা স্মরণ করাবে।
আপনি বিভিন্ন সৃষ্টজীবের গঠনপ্রণালীর মাঝে তাঁর প্রজ্ঞা দেখতে পাবেন।
আসমানগুলো কোনো খুঁটি ছাড়াই উত্থিত করার মাঝে তাঁর কুদরত দেখতে পাবেন।
আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা ও মাটি ফুঁড়ে গাছ জন্মানোর মাঝে তাঁর অনুগ্রহ দেখতে পাবেন।
পাহাড়ের সুবিশাল উচ্চতার মাঝে তাঁর বড়ত্ব দেখতে পাবেন।
ঝড়-ঝাপটা, ভূমিকম্প আর অগ্ন্যুৎপাতে আপনি তাঁর শাস্তি দেখতে পাবেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ
অচিরেই আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাব, বিশ্বজগতের প্রান্তসমূহে এবং তাদের নিজদের মধ্যে; যাতে তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে-এটা (কুর'আন) সত্য।[২]
আপনি দু'চোখ ভরে কিছু দেখলেই সেটা আপনাকে সর্বদ্রষ্টা মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।
আপনি গভীর নিশীথে ফিসফিস আওয়াজ শুনলে সেটা আপনাকে সর্বশ্রোতা মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। গোপন কোনো জ্ঞান জানতে পারলে তা আপনাকে মহাজ্ঞানী আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। প্রতিটি বস্তুর মাঝে নিদর্শন আছে। যে নিদর্শন এটি প্রমাণ করে দেয় যে, তিনিই সেই একক সত্তা।
একবার একদল শিশুর সাথে বসে আল্লাহ্র সৃষ্টির ব্যাপারে আলোচনা করছিলাম। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, 'তোমরা যদি তাঁর সৃষ্টজগতের কথা চিন্তা করো, তাহলেই তাঁর কাছে পৌঁছে যাবে।' আমি কিছুটা বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলাম। আমি বুঝতে পারলাম যে, এই শিশু আমাদের থেকেও বেশি বুঝতে পেরেছে। সে আমার থেকে কী শুনবে, এর বদলে আমার উচিত তার থেকে শোনা।
তিনি এত কাছে যে, তাঁর কাছে যেতে আপনাকে শুধু ভাবতে হবে, শুধু তাঁর নৈকট্যকে অনুভব করতে হবে, শুধু অনুভব করতে হবে যে, তিনি আপনাকে দেখছেন। তারপর বলবেন- 'আল্লাহ্'।

যদি তারা আপনার কাছে জানতে চায়

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ )
তারা যদি আপনাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে তাহলে বলুন, 'আমি নিকটেই।'[১]
যে লোকই আপনাকে জিজ্ঞেস করবে আল্লাহ্ সম্পর্কে, তাকেই আপনি সর্বপ্রথম তাঁর 'নিকটবর্তী' গুণে গুণান্বিত বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দেবেন। সুদূরের এক রবের 'ইবাদাত করার জন্য মানুষের হৃদয়সমূহ প্রস্তুত হয় না; তারা প্রস্তুত না এমন রবের 'ইবাদাতের, যে তাদের ডাক শোনে না, আর তাদের প্রয়োজন দেখে না। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে পরিচিত হতে চায় তাকে আপনি প্রথম যে পরিচয়টা জানাবেন তা হলো, তিনি 'অতি-নিকটে'। এভাবেই আপনার রব আপনাকে শিখিয়েছেন তাঁর ব্যাপারে জানাতে।
এ নৈকট্য আপনাকে শেখাবে তাঁকে ভালোবাসতে, তাঁর কাছে একাকী চাইতে, তাঁকে ভয় করতে। আবার এর পাশাপাশি আপনাকে অভ্যস্ত করবে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে এবং ফিরে যেতে। তিনি নিকটবর্তী তাই আপনার কাছে ক্ষমা ও তাওবার তাওফীক পাওয়ারও যোগ্য তিনি। কারণ, আপনার নিকটে থাকায় তিনি আপনার প্রতিটা পাপকাজ, বিশ্বাসঘাতকতা প্রত্যক্ষ করছেন। আবার তিনি নিকটে বলেই আপনার এই ক্ষমা চাওয়া এবং তাওবা করা কার্যকরী হয়ে যাবে। আপনার ক্ষমাপ্রার্থনার আহ্বান ও তাওবার আকুতি তো শুধু তিনিই শুনে থাকবেন যিনি আপনার তাওবার ব্যাপারে অবগত আছেন। তিনি তো নিকটবর্তী, সাড়া দানকারী। আল্লাহর বাণীটা ভেবে দেখুন-
( فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ )
তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও তারপর তাঁর দিকেই ফিরে চলো।[১]
যে কথাগুলো আপনাকে নিকটবর্তী মহান স্রষ্টার ব্যাপারে লজ্জিত করবে সেটা হলো কোনো একজন মহান ব্যক্তির এই কথাগুলো- 'তাকে ভালোবাসাই কি আপনার উচিত না? আপনি যখন দরজা বন্ধ করে তাঁর অবাধ্যতা করতে যান তখন তিনি দরজার নিচ দিয়ে অক্সিজেন প্রবেশ করিয়ে দেন যেন আপনি মরে না যান।'
এ নৈকট্যের সাথে আছে আল্লাহ্ দিকে বান্দার নৈকট্যের প্রচেষ্টা। তিনি বলেন-
( أُوْلَبِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ )
তারা যাদেরকে ডাকে তারাই তো তাদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে নিকটতর হতে পারে।[২]
এ যে প্রতিযোগিতা আর ছুটে চলার ক্ষেত্র, এখানে বান্দার সর্বোচ্চ কামনা শুধু নিকটে যাওয়া না, অধিকতর নিকটবর্তী হওয়া।

এত ধোঁয়াশার মাঝে...

উম্মতের এ বিপদাপদ, এত যুদ্ধের ধোঁয়াশা যা মু'মিনের অন্তরে দুঃখ-কষ্টের স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়-ই মু'মিনের প্রয়োজন পড়ে 'নিকটবর্তী' নামের তিনটি স্তর জেনে রাখার।
প্রথমত, 'ঈমান ও দৃঢ়বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর নৈকট্যকে জানা। ফলে মানবাত্মা চিৎকার করে সাধারণ মানুষকে আহ্বানের কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পাবে। কারণ, মানুষের রব তো কাছেই আছেন। তিনি সবকিছু দেখছেন, প্রত্যক্ষ করে চলছেন। কুর'আনে একটা আয়াত সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে-
إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ
নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, নিকটবর্তী [১]
এ জন্যই এ নিকটবর্তীর দুয়ারে হৃদয়ের পোড়া ও ক্ষতযুক্ত স্থানগুলো রাখা হয়। এ জায়গায় অতীতের সব কিছু পেশ করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, এত সব কষ্টের মাঝে, চারদিকে বিরাজমান বিশৃঙ্খলার ফাঁকে, ঘরভাঙা, মানুষ মরা, ফল-ফসল বিনষ্ট হওয়ার মধ্যে মানুষ অনুগ্রহ খুঁজে বেড়ায়। এমন অনুগ্রহের ছোঁয়া-যাতে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক লাঞ্ছিত হওয়া বা বিশ্বাসঘাতকতার নিরবচ্ছিন্ন আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া থেকে মানুষ বাঁচতে পারে। তাই সে সত্য রবের বাণীর সামনে দাঁড়ায়-
إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ
নিশ্চয় আল্লাহর অনুগ্রহ মুহসিনদের নিকটেই।[২]
যে মুজাহিদ বীর তার জীবন মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ্ জন্যই বিলিয়ে দিয়েছে তার এবং তার প্রভুর মাঝে এক পাতলা পর্দা আছে। যে পর্দার ওপাশ থেকে উঁকি দিচ্ছে 'ইহসান'-এর সুবাতাস। বান্দাকে শুধু এ যমীনের ফেরেশতার মতো চেষ্টা করতে হবে, যেন সে আল্লাহকে দেখতে পায়। যদি আল্লাহকে সে দেখতে নাও পায় তবে আল্লাহ্ তা'আলা তো তাকে দেখেনই। তাই একটা বুলেট নিক্ষেপ করলেও তিনি জানেন, কেন সে তা নিক্ষেপ করল বা কখন তা করল। বান্দা এভাবে এক 'ইহসান' থেকে অন্য 'ইহসান'-এর দিকে যেতেই থাকবে। আর এর পরিবর্তে আল্লাহ্র অনুগ্রহও তার কাছে আসতে থাকবে। একসময় চারিদিক থেকে অনুগ্রহ তাকে বেষ্টন করে ফেলবে। মৃত্যুর ধোঁয়াশার ভিড় থেকে সে বেরিয়ে জায়গা করে নেবে সন্তুষ্টির মেঘের রাজত্বে।
তৃতীয়ত, দিনগুলো অতিবাহিত হতে থাকে। দুঃখ-কষ্ট নিরন্তর আসতে থাকে। বিপদাপদ আরও তীব্র হয়ে যায়। সবদিক থেকেই অবরোধ জোরালো হয়। এ সময় সেই প্রচেষ্টাশীল বান্দার সামনে তৃতীয় একটি আয়াত হাজির হয়-
۞ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ ۞
তোমরা শুনে নাও, আল্লাহর সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী।[১]
তিনি যেমন তাঁর বান্দার অতি নিকটবর্তী, তেমনি তাঁর রাহমাতও তাঁর মুহসিন বান্দাদের অতি নিকটবর্তী। অনুরূপ তাঁর বাহিনীর সাহায্যও খুবই কাছে থাকে বান্দার।
۞ وَإِنَّ جُندَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ ۞
আর নিশ্চয় আমার বাহিনীই বিজয়ী।[২]
এ আয়াতের মাধ্যমে অপেক্ষারত দুর্বল হৃদয় এবং ধৈর্যরত ক্লান্ত-শ্রান্ত মনের সাথে আল্লাহ্র সংযোগ স্থাপিত হয়। তারা দিন-রাত তাঁর এ নিকটবর্তী সাহায্যের প্রত্যাশায় থাকে।

আল্লাহ্...

আল্লাহ্... আপনার ভয়েই তো চোখের পানি ফেলেছি। আমার দু’চোখের অশ্রুতে আপনার প্রতি যে ভালোবাসার আকুতি তার প্রতি আপনি অনুগ্রহ করুন।
আল্লাহ্... আপনার জন্যই তো আমার হৃদয় জ্বলে উঠেছে। আমার হৃৎস্পন্দনে ভালোবাসার এ অগ্নিশিখার প্রতি আপনি অনুগ্রহ করুন।
আল্লাহ্... আমার কথাগুলো হঠাৎ করেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। সুতরাং উচ্চারিত শব্দের প্রতি খেয়াল না করে আমার বাক্যচয়নে ভালোবাসার যে অনুভূতি তার প্রতি আপনি অনুগ্রহ করুন।
আল্লাহ্র ‘নিকটবর্তী’ নামের অভ্যন্তরে এ ঝটিকা সফর শেষে তাঁর কাছে এ আকুতি রাখি, আমাদের যেন তিনি এমন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন—যারা তাঁর নৈকট্য অনুভব করতে পারে। তিনি যেন এ মহান নাম থেকে উৎসারিত বিনয়, আনুগত্য, ভয়-ভীতি ও তাকে পর্যবেক্ষণ করার গুণাবলি ধারণ করে কাজে পরিণত করার সুযোগ দান করেন। সাথে সাথে তাঁর থেকেই শুধু অনুগ্রহ ও সাহায্য চাওয়ার সুযোগ দান করেন।
আল্লাহ্, আপনি সেই সত্তা—যাকে ডাকা হলে, অথবা যার কাছে চাওয়া হলে পাওয়া যায়। আপনার অনুগ্রহ ও হিদায়াতের ছোঁয়ায় আপনার নৈকট্য আমাদের অর্জন করতে দিন। এ নৈকট্যে যেন আপনার সাথে একান্ত আলাপনে লিপ্ত হতে পারি, হৃদয় থেকে সব অপরিচ্ছন্নতা দূর করতে পারি আর এরই মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি।

টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী, ৪২০৫-৫/১৩৩; সহীহ মুসলিম, ২৭০৪-৪/২০৭৬
[১] সহীহ বুখারী, ৪৯৬০ - ৬/১৭৫; সহীহ মুসলিম, ৭৯৯ - ১/৫৫০
[১] সহীহ মুসলিম, ৭৫৮-১/৫২২
[২] সূরা আন'আম, ০৬: ৫৯
[১] সূরা মুজাদালাহ, ৫৮:০১
[২] সূরা ত-হা, ২০ : ৪৬
[১] সূরা শু'আরা, ২৬: ২১৮-২১৯
[১] সহীহ বুখারী, ৭৪৮২-৯/১৪১; সহীহ মুসলিম, ৭৯২-১/৫৪৫
[২] সূরা ইউনুস, ১০: ৬১
[১] সূরা নামল, ২৭: ৬২
[১] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৭
[১] সহীহ বুখারী, ৭৪০৫-৯/১২১; সহীহ মুসলিম, ২৬৭৫-৪/২০৬১
[২] সূরা হা-মীম সাজদাহ, ৪১ : ৫৩
[১] সূরা বাকারা, ০২ : ১৮৬
[১] সূরা হুদ, ১১ : ৬১
[২] সূরা বানী ইসরা'ঈল, ১৭ : ৫৭
[১] সূরা সাবা, ৩৪ : ৫০
[২] সূরা আ'রাফ, ০৭: ৫৬
[১] সূরা বাকারা, ০২ : ২১৪
[২] সূরা সাফ্ফাত, ৩৭ : ১৭৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00