📄 আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা
তিনি আপনাকে আরোগ্য দেন— সামান্য মাধ্যমে, বিস্ময়কর মাধ্যমে, যেটা মাধ্যম না সেটা দিয়েও, আবার কোনো মাধ্যম ছাড়াই।
আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা
আপনি কি ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েছেন? বেদনায় নীল হয়ে গেছেন? অসুস্থতায় আপনার শরীর কি পাংশুটে বর্ণ ধারণ করেছে?
ডাক্তারদের কাছে যেতে যেতে আপনি কি বিরক্ত? হাসপাতালের করিডরগুলোয় হাঁটতে হাঁটতে আপনি কি ক্লান্ত? আপনার মাথায় কি শুধু ক্লিনিকের নামগুলো ঘুরপাক খায়? ডাক্তারের সাথে সাক্ষাতের তারিখ আর রোগের বিভিন্ন ধরন- এগুলোই কি আপনার মূল চিন্তা?
কেমন লাগবে, যদি আপনাকে এমন একটা বিষয় জানিয়ে দিই-যা আপনার আত্মা থেকে সকল দুঃখ-কষ্ট মুছে দেবে?
সেটা আল্লাহ্রই নাম- 'আশ-শাফী' তথা 'আরোগ্যদাতা'।
এখন আপনার এই ব্যথিত হৃদয়কে কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের সুযোগ দিন। তারপর এই দয়ালু নামটি সম্পর্কে জানুন। এ নামটির ছায়ায় আশ্রয় নিলে আপনি বুঝতে পারবেন এর প্রয়োজন কত। আর আপনি এটাও বুঝতে পারবেন যে, আপনি এই নি'য়ামাত থেকে কতটা দূরে আছেন।
রোগকে বিদায়
'আশ-শাফী' তথা 'আরোগ্যদাতা' আল্লাহ্র এমন একটি নাম যার প্রশংসা আমরা এজন্য করি যে, তিনি নিজেকে এ নামে নামকরণ করেছেন। তিনি নিজেকে সুস্থতা প্রদানের গুণে গুণান্বিত করেছেন। তিনিই সেই সত্তা-যিনি সুস্থতা দান করেন এবং বান্দার শরীরকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখেন। এই নাম শুনলেই এর ভেতরকার অর্থটা বোঝা যায়। এর বাহ্যিক দিকই অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে।
সুস্থতা শব্দটা রোগের সাথেই সম্পৃক্ত। মানবজীবনে রোগ-শোক নিত্যকার ঘটনা। এটা বিবিধ কষ্ট নিয়ে হাজির হয়। এর থেকে কেউ রেহাই পায় না। যে ব্যক্তি চোখের ব্যথা থেকে মুক্ত হয়, সে মাথাব্যথায় আক্রান্ত হয়। আবার মাথাব্যথাটা ভালো হলে পাঁজরে ব্যথা আরম্ভ হয়। এ ব্যথা শেষ হলে জ্বর এসে হানা দেয়। জ্বরটা কমে এলে পেটব্যথা শুরু হয়। পেটের ব্যথা নামলে দাঁত টনটন করে। এভাবে কোনো-না-কোনো অসুস্থতা লেগেই থাকে।
আবার সে যখন সুস্থতা লাভ করে, দেখতে পায় তার ভাই কাতরাচ্ছে, রোগাক্রান্ত হয়ে কষ্ট পাচ্ছে তার বোন। তার মা কান্নাকাটি করছে। ছেলেটা চেঁচামেচি করছে। প্রিয়জন ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।
জীবনটা আসলে দুঃখ-কষ্ট-ব্যথার একটা ময়দান। এ জন্যই আল্লাহ্ নিজের নাম দিয়েছেন আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা; যেন আপনি আপনার সকল ব্যথা নিয়ে তাঁর দয়ার আঙিনায় সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তাঁর অদৃশ্য মহান শক্তির কাছে আপনার সকল ব্যথার অনুভূতি প্রকাশ করেন।
রোগ এক ভয়াবহ জিনিস। এতে আক্রান্ত হয়ে অহংকারী ব্যক্তিটিও হারিয়ে ফেলে তার শক্তি। দুর্বলতা তাকে ছেয়ে ফেলে। ফলে সজীব চঞ্চল প্রাণে অনুভূত হয় অবসাদ ও দুর্বলতার স্পর্শ।
আল্লাহ্ শরীরের এ সজীবতাকে মুহূর্তের জন্য ম্লান করে দেওয়ার ফয়সালা দেন; যেন বান্দা নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করে নেয়। সে যেন বুঝতে পারে-আদতে তার শক্তি-সামর্থ্য বলতে কিছুই নেই।
আল্লাহ্ মানুষের জন্য রোগের ফয়সালা দেন; যেন সে এই রোগের মাধ্যমে এর কাছাকাছি একটা বিষয়কে স্মরণ করে। সেটা হলো মৃত্যু। রোগ যেমন সজীবতা ম্লান করে দেয় তেমনি মৃত্যুও জীবনের পরিসমাপ্তি এনে দেয়।
ব্যক্তি আপনি তো মৃত্যু দিয়েই গড়া। আপনার প্রতিটা জিনিস মৃত্যুর সাথে মেলে। আপনার ঘুমও মৃত্যু। অসুস্থতাও মৃত্যু। জীবনের নতুন ধাপে পৌঁছলে আগের ধাপের মৃত্যু ঘটে; যেমন যৌবন আপনার শৈশবের মৃত্যু ঘটায়। আবার বার্ধক্য যৌবনের মৃত্যু ডেকে আনে। আপনি জীবনের সাথে যতটুকু মেশেন, তার চেয়েও অধিক মেশেন মৃত্যুর সাথেই। তারপরও আমাদের কল্পনা আমাদের মাঝে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করে যে, আমরা চিরস্থায়ী। আর এ কারণেই আমাদের শরীর চিৎকার করে বলতে থাকে- 'তোমার ধ্বংস অতি সন্নিকটে।'
একজন মানুষ অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকাবস্থায় যখন আসা-যাওয়া করতে থাকা সুস্থ লোকদের দেখতে থাকে, তখন তার মাঝে জেগে ওঠে তাওবার মনোভাব। সে অনুভব না করলেও কবরের বাতাস যেন তার চারদিকে প্রবাহিত হয়।
আপনি যখন অসুস্থ, আপনার তখন মনে হতে পারে আপনার আত্মা মৃত ব্যক্তিদের সাথে আলাদা এক জগতে আছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে আপনার দুই চোখ আর দুই ঠোঁট শুকিয়ে যেতে থাকে। আপনার চোখের চাহনিতে কাঁপুনি দৃশ্যমান হয়।
এই তো জীবন। ঠিক এ জীবনটাই আপনার শরীরের ভেতর থেকে আপনাকে দেখতে আসা মানুষগুলোকে হাতের ইশারায় বিদায় জানাচ্ছে।
এভাবে রোগ যখন চূড়ান্তরূপ নেয়, আর দুনিয়ার মোহ থেকে আপনি যখন নিজেকে মুক্ত করে নেন, তখন আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা রোগটাকে আপনার শরীর ত্যাগের অনুমতি দেন। সুস্থতাকে আবার আপনার দেহে বিচরণ করার আদেশ করেন। ধীরে ধীরে আপনার দুই গালে উজ্জলতা ফিরে আসে। অসুস্থতার দিনগুলোতে মুখে যে মলিনতার সৃষ্টি হয়েছিল তা মুছে গিয়ে ফুটে ওঠে মিষ্টি হাসি।
তিনি কোনো মাধ্যম ছাড়াই রোগমুক্তি দেন
রোগমুক্তির জন্য তার কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নেই; কারণ, তিনি আরোগ্যদাতা। তিনি মাধ্যম দিয়েও আপনাকে রোগমুক্তি দেন; কারণ, তিনি যেভাবে চান, সবকিছু সেভাবেই হয়ে থাকে।
তিনি আপনাকে আরোগ্য দেন— সামান্য মাধ্যমে, বিস্ময়কর মাধ্যমে, যেটা মাধ্যম না সেটা দিয়েও, আবার কোনো মাধ্যম ছাড়াই।
সামান্য লতাপাতা দিয়ে আপনাকে রোগমুক্তি দেন। বিবিধ ঔষধপত্র দিয়ে আপনাকে সুস্থ করেন। খাদ্য-পানীয় দিয়ে আপনাকে সুস্থ করেন।
একবার একটা বিস্ময়কর ঘটনা পড়েছিলাম। এক ছেলে যক্ষ্মাসহ কয়েকটি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতপ্রায় হয়ে গেল। ডাক্তাররা বলল, তার মৃত্যু আসন্ন। তার বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। তারা তার বাবাকে পরামর্শ দিল, ছেলেকে গ্রামে নিয়ে যেতে; যেন সে গ্রামের নির্মল বাতাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে শেষ দিনগুলো কাটাতে পারে। অতঃপর তাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো। একদিন কেক খাওয়ার সময় এক লোক ছেলেটির বিষণ্ণ দুই চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, 'বাবা, তুমি কি বেঁচে থাকতে চাও?' সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। লোকটি বলল, 'এমন খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার আশা কর কীভাবে? প্রাকৃতিক খাবার খাবে। এ প্রকৃতিতে মাংস, শাক-সবজিসহ যা কিছু আল্লাহ্ সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং যাতে মাটির প্রভাব আছে সেগুলো খাবে।'
ছেলেটির ভাষ্য-'লোকটির উপদেশ আমার অন্তরে জায়গা করে নিল। আমি তার কথাগুলো অকপটে বিশ্বাস করে নিলাম। এরপর থেকে আমি শুধু জীবিত খাবারই খেতে লাগলাম, যে খাবারের মাঝে রয়েছে সঞ্জীবনী শক্তি-বিভিন্ন মাংস, বিবিধ সবজি, ক্ষেত-খামারের তরকারি, গরম রুটি, তাজা ফলমূল ইত্যাদি। কিছুদিনের মধ্যেই আমার শরীরটা সতেজ হয়ে উঠল। রোগের কোনো অস্তিত্বই রইল না।'
ছেলেটি এ ঘটনা বর্ণনা করেছে বড় হয়ে একজন পুষ্টিবিজ্ঞানী হওয়ার পর। তার নাম জাইলোর্ড হাউজর। তার বই খাদ্যের অলৌকিক ক্ষমতায় তিনি এ কথা লিখেছেন।
ডাক্তাররা তার মৃত্যুর ব্যাপারে ফয়সালা দিয়েই দিয়েছিল; কিন্তু রাজাদের রাজা এমনটি চাননি।
ডাক্তাররা ধারণা করেছিল গ্রামেই তার জীবনের অবসান হবে; কিন্তু আল্লাহ্ তেমনটা চাননি।
হ্যাঁ, ডাক্তাররা তার চিকিৎসা করতে অক্ষম ছিল; কিন্তু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তো অক্ষম নন। তিনি অক্ষম হবেন না। তাকে অক্ষম করতে কেউ পারবেও না।
কে সেই সত্তা-যিনি হতদরিদ্র মানুষের হাতের নাগালে পাওয়া যায় এমন সকল কিছু যেমন শাক-সবজি, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যের মাঝে সুস্থতার উৎসগুলো প্রবেশ করিয়েছেন? তিনি আরোগ্যাদাতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা।
আপনি নিজের অজান্তেই একটা রোগে আক্রান্ত হলেন। তারপর না জেনেই এমন খাবারও খেয়ে ফেললেন যাতে আপনার সুস্থতা নিহিত। আপনি অসুস্থ হন, আবার সুস্থও হয়ে যান আপনার রোগ বা অসুস্থতা সম্পর্কে না জেনেই।
আল্লাহ্ কখনো পানির মধ্যেও সুস্থতার উপাদান দিয়ে দেন। আমরা সবাই জানি- 'যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যেই পান করা হয় সেটা বাস্তবায়িত হয়।' আরও জানি যে, যমযমের পানি 'তৃপ্তিদায়ক ও রোগ নিরাময়কারী পানীয়।' কত রোগী আছে-রোগে দুর্বল হয়ে পড়েছিল; তারপর এই পবিত্র পানি পান করার পর সে আল্লাহ্র ইচ্ছায় সুস্থ হয়ে উঠেছে।
যে ব্যক্তি সুস্থতার এই হাদীসগুলো পড়বে সে নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকেই অনেকগুলো ঔষধের তালিকা পেয়ে যাবে। এর কিছু আবার ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ তার আত-তিব্বন নাবাওয়ী গ্রন্থে সংকলন করেছেন।
এ সকল ঔষধের মাঝে কিছুর উদাহরণ এই-চন্দন কাঠ, গরুর দুধ, চর্বি, কালোজিরা, তালবীনা, রাতে সালাত আদায়। আর এ সবগুলোর ব্যাপারেই সহীহ হাদীস আছে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ধৈর্যের মাধ্যমে সুস্থতা দেন। দু'আর মাধ্যমে দেন। সাদাকার মাধ্যমেও দেন। ক্ষমাপ্রার্থনার মাধ্যমেও দেন। তাওবার মাধ্যমেও দেন। আবার সন্তুষ্ট হয়েও সুস্থতা দেন। সবশেষে কোনো মাধ্যম ছাড়াও আরোগ্য দেন।
আলো ফিরে এলো
তাবুকের কিং 'আব্দুল 'আযীয হাসপাতালের ধর্মীয় অফিসে আমরা অবস্থান করছিলাম। এ সময় আমাদের পরিচিত এক ভাই ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় প্রবেশ করল। তার মুখে দুশ্চিন্তার মেঘ। মুখে সদা বিরাজ করা মুচকি হাসিটা আজ নেই। তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, কী হয়েছে তার। তিনি বললেন, 'আমার ছেলে চোখে দেখতে পাচ্ছে না; কিন্তু কেন দেখতে পারছে না তাও বুঝতে পারছি না। আমার ছেলেটিকে এখন দোতলায় ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।'
হায়! কী ভয়াবহ বিপদ! বাবার জন্য এ বিপদ কতটাই না কষ্টের!
সে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, 'দয়া করে আপনাদের একজন উঠে আসুন। আমার ছেলেটাকে রুকইয়াহ্ করান। [১] এর মাধ্যমে হয়তো আল্লাহ্ তাকে সুস্থতা দান করবেন।'
আমার এক বন্ধু সাথে সাথে উঠে তার সাথে চলে গেল। এক ঘণ্টা পর সে ফিরে এসে জানাল যে, তার ছেলেকে রুকইয়াহ করানো হয়েছে। তারপর সে ছেলের বাবাকে ধৈর্যধারণের জন্য পরামর্শ দিল। তাকে বার বার এ হাদীসটি স্মরণ করিয়ে দিল, 'তোমরা তোমাদের মাঝে অসুস্থ লোকদের চিকিৎসা করো সাদাকাহ দিয়ে'। বাবা সাথে সাথে পকেট থেকে পাঁচশ রিয়াল বের করে বললেন, 'আমার ছেলের সুস্থতার নিয়্যাতে এটা সাদাকাহ করে দিন।' দুই দিন পর বাবা ফিরে এলো। তার চেহারায় পরিবর্তন সুস্পষ্ট। আমার বন্ধুকে বলল তার সাথে যেতে। আধ-ঘণ্টা পর প্রফুল্লচিত্তে বন্ধু ফিরে এসে বলল, 'সুসংবাদ আছে। ছেলেটা রুমের আলো কিছুটা দেখতে পাচ্ছে।' বন্ধু আরও জানাল যে, ছেলের বাবা তাকে আরও এক হাজার রিয়াল সাদাকাহ করে দিতে বলেছে। সেদিন ছিল সপ্তাহের শেষ দিন। এর পরদিন অর্থাৎ শনিবার ছেলেটির বাবা আমার বন্ধুকে নিয়ে আবারও তার ছেলের রুমে গেল। অতঃপর আমার বন্ধু যখন ফিরে এসে জানাল যে, ছেলেটি আবার আগের মতো দেখতে পাচ্ছে তখন আমি যেন আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু তাতে কি? তার চোখের জ্যোতি যে সত্যিই ফিরে এসেছে! সে নতুন করে দেখতে পাচ্ছে!
কে তাকে সুস্থতা দিল? কে সেই সত্তা যিনি তার চোখের আলো ফিরিয়ে দিল? কে তাকে দান করল এ নতুন জীবন?
তাঁর ব্যাপার এই যে, তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছে করেন, তিনি বলেন, 'হও'। ফলে তা হয়ে যায়।
মহান পবিত্র আল্লাহ্। তিনি চোখের আলোকে বললেন, 'ফিরে আসো।' আর চোখের আলোও ফিরে এলো।
তাঁর দিকে ফিরে আসুন
তিনি আপনার কাছে শুধু এটাই চান যে, আপনি তাঁর দিকে ফিরে আসেন। আপনি তাঁর দিকে ধাবিত হন। তাঁকে সন্তুষ্ট করে, তাঁর জন্য সিজদাবনত হয়ে, তাঁর কাছে তাওবা করে, তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে, সাদাকah করে, নিজের দোষ স্বীকার করে ফিরে আসুন তাঁরই আঙিনায়।
দুনিয়ার এমন কোনো হাসপাতাল নেই, যে হাসপাতাল আপনার চিকিৎসা করে সুস্থতা এনে দিতে পারে-যদি আল্লাহ্ আপনার সুস্থতা না চান। [১]
দুনিয়ার বুকে এমন কোনো ডাক্তার নেই, যে আপনার রোগটা দূর করে দিতে পারে—যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সেটা না চান।
একবার এক ধনী লোকের একটা কিডনী নষ্ট হয়ে গেল। তার ছেলেরা তার শরীরে আরেকটা কিডনী বসানোর জন্য তাকে নিয়ে মিশরে চলল।
গ্রামের এক কিশোরীর সাথে তাদের চুক্তি হলো। তারা তাকে কিডনীর দাম হিসেবে এক লক্ষ সৌদি রিয়াল দেবে। সকালবেলা সবাই হাসপাতালে এলো। অস্ত্রোপাচারের আগমুহূর্তে লোকটা কিডনী বিক্রী করতে ইচ্ছুক কিশোরীকে দেখার ইচ্ছে পোষণ করলেন। কিশোরী সলজ্জ ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করল। বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি আমার মতো বৃদ্ধ লোকের কাছে তোমার কিডনী বিক্রী করতে রাজি হলে কেন?
'প্রয়োজনের জন্যই। আমার পরিবার দরিদ্র। আমার ভাইগুলো পড়াশুনা করছে। তাদের সহযোগিতা করার জন্য আমাকে কিছু হলেও করতে হবে।' কিশোরী বলল।
কথাগুলো বৃদ্ধের মুখে যেন চপোটাঘাতের মতো লাগল। গভীর ঘুম থেকে তিনি যেন জেগে উঠলেন। শরীরের মাঝে রক্তের জমাট বেঁধে যে একটা অংশ পচে যাচ্ছে—সেটা তিনি ভুলেই গেলেন। নিজেকে প্রশ্ন করলেন, 'একজন মানুষ কি শুধু খাওয়ার জন্য বা জীবনধারণের জন্য নিজের শরীরের একটা অঙ্গ ছাড়াও থাকতে পারে?!'
সাথে সাথে বৃদ্ধ ছেলেদের ডেকে পাঠালেন। তাদের বললেন, তাকে নিয়ে সৌদি 'আরবে ফিরে যেতে; কারণ, তিনি কিডনী বসানোর চিন্তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাদের আরও আদেশ দিলেন, তারা যেন ওই মেয়েকে এক লক্ষ রিয়াল সাদাকah করে দেন এবং তার কাছ থেকে এক রিয়ালও ফেরত না নেন।
ছেলেরা প্রতিবাদ করে উঠল। কেউ কেউ রেগেও গেল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবার আদেশ তারা মেনে নিল। সৌদি 'আরবে ফিরে আসার পর একদিন যথারীতি কিডনী ডায়ালাইসিসের জন্য বৃদ্ধ হাসপাতালে গেলেন। ডাক্তাররা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল যে, তার কিডনী আগের মতো কাজ করছে!
রাজাধিরাজ মহান আল্লাহ্ কাউকে সুস্থতা দান করতে চাইলে কোনো ডাক্তার-সার্জনের দরকার পড়ে না। সেই মহান রাজা তাঁর রাজত্ব থেকে বান্দার দিকে একবার নজর দেন—তাতেই অসুস্থ বান্দা হয়ে যায় সুস্থ, বিপদগ্রস্ত হয়ে যায় বিপদমুক্ত, মুসাফির হয় চিন্তামুক্ত আর ক্ষতবিক্ষত বান্দা হয়ে যায় ক্ষতহীন।
আগের থেকেই সময় চাওয়া
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনি তাঁর দিকে ফিরে আসেন। আপনি তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করলেই তিনি রোগটাকে আপনার শরীর থেকে তুলে নেন। কারণ, তখন আপনার শরীরে রোগ থাকার মাঝে আর কোনো কল্যাণ নেই।
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনি তাঁর প্রতি বিনয়ী হন, তাঁর দিকে নত হন। আপনি এমনটা করলে তিনি আপনার শরীর থেকে রোগটা তুলে নেন। কারণ, তখন রোগের আর কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনি অন্যের ব্যথা বুঝতে পারেন। তাদের ব্যথা বুঝতে পারলে আপনার রোগটা তিনি তুলে নেন। ফলে এই রোগ থাকার মাঝে আর কোনো কল্যাণ অবশিষ্ট থাকে না।
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনার ধৈর্য ও সন্তুষ্টি পরীক্ষা করতে পারেন। আপনি যদি ধৈর্যধারণ করেন এবং আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন তাহলে রোগ আপনার শরীরে থাকার কোনো দরকার পড়ে না।
আরোগ্যদাতা আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য আগে থেকেই সময় চেয়ে রাখার দরকার নেই। আপনাকে কোনো ভিজিটিং কার্ডও দেখাতে হবে না। নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগে আসতে হবে—এমনটাও না।
শুধু বলুন, 'আল্লাহ্' দেখবেন, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার হাসপাতালের দরজা খুলে গেছে। এ হাসপাতাল শুধু দয়া, করুণা, কোমলতা ও সুস্থতার চাদরে ঢাকা।
আমার এক বন্ধু প্রায়ই তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা বলে থাকে। একবার একটি ছেলে তার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে এবং সাথে সাথেই ছেলেটির হাড় ভেঙ্গে যায়। সে গাড়ি থামিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটে যায়। তার বুকটা তখন দুরু দুরু করে কাঁপছে। এদিকে ছেলের বাবা আর দাদাও হাজির। আমার বন্ধু খুব বিচলিত হয়ে পড়ল। সে ভাবতেই পারছে না—তার কারণে একটি ছেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।
ছেলেটির হাড় ভাঙার শব্দ তার কানে সারাক্ষণ বাজতে থাকে; কিন্তু ছেলেটির দাদা এসে আমার বন্ধুকে সান্ত্বনা দেন। তাকে জানান, আল্লাহ্ যা লিখে রেখেছেন তাই-ই তো হবে। এর বাইরে কার কী করার আছে? বরং এতেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকা চাই।
ছেলেটির দাদা তাদের নিয়ে হাসপাতালের মাসজিদেই 'ইশার সালাত আদায় করেন। সালাতে তিনি তিলাওয়াত করেন, 'ওয়াবাশিরিস্ সাবিরীন'- 'আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করুন।' আমার বন্ধুটা এই তিলাওয়াত শুনে ডুকরে কেঁদে ওঠে।
সালাতের পর যখন তারা বেরিয়ে আসে, ডাক্তাররা ছেলের বাবা আর দাদাকে জানায়, ছেলের বেঁচে থাকার আশাটা ক্ষীণ। তার খুলিতে ফ্র্যাকচার দেখা দিয়েছে।
এ কথা শুনে আমার বন্ধু যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। নির্জীব হয়ে সে ঘরে ফিরে আসে। এক সপ্তাহ সে অফিসে পর্যন্ত যেতে পারেনি; কারণ, ঘটনার আকস্মিকতায় সে একেবারেই ভেঙে পড়েছে।
ওই ছেলেটার জন্য কোনো ঔষধই আর বাকি ছিল না; কিন্তু তার দাদার 'ঈমান, মায়ের দু'আ, বাবার দৃঢ় বিশ্বাস এবং সবার সাথেই আল্লাহর গভীর সম্পর্ক- ছেলেটিকে শেষ পর্যন্ত সুস্থ করে তুলল।
এক সপ্তাহের মাথায় আমি নিজে ওই ছেলেকে দেখতে গেলাম। ছেলেটা হাসছে- খেলছে-হাঁটছে আর আমাদের সাথে কথা বলছে। আল্লাহ্র কথা সত্য প্রমাণিত হলো আর ডাক্তারদের কথা মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। যে সত্তা ভাঙা হাড়ে জোড়া লাগাতে পারেন তার কথাই সত্য বলে প্রতীয়মান হলো। 'আল্লাহ্ মানুষের জন্য রাহমাত অবারিত করলে তা নিবারণকারী কেউ নেই।'
কে সেই সত্তা, যিনি এই ভাঙা হাড়গুলো জোড়া লাগাতে পারেন? মলিন মুখে হাসি ফোটাতে পারেন এবং কবরের দরজায় উপস্থিত শরীরে নতুন করে রূহের সঞ্চার করতে পারেন? আর কেউ নয়, একমাত্র আল্লাহই তা করতে পারেন।
একটি রেখা
নাবীদের পিতা ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম, নিজ রবের কাছ থেকে পবিত্র আত্মা নিয়ে এসেছিলেন। তার অন্তর ছিল সামান্য পরিমাণ শির্ক থেকেও মুক্ত। তিনি যা বলেছেন তা মু'মিন-মাত্রই বুঝতে পারবে। মু'মিন শুধু চিরঞ্জীব আল্লাহর কাছেই আশ্রয় নেবে। তিনি বলেছিলেন—
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ )
আর যখন আমি অসুস্থ হই তখন তিনিই সুস্থ করেন [১]
তিনি যদি আপনাকে সুস্থ করতে চান তাহলে আপনার আর কাউকেই দরকার হবে না; কিন্তু তিনি আপনাকে সুস্থ করতে না চাইলে বিশ্বলোকে এমন কেউ নেই—যে আপনাকে সুস্থ করতে পারে।
কুষ্ঠরোগে আইয়ূব 'আলাইহিস সালামের শরীর ভেঙে পড়ল। পরিবারও ভেঙে গেল। যে লোক সবচেয়ে আশাবাদী সেও তার সুস্থতার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়ল; কিন্তু তিনি অটল হয়ে ধৈর্যধারণ করে চললেন। তার শরীরে রোগ বাসা বেঁধে চলছে, কিন্তু তিনি মাথা নিচু করে মহান রবের সন্তুষ্টি কামনা করছেন। এভাবে কয়েক বছর কষ্ট পাওয়ার পর তার ঠোঁট থেকে একটি দু'আ বেরিয়ে এলো। এ দু'আয় ছিল বিনয়ের আধিক্য, সিজদারত মাথা আর দৃঢ় বিশ্বাসের শেকড়। দু'আটা ছিল—
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ )
আমি তো দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ ও দয়ালু [২]
সাথে সাথে আসমানের দয়ার দুয়ার খুলে গেল। সাত আসমানের ওপর থেকে সেই বিপদগ্রস্তের জন্য সাহায্য নেমে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই কষ্টের বছরগুলো উধাও হয়ে গেল। ঘনিয়ে এলো সুস্থতার পর্ব। তাহলে কেন আপনি অন্যের কাছে চাইতে যাবেন? কেন অন্যের দরবারে ধরনা দেবেন?
কেন ওই সব মৃত ব্যক্তিদের কাছে চাচ্ছেন—যারা আপনার আশেপাশে বিচরণ করছে? কেন চাইছেন না ওই রবের কাছে—যিনি চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর?
কে আপনাকে এই বুঝ দিয়েছে যে, অন্য রাস্তায় আপনার সুস্থতা আসবে?
আপনার সুন্দর জীবনের সূচনা কীভাবে হয়েছে আপনি তা ভুলে গেলেন? কীভাবে ভুলে গেলেন ওই সত্তাকে যিনি আপনাকে সুস্থভাবে আপনার মায়ের পেট থেকে পৃথিবীতে আপনার আগমন ঘটিয়েছেন? তারপর তার বুকেই আপনার জন্য উত্তম আহারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আপনি কিছুই জানতেন না। তিনি আপনাকে জানালেন, কীভাবে আপনি তার বুকে ঠোঁট রেখে পান করবেন, আপনি কি তা ভুলে গেলেন? আপনি কি ভুলে গেলেন সেই সত্তাকে—যিনি আপনার মায়ের অন্তরে রাহমাত দিয়েছেন যেন তিনি আপনাকে আদর-যত্ন করেন আর মমতায় জড়িয়ে রাখেন?
এত দ্রুত আপনি ভুলে গেলেন?
আপনি কি মনে করছেন, তাঁকে ছাড়াই আপনি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবেন?
এই যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনাকে রোগ দিয়ে আগের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এ রোগের মাধ্যমে তিনি বলছেন- 'ফিরে আসো আমার দিকে। যে আমি শূন্য থেকে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, সে আমিই তোমাকে রোগমুক্ত করব।'
সন্তুষ্টি
কখনো কখনো আপনার রোগের নিরাময় আপনার কল্পনার চেয়েও নিকটে থাকে। এই যেমন নাবী আইয়ূব 'আলাইহিস সালাম, তার কাছে আদেশ এলো-পা দিয়ে যমীনে আঘাত করো। সাথে সাথে যমীন ফেটে বেরিয়ে এলো :
'এই তো গোসলের সুশীতল পানি ও পানীয়।'
রোগের ঔষধ তার কাছেই ছিল। আরোগ্যলাভের ব্যাপারে শুধু আল্লাহর ইচ্ছেটাই বাকি ছিল। আল্লাহ্ চাইলেন আর সাথে সাথে আইয়ূব 'আলাইহিস সালামও জেনে গেলেন ঔষধের জায়গাটা। আল্লাহর ইচ্ছায় এ ঔষধেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন।
ওয়াশিংটন, প্যারিস কিংবা পেকিংয়ের উদ্দেশ্যে আপনার টিকেট কাটার দরকার নেই। আপনার ঔষধ কাছেই কোথাও আছে। আপনার অন্তরে সন্তুষ্টির শহরের একটা টিকেট কাটুন।
আপনার ঔষধ আপনার কাছেই আছে; আপনি হয়তো সেটা জানেন না। আপনার অসুখও আপনার দোষেই হয়েছে; হয়তো আপনি সবর করছেন না।
আপনি যদি আল্লাহ্র সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে পারেন, আল্লাহও আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।
রোগ হলো আল্লাহ্র সন্তুষ্টির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় আপনি যদি আল্লাহকে সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেন, তাহলে তাঁর সন্তুষ্টির ফল অবশ্যই আপনি ভোগ করতে পারবেন।
কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, 'রোগাক্রান্ত হয়েও কীভাবে আমি সন্তুষ্ট হবো? রোগাক্রান্ত হলে সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই মানুষের ব্যথা-বেদনা অনুভূত হয়। যা শুধু আমিই নই, যে কেউ তা অপছন্দ করে; তো এতে কীভাবে আমি সন্তুষ্ট হবো?'
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ এ জিজ্ঞাসার সুন্দর জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন- 'এর মাঝে আপাত কোনো বিরোধ নেই যে, বান্দা রোগাক্রান্তবস্থায় একই সাথে সন্তুষ্টও থাকবে, আবার ব্যথার কারণে রোগটাকে ঘৃণাও করবে। যেভাবে তিক্ত ঔষধে মানুষের আরোগ্য হয় বলে ঔষধের তিক্ততার প্রতি রোগীকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়, আবার কষ্টের জন্য রোগকে ঘৃণাও করতে হয়।'
সুতরাং আপনার নাবী আপনাকে যা আদেশ করেছেন তা অন্তরের গভীর থেকে উচ্চারণ করুন-
رضيت بالله ربا وبالإسلام دينا وبمحمد صلى الله عليه وسلم نبيا
'আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে নাবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।' [১]
হৃদয়ের গভীর থেকে পূর্ণ মনোযোগ আর অনুভূতির সাথে কথাগুলো উচ্চারণ করে দেখুন। আপনার অন্তরকে এ কথা মেনে নেওয়ার জন্য অভ্যস্ত করে ফেলুন। এই বাক্যের প্রস্রবণে আপনার অন্তরকে ভালোমতো ধুয়ে-মুছে পরিচ্ছন্ন করে ফেলুন। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট হওয়া তো আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ারই অংশ। আপনি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলে তিনিও আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।
আপনার অন্তরকে বলুন সন্তুষ্টির নিঃশ্বাস নিতে। বলুন এই সন্তুষ্টির স্বাদ আস্বাদন করতে। তারপর আপনার শরীরের দিকে মনোযোগ দিন। দেখবেন—শরীরে দেখা দিয়েছে এক ঝলমলে সুস্থতার নিদর্শন।
আপনার এই রোগ থেকেই যেন সূচনা হয় জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ের। আর সেই অধ্যায়টিতে আপনি নিজ রবের ‘আশ-শাফী’ তথা আরোগ্যদাতা নামটির সাথে পরিচিত হবেন।
পাপের নদীগুলো
আপনি তো জীবনে অনেকবার অসুস্থ হয়েছেন, তাই না? তো পূর্বের সেই ‘অনেকবার’ আপনাকে কে সুস্থ করেছেন? আল্লাহই তো, তাই না? তাহলে এবার কেন মনে হচ্ছে, ‘এই রোগের ব্যাপারে তিনি অক্ষম?’ আপনি বিশ্বাস করুন, তাঁর অক্ষমতার ব্যাপারে আপনার এই দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনাই আপনার জন্য শাস্তি অবধারিত করে ফেলে। আপনার এই ভুল ধারণাই শাস্তিস্বরূপ আপনার রোগ হয়ে যায়। আগে আপনার অন্তর থেকে দুর্ভাবনার এই রোগটা দূর করুন। তারপর আরোগ্যদাতা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। দেখবেন, আপনাকে তিনি সুস্থ করে তুলছেন।
হাসপাতালের এই অসুস্থ লোকগুলো আরোগ্যদাতা আল্লাহর কাছ থেকে সুস্থতার অনুমতির অপেক্ষায় আছে। এ হাসপাতালগুলোর প্রতিটি আর্তনাদ, চিৎকার ও হাহাকার তিনি জানেন। অন্তরের গহীনের ব্যথা তিনি দেখতে পান।
অতঃপর যখন তার চাওয়া পূর্ণ হয়, আপনার আর্তনাদে পাপের নদীগুলো প্রবাহিত হয়ে যায়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তখন আপনার শরীরে সুস্থতাকে ফিরে আসার অনুমতি দেন। আপনি আল্লাহর যমীনে পাপমুক্ত হয়ে পবিত্র দেহে বিচরণ করা শুরু করেন।
তিনি যে পরম দয়ালু; তাই তিনি আপনাকে সুস্থ করে দেন। তিনি যে মহাজ্ঞানী; সে জন্যই আপনাকে তিনি সুস্থ করেন। তিনি যে সহনশীল; তাই তো আপনাকে সুস্থ করেন। তিনি যে ক্ষমতাবান; তাই তো আপনাকে তিনি সুস্থ করেন। তিনি যে আল্লাহ; তাই তো আপনাকে সুস্থ করেন।
তিনি সাথে থাকলে আপনার স্মৃতি থেকে ডাক্তারদের নাম আর ফোন নাম্বার মুছে যাবে। হাসপাতালগুলোর ঠিকানা আপনি ভুলে যাবেন। ডাক্তারের সাথে এ্যাপোয়েন্টমেন্ট আপনি বাতিল করে দেবেন।
আপনার ঘরে একটা নতুন হাসপাতাল গড়ে তুলুন। সে হাসপাতালের নাম হোক ‘জায়নামায’। সিজদার জন্য সময় বরাদ্দ রাখুন। কারও অসুস্থতায় নিয়মিত এই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য সময় ব্যয় করুন অন্তরে একটা নাম জপতে থাকুন—‘আশ-শাফী’।
হে আল্লাহ্, হে আরোগ্যদাতা, প্রতিটি দুর্বল আত্মা, প্রতিটি দুর্বল শরীর আর প্রতিটা অসুস্থ হৃদয়ের জন্য লিখে রাখুন সুস্থতা আর দয়ার ঘোষণা।
টিকাঃ
[১] রোগমুক্তির জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির পাশে কুর'আন তিলাওয়াত করা।
[১] সূরা ইয়াসিন, ৩৬: ৮২
[১] সূরা শু'আরা, ২৬: ৮০
[২] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৮৩
[১] তিরমিযী, মিশকাত, ২৩৯৯
📄 আল-ওয়াকীল তথা পরম নির্ভরযোগ্য
আল্লাহর কাছে চাইলে আপনার কল্পনাও সত্যি হয়ে যাবে। আপনার ধারণাও বাস্তবে পরিণত হবে। আপনার আশার বস্তুগুলো তিনি বাস্তবে রূপান্তর করে দেবেন। আপনার স্বপ্নগুলো তিনি সত্যি করে দেবেন।
আল-ওয়াকীল তথা পরম নির্ভরযোগ্য
আপনি কি নিজের দুর্বলতা অনুভব করতে পারেন? আপনার কাছে কি সারা দুনিয়া বিশাল মনে হয়? এ ব্যস্ততম জীবনের অধ্যায়ে নিজেকে একটা পাখির পালকের মতো মূল্যহীন মনে হয় কখনো?
আপনার কি মনে হয়, আপনি একটা দুর্বল পাখি-যার ডানাগুলো কেটে ফেলা হয়েছে? আপনার কি মনে হয়, চলার জন্য ডানাহীন পাখির মতো আপনারও সাহায্যের প্রয়োজন? আপনার কি এমন কিছু আছে, যেগুলোর ব্যাপারে আপনি ভয় করছেন? আপনি কি চাচ্ছেন এমন কারও কাছে এগুলো সংরক্ষণের ভার দিতে-যিনি সেগুলো হারাবেন না? হোক তা সন্তান, সম্পত্তি, স্বাস্থ্য বা জীবন?
তাহলে আল্লাহ্র মহান নাম 'আল-ওয়াকীল' তথা 'পরম নির্ভরযোগ্য'-এই নামের আলোয় আলোকিত হোন।
এই মহান নামের সাথে নতুন করে পরিচিত হোন। এ নামের অর্থে গভীরভাবে পদচারণা করুন। নিজের দুর্বলতা, দুশ্চিন্তা, একাকিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যান। আল-ওয়াকীলের ছায়ায় আপনি আশ্রয় নিন।
তাঁকে পরম আস্থাভাজন হিসেবে মেনে নিন
পরম নির্ভরযোগ্য কেবল তিনিই যার ওপর আপনার সকল নির্ভরতা সঁপে দিতে পারেন, আশ্রয়ের প্রয়োজনে যার নিকট আশ্রয় নিতে পারেন, আপনার সকল আশা-ভরসা যার সাথে সম্পৃক্ত করে দিতে পারেন।
আপনি যে কাজেই আল্লাহ্ ওপর নির্ভর করবেন সে কাজের কথা ভুলে গেলেও চলবে আপনার; কারণ, যদি আপনি আল্লাহর ওপর নির্ভর করেন, তাহলে এমন একজনের ওপর আপনি নির্ভর করলেন, যিনি সকল কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। আসমান-যমীন তারই সামান্য সৃষ্টি। তিনিই রক্ষা করেন এবং তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন।
তিনি নিজ সত্তার মহত্ত্ব ঘোষণা করে বলেন-
رَّبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَاتَّخِذْهُ وَكِيلًا ۚ
'তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। অতএব, তাঁকেই আপনি গ্রহণ করুন কর্মবিধায়করূপে।' [১]
পূর্ব-পশ্চিমের রব নিজেই তাঁকে আপনার কর্মবিধায়ক ও আস্থাভাজন করে নিতে বলেছেন। এর থেকে স্বস্তি, মর্যাদা ও তাওফীকের বিষয় আর কী হতে পারে?
তিনি চান, আপনি শুধু এ কথাটা অন্তর থেকে বলুন, 'আল্লাহ্, আপনি আমার তত্ত্বাবধায়ক।'
এ পৃথিবীর বুকে এমন কোনো ধনী লোক কি আছে, যে আপনাকে শুধু তার সাহায্যেই চলতে বলবে? শুধু তার ওপরই নির্ভর করতে বলবে? শুধু তার কাছেই আশ্রয় নিতে বলবে? নাহ্, এমন কোনো ধনী লোকের অস্তিত্বই পৃথিবীতে নেই। কারণ, আপনাকে সব বিপদাপদ থেকে রক্ষা করার, আপনার জন্য যথেষ্ট হওয়ার কিংবা আপনাকে সব কাজেই সহযোগিতা করতে পারার ক্ষমতা কোনো মানুষই রাখে না
একমাত্র আল্লাহই এমনটা বলেন, করেন এবং করার ক্ষমতা রাখেন।
আল্লাহ্ ওপর নির্ভরতা অন্তরের দৃঢ়তার এক নিদর্শন। এ নির্ভরতা আপনাকে বিশাল ছাতার নিচে জায়গা করে দেবে। এ ছাতা আপনাকে দুশ্চিন্তার রোদ, বিপদের বৃষ্টি আর দুনিয়াবী দুশ্চিন্তার বাতাস থেকে রক্ষা করবে।
ওই ব্যক্তিই বঞ্চিত, যে এই ছাতা গ্রহণ করতে পারে না, বা এই ছাতার নিচে আশ্রয় নিতে পারে না।
সুমহান রাজা ও সর্বশ্রেষ্ঠ রব আপনাকে আদেশ দিয়েছেন তাঁকে পরম নির্ভরযোগ্য হিসেবে মেনে নিতে। তিনি আপনাকে বলেছেন আপনার সকল প্রয়োজন তাঁর দুয়ারে উপস্থাপন করতে; কারণ, তিনিই আপনার প্রয়োজনগুলো পূর্ণ করেন। তিনি বলেছেন তাঁর কাছেই আশ্রয় নিতে; যেন অবিশ্বাসের তির আপনাকে বিদ্ধ না করে। তিনি বলেছেন, তাঁর দিকেই আপনার সকল বিষয় ন্যস্ত করতে; যেন সব কাজ সুষ্ঠু ও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়। প্রশ্ন হলো, আপনি কীসের অপেক্ষা করছেন? কী কারণে আপনি নিজেকে এ অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করছেন?
আপনি এই আয়াতগুলো পড়ুন-
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَتَكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ *
আর আপনি নির্ভর করুন পরাক্রমশালী পরম দয়ালু আল্লাহ্র ওপর, যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি দাঁড়ান, এবং সিজদাকারীদের মাঝে আপনার উঠা বসা (১)
কী সেই মহান বিষয়, মারাত্মক বিপদ বা কঠিন দুর্ভাবনা-যা এই মর্যাদাবান রবের জন্যেও কঠিন? আল্লাহই তো সকল মর্যাদার অধিকারী, তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আপনি চারদিকে যে মর্যাদা ও প্রতিপত্তির কথা শুনতে পান তার রব তো একমাত্র আল্লাহই। তাহলে সকল মাহাত্ম্য, বড়ত্ব ও মর্যাদার অধিকারী রবের সামনে আপনার বিপদ কীভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবে?
বাৎসরিক পরিকল্পনা
আল্লাহ্র 'ইবাদাত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টির ওপর ভরসা করবেন সেটি হলো, আপনার সকল নির্ভরতা ও আস্থা অন্যদের থেকে ঝেড়ে ফেলে জিহ্বা দিয়ে বলার আগে অন্তরেই বলবেন-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ .
আমরা আপনারই 'ইবাদাত করি আর আপনার কাছেই সাহায্য চাই। [২]
আপনি তাঁর 'ইবাদাত করার লক্ষ্যে তাঁর কাছে সাহায্য চাইবেন, তাঁর ওপর ভরসা করবেন আর শুধু তাঁর কাছেই শক্তি কামনা করবেন।
এটা কল্পনাই করা যায় না যে, আল্লাহ্ আপনাকে তাঁর 'ইবাদাত করতে এবং তাঁর ওপর নির্ভর করতে বলবেন, অতঃপর যখন আপনি তাঁর ওপর নির্ভর করবেন তখন তিনি আপনাকে অপমানিত করবেন; এটা স্রেফ অসম্ভব; এ হতেই পারে না। আপনি তাঁর কাছে পূর্ণ ভালোবাসার সাথে তাঁর 'ইবাদাতের ব্যাপারে সাহায্য চাইবেন, অথচ তিনি আপনাকে সাহায্য করবেন না-এমনটা কখনোই হতে পারে না।
তবে নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বাণী বেশি বেশি পড়বেন-
اللهم أعنى على ذكرك وشكرك وحسن عبادتك
আল্লাহ্, আপনার যিক্র, আপনার কৃতজ্ঞতা আর আপনার উত্তম 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করুন [১]
আমি কি 'বেশি বেশি' পড়তে বললাম?
তাহলে স্যরি বলছি; শুধু 'বেশি বেশি' পড়বেনই না; বরং দৈনিক রুটিন, বাৎসরিক পরিকল্পনা ও জীবনের লক্ষ্য বিনির্মাণে এই দু'আ যেন সবসময় চলমান থাকে।
এর কারণ হলো, যদি তিনি আপনাকে সাহায্য না করেন, তাহলে এমন কোনো শক্তি নেই-যা আপনাকে সাহায্য করতে পারে; তিনি যদি আপনাকে সাহায্য না করেন, তাহলে আপনি কিছুই করতে পারবেন না; তাঁর সাহায্য না পেলে আপনি দুনিয়া ও 'আखিরাত উভয়টাই হারাবেন।
ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ হতে বর্ণিত, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, 'আমি সবচেয়ে উপকারী দু'আ খুঁজতে লাগলাম। আমার কাছে মনে হলো, সে দু'আটি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাপারে তাঁরই সাহায্য চাওয়া। দু'আটি খুঁজে পেলাম সূরা ফাতিহার 'ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতা'ঈন' আয়াতে।”
তিনি আরও বলেন, 'অন্তরের দুটি বড় রোগ হয়। বান্দা যদি এই দুটি রোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পারে, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। এ দুটি হলো লৌকিকতা এবং অহংকার। লৌকিকতার ঔষধ হলো 'ইয়্যাকা না'বুদু' আর অহংকারের ঔষধ হলো 'ইয়্যাকা নাসতা 'ঈন'।' শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ-কে বার বার বলতে শুনতাম, 'ইয়্যাকা না'বুদু' হলো লৌকিকতার ঔষধ। 'ইয়্যাকা নাসতা'ঈন' হলো অহংকারের ঔষধ।
এইমাত্র যে সালাত আদায় করলেন, এ সালাতের ব্যাপারেও আল্লাহ্ যদি আপনাকে সাহায্য না করতেন তাহলে কোনোভাবেই তা আপনি আদায় করতে পারতেন না।
তাঁর জন্য বিনয়ী হোন
তিনি দয়ালু। তাঁর দুয়ারে আপনার প্রয়োজনের ঝুলিটা বাড়িয়ে ধরুন। শুধু আপনার হৃদয়টা তাঁর জন্য বিনয়ী করে দিন। তাঁর কাছে দু'আ না করলেও বিনয়ী হোন অন্তত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনার থেকে এই বিনয়ী ভাবটাই তো চান। আপনি নিশ্চিত থাকুন যে, এরপর থেকে তিনি আপনার সব প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন। আপনার অসুস্থতা দূর করে দেবেন। আপনার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস ফুটিয়ে দেবেন।
আল্লাহ্র কাছে চাইলে আপনার কল্পনাও সত্যি হয়ে যাবে। আপনার ধারণাও বাস্তবে পরিণত হবে। আপনার আশার বস্তুগুলো তিনি বাস্তবে রূপান্তর করে দেবেন। আপনার স্বপ্নগুলো তিনি সত্যি করে দেবেন।
আর নির্ভর করুন পরাক্রমশালী পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর—যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি দাঁড়ান।[১]
যার জন্য আপনি সালাতে দাঁড়ালেন, যার জন্য মাটিতে কপাল ঠেকালেন, যার জন্য মাথা নোয়ালেন, তাঁর কাছেই তো আপনি নিজের প্রয়োজনের কথা জানাবেন। তাঁর দিকেই তো আপনার সুস্থতার ভার দেবেন। তিনিই তো হবেন আপনার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তিনিই আপনার তো স্বপ্নপূরণে সহায়ক।
আপনি আল্লাহ্র রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরুন। অন্য কেউ বিশ্বাস ঘাতকতা করলেও তিনি আপনার প্রকৃত নির্ভরতার স্থান।
একবার এক সৎকর্মশীলা মায়ের ছেলে বাইরের দেশে পড়াশোনা করার ব্যাপারে মনস্থ করল। বাইরের দেশগুলোতে পড়তে গিয়ে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঘটনাগুলো মা শুনেছিলেন; কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে রাজি হতেই হলো। তিনি জানতেন যে, আল্লাহ্ তার ছেলেকে রক্ষা করতে সক্ষম। তাই নিজের ছেলের জন্য সালাতে সবসময় দু'আ করতেন। ছেলে পড়াশোনা শেষে যথারীতি দেশে ফিরে এলো। মা দেখতে পেলেন তার ছেলের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সে মাসজিদমুখী হয়ে গেছে। সে বেশি বেশি সালাত আদায় করছে, ভালো কাজের আদেশ করছে ও খারাপ কাজের নিষেধ করছে। আগে সে যা অর্জন করেনি তা সে এবার অর্জন করতে শুরু করেছে। আগে যা অর্জন করা তার জন্য কষ্টসাধ্য ছিল এখন তা সে সহজেই অর্জন করতে পারছে।
আমরা কীভাবে ভাবতে পারি যে, পরম নির্ভরযোগ্য আল্লাহ্ তা'আলা এমন মায়ের ছেলেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারেন, যে মা সবসময় বিনয়ের সাথে চাইতেন—'আল্লাহ্, আমার সন্তানকে রক্ষা করুন। আপনার ওপরই আমি নির্ভর করলাম। ছেলের ব্যাপারে আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না।'
অশ্রুসজল চোখ ও মুচকি হাসি
যদি দুনিয়ার কোনো রাজা আপনাকে বলে, 'আমার ওপর নির্ভর করো, আমি তোমার প্রাপ্য ওই অত্যাচারীর দখল থেকে আদায় করে দেবো। তুমি শুধু আমার ওপর নির্ভর করে এ কাজে আমাকে নিযুক্ত করো।' তাহলে আপনার কি কোনো সন্দেহ থাকবে যে, আপনার প্রাপ্য আপনি পাবেন না? ওই রাজার যে কোনো সহকারীর একটা কলমের আঁচড়েই তো সেই অত্যাচারী কাঁপতে কাঁপতে এসে আপনার প্রাপ্য আপনাকে বুঝিয়ে দেবে। তাহলে যদি রাজা নিজেই কাজটা করে দেন তাহলে কেমন হবে?
আগের রাজা, রাজার সহযোগীর কথা বাদ দিন। এই আয়াতটি পড়ুন—
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ
আর আপনি নির্ভর করুন ওই চিরস্থায়ী সত্তার ওপর—যিনি চিরঞ্জীব [১]
আপনার ভেতরে এতক্ষণে প্রয়োজনের সকল চিত্র উধাও হয়ে গেছে, তাই না? আপনার মনে আর কোনো ভয় নেই, নেই দুর্ভাবনা বা দুশ্চিন্তার ছাপ।
আল্লাহ্ আপনার সকল সমস্যার সমাধান করে দেবেন। আপনার সব ব্যথা মুছে দেবেন, স্বপ্নগুলো সত্যি করে দেবেন। ফলে আপনার অশ্রুজল পরিণত হবে মুচকি হাসিতে।
আপনি মারা যেতে পারেন; কিন্তু চিরস্থায়ী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা চিরঞ্জীব। আপনার মৃত্যুর পর আপনার ছেলেদের তিনি দেখে রাখবেন। আপনার রেখে যাওয়া ছেলেদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে না। যেই চিরস্থায়ী আল্লাহ্ চিরঞ্জীব আর আপনি মরণশীল, সেই আল্লাহই তো তাদের জন্য যথেষ্ট। তিনি তাদের সাথে থাকবেন। তাদের অবস্থা দেখে দয়া করবেন। তাদের সুখী করবেন। আপনার জীবদ্দশায় তারা যে অবস্থায় ছিল, তার থেকে ভালো অবস্থা ফিরিয়ে দেবেন। কেননা, তিনি তো সেই চিরস্থায়ী আল্লাহ্-যিনি মৃত্যুবরণ করেন না।
জীবনের অক্সিজেন
কেউ যদি আপনার ওপর অত্যাচার নাও করে-তবু আল্লাহর উপর নির্ভর করুন। নির্ভরতা শুধু অত্যাচারীর অত্যাচার থেকেই বাঁচায়; শুধু নির্ধারিত কাজেই সাহায্য করে-এমন নয়, নির্ভরতা আপনার জীবনে অক্সিজেনের মতো। আপনি কি অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারবেন?
সুস্থ অবস্থায়ও আল্লাহ্ ওপর নির্ভর করুন। আপনার হৃৎস্পন্দন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া, শরীরে রক্তের প্রবাহ, খাদ্যের পরিভ্রমণ-এ সবই ছেড়ে দিন আল্লাহর হাতে।
তিনি যদি আপনার চোখের পাতা বধ করার অনুমতি না দিতেন তাহলে তো চোখ দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত। তিনি যদি আপনার জিহ্বাকে স্বাদ আস্বাদনের সক্ষমতা না দিতেন তাহলে আপনার কাছে এ জীবনটা অর্থহীন মনে হতো। তিনি যদি আপনার চামড়াকে অনুভব করার শক্তি না দিতেন তাহলে আপনি টের না পেলেও তা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত।
সন্তানদের ভালো হওয়ার ব্যাপারে নির্ভর করুন কেবল আল্লাহ্ ওপরই। এমন কত ছেলেকে দেখেছি, যারা মাসজিদে বড় হয়েও পরে নাস্তিক হয়ে গেছে। এমন ভয়ানক পরিণতি থেকে আমরা পানাহ চাই দয়াময় আল্লাহ্র কাছে। অনেক ছেলে আছে, যাদের হাতে বাবা-মা অর্থ ঢেলে দিয়েছে, সবচেয়ে বেশি যত্ন নিয়েছে; কিন্তু তারা নষ্ট হয়ে গেছে। আরও দেখেছি এমন ছেলেদের, যাদেরকে তাদের বড় ভাইয়েরা যত্ন-আত্তি দিয়ে ঘিরে রেখেছিল, তারপরও তারা বিচ্যুত হয়ে গেছে।
আপনার ছেলের অন্তরে হিদায়াতের জায়গাটা কতটুকু তা কেবল এক আল্লাহই জানেন। তাঁর কাছে চান—যেন তিনি আপনার অন্তরটা ‘ঈমানে’ পূর্ণ করে দেন। তাঁর ওপরই নির্ভর করুন। বিনয়ের সাথে তাকে বলুন, ‘হে আমার রব, এই আমার সন্তান। আপনি আমার রব, তাঁরও রব, তাঁকে আপনি হিদায়াত দিন, আপনাকে চেনার শক্তি দিন আর আমাকে তাঁর প্রতিপালনে সহযোগিতা করুন। হে আমার রব, আপনি যদি সাহায্য না করেন তাহলে আমি তো তাঁকে সালাত আদায় করার আদেশটাও ভালোভাবে দিতে পারব না। আপনি যদি সাহায্য না করেন, তাহলে সেও পারবে না আন্তরিকতার সাথে সালাত আদায় করতে। সুতরাং আমাদের সাহায্য করুন আপনার স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও উত্তম ‘ইবাদাত করার ব্যাপারে।’
আল্লাহ্ বিহীন জীবনটাই জাহান্নাম
আপনার জীবনের সফলতা অর্জনে নির্ভর করুন আল্লাহ্ ওপর। তিনি ছাড়া আপনার জীবনটা জাহান্নামে পরিণত হবে।
কেউ কেউ বলে, ‘তুমি নিজের স্ত্রীর প্রশংসা করবে। তাঁর এত প্রশংসা করবে যে, তাঁর মন জয় করে নেবে। তাঁর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবে, তাঁর সাথে সদ্ব্যবহার করবে। এভাবে তাঁর মন জয় করে নেবে, তাঁর ভালোবাসা অর্জন করবে।’
এর সবই সঠিক; কিন্তু এর আগে, মাঝে ও শেষে আপনি বলবেন, ‘আল্লাহ্, আমার স্ত্রীকে আমার জন্য ঠিক করে দিন।’ তাঁর ওপরই নির্ভর করুন, কেবল তাঁর কাছেই সাহায্য চান। তাঁকে ডেকে বলুন, ‘আমার সবগুলো মুচকি হাসির কোনো ফায়দা হবে না, যদি আপনি না চান।’
তাঁর কাছে বিনয়াবনত হয়ে বলুন, ‘আল্লাহ্, তাঁর অন্তরটা আপনার হাতে, আমার হাতে নয়। সুতরাং আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে দিন, দু’জনের মাঝে সমঝোতা করে দিন। আমাকে বানিয়ে দিন তাঁর আত্মার প্রশান্তি, অন্তরের শান্তি ও চোখের শীতলতাস্বরূপ আর তাঁকে বানিয়ে দিন আমার আত্মার প্রশান্তি, অন্তরের শান্তি ও চোখের শীতলতাস্বরূপ।’
আপনি যে দুর্বল, আপনার শক্তি যে সীমিত, আপনার সক্ষমতা যে স্বল্প, আর আল্লাহ্ একাই হলেন সর্বশক্তিমান, সুদৃঢ় ও মহান—এ স্বীকৃতিটা আল্লাহ্ আপনার থেকে চান। আপনি যদি এটা স্বীকার করে নেন, তাহলে নির্ভরতার তিন-চতুর্থাংশ হয়েই গেল। এ নির্ভরতাটা যদি করতে পারেন তাহলে দেখবেন আপনার আশেপাশে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে। বিশ্বাস করুন, দেখবেন সবকিছুর পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।
আপনার প্রয়োজন, দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসুন। ধরুন—আপনি এমন একজন মানুষ যার কোনো প্রয়োজন নেই, কোনো স্বপ্ন নেই, কোনো দুশ্চিন্তা নেই, কোনো রোগ নেই। তারপরও আপনাকে তাঁর ওপরই নির্ভর করতে হবে; যেন তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। আপনি কি চান না, তিনি আপনাকে ভালোবাসবেন?
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
'নিশ্চয় আল্লাহ্ তাওয়াক্কুলকারী-(নির্ভরকারী)-দের ভালোবাসেন [১]'
আল্লাহ্ বান্দাকে ভালোবাসেন-যে লোকের অন্তরে সামান্য বিনয়ও আছে, সেও এ কথা শুনলে তার অন্তরটা কেঁপে উঠবে, তার আত্মাটা তীব্র এক আকাঙ্ক্ষা ও কামনায় বিগলিত হয়ে যাবে। যেই আল্লাহ্ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। অন্তত এ কারণটাই যথেষ্ট তাঁর ওপর নির্ভর করার জন্য।
আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট
কিছু মানুষ এসে আপনাকে পেছনে হটার পরামর্শ দেবে। তারা নির্মম বাস্তবতার কিছু নমুনা আপনার কাছে পেশ করে আপনার অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসটা নাড়িয়ে দেবে। তারা আপনার অনুভূতি নিয়ে খেলা করবে। তারা আপনাকে বলবে, আপনার অবস্থান থেকে সরে এসে আপনার মূল্যবোধকে ছেড়ে না দিলে আপনার বিপদের আশংকা থাকবে। এ অবস্থায় আপনি আপনার অন্তরটা 'ঈমান দিয়ে ধৌত করবেন। শুধু বলবেন, 'আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তাঁর ওপরই আমার পরম নির্ভরতা।' এ কথা বলার সাথে সাথে আপনি আল্লাহ্র দয়া ও অনুগ্রহ পেয়ে যাবেন। আপনার আর কোনো ক্ষতি হবে না। এই আয়াতটা মনোযোগ দিয়ে পড়ুন-
الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَنَا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ فَانقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ لَّمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءُ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ ()
এদেরকে লোকেরা বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জড়ো হয়েছে; কাজেই তোমরা তাদের ভয় করো; কিন্তু এ কথা তাদের 'ঈমানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক। তারপর তারা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছিল, কোনো অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি এবং আল্লাহ্ যাতে সন্তুষ্ট তারা তারই অনুসরণ করেছিল এবং আল্লাহ্ মহান অনুগ্রহশীল (১)
খারাপ কিছুতে আক্রান্ত হওয়া—এরকমটা নিঃসন্দেহে হবে না; বরং যে বিপদ থেকে আপনি সামান্য পরিমাণও নিষ্কৃতি পাবেন না বলে মনে করেছিলেন, সে বিপদ তো আপনাকে স্পর্শই করবে না। আপনার চামড়ায় সামান্য পরিমাণ ক্ষতও তৈরি হবে না। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনার বিন্দুমাত্র আফসোসও করা লাগবে না এ নির্ভরতার জন্য।
মন থেকে আয়াতটা পড়ুন—
وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا *
আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই তো যথেষ্ট [২]
আপনি যদি আল্লাহর ওপর নির্ভর করেন তাহলে এটা মনে করবেন না যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে নির্ভর করার মতো না পেয়ে আপনি তাঁর কাছে এসেছেন। না, কখনোই নয়; বরং সৃষ্টজীব মহান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ যে সত্তার ওপর নির্ভর করতে পারে, আপনিও তাঁর ওপরই নির্ভর করছেন।
কেউ কেউ বলে, 'দু'আ ছাড়া আমাদের কিছুই করার নেই।' আশ্চর্য! আপনার কাছে এর চেয়ে শক্তিশালী আর কী আছে?
দু'আ-ই তো নির্ভরতার সোপান। দু'আ মুখের কথায় পরিণত হওয়ার আগে অন্তরের এক দৃঢ় বিশ্বাস ধারণ করে থাকে। এ বিশ্বাস হলো, 'আল্লাহ্ সুবহানাহু সব কিছুই করতে পারেন।' আর এটাই নির্ভরতার সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র।
যে বলে, 'অমুকের তো আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপায় নেই।' তাকে বলে দিন, ‘আল্লাহই তো তার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যথেষ্ট। আল্লাহকে পেয়ে সে কতই-না ধন্য। তার কীসের কমতি থাকবে যদি তার সাথে রাজাধিরাজ ও আসমান-যমীনের রব আল্লাহই থাকেন?
তোমরা দুনিয়ার সব কিছু নিয়ে নাও, আমার আত্মাটা শুধু স্বাধীন রেখে দাও। এতে তোমরা আমাকে নিঃস্ব মনে করলেও আমিই তোমাদের মাঝে সবচেয়ে ধনী।
যৌক্তিক কারণ
আচ্ছা, আপনি জানেন, শুধু আল্লাহ্র ওপর নির্ভরতাই যথেষ্ট কেন? এখানে একটা যৌক্তিক কারণ আছে। সেটা হলো, আল্লাহ্ হলেন যমীন ও আসমানসমূহের মালিক-
وَ لِلّٰهِ مَا فِى السَّمٰوٰتِ وَمَا فِى الْاَرْضِ وَ كَفٰى بِاللّٰهِ وَكِیْلًاۙ
আর আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ্। আর আল্লাহই কর্মবিধায়ক রূপে যথেষ্ট [১]
আপনি যাকে ভয় পান, সে কি যমীনের বাসিন্দা না? যদি বলেন, 'হ্যাঁ', তাহলে সে তো আল্লাহ্রই মালিকানায়। আল্লাহই তার পরিচালক।
যে রোগ আপনাকে দুর্বল করে ফেলে; যা থেকে আরোগ্যলাভের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না, তা কি যমীনের না? তাহলে সেটাও তো আল্লাহ্ই মালিকানায় আছে। তিনি এ রোগকে আদেশ দিতে পারেন আপনার দেহ ত্যাগ করার।
আপনার যত দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা, ক্লান্তি, ব্যস্ততা- সবই কি যমীনের ভেতরে নয়? তাহলে এই যমীনটা যার—এই যমীনের সবকিছু যার, তাঁর ওপর ভরসা রাখুন। তাঁর এক আদেশে আপনার সকল দুঃখ-দুর্দশা-দুর্ভাবনা-দুশ্চিন্তা নিমিষেই মিলিয়ে যাবে।
আর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যেহেতু সব কিছুর স্রষ্টা। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। এজন্য সকল বিষয়ে আমরা শুধু তাঁরই ওপর ভরসা রাখব-
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ )
আল্লাহ্ সকল কিছুর স্রষ্টা। তিনি সবকিছুর ওপর কর্মবিধায়ক (১)
একবার ভেবে দেখুন, 'হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল'- 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট আর তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।'
আমাদের জন্য আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউই নেই। তিনিই তো সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক। তাঁর থেকে মহান, বেশি মর্যাদার আর কেউ নেই।
সাবধান হোন
নির্ভরতার জায়গায় তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে রাখার ব্যাপারে সাবধান থাকুন। সাবধান থাকুন তিনি ব্যতীত অন্য কারও কাছে আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারেও। অন্যথা আপনি দুর্বল হয়ে পড়বেন। দুর্ভাবনা আপনাকে আক্রমণ করে বসবে। আপনার হৃদয় দুনিয়ার ভাবনায় মত্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
أَلَّا تَتَّخِذُوا مِن دُونِي وَكِيلًا )
তোমরা আমার পরিবর্তে কর্মবিধায়ক হিসেবে কাউকে গ্রহণ না করো। (২)
চিরস্থায়ী তিনি থাকতে অন্য কাউকে খোঁজা, অন্য কারও ওপর নির্ভর করা, সংরক্ষণকারী তিনি থাকতে কারও কাছে আশ্রয় নেওয়া আপনার জন্য হারাম।
তিনি যে সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী-তাই তাঁর ওপর নির্ভর করবেন। তিনি গোপনে সংঘটিত সব কিছুই শুনতে পান। গভীর অমানিশায় যা কিছু ঘটে থাকে তার সবই তিনি অবগত। আপনি কীভাবে অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে পারেন—অথচ তিনি ছাড়া আর কেউ গোপনীয় বিষয়গুলো শোনে না, জানেও না?
وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
আর নির্ভর করো আল্লাহ্র ওপর, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী [১]
যে অত্যাচারী আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে সে তো আপনার রক্ষাকারী রবেরই সৃষ্ট। তাই নির্ভর করুন আল্লাহ্ ওপর, তিনিই অন্যের দেওয়া কষ্ট থেকে আপনাকে রক্ষা করবেন। পরিপূর্ণ সাহস নিয়েই বলুন-
إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ رَبِّي وَرَبِّكُمْ مَّا مِن دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ ءَاخِذُ بِنَاصِيَتِهَا *
আমি তো নির্ভর করি আমার ও তোমাদের রব আল্লাহ্ ওপর। এমন কোনো জীব-জন্তু নেই-যা তাঁর পূর্ণ আয়ত্তাধীন নয় [২]
শাইতান তার বাহিনী ও শক্তি নিয়ে মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়, ভয় দেখায়। তারপরও সে আল্লাহ্ ওপর নির্ভরকারী বান্দার কাছে পৌঁছতে পারে না-
إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانُ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ *
নিশ্চয় যারা 'ঈমান আনে এবং তাদের রবের ওপরই নির্ভর করে, তাদের ওপর তার কোনো আধিপত্য নেই।'[৩]
তাহলে কীভাবে অফিসের বস, খারাপ প্রতিবেশী, মন্ত্রী বা কোনো নেতা পৌঁছতে পারবে? স্মরণ করুন-
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ )
যে আল্লাহ্ ওপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট [৪]
যদি তাঁকে আপনার সকল কাজে সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করেন, তাঁর ওপরই নির্ভর করেন, ভরসা রাখেন, তাহলে অন্য কাউকে আপনার কখনো প্রয়োজনই হবে না। তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট। তিনিই আপনাকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন।
আল্লাহর দেওয়া নিরাপত্তা যদি আপনাকে চতুষ্পার্শ থেকে ঘিরে না রাখে, তাহলে আপনি ধ্বংস হয়ে যাবেন। এ জীবন অসুখ-বিসুখ, ক্লান্তি-শ্রান্তি, ষড়যন্ত্র-কূটকৌশলে ভর্তি। আপনাকে আল্লাহ্র রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া পেলে এই কেউটে সাপগুলো আপনার ওপর ছোবল হানতে থাকবে।
আমি আপনাকে ভয় দেখাচ্ছি না, এটাই বাস্তবতা।
শুধু বলুন, 'আল্লাহ্, আপনার ওপর ভরসা করলাম।'
আপনি কি অন্তর থেকে বললেন? এবার মুচকি হাসুন। দেখবেন, সব কেউটে সাপ উধাও হয়ে গেছে।
কিছু জিনিস আপনার জন্য হুমকি
আপনি যখন সকালে বাসা থেকে বের হন, তখন বাইরে আপনার জন্য ভয়াবহ দুর্ঘটনা, অসুখ সৃষ্টিকারী বায়ুপ্রবাহ, পতনোন্মুখ গর্ত, গালি দেওয়ার মতো খারাপ মানুষ, হিংসা করার মতো লোক অথবা এক কুটিল চাকুরিজীবী অথবা প্রতারক বিক্রেতা আপনাকে অনুসরণ করবে। তাই বের হওয়ার সময় আপনার নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দু'আ পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন সেটি আপনি পড়বেন-
بسم الله توكلت على الله، اللهم إني أعوذ بك أن أضل أوأُضل أوأزل أو أُزل أو أظلم أو أظلم أو أجهل أو يجهل على
আল্লাহর নামে, আল্লাহর ওপরই নির্ভর করছি। আল্লাহ, আপনার কাছে পানাহ চাই পথভ্রষ্ট করা, পথভ্রষ্ট হওয়া, পদস্থলন করানো, পদস্খলন হওয়া, অত্যাচার করা, অত্যাচারিত হওয়া, মূর্খ হওয়া বা মূর্খদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে। [১]
এবার আপনি স্বস্তির নিঃশ্বাস গ্রহণ করে বেরিয়ে পড়ুন। দেখবেন সব ভয় কেটে গেছে।
ঘুমিয়ে পড়লে আপনার পিঠ এলিয়ে দেওয়ার সময় তাঁকে স্মরণ করুন, আপনার দায়িত্ব তাঁর হাতেই ছেড়ে দিন; তাঁর আশায় ও তাঁরই ভয়ে।
আপনার রব আপনাকে আদেশ দিয়েছেন তাঁর ওপর ভরসা করতে; প্রতি মুহূর্তে আপনি এটি স্মরণ করবেন। আপনার তো তাঁকে প্রয়োজন। সুতরাং এ সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। এই উপহার ফিরিয়ে দেবেন না। এর অধিকারী হওয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন না।
আল্লাহ্, আপনার প্রতি আমাদের নির্ভরশীল করে দিন, আপনার কাছে আশ্রয়গ্রহণকারী হিসেবে কবুল করে নিন, আপনার প্রতি সুদৃঢ় 'ঈমান দ্বারা আমাদের আচ্ছাদিত করুন। মজবুত 'ঈমান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন অন্য সব সম্পর্ককে, টিকিয়ে রাখুন শুধু আপনার সাথের সম্পর্কটাই।
টিকাঃ
[১] সূরা মুয্যাম্মিল, ৭৩: ০৯
(১) সূরা শু'আরা, ২৬: ২১৭-২১৯
[২] সূরা ফাতিহা, ০১:০৫
[১] আবু দাউদ, ১৫২২
[১] সূরা শু'আরা, ২৬: ২১৮
[১] সূরা ফুরকান, ২৫ : ৫৮
[১] সূরা আলে ইমরান, ০৩: ১৫৯
(১) সূরা আলে-ইমরান, ০৩: ১৮৩-১৮৪
[২] সূরা আহযাব, ৩৩: ০৩
[১] সূরা নিসা, ০৪ : ১৩২
(১) সূরা যুমার, ৩৯ : ৬২
(২) সূরা বানী ইসরা'ঈল, ১৭: ০২
[১] সূরা আনফাল, ০৮: ৬১
[২] সূরা হুদ, ১১: ৫৬
[৩] সূরা নাহল, ১৬: ৯৯
[৪] সূরা তালাক, ৬৫:০৩
[১] হাদীসটি আবু দাউদ তার সুনান গ্রন্থে (৪/৪৮৬-৫০৯৬) উল্লেখ করেছেন।
📄 আশ-শাকুর তথা গুণগ্রাহী
আল্লাহ্র বদান্যতার কাছে সব হিসাবই বৃtha। কারণ, এ এমন এক বদান্যতা যা কোনো হিসাব মানে না। এ যে রবের পরম অনুগ্রহ।
আশ-শাকুর তথা গুণগ্রাহী
আপনি কোনো একজনের উপকার করলেন, কিছুদিন পর সেই আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করল-এমনটা ঘটেছে কি না জীবনে? এমনকি দেখা গেল, আপনাকে সে ভুলেই গেল। আপনার উপকারের কথাও তার মনে রইল না; অধিকন্তু এখন সে আপনাকে দেখলে মুখ ফিরিয়ে চলে।
নিঃসন্দেহে এটা কষ্টকর অভিজ্ঞতা।
এ পৃথিবী এমন অনেক মানুষ দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে আছে-যারা 'ধন্যবাদ' শব্দটি পর্যন্ত চেনে না। তারা এ কথাটিও যথাযথভাবে বলতে পারে না— 'আল্লাহ্ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন'।
একটু মুচকি হাসি তাদের কাছে অদেখা জগতের জ্ঞানের মতোই দুষ্প্রাপ্য লাগে। ছেড়ে দিন তাদের। তাদের মতো লোকেদের তিরস্কার করে নিজের জীবন নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তারা যে নিকৃষ্ট জীবন-যাপন করছে, সেটা নিয়ে ভাবারও কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি গুণগ্রাহী আল্লাহ্ দিকে ফিরে যান। তারা আপনার অন্তরে যে ভাঙন ধরিয়ে দিয়েছে—তা পুনর্নির্মাণ করার জন্য ছুটে যান আপনার রবের পানে।
গুণগ্রাহী আল্লাহ্র স্মরণে সময় কাটান। আল্লাহর এই মহান নামটি নিয়ে ভাবুন। জীবনের বিবর্ণ পাতাগুলো মুছে এ মহান নামের ছোঁয়ায় সজীব করে তুলুন আপনার জীবনপাতা।
তিনি আপনাকে এত বেশি দান করেন যে, আপনি বিস্মিত হয়ে যান
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর বান্দাকে সৎকাজের প্রতিদান দিয়ে থাকেন। তাঁর এই প্রতিদানের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। সৎকাজের প্রতিদান তিনি এত বেশি করে দেন যে, তা আসমান-যমীনব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনাকে যে সৎকাজের আদেশ দিয়েছেন তাতেই রয়েছে আপনার দুনিয়া ও 'আখিরাতের সফলতা। আপনি যদি এর ওপর 'আমাল করেন তাহলে আল্লাহ্ তা'আলাই আপনার প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য; কারণ, তিনিই তো আপনাকে সৎকাজের পথ দেখিয়েছেন, সহজ করে দিয়েছেন এবং আপনার অবস্থার উন্নতি করেছেন। তাই নয় কি? অথচ আপনার অকৃতজ্ঞতা সত্ত্বেও তাঁরই বদান্যতা যে, এরপরও তিনিই আপনার প্রতি সদয় থাকেন। তো এর চেয়ে অধিক বদান্যতা আর কীভাবে দেখানো যেতে পারে? এর থেকে বেশি দানশীলতা আর কীভাবে সম্ভব হতে পারে?
কীভাবে তিনি আপনাকে এত অঢেল দিতে পারেন?
তাঁর সত্তা যেমন চোখ দিয়ে দেখা যায় না, তেমনই তাঁর নাম ও গুণাবলির প্রকৃত অর্থ-জ্ঞান আমাদের বিবেক-বুদ্ধি ধরতে পারে না। এতদসত্ত্বেও জগতে আমাদের তাঁর সাথেই তাঁরই দেখানো পথে চলতে হয়। তাঁর নামের প্রশান্তিদায়ক ছায়ায় নিজেদের জীবন ঢেকে রাখতে হয়।
আল্লাহর গুণগ্রাহিতার চিত্র হলো-
তিনি গুনাহ মাফ করেন এবং সাওয়াব বাড়িয়ে দেন। তিনি সুস্থতা দেন, তিনি সচ্ছলতা দেন। সন্তান, টাকা-পয়সা, শান্তির জীবন-সব তিনিই দেন। তিনি আপনাকে সুখ্যাতি দেন।
আপনার দু'আ তিনি কবুল করেন। তাঁর নৈকট্যলাভে আপনাকে তিনি ধন্য করেন। তাঁর সান্নিধ্যে একাকী সময় কাটানোর সুযোগ দেন।
যে রোগে অন্যরা মারা গেছে, সে রোগে আক্রান্ত হয়েও আপনি সুস্থ হয়ে যান।
সামান্য যেসব বিপদে অন্যরা হতবিহ্বল হয়ে গেছে, তাঁর চেয়ে বড় বড় বিপদ আপনাকে স্পর্শ করার পরও তিনি তা দূর করে দেন। তিনি আপনাকে সরল সঠিক পথ দেখিয়ে দেন। অথচ কত মানুষ আছে যারা এ পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি আপনাকে হিদায়াতের ওপর স্থির রাখেন। অথচ আপনার চেয়েও বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও আপনার চেয়ে ঢের বেশি ইসলাম বোঝে এমন আরও কত মানুষ আছে-যাদের অন্তর হিদায়াত ত্যাগ করে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে।
পড়ুন এবং কল্পনা করুন- অংকের হিসাব
مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مَّائَةُ حَبَّةٍ ۖ
যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে একশ শস্যদানা (১)
এখানেই কি শেষ? একদম না।
۞ اللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ
আর আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন [২]
আল্লাহ্ কতই না মহান।
এক বীজ 'আমাল তাঁর অনুগ্রহ, বদান্যতা ও সুবিবেচনায় সাতশটা সাওয়াবের শস্যদানায় পরিণত হয়।
কীভাবে এক = সাতশ হয়ে যেতে পারে?
একটি ভালো কাজ করলে সাওয়াব তো এর সমানই পাবেন; কিন্তু আল্লাহ্ আপনাকে সাতশগুণ বাড়িয়ে দেন। তিনি যাকে ইচ্ছে তাকে আরও বাড়িয়ে দেন।
আল্লাহ্র বদান্যতার কাছে সব হিসাবই বৃথা। কারণ, এ এমন এক বদান্যতা যা কোনো হিসাব মানে না। এ যে রবের পরম অনুগ্রহ।
আল্লাহ্ কতই না মহান। তিনি আপনাকে দান করতে করতে বিস্মিত করে ফেলেন। আপনাকে সম্মানিত করে বিস্ময়াভিভূত করে দেন। কে এমন আছে, যাকে এই মহান আল্লাহ্ কিছু দেননি, দান করেননি? জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই আমরা তাঁর অসংখ্য উপহার-দান পেয়ে থাকি।
আর স্মরণ করুন...
এই যে তাঁর নাবীগণ, তারা সৎকাজ করেছেন। তারা তাঁর বাণীসমূহ পৌঁছানোর জন্য সংগ্রাম করেছেন। এর উত্তম প্রতিদান তিনি তাদেরকে দিয়েছেন। তাদের স্মরণকে মানুষের মাঝে উচ্চকিত করেছেন, আদর্শরূপে উপস্থাপন করেছেন, তাদের ঘটনা ও ঘটনার শিক্ষাগুলো তাঁর সম্মানিত কিতাবে চিরন্তন করেছেন, তাদের মান-মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন-যার ফলে কেউ তাদের মর্যাদাহানি বা তাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণাও করতে পারে না। এছাড়া আরও বহু প্রতিদান তিনি তাদের দিয়েছেন। তাদেরকে তাঁর কিতাবে উল্লেখ করার একটা বিশেষত্ব আছে। আমি সবসময় সেটা অনুভব করতে পারি।
আল্লাহ্র এক বান্দা। আল্লাহ্ নিজ কুদরতেই তাকে সৃষ্টি করেছেন। সে ইতোপূর্বে কিছুই ছিল না। তার সম্পর্কেই আল্লাহ্ বলছেন-
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَّبِيًّا *
আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইবরাহীমকে; তিনি ছিলেন এক সত্যনিষ্ঠ, নাবী [১]
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مُوسَى إِنَّهُ كَانَ مُخْلَصَا
আর স্মরণ করুন এ কিতাবে মূসাকে; অবশ্যই তিনি ছিলেন মনোনীত [২]
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِدْرِيسَ *
আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইদরীসকে [৩]
এছাড়াও সূরা সা'দ-এ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আইয়ুব আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন,
وَجَدْنَاهُ صَابِرًا
'আমরা তাকে পেয়েছি ধৈর্যশীলরূপে।'
এবার আয়াতটির আরও কিছু অংশ পড়ুন-
نِعْمَ الْعَبْدُ
‘কতই না উত্তম বান্দা তিনি।’
মহান রাজাধিরাজ আল্লাহ্ তাঁর এক বান্দাকে বলছেন- ‘কতই না উত্তম বান্দা তিনি।’ আল্লাহ্ যাকে মর্যাদা দিতে চান তার মর্যাদা কতটা সুউচ্চ!
তারপর আমাদের নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আল্লাহর প্রতিদানের নমুনা দেখুন। কীভাবে তিনি এই রাহমাতকে বণ্টন করে দিয়েছেন আর বলেছেন-
أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَتَ رَبِّكَ ۚ
তারা কি আপনার রবের রাহমাত বণ্টন করে নিতে চায়?[১]
আল্লাহ্ তাকে নিজের বার্তাবাহক নিযুক্ত করেও বিশেষিত করে বলেছেন-
اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ ۘ
আল্লাহই অধিক জ্ঞাত তিনি কোথায় নিজ বার্তা পাঠাবেন।[২]
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে-
وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ ۚ
আর আল্লাহ্ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করেন।[৩]
তাঁর চরিত্রকে করেছেন উত্তম বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত-
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ )
৯৭ আর আপনি তো মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত [১]
এই যে সাহাবীগণ, তারা তাদের জান-মাল দ্বীনের সাহায্যে সঁপে দিয়েছিলেন। তাই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাদের এই প্রতিদান দিয়েছেন যে-তাদের ব্যাপারে (মন্দ) কথা বলা মুনাফিকীর পরিচয়। তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাদের সাওয়াব বৃদ্ধি করেছেন। তাদের সবাইকে ন্যায়পরায়ণ হিসেবে গণ্য করেছেন। বাদ পড়েননি কেউই। তাদেরকে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের মানুষ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাদের ব্যাপারে বলেছেন-
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ *
আল্লাহ্ মু'মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়াত নিচ্ছিল [২]
আরও বলেছেন-
وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى
আর প্রত্যেককেই আল্লাহ্ জান্নাতের ও'য়াদা দিয়েছেন [৩]
তাদের সকলের এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মর্যাদা এতই বেশি ও প্রসিদ্ধ যে, তা উল্লেখ করারও প্রয়োজন হয় না। আর এ সবই তাদের বিশ্বাস, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে আল্লাহর গুণগ্রাহিতা ও প্রতিদান প্রদানের নমুনা।
শস্যদানা পরিমাণ
যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজ করে তাকে যেমন আল্লাহ্ প্রতিদান দিয়ে থাকেন, তেমনই তিনি তাঁরই শান, মাহাত্ম্য ও মর্যাদার উপযুক্ত প্রতিদান দেন। তাঁর এ প্রতিদান অন্যদের স্বাভাবিক প্রতিদানের মতো নয়। তিনি হলেন আশ-শাকুর তথা গুণগ্রাহী। তাঁর এক প্রতিদান অন্য সকলের কৃতজ্ঞতা ও প্রতিদানের তুলনায় অনেক বেশি। আপনি একটা 'আমাল করলে তিনি বার বার আপনাকে এর প্রতিদান দিয়ে থাকেন। আপনার কাজ একনিষ্ঠ ও বিশুদ্ধ হলে সেটা ছোট-বড় যেমনই হোক তিনি তার প্রতিদান দেবেন। তিনি শুধু বড় আমলের পুরস্কার দেন না; বরং শস্যদানা পরিমাণ হলেও তিনি সেটাকে বড় করে তার প্রতিদান দিয়ে থাকেন।
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ *
যে শস্যদানা পরিমাণ ভালো কাজ করবে তা সে দেখবে।[১]
একটি খেজুরের টুকরোর বদলে, একটি কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক পতিতাকে আল্লাহ্ জান্নাত দিলেন। এক লোক সারাজীবন গুনাহ করে মারা যাওয়ার সময় ছেলেদের বলে গেল তাকে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে ফেলতে। সে এ ভয় পেয়েছিল যে, আল্লাহ্ তাকে শাস্তি দেবেন। তার এ ভীতির কারণে, আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। আরেকজনের মাত্র একটা সাওয়াব ছিল; সেটা ছিল তার এক ভাইয়ের প্রতি সাদাকাহ, তাকেও আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করালেন। আরেকজন তো একশত মানুষ হত্যা করেছিল। তারপরও জান্নাতে; কারণ, সে যে আল্লাহ্ দিকে হিজরত করেছিল।
আল্লাহ্ গুণগ্রাহিতার আরেকটি দিক হলো, তিনি সাদাকাহকারীর সাওয়াব দ্রুত দিয়ে দেন। তিনি তাদেরকে বারাকাহ ঢেলে দেন। তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ দিয়ে আচ্ছাদিত করে ফেলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
إن الله يقبل صدقة عبده بيمينه ويربيها كما يربي أحدكم فلوه
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দার দান ডান হাতে কবুল করে সেটাকে প্রতিপালন করেন যেমনিভাবে তোমাদের কেউ ঘোড়ার বাচ্চাকে প্রতিপালন করে (১)
এটা তাঁর বান্দার আনুগত্যে আল্লাহ্র প্রতিদান।
পূর্বাঞ্চলের অধিবাসী এক ভদ্রলোকের সাথে দশ বছর আগে একটা বিখ্যাত সুপার মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে সুপার মার্কেটের মালিকের ঘটনা বর্ণনা করছিল আমার কাছে। সুপার মার্কেটের মালিক ছিল এক সামান্য চাকুরিজীবী। তার স্ত্রীও চাকুরি করত। তারা দু'জনে মিলে টাকা-পয়সা জমাত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল-একটা বাড়ি বানানো। টাকা জমানো প্রায় শেষ। এমন সময় হঠাৎ একদিন স্বামী মাসজিদে এক দা'ঈর কথা শুনতে পেল। সেই দা'ঈ মাসজিদ বানানোর ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে বলেন-
من بنى الله مسجدا ولو كمفحص قطاة بنى الله له بيتاً في الجنة
যে ব্যক্তি আল্লাহ্ জন্য একটা মাসজিদ বানায়-হোক তা পাখির বাসার সমান-আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাতে একটা বাড়ি বানান ২
কথাটা ভদ্রলোকের খুব মনে ধরল। সে রাতে বাসায় গিয়ে স্ত্রীর সাথে এই ব্যাপারে আলাপ করল। সে জানাল যে, তাদের এতদিনের জমানো অর্থের সবটাই সে মাসজিদ তৈরিতে ব্যয় করতে চায়। তার স্ত্রীও সানন্দে এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। মাসজিদ তৈরির প্রকল্পে সেও নিজ অর্থ বিলিয়ে দিল।
একবার কল্পনা করে দেখুন। একটা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বছরের পর বছর আপনি যে টাকা জমালেন তা এক রাতেই ব্যয় করে ফেললেন। তাও এ পরিবর্তনটা আল্লাহ্ ও 'আখিরাত পাওয়ার উদ্দেশ্যে পবিত্র অন্তর থেকে উৎসারিত।
ভদ্রলোক বলেন, মাসজিদ বানানোর পর আবার তারা টাকা জমানো শুরু করল। স্বামীর মাথায় তখন ব্যবসার চিন্তাটাও এলো। সে একটা ছোটখাট দোকান খুলে বসল। চারিদিক থেকে তার কাছে ক্রেতা আসতে লাগল। অর্থ-বিত্ত বেড়ে যেতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যেই লোকটা তার দোকান বড় করতে বাধ্য হলো। তার কয়েকদিন পর সে একে একে কয়েকটা শাখা খুলে বসল।
ভদ্রলোক জানালেন, এখন পূর্বাঞ্চলে তার তেরোটার মতো শাখা আছে। এটা দশ বছর আগের ঘটনা। গুণগ্রাহী আল্লাহ্ কতই না মহামহিম। তাঁর সাথে যেই ব্যবসা করে তাকে তিনি ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত করেন না।
একবার এক লোকের সাথে দেখা হলো। তার নামের শেষে আর-রাহীলী ছিল। আমি মজা করে তাকে বললাম, 'আপনি তাহলে জেদ্দা শহরে অবস্থিত বিখ্যাত 'আর-রাহীলী' সিএনজি স্টেশনের মালিক?'
লোকটা বলল, 'না, আমি সেরকম কেউ নই। তবে আপনি যার কথা বলেছেন সে আমারই এক নিকটাত্মীয়।'
তারপর আমাকে তার ঘটনা জানাল। আর-রাহীলী প্রথমজীবনে দরিদ্রদের অনেক বেশি দান-সাদাকাহ করতেন। ইয়াতীমদের দেখাশোনা করতেন। আত্মীয়-স্বজনের দেখাশোনা অনেক বেশি করতেন। এ কারণেই আল্লাহ্ তার জন্য সব কিছু সহজ করে দিলেন। তিনি এতগুলো সিএনজি স্টেশনের মালিকও হলেন আবার ব্যবসা-ক্ষেত্রেও তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হতে পেরেছেন। গুণগ্রাহী আল্লাহর দান এমনই হয়।
'তুমি ব্যয় কর, আমিও তোমার জন্য ব্যয় করব।' রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
ما نقص مال من صدقة
সাদাকাহ করলে অর্থ সামান্যও কমে না/১
আমাদের এ কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আমাদের রব হাদীসে কুদসীতে বলেছেন-
يا عبدي أنفق أنفق عليك
'হে আমার বান্দা, তুমি ব্যয় করো, আমি তোমার জন্য ব্যয় করব। [২]'
দশগুণ
আপনি যখন কোনো গরীব লোকের হাতে এক টাকা দেবেন, নিশ্চিত থাকুন, আল্লাহ্ আপনাকে এই টাকার সমান বা এরও বেশি অনুগ্রহ, সুস্বাস্থ্য আপনাকে দান করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। সে বেশ গরীব। ‘জুম’আর সালাত আদায়ের জন্য যাচ্ছিল। দেখতে পেল, একলোক একটা দান বাক্স নিয়ে মানুষকে দানে উৎসাহিত করছে। সে বলছে, ‘বান্দা, তুমি ব্যয় করো, আমি তোমার জন্য ব্যয় করব।’ ছাত্রীটি পকেট হাতড়ে পাঁচ টাকা পেল। পুরাটাই সে দানবাক্সে দিয়ে দিল। তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ‘হে আমার রব, আমি দরিদ্র সত্ত্বেও ব্যয় করেছি। তাই আপনি আপনার ভাণ্ডার থেকে আমার জন্য ব্যয় করুন।’ রাতে তাকে তার ভাই দেখতে এলো। ভাই তাকে জানাল যে, তার কাছে কিছু টাকা-পয়সা এসেছে। যার সবই তার দরকার নেই। তাই দুই হাজার টাকা সে তার ভাইকে দিতে এসেছে। এই তো, আল্লাহ্ তার জন্য ব্যয় করলেন।
অনেক আগে এক ম্যাগাজিনে একটা ঘটনা পড়েছিলাম। এক মহিলা লিখেছিল, এক সকালে তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে এক ভিক্ষুক। মহিলা তার ব্যাগ থেকে একশ টাকার শেষ নোটটা বের করে দিয়ে দেয় ভিক্ষুককে। মহিলাটার অন্তর শুধু বলছিল, ‘আল্লাহ্ দশগুণ বাড়িয়ে দিন। দশগুণ বাড়িয়ে দিন।’
মহিলা যথারীতি রান্নাঘরে প্রবেশ করল। নিজের আর স্বামীর জন্য নাস্তা তৈরি করল। স্বামী ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খাওয়া শুরু করল। একটু পর বলল, ‘গত রাতে আমার কাছে তোমার জন্য একটা চিঠি এসেছিল।’ স্ত্রী চিঠিটা খুলে দেখার জন্য উঠে গেল। চিঠির খামটা খুলতেই চোখে পড়ল ব্যাংকের চেক। এক পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখার পুরষ্কার স্বরূপ কিছু টাকা। তারচেয়েও তাজ্জবের ব্যাপার টাকার পরিমাণ এক হাজার টাকা। একেবারে কড়ায়-গণ্ডায় দশগুণ।
ভালো কাজ করুন...
আপনার সব আশা-ভরসা, চাওয়া-পাওয়া যেন দুনিয়ার জন্য না হয়। কারণ, আল্লাহ্ যা আপনার জন্য জমা রেখেছেন, তার জন্য ‘আখিরাতে আপনি বেশি মুখাপেক্ষী।
প্রচুর প্রতিদানের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট রূপটা পাওয়া যায় পিতা-মাতার আনুগত্যের সাথে জীবন চলা সহজ হওয়ায় এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাওফিক পাওয়ার বিষয়টায়। জীবনের সফলতা যেন পিতা-মাতার আনুগত্যের সাথেই সম্পৃক্ত। পৃথিবীতে সফল ব্যক্তিদের জীবনী খুলে দেখুন, দেখবেন, পিতা-মাতার আনুগত্য সবার মাঝেই পাওয়া যায়, নিশ্চিতভাবেই।
আল্লাহ্ সুবহানাহু বলেন-
وَافْعَلُوا الْخَيْرَ
তোমরা ভালো কাজ করো।[১]
এই ভালো কাজ যত ছোটই হোক না কেন, গুণগ্রাহী আল্লাহ্ এর প্রতিদান দেবেনই।
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ *
যে ব্যক্তি শস্যদানা পরিমাণ সৎকাজ করবে সে সেটা দেখতে পাবে।[২]
অবশ্যই সে এর প্রতিদান পাবে। শস্যদানা চোখেই পড়ে না; কিন্তু আপনি এরূপ পরিমাণ ভালো কাজ করলেও দেখবেন, কিয়ামতের মাঠে সেটা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। যে ভয়াবহ দিনে শিশু বৃদ্ধ হয়ে যাবে, সেদিন সেটা আপনাকে আনন্দিত করবে আর আপনার অন্তরকে করবে শক্তিশালী।
ট্রাফিক সিগনাল পার হওয়ার সময় বিপরীত রাস্তার লোকজনকে বিরক্ত না করার জন্য গাড়ির লাইটটা বন্ধ করে রাখবেন। তারা হয়তো আপনার উদ্দেশ্য জানবে না, তাই আপনার কাজের দিকে হয়তো তেমন খেয়াল করবে না; কিন্তু আপনার গুণগ্রাহী আল্লাহ্ যে আপনাকে এর প্রতিদান দেবেন না-এমনটা ভাববেন না। কীভাবে তা হওয়া সম্ভব? রোগে আপনার চোখ চলে যেতে পারত। দুর্ঘটনায় গাড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারত; কিন্তু আল্লাহ্ আপনার ভালো কাজের প্রতিদানে আপনাকে রক্ষা করবেন।
এভাবেই রাতের অন্ধকারে কারও ঘুমে যেন ব্যাঘাত না ঘটে তাই আস্তে দরজা খোলার কারণে, মাসজিদের দরজা দিয়ে এক বৃদ্ধ প্রবেশ করবে; এজন্য আপনি ওটা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন সে কারণে, পথে বিড়ালের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন সে কারণে, একটা শিশুর দিকে ফিরে মুচকি হাসি দিয়েছেন সে কারণে, ঘরের একটা রুম সাজিয়ে দিয়েছেন সে কারণে, মারা গেছে এমন একজন মুসলিমের জন্য দু'আ করেছেন, এই ভেবে যে, তার কোনো নিকটাত্মীয় তার জন্য দু'আ করছে না-এ কারণে, একটা পানির ট্যাপ ভালোমতো বন্ধ করা ছিল না। পানি পড়ছিল টপটপ করে। আপনি সেটা বন্ধ করেছিলেন-সে কারণে, রাস্তার ওপর পড়ে থাকা একটা গাছের ডাল আপনি সরিয়েছিলেন, সে কারণে-এগুলোর সবই ভালো কাজের অন্তর্ভুক্ত; আর এজন্যই গুণগ্রাহী আল্লাহ আপনাকে বিভিন্ন বিপদ-আপদ হতে রক্ষা করেন; এরূপ ভালো কাজ করতেই আল্লাহ্ আপনাকে আদেশ করেছেন-
وَافْعَلُوا الْخَيْرَ
তোমরা ভালো কাজ করো।[১]
চুপ করুন
সর্বোত্তম কাজ হলো, আপনার প্রতিদিনের নির্ধারিত অংশ পড়ার জন্য কুর'আন স্পর্শ করা। কুর'আন পড়তে গিয়ে আপনার চোখ পড়বে না, অন্তর পড়বে ভালো কাজের উৎসাহের দিকে। আপনি মনে মনে ভাববেন যে, আপনার দিনটা যাওয়ার আগেই যেন এ ভালো কাজে আপনি অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। আপনি এ কাজ করার মাধ্যমে আপনার দ্বারা সম্ভব সর্বোত্তম কাজটাই করলেন। আপনি এমন কাজ করলেন যা করার জন্যই কুর'আন নাযিল করা হয়েছে।
আপনি তো আপনার সাধ্যের মধ্যে সবচেয়ে ভালো কাজটাই করেছেন। আপনি যে আপনার আত্মাকে আল্লাহর জন্যই সমর্পণ করেছেন। এই যে মুসলিম হিসেবে জীবনযাপন করছেন, মুসলিমের মতো 'ইবাদাত করছেন, মুসলিমের মতো ব্যবহার করছেন, তাকাচ্ছেন, কথা বলছেন, অনুভব করছেন আবার মারা যাচ্ছেন মুসলিম হিসেবে।
ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'যে ব্যক্তি ইসলাম ও সুন্নাতের ওপর মারা গেল, সে কি কল্যাণের ওপর মরল?' তিনি প্রশ্নকর্তাকে বললেন, 'চুপ থাকো, সে তো পূর্ণাঙ্গ কল্যাণের ওপরই মারা গেল।' আল্লাহ্ সুবহানাহু বলেন-
وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُم مِّنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِندَ اللَّهِ *
আর তোমরা নিজেদের জন্য কল্যাণকর যা ব্যয় করবে তাই আল্লাহ্র কাছে পাবে। [১]
আপনি একটা ভালো কাজ করলে গুণগ্রাহী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সেই ভালো কাজটা সংরক্ষণ করে রাখবেন। ধীরে ধীরে সেটা গড়ে তুলবেন। কিয়ামতের দিন আপনি দেখবেন যে অনেক বেশি পরিমাণে সেটা বিদ্যমান। আপনি দেখতে পাবেন যে, আপনার যে ভালো কাজটা সামান্য ছিল সেটা বাড়তে বাড়তে বিশাল হয়ে গেছে।
وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُم مِّنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِندَ اللَّهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا و
তোমরা তোমাদের নিজেদের জন্য ভালো যা কিছু অগ্রিম পাঠাবে, তোমরা পাবে আল্লাহ্র কাছে তা উৎকৃষ্টতর ও পুরস্কার হিসেবে। [২]
وَمَا يَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَلَن يُكْفَرُوهُ *
আর তারা যে ভালো কাজই করুক তা অস্বীকার করা হবে না। [৩]
একটি দুর্বল হাদীসে ভালো অর্থে আছে-
صنائع المعروف تقي مصارع السوء
ভালো কাজ খারাপ মৃত্যু থেকে বাঁচায় [৪]
এটা রবেরই গুণগ্রাহিতার অংশ। আপনার ভালো কাজকে তিনি ফেলে দেবেন না; বরং এই ভালো কাজটি আপনাকে খারাপ মৃত্যু থেকে রক্ষা করার জন্য একটি প্রতিরক্ষাব্যূহ করে দেবেন।
এ জন্য আল্লাহ্ সুবহানাহুকে গুণগ্রাহী হিসেবে মেনে নেওয়া এবং সব কল্যাণের উৎসমূল হিসেবে তাঁকে গ্রহন করে নেওয়া বান্দাকে তাঁর রবের প্রতি নির্ভরতা বাড়িয়ে দিতে উৎসাহিত করে, বান্দাকে তাঁর রবের ব্যাপারে ভালো ধারণা করতে বলে।
কোথায় যাবো?
- এক বেদুইনকে বলা হলো, 'তুমি তো মরবে।'
- সে বলল, 'তারপর কোথায় যাবো?'
- 'আল্লাহ্র কাছে।'
- 'তাহলে যার কাছে কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই পাবো না, তাঁর কাছে যেতে ভয় কীসের?'
আহ্, কী অপার্থিব অনুভূতি। আল্লাহর ওপর কত বড় আশা এই বেদুইনের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছে। এ ব্যাপারটা কুর'আনও স্বীকৃতি দিয়ে বলে-
وَمَا بِكُم مِّن نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ۞
তোমাদের যে সব নি'য়ামাত আছে তা আল্লাহ্ থেকেই।[১]
সব কিছুই। স্বাস্থ্য, টাকা-পয়সা, বিশ্রাম ও সন্তুষ্টি-যা কিছু আপনাকে ঘিরে রেখেছে তার সবই আল্লাহ্ থেকে।
وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا ۞
আপনার ওপর আল্লাহ্র অনুগ্রহ বিশাল (২)
আপনি সাকুল্যে ষাট-সত্তর বছর তাঁর 'ইবাদাত করেন। তার মধ্যে অধিকাংশই আবার কোনো কষ্ট ছাড়া ঘুমিয়ে বা বৈধ (মুবাহ) কাজ করেই। তারপরও তিনি আপনাকে এমন জান্নাত উপহার দেন যেটা আসমান যমীন পরিব্যাপ্ত করে আছে; যে জান্নাতে আপনি বাস করবেন অনন্তকাল।
না করতেই যিনি এত দিতে পারেন, তাহলে সামান্য করলে তিনি ঠিক কতটা দেবেন? আল্লাহ্র এমন বান্দাদেরও রিযক দেন এবং তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ দিয়ে ধন্য করেন। তাদের তুলনায় আপনি একটা ভালো কাজ করলে একটা পার্থক্য কি সৃষ্টি হয় না? এ সময় আপনার জন্য তো এটা মনে করা সমীচীন নয় যে পরম দয়ালু, গুণগ্রাহী আল্লাহ্ আপনাকে দান করবেন না, প্রতিদান দেবেন না বা দয়ায় ঘিরে ফেলবেন না।
উদ্ধার
তিনজন লোক বৃষ্টির মধ্যে গুহায় আশ্রয় নিল। সকালে দেখতে পেল একটা বড় পাথরখণ্ড গুহার মুখে তাদের পথরোধ করে রেখেছে। ফলে তারা আর বের হতে পারছিল না। তাই তারা আল্লাহ্র কাছে সৎকর্মের মাধ্যমে অনুনয়-বিনয় করে মুক্তি চাইল। আল্লাহ্ তাদের কাজের প্রতিদানস্বরূপ তাদেরকে বিপদ থেকে রক্ষা করলেন এবং পথ থেকে সেটা সরিয়ে দিলেন। তিনজনের দু'আ শেষ। ওদিকে পাথরও সরে গেছে। তারা খোলা আকাশের নিচে সূর্যের আলোয় হাঁটা শুরু করল।
ঈসা 'আলাইহিস সালাম তার সারাজীবনই আল্লাহর জন্য দিয়ে দিয়েছেন। বানু ইসরা'ঈলের নিকৃষ্ট লোকগুলো তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়; কিন্তু মহান আল্লাহ্ তাকে বিস্ময়কর প্রতিদান দিলেন। তিনি তাকে আসমানে উঠিয়ে নিলেন। এভাবে সব ধরনের দুশ্চিন্তা, বিপদ ও দুর্ভাবনা থেকে আল্লাহ্ তাকে তুলে নিয়ে গেলেন। তাকে নিয়ে গেলেন সুউচ্চ আসমানে। সেখানে তিনি সর্বোত্তম সৃষ্টি ও ফেরেশতাদের সাথে বসবাস করতে লাগলেন।
আল্লাহ্র সাথে আপনার ব্যবসা সবসময়ই লাভজনক।
আপনি যে ঘোর বিপদে পতিত তা থেকে আল্লাহ্ আপনাকে বের করে নিয়ে আসতে পারেন। আপনি ভালোমতোই জেনে রাখুন, আপনি যে দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনায় পড়েছেন তা থেকে রক্ষা পাওয়ার সাথে 'উদ্ধার' শব্দটাই মেলে। ভালো কাজ করতে থাকুন। আল্লাহ্ আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে ভালো অবস্থায় নিয়ে আসবেন। যেভাবে ইউনুস 'আলাইহিস সালাম -এর তাসবীহ ছিল তার উদ্ধার হওয়ার কারণ।
আপনি তো সেই সত্তার সাথে ব্যবসা করছেন-যার আছে বিপুল বদান্যতা, অশেষ মেহেরবানী আর অপরিসীম অনুগ্রহ।
আল্লাহর সাথে আপনার এ ব্যবসায় ক্ষতির কিছু নেই। নেই কোনো ভয়। শুধু তাঁর সাথে থাকুন। তাঁর অনুগ্রহগুলো চিন্তা করে দেখুন। তিনি কখনোই আপনাকে ত্যাগ করবেন না। এ ভরসাটা অন্তত রাখুন। আপনি আল্লাহর শুকরিয়ার জন্য একটা সিজদা দিলেই তিনি এর উপযুক্ত প্রতিদান আপনাকে দেবেন। শুধু তাঁর সাথে থাকবেন, তাঁর সাথেই চলবেন।
আল্লাহ্, আমরা যেন আপনাকে বেশি বেশি স্মরণ করতে পারি এবং আপনার নি'য়ামাতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি-আপনি আমাদেরকে সেই তাওফীক দিন। আমাদের সে সকল কাজ করার সুযোগ দিন যা আপনার প্রতিদানের রাস্তা খুলে দেয়-হে গুণগ্রাহী মহান প্রশংসিত আল্লাহ্।
টিকাঃ
(১) সূরা বাকারা, ০২: ২৬১
[২] সূরা বাকারা, ০২: ২৬১
[১] সূরা মারইয়াম, ১৯:৪১
[২] সূরা মারইয়াম, ১৯:৫১
[৩] সূরা মারইয়াম, ১৯:৫৬
[১] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩২
[২] সূরা আনআম, ০৬: ১২৪
[৩] সূরা মায়েদা, ০৫: ৬৭
[১] সূরা কালাম, ৬৮: ০৪
[২] সূরা ফাতহ, ৪৮: ১৮
[৩] সূরা হাদীদ, ৫৭: ১০
[১] সূরা যিলযাল, ৯৯ : ০৭
(১) বুখারী, ২/১০৮-১৪১০; মুসলিম, ২/২০৭-১০১৪
২ ইবনু মাজাহ, ২/৪৯৮-৭৮৭
১ তিরমিযী, ৯/১১১-২৪৯৫
[২] সহীহ বুখারী, ৫৩৫২
[১] সূরা হাজ্জ, ২২ : ৭৭
[২] সূরা যিলযাল, ৯৯ : ০৭
[১] সূরা হাজ্জ, ২২ : ৭৭
[১] সূরা বাকারা, ০২: ১১০
[২] সূরা মুয্যাম্মিল, ৭৩: ২০
[৩] সূরা আলে-ইমরান, ০৩: ১১৫
[৪] তাবারানী তার মু'জামুল কাবীরে (৮০১৪-৮/২৬১) বর্ণনা করেছেন।
[১] সূরা নাহল, ১৬: ৫৩
(২) সূরা নিসা, ০৪: ১১৩
📄 আল-জাব্বার তথা মহিমান্বিত
যখন আপনার কোনো স্বপ্ন ভঙ্গ হয়, আল্লাহ্ আপনার জন্য আরও সুন্দর একটা স্বপ্ন রচনা করেন; যখন আপনার অন্তরে কোনো স্মৃতি নিভু নিভু হয়ে আসে তখনই আল্লাহ্ অসাধারণ এক স্মৃতি নিয়ে আসেন!
আল-জাব্বার তথা মহিমান্বিত
কখনো কি এমন হয়েছে যে, বিপদ-আপদ আপনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে? ভয় আপনার ওপর চেপে বসেছে? ঝড়-ঝাপটা আপনার ওপর আছড়ে পড়েছে?
দারিদ্র্য আপনার জীবনযাত্রা পরিবর্তিত করে দিয়েছে? অসুস্থতা আপনার শরীরকে জীর্ণশীর্ণ করে দিয়েছে? দুর্বলতা আপনাকে ক্লিষ্ট করেছে? বিদ্রুপের দৃষ্টি আপনাকে চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছে?
আপনার এ ভগ্ন হৃদয়, দুর্বল আত্মার জন্য এমন কিছু প্রয়োজন যা আপনার দুর্বলতা, ভগ্নতার প্রতিকার করবে। আপনি এবার পরিচিত হোন আল্লাহ্র 'আল-জাব্বার' নামটির সাথে। যেন এ নামের রাহমাতভরা অর্থে আপনার মনের ভাঙন দূর হয়। এ নামের ছায়ায় আপনার ক্ষতস্থানগুলোতে ঔষধ লাগে। আর এ নামের সুবাতাসে আপনার অশান্ত মনে শান্তির পরশ নেমে আসে।
ভগ্ন হৃদয়.. কীভাবে ভাঙল?
'আল-জাব্বার' তথা মহিমান্বিত নামের অর্থ হলো, তিনি ওই সত্তা—যিনি বান্দার শরীর ও মনের ভাঙন ঠিক করে দেন।
আল্লাহ্ আশ্রয়ে বসবাস করায় আমরা পেয়ে যাই সুখ ও সুস্বাস্থ্যের পথ্য, ব্যথার ঔষধ আর দুশ্চিন্তার এন্টিবায়োটিক।
আল্লাহ্ জানেন যে, বান্দার জীবন, শরীর ও মনে এক ধরনের ভাঙন দেখা দেবেই। এ ভাঙন তাদের হৃদয়ে দাগ রেখে যাবে। তাদের আত্মায় প্রভাব ফেলবে। তাই তো আল্লাহ্ তাঁর করুণার ছায়া দিয়ে এর প্রতিকার করেন। আর এ জন্যই তো তাঁর নাম 'আল-জাব্বার'। তিনি বান্দাদের এটা জানাতে চান যে, তিনি বান্দাদের মনে সৃষ্ট ক্ষতের প্রতিকার জানেন। ফলে বান্দারা তাঁর দিকে ছুটে যায়, তাঁর কাছে আশ্রয় নেয়।
জীবনের এ ভাঙনগুলো বিভিন্ন রকমের—
শরীরের হাড়গোড় ভেঙে যাওয়া, অপমানে অন্তর ফেটে যাওয়া, দারিদ্র্যে আত্মা নেতিয়ে পড়া, অসুস্থতায় শক্তি ফুরিয়ে যাওয়া, স্বপ্ন অর্জনের পথে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া, মাথা হেলে পড়ে এমন বিপদের সম্মুখীন হওয়া—এ ধরনের বিপদ-আপদে আসমানের দরজা খুলে যায়। নেমে আসে করুণার ছায়া আর ভালোবাসার পরম স্পর্শ।
এমন কত ইয়াতীম আছে—যার দিকে অহংকারী লোকদের দৃষ্টিপাত তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। যদি মহিমান্বিত আল্লাহ্ না থাকতেন, তাহলে তো সে নিরাশ হয়ে পড়ত।
এমন কত দুর্বল লোক আছে, যাদের জীবনযাত্রা সবল ব্যক্তির কবলে পড়ে নুয়ে পড়েছে। যদি মহিমান্বিত আল্লাহ্ না থাকতেন, তাহলে সারাটা জীবন তাদেরকে মাথাটা নিচু করেই রাখতে হতো।
এমন কত দরিদ্র লোক আছে, যাদেরকে ধনী লোক কোনো কথা দিয়ে অপদস্থ করেছে। যদি মহিমান্বিত আল্লাহ্ না থাকতেন, তাহলে এ কথা সারা জীবন তাদের জন্য কলঙ্কের দাগ হয়ে থাকত।
তিনি বিপর্যস্ত ব্যক্তির প্রতিকার করেন। দুর্বলকে সাহায্য করেন। নিচু শ্রেণির লোককে উপরে তুলে আনেন। পিছিয়ে পড়া ব্যক্তিকে এগিয়ে আনেন। তাঁর রাহমাত অন্তরের ক্ষতকে দূর করে দেয়।
আমরা এমন অনেককে চিনি যারা বাবা-মা'র কাছ থেকে অনেক বাধাগ্রস্ত হয়েছে তবু রাহমাতের চাদরে আবৃত হয়ে বেরিয়েছে।
তাদের নিয়ে বন্ধুরা ঠাট্টা-উপহাস করেছে, তবুও তারা সফল ও অগ্রসর হয়ে গেছে।
তারা ছোটবেলায় এনিমিয়া, যক্ষ্মা, বুকব্যথায় ভুগেছে। বড় হয়ে তারা শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান হয়ে গেছে।
কোথায় সেই বাধা-বিপত্তি? রোগের চিহ্ন গুলোই বা কোথায়? সব কিছুর প্রতিকার আল্লাহ্ দিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর রাহমাত সব দূর করে দিয়েছে। মহিমান্বিত আল্লাহ্ পেরেছেন সবকিছু বিলীন করে দিতে।
আমার সমস্ত ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দিন
দুই সিজদার মধ্যে আমাদের এ দু'আ বলতে বলা হয়েছে—
اللهم اغفر لي وارحمني وعافني وارزقني واجبرني
আল্লাহ্, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, দয়া করুন, নিরাপত্তা দান করুন, রিস্ক দিন আর সমস্ত ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দিন [১]
‘আমার সমস্ত ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দিন'-এই বলাটা এমন যেন দিনের মধ্যে আমরা কয়েকবার ভেঙে-চুরে যাই; কিন্তু আল্লাহ্ আমাদের ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দেন।
এই তো প্রায় আঠারো বছর আগে আমার একমাত্র বোনের মেয়েটা তার চোখের সামনে মারা গেল। এক গগনবিদারী চিৎকার শুনতে পেলাম পাশের রুম থেকে। এটাই ছিল তার শেষ চিৎকার। ফজরের আগ মুহূর্তে তার আমার বোনের ঘরে ছুটে গেলাম। তার অন্তরে তখন প্রবল দুঃখ-ব্যথা। তার দু'চোখ বেঁয়ে অশ্রুর ফোয়ারা নেমেছে। দীর্ঘনিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে শুধু। আমি তাকে দু'আটা শিখিয়ে দিলাম-
اللهم أجرني في مصيبتي وأخلف لي خيراً منها
'আল্লাহ্, আপনি আমাকে আমার এ বিপদে আশ্রয় দিন। আর আমাকে এর পরিবর্তে উত্তম প্রতিদান দিন।'
আমার বোন তার ভাঙা মন আর ব্যথিত হৃদয় নিয়েই এ দু'আ উচ্চারণ করল। তার এ ভাঙা ভাঙা কথা সেই রবের দিকে উঠে গিয়েছিল। যে রব তাঁর বান্দাদের ভাঙা হৃদয়ের ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দেন তাঁর কাছে এ প্রার্থনা উত্থিত হলো। তিনি ওই এক মেয়ের বদলে তাকে এখন অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে দিয়েছেন। তারা তার আনুগত্য করে। তার সাথে সদাচরণ করে। তিনি আমার বোনের ওপর তাঁর অপরিসীম দান ঢেলে দিয়েছেন।
যখন আপনার আত্মায় অশান্তি বিরাজ করে, আপনার স্বপ্নগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়, আপনার আত্মার দালানে ভাঙন ধরে, তখন আপনি বলুন- 'ইয়া আল্লাহ্।'
আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করুন
গত বছর এক ছাত্রের সাথে দেখা হয়েছিল। তার জিহ্বায় তোতলামি। একটা কথা কয়েকবার না বললে বলতেই পারে না। তাকে ধরে বললাম, 'তুমি যতবার সিজদায় যাবে ততবার এ দু'আ পড়বে-
وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي
আর আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করুন। তারা যেন আমার কথা বুঝতে পারে। [১]
এর একবছর পরে তার সাথে আবার দেখা। এবার তাকে বেশ সুভাষী মনে হলো। ততদিনে আমি অবশ্য আমার দেওয়া পরামর্শের কথা ভুলেই গেছি। তার কাছে এ পরিবর্তনের কারণ জানতে চাইলাম। সে বলল, 'ওই যে- 'ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানী' দু'আটি।'
মহিমান্বিত প্রভু তার জড়তার ক্ষয় দূর করে দিয়েছেন।
তিনি তো সেই মহিমান্বিত প্রভু, যিনি সব ধরনের দুঃখ দূর করে দেন। সব রোগের তিনি শিফা দেন। এমন কোনো বিপদ নেই যা তিনি বিদূরিত করেন না।
বান্দার মনে দুঃখ-কষ্ট জমাট বাঁধে। তার মনে হয় এ দুঃখ কখনও দূর হবে না। হঠাৎ মহিমান্বিত আল্লাহ্ এসে হৃদয়ের ক্ষতটা পূরণ করে দেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে বান্দা ভুলে যায় সব ব্যথা, সব কষ্ট। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তো শুধু ক্ষয়-ক্ষতি দূর করেই দেননি; বরং এর উত্তম বদলাও দিয়েছেন। মনে হয় সবকিছু যেন আগের মতোই আছে এখনও।
তিনি অন্তর, শরীর ও আত্মার সকল ব্যথা দূর করে দেন। তিনি সব ক্ষত মুছে দেন। তিনি পারেন চোখের অশ্রু মুছে দিতে।
যখন দুশ্চিন্তার চাপে পিষ্ট হয়ে যাবেন, বিপদাপদ আপনাকে ঘিরে ফেলবে তখন আপনি অস্থির হয়ে পড়বেন না। সালাতের জন্য কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ান। দেখবেন মুহূর্তের মধ্যেই আপনার সব দুঃখ-ব্যথা দূর হয়ে যাবে, ইন শা আল্লাহ্।
তিনি আপনার মুচকি হাসি পছন্দ করেন
মাগরীবের সালাতের পর সে বসে বসে ইস্তিগফার পড়তে লাগল। সম্বল বলতে তার পকেটে কয়েক রিয়াল মাত্র। জীবনের প্রয়োজনে এ অর্থ কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। যে ব্যক্তি তার দিকে দূর থেকেও তাকাবে, সে-ও তার দারিদ্র্য ধরতে পারবে। শরীরের কাঁটাছেড়া অংশগুলো দেখলে অনুধাবন করতে পারবে; কিন্তু সপ্তাকাশের ওপরের সেই সত্তা-যিনি তার দিকে চেয়ে আছেন-তিনি তার ভাগ্যে লিখে দিলেন যে, ওই রাত যাওয়ার আগেই তার চিন্তারও বাইরের কোনো পন্থায় তার দারিদ্র্য দূর করে দেবেন।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যে আপনার মুচকি হাসি পছন্দ করেন, সেজন্য আপনার মুখে মুচকি হাসি ফোটানোর জন্য সুব্যবস্থা করে দেন। মুচকি হাসি এসে আপনার মুখে সৃষ্ট বিপদের দুশ্চিন্তাভাব দূর করে দেয়।
যদি কারও মন খারাপ দেখেন তাহলে তার মনটা ভালো করে দিন। তার ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য আল্লাহ্ যেন আপনাকেই ব্যবহার করেন। আপনার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকবে আর আপনি ঘুমাবেন তা যেন না হয়। ঘরের উয়তার মাঝে এমন অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকবেন না যেখানে শীতের বায়ুপ্রবাহ অনেক দুর্বল লোকের শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
হুইল চেয়ার
এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা ঘটনা। এক বৃদ্ধা হারামের হাজীদের সমাগমের মাঝে হুইল চেয়ারে করে যাচ্ছিলেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন একদম। শরীরের চামড়া কুঁচকে গেছে। আমার বন্ধুটি যেন ওই বৃদ্ধার মাঝে তার মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল। সে বৃদ্ধার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কাঁদল। তারপর পকেট থেকে সব টাকা-পয়সা বের করে বৃদ্ধাকে দিয়ে দিল। বৃদ্ধার জন্য দুঃখে তার অন্তরটা ফেটে যাচ্ছিল।
বন্ধু বলল, 'আমার মাথায়ই আসেনি যে, ওই বৃদ্ধার প্রতি আমি দয়া করছি বা আমাকে মহান আল্লাহ্ এর প্রতিদান দেবেন। আমার মনের কোণে যে ফাটল ধরেছিল তা আমি ঠিক করছিলাম; কিন্তু পারছিলাম না। ওই মাসটা যেতে-না-যেতেই আমার ব্যাংক একাউন্টে বিশাল পরিমাণ অর্থ এসে হাজির।'
আপনি দুর্বলদের ভাঙন রোধ করবেন আর আল্লাহ্ আপনাকে প্রতিদান দেবেন না-এমনটা ভাবছেন কীভাবে? তিনি যে প্রতিদান প্রদানকারী সুপ্রশংসিত আল্লাহ্।
অন্যেরা যদি বিষ হয় তবে আপনি ঔষধ হোন।
তারা যদি তিক্ত হয় তবে আপনি মিষ্ট হোন।
আপনি হয়ে যান সেই জানালা-যা দিয়ে সুবাতাস ঘরে প্রবেশ করে। আর সেই সুবাতাস কঠিন জীবনের ধোঁয়াশায় অভ্যস্ত হৃদয়গুলোকে প্রশান্তি এনে দেয়। আপনি মহিমান্বিত আল্লাহর এ গুণে গুণান্বিত হোন। উপরের হাত হয়ে যান-যে হাত দান করে।
নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থ ইহুদীকে দেখতে গিয়েছেন।
আবু বাক্স আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু 'আনহু অন্ধ মহিলার ঘর ঝাড়ু দিয়েছেন। তার খাবার রান্না করে দিয়েছেন।
'আব্দুল্লাহ্ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ্ মারা গেলেন। পরদিন থেকে শহরের দরিদ্ররা সকালে দুয়ারের সামনে আর খাবার পেল না। তারা তার মৃত্যুর পর জানতে পারল যে, এ খাবার 'আব্দুল্লাহ্ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ্ দিতেন।
ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-র এক শত্রু মারা গেল। লোকজন শত্রুর মৃত্যু সংবাদ ইবনু তাইমিয়ার কাছে 'সুসংবাদ' হিসেবে নিয়ে এলে তিনি সংবাদ আনয়নকারী লোকদের প্রতি রেগে গেলেন। এরপর তিনি সেই শত্রুর পরিবার-পরিজনের কাছে গিয়ে তাদের সান্ত্বনা দিলেন। বললেন, 'আমি তোমাদের বাবার মতো। তোমাদের কিছু লাগলেই আমাকে খবর দেবে।'
তারা ব্যস্ত ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে। সে কাজ ছিল ভাঙন ধরা অন্তরগুলোতে জোড়া লাগানো। আল্লাহ্ তাদেরকে এ মহান সম্মানিত কাজে ব্যবহার করতেন।
তিরাশি
আমার এক বন্ধু মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে এক লোকের সাথে তার দেখা। লোকটা উমরাহ করতে এসেছে। লোকটা তার কাছে থানার ঠিকানা জানতে চাইল। বন্ধুটি বলল যে, সে খুব ব্যস্ত। কোনো একটা কোর্সের ক্লাস শুরু হয়ে যাচ্ছে। পরের সপ্তাহেই এই কোর্সের ওপর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এতদসত্ত্বেও আমার বন্ধুটি ওই লোকটিকে গাড়িতে ওঠাল যাতে কাছাকাছি কোথাও তাকে পৌঁছে দেওয়া যায়। গাড়িতে ওঠার পর লোকটি জানাল, সে হারামে এসে নিজ মানিব্যাগ, মোবাইল, টিকিটসহ আত্ম-পরিচিতিমূলক সব কিছুই হারিয়েছে। এখন সে অজ্ঞাতনামা। খেতে পারছে না। থাকারও জায়গা নেই। কারও সাথে যোগাযোগের সুযোগও নেই। লোকটি আমার বন্ধুকে বলল, 'আমি ক্লান্ত। তিন দিন ধরে আমি পথে পথে ভিক্ষা করছি আর রাস্তায় ঘুমাচ্ছি।' এতটুকু বলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তাকে খুব বিধ্বস্ত মনে হচ্ছিল।
আমার বন্ধু তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, 'আল্লাহ্ আপনাকে এ জিনিসগুলো থেকে এ জন্য বঞ্চিত করেননি যে, আপনি অন্যের কাছে হাত পাতবেন, ছোট হবেন। আপনি শুধু তাঁর জন্য সিজদা করুন। তাঁর কাছে চান। তিনি আপনাকে ভালোবেসে সব দেবেন। তারপর সে লোকটির হাতে ৮৩ রিয়াল ধরিয়ে দিল। তার পকেটে সর্বসাকুল্যে এ কয়টি রিয়ালই ছিল। লোকটির মুখে মুচকি হাসি ফোটার পর তাকে গাড়ি থেকে কাছাকাছি কোথাও রেখে এলো।
এক সপ্তাহ পরই তার পরীক্ষা। পরীক্ষা এত কঠিন হলো যে, সে তার প্রত্যাশামতো লিখতেই পারল না। লক্ষ্যে থাকা মার্ক যে পাবে না, একরকম নিশ্চিত জেনেই সে মানসিক প্রস্তুতি সেরে নিল। অথচ রেজাল্ট দিলে দেখা গেল, সে ১০০ এর মধ্যে ৮৩ পেয়েছে। ঠিক যে পরিমাণ অর্থ সে ওই লোককে সেদিন দিয়েছিল।
হ্যাঁ, এমন অনেক কিছুর অস্তিত্ব আপনি যতই অস্বীকার করতে যাবেন ততই স্পষ্ট হয়ে আপনার কাছে ধরা দেবে। যখনই আপনি তা আর শুনতে চাইবেন না তখনই আরও জোরে-শোরে আপনার কানে তার নাম পৌঁছবে। হ্যাঁ বন্ধু, তিনি হলেন আল্লাহ্। তিনিই আমাদের রব।
আল্লাহ্ তাকে ব্যবহার করলেন ওই 'উমরাহকারীর কষ্ট দূর করার মাধ্যম হিসেবে। তারপর তাকে তার প্রতিদানও দিয়ে দিলেন।
ভৃত্যের কক্ষ
সবাই যখন রাজাদের দরজায় কড়া নাড়বে তখন আপনি রাজাধিরাজের দরজায় কড়া নাড়বেন। সবাই যখন একজন গভর্নরের আঙিনায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াবে তখন আপনি মহান প্রভুর আঙিনায় সচকিত হয়ে দাঁড়াবেন।
সবাই যখন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যাবে, তখন আপনি রাতে জেগে সালাত আদায় করবেন আর বলবেন, 'আল্লাহ্।'
তাঁর হাতেই মুক্তির চাবিকাঠি। তাঁর কাছে রয়েছে সুস্থতার এক অমূল্য ভাণ্ডার। এ ভাণ্ডার কোথায় জানেন? রাজাধিরাজ আল্লাহর কাছে।
( وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا عِندَنَا خَزَابِنُهُ )
আর আমাদের কাছেই আছে প্রতিটি বস্তুর ভাণ্ডার।[১]
সুখেরও ভাণ্ডার আছে। আছে নিরাপত্তারও। একইভাবে স্বস্তি, সন্তুষ্টি এগুলোরও ভাণ্ডার আছে। যার হাতে সবকিছুর ভাণ্ডার, সবকিছুর মালিকানা তাকে ছেড়ে আপনি কি এমন কারও 'ইবাদাত করবেন, যে নিজের ভালো-খারাপ কিছুই করতে পারে না, জীবন-মৃত্যুরও ফয়সালা দিতে পারে না?
কতই না হাস্যকর হবে, যদি কোনো লোক দুনিয়ার কোনো এক রাজার সাথে দেখা করতে গিয়ে তার সাথে কথা না বলে তার ভৃত্যের কক্ষে গিয়ে ভৃত্যের সাথে আড্ডা জমায়।
আমরা তো এর চেয়েও হাস্যকর কাজ করছি। আমরা দুনিয়া-আখিরাতের রাজার কাছে চাওয়া বাদ দিয়ে সুদূর ওয়াশিংটন বা ইংল্যান্ডে ডাক্তারদের কাছে ছুটি। কয়েক মাস কষ্ট করে, পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্যয় করে তারপর ফিরে আসি।
না, চিকিৎসা করা দোষের না। এটা শারী'য়াতসম্মত; কিন্তু সৃষ্টির সাথে সম্পর্ক গভীর হওয়া আর স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া-এখানেই যত সমস্যা।
স্বপ্ন ... আর স্মৃতি
কিছুদিন 'আল-জাব্বার' তথা মহিমান্বিতের ছায়ায় কাটান। আপনার শরীরের ক্ষতগুলোতে তাঁর নামের অর্থপরশ বুলিয়ে দিন। তাঁর নামকে বানিয়ে নিন আপনার আত্মার সকল ব্যথার উপশম। এ নামে আপনার ভেতরে ফুটিয়ে তুলুন আনন্দের ফুল। এ নাম নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যান আর মনের ভেতরের নিঃসঙ্গতাকে দূর করে দিন।
আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তায়েফ থেকে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে এলেন। নির্বোধগুলো তার পবিত্র পা দুটো প্রস্তরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। রাজাধিরাজ, দুনিয়া-আখিরাতের রাজা আল্লাহ্ তাকে দেখছেন। দেখছেন তাঁর হাবীবকে। তাঁর হাবীবের আকুতিভরা হৃদয়কে। এজন্য জিবরা'ঈল 'আলাইহিস সালাম এবং তার সাথে পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দিলেন-যেন এ কষ্টের অবসান হয়। আল্লাহ্ পাহাড়ের ফেরেশতাকে এক বিশেষ কাজে পাঠালেন। এ কাজ ছিল তায়েফের সুউচ্চ পাহাড় কাঁপিয়ে দেওয়া।
পাহাড়ের ফেরেশতা নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে তার দিকে তাকালেন। দেখলেন, তিনি দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত। 'কারনুস সা'আলিব'-এ এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের হুঁশ ফিরল। দেখতে পেলেন, তার সামনে পাহাড়ের ফেরেশতা দণ্ডায়মান। পাহাড়ের ফেরেশতা বলছেন, 'মুহাম্মাদ, আল্লাহ্ আমাকে নির্দেশ করেছেন আপনার আদেশ মানার জন্য। আপনি চাইলে আমি দুই পাহাড়ের মাঝে তায়েফবাসীকে পিষ্ট করে দিতে পারি।'[১]
আল্লাহ্ যদি আপনার ব্যথার উপশম চান, তাহলে গোটা একটা শহরও তিনি ধ্বংস করে দিতে পারেন কেবল আপনারই জন্য; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটা চাননি। তিনি আল্লাহর কাছে তায়েফবাসীর জন্য ক্ষমা চাইলেন। তাদের প্রতি দয়ার্দ্র হলেন।
যখন বিদ্রুপের চাবুক নূহের হৃদয়ে আঘাত করেছিল তখন তিনি আসমানের দিকে তাকিয়ে নিরীহ গলায় তার রবের কাছে বলেছিলেন-
أَنِّي مَغْلُوبٌ فَانتَصِرْ
আমি পরাভূত (হে আমার রব)। আমাকে সাহায্য করুন।[২]
নূহ 'আলাইহিস সালামের আওয়াজের সাথে সাথে আসমানের দরজা খুলে গেল। নেমে এলো মুষলধারে বৃষ্টি। আল্লাহ্ তার নাবীর জন্য পুরো একটি কওমকে পানিতে ডুবিয়ে দিলেন।
আল্লাহ্ ছাড়া আর কে আছেন, যিনি এ রকম অন্তরের ক্ষত উপশম করতে পারেন?
কিছু লোক আছে, যাদের কাজই হলো, তারা মানসিকভাবে আপনাকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। আপনাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করবে। আপনাকে বন্ধুদের সামনে ছোট করবে। এক 'আল-জাব্বার' যদি না থাকতেন তাহলে তাদের চক্রান্ত আপনাকে পিষে ফেলত।
তারা আপনার দু'চোখে ঢুকে আপনার স্বপ্নগুলো চুরি করতে চায়। আপনার অন্তরে প্রবেশ করে স্মৃতিগুলো মুছে ফেলতে চায়। তবে যখনই আপনার একটা স্বপ্ন নিভে যায় তখনই আল্লাহ্ আপনার জন্য আরেকটা স্বপ্ন সৃষ্টি করে দেন। যখনই আপনার হৃদয় থেকে একটা স্মৃতি মুছে যায় তখনই আল্লাহ্ আরেকটা স্মৃতি আপনার মনে উদিত করেন।
এক কাপ কফি
'আল-জাব্বার' তথা মহিমান্বিত প্রভু অনেক উপশম, ব্যথানাশক ঔষধ আর ড্রেসিং রেখে দিয়েছেন আমাদের জীবনে। এর কিছু কিছু আমরা জানি বটে; কিন্তু অধিকাংশই আমরা জানি না। তবে এর সবই আল্লাহ্ এ বিশ্বজগতে শুধু আপনারই জন্য সৃষ্টি করেছেন। যেন আপনার মুখে হাসি ফোটে। আর আপনি সম্মানিত জীবনযাপন করতে পারেন। এরই সাথে নিমগ্ন হয়ে পড়তে পারেন আল্লাহ্র 'ইবাদাতে'।
আমরা যখন উপশমকারী ঔষধ গ্রহণ করি, সুষম খাবার খাই আর পরিষ্কার পানি পান করি তখন ক্ষত দূর হয়ে যায়।
যখন অন্যের মুখে মুচকি হাসি দেখি, যখন অন্য কেউ আমাদের কাঁধে হাত বুলিয়ে দেয় বা কারও কাছে ভালো কথা শুনি, তখন আমাদের আত্মা শান্তি পায়।
আমরা যখন এমন কাউকে পাই, যে আমাদের অন্তর থেকে ভালোবাসে, যে আমাদের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেয় আর যার সাথে এক কাপ কফি পান করতে পারি তখন খুবই আনন্দ পাই।
এমন অনেক কিছু আছে যেগুলো দেখলে আমাদের ভেতরের ক্ষতগুলো মুছে যায়। যেমন- প্রাকৃতিক দৃশ্য, ঝর্ণার প্রবাহ, পাখি তার ছানাকে খাওয়াচ্ছে এমন দৃশ্য।
অনুরূপ সালাত আমাদের অন্তরে জেগে ওঠা হতাশার গহ্বরকে ঢেকে ফেলে। 'সুবহানা রব্বিয়াল 'আযীম'-এমন এক আনন্দ তৈরি করে-যার স্বাদ আমরা জিহ্বায় পাই। 'সুবহানা রব্বিয়াল আ'লা' আমাদের আরশে উত্থিত করে।
শীতল জীবনে মায়ের দু'আ এনে দেয় উন্নতার ছোঁয়া। বন্ধুকে দেখতে যাওয়া জীবনের কোলাহলের মাঝে বিনোদন দেয়। প্রতিবেশী যখন আপনার খোঁজখবর নেয় তখন আপনার ভেতরের মলিন সত্তা রঙিন হয়ে ওঠে। অরেঞ্জ জুস আপনাকে মুচকি হাসায়। টুকরো মিষ্টি আলাদা স্বাদ এনে দেয়। গরম পানির গোসল সব ক্লান্তি মুছে দেয়।
এ জীবন উপশমের পন্থায় ভর্তি। আমাদের রব আমাদের সুখী করতে চান। আমাদের মুচকি হাসাতে চান। আমরা যেন সুন্দর জীবন যাপন করি—এটাই তাঁর চাওয়া।
সিজদাবনত হোন
কোন জিনিস আপনাকে আল্লাহ্ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে? তাওবাকারী, ক্রন্দনকারী এবং গভীর রাতে তিলাওয়াতকারীদের দলে যোগ দিতে কীসে আপনাকে আটকে রাখছে?
মায়ের পেটে বাচ্চার আকৃতি আল্লাহ্ জন্য সিজদারত ব্যক্তির আকৃতির মতোই।
মায়ের পেটে আপনি যেমন সিজদারত ছিলেন, তেমন সারাটা জীবনভর আপনি সিজদারত থাকুন। তবেই আল্লাহ্ আপনার রিষ্কের জন্য যথেষ্ট হবেন। আপনার জন্য সবচেয়ে সংকীর্ণ জায়গাটাও প্রশস্ত করে দেবেন। আপনাকে আচ্ছাদিত করবেন তাঁর রাহমাতে।
আপনি অন্তর দিয়ে সিজদারত হোন যদিও আপনার মাথা উঁচু থাকে।
হৃৎকম্পন দিয়ে বলুন—'রব্বিয়াল আ'লা' যদিও আপনার মুখে হাসি ফুটে থাকে।
আপনার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা যেন ফিসফিস করে বলে, 'হে ক্ষতসমূহের উপশমকারী প্রভু, আমার সব ভাঙন রোধ করে দিন।' তারপর অবাক হয়ে দেখুন এক অলৌকিক কাণ্ড;-আপনার আত্মা আবার সচল হয়ে উঠছে।
আল্লাহ্, আপনি আমাদের হৃদয়-ক্ষত মুছে দিন। আমাদের শরীরের ভাঙন রোধ করে দিন। আপনি তো সব কিছু করার ক্ষমতা রাখেন।
টিকাঃ
[১] তিরমিযী, ২৮৪
[১] সূরা ত-হা, ২০ : ২৭-২৮
[১] সূরা হিজর, ১৫: ২১
[১] মূল ঘটনা সহীহ বুখারীতে (৩২৩১-৪/১১৫) ও সহীহ মুসলিমে (১৭৯৫ – ৩/১৪২০) আছে।
[২] সূরা কামার, ৫৪: ১০