📄 আল-হাফীয তথা মহারক্ষক
আমরা এন্টিস্লিপ, গাড়ির ব্রেক, প্রতিরক্ষামূলক বেলুন আর সিটবেল্টের উপকারিতা জানি ঠিকই; কিন্তু আমাদের কী দুর্ভাগ্য, এর সক্ষমতা-অক্ষমতা— সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে আমরা ভুলে যাই!
আল-হাফীয তথা মহারক্ষক
যদি অনুভব করেন, আপনার জীবনে বিপদ নেমে আসছে, রোগ আপনার স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আপনার ছেলেটি আপনার থেকে দূরে আছে; আর আপনি তাকে হারিয়ে ফেলার ব্যাপারে শঙ্কিত, অথবা খারাপ সঙ্গীর সাথে মিশে তার বখে যাওয়ার আশঙ্কা করেন; অথবা আপনি মনে করতে পারেন, আপনার জমানো সম্পদ আস্তে আস্তে শেষ হতে শুরু করেছে; তাহলে জেনে রাখুন, আল্লাহ্র 'আল-হাফীয' তথা 'মহারক্ষক' নামটি আপনার জানা দরকার। এই মহান নামের স্পর্শে আপনার 'ঈমানকে নবায়ন করা প্রয়োজন। আপনার জন্য এই নাম নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করার এখনই সময়।
একমাত্র তিনিই আপনার জীবন রক্ষা করবেন, আপনার স্বাস্থ্য রক্ষা করবেন, আপনার সন্তানদের রক্ষা করবেন আর রক্ষা করবেন আপনার সহায়-সম্পত্তি। বস্তুত আপনার জীবনের সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণকারী একমাত্র তিনিই।
হে আত্মা, প্রশান্ত হও
বিখ্যাত মুফাস্সির শাইখ আব্দুর রাহমান আস-সা'দী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, 'মহারক্ষক তো তিনি, যিনি তাঁর সব সৃষ্টিকে রক্ষা করেন। তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার সবকিছুর ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের গুনাহ ও ধ্বংসাত্মক কাজে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করেন। সর্বাবস্থায় নিজ দয়ায় তাদের আচ্ছাদিত করে রাখেন।'
সংরক্ষণের সর্বশেষ পর্যায় তাঁর কাছেই এবং শ্রেষ্ঠ তত্ত্বাবধান তাঁরই। তিনি সাথে থাকলেই আপনি পূর্ণ প্রশান্তি লাভ করবেন।
اللهم احفظني من بين يدى ومن خلفي وعن يميني وعن شمالي ومن فوق وأعوذ بعظمتك أن أغتال من تحتى
আল্লাহ্, আমাকে আপনি রক্ষা করুন সামনের, পেছনের, ডানের, বামের ও উপরের দিক থেকে। আর আমি নিম্নমুখী গুপ্তহত্যার শিকার হওয়া থেকে আমি পানাহ চাই।[১]
আপনি তাঁর কাছে ছয় দিকের বিপদ-আপদ থেকে আশ্রয় চান। আপনি চাইবেন, সংরক্ষণের একটি গোলক যেন আপনাকে সবদিক থেকে ঘিরে রাখে। আর এ ব্যাপারে শুধু আল্লাহই সক্ষমতা রাখেন।
তিনি আপনার চোখ-কান রক্ষা করেন। আর এই রক্ষণাবেক্ষণের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমরা তাকে দিনে-রাতে ডেকে যাই।
اللهم عافني في سمعي، اللهم عافني في بصرى
আল্লাহ্, আমার কানের নিরাপত্তা দিন। আল্লাহ্, আমার চোখের নিরাপত্তা দিন [১]
আপনার চোখ-কান হারালে আপনি এ সৃষ্টিজগত চেনার যন্ত্রই হারিয়ে ফেলবেন। এক বিশাল অন্ধকার জগতে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবেন। ভয়ঙ্কর নীরবতা দিয়ে দুনিয়া আপনাকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলবে।
قُلْ أَرَعَيْتُمْ إِنْ أَخَذَ اللَّهُ سَمْعَكُمْ وَأَبْصَرَكُمْ وَخَتَمَ عَلَى قُلُوبِكُم مَّنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِهِ الانعام
আপনি বলুন, বলো তো দেখি, যদি আল্লাহ্ তোমাদের কান ও চোখ নিয়ে যান এবং তোমাদের অন্তরে মোহর এঁটে দেন, তবে আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের এমন কোন উপাস্য আছে, যে তোমাদের এগুলো এনে দেবে?[২]
মহান রক্ষক তো তিনিই, যার দেওয়া কান দিয়ে আপনি হারাম শোনেন। অথচ মুহূর্তের মধ্যে তা অক্ষম করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আপনাকে তা ব্যবহার করার সুযোগ দেন।
মহান রক্ষক তো তিনিই, যার দেওয়া চোখ দিয়ে আপনি হারাম দেখেন। অথচ ক্ষণিকের মধ্যে তাঁর দৃষ্টি কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আপনাকে তা ব্যবহার করার সুযোগ দেন।
তিনি আপনার দ্বীনেরও সংরক্ষক। আর এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আপনি সিজদায় গিয়ে বলবেন, হে অন্তরসমূহ ও দৃষ্টিসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন।
ভ্রান্তির পথগুলো তিনি যদি আপনার অন্তরকে দ্বীনের ওপর অটল না রাখতেন তাহলে সন্দেহের পশুগুলো আপনার দ্বীনকে খাবলে খেত, প্রবৃত্তির ষন্ডারা আপনার দ্বীনকে অপহরণ করত।
এমন অনেক 'আলিম আছেন যারা বইপত্রের মাঝে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু আল্লাহ্ তাদের বিশ্বাস বিশুদ্ধ করতে চাননি। তাই তারা শেষ বয়সে আল্লাহকে অস্বীকার করে বসে; বিদ'আতে লিপ্ত হয়; কিন্তু দেখুন, কত সামান্য 'আমাল নিয়েও আপনি তাঁকে সিজদা করতে পারছেন। এভাবেই মহারক্ষক আল্লাহ্ আপনার দ্বীন সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
'ইলম থাকা সত্ত্বেও যারা অপদস্থতার শিকার হয়েছে, এমনই একজন 'আলিম, নাম তার 'আব্দুল্লাহ্ আল-কাসিমী। দ্বীনের জন্য তিনি একটি বই রচনা করেছিলেন। বইটির নাম আস-সিরা বাইনাল ইসলাম ওয়াল ওয়াসানিয়্যাহ। তার এই বই নিয়ে কেউ কেউ বাড়িয়ে বলতে গিয়ে বলেন, 'তিনি জান্নাতের মোহরানা দিয়ে দিয়েছেন'। হারাম শরীফের মিম্বরে পর্যন্ত তার প্রশংসা করা হয়েছিল; কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে তার মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। (এমন ফিতনা থেকে আল্লাহ্ আমাদের রক্ষা করুন)। তার মনে সন্দেহ দানা বাধতে থাকে। তারপর তার ধারনাকৃত সেই সন্দেহগুলো একদিন তত্ত্বে রূপ নেয়, বাস্তব চিন্তায় পরিণত হয়। এরপর সেই ভ্রান্তির বেড়াজালে, সন্দেহের ধ্বংসস্তূপে ভর করে সে কলম ধরে ইসলামকে আক্রমণ করে; একটি বইও লিখে ফেলে হাযিহি হিয়াল আগলাল নামে। সেখানে সে দাবী করে বসল, 'আল্লাহর এই দ্বীন এখন শিকল ও জেলখানায় পরিণত হয়েছে।' আমরা আল্লাহ্র কাছে এ রকম লাঞ্ছনা থেকে পানাহ চাই।
মহারক্ষক তো তিনিই, যিনি আপনার দ্বীনকে সংরক্ষণ করেন। আপনার মাথায় জমে থাকা জ্ঞানের স্তূপ সংরক্ষণ করার কোনো দরকার তাঁর নেই। আপনার উচিত জ্ঞান নিয়ে অহংকার না করা। কুর'আন মুখস্থ করেছেন-এ নিয়ে গর্বের কিছু নেই। নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু হাদীস মুখস্থ বলতে পারেন-এ নিয়ে কীসের বড়াই! আল্লাহ যদি দয়া করে আপনার দ্বীনকে সংরক্ষণ না করেন তাহলে আপনি নির্ঘাত বিভ্রান্তিতে নিপতিত হবেন। এই যে বাল'আম ইবনু বাউরা [১]-কে আল্লাহর মহান নামের (ইসমে আ'যম) জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, যেন যে কোনো সময় তাকে তাঁর নামে ডাকলেই তিনি সাড়া দেন। এই মহান নাম তাকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে পারল না। সে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিল।
আমরা আল্লাহকে ভুলে যাই
তিনি আপনার জীবন রক্ষা করেন। এ জন্যই প্রিয়জনদের থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আমরা বলি-
أستودعك الله الذي لا تضيع ودائعه
আপনাকে সেই আল্লাহ্র কাছে আমানত রাখছি, যার আমানতগুলো হারিয়ে যায় না। [১]
যে আমানت আল্লাহ্র সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় রয়েছে তা হারানো যে অসম্ভব।
কোনো দুর্ঘটনায় যদি কোনো মানুষ বেঁচে যায় তাহলে তার পেছনে অবশ্যই একজন সংরক্ষণকারী থাকেন-যিনি তাকে বাঁচান। আমরা এন্টিস্লিপ, গাড়ির ব্রেক, প্রতিরক্ষামূলক বেলুন আর সিটবেল্টের উপকারিতা জানি ঠিকই; কিন্তু আমাদের কী দুর্ভাগ্য, এর সক্ষমতা-অক্ষমতা-সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে আমরা ভুলে যাই!
সাগরের ঢেউতরঙ্গ যখন জাহাজে আঘাত হানে, হৃৎপিণ্ডটা যখন ভয়ে বুক পর্যন্ত উঠে আসে, তখন কে সলিল সমাধি হওয়া থেকে জাহাজটা রক্ষা করেন?
একটি ভিডিওতে দেখেছিলাম, সাগরের উন্মত্ত ঢেউ খেলা করছে একটা জাহাজ নিয়ে। জাহাজের লোকজন দ্রুত একপাশ থেকে অন্য পাশে ছুটে যাচ্ছে। তাদের তখন কিছুই করার নেই। এমনকি স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিও লোপ পেয়েছে। তাদের মাথায় যে একটা জিনিস আছে তা হলো, কোনো কিছু আঁকড়ে ধরে জীবন রক্ষা করা। তারপর যখন ক্যামেরাটা আরও দূর থেকে তাক করা হলো, তখন বিশাল সমুদ্রের প্রমত্ত ঊর্মিমালার মাঝে জাহাজটাকে মনে হলো ছোট্ট এক টুকরো কাগজ।
বিমানের পাইলট যখন ঘোষণা করে, বিমানে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তখন যাত্রীরা সবাই পরম ভক্তির সাথে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকে। সবাই আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় চেয়ে তাওবার ঘোষণা দেয়। জীবনের সব আশা-ভরসা, স্বপ্ন-চিন্তা ভুলে যায়। তাদের বিবেক-বুদ্ধি তখন শুধু মৃত্যুর কথাই চিন্তা করে।
কে তিনি, যিনি তাঁর মহান ক্ষমতায় বিকল বিমান সচল করে দিয়েছেন? যারা ভয়ে কুঁকড়ে ভূত হয়ে গিয়েছিল-কোন সত্তা তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় বের করে এনেছেন?
একবার একটি বিমানের যাত্রী ছিলাম আমি। হঠাৎ প্রবল বায়ুচাপের সম্মুখীন হলো বিমানটি। যখন বিমানের অবস্থা আমি বুঝতে পারলাম যে, সেটি বিরাট মরুভূমির বুকে সাঁতার কেটে চলেছে, সাথে সাথে একরাশ ভয় আমাকে ঘিরে ফেলল। জীবনে এত ভ্রমণ করেছি। সেখানে তো আকাশের বুকে বিমানের এই দুর্বল অবস্থানের ব্যাপারে আমি সচেতন ছিলাম না। আল্লাহ্র অশেষ ক্ষমতায় কীভাবে এটা আকাশে ভেসে বেড়ায়-কখনো তা আমি ভেবেও দেখিনি।
সাগরঝড়ে প্রবল ঢেউয়ে জাহাজ হলো টালমাটাল, নিবিড়ভাবে তাকেই তখন যাচ্ছি ডেকে, সমানতাল। ঝড়ের শেষে নিরাপদে পৌঁছি যখন তীরে, এক নিমিষেই ভুলি তাকে খেল-তামাশায় ফিরে। মাঝ আকাশে উড়ছি যখন মুক্ত বাধাহীন, যাই না পড়ে, রক্ষা করেন রব্বুল 'আলামীন।
প্রহরীরা
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
لَهُ مُعَقِّبَتٌ مِّنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ، يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ !
মানুষের জন্য রয়েছে তার সামনে-পেছনে একের পর এক আগমনকারী প্রহরী; তারা আল্লাহ্র আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে।[১]
শুধু আপনার জন্যই মহারক্ষক আল্লাহ চারজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে রেখেছেন। আপনাকে তারা সবদিক থেকে ঘিরে রাখে। আপনার তাকদীর অনুযায়ী সবকিছু যেন সম্পন্ন হয়, আল্লাহ্র নির্দেশে সে জন্য আপনাকে তারা ঘিরে রাখে।
তিনিই তো মহারক্ষক। তিনি আপনার জন্য এত পরিমাণ ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন, যেন তিনি না চাইলে একটা বুলেটও আপনাকে আঘাত করতে না পারে, কোনো পাথরের আঘাতে যেন আপনি শেষ হয়ে না যান, এমনকি একটি মশাও যেন আপনার ত্বক স্পর্শ করতে না পারে।
শাইখ 'আয়য আল-কারনীকে ফিলিপাইনে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সেই ভিডিওটা আমি বিস্ময়ের সাথে দেখেছি। এক মিটার দূরত্ব থেকে আততায়ী শাইখের দিকে ছয়টা বুলেট শুট করল। এই বুলেট আর শাইখের মাঝে কোনো প্রতিবন্ধক ছিল না। আততায়ীকে বেশ ধূর্ত মনে হলো। শাইখ বা তার সহকারীরা প্রতিহত করারও সুযোগ পাননি; কিন্তু এরপরও শাইখ সুস্থ অবস্থায় সেখান থেকে বের হলেন। আমার মনে পড়ে, অনেক দূর থেকেও একটা মাত্র বুলেট আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির জীবন কেড়ে নেয়। অথচ তখন তার গাড়ি ধীর গতিতে সামনে চলছিল। চারপাশে প্রচুর সেনাবাহিনীর সদস্যও ছিল তার নিরাপত্তায়।
পরে শাইখ বলেছিলেন, আক্রমণের সময় তিনি আল্লাহ্র স্মরণে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি নিজেকে দু'আ-র প্রাচীর দিয়ে বেষ্টন করে রেখেছিলেন।
এই ঘটনাটি একটি পরিপূর্ণ পাঠের অংশ। শুধু তাই নয়, এ ধরনের ঘটনা সম্বলিত কয়েক খণ্ডের একটি বই রচিত হতে পারে, যে বই 'হাফীয' (মহারক্ষক) নামের বর্ণনায় পূর্ণ থাকবে।
বন্ধনীর মাঝে..
আপনি কি জানেন, তিনি সবসময়ই আপনাকে রক্ষা করে থাকেন, নানামুখী আক্রমণ থেকে প্রতি মুহূর্তেই আপনাকে তিনি বার বার বাঁচিয়ে থাকেন?
কীভাবে?
এই যে লেখাটি পড়ছেন, এরই মধ্যে তিনি আপনার হৃৎস্পন্দন থেমে যাওয়া, আপনার শিরা-উপশিরায় রক্ত জমাট বাঁধা, বিবেকের উন্মাদনা, কিডনি নষ্ট হওয়া, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিনষ্ট হওয়া, মাথাব্যথা, পাকস্থলীর সমস্যা, কোনো অঙ্গ বিকল হওয়া, চোখ অন্ধ হওয়া, শ্রবণশক্তি চলে যাওয়া, জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া-এ সব থেকে তিনি আপনাকে বাঁচিয়েছেন। এর পরের মুহূর্তের পরের মুহূর্তটাও আপনাকে তিনিই বাঁচিয়ে রাখেন। তার প্রতিরক্ষা আপনার জন্য এভাবেই চলছে..
বলুন তো, এই স...ব কিছুর জন্য প্রতি মুহূর্তে আমাদের ঠিক কয়বার 'আলহামদু লিল্লাহ্' পড়া উচিত?
একটি বোতল
অন্ধকারে অচেনা-অজানা কোথাও আপনার গাড়ি থামানোর পর যদি ভয় পান যে সেটি চুরি হয়ে যাবে, তাহলে মহারক্ষকের হাতে তা সংরক্ষণের ভার দিয়ে দিন। যা কিছু আল্লাহকে রক্ষা করতে দিয়েছেন তা আপনি কক্ষনো হারাবেন না।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তিত হলে বলবেন- أستودعكم الله الذي لا تضيع ودائعه 'আমি সেই আল্লাহ্র কাছে তোমাদের আমানত রেখে যাচ্ছি-যার নিকট গচ্ছিত আমানত হারায় না।'
ফিরে এসে দেখবেন, তারা ভালো অবস্থাতেই আছে। কারণ, তিনি যে মহারক্ষক।
যদি কখনো পাবলিক প্লেসে অথবা অনিরাপদ কোনো জায়গায় দামী কিছু রেখে যেতে বাধ্য হন, তাহলে অন্তর থেকে বলুন, 'আল্লাহ্, আপনি রক্ষা করুন।' নিশ্চিত থাকুন, আপনার ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহ্ তা রক্ষা করবেন।
চার বন্ধু তাবুক থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে 'নিমাতৃ রাইত' নামে এক জায়গায় বেড়াতে গেল। সকাল নয়টায় তারা পায়ে হেঁটে 'শুক' নামক এক স্থানে পৌঁছল। এই 'শুক' এক গভীর খাদ। সেখানে নামার মানে হলো, জীবনের মায়া ত্যাগ করে সেটি বিলিয়ে দেওয়া। কারণ, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি গর্ত।
অ্যাডভেঞ্চারের নেশা তাদের পেয়ে বসল। তারা আধঘণ্টার মধ্যে ওই খাদের তলানিতে পৌঁছে গেল। মাগরিব পর্যন্ত তারা উপরে ওঠার চেষ্টা করল। পাথরগুলো আঁকড়ে ধরল; কিন্তু মসৃণ পাথরখণ্ডে তারা বার বার পিছলিয়ে পড়ে যেতে লাগল। পায়ের নিচের পাথরখণ্ড ভেঙে যেতে লাগল। পরে এমন একটা সরু জায়গা বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল—যেখানে পায়ের আঙুলেরও জায়গা হয় না।
এভাবে চেষ্টা করতে করতে তারা একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তাদের পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। এক তীব্র পিপাসায় তারা পরাজিত হয়ে পড়ল। সোজা কথা, চোখের তারায় সাক্ষাৎ মৃত্যু দেখতে পেল তারা।
তবে তাদের অন্তরগুলো ছিল আল্লাহ্র সাথে সম্পৃক্ত। তারা দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো রক্ষাকারী নেই। তাদের মধ্যে একজন (বাকিরাও সাক্ষ্য দেয়) আল্লাহ্র কাছে বিনয়াবনত হয়ে চাইল। পিপাসায় বুকের ছাতিটা তখন ফেটে যাচ্ছে, মৃত্যু-কামনার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, এখানে কোনো মানুষ কখনো পা রেখেছে, এমন সম্ভাবনা একেবারেই—নেই এ অবস্থায় হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন একটি পানির বোতল দেখতে পেল। বোতলটি পরিষ্কার ও স্বচ্ছ টলটলে পানিতে পরিপূর্ণ। এই পানি বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি করে পান করার যে আনন্দ, তাদের নিকট এর চেয়ে বেশি আনন্দের ব্যাপার ছিল এই, আল্লাহ্ ওই সময় তাদের সাথে ছিলেন। আল্লাহ্-ই এই বোতলটা তাদের জন্য ওই সময় পাঠিয়েছিলেন। তাদের রক্ষা করেছিলেন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে।
এই বোতলটি শুধু মৃত্যু থেকে বাঁচার চিহ্ন না, এটা মহারক্ষকের হিফাযতের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ওই যুবকরা আবার উপরে ওঠার চেষ্টা করতে থাকে। এভাবে মাগরিবের পূর্বমুহূর্তে তারা ছাদে পৌঁছে যায়। ততক্ষণে তাদের মুখগুলো কালো রং ধারণ করেছে। পোশাক ছিন্নভিন্ন। পা থেকে রক্ত ঝরছে। তবে আল্লাহ্র প্রতি তাদের 'ঈমান তখন পাহাড়সম।
কিছু চোখ ঘুমিয়ে পড়ে আবার কিছু চোখ জেগে থাকে। এমন সব বিষয় নিয়ে অনেকে ব্যস্ত থাকে, যা হতেও পারে আবার না হতেও পারে। যে রব গতকাল আপনার জন্য যথেষ্ট ছিলেন তিনি আগামীকালও আপনার জন্য যথেষ্ট হবেন।
অনেক অনেক বেশি
মহারক্ষকের সাথে প্রতিটি সৃষ্টিরই একটা সম্পর্ক আছে। সৃষ্টি করার পরই তিনি সৃষ্টিকুলকে ছেড়ে দেননি; বরং জীবনের নতুন নতুন ধাপের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তাদেরকে তিনি অস্ত্র-সজ্জিত করে দেন। তিনি জীবনযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার জন্য প্রত্যেক সৃষ্টজীবকে তার উপযুক্ত তরবারি দিয়ে সুসজ্জিত করেন।
দ্রুত দৌঁড়ানোর সক্ষমতা দিয়ে কিছু প্রাণীকে তিনি অন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন। যেমন: হরিণ, খরগোশ।
কেউ ক্ষতি করতে চাইলে তাকে আক্রমণ করে ফেঁড়ে-চিরে দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা দিয়েছেন ষাঁড় আর গণ্ডারকে।
কিছু প্রাণীকে দীর্ঘদেহ দিয়ে রক্ষা করেন তিনি অন্য প্রাণী থেকে। সে তার বিশাল দেহ দিয়ে শত্রুকে মাড়িয়ে চলে। যেমন: ভাল্লুক আর হাতি।
কিছু প্রাণী আছে যারা বৈদ্যুতিক সংকেত দিয়ে নিজেদের রক্ষা করে। তাদেরকে যেই স্পর্শ করে সেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। যেমন: বৈদ্যুতিক ইল ফিশ।
কিছু প্রাণী আবার নিজেদের শরীরে বিষ তৈরি করে আত্মরক্ষা করে। যেমন: সাপ-বিচ্ছু। এভাবেই তিনি তাঁর সৃষ্টিকুলকে রক্ষা করেন। আর মানুষ জানে না এমন কত প্রাণীকে তিনি রক্ষা করেন-তার সংখ্যা নিরূপণ করা অসম্ভব ব্যাপার।
তিনি আপনাকে রক্ষা করেন
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যে মু'মিন বান্দাদের হিফাযত করেন তার একটা চিত্র হলো-
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ ءَامَنُوا
নিশ্চয় আল্লাহ্ 'ঈমানদারদের রক্ষা করেন।[১]
একবার ভেবে দেখুন, তিনি যে 'ঈমানদারদের যাবতীয় বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন কেবল তা নয়; বরং তাদের হয়েই তিনি তাদের রক্ষা করেন। এতেই বোঝা যায়, তারা কত ভয়াবহ ও বিবিধ সমস্যার মুখোমুখি হবে; কিন্তু আল্লাহ্ তো জানেন, তাদের শত্রুরা কী পরিকল্পনা করেছে। তাই তিনি তার প্রিয় মু'মিন বান্দাদের হিফাযতের দায়িত্ব নেন, যাবতীয় ক্ষতি থেকে তাদের দূরে রাখেন।
হাদীসে কুদসীতে [১] আছে— যে আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুতা করবে তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধের ঘোষণা দিই। [২]
একবার কল্পনা করুন, সত্য দ্বীনের দা'ওয়াতের শত্রুর সাথে আল্লাহ্র যুদ্ধ। কে বিজয়ী হবে আর কে পরাজিত? কে হবে লাঞ্ছিত?
তিনি তাঁর মু'মিন বান্দাদের হিফাযত করেন। তাদেরকে বিশেষভাবে রক্ষা করেন। ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও দয়া দিয়ে তাদের ঘিরে রাখেন।
কুরাইশের মুশরিকরা একটা গুহার কাছে একত্র হলো। গুহার ভেতরে মাত্র দুইজন মানুষ—রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবূ বাক্ আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু 'আনহু। তাদেরকে হত্যার জন্য ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থপুরস্কার ঘোষণা করা হয়ে গেছে। মুশরিকদের ভেতর একটা চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। ওই সময়ের সবচেয়ে দামী ব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারা এবং তার নাম-নিশানা বিলীন করে দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাদের ভেতর।
আবু বাক্স আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-র অন্তরের কোণে ভয়ের নীরব প্রবেশ। মহান সাথী তার দিকে ভরসার চোখে তাকালেন; জিজ্ঞেস করলেন, 'আবূ বাক্স, তোমার কী মত সেই দু'জনের ব্যাপারে—যাদের মধ্যে তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ্? আবু বাক্স, তুমি কি মনে করো যে, আমরা দুইজনই? না, আমরা তো তিনজন।'
মুহূর্তের মধ্যে ভয়ের জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কাঁপাকাঁপি থেমে গেল। দুর্ভাবনা কেটে গেল।
আপনি যদি তাঁর সংরক্ষণের অধীন হয়ে যেতে পারেন, তবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন; কারণ, সব ভয়াবহ ব্যাপারই তখন নিরাপদ।
খেয়াল করুন, যেসব যুবক গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল—তাদের কথা।[১] তারা আল্লাহ্র কাছে হিদায়াত চেয়েছিল। আল্লাহ্ তাদের আশ্রয় দিলেন দুয়ার বিহীন একটি গুহায়। সেটি ছিল মানুষ, পশু আর পোকামাকড়ের জন্য উন্মুক্ত; কিন্তু রাহমান তাদের রক্ষা করতে চান, এজন্য তিনি সেখানে পাহারাদারির জন্য সৈন্য দাঁড় করিয়ে দিলেন। এ সৈন্যের নাম 'ভয়'। ভয়ে কেউ আর সেই গুহার আশেপাশেই আসত না। কেউ ভুল করে কাছে কিনারে এসে পড়লে ভয়ে পালাত :
যদি আপনি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখতেন, তাহলে আপনি অবশ্যই পেছন ফিরে পালিয়ে যেতেন। আর অবশ্যই আপনি তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তেন।[২]
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
سَأُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ
খুব শীঘ্রই আমি কাফিরদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করবো।[৩]
তাঁর বান্দাদের জন্যই তিনি কাফিরদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করেন। সেজন্য কাফিররা সবসময় আল্লাহ্র বন্ধুদের ভয়ে ভীত থাকে।
হিংস্র পশুর উপত্যকা
আল্লাহ্ আপনাকে ফেরেশতা দিয়ে রক্ষা করবেন। যে ব্যক্তি ঘুমানোর আগে 'আয়াতুল কুরসী' পড়বে তার জন্য আল্লাহ্ এমন একজন ফেরেশতা তার মাথার কাছে নিযুক্ত করবেন যে তাকে রক্ষা করবে।
আল্লাহ্ যদি আপনার সাথে থাকেন তাহলে কীসের ভয়?
'আল-হাফীয' তথা 'মহারক্ষক' এই নামটা আপনাকে বুক উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস যোগায়। আপনাকে তাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়, যিনি চিরঞ্জীব। যিনি মৃত্যুবরণ করেন না। আপনি যখন অন্ধকারে হেঁটে চলেন, যখন আপনি হিংস্র পশুর উপত্যকা পেরিয়ে যান, কুমিরপূর্ণ নদী যখন আপনি পার হন তখন মহারক্ষক আপনাকে সবসময়ই সংরক্ষণের একটা বলয় দিয়ে ঘিরে রাখেন। তখন বিপদের আয়োজনগুলো আপনার কাছে নিতান্তই সামান্য বস্তুতে পরিণত হয়ে পড়ে।
এর মানে এই না যে, আল্লাহ রক্ষা করছেন—এই দোহাই দিয়ে আপনি নিজেকে হিফাযতের কোনো মাধ্যম/উপায় গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখবেন; বরং মাধ্যম গ্রহণের জন্য আমাদের তো আদেশই দেওয়া হয়েছে। হিজরত, যুদ্ধসহ সবসময়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাধ্যম গ্রহণ করেছেন। সুতরাং মাধ্যমের গুরুত্ব তো থাকবেই এবং একই সাথে আপনার অন্তরে আল্লাহ্র অবস্থান থাকবে মহাজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান ও মহারক্ষকরূপে।
আফ্রিকায় দা'ওয়াতের কাজ করার জন্য 'আব্দুর রাহমান আস-সুমাইত সফর করেছেন। সেখানে দা'ওয়াত দিয়েছেন, দ্বীন প্রচার করেছেন, পথে গিরি-উপত্যকা পার হয়েছেন, ক্ষুধা-পিপাসা, অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছেন—এরপরও তার যে স্বাচ্ছন্দ্যে দা'ওয়াতী কাজ করতে পারা এবং দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে এ কাজে অগ্রসর থাকা এবং অবশেষে কুয়েতে নিজ বাড়ির বিছানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা—এগুলো কেউ যদি চিন্তা করে, তাহলে বুঝবে, আল্লাহ্র 'আল-হাফীয' তথা মহারক্ষক নামের মহিমা কী!
এ ব্যাপারে আরেকটা ঘটনা উল্লেখ করা যাক। এটা আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দাদের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর কিছু না। সা'ঈদ ইবনু জুবাইর রাহিমাহুল্লাহ-কে হাজ্জাজের দুইজন সৈন্য ধরে ফেলল। তারা তাকে হাজ্জাজের কাছে নিয়ে যেতে লাগল। পথে বৃষ্টি নেমে এলে তারা এক পাদ্রীর গির্জায় আশ্রয় নিল; কিন্তু সা'ঈদ সেখানে প্রবেশ করতে কিছুতেই রাজি হলেন না। যে জায়গায় বিভ্রান্তিমূলক পদ্ধতিতে আল্লাহর উপাসনা করা হয় সেখানে প্রবেশে কোনোভাবেই তাকে সম্মত করা গেল না। তারা তাকে রেখেই গির্জায় ঢুকে পড়ল। এ সময় একটা সিংহ তার কাছে এলো। ভেতর থেকে হাজ্জাজের সৈন্যরা চিৎকার করে বলল, 'আপনি পালান, আপনি পালান।' কিন্তু সা'ঈদ একটুও না নড়ে আপন জায়গায় বসে রইলেন। বসে বসে যিক্রে নিমগ্ন হলেন। সিংহ এবার তাঁর আরও কাছে চলে এলো। এবার সা'ঈদের কানের কাছে এসে যেন ফিসফিস করে কিছু বলল। দুই সৈন্য ভয়ে জবুথবু হয়ে তাকিয়ে রইল সা'ঈদের দিকে। পাদ্রীও অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বললেন, 'এ ব্যক্তি তো আল্লাহ্র এক খাঁটি বান্দা।'
থাকো তোমরা দুনিয়া নিয়ে আমাকে রাখো মুক্ত-স্বাধীন। তোমাদের মধ্যে আমিই ধনী যদিও আমি সহায়-সম্বলহীন।
শেষ মুহূর্তে হিংস্র সিংহটাকে থামিয়েছিলেন কে? তিনি তো সেই মহারক্ষক প্রভু।
আমি দরিদ্র
ইউটিউবে একটা ভয়াবহ ভিডিও দেখলাম; এক লোক হেঁটে রেললাইন পার হচ্ছে। ট্রেনটা বেশ দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে। তবে লোকটা যথাসময়ে ওই পাশে চলে যাবে এমন একটা ভাব নিয়েই এগোচ্ছে।
হঠাৎ করে তার পা আটকে গেল রেললাইনের সাথে। সে পা ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে; কিন্তু সরছে না। এদিকে ট্রেনও এগিয়ে আসছে প্রবল গতিতে। মৃত্যুর ভয়ে সে জোরে চিৎকার করে উঠল। মরার আগেই ভয়ে সে মরে যাচ্ছে এমন অবস্থা। ট্রেন আর তার মাঝে দূরত্ব যখন মাত্র কয়েক মিটার বাকি, তখন আল্লাহ্ লাইনের লোহার পাতকে লোকটির পা বের করার অনুমতি দিলেন। লাইন থেকে পা ছাড়িয়ে লোকটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল।
আপনার দুর্বলতার ওপর ভরসা রাখুন, আপনি যে কত ক্ষুদ্র সেটা বিশ্বাস করতে শিখুন। দারিদ্র্যের ওপর নির্ভর করুন। তারপর আপনার অন্তরকে আল্লাহমুখী করে ফেলুন আর বলুন-
আমি সৃষ্টিকূলের প্রভুর কাছে দরিদ্রের মতো চাই। আমি চাই সর্বাবস্থায়ই নিঃস্ব।
হযরত লূত 'আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় ছিল জঘন্য পাপাচারী। একদিন তারা জোরপূর্বক লূত 'আলাইহিস সালামের ঘরে ঢুকে পড়ল এবং তার অতিথিদের জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। অথচ অতিথি ছিলেন ফেরেশতারা। আচ্ছা, আপনার ঘরের অতিথি যদি আপনার সম্প্রদায়ের সবচেয়ে পাপী লোকগুলোও হয় এবং তাদেরকে কেউ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় তাহলে সেটা কত বড় লজ্জার ব্যাপার হবে, ভেবে দেখুন তো; অধিকন্তু সেখানে অতিথি ছিলেন পবিত্রতম ফেরেশতাগণ। লুত 'আলাইহিস সালাম তখন দুর্বল কণ্ঠে বললেন-
لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ ءَاوِي إِلَىٰ رُكْنٍ شَدِيدٍ ۞
তোমাদের বিরুদ্ধে যদি আমার শক্তি থাকত অথবা আমি কোনো সুদৃঢ় আশ্রয় গ্রহণ করতে সক্ষম হতাম।[১]
নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম লূত 'আলাইহিস সালামের এই অসহায় উক্তি সম্পর্কে বলেন, 'আল্লাহ্ লূত আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর রহম করুন। তিনি সুদৃঢ় স্তম্ভ আল্লাহ্র নিকটেই আশ্রয় নিতেন [২]
আপনি আল্লাহ্র রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরুন। কারণ, অন্যান্য স্তম্ভ আপনার সাথে বে'ঈমানী করলেও এটা করবে না।
প্রিয় ভাই আল্লাহ্ কখনো শত্রু দিয়েও আপনাকে হিফাযত করবেন। কীভাবে সেটি? কথিত আছে, এক গভীর রাতে চুরি করার জন্য এক চোর মহল্লার একটি বাড়িতে ঢুকল। বাড়িতে ঢুকে সে মূল কক্ষে থাকা ওই বাড়ির টাকা-পয়সা যেখানে যা ছিল খুঁজতে লাগল। বাড়িতে অবস্থানকারী দম্পতি তাদের ছোট বাচ্চা নিয়ে ঘুমাচ্ছিল। চোর ঘরে ঢোকার পর হঠাৎ বাচ্চাটি চিৎকার করে কেঁদে উঠল। বাবা-মা জেগে উঠে কিছুটা সন্দেহপ্রবণ হয়ে চিন্তা করতে থাকল—বাচ্চাটা কী দেখে এমন চিৎকার করছে? বাচ্চার কান্না না থামায় বাবা-মা দুজনই উঠে বাচ্চাটি কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাচ্চাটি কেঁদে ওঠার সাথে সাথেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল চোরটা। দম্পত্তি বাচ্চা নিয়ে যেই ঘর থেকে বের হলো, পাশে লুকিয়ে থেকে অমনি সে আবারও তাদের চোখের আড়ালে ঘরে গিয়ে ঢুকল এবং এরই মধ্যে কোনো কারণে হঠাৎ করে রুমের ছাদটা ভেঙে পড়ল। ছাদের নীচে চাপা পড়ে সাথে সাথেই মারা গেল চোরটা।
আচ্ছা, এই চোরটাকে কে নিয়ে এসেছে ওই পরিবারকে ছাদের নিচে চাপা পড়া থেকে বাঁচাতে? কৌশলটা তো এই চোরের পক্ষেই ছিল, কীভাবে বিপক্ষে চলে গেল? ওই সত্তার ইশারায়—যিনি হলেন মহারক্ষক আল্লাহ্। তিনি তাঁর বান্দাদের রক্ষা করেন। এমনকি শত্রু দিয়েও। আরেকবার হাদীসটি পড়ে দেখুন—
يا غلام، إني أعلمك كلمات احفظ الله يحفظك، احفظ الله تجده تجاهك، تعرف إلى الله في الرخاء يعرفك في الشدة
‘যুবক, আমি তোমাকে কিছু বাক্য শিখিয়ে দিই: আল্লাহকে মেনে চলো; তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলো; তুমি তাঁকে তোমার পাশে পাবে। ভালো সময়ে আল্লাহ্র সাথে পরিচিত হও; তাহলে খারাপ সময়ে তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন।’[১]
আল্লাহকে মেনে চলুন, তিনি আপনাকে হিফাযত করবেন। আদেশের ক্ষেত্রে আল্লাহকে মেনে চলুন। তিনি যেমনটা বলেছেন তেমনটা করুন।
নিষেধের ক্ষেত্রে আল্লাহকে মেনে চলুন। তিনি যা করতে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করুন।
শ্বাসরোধ
আপনি আপনার ভয়-দুর্ভাবনা দমন করুন। আল্লাহ্ আপনাকে সেভাবে রক্ষা করবেন, যেভাবে ইউনুস ইবনু মাত্তা 'আলাইহিস সালাম-কে রক্ষা করেছিলেন।
ইউনুস 'আলাইহিস সালাম-এর দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনার সমপরিমাণ দুশ্চিন্তা আর কারও হতে পারে না। তিনি তিন ধাপ অন্ধকারের ভেতর ছিলেন। গভীর সমুদ্রের অন্ধকার, তিমির রাতের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকার। কী ভয়াবহ একটা জীবনে তিনি আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন মাছের পেটে। অন্ধকার। সংকীর্ণতা। শ্বাসরোধ।
তারপরও এই সব বিপদের মোকাবেলা করলেন একটি দু'আর মাধ্যমে-
لا إله إلا أنت سبحانك إني كنت من الظالمين
'লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন।'
এই দুর্বল আওয়াজ মাছের পেট, সমুদ্র আর রাতের অন্ধকার ভেদ করে আসমানে উত্থিত হলো। ফেরেশতারা এ আওয়াজ শুনে বললেন, 'প্রভু, অপরিচিত জায়গা থেকে খুব পরিচিত একটি আওয়াজ পাচ্ছি।'
উদ্ধারের পর্ব ঘনিয়ে এলো। তাকে এবার রক্ষা করার পালা। ক্ষমার চাদরে আচ্ছাদিত হলেন তিনি। তিমি মাছ তাকে ফেলে দিল সমুদ্রতীরে। মহারক্ষক তার পাশেই ইয়াকতীন[১] গাছের চারা গজিয়ে দিলেন।
এ জীবনে আমরা সবাই যুন্নুনের[২] মতোই। যখনই জীবনে বিপদগ্রস্ত হবো তখনই আমরা শুধু 'লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন'-এ আহ্বান করব। আল্লাহ্ আমাদের এর বিনিময়ে রক্ষা করবেন।
আল্লাহ্, আপনি আপনার আমাদের রক্ষা করুন। আপনার অনুকূলে আমাদের আশ্রয় প্রদান করুন। আপনি আমাদের সামনে, পেছনে, ডানে, বামে, উপরে আর নিচে আপনার হিফাযতের দেয়াল তুলে দেন, যার মাধ্যমে আমরা অকল্যাণের ভয়াবহতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবো।
টিকাঃ
[১] ইবনু মাজাহ, ৩১২১
[১] আবু দাউদ, ৫০৯০
[২] সূরা আন'আম, ০৬: ৪৬
[১] বাল'আম ইবন বাউরা মুসা 'আলাইহিস সালামের সময় অ-ইয়াহুদীদের মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতো। নিজ সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে প্রভূত সম্মান প্রদর্শন করত। কেননা, সে ছিল এমন একজন লোক, যার দু'আ কবুল হতো। সিরিয়ার কিনআন এলাকায় ছিল তার বসবাস। যখন মুসা 'আলাইহিস সালাম কিনআন বিজয়ে সফর করেন, বাল'আমের সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে চাপ দিতে থাকে মূসা 'আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে ধ্বংসের দু'আ করতে। প্রথমে সে অস্বীকার করলেও পরে প্রলোভনে পড়ে সে নাবী ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে বদ-দু'আ করে। আর এর ফলেই সে আল্লাহর শাস্তিতে পতিত হয়। বিস্তারিত দেখুন, মাআরিফুল কুরআন, পৃ. স. ৫০১... এছাড়া বাল'আমকে রবানিক সাহিত্যে সাতজন নম্র ভাববাদীর (আইয়ূব ও তার চার বন্ধু, বাল'আম ও তার পিতা বাউরা) একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- (Talmud, B. B. 15b)। অ-ইয়াহুদীদের মধ্যে বাল 'আমের অবস্থান ছিল তেমন-ই যেমন ছিল ইয়াহুদীদের মাঝে মূসা 'আলাইহিস সালামের অবস্থান- (Midrash Numbers Rabbah 20)। উল্লেখ্য, মুসা 'আলাইহিস সালামের মতো বাল'আমেরও ত্বকচ্ছেদ অবস্থায় জন্ম- (Abbot De-Rabbi Natan)। ইয়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তালমুদমতে, তার এক পা খোঁড়া ও এক চোখ কানা ছিল- (Talmud Sanhedrin 105a)।
[১] মুসনাদ আহমদ: ২/৪০৩
[১] সূরা রা'দ, ১৩: ১১
[১] হাদীসে কুদসী হলো আল্লাহর এমন বাণী, যা কুর'আনের অর্ন্তভুক্ত নয়, জিবরা'ঈল 'আলাইসি সালাম আল্লাহর বাণী হিসেবেই রাসূলের কাছে পৌছিয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা নিজ বর্ণনায় শুনিয়েছেন।
[২] বুখারী, ৬১৩৭
[১] আসহাবে কাহাফ বা গুহায় আশ্রয়গ্রহণকারী সেই ছয়জন যুবক উদ্দেশ্য এখানে-যারা তাওহীদের বিশ্বাসী ছিল। তাদের সঙ্গে আশ্রয়গ্রহণকারী একটি কুকুরও ছিল তাদের সাথে।
[২] সূরা কাহাফ, ১৮ : ১৮
[৩] সূরা আনফাল, ০৮ : ১২
[১] সূরা হুদ, ১১: ৮০
[২] সহীহ বুখারী, ৩৩৭২; সহীহ মুসলিম, ১৫১
[১] হাদীসটি আবু দাউদ তার সুনান গ্রন্থে (৪/৪৮৬-৫০৯৬) উল্লেখ করেছেন।
[১] এর অর্থে বলা হয়, এটি একটি মিষ্টি কুমড়ো গাছের চারা ছিল। যা আল্লাহ তা'আলা তার নাবীকে ছায়া দান ও সুস্থতার জন্য উৎপন্ন করেছিলেন।
[২] সূরা আম্বিয়ায় ইউনুস 'আলাইহিস সালামকে যুলুন বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
📄 আল-লাতীফ তথা সূক্ষ্মদর্শী
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ আপনাকে অনিষ্ট থেকে বাঁচাতে চান তাহলে তিনি আপনাকে সেই অনিষ্ট আর দেখাবেন না অথবা অনিষ্ট আপনার কাছে আসার পথই খুঁজে পাবে না, অথবা হতে পারে, আপনারা একে অপরকে অতিক্রম করে যাবেন; কিন্তু কেউ কাউকে স্পর্শই করবেন না!
আল-লাতীফ তথা সূক্ষ্মদর্শী
আপনার নিরাপত্তা কি খুব দুরূহ ব্যাপার? এ নিরাপত্তার মাঝে কি বিপদের হাতছানি দেখছেন? ডাক্তাররা কি আপনাকে জানিয়ে দিয়েছে যে, আপনার অমুক আত্মীয়ের আরোগ্যলাভের কোনো সম্ভাবনা নেই? আপনার কাজের আশানুরূপ ফলাফল না পেলে কি আপনি হতাশায় ভোগেন?
তাহলে আসুন, আমরা পরিচিত হই আল্লাহ্র 'সূক্ষ্মদর্শী' নামটির সাথে। এ নাম পর্যবেক্ষণ করলে নিশ্চিত হবেন যে, এ জীবনে অসম্ভব বলে কিছু নেই। আল্লাহ্ সবকিছুই করতে পারেন। আপনার অসম্ভব স্বপ্নগুলো বাস্তবের রূপ নেবে যদি আপনি 'সূক্ষ্মদর্শী' আল্লাহ্র দরজায় কড়া নাড়েন।
সূক্ষ্মতা
আভিধানিক অর্থে : 'আল-লাতীফ' তিনি, যিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি ইহসান (কল্যাণ, অনুগ্রহ, দান-দয়া) করেন। তাদের উপকারে আসে এমন বস্তু সূক্ষ্ম ও কোমলভাবে পৌঁছে দেন। আপনি যদি বলেন, 'লাতাফাল্লাহু লাকা'-এর মানে হলো, 'আল্লাহ্ আপনার ইচ্ছাগুলো সূক্ষ্মভাবে পূর্ণ করুন।'
'আল-লুতফ' শব্দের অর্থ হলো: সূক্ষ্মতা ও পুঙ্খানুপুঙ্খতা।
তিনি আপনার প্রতি কোমলরূপে ইহসান তখনই করতে পারবেন যখন তিনি আপনার অন্তরের খবর ও সূক্ষ্ম বিষয়গুলো জানবেন।
আল্লাহ্ হলেন ওই সত্তা-যিনি বান্দার প্রতি গোপনে ইহসান করেন। বান্দার প্রয়োজন পূরনের বন্দোবস্ত তিনি এমন জায়গায় করে রাখেন যে, বান্দা সেটা জানতেই পারে না। এমন জায়গায় তিনি বান্দার জন্য রিস্কের ব্যবস্থা করে রাখেন, বান্দা যা ধারণাও করতে পারে না।
বান্দাকে দয়া করেন, ইহসান করেন। বান্দাকে রক্ষা করেন, হিদায়াত দেন। বান্দার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন। এ সকল ব্যাপারেই তিনি সূক্ষ্মদর্শী।
তাঁর অদৃশ্য ক্ষমতার মহিমান্বিত রূপ, তাঁর জ্ঞানের মহত্ত্ব ও সৃষ্টিজগতের প্রতি দৃষ্টি রাখার পাশাপাশি বান্দার জন্য যা ভালো, যা উপকারী—সবই তিনি সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করেন। তাঁর অনুগ্রহ দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যাবে না। এ অনুগ্রহ আপনার কাছে সুসংবাদের সুবাতাস নিয়ে হাজির হবে। আপনাকে প্রস্তুত করবে গ্রহণ করার জন্য। তারপর যখন আপনার ওপর অনুগ্রহ প্রস্তুত হয়ে থাকবে, তখন আপনাকে তিনি একটা উপায় বাতলে দেবেন, যে উপায়ে আপনি এ অনুগ্রহ অর্জন করতে পারবেন। তিনি আপনার জন্য ওই অনুগ্রহ অর্জনের পথকে সুসজ্জিত করে দেবেন। আপনি ভাববেন, এটা আপনার নিজ হাতেরই অর্জন। অথচ এটা আসলে আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহের একটা সামান্য নমুনামাত্র।
তিনি এমন ঘটনা ঘটান, যেগুলো আমাদের বিবেক-বুদ্ধি কল্পনাও করতে পারবে না। তিনি সেগুলো বাস্তবে রূপ দেন। এই যে তাঁর অনুগ্রহের দান-এ তো অদৃশ্য এবং সূক্ষ্মদর্শিতার মাধ্যমেই। আপনি হঠাৎ করে আপনার আঙিনায় এ অনুগ্রহের উপস্থিতি দেখতে পাবেন। কীভাবে এটা ঘটল—ভেবে পাবেন না। আপনার মাঝে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাবে যে, আপনার অবস্থা ও শক্তি অনুযায়ী এটা বাস্তবায়ন করার কোনো ক্ষমতাই আপনার কাছে নেই। আপনি তখন আসমানের দিকে তাকিয়ে বলবেন—
لطيف بعباده
আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি কোমল। [১]
সূক্ষ্মতার সুবাতাস
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ আপনাকে সাহায্য করতে চান তাহলে সামান্য একটি মাধ্যমকে তিনি বড় মাধ্যমে পরিণত করতে পারেন।
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ আপনাকে সচ্ছল করতে চান তাহলে যার থেকে আপনি কখনো কোনো কিছু পাওয়ার আশাই করেননি, তার কাছ থেকেই সবচেয়ে বড় পাওয়াটাই পেতে পারেন।
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ আপনাকে অনিষ্ট থেকে বাঁচাতে চান তাহলে তিনি আপনাকে সেই অনিষ্ট আর দেখাবেন না অথবা অনিষ্ট আপনার কাছে আসার পথই খুঁজে পাবে না। পাবে না, অথবা হতে পারে, আপনারা একে অপরকে অতিক্রম করে যাবেন; কিন্তু কেউ কাউকে স্পর্শই করবেন না।
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ আপনাকে কোনো ঘৃণিত পাপকাজ থেকে রক্ষা করতে চান তাহলে আপনার কাছে সেটা অপছন্দনীয় করে দেবেন। আপনার জন্য সেটা করা কঠিন হয়ে যাবে। কাজটা করতে আপনিও অস্বস্তিবোধ করবেন। কাজটা করার জন্য হয়তো অগ্রসর হলেন; কিন্তু পথে তিনি একটা কিছু দিয়ে আপনাকে থামিয়ে দেবেন এবং সামনে অগ্রসর হতে দেবেন না।
মু'মিনগণ সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ এই অনুগ্রহগুলো পর্যবেক্ষণ করে। তারা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সেগুলো অবলোকন করে। জীবনের প্রতিটি ফায়সালাতেই তারা খুঁজে পায় আল্লাহর কোমল ও সূক্ষ্ম পরশ।
সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ যখন ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম-কে কারাগার থেকে মুক্ত করতে চাইলেন, তখন তিনি কারাগারের প্রাচীর ভেঙে দেননি। আকাশ থেকে কোনো বিদ্যুৎ দিয়ে ঝলসে দেননি কারাগারের তালা। তিনি শুধু বাদশাহকে একটা স্বপ্ন দেখালেন, স্বপ্নের মাঝে একটা ছোট্ট ইশারা রাখলেন, যা দিয়ে সত্যবাদী ইউসুফ মুক্তি পাবেন অত্যাচারের শিকল থেকে।
সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ যখন মূসা 'আলাইহিস সালামকে মায়ের কাছে ফেরাতে চাইলেন তখন তিনি কোনো যুদ্ধ লাগিয়ে দেননি, যার মাধ্যমে বানু ইসরা'ঈল ফিরাউনের সীমালঙ্ঘনের বিপক্ষে লড়াই করে মাযলুমদের রক্ষা করবে। না, তিনি শুধু মূসা 'আলাইহিস সালামের মুখে অন্যান্য সব ধাত্রীমাতার প্রতি অরুচি সৃষ্টি করে দিলেন। মায়ের অন্তরটা যখন দুশ্চিন্তায় খালি হয়ে গেছে তখন এই সামান্য একটা মাধ্যম দিয়ে তিনি মূসা 'আলাইহিস সালামকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন।
আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন শি'আবে বানু হাশিমের সাথে বন্দি ছিলেন তখন সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ চাইলেই এক ভয়াবহ চিৎকারে কুরাইশদের ধ্বংস করে দিতে পারতেন; কিন্তু তিনি শুধু কিছু কীটপতঙ্গ পাঠালেন। কীটগুলো কা'বাঘরে ঝুলিয়ে রাখা ওই নিপীড়নের চুক্তিটা খেয়ে ফেলল। ফলে যেসব কীট চোখেই পড়ে না সেগুলোর মাধ্যমেই এই নিপীড়নপত্র তিনি ছিন্নভিন্ন করে দিলেন।
আপনি ছাড়া আমি আর কারও কাছেই হাত তুলি না।
আপনি ছাড়া আর কারও জন্য আমার দু'চোখ থেকে অশ্রু ঝরে না।
আপনার দরজাটা আমার জন্য সংকীর্ণ নয়।
তাহলে আপনার কাছে যে চাইতে আসবে তাকে ফেরাবেন কীভাবে, আল্লাহ? আপনি তো অমুখাপেক্ষী। সুতরাং আপনার কাছে যে চাইতে আসে তাকে কীভাবে ফিরিয়ে দেবেন?
তাঁর দয়া ও সূক্ষ্মদর্শিতা তো বিপদাপদকে ছাড়িয়ে যায়। যেহেতু তিনি হলেন পরম দয়াময় ও সূক্ষ্মদর্শী, তিনি সবচেয়ে সহজ বিষয়গুলো দিয়েই বড় ধরনের বিষয়গুলো নির্ধারণ করেন। তার যেভাবে ইচ্ছা হয় তিনি সেভাবেই সব কিছু করেন। বান্দা জানতেই পারে না কী ঘটছে।
এক টুকরো পাথর
ধরুন, আপনি ঘুমিয়ে আছেন। আল্লাহ্ চাইলেন, যেন আপনি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করেন। তাই তিনি একটু মৃদু বাতাস পাঠালেন। আপনার রুমের জানালাটা নড়ে উঠল। অথবা আপনার পাশের রুমে একটা ছেলে হাঁটাহাঁটি করছে, হই চই করছে। অথবা আপনার তীব্র পিপাসা পেয়ে বসল। এ রকম কোনো একটা কারণে আপনি জেগে উঠলেন। ওযু সেরে কয়েক মিনিট পর আপনি সালাতের স্থানে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা শুরু করলেন। আপনি জানেনই না যে, আপনাকে কে উঠিয়েছেন।
সুউচ্চ পাহাড়ী রাস্তায় আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন। গাড়িটা রাস্তার এক পাশে দাঁড় করালেন ড্রয়ারে কিছু একটা খোঁজার জন্য। হতে পারে সেটা আপনার আইডি কার্ড বা মানিব্যাগ। কয়েক সেকেন্ড পর চোখের সামনে দেখলেন, পাহাড়ের চূড়া থেকে একটা বিরাট পাথরের খণ্ড আপনার সামনে দিয়ে নেমে যাচ্ছে। ঠিক ওই সময় আপনি যদি না থামতেন, তাহলে পাথরটা গাড়িসমেত আপনাকে পিষ্ট করে চলে যেত। আপনি জানেনই না, কে আপনাকে বাঁচিয়েছে।
আল্লাহ্র অবাধ্যতা করার জন্য রাতের বেলা রাস্তায় বের হলেন। পরিকল্পনা বেশ ভালোভাবে সাজানো। হঠাৎ দূরে একটা গাড়ি দেখতে পেলেন। সন্দেহ হলো, কেউ আপনাকে অনুসরণ করছে। গাড়ি পার হয়ে যাওয়ার পর আপনার ভেতরে একটা অপরাধবোধ জন্ম নেয়। আপনি পরিকল্পনাটা বাতিল করে বাড়িতে ফিরে এলেন। আপনি জানেনই না, তিনিই আপনাকে তার কোমলতা দিয়ে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
আল্লাহর এমন অনেক সূক্ষ্ম দয়া আছে যার সূক্ষ্মতা বুদ্ধিমান ব্যক্তিও ধরতে পারে না। অনেক কিছু সকালে খারাপ লাগে, কিন্তু বিকেল গড়িয়ে গেলে সেটিই আবার ভালো লাগতে শুরু করে। যদি কখনো আপনার অবস্থা সংকীর্ণ হয়ে আসে তাহলে মহান আল্লাহ্র প্রতি ভরসা রাখবেন।
গোপন ও সূক্ষ্ম বিষয়াদি
একজন সূক্ষ্মদর্শীকে অবশ্যই হতে হবে মহাজ্ঞানী। তিনি আপনাকে কীভাবে সূক্ষ্ম পরিচর্যা করবেন যদি এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো না-ই জানেন?
তাকে অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা হতে হবে। কারণ, পরিপূর্ণ সূক্ষ্মদর্শিতা থাকলেই কেবল অনস্তিত্ব থেকে কোনো কিছু অস্তিত্বে নিয়ে আসতে পারেন। এই যে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি একটা অপরটাকে বোঝায়, আর একটা আরেকটাকে আবশ্যক করে-সে ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ) Φ
যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী ও সম্যক অবহিত [১]
কীভাবে তিনি না জেনে থাকবেন? তিনি তো সকল গোপন বিষয়াদিও জানেন। তাঁর জ্ঞান এমন পর্যায়ে যে, তা সূক্ষ্ম ও অতি গোপন। তিনি তো এমন রব, যিনি গোপনে মানুষকে সম্মান দান করেন, মানুষকে হিদায়াত দেন, মানুষের সব কিছু পরিচালনা করেন, তিনি কি এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো না জেনে থাকবেন? তাও কি হয়, হতে পারে? শাইখ আব্দুর রাহমান আস-সা'দী বলেন, 'তিনি এমন সূক্ষ্মদর্শী যে, তাঁর জ্ঞান গোপন বিষয়াদিকে ঘিরে আছে, সূক্ষ্ম বিষয়গুলোকে বেষ্টন করে আছে।'
এই যে ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম একটি স্বপ্ন দেখলেন, সেটা তো ওই অবস্থাতে একদম অসম্ভবই মনে হয়েছিল। তার স্বপ্নের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'নিশ্চয় আমি এগারোটা তারকা, সূর্য এবং চাঁদ দেখেছি। তারা আমাকে সিজদা করছিল।' স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো, তার বাবা, মা ও এগারো ভাইবোন তাকে সম্মান জানিয়ে সিজদা করবে।
ওই অবস্থায় এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই পাওয়া যায় না।
তার পিতা একজন সম্মানিত নাবী, একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। এটা তো মেনে নেওয়া অসম্ভব যে, বড় মানুষ ছোট মানুষকে সিজদা করবে, যে নাবী নয় তাকে নাবী সিজদা করবে, বাবা ছেলেকে সিজদা করবে।
তার ভাইয়েরা তো তাকে ঘৃণাই করে। সিজদা করবে কীভাবে? তাদের ঘৃণা এমন পর্যায়ের ছিল যে, তারা তাকে হত্যারও পরিকল্পনা করেছিল। এ ঘৃণা তাদেরকে প্ররোচিত করেছে তাকে কুয়ায় ফেলে দিতে। এই সব পরিস্থিতি তাদের সিজদাকে আরও অসম্ভব করে তুলেছিল।
অবস্থার পরিবর্তন হলো। তাকে কুয়ায় নিক্ষেপ করা হলো। তারপর পণ্যদ্রব্যের মতো তাকে বিক্রিও করা হলো। তিনি হয়ে গেলেন মিশরের শাসকের দাস। দাস অবস্থায় এই অসম্ভাব্যতা আরও বেড়ে গেল।
তারপর তিনি হয়ে গেলেন এক বন্দী। স্বপ্নপূরণ থেকে তার দূরত্ব বেড়ে গেল যোজন যোজন।
কিন্তু সূক্ষ্মদর্শী সত্তা ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন এবং পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারেন। তিনি তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাকে বড় একটি পদে আসীন করলেন। তারপর দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। ভাইয়েরা তার কাছে এলো প্রয়োজন নিয়ে। তারপরই সেই পুরাতন স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ ভাগ্য পরিবর্তন করে দিলেন। ফলাফল: ইউসুফ 'আলাইহিস সালামের বাবা-মা ও ভাইয়েরা তাকে সিজদা করেন-এতে ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম বিস্মিত হন। তিনি বলেই ফেলেন-
يَتَأَبَتِ هَذَا تَأْوِيلُ رُمْيَيَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا
হে আমার পিতা, এই তো আমার আগের স্বপ্নের ব্যাখ্যা। আমার রব এটাকে সত্য করেছেন [১]
কেননা, রবের ইচ্ছা না থাকলে তা বাস্তবায়িত হতো না।
'তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছেন এবং শাইতান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদের মরু অঞ্চল থেকে এখানে নিয়ে এসে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।'
এটাই হলো আল্লাহ্ নিপুণতার সারমর্ম। অতঃপর তিনি স্বাক্ষ্য দিলেন, 'নিশ্চয় আমার রব যা করেন নিপুণতার সাথেই করেন।' হ্যাঁ, তিনিই তো সুনিপুণ। তিনি কিছু করতে চাইলে তার মাধ্যমগুলো খুব নিপুণ, সূক্ষ্ম ও গোপনীয়ভাবে প্রস্তুত করেন। এমনকি অসম্ভব জিনিসও ঘটে থাকে। কারণ, তিনি যে সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।
সুদূরের স্বপ্ন
যদি দেখেন, যমীনটা ধূসর হয়ে গেছে, এর ওপর মেঘগুলো ভিড় জমাচ্ছে। এরপর বিদ্যুৎ চমকাল। বৃষ্টি নামা শুরু হলো। যমীনটা নড়েচড়ে উঠল। সবুজাভ হয়ে এলো চারপাশ। আপনি মনে করবেন না যে, এটা প্রাকৃতিক ব্যাপার। আল্লাহ্ বাণী গভীরভাবে ভেবে দেখুন-
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَتُصْبِحُ الْأَرْضُ مُخْضَرَّةً إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ
তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ্ পানি বর্ষণ করেন আকাশ হতে; যেন সবুজ শ্যামল হয়ে ওঠে যমীন? নিশ্চয় আল্লাহ্ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত [২]
আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন যত অসম্ভবই মনে হোক না কেন, আপনার স্বপ্ন পূরণের সাথে আপনার ব্যবধান যত দূরেই থাকুক না কেন, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সেটার ব্যবস্থা করে দেবেন।
يَبْنَى إِنَّهَا إِن تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُن فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ )
হে আমার ছেলে, নিশ্চয় তা যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, অতঃপর তা থাকে শিলাগর্ভে অথবা আসমানসমূহে কিংবা যমীনে, আল্লাহ্ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। [১]
তাই আপনি হতাশ হবেন না। আপনার রব নিপুণতার সাথেই সবকিছুর ব্যবস্থা করেন।
আমার এক বন্ধু দীর্ঘ সফরে তাবুক থেকে জর্ডান সীমান্তের উদ্দেশে রওনা হলেন। সকালবেলা তাকে মৃতাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে হবে। কারণ, সেখানে বিভিন্ন দেশের ছাত্রদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়েছে; কিন্তু রওনা হয়ে একশ কিলোমিটার যেতেই মনে পড়ল, পাসপোর্টটা তিনি বাসায় রেখে এসেছেন। আবার কষ্ট করে ফিরে আসতে লাগলেন। ফিরে এসে ওই সপ্তাহে আর না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
পরের দিন পত্রিকা খুলে দেখতে পেলেন যে, মৃতাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দেশের কিছু ছাত্র বিশৃঙ্খলা করেছে যার ফলে অনেকে আহত হয়েছে।
এই যে সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্, তিনিই তাকে ভুলিয়ে দিলেন পাসপোর্টের ব্যাপারটা। যেন তাকে দেখতে না হয় রক্ত। যেন পরের সকালটা তাকে হাসপাতালে কাটাতে না হয়। অথবা তার অন্তরে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ভয় ঢুকে না পড়ে, যে ভয়ের কারণে সে হয়তো পড়াশোনাই ছেড়ে দিতে পারে।
সূক্ষ্মদর্শীর কথাগুলো লক্ষ করুন। নিঃসন্দেহে একের পর এক উদাহরণ আসতেই থাকে। প্রতিটি কাজেই সূক্ষ্মতার ছোঁয়া। জীবনের প্রতি মুহূর্তেই সূক্ষ্মদর্শী ও বিজ্ঞ আল্লাহর কোমল পরশ ঘিরে রেখেছে আপনাকে সব দিক থেকেই।
চূড়ান্ত মুহূর্তের কোমল পরশ
আপনি যদি ঠিক এমন সময় রুমে প্রবেশ করেন, যখন আপনার শিশু সন্তানটি বিছানা থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। তখন নিজেকে প্রশ্ন করুন, 'ঠিক এখনই কেন আপনি রুমে ঢুকলেন?'
আপনি পানির জন্য রান্নাঘরে ঢুকছিলেন; কিন্তু হঠাৎ বৈদ্যুতিক প্রবাহের আওয়াজ শুনে ছুটে গিয়ে দেখলেন, ফ্রিজে আগুন লাগার উপক্রম, দ্রুত লাইনটা আলাদা করে দিলেন। এ সময় নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, 'ঠিক এ সময় কোন সত্তা আপনাকে রান্নাঘরে প্রবেশ করালেন? আর পাঁচটা মিনিট পরে কেন ঢুকলেন না?'
হুবহু এমনই ঘটবে আপনার সাথে তা নয়, এ রকম কিছু অথবা এর কাছাকাছি কিছু তো অবশ্যই আপনি ঘটতে দেখেছেন। একবার স্মৃতি রোমন্থন করে দেখুন। মনে পড়বে, মহান আল্লাহ্র কোমল স্পর্শ কীভাবে আপনার জীবনকে ঘিরে রেখেছে পরম মমতায়।
এই মহান নামের ভেতর এ সামান্য কিছু সময়ের জন্য প্রবেশের মাধ্যমে আমরা মাত্র কয়েকটি অর্থ বের করে আনতে পেরেছি। আর এ অর্থের গভীরে আরও কত অর্থ আছে যেগুলো আপনাকেই চিন্তা করে বের করার ভার দিলাম। আপনি গভীরভাবে ভাবুন আর এ ব্যাপারে 'আলিমদের বইগুলো পড়ে দেখুন।
যে নামে এতক্ষণ ডুব দিয়েছেন, আপনার কি উচিত নয়, এই সূক্ষ্মদর্শী দয়ালু আল্লাহকে আপনি ভালোবাসবেন? তাঁর দানগুলোর কথা ভেবে দেখবেন? আপনার অন্তর তাঁকে স্মরণ করবে, তাঁর কথা ভাববে, তাঁর কাছেই আশা রাখবে, তাঁকে ভয় করে চলবে?
এই নামের সাথে কয়েকটা দিন অতিবাহিত করুন। এই নামেই আল্লাহকে ডাকুন। তাঁর সূক্ষ্ম দয়া চান। তাঁর হিদায়াতের সূক্ষ্ম নিদর্শনগুলো দেখে চোখের পানি ঝরান। আর বিনয়ী হয়ে বলুন-
'হে সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্, আমরা যা ভয় পাই তা থেকে আমাদের বাঁচান...'
আল্লাহ্, হে সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্, সূক্ষ্মভাবে আমাদের প্রতি কোমলতা ও দয়া পৌঁছে দিন। আপনার রহমতের সূক্ষ্মতা দিয়ে আমাদের অন্তরের বক্রতাকে দূর করে দিন। আমাদের ভ্রষ্ট অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালনা করুন। আমাদের জীবনের মলিনতাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে দিন।
টিকাঃ
[১] সূরা শূরা, ৪২ : ১৯
[১] সূরা মুলক, ৬৭: ১৪
[১] সূরা ইউসুফ, ১২: ৯৯
[২] সূরা হাজ্জ, ২২: ৬৩
[১] সূরা লুকমান, ৩১ : ১৬
📄 আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা
তিনি আপনাকে আরোগ্য দেন— সামান্য মাধ্যমে, বিস্ময়কর মাধ্যমে, যেটা মাধ্যম না সেটা দিয়েও, আবার কোনো মাধ্যম ছাড়াই।
আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা
আপনি কি ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েছেন? বেদনায় নীল হয়ে গেছেন? অসুস্থতায় আপনার শরীর কি পাংশুটে বর্ণ ধারণ করেছে?
ডাক্তারদের কাছে যেতে যেতে আপনি কি বিরক্ত? হাসপাতালের করিডরগুলোয় হাঁটতে হাঁটতে আপনি কি ক্লান্ত? আপনার মাথায় কি শুধু ক্লিনিকের নামগুলো ঘুরপাক খায়? ডাক্তারের সাথে সাক্ষাতের তারিখ আর রোগের বিভিন্ন ধরন- এগুলোই কি আপনার মূল চিন্তা?
কেমন লাগবে, যদি আপনাকে এমন একটা বিষয় জানিয়ে দিই-যা আপনার আত্মা থেকে সকল দুঃখ-কষ্ট মুছে দেবে?
সেটা আল্লাহ্রই নাম- 'আশ-শাফী' তথা 'আরোগ্যদাতা'।
এখন আপনার এই ব্যথিত হৃদয়কে কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের সুযোগ দিন। তারপর এই দয়ালু নামটি সম্পর্কে জানুন। এ নামটির ছায়ায় আশ্রয় নিলে আপনি বুঝতে পারবেন এর প্রয়োজন কত। আর আপনি এটাও বুঝতে পারবেন যে, আপনি এই নি'য়ামাত থেকে কতটা দূরে আছেন।
রোগকে বিদায়
'আশ-শাফী' তথা 'আরোগ্যদাতা' আল্লাহ্র এমন একটি নাম যার প্রশংসা আমরা এজন্য করি যে, তিনি নিজেকে এ নামে নামকরণ করেছেন। তিনি নিজেকে সুস্থতা প্রদানের গুণে গুণান্বিত করেছেন। তিনিই সেই সত্তা-যিনি সুস্থতা দান করেন এবং বান্দার শরীরকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখেন। এই নাম শুনলেই এর ভেতরকার অর্থটা বোঝা যায়। এর বাহ্যিক দিকই অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে।
সুস্থতা শব্দটা রোগের সাথেই সম্পৃক্ত। মানবজীবনে রোগ-শোক নিত্যকার ঘটনা। এটা বিবিধ কষ্ট নিয়ে হাজির হয়। এর থেকে কেউ রেহাই পায় না। যে ব্যক্তি চোখের ব্যথা থেকে মুক্ত হয়, সে মাথাব্যথায় আক্রান্ত হয়। আবার মাথাব্যথাটা ভালো হলে পাঁজরে ব্যথা আরম্ভ হয়। এ ব্যথা শেষ হলে জ্বর এসে হানা দেয়। জ্বরটা কমে এলে পেটব্যথা শুরু হয়। পেটের ব্যথা নামলে দাঁত টনটন করে। এভাবে কোনো-না-কোনো অসুস্থতা লেগেই থাকে।
আবার সে যখন সুস্থতা লাভ করে, দেখতে পায় তার ভাই কাতরাচ্ছে, রোগাক্রান্ত হয়ে কষ্ট পাচ্ছে তার বোন। তার মা কান্নাকাটি করছে। ছেলেটা চেঁচামেচি করছে। প্রিয়জন ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।
জীবনটা আসলে দুঃখ-কষ্ট-ব্যথার একটা ময়দান। এ জন্যই আল্লাহ্ নিজের নাম দিয়েছেন আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা; যেন আপনি আপনার সকল ব্যথা নিয়ে তাঁর দয়ার আঙিনায় সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তাঁর অদৃশ্য মহান শক্তির কাছে আপনার সকল ব্যথার অনুভূতি প্রকাশ করেন।
রোগ এক ভয়াবহ জিনিস। এতে আক্রান্ত হয়ে অহংকারী ব্যক্তিটিও হারিয়ে ফেলে তার শক্তি। দুর্বলতা তাকে ছেয়ে ফেলে। ফলে সজীব চঞ্চল প্রাণে অনুভূত হয় অবসাদ ও দুর্বলতার স্পর্শ।
আল্লাহ্ শরীরের এ সজীবতাকে মুহূর্তের জন্য ম্লান করে দেওয়ার ফয়সালা দেন; যেন বান্দা নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করে নেয়। সে যেন বুঝতে পারে-আদতে তার শক্তি-সামর্থ্য বলতে কিছুই নেই।
আল্লাহ্ মানুষের জন্য রোগের ফয়সালা দেন; যেন সে এই রোগের মাধ্যমে এর কাছাকাছি একটা বিষয়কে স্মরণ করে। সেটা হলো মৃত্যু। রোগ যেমন সজীবতা ম্লান করে দেয় তেমনি মৃত্যুও জীবনের পরিসমাপ্তি এনে দেয়।
ব্যক্তি আপনি তো মৃত্যু দিয়েই গড়া। আপনার প্রতিটা জিনিস মৃত্যুর সাথে মেলে। আপনার ঘুমও মৃত্যু। অসুস্থতাও মৃত্যু। জীবনের নতুন ধাপে পৌঁছলে আগের ধাপের মৃত্যু ঘটে; যেমন যৌবন আপনার শৈশবের মৃত্যু ঘটায়। আবার বার্ধক্য যৌবনের মৃত্যু ডেকে আনে। আপনি জীবনের সাথে যতটুকু মেশেন, তার চেয়েও অধিক মেশেন মৃত্যুর সাথেই। তারপরও আমাদের কল্পনা আমাদের মাঝে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করে যে, আমরা চিরস্থায়ী। আর এ কারণেই আমাদের শরীর চিৎকার করে বলতে থাকে- 'তোমার ধ্বংস অতি সন্নিকটে।'
একজন মানুষ অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকাবস্থায় যখন আসা-যাওয়া করতে থাকা সুস্থ লোকদের দেখতে থাকে, তখন তার মাঝে জেগে ওঠে তাওবার মনোভাব। সে অনুভব না করলেও কবরের বাতাস যেন তার চারদিকে প্রবাহিত হয়।
আপনি যখন অসুস্থ, আপনার তখন মনে হতে পারে আপনার আত্মা মৃত ব্যক্তিদের সাথে আলাদা এক জগতে আছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে আপনার দুই চোখ আর দুই ঠোঁট শুকিয়ে যেতে থাকে। আপনার চোখের চাহনিতে কাঁপুনি দৃশ্যমান হয়।
এই তো জীবন। ঠিক এ জীবনটাই আপনার শরীরের ভেতর থেকে আপনাকে দেখতে আসা মানুষগুলোকে হাতের ইশারায় বিদায় জানাচ্ছে।
এভাবে রোগ যখন চূড়ান্তরূপ নেয়, আর দুনিয়ার মোহ থেকে আপনি যখন নিজেকে মুক্ত করে নেন, তখন আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা রোগটাকে আপনার শরীর ত্যাগের অনুমতি দেন। সুস্থতাকে আবার আপনার দেহে বিচরণ করার আদেশ করেন। ধীরে ধীরে আপনার দুই গালে উজ্জলতা ফিরে আসে। অসুস্থতার দিনগুলোতে মুখে যে মলিনতার সৃষ্টি হয়েছিল তা মুছে গিয়ে ফুটে ওঠে মিষ্টি হাসি।
তিনি কোনো মাধ্যম ছাড়াই রোগমুক্তি দেন
রোগমুক্তির জন্য তার কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নেই; কারণ, তিনি আরোগ্যদাতা। তিনি মাধ্যম দিয়েও আপনাকে রোগমুক্তি দেন; কারণ, তিনি যেভাবে চান, সবকিছু সেভাবেই হয়ে থাকে।
তিনি আপনাকে আরোগ্য দেন— সামান্য মাধ্যমে, বিস্ময়কর মাধ্যমে, যেটা মাধ্যম না সেটা দিয়েও, আবার কোনো মাধ্যম ছাড়াই।
সামান্য লতাপাতা দিয়ে আপনাকে রোগমুক্তি দেন। বিবিধ ঔষধপত্র দিয়ে আপনাকে সুস্থ করেন। খাদ্য-পানীয় দিয়ে আপনাকে সুস্থ করেন।
একবার একটা বিস্ময়কর ঘটনা পড়েছিলাম। এক ছেলে যক্ষ্মাসহ কয়েকটি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতপ্রায় হয়ে গেল। ডাক্তাররা বলল, তার মৃত্যু আসন্ন। তার বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। তারা তার বাবাকে পরামর্শ দিল, ছেলেকে গ্রামে নিয়ে যেতে; যেন সে গ্রামের নির্মল বাতাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে শেষ দিনগুলো কাটাতে পারে। অতঃপর তাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো। একদিন কেক খাওয়ার সময় এক লোক ছেলেটির বিষণ্ণ দুই চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, 'বাবা, তুমি কি বেঁচে থাকতে চাও?' সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। লোকটি বলল, 'এমন খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার আশা কর কীভাবে? প্রাকৃতিক খাবার খাবে। এ প্রকৃতিতে মাংস, শাক-সবজিসহ যা কিছু আল্লাহ্ সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং যাতে মাটির প্রভাব আছে সেগুলো খাবে।'
ছেলেটির ভাষ্য-'লোকটির উপদেশ আমার অন্তরে জায়গা করে নিল। আমি তার কথাগুলো অকপটে বিশ্বাস করে নিলাম। এরপর থেকে আমি শুধু জীবিত খাবারই খেতে লাগলাম, যে খাবারের মাঝে রয়েছে সঞ্জীবনী শক্তি-বিভিন্ন মাংস, বিবিধ সবজি, ক্ষেত-খামারের তরকারি, গরম রুটি, তাজা ফলমূল ইত্যাদি। কিছুদিনের মধ্যেই আমার শরীরটা সতেজ হয়ে উঠল। রোগের কোনো অস্তিত্বই রইল না।'
ছেলেটি এ ঘটনা বর্ণনা করেছে বড় হয়ে একজন পুষ্টিবিজ্ঞানী হওয়ার পর। তার নাম জাইলোর্ড হাউজর। তার বই খাদ্যের অলৌকিক ক্ষমতায় তিনি এ কথা লিখেছেন।
ডাক্তাররা তার মৃত্যুর ব্যাপারে ফয়সালা দিয়েই দিয়েছিল; কিন্তু রাজাদের রাজা এমনটি চাননি।
ডাক্তাররা ধারণা করেছিল গ্রামেই তার জীবনের অবসান হবে; কিন্তু আল্লাহ্ তেমনটা চাননি।
হ্যাঁ, ডাক্তাররা তার চিকিৎসা করতে অক্ষম ছিল; কিন্তু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তো অক্ষম নন। তিনি অক্ষম হবেন না। তাকে অক্ষম করতে কেউ পারবেও না।
কে সেই সত্তা-যিনি হতদরিদ্র মানুষের হাতের নাগালে পাওয়া যায় এমন সকল কিছু যেমন শাক-সবজি, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যের মাঝে সুস্থতার উৎসগুলো প্রবেশ করিয়েছেন? তিনি আরোগ্যাদাতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা।
আপনি নিজের অজান্তেই একটা রোগে আক্রান্ত হলেন। তারপর না জেনেই এমন খাবারও খেয়ে ফেললেন যাতে আপনার সুস্থতা নিহিত। আপনি অসুস্থ হন, আবার সুস্থও হয়ে যান আপনার রোগ বা অসুস্থতা সম্পর্কে না জেনেই।
আল্লাহ্ কখনো পানির মধ্যেও সুস্থতার উপাদান দিয়ে দেন। আমরা সবাই জানি- 'যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যেই পান করা হয় সেটা বাস্তবায়িত হয়।' আরও জানি যে, যমযমের পানি 'তৃপ্তিদায়ক ও রোগ নিরাময়কারী পানীয়।' কত রোগী আছে-রোগে দুর্বল হয়ে পড়েছিল; তারপর এই পবিত্র পানি পান করার পর সে আল্লাহ্র ইচ্ছায় সুস্থ হয়ে উঠেছে।
যে ব্যক্তি সুস্থতার এই হাদীসগুলো পড়বে সে নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকেই অনেকগুলো ঔষধের তালিকা পেয়ে যাবে। এর কিছু আবার ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ তার আত-তিব্বন নাবাওয়ী গ্রন্থে সংকলন করেছেন।
এ সকল ঔষধের মাঝে কিছুর উদাহরণ এই-চন্দন কাঠ, গরুর দুধ, চর্বি, কালোজিরা, তালবীনা, রাতে সালাত আদায়। আর এ সবগুলোর ব্যাপারেই সহীহ হাদীস আছে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ধৈর্যের মাধ্যমে সুস্থতা দেন। দু'আর মাধ্যমে দেন। সাদাকার মাধ্যমেও দেন। ক্ষমাপ্রার্থনার মাধ্যমেও দেন। তাওবার মাধ্যমেও দেন। আবার সন্তুষ্ট হয়েও সুস্থতা দেন। সবশেষে কোনো মাধ্যম ছাড়াও আরোগ্য দেন।
আলো ফিরে এলো
তাবুকের কিং 'আব্দুল 'আযীয হাসপাতালের ধর্মীয় অফিসে আমরা অবস্থান করছিলাম। এ সময় আমাদের পরিচিত এক ভাই ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় প্রবেশ করল। তার মুখে দুশ্চিন্তার মেঘ। মুখে সদা বিরাজ করা মুচকি হাসিটা আজ নেই। তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, কী হয়েছে তার। তিনি বললেন, 'আমার ছেলে চোখে দেখতে পাচ্ছে না; কিন্তু কেন দেখতে পারছে না তাও বুঝতে পারছি না। আমার ছেলেটিকে এখন দোতলায় ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।'
হায়! কী ভয়াবহ বিপদ! বাবার জন্য এ বিপদ কতটাই না কষ্টের!
সে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, 'দয়া করে আপনাদের একজন উঠে আসুন। আমার ছেলেটাকে রুকইয়াহ্ করান। [১] এর মাধ্যমে হয়তো আল্লাহ্ তাকে সুস্থতা দান করবেন।'
আমার এক বন্ধু সাথে সাথে উঠে তার সাথে চলে গেল। এক ঘণ্টা পর সে ফিরে এসে জানাল যে, তার ছেলেকে রুকইয়াহ করানো হয়েছে। তারপর সে ছেলের বাবাকে ধৈর্যধারণের জন্য পরামর্শ দিল। তাকে বার বার এ হাদীসটি স্মরণ করিয়ে দিল, 'তোমরা তোমাদের মাঝে অসুস্থ লোকদের চিকিৎসা করো সাদাকাহ দিয়ে'। বাবা সাথে সাথে পকেট থেকে পাঁচশ রিয়াল বের করে বললেন, 'আমার ছেলের সুস্থতার নিয়্যাতে এটা সাদাকাহ করে দিন।' দুই দিন পর বাবা ফিরে এলো। তার চেহারায় পরিবর্তন সুস্পষ্ট। আমার বন্ধুকে বলল তার সাথে যেতে। আধ-ঘণ্টা পর প্রফুল্লচিত্তে বন্ধু ফিরে এসে বলল, 'সুসংবাদ আছে। ছেলেটা রুমের আলো কিছুটা দেখতে পাচ্ছে।' বন্ধু আরও জানাল যে, ছেলের বাবা তাকে আরও এক হাজার রিয়াল সাদাকাহ করে দিতে বলেছে। সেদিন ছিল সপ্তাহের শেষ দিন। এর পরদিন অর্থাৎ শনিবার ছেলেটির বাবা আমার বন্ধুকে নিয়ে আবারও তার ছেলের রুমে গেল। অতঃপর আমার বন্ধু যখন ফিরে এসে জানাল যে, ছেলেটি আবার আগের মতো দেখতে পাচ্ছে তখন আমি যেন আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু তাতে কি? তার চোখের জ্যোতি যে সত্যিই ফিরে এসেছে! সে নতুন করে দেখতে পাচ্ছে!
কে তাকে সুস্থতা দিল? কে সেই সত্তা যিনি তার চোখের আলো ফিরিয়ে দিল? কে তাকে দান করল এ নতুন জীবন?
তাঁর ব্যাপার এই যে, তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছে করেন, তিনি বলেন, 'হও'। ফলে তা হয়ে যায়।
মহান পবিত্র আল্লাহ্। তিনি চোখের আলোকে বললেন, 'ফিরে আসো।' আর চোখের আলোও ফিরে এলো।
তাঁর দিকে ফিরে আসুন
তিনি আপনার কাছে শুধু এটাই চান যে, আপনি তাঁর দিকে ফিরে আসেন। আপনি তাঁর দিকে ধাবিত হন। তাঁকে সন্তুষ্ট করে, তাঁর জন্য সিজদাবনত হয়ে, তাঁর কাছে তাওবা করে, তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে, সাদাকah করে, নিজের দোষ স্বীকার করে ফিরে আসুন তাঁরই আঙিনায়।
দুনিয়ার এমন কোনো হাসপাতাল নেই, যে হাসপাতাল আপনার চিকিৎসা করে সুস্থতা এনে দিতে পারে-যদি আল্লাহ্ আপনার সুস্থতা না চান। [১]
দুনিয়ার বুকে এমন কোনো ডাক্তার নেই, যে আপনার রোগটা দূর করে দিতে পারে—যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সেটা না চান।
একবার এক ধনী লোকের একটা কিডনী নষ্ট হয়ে গেল। তার ছেলেরা তার শরীরে আরেকটা কিডনী বসানোর জন্য তাকে নিয়ে মিশরে চলল।
গ্রামের এক কিশোরীর সাথে তাদের চুক্তি হলো। তারা তাকে কিডনীর দাম হিসেবে এক লক্ষ সৌদি রিয়াল দেবে। সকালবেলা সবাই হাসপাতালে এলো। অস্ত্রোপাচারের আগমুহূর্তে লোকটা কিডনী বিক্রী করতে ইচ্ছুক কিশোরীকে দেখার ইচ্ছে পোষণ করলেন। কিশোরী সলজ্জ ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করল। বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি আমার মতো বৃদ্ধ লোকের কাছে তোমার কিডনী বিক্রী করতে রাজি হলে কেন?
'প্রয়োজনের জন্যই। আমার পরিবার দরিদ্র। আমার ভাইগুলো পড়াশুনা করছে। তাদের সহযোগিতা করার জন্য আমাকে কিছু হলেও করতে হবে।' কিশোরী বলল।
কথাগুলো বৃদ্ধের মুখে যেন চপোটাঘাতের মতো লাগল। গভীর ঘুম থেকে তিনি যেন জেগে উঠলেন। শরীরের মাঝে রক্তের জমাট বেঁধে যে একটা অংশ পচে যাচ্ছে—সেটা তিনি ভুলেই গেলেন। নিজেকে প্রশ্ন করলেন, 'একজন মানুষ কি শুধু খাওয়ার জন্য বা জীবনধারণের জন্য নিজের শরীরের একটা অঙ্গ ছাড়াও থাকতে পারে?!'
সাথে সাথে বৃদ্ধ ছেলেদের ডেকে পাঠালেন। তাদের বললেন, তাকে নিয়ে সৌদি 'আরবে ফিরে যেতে; কারণ, তিনি কিডনী বসানোর চিন্তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাদের আরও আদেশ দিলেন, তারা যেন ওই মেয়েকে এক লক্ষ রিয়াল সাদাকah করে দেন এবং তার কাছ থেকে এক রিয়ালও ফেরত না নেন।
ছেলেরা প্রতিবাদ করে উঠল। কেউ কেউ রেগেও গেল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবার আদেশ তারা মেনে নিল। সৌদি 'আরবে ফিরে আসার পর একদিন যথারীতি কিডনী ডায়ালাইসিসের জন্য বৃদ্ধ হাসপাতালে গেলেন। ডাক্তাররা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল যে, তার কিডনী আগের মতো কাজ করছে!
রাজাধিরাজ মহান আল্লাহ্ কাউকে সুস্থতা দান করতে চাইলে কোনো ডাক্তার-সার্জনের দরকার পড়ে না। সেই মহান রাজা তাঁর রাজত্ব থেকে বান্দার দিকে একবার নজর দেন—তাতেই অসুস্থ বান্দা হয়ে যায় সুস্থ, বিপদগ্রস্ত হয়ে যায় বিপদমুক্ত, মুসাফির হয় চিন্তামুক্ত আর ক্ষতবিক্ষত বান্দা হয়ে যায় ক্ষতহীন।
আগের থেকেই সময় চাওয়া
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনি তাঁর দিকে ফিরে আসেন। আপনি তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করলেই তিনি রোগটাকে আপনার শরীর থেকে তুলে নেন। কারণ, তখন আপনার শরীরে রোগ থাকার মাঝে আর কোনো কল্যাণ নেই।
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনি তাঁর প্রতি বিনয়ী হন, তাঁর দিকে নত হন। আপনি এমনটা করলে তিনি আপনার শরীর থেকে রোগটা তুলে নেন। কারণ, তখন রোগের আর কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনি অন্যের ব্যথা বুঝতে পারেন। তাদের ব্যথা বুঝতে পারলে আপনার রোগটা তিনি তুলে নেন। ফলে এই রোগ থাকার মাঝে আর কোনো কল্যাণ অবশিষ্ট থাকে না।
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনার ধৈর্য ও সন্তুষ্টি পরীক্ষা করতে পারেন। আপনি যদি ধৈর্যধারণ করেন এবং আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন তাহলে রোগ আপনার শরীরে থাকার কোনো দরকার পড়ে না।
আরোগ্যদাতা আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য আগে থেকেই সময় চেয়ে রাখার দরকার নেই। আপনাকে কোনো ভিজিটিং কার্ডও দেখাতে হবে না। নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগে আসতে হবে—এমনটাও না।
শুধু বলুন, 'আল্লাহ্' দেখবেন, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার হাসপাতালের দরজা খুলে গেছে। এ হাসপাতাল শুধু দয়া, করুণা, কোমলতা ও সুস্থতার চাদরে ঢাকা।
আমার এক বন্ধু প্রায়ই তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা বলে থাকে। একবার একটি ছেলে তার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে এবং সাথে সাথেই ছেলেটির হাড় ভেঙ্গে যায়। সে গাড়ি থামিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটে যায়। তার বুকটা তখন দুরু দুরু করে কাঁপছে। এদিকে ছেলের বাবা আর দাদাও হাজির। আমার বন্ধু খুব বিচলিত হয়ে পড়ল। সে ভাবতেই পারছে না—তার কারণে একটি ছেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।
ছেলেটির হাড় ভাঙার শব্দ তার কানে সারাক্ষণ বাজতে থাকে; কিন্তু ছেলেটির দাদা এসে আমার বন্ধুকে সান্ত্বনা দেন। তাকে জানান, আল্লাহ্ যা লিখে রেখেছেন তাই-ই তো হবে। এর বাইরে কার কী করার আছে? বরং এতেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকা চাই।
ছেলেটির দাদা তাদের নিয়ে হাসপাতালের মাসজিদেই 'ইশার সালাত আদায় করেন। সালাতে তিনি তিলাওয়াত করেন, 'ওয়াবাশিরিস্ সাবিরীন'- 'আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করুন।' আমার বন্ধুটা এই তিলাওয়াত শুনে ডুকরে কেঁদে ওঠে।
সালাতের পর যখন তারা বেরিয়ে আসে, ডাক্তাররা ছেলের বাবা আর দাদাকে জানায়, ছেলের বেঁচে থাকার আশাটা ক্ষীণ। তার খুলিতে ফ্র্যাকচার দেখা দিয়েছে।
এ কথা শুনে আমার বন্ধু যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। নির্জীব হয়ে সে ঘরে ফিরে আসে। এক সপ্তাহ সে অফিসে পর্যন্ত যেতে পারেনি; কারণ, ঘটনার আকস্মিকতায় সে একেবারেই ভেঙে পড়েছে।
ওই ছেলেটার জন্য কোনো ঔষধই আর বাকি ছিল না; কিন্তু তার দাদার 'ঈমান, মায়ের দু'আ, বাবার দৃঢ় বিশ্বাস এবং সবার সাথেই আল্লাহর গভীর সম্পর্ক- ছেলেটিকে শেষ পর্যন্ত সুস্থ করে তুলল।
এক সপ্তাহের মাথায় আমি নিজে ওই ছেলেকে দেখতে গেলাম। ছেলেটা হাসছে- খেলছে-হাঁটছে আর আমাদের সাথে কথা বলছে। আল্লাহ্র কথা সত্য প্রমাণিত হলো আর ডাক্তারদের কথা মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। যে সত্তা ভাঙা হাড়ে জোড়া লাগাতে পারেন তার কথাই সত্য বলে প্রতীয়মান হলো। 'আল্লাহ্ মানুষের জন্য রাহমাত অবারিত করলে তা নিবারণকারী কেউ নেই।'
কে সেই সত্তা, যিনি এই ভাঙা হাড়গুলো জোড়া লাগাতে পারেন? মলিন মুখে হাসি ফোটাতে পারেন এবং কবরের দরজায় উপস্থিত শরীরে নতুন করে রূহের সঞ্চার করতে পারেন? আর কেউ নয়, একমাত্র আল্লাহই তা করতে পারেন।
একটি রেখা
নাবীদের পিতা ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম, নিজ রবের কাছ থেকে পবিত্র আত্মা নিয়ে এসেছিলেন। তার অন্তর ছিল সামান্য পরিমাণ শির্ক থেকেও মুক্ত। তিনি যা বলেছেন তা মু'মিন-মাত্রই বুঝতে পারবে। মু'মিন শুধু চিরঞ্জীব আল্লাহর কাছেই আশ্রয় নেবে। তিনি বলেছিলেন—
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ )
আর যখন আমি অসুস্থ হই তখন তিনিই সুস্থ করেন [১]
তিনি যদি আপনাকে সুস্থ করতে চান তাহলে আপনার আর কাউকেই দরকার হবে না; কিন্তু তিনি আপনাকে সুস্থ করতে না চাইলে বিশ্বলোকে এমন কেউ নেই—যে আপনাকে সুস্থ করতে পারে।
কুষ্ঠরোগে আইয়ূব 'আলাইহিস সালামের শরীর ভেঙে পড়ল। পরিবারও ভেঙে গেল। যে লোক সবচেয়ে আশাবাদী সেও তার সুস্থতার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়ল; কিন্তু তিনি অটল হয়ে ধৈর্যধারণ করে চললেন। তার শরীরে রোগ বাসা বেঁধে চলছে, কিন্তু তিনি মাথা নিচু করে মহান রবের সন্তুষ্টি কামনা করছেন। এভাবে কয়েক বছর কষ্ট পাওয়ার পর তার ঠোঁট থেকে একটি দু'আ বেরিয়ে এলো। এ দু'আয় ছিল বিনয়ের আধিক্য, সিজদারত মাথা আর দৃঢ় বিশ্বাসের শেকড়। দু'আটা ছিল—
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ )
আমি তো দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ ও দয়ালু [২]
সাথে সাথে আসমানের দয়ার দুয়ার খুলে গেল। সাত আসমানের ওপর থেকে সেই বিপদগ্রস্তের জন্য সাহায্য নেমে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই কষ্টের বছরগুলো উধাও হয়ে গেল। ঘনিয়ে এলো সুস্থতার পর্ব। তাহলে কেন আপনি অন্যের কাছে চাইতে যাবেন? কেন অন্যের দরবারে ধরনা দেবেন?
কেন ওই সব মৃত ব্যক্তিদের কাছে চাচ্ছেন—যারা আপনার আশেপাশে বিচরণ করছে? কেন চাইছেন না ওই রবের কাছে—যিনি চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর?
কে আপনাকে এই বুঝ দিয়েছে যে, অন্য রাস্তায় আপনার সুস্থতা আসবে?
আপনার সুন্দর জীবনের সূচনা কীভাবে হয়েছে আপনি তা ভুলে গেলেন? কীভাবে ভুলে গেলেন ওই সত্তাকে যিনি আপনাকে সুস্থভাবে আপনার মায়ের পেট থেকে পৃথিবীতে আপনার আগমন ঘটিয়েছেন? তারপর তার বুকেই আপনার জন্য উত্তম আহারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আপনি কিছুই জানতেন না। তিনি আপনাকে জানালেন, কীভাবে আপনি তার বুকে ঠোঁট রেখে পান করবেন, আপনি কি তা ভুলে গেলেন? আপনি কি ভুলে গেলেন সেই সত্তাকে—যিনি আপনার মায়ের অন্তরে রাহমাত দিয়েছেন যেন তিনি আপনাকে আদর-যত্ন করেন আর মমতায় জড়িয়ে রাখেন?
এত দ্রুত আপনি ভুলে গেলেন?
আপনি কি মনে করছেন, তাঁকে ছাড়াই আপনি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবেন?
এই যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনাকে রোগ দিয়ে আগের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এ রোগের মাধ্যমে তিনি বলছেন- 'ফিরে আসো আমার দিকে। যে আমি শূন্য থেকে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, সে আমিই তোমাকে রোগমুক্ত করব।'
সন্তুষ্টি
কখনো কখনো আপনার রোগের নিরাময় আপনার কল্পনার চেয়েও নিকটে থাকে। এই যেমন নাবী আইয়ূব 'আলাইহিস সালাম, তার কাছে আদেশ এলো-পা দিয়ে যমীনে আঘাত করো। সাথে সাথে যমীন ফেটে বেরিয়ে এলো :
'এই তো গোসলের সুশীতল পানি ও পানীয়।'
রোগের ঔষধ তার কাছেই ছিল। আরোগ্যলাভের ব্যাপারে শুধু আল্লাহর ইচ্ছেটাই বাকি ছিল। আল্লাহ্ চাইলেন আর সাথে সাথে আইয়ূব 'আলাইহিস সালামও জেনে গেলেন ঔষধের জায়গাটা। আল্লাহর ইচ্ছায় এ ঔষধেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন।
ওয়াশিংটন, প্যারিস কিংবা পেকিংয়ের উদ্দেশ্যে আপনার টিকেট কাটার দরকার নেই। আপনার ঔষধ কাছেই কোথাও আছে। আপনার অন্তরে সন্তুষ্টির শহরের একটা টিকেট কাটুন।
আপনার ঔষধ আপনার কাছেই আছে; আপনি হয়তো সেটা জানেন না। আপনার অসুখও আপনার দোষেই হয়েছে; হয়তো আপনি সবর করছেন না।
আপনি যদি আল্লাহ্র সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে পারেন, আল্লাহও আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।
রোগ হলো আল্লাহ্র সন্তুষ্টির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় আপনি যদি আল্লাহকে সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেন, তাহলে তাঁর সন্তুষ্টির ফল অবশ্যই আপনি ভোগ করতে পারবেন।
কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, 'রোগাক্রান্ত হয়েও কীভাবে আমি সন্তুষ্ট হবো? রোগাক্রান্ত হলে সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই মানুষের ব্যথা-বেদনা অনুভূত হয়। যা শুধু আমিই নই, যে কেউ তা অপছন্দ করে; তো এতে কীভাবে আমি সন্তুষ্ট হবো?'
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ এ জিজ্ঞাসার সুন্দর জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন- 'এর মাঝে আপাত কোনো বিরোধ নেই যে, বান্দা রোগাক্রান্তবস্থায় একই সাথে সন্তুষ্টও থাকবে, আবার ব্যথার কারণে রোগটাকে ঘৃণাও করবে। যেভাবে তিক্ত ঔষধে মানুষের আরোগ্য হয় বলে ঔষধের তিক্ততার প্রতি রোগীকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়, আবার কষ্টের জন্য রোগকে ঘৃণাও করতে হয়।'
সুতরাং আপনার নাবী আপনাকে যা আদেশ করেছেন তা অন্তরের গভীর থেকে উচ্চারণ করুন-
رضيت بالله ربا وبالإسلام دينا وبمحمد صلى الله عليه وسلم نبيا
'আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে নাবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।' [১]
হৃদয়ের গভীর থেকে পূর্ণ মনোযোগ আর অনুভূতির সাথে কথাগুলো উচ্চারণ করে দেখুন। আপনার অন্তরকে এ কথা মেনে নেওয়ার জন্য অভ্যস্ত করে ফেলুন। এই বাক্যের প্রস্রবণে আপনার অন্তরকে ভালোমতো ধুয়ে-মুছে পরিচ্ছন্ন করে ফেলুন। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট হওয়া তো আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ারই অংশ। আপনি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলে তিনিও আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।
আপনার অন্তরকে বলুন সন্তুষ্টির নিঃশ্বাস নিতে। বলুন এই সন্তুষ্টির স্বাদ আস্বাদন করতে। তারপর আপনার শরীরের দিকে মনোযোগ দিন। দেখবেন—শরীরে দেখা দিয়েছে এক ঝলমলে সুস্থতার নিদর্শন।
আপনার এই রোগ থেকেই যেন সূচনা হয় জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ের। আর সেই অধ্যায়টিতে আপনি নিজ রবের ‘আশ-শাফী’ তথা আরোগ্যদাতা নামটির সাথে পরিচিত হবেন।
পাপের নদীগুলো
আপনি তো জীবনে অনেকবার অসুস্থ হয়েছেন, তাই না? তো পূর্বের সেই ‘অনেকবার’ আপনাকে কে সুস্থ করেছেন? আল্লাহই তো, তাই না? তাহলে এবার কেন মনে হচ্ছে, ‘এই রোগের ব্যাপারে তিনি অক্ষম?’ আপনি বিশ্বাস করুন, তাঁর অক্ষমতার ব্যাপারে আপনার এই দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনাই আপনার জন্য শাস্তি অবধারিত করে ফেলে। আপনার এই ভুল ধারণাই শাস্তিস্বরূপ আপনার রোগ হয়ে যায়। আগে আপনার অন্তর থেকে দুর্ভাবনার এই রোগটা দূর করুন। তারপর আরোগ্যদাতা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। দেখবেন, আপনাকে তিনি সুস্থ করে তুলছেন।
হাসপাতালের এই অসুস্থ লোকগুলো আরোগ্যদাতা আল্লাহর কাছ থেকে সুস্থতার অনুমতির অপেক্ষায় আছে। এ হাসপাতালগুলোর প্রতিটি আর্তনাদ, চিৎকার ও হাহাকার তিনি জানেন। অন্তরের গহীনের ব্যথা তিনি দেখতে পান।
অতঃপর যখন তার চাওয়া পূর্ণ হয়, আপনার আর্তনাদে পাপের নদীগুলো প্রবাহিত হয়ে যায়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তখন আপনার শরীরে সুস্থতাকে ফিরে আসার অনুমতি দেন। আপনি আল্লাহর যমীনে পাপমুক্ত হয়ে পবিত্র দেহে বিচরণ করা শুরু করেন।
তিনি যে পরম দয়ালু; তাই তিনি আপনাকে সুস্থ করে দেন। তিনি যে মহাজ্ঞানী; সে জন্যই আপনাকে তিনি সুস্থ করেন। তিনি যে সহনশীল; তাই তো আপনাকে সুস্থ করেন। তিনি যে ক্ষমতাবান; তাই তো আপনাকে তিনি সুস্থ করেন। তিনি যে আল্লাহ; তাই তো আপনাকে সুস্থ করেন।
তিনি সাথে থাকলে আপনার স্মৃতি থেকে ডাক্তারদের নাম আর ফোন নাম্বার মুছে যাবে। হাসপাতালগুলোর ঠিকানা আপনি ভুলে যাবেন। ডাক্তারের সাথে এ্যাপোয়েন্টমেন্ট আপনি বাতিল করে দেবেন।
আপনার ঘরে একটা নতুন হাসপাতাল গড়ে তুলুন। সে হাসপাতালের নাম হোক ‘জায়নামায’। সিজদার জন্য সময় বরাদ্দ রাখুন। কারও অসুস্থতায় নিয়মিত এই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য সময় ব্যয় করুন অন্তরে একটা নাম জপতে থাকুন—‘আশ-শাফী’।
হে আল্লাহ্, হে আরোগ্যদাতা, প্রতিটি দুর্বল আত্মা, প্রতিটি দুর্বল শরীর আর প্রতিটা অসুস্থ হৃদয়ের জন্য লিখে রাখুন সুস্থতা আর দয়ার ঘোষণা।
টিকাঃ
[১] রোগমুক্তির জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির পাশে কুর'আন তিলাওয়াত করা।
[১] সূরা ইয়াসিন, ৩৬: ৮২
[১] সূরা শু'আরা, ২৬: ৮০
[২] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৮৩
[১] তিরমিযী, মিশকাত, ২৩৯৯
📄 আল-ওয়াকীল তথা পরম নির্ভরযোগ্য
আল্লাহর কাছে চাইলে আপনার কল্পনাও সত্যি হয়ে যাবে। আপনার ধারণাও বাস্তবে পরিণত হবে। আপনার আশার বস্তুগুলো তিনি বাস্তবে রূপান্তর করে দেবেন। আপনার স্বপ্নগুলো তিনি সত্যি করে দেবেন।
আল-ওয়াকীল তথা পরম নির্ভরযোগ্য
আপনি কি নিজের দুর্বলতা অনুভব করতে পারেন? আপনার কাছে কি সারা দুনিয়া বিশাল মনে হয়? এ ব্যস্ততম জীবনের অধ্যায়ে নিজেকে একটা পাখির পালকের মতো মূল্যহীন মনে হয় কখনো?
আপনার কি মনে হয়, আপনি একটা দুর্বল পাখি-যার ডানাগুলো কেটে ফেলা হয়েছে? আপনার কি মনে হয়, চলার জন্য ডানাহীন পাখির মতো আপনারও সাহায্যের প্রয়োজন? আপনার কি এমন কিছু আছে, যেগুলোর ব্যাপারে আপনি ভয় করছেন? আপনি কি চাচ্ছেন এমন কারও কাছে এগুলো সংরক্ষণের ভার দিতে-যিনি সেগুলো হারাবেন না? হোক তা সন্তান, সম্পত্তি, স্বাস্থ্য বা জীবন?
তাহলে আল্লাহ্র মহান নাম 'আল-ওয়াকীল' তথা 'পরম নির্ভরযোগ্য'-এই নামের আলোয় আলোকিত হোন।
এই মহান নামের সাথে নতুন করে পরিচিত হোন। এ নামের অর্থে গভীরভাবে পদচারণা করুন। নিজের দুর্বলতা, দুশ্চিন্তা, একাকিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যান। আল-ওয়াকীলের ছায়ায় আপনি আশ্রয় নিন।
তাঁকে পরম আস্থাভাজন হিসেবে মেনে নিন
পরম নির্ভরযোগ্য কেবল তিনিই যার ওপর আপনার সকল নির্ভরতা সঁপে দিতে পারেন, আশ্রয়ের প্রয়োজনে যার নিকট আশ্রয় নিতে পারেন, আপনার সকল আশা-ভরসা যার সাথে সম্পৃক্ত করে দিতে পারেন।
আপনি যে কাজেই আল্লাহ্ ওপর নির্ভর করবেন সে কাজের কথা ভুলে গেলেও চলবে আপনার; কারণ, যদি আপনি আল্লাহর ওপর নির্ভর করেন, তাহলে এমন একজনের ওপর আপনি নির্ভর করলেন, যিনি সকল কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। আসমান-যমীন তারই সামান্য সৃষ্টি। তিনিই রক্ষা করেন এবং তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন।
তিনি নিজ সত্তার মহত্ত্ব ঘোষণা করে বলেন-
رَّبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَاتَّخِذْهُ وَكِيلًا ۚ
'তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। অতএব, তাঁকেই আপনি গ্রহণ করুন কর্মবিধায়করূপে।' [১]
পূর্ব-পশ্চিমের রব নিজেই তাঁকে আপনার কর্মবিধায়ক ও আস্থাভাজন করে নিতে বলেছেন। এর থেকে স্বস্তি, মর্যাদা ও তাওফীকের বিষয় আর কী হতে পারে?
তিনি চান, আপনি শুধু এ কথাটা অন্তর থেকে বলুন, 'আল্লাহ্, আপনি আমার তত্ত্বাবধায়ক।'
এ পৃথিবীর বুকে এমন কোনো ধনী লোক কি আছে, যে আপনাকে শুধু তার সাহায্যেই চলতে বলবে? শুধু তার ওপরই নির্ভর করতে বলবে? শুধু তার কাছেই আশ্রয় নিতে বলবে? নাহ্, এমন কোনো ধনী লোকের অস্তিত্বই পৃথিবীতে নেই। কারণ, আপনাকে সব বিপদাপদ থেকে রক্ষা করার, আপনার জন্য যথেষ্ট হওয়ার কিংবা আপনাকে সব কাজেই সহযোগিতা করতে পারার ক্ষমতা কোনো মানুষই রাখে না
একমাত্র আল্লাহই এমনটা বলেন, করেন এবং করার ক্ষমতা রাখেন।
আল্লাহ্ ওপর নির্ভরতা অন্তরের দৃঢ়তার এক নিদর্শন। এ নির্ভরতা আপনাকে বিশাল ছাতার নিচে জায়গা করে দেবে। এ ছাতা আপনাকে দুশ্চিন্তার রোদ, বিপদের বৃষ্টি আর দুনিয়াবী দুশ্চিন্তার বাতাস থেকে রক্ষা করবে।
ওই ব্যক্তিই বঞ্চিত, যে এই ছাতা গ্রহণ করতে পারে না, বা এই ছাতার নিচে আশ্রয় নিতে পারে না।
সুমহান রাজা ও সর্বশ্রেষ্ঠ রব আপনাকে আদেশ দিয়েছেন তাঁকে পরম নির্ভরযোগ্য হিসেবে মেনে নিতে। তিনি আপনাকে বলেছেন আপনার সকল প্রয়োজন তাঁর দুয়ারে উপস্থাপন করতে; কারণ, তিনিই আপনার প্রয়োজনগুলো পূর্ণ করেন। তিনি বলেছেন তাঁর কাছেই আশ্রয় নিতে; যেন অবিশ্বাসের তির আপনাকে বিদ্ধ না করে। তিনি বলেছেন, তাঁর দিকেই আপনার সকল বিষয় ন্যস্ত করতে; যেন সব কাজ সুষ্ঠু ও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়। প্রশ্ন হলো, আপনি কীসের অপেক্ষা করছেন? কী কারণে আপনি নিজেকে এ অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করছেন?
আপনি এই আয়াতগুলো পড়ুন-
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ الَّذِي يَرَتَكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ *
আর আপনি নির্ভর করুন পরাক্রমশালী পরম দয়ালু আল্লাহ্র ওপর, যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি দাঁড়ান, এবং সিজদাকারীদের মাঝে আপনার উঠা বসা (১)
কী সেই মহান বিষয়, মারাত্মক বিপদ বা কঠিন দুর্ভাবনা-যা এই মর্যাদাবান রবের জন্যেও কঠিন? আল্লাহই তো সকল মর্যাদার অধিকারী, তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আপনি চারদিকে যে মর্যাদা ও প্রতিপত্তির কথা শুনতে পান তার রব তো একমাত্র আল্লাহই। তাহলে সকল মাহাত্ম্য, বড়ত্ব ও মর্যাদার অধিকারী রবের সামনে আপনার বিপদ কীভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবে?
বাৎসরিক পরিকল্পনা
আল্লাহ্র 'ইবাদাত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টির ওপর ভরসা করবেন সেটি হলো, আপনার সকল নির্ভরতা ও আস্থা অন্যদের থেকে ঝেড়ে ফেলে জিহ্বা দিয়ে বলার আগে অন্তরেই বলবেন-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ .
আমরা আপনারই 'ইবাদাত করি আর আপনার কাছেই সাহায্য চাই। [২]
আপনি তাঁর 'ইবাদাত করার লক্ষ্যে তাঁর কাছে সাহায্য চাইবেন, তাঁর ওপর ভরসা করবেন আর শুধু তাঁর কাছেই শক্তি কামনা করবেন।
এটা কল্পনাই করা যায় না যে, আল্লাহ্ আপনাকে তাঁর 'ইবাদাত করতে এবং তাঁর ওপর নির্ভর করতে বলবেন, অতঃপর যখন আপনি তাঁর ওপর নির্ভর করবেন তখন তিনি আপনাকে অপমানিত করবেন; এটা স্রেফ অসম্ভব; এ হতেই পারে না। আপনি তাঁর কাছে পূর্ণ ভালোবাসার সাথে তাঁর 'ইবাদাতের ব্যাপারে সাহায্য চাইবেন, অথচ তিনি আপনাকে সাহায্য করবেন না-এমনটা কখনোই হতে পারে না।
তবে নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বাণী বেশি বেশি পড়বেন-
اللهم أعنى على ذكرك وشكرك وحسن عبادتك
আল্লাহ্, আপনার যিক্র, আপনার কৃতজ্ঞতা আর আপনার উত্তম 'ইবাদাতের ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করুন [১]
আমি কি 'বেশি বেশি' পড়তে বললাম?
তাহলে স্যরি বলছি; শুধু 'বেশি বেশি' পড়বেনই না; বরং দৈনিক রুটিন, বাৎসরিক পরিকল্পনা ও জীবনের লক্ষ্য বিনির্মাণে এই দু'আ যেন সবসময় চলমান থাকে।
এর কারণ হলো, যদি তিনি আপনাকে সাহায্য না করেন, তাহলে এমন কোনো শক্তি নেই-যা আপনাকে সাহায্য করতে পারে; তিনি যদি আপনাকে সাহায্য না করেন, তাহলে আপনি কিছুই করতে পারবেন না; তাঁর সাহায্য না পেলে আপনি দুনিয়া ও 'আखিরাত উভয়টাই হারাবেন।
ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ হতে বর্ণিত, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, 'আমি সবচেয়ে উপকারী দু'আ খুঁজতে লাগলাম। আমার কাছে মনে হলো, সে দু'আটি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাপারে তাঁরই সাহায্য চাওয়া। দু'আটি খুঁজে পেলাম সূরা ফাতিহার 'ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতা'ঈন' আয়াতে।”
তিনি আরও বলেন, 'অন্তরের দুটি বড় রোগ হয়। বান্দা যদি এই দুটি রোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পারে, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। এ দুটি হলো লৌকিকতা এবং অহংকার। লৌকিকতার ঔষধ হলো 'ইয়্যাকা না'বুদু' আর অহংকারের ঔষধ হলো 'ইয়্যাকা নাসতা 'ঈন'।' শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ-কে বার বার বলতে শুনতাম, 'ইয়্যাকা না'বুদু' হলো লৌকিকতার ঔষধ। 'ইয়্যাকা নাসতা'ঈন' হলো অহংকারের ঔষধ।
এইমাত্র যে সালাত আদায় করলেন, এ সালাতের ব্যাপারেও আল্লাহ্ যদি আপনাকে সাহায্য না করতেন তাহলে কোনোভাবেই তা আপনি আদায় করতে পারতেন না।
তাঁর জন্য বিনয়ী হোন
তিনি দয়ালু। তাঁর দুয়ারে আপনার প্রয়োজনের ঝুলিটা বাড়িয়ে ধরুন। শুধু আপনার হৃদয়টা তাঁর জন্য বিনয়ী করে দিন। তাঁর কাছে দু'আ না করলেও বিনয়ী হোন অন্তত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনার থেকে এই বিনয়ী ভাবটাই তো চান। আপনি নিশ্চিত থাকুন যে, এরপর থেকে তিনি আপনার সব প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন। আপনার অসুস্থতা দূর করে দেবেন। আপনার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস ফুটিয়ে দেবেন।
আল্লাহ্র কাছে চাইলে আপনার কল্পনাও সত্যি হয়ে যাবে। আপনার ধারণাও বাস্তবে পরিণত হবে। আপনার আশার বস্তুগুলো তিনি বাস্তবে রূপান্তর করে দেবেন। আপনার স্বপ্নগুলো তিনি সত্যি করে দেবেন।
আর নির্ভর করুন পরাক্রমশালী পরম দয়ালু আল্লাহর ওপর—যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি দাঁড়ান।[১]
যার জন্য আপনি সালাতে দাঁড়ালেন, যার জন্য মাটিতে কপাল ঠেকালেন, যার জন্য মাথা নোয়ালেন, তাঁর কাছেই তো আপনি নিজের প্রয়োজনের কথা জানাবেন। তাঁর দিকেই তো আপনার সুস্থতার ভার দেবেন। তিনিই তো হবেন আপনার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তিনিই আপনার তো স্বপ্নপূরণে সহায়ক।
আপনি আল্লাহ্র রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরুন। অন্য কেউ বিশ্বাস ঘাতকতা করলেও তিনি আপনার প্রকৃত নির্ভরতার স্থান।
একবার এক সৎকর্মশীলা মায়ের ছেলে বাইরের দেশে পড়াশোনা করার ব্যাপারে মনস্থ করল। বাইরের দেশগুলোতে পড়তে গিয়ে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঘটনাগুলো মা শুনেছিলেন; কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে রাজি হতেই হলো। তিনি জানতেন যে, আল্লাহ্ তার ছেলেকে রক্ষা করতে সক্ষম। তাই নিজের ছেলের জন্য সালাতে সবসময় দু'আ করতেন। ছেলে পড়াশোনা শেষে যথারীতি দেশে ফিরে এলো। মা দেখতে পেলেন তার ছেলের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সে মাসজিদমুখী হয়ে গেছে। সে বেশি বেশি সালাত আদায় করছে, ভালো কাজের আদেশ করছে ও খারাপ কাজের নিষেধ করছে। আগে সে যা অর্জন করেনি তা সে এবার অর্জন করতে শুরু করেছে। আগে যা অর্জন করা তার জন্য কষ্টসাধ্য ছিল এখন তা সে সহজেই অর্জন করতে পারছে।
আমরা কীভাবে ভাবতে পারি যে, পরম নির্ভরযোগ্য আল্লাহ্ তা'আলা এমন মায়ের ছেলেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারেন, যে মা সবসময় বিনয়ের সাথে চাইতেন—'আল্লাহ্, আমার সন্তানকে রক্ষা করুন। আপনার ওপরই আমি নির্ভর করলাম। ছেলের ব্যাপারে আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না।'
অশ্রুসজল চোখ ও মুচকি হাসি
যদি দুনিয়ার কোনো রাজা আপনাকে বলে, 'আমার ওপর নির্ভর করো, আমি তোমার প্রাপ্য ওই অত্যাচারীর দখল থেকে আদায় করে দেবো। তুমি শুধু আমার ওপর নির্ভর করে এ কাজে আমাকে নিযুক্ত করো।' তাহলে আপনার কি কোনো সন্দেহ থাকবে যে, আপনার প্রাপ্য আপনি পাবেন না? ওই রাজার যে কোনো সহকারীর একটা কলমের আঁচড়েই তো সেই অত্যাচারী কাঁপতে কাঁপতে এসে আপনার প্রাপ্য আপনাকে বুঝিয়ে দেবে। তাহলে যদি রাজা নিজেই কাজটা করে দেন তাহলে কেমন হবে?
আগের রাজা, রাজার সহযোগীর কথা বাদ দিন। এই আয়াতটি পড়ুন—
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ
আর আপনি নির্ভর করুন ওই চিরস্থায়ী সত্তার ওপর—যিনি চিরঞ্জীব [১]
আপনার ভেতরে এতক্ষণে প্রয়োজনের সকল চিত্র উধাও হয়ে গেছে, তাই না? আপনার মনে আর কোনো ভয় নেই, নেই দুর্ভাবনা বা দুশ্চিন্তার ছাপ।
আল্লাহ্ আপনার সকল সমস্যার সমাধান করে দেবেন। আপনার সব ব্যথা মুছে দেবেন, স্বপ্নগুলো সত্যি করে দেবেন। ফলে আপনার অশ্রুজল পরিণত হবে মুচকি হাসিতে।
আপনি মারা যেতে পারেন; কিন্তু চিরস্থায়ী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা চিরঞ্জীব। আপনার মৃত্যুর পর আপনার ছেলেদের তিনি দেখে রাখবেন। আপনার রেখে যাওয়া ছেলেদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে না। যেই চিরস্থায়ী আল্লাহ্ চিরঞ্জীব আর আপনি মরণশীল, সেই আল্লাহই তো তাদের জন্য যথেষ্ট। তিনি তাদের সাথে থাকবেন। তাদের অবস্থা দেখে দয়া করবেন। তাদের সুখী করবেন। আপনার জীবদ্দশায় তারা যে অবস্থায় ছিল, তার থেকে ভালো অবস্থা ফিরিয়ে দেবেন। কেননা, তিনি তো সেই চিরস্থায়ী আল্লাহ্-যিনি মৃত্যুবরণ করেন না।
জীবনের অক্সিজেন
কেউ যদি আপনার ওপর অত্যাচার নাও করে-তবু আল্লাহর উপর নির্ভর করুন। নির্ভরতা শুধু অত্যাচারীর অত্যাচার থেকেই বাঁচায়; শুধু নির্ধারিত কাজেই সাহায্য করে-এমন নয়, নির্ভরতা আপনার জীবনে অক্সিজেনের মতো। আপনি কি অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারবেন?
সুস্থ অবস্থায়ও আল্লাহ্ ওপর নির্ভর করুন। আপনার হৃৎস্পন্দন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া, শরীরে রক্তের প্রবাহ, খাদ্যের পরিভ্রমণ-এ সবই ছেড়ে দিন আল্লাহর হাতে।
তিনি যদি আপনার চোখের পাতা বধ করার অনুমতি না দিতেন তাহলে তো চোখ দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত। তিনি যদি আপনার জিহ্বাকে স্বাদ আস্বাদনের সক্ষমতা না দিতেন তাহলে আপনার কাছে এ জীবনটা অর্থহীন মনে হতো। তিনি যদি আপনার চামড়াকে অনুভব করার শক্তি না দিতেন তাহলে আপনি টের না পেলেও তা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত।
সন্তানদের ভালো হওয়ার ব্যাপারে নির্ভর করুন কেবল আল্লাহ্ ওপরই। এমন কত ছেলেকে দেখেছি, যারা মাসজিদে বড় হয়েও পরে নাস্তিক হয়ে গেছে। এমন ভয়ানক পরিণতি থেকে আমরা পানাহ চাই দয়াময় আল্লাহ্র কাছে। অনেক ছেলে আছে, যাদের হাতে বাবা-মা অর্থ ঢেলে দিয়েছে, সবচেয়ে বেশি যত্ন নিয়েছে; কিন্তু তারা নষ্ট হয়ে গেছে। আরও দেখেছি এমন ছেলেদের, যাদেরকে তাদের বড় ভাইয়েরা যত্ন-আত্তি দিয়ে ঘিরে রেখেছিল, তারপরও তারা বিচ্যুত হয়ে গেছে।
আপনার ছেলের অন্তরে হিদায়াতের জায়গাটা কতটুকু তা কেবল এক আল্লাহই জানেন। তাঁর কাছে চান—যেন তিনি আপনার অন্তরটা ‘ঈমানে’ পূর্ণ করে দেন। তাঁর ওপরই নির্ভর করুন। বিনয়ের সাথে তাকে বলুন, ‘হে আমার রব, এই আমার সন্তান। আপনি আমার রব, তাঁরও রব, তাঁকে আপনি হিদায়াত দিন, আপনাকে চেনার শক্তি দিন আর আমাকে তাঁর প্রতিপালনে সহযোগিতা করুন। হে আমার রব, আপনি যদি সাহায্য না করেন তাহলে আমি তো তাঁকে সালাত আদায় করার আদেশটাও ভালোভাবে দিতে পারব না। আপনি যদি সাহায্য না করেন, তাহলে সেও পারবে না আন্তরিকতার সাথে সালাত আদায় করতে। সুতরাং আমাদের সাহায্য করুন আপনার স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও উত্তম ‘ইবাদাত করার ব্যাপারে।’
আল্লাহ্ বিহীন জীবনটাই জাহান্নাম
আপনার জীবনের সফলতা অর্জনে নির্ভর করুন আল্লাহ্ ওপর। তিনি ছাড়া আপনার জীবনটা জাহান্নামে পরিণত হবে।
কেউ কেউ বলে, ‘তুমি নিজের স্ত্রীর প্রশংসা করবে। তাঁর এত প্রশংসা করবে যে, তাঁর মন জয় করে নেবে। তাঁর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবে, তাঁর সাথে সদ্ব্যবহার করবে। এভাবে তাঁর মন জয় করে নেবে, তাঁর ভালোবাসা অর্জন করবে।’
এর সবই সঠিক; কিন্তু এর আগে, মাঝে ও শেষে আপনি বলবেন, ‘আল্লাহ্, আমার স্ত্রীকে আমার জন্য ঠিক করে দিন।’ তাঁর ওপরই নির্ভর করুন, কেবল তাঁর কাছেই সাহায্য চান। তাঁকে ডেকে বলুন, ‘আমার সবগুলো মুচকি হাসির কোনো ফায়দা হবে না, যদি আপনি না চান।’
তাঁর কাছে বিনয়াবনত হয়ে বলুন, ‘আল্লাহ্, তাঁর অন্তরটা আপনার হাতে, আমার হাতে নয়। সুতরাং আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে দিন, দু’জনের মাঝে সমঝোতা করে দিন। আমাকে বানিয়ে দিন তাঁর আত্মার প্রশান্তি, অন্তরের শান্তি ও চোখের শীতলতাস্বরূপ আর তাঁকে বানিয়ে দিন আমার আত্মার প্রশান্তি, অন্তরের শান্তি ও চোখের শীতলতাস্বরূপ।’
আপনি যে দুর্বল, আপনার শক্তি যে সীমিত, আপনার সক্ষমতা যে স্বল্প, আর আল্লাহ্ একাই হলেন সর্বশক্তিমান, সুদৃঢ় ও মহান—এ স্বীকৃতিটা আল্লাহ্ আপনার থেকে চান। আপনি যদি এটা স্বীকার করে নেন, তাহলে নির্ভরতার তিন-চতুর্থাংশ হয়েই গেল। এ নির্ভরতাটা যদি করতে পারেন তাহলে দেখবেন আপনার আশেপাশে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে। বিশ্বাস করুন, দেখবেন সবকিছুর পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।
আপনার প্রয়োজন, দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসুন। ধরুন—আপনি এমন একজন মানুষ যার কোনো প্রয়োজন নেই, কোনো স্বপ্ন নেই, কোনো দুশ্চিন্তা নেই, কোনো রোগ নেই। তারপরও আপনাকে তাঁর ওপরই নির্ভর করতে হবে; যেন তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। আপনি কি চান না, তিনি আপনাকে ভালোবাসবেন?
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
'নিশ্চয় আল্লাহ্ তাওয়াক্কুলকারী-(নির্ভরকারী)-দের ভালোবাসেন [১]'
আল্লাহ্ বান্দাকে ভালোবাসেন-যে লোকের অন্তরে সামান্য বিনয়ও আছে, সেও এ কথা শুনলে তার অন্তরটা কেঁপে উঠবে, তার আত্মাটা তীব্র এক আকাঙ্ক্ষা ও কামনায় বিগলিত হয়ে যাবে। যেই আল্লাহ্ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। অন্তত এ কারণটাই যথেষ্ট তাঁর ওপর নির্ভর করার জন্য।
আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট
কিছু মানুষ এসে আপনাকে পেছনে হটার পরামর্শ দেবে। তারা নির্মম বাস্তবতার কিছু নমুনা আপনার কাছে পেশ করে আপনার অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসটা নাড়িয়ে দেবে। তারা আপনার অনুভূতি নিয়ে খেলা করবে। তারা আপনাকে বলবে, আপনার অবস্থান থেকে সরে এসে আপনার মূল্যবোধকে ছেড়ে না দিলে আপনার বিপদের আশংকা থাকবে। এ অবস্থায় আপনি আপনার অন্তরটা 'ঈমান দিয়ে ধৌত করবেন। শুধু বলবেন, 'আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তাঁর ওপরই আমার পরম নির্ভরতা।' এ কথা বলার সাথে সাথে আপনি আল্লাহ্র দয়া ও অনুগ্রহ পেয়ে যাবেন। আপনার আর কোনো ক্ষতি হবে না। এই আয়াতটা মনোযোগ দিয়ে পড়ুন-
الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَنَا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ فَانقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ لَّمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءُ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ ()
এদেরকে লোকেরা বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জড়ো হয়েছে; কাজেই তোমরা তাদের ভয় করো; কিন্তু এ কথা তাদের 'ঈমানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক। তারপর তারা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছিল, কোনো অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি এবং আল্লাহ্ যাতে সন্তুষ্ট তারা তারই অনুসরণ করেছিল এবং আল্লাহ্ মহান অনুগ্রহশীল (১)
খারাপ কিছুতে আক্রান্ত হওয়া—এরকমটা নিঃসন্দেহে হবে না; বরং যে বিপদ থেকে আপনি সামান্য পরিমাণও নিষ্কৃতি পাবেন না বলে মনে করেছিলেন, সে বিপদ তো আপনাকে স্পর্শই করবে না। আপনার চামড়ায় সামান্য পরিমাণ ক্ষতও তৈরি হবে না। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনার বিন্দুমাত্র আফসোসও করা লাগবে না এ নির্ভরতার জন্য।
মন থেকে আয়াতটা পড়ুন—
وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا *
আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই তো যথেষ্ট [২]
আপনি যদি আল্লাহর ওপর নির্ভর করেন তাহলে এটা মনে করবেন না যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে নির্ভর করার মতো না পেয়ে আপনি তাঁর কাছে এসেছেন। না, কখনোই নয়; বরং সৃষ্টজীব মহান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ যে সত্তার ওপর নির্ভর করতে পারে, আপনিও তাঁর ওপরই নির্ভর করছেন।
কেউ কেউ বলে, 'দু'আ ছাড়া আমাদের কিছুই করার নেই।' আশ্চর্য! আপনার কাছে এর চেয়ে শক্তিশালী আর কী আছে?
দু'আ-ই তো নির্ভরতার সোপান। দু'আ মুখের কথায় পরিণত হওয়ার আগে অন্তরের এক দৃঢ় বিশ্বাস ধারণ করে থাকে। এ বিশ্বাস হলো, 'আল্লাহ্ সুবহানাহু সব কিছুই করতে পারেন।' আর এটাই নির্ভরতার সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র।
যে বলে, 'অমুকের তো আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপায় নেই।' তাকে বলে দিন, ‘আল্লাহই তো তার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যথেষ্ট। আল্লাহকে পেয়ে সে কতই-না ধন্য। তার কীসের কমতি থাকবে যদি তার সাথে রাজাধিরাজ ও আসমান-যমীনের রব আল্লাহই থাকেন?
তোমরা দুনিয়ার সব কিছু নিয়ে নাও, আমার আত্মাটা শুধু স্বাধীন রেখে দাও। এতে তোমরা আমাকে নিঃস্ব মনে করলেও আমিই তোমাদের মাঝে সবচেয়ে ধনী।
যৌক্তিক কারণ
আচ্ছা, আপনি জানেন, শুধু আল্লাহ্র ওপর নির্ভরতাই যথেষ্ট কেন? এখানে একটা যৌক্তিক কারণ আছে। সেটা হলো, আল্লাহ্ হলেন যমীন ও আসমানসমূহের মালিক-
وَ لِلّٰهِ مَا فِى السَّمٰوٰتِ وَمَا فِى الْاَرْضِ وَ كَفٰى بِاللّٰهِ وَكِیْلًاۙ
আর আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ্। আর আল্লাহই কর্মবিধায়ক রূপে যথেষ্ট [১]
আপনি যাকে ভয় পান, সে কি যমীনের বাসিন্দা না? যদি বলেন, 'হ্যাঁ', তাহলে সে তো আল্লাহ্রই মালিকানায়। আল্লাহই তার পরিচালক।
যে রোগ আপনাকে দুর্বল করে ফেলে; যা থেকে আরোগ্যলাভের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না, তা কি যমীনের না? তাহলে সেটাও তো আল্লাহ্ই মালিকানায় আছে। তিনি এ রোগকে আদেশ দিতে পারেন আপনার দেহ ত্যাগ করার।
আপনার যত দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা, ক্লান্তি, ব্যস্ততা- সবই কি যমীনের ভেতরে নয়? তাহলে এই যমীনটা যার—এই যমীনের সবকিছু যার, তাঁর ওপর ভরসা রাখুন। তাঁর এক আদেশে আপনার সকল দুঃখ-দুর্দশা-দুর্ভাবনা-দুশ্চিন্তা নিমিষেই মিলিয়ে যাবে।
আর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যেহেতু সব কিছুর স্রষ্টা। তিনি যা চান তাই করতে পারেন। এজন্য সকল বিষয়ে আমরা শুধু তাঁরই ওপর ভরসা রাখব-
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ )
আল্লাহ্ সকল কিছুর স্রষ্টা। তিনি সবকিছুর ওপর কর্মবিধায়ক (১)
একবার ভেবে দেখুন, 'হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল'- 'আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট আর তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।'
আমাদের জন্য আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউই নেই। তিনিই তো সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক। তাঁর থেকে মহান, বেশি মর্যাদার আর কেউ নেই।
সাবধান হোন
নির্ভরতার জায়গায় তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে রাখার ব্যাপারে সাবধান থাকুন। সাবধান থাকুন তিনি ব্যতীত অন্য কারও কাছে আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারেও। অন্যথা আপনি দুর্বল হয়ে পড়বেন। দুর্ভাবনা আপনাকে আক্রমণ করে বসবে। আপনার হৃদয় দুনিয়ার ভাবনায় মত্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
أَلَّا تَتَّخِذُوا مِن دُونِي وَكِيلًا )
তোমরা আমার পরিবর্তে কর্মবিধায়ক হিসেবে কাউকে গ্রহণ না করো। (২)
চিরস্থায়ী তিনি থাকতে অন্য কাউকে খোঁজা, অন্য কারও ওপর নির্ভর করা, সংরক্ষণকারী তিনি থাকতে কারও কাছে আশ্রয় নেওয়া আপনার জন্য হারাম।
তিনি যে সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী-তাই তাঁর ওপর নির্ভর করবেন। তিনি গোপনে সংঘটিত সব কিছুই শুনতে পান। গভীর অমানিশায় যা কিছু ঘটে থাকে তার সবই তিনি অবগত। আপনি কীভাবে অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে পারেন—অথচ তিনি ছাড়া আর কেউ গোপনীয় বিষয়গুলো শোনে না, জানেও না?
وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
আর নির্ভর করো আল্লাহ্র ওপর, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী [১]
যে অত্যাচারী আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে সে তো আপনার রক্ষাকারী রবেরই সৃষ্ট। তাই নির্ভর করুন আল্লাহ্ ওপর, তিনিই অন্যের দেওয়া কষ্ট থেকে আপনাকে রক্ষা করবেন। পরিপূর্ণ সাহস নিয়েই বলুন-
إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ رَبِّي وَرَبِّكُمْ مَّا مِن دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ ءَاخِذُ بِنَاصِيَتِهَا *
আমি তো নির্ভর করি আমার ও তোমাদের রব আল্লাহ্ ওপর। এমন কোনো জীব-জন্তু নেই-যা তাঁর পূর্ণ আয়ত্তাধীন নয় [২]
শাইতান তার বাহিনী ও শক্তি নিয়ে মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়, ভয় দেখায়। তারপরও সে আল্লাহ্ ওপর নির্ভরকারী বান্দার কাছে পৌঁছতে পারে না-
إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانُ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ *
নিশ্চয় যারা 'ঈমান আনে এবং তাদের রবের ওপরই নির্ভর করে, তাদের ওপর তার কোনো আধিপত্য নেই।'[৩]
তাহলে কীভাবে অফিসের বস, খারাপ প্রতিবেশী, মন্ত্রী বা কোনো নেতা পৌঁছতে পারবে? স্মরণ করুন-
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ )
যে আল্লাহ্ ওপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট [৪]
যদি তাঁকে আপনার সকল কাজে সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করেন, তাঁর ওপরই নির্ভর করেন, ভরসা রাখেন, তাহলে অন্য কাউকে আপনার কখনো প্রয়োজনই হবে না। তিনিই আপনার জন্য যথেষ্ট। তিনিই আপনাকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন।
আল্লাহর দেওয়া নিরাপত্তা যদি আপনাকে চতুষ্পার্শ থেকে ঘিরে না রাখে, তাহলে আপনি ধ্বংস হয়ে যাবেন। এ জীবন অসুখ-বিসুখ, ক্লান্তি-শ্রান্তি, ষড়যন্ত্র-কূটকৌশলে ভর্তি। আপনাকে আল্লাহ্র রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া পেলে এই কেউটে সাপগুলো আপনার ওপর ছোবল হানতে থাকবে।
আমি আপনাকে ভয় দেখাচ্ছি না, এটাই বাস্তবতা।
শুধু বলুন, 'আল্লাহ্, আপনার ওপর ভরসা করলাম।'
আপনি কি অন্তর থেকে বললেন? এবার মুচকি হাসুন। দেখবেন, সব কেউটে সাপ উধাও হয়ে গেছে।
কিছু জিনিস আপনার জন্য হুমকি
আপনি যখন সকালে বাসা থেকে বের হন, তখন বাইরে আপনার জন্য ভয়াবহ দুর্ঘটনা, অসুখ সৃষ্টিকারী বায়ুপ্রবাহ, পতনোন্মুখ গর্ত, গালি দেওয়ার মতো খারাপ মানুষ, হিংসা করার মতো লোক অথবা এক কুটিল চাকুরিজীবী অথবা প্রতারক বিক্রেতা আপনাকে অনুসরণ করবে। তাই বের হওয়ার সময় আপনার নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দু'আ পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন সেটি আপনি পড়বেন-
بسم الله توكلت على الله، اللهم إني أعوذ بك أن أضل أوأُضل أوأزل أو أُزل أو أظلم أو أظلم أو أجهل أو يجهل على
আল্লাহর নামে, আল্লাহর ওপরই নির্ভর করছি। আল্লাহ, আপনার কাছে পানাহ চাই পথভ্রষ্ট করা, পথভ্রষ্ট হওয়া, পদস্থলন করানো, পদস্খলন হওয়া, অত্যাচার করা, অত্যাচারিত হওয়া, মূর্খ হওয়া বা মূর্খদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে। [১]
এবার আপনি স্বস্তির নিঃশ্বাস গ্রহণ করে বেরিয়ে পড়ুন। দেখবেন সব ভয় কেটে গেছে।
ঘুমিয়ে পড়লে আপনার পিঠ এলিয়ে দেওয়ার সময় তাঁকে স্মরণ করুন, আপনার দায়িত্ব তাঁর হাতেই ছেড়ে দিন; তাঁর আশায় ও তাঁরই ভয়ে।
আপনার রব আপনাকে আদেশ দিয়েছেন তাঁর ওপর ভরসা করতে; প্রতি মুহূর্তে আপনি এটি স্মরণ করবেন। আপনার তো তাঁকে প্রয়োজন। সুতরাং এ সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। এই উপহার ফিরিয়ে দেবেন না। এর অধিকারী হওয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন না।
আল্লাহ্, আপনার প্রতি আমাদের নির্ভরশীল করে দিন, আপনার কাছে আশ্রয়গ্রহণকারী হিসেবে কবুল করে নিন, আপনার প্রতি সুদৃঢ় 'ঈমান দ্বারা আমাদের আচ্ছাদিত করুন। মজবুত 'ঈমান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন অন্য সব সম্পর্ককে, টিকিয়ে রাখুন শুধু আপনার সাথের সম্পর্কটাই।
টিকাঃ
[১] সূরা মুয্যাম্মিল, ৭৩: ০৯
(১) সূরা শু'আরা, ২৬: ২১৭-২১৯
[২] সূরা ফাতিহা, ০১:০৫
[১] আবু দাউদ, ১৫২২
[১] সূরা শু'আরা, ২৬: ২১৮
[১] সূরা ফুরকান, ২৫ : ৫৮
[১] সূরা আলে ইমরান, ০৩: ১৫৯
(১) সূরা আলে-ইমরান, ০৩: ১৮৩-১৮৪
[২] সূরা আহযাব, ৩৩: ০৩
[১] সূরা নিসা, ০৪ : ১৩২
(১) সূরা যুমার, ৩৯ : ৬২
(২) সূরা বানী ইসরা'ঈল, ১৭: ০২
[১] সূরা আনফাল, ০৮: ৬১
[২] সূরা হুদ, ১১: ৫৬
[৩] সূরা নাহল, ১৬: ৯৯
[৪] সূরা তালাক, ৬৫:০৩
[১] হাদীসটি আবু দাউদ তার সুনান গ্রন্থে (৪/৪৮৬-৫০৯৬) উল্লেখ করেছেন।