📄 আস-সামাদ তথা স্বয়ংসম্পূর্ণ
সমগ্র বিশ্বের সকল সৃষ্টি যদি আপনার কোনো ক্ষতি করতে চায়, বিপরীতে আল্লাহ্ যদি আপনার কোনো ক্ষতি না চান, তাহলে কেউই আপনার কিছু করতে পারবে না।
আবার আল্লাহ্ যদি আপনাকে কোনো অনিষ্ট দ্বারা আক্রান্ত করতে চান, বিপরীতে সমগ্র বিশ্বের সকল সৃষ্টি একত্র হয়েও যদি আপনাকে তা থেকে রক্ষা করতে চায়, তবুও তারা আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না।
'আস-সামাদ' তথা স্বয়ংসম্পূর্ণ
যদি দেখেন সংকীর্ণ এক জেলখানায় আপনি আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন, যেখান থেকে কোনোভাবেই আপনি বের হতে পারছেন না; যদি আপনাকে বিপদাপদ ঘিরে ধরে; নানা প্রয়োজন যদি আপনাকে বেষ্টন করে ফেলে; নানা রকম দুশ্চিন্তায় যদি আপনি অসাড় হয়ে পড়েন আর আপনার অন্তরাত্মা অজানা কোথাও পালাতে চায়—তাহলে জেনে রাখুন, এখনই সময় আপনার রবের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার।
জীবনে শক্তিশালী হয়ে উঠতে যা কিছু প্রয়োজন—তার সবই দেবে আল্লাহ্র পবিত্র নাম ‘আস-সামাদ’ তথা ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’। এ নাম আপনাকে সাহসের সাথে বাস্তবতার মোকাবেলা করতে সহযোগিতা করবে। আপনাকে দৃঢ়তার সাথে পদক্ষেপ নিতে শক্তি যোগাবে।
এই স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিপালকের সঙ্গে নতুন এক জীবন শুরু করুন। নিশ্চিত থাকুন—আপনার আগামীকাল আজকের থেকে ভালো হবে, বহুগুণে, অনেক দিক থেকেই।
স্বয়ংসম্পূর্ণতার ছায়ায়
‘আস-সামাদ’ (স্বয়ংসম্পূর্ণ) নামটি শুনলেই ভেতরে কেমন যেন এক ধরনের সম্মোহন তৈরি হয়। শব্দটির বর্ণগুলো যেমন শক্তিশালী, অর্থও তেমনই গভীর। যদিও এই নামের স্মরণ খুব কমই হয়ে থাকে তবুও নামটির আলাদা এক গাম্ভীর্য আছে। এই গাম্ভীর্য বান্দাকে ‘ইবাদাতের সময় আল্লাহ্র প্রতি একনিষ্ঠ করে তোলে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র ‘ইবাদাতে যত বেশি একনিষ্ঠ হবে, তার অন্তর আল্লাহর প্রতি ততই ঝুঁকবে, ততই তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে উঠবে এবং শুধু তাঁরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে।
চলুন, আমরা ‘আস-সামাদ’ (স্বয়ংসম্পূর্ণ)-এর জগতে প্রবেশ করি। ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ শব্দ থেকে কিছু পাওয়ার চেষ্টা করি—
স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেন তিনি—সকল সৃষ্টি যার মুখাপেক্ষী, সবাই যার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, যিনি সবাইকে নিরাপত্তা দান করেন। এটিই এই নামের মহান অর্থ। এই অর্থের পথ ধরেই আমরা এখন যাত্রা করব।
কোনো কিছু চাইতে হলে স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তার কাছেই চাইতে হয়। বিপদাপদ নেমে এলে তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করতে হয়। বিপদে পড়লে ভীত-বিহ্বল হয়ে তাঁর দিকেই ছুটে যেতে হয়।
কুর'আনের ছোট কিন্তু বিশিষ্ট একটি সূরায় তাঁর এই নামটি এসেছে। যে সূরাটি কুর'আনুল কারীমের এক-তৃতীয়াংশের মর্যাদা রাখে। সূরা ইখলাস।
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ ۞
বলুন, আল্লাহ্ এক। আল্লাহ্ অমুখাপেক্ষী [১]
বান্দার যখন কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয় তখন বলবে, 'আল্লাহ্'। যখন কোনো পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন হয় তখনো বলবে, 'আল্লাহ্'। যখন কোনো রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয় তখনো বলবে, 'আল্লাহ্'। যখন কোনো পথপ্রদর্শনের প্রয়োজন পড়ে তখনো বলবে, 'আল্লাহ্'। যখন অনুকম্পালাভের প্রয়োজন পড়ে তখনো সে বলবে, 'আল্লাহ্'।
ঢেউতরঙ্গ
তিনি আপনাকে আপনার প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে ঘিরে রেখেছেন, যেন আপনি তাঁর নাম, তাঁর শান-শওকত, গুণাবলি দিয়ে তাঁর কাছে চাইতে পারেন। আর আপনার এই চাওয়াটাই হবে তাঁর প্রতি আপনার মুখাপেক্ষিতার নমুনা।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আপনি তাঁর প্রয়োজন অনুভব করবেন। নিজ ইচ্ছায় তাঁর কাছে ছুটে যেতে না চাইলে অনিচ্ছায় হলেও আপনাকে তাঁর দিকেই ফিরতে হবে।
কৃষকের ফসল ফলানোর মৌসুম পেরিয়ে যাচ্ছে। জমিতে সেচের প্রয়োজন; কিন্তু সেচযোগ্য পানি কমে এসেছে, তখন আসমানের দিকে তাকিয়ে সে আর্তনাদ করে বলে ওঠে, হে আল্লাহ্!
যখন নৌকাযোগে প্রবল ঢেউয়ের মাঝ দিয়ে আরোহীরা ছুটে চলে, বিশাল বিশাল ঢেউ যখন তাদের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়ার এক তীব্র ভীতি তাদের অন্তরে সঞ্চার করে চলে, তখন তারা অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে, আল্লাহ্!
বৈমানিক যখন ঘোষণা দেয় যে, বিমানের চাকাগুলো কাজ করছে না, সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এয়ারপোর্টের ওপর বিমানটা আরেকবার চক্কর দেবে, আরোহীরা তখন গুরুত্বপূর্ণ সকল লোকজনের কথা ভুলে যায়। তারা শুধু সেই সত্তাকে স্মরণ করে-যার হাতে সকল কিছুর ক্ষমতা, যিনি নিরাপত্তা দেন সবাইকে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রয়োজন কখনো পড়ে না এবং সে সক্ষমতাও নেই কারও।
স্ক্রিনে হার্টবিটের কার্যক্রম দেখানো হচ্ছে। আপনি সেই আঁকাবাঁকা রেখাগুলো দেখছেন। অসুস্থ লোকটার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে কমে আসছে। নেমে আসছে হার্টবিটের কার্যক্রমের সূচক-কাঁটাও। স্ক্রিনে রেখাগুলোর নড়াচড়া যখন আপনার সামনে আস্তে আস্তে স্থির হয়ে আসে; ঠিক সেই মুহূর্তে আপনি কিন্তু সহযোগিতার জন্য নার্সকে স্মরণ করেন না। আপনার মাথা থেকে ডাক্তারের নামটাও তখন কর্পূরের মতো উবে যায়। কেবল মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটি কাতর সুর, 'আল্লাহ্, সাহায্য করুন।
ভ্রান্ত চিন্তা
হুসাইন নামে এক বৃদ্ধ বেদুইন একবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলো। নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কয়জনের 'ইবাদাত করো, হুসাইন?' সে বলল, 'সাত জনের; ছয় জন যমীনে আর এক জন আসমানে।' নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি ভয় পাও কাকে?' সে বলল, 'যিনি আসমানে আছেন তাঁকে।' তিনি এবার জিজ্ঞেস করলেন, 'হুসাইন, কার কাছে চাও তুমি?' সে বলল, 'যিনি আসমানে আছেন, তাঁর কাছে।' নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, 'তাহলে যমীনে যারা আছে তাদের বর্জন করো এবং আসমানে যিনি আছেন কেবল তাঁরই 'ইবাদাত করো।' বৃদ্ধ বেদুইন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা শুনে ইসলাম গ্রহণ করে নিলেন [১]
হুসাইন নামের এই বেদুইন স্বয়ংসম্পূর্ণতার মর্ম বুঝতে পেরেছিলেন। কারণ, যার দিকে আপনি মুখাপেক্ষী হবেন, যাকে আপনি ভয় পাবেন, যার কাছে আপনি আপনার সবকিছু সঁপে দেবেন, আপনার সকল চাওয়া-পাওয়া যার দুয়ারে আপনি তুলে ধরবেন, আপনার সকল আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু যিনি হবেন, তিনিই তো আপনার সিজদা পাওয়ার অধিক যোগ্য।
'ঈমান খুবই সহজ একটি জিনিস। এটি অর্জনের জন্য গাদা গাদা বইপত্রের দরকার নেই। কোনো দার্শনিক মতবাদ, যৌক্তিক গবেষণার আবশ্যকীয়তা নেই। 'ঈমান হলো একনিষ্ঠতার সাথে শুধু একটি বাক্য স্বীকার করা, তারপর সেই বাক্য দ্বারা ভ্রান্তির জাল ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া।
কুর'আন এ বিষয়টাকে সংক্ষেপে বলছে- قُلِ اللَّهُ ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ )
বলুন, আল্লাহ; তারপর তাদেরকে খেল-তামাশায় মত্ত হতে দিন [১]
শুধু 'আল্লাহ্' শব্দটিই জীবনের সব মিথ্যাকে ঢেকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
প্রতিটি মানুষের এই যে শরীর, শরীরের প্রতিটি কোষের গভীরে, শিরার অভ্যন্তরে এমন অনেক কিছু রয়েছে-যা আল্লাহকে ভালো করেই চেনে। তাঁর জন্য সিজদায় নত হয়। নিজের অজান্তেই অন্তরের অন্তরীক্ষে তাঁরই জন্য তাসবীহ জপে যায়।
একজন কাফির যদিও কাফির-তা সত্ত্বেও কুর'আনের ধ্বনি তার কানে পৌঁছলে সে নত হয়ে আসে।
সীরাতের বিখ্যাত ঘটনাবলির মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার মাসজিদুল হারামে মক্কার মুশরিকদের কাছাকাছি অবস্থান করে সূরা নাজম তিলাওয়াত করছিলেন। সূরা শেষ করার সাথে সাথেই সবাই সিজদা করা শুরু করল। একেবারে সব্বাই সিজদা করে ফেলল। এমনকি যারা তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তাকে কষ্ট দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল-তারাও। কারণ, তাদের শরীরের কোষে, শিরা-উপশিরায় হঠাৎ করে যে 'ঈমানী শক্তি জেগে উঠেছিল সেটাই তাদের সিজদায় লুটিয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল।
তারকারাজি
আল্লাহ্ তাঁর বিশেষ বান্দাদের অন্তরে তাঁকে ভালোবাসার প্রয়োজন সৃষ্টি করে দিয়েছেন। বান্দার অন্তরে ভালোবাসার পবিত্র একটি জায়গা আছে। এ জায়গাটি শুধু তখনই পূর্ণ হবে যখন বান্দা আল্লাহর প্রতি নত হবে, তাঁর ঘর তাওয়াফ করবে, তাঁর সামনে দাঁড়াবে, তাঁর জন্যই ঘুম থেকে উঠবে আর অকাতরে তাঁর রাস্তায় দান করে যাবে।
এ জীবন যেন প্রতিটি মুহূর্তেই ফিসফিস আওয়াজে বলছে, 'আপনি যাকে খুঁজছেন, তিনি তো 'আরশের উপর আপনার কথা শুনছেন। 'রাহমান (আল্লাহ) আরশের উপর রয়েছেন।'
এক পাপী একবার রাস্তার ঘুপচি এক গলিতে একাকী পেয়ে একজন নারীর পথ আগলে তাকে কুপ্রস্তাব দিয়ে বসল। সেই নারী তার পাপকাজে বাধা দিয়ে তার প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানালেন। পাপী লোক তাকে উৎসাহ দিয়ে বলল, 'আমাদের কেউ দেখছে না, শুধু তারকাগুলো দেখছে।' তখন তিনি সাহসের সাথেই জবাব দিলেন, 'তাই যদি হয়, তাহলে এ তারকারাজি যিনি স্থাপন করেছেন তিনি কোথায়?' তিনি তো দেখছেন।
এই নারীর অন্তর ছিল আল্লাহ্র প্রতি মুখাপেক্ষী। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ্ তাকে দেখছেন, আল্লাহ্ সব জানেন, তিনি সব শোনেন। তার বিশ্বাস ছিল, তিনি সবই দেখেন; আর তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে। তো, আল্লাহ্র প্রতি আপনার মুখাপেক্ষিতা সালাত আদায়ের সময় কা'বাঘরের প্রতি মুসল্লীর নির্ভরতার মতো হতে হবে। অন্তর এমনই হওয়া চাই। অন্তরের কামনা-বাসনা সবদিকেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে পারে; তবে সামনের দিকটা থাকবে কেবল আল্লাহ্র জন্যই।
আপনার অন্তরের ডান দিকটাকে যেদিকে ইচ্ছে ফেরান। বাম দিকটাও যেদিকে ইচ্ছে ফিরিয়ে নিন; কিন্তু সামনের দিকটা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই রাখবেন। তিনি যে আপনাকে দেখছেন-এই ভাবনাটি মাথায় স্থির রাখবেন। কেবল তাঁকেই আপনার সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে দেবেন।
আপনি তো তাঁকে ভুলে যান
কখনো যদি কোনো কিছু খুঁজে না পান, তাহলে অনর্থক চিন্তা বাদ দিন। আল্লাহর দিকে মুখ করুন। তাঁর কাছে চান। তিনিই সেটা হারানোর ব্যবস্থা করেছেন, যেন বান্দা তাঁর মুখাপেক্ষী হয়ে তাঁর আশ্রয় কামনা করে। যেন বান্দা বলে, 'আল্লাহ্, আমার হারানো জিনিসটা আমাকে ফিরিয়ে দিন।' তিনি চান—আপনি যেন তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, আর আপনার প্রয়োজনকে ভুলে যান। অথচ আপনি আপনার প্রয়োজনীয় বস্তু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আর ভুলে বসে আছেন আল্লাহকে!
এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-র খুব দামী একটি বক্তব্য আছে। অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে দেখুন, বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্টের সময় বক্তব্যটি মনে করুন। তিনি বলেছেন,
'বান্দা প্রায়ই বিপদে পড়ে। সে আল্লাহ্র কাছে নিজের প্রয়োজন উত্থাপন করে, তাঁর কাছে চায়, বিপদ থেকে মুক্তি কামনা করে। সে বিনয়ের সাথে চাইতে থাকে। মাধ্যম হিসেবে সে 'ইবাদাত-বন্দেগী শুরু করে। প্রাথমিক অবস্থায় তার লক্ষ্য থাকে রিস্ক, সাহায্য, নিরাপত্তা বা এ ধরনের কিছু পাওয়া; কিন্তু বিনয়ের সাথে চাওয়ার ফলে সে আল্লাহকে চিনতে পারে। আল্লাহ্র প্রতি তার ভালোবাসা জন্মায়। আল্লাহকে ডেকে ও স্মরণ করে সে তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করে। এই স্মরণই একসময় তার কাছে ওই প্রয়োজনের চেয়ে প্রিয় হয়ে ওঠে। বান্দাদের প্রতি এটি আল্লাহ্র এক ধরনের দয়া। এভাবে অনেক সময় দুনিয়াবী প্রয়োজন দিয়েই তিনি বান্দাদের দ্বীনী উচ্চ স্থানে পৌঁছে দেন।'
মূসা 'আলাইহিস সালামের সময় একবার বৃষ্টিবর্ষণ বন্ধ হয়ে গেল। প্রচণ্ড খরা দেখা দিল। সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী-पुरुष-শিশু নিয়ে মূসা 'আলাইহিস সালাম পথে বেরিয়ে এলেন। দেখলেন, একটি পিঁপড়া মেঘমালার প্রভুর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে আসমানের দিকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে। মূসা 'আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন মুখাপেক্ষিতার অর্থ। এই যে পিঁপড়ার বিনয়, এই বিনয়ে আসমান থেকে অঝোর ধারার বর্ষণ হওয়া অবশ্যম্ভাবী। তিনি নিজ সম্প্রদায়কে বললেন, 'তোমরা ফিরে চলো।' তারা ফিরে যাওয়ার সময়ই বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজ আর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো।
ছোটবেলায় শুনতাম, একজন কারী দু'আ করছেন, 'আল্লাহ্, আপনার দুয়ারে আমরা বাহন থামালাম.. আপনার দান থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না।' তো এই যে মহান দানশীলের দরজায় বাহন থামানো—এর নামই মুখাপেক্ষিতা।
কেবল তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হোন
আপনি রোগাক্রান্ত হয়েছেন; আপনাকে অবশ্যই জেনে রাখতে হবে, ঔষধকে যদি তিনি আপনার শরীরে কাজ করার অনুমতি না দেন, তাহলে আপনার ওই রোগ কিছুতেই ভালো হবে না। তাই নিজের সুস্থতার জন্য কেবল তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হোন।
আপনাকে এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে, তিনি যদি ওই চলন্ত গাড়িটা আপনার দিক থেকে ঘুরিয়ে না দিতেন তাহলে আপনি এতক্ষণে মৃতদের একজন হয়ে পড়ে থাকতেন। তাই নিজেকে রক্ষার জন্য আপনি তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হবেন।
আপনাকে এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে, তিনি যদি আপনাকে রক্ষা না করতেন, তাহলে সামুদ্রিক যানে আরোহণের পর সেটি উল্টে এতক্ষণে আপনি মাছের খাবারে পরিণত হতেন। তাই তিনি যেন সর্বদা আপনার সাথে থাকেন—সে জন্য আপনি তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হবেন।
আপনার উচিত তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া—যেন আপনার আত্মা প্রশান্তি পায়, যেন আপনার ভেতরের অস্থিরতা দূর হয়। কেননা, তাকে ব্যতীত কল্পনা করলে আপনাকে শুধু দিগ্বিদিক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে বেড়াতে হবে। আর এতে আপনি ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়বেন।
এই যে যারা জাহাজের ওপর আছে, তাদের কথাই ভাবুন। অন্তহীন সমুদ্রে জাহাজ যখন দুলতে আরম্ভ করে, মৃত্যু একেবারে নিকটে চলে আসে, যখন প্রবল ঝড় তাদেরকে টালমাটাল অবস্থায় ফেলে, দেখবেন, সব ধর্মের লোকেরা তখন কেবলই একজনের নাম বলছে—'আল্লাহ্!'
هُوَ الَّذِي يُسَيِّرُكُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ حَتَّى إِذَا كُنتُمْ فِي الْفُلْكِ وَجَرَيْنَ بِهِم بِرِيحٍ طَيِّبَةٍ وَفَرِحُوا بِهَا جَاءَ تَهَا رِيحٌ عَاصِفُ وَجَاءَهُمُ الْمَوْجُ مِن كُلِّ مَكَانٍ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ أُحِيطَ بِهِمْ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ لَئِنْ أَنجَيْتَنَا مِنْ هَذِهِ، لَتَكُونَنَّ مِنَ الشَّاكِرِينَ
তিনিই তোমাদের জলে-স্থলে ভ্রমণ করান। এমনকি তোমরা যখন নৌযানে আরোহণ কর এবং সেগুলো আরোহী নিয়ে অনুকূল বাতাসে বেরিয়ে যায় এবং তারা তাতে আনন্দিত হয়, তারপর যখন দমকা হাওয়া বইতে শুরু করে এবং চারদিক থেকে উত্তাল তরঙ্গমালা ধেয়ে আসে, আর তারা নিশ্চিত ধারণা করে যে, এবার তারা ঘেরাও হয়ে পড়েছে, তখন তারা দ্বীনের প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহকে ডেকে বলে, 'আপনি আমাদের এ (বিপদ) থেকে বাঁচালে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো।'[১]
তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার মতো কিছু প্রয়োজন, কিছু উপকরণ আপনার মধ্যে তিনি সৃষ্টি করে রেখেছেন। আপনি যদি 'আল্লাহ্' বলে একবার ডাকেন, তাহলে আপনার ভেতরটা নিরাপত্তায় নিশ্চিন্ত হয়ে উঠবে। প্রয়োজনের কথা যদি ইচ্ছায় না বলেন, তবু অনিচ্ছায় হলেও আপনাকে বলতেই হবে। যদি আপনি 'ঈমানদার অবস্থায় না বলেন, তবে তা জোর করে হলেও অন্য অবস্থায় আপনাকে বলতে হবে। যদি সুখের সময় তাকে মনে না করেন, তাহলে কষ্টের সময় তাঁর নামেই আপনাকে চিৎকার করতে হবে।
কম্পাস
তাঁর কাছে ফিরে আসার জন্য আমরা কেন বিপদের অপেক্ষা করি? কেন বিপদই আমাদেরকে তাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়? সমস্যায় পড়লে তবেই কেন আমরা মাসজিদ পানে ছুটি?
আমাদের কি উচিত নয় বিপদ-আপদ সমস্যা ছাড়াও তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া?
এই যে সুস্থতা, 'ঈমান, নিরাপত্তা, সুখ ইত্যাদি তিনি আমাদের দিয়েছেন, তা কি পরিমাণে এতই কম যে, বিপদে পড়া ব্যতীত আমরা তাঁর প্রতি মাথা নত করব না? বিপদে না পড়লে, নিরাপদ থাকাকালে আমরা আল্লাহকে স্মরণ করবো না?
আপনার অন্তরের কম্পাসটাকে তাঁর দিকে ফিরিয়ে নিন। তারপর তাঁর দিকে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ছুটে যান। আপনাকে তাঁর কাছে পৌঁছতে হবেই। 'তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাও না কেন, সেদিকই আল্লাহ্র দিক।'
আপনি যদি সকালে একজনের বাড়িতে আশ্রয় চান, দেখবেন সকালে আপনাকে সে আশ্রয় দিলেও বিকেলে আপনার জন্য দরজা বন্ধ করে দেবে। সে আপনাকে একজনের বিপক্ষে সাহায্য করলেও স্বাভাকিভাবেই অন্যজনের বিপক্ষে সাহায্য না-ও করতে পারে। আজ কিছু দিলে আগামীকাল নাও দিতে পারে; কিন্তু আল্লাহ্ কক্ষনো এমনটা করবেন না।
هُوَ الْحَيُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَادْعُوهُ
তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তাই তাঁকে ডাকো।[১]
তিনি দিনে-রাতে সব সময় বান্দাকে দান করে যান। আপনি নির্যাতিত হলে তিনি আপনাকে সাহায্য করেন। তিনি কক্ষনো বান্দার প্রতি রাগান্বিত হয়ে নিজের দানের দরজা বন্ধ করেন না। তাঁর হাত দিন-রাত দান করে যায়। তিনি মহান দানশীল। এ জন্যই সকল সৃষ্টি তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে আছে। আপনি যদি কোনো প্রয়োজনে অন্য কারও প্রতি মুখাপেক্ষী হন, তাহলে ব্যর্থ মনোরথ নিয়েই আপনাকে ফিরতে হবে। কোনো সন্দেহ নেই।
অন্য কারও কাছে চাইলে সে হয়তো আপনার কথা শুনবে না, শুনলেও আপনার প্রয়োজন পূরণ করতে দেরি করবে; অথবা প্রয়োজন কিছুটা পূর্ণ করবে, কিছুটা থাকবে; অথবা প্রয়োজন পূর্ণ করে দেবে ঠিকই, তবে এক চামচ অপমানের সাথে; অথবা অপমানও করবে না, কিন্তু তবুও আপনি তার কাছে ছোট হয়ে যাবেন।
অন্তরটা কেবল তাঁর জন্যই রাখুন
অনেক আগে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পড়াশোনার একটি বিষয়ের ওপর লেখা জমা দেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম। যে ভদ্রলোকের কাছে লেখা জমা দিতে হবে, তার কাছে যখন আমার লেখার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গেলাম, তিনি বললেন, 'এত বেশি কথা বলার দরকার নেই।'
মানুষ চায় না, আপনি বিস্তারিত কিছু তাদের কাছে বলেন; কিন্তু আল্লাহ্র সামনে আপনি বিস্তারিত বলবেন, বেশি করে চাইবেন—এটাই আল্লাহ্ পছন্দ করেন। যে বান্দা আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চায়, তাকেই তো আল্লাহ্ ভালোবাসেন। তাহলে কেন আপনি তাঁকে ছেড়ে অন্য কারও কাছে চাচ্ছেন?
নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবন 'আব্বাস রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-কে বললেন—
إذا سألت فاسأل الله তুমি চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইবে [১]
যখনই আপনার কোনো কিছুর প্রয়োজন হবে, তখন তা যার কাছে চাইবেন-তিনি যেন আল্লাহই হন।
এক আল্লাহভীরু ব্যক্তি থেকে আবু হামিদ আল-গাযালী রাহিমাহুল্লাহ্ একটি কথা বর্ণনা করেছেন-যা আমার খুবই ভালো লেগেছে। সেখানে তিনি আল্লাহর মহান নামের ব্যাপারে বলছেন, 'আপনার অন্তরটি আপনি অন্য সব কিছু থেকে শূণ্য করে শুধু আল্লাহ্ জন্য রাখুন। তারপর তাঁকে যে নামেই ডাকবেন তিনি সাড়া দেবেন।'
এটাই মুখাপেক্ষিতার অর্থ। আপনার অন্তরে আল্লাহর নামটি সরব রাখুন। তারপর তিনি সন্তুষ্ট হন এমন কোনো কথা বলুন- যাতে থাকবে তাঁরই স্নেহের পরশ ও কোমল ছোঁয়া।
আপনার ওপর যখন কোনো বিপদ আসে, ধরে নিন সেটি কোনো চিঠি। এ চিঠি আপনাকে বলছে, 'আপনার একজন রব আছেন। তাঁকেই ডাকুন।'
আপনার অসুস্থতা একটি বার্তা, যেন আপনি আপনার রবের প্রতি বিনয়ী হতে পারেন। আপনার দারিদ্র্য একটা সংকেত, যেন সিজদায় আপনি তাঁর প্রতি নত হতে পারেন। আপনার দুর্বলতা আপনাকে বলছে, 'আপনি সর্বশক্তিমানের কাছে শক্তি চান।'
আপনার জীবনের সবকিছু চিৎকার করে আপনাকে বলে, আপনার একজন রব আছেন, তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হোন।
ইবনু 'আব্বাস রাযিয়াল্লাহু 'আনহুর উল্লিখিত হাদীসটিতে নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
তুমি আল্লাহ্ (বিধানসমূহের) রক্ষণাবেক্ষণ কর (তাহলে) আল্লাহ্ তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। তুমি আল্লাহ্ (অধিকারসমূহের) স্মরণ রাখো, তাহলে তুমি তাঁকে তোমার সম্মুখে পাবে [২]
আপনার অন্তরের গভীরে, চিন্তা-চেতনায়, কর্মকাণ্ডে তাঁকে ধারণ করুন। তাহলে তিনি আপনাকে সাহায্য, আনুকূল্য ও সমর্থন দিয়ে আপনার পাশেই থাকবেন।
এটি একটি বাস্তবতা যে, মুখাপেক্ষিতার কারণে বান্দার অন্তর ততক্ষণ প্রশান্ত হয় না যতক্ষণ না সে তার সকল বিষয় মহান আল্লাহর চিরস্থায়ী রাজত্বের দরবারে আনুকূল্য ও প্রশান্তি পাওয়ার জন্য পেশ করে।
কয়েক কদম
যেদিকে ইচ্ছে তাকান; তবে আপনার অন্তরে আলাদা দুটি চোখ রাখবেন, যে চোখ দুটি শুধু আল্লাহর-ই মাহাত্ম্য দেখবে।
যা ইচ্ছে বলুন; তবে আপনার অন্তরে একটা জিহ্বা রাখবেন, যেটি শুধু তাঁকে স্মরণ করেই কথা বলবে। সবার কথা শুনবেন, তবে অন্তরে একটি কান রাখবেন, যেটি শুধু তাঁর কথাই শুনবে।
যে পথে ইচ্ছে হাঁটতে পারেন; তবে অন্তরে অন্তরেও কয়েক কদম হাঁটুন, যে হাঁটার গন্তব্য হবে মহান রবের 'আরশ।
আপনার অন্তর, আত্মা, চিন্তা, দেহ, ইচ্ছা, ধ্যান-ধারণা—সবকিছুকেই তাঁর মুখাপেক্ষী করে তুলুন।
কখনো কলম হাতে নিলে মনে মনে বলুন, 'আমি এ কলম দিয়ে যা লিখবো তাতে কি আল্লাহ্ খুশি হবেন?'
কোনো কথা বলতে গেলে ভেবে নেবেন, 'আমি যা বলব তাতে কি তিনি সন্তুষ্ট হবেন?'
যে কোনো অবস্থায় উপনীত হওয়ার পর নিজেকে প্রশ্ন করবেন, 'আমার এ অবস্থাটা কি তাঁর কাছে পছন্দনীয়?'
একটা অদৃশ্য এলার্ম আপনার অন্তরের ভেতরে সেট করে দিন; যেটা বলেই চলবে, 'আল্লাহ্ কী চান, আল্লাহ্ কী চান, আল্লাহ্ কী চান?'
সর্বাবস্থায় তাঁর মুখাপেক্ষী হোন। মধ্যরাতে জেগে উঠলে তাকেই স্মরণ করুন। তাকে স্মরণ না করলে আপনার সব চিন্তাই যে বিফল। আপনার কল্পনায় যদি তার নামের ভালোবাসা জেগে না ওঠে যদি না থাকে তাহলে আপনার বিবেক নষ্ট। আপনার সব স্বপ্ন তখন গিরি-খাদের মতো হবে, যা একসময় আপনাকে বিপদে ফেলবে। তবে আপনার অন্তরে যখনই সেই চিরঞ্জীব সত্তার স্মরণ আসে তখন সেই স্বপ্নগুলো ভরে ওঠে গাছ, নদী ও পাখির কলরবে; পরিণত হয় এক অনাবিল সৌন্দর্যের ভূমিতে।
উত্থান
যদি আপনার আত্মাকে শিখিয়ে নিতে পারেন যে, ক্রমান্বয়ে কীভাবে তাঁর নিকটবর্তী হয়ে উঠতে হবে; দেখবেন, সে এক সময় দুনিয়াবী চাওয়া বেশি চাইতে লজ্জাবোধ করবে। কারণ, আপনাকে তো দুনিয়া চাওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। আপনার চাওয়া-পাওয়া সব তো 'আখিরাতকেন্দ্রিকই।
- একবার খলীফা কা'বা ঘর তাওয়াফ করতে গিয়ে ইবনু 'উমারকে বললেন, 'ইবনু 'উমার, আমার কাছে কিছু চাও তো।'
- তখন ইবনু 'উমার আল্লাহ্র প্রতি মুখাপেক্ষী এক উত্থিত মানুষের মতো খলীফার দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, 'দুনিয়াবী, না 'আখিরাতের বিষয়?'
- খলীফা বললেন, 'আখিরাতেরটা তো আল্লাহ্র নিকটই। আমার কাছে দুনিয়াবী কিছু চাও।'
- উত্তরে ইবনু 'উমার বললেন, 'দুনিয়ার মালিকের কাছেই দুনিয়া চাইনি, আর যে কিনা দুনিয়ার মালিক নয়, তার কাছে কীভাবে আমি দুনিয়া চাই?'
তো, আল্লাহ্র প্রতি মুখাপেক্ষিতা আপনাকে অপমানিত করবে না; বরং আপনার ব্যক্তিত্বকে মহান করে তুলবে। এইসব ধুলাবালির রাজাদের আপনি কখনোই পরোয়া করবেন না। দুনিয়া এমন একটা জিনিস-যার দিকে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী বান্দারা কখনো ফিরেও তাকায় না।
ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্-কে এক আমীর বলেছিলেন, 'আচ্ছা, শুনলাম, আপনি আমাদের রাজাকে খুঁজছেন?'
ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ্ মাথা উঁচু করে বললেন, 'আল্লাহ্র কসম, আমার কাছে আপনার এই রাজার দুই পয়সারও দাম নেই।'
যে লোক রাতের প্রান্তভাগে আল্লাহর দিকে মুখ ফেরায় সে কীভাবে দিনের প্রান্তভাগে এসে এক টুকরো মাটির মুখাপেক্ষী হয়ে নিজেকে লাঞ্ছিত করবে?
বাস্তবতা
যখনই আপনি আপনার প্রয়োজনে তাঁর মুখাপেক্ষী হবেন, তখনই আপনার প্রয়োজনটা হাতের নাগালে চলে আসবে। আল্লাহ্র পথে আসা ছাড়া আপনার কোনো ইচ্ছাই পূর্ণ হওয়া সম্ভব না। আল্লাহ্র আঙিনা ছাড়া আপনার কোনো প্রয়োজনেরই অস্তিত্ব নেই। আল্লাহ্র ইশারা ছাড়া কোনো কিছু ঘটার সম্ভাবনাও নেই। তিনি ছাড়া আর কেউই নেই—যার দ্বারা এই জগতে কোনোকিছু ঘটতে পারে।
তাঁর শক্তি ও ইচ্ছা ছাড়া একটি কোষও নড়তে পারে না, একটি অণুও জন্মাতে পারে না, পানির একটি ফোঁটাও বাষ্পে পরিণত হতে পারে না, গাছের একটি পাতাও ঝরে পড়তে পারে না।
আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করলে সকল সৃষ্টি মিলে আপনার এক তিল পরিমাণ ক্ষতি যেমন করতে পারবে না, তেমনই আল্লাহ্ যদি আপনার ক্ষতি চান তাহলে সকল সৃষ্টি মিলে আপনাকে কোনোভাবেই সেই ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারবে না।
তাই আল্লাহ্র কাছেই ফিরে আসুন। তাঁর কাছে আশ্রয় চান, আপনার দায়িত্বটা তাঁর হাতে ছেড়ে দিন। তিনিই তো সেই অমুখাপেক্ষী প্রভু—যিনি জন্ম নেননি, এবং কাউকে জন্ম দেননি। তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই।
হে আল্লাহ্, আপনি আমাদের অন্তরকে আপনার মুখাপেক্ষী করে দিন। আমাদের মনকে এমন করে দিন—যেন আমরা কেবল আপনার কাছেই হাত পাতি, আপনার দরবারেই শুধু ধরনা দিই। আপনি ছাড়া আর কোনো সৃষ্টির কাছে যেন আমরা সাহায্য না চেয়ে বসি।
টিকাঃ
[১] সূরা ইখলাস, ১১২: ১-২
[১] তিরমিযী, ৩৮২০-১২/৪৫২
[১] সূরা আন'আম, ৬ : ৯১
[১] সূরা ইউনুস, ১০ : ২২
[১] সূরা মু'মিন, ৪০: ৬৫
[১] তিরমিযী, ২৫১৬
[২] তিরমিযী, ২৫১৬
📄 আল-হাফীয তথা মহারক্ষক
আমরা এন্টিস্লিপ, গাড়ির ব্রেক, প্রতিরক্ষামূলক বেলুন আর সিটবেল্টের উপকারিতা জানি ঠিকই; কিন্তু আমাদের কী দুর্ভাগ্য, এর সক্ষমতা-অক্ষমতা— সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে আমরা ভুলে যাই!
আল-হাফীয তথা মহারক্ষক
যদি অনুভব করেন, আপনার জীবনে বিপদ নেমে আসছে, রোগ আপনার স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আপনার ছেলেটি আপনার থেকে দূরে আছে; আর আপনি তাকে হারিয়ে ফেলার ব্যাপারে শঙ্কিত, অথবা খারাপ সঙ্গীর সাথে মিশে তার বখে যাওয়ার আশঙ্কা করেন; অথবা আপনি মনে করতে পারেন, আপনার জমানো সম্পদ আস্তে আস্তে শেষ হতে শুরু করেছে; তাহলে জেনে রাখুন, আল্লাহ্র 'আল-হাফীয' তথা 'মহারক্ষক' নামটি আপনার জানা দরকার। এই মহান নামের স্পর্শে আপনার 'ঈমানকে নবায়ন করা প্রয়োজন। আপনার জন্য এই নাম নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করার এখনই সময়।
একমাত্র তিনিই আপনার জীবন রক্ষা করবেন, আপনার স্বাস্থ্য রক্ষা করবেন, আপনার সন্তানদের রক্ষা করবেন আর রক্ষা করবেন আপনার সহায়-সম্পত্তি। বস্তুত আপনার জীবনের সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণকারী একমাত্র তিনিই।
হে আত্মা, প্রশান্ত হও
বিখ্যাত মুফাস্সির শাইখ আব্দুর রাহমান আস-সা'দী রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন, 'মহারক্ষক তো তিনি, যিনি তাঁর সব সৃষ্টিকে রক্ষা করেন। তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার সবকিছুর ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের গুনাহ ও ধ্বংসাত্মক কাজে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করেন। সর্বাবস্থায় নিজ দয়ায় তাদের আচ্ছাদিত করে রাখেন।'
সংরক্ষণের সর্বশেষ পর্যায় তাঁর কাছেই এবং শ্রেষ্ঠ তত্ত্বাবধান তাঁরই। তিনি সাথে থাকলেই আপনি পূর্ণ প্রশান্তি লাভ করবেন।
اللهم احفظني من بين يدى ومن خلفي وعن يميني وعن شمالي ومن فوق وأعوذ بعظمتك أن أغتال من تحتى
আল্লাহ্, আমাকে আপনি রক্ষা করুন সামনের, পেছনের, ডানের, বামের ও উপরের দিক থেকে। আর আমি নিম্নমুখী গুপ্তহত্যার শিকার হওয়া থেকে আমি পানাহ চাই।[১]
আপনি তাঁর কাছে ছয় দিকের বিপদ-আপদ থেকে আশ্রয় চান। আপনি চাইবেন, সংরক্ষণের একটি গোলক যেন আপনাকে সবদিক থেকে ঘিরে রাখে। আর এ ব্যাপারে শুধু আল্লাহই সক্ষমতা রাখেন।
তিনি আপনার চোখ-কান রক্ষা করেন। আর এই রক্ষণাবেক্ষণের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমরা তাকে দিনে-রাতে ডেকে যাই।
اللهم عافني في سمعي، اللهم عافني في بصرى
আল্লাহ্, আমার কানের নিরাপত্তা দিন। আল্লাহ্, আমার চোখের নিরাপত্তা দিন [১]
আপনার চোখ-কান হারালে আপনি এ সৃষ্টিজগত চেনার যন্ত্রই হারিয়ে ফেলবেন। এক বিশাল অন্ধকার জগতে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবেন। ভয়ঙ্কর নীরবতা দিয়ে দুনিয়া আপনাকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলবে।
قُلْ أَرَعَيْتُمْ إِنْ أَخَذَ اللَّهُ سَمْعَكُمْ وَأَبْصَرَكُمْ وَخَتَمَ عَلَى قُلُوبِكُم مَّنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِهِ الانعام
আপনি বলুন, বলো তো দেখি, যদি আল্লাহ্ তোমাদের কান ও চোখ নিয়ে যান এবং তোমাদের অন্তরে মোহর এঁটে দেন, তবে আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের এমন কোন উপাস্য আছে, যে তোমাদের এগুলো এনে দেবে?[২]
মহান রক্ষক তো তিনিই, যার দেওয়া কান দিয়ে আপনি হারাম শোনেন। অথচ মুহূর্তের মধ্যে তা অক্ষম করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আপনাকে তা ব্যবহার করার সুযোগ দেন।
মহান রক্ষক তো তিনিই, যার দেওয়া চোখ দিয়ে আপনি হারাম দেখেন। অথচ ক্ষণিকের মধ্যে তাঁর দৃষ্টি কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আপনাকে তা ব্যবহার করার সুযোগ দেন।
তিনি আপনার দ্বীনেরও সংরক্ষক। আর এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আপনি সিজদায় গিয়ে বলবেন, হে অন্তরসমূহ ও দৃষ্টিসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন।
ভ্রান্তির পথগুলো তিনি যদি আপনার অন্তরকে দ্বীনের ওপর অটল না রাখতেন তাহলে সন্দেহের পশুগুলো আপনার দ্বীনকে খাবলে খেত, প্রবৃত্তির ষন্ডারা আপনার দ্বীনকে অপহরণ করত।
এমন অনেক 'আলিম আছেন যারা বইপত্রের মাঝে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু আল্লাহ্ তাদের বিশ্বাস বিশুদ্ধ করতে চাননি। তাই তারা শেষ বয়সে আল্লাহকে অস্বীকার করে বসে; বিদ'আতে লিপ্ত হয়; কিন্তু দেখুন, কত সামান্য 'আমাল নিয়েও আপনি তাঁকে সিজদা করতে পারছেন। এভাবেই মহারক্ষক আল্লাহ্ আপনার দ্বীন সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
'ইলম থাকা সত্ত্বেও যারা অপদস্থতার শিকার হয়েছে, এমনই একজন 'আলিম, নাম তার 'আব্দুল্লাহ্ আল-কাসিমী। দ্বীনের জন্য তিনি একটি বই রচনা করেছিলেন। বইটির নাম আস-সিরা বাইনাল ইসলাম ওয়াল ওয়াসানিয়্যাহ। তার এই বই নিয়ে কেউ কেউ বাড়িয়ে বলতে গিয়ে বলেন, 'তিনি জান্নাতের মোহরানা দিয়ে দিয়েছেন'। হারাম শরীফের মিম্বরে পর্যন্ত তার প্রশংসা করা হয়েছিল; কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে তার মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। (এমন ফিতনা থেকে আল্লাহ্ আমাদের রক্ষা করুন)। তার মনে সন্দেহ দানা বাধতে থাকে। তারপর তার ধারনাকৃত সেই সন্দেহগুলো একদিন তত্ত্বে রূপ নেয়, বাস্তব চিন্তায় পরিণত হয়। এরপর সেই ভ্রান্তির বেড়াজালে, সন্দেহের ধ্বংসস্তূপে ভর করে সে কলম ধরে ইসলামকে আক্রমণ করে; একটি বইও লিখে ফেলে হাযিহি হিয়াল আগলাল নামে। সেখানে সে দাবী করে বসল, 'আল্লাহর এই দ্বীন এখন শিকল ও জেলখানায় পরিণত হয়েছে।' আমরা আল্লাহ্র কাছে এ রকম লাঞ্ছনা থেকে পানাহ চাই।
মহারক্ষক তো তিনিই, যিনি আপনার দ্বীনকে সংরক্ষণ করেন। আপনার মাথায় জমে থাকা জ্ঞানের স্তূপ সংরক্ষণ করার কোনো দরকার তাঁর নেই। আপনার উচিত জ্ঞান নিয়ে অহংকার না করা। কুর'আন মুখস্থ করেছেন-এ নিয়ে গর্বের কিছু নেই। নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু হাদীস মুখস্থ বলতে পারেন-এ নিয়ে কীসের বড়াই! আল্লাহ যদি দয়া করে আপনার দ্বীনকে সংরক্ষণ না করেন তাহলে আপনি নির্ঘাত বিভ্রান্তিতে নিপতিত হবেন। এই যে বাল'আম ইবনু বাউরা [১]-কে আল্লাহর মহান নামের (ইসমে আ'যম) জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, যেন যে কোনো সময় তাকে তাঁর নামে ডাকলেই তিনি সাড়া দেন। এই মহান নাম তাকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে পারল না। সে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিল।
আমরা আল্লাহকে ভুলে যাই
তিনি আপনার জীবন রক্ষা করেন। এ জন্যই প্রিয়জনদের থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আমরা বলি-
أستودعك الله الذي لا تضيع ودائعه
আপনাকে সেই আল্লাহ্র কাছে আমানত রাখছি, যার আমানতগুলো হারিয়ে যায় না। [১]
যে আমানت আল্লাহ্র সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় রয়েছে তা হারানো যে অসম্ভব।
কোনো দুর্ঘটনায় যদি কোনো মানুষ বেঁচে যায় তাহলে তার পেছনে অবশ্যই একজন সংরক্ষণকারী থাকেন-যিনি তাকে বাঁচান। আমরা এন্টিস্লিপ, গাড়ির ব্রেক, প্রতিরক্ষামূলক বেলুন আর সিটবেল্টের উপকারিতা জানি ঠিকই; কিন্তু আমাদের কী দুর্ভাগ্য, এর সক্ষমতা-অক্ষমতা-সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে আমরা ভুলে যাই!
সাগরের ঢেউতরঙ্গ যখন জাহাজে আঘাত হানে, হৃৎপিণ্ডটা যখন ভয়ে বুক পর্যন্ত উঠে আসে, তখন কে সলিল সমাধি হওয়া থেকে জাহাজটা রক্ষা করেন?
একটি ভিডিওতে দেখেছিলাম, সাগরের উন্মত্ত ঢেউ খেলা করছে একটা জাহাজ নিয়ে। জাহাজের লোকজন দ্রুত একপাশ থেকে অন্য পাশে ছুটে যাচ্ছে। তাদের তখন কিছুই করার নেই। এমনকি স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিও লোপ পেয়েছে। তাদের মাথায় যে একটা জিনিস আছে তা হলো, কোনো কিছু আঁকড়ে ধরে জীবন রক্ষা করা। তারপর যখন ক্যামেরাটা আরও দূর থেকে তাক করা হলো, তখন বিশাল সমুদ্রের প্রমত্ত ঊর্মিমালার মাঝে জাহাজটাকে মনে হলো ছোট্ট এক টুকরো কাগজ।
বিমানের পাইলট যখন ঘোষণা করে, বিমানে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তখন যাত্রীরা সবাই পরম ভক্তির সাথে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকে। সবাই আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় চেয়ে তাওবার ঘোষণা দেয়। জীবনের সব আশা-ভরসা, স্বপ্ন-চিন্তা ভুলে যায়। তাদের বিবেক-বুদ্ধি তখন শুধু মৃত্যুর কথাই চিন্তা করে।
কে তিনি, যিনি তাঁর মহান ক্ষমতায় বিকল বিমান সচল করে দিয়েছেন? যারা ভয়ে কুঁকড়ে ভূত হয়ে গিয়েছিল-কোন সত্তা তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় বের করে এনেছেন?
একবার একটি বিমানের যাত্রী ছিলাম আমি। হঠাৎ প্রবল বায়ুচাপের সম্মুখীন হলো বিমানটি। যখন বিমানের অবস্থা আমি বুঝতে পারলাম যে, সেটি বিরাট মরুভূমির বুকে সাঁতার কেটে চলেছে, সাথে সাথে একরাশ ভয় আমাকে ঘিরে ফেলল। জীবনে এত ভ্রমণ করেছি। সেখানে তো আকাশের বুকে বিমানের এই দুর্বল অবস্থানের ব্যাপারে আমি সচেতন ছিলাম না। আল্লাহ্র অশেষ ক্ষমতায় কীভাবে এটা আকাশে ভেসে বেড়ায়-কখনো তা আমি ভেবেও দেখিনি।
সাগরঝড়ে প্রবল ঢেউয়ে জাহাজ হলো টালমাটাল, নিবিড়ভাবে তাকেই তখন যাচ্ছি ডেকে, সমানতাল। ঝড়ের শেষে নিরাপদে পৌঁছি যখন তীরে, এক নিমিষেই ভুলি তাকে খেল-তামাশায় ফিরে। মাঝ আকাশে উড়ছি যখন মুক্ত বাধাহীন, যাই না পড়ে, রক্ষা করেন রব্বুল 'আলামীন।
প্রহরীরা
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
لَهُ مُعَقِّبَتٌ مِّنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ، يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ !
মানুষের জন্য রয়েছে তার সামনে-পেছনে একের পর এক আগমনকারী প্রহরী; তারা আল্লাহ্র আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে।[১]
শুধু আপনার জন্যই মহারক্ষক আল্লাহ চারজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে রেখেছেন। আপনাকে তারা সবদিক থেকে ঘিরে রাখে। আপনার তাকদীর অনুযায়ী সবকিছু যেন সম্পন্ন হয়, আল্লাহ্র নির্দেশে সে জন্য আপনাকে তারা ঘিরে রাখে।
তিনিই তো মহারক্ষক। তিনি আপনার জন্য এত পরিমাণ ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন, যেন তিনি না চাইলে একটা বুলেটও আপনাকে আঘাত করতে না পারে, কোনো পাথরের আঘাতে যেন আপনি শেষ হয়ে না যান, এমনকি একটি মশাও যেন আপনার ত্বক স্পর্শ করতে না পারে।
শাইখ 'আয়য আল-কারনীকে ফিলিপাইনে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সেই ভিডিওটা আমি বিস্ময়ের সাথে দেখেছি। এক মিটার দূরত্ব থেকে আততায়ী শাইখের দিকে ছয়টা বুলেট শুট করল। এই বুলেট আর শাইখের মাঝে কোনো প্রতিবন্ধক ছিল না। আততায়ীকে বেশ ধূর্ত মনে হলো। শাইখ বা তার সহকারীরা প্রতিহত করারও সুযোগ পাননি; কিন্তু এরপরও শাইখ সুস্থ অবস্থায় সেখান থেকে বের হলেন। আমার মনে পড়ে, অনেক দূর থেকেও একটা মাত্র বুলেট আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির জীবন কেড়ে নেয়। অথচ তখন তার গাড়ি ধীর গতিতে সামনে চলছিল। চারপাশে প্রচুর সেনাবাহিনীর সদস্যও ছিল তার নিরাপত্তায়।
পরে শাইখ বলেছিলেন, আক্রমণের সময় তিনি আল্লাহ্র স্মরণে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি নিজেকে দু'আ-র প্রাচীর দিয়ে বেষ্টন করে রেখেছিলেন।
এই ঘটনাটি একটি পরিপূর্ণ পাঠের অংশ। শুধু তাই নয়, এ ধরনের ঘটনা সম্বলিত কয়েক খণ্ডের একটি বই রচিত হতে পারে, যে বই 'হাফীয' (মহারক্ষক) নামের বর্ণনায় পূর্ণ থাকবে।
বন্ধনীর মাঝে..
আপনি কি জানেন, তিনি সবসময়ই আপনাকে রক্ষা করে থাকেন, নানামুখী আক্রমণ থেকে প্রতি মুহূর্তেই আপনাকে তিনি বার বার বাঁচিয়ে থাকেন?
কীভাবে?
এই যে লেখাটি পড়ছেন, এরই মধ্যে তিনি আপনার হৃৎস্পন্দন থেমে যাওয়া, আপনার শিরা-উপশিরায় রক্ত জমাট বাঁধা, বিবেকের উন্মাদনা, কিডনি নষ্ট হওয়া, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিনষ্ট হওয়া, মাথাব্যথা, পাকস্থলীর সমস্যা, কোনো অঙ্গ বিকল হওয়া, চোখ অন্ধ হওয়া, শ্রবণশক্তি চলে যাওয়া, জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া-এ সব থেকে তিনি আপনাকে বাঁচিয়েছেন। এর পরের মুহূর্তের পরের মুহূর্তটাও আপনাকে তিনিই বাঁচিয়ে রাখেন। তার প্রতিরক্ষা আপনার জন্য এভাবেই চলছে..
বলুন তো, এই স...ব কিছুর জন্য প্রতি মুহূর্তে আমাদের ঠিক কয়বার 'আলহামদু লিল্লাহ্' পড়া উচিত?
একটি বোতল
অন্ধকারে অচেনা-অজানা কোথাও আপনার গাড়ি থামানোর পর যদি ভয় পান যে সেটি চুরি হয়ে যাবে, তাহলে মহারক্ষকের হাতে তা সংরক্ষণের ভার দিয়ে দিন। যা কিছু আল্লাহকে রক্ষা করতে দিয়েছেন তা আপনি কক্ষনো হারাবেন না।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তিত হলে বলবেন- أستودعكم الله الذي لا تضيع ودائعه 'আমি সেই আল্লাহ্র কাছে তোমাদের আমানত রেখে যাচ্ছি-যার নিকট গচ্ছিত আমানত হারায় না।'
ফিরে এসে দেখবেন, তারা ভালো অবস্থাতেই আছে। কারণ, তিনি যে মহারক্ষক।
যদি কখনো পাবলিক প্লেসে অথবা অনিরাপদ কোনো জায়গায় দামী কিছু রেখে যেতে বাধ্য হন, তাহলে অন্তর থেকে বলুন, 'আল্লাহ্, আপনি রক্ষা করুন।' নিশ্চিত থাকুন, আপনার ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহ্ তা রক্ষা করবেন।
চার বন্ধু তাবুক থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে 'নিমাতৃ রাইত' নামে এক জায়গায় বেড়াতে গেল। সকাল নয়টায় তারা পায়ে হেঁটে 'শুক' নামক এক স্থানে পৌঁছল। এই 'শুক' এক গভীর খাদ। সেখানে নামার মানে হলো, জীবনের মায়া ত্যাগ করে সেটি বিলিয়ে দেওয়া। কারণ, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি গর্ত।
অ্যাডভেঞ্চারের নেশা তাদের পেয়ে বসল। তারা আধঘণ্টার মধ্যে ওই খাদের তলানিতে পৌঁছে গেল। মাগরিব পর্যন্ত তারা উপরে ওঠার চেষ্টা করল। পাথরগুলো আঁকড়ে ধরল; কিন্তু মসৃণ পাথরখণ্ডে তারা বার বার পিছলিয়ে পড়ে যেতে লাগল। পায়ের নিচের পাথরখণ্ড ভেঙে যেতে লাগল। পরে এমন একটা সরু জায়গা বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল—যেখানে পায়ের আঙুলেরও জায়গা হয় না।
এভাবে চেষ্টা করতে করতে তারা একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তাদের পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। এক তীব্র পিপাসায় তারা পরাজিত হয়ে পড়ল। সোজা কথা, চোখের তারায় সাক্ষাৎ মৃত্যু দেখতে পেল তারা।
তবে তাদের অন্তরগুলো ছিল আল্লাহ্র সাথে সম্পৃক্ত। তারা দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো রক্ষাকারী নেই। তাদের মধ্যে একজন (বাকিরাও সাক্ষ্য দেয়) আল্লাহ্র কাছে বিনয়াবনত হয়ে চাইল। পিপাসায় বুকের ছাতিটা তখন ফেটে যাচ্ছে, মৃত্যু-কামনার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, এখানে কোনো মানুষ কখনো পা রেখেছে, এমন সম্ভাবনা একেবারেই—নেই এ অবস্থায় হঠাৎ তাদের মধ্যে একজন একটি পানির বোতল দেখতে পেল। বোতলটি পরিষ্কার ও স্বচ্ছ টলটলে পানিতে পরিপূর্ণ। এই পানি বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি করে পান করার যে আনন্দ, তাদের নিকট এর চেয়ে বেশি আনন্দের ব্যাপার ছিল এই, আল্লাহ্ ওই সময় তাদের সাথে ছিলেন। আল্লাহ্-ই এই বোতলটা তাদের জন্য ওই সময় পাঠিয়েছিলেন। তাদের রক্ষা করেছিলেন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে।
এই বোতলটি শুধু মৃত্যু থেকে বাঁচার চিহ্ন না, এটা মহারক্ষকের হিফাযতের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ওই যুবকরা আবার উপরে ওঠার চেষ্টা করতে থাকে। এভাবে মাগরিবের পূর্বমুহূর্তে তারা ছাদে পৌঁছে যায়। ততক্ষণে তাদের মুখগুলো কালো রং ধারণ করেছে। পোশাক ছিন্নভিন্ন। পা থেকে রক্ত ঝরছে। তবে আল্লাহ্র প্রতি তাদের 'ঈমান তখন পাহাড়সম।
কিছু চোখ ঘুমিয়ে পড়ে আবার কিছু চোখ জেগে থাকে। এমন সব বিষয় নিয়ে অনেকে ব্যস্ত থাকে, যা হতেও পারে আবার না হতেও পারে। যে রব গতকাল আপনার জন্য যথেষ্ট ছিলেন তিনি আগামীকালও আপনার জন্য যথেষ্ট হবেন।
অনেক অনেক বেশি
মহারক্ষকের সাথে প্রতিটি সৃষ্টিরই একটা সম্পর্ক আছে। সৃষ্টি করার পরই তিনি সৃষ্টিকুলকে ছেড়ে দেননি; বরং জীবনের নতুন নতুন ধাপের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তাদেরকে তিনি অস্ত্র-সজ্জিত করে দেন। তিনি জীবনযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার জন্য প্রত্যেক সৃষ্টজীবকে তার উপযুক্ত তরবারি দিয়ে সুসজ্জিত করেন।
দ্রুত দৌঁড়ানোর সক্ষমতা দিয়ে কিছু প্রাণীকে তিনি অন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন। যেমন: হরিণ, খরগোশ।
কেউ ক্ষতি করতে চাইলে তাকে আক্রমণ করে ফেঁড়ে-চিরে দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা দিয়েছেন ষাঁড় আর গণ্ডারকে।
কিছু প্রাণীকে দীর্ঘদেহ দিয়ে রক্ষা করেন তিনি অন্য প্রাণী থেকে। সে তার বিশাল দেহ দিয়ে শত্রুকে মাড়িয়ে চলে। যেমন: ভাল্লুক আর হাতি।
কিছু প্রাণী আছে যারা বৈদ্যুতিক সংকেত দিয়ে নিজেদের রক্ষা করে। তাদেরকে যেই স্পর্শ করে সেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। যেমন: বৈদ্যুতিক ইল ফিশ।
কিছু প্রাণী আবার নিজেদের শরীরে বিষ তৈরি করে আত্মরক্ষা করে। যেমন: সাপ-বিচ্ছু। এভাবেই তিনি তাঁর সৃষ্টিকুলকে রক্ষা করেন। আর মানুষ জানে না এমন কত প্রাণীকে তিনি রক্ষা করেন-তার সংখ্যা নিরূপণ করা অসম্ভব ব্যাপার।
তিনি আপনাকে রক্ষা করেন
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যে মু'মিন বান্দাদের হিফাযত করেন তার একটা চিত্র হলো-
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ ءَامَنُوا
নিশ্চয় আল্লাহ্ 'ঈমানদারদের রক্ষা করেন।[১]
একবার ভেবে দেখুন, তিনি যে 'ঈমানদারদের যাবতীয় বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন কেবল তা নয়; বরং তাদের হয়েই তিনি তাদের রক্ষা করেন। এতেই বোঝা যায়, তারা কত ভয়াবহ ও বিবিধ সমস্যার মুখোমুখি হবে; কিন্তু আল্লাহ্ তো জানেন, তাদের শত্রুরা কী পরিকল্পনা করেছে। তাই তিনি তার প্রিয় মু'মিন বান্দাদের হিফাযতের দায়িত্ব নেন, যাবতীয় ক্ষতি থেকে তাদের দূরে রাখেন।
হাদীসে কুদসীতে [১] আছে— যে আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুতা করবে তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধের ঘোষণা দিই। [২]
একবার কল্পনা করুন, সত্য দ্বীনের দা'ওয়াতের শত্রুর সাথে আল্লাহ্র যুদ্ধ। কে বিজয়ী হবে আর কে পরাজিত? কে হবে লাঞ্ছিত?
তিনি তাঁর মু'মিন বান্দাদের হিফাযত করেন। তাদেরকে বিশেষভাবে রক্ষা করেন। ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও দয়া দিয়ে তাদের ঘিরে রাখেন।
কুরাইশের মুশরিকরা একটা গুহার কাছে একত্র হলো। গুহার ভেতরে মাত্র দুইজন মানুষ—রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবূ বাক্ আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু 'আনহু। তাদেরকে হত্যার জন্য ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থপুরস্কার ঘোষণা করা হয়ে গেছে। মুশরিকদের ভেতর একটা চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। ওই সময়ের সবচেয়ে দামী ব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারা এবং তার নাম-নিশানা বিলীন করে দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাদের ভেতর।
আবু বাক্স আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু 'আনহু-র অন্তরের কোণে ভয়ের নীরব প্রবেশ। মহান সাথী তার দিকে ভরসার চোখে তাকালেন; জিজ্ঞেস করলেন, 'আবূ বাক্স, তোমার কী মত সেই দু'জনের ব্যাপারে—যাদের মধ্যে তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ্? আবু বাক্স, তুমি কি মনে করো যে, আমরা দুইজনই? না, আমরা তো তিনজন।'
মুহূর্তের মধ্যে ভয়ের জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কাঁপাকাঁপি থেমে গেল। দুর্ভাবনা কেটে গেল।
আপনি যদি তাঁর সংরক্ষণের অধীন হয়ে যেতে পারেন, তবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন; কারণ, সব ভয়াবহ ব্যাপারই তখন নিরাপদ।
খেয়াল করুন, যেসব যুবক গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল—তাদের কথা।[১] তারা আল্লাহ্র কাছে হিদায়াত চেয়েছিল। আল্লাহ্ তাদের আশ্রয় দিলেন দুয়ার বিহীন একটি গুহায়। সেটি ছিল মানুষ, পশু আর পোকামাকড়ের জন্য উন্মুক্ত; কিন্তু রাহমান তাদের রক্ষা করতে চান, এজন্য তিনি সেখানে পাহারাদারির জন্য সৈন্য দাঁড় করিয়ে দিলেন। এ সৈন্যের নাম 'ভয়'। ভয়ে কেউ আর সেই গুহার আশেপাশেই আসত না। কেউ ভুল করে কাছে কিনারে এসে পড়লে ভয়ে পালাত :
যদি আপনি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখতেন, তাহলে আপনি অবশ্যই পেছন ফিরে পালিয়ে যেতেন। আর অবশ্যই আপনি তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তেন।[২]
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
سَأُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ
খুব শীঘ্রই আমি কাফিরদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করবো।[৩]
তাঁর বান্দাদের জন্যই তিনি কাফিরদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করেন। সেজন্য কাফিররা সবসময় আল্লাহ্র বন্ধুদের ভয়ে ভীত থাকে।
হিংস্র পশুর উপত্যকা
আল্লাহ্ আপনাকে ফেরেশতা দিয়ে রক্ষা করবেন। যে ব্যক্তি ঘুমানোর আগে 'আয়াতুল কুরসী' পড়বে তার জন্য আল্লাহ্ এমন একজন ফেরেশতা তার মাথার কাছে নিযুক্ত করবেন যে তাকে রক্ষা করবে।
আল্লাহ্ যদি আপনার সাথে থাকেন তাহলে কীসের ভয়?
'আল-হাফীয' তথা 'মহারক্ষক' এই নামটা আপনাকে বুক উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস যোগায়। আপনাকে তাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়, যিনি চিরঞ্জীব। যিনি মৃত্যুবরণ করেন না। আপনি যখন অন্ধকারে হেঁটে চলেন, যখন আপনি হিংস্র পশুর উপত্যকা পেরিয়ে যান, কুমিরপূর্ণ নদী যখন আপনি পার হন তখন মহারক্ষক আপনাকে সবসময়ই সংরক্ষণের একটা বলয় দিয়ে ঘিরে রাখেন। তখন বিপদের আয়োজনগুলো আপনার কাছে নিতান্তই সামান্য বস্তুতে পরিণত হয়ে পড়ে।
এর মানে এই না যে, আল্লাহ রক্ষা করছেন—এই দোহাই দিয়ে আপনি নিজেকে হিফাযতের কোনো মাধ্যম/উপায় গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখবেন; বরং মাধ্যম গ্রহণের জন্য আমাদের তো আদেশই দেওয়া হয়েছে। হিজরত, যুদ্ধসহ সবসময়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাধ্যম গ্রহণ করেছেন। সুতরাং মাধ্যমের গুরুত্ব তো থাকবেই এবং একই সাথে আপনার অন্তরে আল্লাহ্র অবস্থান থাকবে মহাজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান ও মহারক্ষকরূপে।
আফ্রিকায় দা'ওয়াতের কাজ করার জন্য 'আব্দুর রাহমান আস-সুমাইত সফর করেছেন। সেখানে দা'ওয়াত দিয়েছেন, দ্বীন প্রচার করেছেন, পথে গিরি-উপত্যকা পার হয়েছেন, ক্ষুধা-পিপাসা, অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছেন—এরপরও তার যে স্বাচ্ছন্দ্যে দা'ওয়াতী কাজ করতে পারা এবং দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে এ কাজে অগ্রসর থাকা এবং অবশেষে কুয়েতে নিজ বাড়ির বিছানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা—এগুলো কেউ যদি চিন্তা করে, তাহলে বুঝবে, আল্লাহ্র 'আল-হাফীয' তথা মহারক্ষক নামের মহিমা কী!
এ ব্যাপারে আরেকটা ঘটনা উল্লেখ করা যাক। এটা আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দাদের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর কিছু না। সা'ঈদ ইবনু জুবাইর রাহিমাহুল্লাহ-কে হাজ্জাজের দুইজন সৈন্য ধরে ফেলল। তারা তাকে হাজ্জাজের কাছে নিয়ে যেতে লাগল। পথে বৃষ্টি নেমে এলে তারা এক পাদ্রীর গির্জায় আশ্রয় নিল; কিন্তু সা'ঈদ সেখানে প্রবেশ করতে কিছুতেই রাজি হলেন না। যে জায়গায় বিভ্রান্তিমূলক পদ্ধতিতে আল্লাহর উপাসনা করা হয় সেখানে প্রবেশে কোনোভাবেই তাকে সম্মত করা গেল না। তারা তাকে রেখেই গির্জায় ঢুকে পড়ল। এ সময় একটা সিংহ তার কাছে এলো। ভেতর থেকে হাজ্জাজের সৈন্যরা চিৎকার করে বলল, 'আপনি পালান, আপনি পালান।' কিন্তু সা'ঈদ একটুও না নড়ে আপন জায়গায় বসে রইলেন। বসে বসে যিক্রে নিমগ্ন হলেন। সিংহ এবার তাঁর আরও কাছে চলে এলো। এবার সা'ঈদের কানের কাছে এসে যেন ফিসফিস করে কিছু বলল। দুই সৈন্য ভয়ে জবুথবু হয়ে তাকিয়ে রইল সা'ঈদের দিকে। পাদ্রীও অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বললেন, 'এ ব্যক্তি তো আল্লাহ্র এক খাঁটি বান্দা।'
থাকো তোমরা দুনিয়া নিয়ে আমাকে রাখো মুক্ত-স্বাধীন। তোমাদের মধ্যে আমিই ধনী যদিও আমি সহায়-সম্বলহীন।
শেষ মুহূর্তে হিংস্র সিংহটাকে থামিয়েছিলেন কে? তিনি তো সেই মহারক্ষক প্রভু।
আমি দরিদ্র
ইউটিউবে একটা ভয়াবহ ভিডিও দেখলাম; এক লোক হেঁটে রেললাইন পার হচ্ছে। ট্রেনটা বেশ দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে। তবে লোকটা যথাসময়ে ওই পাশে চলে যাবে এমন একটা ভাব নিয়েই এগোচ্ছে।
হঠাৎ করে তার পা আটকে গেল রেললাইনের সাথে। সে পা ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে; কিন্তু সরছে না। এদিকে ট্রেনও এগিয়ে আসছে প্রবল গতিতে। মৃত্যুর ভয়ে সে জোরে চিৎকার করে উঠল। মরার আগেই ভয়ে সে মরে যাচ্ছে এমন অবস্থা। ট্রেন আর তার মাঝে দূরত্ব যখন মাত্র কয়েক মিটার বাকি, তখন আল্লাহ্ লাইনের লোহার পাতকে লোকটির পা বের করার অনুমতি দিলেন। লাইন থেকে পা ছাড়িয়ে লোকটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল।
আপনার দুর্বলতার ওপর ভরসা রাখুন, আপনি যে কত ক্ষুদ্র সেটা বিশ্বাস করতে শিখুন। দারিদ্র্যের ওপর নির্ভর করুন। তারপর আপনার অন্তরকে আল্লাহমুখী করে ফেলুন আর বলুন-
আমি সৃষ্টিকূলের প্রভুর কাছে দরিদ্রের মতো চাই। আমি চাই সর্বাবস্থায়ই নিঃস্ব।
হযরত লূত 'আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় ছিল জঘন্য পাপাচারী। একদিন তারা জোরপূর্বক লূত 'আলাইহিস সালামের ঘরে ঢুকে পড়ল এবং তার অতিথিদের জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। অথচ অতিথি ছিলেন ফেরেশতারা। আচ্ছা, আপনার ঘরের অতিথি যদি আপনার সম্প্রদায়ের সবচেয়ে পাপী লোকগুলোও হয় এবং তাদেরকে কেউ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় তাহলে সেটা কত বড় লজ্জার ব্যাপার হবে, ভেবে দেখুন তো; অধিকন্তু সেখানে অতিথি ছিলেন পবিত্রতম ফেরেশতাগণ। লুত 'আলাইহিস সালাম তখন দুর্বল কণ্ঠে বললেন-
لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ ءَاوِي إِلَىٰ رُكْنٍ شَدِيدٍ ۞
তোমাদের বিরুদ্ধে যদি আমার শক্তি থাকত অথবা আমি কোনো সুদৃঢ় আশ্রয় গ্রহণ করতে সক্ষম হতাম।[১]
নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম লূত 'আলাইহিস সালামের এই অসহায় উক্তি সম্পর্কে বলেন, 'আল্লাহ্ লূত আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর রহম করুন। তিনি সুদৃঢ় স্তম্ভ আল্লাহ্র নিকটেই আশ্রয় নিতেন [২]
আপনি আল্লাহ্র রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরুন। কারণ, অন্যান্য স্তম্ভ আপনার সাথে বে'ঈমানী করলেও এটা করবে না।
প্রিয় ভাই আল্লাহ্ কখনো শত্রু দিয়েও আপনাকে হিফাযত করবেন। কীভাবে সেটি? কথিত আছে, এক গভীর রাতে চুরি করার জন্য এক চোর মহল্লার একটি বাড়িতে ঢুকল। বাড়িতে ঢুকে সে মূল কক্ষে থাকা ওই বাড়ির টাকা-পয়সা যেখানে যা ছিল খুঁজতে লাগল। বাড়িতে অবস্থানকারী দম্পতি তাদের ছোট বাচ্চা নিয়ে ঘুমাচ্ছিল। চোর ঘরে ঢোকার পর হঠাৎ বাচ্চাটি চিৎকার করে কেঁদে উঠল। বাবা-মা জেগে উঠে কিছুটা সন্দেহপ্রবণ হয়ে চিন্তা করতে থাকল—বাচ্চাটা কী দেখে এমন চিৎকার করছে? বাচ্চার কান্না না থামায় বাবা-মা দুজনই উঠে বাচ্চাটি কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাচ্চাটি কেঁদে ওঠার সাথে সাথেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল চোরটা। দম্পত্তি বাচ্চা নিয়ে যেই ঘর থেকে বের হলো, পাশে লুকিয়ে থেকে অমনি সে আবারও তাদের চোখের আড়ালে ঘরে গিয়ে ঢুকল এবং এরই মধ্যে কোনো কারণে হঠাৎ করে রুমের ছাদটা ভেঙে পড়ল। ছাদের নীচে চাপা পড়ে সাথে সাথেই মারা গেল চোরটা।
আচ্ছা, এই চোরটাকে কে নিয়ে এসেছে ওই পরিবারকে ছাদের নিচে চাপা পড়া থেকে বাঁচাতে? কৌশলটা তো এই চোরের পক্ষেই ছিল, কীভাবে বিপক্ষে চলে গেল? ওই সত্তার ইশারায়—যিনি হলেন মহারক্ষক আল্লাহ্। তিনি তাঁর বান্দাদের রক্ষা করেন। এমনকি শত্রু দিয়েও। আরেকবার হাদীসটি পড়ে দেখুন—
يا غلام، إني أعلمك كلمات احفظ الله يحفظك، احفظ الله تجده تجاهك، تعرف إلى الله في الرخاء يعرفك في الشدة
‘যুবক, আমি তোমাকে কিছু বাক্য শিখিয়ে দিই: আল্লাহকে মেনে চলো; তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলো; তুমি তাঁকে তোমার পাশে পাবে। ভালো সময়ে আল্লাহ্র সাথে পরিচিত হও; তাহলে খারাপ সময়ে তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন।’[১]
আল্লাহকে মেনে চলুন, তিনি আপনাকে হিফাযত করবেন। আদেশের ক্ষেত্রে আল্লাহকে মেনে চলুন। তিনি যেমনটা বলেছেন তেমনটা করুন।
নিষেধের ক্ষেত্রে আল্লাহকে মেনে চলুন। তিনি যা করতে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করুন।
শ্বাসরোধ
আপনি আপনার ভয়-দুর্ভাবনা দমন করুন। আল্লাহ্ আপনাকে সেভাবে রক্ষা করবেন, যেভাবে ইউনুস ইবনু মাত্তা 'আলাইহিস সালাম-কে রক্ষা করেছিলেন।
ইউনুস 'আলাইহিস সালাম-এর দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনার সমপরিমাণ দুশ্চিন্তা আর কারও হতে পারে না। তিনি তিন ধাপ অন্ধকারের ভেতর ছিলেন। গভীর সমুদ্রের অন্ধকার, তিমির রাতের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকার। কী ভয়াবহ একটা জীবনে তিনি আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন মাছের পেটে। অন্ধকার। সংকীর্ণতা। শ্বাসরোধ।
তারপরও এই সব বিপদের মোকাবেলা করলেন একটি দু'আর মাধ্যমে-
لا إله إلا أنت سبحانك إني كنت من الظالمين
'লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন।'
এই দুর্বল আওয়াজ মাছের পেট, সমুদ্র আর রাতের অন্ধকার ভেদ করে আসমানে উত্থিত হলো। ফেরেশতারা এ আওয়াজ শুনে বললেন, 'প্রভু, অপরিচিত জায়গা থেকে খুব পরিচিত একটি আওয়াজ পাচ্ছি।'
উদ্ধারের পর্ব ঘনিয়ে এলো। তাকে এবার রক্ষা করার পালা। ক্ষমার চাদরে আচ্ছাদিত হলেন তিনি। তিমি মাছ তাকে ফেলে দিল সমুদ্রতীরে। মহারক্ষক তার পাশেই ইয়াকতীন[১] গাছের চারা গজিয়ে দিলেন।
এ জীবনে আমরা সবাই যুন্নুনের[২] মতোই। যখনই জীবনে বিপদগ্রস্ত হবো তখনই আমরা শুধু 'লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন'-এ আহ্বান করব। আল্লাহ্ আমাদের এর বিনিময়ে রক্ষা করবেন।
আল্লাহ্, আপনি আপনার আমাদের রক্ষা করুন। আপনার অনুকূলে আমাদের আশ্রয় প্রদান করুন। আপনি আমাদের সামনে, পেছনে, ডানে, বামে, উপরে আর নিচে আপনার হিফাযতের দেয়াল তুলে দেন, যার মাধ্যমে আমরা অকল্যাণের ভয়াবহতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবো।
টিকাঃ
[১] ইবনু মাজাহ, ৩১২১
[১] আবু দাউদ, ৫০৯০
[২] সূরা আন'আম, ০৬: ৪৬
[১] বাল'আম ইবন বাউরা মুসা 'আলাইহিস সালামের সময় অ-ইয়াহুদীদের মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতো। নিজ সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে প্রভূত সম্মান প্রদর্শন করত। কেননা, সে ছিল এমন একজন লোক, যার দু'আ কবুল হতো। সিরিয়ার কিনআন এলাকায় ছিল তার বসবাস। যখন মুসা 'আলাইহিস সালাম কিনআন বিজয়ে সফর করেন, বাল'আমের সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে চাপ দিতে থাকে মূসা 'আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে ধ্বংসের দু'আ করতে। প্রথমে সে অস্বীকার করলেও পরে প্রলোভনে পড়ে সে নাবী ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে বদ-দু'আ করে। আর এর ফলেই সে আল্লাহর শাস্তিতে পতিত হয়। বিস্তারিত দেখুন, মাআরিফুল কুরআন, পৃ. স. ৫০১... এছাড়া বাল'আমকে রবানিক সাহিত্যে সাতজন নম্র ভাববাদীর (আইয়ূব ও তার চার বন্ধু, বাল'আম ও তার পিতা বাউরা) একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- (Talmud, B. B. 15b)। অ-ইয়াহুদীদের মধ্যে বাল 'আমের অবস্থান ছিল তেমন-ই যেমন ছিল ইয়াহুদীদের মাঝে মূসা 'আলাইহিস সালামের অবস্থান- (Midrash Numbers Rabbah 20)। উল্লেখ্য, মুসা 'আলাইহিস সালামের মতো বাল'আমেরও ত্বকচ্ছেদ অবস্থায় জন্ম- (Abbot De-Rabbi Natan)। ইয়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তালমুদমতে, তার এক পা খোঁড়া ও এক চোখ কানা ছিল- (Talmud Sanhedrin 105a)।
[১] মুসনাদ আহমদ: ২/৪০৩
[১] সূরা রা'দ, ১৩: ১১
[১] হাদীসে কুদসী হলো আল্লাহর এমন বাণী, যা কুর'আনের অর্ন্তভুক্ত নয়, জিবরা'ঈল 'আলাইসি সালাম আল্লাহর বাণী হিসেবেই রাসূলের কাছে পৌছিয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা নিজ বর্ণনায় শুনিয়েছেন।
[২] বুখারী, ৬১৩৭
[১] আসহাবে কাহাফ বা গুহায় আশ্রয়গ্রহণকারী সেই ছয়জন যুবক উদ্দেশ্য এখানে-যারা তাওহীদের বিশ্বাসী ছিল। তাদের সঙ্গে আশ্রয়গ্রহণকারী একটি কুকুরও ছিল তাদের সাথে।
[২] সূরা কাহাফ, ১৮ : ১৮
[৩] সূরা আনফাল, ০৮ : ১২
[১] সূরা হুদ, ১১: ৮০
[২] সহীহ বুখারী, ৩৩৭২; সহীহ মুসলিম, ১৫১
[১] হাদীসটি আবু দাউদ তার সুনান গ্রন্থে (৪/৪৮৬-৫০৯৬) উল্লেখ করেছেন।
[১] এর অর্থে বলা হয়, এটি একটি মিষ্টি কুমড়ো গাছের চারা ছিল। যা আল্লাহ তা'আলা তার নাবীকে ছায়া দান ও সুস্থতার জন্য উৎপন্ন করেছিলেন।
[২] সূরা আম্বিয়ায় ইউনুস 'আলাইহিস সালামকে যুলুন বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
📄 আল-লাতীফ তথা সূক্ষ্মদর্শী
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ আপনাকে অনিষ্ট থেকে বাঁচাতে চান তাহলে তিনি আপনাকে সেই অনিষ্ট আর দেখাবেন না অথবা অনিষ্ট আপনার কাছে আসার পথই খুঁজে পাবে না, অথবা হতে পারে, আপনারা একে অপরকে অতিক্রম করে যাবেন; কিন্তু কেউ কাউকে স্পর্শই করবেন না!
আল-লাতীফ তথা সূক্ষ্মদর্শী
আপনার নিরাপত্তা কি খুব দুরূহ ব্যাপার? এ নিরাপত্তার মাঝে কি বিপদের হাতছানি দেখছেন? ডাক্তাররা কি আপনাকে জানিয়ে দিয়েছে যে, আপনার অমুক আত্মীয়ের আরোগ্যলাভের কোনো সম্ভাবনা নেই? আপনার কাজের আশানুরূপ ফলাফল না পেলে কি আপনি হতাশায় ভোগেন?
তাহলে আসুন, আমরা পরিচিত হই আল্লাহ্র 'সূক্ষ্মদর্শী' নামটির সাথে। এ নাম পর্যবেক্ষণ করলে নিশ্চিত হবেন যে, এ জীবনে অসম্ভব বলে কিছু নেই। আল্লাহ্ সবকিছুই করতে পারেন। আপনার অসম্ভব স্বপ্নগুলো বাস্তবের রূপ নেবে যদি আপনি 'সূক্ষ্মদর্শী' আল্লাহ্র দরজায় কড়া নাড়েন।
সূক্ষ্মতা
আভিধানিক অর্থে : 'আল-লাতীফ' তিনি, যিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি ইহসান (কল্যাণ, অনুগ্রহ, দান-দয়া) করেন। তাদের উপকারে আসে এমন বস্তু সূক্ষ্ম ও কোমলভাবে পৌঁছে দেন। আপনি যদি বলেন, 'লাতাফাল্লাহু লাকা'-এর মানে হলো, 'আল্লাহ্ আপনার ইচ্ছাগুলো সূক্ষ্মভাবে পূর্ণ করুন।'
'আল-লুতফ' শব্দের অর্থ হলো: সূক্ষ্মতা ও পুঙ্খানুপুঙ্খতা।
তিনি আপনার প্রতি কোমলরূপে ইহসান তখনই করতে পারবেন যখন তিনি আপনার অন্তরের খবর ও সূক্ষ্ম বিষয়গুলো জানবেন।
আল্লাহ্ হলেন ওই সত্তা-যিনি বান্দার প্রতি গোপনে ইহসান করেন। বান্দার প্রয়োজন পূরনের বন্দোবস্ত তিনি এমন জায়গায় করে রাখেন যে, বান্দা সেটা জানতেই পারে না। এমন জায়গায় তিনি বান্দার জন্য রিস্কের ব্যবস্থা করে রাখেন, বান্দা যা ধারণাও করতে পারে না।
বান্দাকে দয়া করেন, ইহসান করেন। বান্দাকে রক্ষা করেন, হিদায়াত দেন। বান্দার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন। এ সকল ব্যাপারেই তিনি সূক্ষ্মদর্শী।
তাঁর অদৃশ্য ক্ষমতার মহিমান্বিত রূপ, তাঁর জ্ঞানের মহত্ত্ব ও সৃষ্টিজগতের প্রতি দৃষ্টি রাখার পাশাপাশি বান্দার জন্য যা ভালো, যা উপকারী—সবই তিনি সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করেন। তাঁর অনুগ্রহ দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যাবে না। এ অনুগ্রহ আপনার কাছে সুসংবাদের সুবাতাস নিয়ে হাজির হবে। আপনাকে প্রস্তুত করবে গ্রহণ করার জন্য। তারপর যখন আপনার ওপর অনুগ্রহ প্রস্তুত হয়ে থাকবে, তখন আপনাকে তিনি একটা উপায় বাতলে দেবেন, যে উপায়ে আপনি এ অনুগ্রহ অর্জন করতে পারবেন। তিনি আপনার জন্য ওই অনুগ্রহ অর্জনের পথকে সুসজ্জিত করে দেবেন। আপনি ভাববেন, এটা আপনার নিজ হাতেরই অর্জন। অথচ এটা আসলে আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহের একটা সামান্য নমুনামাত্র।
তিনি এমন ঘটনা ঘটান, যেগুলো আমাদের বিবেক-বুদ্ধি কল্পনাও করতে পারবে না। তিনি সেগুলো বাস্তবে রূপ দেন। এই যে তাঁর অনুগ্রহের দান-এ তো অদৃশ্য এবং সূক্ষ্মদর্শিতার মাধ্যমেই। আপনি হঠাৎ করে আপনার আঙিনায় এ অনুগ্রহের উপস্থিতি দেখতে পাবেন। কীভাবে এটা ঘটল—ভেবে পাবেন না। আপনার মাঝে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাবে যে, আপনার অবস্থা ও শক্তি অনুযায়ী এটা বাস্তবায়ন করার কোনো ক্ষমতাই আপনার কাছে নেই। আপনি তখন আসমানের দিকে তাকিয়ে বলবেন—
لطيف بعباده
আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের প্রতি কোমল। [১]
সূক্ষ্মতার সুবাতাস
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ আপনাকে সাহায্য করতে চান তাহলে সামান্য একটি মাধ্যমকে তিনি বড় মাধ্যমে পরিণত করতে পারেন।
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ আপনাকে সচ্ছল করতে চান তাহলে যার থেকে আপনি কখনো কোনো কিছু পাওয়ার আশাই করেননি, তার কাছ থেকেই সবচেয়ে বড় পাওয়াটাই পেতে পারেন।
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ আপনাকে অনিষ্ট থেকে বাঁচাতে চান তাহলে তিনি আপনাকে সেই অনিষ্ট আর দেখাবেন না অথবা অনিষ্ট আপনার কাছে আসার পথই খুঁজে পাবে না। পাবে না, অথবা হতে পারে, আপনারা একে অপরকে অতিক্রম করে যাবেন; কিন্তু কেউ কাউকে স্পর্শই করবেন না।
যদি সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ আপনাকে কোনো ঘৃণিত পাপকাজ থেকে রক্ষা করতে চান তাহলে আপনার কাছে সেটা অপছন্দনীয় করে দেবেন। আপনার জন্য সেটা করা কঠিন হয়ে যাবে। কাজটা করতে আপনিও অস্বস্তিবোধ করবেন। কাজটা করার জন্য হয়তো অগ্রসর হলেন; কিন্তু পথে তিনি একটা কিছু দিয়ে আপনাকে থামিয়ে দেবেন এবং সামনে অগ্রসর হতে দেবেন না।
মু'মিনগণ সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ এই অনুগ্রহগুলো পর্যবেক্ষণ করে। তারা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সেগুলো অবলোকন করে। জীবনের প্রতিটি ফায়সালাতেই তারা খুঁজে পায় আল্লাহর কোমল ও সূক্ষ্ম পরশ।
সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ যখন ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম-কে কারাগার থেকে মুক্ত করতে চাইলেন, তখন তিনি কারাগারের প্রাচীর ভেঙে দেননি। আকাশ থেকে কোনো বিদ্যুৎ দিয়ে ঝলসে দেননি কারাগারের তালা। তিনি শুধু বাদশাহকে একটা স্বপ্ন দেখালেন, স্বপ্নের মাঝে একটা ছোট্ট ইশারা রাখলেন, যা দিয়ে সত্যবাদী ইউসুফ মুক্তি পাবেন অত্যাচারের শিকল থেকে।
সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ যখন মূসা 'আলাইহিস সালামকে মায়ের কাছে ফেরাতে চাইলেন তখন তিনি কোনো যুদ্ধ লাগিয়ে দেননি, যার মাধ্যমে বানু ইসরা'ঈল ফিরাউনের সীমালঙ্ঘনের বিপক্ষে লড়াই করে মাযলুমদের রক্ষা করবে। না, তিনি শুধু মূসা 'আলাইহিস সালামের মুখে অন্যান্য সব ধাত্রীমাতার প্রতি অরুচি সৃষ্টি করে দিলেন। মায়ের অন্তরটা যখন দুশ্চিন্তায় খালি হয়ে গেছে তখন এই সামান্য একটা মাধ্যম দিয়ে তিনি মূসা 'আলাইহিস সালামকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন।
আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন শি'আবে বানু হাশিমের সাথে বন্দি ছিলেন তখন সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ চাইলেই এক ভয়াবহ চিৎকারে কুরাইশদের ধ্বংস করে দিতে পারতেন; কিন্তু তিনি শুধু কিছু কীটপতঙ্গ পাঠালেন। কীটগুলো কা'বাঘরে ঝুলিয়ে রাখা ওই নিপীড়নের চুক্তিটা খেয়ে ফেলল। ফলে যেসব কীট চোখেই পড়ে না সেগুলোর মাধ্যমেই এই নিপীড়নপত্র তিনি ছিন্নভিন্ন করে দিলেন।
আপনি ছাড়া আমি আর কারও কাছেই হাত তুলি না।
আপনি ছাড়া আর কারও জন্য আমার দু'চোখ থেকে অশ্রু ঝরে না।
আপনার দরজাটা আমার জন্য সংকীর্ণ নয়।
তাহলে আপনার কাছে যে চাইতে আসবে তাকে ফেরাবেন কীভাবে, আল্লাহ? আপনি তো অমুখাপেক্ষী। সুতরাং আপনার কাছে যে চাইতে আসে তাকে কীভাবে ফিরিয়ে দেবেন?
তাঁর দয়া ও সূক্ষ্মদর্শিতা তো বিপদাপদকে ছাড়িয়ে যায়। যেহেতু তিনি হলেন পরম দয়াময় ও সূক্ষ্মদর্শী, তিনি সবচেয়ে সহজ বিষয়গুলো দিয়েই বড় ধরনের বিষয়গুলো নির্ধারণ করেন। তার যেভাবে ইচ্ছা হয় তিনি সেভাবেই সব কিছু করেন। বান্দা জানতেই পারে না কী ঘটছে।
এক টুকরো পাথর
ধরুন, আপনি ঘুমিয়ে আছেন। আল্লাহ্ চাইলেন, যেন আপনি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করেন। তাই তিনি একটু মৃদু বাতাস পাঠালেন। আপনার রুমের জানালাটা নড়ে উঠল। অথবা আপনার পাশের রুমে একটা ছেলে হাঁটাহাঁটি করছে, হই চই করছে। অথবা আপনার তীব্র পিপাসা পেয়ে বসল। এ রকম কোনো একটা কারণে আপনি জেগে উঠলেন। ওযু সেরে কয়েক মিনিট পর আপনি সালাতের স্থানে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা শুরু করলেন। আপনি জানেনই না যে, আপনাকে কে উঠিয়েছেন।
সুউচ্চ পাহাড়ী রাস্তায় আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন। গাড়িটা রাস্তার এক পাশে দাঁড় করালেন ড্রয়ারে কিছু একটা খোঁজার জন্য। হতে পারে সেটা আপনার আইডি কার্ড বা মানিব্যাগ। কয়েক সেকেন্ড পর চোখের সামনে দেখলেন, পাহাড়ের চূড়া থেকে একটা বিরাট পাথরের খণ্ড আপনার সামনে দিয়ে নেমে যাচ্ছে। ঠিক ওই সময় আপনি যদি না থামতেন, তাহলে পাথরটা গাড়িসমেত আপনাকে পিষ্ট করে চলে যেত। আপনি জানেনই না, কে আপনাকে বাঁচিয়েছে।
আল্লাহ্র অবাধ্যতা করার জন্য রাতের বেলা রাস্তায় বের হলেন। পরিকল্পনা বেশ ভালোভাবে সাজানো। হঠাৎ দূরে একটা গাড়ি দেখতে পেলেন। সন্দেহ হলো, কেউ আপনাকে অনুসরণ করছে। গাড়ি পার হয়ে যাওয়ার পর আপনার ভেতরে একটা অপরাধবোধ জন্ম নেয়। আপনি পরিকল্পনাটা বাতিল করে বাড়িতে ফিরে এলেন। আপনি জানেনই না, তিনিই আপনাকে তার কোমলতা দিয়ে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
আল্লাহর এমন অনেক সূক্ষ্ম দয়া আছে যার সূক্ষ্মতা বুদ্ধিমান ব্যক্তিও ধরতে পারে না। অনেক কিছু সকালে খারাপ লাগে, কিন্তু বিকেল গড়িয়ে গেলে সেটিই আবার ভালো লাগতে শুরু করে। যদি কখনো আপনার অবস্থা সংকীর্ণ হয়ে আসে তাহলে মহান আল্লাহ্র প্রতি ভরসা রাখবেন।
গোপন ও সূক্ষ্ম বিষয়াদি
একজন সূক্ষ্মদর্শীকে অবশ্যই হতে হবে মহাজ্ঞানী। তিনি আপনাকে কীভাবে সূক্ষ্ম পরিচর্যা করবেন যদি এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো না-ই জানেন?
তাকে অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা হতে হবে। কারণ, পরিপূর্ণ সূক্ষ্মদর্শিতা থাকলেই কেবল অনস্তিত্ব থেকে কোনো কিছু অস্তিত্বে নিয়ে আসতে পারেন। এই যে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি একটা অপরটাকে বোঝায়, আর একটা আরেকটাকে আবশ্যক করে-সে ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন-
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ) Φ
যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী ও সম্যক অবহিত [১]
কীভাবে তিনি না জেনে থাকবেন? তিনি তো সকল গোপন বিষয়াদিও জানেন। তাঁর জ্ঞান এমন পর্যায়ে যে, তা সূক্ষ্ম ও অতি গোপন। তিনি তো এমন রব, যিনি গোপনে মানুষকে সম্মান দান করেন, মানুষকে হিদায়াত দেন, মানুষের সব কিছু পরিচালনা করেন, তিনি কি এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো না জেনে থাকবেন? তাও কি হয়, হতে পারে? শাইখ আব্দুর রাহমান আস-সা'দী বলেন, 'তিনি এমন সূক্ষ্মদর্শী যে, তাঁর জ্ঞান গোপন বিষয়াদিকে ঘিরে আছে, সূক্ষ্ম বিষয়গুলোকে বেষ্টন করে আছে।'
এই যে ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম একটি স্বপ্ন দেখলেন, সেটা তো ওই অবস্থাতে একদম অসম্ভবই মনে হয়েছিল। তার স্বপ্নের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'নিশ্চয় আমি এগারোটা তারকা, সূর্য এবং চাঁদ দেখেছি। তারা আমাকে সিজদা করছিল।' স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো, তার বাবা, মা ও এগারো ভাইবোন তাকে সম্মান জানিয়ে সিজদা করবে।
ওই অবস্থায় এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই পাওয়া যায় না।
তার পিতা একজন সম্মানিত নাবী, একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। এটা তো মেনে নেওয়া অসম্ভব যে, বড় মানুষ ছোট মানুষকে সিজদা করবে, যে নাবী নয় তাকে নাবী সিজদা করবে, বাবা ছেলেকে সিজদা করবে।
তার ভাইয়েরা তো তাকে ঘৃণাই করে। সিজদা করবে কীভাবে? তাদের ঘৃণা এমন পর্যায়ের ছিল যে, তারা তাকে হত্যারও পরিকল্পনা করেছিল। এ ঘৃণা তাদেরকে প্ররোচিত করেছে তাকে কুয়ায় ফেলে দিতে। এই সব পরিস্থিতি তাদের সিজদাকে আরও অসম্ভব করে তুলেছিল।
অবস্থার পরিবর্তন হলো। তাকে কুয়ায় নিক্ষেপ করা হলো। তারপর পণ্যদ্রব্যের মতো তাকে বিক্রিও করা হলো। তিনি হয়ে গেলেন মিশরের শাসকের দাস। দাস অবস্থায় এই অসম্ভাব্যতা আরও বেড়ে গেল।
তারপর তিনি হয়ে গেলেন এক বন্দী। স্বপ্নপূরণ থেকে তার দূরত্ব বেড়ে গেল যোজন যোজন।
কিন্তু সূক্ষ্মদর্শী সত্তা ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন এবং পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারেন। তিনি তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তাকে বড় একটি পদে আসীন করলেন। তারপর দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। ভাইয়েরা তার কাছে এলো প্রয়োজন নিয়ে। তারপরই সেই পুরাতন স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্ ভাগ্য পরিবর্তন করে দিলেন। ফলাফল: ইউসুফ 'আলাইহিস সালামের বাবা-মা ও ভাইয়েরা তাকে সিজদা করেন-এতে ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম বিস্মিত হন। তিনি বলেই ফেলেন-
يَتَأَبَتِ هَذَا تَأْوِيلُ رُمْيَيَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا
হে আমার পিতা, এই তো আমার আগের স্বপ্নের ব্যাখ্যা। আমার রব এটাকে সত্য করেছেন [১]
কেননা, রবের ইচ্ছা না থাকলে তা বাস্তবায়িত হতো না।
'তিনি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছেন এবং শাইতান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদের মরু অঞ্চল থেকে এখানে নিয়ে এসে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।'
এটাই হলো আল্লাহ্ নিপুণতার সারমর্ম। অতঃপর তিনি স্বাক্ষ্য দিলেন, 'নিশ্চয় আমার রব যা করেন নিপুণতার সাথেই করেন।' হ্যাঁ, তিনিই তো সুনিপুণ। তিনি কিছু করতে চাইলে তার মাধ্যমগুলো খুব নিপুণ, সূক্ষ্ম ও গোপনীয়ভাবে প্রস্তুত করেন। এমনকি অসম্ভব জিনিসও ঘটে থাকে। কারণ, তিনি যে সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।
সুদূরের স্বপ্ন
যদি দেখেন, যমীনটা ধূসর হয়ে গেছে, এর ওপর মেঘগুলো ভিড় জমাচ্ছে। এরপর বিদ্যুৎ চমকাল। বৃষ্টি নামা শুরু হলো। যমীনটা নড়েচড়ে উঠল। সবুজাভ হয়ে এলো চারপাশ। আপনি মনে করবেন না যে, এটা প্রাকৃতিক ব্যাপার। আল্লাহ্ বাণী গভীরভাবে ভেবে দেখুন-
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَتُصْبِحُ الْأَرْضُ مُخْضَرَّةً إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ
তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ্ পানি বর্ষণ করেন আকাশ হতে; যেন সবুজ শ্যামল হয়ে ওঠে যমীন? নিশ্চয় আল্লাহ্ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত [২]
আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়ন যত অসম্ভবই মনে হোক না কেন, আপনার স্বপ্ন পূরণের সাথে আপনার ব্যবধান যত দূরেই থাকুক না কেন, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সেটার ব্যবস্থা করে দেবেন।
يَبْنَى إِنَّهَا إِن تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُن فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ )
হে আমার ছেলে, নিশ্চয় তা যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, অতঃপর তা থাকে শিলাগর্ভে অথবা আসমানসমূহে কিংবা যমীনে, আল্লাহ্ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। [১]
তাই আপনি হতাশ হবেন না। আপনার রব নিপুণতার সাথেই সবকিছুর ব্যবস্থা করেন।
আমার এক বন্ধু দীর্ঘ সফরে তাবুক থেকে জর্ডান সীমান্তের উদ্দেশে রওনা হলেন। সকালবেলা তাকে মৃতাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে হবে। কারণ, সেখানে বিভিন্ন দেশের ছাত্রদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়েছে; কিন্তু রওনা হয়ে একশ কিলোমিটার যেতেই মনে পড়ল, পাসপোর্টটা তিনি বাসায় রেখে এসেছেন। আবার কষ্ট করে ফিরে আসতে লাগলেন। ফিরে এসে ওই সপ্তাহে আর না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
পরের দিন পত্রিকা খুলে দেখতে পেলেন যে, মৃতাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দেশের কিছু ছাত্র বিশৃঙ্খলা করেছে যার ফলে অনেকে আহত হয়েছে।
এই যে সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্, তিনিই তাকে ভুলিয়ে দিলেন পাসপোর্টের ব্যাপারটা। যেন তাকে দেখতে না হয় রক্ত। যেন পরের সকালটা তাকে হাসপাতালে কাটাতে না হয়। অথবা তার অন্তরে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ভয় ঢুকে না পড়ে, যে ভয়ের কারণে সে হয়তো পড়াশোনাই ছেড়ে দিতে পারে।
সূক্ষ্মদর্শীর কথাগুলো লক্ষ করুন। নিঃসন্দেহে একের পর এক উদাহরণ আসতেই থাকে। প্রতিটি কাজেই সূক্ষ্মতার ছোঁয়া। জীবনের প্রতি মুহূর্তেই সূক্ষ্মদর্শী ও বিজ্ঞ আল্লাহর কোমল পরশ ঘিরে রেখেছে আপনাকে সব দিক থেকেই।
চূড়ান্ত মুহূর্তের কোমল পরশ
আপনি যদি ঠিক এমন সময় রুমে প্রবেশ করেন, যখন আপনার শিশু সন্তানটি বিছানা থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। তখন নিজেকে প্রশ্ন করুন, 'ঠিক এখনই কেন আপনি রুমে ঢুকলেন?'
আপনি পানির জন্য রান্নাঘরে ঢুকছিলেন; কিন্তু হঠাৎ বৈদ্যুতিক প্রবাহের আওয়াজ শুনে ছুটে গিয়ে দেখলেন, ফ্রিজে আগুন লাগার উপক্রম, দ্রুত লাইনটা আলাদা করে দিলেন। এ সময় নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, 'ঠিক এ সময় কোন সত্তা আপনাকে রান্নাঘরে প্রবেশ করালেন? আর পাঁচটা মিনিট পরে কেন ঢুকলেন না?'
হুবহু এমনই ঘটবে আপনার সাথে তা নয়, এ রকম কিছু অথবা এর কাছাকাছি কিছু তো অবশ্যই আপনি ঘটতে দেখেছেন। একবার স্মৃতি রোমন্থন করে দেখুন। মনে পড়বে, মহান আল্লাহ্র কোমল স্পর্শ কীভাবে আপনার জীবনকে ঘিরে রেখেছে পরম মমতায়।
এই মহান নামের ভেতর এ সামান্য কিছু সময়ের জন্য প্রবেশের মাধ্যমে আমরা মাত্র কয়েকটি অর্থ বের করে আনতে পেরেছি। আর এ অর্থের গভীরে আরও কত অর্থ আছে যেগুলো আপনাকেই চিন্তা করে বের করার ভার দিলাম। আপনি গভীরভাবে ভাবুন আর এ ব্যাপারে 'আলিমদের বইগুলো পড়ে দেখুন।
যে নামে এতক্ষণ ডুব দিয়েছেন, আপনার কি উচিত নয়, এই সূক্ষ্মদর্শী দয়ালু আল্লাহকে আপনি ভালোবাসবেন? তাঁর দানগুলোর কথা ভেবে দেখবেন? আপনার অন্তর তাঁকে স্মরণ করবে, তাঁর কথা ভাববে, তাঁর কাছেই আশা রাখবে, তাঁকে ভয় করে চলবে?
এই নামের সাথে কয়েকটা দিন অতিবাহিত করুন। এই নামেই আল্লাহকে ডাকুন। তাঁর সূক্ষ্ম দয়া চান। তাঁর হিদায়াতের সূক্ষ্ম নিদর্শনগুলো দেখে চোখের পানি ঝরান। আর বিনয়ী হয়ে বলুন-
'হে সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্, আমরা যা ভয় পাই তা থেকে আমাদের বাঁচান...'
আল্লাহ্, হে সূক্ষ্মদর্শী আল্লাহ্, সূক্ষ্মভাবে আমাদের প্রতি কোমলতা ও দয়া পৌঁছে দিন। আপনার রহমতের সূক্ষ্মতা দিয়ে আমাদের অন্তরের বক্রতাকে দূর করে দিন। আমাদের ভ্রষ্ট অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালনা করুন। আমাদের জীবনের মলিনতাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে দিন।
টিকাঃ
[১] সূরা শূরা, ৪২ : ১৯
[১] সূরা মুলক, ৬৭: ১৪
[১] সূরা ইউসুফ, ১২: ৯৯
[২] সূরা হাজ্জ, ২২: ৬৩
[১] সূরা লুকমান, ৩১ : ১৬
📄 আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা
তিনি আপনাকে আরোগ্য দেন— সামান্য মাধ্যমে, বিস্ময়কর মাধ্যমে, যেটা মাধ্যম না সেটা দিয়েও, আবার কোনো মাধ্যম ছাড়াই।
আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা
আপনি কি ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েছেন? বেদনায় নীল হয়ে গেছেন? অসুস্থতায় আপনার শরীর কি পাংশুটে বর্ণ ধারণ করেছে?
ডাক্তারদের কাছে যেতে যেতে আপনি কি বিরক্ত? হাসপাতালের করিডরগুলোয় হাঁটতে হাঁটতে আপনি কি ক্লান্ত? আপনার মাথায় কি শুধু ক্লিনিকের নামগুলো ঘুরপাক খায়? ডাক্তারের সাথে সাক্ষাতের তারিখ আর রোগের বিভিন্ন ধরন- এগুলোই কি আপনার মূল চিন্তা?
কেমন লাগবে, যদি আপনাকে এমন একটা বিষয় জানিয়ে দিই-যা আপনার আত্মা থেকে সকল দুঃখ-কষ্ট মুছে দেবে?
সেটা আল্লাহ্রই নাম- 'আশ-শাফী' তথা 'আরোগ্যদাতা'।
এখন আপনার এই ব্যথিত হৃদয়কে কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের সুযোগ দিন। তারপর এই দয়ালু নামটি সম্পর্কে জানুন। এ নামটির ছায়ায় আশ্রয় নিলে আপনি বুঝতে পারবেন এর প্রয়োজন কত। আর আপনি এটাও বুঝতে পারবেন যে, আপনি এই নি'য়ামাত থেকে কতটা দূরে আছেন।
রোগকে বিদায়
'আশ-শাফী' তথা 'আরোগ্যদাতা' আল্লাহ্র এমন একটি নাম যার প্রশংসা আমরা এজন্য করি যে, তিনি নিজেকে এ নামে নামকরণ করেছেন। তিনি নিজেকে সুস্থতা প্রদানের গুণে গুণান্বিত করেছেন। তিনিই সেই সত্তা-যিনি সুস্থতা দান করেন এবং বান্দার শরীরকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখেন। এই নাম শুনলেই এর ভেতরকার অর্থটা বোঝা যায়। এর বাহ্যিক দিকই অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে।
সুস্থতা শব্দটা রোগের সাথেই সম্পৃক্ত। মানবজীবনে রোগ-শোক নিত্যকার ঘটনা। এটা বিবিধ কষ্ট নিয়ে হাজির হয়। এর থেকে কেউ রেহাই পায় না। যে ব্যক্তি চোখের ব্যথা থেকে মুক্ত হয়, সে মাথাব্যথায় আক্রান্ত হয়। আবার মাথাব্যথাটা ভালো হলে পাঁজরে ব্যথা আরম্ভ হয়। এ ব্যথা শেষ হলে জ্বর এসে হানা দেয়। জ্বরটা কমে এলে পেটব্যথা শুরু হয়। পেটের ব্যথা নামলে দাঁত টনটন করে। এভাবে কোনো-না-কোনো অসুস্থতা লেগেই থাকে।
আবার সে যখন সুস্থতা লাভ করে, দেখতে পায় তার ভাই কাতরাচ্ছে, রোগাক্রান্ত হয়ে কষ্ট পাচ্ছে তার বোন। তার মা কান্নাকাটি করছে। ছেলেটা চেঁচামেচি করছে। প্রিয়জন ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।
জীবনটা আসলে দুঃখ-কষ্ট-ব্যথার একটা ময়দান। এ জন্যই আল্লাহ্ নিজের নাম দিয়েছেন আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা; যেন আপনি আপনার সকল ব্যথা নিয়ে তাঁর দয়ার আঙিনায় সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তাঁর অদৃশ্য মহান শক্তির কাছে আপনার সকল ব্যথার অনুভূতি প্রকাশ করেন।
রোগ এক ভয়াবহ জিনিস। এতে আক্রান্ত হয়ে অহংকারী ব্যক্তিটিও হারিয়ে ফেলে তার শক্তি। দুর্বলতা তাকে ছেয়ে ফেলে। ফলে সজীব চঞ্চল প্রাণে অনুভূত হয় অবসাদ ও দুর্বলতার স্পর্শ।
আল্লাহ্ শরীরের এ সজীবতাকে মুহূর্তের জন্য ম্লান করে দেওয়ার ফয়সালা দেন; যেন বান্দা নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করে নেয়। সে যেন বুঝতে পারে-আদতে তার শক্তি-সামর্থ্য বলতে কিছুই নেই।
আল্লাহ্ মানুষের জন্য রোগের ফয়সালা দেন; যেন সে এই রোগের মাধ্যমে এর কাছাকাছি একটা বিষয়কে স্মরণ করে। সেটা হলো মৃত্যু। রোগ যেমন সজীবতা ম্লান করে দেয় তেমনি মৃত্যুও জীবনের পরিসমাপ্তি এনে দেয়।
ব্যক্তি আপনি তো মৃত্যু দিয়েই গড়া। আপনার প্রতিটা জিনিস মৃত্যুর সাথে মেলে। আপনার ঘুমও মৃত্যু। অসুস্থতাও মৃত্যু। জীবনের নতুন ধাপে পৌঁছলে আগের ধাপের মৃত্যু ঘটে; যেমন যৌবন আপনার শৈশবের মৃত্যু ঘটায়। আবার বার্ধক্য যৌবনের মৃত্যু ডেকে আনে। আপনি জীবনের সাথে যতটুকু মেশেন, তার চেয়েও অধিক মেশেন মৃত্যুর সাথেই। তারপরও আমাদের কল্পনা আমাদের মাঝে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করে যে, আমরা চিরস্থায়ী। আর এ কারণেই আমাদের শরীর চিৎকার করে বলতে থাকে- 'তোমার ধ্বংস অতি সন্নিকটে।'
একজন মানুষ অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকাবস্থায় যখন আসা-যাওয়া করতে থাকা সুস্থ লোকদের দেখতে থাকে, তখন তার মাঝে জেগে ওঠে তাওবার মনোভাব। সে অনুভব না করলেও কবরের বাতাস যেন তার চারদিকে প্রবাহিত হয়।
আপনি যখন অসুস্থ, আপনার তখন মনে হতে পারে আপনার আত্মা মৃত ব্যক্তিদের সাথে আলাদা এক জগতে আছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে আপনার দুই চোখ আর দুই ঠোঁট শুকিয়ে যেতে থাকে। আপনার চোখের চাহনিতে কাঁপুনি দৃশ্যমান হয়।
এই তো জীবন। ঠিক এ জীবনটাই আপনার শরীরের ভেতর থেকে আপনাকে দেখতে আসা মানুষগুলোকে হাতের ইশারায় বিদায় জানাচ্ছে।
এভাবে রোগ যখন চূড়ান্তরূপ নেয়, আর দুনিয়ার মোহ থেকে আপনি যখন নিজেকে মুক্ত করে নেন, তখন আশ-শাফী তথা আরোগ্যদাতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা রোগটাকে আপনার শরীর ত্যাগের অনুমতি দেন। সুস্থতাকে আবার আপনার দেহে বিচরণ করার আদেশ করেন। ধীরে ধীরে আপনার দুই গালে উজ্জলতা ফিরে আসে। অসুস্থতার দিনগুলোতে মুখে যে মলিনতার সৃষ্টি হয়েছিল তা মুছে গিয়ে ফুটে ওঠে মিষ্টি হাসি।
তিনি কোনো মাধ্যম ছাড়াই রোগমুক্তি দেন
রোগমুক্তির জন্য তার কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নেই; কারণ, তিনি আরোগ্যদাতা। তিনি মাধ্যম দিয়েও আপনাকে রোগমুক্তি দেন; কারণ, তিনি যেভাবে চান, সবকিছু সেভাবেই হয়ে থাকে।
তিনি আপনাকে আরোগ্য দেন— সামান্য মাধ্যমে, বিস্ময়কর মাধ্যমে, যেটা মাধ্যম না সেটা দিয়েও, আবার কোনো মাধ্যম ছাড়াই।
সামান্য লতাপাতা দিয়ে আপনাকে রোগমুক্তি দেন। বিবিধ ঔষধপত্র দিয়ে আপনাকে সুস্থ করেন। খাদ্য-পানীয় দিয়ে আপনাকে সুস্থ করেন।
একবার একটা বিস্ময়কর ঘটনা পড়েছিলাম। এক ছেলে যক্ষ্মাসহ কয়েকটি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতপ্রায় হয়ে গেল। ডাক্তাররা বলল, তার মৃত্যু আসন্ন। তার বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। তারা তার বাবাকে পরামর্শ দিল, ছেলেকে গ্রামে নিয়ে যেতে; যেন সে গ্রামের নির্মল বাতাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে শেষ দিনগুলো কাটাতে পারে। অতঃপর তাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো। একদিন কেক খাওয়ার সময় এক লোক ছেলেটির বিষণ্ণ দুই চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, 'বাবা, তুমি কি বেঁচে থাকতে চাও?' সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। লোকটি বলল, 'এমন খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার আশা কর কীভাবে? প্রাকৃতিক খাবার খাবে। এ প্রকৃতিতে মাংস, শাক-সবজিসহ যা কিছু আল্লাহ্ সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং যাতে মাটির প্রভাব আছে সেগুলো খাবে।'
ছেলেটির ভাষ্য-'লোকটির উপদেশ আমার অন্তরে জায়গা করে নিল। আমি তার কথাগুলো অকপটে বিশ্বাস করে নিলাম। এরপর থেকে আমি শুধু জীবিত খাবারই খেতে লাগলাম, যে খাবারের মাঝে রয়েছে সঞ্জীবনী শক্তি-বিভিন্ন মাংস, বিবিধ সবজি, ক্ষেত-খামারের তরকারি, গরম রুটি, তাজা ফলমূল ইত্যাদি। কিছুদিনের মধ্যেই আমার শরীরটা সতেজ হয়ে উঠল। রোগের কোনো অস্তিত্বই রইল না।'
ছেলেটি এ ঘটনা বর্ণনা করেছে বড় হয়ে একজন পুষ্টিবিজ্ঞানী হওয়ার পর। তার নাম জাইলোর্ড হাউজর। তার বই খাদ্যের অলৌকিক ক্ষমতায় তিনি এ কথা লিখেছেন।
ডাক্তাররা তার মৃত্যুর ব্যাপারে ফয়সালা দিয়েই দিয়েছিল; কিন্তু রাজাদের রাজা এমনটি চাননি।
ডাক্তাররা ধারণা করেছিল গ্রামেই তার জীবনের অবসান হবে; কিন্তু আল্লাহ্ তেমনটা চাননি।
হ্যাঁ, ডাক্তাররা তার চিকিৎসা করতে অক্ষম ছিল; কিন্তু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তো অক্ষম নন। তিনি অক্ষম হবেন না। তাকে অক্ষম করতে কেউ পারবেও না।
কে সেই সত্তা-যিনি হতদরিদ্র মানুষের হাতের নাগালে পাওয়া যায় এমন সকল কিছু যেমন শাক-সবজি, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যের মাঝে সুস্থতার উৎসগুলো প্রবেশ করিয়েছেন? তিনি আরোগ্যাদাতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা।
আপনি নিজের অজান্তেই একটা রোগে আক্রান্ত হলেন। তারপর না জেনেই এমন খাবারও খেয়ে ফেললেন যাতে আপনার সুস্থতা নিহিত। আপনি অসুস্থ হন, আবার সুস্থও হয়ে যান আপনার রোগ বা অসুস্থতা সম্পর্কে না জেনেই।
আল্লাহ্ কখনো পানির মধ্যেও সুস্থতার উপাদান দিয়ে দেন। আমরা সবাই জানি- 'যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যেই পান করা হয় সেটা বাস্তবায়িত হয়।' আরও জানি যে, যমযমের পানি 'তৃপ্তিদায়ক ও রোগ নিরাময়কারী পানীয়।' কত রোগী আছে-রোগে দুর্বল হয়ে পড়েছিল; তারপর এই পবিত্র পানি পান করার পর সে আল্লাহ্র ইচ্ছায় সুস্থ হয়ে উঠেছে।
যে ব্যক্তি সুস্থতার এই হাদীসগুলো পড়বে সে নাবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকেই অনেকগুলো ঔষধের তালিকা পেয়ে যাবে। এর কিছু আবার ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ তার আত-তিব্বন নাবাওয়ী গ্রন্থে সংকলন করেছেন।
এ সকল ঔষধের মাঝে কিছুর উদাহরণ এই-চন্দন কাঠ, গরুর দুধ, চর্বি, কালোজিরা, তালবীনা, রাতে সালাত আদায়। আর এ সবগুলোর ব্যাপারেই সহীহ হাদীস আছে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ধৈর্যের মাধ্যমে সুস্থতা দেন। দু'আর মাধ্যমে দেন। সাদাকার মাধ্যমেও দেন। ক্ষমাপ্রার্থনার মাধ্যমেও দেন। তাওবার মাধ্যমেও দেন। আবার সন্তুষ্ট হয়েও সুস্থতা দেন। সবশেষে কোনো মাধ্যম ছাড়াও আরোগ্য দেন।
আলো ফিরে এলো
তাবুকের কিং 'আব্দুল 'আযীয হাসপাতালের ধর্মীয় অফিসে আমরা অবস্থান করছিলাম। এ সময় আমাদের পরিচিত এক ভাই ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় প্রবেশ করল। তার মুখে দুশ্চিন্তার মেঘ। মুখে সদা বিরাজ করা মুচকি হাসিটা আজ নেই। তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, কী হয়েছে তার। তিনি বললেন, 'আমার ছেলে চোখে দেখতে পাচ্ছে না; কিন্তু কেন দেখতে পারছে না তাও বুঝতে পারছি না। আমার ছেলেটিকে এখন দোতলায় ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।'
হায়! কী ভয়াবহ বিপদ! বাবার জন্য এ বিপদ কতটাই না কষ্টের!
সে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, 'দয়া করে আপনাদের একজন উঠে আসুন। আমার ছেলেটাকে রুকইয়াহ্ করান। [১] এর মাধ্যমে হয়তো আল্লাহ্ তাকে সুস্থতা দান করবেন।'
আমার এক বন্ধু সাথে সাথে উঠে তার সাথে চলে গেল। এক ঘণ্টা পর সে ফিরে এসে জানাল যে, তার ছেলেকে রুকইয়াহ করানো হয়েছে। তারপর সে ছেলের বাবাকে ধৈর্যধারণের জন্য পরামর্শ দিল। তাকে বার বার এ হাদীসটি স্মরণ করিয়ে দিল, 'তোমরা তোমাদের মাঝে অসুস্থ লোকদের চিকিৎসা করো সাদাকাহ দিয়ে'। বাবা সাথে সাথে পকেট থেকে পাঁচশ রিয়াল বের করে বললেন, 'আমার ছেলের সুস্থতার নিয়্যাতে এটা সাদাকাহ করে দিন।' দুই দিন পর বাবা ফিরে এলো। তার চেহারায় পরিবর্তন সুস্পষ্ট। আমার বন্ধুকে বলল তার সাথে যেতে। আধ-ঘণ্টা পর প্রফুল্লচিত্তে বন্ধু ফিরে এসে বলল, 'সুসংবাদ আছে। ছেলেটা রুমের আলো কিছুটা দেখতে পাচ্ছে।' বন্ধু আরও জানাল যে, ছেলের বাবা তাকে আরও এক হাজার রিয়াল সাদাকাহ করে দিতে বলেছে। সেদিন ছিল সপ্তাহের শেষ দিন। এর পরদিন অর্থাৎ শনিবার ছেলেটির বাবা আমার বন্ধুকে নিয়ে আবারও তার ছেলের রুমে গেল। অতঃপর আমার বন্ধু যখন ফিরে এসে জানাল যে, ছেলেটি আবার আগের মতো দেখতে পাচ্ছে তখন আমি যেন আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু তাতে কি? তার চোখের জ্যোতি যে সত্যিই ফিরে এসেছে! সে নতুন করে দেখতে পাচ্ছে!
কে তাকে সুস্থতা দিল? কে সেই সত্তা যিনি তার চোখের আলো ফিরিয়ে দিল? কে তাকে দান করল এ নতুন জীবন?
তাঁর ব্যাপার এই যে, তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছে করেন, তিনি বলেন, 'হও'। ফলে তা হয়ে যায়।
মহান পবিত্র আল্লাহ্। তিনি চোখের আলোকে বললেন, 'ফিরে আসো।' আর চোখের আলোও ফিরে এলো।
তাঁর দিকে ফিরে আসুন
তিনি আপনার কাছে শুধু এটাই চান যে, আপনি তাঁর দিকে ফিরে আসেন। আপনি তাঁর দিকে ধাবিত হন। তাঁকে সন্তুষ্ট করে, তাঁর জন্য সিজদাবনত হয়ে, তাঁর কাছে তাওবা করে, তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে, সাদাকah করে, নিজের দোষ স্বীকার করে ফিরে আসুন তাঁরই আঙিনায়।
দুনিয়ার এমন কোনো হাসপাতাল নেই, যে হাসপাতাল আপনার চিকিৎসা করে সুস্থতা এনে দিতে পারে-যদি আল্লাহ্ আপনার সুস্থতা না চান। [১]
দুনিয়ার বুকে এমন কোনো ডাক্তার নেই, যে আপনার রোগটা দূর করে দিতে পারে—যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সেটা না চান।
একবার এক ধনী লোকের একটা কিডনী নষ্ট হয়ে গেল। তার ছেলেরা তার শরীরে আরেকটা কিডনী বসানোর জন্য তাকে নিয়ে মিশরে চলল।
গ্রামের এক কিশোরীর সাথে তাদের চুক্তি হলো। তারা তাকে কিডনীর দাম হিসেবে এক লক্ষ সৌদি রিয়াল দেবে। সকালবেলা সবাই হাসপাতালে এলো। অস্ত্রোপাচারের আগমুহূর্তে লোকটা কিডনী বিক্রী করতে ইচ্ছুক কিশোরীকে দেখার ইচ্ছে পোষণ করলেন। কিশোরী সলজ্জ ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করল। বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি আমার মতো বৃদ্ধ লোকের কাছে তোমার কিডনী বিক্রী করতে রাজি হলে কেন?
'প্রয়োজনের জন্যই। আমার পরিবার দরিদ্র। আমার ভাইগুলো পড়াশুনা করছে। তাদের সহযোগিতা করার জন্য আমাকে কিছু হলেও করতে হবে।' কিশোরী বলল।
কথাগুলো বৃদ্ধের মুখে যেন চপোটাঘাতের মতো লাগল। গভীর ঘুম থেকে তিনি যেন জেগে উঠলেন। শরীরের মাঝে রক্তের জমাট বেঁধে যে একটা অংশ পচে যাচ্ছে—সেটা তিনি ভুলেই গেলেন। নিজেকে প্রশ্ন করলেন, 'একজন মানুষ কি শুধু খাওয়ার জন্য বা জীবনধারণের জন্য নিজের শরীরের একটা অঙ্গ ছাড়াও থাকতে পারে?!'
সাথে সাথে বৃদ্ধ ছেলেদের ডেকে পাঠালেন। তাদের বললেন, তাকে নিয়ে সৌদি 'আরবে ফিরে যেতে; কারণ, তিনি কিডনী বসানোর চিন্তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাদের আরও আদেশ দিলেন, তারা যেন ওই মেয়েকে এক লক্ষ রিয়াল সাদাকah করে দেন এবং তার কাছ থেকে এক রিয়ালও ফেরত না নেন।
ছেলেরা প্রতিবাদ করে উঠল। কেউ কেউ রেগেও গেল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবার আদেশ তারা মেনে নিল। সৌদি 'আরবে ফিরে আসার পর একদিন যথারীতি কিডনী ডায়ালাইসিসের জন্য বৃদ্ধ হাসপাতালে গেলেন। ডাক্তাররা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল যে, তার কিডনী আগের মতো কাজ করছে!
রাজাধিরাজ মহান আল্লাহ্ কাউকে সুস্থতা দান করতে চাইলে কোনো ডাক্তার-সার্জনের দরকার পড়ে না। সেই মহান রাজা তাঁর রাজত্ব থেকে বান্দার দিকে একবার নজর দেন—তাতেই অসুস্থ বান্দা হয়ে যায় সুস্থ, বিপদগ্রস্ত হয়ে যায় বিপদমুক্ত, মুসাফির হয় চিন্তামুক্ত আর ক্ষতবিক্ষত বান্দা হয়ে যায় ক্ষতহীন।
আগের থেকেই সময় চাওয়া
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনি তাঁর দিকে ফিরে আসেন। আপনি তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করলেই তিনি রোগটাকে আপনার শরীর থেকে তুলে নেন। কারণ, তখন আপনার শরীরে রোগ থাকার মাঝে আর কোনো কল্যাণ নেই।
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনি তাঁর প্রতি বিনয়ী হন, তাঁর দিকে নত হন। আপনি এমনটা করলে তিনি আপনার শরীর থেকে রোগটা তুলে নেন। কারণ, তখন রোগের আর কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনি অন্যের ব্যথা বুঝতে পারেন। তাদের ব্যথা বুঝতে পারলে আপনার রোগটা তিনি তুলে নেন। ফলে এই রোগ থাকার মাঝে আর কোনো কল্যাণ অবশিষ্ট থাকে না।
তিনি আপনাকে অসুস্থ করেন, যেন আপনার ধৈর্য ও সন্তুষ্টি পরীক্ষা করতে পারেন। আপনি যদি ধৈর্যধারণ করেন এবং আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন তাহলে রোগ আপনার শরীরে থাকার কোনো দরকার পড়ে না।
আরোগ্যদাতা আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য আগে থেকেই সময় চেয়ে রাখার দরকার নেই। আপনাকে কোনো ভিজিটিং কার্ডও দেখাতে হবে না। নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগে আসতে হবে—এমনটাও না।
শুধু বলুন, 'আল্লাহ্' দেখবেন, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার হাসপাতালের দরজা খুলে গেছে। এ হাসপাতাল শুধু দয়া, করুণা, কোমলতা ও সুস্থতার চাদরে ঢাকা।
আমার এক বন্ধু প্রায়ই তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা বলে থাকে। একবার একটি ছেলে তার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে এবং সাথে সাথেই ছেলেটির হাড় ভেঙ্গে যায়। সে গাড়ি থামিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটে যায়। তার বুকটা তখন দুরু দুরু করে কাঁপছে। এদিকে ছেলের বাবা আর দাদাও হাজির। আমার বন্ধু খুব বিচলিত হয়ে পড়ল। সে ভাবতেই পারছে না—তার কারণে একটি ছেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।
ছেলেটির হাড় ভাঙার শব্দ তার কানে সারাক্ষণ বাজতে থাকে; কিন্তু ছেলেটির দাদা এসে আমার বন্ধুকে সান্ত্বনা দেন। তাকে জানান, আল্লাহ্ যা লিখে রেখেছেন তাই-ই তো হবে। এর বাইরে কার কী করার আছে? বরং এতেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকা চাই।
ছেলেটির দাদা তাদের নিয়ে হাসপাতালের মাসজিদেই 'ইশার সালাত আদায় করেন। সালাতে তিনি তিলাওয়াত করেন, 'ওয়াবাশিরিস্ সাবিরীন'- 'আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করুন।' আমার বন্ধুটা এই তিলাওয়াত শুনে ডুকরে কেঁদে ওঠে।
সালাতের পর যখন তারা বেরিয়ে আসে, ডাক্তাররা ছেলের বাবা আর দাদাকে জানায়, ছেলের বেঁচে থাকার আশাটা ক্ষীণ। তার খুলিতে ফ্র্যাকচার দেখা দিয়েছে।
এ কথা শুনে আমার বন্ধু যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। নির্জীব হয়ে সে ঘরে ফিরে আসে। এক সপ্তাহ সে অফিসে পর্যন্ত যেতে পারেনি; কারণ, ঘটনার আকস্মিকতায় সে একেবারেই ভেঙে পড়েছে।
ওই ছেলেটার জন্য কোনো ঔষধই আর বাকি ছিল না; কিন্তু তার দাদার 'ঈমান, মায়ের দু'আ, বাবার দৃঢ় বিশ্বাস এবং সবার সাথেই আল্লাহর গভীর সম্পর্ক- ছেলেটিকে শেষ পর্যন্ত সুস্থ করে তুলল।
এক সপ্তাহের মাথায় আমি নিজে ওই ছেলেকে দেখতে গেলাম। ছেলেটা হাসছে- খেলছে-হাঁটছে আর আমাদের সাথে কথা বলছে। আল্লাহ্র কথা সত্য প্রমাণিত হলো আর ডাক্তারদের কথা মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। যে সত্তা ভাঙা হাড়ে জোড়া লাগাতে পারেন তার কথাই সত্য বলে প্রতীয়মান হলো। 'আল্লাহ্ মানুষের জন্য রাহমাত অবারিত করলে তা নিবারণকারী কেউ নেই।'
কে সেই সত্তা, যিনি এই ভাঙা হাড়গুলো জোড়া লাগাতে পারেন? মলিন মুখে হাসি ফোটাতে পারেন এবং কবরের দরজায় উপস্থিত শরীরে নতুন করে রূহের সঞ্চার করতে পারেন? আর কেউ নয়, একমাত্র আল্লাহই তা করতে পারেন।
একটি রেখা
নাবীদের পিতা ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম, নিজ রবের কাছ থেকে পবিত্র আত্মা নিয়ে এসেছিলেন। তার অন্তর ছিল সামান্য পরিমাণ শির্ক থেকেও মুক্ত। তিনি যা বলেছেন তা মু'মিন-মাত্রই বুঝতে পারবে। মু'মিন শুধু চিরঞ্জীব আল্লাহর কাছেই আশ্রয় নেবে। তিনি বলেছিলেন—
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ )
আর যখন আমি অসুস্থ হই তখন তিনিই সুস্থ করেন [১]
তিনি যদি আপনাকে সুস্থ করতে চান তাহলে আপনার আর কাউকেই দরকার হবে না; কিন্তু তিনি আপনাকে সুস্থ করতে না চাইলে বিশ্বলোকে এমন কেউ নেই—যে আপনাকে সুস্থ করতে পারে।
কুষ্ঠরোগে আইয়ূব 'আলাইহিস সালামের শরীর ভেঙে পড়ল। পরিবারও ভেঙে গেল। যে লোক সবচেয়ে আশাবাদী সেও তার সুস্থতার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়ল; কিন্তু তিনি অটল হয়ে ধৈর্যধারণ করে চললেন। তার শরীরে রোগ বাসা বেঁধে চলছে, কিন্তু তিনি মাথা নিচু করে মহান রবের সন্তুষ্টি কামনা করছেন। এভাবে কয়েক বছর কষ্ট পাওয়ার পর তার ঠোঁট থেকে একটি দু'আ বেরিয়ে এলো। এ দু'আয় ছিল বিনয়ের আধিক্য, সিজদারত মাথা আর দৃঢ় বিশ্বাসের শেকড়। দু'আটা ছিল—
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ )
আমি তো দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ ও দয়ালু [২]
সাথে সাথে আসমানের দয়ার দুয়ার খুলে গেল। সাত আসমানের ওপর থেকে সেই বিপদগ্রস্তের জন্য সাহায্য নেমে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই কষ্টের বছরগুলো উধাও হয়ে গেল। ঘনিয়ে এলো সুস্থতার পর্ব। তাহলে কেন আপনি অন্যের কাছে চাইতে যাবেন? কেন অন্যের দরবারে ধরনা দেবেন?
কেন ওই সব মৃত ব্যক্তিদের কাছে চাচ্ছেন—যারা আপনার আশেপাশে বিচরণ করছে? কেন চাইছেন না ওই রবের কাছে—যিনি চিরঞ্জীব, অবিনশ্বর?
কে আপনাকে এই বুঝ দিয়েছে যে, অন্য রাস্তায় আপনার সুস্থতা আসবে?
আপনার সুন্দর জীবনের সূচনা কীভাবে হয়েছে আপনি তা ভুলে গেলেন? কীভাবে ভুলে গেলেন ওই সত্তাকে যিনি আপনাকে সুস্থভাবে আপনার মায়ের পেট থেকে পৃথিবীতে আপনার আগমন ঘটিয়েছেন? তারপর তার বুকেই আপনার জন্য উত্তম আহারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আপনি কিছুই জানতেন না। তিনি আপনাকে জানালেন, কীভাবে আপনি তার বুকে ঠোঁট রেখে পান করবেন, আপনি কি তা ভুলে গেলেন? আপনি কি ভুলে গেলেন সেই সত্তাকে—যিনি আপনার মায়ের অন্তরে রাহমাত দিয়েছেন যেন তিনি আপনাকে আদর-যত্ন করেন আর মমতায় জড়িয়ে রাখেন?
এত দ্রুত আপনি ভুলে গেলেন?
আপনি কি মনে করছেন, তাঁকে ছাড়াই আপনি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবেন?
এই যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনাকে রোগ দিয়ে আগের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এ রোগের মাধ্যমে তিনি বলছেন- 'ফিরে আসো আমার দিকে। যে আমি শূন্য থেকে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, সে আমিই তোমাকে রোগমুক্ত করব।'
সন্তুষ্টি
কখনো কখনো আপনার রোগের নিরাময় আপনার কল্পনার চেয়েও নিকটে থাকে। এই যেমন নাবী আইয়ূব 'আলাইহিস সালাম, তার কাছে আদেশ এলো-পা দিয়ে যমীনে আঘাত করো। সাথে সাথে যমীন ফেটে বেরিয়ে এলো :
'এই তো গোসলের সুশীতল পানি ও পানীয়।'
রোগের ঔষধ তার কাছেই ছিল। আরোগ্যলাভের ব্যাপারে শুধু আল্লাহর ইচ্ছেটাই বাকি ছিল। আল্লাহ্ চাইলেন আর সাথে সাথে আইয়ূব 'আলাইহিস সালামও জেনে গেলেন ঔষধের জায়গাটা। আল্লাহর ইচ্ছায় এ ঔষধেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন।
ওয়াশিংটন, প্যারিস কিংবা পেকিংয়ের উদ্দেশ্যে আপনার টিকেট কাটার দরকার নেই। আপনার ঔষধ কাছেই কোথাও আছে। আপনার অন্তরে সন্তুষ্টির শহরের একটা টিকেট কাটুন।
আপনার ঔষধ আপনার কাছেই আছে; আপনি হয়তো সেটা জানেন না। আপনার অসুখও আপনার দোষেই হয়েছে; হয়তো আপনি সবর করছেন না।
আপনি যদি আল্লাহ্র সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে পারেন, আল্লাহও আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।
রোগ হলো আল্লাহ্র সন্তুষ্টির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় আপনি যদি আল্লাহকে সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেন, তাহলে তাঁর সন্তুষ্টির ফল অবশ্যই আপনি ভোগ করতে পারবেন।
কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, 'রোগাক্রান্ত হয়েও কীভাবে আমি সন্তুষ্ট হবো? রোগাক্রান্ত হলে সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই মানুষের ব্যথা-বেদনা অনুভূত হয়। যা শুধু আমিই নই, যে কেউ তা অপছন্দ করে; তো এতে কীভাবে আমি সন্তুষ্ট হবো?'
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ্ এ জিজ্ঞাসার সুন্দর জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন- 'এর মাঝে আপাত কোনো বিরোধ নেই যে, বান্দা রোগাক্রান্তবস্থায় একই সাথে সন্তুষ্টও থাকবে, আবার ব্যথার কারণে রোগটাকে ঘৃণাও করবে। যেভাবে তিক্ত ঔষধে মানুষের আরোগ্য হয় বলে ঔষধের তিক্ততার প্রতি রোগীকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়, আবার কষ্টের জন্য রোগকে ঘৃণাও করতে হয়।'
সুতরাং আপনার নাবী আপনাকে যা আদেশ করেছেন তা অন্তরের গভীর থেকে উচ্চারণ করুন-
رضيت بالله ربا وبالإسلام دينا وبمحمد صلى الله عليه وسلم نبيا
'আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে নাবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।' [১]
হৃদয়ের গভীর থেকে পূর্ণ মনোযোগ আর অনুভূতির সাথে কথাগুলো উচ্চারণ করে দেখুন। আপনার অন্তরকে এ কথা মেনে নেওয়ার জন্য অভ্যস্ত করে ফেলুন। এই বাক্যের প্রস্রবণে আপনার অন্তরকে ভালোমতো ধুয়ে-মুছে পরিচ্ছন্ন করে ফেলুন। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট হওয়া তো আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ারই অংশ। আপনি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলে তিনিও আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।
আপনার অন্তরকে বলুন সন্তুষ্টির নিঃশ্বাস নিতে। বলুন এই সন্তুষ্টির স্বাদ আস্বাদন করতে। তারপর আপনার শরীরের দিকে মনোযোগ দিন। দেখবেন—শরীরে দেখা দিয়েছে এক ঝলমলে সুস্থতার নিদর্শন।
আপনার এই রোগ থেকেই যেন সূচনা হয় জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ের। আর সেই অধ্যায়টিতে আপনি নিজ রবের ‘আশ-শাফী’ তথা আরোগ্যদাতা নামটির সাথে পরিচিত হবেন।
পাপের নদীগুলো
আপনি তো জীবনে অনেকবার অসুস্থ হয়েছেন, তাই না? তো পূর্বের সেই ‘অনেকবার’ আপনাকে কে সুস্থ করেছেন? আল্লাহই তো, তাই না? তাহলে এবার কেন মনে হচ্ছে, ‘এই রোগের ব্যাপারে তিনি অক্ষম?’ আপনি বিশ্বাস করুন, তাঁর অক্ষমতার ব্যাপারে আপনার এই দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনাই আপনার জন্য শাস্তি অবধারিত করে ফেলে। আপনার এই ভুল ধারণাই শাস্তিস্বরূপ আপনার রোগ হয়ে যায়। আগে আপনার অন্তর থেকে দুর্ভাবনার এই রোগটা দূর করুন। তারপর আরোগ্যদাতা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। দেখবেন, আপনাকে তিনি সুস্থ করে তুলছেন।
হাসপাতালের এই অসুস্থ লোকগুলো আরোগ্যদাতা আল্লাহর কাছ থেকে সুস্থতার অনুমতির অপেক্ষায় আছে। এ হাসপাতালগুলোর প্রতিটি আর্তনাদ, চিৎকার ও হাহাকার তিনি জানেন। অন্তরের গহীনের ব্যথা তিনি দেখতে পান।
অতঃপর যখন তার চাওয়া পূর্ণ হয়, আপনার আর্তনাদে পাপের নদীগুলো প্রবাহিত হয়ে যায়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তখন আপনার শরীরে সুস্থতাকে ফিরে আসার অনুমতি দেন। আপনি আল্লাহর যমীনে পাপমুক্ত হয়ে পবিত্র দেহে বিচরণ করা শুরু করেন।
তিনি যে পরম দয়ালু; তাই তিনি আপনাকে সুস্থ করে দেন। তিনি যে মহাজ্ঞানী; সে জন্যই আপনাকে তিনি সুস্থ করেন। তিনি যে সহনশীল; তাই তো আপনাকে সুস্থ করেন। তিনি যে ক্ষমতাবান; তাই তো আপনাকে তিনি সুস্থ করেন। তিনি যে আল্লাহ; তাই তো আপনাকে সুস্থ করেন।
তিনি সাথে থাকলে আপনার স্মৃতি থেকে ডাক্তারদের নাম আর ফোন নাম্বার মুছে যাবে। হাসপাতালগুলোর ঠিকানা আপনি ভুলে যাবেন। ডাক্তারের সাথে এ্যাপোয়েন্টমেন্ট আপনি বাতিল করে দেবেন।
আপনার ঘরে একটা নতুন হাসপাতাল গড়ে তুলুন। সে হাসপাতালের নাম হোক ‘জায়নামায’। সিজদার জন্য সময় বরাদ্দ রাখুন। কারও অসুস্থতায় নিয়মিত এই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য সময় ব্যয় করুন অন্তরে একটা নাম জপতে থাকুন—‘আশ-শাফী’।
হে আল্লাহ্, হে আরোগ্যদাতা, প্রতিটি দুর্বল আত্মা, প্রতিটি দুর্বল শরীর আর প্রতিটা অসুস্থ হৃদয়ের জন্য লিখে রাখুন সুস্থতা আর দয়ার ঘোষণা।
টিকাঃ
[১] রোগমুক্তির জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির পাশে কুর'আন তিলাওয়াত করা।
[১] সূরা ইয়াসিন, ৩৬: ৮২
[১] সূরা শু'আরা, ২৬: ৮০
[২] সূরা আম্বিয়া, ২১: ৮৩
[১] তিরমিযী, মিশকাত, ২৩৯৯