📄 অতিরিক্ত কাজের বোঝা
অনেকেই নিজেদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়ে নেন। এত কাজ করা কীভাবে সম্ভব হবে সে ভাবনায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। আপন সাধ্যের ব্যাপারে জানা না থাকলে, অবাস্তব অনুরোধগুলো সুন্দরভাবে না ফেরাতে পারলে কিংবা সময়ের হদিস হারিয়ে ফেললে এমনটা হয়।
"সময় অপচয় মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। মৃত্যু মানুষকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে; সময়ের অপচয় বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহ থেকে। (ইবনুল কায়্যিম রহ)"
অনুরোধে ঢেঁকি না গেলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমন লোক তো রয়েছেই যারা কিনা তাদের কাজগুলো অন্যদের দিয়ে করিয়ে নিতে চায়। ইসলাম আমাদের অন্যদের প্রয়োজন ও সাহায্যে এগিয়ে আসতে বলে। কিন্তু আমাদের নিজেদের প্রয়োজনকেও তুচ্ছ করা যাবে না। ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
আর এসব ক্ষেত্রেই আপনাকে দৃঢ়তা গড়ে তুলতে হবে। দৃঢ় হওয়া মানে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেই সবার সাথে কোমলভাবে কথা বলা। কাউকে তাচ্ছিল্য না করে 'না' বলতে পারা। এ পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগবে, একই সাথে ভুলও হবে প্রচুর। কিন্তু 'না' বলতে শেখা এমন এক দক্ষতা, যা আপনার নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে খুব প্রয়োজন। এ দক্ষতাটা না শিখলে আমাদের গোটা জীবন অন্যদের কাজ করতে করতেই ফুরিয়ে যাবে। নিজেদের জন্য তেমন কোনো সময় আর অবশিষ্ট থাকবে না। অতিরিক্ত কাজের বোঝা এড়ানোর প্রথম পদ্ধতি হলো বোঝা হতে পারে, এমন জিনিসগুলোকে 'না' বলে দেওয়া।
সময়ের হিসাব রাখুন, এক দিনে কতটুকু কাজ করতে পারবেন, আন্দাজ করে নিন। যে সময়গুলোতে বেশি সক্রিয় থাকেন আর যে সময়গুলোতে অলস, দুটো সময়কেই চিহ্নিত করুন। এরপর দেখুন এর মাঝে একদিনে বা এক সপ্তাহে আপনি কতটুকু কাজ করতে পারবেন। এভাবে আপনি আপনার সাধ্যের সীমাটুকু বুঝবেন এবং সেভাবেই নিজেকে এগিয়ে নিতে পারবেন। নিজের সীমা জানা হয়ে গেলে অতিরিক্ত কাজ চেনাও সহজ হবে। আর ঠিক এ সময়েই আপনাকে দৃঢ়চেতা হতে হবে। ভদ্রভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে কেন আপনি ওই কাজটি করতে পারবেন না।
কোনো কাজের আয়তন বড় হলে সেটাকে ভেঙে ফেলুন, ছোট ছোট ভাগ করুন। এর মানে এমন আয়তনের ভাগে ভেঙে ফেলা যতটুকু আপনি সামলাতে পারবেন। একটি বড়সড় কাজকে চাপ ছাড়া করার এটাই সবচে উত্তম পদ্ধতি। ধরুন, আপনি ৮০০ পৃষ্ঠার একটি তাফসীরের বই পড়বেন। কিন্তু এত বিশাল আয়তন দেখে আপনি বই খুলতেই ভয় পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে বইটিকে খণ্ড খণ্ড করে ফেলুন। ঘাবড়াবেন না, ছিঁড়ে ফেলতে বলছি না। যতটুকু আপনি একদিনে পড়তে পারবেন, তার একটি খসড়া চিন্তা করুন। ধরুন, একদিনে ২০ পৃষ্ঠা। এভাবে পড়লে আপনি ৮০০ পৃষ্ঠার বই মাত্র ৪০ দিনে শেষ করতে পারবেন! অসম্ভব কাজটিকেই খুব সহজ মনে হবে।
বিশ্রামের জন্য যথেষ্ট সময় না রাখাতেও অনেকে চাপ অনুভব করেন। একটি ব্রেক নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেওয়ার আগপর্যন্তই আমাদের মস্তিষ্ক কাজ করতে পারে। এজন্য প্রতি ঘণ্টায় কমপক্ষে ৫ মিনিটের বিশ্রাম প্রয়োজন। এভাবে আপনার মন সতেজ থাকে এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারবে।
📄 বার্নআউট ফাঁদ
কোনো প্রকার বিশ্রাম কিংবা আনন্দ বিনোদন ছাড়াই কাজ করে গেলে বার্নআউট হয়। আমরা যতই পুরো সময়টা কাজে লাগাতে চাই না কেন, এটা সম্ভব না। আমাদের শরীর-মন একটি পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায়, আর চলতে চায় না। কিছুক্ষণ কাজ করার পরই আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, কাজ করার গতি কমে আসে। নিজের শতভাগ দেওয়াটাও তখন আর সম্ভব হয়ে ওঠে না।
এমন পরিস্থিতিতে যখন পড়বেন, তখনই সময় বিশ্রাম নেওয়ার, একটি ছোট বিরতির। বার্নআউট এড়াতে আমরা অনেকভাবে ব্রেক নিতে পারি :
• প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিটের বিরতি
• দুপুরের খাবার আগে ১ ঘণ্টার বিশ্রাম
• প্রতি সন্ধ্যায় ১-২ ঘণ্টার আনন্দ-বিনোদন
• সপ্তাহে একদিন কাজের কথা একেবারে ভুলে যাওয়া
• বছরে ১-২ বার রুটিনের বাইরে ছুটি নেওয়া
হালালভাবে আনন্দ ও মজা করা নিয়ে অপরাধবোধের কিছু নেই। আল্লাহ এ পৃথিবীর ভালো ভালো জিনিসগুলো আমাদের উপভোগের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আর মন উৎফুল্ল রাখার জন্য এবং ভালোভাবে কাজ করতে পারার জন্য বিনোদন খুব দরকার। বিনোদন ছাড়া আমাদের মন-মেজাজ ঝিমিয়ে পড়ে আর একাগ্রতাও হারিয়ে যায়। তা ছাড়া খুব বেশি বিনোদনে ডুবে থেকে সময়ের খেই হারিয়ে ফেলাও উচিত না। ভারসাম্য থাকাটা জরুরি। আর এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে বিনোদনের চাইতে বেশি প্রাধান্য দেওয়াই ভারসাম্য।
বিরতির সময় এমন কিছু করুন, যা আপনার কাছে সত্যিই আনন্দদায়ক। সেটা হতে পারে হাঁটাহাঁটি, হালাল কিছু দেখা, বই পড়া, ব্যায়াম করা অথবা শুধুই কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ন্যাপ নেওয়া। কাজ নিয়ে একদমই ভাববেন না, শুধুই আরাম করুন।
অনেকেই ছুটি কাটাতে চান না। তাদের কাছে ছুটি কাটানোর জন্য টাকা খরচ করাটা বিলাসিতা মনে হয়। এরচেয়ে কাজ করাকে তারা ভালো মনে করেন। যদিও এ আচরণটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো, কিন্তু জীবনের টানাপড়েন থেকে মুক্তি পেতে মাঝে মাঝে ছুটির দরকার। ছুটি কাটানো মানেই অনেক টাকা-পয়সা খরচ করতে হবে, তা না। পৃথিবী জুড়ে অনেক জায়গাতেই ছুটি কাটানোর জন্য যাওয়া যেতে পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা জায়গাগুলোকে পছন্দ করি যেমন, পাহাড়, সমুদ্র, দ্বীপ। যেখানে গেলে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া যাবে, সৃষ্টিকর্তার মহিমা অনুভূত হবে, একইসাথে আত্মিক জাগরণও ঘটবে।
উমরা আমার জন্য বেশ উপকারী কিন্তু উমরা করতে সাধারণত অনেক খরচ হয়। তাই যখন তখন যাওয়া সম্ভব না। মাক্কা-মাদীনার আধ্যাত্মিক প্রশান্তিময় পরিবেশ ভ্রমণকারীর আত্মিক জগতে, তার বিশ্বাসে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। যদি উমরা না করে থাকেন এবং আপনার সামর্থ্য থাকে, তা হলে উমরা পালন করে আসুন। এটা এমন একটি যাত্রা, যা আপনি কখনও ভুলবেন না।