📄 পিপল ট্র্যাপ
অন্য মানুষেরাও আপনার জন্য বিক্ষেপণের কারণ হতে পারেন। খুব মনোযোগের কোনো কাজ করার সময় অন্যদের জানিয়ে দিন, যাতে আপনাকে বিরক্ত না করে। নিজের অফিস থাকলে ব্যাপারটা আরও সহজ। অফিসের দরজা বন্ধ রাখুন এবং বন্ধ করার আগে অন্যদের বলে দিন খুব প্রয়োজন ছাড়া যাতে আপনাকে বিরক্ত না করা হয়। ব্যক্তিগত সহকারী থাকলে তিনিই আপনার ফোনকলগুলো সামলাবেন। আপনি ব্যস্ত থাকলে এটাই সবচে ভালো। এটা সম্ভব না হলে ফোন সাইলেন্ট রাখুন, যাতে অন্য কোনো উপায়েও আপনি কারো দ্বারা বিক্ষিপ্ত না হন।
এটা আবার উন্মুক্ত অফিসগুলোতে খুব কঠিন। নিজস্ব কিউবিকল থাকলে এমন কিছু বানিয়ে নিন, যা বাকিদের বার্তা দেবে যে আপনি ব্যস্ত। এসবকিছুও যদি ব্যর্থ হয় তবে কাজ করার সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করুন। এতে করে আশেপাশে কোলাহল আপনার কানে পৌঁছাবে না, আবার কানে ইয়ারফোন আছে, এমন কাউকে সাধারণত মানুষজন তেমন বিরক্ত করে না।
📄 মাল্টি-টাস্কিং প্রবঞ্চনা
আমার টিনএজের সময়ে মাল্টি-টাস্কিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। মাল্টি-টাস্কিং যেন ছিল কারো ব্যস্ততা এবং গুরুত্ব নির্দেশক। ফোনে কথা বলতে বলতে রিপোর্ট টাইপ করছেন, আবার সাথে খবর দেখছেন এবং কফি খাচ্ছেন - এমন লোক তখন অহরহ দেখা যেত। একইসঙ্গে অনেক কিছু করাটা যেন গর্ব করার মতো কোনো বিষয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে মাল্টি-টাস্কিং প্রোডাক্টিভিটি কমিয়ে দেয় এবং একইসাথে কাজের মানেও প্রভাব পড়ে। একইসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করলে আমাদের মন কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজে ফোকাস করতে পারে না। ফলে খুব ভালো কোনো ফলাফলও দেখাতে পারি না।
আধুনিক সময়ের টাইম ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞরা একমত যে, একই সময়ে শুধু একটি কাজ মনোযোগের সাথে করলে কাজটি দ্রুত এবং ভালোভাবে শেষ হয়। কারো সাথে কথা বলার সময় তার সাথেই পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কথা বলুন। বই লিখার সময় অন্য সবকিছু বন্ধ করে লেখার কাজেই ফোকাস করুন। আর মিটিং-এর প্রস্তুতি নিলেও প্রস্তুতির কাজটিই ভালোভাবে করুন। তা হলে দেখবেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ সারতে পারছেন এবং কাজটির গুণগত মানও ভালো হবে। মাল্টি-টাস্কিং এ অন্য যে কাজগুলো করছিলেন, সেগুলো করার জন্যেও দেখবেন অনেক সময় থেকে যাচ্ছে।
এর মানে কিন্তু একদম এমন না যে, টাইম ম্যানেজমেন্টে মাল্টি-টাস্কিং এর কোনো জায়গা নেই। ব্যক্তিগতভাবে দুটো ক্ষেত্রে মাল্টি-টাস্কিংকে আমি বেশ উপকারী পেয়েছি:
• যেসব কাজে খুব বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, সেসব ক্ষেত্রে আমি কাজটি করতে করতে অডিওবুক বা লেকচারও শুনি। যেমন ধরুন, সাংসারিক বা ছোটখাটো কোনো কাজ। এতে করে আমার মস্তিষ্ক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে না এবং প্রোডাক্টিভও থাকে। আবার আমার হাত অবচেতনভাবে ছোটখাটো কাজটিও করছে। অবশ্য এজন্য কিছুটা মানসিক প্রশিক্ষণ ও দরকার। না-হয় একইসঙ্গে দুটো কাজ করতে গিয়ে ভুল করে ফেলবেন। তা ছাড়া অভ্যস্ত না হলে মনোযোগ দিয়ে কাজটি করতে পারবেন না।
• ট্রাফিকে বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়। এটা আগের চেয়ে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি কিন্তু ঘটনা অনেকটা একই। আমরা প্রায়ই এমন পরিস্থিতিতে পড়ি, যখন চুপচাপ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া বা ট্রাফিকে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। এ পরিস্থিতিগুলোতে আপনার কাছে দুটো কাজ করার সুযোগ আছে। হয় আপনি রেগেমেগে বিরক্ত হয়ে যাবেন, যা কিনা আপনার মানসিক অবস্থা, প্রোডাক্টিভিটি এমনকি ফিটনেসেও প্রভাব ফেলবে। অথবা এ সময়টাকে আপনি কাজেও লাগাতে পারেন।
যখনই আমার আধ থেকে এক ঘণ্টা সময় লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে, আমি সাথে করে একটি বই (অথবা ই-বুক) নিয়ে যাই। এতে করে সময় নষ্ট হয় না। একইভাবে ট্রাফিকে আটকে গেলে লেকচার জাতীয় কিছু শুনুন। অথবা অফিসে পৌঁছানোর আগে প্রয়োজনীয় কয়েকটা ফোনকল সেরে রাখতে পারেন। তা হলে অফিসে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারবেন। এ সময়টায় নিজের স্বপ্নগুলো নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পাবেন। অথবা এ সময়টায় ইস্তিগফার, যিক্র কিংবা দু'আ করতে পারেন।
আবার ট্রেনে কিংবা এয়ারপ্লেনে চড়ার সময় দুশ্চিন্তা বা আবোলতাবোল ভাবনায় সময় নষ্ট না করে এ সময়টা প্রোডাক্টিভ কিছু করার পেছনে দিন। এভাবে দিনশেষে দেখবেন আপনি বাকিদের চেয়ে এগিয়ে আছেন। এক্ষেত্রে মাল্টি-টাস্কিং সত্যি খুব কাজে দেয়।
ইন্টারনেট থেকে একটি প্রোগ্রাম নামাতে অথবা লোড করতে বেশি সময় লাগলে সে ফাঁকে ছোটখাটো কাজগুলো সেরে ফেলুন। আশা করি আপনার কাছে পুরো ছবিটা পরিষ্কার হয়েছে। ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হওয়ার আগপর্যন্ত মাল্টি-টাস্কিং পরিহার করুন। লাভ বেশি হলে মাল্টি-টাস্কিংয়ে লেগে পড়ুন।
এটা টাইম ম্যানেজমেন্টের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ—প্রতিটা মুহূর্তকে কাজে লাগানো। প্রতিটা ছোটখাটো সুযোগকে বড় কিছুতে রূপান্তর করা।
📄 অতিরিক্ত কাজের বোঝা
অনেকেই নিজেদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়ে নেন। এত কাজ করা কীভাবে সম্ভব হবে সে ভাবনায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। আপন সাধ্যের ব্যাপারে জানা না থাকলে, অবাস্তব অনুরোধগুলো সুন্দরভাবে না ফেরাতে পারলে কিংবা সময়ের হদিস হারিয়ে ফেললে এমনটা হয়।
"সময় অপচয় মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। মৃত্যু মানুষকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে; সময়ের অপচয় বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহ থেকে। (ইবনুল কায়্যিম রহ)"
অনুরোধে ঢেঁকি না গেলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমন লোক তো রয়েছেই যারা কিনা তাদের কাজগুলো অন্যদের দিয়ে করিয়ে নিতে চায়। ইসলাম আমাদের অন্যদের প্রয়োজন ও সাহায্যে এগিয়ে আসতে বলে। কিন্তু আমাদের নিজেদের প্রয়োজনকেও তুচ্ছ করা যাবে না। ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
আর এসব ক্ষেত্রেই আপনাকে দৃঢ়তা গড়ে তুলতে হবে। দৃঢ় হওয়া মানে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেই সবার সাথে কোমলভাবে কথা বলা। কাউকে তাচ্ছিল্য না করে 'না' বলতে পারা। এ পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগবে, একই সাথে ভুলও হবে প্রচুর। কিন্তু 'না' বলতে শেখা এমন এক দক্ষতা, যা আপনার নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে খুব প্রয়োজন। এ দক্ষতাটা না শিখলে আমাদের গোটা জীবন অন্যদের কাজ করতে করতেই ফুরিয়ে যাবে। নিজেদের জন্য তেমন কোনো সময় আর অবশিষ্ট থাকবে না। অতিরিক্ত কাজের বোঝা এড়ানোর প্রথম পদ্ধতি হলো বোঝা হতে পারে, এমন জিনিসগুলোকে 'না' বলে দেওয়া।
সময়ের হিসাব রাখুন, এক দিনে কতটুকু কাজ করতে পারবেন, আন্দাজ করে নিন। যে সময়গুলোতে বেশি সক্রিয় থাকেন আর যে সময়গুলোতে অলস, দুটো সময়কেই চিহ্নিত করুন। এরপর দেখুন এর মাঝে একদিনে বা এক সপ্তাহে আপনি কতটুকু কাজ করতে পারবেন। এভাবে আপনি আপনার সাধ্যের সীমাটুকু বুঝবেন এবং সেভাবেই নিজেকে এগিয়ে নিতে পারবেন। নিজের সীমা জানা হয়ে গেলে অতিরিক্ত কাজ চেনাও সহজ হবে। আর ঠিক এ সময়েই আপনাকে দৃঢ়চেতা হতে হবে। ভদ্রভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে কেন আপনি ওই কাজটি করতে পারবেন না।
কোনো কাজের আয়তন বড় হলে সেটাকে ভেঙে ফেলুন, ছোট ছোট ভাগ করুন। এর মানে এমন আয়তনের ভাগে ভেঙে ফেলা যতটুকু আপনি সামলাতে পারবেন। একটি বড়সড় কাজকে চাপ ছাড়া করার এটাই সবচে উত্তম পদ্ধতি। ধরুন, আপনি ৮০০ পৃষ্ঠার একটি তাফসীরের বই পড়বেন। কিন্তু এত বিশাল আয়তন দেখে আপনি বই খুলতেই ভয় পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে বইটিকে খণ্ড খণ্ড করে ফেলুন। ঘাবড়াবেন না, ছিঁড়ে ফেলতে বলছি না। যতটুকু আপনি একদিনে পড়তে পারবেন, তার একটি খসড়া চিন্তা করুন। ধরুন, একদিনে ২০ পৃষ্ঠা। এভাবে পড়লে আপনি ৮০০ পৃষ্ঠার বই মাত্র ৪০ দিনে শেষ করতে পারবেন! অসম্ভব কাজটিকেই খুব সহজ মনে হবে।
বিশ্রামের জন্য যথেষ্ট সময় না রাখাতেও অনেকে চাপ অনুভব করেন। একটি ব্রেক নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেওয়ার আগপর্যন্তই আমাদের মস্তিষ্ক কাজ করতে পারে। এজন্য প্রতি ঘণ্টায় কমপক্ষে ৫ মিনিটের বিশ্রাম প্রয়োজন। এভাবে আপনার মন সতেজ থাকে এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারবে।
📄 বার্নআউট ফাঁদ
কোনো প্রকার বিশ্রাম কিংবা আনন্দ বিনোদন ছাড়াই কাজ করে গেলে বার্নআউট হয়। আমরা যতই পুরো সময়টা কাজে লাগাতে চাই না কেন, এটা সম্ভব না। আমাদের শরীর-মন একটি পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায়, আর চলতে চায় না। কিছুক্ষণ কাজ করার পরই আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, কাজ করার গতি কমে আসে। নিজের শতভাগ দেওয়াটাও তখন আর সম্ভব হয়ে ওঠে না।
এমন পরিস্থিতিতে যখন পড়বেন, তখনই সময় বিশ্রাম নেওয়ার, একটি ছোট বিরতির। বার্নআউট এড়াতে আমরা অনেকভাবে ব্রেক নিতে পারি :
• প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিটের বিরতি
• দুপুরের খাবার আগে ১ ঘণ্টার বিশ্রাম
• প্রতি সন্ধ্যায় ১-২ ঘণ্টার আনন্দ-বিনোদন
• সপ্তাহে একদিন কাজের কথা একেবারে ভুলে যাওয়া
• বছরে ১-২ বার রুটিনের বাইরে ছুটি নেওয়া
হালালভাবে আনন্দ ও মজা করা নিয়ে অপরাধবোধের কিছু নেই। আল্লাহ এ পৃথিবীর ভালো ভালো জিনিসগুলো আমাদের উপভোগের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আর মন উৎফুল্ল রাখার জন্য এবং ভালোভাবে কাজ করতে পারার জন্য বিনোদন খুব দরকার। বিনোদন ছাড়া আমাদের মন-মেজাজ ঝিমিয়ে পড়ে আর একাগ্রতাও হারিয়ে যায়। তা ছাড়া খুব বেশি বিনোদনে ডুবে থেকে সময়ের খেই হারিয়ে ফেলাও উচিত না। ভারসাম্য থাকাটা জরুরি। আর এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে বিনোদনের চাইতে বেশি প্রাধান্য দেওয়াই ভারসাম্য।
বিরতির সময় এমন কিছু করুন, যা আপনার কাছে সত্যিই আনন্দদায়ক। সেটা হতে পারে হাঁটাহাঁটি, হালাল কিছু দেখা, বই পড়া, ব্যায়াম করা অথবা শুধুই কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ন্যাপ নেওয়া। কাজ নিয়ে একদমই ভাববেন না, শুধুই আরাম করুন।
অনেকেই ছুটি কাটাতে চান না। তাদের কাছে ছুটি কাটানোর জন্য টাকা খরচ করাটা বিলাসিতা মনে হয়। এরচেয়ে কাজ করাকে তারা ভালো মনে করেন। যদিও এ আচরণটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো, কিন্তু জীবনের টানাপড়েন থেকে মুক্তি পেতে মাঝে মাঝে ছুটির দরকার। ছুটি কাটানো মানেই অনেক টাকা-পয়সা খরচ করতে হবে, তা না। পৃথিবী জুড়ে অনেক জায়গাতেই ছুটি কাটানোর জন্য যাওয়া যেতে পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা জায়গাগুলোকে পছন্দ করি যেমন, পাহাড়, সমুদ্র, দ্বীপ। যেখানে গেলে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া যাবে, সৃষ্টিকর্তার মহিমা অনুভূত হবে, একইসাথে আত্মিক জাগরণও ঘটবে।
উমরা আমার জন্য বেশ উপকারী কিন্তু উমরা করতে সাধারণত অনেক খরচ হয়। তাই যখন তখন যাওয়া সম্ভব না। মাক্কা-মাদীনার আধ্যাত্মিক প্রশান্তিময় পরিবেশ ভ্রমণকারীর আত্মিক জগতে, তার বিশ্বাসে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। যদি উমরা না করে থাকেন এবং আপনার সামর্থ্য থাকে, তা হলে উমরা পালন করে আসুন। এটা এমন একটি যাত্রা, যা আপনি কখনও ভুলবেন না।