📄 ফোন-ফাঁদ
মেইলের পাশাপাশি এখনকার সময়ে আরও অনেক বিক্ষেপক আছে। মেইল ছাড়াও আছে এসএমএস, ভয়েস মেইল, ফোনকল, ফেসবুক নোটিফিকেশন ইত্যাদি। কল ধরা অথবা নোটিফিকেশন আসামাত্রই মোবাইল চেক করার একটি আকর্ষণ আমরা সচরাচরই অনুভব করি। এই আকর্ষণকে দমাতে হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় মোবাইলটা বন্ধই রাখুন। এরপর প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ মিনিটের জন্য মোবাইলে নোটিফিকেশন চেক করতে পারেন। ওই ৫৫ মিনিট আপনি অফলাইন থাকার পরও পৃথিবী কিন্তু ধ্বংস হয়ে যায়নি। তাই না? বরং আপনি ভালোভাবে আপনার কাজ করতে পেরেছেন এবং তবু প্রতিটা নোটিফিকেশন দেখার জন্য পাঁচ মিনিট সময় পেয়েছেন।
ফোন-ফাঁদ এড়াতে অন্য কোনো পদ্ধতিও অনুসরণ করতে পারেন। পারলে কলগুলোর উত্তর দেবার জন্য একজন সহকারী নিয়োগ করুন। তিনি আপনাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কলগুলোর একটি তালিকা দেবেন, যাদের সাথে দিনের শেষে যোগাযোগ করতে পারেন। এছাড়াও ভয়েস মেইল সুবিধা চালু করতে পারেন, যাতে বুঝতে পারেন কোন কলগুলো ব্যাক করতে হবে।
ফোনকলে থাকাকালেও খেই হারিয়ে ফেলবেন না। ফোনের অপর পাশের মানুষটিকে বলুন, আপনি সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট কথা বলতে পারবেন (অথবা আপনার বিবেচনা অনুযায়ী কোনো সময়)। এরপর আপনাকে কাজে ফিরে যেতে হবে। এটা বলা হলে তারা অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন এড়াতে সচেতন থাকবেন এবং যথাসম্ভব মূল বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলবে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি ফোনে কথা বলার সময় বলে দিই যে, আমার পছন্দের মাধ্যম হলো ইমেইল। ফোনের চেয়ে মেইলে আমি বিস্তারিতভাবে উত্তর দিতে পারব। এভাবে যখন সবাই বিষয়টা বুঝে গেল তখন ধীরে ধীরে ফোনকলের পরিমাণ কমে গেল এবং মেইল আসা বেড়ে গেল। এটা আসলে ভালো। মেইলে মূল বক্তব্যকে ঘিরে প্রাসঙ্গিক কথা লেখা হয়। ফোনে কথা বলার সময়ে যেমন অপ্রয়োজনীয় কথা চলে আসে, ইমেইলে তেমন ঘটে না।
📄 কাজের পরিবেশ
আপনার কাজের পরিবেশ কেমন এটাও গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কাজের জায়গায় আপনার চারপাশে কী কী আছে এটা অনেকেই খেয়াল করেন না। অনেক সময় আশপাশে অকাজের জিনিসপত্র রেখে নিজেরাই নিজেদের বিক্ষিপ্ত করি।
আপনার কাজের জায়গায় শুধু সে জিনিসগুলোই রাখুন, যা দিয়ে আপনি কাজ করবেন আর অতিরিক্ত কিছুই না। ডেস্ক, চেয়ার, কম্পিউটার, বই, স্টেশনারি ইত্যাদি সব এমনভাবে রাখুন যাতে আপনার সময় বাঁচে। আর অন্য সবকিছু দৃষ্টির বাইরে তথা মন থেকেও দূরে রাখুন।
যেমন, ডেস্কে যেকোনো ধরনের ম্যাগাজিন রাখাটা মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করবে। হয়তো কাজ করতে করতে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টিয়ে দেখতে ইচ্ছে হবে। একই ব্যাপার ভিডিও, বিনোদন ওয়েবসাইট, ভিডিও গেমস ইত্যাদি যেকোনো কিছুর ক্ষেত্রেও। সমাধান হলো সাদামাটা থাকা। যা এই মুহূর্তে দরকার, তা হাতের কাছাকাছি থাকা এবং অন্য সবকিছু প্রয়োজনে না আসা পর্যন্ত দূরে রাখা।
📄 পিপল ট্র্যাপ
অন্য মানুষেরাও আপনার জন্য বিক্ষেপণের কারণ হতে পারেন। খুব মনোযোগের কোনো কাজ করার সময় অন্যদের জানিয়ে দিন, যাতে আপনাকে বিরক্ত না করে। নিজের অফিস থাকলে ব্যাপারটা আরও সহজ। অফিসের দরজা বন্ধ রাখুন এবং বন্ধ করার আগে অন্যদের বলে দিন খুব প্রয়োজন ছাড়া যাতে আপনাকে বিরক্ত না করা হয়। ব্যক্তিগত সহকারী থাকলে তিনিই আপনার ফোনকলগুলো সামলাবেন। আপনি ব্যস্ত থাকলে এটাই সবচে ভালো। এটা সম্ভব না হলে ফোন সাইলেন্ট রাখুন, যাতে অন্য কোনো উপায়েও আপনি কারো দ্বারা বিক্ষিপ্ত না হন।
এটা আবার উন্মুক্ত অফিসগুলোতে খুব কঠিন। নিজস্ব কিউবিকল থাকলে এমন কিছু বানিয়ে নিন, যা বাকিদের বার্তা দেবে যে আপনি ব্যস্ত। এসবকিছুও যদি ব্যর্থ হয় তবে কাজ করার সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করুন। এতে করে আশেপাশে কোলাহল আপনার কানে পৌঁছাবে না, আবার কানে ইয়ারফোন আছে, এমন কাউকে সাধারণত মানুষজন তেমন বিরক্ত করে না।
📄 মাল্টি-টাস্কিং প্রবঞ্চনা
আমার টিনএজের সময়ে মাল্টি-টাস্কিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। মাল্টি-টাস্কিং যেন ছিল কারো ব্যস্ততা এবং গুরুত্ব নির্দেশক। ফোনে কথা বলতে বলতে রিপোর্ট টাইপ করছেন, আবার সাথে খবর দেখছেন এবং কফি খাচ্ছেন - এমন লোক তখন অহরহ দেখা যেত। একইসঙ্গে অনেক কিছু করাটা যেন গর্ব করার মতো কোনো বিষয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে মাল্টি-টাস্কিং প্রোডাক্টিভিটি কমিয়ে দেয় এবং একইসাথে কাজের মানেও প্রভাব পড়ে। একইসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করলে আমাদের মন কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজে ফোকাস করতে পারে না। ফলে খুব ভালো কোনো ফলাফলও দেখাতে পারি না।
আধুনিক সময়ের টাইম ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞরা একমত যে, একই সময়ে শুধু একটি কাজ মনোযোগের সাথে করলে কাজটি দ্রুত এবং ভালোভাবে শেষ হয়। কারো সাথে কথা বলার সময় তার সাথেই পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কথা বলুন। বই লিখার সময় অন্য সবকিছু বন্ধ করে লেখার কাজেই ফোকাস করুন। আর মিটিং-এর প্রস্তুতি নিলেও প্রস্তুতির কাজটিই ভালোভাবে করুন। তা হলে দেখবেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ সারতে পারছেন এবং কাজটির গুণগত মানও ভালো হবে। মাল্টি-টাস্কিং এ অন্য যে কাজগুলো করছিলেন, সেগুলো করার জন্যেও দেখবেন অনেক সময় থেকে যাচ্ছে।
এর মানে কিন্তু একদম এমন না যে, টাইম ম্যানেজমেন্টে মাল্টি-টাস্কিং এর কোনো জায়গা নেই। ব্যক্তিগতভাবে দুটো ক্ষেত্রে মাল্টি-টাস্কিংকে আমি বেশ উপকারী পেয়েছি:
• যেসব কাজে খুব বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, সেসব ক্ষেত্রে আমি কাজটি করতে করতে অডিওবুক বা লেকচারও শুনি। যেমন ধরুন, সাংসারিক বা ছোটখাটো কোনো কাজ। এতে করে আমার মস্তিষ্ক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে না এবং প্রোডাক্টিভও থাকে। আবার আমার হাত অবচেতনভাবে ছোটখাটো কাজটিও করছে। অবশ্য এজন্য কিছুটা মানসিক প্রশিক্ষণ ও দরকার। না-হয় একইসঙ্গে দুটো কাজ করতে গিয়ে ভুল করে ফেলবেন। তা ছাড়া অভ্যস্ত না হলে মনোযোগ দিয়ে কাজটি করতে পারবেন না।
• ট্রাফিকে বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়। এটা আগের চেয়ে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি কিন্তু ঘটনা অনেকটা একই। আমরা প্রায়ই এমন পরিস্থিতিতে পড়ি, যখন চুপচাপ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া বা ট্রাফিকে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। এ পরিস্থিতিগুলোতে আপনার কাছে দুটো কাজ করার সুযোগ আছে। হয় আপনি রেগেমেগে বিরক্ত হয়ে যাবেন, যা কিনা আপনার মানসিক অবস্থা, প্রোডাক্টিভিটি এমনকি ফিটনেসেও প্রভাব ফেলবে। অথবা এ সময়টাকে আপনি কাজেও লাগাতে পারেন।
যখনই আমার আধ থেকে এক ঘণ্টা সময় লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে, আমি সাথে করে একটি বই (অথবা ই-বুক) নিয়ে যাই। এতে করে সময় নষ্ট হয় না। একইভাবে ট্রাফিকে আটকে গেলে লেকচার জাতীয় কিছু শুনুন। অথবা অফিসে পৌঁছানোর আগে প্রয়োজনীয় কয়েকটা ফোনকল সেরে রাখতে পারেন। তা হলে অফিসে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারবেন। এ সময়টায় নিজের স্বপ্নগুলো নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পাবেন। অথবা এ সময়টায় ইস্তিগফার, যিক্র কিংবা দু'আ করতে পারেন।
আবার ট্রেনে কিংবা এয়ারপ্লেনে চড়ার সময় দুশ্চিন্তা বা আবোলতাবোল ভাবনায় সময় নষ্ট না করে এ সময়টা প্রোডাক্টিভ কিছু করার পেছনে দিন। এভাবে দিনশেষে দেখবেন আপনি বাকিদের চেয়ে এগিয়ে আছেন। এক্ষেত্রে মাল্টি-টাস্কিং সত্যি খুব কাজে দেয়।
ইন্টারনেট থেকে একটি প্রোগ্রাম নামাতে অথবা লোড করতে বেশি সময় লাগলে সে ফাঁকে ছোটখাটো কাজগুলো সেরে ফেলুন। আশা করি আপনার কাছে পুরো ছবিটা পরিষ্কার হয়েছে। ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হওয়ার আগপর্যন্ত মাল্টি-টাস্কিং পরিহার করুন। লাভ বেশি হলে মাল্টি-টাস্কিংয়ে লেগে পড়ুন।
এটা টাইম ম্যানেজমেন্টের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ—প্রতিটা মুহূর্তকে কাজে লাগানো। প্রতিটা ছোটখাটো সুযোগকে বড় কিছুতে রূপান্তর করা।