📄 ধৈর্য
নিজের স্বপ্ন এবং লক্ষ্যগুলো পূরণ করা অল্প সময়ের প্রজেক্ট না। এজন্য প্রয়োজন সারা জীবন সুন্দরভাবে একটি ভালো জীবনব্যবস্থার প্রতি কমিটেড থাকা। আবার এজন্য দরকার প্রচুর ধৈর্য। অনেক বড় স্বপ্ন ও লক্ষ্যগুলো রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
আপনার সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা করতে হবে এবং সুদূরপ্রসারী ফলাফলের কথাও মাথায় রাখতে হবে। এটা করার একটি অন্যতম উপায় হলো লক্ষ্যগুলোকে কল্পনার চোখে দেখা। এমনভাবে দেখা যেন তা একেবারে চোখের সামনেই, যেন তা সত্যিই ঘটছে। ধরুন, আপনি স্বপ্ন দেখেন ছোট একটি দ্বীপের মাঝে একটি সুন্দর বাড়ির। এখন দ্বীপের সে বাড়িটি নিয়ে এমনভাবে ভাবুন আর কল্পনা করুন, যাতে প্রতিদিন সে স্বপ্ন পূরণের জন্য ছুটতে অনুপ্রেরণা খুঁজে পান। যদিও সে স্বপ্ন পূরণ হতে ৫-১০ বছর লেগে যায়।
আমরা মুসলিমরা জান্নাত নিয়ে সারা জীবন এই কাজটিই করি। আমরা জান্নাতের দৃশ্য কল্পনা করি, ভাবি সেখানে আমাদের ঘরটা দেখতে কেমন হবে, কীভাবে জান্নাতে গেলে আমাদের সব দুঃখ-কষ্টের অবসান হবে। এতে করে আমরা গুনাহ থেকে দূরে থাকতে অনুপ্রাণিত হই। আর এটা আমরা গোটা জীবন ধরেই করি। জান্নাত পেতে যে ধৈর্য দরকার, এটা তারই অংশ। আর এই কাজটি আমরা পার্থিব কাজের ক্ষেত্রেও করতে পারি।
📄 অধ্যবসায়
লক্ষ্য পূরণের পথে অনেক বাধা-বিপত্তি আপনার সামনে এসে দাঁড়াবে। এটাই জগতের নিয়ম। তাই সুখে থাকতে হলে এটা মেনে নিয়েই পথ চলতে হবে। দুনিয়ার জগৎ নিখুঁত না, এটা পরীক্ষার জায়গা। আর তাই আমরা বিভিন্নভাবে এখানে পরীক্ষিত হব।
এখানে মূল কথা হলো প্রস্তুত থাকা। লক্ষ্য অর্জনের পথে যেকোনো বাধা মোকাবিলা করার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন। যেকোনো বাধাকে ইতিবাচকভাবে দেখুন। যে বাধাই আসুক না কেন, সামনে এগিয়ে যান। সব পরিস্থিতিতে শান্ত থাকুন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করুন। সব বাধা সরে যাবে।
প্রতিটা লক্ষ্য পূরণের পথেই বাধা আসবে। বাধাহীন কোনো লক্ষ্যই আসলে অতটা মূল্যবান নয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার স্বাধীনতা সংগ্রামের কথাই ধরুন। তিনি বহু বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষের সমঅধিকার ও স্বাধীনতা আদায়ের জন্য কাজ করেছেন। আর শেষ পর্যন্ত তিনি সে কাঙ্ক্ষিত বাধার মুখোমুখি হন—কারাগার।
তবু তিনি তার লক্ষ্য পূরণে লেগে ছিলেন। ২৭ বছর কারাবন্দি থেকেও হাল ছাড়েননি। দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের সাথে তার এই অপ্রতিরোধ্য মানসিকতা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
আপনার লক্ষ্যগুলো ম্যান্ডেলার লক্ষ্যের মতো অতটা মহত্ত্বর নাও হতে পারে। কিন্তু মূলনীতি একই। যদি লক্ষ্যটা বলার মতো কিছু একটি হয়, যদি এমন কিছু হয় যার জন্য লড়াই করাটা সার্থক, তবে কোনো পিছুটানই আপনার পথে বাধা সৃষ্টি করা উচিত নয়।
📄 আত্ম-নিয়ন্ত্রণ
আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সবরের আরেকটা অনুবাদ। সাধারণভাবে এর অর্থ গুনাহ করতে চাওয়ার ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করা। টাইম ম্যানেজমেন্টের জন্যেও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ খুব প্রয়োজনীয়। এটা আমাদের সবার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে থাকা উচিত। আমাদের সবারই কখনও না কখনও অযথা সময় নষ্ট করতে ইচ্ছে করে, এমন কিছু করার ইচ্ছে জাগে, যা নিয়ে পরবর্তী সময়ে আমরা হয়তো খুব আফসোস করব। সে সময়গুলোতে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের গুণ থাকা খুব জরুরি। আমাদের মন্দ চাওয়াগুলোকে সাধ্যমতো দমন করে লক্ষ্যের প্রতি সজাগ থাকা উচিত।
আত্ম-নিয়ন্ত্রণ আত্ম-বিশ্বাসের জন্যেও খুব ভালো। আপনার প্রবৃত্তি, ভাবনা এবং কাজগুলো যত আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তত বেশি আপনি আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অনুভব করবেন। এটি আবার আপনার প্রোডাক্টিভিটিও বাড়িয়ে দেবে। টাইম ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব মানে আছে। প্রয়োজনীয় কাজ করার সময় মোবাইল এবং ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ রাখাও এর মাঝে পড়ে। যখন অলসতা করবেন তখনও নিজেকে একটু জোর দিন, কাজ করুন। আবার কাজের দিনগুলোতে ইউটিউব আর কমেডি ওয়েবসাইটে সময় নষ্ট করার তীব্র ইচ্ছেটাকেও রোধ করুন।
📄 ধারাবাহিকতা
সবর ধারাবাহিকতার অর্থও বহন করে। ধারাবাহিকতা বজায় রাখা টাইম ম্যানেজমেন্টের মৌলিকতম একটি বিষয়। শিডিউল তৈরি করেও যদি সে অনুযায়ী কাজ না করেন, তা হলে লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। একটি শিডিউল বা টু-ডু লিস্ট মেনে চলা খুব গুরুত্বপূর্ণ আর এজন্যে দরকার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।
যেকোনো কাজ হোক দীর্ঘ বা স্বল্প সময়ব্যাপী, উভয় ক্ষেত্রেই ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। এ ধরনের লক্ষ্য অর্জনে প্রতিদিন ছোট ছোট পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া সফলতার ভিন্ন কোনো পথ নেই। কিন্তু এ পদক্ষেপগুলোকে হতে হবে সুপরিকল্পিত এবং প্রয়োগ করতে হবে ধারাবাহিকভাবে।
ইবনু জাওযী ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে একজন ভালো উদাহরণ। সারা জীবনে তিনি এক হাজারেরও বেশি বই লিখেছেন। এ অর্জন সম্ভব হয়েছে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং কঠোরভাবে সময় মেনে চলার কারণে। ইমাম যাহাবী আবদুল লাতিফের সূত্রে বলেছেন, “ইবনু জাওযী একমুহূর্ত সময়ও নষ্ট করেননি। তিনি দিনে চারবার রেজিস্ট্রি করতেন। তবু তার সংকলন, শিক্ষকতা এবং ফাতওয়া দেওয়ার কাজও অব্যাহত ছিল। এটা আসলে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিনের লক্ষ্য পূরণ করে যাওয়ার সুফল।”