📘 টাইম ম্যানেজমেন্ট 📄 বার্নআউট সামলানো

📄 বার্নআউট সামলানো


কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে একই দিনে অনেকগুলো কাজ করে ফেলতে চান। এতে করে তারা নিজেদের ঘাড়ে অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন। আর শেষপর্যন্ত এ অতিরিক্ত বোঝা মোড় নেয় বার্নআউটে। বার্নআউট হলো খুব বেশি কাজ করে ফেলার ফলে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ক্লান্তিকর অনুভূতি। এর ফলে আরও কাজ করতে যাওয়ার ব্যাপারে সমস্ত আগ্রহ চলে যায়। বার্নআউট বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আসতে পারে।

বার্নআউট এড়ানোর সবচে ভালো উপায় হলো সাধ্যের চেয়ে অতিরিক্ত কাজের বোঝা কাঁধে না নেওয়া। এজন্য নিজের লক্ষ্য এবং সীমাবদ্ধতাগুলো জানা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। দরকারি ও সাধ্যের মধ্যকার কাজগুলোই হাতে নেওয়া উচিত। এই বিষয়টা আমি বেশ কাঠখড় পুড়িয়েই শিখেছি।

২০১১-এর দিকে অনেকগুলো কাজ একইসঙ্গে করছিলাম। ৬-৮ ঘণ্টা ধরে এরাবিক ক্লাস নিচ্ছি, বই লিখছি, ৮ ঘণ্টার ফুলটাইম চাকরি করছি সপ্তাহে ৬ দিন, একইসাথে চলছে BAIS-এ পড়াশোনা। ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন জায়গায় লেকচার দিচ্ছি, ১০ ঘণ্টা প্রতি সপ্তাহে অনলাইন ক্লাসও নিচ্ছি। এসবের পর পরিবারকেও সময় দিয়েছি। কাজের অতিরিক্ত চাপে আমি তখন বেশ মেজাজি এবং গম্ভীর হয়ে পড়লাম। কারণ, আমি আমার শরীর এবং মস্তিষ্কের সাধ্যের চেয়ে বেশি বোঝা নিয়ে ফেলেছিলাম। আবার নিজে যথাযথ সময় না দেওয়ায় সবকিছুর মাঝে ভারসাম্যও রক্ষা করতে পারছিলাম না।

এই অবস্থায় কিছু কিছু কাজ থেকে আমার অব্যাহতি নেওয়া জরুরি হয়ে দাঁড়াল। এরাবিক ক্লাস নেওয়া ছেড়ে দিলাম এবং বিভিন্ন জায়গায় লেকচার দিতে যাওয়া কমিয়ে দিলাম, যাতে নিজেকে এবং পরিবারকে আরও বেশি সময় দিতে পারি। এতে করে আমার মাসিক আয় কমে গেলেও মানসিক প্রশান্তি এবং সুখ টাকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক প্রশান্তি থাকলে ভবিষ্যতে আরও আয় করা সম্ভব হবে এবং কাজও আরও মানসম্মত হবে।

এই প্রসঙ্গে মনে রাখা উচিত যে, প্রাত্যহিক রুটিনে যেন বিশ্রাম এবং বিনোদনের জন্য যথেষ্ট সময় বরাদ্দ থাকে। অনেকেই এসবকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে বিবেচনা করেন না। তারা এগুলোকে সময়ের অপচয় ভাবেন। কিন্তু আল্লাহ আমাদের কিছু চাহিদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এসব চাহিদার মাঝে আছে বিনোদন এবং বিশ্রাম। এসব এড়িয়ে গেলে আমরাও বার্নআউটের স্বীকার হব। কারণ, মানবমস্তিষ্ক বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করার আগপর্যন্তই কাজ করতে পারে। এরপর আর পারে না।

তাই নিজের ওপর দয়া করুন এবং যখনই দরকার হয় তখনই বিশ্রাম নিন। প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ মিনিটের একটি বিশ্রাম নিন, প্রতি সন্ধ্যায় নিজেকে এক ঘণ্টা সময় দিন। আর সপ্তাহে একটি দিন শুধু আরাম করবেন, এদিন কাজ নিয়ে কিছুই ভাববেন না।

প্রতি বছর একবার ঘুরতে যান। আল্লাহর এই সুন্দর পৃথিবীটা ঘুরে আসুন। এখানে মূল কথা হলো একটি ব্রেক নেওয়া এবং মনকে বিশ্রাম দেওয়া। কাজের সময়ে কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব পালনের সময়ে এটা সম্ভব না। এজন্য দরকার নির্জন একান্ত সময়। আর নিজের জন্য এমন সময় নেওয়াতে মোটেও দোষের কিছু নেই।

অধিকাংশ চাকরিতেই সপ্তাহে এক বা দুদিন ছুটি থাকে। কিন্তু সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের কাজের চাপের দুশ্চিন্তায় অনেকে এ ছুটির দিনগুলোও উপভোগ করতে পারেন না। সমাধান সে আগেরটাই—হাতের কাজে মন দিন। এক্ষেত্রে হাতের কাজটি হলো আরাম করা, বিশ্রাম নেওয়া। আরাম করার সময় মনকে দুশ্চিন্তা করার সুযোগ দেবেন না। সুখের এবং আনন্দময় জিনিস নিয়ে ভাবুন, মুহূর্তটা উপভোগ করুন। বিশ্রামের সময়টায় যা করছি, তা আনন্দের সাথে করুন। তা হলে আগামীকালের কাজ করতে আরও বেশি অনুপ্রেরণা পাবেন।

করে দেখুন, সত্যি ভীষণ উপকার পাবেন। পাঁচ মিনিটের হলেও ব্রেক নিন। সজীব অনুভূতি আবারও আপনার ভেতরটাকে উজ্জীবিত করে তুলবে।

বার্নআউট এড়াতে আমার সর্বশেষ উপদেশ হলো অযথা কাজ এবং মানসিক চাপকে 'না' বলুন। অন্যকে 'না' বলতে, তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে অনেকেই বিব্রতবোধ করেন। তারা ভাবেন সবার কাজ করে দেওয়া তাদের যেন অবশ্য কর্তব্য। এ ধরনের স্বভাব অবাস্তব এবং আনপ্রোডাক্টিভ, ইসলাম আপনাকে এসব করতে বাধ্য করে না। ভদ্রভাবে 'না' বলা শিখুন, তখন মানুষও বুঝতে পারবে যে আপনি ব্যস্ত এবং তারা বিষয়টা ধীরে ধীরে মেনে নেবে।

📘 টাইম ম্যানেজমেন্ট 📄 সবর থাকা

📄 সবর থাকা


গতিবেগ ধরে রাখার মানে সামনের সব বাধা ঠেলে নিজেকে এগিয়ে নিতে থাকা। এটাকেই আরবিতে সবর বলা হয়। একজন বিশ্বাসীর চরিত্রে এটা অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য, যার উল্লেখ কুরআনে অসংখ্যবার হয়েছে। সবরের অনুবাদ সাধারণত করা হয় ধৈর্য। কিন্তু সবর মানে শুধু ধৈর্য নয়, বরং এর সাথে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। ধৈর্য ছাড়াও অধ্যবসায়, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিকতাও এর অর্থের মধ্যে পড়ে। এ প্রত্যেকটা বিষয়ই টাইম ম্যানেজমেন্টের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

📘 টাইম ম্যানেজমেন্ট 📄 ধৈর্য

📄 ধৈর্য


নিজের স্বপ্ন এবং লক্ষ্যগুলো পূরণ করা অল্প সময়ের প্রজেক্ট না। এজন্য প্রয়োজন সারা জীবন সুন্দরভাবে একটি ভালো জীবনব্যবস্থার প্রতি কমিটেড থাকা। আবার এজন্য দরকার প্রচুর ধৈর্য। অনেক বড় স্বপ্ন ও লক্ষ্যগুলো রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

আপনার সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা করতে হবে এবং সুদূরপ্রসারী ফলাফলের কথাও মাথায় রাখতে হবে। এটা করার একটি অন্যতম উপায় হলো লক্ষ্যগুলোকে কল্পনার চোখে দেখা। এমনভাবে দেখা যেন তা একেবারে চোখের সামনেই, যেন তা সত্যিই ঘটছে। ধরুন, আপনি স্বপ্ন দেখেন ছোট একটি দ্বীপের মাঝে একটি সুন্দর বাড়ির। এখন দ্বীপের সে বাড়িটি নিয়ে এমনভাবে ভাবুন আর কল্পনা করুন, যাতে প্রতিদিন সে স্বপ্ন পূরণের জন্য ছুটতে অনুপ্রেরণা খুঁজে পান। যদিও সে স্বপ্ন পূরণ হতে ৫-১০ বছর লেগে যায়।

আমরা মুসলিমরা জান্নাত নিয়ে সারা জীবন এই কাজটিই করি। আমরা জান্নাতের দৃশ্য কল্পনা করি, ভাবি সেখানে আমাদের ঘরটা দেখতে কেমন হবে, কীভাবে জান্নাতে গেলে আমাদের সব দুঃখ-কষ্টের অবসান হবে। এতে করে আমরা গুনাহ থেকে দূরে থাকতে অনুপ্রাণিত হই। আর এটা আমরা গোটা জীবন ধরেই করি। জান্নাত পেতে যে ধৈর্য দরকার, এটা তারই অংশ। আর এই কাজটি আমরা পার্থিব কাজের ক্ষেত্রেও করতে পারি।

📘 টাইম ম্যানেজমেন্ট 📄 অধ্যবসায়

📄 অধ্যবসায়


লক্ষ্য পূরণের পথে অনেক বাধা-বিপত্তি আপনার সামনে এসে দাঁড়াবে। এটাই জগতের নিয়ম। তাই সুখে থাকতে হলে এটা মেনে নিয়েই পথ চলতে হবে। দুনিয়ার জগৎ নিখুঁত না, এটা পরীক্ষার জায়গা। আর তাই আমরা বিভিন্নভাবে এখানে পরীক্ষিত হব।

এখানে মূল কথা হলো প্রস্তুত থাকা। লক্ষ্য অর্জনের পথে যেকোনো বাধা মোকাবিলা করার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন। যেকোনো বাধাকে ইতিবাচকভাবে দেখুন। যে বাধাই আসুক না কেন, সামনে এগিয়ে যান। সব পরিস্থিতিতে শান্ত থাকুন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করুন। সব বাধা সরে যাবে।

প্রতিটা লক্ষ্য পূরণের পথেই বাধা আসবে। বাধাহীন কোনো লক্ষ্যই আসলে অতটা মূল্যবান নয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার স্বাধীনতা সংগ্রামের কথাই ধরুন। তিনি বহু বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষের সমঅধিকার ও স্বাধীনতা আদায়ের জন্য কাজ করেছেন। আর শেষ পর্যন্ত তিনি সে কাঙ্ক্ষিত বাধার মুখোমুখি হন—কারাগার।

তবু তিনি তার লক্ষ্য পূরণে লেগে ছিলেন। ২৭ বছর কারাবন্দি থেকেও হাল ছাড়েননি। দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের সাথে তার এই অপ্রতিরোধ্য মানসিকতা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

আপনার লক্ষ্যগুলো ম্যান্ডেলার লক্ষ্যের মতো অতটা মহত্ত্বর নাও হতে পারে। কিন্তু মূলনীতি একই। যদি লক্ষ্যটা বলার মতো কিছু একটি হয়, যদি এমন কিছু হয় যার জন্য লড়াই করাটা সার্থক, তবে কোনো পিছুটানই আপনার পথে বাধা সৃষ্টি করা উচিত নয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px