📄 পরিকল্পনা
পরিকল্পনা করা ইতিহাসের প্রতিটা সফল ব্যক্তির জীবনধারার উপকরণ ছিল। দেখুন না, নবিজির হিজরাত কতটা সুপরিকল্পিত ছিল! খালিদ ইবনু ওয়ালিদ যুদ্ধের জন্য তার সৈন্যদের কত বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে সাজিয়েছিলেন। এবং ইসলামের ইতিহাস জুড়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর পেছনে কত পরিকল্পনার ছাপ ছিল!
যথেষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া বড়সড় কিছু করা সম্ভব নয়। আর তাই পরিকল্পনা করার অভ্যাস গড়ে তোলা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটা হতে পারে একটি লক্ষ্য পূরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা তৈরি করা অথবা প্রতিটা দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, লেকচার, মিটিং কিংবা একটি ক্লাসের জন্য পরিকল্পনার ছক সাজানো। দীর্ঘ জীবন পরিক্রমায় এ অভ্যাসটি সময়ের সদ্ব্যবহারে এবং জীবনের সেরাটুকু দিতে আমাদের সাহায্য করে।
📄 ভেঙে ভেঙে কাজ করা
গড়িমসি করার পেছনে খুব বড় একটি কারণ হলো—সামনে থাকা কাজগুলোকে এক বিশাল স্তূপাকারে দেখা। কিন্তু যেকোনো পাহাড়সম কাজকে ভেঙে চড়ার মতো উপযোগী করা যায়। এজন্যেও দরকার যথাযথ পরিকল্পনা, সাথে ধারাবাহিক অল্পস্বল্প প্রচেষ্টা। কিন্তু এ অভ্যাস প্রচুর সময় বাঁচায়।
একটি উদাহরণ দিই: ধরুন, আপনি একজন স্কুলশিক্ষক। একটি পরীক্ষার জন্য আপনাকে ১০০টা প্রশ্ন তৈরি করতে হবে। আপনার হাতে সময় আছে ১০ দিন। অধিকাংশ মানুষই এ ১০ দিনের কিছু দিন পার করে 'এত কম সময় কেন' বলে অভিযোগ করে। আর কিছুদিন পার করে 'আয় হায়! সময় তো শেষের দিকে' ভেবে দুশ্চিন্তা করে। আর অবশেষে নির্ধারিত সময়ের আগের রাতে তাড়াহুড়ো করে প্রশ্ন তৈরি করতে বসে। এ ধরনের পদ্ধতি অর্থহীন, অবান্তর।
প্রতিদিন ১০টা করে প্রশ্ন তৈরি করা যায় না? এতে সময়ও কম লাগবে, চাপও কম হবে, নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে আবার প্রশ্নগুলোও বেশ মানসম্মত হবে।
এ ধারণা আমাদের জীবনের সবক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যেতে পারে। এসাইনমেন্ট করবেন? একেবারে না করে ভেঙে ভেঙে করুন। একদিন গবেষণা করুন, আরেকদিন তথ্য সংগ্রহ করুন, আরেকদিন এসাইনমেন্টের রূপরেখা প্রস্তুত করুন। শেষে কিছুদিন লেখালেখিতে হাত দিন। দেখবেন কোনো রকম চাপ ছাড়াই আপনার এসাইনমেন্ট শেষ হয়ে যাবে।
আমি বই লেখার ক্ষেত্রে এ কৌশলটাই ব্যবহার করি—ভেঙে ভেঙে কাজ করা। প্রতিদিন এক ঘণ্টা সময় বরাদ্দ রাখি লেখালেখির জন্য। এই এক ঘণ্টায় আমি ৫-৬ পৃষ্ঠা লিখি আর এভাবে কয়েক মাসের ভেতরে একটি পুরো বই লেখা শেষ করি। ভেঙে ভেঙে কাজের অভ্যাস করাটা খুবই কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী লক্ষ্য পূরণে খুব প্রয়োজনীয়。
রাসূলুল্লাহ আমাদের অল্প পরিমাণে হলেও নিয়মিত নাফল "ইবাদাত করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন,
“নেক আমল করো যথাযথভাবে, নিষ্ঠার সাথে এবং পরিমিত পরিমাণে। জেনে রাখো, তোমাদের আমল তোমাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে না। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো, যা নিয়মিত এবং ধারাবাহিকভাবে করা হয়। এমনকি তা পরিমাণে কম হলেও।" (সহীহ বুখারী)
📄 সময় বরাদ্দ করা
গড়িমসি করা এবং ঠিকভাবে লক্ষ্য পূরণ করতে না পারার অন্যতম কারণ হলো লক্ষ্যের জন্য সময় বরাদ্দ না রাখা। জীবনের সবকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য সময় বরাদ্দ রাখা খুব ভালো একটি অভ্যাস।
ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, আমি আমার স্ত্রী, বাচ্চা, লেখালেখি, পড়াশোনা, কুরআন তিলাওয়াত, বাচ্চাদের হোম-স্কুলিং করানো এবং কাজের প্রতিটা ক্ষেত্রের জন্য সময় ভাগ করে রাখি। এভাবে সময় নির্দিষ্ট করে রাখার কারণেই আমার পক্ষে সব কাজ সুন্দরভাবে শেষ করা সম্ভব হয়।
এই অভ্যাসটা গড়ে তোলা খুব সহজ। প্রতিটা লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পনা ঠিক করার সময়ই কোন কাজের জন্য কতটুকু সময় দরকার তা নির্ধারণ করে ফেলুন। দেখুন ওই কাজটির জন্য কোন সময়টা যথার্থ এবং সে সময়টাই ঠিক করুন।
📄 একাগ্র হওয়া
একাগ্র হওয়া একটি অভ্যাস এবং গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসই বটে। পূর্বের এবং বর্তমান সময়ের সফল মানুষদের জীবন থেকে দেখা গেছে-তাদের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল এই মুহূর্তের কাজটিতে একাগ্র থাকতে পারা। একাগ্রতা মানে হাতের সামনের কাজটির প্রতি সম্পূর্ণভাবে নিমগ্ন থাকা এবং নিজেকে বিক্ষিপ্ত হতে না দেওয়া।
এই অভ্যাস গড়ে তুলতে কিছু শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সময়-ব্যবহার সংকুচিত করা। একাগ্রতার সাথে কাজ করলে যে কাজ ত্রিশ মিনিটে শেষ হয়ে যাবে, বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে করলে সে জায়গায় সময় লাগবে দুঘণ্টা।
আমাদের ধর্মের একটি সুন্দর দিক হলো সালাতের মাধ্যমে একাগ্রতার বেশ ভালো প্রশিক্ষণ পাওয়া। যদিও অনেকে ভালোভাবে সালাত পড়ি না বলে এ উপকারটুকু পাই না। অনেকের জন্য সালাত একটি আনুষ্ঠানিকতার বিষয়, হৃদয় এবং আত্মার কোনো সংযোগ এতে থাকে না। একাগ্রতা গড়ে তোলার জন্য সালাত হলো সবচে উত্তম পন্থা। সালাত থেকে প্রাপ্ত এ প্রশিক্ষণ এরপর জীবনের অন্যসব ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যাবে।