📄 শুরু করে দিন
আপনার লক্ষ্য ঠিক আছে, আপনি জানেন গড়িমসি করা উচিত না, পরিকল্পনাও ঠিক করা আছে কিন্তু আপনি এখনও কাজটি শুরু করেননি। কিছু একটি আপনাকে আটকে রাখছে। নানা আশঙ্কা-অজুহাত আপনার মনে দানা বেঁধে আছে। এমন হলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলুন দেরি করে কোনো লাভ নেই।
নষ্ট হওয়া একটি দিন ফিরে পাবেন না। কেন একে হেলায় হারাতে দিচ্ছেন? আজ থেকেই নিজের জীবনযাপনের ধরন বদলে ফেলুন, লক্ষ্যগুলো পূরণে স্থির থাকুন। এভাবে কি কোনো কিছু হারাবেন আপনি?
আজ থেকে দশ-বিশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান, সেটা নিয়ে ভাবুন। সে অবস্থানে পৌঁছাতে চাইলে আপনাকে কিন্তু আজকে থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। দেরি করলে কোথাও পৌঁছাতে পারবেন না।
আপনার মনের ভেতরেই সবকিছু ঘটছে। কাজেই কোন বিষয়গুলোতে মন দেবেন এবং কোন ভাবনাগুলোর ওপর কাজ করবেন, এসব আপনার হাতেই। অজুহাতগুলো সরিয়ে দিন, নিজের ঘড়ির কাঁটা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিন এবং বদলে যাওয়া শুরু করুন।
“আগামীকালকে যে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে দেখে সে আসলে মৃত্যুকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। সামনে কত দিন আসবে অথচ সে থাকবে না! ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কত স্বপ্ন অথচ অনেক স্বপ্নই তার পূরণ হবার নয়। জীবনের ব্যাপ্তি বা এর সময়কাল এবং কত দ্রুত এ সময় কেটে যায় এসব নিয়ে ভাবলে সব ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা স্বাদ হারিয়ে ফেলবে।” আউন ইবনু 'আবদুল্লাহ
📄 নতুন অভ্যাস : নতুন শুরু
আদতে টাইম ম্যানেজমেন্ট হলো পুরোনো বদঅভ্যাসকে ভালো অভ্যাস দিয়ে বদলে ফেলা। প্রত্যেকেরই কিছু খারাপ অভ্যাস রয়েছে, যা সময় নষ্ট করে অথবা দেরির কারণ হয়। সাধারণ সমস্যা হিসেবে আমরা গড়িমসি করা নিয়ে আলোকপাত করেছি। কিন্তু এমন আরও অনেক আছে। যেমন, আলস্য, অতিরিক্ত ঘুম, অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া এবং অতিমাত্রায় সামাজিকতা পালন। বিচিত্র কারণে মূল ধারার বিদ্বান 'আলিমগণ এসবকে হৃদয়ের জন্য ক্ষতিকর বলেছেন।
এসব শুধু আমাদের সময়ই নষ্ট করে না বরং আত্মাকে পেঁচিয়ে ফেলে। একইসাথে সম্পদ ও জ্ঞানের অপচয়ের দিকেও নিয়ে যায়। টাইম ম্যানেজমেন্টের সাথে লেগে থাকতে চাইলে সময়ের পরিক্রমায় অনেকগুলো বদঅভ্যাস বদলাতে হবে। একটি বদঅভ্যাস বদলানোর কিছু মৌলিক সূত্র আছে:
* বদঅভ্যাসটি চিহ্নিত করুন।
* যে ভালো অভ্যাসটি দিয়ে খারাপ অভ্যাসটিকে বদলাবেন সেটিও চিহ্নিত করুন।
* চিহ্নিত করা হয়ে গেলে আজ থেকে বদঅভ্যাসগুলো বদলে ফেলে ভালো অভ্যাসগুলোর চর্চা আরম্ভ করে দিন।
* নতুন অভ্যাসটি সত্যিকার অর্থে 'অভ্যাসে' পরিণত হওয়ার আগপর্যন্ত ধারাবাহিকতা রক্ষা করুন। (সাধারণত গড়ে ৩০ দিন)
* এরপর থেকে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলার কাজটি সহজ হয়ে যায়। তখন আপনি নতুন অভ্যাস গড়ে তোলায় মনোযোগী হতে পারেন。
অভ্যাস বদলাতে হলে প্রয়োজন সবর এবং লেগে থাকার মানসিকতা। এতে আপনার কেবল উপকারই হবে। আর খারাপ অভ্যাস বদলিয়ে আপনি আসলে কিছুই হারাচ্ছেন না।
টাইম ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে কিছু মূল অভ্যাস রয়েছে, যেগুলো আপনার মাঝে গড়ে তুলতে হবে:
📄 পরিকল্পনা
পরিকল্পনা করা ইতিহাসের প্রতিটা সফল ব্যক্তির জীবনধারার উপকরণ ছিল। দেখুন না, নবিজির হিজরাত কতটা সুপরিকল্পিত ছিল! খালিদ ইবনু ওয়ালিদ যুদ্ধের জন্য তার সৈন্যদের কত বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে সাজিয়েছিলেন। এবং ইসলামের ইতিহাস জুড়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর পেছনে কত পরিকল্পনার ছাপ ছিল!
যথেষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া বড়সড় কিছু করা সম্ভব নয়। আর তাই পরিকল্পনা করার অভ্যাস গড়ে তোলা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটা হতে পারে একটি লক্ষ্য পূরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা তৈরি করা অথবা প্রতিটা দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, লেকচার, মিটিং কিংবা একটি ক্লাসের জন্য পরিকল্পনার ছক সাজানো। দীর্ঘ জীবন পরিক্রমায় এ অভ্যাসটি সময়ের সদ্ব্যবহারে এবং জীবনের সেরাটুকু দিতে আমাদের সাহায্য করে।
📄 ভেঙে ভেঙে কাজ করা
গড়িমসি করার পেছনে খুব বড় একটি কারণ হলো—সামনে থাকা কাজগুলোকে এক বিশাল স্তূপাকারে দেখা। কিন্তু যেকোনো পাহাড়সম কাজকে ভেঙে চড়ার মতো উপযোগী করা যায়। এজন্যেও দরকার যথাযথ পরিকল্পনা, সাথে ধারাবাহিক অল্পস্বল্প প্রচেষ্টা। কিন্তু এ অভ্যাস প্রচুর সময় বাঁচায়।
একটি উদাহরণ দিই: ধরুন, আপনি একজন স্কুলশিক্ষক। একটি পরীক্ষার জন্য আপনাকে ১০০টা প্রশ্ন তৈরি করতে হবে। আপনার হাতে সময় আছে ১০ দিন। অধিকাংশ মানুষই এ ১০ দিনের কিছু দিন পার করে 'এত কম সময় কেন' বলে অভিযোগ করে। আর কিছুদিন পার করে 'আয় হায়! সময় তো শেষের দিকে' ভেবে দুশ্চিন্তা করে। আর অবশেষে নির্ধারিত সময়ের আগের রাতে তাড়াহুড়ো করে প্রশ্ন তৈরি করতে বসে। এ ধরনের পদ্ধতি অর্থহীন, অবান্তর।
প্রতিদিন ১০টা করে প্রশ্ন তৈরি করা যায় না? এতে সময়ও কম লাগবে, চাপও কম হবে, নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে আবার প্রশ্নগুলোও বেশ মানসম্মত হবে।
এ ধারণা আমাদের জীবনের সবক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যেতে পারে। এসাইনমেন্ট করবেন? একেবারে না করে ভেঙে ভেঙে করুন। একদিন গবেষণা করুন, আরেকদিন তথ্য সংগ্রহ করুন, আরেকদিন এসাইনমেন্টের রূপরেখা প্রস্তুত করুন। শেষে কিছুদিন লেখালেখিতে হাত দিন। দেখবেন কোনো রকম চাপ ছাড়াই আপনার এসাইনমেন্ট শেষ হয়ে যাবে।
আমি বই লেখার ক্ষেত্রে এ কৌশলটাই ব্যবহার করি—ভেঙে ভেঙে কাজ করা। প্রতিদিন এক ঘণ্টা সময় বরাদ্দ রাখি লেখালেখির জন্য। এই এক ঘণ্টায় আমি ৫-৬ পৃষ্ঠা লিখি আর এভাবে কয়েক মাসের ভেতরে একটি পুরো বই লেখা শেষ করি। ভেঙে ভেঙে কাজের অভ্যাস করাটা খুবই কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী লক্ষ্য পূরণে খুব প্রয়োজনীয়。
রাসূলুল্লাহ আমাদের অল্প পরিমাণে হলেও নিয়মিত নাফল "ইবাদাত করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন,
“নেক আমল করো যথাযথভাবে, নিষ্ঠার সাথে এবং পরিমিত পরিমাণে। জেনে রাখো, তোমাদের আমল তোমাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে না। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো, যা নিয়মিত এবং ধারাবাহিকভাবে করা হয়। এমনকি তা পরিমাণে কম হলেও।" (সহীহ বুখারী)