📄 অতিরিক্ত নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা
Procrastination-এর আরেকটা বড় কারণ হলো Perfection. এ কারনেই লেখালেখি জীবন আরম্ভ করতে যেয়ে আমি প্রচুর গড়িমসি করেছি। আমি সব সময় চেয়েছি একজন লেখক হতে এবং বই লিখেই আমার দিনগুলো পার করতে।
অসংখ্য আইডিয়া ছিল আমার, অনেক খসড়া দাঁড় করিয়েছি, বহু সারাংশ আর 'প্রথম অধ্যায়'ও লিখেছি। কিন্তু এর বেশি আমি এগোতে পারিনি। কারণ, আমার লেখা যথার্থ হতে হবে, খাঁটি হতে হবে এই অযাচিত ভূত আমাকে পেয়ে বসেছিল। আমার কাছে নিজের লেখাগুলোকে মনে হতো ভুলে ভরা এবং সেগুলোর গুরুতর সম্পাদনা প্রয়োজন। মনে হতো এ লেখা কেউ পড়বে না। এভাবে বিধ্বস্ত মনে হাল ছেড়ে দিতাম আর একটি ছেড়ে আরেকটা লেখায় হাত দিতাম। শতভাগ নির্ভুল হতে চাওয়া আমার লেখাগুলো শেষ করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল।
একদিন ভাবলাম নির্ভুল হতে চাওয়ার এ চিন্তাটা বেশ বাজে। আমি একজন মানুষ, আর মানুষের লেখনী কখনোই শতভাগ নির্ভুল হবে না। প্রাথমিক লেখা অবশ্যই জগািখচুড়ি ধরনের হবে। আর এ কারণেই আমরা সম্পাদনা করি, লেখা সম্পাদকের কাছে পাঠাই এমনকি পুনর্মার্জিত সংস্করণ বের করি।
উপলব্ধি করলাম যে, যদি আমি লেখালেখিতে ক্যারিয়ার করতে চাই তা হলে আমাকে নির্ভুল হবার অপচেষ্টা বাদ দিয়ে লিখে যেতে হবে। যা মনে আসে লিখে ফেলব, কাটাছেঁড়া মোছামুছি পরে করা যাবে। এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর আমার গড়িমসি করা বন্ধ হলো এবং লেখালেখিও একটি গতি পেল।
আপনিও হয়তো আপনার কোনো লক্ষ্যে পিছিয়ে আছেন, কারণ আপনি ভাবছেন এটা এখনও নির্ভুল হয়নি। এসব ক্ষেত্রে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটিই রাস্তা। আপনাকে বুঝতে হবে যে, নির্ভুল হওয়া সম্ভব নয়। যেকোনো মানবীয় কাজে ভুল হওয়াটাই রীতি। যথার্থ হওয়াটা বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তাই নির্ভুল হতে চাওয়ার ইচ্ছেটা ছেড়ে দিন, নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করুন। জন পেরি তার The Art of Procrastination বইয়ে এ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন:
কোনো কাজ হাতে নেওয়ার সময় একটি “মোটামুটি নির্ভুল” কাজ করার লাভ এবং ক্ষতির হিসাবটা আগে ভাগে করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিজেকে কিছু প্রশ্ন করতে হবে: এ জায়গায় নির্ভুলভাবে কাজ করতে যাওয়ার উপযোগিতা কতটুকু? মোটামুটি কাজ করলে যা হতো, সেখানে নির্ভুল কাজ করার চেষ্টা করে কি খুব বেশি লাভ হবে? আমি এ কাজটি মোটামুটি নির্ভুলভাবে করতে পারব এর সম্ভাবনাই বা কতটুকু? এটা করলে বা না করলে আমার বা অন্যদের জন্য কেমন পরিবর্তন বয়ে আনবে? আদৌ কি আনবে?
প্রায় ক্ষেত্রে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর হবে: একটি “মোটামুটি নির্ভুল” কাজ একদম নির্ভুল কাজ করার চেয়ে ভালো। আর এমনিতেই আমি সেটুকুই করতে পারব। কাজেই আমি একটি মোটামুটি নির্ভুল কাজ করার জন্য নিজেকে ছাড়পত্র দিচ্ছি। পুরোপুরি নির্ভুল করতে গিয়ে কাজের সময়সীমা অতিক্রম করে ফেলার চেয়ে এটাই ভালো। যার মানে আমি এখনই কাজটি শুরু করতে পারি (বা অন্ততপক্ষে আগামীকাল)।
📄 তাৎক্ষণিক তৃপ্তি পেতে চাওয়া
আমাদের মনস্তত্ত্ব এখন তাৎক্ষণিক পরিতৃপ্তির প্রতি বেশি আসক্ত। আমরা দ্রুত সবকিছু পেতে চাই। আধুনিক বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাও ভোক্তাদের মাঝে এ অভ্যাস আরও ছড়িয়ে দিয়েছে। বুঝতে শেখার পর থেকেই একটি শিশুকে দীর্ঘস্থায়ী অর্জনের চেয়ে তাৎক্ষণিক পরিতৃপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এই মানসিকতা নিয়েই আমরা বেড়ে ওঠি। এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে আমাদের জীবনে।
অনেক মুসলিমই ব্যভিচারের মতো গুনাহে জড়িয়ে পড়ে তাৎক্ষণিক পরিতৃপ্তি পেতে যেয়ে। বিয়ের মতো দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক এবং এর সাথে জড়িত দায়িত্ব তাদের কাছে কঠিন মনে হয়। একইভাবে দ্রুততম সময়ে টাকা উপার্জন করতে চাওয়া, ধনী হতে চাওয়া এমনকি খিলাফাহ ও জান্নাতের পথেও শর্টকাট বেছে নিয়েছে অনেকেই।
বর্তমান সময়ে এবং ইসলামের ইতিহাস জুড়ে যতগুলো চরমপন্থি সংগ্রাম হয়েছে, সবগুলোর পেছনে ছিল এই একই কারণ—তাৎক্ষণিক ফলাফল কামনা। এই মানসিকতা এমনকি আমাদের টাইম ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করেছে। আমাদের অনেক লক্ষ্য আছে, স্বপ্ন আছে। কিন্তু একটু চ্যাট করি, একটু ফানি ভিডিও দেখি, একটু স্ন্যাকস খাই এসব থেকে আমরা যে তাৎক্ষণিক তৃপ্তি পেতে চাই, তা আমাদের এই স্বপ্ন আর লক্ষ্য পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব কারণে আমরা দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হই।
এই মানসিকতা অনৈসলামি এবং ধ্বংসাত্মকও বটে। উম্মাহর বর্তমান অবস্থাই এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। একদিকে চরমপন্থিরা জান্নাতে যাওয়ার শর্টকাট খুঁজছে, অন্যদিকে সাধারণ মুসলিমরা নিজেদের প্রবৃত্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কারণ, ধার্মিকতার পথটায় তাৎক্ষণিক তৃপ্তির অবকাশ নেই। এ পথে ধৈর্য ধরে এগোতে হবে, সাথে সাথে জীবনব্যাপী ধার্মিকতা অর্জনে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
ইসলাম শিক্ষা দেয় সবরের। এর মধ্যে রয়েছে ধৈর্য, একাগ্রতা, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিকতা। এসবকিছুর জন্যই দরকার দীর্ঘস্থায়ী প্রচেষ্টা। এর ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য। সফলতার পথে যেকোনো শর্টকাটই এক ধরনের প্রতারণা। এটা অবাস্তব এবং ইসলামি আদর্শের বিপরীত।
এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের চিন্তার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে আমরা যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ পৃথিবীকে দেখি, সে দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে, পার্থিব কিংবা পরকালীন সফলতা অর্জিত হবে দীর্ঘস্থায়ী চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা সমাধানের কোনো শর্টকাট উপায় নেই, যেমন নেই আত্মিক প্রশিক্ষণ কিংবা অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্যেও। যেটা চান, সেটাতে মনে-প্রাণে লেগে থাকতে হবে, কাজ করে যেতে হবে।
📄 আলসেমি যখন ভালো
আমার এতক্ষণ পর্যন্ত বলা কথা শুনে মনে হতে পারে আমি বোধহয় একটুও অলসতা করি না এবং আমি গড়িমসি করার চরম বিরোধী। আসলে তা না, আমিও গড়িমসি করি, অলসতা করি কিন্তু যখন সেটা লাভজনক। পরিকল্পনা করে, গুছিয়ে কোনো কাজে অলসতা করা ক্ষেত্রবিশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ টাইম ম্যানেজমেন্ট স্কিল হয়ে উঠতে পারে। কোনো কাজ করার যথার্থ সময়টা আসার আগপর্যন্ত কাজটি না ধরাই হলো ভালো অলসতা।
যেমন ধরুন, আমি খুব ক্লান্ত এবং এখন অফিসে কাজের সময়ও শেষ। এ সময়টাতে আমি একটু বিশ্রাম করব, মজা করব এবং কালকের জন্য বাকি কাজ রেখে দেব। অফিস টাইমেই অবসন্নবোধ করলে তখনকার উচিত ছোট একটি ব্রেক নেওয়া, একটু মজার কিছু করা। এরপর আবার পূর্ণোদ্যমে কাজে ফিরে যাওয়া।
হয়তো ভাবছেন, যে কাজ আজকে করা সম্ভব সেটা কেন আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা? এর উত্তর হলো, 'কারণ আমি জানি আগামীকাল আমি কাজটি আজকের চাইতে আরও ভালোভাবে করতে পারব'।
যদি আপনার লক্ষ্য, আকাঙ্ক্ষাগুলো বড় হয় তা হলে সেগুলো পূরণ করা এক দিন, এক সপ্তাহ, এক মাস, এক বছর এমনকি দশ বছরেও সম্ভব না হতে পারে। আপনাকে পরিকল্পনা করতে হবে, কিছু কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোতে হবে। এখানে কিছু কাজে একটু গড়িমসি করতে হবে, ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখতে হবে। যে কাজগুলো এখনই করতে হবে, সেগুলোতে যাতে সময় দেওয়া যায় এবং ভারী কাজগুলো অন্য সময়ে চাপ ছাড়া করা সম্ভব হয়।
কখনও এমন হয় যে, শীঘ্রই একটি কঠোর পরিশ্রমের কাজ করতে হবে কিন্তু আপনার এখন প্রয়োজন ছুটি। এজন্য আপনি মোটেও মন খারাপ করবেন না। ছুটিটাই আপনার জন্য ভালো। কারণ, এতে আপনি রিচার্জড হয়ে যাবেন, শরীর ও মন উভয়ই চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তখন আপনার পক্ষে আরও ভালো কাজ করা সম্ভব হবে। ছুটিটা না নিলে তা হতো না।
এ ধরনের procrastination ভালো। কারণ পরিকল্পনা এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই এটা করা হচ্ছে। আর তাই কোনো রকম খারাপ লাগার অনুভূতি না রেখেই এটা করা উচিত। মোটা দাগে বিবেচনা করলে, যা থেকে ভবিষ্যতে উপকার পাওয়া যাবে, তা-ই ভালো, হোক না সেটা আলস্য বা গড়িমসি।
📄 শুরু করে দিন
আপনার লক্ষ্য ঠিক আছে, আপনি জানেন গড়িমসি করা উচিত না, পরিকল্পনাও ঠিক করা আছে কিন্তু আপনি এখনও কাজটি শুরু করেননি। কিছু একটি আপনাকে আটকে রাখছে। নানা আশঙ্কা-অজুহাত আপনার মনে দানা বেঁধে আছে। এমন হলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলুন দেরি করে কোনো লাভ নেই।
নষ্ট হওয়া একটি দিন ফিরে পাবেন না। কেন একে হেলায় হারাতে দিচ্ছেন? আজ থেকেই নিজের জীবনযাপনের ধরন বদলে ফেলুন, লক্ষ্যগুলো পূরণে স্থির থাকুন। এভাবে কি কোনো কিছু হারাবেন আপনি?
আজ থেকে দশ-বিশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান, সেটা নিয়ে ভাবুন। সে অবস্থানে পৌঁছাতে চাইলে আপনাকে কিন্তু আজকে থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। দেরি করলে কোথাও পৌঁছাতে পারবেন না।
আপনার মনের ভেতরেই সবকিছু ঘটছে। কাজেই কোন বিষয়গুলোতে মন দেবেন এবং কোন ভাবনাগুলোর ওপর কাজ করবেন, এসব আপনার হাতেই। অজুহাতগুলো সরিয়ে দিন, নিজের ঘড়ির কাঁটা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিন এবং বদলে যাওয়া শুরু করুন।
“আগামীকালকে যে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে দেখে সে আসলে মৃত্যুকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। সামনে কত দিন আসবে অথচ সে থাকবে না! ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কত স্বপ্ন অথচ অনেক স্বপ্নই তার পূরণ হবার নয়। জীবনের ব্যাপ্তি বা এর সময়কাল এবং কত দ্রুত এ সময় কেটে যায় এসব নিয়ে ভাবলে সব ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা স্বাদ হারিয়ে ফেলবে।” আউন ইবনু 'আবদুল্লাহ