📄 লক্ষ্যের অভাব
এ বিষয়ে আগের অধ্যায়গুলোতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্যগুলোই সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের প্রধান অনুপ্রেরণা। এ লক্ষ্যগুলোই আমাদের প্রতিদিন সামনের দিনগুলোর জন্য উজ্জীবিত করে তোলে।
যাদের যথাযথ লক্ষ্য নেই, তারা জীবনে কোনো কিছুর প্রতি বিশ্বস্ত থাকার প্রেরণা খুঁজে পায় না। ফলস্বরূপ তারা ভালোভাবে কোনো কাজ করতে পারে না, সঠিক সময়ের মধ্যে করা তো দূরের কথা। জীবন যেন তাদের কাছে একের পর এক বাধা পেরুনো, যে বাধাগুলো তারা অল্প পরিশ্রমে অতিক্রম করতে পারলেই বাঁচে। তাই তারা সব কাজ শেষ মিনিটের জন্য রেখে দেয় এবং কাজের মান নিয়ে মোটেও ভাবিত হয় না।
গড়িমসি করার এ স্বভাব তাড়াতে হলে সবার আগে লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। এ লক্ষ্যগুলোই আপনাকে আলস্য ঝেড়ে কাজে নেমে পড়তে প্রেরণা জোগাবে।
📄 ধোঁকা
ভালো কাজ ও তাওবা করার ক্ষেত্রে শয়তান সবাইকে এক ধরনের ধোঁকায় ফেলে দেয়। গড়িমসি বা আলস্যে ফেলে ভালো কাজ এবং তাওবা করা থেকে বিরত রাখে। ‘বুড়ো বয়সে তাওবা করে নেব’ হলো এ ধরনের প্রতারণামূলক বাক্যের সার্থক উদাহরণ। পরে কাজ করার অনেক সময় পাওয়া যাবে—এটা ভেবে আমরা আসলে নিজেদেরই বোকা বানাই।
তাওবা করার ক্ষেত্রে এ ধরনের আলস্য খুব মারাত্মক হতে পারে; এ জীবনে এবং আখিরাতেও। যদিও এমন মানসিকতার প্রয়োগ আমরা আমাদের জীবনের সব ক্ষেত্রেই করে চলেছি। আমরা মনে করছি—এসাইনমেন্টটা জমা দেওয়ার, রিপোর্ট সাবমিট করার অথবা মিটিং-এর নোট তৈরি করার এখনও অনেক সময় আছে। শেষমেশ দেখি আর বেশি সময় নেই।
এরপর আমরা তাড়াহুড়ো করা আরম্ভ করি। এর সাথে যুক্ত হয় দুশ্চিন্তা, ভয় এবং হতাশা। সব মিলিয়ে আমাদের কাজ গিয়ে পৌঁছে শেষ মুহূর্তের দোটানায় আর কাজের মানও হয় খারাপ।
এখানে মূল কথা হলো ‘পরে’ করার ভুল ধারণাটা অনুধাবন করতে পারা। মুসলিম হিসেবে আমরা জানি, ভবিষ্যতে কোনো কাজের ব্যাপারে “ইন শা আল্লাহ” (যদি আল্লাহ চান) বলতে হয়।
“এবং কখনো বলো না আমি আগামীকাল কাজটি করব, ইন শা আল্লাহ বলা ব্যতীত।” (সূরা আল-কাহফ ২৩-২৪)
“ইন শা আল্লাহ” এ কথাটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভবিষ্যৎ আল্লাহর হাতে। আর তাই আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখা উচিত না। আমরা জানি না ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। আমাদের উচিত চোখের সামনের পর্দা তুলে বাস্তবতা অনুধাবন করা। আর বাস্তবতা হলো আলস্যে নষ্ট হওয়া একটি মুহূর্তও আমরা আর ফিরে পাব না। কাজে নেমে পড়ার সময় এখনই, আগামীকাল নয়।
📄 অতিরিক্ত নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা
Procrastination-এর আরেকটা বড় কারণ হলো Perfection. এ কারনেই লেখালেখি জীবন আরম্ভ করতে যেয়ে আমি প্রচুর গড়িমসি করেছি। আমি সব সময় চেয়েছি একজন লেখক হতে এবং বই লিখেই আমার দিনগুলো পার করতে।
অসংখ্য আইডিয়া ছিল আমার, অনেক খসড়া দাঁড় করিয়েছি, বহু সারাংশ আর 'প্রথম অধ্যায়'ও লিখেছি। কিন্তু এর বেশি আমি এগোতে পারিনি। কারণ, আমার লেখা যথার্থ হতে হবে, খাঁটি হতে হবে এই অযাচিত ভূত আমাকে পেয়ে বসেছিল। আমার কাছে নিজের লেখাগুলোকে মনে হতো ভুলে ভরা এবং সেগুলোর গুরুতর সম্পাদনা প্রয়োজন। মনে হতো এ লেখা কেউ পড়বে না। এভাবে বিধ্বস্ত মনে হাল ছেড়ে দিতাম আর একটি ছেড়ে আরেকটা লেখায় হাত দিতাম। শতভাগ নির্ভুল হতে চাওয়া আমার লেখাগুলো শেষ করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল।
একদিন ভাবলাম নির্ভুল হতে চাওয়ার এ চিন্তাটা বেশ বাজে। আমি একজন মানুষ, আর মানুষের লেখনী কখনোই শতভাগ নির্ভুল হবে না। প্রাথমিক লেখা অবশ্যই জগািখচুড়ি ধরনের হবে। আর এ কারণেই আমরা সম্পাদনা করি, লেখা সম্পাদকের কাছে পাঠাই এমনকি পুনর্মার্জিত সংস্করণ বের করি।
উপলব্ধি করলাম যে, যদি আমি লেখালেখিতে ক্যারিয়ার করতে চাই তা হলে আমাকে নির্ভুল হবার অপচেষ্টা বাদ দিয়ে লিখে যেতে হবে। যা মনে আসে লিখে ফেলব, কাটাছেঁড়া মোছামুছি পরে করা যাবে। এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর আমার গড়িমসি করা বন্ধ হলো এবং লেখালেখিও একটি গতি পেল।
আপনিও হয়তো আপনার কোনো লক্ষ্যে পিছিয়ে আছেন, কারণ আপনি ভাবছেন এটা এখনও নির্ভুল হয়নি। এসব ক্ষেত্রে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটিই রাস্তা। আপনাকে বুঝতে হবে যে, নির্ভুল হওয়া সম্ভব নয়। যেকোনো মানবীয় কাজে ভুল হওয়াটাই রীতি। যথার্থ হওয়াটা বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তাই নির্ভুল হতে চাওয়ার ইচ্ছেটা ছেড়ে দিন, নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করুন। জন পেরি তার The Art of Procrastination বইয়ে এ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন:
কোনো কাজ হাতে নেওয়ার সময় একটি “মোটামুটি নির্ভুল” কাজ করার লাভ এবং ক্ষতির হিসাবটা আগে ভাগে করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিজেকে কিছু প্রশ্ন করতে হবে: এ জায়গায় নির্ভুলভাবে কাজ করতে যাওয়ার উপযোগিতা কতটুকু? মোটামুটি কাজ করলে যা হতো, সেখানে নির্ভুল কাজ করার চেষ্টা করে কি খুব বেশি লাভ হবে? আমি এ কাজটি মোটামুটি নির্ভুলভাবে করতে পারব এর সম্ভাবনাই বা কতটুকু? এটা করলে বা না করলে আমার বা অন্যদের জন্য কেমন পরিবর্তন বয়ে আনবে? আদৌ কি আনবে?
প্রায় ক্ষেত্রে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর হবে: একটি “মোটামুটি নির্ভুল” কাজ একদম নির্ভুল কাজ করার চেয়ে ভালো। আর এমনিতেই আমি সেটুকুই করতে পারব। কাজেই আমি একটি মোটামুটি নির্ভুল কাজ করার জন্য নিজেকে ছাড়পত্র দিচ্ছি। পুরোপুরি নির্ভুল করতে গিয়ে কাজের সময়সীমা অতিক্রম করে ফেলার চেয়ে এটাই ভালো। যার মানে আমি এখনই কাজটি শুরু করতে পারি (বা অন্ততপক্ষে আগামীকাল)।
📄 তাৎক্ষণিক তৃপ্তি পেতে চাওয়া
আমাদের মনস্তত্ত্ব এখন তাৎক্ষণিক পরিতৃপ্তির প্রতি বেশি আসক্ত। আমরা দ্রুত সবকিছু পেতে চাই। আধুনিক বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাও ভোক্তাদের মাঝে এ অভ্যাস আরও ছড়িয়ে দিয়েছে। বুঝতে শেখার পর থেকেই একটি শিশুকে দীর্ঘস্থায়ী অর্জনের চেয়ে তাৎক্ষণিক পরিতৃপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এই মানসিকতা নিয়েই আমরা বেড়ে ওঠি। এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে আমাদের জীবনে।
অনেক মুসলিমই ব্যভিচারের মতো গুনাহে জড়িয়ে পড়ে তাৎক্ষণিক পরিতৃপ্তি পেতে যেয়ে। বিয়ের মতো দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক এবং এর সাথে জড়িত দায়িত্ব তাদের কাছে কঠিন মনে হয়। একইভাবে দ্রুততম সময়ে টাকা উপার্জন করতে চাওয়া, ধনী হতে চাওয়া এমনকি খিলাফাহ ও জান্নাতের পথেও শর্টকাট বেছে নিয়েছে অনেকেই।
বর্তমান সময়ে এবং ইসলামের ইতিহাস জুড়ে যতগুলো চরমপন্থি সংগ্রাম হয়েছে, সবগুলোর পেছনে ছিল এই একই কারণ—তাৎক্ষণিক ফলাফল কামনা। এই মানসিকতা এমনকি আমাদের টাইম ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করেছে। আমাদের অনেক লক্ষ্য আছে, স্বপ্ন আছে। কিন্তু একটু চ্যাট করি, একটু ফানি ভিডিও দেখি, একটু স্ন্যাকস খাই এসব থেকে আমরা যে তাৎক্ষণিক তৃপ্তি পেতে চাই, তা আমাদের এই স্বপ্ন আর লক্ষ্য পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব কারণে আমরা দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হই।
এই মানসিকতা অনৈসলামি এবং ধ্বংসাত্মকও বটে। উম্মাহর বর্তমান অবস্থাই এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। একদিকে চরমপন্থিরা জান্নাতে যাওয়ার শর্টকাট খুঁজছে, অন্যদিকে সাধারণ মুসলিমরা নিজেদের প্রবৃত্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কারণ, ধার্মিকতার পথটায় তাৎক্ষণিক তৃপ্তির অবকাশ নেই। এ পথে ধৈর্য ধরে এগোতে হবে, সাথে সাথে জীবনব্যাপী ধার্মিকতা অর্জনে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
ইসলাম শিক্ষা দেয় সবরের। এর মধ্যে রয়েছে ধৈর্য, একাগ্রতা, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিকতা। এসবকিছুর জন্যই দরকার দীর্ঘস্থায়ী প্রচেষ্টা। এর ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য। সফলতার পথে যেকোনো শর্টকাটই এক ধরনের প্রতারণা। এটা অবাস্তব এবং ইসলামি আদর্শের বিপরীত।
এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের চিন্তার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে আমরা যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ পৃথিবীকে দেখি, সে দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টাতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে, পার্থিব কিংবা পরকালীন সফলতা অর্জিত হবে দীর্ঘস্থায়ী চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা সমাধানের কোনো শর্টকাট উপায় নেই, যেমন নেই আত্মিক প্রশিক্ষণ কিংবা অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্যেও। যেটা চান, সেটাতে মনে-প্রাণে লেগে থাকতে হবে, কাজ করে যেতে হবে।