📄 ধর্মীয় অগ্রাধিকার
এক্ষেত্রে অগ্রাধিকারগুলো ইতোমধ্যেই নির্ধারিত করে দেওয়া আছে অর্থাৎ মাথা খাটিয়ে বের করার প্রয়োজন নেই। এগুলোর জন্য সময় বের করতে হবে কেবল। তা ছাড়া প্রতিটা মুসলিমের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারগুলো মোটামুটি একই। যেমন:
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সময়মতো পড়া: সালাত ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। তাই অগ্রাধিকারের তালিকায় এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সালাত আল্লাহর সাথে আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম, আমাদের মন্দ প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে অন্যতম সহায়ক। সালাত আমাদের শৃঙ্খলাবোধ এবং মনোযোগ অর্জনে সাহায্য করে। আর একজন বিশ্বাসীর জীবনে সালাত খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ‘ইবাদাত।
কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করাটা বাধ্যতামূলক না হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি 'ইবাদাত। আর এ কাজটি ১০ মিনিটের জন্য হলেও করা উচিত। কুরআন তিলাওয়াত আমাদের অগ্রাধিকার ও দায়িত্বগুলো মনে করিয়ে দেয়, ঈমান বৃদ্ধি করে, হৃদয়কে প্রশান্ত করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি বয়ে আনে।
ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা: প্রতিটা মুসলিমের উচিত প্রতিনিয়ত ইসলামের জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা করা। অধিকাংশ মানুষ যথেষ্ট সময় না থাকার অজুহাত দেয়। কিন্তু টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে একটি বই পড়ার সময় আপনি আর সে অযুহাত দিতে পারেন না। কিছু বই, লেকচার আর কোর্সের একটি সিলেবাস তৈরি করে ফেলুন। এরপর প্রতিদিন ত্রিশ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা ইসলামের জ্ঞান অর্জনের পেছনে দিন।
আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি কর্তব্য: এটা ধর্মীয় আবশ্যক কাজের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমরা একটি অন্য ক্যাটাগরিতে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
📄 ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত অগ্রাধিকার
আমাদের ক্যারিয়ারের সাথে সম্পর্কিত অগ্রাধিকারগুলো মোটামুটি নিচের প্রকারগুলোতে ভাগ করা যায়। একেকজনের জন্য ব্যাপকতার ক্ষেত্রে আর গুরুত্ব অনুসারে এ প্রকারভেদে ভিন্নতা ঘটতে পারে।
স্বল্পস্থায়ী কাজ: এ কাজগুলো খুব অল্প সময়ে দ্রুততার সাথে সেরে ফেলা উচিত। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার মাঝে এসব কাজ যেন বাধা সৃষ্টি না করে।
দীর্ঘস্থায়ী কাজ: এক্ষেত্রে আমরা অনেকেই ভালোভাবে টাইম ম্যানেজ করতে ভুল করি। নির্ধারিত সময় শেষ হতে আরও দুই মাস সময় বাকি আছে দেখলে আমরা আরও গড়িমসি করি। এভাবে শেষমেশ কাজটি আর সুন্দরভাবে করাও হয়ে ওঠে না। এখানে সমাধান হলো আগেভাগে পরিকল্পনা করা।
প্রথমে দীর্ঘস্থায়ী কাজের ডেডলাইনগুলো চিহ্নিত করা উচিত। এরপর প্রতিদিন ত্রিশ মিনিট সময় কাজটির জন্য বরাদ্দ রেখে কাজ করে গেলে দেখবেন নির্ধারিত সময়ের আগেই আপনার কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এবং শুধু শেষ না, খুব ভালোভাবেই শেষ করতে পারবেন। এতে করে কাজের চাপ এবং দুশ্চিন্তাতেও পড়বেন না।
পেশাগত উন্নয়ন: চারপাশের এত এত জরুরি কাজ এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ভিড়ে আমরা আমাদের পেশাগত উন্নয়ন নিয়ে সহজেই আত্মতুষ্টিতে ভুগি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে হলে পেশাগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর এজন্য প্রতিদিন কিছু সময় নির্ধারিত করা উচিত, এমনকি প্রতিদিন ত্রিশ মিনিট করে হলেও। বই এবং আর্টিকেল পড়া, সেমিনারে অংশগ্রহণ করা এসবের মাধ্যমে নিজেকে নিয়মিত উন্নত করতে হবে এবং এভাবে একজন পেশাজীবী হিসেবেও দক্ষ হয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
আপনার যোগ্যতা যত বাড়বে, চাকরির সুযোগও তত বেশি আসবে, একইসাথে আপনার স্যালারিও ভালো হবে। বাস্তবতা হলো, পেশাগত দক্ষতাই আপনার সামনের জীবনে সবচে বেশি কাজে আসবে। কিন্তু খুব কমই আমরা এ বিষয়টাকে আমলে নেই।
📄 পারিবারিক অগ্রাধিকার
এটা বেশ সহজ। অগ্রাধিকারের ধরন নির্ভর করবে আপনার পারিবারিক কাঠামোর ওপর।
জীবনসঙ্গী: আপনার জীবনসঙ্গীর জন্য প্রতিদিন সময় বের করুন। এটা করার সবচে ভালো উপায় হলো, বাচ্চাদের সাথে বেডটাইমটা আগে সেরে নেওয়া। ওরা ঘুমিয়ে যাবার পর একটি অখণ্ড ও সুন্দর সময় আপনার স্বামী/স্ত্রীর সাথে ব্যয় করুন। এটা হলো সাধারণ নিয়ম। কিন্তু বহুবিবাহের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটবে। এসব ক্ষেত্রে টাইম ম্যানেজমেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে সব স্ত্রীর জন্যই সময় বের করতে হবে এবং সবাইকেই সমান সময় দিতে হবে।
সন্তান-সন্ততি: অনেকে নিজের বাচ্চাদের সাথে একদমই সময় কাটান না। হয় এড়িয়ে যান অথবা নানা রকম গ্যাজেট দিয়ে ওদের ডুবিয়ে রাখেন, যাতে বাচ্চারা বিরক্ত না করে। ভুলে গেলে চলবে না, আপনার সন্তানেরাই এ পৃথিবীতে এবং আখিরাতের জন্য আপনার সর্বোত্তম বিনিয়োগ। তাদের আপনি সবচে ভালো যে উপহারটা দিতে পারেন, সেটা হলো আপনার সময়। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আপনার কাজ শেষে এক ঘণ্টা সময় আপনার বাচ্চাদের জন্য রাখুন। ওদের সাথে আনন্দময় সময় কাটান। এভাবে আপনাদের সম্পর্কে একটি পরিবর্তন দেখতে পাবেন, একইসাথে এর মাধ্যমে ওদের বেড়ে ওঠাটাও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে।
বাবা-মা: তাদের সাথে একই বাসায় থাকলে তাদের জন্য প্রতিদিন সময় বের করুন। আর যদি একইসঙ্গে না থাকেন, তা হলে ফোনে যোগাযোগ করুন এবং সপ্তাহে অন্তত একবার তাদের দেখতে যান। তাদের অবহেলা করবেন না। কারণ, তাদের সন্তুষ্টিতেই আপনার জান্নাত পাওয়া সহজ হবে। বাবা-মাকে সময় দেওয়া প্রত্যেকের জীবনেই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
ভাই-বোন: আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমরা প্রত্যেকে আমাদের নিজেদের জীবন নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমাদের ভাই-বোনরাও তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এভাবে দূরত্ব তৈরি হয়। মুসলিম হিসেবে আমাদের অবশ্যই পারিবারিক বন্ধন রক্ষা করার ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে। এজন্য নিজেদের মধ্যে মেসেজিং করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংযুক্ত থাকা এবং সময় সময় একে অপরকে দা'ওয়াত দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
📄 সামাজিক কর্তব্য
সমাজে কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রাখতে ইসলাম আমাদের উৎসাহিত করে। কিন্তু কাজের ব্যস্ততায় আমরা অনেকেই সমাজ থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্নই হয়ে পড়ি। কমপক্ষে যে সামাজিক কর্তব্যগুলো আমাদের পালন করা উচিত সেগুলো হলো:
দা'ওয়াহ: ইসলামের বার্তা অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া প্রতিটা মুসলিমের জন্য আবশ্যক। অনেকভাবেই আমরা এটা করতে পারি। এটা হতে পারে আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ইসলাম নিয়ে কিছু পোস্ট করে অথবা আপনার প্রতিবেশী কিংবা সহকর্মীর সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে। যাই হোক না কেন, দা'ওয়াহ আমাদের জীবনের অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে অবশ্যই যেন থাকে।
সামাজিক সেবা: আপনার নিজের এলাকাতে সমাজসেবামূলক কোনো কাজে অংশ নিতে পারেন। যদি বেশি সময় দিতে পারেন তা হলে তো ভালোই, না পারলে অল্প সময় হলেও দিন। এলাকার ভেতরে এমন অনেক কাজ রয়েছে, যাতে আপনি অন্ততপক্ষে সপ্তাহে একদিন হলেও সময় দিতে পারবেন। যদি এমন কোনো কাজ না পান, তা হলে আমার পরামর্শ হলো আপনি নিজেই কোনো সেবামূলক কাজের উদ্যোগ নিন।