📄 জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাট্রিক্স
স্টিফেন কভে তার '7 habits of highly effective people' বইতে 'জরুরি' আর 'গুরুত্বপূর্ণ' এ দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি কাজকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেন, যেখানে বিষয়টা মোটেও ওরকম না। আপনি যে লেখাটা এখন লিখছেন অথবা যে বইটি পড়ছেন, তা আপনার ফোনে মাত্র আসা কল, মেসেজ অথবা নোটিফিকেশনের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবুও আমরা অনেকেই জরুরি কাজে সময় এবং মনোযোগ দেওয়াকে অগ্রাধিকার দিই। এটা শুধুই যে সময় নষ্ট করে তা না, মনোযোগও সরিয়ে দেয়। তারপর আগের কাজটায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্টিফেন কভে বলেছেন, "সফল মানুষেরা সুযোগ খোঁজেন, তারা সমস্যা নিয়ে পড়ে থাকেন না। তারা সুযোগগুলোকে বেড়ে উঠতে দেন আর সমস্যাগুলো দমিয়ে রাখেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হয় প্রতিরোধমূলক।”
তাই 'জরুরি' আর 'গুরুত্বপূর্ণ' এ দুয়ের পার্থক্য জানতে হবে। আর এজন্য দরকার জীবনের অগ্রাধিকারগুলোর ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা। মুসলিম হিসেবে আমাদের কিছু সাধারণ অগ্রাধিকার রয়েছে। কিন্তু প্রতিটা মানুষই স্বতন্ত্র, তার দক্ষতার জায়গাগুলোও ভিন্ন। আর তাই জীবনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাধিকারগুলোও ভিন্ন হবে।
জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাট্রিক্স:
- গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জরুরি নয়: এ ডায়াগ্রামটা জরুরি/গুরুত্বপূর্ণ ম্যাট্রিক্সের একটি উদাহরণ। আমাদের কাজগুলো এ ম্যাট্রিক্সের চার ক্যাটাগরির কোনো না কোনো একটিতে পড়ে। সেগুলো হয় জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ, জরুরি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জরুরি নয় অথবা জরুরি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনোটিই নয়। জরুরি কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া অনুচিত, কারণ এতে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অবহেলিত হয়।
জরুরি এবং একইসাথে গুরুত্বপূর্ণ কাজের উদাহরণ হলো, এ সপ্তাহের মধ্যেই শেষ করতে হবে এমন কোনো কাজ। কাজটি গুরুত্বপূর্ণ বটে কিন্তু সময়সীমা থাকায় একইসাথে জরুরিও। এসব ক্ষেত্রে কৌশল হলো, ফেলে না রেখে কাজটি দ্রুত সেরে ফেলা।
গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জরুরি নয় এমন কাজের উদাহরণ হলো, দীর্ঘস্থায়ী লক্ষ্যগুলো। যেমন, এ বইটি লেখা। বইটি লেখার ব্যাপারে আমার তাড়া ছিল না। কিন্তু আমি প্রতিদিন অল্প অল্প করে হলেও লিখেছি, কারণ এটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এখানেই আমরা অনেকে ভুল করে বসি। গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জরুরি না, এমন কাজগুলো চিহ্নিত করতে আমরা ভুল করি। এসব কাজ করার সঠিক ধরন হলো— প্রতিদিন এসব কাজের জন্য অল্প হলেও সময় বের করা। ব্যক্তিগত উন্নয়ন, পড়াশোনা, অধ্যয়ন, দীর্ঘস্থায়ী লক্ষ্য এসবের জন্য সময় নির্ধারিত করে নিন। যদি একসময় এগুলো জরুরি কাজে পরিণত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন, তা হলে কখনোই এগুলো করা সম্ভব হয়ে উঠবে না।
জরুরি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন কাজগুলো হলো মূলত মনোযোগ বিচ্ছিন্নকারী জিনিসগুলো। যেমন, ফোন কল, মেসেজ অথবা কারো সাথে কথা বলা। অনেকে মনে করে প্রতিটা কল রিসিভ করতে হবে এবং প্রতিটা মেসেজের দ্রুত একটি জবাব দিতে হবে। এটা ভুল ধারণা।
এভাবে করা হলে আমাদের সময় নষ্ট হবে, কাজের গতি কমে যাবে। এ বিষয়ে সামনের কোনো অধ্যায়ে আলোচনা করব—কীভাবে এসব কাজ সামলাতে হয়। আপাতত এটুকু জেনে রাখা যায় যে, এক ঘণ্টা ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা, ফোন কলের উত্তর দেওয়া কিংবা বন্ধুর সাথে চ্যাট করা থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন আমরা জরুরি নয় এবং একই সাথে অগুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর কথা বলব। এসব কাজের মধ্যে পড়ে— টেলিভিশন দেখা, ভিডিও গেমস খেলা আর ইন্টারনেট ব্রাউজ করা। এ কাজগুলো কখনোই আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর সামনে আসা উচিত না। বরং অবসর বিনোদনের জন্য রেখে দেওয়া উচিত। এসবের চেয়ে আমাদের জীবনের লক্ষ্যগুলো অনেক বড়।
স্টিফেন কভে খুব সুন্দরভাবে এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন: "জরুরি কাজগুলো সাধারণত দৃশ্যমান। তারা আমাদের চাপ দিতে থাকে, কাজে নেমে পড়ার জন্য জোর দেয়। এগুলো সাধারণত সবার ক্ষেত্রেই জরুরি কাজ। এরা আমাদের চোখের সামনেই থাকে এবং প্রায়ই এ কাজগুলো আনন্দদায়ক, সহজ এবং মজার হয়। কিন্তু এগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অগুরুত্বপূর্ণও বটে।
অপরদিকে কোনো কাজের গুরুত্ব তার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। আমাদের জীবন, বিশ্বাস এবং লক্ষ্য পূরণে ভূমিকা রাখলেই কেবল কোনো কিছুকে গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়।
আমরা জরুরি কাজগুলোর প্রতিই বেশি সাড়া দিই। গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জরুরি না এমন কাজগুলো বেশি বেশি করা উচিত, এগুলোতে আরও বেশি সক্রিয় হওয়া উচিত। আমাদের সুযোগকে আঁকড়ে ধরতে হবে আর তখনই আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নগুলো পূরণ হতে শুরু করবে।”
নিচের ডায়াগ্রামে জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের উদাহরণসহ ভাগ করে ম্যাট্রিক্সে দেখানো হলো:
১. জরুরি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নয়: যেমন সাধারণ মেইলের জবাব দেওয়া বা যে কারও ফোন রিসিভ করা।
২. জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ: এই সপ্তাহে নির্ধারিত কোনো ডেডলাইন মিট করা বা নির্দিষ্ট কোনো মিটিং এ উপস্থিত হওয়া।
৩. জরুরি নয় গুরুত্বপূর্ণও নয়: অফিসের সর্বশেষ চলতে থাকা কোনো গুজব বা কানাঘুষায় অংশগ্রহণ।
৪. গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জরুরি নয়: কোনো বই লেখার কাজ করা কিংবা অনেক পরে শেষ হবে এমন কোনো প্রকল্পের কাজ।
📄 ধর্মীয় অগ্রাধিকার
এক্ষেত্রে অগ্রাধিকারগুলো ইতোমধ্যেই নির্ধারিত করে দেওয়া আছে অর্থাৎ মাথা খাটিয়ে বের করার প্রয়োজন নেই। এগুলোর জন্য সময় বের করতে হবে কেবল। তা ছাড়া প্রতিটা মুসলিমের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারগুলো মোটামুটি একই। যেমন:
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সময়মতো পড়া: সালাত ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ। তাই অগ্রাধিকারের তালিকায় এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সালাত আল্লাহর সাথে আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম, আমাদের মন্দ প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে অন্যতম সহায়ক। সালাত আমাদের শৃঙ্খলাবোধ এবং মনোযোগ অর্জনে সাহায্য করে। আর একজন বিশ্বাসীর জীবনে সালাত খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ‘ইবাদাত।
কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করাটা বাধ্যতামূলক না হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি 'ইবাদাত। আর এ কাজটি ১০ মিনিটের জন্য হলেও করা উচিত। কুরআন তিলাওয়াত আমাদের অগ্রাধিকার ও দায়িত্বগুলো মনে করিয়ে দেয়, ঈমান বৃদ্ধি করে, হৃদয়কে প্রশান্ত করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি বয়ে আনে।
ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা: প্রতিটা মুসলিমের উচিত প্রতিনিয়ত ইসলামের জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা করা। অধিকাংশ মানুষ যথেষ্ট সময় না থাকার অজুহাত দেয়। কিন্তু টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে একটি বই পড়ার সময় আপনি আর সে অযুহাত দিতে পারেন না। কিছু বই, লেকচার আর কোর্সের একটি সিলেবাস তৈরি করে ফেলুন। এরপর প্রতিদিন ত্রিশ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা ইসলামের জ্ঞান অর্জনের পেছনে দিন।
আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি কর্তব্য: এটা ধর্মীয় আবশ্যক কাজের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমরা একটি অন্য ক্যাটাগরিতে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
📄 ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত অগ্রাধিকার
আমাদের ক্যারিয়ারের সাথে সম্পর্কিত অগ্রাধিকারগুলো মোটামুটি নিচের প্রকারগুলোতে ভাগ করা যায়। একেকজনের জন্য ব্যাপকতার ক্ষেত্রে আর গুরুত্ব অনুসারে এ প্রকারভেদে ভিন্নতা ঘটতে পারে।
স্বল্পস্থায়ী কাজ: এ কাজগুলো খুব অল্প সময়ে দ্রুততার সাথে সেরে ফেলা উচিত। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার মাঝে এসব কাজ যেন বাধা সৃষ্টি না করে।
দীর্ঘস্থায়ী কাজ: এক্ষেত্রে আমরা অনেকেই ভালোভাবে টাইম ম্যানেজ করতে ভুল করি। নির্ধারিত সময় শেষ হতে আরও দুই মাস সময় বাকি আছে দেখলে আমরা আরও গড়িমসি করি। এভাবে শেষমেশ কাজটি আর সুন্দরভাবে করাও হয়ে ওঠে না। এখানে সমাধান হলো আগেভাগে পরিকল্পনা করা।
প্রথমে দীর্ঘস্থায়ী কাজের ডেডলাইনগুলো চিহ্নিত করা উচিত। এরপর প্রতিদিন ত্রিশ মিনিট সময় কাজটির জন্য বরাদ্দ রেখে কাজ করে গেলে দেখবেন নির্ধারিত সময়ের আগেই আপনার কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এবং শুধু শেষ না, খুব ভালোভাবেই শেষ করতে পারবেন। এতে করে কাজের চাপ এবং দুশ্চিন্তাতেও পড়বেন না।
পেশাগত উন্নয়ন: চারপাশের এত এত জরুরি কাজ এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ভিড়ে আমরা আমাদের পেশাগত উন্নয়ন নিয়ে সহজেই আত্মতুষ্টিতে ভুগি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে হলে পেশাগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর এজন্য প্রতিদিন কিছু সময় নির্ধারিত করা উচিত, এমনকি প্রতিদিন ত্রিশ মিনিট করে হলেও। বই এবং আর্টিকেল পড়া, সেমিনারে অংশগ্রহণ করা এসবের মাধ্যমে নিজেকে নিয়মিত উন্নত করতে হবে এবং এভাবে একজন পেশাজীবী হিসেবেও দক্ষ হয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
আপনার যোগ্যতা যত বাড়বে, চাকরির সুযোগও তত বেশি আসবে, একইসাথে আপনার স্যালারিও ভালো হবে। বাস্তবতা হলো, পেশাগত দক্ষতাই আপনার সামনের জীবনে সবচে বেশি কাজে আসবে। কিন্তু খুব কমই আমরা এ বিষয়টাকে আমলে নেই।
📄 পারিবারিক অগ্রাধিকার
এটা বেশ সহজ। অগ্রাধিকারের ধরন নির্ভর করবে আপনার পারিবারিক কাঠামোর ওপর।
জীবনসঙ্গী: আপনার জীবনসঙ্গীর জন্য প্রতিদিন সময় বের করুন। এটা করার সবচে ভালো উপায় হলো, বাচ্চাদের সাথে বেডটাইমটা আগে সেরে নেওয়া। ওরা ঘুমিয়ে যাবার পর একটি অখণ্ড ও সুন্দর সময় আপনার স্বামী/স্ত্রীর সাথে ব্যয় করুন। এটা হলো সাধারণ নিয়ম। কিন্তু বহুবিবাহের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটবে। এসব ক্ষেত্রে টাইম ম্যানেজমেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে সব স্ত্রীর জন্যই সময় বের করতে হবে এবং সবাইকেই সমান সময় দিতে হবে।
সন্তান-সন্ততি: অনেকে নিজের বাচ্চাদের সাথে একদমই সময় কাটান না। হয় এড়িয়ে যান অথবা নানা রকম গ্যাজেট দিয়ে ওদের ডুবিয়ে রাখেন, যাতে বাচ্চারা বিরক্ত না করে। ভুলে গেলে চলবে না, আপনার সন্তানেরাই এ পৃথিবীতে এবং আখিরাতের জন্য আপনার সর্বোত্তম বিনিয়োগ। তাদের আপনি সবচে ভালো যে উপহারটা দিতে পারেন, সেটা হলো আপনার সময়। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আপনার কাজ শেষে এক ঘণ্টা সময় আপনার বাচ্চাদের জন্য রাখুন। ওদের সাথে আনন্দময় সময় কাটান। এভাবে আপনাদের সম্পর্কে একটি পরিবর্তন দেখতে পাবেন, একইসাথে এর মাধ্যমে ওদের বেড়ে ওঠাটাও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে।
বাবা-মা: তাদের সাথে একই বাসায় থাকলে তাদের জন্য প্রতিদিন সময় বের করুন। আর যদি একইসঙ্গে না থাকেন, তা হলে ফোনে যোগাযোগ করুন এবং সপ্তাহে অন্তত একবার তাদের দেখতে যান। তাদের অবহেলা করবেন না। কারণ, তাদের সন্তুষ্টিতেই আপনার জান্নাত পাওয়া সহজ হবে। বাবা-মাকে সময় দেওয়া প্রত্যেকের জীবনেই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
ভাই-বোন: আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমরা প্রত্যেকে আমাদের নিজেদের জীবন নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমাদের ভাই-বোনরাও তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এভাবে দূরত্ব তৈরি হয়। মুসলিম হিসেবে আমাদের অবশ্যই পারিবারিক বন্ধন রক্ষা করার ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে। এজন্য নিজেদের মধ্যে মেসেজিং করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংযুক্ত থাকা এবং সময় সময় একে অপরকে দা'ওয়াত দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।