📄 সম্পাদকের কথা
ফজরের সালাতের পর রাসূল সাহাবিদের খোঁজখবর নিতেন। কেউ কোনো স্বপ্ন দেখে থাকলে তার ব্যাখ্যা করতেন। বিভিন্ন সময় উৎসাহমূলক বিভিন্ন কথাবার্তা বলতেন। একদিন ফজরের পর তিনি উপস্থিত সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের মধ্যে আজ কে সাওমের নিয়্যাত করে ঘুম থেকে উঠেছ?” আবু বাক্স আস সিদ্দীক বললেন, "আমি।” এরপর জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাদের মাঝে কে আজ জানাযায় অংশ নিয়েছ?” আবু বাক্স বললেন, "আমি।” এরপর জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাদের মধ্যে কে আজ দরিদ্রকে খাইয়েছ?” আবু বাক্স বললেন, "আমি।” এরপর জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাদের মধ্যে কে আজ অসুস্থ কাউকে দেখতে গিয়েছে?” আবু বাক্স আস-সিদ্দীক বললেন, "আমি।” নবি বলেন, "এই কাজগুলো যদি কেউ একই দিনে করে তবে আশা করা যায়, তাকে জান্নাত দেওয়া হবে"।
এরাই ছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষ। কিন্তু আমরা তাদের উত্তরসূরি হয়ে টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পশ্চিমাদের বই খুঁজি।
আমরা প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে করা এক যুদ্ধ বিক্রি করে এখনও খাওয়ার ধান্ধা করি। অথচ একেকজন সাহাবি এক জীবনে অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এমনকি বিশ-পঁচিশ-ত্রিশ কিংবা তারও বেশি। আমরা এমন আত্মনিবেদিত মানুষের জীবনী পড়ার সময় হয়তো ভাবি, যুদ্ধই হয়তো ছিল তাদের জীবন; ঘরসংসার নিয়ে তাদের ভাবতে হয়নি। কিন্তু না! তারা চিরকুমার ছিলেন না; ছিলেন না কাস্তেবিপ্লবীদের মতো—যারা বিপ্লব বেচে পরনারী ভোগ করে। তাদের প্রায় সকলেরই একাধিক স্ত্রী ছিল এবং সে স্ত্রীরা তাদের স্বামীর প্রতি সন্তুষ্টও ছিলেন। তারা একটি দুটি নয়, অনেক সন্তান নিয়েছেন এবং তাদের লালন-পালন করেছেন। সবই সামলেছেন তারা।
যখন একটি হাদিস সংগ্রহ করতে মাইলের পর মাইল সফর করতে হতো-এরোপ্লেনে নয়, ঘোড়া-গাধা-উটে চড়ে, তখন ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে কম-বেশ ত্রিশ হাজার হাদিস সংগ্রহ করেছেন। ইমাম বুখারি সাত হাজার পাঁচ শ হাদিস সংকলন করেছেন শুধু সহিহ বুখারিতেই। প্রতিটি হাদিস লিপিবদ্ধ করার পূর্বে তিনি দুই রাকা'আত ইস্তিখারা সালাতও আদায় করেছেন।
পাখির পালক কালিতে চুবিয়ে লেখার যুগে অনেক মুসলিম বিদ্বান যে রচনা করে গিয়েছেন, আমাদের অনেকে এক জীবনে হয়তো পড়েও শেষ করতে পারব না।
তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের সব কাজ সহজ করে দিয়েছে। ক্লিকেই দুনিয়ার তথ্য আমাদের নখের ডগায়। আমরা পৃথিবীর এক প্রান্তে প্রাতরাশ সেরে অন্য প্রান্তে দুপুরের কাইলুলা করতে পারি। এত সুযোগ সুবিধা ভোগ করেও পূর্বসূরিদের মতো যোগ্য সন্তান জন্ম দিতে এই জাতি আজ ব্যর্থ। সকাল হয়, দিন গড়িয়ে রাত হয়, আবার সূর্য ওঠে। আলু-পেঁয়াজ আর বিদ্যুৎ-বিলের হিসাব মেটাতেই বেলা শেষ। পৃথিবীকে দিয়ে যাওয়ার মতো কিছুই করা হয় না। সময় নেই, ব্যস্ত।
আমরা কি আসলেই ব্যস্ত-নাকি ব্যস্ততার অভিনয় করি, কিছু না করেই নিজেকে কিছু একটা প্রমাণ করার কসরতে। একটু বসুন নিজের সাথে। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন।
তথ্যপ্রযুক্তির অক্টোপাসে জড়ানো আধুনিক এই সময়ে জীবনটাকে আরেকটু যারা অর্থবহ করতে চান; পৃথিবীতে রেখে যাওয়ার মতো কিছু করতে চান তাদের জন্য সিয়ানের এই বই 'Time Management'।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বইটি অনুবাদ করার পক্ষে ছিলাম না। কারণ, লেখক এত সহজ সরল ইংরেজিতে রচনাটি করেছেন যে, যারা মোটামুটি ইংরেজি পড়তে পারেন তারাই বুঝতে পারবেন। কিন্তু পাঠকদের পক্ষ থেকে ক্রমাগত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমার অবস্থান থেকে সরে এসে অনুবাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।
বইটি লিখেছেন ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটির হেড টিউটোরিয়াল এসিস্ট্যান্ট উস্তাদ ইসমাঈল কামদার। বইটির বাংলা অনুবাদ আপনাদের হাতে তুলে দিতে পেরে সিয়ান পরিবার আনন্দিত। আল্লাহ বইটির সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
আবু তাসমিয়া আহমদ রফিক
প্রধান সম্পাদক
সিয়ান পাবলিকেশন লিমিটেড
সেপ্টেম্বর, ২০১৯
📄 পূর্বকথা
আর-রাহমান, আর-রাহীম আল্লাহর নামে।
টাইম ম্যানেজমেন্ট বা সময় ব্যবস্থাপনার ওপর বই লেখার ধারণা আমার মাথায় প্রথম আসে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সাথে সাথে আমি লেখাও শুরু করে দিই, কারণ আমার একদমই তর সইছিল না, ভীষণ রকমের উদ্দীপনা কাজ করছিল তখন। আর সবাই যাতে দ্রুত আমার লেখাটা পড়তে পারে এ নিয়ে এতই উদগ্রীব ছিলাম যে, তাড়াহুড়োয় একটা আনাড়ি ভুল করে বসি।
আমি কাউকে দিয়ে প্রুফরিড করানো কিংবা কোনো দক্ষ সম্পাদনা ছাড়াই বইটি নিজে নিজে ছাপিয়ে ফেলি। শেষমেশ ২০১৫ সালের মার্চ মাসে বইটা বের হয়, অনেকেই বইটি পড়ে উপকৃত হয় ঠিকই কিন্তু বইটি ছিল অনেকগুলো মুদ্রণজনিত ভুলে ভরা। একজন পারফেকশনিস্ট হিসেবে এটা আমার জন্য বেশ লজ্জাজনক। যাহোক, আমি আমার ভুল থেকে শিখেছি। এরপর থেকে যত বই-ই আমি লিখব, বাজারে বের করার আগে সবগুলোর সম্পাদনা করানো হবে।
ছাপানোর দিকটা বাদ দিলে আমার বইটা নিয়ে আমি অসন্তুষ্ট ছিলাম না। বইটায় অসংখ্য পরীক্ষিত কৌশল আর নিয়ম বলা আছে, যা আমার মতে বেশ উপকারী। কেউ সেগুলো ঠিকমতো কাজে লাগালে সেগুলো তার জীবনই পালটে দিতে পারে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যথাশীঘ্র বইটার দ্বিতীয় সংস্করণ বের করব।
সঙ্গে সঙ্গে চিরুনি অভিযানে নেমে গেলাম। বইয়ের ভুলগুলো খুঁজতে লাগলাম এবং সম্পাদনার জন্য পাঠানোর আগেই অনেকগুলো ভুল নিজেই সংশোধন করে ফেলেছিলাম। এ কাজ করতে করতে আমার মনে হলো বইটার কলেবর আরও বাড়ানো যেতে পারে। যে যে দিকগুলোকে আরও উপকারী করা যেতে পারে, সেগুলো নোট করতে লাগলাম। এভাবে শেষমেশ বইটা আরও ৫০ পৃষ্ঠা বেড়ে গেল।
বইয়ের অতিরিক্ত পৃষ্ঠাগুলোতে কিছু খসড়া তালিকা যুক্ত করেছি। বইয়ে যেসব কৌশল আলোচনা করেছি সেগুলোর আলোকেই এ টেমপ্লেটগুলো সাজানো। বইটির প্রথম প্রকাশের পর টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আরও যা লিখেছি সেগুলো পরিশিষ্টতে থাকছে। এছাড়াও প্রতিটি অধ্যায়ে যেখানে প্রয়োজন মনে হয়েছে, সেখানে উদাহরণ এবং অতিরিক্ত ব্যাখ্যা সংযোজন করেছি।
আমি ভালো করেই জানি মানুষের লেখনী কখনোই একেবারে ত্রুটিহীন, যথার্থ নয়। উন্নতির কিছু না কিছু জায়গা থেকেই যায়। কিন্তু এ দ্বিতীয় সংস্করণটা প্রথমটার চাইতে বহুগুণে ভালো। এ সংস্করণে অনেক বিস্তারিত উপকরণ আছে, এছাড়া ব্যাবহারিক কৌশলসহ বহু উপকারী টিপসও আছে।
টাইম ম্যানেজমেন্ট এমন একটা বিষয়, যেখানে আপনি ক্রমাগত উন্নতি করতে পারবেন, নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করবেন। তাই পরবর্তী সংস্করণগুলোতে কিছু না কিছু সংযুক্ত করার সুযোগ থাকে। আমি তাকিয়ে আছি সময় গড়িয়ে যাবার সাথে সাথে টাইম ম্যানেজমেন্টের আরও কৌশল শেখার আশায়, এবং সেগুলো বই আর প্রবন্ধ আকারে আপনাদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য।
আপনাদের সকলের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আশা করছি এ সংস্করণটা পূর্বেরটার তুলনায় আরও বেশি উপভোগ করবেন। টাইম ম্যানেজমেন্ট এবং সেল্ফ-হেল্প নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আরও জানতে আমার ওয়েবসাইট http://islamicselfhelp.com এ ঘুরে আসতে পারেন স্বচ্ছন্দে।
সালাম
আবু মুআবিয়া ইসমাইল কামদার
📄 অনুবাদকের কথা
'Time Management' যখন প্রথম বাজারে আসে তখন বইটি কেনার ব্যাপারে আমি তেমন আগ্রহ দেখাইনি। একটু ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল বটে কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কিছু মনে হয়নি। সেটার কারণ সম্ভবত তখনও সময়কে 'ম্যানেজ' করার প্রয়োজনীয়তা আমি অনুভব করিনি। তখন ছিল হাতে অফুরন্ত সময় আর পড়াশোনা ছাড়া তেমন কোনো কাজে সে অফুরন্ত সময় কাজে লাগানোর তাগিদ ছিল না। তবুও কিনেছিলাম, কারণ সিয়ানের বই।
এরপর যখন বইটি পড়া শুরু করি তখন ইউনিভার্সিটিতে। আর সে সময় হাড়ে হাড়ে অনুভব করছিলাম আধুনিক যুগে সময়ের বারাকাহ কত কমে গেছে আর একজন মুসলিমকে সে বারাকাহ ফিরিয়ে আনতে প্রতিনিয়ত কতটা সংগ্রাম করতে হয়। ইবাদাত, পড়াশোনা, চাকরি, বিনোদন, ব্যক্তিগত জীবন—সবকিছু ইফেক্টিভলি ম্যানেজ করতে পারাটা এ যুগে অনেক বড় একটা স্কিল। সে স্কিল আয়ত্ত করা আবার এতটা সহজও না। আমাদের এমন অনেক বন্ধু আছে, যারা লাস্ট মোমেন্টে এসে সবকিছু করেও কীভাবে কীভাবে যেন সফলতা পেয়ে যায়। তাদের দেখে আমাদের এই ভ্রান্তি ঘটে যে, টাইম ম্যানেজমেন্টের কী দরকার! এসব ম্যানেজমেন্ট মানেই নিয়ম-কানুন আর মোটিভেশন।
একজন মুসলিমের জীবনে নিয়ম-কানুন, শৃঙ্খলা এসব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো একেকজনের জীবনে নিয়ম-কানুন, শৃঙ্খলার মাত্রা বিভিন্ন কিন্তু এটা থাকতেই হবে, আপাতত যতই বোরিং মনে হোক না কেন।
শায়খ ইসমাইল কামদার এ নিয়ম-কানুনকেই এত সহজ করে দেখিয়েছেন যে, অনুবাদ করতে গিয়ে আমার মনে হয়নি যে আমি গতানুগতিক কিছু অনুবাদ করছি। 2 minutes rule, S.M.A.R.T goal, to-do-list-এর মতো টেকনিকের কথা আগেও আমরা পড়েছি কিন্তু সময়ের বারাকাহ কীভাবে পাওয়া যায় এটা নিয়ে হয়তো আগে তেমন কেউ পড়েননি। যারা জানেন এবং বোঝেন যে, সময়কে স্মার্টলি ব্যবহার করতে পারলে জীবন সহজ হয়ে যায় তাদের জন্য এ বইটা মাস্ট রিড।
এটা আমার প্রথম অনুবাদ। এর আগে খণ্ড খণ্ড কাজ করেছি তবে পুরো বই এই প্রথম। চেষ্টা করেছি লেখা সহজ-সাবলীল রাখতে, কারণ সেল্ফ-হেল্পের অনেক টপিকই বাংলায় অপরিচিত। ধন্যবাদ মাসুদ শরীফ ভাইকে, উনিই কাজটি দিয়েছিলেন আর সময়ে সময়ে দ্রুত অনুবাদ শেষ করার তাগাদা দিয়ে আমার নিজের টাইম ম্যানেজমেন্টের ঘাটতি পূরণ করে দিয়েছিলেন।
আশা করি উপভোগ করবেন।
দু'আ প্রার্থী।
মুহাম্মাদ ইফাত মান্নান
📄 সময়ের বারাকাহ নেই?
নিচের কথোপকথনটা দেখুন, চেনা চেনা লাগে?
আহমাদ : শুক্রবার চলে এল। সময়গুলো যে কীভাবে চলে যায়!
আয়িশা : হ্যাঁ, সপ্তাহটা যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। সময়ের যেন কোনো বারাকাহ নেই।
আহমাদ : কিয়ামতের লক্ষণ এটা। কোনো কিছুই যেন করা হচ্ছে না ইদানীং। কাজ করতে করতে আর বিল দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আর কিছু করার সময়ই পাই না।
আয়িশা : ঠিক বলেছ। বাচ্চা আর ঘরের কাজ সামলাতে সামলাতেই সময় শেষ হয়ে যায়। একটি বই পড়ি না কত মাস হয়ে গেল!
আহমাদ : কী আর করবে? এটাই তো জীবন, তাই না?
আয়িশা : হ্যাঁ, এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে।
ওপরের কথোপকথনের সামান্য অংশও যদি চেনা মনে হয়, তা হলে আপনার জন্য সুখবর! দরকারি বইটিই কিনেছেন। এ বইয়ে আপনি কিছু সুন্দর অভ্যাস ও কৌশল শিখবেন, যেগুলো অনুসরণ করে আপনি সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবেন।
অনেকেই অভিযোগ করে—সময়ের বারাকাহ চলে গেছে। কিন্তু আমি মনে করি না, সব ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। বারাকাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার এবং কেউ তাঁর কাছে বারাকাহ চাইলে, পাওয়ার চেষ্টা করে গেলে তিনি তাকে সেটা দেন। তো আপনি যদি আল্লাহর কাছে সময়ের বারাকাহ চেয়ে দু'আ না করে থাকেন, আপনাকেই বলছি, এখনই যান। (হ্যাঁ! বই বন্ধ করুন, আগে দু'আ করে আসুন, শেষ হলে এ পৃষ্ঠা থেকে আবার পড়া শুরু করুন)। যদি আপনি বারাকার জন্য দু'আ করেও কোনো পরিবর্তন দেখতে না পান, তা হলে আপনার জীবনযাপনে পরিবর্তন দরকার। হতে পারে আপনার কিছু অভ্যাস বদলাতে হবে এবং এভাবে বারাকাহ পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে। এ বইটি সে কাজেই আপনাকে সহযোগিতা করবে।
সামনের অধ্যায়গুলোতে আমরা কিছু অভ্যাস এবং কৌশলের ব্যাপারে জানব, যা পরীক্ষিত এবং শতভাগ হালাল! (আধ্যাত্মিক এবং জাগতিক উভয়দিক থেকে)। সময় গোছাতে এবং জীবনের লক্ষ্য পূরণে এগুলো আপনার সহায়ক হবে।
শুরু করার আগে একটি গল্প বলি। কীভাবে আমি টাইম ম্যানেজমেন্ট আবিষ্কার করি এবং কীভাবে এ আবিষ্কার আমার জীবন গোছাতে সাহায্য করেছিল, সেই গল্প।
'৯০ ও '০০-এর দশকে বেড়ে ওঠা আমার প্রজন্মটা ছিল 'সময় নষ্টের' কাজে উসতাদ। ভিডিও গেমস, মুভি ছিল সময় নষ্টের অন্যতম উপকরণ। এভাবে সময় অপচয় করে দিন শেষে আমরাই আবার আফসোস করতাম, বড় কোনো কাজ করার মতো সময়ই পাই না। আর আমিও যেহেতু এ প্রজন্মেরই একজন, এমন কিছু বদঅভ্যাস আমারও ছিল। যেগুলো আপনাদের মাঝেও কারো কারো থাকতে পারে। যেমন, সময়ের কোনো হিসেব ছাড়াই রাত জেগে ভিডিও গেমস খেলা, মজার কোনো কাজ করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দেওয়া এবং সবচেয়ে বাজে মাল্টি-টাস্কিং করা।
২০১০ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে আমি ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিই। যোগ দেবার সাথে সাথেই কাজের প্রচণ্ড চাপে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। আমাকে সপ্তাহে ছয়টা ক্লাস নিতে হতো, ই-মেইল আর ফোরাম পোস্টের উত্তর দিতে হতো, আর এসাইনমেন্ট গ্রেডিং-এর কাজও ছিল। আমার মনে পড়ে, সে বছর হাজ্জের সময় আজিজিয়াতে আমি আমার শিক্ষক ড. বিলাল ফিলিপ্সের সাথে আলাপ করি। সেখানে তাকে আমার কাজের প্রচণ্ড চাপের ব্যাপারে অনুযোগ করি। তিনি তখন বললেন, আমি যেন একটি উপায় বের করে নিই। কারণ, কাজের চাপ বাড়বে বই কমবে না। হোটেলে ফেরার সময় তার কথাটি ভেবে দেখলাম। হাজ্জ থেকে ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নিলাম, সময়কে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানোর পদ্ধতি নিয়ে কিছু পড়াশোনা করব। তখন থেকে বিগত পাঁচ বছর ধরে আমি সেল্ফ-হেল্প এবং টাইম-ম্যানেজমেন্টের ওপর অনেকগুলো বই পড়েছি। প্রতিটা বই থেকেই আমি অনেক নতুন নতুন কৌশল এবং অভ্যাস সম্পর্কে জেনেছি, যেগুলো আমার দারুণ কাজে এসেছে।
আল-হামদু লিল্লাহ, এখন আমি IOU-এর প্রধান সহকারী শিক্ষক। এখন সপ্তাহে আমি ১২ ঘণ্টা ক্লাস নিই, প্রতি সেমিস্টারে ১০০০-এরও ওপর এসাইনমেন্ট গ্রেড করি। এ ছাড়া আমার ছেলে-মেয়েদের বাসায় পড়াই, বই আর প্রবন্ধ লিখি, অন্য প্রতিষ্ঠানেও পড়ানো হয় এবং সারা সপ্তাহ জুড়ে আরও অনেক কাজ করি। আমি বিশ্বাস করি এটা আসলে দুটো কাজের ফলাফল-
• বারাকার জন্য দু'আ করা।
• প্রতিনিয়ত সময়ের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
• তো, আমি বইটি লেখার ব্যাপারে ধারণা পাই ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এই বিষয়ের ওপর কিছু লেখা ছিল আমার বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। আমি ইতোমধ্যে অবশ্য টাইম ম্যানেজমেন্টের ওপর অনেক প্রবন্ধ লিখেছি, ওয়েবিনারে বক্তব্য রেখেছি আর ফেসবুকে অল্পস্বল্প কিছু টিপস পোস্ট করেছি।
যাহোক, আমার মনে হতো এ বিষয়ের ওপর লেখনীগুলোতে বড় ধরনের কিছু ফাঁক ছিল। বেশির ভাগ বই সেক্যুলার দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা (তারপরও অবশ্যপাঠ্য)। আর ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা বইগুলো হয় এতই যে, মূল বিষয়ের প্রতি মোটেও সুবিচার করা হয়নি; আর নয়তো এতই বিস্তারিত যে, সাধারণ মানুষ সেটা পড়ার আগ্রহই পাবে না। তাই টাইম ম্যানেজমেন্টের ওপর এ বইটি লেখা আমার লক্ষ্য বানিয়ে ফেলেছিলাম। সেই সঙ্গে দু'আ করছি সেল্ফ-হেল্প সিরিজের বইগুলোর জন্য এ বইটি যাতে একটি ভালো ভূমিকা হয়।
এ বইটি আমার পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য উপহার। আমার সারা দিনের পুরো সময়টার সর্বোচ্চটুকু কাজে লাগানোর জন্য যে কৌশল, অভ্যাস এবং টিপসগুলো অনুসরণ করি, সেগুলো এখানে আমি আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করব, যাতে করে আপনারাও আপনাদের সময়কে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারেন। এভাবে একদিন, আমাদের প্রিয় পৃথিবীতে আমাদের বসবাস আরো উপভোগ্য হয়ে উঠবে, আরও আনন্দময় হয়ে উঠবে।
সময়কে ভালোভাবে কাজে লাগানোর মৌলিক যেসব ধারণা, অভ্যাস এবং কৌশল রয়েছে, সেগুলো আমরা সামনের অধ্যায়গুলোতে দেখব। প্রতিটা অধ্যায়ের শেষে থাকবে 'যা যা করব' বিভাগ। এটা মূলত প্রায়োগিক দিকগুলো নিয়ে গঠিত। আমার পরামর্শ থাকবে এ বিভাগে উল্লিখিত কাজগুলো যেন ঠিকভাবে করা হয়, নিজের জীবনে কাজে লাগানো হয়। এতে করে নিজ নিজ জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আপনারা নিজেরাই অনুভব করবেন।
এ বইটি প্র্যাক্টিক্যাল। শুধুই পড়ে গেলেন, 'খুব ভালো বই' বলে প্রশংসা করলেন, শেষমেশ বুকশেলফে ফেলে রাখলেন, এমনটা করা যাবে না। বরং আপনার উচিত হবে, এখানে বর্ণিত কৌশলগুলো চেষ্টা করে দেখবেন এবং নিজের জীবনে প্রয়োগ করবেন।
আল্লাহ যেন আমাকে এ সিরিজের বইগুলো শেষ করার তাওফিক দেন, আমার কাজ কবুল করে নেন এবং এ বইটিকে পাঠকের জন্য উপকারী বানিয়ে দেন। আমীন।
যা যা করব
বইটি পড়ে শেষ করুন:)