📄 রুগ্নকে দেখতে গিয়ে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুআ
عَادَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا مَرِيضٌ فَقَالَ لِي يَا سَلْمَانُ شَفَى اللَّهُ سَقَمَكَ وَغَفَرَ ذَنْبَكَ وَعَافَاكَ فِي دِينِكَ وَجِسْمِكَ إِلَى مُدَّةِ أَجَلِكَ
হযরত সালমান ফারসী (রাযিঃ) তাঁর ব্যক্তিগত ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, "আমি রুগ্ন অবস্থায় হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখার জন্য তশরীফ নিয়ে আসেন এবং এই দুআ করেন, আল্লাহ তোমার রোগ ভাল করে দিন, তোমার গোনাহ মাফ করে দিন এবং তোমার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমার দ্বীন ও দেহকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন।"
চিন্তা করে দেখুন! কত ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ দুআ। কেন হবে না। এটা যে আল্লাহর নবীর পবিত্র মুখ নিসৃত দুআ। তাই তো এতে দুনিয়া ও আখেরাত, বর্তমান ও ভবিষ্যত, দেহ ও আত্মা সবকিছুর জন্যই কল্যাণের দুআ সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে রয়েছেঃ
(এক) মহান মুক্তিদাতা আল্লাহ তোমার রোগ ভাল করে দিন এবং তোমাকে সুস্থতা দান করুন।
(দুই) ক্ষমাশীল আল্লাহ তোমার গোনাহ ক্ষমা করে দিন। তিনি যদি মেহেরবানী করে ক্ষমা না করেন তাহলে দুনিয়াতে অপদস্থতা এবং আখেরাতে লাঞ্ছণা ছাড়া আর কি পাব?
(তিন) আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক রুগ্ন ব্যক্তিকে আত্মিক এবং দৈহিক উভয় দিক থেকেই শান্তি দান করুন। আর যতদিন হায়াত থাকবে ততদিন সুস্থ আরামদায়ক ও নিরাপদ জীবন দান করুন।
📄 রুগ্ন ব্যক্তির নিকট দু’আ কামনা
হযরত আনাস (রাযিঃ) রেওয়ায়াত করেন, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
عُودُوا المَرْضَى وَمُرُوهُم فليدعوا الله لكمْ فَإِنَّ دَعْوَةَ الْمَرِيضِ مُسْتَجَابَة وذنبُهُ مَغْفُورٌ
"তোমরা রুগ্ন ব্যক্তিদের দেখতে যাবে এবং তাদের নিকট দুআর আবেদন করবে। তারা যেন তোমাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করে। কেননা, রুগ্ন ব্যক্তির দুআ অবশ্যই কবুল হয়ে থাকে এবং তাদের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। -আত-তারগীব ওয়াত তারহীব
এ সম্পর্কে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফারুক (রাযিঃ)-এর বরাতেও একটি হাদীস শ্রবণ করুন।
عَنْ عَمْرِبْنَ الْخَطَابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلْتَ عَلَى مَرِيضٍ فَمُرُهُ يَدْعُوكَ فَإِنَّ دُعَاءَهُ كَدُعَاءِ الْمَلَئِكَةِ -
"হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, হযরত রাসূল মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা যখন কোন রুগ্ন ব্যক্তির নিকট যাবে তখন তার নিকট আবদার করে বলবে সে যেন তোমাদের জন্য দুআ করে। কেননা, তার দুআ ফেরেশতাদের দুআর মত (মকবুল) হয়ে থাকে।" -ইবনে মাজাহ, মিশকাত শরীফ
আল্লাহ আকবার! কোথায় কল্পনাপূজারীদের এই ধারনা যে রোগ-ব্যধি হওয়া একটি আযাব ও গুনাহের শাস্তি। আর কোথায় সত্যবাদী মহান নবীর এই শিক্ষা যে, রুগ্ন ব্যক্তির উপর আল্লাহর খাছ রহমত বর্ষিত হয়। তার দুআ বিশেষভাবে কবুল হয়ে থাকে। এটা কতবড় সুসংবাদ যে, রুগ্ন ব্যক্তির গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় এবং তার দুআ মকবুল হয়। শুধু তাই নয় বরং তাদের দুআ ফেরেশতাদের দুআর সমপর্যায়ের হয়ে থাকে। সুতরাং তোমরা যখন কোন রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে যাবে তখন তার নিকট নিজের জন্য দুআর দরখাস্ত করবে।
এতে বুঝা যায়, অসুখে পতিত হওয়ার কারণে বান্দা যেন ফেরেশতাদের ন্যায় দুআ কবুল হওয়ার মাকাম ও মর্যাদা হাসিল করে এবং স্বীয় মাওলা পাকের অতি নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যায়।
📄 অন্তিম মূহুর্তে তালক্বীন
যে কারো দুনিয়াতে আসার পর একদিন তাকে এখান থেকে বিদায় নিতেই হবে। মৃত্যুর স্বাদ তাকে চাকতেই হবে। দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার এই অন্তিম মুহূর্তটি কেমনে অতিক্রান্ত হবে? এ সম্পর্কে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সম্মানিত সাহাবী হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাযিঃ)-এর মুখ থেকে শুনুন। তিনি বলেন, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
لَقِنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
"তোমরা মৃত্যু পথযাত্রী লোকদের (তার অন্তিম মুহূর্তে) কালেমায়ে তাইয়্যেবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর তালক্বীন কর।"-মুসলিম শরীফ
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপর এক সাহাবী হযরত মুআয (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসও উপরোক্ত মুবারক ইরশাদের সমর্থন করে। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَنْ كَانَ أُخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ
"যার জীবনের শেষ কালাম হবে "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ" সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" -মুসতাদরাক, আবূ দাউদ
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (আমার পিতা-মাতা তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক) এই পবিত্র বাণীর আছর হল এই যে, আজ আমাদের সমাজে সুপ্রচলিত নিয়ম এই যে, কোন রুগ্ন ব্যক্তির শুশ্রূষাকারী যখন অনুভব করে যে, এখন তার শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে তখন তার মৃত্যু কষ্টের অবস্থায় তাকে কালিমায়ে তাইয়্যেবার তালক্বীন করে। তালক্বীনের অর্থ হল তাকে বলা হবে যে, কালামা তাইয়্যেবা “লা-ইলাহা ইল্লাহ" পাঠ কর। তবে এ ক্ষেত্রে সুন্নত হল এই যে, পাশে বসা লোকেরা নিজেরাই জোরে জোরে কালিমা তাইয়্যেবা পাঠ করতে থাকবে। বস্তুতঃ এর মধ্যে অনেক বড় হিকমত নিহিত রয়েছে।
পক্ষান্তরে যদি মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিকে কালিমা পড়তে বলা হয় তবে সে হয়তো পড়তে সক্ষম নাও হতে পারে। কারন এই কঠিন অবস্থায় তার জিহবার নড়াচড়া করার শক্তি আছে কিনা তার হুশ ও অনুভূতি ঠিক আছে কিনা তাতো জানার কোন উপায় নাই। সর্বোপরি খোদা না করুন মুত্যু যাতনায় তার মস্তিষ্কও তো বিকৃত হয়ে যেতে পারে। এমতাবস্থায় সে হয়তো কালিমা পড়তে অস্বীকারও করে বসতে পারে। সুতরাং পাশে অবস্থানরত শুশ্রূষাকারীগণ কালিমা পাঠ করতে থাকবে। আর রোগীর নিজেরই উপলব্ধি জাগ্রত হবে।
📄 হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্তিম মূহুর্ত
আল্লাহ তা'আলার প্রিয় হাবীবের ওয়াফাতকালীন মুহূর্তগুলি কিভাবে কেটেছে? এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় তাঁর পবিত্র মুখে কি কি কথা উচ্চারিত হয়েছে?
এই প্রশ্নের জওয়াব হযরতের অন্তিম মুহূর্তে শুশ্রূষাকারীণী তাঁর পবিত্রা স্ত্রী মুসলিম জননী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ)-এর ভাষায় শুনুন। তিনি বলেনঃ
رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ بِالْمَوْتِ عِندَهُ قَدَحُ فِيهِ مَاءً وَهُوَ يُدْخِلُ يَدَهُ فِي الْقَدَحِ ثُمَّ يَمْسَحُ وَجْهَهُ بِالْمَاءِ ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَسَكَرَاتِ الْمَوْتِ
"আমি রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওয়াফাতের সময় ঘনিয়ে এলে তাঁর পাশে রক্ষিত একটি পানির পাত্রে বার বার হাত ভিজিয়ে এনে স্বীয় চেহারা মুবারক মছেহ করতে দেখেছি। এ সময় তিনি বলছিলেন "আয় আল্লাহ! আমাকে মৃত্যুর কঠিন যাতনায় সাহায্য করুন।" -তিরমিযী শরীফ
এতদ্ব্যতীত বুখারী ও মুসলিম শরীফে উক্ত হযরত আয়েশা (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত এইরূপ রেওয়ায়াত বিদ্যমান রয়েছে যে, তিনি বলেছেন, অন্তিম মুহূর্তে হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিলেন তখন তিনি বলছিলেনঃ
اللهمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَالْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الْأَعْلَى
হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন এবং আমাকে আমার মহান বন্ধুর সান্নিধ্যে নিয়ে যান।
-বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ
আল্লাহ! আল্লাহ! জীবনের অন্তিম মুহূর্তটি কত কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে থাকে। আল্লাহর প্রিয় হাবীবের জীবনেও সেই চরম সন্ধিক্ষণটি অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময় তিনি এমন প্রচন্ড গরম অনুভব করেন, যার ফলে বারবার তিনি তাঁর হাত ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়েছেন ও ভিজা হাতে চেহারা মুবারক মুছেছেন। এ কঠিন অবস্থাতেও তিনি তাঁর পবিত্র মুখে আল্লাহর মাগফিরাত ও রহমত কামনা করছেন। মহান বন্ধুর সাথে মিলনের ঐকান্তিক আকাংখা ব্যক্ত করছেন।