📄 রুগ্ন ব্যক্তিকে নামাযের তালক্বীন
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ رَانِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا نَائِمُ أَشْكُو مِنْ وَجْع بَطْنِى فَقَالَ لِي يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَبِي بِكَ وَجُعُ ؟ قُلْتُ نَعَمُ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ قُمْ فَصَلِّ فَإِنَّ فِي الصَّلُوةِ شِفَاء
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, একবার আমি পেটের ব্যথায় অসুস্থ ছিলাম। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে আসেন। আমি তখন ঘুমিয়ে ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে আবূ হুরাইরা! তোমার কি পেটে ব্যথা? আমি আরয করলাম, হ্যাঁ! ইয়া রাসূলাল্লাহ! হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উঠঃ নামায পড়। কেননা, নামাযে শেফা (আরোগ্য) রয়েছে।" -ইবনে মাজাহ
হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযকে মুমিনের মেরাজ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতি নিবিষ্ট হওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম বলেছেন। আল্লাহর বান্দা যখন নামাযের জন্য নিয়ত বাঁধে তখন সে দুনিয়ার সব চিন্তা-ভাবনা ও দুঃখ কষ্ট ভুলে যায়। নামাযে পঠিত দুআসমূহ নামাযের ভাব-ভঙ্গি উঠা বসা সব কিছু একথাই প্রকাশ ও প্রমাণ করে। উপরোক্ত হাদীসে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর একজন সার্বক্ষণিক মর্যাদাবান সাহাবী হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) কে নামাযের আরো একটি ফায়দার কথা বলেছেন যে, যে কোন ব্যথা বেদনা ও দুঃখ কষ্ট যাই হোক, নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে যাবে দয়াময় আল্লাহ তা'আলা তা দূরীভূত করে দেবেন। কেননা, নামাযে শেফা ও আরোগ্য রয়েছে।
📄 হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চোখে পানি
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ)-এর ভাষায় রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগী দেখতে যাওয়ার একটি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এখানে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, একবার হযরত সাআদ ইবনে উবাদা (রাযিঃ) অসুস্থ হয়ে পড়লে হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেখার জন্য তশরীফ নিয়ে যান। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযিঃ), হযরত সাআদ ইবনে আবী ওয়াককাস (রাযিঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিঃ) তাঁর সাথে ছিলেন। অতঃপরঃ
فَلَمَّا دَخَلَ عَلَيْهِ وَجَدَهُ فِي غَشِيَتِهِ فَقَالَ لَقَدْ قَضَى؟ قَالُوا لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ - فَبَكَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হযরত সাআদ ইবনে উবাদা (রাযিঃ)-এর নিকট গিয়ে পৌঁছলেন তখন তাঁকে নির্জিব অবস্থায় দেখতে পেলেন, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন সে কি মারা গেছে? লোকেরা বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! না এখনো মারা যায় নাই। এ কথা শুনার পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁদতে থাকেন।
হাদীসের বর্ণনাকারী আরো বলেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাঁদতে দেখে উপস্থিত অন্যান্য লোকেরাও কাঁদতে আরম্ভ করে। অতঃপর হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তোমরা কি জাননা যে, আল্লাহ তা'আলা চোখের পানি ও অন্তরের কষ্টের উপর কোন শাস্তি দেন না? (অতঃপর তিনি জিহবার দিকে ইশারা করে বললেন) তবে এটার কারণে আযাব বা রহম করেন। -বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ
আঁ-হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনের এই ঘটনা হতে এ শিক্ষা পাওয়া যায় যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরব কান্নায় চোখে অশ্রু প্রবাহিত হওয়া এবং হৃদয় ব্যথাতুর ও চিন্তাক্লিষ্ট হওয়াকে প্রকৃতিগত একটি বৈধ বিষয় বলে অভিহিত করেছেন। উক্ত ঘটনায় হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও ব্যথাতুর হয়েছেন এবং চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত করেছেন। স্বীয় উম্মতকেও এই দুঃখ প্রকাশ করার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু জিহবার দিকে ইশারা করে বলেছেন যে, ঐ ছোট্ট অঙ্গটি থেকে বের হওয়া শব্দাবলী যেমন আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যম হয় তেমনি আযাব ও শাস্তির কারণ হয়। ভাল কথা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ডেকে আনে। আর অবৈধ শোক গাঁথা, অভিযোগ ও শোকায়েতের কথা তাঁর আযাবকে উস্কে দেয়।
হিন্দু সমাজে এই প্রথা আছে যে, তারা মৃত্যুর পর মৃতের শিয়রে এবং শবযাত্রার সময় লাশের সাথে নিয়মিত মাতমকারী দল প্রেরণ করে থাকে। তারা এক বিশেষ ভঙ্গিতে শোকগাঁথা গায়। বুকে চাপড়ায়। মাথায় ও মুখে ধূলি বালি মাখে। কোন কোন এলাকায় এই কাজ ভাড়া করা লোক দিয়ে করানো হয়।
এখনো মুর্খ সমাজে মহিলাগণ গলা মিলিয়ে সমস্বরে শোকগাঁথা গায়। চোখে পানি আসুক বা না আসুক, অন্তর কাঁদুক আর নাই কাঁদুক উচ্চ আওয়াজে তারা মাতম অবশ্যই করবে। এ জন্যেই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহবাকে আযাব ও দয়ার কারণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
📄 রোগী দেখার মসনূন দু’আ
উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাযিঃ)-এর ভাষায় আঁ-হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই দু'আটিও শ্রবণ করুন, যা তিনি রোগী দেখার সময় তাঁর পবিত্র মুখে পাঠ করতেনঃ
كَانَ إِذَا أَتَى مَرِيضًا أَوْ أُتِيَ بِهِ قَالَ اذْهَبِ الْبَأْسَ رَبَّ النَّاسِ وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاءُكَ شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
"যখন তিনি কোন রোগীকে দেখতে যেতেন বা কোন রোগীকে তাঁর খেদমতে নিয়ে আসা হত তখন তিনি এই দুআ পাঠ করতেন। "হে মানুষের রব্ব! তার কষ্ট দূর করে দিন। তাকে আরোগ্য দান করুন। কেননা, আপনি আরোগ্য দানকারী। আপনি ব্যতীত আর কারো নিকট শেফা (আরোগ্য দান করার শক্তি) নাই। আপনি তাকে এমন আরোগ্য দান করুন, যার পর আর কোন রোগ অবশিস্ট থাকবে না।" -বুখারী শরীফ
রাহমাতুল্লাল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি কোন রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে নিজে তশরীফ নিয়ে যেতেন বা রুগ্ন ব্যক্তিকে তাঁর খেদমতে হাজির করা হত তাহলে তিনি সকল রোগের শেফাদানকারী দয়াময় আল্লাহর দরবারে উপরোক্ত দুআ করতেন। তাঁর এই দুআর দুটি বাক্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিন-
اَذْهِبِ الْبَأْسَ رَبَّ النَّاسِ
অর্থাৎ “হে মানুষের প্রতিপালনকারী রব্ব! আপনি তার কষ্ট দূর করে দিন।"
بأس শব্দটির অর্থ- কঠিন, মুসীবত, কষ্ট, দারিদ্র ও যুদ্ধ। (মুফরাদাতুল কুরআন, রাগেব) যেন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ দুআ করতেন যে, আয় পরওয়ারদিগার! এই রুগ্ন ব্যক্তির সব ধরনের কাঠিণ্য, দুঃখ-কষ্ট ও বালা-মুসীবত দূর করে দিন।
اِشْفِ اَنْتَ الشَّافِی
অর্থাৎ হে দয়াময় মাওলা! আরোগ্য আপনারই হাতে। আপনি স্বীয় কুদরতে এই রুগ্ন ব্যক্তিকে আরোগ্য দান করুন। এমন আরোগ্য দান করুন যার পর আর কোন প্রকার রোগ-ব্যাধি অবশিষ্ট না থাকে। আরবী ভাষায় সর্বপ্রকার দৈহিক রোগ-ব্যাধিকেই "সাকাম" বলা হয়। -মুফারাদাতুল কুরআন, রাগেব
📄 রোগী দেখার আরেকাটি দুআ
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ عَادَ مَرِيضًا فَقَالَ أَسْأَلُ اللهَ الْعَظِيمَ رَبِّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ أَنْ يَشْفِيكَ سَبْعًا عُوفِيَ إِنْ لَمْ يَكُنْ حَضَرَ أَجَلُهُ)
"হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে রেওয়ায়াত করেন যে, যে ব্যক্তি কোন রুগ্নকে দেখতে যাবে সে যেন সাতবার এই দুআটি পাঠ করে-
اَسْأَلُ اللهَ الْعَظِيمَ رَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
অর্থাৎ "আমি সুউচ্চ আরশের সুমহান অধিপতি (রব্ব)-এর নিকট আপনার রোগমুক্তি কামনা করছি। তিনি যেন আপনাকে পূর্ণ আরোগ্য দান করেন।" যদি তার মৃত্যুর সময় এসে না গিয়ে থাকে তবে সে (এই দুআর বরকতে) আরোগ্য লাভ করবে। -মুসতাদরাকে হাকেম, আবু দাউদ ও নাসায়ী শরীফ
দু'আটি একবার পাঠ করে নিন। এটা এমন কোন লম্বা দুআ নয় যা মুখস্ত করে নেওয়া খুব কঠিন হবে। তাই আপনিও এটি মুখস্ত করে নিন। মনে রাখবেন! দুআর অর্থ উপায় উপকরণ অবলম্বন না করা এবং ওষুধ পত্র ও চিকিৎসা থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়ার নাম নয়। বরং দুআর অর্থ হল-একমাত্র আরোগ্য দানকারী মহান পরওয়ারদিগারের দরবারে রোগীর রোগ মুক্তির জন্য একান্ত নিবিষ্ট চিত্তে বিনীত প্রার্থনা করা। এ জন্যেই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআটি সাত বার পড়তে বলেছেন।
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুসংবাদ দিয়েছেন যে, যদি তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে না এসে থাকে তাহলে রুগ্ন ব্যক্তি অবশ্যই আরোগ্য লাভ করবে। তার শেষ মুহূর্ত এসে গেছে কিনা তা যেহেতু কারো জানা নাই সুতরাং তার রোগ মুক্তি কামনা করতে থাকাই উচিত।