📄 রোগী দেখার নিয়ম পদ্ধতি
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ رَضِ اللهُ عَنْهُ أَنَّ مِنْ تَمَامِ عِيَادَةِ الْمَرِيضِ أَنْ يَضَعَ أَحَدُكُمْ يَدَهُ عَلَى جَبْهَتِهِ أَوْ عَلَى يَدِهِ وَيَسْأَلُهُ كَيْفَ هُوَ ؟
“হযরত আবূ উমামা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন যে, রোগী দেখার উত্তম নিয়ম হল এই যে, তুমি রোগীর কপালে বা তার হাতে তোমার হাত রাখবে এবং তাকে জিজ্ঞাসা করবে যে, আপনি কেমন আছেন?” -তিরমিযী শরীফ
রোগী দেখার ব্যাপারে প্রায় অনুরূপ একটি রেওয়ায়াত হযরত ইবনুস সুন্নী (রহঃ) হতেও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন:
تمامُ الْعَيَادَةِ أَنْ تَضَعَ يَدَكَ عَلَى الْمَرِيضِ وَتَقُولُ كَيْفَ أَصْبَحْتَ وَكَيْفَ أَمْسَيْتَ ؟
“রোগী দেখার নিয়ম হল এই যে, তুমি রোগীর শরীরে তোমার হাত রাখবে এবং তাকে জিজ্ঞাসা করবে যে, আপনার সকাল কেমন কাটল? আপনার সন্ধ্যা কেমন কাটল? (অর্থাৎ আপনি সকালে কেমন ছিলেন এবং সন্ধায় কেমন আছেন?)
উল্লেখিত দুটি হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রোগী দেখার দ্বারা শুধু তার অবস্থা জিজ্ঞাসা করা উদ্দেশ্য নয়। বরং আসল বিষয় হল রোগীকে সান্ত্বনা ও শান্তি দেওয়া। আমরা কারো দুঃখ দরদ তো নিয়ে নিতে পারি না। তবে সুন্দর কথা ও উত্তম আচরণের দ্বারা তার হৃদয় মন অবশ্যই প্রফুল্ল করতে পারি। এভাবে তার দুঃখ কষ্ট কিছুটা হলেও হালকা করতে পারি।
রোগীর মাথায় বা তার হাতে হাত রাখার দ্বারা একদিকে যেমন তার জ্বরের প্রচন্ডতা অনুভব করা যায়। তেমনি তার প্রতি নিজের ঐকান্তিকতা এবং অকৃত্রিম সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটে। আর এটা এমন একটি বিষয় যা একজন রোগীর জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।
📄 রোগীর মন খুশী করা
হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাযিঃ) হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সুপ্রসিদ্ধ সাহাবী ছিলেন। তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা হযুরের বাণী শুনুন। তিনি ইরশাদ করেছিলেন:
إِذَا دَخَلْتُمْ عَلَى الْمَرِيضِ فَنَفْسُوالَهُ فِي الْأَجَلِ فَإِنَّ ذَلِكَ لَا يَرُدُّ شَيْئًا وَهُوَ يَطِيبُ نَفْسَ الْمَرِيضِ
"তুমি যখন কোন রুগ্ন ব্যক্তির নিকট যাবে তখন তার দীর্ঘ হায়াত সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করবে। এটা অবশ্য তকদীরকে রদ করতে পারবে না। তবে এতে রোগীর মন অবশ্যই খুশী হবে।"-ইবনে মাজাহ
এ বিষয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বর্ণিত একটি হাদীসও এখানে উদ্ধৃত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগ শয্যায় শায়িত একজন গ্রাম্য ব্যক্তিকে দেখার জন্য তশরীফ নিয়ে যান। হুযুরের অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি যখন কোন রোগী দেখতে যেতেন তখন তাকে বলতেনঃ
.... لَا بَأْسَ طُهُورُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى .
অর্থাৎ "চিন্তার কোন কারণ নাই, ইনশাআল্লাহ সুস্থ হয়ে যাবে।" -বুখারী শরীফ
এ পর্যায়ে হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরো একটি মূল্যবান বাণী শ্রবণ করুন। তিনি ইরশাদ করেছেন যে,
إِذَا حَضَرْتُمُ الْمَرِيضَ فَقُولُوا خَيْرًا
"তোমরা যখন কোন রুগ্ন ব্যক্তির নিকট যাবে তখন তার সাথে ভাল ভাল কথা বলবে।"
রসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপরোক্ত তিনটি হাদীসের প্রতি একবার লক্ষ্য করুন এবং চিন্তা করে দেখুন এগুলি থেকে আপনি কি হেদায়াত লাভ করেন। প্রথমতঃ রোগীর নিকট তার দীর্ঘ জীবন লাভের আলোচনা করবে। তোমাদের কথায় আল্লাহর সিদ্ধান্ত অবশ্যই পাল্টাবেনা। কিন্তু এতে রোগীর চিত্ত অবশ্যই আন্দোলিত ও প্রফুল্ল হবে। দ্বিতীয়তঃ রোগীকে সাহস দাও যে, খোদা চাহেন তো ভয়ের কোন কারণ নাই। তৃতীয়তঃ যখনি কোন রোগীর নিকট যাবে, তার সাথে অতি উত্তম কথা বলবে।
📄 স্বল্প সময়ে রোগী দেখা
এখানে রোগী দেখা সম্পর্কিত হযরত সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস পেশ করা হচ্ছে
اجرا سُرعة القِيَامِ عِنْدَ الْمَرِيضِ أَفْضَلُ الْعِيَادَة أَجْرًا .
"সওয়াব ও প্রতিদানের দিক থেকে সর্বোত্তম রোগী দেখা হল রোগীর নিকট স্বল্প সময় অবস্থান করা।"-ফতহুল কবীর
হযরত আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুরূপ আরো একটি হাদীস পাঠ করুন :
لَا يَطِيلُ الْجُلُوسَ لِأَنَّ الْإِطَالَةَ عِنْدَ الْمَرِيضِ مكروهة
"কোন রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে গিয়ে তার নিকট দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করবে না। কেননা, রুগ্ন ব্যক্তির নিকট বেশীক্ষণ অবস্থান করা অপছন্দনীয়।"
মহানবীর (আমার পিতা মাতা তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক) প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী সমূহের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করে দেখুন, এগুলির মধ্যে জ্ঞান, বুদ্ধি, হিকমত, প্রজ্ঞার কি বিশাল ভান্ডার সুপ্ত রয়েছে। এমন কোন্ দিকটি আছে যা তাঁর দৃষ্টিতে ধরা পড়ে নাই? বাস্তবিক তিনি ছিলেন খাতামুল মুরসালীন ও রাহমাতুল্লিল আ'লামীন অর্থাৎ আখেরী নবী ও সমগ্র বিশ্বজাহানের জন্য রহমত স্বরূপ।
ইয়াদত বা রোগী দেখা মানবীয় জীবনের বিশাল ও বিস্তৃত ক্ষেত্রে মানব সেবার একটি অতিক্ষুদ্র অঙ্গ। কিন্তু আমলের দিক থেকে ছোট্ট এবং সওয়াবের দিক থেকে অনেক বড় সওয়াবের এই কাজটির প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কেই তিনি দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন যে, তোমরা রুগ্ন ব্যক্তিদের দেখতে যাও। কেননা, এটা একটি বড় ইবাদত। কিন্তু তার নিকট বেশী সময় অবস্থান করো না। রোগীর নিকট দর্শনার্থীর দীর্ঘসময় অবস্থান করা অপছন্দনীয় কাজ। বাস্তব ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই যে, রোগীর নিকট দর্শনার্থীরা অধিক সময় অবস্থান করলে রোগীর এবং রোগীর পরিজন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের খুবই পেরেশানী হয়।
📄 তৃতীয় দিনে রোগী দেখা
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَعُودُ مَرِيضًا إِلَّا بَعْدَ الثَّلَاثِ
"হযরত আনাস (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুগ্ন ব্যক্তিকে অসুস্থ হওয়ার তিন দিন পর দেখতে যেতেন।" সম্ভবতঃ এরূপ একটি রেওয়ায়াতও আছে যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্বর আসার তিন দিন পর জ্বরের চিকিৎসা শুরু করতেন।
হযরত আনাস (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত রেওয়ায়াতে জানা গেল যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হওয়ার তিন দিন পর রোগী দেখতে যেতেন। হতে পারে এটা কোন বিশেষ রোগীর ক্ষেত্রে হয়েছে। অথবা এমনও হতে পারে যে, এটা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক ব্যস্ততাকালীন সময়ের বিশেষ কোন ঘটনা ছিল। মদীনার জীবনে তিনি দ্বীনি দাওয়াত ও তাবলীগ, আল্লাহ তা'আলার স্মরণ এবং বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রতিনিধি দলের সাথে দেখা সাক্ষাতের কারণে অসম্ভব ব্যস্ত থাকতেন। একদিকে পর্যায়ক্রমে কাফেরদের হামলা চলছিল। অপরদিকে সৃষ্টি হচ্ছিল নতুন নতুন সমস্যা। এতদসত্ত্বেও তিনি খেদমতে খালকের স্বভাবগত অভ্যাসে অটল ছিলেন।
"বুখারী শরীফে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সম্মানিত সাহাবী হযরত আনাস (রাযিঃ) হতেই বর্ণিত আছে যে, "এক ইয়াহুদী হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করত। সে অসুস্থ হয়ে গেলে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখার জন্য তশরীফ নিয়ে যান এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। ছেলেটি ইসলাম কবুল করে।" সম্ভবতঃ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুমহান উন্নত চরিত্র এবং একজন অসুস্থ খাদেমকে দেখার ও খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য তার বাড়ীতে গমন করাই তাকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল।