📄 ডান কাতে শোয়া
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ رَكَعَتَى الْفَجْرِ فليضطجع عَلَى يَمِينِهِ
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) রেওয়ায়াত করেন, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তোমাদের কেউ যখন ফজরের দু'রাকআত সুন্নত পড়ে ফেলবে, সে যেন ডান কাতে শোয়ে জামাআত শুরু হওয়ার পূর্বে কিছু সময় আরাম করে নেয়।
-আবূ দাউদ, তিরমিযী, রিয়াযুস সালেহীন
এ বিষয়ে স্বয়ং রসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস কি ছিল? এই প্রশ্নের জওয়াব হুযুরের সম্মানিতা স্ত্রী উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাযিঃ)-এর ভাষায় শুননঃ
قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا صَلَّى رَكَعَتِي الْفَجْرِ أَضْطَجَعَ عَلَى شَقَهِ الْأَيْمَنِ
"তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের দুরাকআত সুন্নত নামায পড়ার পর ডান কাতে শুয়ে কিছু সময় আরাম করতেন।"
উল্লেখিত দু'টি হাদীসে যদিও ফজরের সুন্নতের পর কিছু সময় আরাম করার বিষয়ে হুযূরের মূল্যবান বাণী ও উসওয়ায়ে হাসানা উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব সময়ের নিয়মও এরূপই ছিল। তিনি সর্বদাই ডান কাতে শোতেন। ডান হাত মাথার নীচে তাকিয়া হিসাবে থাকত এবং তাঁর রুখ হত কেবলামুখী। আমরা একটু পরেই এ সম্পর্কিত অন্যান্য হাদীসের মাধ্যমে বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে তুলব। বস্তুতঃ আমাদের জন্যও এভাবে শুয়ার মধ্যেই মঙ্গল নিহিত রয়েছে।
মানুষের হৃদযন্ত্র তার বুকের বামপাশে রয়েছে। আজ সকল ডাক্তারগণ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ঐক্যমত পোষণ করেন যে, হৃদযন্ত্রের উপর কোন প্রকার ভার চাপানো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই মানুষ যদি বাম দিকে কাত হয়ে শয়ন করে তাহলে অবশ্যই তার হৃদযন্ত্রের উপর চাপ পড়বে। চিন্তা করে দেখুন! আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে যখন বর্তমান এই চিকিৎসা শাস্ত্রের নতুন নতুন গবেষণা ও বিস্ময়কর আবিষ্কারের কোন নাম নিশানাও ছিল না তখন একজন উম্মী নবী কত প্রজ্ঞা ও হিকমতপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেছেন। এবং কত সর্বাঙ্গ সুন্দর, সর্বোত্তম একটি আদর্শ জীবন যাপন করে গেছেন।
📄 শুয়ার সঠিক নিয়ম
পূর্ব আলোচনায় আমরা দুটি হাদীস উদ্ধৃত করেছি। যেগুলোর বিষয়বস্তু হল এই যে, হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের দু' রাকআত সুন্নত নামায পড়ার পর ডান কাতে শুয়ে একটু আরাম করতে বলেছেন। তিনি নিজেও এই আমল করেছেন। এ পর্যায়ে আমরা হুযূরের সাধারণ ও ব্যাপক হুকুম উদ্ধৃত করছি। এই হাদীসের বর্ণনাকারী হলেন হযরত সায়ীদ ইবনে আবূ উবাইদা (রাযিঃ)। তিনি বলেন, হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ فتوضأ وضوءك للصلاةِ ثُمَّ اضْطَجِعُ عَلَى شَقِكَ الْأَيْمَنِ
অর্থাৎ “তোমারা যখন শুয়ার জন্য বিছানায় যাবে তখন প্রথমে অযু করবে, যেমন নামাযের জন্য অযু কর। অতঃপর ডান কাতে শুয়ে পড়বে।" -বুখারী শরীফ
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী হযরত ইয়াঈশ (রাযিঃ) তাঁর পিতার নিকট থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, একবার আমি মসজিদে উপুড় হয়ে শুয়া ছিলাম। হঠাৎ কেউ যেন আমাকে তার পা দিয়ে নাড়া দিল এবং বলল যে, এভাবে শুয়া আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। অতঃপর আমি যখন চোখ তুলে তাকালাম তখন দেখতে পেলাম যে, এই ব্যক্তি হলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান কাতে শুতেন এবং তাঁর ডান হাত মাথার নীচে দিয়ে ঘুমাতেন। এ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে,
إِنَّهُ كَانَ إِذَا نَامَ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى تَحْتَ خَدِّهِ
"হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘুমাতেন তখন তাঁর ডান হাত নিজের গাল মুবারকের নীচে রাখতেন।" ঘুমানোর সময়ও তাঁর রুখ কেবলার দিকে থাকত। এতে বাইতুল্লাহ শরীফের প্রতি হুযূরের পূর্ণ মনোযোগ নিবন্ধ থাকার পরিচয় পাওয়া যায়। সৌভাগ্য সেই ব্যক্তির যে তার প্রতিটি কাজে সরওয়ারের কায়েনাত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুরসণ করে। নিজের চলাফেরা, নিদ্রা ও জাগরণও হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাসের ছাঁচে গড়ে তোলে। কেননা, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণের মধ্যেই সার্বিক সফলতা, কল্যাণ ও সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে।
📄 ঘুমানোর সময়
ঘুমানোর ব্যাপারে হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি ইশার নামাযের পর খুব তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তেন। কিছু সময় আরাম করার পর খুব তাড়াতাড়িই তাহাজ্জুদের নামায পড়ার জন্য জেগে যেতেন। তাই আমাদের বুযুর্গানে দ্বীন আজো ইশার নামাযের পর জেগে থাকা এবং গল্পগুজব করাকে পছন্দ করেন না। এ প্রসঙ্গে হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন:
كَانَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَ الْعِشَاءِ وَالْحَدِيثَ بَعْدَهَا
"হযরত রাসূল মাকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার নামাযের আগে ঘুমানো এবং ইশার পর গল্পগুজব করাকে অপছন্দ করতেন।"
এবার ঘুমানো সম্পর্কে হুযূরের বাণী পাঠ করুন।
তিনি ইরশাদ করেছেন:
الصبحة تمنع الرزق
(১) সকালের ঘুম রিযিকের প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়। দিন হল কাজের জন্য আর রাত হল ঘুম ও আরামের জন্য। যদি সারা রাত আরাম করার পরও কেউ নতুন উদ্যমে তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তৎপর হয়ে উঠার পরিবর্তে ঘুমিয়ে থাকে তাহলে তার রিযিকের দরওয়াজা সে নিজেই বন্ধ করে দেয়।
اسْتَعِينُوا عَلَى قِيَامِ اللَّيْلِ بِقَيْلُولَةِ النَّهَارِ
(২) রাতের একাকিত্বে আল্লাহর স্মরণে নামায পড়ার সুবিধার্থে দিনের বেলা কিছু সময় কায়লুলা (আরাম) করবে। দুপুরে খাওয়ার পর কিছু সময় বিশ্রাম করাকে কায়লুলা বলে। কায়লুলা শুধু স্বাস্থ্যের জন্যই উপকারী নয় বরং রাতের বেলা আল্লাহর স্মরণে জাগ্রত থাকার ঘুমের ঘাটতি পুরণ করতেও সহায়ক হয়।
(৩) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, হযরত রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ
من نام بعد العصر فاختلس عقله فلا يلومن إلا نفسه
"যে ব্যক্তি আসরের পর নিদ্রা গেল সে তার আকল বুদ্ধি ভোঁতা করে ফেলল। সে যেন তার আকল বুদ্ধি ভোঁতা হওয়ার জন্য নিজেকে ব্যতীত আর কাউকে দায়ী না করে।"-জামে সগীর
📄 ঘুমানোর দু’আ
হযরত সায়ীদ ইবনে আবু উবাইদা (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস খানির প্রথম অংশে আপনারা একটু আগেই পড়েছেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিছানায় যাওয়ার পূর্বে নামাযের ন্যায় অযু করতে এবং ডান কাতে শুতে বলেছেন। অতঃপর তিনি বলেছেন যে, ঘুমানোর আগে তোমারা নিম্নের দু'আটি পড়বেঃ
اللهم اسلمت نفسى اليك وفوضت أمرى اليك والجأت ظهري اليك رغبة و رهبة اليك لا ملجأ ولا منجى منك الا اليك
অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আমার জীবন আপনার নিকট হাওয়ালা করছি এবং আমার যাবতীয় বিষয় আপনাকে সোর্পদ করছি। আপনার প্রতি আশা ও ভীতির সাথে আমি আপনারই আশ্রয় গ্রহণ করছি। আপনি ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল ও ঠিকানা নাই।”
হযরত হুযাইফা (রাযিঃ) ও হযরত আবূ যর গিফারী (রাযিঃ) তাঁরা দু'জনেই রেওয়ায়াত করেছেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘুমানোর জন্য তাঁর বিছানায় যেতেন তখন এই দুআ পড়তেনঃ
بِسْمِكَ اللهم أَحْيَا وَ أَمُوتُ
উপরোক্ত দুআগুলি হল ঘুমানোর পূর্বে পাঠ করার জন্য। এবার ঘুম থেকে জেগে উঠে যে দু'আ পড়তে হবে সেগুলি লক্ষ্য করুন। হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমারা যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হবে তখন এই দুআ পাঠ করবেঃ
الحمد للهِ الَّذِي رَدَّ عَلَى رُوحِي وَعَافَانِي فِي جَسَدِي وَأَذِنَ لِي بِذِكْرِهِ
"সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমার আত্মা আমার দেহে ফিরিয়ে দিয়েছেন, আমার দেহকে আরাম দিয়েছেন এবং আমাকে স্বীয় যিকিরের তওফীক দিয়েছেন।" নাসায়ী
হযরত হুযাইফা (রাযিঃ) ও হযরত আবূ যর গিফারী (রাযিঃ) কর্তৃক উপরোল্লেখিত রেওয়ায়াতের শেষ অংশে আছে যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হতেন তখন এই দুআ পাঠ করতেনঃ
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
"সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাকে মৃত্যুর পর জীবন দান করেছেন এবং তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে।"
উপরোক্ত দুআসমূহ মুখস্ত করে নিন। সে ব্যক্তির চেয়ে অধিক নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত আর কে হবে যে ঘুমানোর আগে নিজেই নিজকে খালেক ও মালেকের নিকট সোর্পদ করে দেয়, যিনি চিরন্তন ও চিরঞ্জীব। যার না নিদ্রা আসে আর না তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হন।