📄 উপুড় হয়ে শোয়া
عَنْ يَعِيشَ بْنِ طِخْفَةَ الْغِفَارِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ أَبِي بَيْنَمَا أَنَا مُضْطَجِعُ فِي الْمَسْجِدِ عَلَى بَطْنِى إِذَا رَجُلٌ يُحرِّ كُنِي بِرِجْلِهِ فَقَالَ إِنَّ هَذَا ضَجَعَةٌ يُبْغِضُهَا اللهُ - قَالَ فَنَظَرْتُ فَإِذَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
"হযরত ইয়াঈশ ইবনে তিখফা (রাযিঃ) হতে বর্ণিতঃ তিনি বলেন আমার পিতা বর্ণনা করেছেন যে, একদা আমি মসজিদে উপুড় হয়ে শোয়া ছিলাম। হঠাৎ আমি অনুভব করলাম যে, কেউ আমাকে তার পা দিয়ে নাড়া দিচ্ছে। অতঃপর বলছে যে, এভাবে উপুড় হয়ে শোয়াকে আল্লাহ অপছন্দ করেন। আমার পিতা বলেন, অতঃপর আমি চোখ খুলে দেখলাম (এ ব্যক্তি আর কেউ নন) স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম"।
আপনি ভেবে দেখেছেন! নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপুড় হয়ে শোয়াকে কত বড় ভুল ও ক্ষতিকর হিসাবে উল্লেখ করেছেন! মহান আল্লাহ এভাবে শোয়াকে ঘৃণা করেন।
উপুড় হয়ে শোয়ার দ্বারা মানুষের পাকস্থলী, হজমশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্যের উপর অত্যন্ত খারাপ প্রভাব পড়ে। হৃদয়ের স্পন্দন ও শ্বাস প্রশ্বাসে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। যে কাজটির মধ্যে এত খারাবী আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তা পছন্দ করবেন কেন? যারা মানুষের মঙ্গল আর কল্যাণ চান তারা মানুষের জন্য মন্দ ও ক্ষতিকর কোন বিষয়কে কিভাবে মেনে নিতে পারেন?
📄 ডান কাতে শোয়া
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ رَكَعَتَى الْفَجْرِ فليضطجع عَلَى يَمِينِهِ
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) রেওয়ায়াত করেন, রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তোমাদের কেউ যখন ফজরের দু'রাকআত সুন্নত পড়ে ফেলবে, সে যেন ডান কাতে শোয়ে জামাআত শুরু হওয়ার পূর্বে কিছু সময় আরাম করে নেয়।
-আবূ দাউদ, তিরমিযী, রিয়াযুস সালেহীন
এ বিষয়ে স্বয়ং রসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস কি ছিল? এই প্রশ্নের জওয়াব হুযুরের সম্মানিতা স্ত্রী উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা (রাযিঃ)-এর ভাষায় শুননঃ
قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا صَلَّى رَكَعَتِي الْفَجْرِ أَضْطَجَعَ عَلَى شَقَهِ الْأَيْمَنِ
"তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের দুরাকআত সুন্নত নামায পড়ার পর ডান কাতে শুয়ে কিছু সময় আরাম করতেন।"
উল্লেখিত দু'টি হাদীসে যদিও ফজরের সুন্নতের পর কিছু সময় আরাম করার বিষয়ে হুযূরের মূল্যবান বাণী ও উসওয়ায়ে হাসানা উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব সময়ের নিয়মও এরূপই ছিল। তিনি সর্বদাই ডান কাতে শোতেন। ডান হাত মাথার নীচে তাকিয়া হিসাবে থাকত এবং তাঁর রুখ হত কেবলামুখী। আমরা একটু পরেই এ সম্পর্কিত অন্যান্য হাদীসের মাধ্যমে বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে তুলব। বস্তুতঃ আমাদের জন্যও এভাবে শুয়ার মধ্যেই মঙ্গল নিহিত রয়েছে।
মানুষের হৃদযন্ত্র তার বুকের বামপাশে রয়েছে। আজ সকল ডাক্তারগণ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ঐক্যমত পোষণ করেন যে, হৃদযন্ত্রের উপর কোন প্রকার ভার চাপানো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই মানুষ যদি বাম দিকে কাত হয়ে শয়ন করে তাহলে অবশ্যই তার হৃদযন্ত্রের উপর চাপ পড়বে। চিন্তা করে দেখুন! আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে যখন বর্তমান এই চিকিৎসা শাস্ত্রের নতুন নতুন গবেষণা ও বিস্ময়কর আবিষ্কারের কোন নাম নিশানাও ছিল না তখন একজন উম্মী নবী কত প্রজ্ঞা ও হিকমতপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেছেন। এবং কত সর্বাঙ্গ সুন্দর, সর্বোত্তম একটি আদর্শ জীবন যাপন করে গেছেন।
📄 শুয়ার সঠিক নিয়ম
পূর্ব আলোচনায় আমরা দুটি হাদীস উদ্ধৃত করেছি। যেগুলোর বিষয়বস্তু হল এই যে, হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের দু' রাকআত সুন্নত নামায পড়ার পর ডান কাতে শুয়ে একটু আরাম করতে বলেছেন। তিনি নিজেও এই আমল করেছেন। এ পর্যায়ে আমরা হুযূরের সাধারণ ও ব্যাপক হুকুম উদ্ধৃত করছি। এই হাদীসের বর্ণনাকারী হলেন হযরত সায়ীদ ইবনে আবূ উবাইদা (রাযিঃ)। তিনি বলেন, হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ فتوضأ وضوءك للصلاةِ ثُمَّ اضْطَجِعُ عَلَى شَقِكَ الْأَيْمَنِ
অর্থাৎ “তোমারা যখন শুয়ার জন্য বিছানায় যাবে তখন প্রথমে অযু করবে, যেমন নামাযের জন্য অযু কর। অতঃপর ডান কাতে শুয়ে পড়বে।" -বুখারী শরীফ
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী হযরত ইয়াঈশ (রাযিঃ) তাঁর পিতার নিকট থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, একবার আমি মসজিদে উপুড় হয়ে শুয়া ছিলাম। হঠাৎ কেউ যেন আমাকে তার পা দিয়ে নাড়া দিল এবং বলল যে, এভাবে শুয়া আল্লাহ তা'আলা অপছন্দ করেন। অতঃপর আমি যখন চোখ তুলে তাকালাম তখন দেখতে পেলাম যে, এই ব্যক্তি হলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান কাতে শুতেন এবং তাঁর ডান হাত মাথার নীচে দিয়ে ঘুমাতেন। এ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে,
إِنَّهُ كَانَ إِذَا نَامَ وَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى تَحْتَ خَدِّهِ
"হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘুমাতেন তখন তাঁর ডান হাত নিজের গাল মুবারকের নীচে রাখতেন।" ঘুমানোর সময়ও তাঁর রুখ কেবলার দিকে থাকত। এতে বাইতুল্লাহ শরীফের প্রতি হুযূরের পূর্ণ মনোযোগ নিবন্ধ থাকার পরিচয় পাওয়া যায়। সৌভাগ্য সেই ব্যক্তির যে তার প্রতিটি কাজে সরওয়ারের কায়েনাত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুরসণ করে। নিজের চলাফেরা, নিদ্রা ও জাগরণও হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাসের ছাঁচে গড়ে তোলে। কেননা, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণের মধ্যেই সার্বিক সফলতা, কল্যাণ ও সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে।
📄 ঘুমানোর সময়
ঘুমানোর ব্যাপারে হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি ইশার নামাযের পর খুব তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তেন। কিছু সময় আরাম করার পর খুব তাড়াতাড়িই তাহাজ্জুদের নামায পড়ার জন্য জেগে যেতেন। তাই আমাদের বুযুর্গানে দ্বীন আজো ইশার নামাযের পর জেগে থাকা এবং গল্পগুজব করাকে পছন্দ করেন না। এ প্রসঙ্গে হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন:
كَانَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَ الْعِشَاءِ وَالْحَدِيثَ بَعْدَهَا
"হযরত রাসূল মাকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার নামাযের আগে ঘুমানো এবং ইশার পর গল্পগুজব করাকে অপছন্দ করতেন।"
এবার ঘুমানো সম্পর্কে হুযূরের বাণী পাঠ করুন।
তিনি ইরশাদ করেছেন:
الصبحة تمنع الرزق
(১) সকালের ঘুম রিযিকের প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়। দিন হল কাজের জন্য আর রাত হল ঘুম ও আরামের জন্য। যদি সারা রাত আরাম করার পরও কেউ নতুন উদ্যমে তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তৎপর হয়ে উঠার পরিবর্তে ঘুমিয়ে থাকে তাহলে তার রিযিকের দরওয়াজা সে নিজেই বন্ধ করে দেয়।
اسْتَعِينُوا عَلَى قِيَامِ اللَّيْلِ بِقَيْلُولَةِ النَّهَارِ
(২) রাতের একাকিত্বে আল্লাহর স্মরণে নামায পড়ার সুবিধার্থে দিনের বেলা কিছু সময় কায়লুলা (আরাম) করবে। দুপুরে খাওয়ার পর কিছু সময় বিশ্রাম করাকে কায়লুলা বলে। কায়লুলা শুধু স্বাস্থ্যের জন্যই উপকারী নয় বরং রাতের বেলা আল্লাহর স্মরণে জাগ্রত থাকার ঘুমের ঘাটতি পুরণ করতেও সহায়ক হয়।
(৩) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, হযরত রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ
من نام بعد العصر فاختلس عقله فلا يلومن إلا نفسه
"যে ব্যক্তি আসরের পর নিদ্রা গেল সে তার আকল বুদ্ধি ভোঁতা করে ফেলল। সে যেন তার আকল বুদ্ধি ভোঁতা হওয়ার জন্য নিজেকে ব্যতীত আর কাউকে দায়ী না করে।"-জামে সগীর