📄 ভুনা গোশত
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গোশত খুবই প্রিয় ছিল এটা আপনারা লক্ষ্য করেছেন। তবে সামনের রান ও ঘাড়ের গোশত বেশী পছন্দনীয় ছিল। এ সম্পর্কে অন্য একজন সাহাবীর (রাযিঃ) বর্ণনা দেখুনঃ
عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ ضِفْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَأَمَرَ بِجَنْبِ فَشُوى ثُمَّ أَخَذَ السُّفْرَةِ فَجَعَلَهُ يَحِرُّ لِى بِهَا مِنْهُ .
"হযরত মুগীরা ইবনে শোবা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, একদা রাত্রে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে (কোন স্থানে) মেহমান ছিলাম। আপ্যায়নকারী একটা বকরী জবাই করল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনের রান ভুনা করতে বললেন। অতঃপর একটা ছুরি নিলেন এবং আমার জন্য উক্ত রান থেকে ছুরি দিয়ে কাটতে লাগলেন। -তিরমিযী, মিশকাত
এ হাদীসের দু'টি বিষয় বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। প্রথমতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভুনা গোশত পছন্দ করতেন। তাই শুধু শুষ্ক রুটি খাওয়াই সুন্নত নয় রবং স্বচ্ছলতা থাকলে সুস্বাদু এবং উত্তম খানা খাওয়াও সুন্নতের খেলাফ নয় বরং এটাও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত সুন্নত।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় উভয় অবস্থার দৃষ্টান্ত বিদ্যমান রয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ছুরি দিয়ে কর্তন করা এবং টুকরা করা সুন্নত পরিপন্থি নয়। অবশ্য কাটা চামচের ব্যবহার একেবারেই পাশ্চাত্য ফ্যাশন। এখন রসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আমাদের মহব্বত এবং সম্পর্কই প্রমাণ করবে যে, আমরা কোন পদ্ধতি ও সভ্যতা গ্রহণ করব। একজন প্রকৃত প্রেমিক স্বীয় প্রেমাস্পদের পছন্দনীয় কাজের উপর জীবন উৎসর্গ করাকেই জীবনের স্বার্থকতা মনে করবে। বাহ্যতঃ তা যতই নগণ্য মনে হোক না কেন।
📄 পাখির গোশত
(১) হযরত যাহদাম জারমী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত: হযরত আবূ মূসা (রাযিঃ) বলেন:
رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ لَحُم دُجاج
"আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মোরগের গোশত খেতে দেখেছি।"
(২) হযরত ইব্রাহীম ইবনে ওমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তার দাদা সাফিনা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন,
اكلتُ مع رسول الله صلى الله عليه وسلم لحم حباری
"আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে 'হুবারার' গোশত খেয়েছি।"
উক্ত হাদীসদ্বয় শামায়েলে তিরমিযী থেকে নেওয়া হয়েছে।
"দুজাজ" মোরগকে বলা হয়। আর হুবারা ছাই রংগের এক প্রকার পাখি যার গর্দান এবং ঠোঁট লম্বা হয়ে থাকে। ফার্সীতে এটাকে 'তাগদীরা' এবং 'চারয' বলা হয়। কোন কোন পন্ডিত ব্যক্তি এটাকে সুরখাবও বলে থাকেন।
(৩) হযরত আনাস (রাযিঃ) বলেন, আমরা "মাররা যাহরান" নামক স্থানে গর্ত থেকে একটা খরগোশ বের করলাম। লোকেরা এটার পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত হয়ে গেল। তবে আমি শেষ পর্যন্ত এটা ধরেই ফেললাম এবং আবু তালহার (রাযিঃ) নিকট নিয়ে এলাম। তিনি এটা জবাই করে এর পাখা অথবা রান নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠিয়ে দিলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে তিনি এটা থেকে কিছু খেয়ে ছিলেন।" - বুখারী শরীফঃ কিতাবুল হেবাহ
উল্লেখিত হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোরগ, হুবারা (তাগদীর সুরখাব) এবং খরগোশের গোশত আহার করেছেন। যদিও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোশত খাওয়ার সুযোগ কম হয়েছে তথাপি গোশত খুবই পছন্দ করতেন। বিশেষ করে গর্দান, সামনের দিকের বাজুর গোশত এবং রানের গোশত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুবই প্রিয় ছিল।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে বলেন, "তাঁরা উড়ন্ত পাখীর গোশত ভক্ষণ করবে, যে পাখীর মাংস তাদের দিলে চায়।" -সূরা ওয়াক্বেয়াহ: আয়াত: ২১
ইউনানী, এলোপ্যাথিক এবং হোমিওপ্যাথিক নির্বিশেষে সকল পদ্ধতির চিকিৎসকগণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে একথার উপর একমত যে, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে মোরগ এবং পাখীর গোশত অন্য সকল প্রকার গোশতের চেয়ে বেশী উপকারী। প্যারালাইসিসগ্রস্ত রোগীকে জংলী কবুতরের গোশত ঔষধ হিসাবে খাওয়ান হয়।
📄 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় খাদ্য সরীদ
'সরীদ' নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা বিশেষ প্রিয় খাদ্য ছিল। এ সম্পর্কে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিটকতম সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) -এর বর্ণনা নকল করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি -
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ أَحَبُّ الطَّعَامِ إِلَى الرَّسُولِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الشَّرِيدُ مِنَ الْخَبَرِ وَالشَّرِيدُ مِنَ الْحَيْسِ
"হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তম খাদ্য ছিল "সরীদ”। সরীদ রুটি থেকে তৈরী হয় এবং 'হাইস' থেকেও তৈরী হয়। - আবূ দাউদ, মিশকাত শরীফ
এই রেওয়ায়েতে সরীদের দুইটি অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে:
(১) রুটি থেকে সরীদ অর্থাৎ রুটির টুকরা তরকারীর সুরবা বা পাতলা ডালের মধ্যে এমনভাবে ভিজিয়ে রাখা যেন রুটি খুব ভাল করে ভিজে যায় এবং তা চর্বনের প্রয়োজন না হয়। এই খানা নরম হয় এবং দ্রুত হজম হয়ে যায়।
(২) হাইস থেকে সরীদ অর্থাৎ ছাতুর মধ্যে খেজুর, পনির, ঘি, মিশ্রিত করে সালিদার মত যা তৈরী করা হয়। এ প্রকারে খাদ্য তৈরীর উদ্দেশ্যে হল খানা নরম হওয়া এবং চিবানোর প্রয়োজন না হওয়া আর হজম করতে কষ্ট না হওয়া।
প্রথমত: ছাতু দ্রুত হজম হওয়া ছাড়াও রোগ নিরাময়ের কাজ করে। তাছাড়া এ পদ্ধতিতে তৈরী করায় অন্য উপকারও রয়েছে। এই প্রকার সরীদ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় "হালুয়া" ছিল।
📄 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা প্রিয় খাদ্য লাউ
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ خَيَّاطًا دَعَا النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِطَعَامٍ صَنَعِ فَذَهَبْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَرَّبَ خُبْزًا شَعِيرًا وَمَرَقَا فِيهِ دُبَّاء وَقَدِيدٌ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَتَبَّعُ الدُّبَّاءَ مِنْ حَوَالِي الْقِصْعَةِ فَلَمْ ازل احب الدباء بعد يومئذ
"হযরত আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত : একদা এক দর্জি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খানা খাওয়ার দাওয়াত দেয়। আমিও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে যাই। (আমন্ত্রণকারী) জবের রুটি এবং সুরবা পরিবেশন করল যার মধ্যে লাউ ও শুকনা গোশত ছিল। আমি দেখলাম আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাত্রের কিনার থেকে লাউয়ের টুকরা খুঁজে বের করছেন। সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত লাউ সর্বদাই আমার প্রিয় খাদ্য।" -বুখারী, মুসলিম
লাউ কয়েক প্রকার। আমাদের দেশে লাউকি, ঘিয়া লাউ গোল লাউ বা পিলকদু এবং লাল ফুল কদু সচরাচর পাওয়া যায়। প্রথম দুই প্রকার কম বেশী প্রায় একই বৈশিষ্ট্যের। কিন্তু তৃতীয় প্রকার একেবারেই ভিন্ন ধরনের, শুধু নামে মিল রয়েছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাউকী পছন্দ করতেন। যাকে সাদা ফুলের কদু এবং ঘিয়া কদুও বলা হয়। এটা এক উত্তম তরকারী। খেতে খুবই সুস্বাদু এবং কার্যকারিতাও স্বাস্থ্য সম্মত, এবং স্বভাব খুবই ঠান্ডা এবং খুবই দ্রুত হজমকারী, পাকাতেও সুবিধা। এ দিকে চুলার উপর হাড়ি রাখা হল তো ওদিকে পাক হয়ে গেল। লাউয়ের তরকারী নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুবই প্রিয় ছিল। -ইবনে মাজা