📄 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পছন্দনীয় গোশত
গোশতের মধ্যে বাজু এবং গর্দানের গোশত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব পছন্দনীয় ছিল। সুবহানাল্লাহ! হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্বাচন কতই না ত্রুটিমুক্ত ও যুক্তিযুক্ত ছিল।
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে কিছু গোশত নিয়ে আসা হল এবং তার মধ্য হতে বাজুর গোশত হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে এগিয়ে দেওয়া হল। তিনি বাজুর গোশত পছন্দ করতেন। অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই গোশত দাঁত দিয়ে চিবিয়ে খেলেন।" -তিরমিযী, ইবনে মাজাহ
একটি প্রসিদ্ধ ঘটনার মধ্যে এ শব্দ সমূহ এসেছে:
أُتِيَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِلَحْمٍ فَرَفَعَ إِلَيْهِ الدَّرَاعَ وَكَانَ تُعْجِبُهُ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে গোশত আনা হল। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বাজুর গোশত পছন্দনীয় ছিল তাই উত্তম গোশতের মধ্যে হতে বাজুর গোশত হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেওয়া হল।" -যাদুল মাআদ: খন্ডঃ ২, বুখারী ও মুসলিম শরীফের বরাতে
গর্দানের গোশতের ব্যাপারে হযরত যুবায়াহ বিনতে যুবাইর (রাযিঃ)-এর বর্ণনা লক্ষ্য করুন। তিনি বলেন, আমরা একবার আমাদের বাড়ীতে বকরী জবাই করলাম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খবর পাঠালেন যে, আমার অংশ পাঠিয়ে দিন। আমি বললাম, শুধু মাত্র গর্দানের গোশত অবশিষ্ট আছে এবং এটা পাঠাতে আমার লজ্জা হচ্ছে। অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাল্টা বলে পাঠালেন, এটাই পাঠিয়ে দিন। গর্দানের গোশত বকরীর উত্তম অংশ। গর্দানের গোশত ভালর নিটকতর এবং ক্ষতি থেকে দূরতর। -যাদুল মাআদ: খন্ডঃ ২
এ সকল হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গোশত খুব প্রিয় ছিল, বিশেষ করে বাজু এবং গর্দানের গোশত আরও অধিক প্রিয় ছিল।
📄 প্রিয় গোশত
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন গোশত প্রিয় ছিল? এই প্রশ্নের জবাবে সাহাবায়ে কিরামদের (রাযিঃ) নিম্নোল্লিখিত বর্ণনা সমূহও পাঠ করুন। সবগুলি হাদীসই শামায়েলে তিরমিযী হতে লওয়া হয়েছে।
(১) হযরত উম্মে সালামা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন যে,
ا أَنَّهَا قَرَّبَتْ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَنْباً مَشْوِيًّا فَأَكَلَ مِنْهُ
“তিনি (হযরত উম্মে সালমা রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ভুনা রান নিয়ে গেলে তিনি তা খেলেন।
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ الْحَارِثِ قَالَ أَكَلْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شِوَاءٌ
(২) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারেস (রাযিঃ) বলেন, আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ভুনা গোশত খেয়েছি।"
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُعْجِبُهُ الذراع
(৩) "হযরত ইবনে মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত: হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁধের গোশত পছন্দ করতেন।"
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَتِ الذِرَاعُ أَحَبَّ اللَّحْمِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁধের গোশত সর্বাপেক্ষ বেশী পছন্দ করতেন।"
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ جَعْفَرِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ إِنَّ أَطْيَبَ اللَّحْمِ لَهُمُ الظَّهْرِ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই পিঠের গোশত সর্বোত্তম।"
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ...... ثُمَّ رَاهُ أَكَلَ مِنْ كَيْفِ شَاةٍ
(৫) হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত: অতপর আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বকরীর কাঁধের মাংস খেতে দেখলাম।"
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন্ জানোয়ারের কোন্ অংশের গোশত পছন্দ করতেন তা যাতে এক নযরে জানা যায় সে উদ্দেশ্যে উপরোল্লিখিত বর্ণনাগুলির সার সংক্ষেপ তুলে ধরলাম। তা হল- সামনের উরুর গোশত, ঘাড়, রান, কাঁধ, পিঠ, বিশেষ করে ভুনা গোশত।
📄 ভুনা গোশত
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গোশত খুবই প্রিয় ছিল এটা আপনারা লক্ষ্য করেছেন। তবে সামনের রান ও ঘাড়ের গোশত বেশী পছন্দনীয় ছিল। এ সম্পর্কে অন্য একজন সাহাবীর (রাযিঃ) বর্ণনা দেখুনঃ
عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ ضِفْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَأَمَرَ بِجَنْبِ فَشُوى ثُمَّ أَخَذَ السُّفْرَةِ فَجَعَلَهُ يَحِرُّ لِى بِهَا مِنْهُ .
"হযরত মুগীরা ইবনে শোবা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, একদা রাত্রে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে (কোন স্থানে) মেহমান ছিলাম। আপ্যায়নকারী একটা বকরী জবাই করল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনের রান ভুনা করতে বললেন। অতঃপর একটা ছুরি নিলেন এবং আমার জন্য উক্ত রান থেকে ছুরি দিয়ে কাটতে লাগলেন। -তিরমিযী, মিশকাত
এ হাদীসের দু'টি বিষয় বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। প্রথমতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভুনা গোশত পছন্দ করতেন। তাই শুধু শুষ্ক রুটি খাওয়াই সুন্নত নয় রবং স্বচ্ছলতা থাকলে সুস্বাদু এবং উত্তম খানা খাওয়াও সুন্নতের খেলাফ নয় বরং এটাও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত সুন্নত।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় উভয় অবস্থার দৃষ্টান্ত বিদ্যমান রয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ছুরি দিয়ে কর্তন করা এবং টুকরা করা সুন্নত পরিপন্থি নয়। অবশ্য কাটা চামচের ব্যবহার একেবারেই পাশ্চাত্য ফ্যাশন। এখন রসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আমাদের মহব্বত এবং সম্পর্কই প্রমাণ করবে যে, আমরা কোন পদ্ধতি ও সভ্যতা গ্রহণ করব। একজন প্রকৃত প্রেমিক স্বীয় প্রেমাস্পদের পছন্দনীয় কাজের উপর জীবন উৎসর্গ করাকেই জীবনের স্বার্থকতা মনে করবে। বাহ্যতঃ তা যতই নগণ্য মনে হোক না কেন।
📄 পাখির গোশত
(১) হযরত যাহদাম জারমী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত: হযরত আবূ মূসা (রাযিঃ) বলেন:
رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ لَحُم دُجاج
"আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মোরগের গোশত খেতে দেখেছি।"
(২) হযরত ইব্রাহীম ইবনে ওমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তার দাদা সাফিনা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন,
اكلتُ مع رسول الله صلى الله عليه وسلم لحم حباری
"আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে 'হুবারার' গোশত খেয়েছি।"
উক্ত হাদীসদ্বয় শামায়েলে তিরমিযী থেকে নেওয়া হয়েছে।
"দুজাজ" মোরগকে বলা হয়। আর হুবারা ছাই রংগের এক প্রকার পাখি যার গর্দান এবং ঠোঁট লম্বা হয়ে থাকে। ফার্সীতে এটাকে 'তাগদীরা' এবং 'চারয' বলা হয়। কোন কোন পন্ডিত ব্যক্তি এটাকে সুরখাবও বলে থাকেন।
(৩) হযরত আনাস (রাযিঃ) বলেন, আমরা "মাররা যাহরান" নামক স্থানে গর্ত থেকে একটা খরগোশ বের করলাম। লোকেরা এটার পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত হয়ে গেল। তবে আমি শেষ পর্যন্ত এটা ধরেই ফেললাম এবং আবু তালহার (রাযিঃ) নিকট নিয়ে এলাম। তিনি এটা জবাই করে এর পাখা অথবা রান নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠিয়ে দিলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করলেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে তিনি এটা থেকে কিছু খেয়ে ছিলেন।" - বুখারী শরীফঃ কিতাবুল হেবাহ
উল্লেখিত হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোরগ, হুবারা (তাগদীর সুরখাব) এবং খরগোশের গোশত আহার করেছেন। যদিও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোশত খাওয়ার সুযোগ কম হয়েছে তথাপি গোশত খুবই পছন্দ করতেন। বিশেষ করে গর্দান, সামনের দিকের বাজুর গোশত এবং রানের গোশত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুবই প্রিয় ছিল।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে বলেন, "তাঁরা উড়ন্ত পাখীর গোশত ভক্ষণ করবে, যে পাখীর মাংস তাদের দিলে চায়।" -সূরা ওয়াক্বেয়াহ: আয়াত: ২১
ইউনানী, এলোপ্যাথিক এবং হোমিওপ্যাথিক নির্বিশেষে সকল পদ্ধতির চিকিৎসকগণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে একথার উপর একমত যে, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে মোরগ এবং পাখীর গোশত অন্য সকল প্রকার গোশতের চেয়ে বেশী উপকারী। প্যারালাইসিসগ্রস্ত রোগীকে জংলী কবুতরের গোশত ঔষধ হিসাবে খাওয়ান হয়।