📄 হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপছন্দনীয় খাদ্য
'হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত: হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবূ আইয়্যুব আনসারী (রাযিঃ)-এর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। হযরত আবূ আইয়্যুব (রাযিঃ) যখনই খানা খেতেন তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য খাদ্যের কিছু অংশ পাঠিয়ে দিতেন। এ নিয়মে একদিন তিনি কিছু খানা পাঠালেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই খানা খেলেন না। তখন আবূ আইয়্যুব (রাযিঃ) হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে খানা না খাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর মধ্যে পেঁয়াজ মিশ্রিত রয়েছে। তখন তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পেঁয়াজ কি হারাম? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি উত্তরে বললেন,
وَلَكِنِّي أَكْرَهُهُ مِنْ أَجْلِ رِيحِهِ
“হারাম নয় বটে, তবে দুগন্ধের কারণে আমি এটা পছন্দ করি না।” -তিরমিযী
তিনি যে শুধু পেঁয়াজ খাওয়া থেকেই বিরত থাকতেন তা নয় বরং দুর্গন্ধযুক্ত এমন কোন জিনিসই তিনি খেতেন না যদ্বারা অন্যের কষ্ট হয়। নিম্ন বর্ণিত হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়।
"হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে আবী ইয়াযিদ থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমাকে উম্মে আইয়্যুব (রাযিঃ) বলেছেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাড়ীতে তাশরীফ নিয়ে যান। তিনি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য খাদ্য তৈরী করলেন। যার মধ্যে কিছু শাক-সব্জিও ছিল। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত খাদ্য পছন্দ করলেন না। তিনি সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা খেয়ে নাও। আমি তোমাদের মত নই; আমার ভয় হয় যে, (এই খানায়) আমার সাথীদের তথা ফেরেশতাদের কষ্ট হবে।" -তিরমিযী
📄 ক্ষতিকর খাদ্যের প্রতিক্রিয়া দূরকরণ
যাদুল মাআদ নামক গ্রন্থ হতে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাদ্যদ্রব্য সম্পর্কে অত্যন্ত উপকারী কিছু বিষয় পূর্বে বর্ণনা করেছি। খাদ্য সংক্রান্ত অধ্যায়ের শেষ পর্যায়ে আল্লামা হাফেয ইবনে কাইয়্যিম (রহঃ) অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা বিষয়- হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষতিকর খাদ্যের প্রতিক্রিয়া কি করে দূর করতেন তা বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন:
كَانَ يُصْلِحُ ضَرَرَ بَعْضِ الْأَغْذِيَةِ بِبَعْضٍ إِذَا وَجَدَ إِلَيْهِ سَبِيلًا فَيَكْسِرُ حَرَارَةِ هَذَا بير دَةٍ هَذَا وَيَبُوسَةِ هَذَا يَرِطُوبَةِ هَذَا
"যদি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন ক্ষতিকর খাদ্য খেতেই হত তখন তিনি অন্য কোন ভাল খাদ্যের দ্বারা উক্ত খাদ্যের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দূর করে নিতেন। অর্থাৎ ঐ জিনিসের গরম প্রতিক্রিয়াকে অন্য ঠান্ডা জিনিস দ্বারা এবং শুকনা জিনিসের প্রতিক্রিয়াকে আদ্র কোন জিনিস দ্বারা দূর করে নিতেন।"
অতঃপর আল্লামা হাফেয ইবনে কাইয়্যিম (রহঃ) কাঁকড়ী ও তাজা খেজুরের উদাহরণ দেন, যা একটা অন্যটার ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দূরে করে থাকে। এভাবে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুকনা খেজুরকে ঘি এবং মাখন-এর সঙ্গে মিশিয়ে খেতেন, যাতে ঘিয়ের মাধ্যমে এর শুষ্কতা দূর হয়ে যায়। - যাদুল মাআদ: খণ্ডঃ ২
আবূ দাউদ ও তিরমিযী শরীফে এরূপ একটি রেওয়ায়াতও বিদ্যমান রয়েছে যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাজা খেজুরের সাথে খরবুজা খেতেন এবং বলতেন যে, খরবুজা খেজুরের গরম দূর করে দেয়। -যাদুল মাআদ: খন্ডঃ২
📄 গাভীর দুধ এবং ঘি
عن صُهَيْبِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ يُرفعهُ عَلَيْكُمْ بِلَيْنِ الْبَقَرِ فَإِنَّهَا شِفَاءٌ وَسَمَنُهَا دَوَاءُ ولحمها داء
হযরত সুহাইব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা অবশ্যই গাভীর দুধ পান করবে। কেননা এর মধ্যে শেফা রয়েছে এবং এর ঘির মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে। আর এর গোশতের মধ্যে রোগ রয়েছে। - যাদুল মাআদ: খন্ড: ২
মুসদাতরাক গ্রন্থের "তিব্ব" অধ্যায়ের প্রথম হাদীস হল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীতে এমন কোন রোগ-ব্যাধি পাঠান নাই যার ঔষধ প্রেরণ করেন নাই। আর গাভীর দুধের মধ্যে প্রত্যেক রোগের প্রতিষেধক রয়েছে।"
এই অধ্যায়েরই তৃতীয় হাদীসে শেফার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে যে,
فَإِنَّهَا تَقْرِمُ مِنْ كُلِّ شَجَرٍ
কেননা গাভী সব ধরনের গাছের পাতা খেয়ে থাকে।" -মুসতাদরাকে হাকেম
হাকীকত হল, উট, মহিষ, ভেড়া, বকরী এবং অন্যান্য সমস্ত প্রাণীর তুলনায় গাভীর দুধ উত্তম। সকল প্রকার ক্ষতি থেকে মুক্ত এবং কতিপয় রোগের শেফা। এতদ্ব্যতীত গাভীর ঘি, এবং মাখনও বহু রোগের প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে। চিকিৎসকগণ এটাকে ঔষধ হিসাবে ব্যবস্থা করে থাকেন।
তবে গরুর গোশত যেহেতু গরম, তাই এর গরম প্রতিক্রিয়া কিছুটা সমস্যাও সৃষ্টি করে থাকে। কিন্তু আমাদের কখনও একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, গরুর গোশত হালাল। আর হালাল কোন কিছুকেই নিজের জন্য হারাম মনে করার অনুমতি শরীয়ত কখনও দেয় নাই। তবে ডাক্তারী মতে গরুর গোশত খাওয়া না খাওযা ভিন্ন কথা।
📄 খেজুর এবং কাঁকড়ী
عَنْ عَبْدِ اللهِ بن جعفر رض قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ الرُّطْبَ بِالْقِتَاءِ
"হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাজা খেজুর এবং কাঁকড়ী একত্রে খেতে দেখেছি।" বুখারী, মুসলিম, মিশকাত
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাওয়ার এই পদ্ধতিটি কতই না চিকিৎসা সম্মত ছিল। রুতব' পাকা তরু তাজা খেজুরকে বলে। কাঁচা হোক বা শুকনা হোক খেজুর তাঁর নিজস্ব সর্বপ্রকার উপকারের সঙ্গে সঙ্গে গরম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। খেজুরের প্রতিক্রিয়া এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চিকিৎসা বিষয়ক 'আজওয়া খেজুর' শিরোনামে চতুর্থ অধ্যয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি।
কাঁকড়ীকে আরবীতে কিস্সা বলা হয়। মূলতঃ কাঁকড়ী ভিজা পানসা হয়ে থাকে। এর স্বভাব প্রতিক্রিয়াও ঠাণ্ডা। ধনী দরিদ্র নির্বেশেষে সকলের জন্যেই এটা ফল এবং সব্জি দুইটিই। এটা পিপাসা, গরম, জ্বালা-যন্ত্রণা এবং রক্তের চাপ ইত্যাদি কমিয়ে দেয়। অতি দ্রুত হজম হয়। -হায়াতে জিন্দিগী: পৃঃ ১১৪
কাঁকড়ী অন্তরে শান্তি আনে। পেশাব সৃষ্টি করে। প্রস্রাবের জ্বালা যন্ত্রণা দূর করে। মূত্রদ্বার দিয়ে পূঁজ, রক্ত ইত্যাদি নির্গত হওয়া বন্ধ করে। মূত্রাশয়ের পাথর এবং মূত্র থলীর জন্য বিশেষ উপকারী। -কিতাবুল মুফরাদাতঃ খাওয়াসুল আদবিয়া: পৃঃ ২৭৮
সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা'আলা কাঁকড়ীর মধ্যে শতকরা ৭৫৬ ভাগ প্রাকৃতিক পানি, জমা করে দিয়েছেন। ১/২ ভাগ মাংস, ২/৩ ভাগ শ্বেতসার বা মাড় রয়েছে। তাছাড়া এতে তৈলাক্ত পদার্থ, খনিজ লবণ, পটাশিয়াম, লাইম, ফসফরাস, সালফার ইত্যাদিও বিদ্যমান রয়েছে। -সিহহাত আওর তন্দুরস্তীঃ পৃঃ ২০
হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর এবং কাঁকড়ী এক সঙ্গে খেতেন।