📄 মশক্বীযা বা কলস থেকে পানি পান করা
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَشْرَبَ مِنْ فِي السَّقَاءِ أَو القُرْبَةِ -
"হযরত আবু হুরাইরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মশক বা মশকীযায় মুখ লাগিয়ে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন।" -রিয়াযুস সালেহীন
হাদীসে উল্লেখিত ছিকা এবং "কিরবাহ” উভয় শব্দ মশক-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে উভয়ের আকৃতি ও পুরুত্বের মধ্যে কম বেশী পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। শাব্দিক অর্থের পেছনে না পড়ে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ কি? তাই দেখা উচিত। আর তা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মশকে মুখ লাগিয়ে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই নিষেধাজ্ঞার হেকমত খুব সহজেই বুঝে আসে। প্রথমতঃ ভরা মশকে মুখ লাগালে পানির মধ্যে এর প্রভাব পড়বে। আর যদি আল্লাহ না করুন পানকারীর দাঁতে অসুখ থাকে বা মুখে অন্য কোন সমস্যা থাকে তবে এর প্রতিক্রিয়া সমস্ত পানিতে ছড়িয়ে পড়বে। আর এটা স্বাস্থ্য রক্ষা নীতির পরিপন্থী হবে।
দ্বিতীয়তঃ ভরা মশক থেকে পানি পান করায় কিছু পানি অবশ্যই পড়ে নষ্ট হবে। আর কোন কিছুই নষ্ট করা কখনও বৈধ হতে পারে না। অধিকন্তু পানি আল্লাহর নিয়ামত সমূহের একটা বড় নিয়ামত।
এতদ্ব্যতীত এটা একটা কুদরতী বিষয় যে, ভরা মশক থেকে নিশ্চিন্ত মনে শান্তির সঙ্গে পান করা মুশকিল। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত হল ধীরে ধীরে কম পক্ষে তিন ঢোকে পান করা। স্বাস্থ্য বিধিমতে এটা একটা জরুরী বিষয়।
এই নিষেধাজ্ঞার চতুর্থ হিকমত হল, মশক থেকে পানি পান করায় কিছু পানি পতিত হয়ে ছিটে কাপড়ে লাগার খুবই সম্ভাবনা থাকে যা পবিত্রতা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
📄 ভাঙ্গা পাত্রে পানি পান করা
"আবু দাউদ শরীফের রেওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাত্রের ভাঙ্গা অংশের দিক থেকে পানি পান করতে এবং পানীয়ের মধ্যে ফুঁক দিতে নিষেধ করেছেন।" -জাদুল মাআদ খন্ড: ৩
রিয়াযুস সালেহীন এবং মিশকাত শরীফেও হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাযিঃ)-এর নিম্নোক্ত রেওয়ায়াত বিদ্যমান রয়েছে:
قَالَ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ اخْتِنَاتِ الْأَسْقِيَةِ يَعْنِي أَنْ تَكْسِرَ أَفْوَاهِهَا وَ يَشْرَبُ مِنْهَا
তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মশকীয়া "একতেনাস” করতে অর্থাৎ মশকীয়ার মুখ ভেঙ্গে সেই মুখ থেকে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন।"
উপরোক্ত দুইটি রেওয়ায়াত মিলিয়ে পাঠ করলে তা থেকে তিনটি বিষয় জানা যায়:
১। পাত্রের ভাঙ্গা অংশ থেকে পানি পান না করা।
২। পানীয়ের মধ্যে ফুঁক না দেওয়া।
৩। মশকিয়ার মুখ ভেঙ্গে তথায় মুখ লাগিয়ে পানি পান না করা।
"বর্তনের ভাঙ্গা অংশ থেকে পান করা যাবে না”, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই ছবকের প্রথম হুকুমের মধ্যে অনেকগুলি হেকমত রয়েছে। কারণ এতে শুধু মাত্র ভাঙ্গা অংশের মাধ্যমে ঠোঁট কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। বরং এ ধরনের ভাঙ্গা বর্তন পরিষ্কার করার সময় ময়লা আবর্জনা ইত্যাদি বর্তনে থেকে যাওয়ার খুবই সম্ভাবনা থাকে। অথবা পূর্বের ব্যবহৃত দ্রব্যের কিছু লেগে থাকে। অথবা ক্ষতিকর লালা বা থুথু ইত্যাদি বর্তনে আটকে থাকে এবং ঐ দিক থেকে পানি পান করায় উক্ত ক্ষতিকর পদার্থ পেটের মধ্যে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
আমাদের ঘরে ব্যবহৃত মেটে এবং চিনা বর্তনের ক্ষেত্রে এ অবস্থাটি খুবই লক্ষ্য করা যায়। কারণ চিনা বর্তন, রেকাবী এবং অন্যান্য বর্তনের ভাঙ্গা অংশের মধ্যে নিঃসন্দেহে ময়লা ইত্যাদি জমে থাকে। পরিষ্কার করা সত্ত্বেও ভাঙ্গা অংশ থেকে এগুলি দূর হয় না।
আল্লাহ! আল্লাহ! নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি বাণী কতই না মঙ্গলজনক।
📄 পাত্র ঢেকে রাখবে
عَظُو الإِنَاءَ وَأُوكُو السَّقَاءِ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, বর্তন ঢেকে রাখবে এবং মশক (চামড়ার থলি যাতে করে পানি বহন করা হয়। আমাদের দেশে এর বিকল্প হিসাবে কলস ব্যবহৃত হয়ে থাকে) এর মুখ বন্ধ করে রাখবে।" - বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র ইরশাদ করেন,
الْإِحْمَرَهُ وَلَوْ تَعْرِضُ عَلَيْهِ عُودًا
"কাঠের ঢাকনা দিয়ে হলেও দুধের বর্তন ঢেকে রেখো।"
চিকিৎসা শাস্ত্র মতে খানা-পিনা জাতীয় বস্তু খুবই সাবধানে রাখা উচিত। কেননা মাছি এগুলির উপর পাগলের মত ছুটে এসে বসে যায় এবং অসংখ্য রোগ জীবাণু সঙ্গে নিয়ে আসে। মাছির আক্রমণ ও উপদ্রব থেকে রেহাই পাওয়ার একটাই মাত্র উপায় আছে, তা হল খানা-পিনা ঢেকে রাখা।
পাত্র খোলা রাখার দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর দিক হলো, পাত্রে এমন কিছু পড়তে পারে যা স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর এবং এতে রোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সাধারণত প্রতি বাড়ীতেই টিক্টিকি বাস করে। এগুলির দেহাবয়ব শুধু বিশ্রী নয় বরং এর শরীর বিষাক্তও বটে। তাই কোন কিছু বিষাক্ত হওয়ার জন্য এর মধ্যে টিক্টিকি পতিত হওয়াই যথেষ্ট। সুতরাং এ বিষয়টির প্রতি পূর্ণ সতর্ক দৃষ্টি রাখা চাই।
একটু চিন্তা করে দেখুন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা কতটুকু হেকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ছিল এবং তিনি কেমন উপকারী পদ্ধতি শিক্ষা দিয়ে গেছেন। শতশত বছর পরে ব্যাপক গবেষণা করে মানুষ আজ যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, উম্মি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময়ই (১৪শত বৎসর পূর্বেই) তা বলে গেছেন। বস্তুতঃ সে ব্যক্তিই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করেছে যে তাঁর শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছে।