📄 পানিতে নিঃশ্বাস ফেলো না
আমি পানি পান করার আদব সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত করেছি এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিম্নোক্ত বাণী সমূহ চিহ্নিত করছি।
* বিসমিল্লাহ বলে পানি পান করবে।
* এক শ্বাসে পানি পান করবে না বরং তিন শ্বাসে অল্প অল্প করে পান করবে।
* পানি পান করে আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করবে, যার সুন্নতি শব্দগুলি হল 'আলহামদুল্লিাহ'।
* নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং এ পদ্ধতিতে পানি পান করতেন, এমনকি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাতো ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি ঢোকেই 'আল হামদুল্লিাহ' বলতেন এবং পরিশেষে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।
* পানি পান করার ৪র্থ আদব হল দাঁড়িয়ে পান না করা। পরিতাপের বিষয় আমাদের দেশে আজ বুফে সিস্টেম (Buffet) আধুনিক সভ্যতার এক বিশেষ নিদর্শন ও বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে।
* শুধুমাত্র যমযমের পানি দাঁড়িয়ে ক্বিবলামুখী হয়ে পান করা সুন্নত। এভাবে পান করার হেকমত সুস্পষ্ট।
প্রথমতঃ যম্যম্ কূপের নিকট হিজায ও অন্যান্য স্থান থেকে আগত লোকদের ভীড়; দ্বিতীয়তঃ কূপের সম্মান ও পবিত্রতা।
* এখন পানি পান করার আদব সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরো একটি হাদীস পেশ করছি: হযরত ইকরামা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَتَنَفُسَ فِي الْإِنَاءِ أَوْ يَنْفَخَ فِيهِ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানির মধ্যে নিঃশ্বাস ফেলতে এবং ফুঁক দিতে নিষেধ করেছেন।" -মুসতাদরাক
পানির পাত্রের মধ্যে হুক্কার মত গড় গড় করা, পানি পান করার বর্তনের মধ্যে ফুঁক মারা স্বাস্থ্য নীতিরও পরিপন্থি। বিশেষতঃ যদি এ সকল পাত্রে অন্য কেউ পান করে তাহলে তো কথাই নাই। চিন্তার বিষয় হল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীগুলির হিকমত ও দর্শন কতইনা মূল্যবান। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ স্বাস্থ্য নীতি বিষয়ক যে সকল তত্ত্ব আজ প্রমাণ করছেন তা শত শত বৎসর পূর্বেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন।
হযরত আবূ হুরাইরা (রাযি)-এর নিম্নোক্ত বর্ণনা বিষয়টিকে আরো সুস্পষ্ট করে দিয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "তোমাদের কেউ কোন পাত্রে পানি পান করার সময় পাত্রের মধ্যে নিঃশ্বাস ফেলো না।"
وَلَكِنْ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَتَنفُسَ فَلْيُؤَخِّرُهُ عَنْهُ ثُمَّ يَتَنفَسٌ
"যদি শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন হয় তবে পাত্র সরিয়ে শ্বাস নাও।" -মুসতাদরাক গ্রন্থে এ সম্পর্কে হযরত আবূ সায়ীদ খুদরী (রাযিঃ) থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে।
অন্য এক রেওয়ায়াতে তিনি ইরশাদ করেছেন:
إِذَا شَرِبَ أَحَدُكُمْ فَلَا يَتَنَفَسُ فِي الْإِنَاءِ
"তোমাদের কেউ কিছু পান করার সময় পাত্রের মধ্যে ফুঁক দিবে না।” বস্তুতঃ এটাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের আমল ছিল। যার আলোচনা ইবনে মাজাহ ও অন্যান্য হাদীসের কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে।
📄 পানি পান করার পর দুআ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি পান করার পর যে দুআ পাঠ করতেন এ অধ্যায়ে তা উল্লেখ করা হল। এই দুআর বর্ণনাকারী হযরত আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী (রাযিঃ) বলেন,
كَانَ يَقُولُ بَعْدَ الشِّرْبِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي جَعَلَ الْمَاءَ عَذِبًا فَرَانًا بِرَحْمَتِهِ وَلَمْ يَجْعَلْهُ مِلْحاً أَجَاجًا بِذُنُوبَنَا
"কিছু পান করার পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, সমস্ত প্রশংসা ঐ আল্লাহর জন্য যিনি স্বীয় রহমতে পানিকে মিষ্টি ও সুস্বাদু বানিয়েছেন এবং আমাদের অপরাধ সত্ত্বেও এটাকে লবণাক্ত ও খারযুক্ত করেন নাই।" -তাবরানী
আল্লাহ! আল্লাহ!! মানব কূলের শিরোমণি, বিশ্বজাহানের সর্দার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহর দরবারে কতই না কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। মূলতঃ পানি মিষ্টি ও সুস্বাদু হওয়া একমাত্র সেই মহান সত্তা আল্লাহ তা'আলারই রহমত। আল্লাহর কোন বান্দা এমন আছেন যিনি এ নিয়ামতকে তার নেক কাজের প্রতিফল হিসাবে আখ্যায়িত করতে পারেন? আমাদের নেকের পাল্লা এমন কী ভারী হয়ে গেছে যার ফলে আমরা আল্লাহর এই নিয়ামতের হকদার হয়ে গেছি?
দুআর দ্বিতীয় অংশে রহমতের আধার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মত গোনাহগার উম্মতদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, বিপর্যয় যে ধরনেরই হোক না কেন তা বান্দার নিজেরই কর্মের প্রতিফল। তা না হয় পরম করুণাময় মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর পিতা-মাতার চেয়েও বহুগুণে স্নেহশীল ও দয়ার্দ্র।
📄 রূপার পাত্র
হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্রা স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
الَّذِي يَشْرَبُ فِي آنِيَةِ الْفِضَّةِ إِنَّمَا يجر جرفي بطنه نار جهنم
"যে ব্যক্তি রূপার পাত্রে পান করে, সে (যেন) নিজের পেটে জাহান্নামের আগুন ভরে।"- বুখারী, মুসলি ম শরীফ
ইসলাম তার অনুসারীদেরকে সরলতা, অনাড়ম্বরতা শিক্ষা দেয় এবং সরলতা প্রিয় করে। ইসলামী শিক্ষা শুধু মাত্র ওয়াজ ও বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং আমলী যিন্দিগীর মধ্যে সচেতনভাবে এগুলির বাস্তবায়নও একান্ত জরুরী। যার একটা দৃষ্টান্ত হল স্বর্ণ, রূপা, রেশম ও সিল্কের পোশাক ইত্যাদি সম্পর্কে ইসলামী হুকুম সংক্রান্ত আমল।
প্রথমতঃ ইসলাম যাকাতের সম্পদ বন্টনের মাধ্যমে স্বর্ণ-রূপা সঞ্চয়ের সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে এবং সামর্থশীলদের সঞ্চয়ের মধ্যে গরীব নিঃস্বদের অংশীদার করেছে। স্বর্ণ-রূপা ব্যবহার মহিলাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে। পুরুষের জন্য এগুলির ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
উপরোল্লেখিত হাদীস অনুযায়ী স্বর্ণ রূপার বর্তন নারী পুরুষ সকলের জন্যই নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কারণ এতে ধনীদের ঘরে সম্পদ জমা হত এবং তাদের ইমারতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হত। আর অন্যদিকে দরিদ্রদের মন ছোট হয়ে যেত। এভাবে ইসলামের স্বাভাবিক সহজ সরলতা একেবারেই খতম হয়ে যেত।
📄 স্বর্ণ রৌপ্যের বর্তন
রূপার পাত্রে পানি ইত্যাদি পান করার নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীস বর্ণনা করেছি। এখানে শুধু খানা পিনা সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরো কয়েকটি ইরশাদ পাঠ করুন।
(১) হযরত হুযাইফা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, "নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে রেশম ও সিল্কের পোষাক পরিধান করতে এবং স্বর্ণ ও রৌপ্যের বর্তন ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আরো ইরশাদ করেছেন যে,
هُنَّ لَهُمْ فِي الدنيا وهي لَكُمْ فِي الآخِرَةِ
"এই জিনিসগুলি কাফেরদের জন্য দুনিয়ায় এবং তোমাদের জন্য আখেরাতে রয়েছে।" -বুখারী, মুসলিম
(২) নবী করীম সসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সাহাবী থেকেই অন্য এক রেওয়ায়াত হল 'আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, রেশম ও সিল্কের কাপড় পরিধান করো না এবং স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্রে পান করো না এবং স্বর্ণ রৌপ্যের বাটিতে খেয়ো না।" -বুখারী ও মুসলিম শরীফ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী সমূহের উপর সাহাবায়ে কেরামগণ কিভাবে আমল করেছেন সে সম্পর্কে মিশকাত শরীফের একটি বর্ণনা লক্ষ্য করুন। হাদীস বর্ণনাকারী হযরত আনাস ইবনে সিরীন বলেনঃ
আমি হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাযিঃ)-এর সঙ্গে অগ্নি পূজকদের একটা জামাআতের নিকট ছিলাম। এক ব্যক্তি স্বর্ণের পাত্রে এক প্রকার হালুয়া নিয়ে এল। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাযিঃ) খেলেন না। হালুয়া নিয়ে আসা লোকটিকে বলা হল এটা পাল্টিয়ে আন। হালুয়ার পাত্র পরিবর্তন করে আনা হলে তিনি তা খেলেন। - বায়হাকী