📄 তাকাল্লুফ বা লৌকিকতার নিষেধাজ্ঞা
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ نُهِينَا عَنِ التَّكَلَفِ
"হযরত ওমর ফারুক (রাযিঃ)-এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের লৌকিকতা দেখাতে নিষেধ করেছেন। -শামায়েলে তিরমিযী
হাদীস বিশারদগন তাকালুফ বা লৌকিকতার সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেনঃ "কষ্টের সঙ্গে এমন কোন বিষয় বা এমন কোন কাজ করা যার মধ্যে কোন কল্যাণ নিহিত নাই এবং যাতে কোন উপকারও হয় না।"
আল্লাহ ঐ সকল বুযুর্গদের উত্তম বদলা দান করুন যারা আরবের সর্বাপেক্ষা বড় ভাষাবিদ এবং আল্লাহর সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অলৌকিক বর্ণনাকৃত বাণীর ব্যাখ্যাও এমন সুন্দরভাবে দিয়েছেন যা তাঁর শানের যথোপযুক্ত ছিল। তাকাল্লুফের উল্লেখিত ব্যাখ্যার ব্যাপারে একটু ভেবে দেখুন। তা কতই না অর্থবহ হয়েছে।
প্রতিটি এমন বিষয় যাতে কোন উপকার নাই এবং প্রত্যেক এমন কাজ যার কোন অর্থই হয় না, তা যদি বিশেষ কষ্ট স্বীকার করে সম্পন্ন করা হয় তবে সেটা তাকাল্লুফের মধ্যে গণ্য হবে। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য এক হাদীসে ইরশাদ করেন:
مَنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
"কোন ব্যক্তির জন্য ইসলামের সৌন্দর্য্য হল অযথা বা অনর্থক বিষয় ত্যাগ করার মধ্যে।" মুয়াত্তা ইমাম মালেক (রহঃ)
আসুন! এখন এবার একটু আমাদের নিজের জীবনের কর্ম এবং বন্ধু বান্ধবদের সাথে মিলা মেশা ও নিজের সামাজিক যিন্দেগীর দিকে গভীর দৃষ্টিতে দেখি, এতে উপকারী অনুপকারী বিষয় কি পরিমাণ প্রবেশ করেছে। আমার তো ধারণা আমাদের জীবনের সব কিছুতেই আমরা লৌকিকতার খোলস পড়ে আছি। আর ভেতরে সবই অন্তঃসার শূন্য-ফাঁকা।
📄 খানায় তাকাল্লুফ
সুপ্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রাযিঃ) বর্ণনা করেন:
أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ لَا تَتَكَلَّفَ لِلضَّيْفِ مَا لَيْسَ عِندَنَا وَأَنْ نَتَقَدَّمَ إِلَيْهِ مَا حَضَرَنَا
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমাদের নিকট যা নাই মেহমানদের খাতিরে তা যোগাড় করতে গিয়ে কষ্ট উঠাবে না। বরং যা কিছু উপস্থিত আছে তাদের সামনে তাই দিবে।"
তাবরানী নামক হাদীস গ্রন্থে এ বিষয়টি দু একটি শব্দের পরিবর্তন সাপেক্ষে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে,
نَهَانَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَتَكَلَّفَ لِلضَّيْفِ مَا لَيْسَ عِندَنَا .
"আমাদের নিকট যা নাই মেহমানদের খাতিরে তা নিয়ে কষ্ট উঠাতে আমাদেরকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।"
অনেক সময় আমরা এ ধরনের তাকাল্লুফের শিকার হয়ে থাকি। যার ফলে একদিকে মেহমান এক প্রকার লজ্জায় পড়ে যায় এবং আমরা পেরেশান হই। আর এ কারণে রহমতের ফিরিশতাকে অর্থাৎ মেহমানকে আমরা বিপদের মূল মনে কর।
উম্মী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের প্রকৃতি ও স্বভাব ভাল করেই জানতেন, উপলব্ধি করতেন। তাই তিনি মেহমানদের ব্যাপারে তাকাল্লুফ করতে নিষেধ করার সঙ্গে সঙ্গে এর হেকমতও বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, فتبغضوه অর্থাৎ এ ভাবে তোমরা মেহমানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে শুরু করবে। আর যে ব্যক্তি মেহমানের প্রতি বিদ্বেষ রাখে সে যেন আল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ রাখে এবং যে আল্লাহর সঙ্গে বিদ্বেষ রাখবে আল্লাহও তাকে ঘৃণা করবেন। চিন্তা করে দেখুন! তাকালুফের ধারাবাহিকতা কোথায় গিয়ে শেষ হয়।
📄 পেট কিভাবে পূর্ণ হবে?
عَنْ وَحْشِيِّ بْنِ حَرْبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ أَصْحَابَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ : أَنَا تَأْكُلُ وَلَا نَشْبَعُ قَالَ فَلَعَلَّكُمْ تَفْتَرِقُونَ؟ قَالُوا نَعَمْ قَالَ فَاجْتَمِعُوا عَلَى طَعَامِكُمْ وَاذْكُرُ وَاسْمَ اللَّهِ يُبَارِكُ لَكُمْ فِيهِ .
আজকাল অধিকাংশ লোকই বে-বরকতের অভিযোগ করে থাকে। প্রতিটি লোকই অনুভব করে যে, জিনিসের মধ্যে বরকত নাই। বিশেষ করে খানার মধ্যে বরকত একেবারে নাই বললেই চলে। মানুষ খুব খায়, পেটও ভরে। কিন্তু 'পরিতৃপ্তি' বলতে যা বুঝায় তা লাভ হয় না। খেতে খেতেই আবার ক্ষুধা লাগে।
এমনটি কেন হয়? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী হযরত ওয়াহশী (রাযিঃ)-এর বর্ণিত নিম্নোল্লিখিত হাদীসে উক্ত প্রশ্নের জবাব রয়েছে।
তিনি বলেন, নবী করীম (সাঃ)-এর সাহাবীগণ একদা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা খানা খাই, কিন্তু আমাদের তৃপ্তি মিটে না। নবী করীম (সাঃ) বললেন, "সম্ভবত তোমরা পৃথক পৃথক ভাবে খানা খাও? সাহাবীগণ আরয করলেন, হ্যাঁ, (আমরা পৃথক পৃথক ভাবে খাই)। অতঃপর নবী করীম (সাঃ) বললেন, তোমরা একত্রে খানা খাবে এবং আল্লাহর নাম নিয়ে খানা খাবে; মেহেরবান আল্লাহ এতে তোমাদের খানায় বরকত দান করবেন। -সূনানে আবূ দাউদ
একত্রে খানা খাওয়ায় শুধুমাত্র দু'জনের খানা তিনজনের এবং তিন জনের খানা চারজনের জন্যে যথেষ্ট হওয়ার বরকত লাভ হয় না বরং উক্ত হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, একত্রে খানা খাওয়ায় প্রত্যেক ব্যক্তির পরিতৃপ্তিও অর্জিত হয়। আর সেই সঙ্গে আল্লাহর নামে খানা শুরু করলেতো نُورٌ عَلَى نُور অর্থাৎ তাতে খুব বেশী বরকত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদও সত্য। অতএব খানার মধ্যে কষ্টে পড়া প্রকৃত পক্ষে নিজেদেরই কর্মফল বৈ আর কিছুই নয়।
📄 খাওয়ার পর
খাওয়ার পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিনটি সুন্নত বিশেষভাবে স্মরণ রাখা আবশ্যকঃ
১। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাওয়ার পর হাত মুখ ধৌত করাকে খানায় বরকত হওয়ার কারণ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। -সুনানে আবূ দাউদ, তিরযিমী
হযরত আনাস (রাযিঃ) এর বর্ণনা, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি চায় যে, আল্লাহ তায়ালা তার ঘরের বরকত বৃদ্ধি করে দেন, তার উচিত যখন খানা সামনে আসে তখন এবং দস্তর খানা যখন উঠিয়ে নেওয়া হয় (অর্থাৎ খানা শেষ হয়ে যায়) তখন হাত মুখ ধৌত করা।" -কাযবীনী
২। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ পান করার পর কুল্লি করতেন।
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَرِبَ لَبَنًا فَدَعَا بِمَاءٍ فَمَضْمَضَ وَقَالَ إِنَّ له دسما
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ পান করলেন অতঃপর পানি চাইলেন ও কুল্লি করলেন, আর বললেন এতে তৈলাক্ত পদার্থ থাকে।
৩। পানাহারের পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করতেন:
اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْ أَطْعَمَنَا وَسَقَانَا وَجَعَلَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ
৪। কারও বাড়ীতে দাওয়াত খেলে বাড়ীওয়ালার রিযিকের মধ্যে প্রশস্ততা ও বরকতের জন্য এই দুআ করতেনঃ
اللهم اطْعِمُ مَنْ أَطْعَمَنِي وَاسْقِ مَنْ سَقَانِي
৫। কখনও কখনও এ দুআও করতেনঃ
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَهُ وَسَوَّغَهُ وَجَعَلَ لَهُ مَخْرَجًا