📄 খানা বণ্টনের পদ্ধতি
الايمن فالايمن
"যে ব্যক্তি ডান দিকে রয়েছে তার হক বেশী।"
একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের এমন একটি মজলিসে তাশরিফ রাখেন যে মজলিসে সাহাবীগণের বসার তরতীব ছিল এরূপ : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাম দিকে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাযি)-এবং তাঁর ডান দিকে একজন গ্রাম্য ব্যক্তি ছিল এবং তার সঙ্গে হযরত ওমর ফারুক (রাযিঃ) বসে ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে দুধ পাঠালে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু পান করে স্বীয় অভ্যাসানুযায়ী মজলিসের সাহাবীদের পালাক্রমে দিতে ছিলেন। হযরত ওমর ফারুক (রাযিঃ) আরয করলেন, প্রথমে আবূ বকর (রাযিঃ) কে দিন। কিন্তু হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ডান দিকে বসা গ্রাম্য লোকটিকে দিলেন (যার সঙ্গে হযরত ওমর (রাযিঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এবং ইরশাদ করলেন
الايمن فالايمن
"যে ব্যক্তি ডান দিকে আছে, তার হক (অধিকার) বেশী।"
হযরত সাহল ইবনে সাআদ (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কিছু পানীয় নিয়ে এলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু পান করলেন। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডান দিকে একটা ছেলে এবং বাম দিকে এক বৃদ্ধ বসা ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি কি এই বৃদ্ধকে আগে পান করাবার অনুমতি দিবে? ছেলেটি জবাবে বলল, কখনও নয়। যে অংশটুকু আপনার থেকে আমি লাভ করতে যাচ্ছি তাতে কাউকেই প্রাধান্য দিব না। সুতরাং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেয়ালাটি ছেলেটির হাতের উপর রেখে দিলেন।" বুখারী, মুসলিম
এ বর্ণনা থেকেই সম্মিলিত ইসলামী পানাহারের এ পদ্ধতি নির্ধারিত হয় যে, খানা-পিনা অথবা অন্য কোন জিনিস বন্টন করতে হলে ডান দিক থেকে বন্টন শুরু করবে। আর সর্বসম্মত অভিমত হলো ডান দিকে ছোট বা বড় যেমন লোকই থাকুক না কেন সকল অবস্থাতেই এই একই হুকুম প্রযোজ্য হবে।
📄 অপরকে খাওয়ানো
خَيْرُكُمْ مَّنْ اَطْعَمَ الطَّعَامَ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে অপরকে খানা খাওয়ায়।" -মুসতাদরাকে হাকেম
এর বিপরীত যে ব্যক্তি গরীব মিসকিনদের খানার ব্যবস্থা করেনা আল্লাহ তা'আলার পবিত্র কালামে তাকে কিয়ামত দিবসের প্রতি মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করা হয়েছে।'
এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ এবং উৎসাহ ও প্রেরণামূলক হাদীস এত অধিক রয়েছে যে, যা একত্রিত করলে আলাদা এক গ্রন্থ তৈরী হয়ে যাবে। আখেরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কথা পর্যন্ত বলেছেন যে, প্রতিবেশী ক্ষুধার্থ হয়ে শুয়ে আছে এ কথা জেনেও যে ব্যক্তি উদরপূর্ণ করে খায়, তার এই খানা সম্পূর্ণ জায়েয ও হালাল উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত হলেও সে যেন জেনে রাখে যে, সে হারাম খাদ্য দ্বারা পেট পূর্ণ করল। (আল্লাহ এই অবস্থা থেকে আমাদের পানাহ দান করুন।)
খানার মধ্যে নিজের সঙ্গে অন্যকে শরীক করায় কতটুকু বরকত তা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদীস দ্বারা অনুধাবন করুন। ইরশাদ হচ্ছে:
مَنْ أَطْعَمَ أَخَاهُ حَتَّى يُشْبِعَهُ وَسَقَاهُ حَتَّى يَرْوِيَهُ بَعَّدَهُ اللَّهُ مِنَ النَّارِ لِسَبْعِ خَنَادِقٍ مَا بَيْنَ كُلِّ خَنْدَقَيْنِ مَسِيرَةً خَمْسٍ مِائَةِ عَامٍ
"যে ব্যক্তি তার কোন ভাইকে এই পরিমাণ খানা খাওয়াল যাতে তার পেট পূর্ণ হয়ে যায় এবং এইপরিমাণ পান করাল যাতে সে তৃপ্ত হয়ে গেল। (তার জন্যে এ সুসংবাদ যে) আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে এই পরিমাণ দূরে রাখবেন যতটুকু সাত খন্দকের দূরত্ব রয়েছে। প্রত্যেক খন্দকের মাঝে পাঁচশত বছরের দূরত্ব বিদ্যমান।"
আলোচিত হাদীসের প্রথম শব্দ তার ভাই-এর উপর দৃষ্টি ফেলুন। এখানে অভাবী ও ক্ষুধার্থকে ভাই বলা হয়েছে। চাই সে নিজের ভাই হোক বা অন্য গোত্রের কেউ হোক না কেন।
📄 মেহমানের পছন্দীয় খানা
ইসলামী সমাজে মেহমানদের আদর আপ্যায়ন উন্নত চারিত্রিক গুণাবলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ পরম মেহমান নাওয়ায ছিলেন। তাদের নিকট একজন মেহমান রহমতের ফিরশতার চেয়ে কম ছিল না। মেহমানের খাতিরে তাঁরা স্বীয় আরাম আয়েশ কুরবানী করে দিতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক সাহাবীতো মেহমানদারীতে বিরল দৃষ্টান্তই স্থাপন করে গেছেন। ঘটনা এই যে, একদিন সেই সাহাবীর ঘরে এতটুকু খানা ছিল যাতে কোন রকমে একজনের চলে। এমতাবস্থায় রাত্রি বেলায় এক মেহমান এল। স্বামী স্ত্রী পরামর্শ করে নিলেন। খানা দস্তর খানায় রেখে (বাহানা করে) স্ত্রী বাতি নিভিয়ে দিলেন। আর স্বামী (বর্তনে) খালি হাত বুলাতে লাগলেন এবং খানা খাওয়ার শব্দের মত চপচপ করতে লাগলেন। উদ্দেশ্য মেহমান যেন মনে করে যে, তিনিও মেহমানের সঙ্গে যথারীতি খানায় শরীক আছেন। এভাবে মেহমান তৃপ্তি সহকারে খানা খেয়ে নিল। সুবহানাল্লাহ! ভেবে দেখুন। তাদের মধ্যে আত্মত্যাগের কতই না জযবা ছিল।
মূলতঃ এগুলি সবই ছিল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও আমলী আদর্শের ফসল। হযরত জাবের (রাযিঃ) বর্ণনা করেন:
مَنْ لَذَّذَ أَخَاهُ بِمَا يَشْتَهِي كَتَبَ اللهُ لَهُ الفَ الفَ حَسَنَةٍ وَمُحِيَ عَنْهُ الفَ سَيِّئَةٍ
"যে ব্যক্তি তার ভাইকে স্বীয় প্রিয় বস্তু দ্বারা পরিতৃপ্ত করবে, আল্লাহ তাঁর আমল নামায় হাজার হাজার নেকী লিখে দিবেন। এবং তার হাজার হাজার গোনাহ মাফ করে দিবেন এবং তাঁর মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিবেন। আর তাকে তিনটি জান্নাত তথা জান্নাতুল ফেরদৌস, জান্নাতুল আদন এবং জান্নাতুল খুলদ থেকে খানা খাওয়াবেন।"
📄 তাকাল্লুফ বা লৌকিকতার নিষেধাজ্ঞা
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ نُهِينَا عَنِ التَّكَلَفِ
"হযরত ওমর ফারুক (রাযিঃ)-এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের লৌকিকতা দেখাতে নিষেধ করেছেন। -শামায়েলে তিরমিযী
হাদীস বিশারদগন তাকালুফ বা লৌকিকতার সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেনঃ "কষ্টের সঙ্গে এমন কোন বিষয় বা এমন কোন কাজ করা যার মধ্যে কোন কল্যাণ নিহিত নাই এবং যাতে কোন উপকারও হয় না।"
আল্লাহ ঐ সকল বুযুর্গদের উত্তম বদলা দান করুন যারা আরবের সর্বাপেক্ষা বড় ভাষাবিদ এবং আল্লাহর সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অলৌকিক বর্ণনাকৃত বাণীর ব্যাখ্যাও এমন সুন্দরভাবে দিয়েছেন যা তাঁর শানের যথোপযুক্ত ছিল। তাকাল্লুফের উল্লেখিত ব্যাখ্যার ব্যাপারে একটু ভেবে দেখুন। তা কতই না অর্থবহ হয়েছে।
প্রতিটি এমন বিষয় যাতে কোন উপকার নাই এবং প্রত্যেক এমন কাজ যার কোন অর্থই হয় না, তা যদি বিশেষ কষ্ট স্বীকার করে সম্পন্ন করা হয় তবে সেটা তাকাল্লুফের মধ্যে গণ্য হবে। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য এক হাদীসে ইরশাদ করেন:
مَنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
"কোন ব্যক্তির জন্য ইসলামের সৌন্দর্য্য হল অযথা বা অনর্থক বিষয় ত্যাগ করার মধ্যে।" মুয়াত্তা ইমাম মালেক (রহঃ)
আসুন! এখন এবার একটু আমাদের নিজের জীবনের কর্ম এবং বন্ধু বান্ধবদের সাথে মিলা মেশা ও নিজের সামাজিক যিন্দেগীর দিকে গভীর দৃষ্টিতে দেখি, এতে উপকারী অনুপকারী বিষয় কি পরিমাণ প্রবেশ করেছে। আমার তো ধারণা আমাদের জীবনের সব কিছুতেই আমরা লৌকিকতার খোলস পড়ে আছি। আর ভেতরে সবই অন্তঃসার শূন্য-ফাঁকা।