📄 আঙ্গুল চাটা
(۱) عَنِ ابْنِ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَلْعَقُ أَصَابِعَهُ ثَلْثاً
১। "কাব ইবনে মালেক (রাযিঃ) এর ছেলে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার আঙ্গুল চাটতেন।"
(۲) عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَكَلَ طَعَامًا لَعَقَ أَصَابِعَهُ الثَّلث
২। "হযরত আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খানা শেষ করে তিনটি আঙ্গুল চাটতেন।"
৩। "কা'ব ইবনে মালেক (রাযিঃ) এর ছেলে তার পিতা থেকে এভাবেও বর্ণনা করেন যে, "হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তিন আঙ্গুল দ্বারা খানা খেতেন এবং খানা খাওয়ার পর আঙ্গুলগুলি চাটিয়ে নিতেন।" (এই হাদীস তিনটি শামায়েলে তিরমিযী থেকে নেয়া হয়েছে।)
উপরোক্ত হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা দুটি বিষয় শিক্ষা লাভ করতে পারি :
(১) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন আঙ্গুল দ্বারা খানা খেতেন। সম্পূর্ণ হাতে তরকারী লাগাতেন না। কেননা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল।
(২) খাওয়ার পর কাপড় দ্বারা হাত পরিষ্কার করা এবং পানি দ্বারা হাত ধৌত করার পূর্বে তাঁর আঙ্গুল মোবারক চেটে নিতেন। আঙ্গুল চাটা মানুষের জন্মগত অভ্যাস। তাই প্রত্যেক শিশুই প্রকৃতিগতভাবে তাদের আঙ্গুল চেটে থাকে। ডাক্তারী মতে এ কাজটি পরিপাকের জন্য অত্যন্ত জরুরী। দুর্ভাগ্য যে, আধুনিক সভ্যতার দৃষ্টিতে আঙ্গুল চাটা এমনকি হাত দ্বারা খাওয়া পর্যন্ত নীচুতা অভদ্রতা মনে করা হয়। কিন্তু আমাদের এত কি দায় পড়ল যে, নিজেদের সুন্দর পদ্ধতি ও উত্তম আদর্শ ছেড়ে দিয়ে অন্যের অন্ধ অনুসরণ করতে হবে?
📄 পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় খানা
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَعِيبُ مَا كُولًا كَانَ إِذَا أَعْجَبَهُ أَكَلَهُ والا تركه
হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন যে, "নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খানার দোষ বের করতেন না। খানা পছন্দ হলে খেয়ে নিতেন অন্যথায় চুপ থাকতেন।"
প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট সব জিনিস একই রকম প্রিয় নয়। কোন এক ব্যক্তির যে প্রকার খানা পছন্দ অন্যের তা পছন্দ নয়, এটা একটা স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। তবে এ কথাটি স্মরণ রাখা উচিত যে, রিযিক আল্লাহর একটা নিয়ামত। এতে দোষ-ত্রুটি বের করা রিযিকের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের নামান্তর। সর্বোপরি এতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের বিরোধিতা ও আল্লাহপাকের নাশুকরিয়া করা হয়। তাই আদৌ আমাদের এরূপ করা উচিত নয়।
হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই কোন খানায় দোষ ধরেন নাই। মনে চাইলে খেতেন আর মনে না চাইলে রেখে দিতেন। -বুখারী, মুসলিম
এ সম্পর্কে এক বুযুর্গের ঘটনা পাঠ করুন, তাহলো এক বুযুর্গের ইন্তিকালের পর কেউ তাঁকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছেন? তিনি জবাবে বললেন, হিসাব নিকাশের সমস্যা সহজেই মিটে গেছে। প্রশ্নকারী (আবার) বললেন, কোন্ নেক কাজটি কাজে এসেছে? বুযুর্গ জবাবে বললেন, আমার স্ত্রী একদিন খিচুড়ী পাকাতে গিয়ে ভুলে অতিরিক্ত লবন দিয়ে ফেলে। আমি খিচুড়ীর লোকমা মুখে দিতেই মনে হল মুখে যেন বিষ পুরে দিয়েছি। তখন অনিচ্ছায় মুখ থেকে ফেলে দিতে ইচ্ছা করল। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হলো এটা তো আল্লাহর নিয়ামত। বিবির সামনে অসন্তোষের একটা শব্দও উচ্চারণ না করে উক্ত খিচুড়ি পেট ভরে খেয়ে নেই। এই আমলটি আল্লাহ তা'আলার পছন্দ হয়ে যায় এবং ক্ষমার নির্দেশ মিলে।
📄 দুই বা ততোধিক খানার মধ্যে বাছাই
দোজাহানের সর্দার আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেমন দুঃখ, কষ্ট, দারিদ্রতা ও অনাহারে জীবন যাপন করেছেন তা সকলেই অবগত। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ)-এর বর্ণনানুযায়ী তাঁর পবিত্র হায়াতে এমন সুযোগ কখনো আসে নাই যে, সপ্তাহের সাতদিন চুলা জ্বলেছে। এ কথা স্পষ্ট যে, এমতাবস্থায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দস্তর খানায় খুব কমই একাধিক খানা এসে থাকবে। আমরা নালায়েক উম্মত একমাত্র তাঁর উসিলাতেই আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নিয়ামত ভোগ করছি। অথচ শুকরিয়ার শব্দটিও মুখে উচ্চারণ করি না।
দস্তরখানায় একাধিক খাদ্য আসলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি পদ্ধতি অবলম্বন করতেন তা তাঁর জীবন সঙ্গিনী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ)-এর ভাষায় শুনন।
তিনি বলেন,
مَا خَيْرَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ شَيْئَيْنِ إِلَّا إِخْتَارَ أَيْسَرَهُمَا
নবী করীমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মুখস্থ খানার মধ্যে পছন্দ অপছন্দের ব্যাপারে এই নীতি ছিল যে, খানার মধ্যে যা অধিক সহজ ও সাধারণ হত সেটাই বেঁচে নিতেন।"-বুখারী ও মুসলিম শরীফ
এটা শুধু খানার ক্ষেত্রেই নয় বরং সকল ক্ষেত্রেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজ সরল পদ্ধতি পছন্দ করতেন, কঠিন বিষয় কখনও গ্রহণ করতেন না। একটা প্রশস্ত দস্তরখানার উপর অনেক খানা থাকা অবস্থায় আমাদের কি পন্থা অবলম্বন করা উচিত এ ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ হল:
كُلِّ مِمَّا يَلِيكَ
"তোমাদের নিকট থেকে খানা খাও।” লম্বা লম্বা হাত মারা এবং অন্যের সম্মুখ থেকে উঠিয়ে খাওয়া ইসলামী আদব ও শিষ্টাচারের খেলাপ। সর্বদাই নিজের সম্মুখস্থ বর্তন থেকে খাওয়া উচিত।
📄 খানা বণ্টনের পদ্ধতি
الايمن فالايمن
"যে ব্যক্তি ডান দিকে রয়েছে তার হক বেশী।"
একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের এমন একটি মজলিসে তাশরিফ রাখেন যে মজলিসে সাহাবীগণের বসার তরতীব ছিল এরূপ : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাম দিকে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাযি)-এবং তাঁর ডান দিকে একজন গ্রাম্য ব্যক্তি ছিল এবং তার সঙ্গে হযরত ওমর ফারুক (রাযিঃ) বসে ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে দুধ পাঠালে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু পান করে স্বীয় অভ্যাসানুযায়ী মজলিসের সাহাবীদের পালাক্রমে দিতে ছিলেন। হযরত ওমর ফারুক (রাযিঃ) আরয করলেন, প্রথমে আবূ বকর (রাযিঃ) কে দিন। কিন্তু হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ডান দিকে বসা গ্রাম্য লোকটিকে দিলেন (যার সঙ্গে হযরত ওমর (রাযিঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এবং ইরশাদ করলেন
الايمن فالايمن
"যে ব্যক্তি ডান দিকে আছে, তার হক (অধিকার) বেশী।"
হযরত সাহল ইবনে সাআদ (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কিছু পানীয় নিয়ে এলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু পান করলেন। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডান দিকে একটা ছেলে এবং বাম দিকে এক বৃদ্ধ বসা ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি কি এই বৃদ্ধকে আগে পান করাবার অনুমতি দিবে? ছেলেটি জবাবে বলল, কখনও নয়। যে অংশটুকু আপনার থেকে আমি লাভ করতে যাচ্ছি তাতে কাউকেই প্রাধান্য দিব না। সুতরাং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেয়ালাটি ছেলেটির হাতের উপর রেখে দিলেন।" বুখারী, মুসলিম
এ বর্ণনা থেকেই সম্মিলিত ইসলামী পানাহারের এ পদ্ধতি নির্ধারিত হয় যে, খানা-পিনা অথবা অন্য কোন জিনিস বন্টন করতে হলে ডান দিক থেকে বন্টন শুরু করবে। আর সর্বসম্মত অভিমত হলো ডান দিকে ছোট বা বড় যেমন লোকই থাকুক না কেন সকল অবস্থাতেই এই একই হুকুম প্রযোজ্য হবে।