📄 একত্রে খাওয়ার বরকত
পূর্ব অধ্যায়ে একত্রে খাওয়া সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ জেনেছেন। এখন সাহাবায়ে কেরামদের (রাযিঃ) আমল সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রমাণ এবং তাদের ইসলামী সভ্যতা ও আদর্শের বরকত সম্পর্কে চিন্তা করে দেখুন।
كَانَ الصَّحَابَةِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ يَقُولُونَ الْإِجْتِمَاعُ عَلَى الطَّعَامِ مِنْ مَكَارِمِ الْأَخْلَاقِ
"হযরত সাহাবায়ে কেরামগণ বলতেন, একত্রে খানা খাওয়া মহৎ চরিত্রের পরিচায়ক।"
হযরত ওয়াহশী ইবনে হরব (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা পানাহার করি কিন্তু তৃপ্ত হই না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, সম্ভবত তোমরা পৃথক পৃথক ভাবে খাও? তাঁরা বললেন, জি হ্যাঁ। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
اجتمعوا عَلَى طَعَامِكُمْ يُبَارِكُ لَكُمْ فِيهِ
"তোমরা একত্রে খানা খাও। এতে তোমাদের খানায় বরকত হবে।"
এ বরকতের বাহ্যিক প্রকাশ ও বাস্তব প্রমাণ হলো সর্বদা দুইজন পৃথক পৃথক ব্যক্তির খানা একত্রে তিন জনের এবং তিনজনের খানা চার জনের জন্য যথেষ্ট হয় এবং কেউই ক্ষুধার্থ থাকে না। আর এর বিপরীত এই লোকগুলি যদি উক্ত খানাই পৃথক পৃথক ভাবে খায় তবে কারো কারো হয় তো পেট ভরে যাবে বরং এমনও হতে পারে যে দু'চার লোকমা অবশিষ্টও থেকে যেতে পারে। যা কারো উপকারে আসবে না। আবার কেউ হয়তো বা ক্ষুধার্থও থেকে যেতে পারে। কারণ প্রত্যেকের খোরাক ও অবস্থা এক রকম নয়। এটা হলো খায়ের বরকতের বস্তুগত দিক। আর রূহানী ফায়দার তো কোন পরিসীমাই নাই। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
خَيْرُ الطَّعَامِ مَا كَثُرَتِ الْأَيْدِي
"উত্তম খানা হল যার মধ্যে অধিক হাত (বেশী লোক) শরীক হয়।"
📄 উপুড় হয়ে শুয়ে খেয়োনা
হযরত সালেম যুহরী (রাযিঃ) বর্ণনা করেন,
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَأْكُلُ الرَّجُلُ وَهُوَ مُنْبَطِحٌ عَلَى وَجْهِهِ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে নিষেধ করেছেন যে, কেউ যেন উপুড় হয়ে শুয়ে না খায়।"
বাহ্যতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্ত বাণীর সঙ্গে দ্বীনী আকিদা, ইসলামী নীতিমালা এবং ধর্মীয় বিষয়ের কোন সম্পর্ক নাই বরং এটা একটা খালেস চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক ব্যাপার এবং শারিরীক সুস্থতার খাতিরে উক্ত নির্দেশ মেনে চলা নেহায়েত জরুরী। উপুড় হয়ে শুয়ে খাওয়া শুধু স্বাস্থ্যগত ও ভদ্রতার পরিপন্থী নয় বরং এটা পশুর স্বভাবও বটে। তাছাড়া এটা হজমশক্তি ও পরিপাক প্রক্রিয়ার জন্য অশেষ ক্ষতিকর। আর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রূহানী ও শারীরিক তালীমের পরিপন্থী তো বটেই, কারন চিকিৎসা শাস্ত্রও তাঁর তালীমের অন্তর্ভুক্ত।
ইসলাম শুধু মাত্র কতিপয় আকীদা বিশ্বাসের নাম নয় এবং ইসলামী শিক্ষা শুধু কিছু মাযহাবী ইবাদত ও প্রকাশ্য রীতিনীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। বরং ইসলামী শিক্ষা পুরা মানবীয় যিন্দেগীর অন্তর্ভুক্ত। আখেরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিন্দেগীর প্রতিটি ক্ষেত্রেই পথ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা অসভ্য, বর্বর এবং মুর্খ জাতির মধ্যে প্রেরিত হন এবং নিজেও উম্মি (অক্ষর জ্ঞান শূন্য) ছিলেন। কিন্তু আল্লাহর তা'আলার ওহীর মাধ্যমে তিনি দুনিয়াবী ইলম ও কৌশল ইত্যাদি এ পরিমাণ প্রাপ্ত হয়েছিলেন যা বড় বড় পন্ডিত বুদ্ধিমান ও দার্শনিকগণ অর্জন করতে সক্ষম হয় নাই। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পদাংক অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন।
📄 রুটি দ্বারা আঙ্গুল পরিষ্কার করা
রিযিক আল্লাহ তা'আলার এক বড় নিয়ামত। আর নিয়ামত যত বড় হয় তার আদব-সম্মান করাও ততবেশী আবশ্যক হয়ে পড়ে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইরশাদ করেন:
اكرِمُوا الْخُبْرَ فَإِنَّ اللهَ تَعَالَى انْزَلَهُ مِنْ بَرَكَاتِ السَّمَاءِ وَلَا يُمْسِحُ يَدَهُ بِالْخُبْرُ
"রুটির আদব ও সম্মান কর। কেননা আল্লাহ তা'য়ালা এটাকে বরকতের আকাশ হতে পাঠিয়েছেন এবং তোমরা রুটি দ্বারা স্বীয় হাত পরিষ্কার করো না।" স্বয়ং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাওয়ার পর তিনবার আঙ্গুল চাটতেন।" -মুসতাদরাক
হযরত আনাস (রাযি) এ বিষয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য এক ইরশাদ বর্ণনা করেন:
لا يمسح يده بالمنديل حَتَّى يَلْعِقَ أَصَابِعَهُ فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي فِي أَي طعام البركة
" কোন ব্যক্তি তার আঙ্গুল চেটে পরিষ্কার না করা পর্যন্ত রুমাল দ্বারা স্বীয় হাত ছাফ করবে না। কারণ কোন্ খানার মধ্যে কি বরকত আছে তার জানা নাই।"
এ বিষয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
إِذَا أَكَلَ أَحَدَكُمْ طَعَامًا فَلَا يَمْسَحُ أَصَابِعَهُ حَتَّى يَلْعِقَهَا أَوْ يُلْعِقَهَا
"তোমাদের মধ্যে কেউ খানা খেলে ঐ সময় পর্যন্ত তার আঙ্গুল মুছবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজে তা চেটে না নেয় অথবা কারো দ্বারা চাটায়।" - বুখারী, মুসলিম
উক্ত হাদীসসমূহে যে বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে তা হল-খানার সম্মান, বিশেষ করে রুটির সম্মান করা। মূলতঃ রিযিক আল্লাহ তা'য়ালার নিয়ামতসমূহের একটা বড় নিয়ামত। তাই এর ইজ্জত-সম্মান করা সর্ব বিবেচনায়ই ওয়াজিব। রুটি দ্বারা হাত-মুছা (পরিষ্কার করা) রুটিকে অবজ্ঞা করার শামিল। কারণ রুটি তো খাওয়ার জন্য, হাত পরিষ্কার করার জন্য নয়।
📄 আঙ্গুল চাটা
(۱) عَنِ ابْنِ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ عَنْ أَبِيهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَلْعَقُ أَصَابِعَهُ ثَلْثاً
১। "কাব ইবনে মালেক (রাযিঃ) এর ছেলে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার আঙ্গুল চাটতেন।"
(۲) عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَكَلَ طَعَامًا لَعَقَ أَصَابِعَهُ الثَّلث
২। "হযরত আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খানা শেষ করে তিনটি আঙ্গুল চাটতেন।"
৩। "কা'ব ইবনে মালেক (রাযিঃ) এর ছেলে তার পিতা থেকে এভাবেও বর্ণনা করেন যে, "হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তিন আঙ্গুল দ্বারা খানা খেতেন এবং খানা খাওয়ার পর আঙ্গুলগুলি চাটিয়ে নিতেন।" (এই হাদীস তিনটি শামায়েলে তিরমিযী থেকে নেয়া হয়েছে।)
উপরোক্ত হাদীস সমূহের মাধ্যমে আমরা দুটি বিষয় শিক্ষা লাভ করতে পারি :
(১) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন আঙ্গুল দ্বারা খানা খেতেন। সম্পূর্ণ হাতে তরকারী লাগাতেন না। কেননা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল।
(২) খাওয়ার পর কাপড় দ্বারা হাত পরিষ্কার করা এবং পানি দ্বারা হাত ধৌত করার পূর্বে তাঁর আঙ্গুল মোবারক চেটে নিতেন। আঙ্গুল চাটা মানুষের জন্মগত অভ্যাস। তাই প্রত্যেক শিশুই প্রকৃতিগতভাবে তাদের আঙ্গুল চেটে থাকে। ডাক্তারী মতে এ কাজটি পরিপাকের জন্য অত্যন্ত জরুরী। দুর্ভাগ্য যে, আধুনিক সভ্যতার দৃষ্টিতে আঙ্গুল চাটা এমনকি হাত দ্বারা খাওয়া পর্যন্ত নীচুতা অভদ্রতা মনে করা হয়। কিন্তু আমাদের এত কি দায় পড়ল যে, নিজেদের সুন্দর পদ্ধতি ও উত্তম আদর্শ ছেড়ে দিয়ে অন্যের অন্ধ অনুসরণ করতে হবে?