📄 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মিলিত খানা
সুপ্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আনাস (রাযি) বর্ণনা করেন:
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَأْكُلُ وَحْدَهُ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী খানা খেতেন না।"
এটা শুধু মাত্র একজন সাহাবীর (রাযি) বর্ণনা নয়, বহুসংখ্যক সাহাবাদের বর্ণনা এবং তাদের নিজেদের সম্মিলিত খাওয়ার আমলই এ বিষয়ে স্বাক্ষ্য বহন করে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথকভাবে খানা খেতেন না বরং মজলিসে উপস্থিত ছোট বড় সকল পর্যায়ের লোকদের নিয়ে খানা খেতেন।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মাত্র মজলিসের সকল ব্যক্তিদের খানায় শরীক করতেন না। বরং আমীর, গরীব, ছোট বড় ইত্যাদির মধ্যে কোন পার্থক্য না করেই সাথীদেরকে নিজ বর্তনের খানায় শারীক করতেন। উপস্থিত সকলকেই একই দস্তরখানায় বসাতেন এবং একই বর্তনে, একই স্থানে বসিয়ে খাওয়াতেন।
হযরত জাবের (রাযি) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, "একজনের খানা দু'জনের এবং দু'জনের খানা চারজনের ও চারজনের খানা আটজনের জন্য যথেষ্ট হয়।" -মুসলিম
আধুনিক সভ্যতা মানুষকে অনেক কিছুই দিয়েছে। নবনব আবিষ্কার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা দূরকে করেছে নিকট; প্রচার মাধ্যমের যন্ত্রগুলি সমগ্র দুনিয়াকে করেছে একাকার। কিন্তু মানুষকে ভদ্রতা এবং মনুষ্যত্ব থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছে। মানুষের পরস্পরে একের থেকে অপরকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। একত্রে দস্তরখানার উপর খানা খাওয়ার মানসকিতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রত্যেকে ব্যক্তিগত প্লেট ও গ্লাস ব্যবহার করছে। ফলে একত্রে খাওয়ায় যে ভালবাসা হৃদ্যতা ও মহব্বত সৃষ্টি হত তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আসুন! আমরা আবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতকে জীবন্ত করি।
📄 একত্রে খাওয়ার আদব
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا وضعَتِ الْمَائِدَة فَلا يَقُومُ رَجُلٌ حَتَّى تَرْفَعَ المَائِدَةُ وَلَا يُرْفَعُ يَدَهُ وَإِنْ شَبعَ حَتَّى يَفْرَغَ الْقَوْمُ وَلْيُعْذِرُ فَإِنَّ ذَلِكَ يَخْجِلُ جَلِيسَهُ فَيَقْبِضُ يَدَهُ وَعَسَى أَنْ يَكُونَ لَهُ فِي الطَّعَامِ حَاجَةٌ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দস্তরখানা বিছাবার পর অর্থাৎ কোন মজলিসে একত্রে খাওয়া শুরু করার সময় ততক্ষণ পর্যন্ত উঠবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দস্তরখানা উঠিয়ে নেওয়া না হয় অর্থাৎ সকলের খাওয়া শেষ না হয় এবং কোন ব্যক্তি খেয়ে তৃপ্ত হয়ে গেলেও সকল লোক ফারেগ না হওয়া পর্যন্ত খানা থেকে হাত উঠাবে না। তবে একান্ত অপারগ হলে অপরাগতা পেশ করবে। নতুবা বৈঠকের সাথীদের লজ্জা করবে এবং তারা খানা বন্ধ করে দিবে। অথচ হতে পারে তাদের খাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।"-ইবনে মাজাহ
স্বয়ং বিশ্ব জাহানের সর্দার হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে হযরত জাফর ইবনে মুহাম্মদ (রাযিঃ) বর্ণনা করেন:
إِذَا أَكَلَ مَعَ قَوْمٍ كَانَ آخِرَهُمْ أَكَلا
"নবী করীম (সাঃ) যখন অন্যান্যদের সঙ্গে খানা খেতেন তখন সকলের শেষে খানা শেষ করতেন।"- মিশকাত শরীফ
উক্ত হাদীস দ্বারা আমরা নিম্নোক্ত মুলনীতিগুলির শিক্ষা পাই।
১। দস্তরখানায় খাওয়ার পর খানা রেখে দস্তরখানা থেকে উঠবে না।
২। সকলে খানা থেকে ফারেগ না হওয়া পর্যন্ত খানা খাওয়া বন্ধ করবে না। কারণ, হতে পারে অন্যের পেটে এখনও ক্ষুধা রয়েছে। তাই তোমরা খাওয়া বন্ধ করে দিলে সেও খানা থেকে হাত তুলে নিয়ে ক্ষুধার্থ থেকে যাবে।
৩। যদি তোমার কোন অসুবিধা থাকে তাহলে অপারগতা পেশ করবে।
📄 একত্রে খাওয়ার বরকত
পূর্ব অধ্যায়ে একত্রে খাওয়া সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ জেনেছেন। এখন সাহাবায়ে কেরামদের (রাযিঃ) আমল সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রমাণ এবং তাদের ইসলামী সভ্যতা ও আদর্শের বরকত সম্পর্কে চিন্তা করে দেখুন।
كَانَ الصَّحَابَةِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ يَقُولُونَ الْإِجْتِمَاعُ عَلَى الطَّعَامِ مِنْ مَكَارِمِ الْأَخْلَاقِ
"হযরত সাহাবায়ে কেরামগণ বলতেন, একত্রে খানা খাওয়া মহৎ চরিত্রের পরিচায়ক।"
হযরত ওয়াহশী ইবনে হরব (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা পানাহার করি কিন্তু তৃপ্ত হই না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, সম্ভবত তোমরা পৃথক পৃথক ভাবে খাও? তাঁরা বললেন, জি হ্যাঁ। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
اجتمعوا عَلَى طَعَامِكُمْ يُبَارِكُ لَكُمْ فِيهِ
"তোমরা একত্রে খানা খাও। এতে তোমাদের খানায় বরকত হবে।"
এ বরকতের বাহ্যিক প্রকাশ ও বাস্তব প্রমাণ হলো সর্বদা দুইজন পৃথক পৃথক ব্যক্তির খানা একত্রে তিন জনের এবং তিনজনের খানা চার জনের জন্য যথেষ্ট হয় এবং কেউই ক্ষুধার্থ থাকে না। আর এর বিপরীত এই লোকগুলি যদি উক্ত খানাই পৃথক পৃথক ভাবে খায় তবে কারো কারো হয় তো পেট ভরে যাবে বরং এমনও হতে পারে যে দু'চার লোকমা অবশিষ্টও থেকে যেতে পারে। যা কারো উপকারে আসবে না। আবার কেউ হয়তো বা ক্ষুধার্থও থেকে যেতে পারে। কারণ প্রত্যেকের খোরাক ও অবস্থা এক রকম নয়। এটা হলো খায়ের বরকতের বস্তুগত দিক। আর রূহানী ফায়দার তো কোন পরিসীমাই নাই। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
خَيْرُ الطَّعَامِ مَا كَثُرَتِ الْأَيْدِي
"উত্তম খানা হল যার মধ্যে অধিক হাত (বেশী লোক) শরীক হয়।"
📄 উপুড় হয়ে শুয়ে খেয়োনা
হযরত সালেম যুহরী (রাযিঃ) বর্ণনা করেন,
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَأْكُلُ الرَّجُلُ وَهُوَ مُنْبَطِحٌ عَلَى وَجْهِهِ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে নিষেধ করেছেন যে, কেউ যেন উপুড় হয়ে শুয়ে না খায়।"
বাহ্যতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্ত বাণীর সঙ্গে দ্বীনী আকিদা, ইসলামী নীতিমালা এবং ধর্মীয় বিষয়ের কোন সম্পর্ক নাই বরং এটা একটা খালেস চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক ব্যাপার এবং শারিরীক সুস্থতার খাতিরে উক্ত নির্দেশ মেনে চলা নেহায়েত জরুরী। উপুড় হয়ে শুয়ে খাওয়া শুধু স্বাস্থ্যগত ও ভদ্রতার পরিপন্থী নয় বরং এটা পশুর স্বভাবও বটে। তাছাড়া এটা হজমশক্তি ও পরিপাক প্রক্রিয়ার জন্য অশেষ ক্ষতিকর। আর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রূহানী ও শারীরিক তালীমের পরিপন্থী তো বটেই, কারন চিকিৎসা শাস্ত্রও তাঁর তালীমের অন্তর্ভুক্ত।
ইসলাম শুধু মাত্র কতিপয় আকীদা বিশ্বাসের নাম নয় এবং ইসলামী শিক্ষা শুধু কিছু মাযহাবী ইবাদত ও প্রকাশ্য রীতিনীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। বরং ইসলামী শিক্ষা পুরা মানবীয় যিন্দেগীর অন্তর্ভুক্ত। আখেরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিন্দেগীর প্রতিটি ক্ষেত্রেই পথ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা অসভ্য, বর্বর এবং মুর্খ জাতির মধ্যে প্রেরিত হন এবং নিজেও উম্মি (অক্ষর জ্ঞান শূন্য) ছিলেন। কিন্তু আল্লাহর তা'আলার ওহীর মাধ্যমে তিনি দুনিয়াবী ইলম ও কৌশল ইত্যাদি এ পরিমাণ প্রাপ্ত হয়েছিলেন যা বড় বড় পন্ডিত বুদ্ধিমান ও দার্শনিকগণ অর্জন করতে সক্ষম হয় নাই। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পদাংক অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন।