📄 পতিত খানা
পড়ে যাওয়া খানা সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীঃ
مَنْ أَكَلَ مَا سَقَطَ مِنَ الْمَائِدَةِ عَاشَ فِي سَعَةٍ وَ عُوفِي فِي وَلَدِهِ
"যে ব্যক্তি দস্তরখানা থেকে পড়ে যাওয়া খানা উঠিয়ে খেয়ে নিল তার দস্তরখানা প্রশস্থ হয়ে গেল অর্থাৎ তার রিযিকের মধ্যে বরকত এসে গেল এবং তার সন্তান-সন্ততি সুস্থতা ও নিরাপত্তা পেয়ে গেল।"
এ সম্পর্কে অন্য একটি হাদীস হলো:
اَمَنَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْبَرَضِ وَالْجُذَامِ وَصَرَفَ عَنْ وَلَدِهِ الْحُمُقِ
"সে দারিদ্র এবং মুখাপেক্ষিতা হতে নিরাপদ হয়ে গেল। ধবল ও কুষ্ঠরোগ থেকে রক্ষা পেল এবং তার সন্তানাদি থেকে নির্বুদ্ধিতা ও বোকামি দূর হয়ে গেল।"
এ সম্পর্কিত তৃতীয় হাদীসের বর্ণনা:
أعطى سَعَةً مِّنَ الرِّزْقِ
"তার রিযিকের মধ্যে প্রশস্ততা (স্বচ্ছলতা ও বরকত) দান করা হয়।"
হযরত জাবের (রাযি) থেকে অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে:
إِذَا وَقَعَتْ لُقْمَةٌ أَحَدِكُمْ فَلْيَأْخُذَهَا فَلْيُمِطْ مَا كَانَ بِهَا مِنْ أَذًى وَلْيَأْكُلُهَا وَلَا يَدَعُهَا لِلشَّيْطَانِ -
"তোমাদের কারো কোন লোকমা পড়ে গেলে তা তুলে নাও (অতঃপর) এর উপর যে সকল ময়লা লেগে গেছে তা পরিষ্কার করে খেয়ে ফেল এবং শয়তানের জন্য এটা ছেড়ে দিও না।" মুসলিম শরীফ
আমাদের নিজেদের মনগড়া অথবা পাশ্চাত্য থেকে ধার করা সভ্যতানুযায়ী পতিত খাদ্যদ্রব্য উঠিয়ে খাওয়া আদব (ATICATE বা ভদ্রতা) এর পরিপন্থী মনে করা হয়। আমাদের বুঝেই আসে না যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোল্লেখিত ইরশাদ বর্তমান থাকা সত্বেও আমাদের স্বেচ্ছাচারিতার কি অধিকার থাকতে পারে।
পতিত খানার বরকত সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত ফরমান একবার আমাদের চিন্তা করে দেখা উচিত। পতিত খানা উঠিয়ে খাওয়ার বরকত ও উপকারিতা-
১। খানা এবং রিজিকের মধ্যে বরকত ও প্রশস্ততা আনে।
২। সন্তানাদির সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
৩। অভাব-অনটন ও ভিক্ষাবৃত্তি ও অনাহার থেকে নিরাপদ রাখে।
৪। কুষ্ঠ রোগের মত ব্যাধি থেকে রক্ষা করে।
৫। সন্তান সন্ততি নির্বুদ্ধিতা ও বোকামী হতে রেহাই পায়।
৬। স্বীয় খানা শয়তানের খাদ্য হয় না।
আমাদের উচিত পাশ্চাত্য সভ্যতার ছোবলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতকে জলাঞ্জলী না দিয়ে পতিত খানা ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করতঃ ভক্তি সহকারে বিনা দ্বিধায় খেয়ে নেওয়া। এতেই মঙ্গল ও বরকত রয়েছে।
📄 টেক লাগিয়ে খেয়ো না
كَانَ يَقُولُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا أَكُلُ مُتَّكِاً
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি তাকিয়া বা টেক লাগিয়ে খাই না।”
এ বিষয়ে হযরত আলী ইবনে আকমর (রযিঃ)-এর বর্ণিত অন্য এক হাদীস হলঃ
أَمَّا أَنَا فَلَا اك وحنا
"যথা সম্ভব আমি টেক লাগিয়ে খাই না।" -বুখারী, আবূ দাউদ, নাসায়ী
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম টেক দিয়ে খাওয়া কেন পছন্দ করতেন না? এ প্রশ্নের জবাব হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্রা সহধর্মিনী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ)-এর মোবারক জুবানেই শুনুন। তিনি বলেন। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম (আমার জীবন আপনার উপর কুরবান হোক) "আপনি তাকিয়া লাগিয়ে আহার করুন" একথা শুনে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথা মোবারক জমিনের দিকে ঝুকিয়ে বললেন,
أَنما أنا عبد يجلس كما يجلس العبد واكل كما ياكل العبد
"আমি আল্লাহর একজন গোলাম মাত্র। তাই এই ভাবে আমার বসা শোভা পায় যেভাবে একজন গোলাম (মনিবের সামনে) বসে। আর এমন ভাবেই আমার খানা খাওয়া উচিত যেমনভাবে একজন গোলামের তার মনিবের সামনে খাওয়া শোভা পায়। -আহকামুন নবুওয়াত
চিন্তার বিষয়, এ বিনয় ও নম্রতা এবং বন্দেগী ও দাসত্বের প্রকাশ এমন ব্যক্তি থেকে প্রকাশ পেয়েছে যিনি বিশ্ব জাহানের সর্দার, সৃষ্টির মূল, যার কারণেই বিশ্ব জাহান অস্তিত্ব লাভ করেছে, যার জন্য চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের অবস্থা হলো আমরা সর্বক্ষণই উদ্ধত ও বাবুয়ানায় লিপ্ত থাকি। অসুস্থতা অথবা কোন অপারগতার কারণে কখনো টেক লাগিয়ে খাওয়া দাওয়া করলে তো কোন কথা নাই। তবে একজন সুস্থ সবল ও সামর্থবান লোকের জন্য কখনোই এভাবে খাওয়ার অনুমতি নাই। আল্লাহর কোন বান্দা তার দেওয়া নেয়ামত খাবে আর বাঁকা হয়ে বাবুয়ানা কায়দায় বসবে এটা তার দাসত্বের পরিপন্থী।
📄 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মিলিত খানা
সুপ্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আনাস (রাযি) বর্ণনা করেন:
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَأْكُلُ وَحْدَهُ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী খানা খেতেন না।"
এটা শুধু মাত্র একজন সাহাবীর (রাযি) বর্ণনা নয়, বহুসংখ্যক সাহাবাদের বর্ণনা এবং তাদের নিজেদের সম্মিলিত খাওয়ার আমলই এ বিষয়ে স্বাক্ষ্য বহন করে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথকভাবে খানা খেতেন না বরং মজলিসে উপস্থিত ছোট বড় সকল পর্যায়ের লোকদের নিয়ে খানা খেতেন।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মাত্র মজলিসের সকল ব্যক্তিদের খানায় শরীক করতেন না। বরং আমীর, গরীব, ছোট বড় ইত্যাদির মধ্যে কোন পার্থক্য না করেই সাথীদেরকে নিজ বর্তনের খানায় শারীক করতেন। উপস্থিত সকলকেই একই দস্তরখানায় বসাতেন এবং একই বর্তনে, একই স্থানে বসিয়ে খাওয়াতেন।
হযরত জাবের (রাযি) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, "একজনের খানা দু'জনের এবং দু'জনের খানা চারজনের ও চারজনের খানা আটজনের জন্য যথেষ্ট হয়।" -মুসলিম
আধুনিক সভ্যতা মানুষকে অনেক কিছুই দিয়েছে। নবনব আবিষ্কার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা দূরকে করেছে নিকট; প্রচার মাধ্যমের যন্ত্রগুলি সমগ্র দুনিয়াকে করেছে একাকার। কিন্তু মানুষকে ভদ্রতা এবং মনুষ্যত্ব থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছে। মানুষের পরস্পরে একের থেকে অপরকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। একত্রে দস্তরখানার উপর খানা খাওয়ার মানসকিতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রত্যেকে ব্যক্তিগত প্লেট ও গ্লাস ব্যবহার করছে। ফলে একত্রে খাওয়ায় যে ভালবাসা হৃদ্যতা ও মহব্বত সৃষ্টি হত তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আসুন! আমরা আবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতকে জীবন্ত করি।
📄 একত্রে খাওয়ার আদব
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا وضعَتِ الْمَائِدَة فَلا يَقُومُ رَجُلٌ حَتَّى تَرْفَعَ المَائِدَةُ وَلَا يُرْفَعُ يَدَهُ وَإِنْ شَبعَ حَتَّى يَفْرَغَ الْقَوْمُ وَلْيُعْذِرُ فَإِنَّ ذَلِكَ يَخْجِلُ جَلِيسَهُ فَيَقْبِضُ يَدَهُ وَعَسَى أَنْ يَكُونَ لَهُ فِي الطَّعَامِ حَاجَةٌ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দস্তরখানা বিছাবার পর অর্থাৎ কোন মজলিসে একত্রে খাওয়া শুরু করার সময় ততক্ষণ পর্যন্ত উঠবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দস্তরখানা উঠিয়ে নেওয়া না হয় অর্থাৎ সকলের খাওয়া শেষ না হয় এবং কোন ব্যক্তি খেয়ে তৃপ্ত হয়ে গেলেও সকল লোক ফারেগ না হওয়া পর্যন্ত খানা থেকে হাত উঠাবে না। তবে একান্ত অপারগ হলে অপরাগতা পেশ করবে। নতুবা বৈঠকের সাথীদের লজ্জা করবে এবং তারা খানা বন্ধ করে দিবে। অথচ হতে পারে তাদের খাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।"-ইবনে মাজাহ
স্বয়ং বিশ্ব জাহানের সর্দার হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে হযরত জাফর ইবনে মুহাম্মদ (রাযিঃ) বর্ণনা করেন:
إِذَا أَكَلَ مَعَ قَوْمٍ كَانَ آخِرَهُمْ أَكَلا
"নবী করীম (সাঃ) যখন অন্যান্যদের সঙ্গে খানা খেতেন তখন সকলের শেষে খানা শেষ করতেন।"- মিশকাত শরীফ
উক্ত হাদীস দ্বারা আমরা নিম্নোক্ত মুলনীতিগুলির শিক্ষা পাই।
১। দস্তরখানায় খাওয়ার পর খানা রেখে দস্তরখানা থেকে উঠবে না।
২। সকলে খানা থেকে ফারেগ না হওয়া পর্যন্ত খানা খাওয়া বন্ধ করবে না। কারণ, হতে পারে অন্যের পেটে এখনও ক্ষুধা রয়েছে। তাই তোমরা খাওয়া বন্ধ করে দিলে সেও খানা থেকে হাত তুলে নিয়ে ক্ষুধার্থ থেকে যাবে।
৩। যদি তোমার কোন অসুবিধা থাকে তাহলে অপারগতা পেশ করবে।