📄 খানার মধ্যে ফুঁক দিও না
لاَ يُنْفَخُ فِي الطَّعَامِ الْحَارِفَهُوَ مَنْهِيٌّ عَنْهُ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, গরম খানার মধ্যে ফুঁক দিও না। কেননা এটা করতে নিষধ করা হয়েছে।" -মুসনাদে ইমাম আহমদ, ইবনে মাজাহ
আল্লাহ! আল্লাহ! খানার মধ্যে ফুঁক না দেওয়ার উপদেশ কতই না হেকমতপূর্ণ শিক্ষা। কারণ দাঁতের মধ্যে যে সকল অসুখ হয়ে থাকে তার কোন কোনটি সংক্রামক ব্যাধি অর্থাৎ একজন থেকে অন্যের দেহে ছড়ায়) কারো কারো মুখ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হয়। এমতাবস্থায় প্রত্যেকেই বুঝতে পারে যে, খানার মধ্যে ফুঁক দেওয়া অন্যের জন্য কতটুকু কষ্টের কারণ হয় এবং স্বয়ং ভক্ষণকারীর জন্যই বা কতটুকু ক্ষতিকর। এটা হল গরম খাদ্যে ফুঁক দেওয়ার কথা। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো বেশী গরম খানা পছন্দই করতেন না। তিনি বলতেন, এর মধ্যে বরকত হবে না। এটা সতঃসিদ্ধ কথা যে, আপনি পরীক্ষামূলকভাবে রুটির তাওয়া থেকে গরম গরম রুটি তুলে তুলে খাওয়া শুরু করুন এবং লক্ষ্য করে দেখুন সাধারণ খানার চেয়ে অধিক খেতে পারেন কি না এবং খাওয়ার সময় রুটির পরিমাণ সম্পর্কিত বোধুটুকুও থাকে কি না।" -মুসতাদরাকে, হাকিম, মুজামে তাবরানী
গরম খানা ভক্ষণে গালের ছাল উঠে যায় এবং পরিপাক তন্ত্রের সুস্থতা (অর্থাৎ স্বাভাবিক কার্যক্ষমতার উপর প্রভাব পড়ে। গরম গরম খানার মধ্যে ঠান্ডা পানি পান করাতো (আর এর প্রচলন এখন খুবই ব্যাপক) দাঁতের সঙ্গে বড় জুলুম করার শামিল। বিশেষ করে গরমকালে বরফের ঠান্ডা পানি পানকারীর জন্য গরম খানা খাওয়া খুবই ক্ষতিকর। সুতরাং ধীরস্থির ভাবে এতমিনানের সঙ্গে খানা খাওয়া উচিত, যাতে ফুঁক দিয়ে ঠান্ডা করার প্রয়োজন না হয় বা দাঁত ও পরিপাকের জন্য ক্ষতিকর না হয়।
📄 পড়ে যাওয়া লোকমা
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ إِذَا وَقَعَتْ لُقْمَةَ أَحَدِكُمْ فَلْيَأْخُذُهَا فَلْيَحِطْ مَا كَانَ بِهَا مِنْ أَذًى وَلَيَأْكُلُهَا وَلَا يَدَعُهَا لِلشَّيْطَانِ -
"হযরত জাবের (রাযি) থেকে বর্ণিত : তোমাদের মধ্যে কারো লোকমাহ পড়ে গেলে তা তুলে নাও এবং মাটি ইত্যাদি পরিষ্কার করে খেয়ে ফেল এবং শয়তানের জন্য এটা রেখে দিও না।" -মুসলিম শরীফ
এ বিষয়ে অন্য এক হাদীসের বর্ণিত বাক্য হল; সর্বাবস্থায়ই শয়তান তোমাদের নিকট এসে থাকে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে কারো কোন লোকমা পড়ে গেলে তা থেকে মাটি ইত্যাদি পরিষ্কার করে খেয়ে নাও; শয়তানের জন্য এটা রেখে দিওনা।"
আমাদের এযুগে পাকী নাপাকীর অনুভূতিই তো প্রায় উঠে গেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা এবং ইস্তিঞ্জার এহতেমাম না করা একটা ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে হাত থেকে কোন খাদ্য দ্রব্য পড়ে গেলে তা উঠিয়ে খাওয়া খারাপ মনে করা হচ্ছে। মনে করা হয় এটা নাপাক হয়ে গেছে, চাই সেটা শুকনা কোন খাবার হোক না কেন। আসল কথা হল রিযিকের গুরুত্ব এবং নেয়ামতের কদর সম্পর্কিত অনুভূতি অন্তর থেকে মুছে গেছে তাই বরকতও উঠে গেছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "হাতের লোকমা পড়ে গেলে তা পরিষ্কার করে খেয়ে নাও। তুমি না খেলে এটা শয়তানের লোকমায় পরিণত হবে এবং তোমাদের খাদ্য শয়তানের কাজে আসবে।" নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই তালীমের প্রতিক্রিয়া এমন হয়েছিল যে, আমাদের বুযুর্গগণ খাদ্যের কণা এবং লবণের দানা পর্যন্ত যত্নের সঙ্গে ভক্তি সহকারে চেটে খেয়ে নিতেন।
📄 পতিত খানা
পড়ে যাওয়া খানা সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীঃ
مَنْ أَكَلَ مَا سَقَطَ مِنَ الْمَائِدَةِ عَاشَ فِي سَعَةٍ وَ عُوفِي فِي وَلَدِهِ
"যে ব্যক্তি দস্তরখানা থেকে পড়ে যাওয়া খানা উঠিয়ে খেয়ে নিল তার দস্তরখানা প্রশস্থ হয়ে গেল অর্থাৎ তার রিযিকের মধ্যে বরকত এসে গেল এবং তার সন্তান-সন্ততি সুস্থতা ও নিরাপত্তা পেয়ে গেল।"
এ সম্পর্কে অন্য একটি হাদীস হলো:
اَمَنَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْبَرَضِ وَالْجُذَامِ وَصَرَفَ عَنْ وَلَدِهِ الْحُمُقِ
"সে দারিদ্র এবং মুখাপেক্ষিতা হতে নিরাপদ হয়ে গেল। ধবল ও কুষ্ঠরোগ থেকে রক্ষা পেল এবং তার সন্তানাদি থেকে নির্বুদ্ধিতা ও বোকামি দূর হয়ে গেল।"
এ সম্পর্কিত তৃতীয় হাদীসের বর্ণনা:
أعطى سَعَةً مِّنَ الرِّزْقِ
"তার রিযিকের মধ্যে প্রশস্ততা (স্বচ্ছলতা ও বরকত) দান করা হয়।"
হযরত জাবের (রাযি) থেকে অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে:
إِذَا وَقَعَتْ لُقْمَةٌ أَحَدِكُمْ فَلْيَأْخُذَهَا فَلْيُمِطْ مَا كَانَ بِهَا مِنْ أَذًى وَلْيَأْكُلُهَا وَلَا يَدَعُهَا لِلشَّيْطَانِ -
"তোমাদের কারো কোন লোকমা পড়ে গেলে তা তুলে নাও (অতঃপর) এর উপর যে সকল ময়লা লেগে গেছে তা পরিষ্কার করে খেয়ে ফেল এবং শয়তানের জন্য এটা ছেড়ে দিও না।" মুসলিম শরীফ
আমাদের নিজেদের মনগড়া অথবা পাশ্চাত্য থেকে ধার করা সভ্যতানুযায়ী পতিত খাদ্যদ্রব্য উঠিয়ে খাওয়া আদব (ATICATE বা ভদ্রতা) এর পরিপন্থী মনে করা হয়। আমাদের বুঝেই আসে না যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোল্লেখিত ইরশাদ বর্তমান থাকা সত্বেও আমাদের স্বেচ্ছাচারিতার কি অধিকার থাকতে পারে।
পতিত খানার বরকত সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত ফরমান একবার আমাদের চিন্তা করে দেখা উচিত। পতিত খানা উঠিয়ে খাওয়ার বরকত ও উপকারিতা-
১। খানা এবং রিজিকের মধ্যে বরকত ও প্রশস্ততা আনে।
২। সন্তানাদির সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
৩। অভাব-অনটন ও ভিক্ষাবৃত্তি ও অনাহার থেকে নিরাপদ রাখে।
৪। কুষ্ঠ রোগের মত ব্যাধি থেকে রক্ষা করে।
৫। সন্তান সন্ততি নির্বুদ্ধিতা ও বোকামী হতে রেহাই পায়।
৬। স্বীয় খানা শয়তানের খাদ্য হয় না।
আমাদের উচিত পাশ্চাত্য সভ্যতার ছোবলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতকে জলাঞ্জলী না দিয়ে পতিত খানা ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করতঃ ভক্তি সহকারে বিনা দ্বিধায় খেয়ে নেওয়া। এতেই মঙ্গল ও বরকত রয়েছে।
📄 টেক লাগিয়ে খেয়ো না
كَانَ يَقُولُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا أَكُلُ مُتَّكِاً
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি তাকিয়া বা টেক লাগিয়ে খাই না।”
এ বিষয়ে হযরত আলী ইবনে আকমর (রযিঃ)-এর বর্ণিত অন্য এক হাদীস হলঃ
أَمَّا أَنَا فَلَا اك وحنا
"যথা সম্ভব আমি টেক লাগিয়ে খাই না।" -বুখারী, আবূ দাউদ, নাসায়ী
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম টেক দিয়ে খাওয়া কেন পছন্দ করতেন না? এ প্রশ্নের জবাব হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্রা সহধর্মিনী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ)-এর মোবারক জুবানেই শুনুন। তিনি বলেন। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম (আমার জীবন আপনার উপর কুরবান হোক) "আপনি তাকিয়া লাগিয়ে আহার করুন" একথা শুনে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথা মোবারক জমিনের দিকে ঝুকিয়ে বললেন,
أَنما أنا عبد يجلس كما يجلس العبد واكل كما ياكل العبد
"আমি আল্লাহর একজন গোলাম মাত্র। তাই এই ভাবে আমার বসা শোভা পায় যেভাবে একজন গোলাম (মনিবের সামনে) বসে। আর এমন ভাবেই আমার খানা খাওয়া উচিত যেমনভাবে একজন গোলামের তার মনিবের সামনে খাওয়া শোভা পায়। -আহকামুন নবুওয়াত
চিন্তার বিষয়, এ বিনয় ও নম্রতা এবং বন্দেগী ও দাসত্বের প্রকাশ এমন ব্যক্তি থেকে প্রকাশ পেয়েছে যিনি বিশ্ব জাহানের সর্দার, সৃষ্টির মূল, যার কারণেই বিশ্ব জাহান অস্তিত্ব লাভ করেছে, যার জন্য চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের অবস্থা হলো আমরা সর্বক্ষণই উদ্ধত ও বাবুয়ানায় লিপ্ত থাকি। অসুস্থতা অথবা কোন অপারগতার কারণে কখনো টেক লাগিয়ে খাওয়া দাওয়া করলে তো কোন কথা নাই। তবে একজন সুস্থ সবল ও সামর্থবান লোকের জন্য কখনোই এভাবে খাওয়ার অনুমতি নাই। আল্লাহর কোন বান্দা তার দেওয়া নেয়ামত খাবে আর বাঁকা হয়ে বাবুয়ানা কায়দায় বসবে এটা তার দাসত্বের পরিপন্থী।