📄 খানা এবং অপব্যয়
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
كلوا واشربوا ولا تسرفوا انه لا يحب المسرفين
"তোমরা খাও, এবং পান কর তবে অপব্যয় করোনা। নিশ্চয় আল্লাহ অপব্যয়ীদের পছন্দ করেন না। -সূরাহ আরাফ: আয়াত: ৩১
পানাহার সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের উক্ত মহামূল্যবান নীতি গ্রহণ করে নেওয়ার পর হজম শক্তির গন্ডগোল এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। ইসরাফ )اسراف( শব্দটি সাধারনণত অপব্যয় ও অতিরিক্ত খরচ অর্থে ব্যবহার করা হয় অর্থাৎ সীমাতিরিক্ত খরচ।
কিন্তু খানা-পিনার ক্ষেত্রে অনর্থক খরচ অথবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়াকেই ইসরাফ বুঝায় না বরং খানা-পিনার মধ্যে দুই প্রকার ইসরাফ রয়েছে যা থেকে বিরত থাকা একান্ত জরুরী।
(১) কামমিয়াত বা পানাহারের পরিমাণের মধ্যে ইসরাফ বা অপব্যয় করা।
(২) কাইফিয়াত বা খানার কোয়ালিটি ও গুণের মধ্যে ইসরাফ করা।
কামমিয়াত বুঝবার জন্য অন্য একটি সহজ শব্দ 'পরিমাণ' মাত্রা বা সংখ্যা ইত্যাদি বলা যায়। অর্থাৎ এত পরিমাণ আহার করা যে, সহজে হজম করতে সক্ষম না হয়, যার ফলে মারাত্মক অসুখে পতিত হতে হয়। নিয়মিত বদহজমী শুরু হয়, ফলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমস্যা এবং চিন্তা-ভাবনার মধ্যে বিক্ষিপ্ততা সৃষ্টি হয়। অনুভূতি শক্তি নষ্ট হয়ে যায়, পাকস্থলী নিজ কর্মে অক্ষম হয়ে পড়ে। ঘুম বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু হয়। শরীর মোটা হওয়াটাও সাধারণত খানা-পিনার মধ্যে ইসরাফ করার ফল।
খানার কাইফিয়াত অর্থাৎ Quality গুণ বা অবস্থার মধ্যে ইসরাফ হল ঐ সকল জিনিস পানাহার করা যা তার দৈহিক চাহিদা স্বভাব ও মেজাজের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। অথবা মওসুম বা ঋতু হিসাবে উপযোগী না হওয়া। যেমন শীতকালে ঠান্ডা জাতীয় খাবার বা জ্বরের অবস্থায় জ্বরের অনুপযোগী বা প্রতিকূল গরম কিছু গ্রহণ করা। আল্লাহর কালাম যেহেতু চিরন্তন শ্বাশত ও সমগ্রবিশ্ববাসীর জন্যেই প্রযোজ্য সেহেতু তার স্বর্ণোজ্জ্বল নিয়ম পদ্ধতিও চিরন্তন শ্বাশত এবং সমগ্র বিশ্ব মানবতার জন্য কল্যাণকর।
কিছুদিন পূর্বে "লুইংগ কারনারো" (Luigi cornoro) নামে ইটালির এক লেখক এ বিষয়ের মূলনীতি সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ লিখেছেন। গ্রন্থটি সকল মহলেই সমাদৃত ও গ্রহনীয় হয়েছে। ইংরেজী এবং ইউরোপের কয়েকটি ভাষায় এই গ্রন্থ অনুদিত হয়েছে। এতদসত্ত্বেও আমরা যদি খানা পিনার ক্ষেত্রে ইসরাফে লিপ্ত থাকি তাহলে আমাদের চেয়ে দুর্ভাগা আর কে হতে পারে?
এবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত বাণীসমূহ লক্ষ্য করুন:
(১) "মুসলমান এক নাড়ি দ্বারা খায় আর কাফের ও মোনাফেক সাত নাড়ি দ্বারা খেয়ে থাকে। - বুখারী শরীফ
(২) "ক্ষুধার অতিরিক্ত ভক্ষণকারীকে খুবই ঘৃণার চোখে দেখা হয়।" - মুসনাদে দাইলামী
(৩) " যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অত্যধিক খাবে কিয়ামত দিবসে সে ঐ পরিমাণ ক্ষুধার্থ থাকবে।" - ইবনে মাজাহ
📄 বেশী খাওয়ার ক্ষতি সমূহ
تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ تَعَالَى مِنَ الرَّغْبِ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
"বেশী খাওয়া থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাও।" (الكامل لابن عدی) খানা এবং ইসরাফ অধ্যায়ে আমরা খানা পিনার মধ্যম পন্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে খানা-পিনার মধ্যে অতিরিক্ত আহারের ক্ষতিকর দিকগুলি তুলে ধরছি।
(১) ডায়েবেটিসঃ অধিক ভোজনের প্রাথমিক ফল হল ডায়াবেটিস। কেননা বেশী খাওয়ার কারণে লালাগ্রন্থীকে বেশী কাজ করতে হয়। এ কারণে অভ্যন্তরীণ আদ্রতা (রস বা insulin অর্থাৎ বহুমূত্র রোগের প্রতিষেধক) কমে যায় এবং রক্তে চিনির (Sugar) পরিমাণ বেড়ে যায়।
(২) ব্লাড প্রেসার: অধিক ভোজন রক্তের চাপ বৃদ্ধির একটা অত্যাবশ্যকীয় দ্বিতীয় কারণ। কেননা ডায়াবেটিস এবং ব্লাড প্রেসার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।
(৩) ফালেজ বা প্যারালাইসিস : প্যারালাইসিসও অধিক ভোজনের কারণে হয়ে থাকে। এতে রক্তবাহী শিরাগুলি সংকীর্ণ হয়ে যায়, ফলে রক্ত চলাচল বাঁধা প্রাপ্ত হয়। এভাবে যখন শিরাগুলি একেবারেই সংকীর্ণ হয়ে পড়ে তখন সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনুভূতিহীন হয়ে যায়। আর এ অবস্থাটি মস্তিষ্কের কোন অংশে হঠাৎ প্রকাশ পেলে মানুষ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়।
(৪) হৃদ রোগঃ শিরার সংকীর্ণতা হৃদ রোগের অন্যতম কারণ। কেননা শিরার চূড়ান্ত সংকীর্ণতা হৃদপিন্ডের সংগে সম্পর্কযুক্ত হয়। এমতাবস্থায় হৃদপিন্ডের বিবর্তন হওয়া এক অতি স্বাভাবিক ব্যাপার।
(৫) অসময়ে বার্ধক্যে পতিত হওয়া: অধিক ভোজনের ফলেই এ অবস্থা হয়ে থাকে। কেননা বেশী খেলে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলি যথাযথভাবে কাজ করতে অপরাগ হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই দুর্বল বা শক্তিহীন হয়ে যায় এবং তাকে বৃদ্ধ মনে হতে থাকে।
(৬) শরীর মোটা বা স্থূল হওয়াঃ এটাও অধিক ভোজনের কারণে হয় এবং এই অবস্থায় আরো বহু রোগের কারণ হয়। যেমন শরীরের জোড়ার রোগ ও অস্থিমজ্জার ব্যথা ইত্যাদি।
(৭) অজীর্ণ গ্যাস্টিক এবং অতিসার তথা ধ্বংসাত্মক ব্যাথাও অধিক ভোজনের ফল। এতে মানুষ পায়খানা ও প্রস্রাবের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এভাবে ভাল মানুষও (অনেক সময়) পাগল উন্মাদ পর্যন্ত হয়ে যায়।
মোটকথা অধিক ভোজ হাজরো সমস্যা সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে যদি কেউ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের উপর আমল করে, সময় মত এবং জরুরত পরিমাণ খানা খায় তবে সর্বদাই সুস্থ শরীরে সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে সক্ষম হয়। এ সম্পর্কে নিম্নের বাণীটি লক্ষ্য করুন:
"মানুষের জন্য কোমর সোজা রাখার মত কয়েক লোকমা (সামান্য) খানাই যথেষ্ট। আর যদি একান্তই বেশী খাওয়ার আবশ্যক হয়ে পড়ে তবে পেটের এক তৃতীয়াংশ খানা, এক তৃতীয়াংশ পানি দ্বারা পূর্ণ করবে এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস প্রশ্বাসের জন্যে খালি রাখবে।"
📄 অল্প অল্প খাওয়া
"হযরত জাবালা ইবনে সুহাইম (রাযি) বর্ণনা করেন, তখন ছিল দুর্ভিক্ষের বছর। আমরা ইবনে যুবায়ের (রাযি)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমাদেরকে খাওয়ার জন্যে খেজুর দেওয়া হতো। একদিন আমরা যখন খানা খাচ্ছিলাম তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি) আমাদের নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন:
لَا تُقَارِبُوا فَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ الْقِرَانِ
"তোমরা (দুইটি খেজুর) একত্রে মিলিয়ে খেয়ো না, কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোকে একত্রে খেতে নিষেধ করেছেন। অতঃপর তিনি বললেন তবে তার ভাই (যার সঙ্গে সে একত্রে খাচ্ছে) অনুমতি দিলে এর ব্যতিক্রম করে খেতে পারবে। বুখারী মুসলিম শরীফ
"হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুসর (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব বড় একটা পিয়ালা ছিল যার নাম ছিল "গারা" (১)। এটাকে চার জনে উঁচু করতে হত। (সম্ভবতঃ এটা ডেক জাতীয় বর্তন হবে। চান্তের নামায শেষ করে সকলে মিলে এটা নিয়ে যেতেন। অতঃপর এর মধ্যে সারীদ (এক প্রকার সুস্বাদু খানা) পাকান হত। সাহাবীদের (রাযি) সংখ্যা যখন বেশী হত তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাটুতে ভর করে বসে যেতেন। একদা এক গ্রাম্য লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এভাবে বসা দেখে বলল, এটা কেমন বসা? লোকটির কথা শুনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
إِنَّ اللَّهَ جَعَلَنِي كَرِيمًا وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا عَنِيدًا - ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كُلُوا مِنْ حَوَالِيْهَا وَدَعُوا ذُروَتِهَا يُبَارِكُ فِيهَا عَلَيْهِ وَسَلَّم
"নিশ্চয় মহান আল্লাহ আমাকে উদার, দয়াশীল করে সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাকে অবাধ্য হঠকারী ও উদ্ধত করেন নাই। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা বর্তনের একপার্শ্ব হতে খাও এবং উপরের অংশ বাদ রাখ। (কারণ) আল্লাহ এটা থেকে তোমাদের জন্য বরকত নাযিল করবেন।" আবূ দাউদ
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি) থেকে বর্ণিত:
الْبَرْكَتُ تَنْزِلُ فِي وَسَطِ الطَّعَامِ فَكُلُوا مِنْ حَافَتَيْهِ وَلَا تَأْكُلُوا مِنْ وَسَطِهِ
"খানার মধ্যখানে বরকত নাযিল হয়। তোমরা খানার কিনারা থেকে খাও এবং মধ্যখান থেকে খেয়ো না।" তিরমিযী শরীফ
📄 খানার মধ্যে ফুঁক দিও না
لاَ يُنْفَخُ فِي الطَّعَامِ الْحَارِفَهُوَ مَنْهِيٌّ عَنْهُ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, গরম খানার মধ্যে ফুঁক দিও না। কেননা এটা করতে নিষধ করা হয়েছে।" -মুসনাদে ইমাম আহমদ, ইবনে মাজাহ
আল্লাহ! আল্লাহ! খানার মধ্যে ফুঁক না দেওয়ার উপদেশ কতই না হেকমতপূর্ণ শিক্ষা। কারণ দাঁতের মধ্যে যে সকল অসুখ হয়ে থাকে তার কোন কোনটি সংক্রামক ব্যাধি অর্থাৎ একজন থেকে অন্যের দেহে ছড়ায়) কারো কারো মুখ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হয়। এমতাবস্থায় প্রত্যেকেই বুঝতে পারে যে, খানার মধ্যে ফুঁক দেওয়া অন্যের জন্য কতটুকু কষ্টের কারণ হয় এবং স্বয়ং ভক্ষণকারীর জন্যই বা কতটুকু ক্ষতিকর। এটা হল গরম খাদ্যে ফুঁক দেওয়ার কথা। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো বেশী গরম খানা পছন্দই করতেন না। তিনি বলতেন, এর মধ্যে বরকত হবে না। এটা সতঃসিদ্ধ কথা যে, আপনি পরীক্ষামূলকভাবে রুটির তাওয়া থেকে গরম গরম রুটি তুলে তুলে খাওয়া শুরু করুন এবং লক্ষ্য করে দেখুন সাধারণ খানার চেয়ে অধিক খেতে পারেন কি না এবং খাওয়ার সময় রুটির পরিমাণ সম্পর্কিত বোধুটুকুও থাকে কি না।" -মুসতাদরাকে, হাকিম, মুজামে তাবরানী
গরম খানা ভক্ষণে গালের ছাল উঠে যায় এবং পরিপাক তন্ত্রের সুস্থতা (অর্থাৎ স্বাভাবিক কার্যক্ষমতার উপর প্রভাব পড়ে। গরম গরম খানার মধ্যে ঠান্ডা পানি পান করাতো (আর এর প্রচলন এখন খুবই ব্যাপক) দাঁতের সঙ্গে বড় জুলুম করার শামিল। বিশেষ করে গরমকালে বরফের ঠান্ডা পানি পানকারীর জন্য গরম খানা খাওয়া খুবই ক্ষতিকর। সুতরাং ধীরস্থির ভাবে এতমিনানের সঙ্গে খানা খাওয়া উচিত, যাতে ফুঁক দিয়ে ঠান্ডা করার প্রয়োজন না হয় বা দাঁত ও পরিপাকের জন্য ক্ষতিকর না হয়।