📄 খানা খাওয়ার জন্য বসার পদ্ধতি
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে বসে খানা খেতেন? এ প্রশ্নের জবাবের জন্যে নিম্নের হাদীসটি দেখুন-
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .... عَلَى رُكْبَتَيْهِ وَجَلَسَ عَلَى ظَهْرٍ قَدَمَيْهِ رُبَّمَا نَصَبَ رِجْلَهُ الْيُمْنَى وَجَلَسَ عَلَى الْيُسْرَى
"খানা খাওয়ার সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই হাটু গেড়ে স্বীয় কদম যুগলের পিঠের উপর বসতেন। অধিকাংশ সময় ডান পা খাড়া করে রেখে বাম পায়ের উপর বসতেন। (বর্ণনাকারী বসার উক্ত পদ্ধতি বর্ণনা করে এ কথাও বলেছেন যে, এ পদ্ধতিটি স্বীয় মহান রব্বুল আলামীনের প্রতি মনোযোগী হওয়ার বহিঃপ্রকাশ ছিল। এবং এতে খানার প্রতি আদব ও সম্মানের প্রকাশ ঘটতো।
📄 খানার মধ্যে তাড়াতাড়ি করা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দিষ্ট বসার পদ্ধতির কথা একটু ভেবে দেখুন, তা কতইনা স্বাভাবিক ছিল এবং এভাবে বসায় কিরূপ আরামবোধ হয়। নিঃসন্দেহে মানুষ এভাবে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলেও ক্লান্তি অনুভব হবে না। কিন্তু আজ আমরা এভাবে না বসে যে পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকি এটা স্বভাবতই এক প্রকার বোঝা (ঝামেলা)। মনে হয়। যে সকল সাহেবগণ দাঁড়িয়ে অর্থাৎ BUFFET -এ খাওয়াকে সম্মান ও গৌরব মনে করে তাদের চিন্তা করা উচিত যে, তারা শুধু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতেরই বিরোধিতা করছে না বরং খানাকেও অসম্মান করছে এবং সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার মধ্যে অযথা কষ্টও করছে। তাছাড়া বিভিন্ন প্রকার খানা টেবিলে রাখার ফলে একটা টানাটানি অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে।
অন্যদিকে দস্তরখানার উপর বসে খানা খেতে খুবই অল্প জায়গার প্রয়োজন হয়। তাছাড়া এতে ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পারিক সসুম্পর্কের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটে তা অন্য কোন পদ্ধতিতে সম্ভব নয়।
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا قُدِّمَ الْعِشَاءُ فَابْدَوْا بِهِ قَبْلَ أَنْ تُصَلُّوا صَلَاةَ الْمَغْرِبِ وَلَا تَعْجَلُوا عَنْ عَشَائِكُمْ
"হযরত আনাস (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, খানা সামনে এলে মাগরিবের নামায আদায়ের পূর্বেই খানা খেয়ে নাও এবং খানার মধ্যে তাড়াহুড়া করো না।" -বুখারী শরীফ
রাত্রের খানাকে عشا আশাউন বলা হয়। অধুনা সভ্যগণ রাত্রের খানা খুবই দেরী করে খেয়ে থাকে। খানা বিলম্বে খেয়ে এবং খাওয়ার পরই ঘুমিয়ে গেলে খানা ঠিকমত হজম হয় না। হজম শক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ডাক্তার ছিলেন না বটে, তবে লক্ষ্য করার বিষয় হল তাঁর কথাগুলি কতই না হেকমতপূর্ণ। তিনি বলেন দুপরের খানা খাওয়ার পর কায়লুলাহ অর্থাৎ কিছুক্ষণ শুয়ে আরাম করবে এবং রাত্রের খানা খাওয়ার পর চল্লিশ কদম হাঁটাহাঁটি করবে।
উপরোল্লিখিত হাদীসের উদ্দেশ্য হল, ক্ষুধার সময় সকল কাজের পূর্বে খানা খাবে। যদি কখনও এমনটি ঘটে যায় যে, খানা সামনে রাখা হয়েছে আর এদিকে নামাযের আযান হয়ে গেছে তাহলে এমতাবস্থায় প্রথমে খানা খাবে অতঃপর নামায আদায় করবে।
মাগরিবের নামাযঃ যার ওয়াক্ত খুবই সংকীর্ণ সে ক্ষেত্রেও ঠিক একই হুকুম। অর্থাৎ ওয়াক্ত চলে যাওয়ার ভয়ে জলদী জলদী খাবে না। বরং হাদীসে বলা হয়েছে- খানায় জলদী করো না; ধীরে ধীরে আরামের সঙ্গে খাও।
মনে রাখবে এমন ঘটনা কদাচিতই (কখনও কখনও) ঘটে থাকে। তবে এটাকে এমন অভ্যাসে পরিণত করে নিবে না যে, ঠিক নামাযের সময় খানা সামনে রাখা হবে আর নামায বাদ দিয়ে খানা খেতে বসে যাবে।
📄 আল্লাহর নামে ডান হাত দ্বারা খানা শুরু করা
খানা-পিনার আদব সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় ছাড়াও দুটি বিষয় সর্বদা খেয়াল রাখা খুবই জরুরী।
(১) খানা পিনা আল্লাহর নামে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা।
(২) ডান হাত দ্বারা পানাহার করা।
এ বিষয়গুলির উপকারিতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে নিজের পক্ষ হতে কিছু না লিখে সরাসরি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুল্যবান বাণী সমূহ উল্লেখ করার সৌভাগ্য লাভ করছি।
١ - عن عمرو بن أبي سلمة رضي الله عنه قال لي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَمَّ اللَّهَ كُلَّ بِيَمِينِكَ وَكُلِّ مِمَّا يَلِيكَ
(১) "হযরত আ'মর ইবনে আবূ সালমা (রাযিঃ) বলেন, আমাকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নাম লও, অর্থাৎ বিসমিল্লাহ পাঠ কর, ডান হাত দ্বারা খাও এবং নিজের সম্মুখ থেকে খাও।" -বুখারী, মুসলিম
(২) হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَدٌ كُرِ اسْمَ اللَّهِ تَعَالَى فَإِنْ نَسِيَ أَنْ يَذْكُرَ اسْمَ اللَّهِ تَعَالَى فِي أَوَّلِهِ فَلْيَقُلْ بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ .
"তোমাদের মধ্যে কেউ যখন খানা খেতে শুরু করবে প্রথমে আল্লাহ তা'আলার নাম নিয়ে খানা আরম্ভ করবে। যদি প্রথমে আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যায় তবে বিসমিল্লাহি আউওয়ালিহি ওয়া আখিরিহি বলবে-
-আবু দাউদ, তিরমিযী
(৩) "হযরত জাবের (রাযি) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, কোন ব্যক্তি যদি স্বীয় ঘরে প্রবেশের সময় এবং খানা খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ পড়ে তবে শয়তান তার সাথীদের বলতে থাকে, চলো! এটা তোমাদের জন্য রাত্রি কাটাবার এবং খানা খাওয়ার স্থান নয়। পক্ষান্তরে কোন ব্যক্তি যদি ঘরে প্রবেশের সময় এবং খানু শুরু করার সময় বিসমিল্লাহ না পড়ে তবে শয়তান বলতে থাকে তোমাদের জন্য রাত্রি যাপন করার এবং খানা খাওয়ার স্থান উভয়ই মিলে গেছে।" - মুসলিম শরীফ
(৪) হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা (রাযি) বলেন, একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ছয়জন সাহাবী (রাযি)-এর সঙ্গে খানা খাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে একজন গ্রাম্য অশিক্ষিত লোক এসে তাদের সঙ্গে খেতে বসে দুই লোকমাতেই সব খানা খেয়ে ফেলল। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, এই ব্যক্তি যদি আল্লাহর নামে শুরু করত তবে তোমাদের সকলের জন্যেই এই খাদ্য যথেষ্ট হত।" তিরমিযী শরীফ
(৫) হযরত ইবনে ওমর (রাযি) থেকে বর্ণিতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَأْكُلُ أَحَدٌ مِنْكُمْ بِشِمَالِهِ وَلَا يَشْرَبُنَ بِهَا فَإِنَّ الشَّيْطَنَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ وَيَشْرَبُ بِهَا
"তোমাদের কেউ বাম হাত দিয়ে খেও না। কেননা শয়তান বাম হাত দ্বারা পানাহার করে।" সূনানে আবূ দাউদ, তিরমিযী
📄 খানা এবং অপব্যয়
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
كلوا واشربوا ولا تسرفوا انه لا يحب المسرفين
"তোমরা খাও, এবং পান কর তবে অপব্যয় করোনা। নিশ্চয় আল্লাহ অপব্যয়ীদের পছন্দ করেন না। -সূরাহ আরাফ: আয়াত: ৩১
পানাহার সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের উক্ত মহামূল্যবান নীতি গ্রহণ করে নেওয়ার পর হজম শক্তির গন্ডগোল এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। ইসরাফ )اسراف( শব্দটি সাধারনণত অপব্যয় ও অতিরিক্ত খরচ অর্থে ব্যবহার করা হয় অর্থাৎ সীমাতিরিক্ত খরচ।
কিন্তু খানা-পিনার ক্ষেত্রে অনর্থক খরচ অথবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়াকেই ইসরাফ বুঝায় না বরং খানা-পিনার মধ্যে দুই প্রকার ইসরাফ রয়েছে যা থেকে বিরত থাকা একান্ত জরুরী।
(১) কামমিয়াত বা পানাহারের পরিমাণের মধ্যে ইসরাফ বা অপব্যয় করা।
(২) কাইফিয়াত বা খানার কোয়ালিটি ও গুণের মধ্যে ইসরাফ করা।
কামমিয়াত বুঝবার জন্য অন্য একটি সহজ শব্দ 'পরিমাণ' মাত্রা বা সংখ্যা ইত্যাদি বলা যায়। অর্থাৎ এত পরিমাণ আহার করা যে, সহজে হজম করতে সক্ষম না হয়, যার ফলে মারাত্মক অসুখে পতিত হতে হয়। নিয়মিত বদহজমী শুরু হয়, ফলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমস্যা এবং চিন্তা-ভাবনার মধ্যে বিক্ষিপ্ততা সৃষ্টি হয়। অনুভূতি শক্তি নষ্ট হয়ে যায়, পাকস্থলী নিজ কর্মে অক্ষম হয়ে পড়ে। ঘুম বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু হয়। শরীর মোটা হওয়াটাও সাধারণত খানা-পিনার মধ্যে ইসরাফ করার ফল।
খানার কাইফিয়াত অর্থাৎ Quality গুণ বা অবস্থার মধ্যে ইসরাফ হল ঐ সকল জিনিস পানাহার করা যা তার দৈহিক চাহিদা স্বভাব ও মেজাজের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। অথবা মওসুম বা ঋতু হিসাবে উপযোগী না হওয়া। যেমন শীতকালে ঠান্ডা জাতীয় খাবার বা জ্বরের অবস্থায় জ্বরের অনুপযোগী বা প্রতিকূল গরম কিছু গ্রহণ করা। আল্লাহর কালাম যেহেতু চিরন্তন শ্বাশত ও সমগ্রবিশ্ববাসীর জন্যেই প্রযোজ্য সেহেতু তার স্বর্ণোজ্জ্বল নিয়ম পদ্ধতিও চিরন্তন শ্বাশত এবং সমগ্র বিশ্ব মানবতার জন্য কল্যাণকর।
কিছুদিন পূর্বে "লুইংগ কারনারো" (Luigi cornoro) নামে ইটালির এক লেখক এ বিষয়ের মূলনীতি সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ লিখেছেন। গ্রন্থটি সকল মহলেই সমাদৃত ও গ্রহনীয় হয়েছে। ইংরেজী এবং ইউরোপের কয়েকটি ভাষায় এই গ্রন্থ অনুদিত হয়েছে। এতদসত্ত্বেও আমরা যদি খানা পিনার ক্ষেত্রে ইসরাফে লিপ্ত থাকি তাহলে আমাদের চেয়ে দুর্ভাগা আর কে হতে পারে?
এবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত বাণীসমূহ লক্ষ্য করুন:
(১) "মুসলমান এক নাড়ি দ্বারা খায় আর কাফের ও মোনাফেক সাত নাড়ি দ্বারা খেয়ে থাকে। - বুখারী শরীফ
(২) "ক্ষুধার অতিরিক্ত ভক্ষণকারীকে খুবই ঘৃণার চোখে দেখা হয়।" - মুসনাদে দাইলামী
(৩) " যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অত্যধিক খাবে কিয়ামত দিবসে সে ঐ পরিমাণ ক্ষুধার্থ থাকবে।" - ইবনে মাজাহ