📄 কতিপয় হারাম খাদ্য
(৩) রক্ত
পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ
: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য মৃত জীব এবং রক্ত হারাম করেছেন।" সূরা বাকারা: আয়াত: ১৭৩
খানা-পিনার বস্তুর মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের হারাম হল রক্ত। মৃত্যু প্রাণী এবং শূকুরের আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত হারাম হওয়া সম্পর্কেও বারবার আলোচনা এসেছে।
(حَرَام - حَرَم) এবং (محروم) এই তিনটি শব্দ একই শব্দ মূল বা ধাতু থেকে এসেছে।
(حرم) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। তবে নিষেধের অর্থ কখনো এর সম্মানের কারণে ও হতে পারে যেমন বাইতুল্লাহ শরীফের হারাম ইত্যাদি। নিষিদ্ধতার দ্বিতীয় কারণ হলো এর নিকৃষ্টতা। যেমন মৃত প্রাণীর মাংস, শূকর, কুকুর এবং রক্ত ইত্যাদি হারাম হওয়া।
মূলত রক্ত শরীরের সকল জীবাণু, বিষাক্ত পদার্থ, ক্ষতিকর প্রভাব এবং রোগ বহনকারী। রক্তের তীব্রতা ও উষ্ণতার দ্বারাই এই ক্ষতিকর প্রভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লাহ তা'আলা রক্তকে হারাম আখ্যায়িত করে স্বীয় হেকমতের মাধ্যমে মানুষের উপর বড় মেহেরবানী করেছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, রক্ত পানকারীর নাড়ীতে পৌঁছে তার জীবানুগুলি ইমোনিয়া সৃষ্টি করে। ফলে যকৃৎ দুষণ এবং বিভিন্ন প্রকার রোগের সৃষ্টি হয়।
📄 শরাব একটা হারাম পানীয়
ইরশাদ হচ্ছে:
إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ فَاجْتَنِبُوهُ ...... فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ -
"নিশ্চয় মদ, জুয়া, মূর্তি এবং লটারী শয়তানের গর্হিত কর্ম। তোমরা এগুলি হতে সম্পূর্ণ দূরে থাক, তোমাদের মঙ্গল হবে। শয়তান মদ এবং জুয়া দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা সৃস্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখতে চায়। এখনও কি তোমরা ফিরে আসবে না।” -সূরা আনআম: আয়াত: ৯০-৯১
অন্যস্থানে আল্লাহ তা'আলা মদ এবং জুয়া সম্পর্কে বলেছেন যে, ("হে নবী!) আপনার কাছে (মানুষ) মদ এবং জুয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করছে, আপনি বলে দিন এতে গুনাহ এর উৎস রয়েছে, আর মানুষের জন্যে কিছু উপকারও নিহিত আছে।" -সূরা বাকারা: আয়াত: ২১৯
শরাব বা মদ আঙ্গুর, খেজুর, গম, জব ইত্যাদির রস দ্বারা তৈরী করা হয়। পবিত্র কোরআনের সূরা নাহল এর ৬৭ নং আয়াতে শরাব সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, এটা আকলকে বিকৃত, বুদ্ধিমত্তা ও বোধশক্তিকে বিভ্রান্ত ও অনুভূতিকে উত্তপ্ত করে স্বাভাবিক ও সুস্থ লোককে অজ্ঞান করে দেয় এবং চিন্তা শক্তি নষ্ট করে ফেলে। মদ্য পানকারীর মধ্যে এক প্রকার উত্তেজনার আধিক্য দেখা যায়, যার ফলে আজে বাজে বকতে থাকে, যে সব কথা বলা যায় না তাও বলে ফেলে। এমতাবস্থায় সে না পারে ইজ্জত সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রাখতে আর না পারে গোপনীয়তা বজায় রাখতে। এমনকি রাষ্ট্রীয় একান্ত গুরুত্বপূর্ণ গোপন কথা পর্যন্ত মাতাল অবস্থায় প্রকাশ হয়ে পড়ে।
শরাবের মাতলামীতে যেহেতু হুশ-জ্ঞান ঠিক থাকেনা, মা বোন ভাল মন্দ ইত্যাদির পার্থক্য পর্যন্ত বাকী থাকে না। সে ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য করা এবং ইবাদাতের প্রতি মনোযোগী হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
মদ্যপানে শুধু মানুষের হুশ জ্ঞানই বিগড়ে যায় না বরং পাকস্থলী নষ্ট হওয়ায় হজম শক্তির সর্বক্ষমতা ও নিয়ম বিগড়ে যায়। এতে পাকস্থলীর ব্যথা, পাকস্থলীতে ক্ষত বরং; এতে পাকস্থলীতে ক্যান্সারের মত মারাত্মক রোগও সৃষ্টি হয়। মদ্য পানে রক্তের তীব্রতা খুবই বেড়ে যাওয়ায় খুব শীঘ্র অসুস্থতা দেখা দেয়। আপাতঃ দৃষ্টিতে মদের গরম প্রভাবে বুকের রোগে শান্তি পাওয়া যায় বটে তবে প্রকৃত পক্ষে অন্তরের অবস্থা একেবারেই বিগড়ে যায়। কারণ কেন্দ্রীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলি প্রভাবিত হওয়ার ফলে প্লীহা এবং যকৃৎ - এর কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। বেশী বেশী মদ্যপান করায় প্রস্রাব বৃদ্ধি সমস্যা দেখা দেয়, এমন কি মদ্যপায়ী প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে।
এর চেয়ে বড় খারাবী এবং দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে যে, শরাব পানকারী ভাল মন্দের পার্থক্য বরং মা-বোনের চেতনা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। সে আকল বিবর্জিত এবং আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত থেকে দূরে সরে পড়ে। লা হওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
বর্তমান যুগের পশ্চিমা দেশবাসীর মত অন্ধকার যুগে আরবের অধিবাসীগণও শরাব প্রিয় ছিল। শরাব তাদের মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ইসলামের দৌলত দান করতঃ অল্প দিনের মধ্যে শরাব থেকে মুক্তি দিলেন। শরাব হারাম হওয়ার বিধান সম্বলিত হুকুম আহকাম ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হয়। তবে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত সর্বশেষ হুকুম যখন নাজিল হয় এবং মদীনার অলি গলিতে শরাব হারাম হওয়া সম্পর্কে ঘোষণা দেওয়া হয় তখনই শরাবের পাত্র, পান পাত্র ও কলসীগুলি টুকরা টুকরা হয়ে গেল। পবিত্র মদীনার গলীতে গলীতে দুর্গন্ধযুক্ত পানির মত শরাব ঢেলে ফেলা হল। অতঃপর আর কখনই তা কারো মুখের কাছে আসে নাই।
📄 মাটি খাওয়া এবং চলা ফেরা অবস্থায় খাওয়া
مَنْ أَكل الطَّيِّنَ فَكَأَنَّمَا أَعَانَ عَلَى قَتْلِ نَفْسِهِ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন "যে ব্যক্তি মাটি ভক্ষণ করে সে যেন নিজকে নিজে হত্যা করার জন্যে সাহায্য করে।" - তাবরানী
মাটি গুণগত ভাবে পবিত্র এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে নাপাকী না লাগে ততক্ষণ তা পবিত্র থাকে। তবে মাটি খাওয়ার জিনিস নয়। মাটি খাওয়া অথবা মাটি মিশ্রিত কোন কিছু খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্যে খুবই ক্ষতিকর। এখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী পাঠকগণের সামনে তুলে ধরা হল।
মাটি হজমে সাহায্য করতে পারে না এবং নিজেও হজম হতে পারে না। কেননা এটা পাকস্থলীতে স্থির থাকে এবং পেটের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
الا كُلِّ فِي السُّوقِ دَنَاءَة
অর্থাৎ "বাজারে কোন কিছু খাওয়া নিকৃষ্ট কাজ।" বাজারে চলা ফেরা অবস্থায় খাওয়া ভদ্রতা ও সভ্যতার খেলাপ এবং স্বাস্থ্য রক্ষা বিধানের পরিপন্থী। চলতে ফিরতে এটা সেটা মুখে দেওয়া পশুর আচরণ, মানুষের কাজ নয়।
📄 খাওয়ার পূর্বে হাত ধৌত করা
الْوَضُوءُ قَبْلَ الطَّعَامِ يُنفِى الْفَقْرَ وَبَعْدَهُ يَنْفِي اللَّحْمَ
"খাওয়ার পূর্বের অযু (হাত মুখ ধৌত করা) দরিদ্রতা দূর করে এবং খাওয়ার পর (হাত মুখ) ধৌত করায় স্থূলতা দূর হয়।”
অযূর আভিধানিক অর্থ ধৌত করা ও পবিত্র করা। উলামাগণ তিন প্রকার অযূর উল্লেখ করে থাকেন।
(১) অযূয়ে সালাত বা নামাযের অযূ। এতে হাত মুখ ধৌত করা ব্যতীত মাথা মাসেহ করা ও পা ধৌত করা ফরজ। কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়া সুন্নাত।
(২) অযূয়ে নাউম বা ঘুমের অযূ। এ অযূতে হাত মুখ ধৌত করতে হয় এবং ইস্তিঞ্জা করতে হয়।
(৩) অযূয়ে তায়াম বা খাওয়ার অযূ। এ অযূতে হাত ধৌত করা ও কুলি করা সুন্নাত।
হযরত সালমান ফারসী (রাযি) বর্ণনা করেন, আমি তাওরাত কিতাবে পড়েছি, খাওয়ার পূর্বে অযু করায় বরকত নাযিল হয়। আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ সম্পর্কে আলোচনা করলে তিনি বললেন -
بركت الطعام الوضوء قبله والوضوء بعده
"খাওয়ার পূর্বে এবং খাওয়ার পরে অযু করলে খানায় বরকত হয়।" -সূনানে আবূ দাউদ, তিরমিযী
আজো অধিকাংশ মানুষের সামনে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী সুন্নত বিষয় অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তা হল রুমাল অথবা তোয়ালে ইত্যাদি দ্বারা হাত মোছা (শুষ্ককরা) অথবা না মোছার ব্যাপারে হুকুম কি?
মূলতঃ সুন্নত হল খাওয়ার পূর্বে হাত ধৌত করার পর কোন কাপড় বা তোয়ালে দ্বারা হাত না মোছা। অবশ্য খাওয়ার পর হাত ধৌত করে অবশ্যই কোন কাপড় অথবা তোয়ালে দ্বারা হাত মোছন করা যাবে। কিন্তু আশ্চর্য! নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ পদ্ধতি কতই না হেকমতপূর্ণ। কারণ রুমাল হোক অথবা তোয়ালে হোক তাতে জীবানু অথবা ময়লা ইত্যাদি থাকা খুবই সম্ভব। তাই খানা খাওয়ার জন্য হাত ধৌত করার পর রুমাল তোয়ালে দ্বারা হাত মুছে ফেললে হাত ধোয়ার সমস্ত উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে গেল।