📄 হালাল খাদ্য
কোন খাদ্য জায়েয অথবা নাজায়েয হওয়ার মৌলিক শর্ত দুটি। প্রথমটি হলো খাদ্য হালাল হওয়া। দ্বিতীয়টি হলো পবিত্র হওয়া। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ হচ্ছেঃ
يَاأَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا
"হে মানব! জমিনে যা কিছু রয়েছে তা থেকে হালাল ও পবিত্র জিনিসগুলি খাও।” -সূরা বাকারাঃ আয়াতঃ ১৮৬
(১) হালাল : ঐ সকল জিনিসকে বলে যা শরীয়ত অনুমোদিত। এবং তা গ্রহণ করাকে শরীয়ত নিষেধ করে নাই। যেমন দুধ, ঘি, ফল, শাক-সব্জি, হালাল জীব-জন্তুর গোশত ইত্যাদি। তবে শরয়ী অনুমোদনের সাথে সাথে উক্ত হালাল বস্তু অবশ্যই জায়েয পন্থায় অর্জিত হতে হবে। নাজায়েয পন্থায় উপার্জিত অথবা প্রাপ্ত হলে চলবে না। যেমন চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, ছিনতাই, অথবা কোন নাহক পন্থায় অর্জিত জীবিকা হালাল নয়।
(২) পবিত্রতা: খাদ্য হালাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় শর্ত হলো, তা পবিত্র হতে হবে। কারণ কোন বস্তু যতই হালাল এবং বৈধ উপায়ে তা অর্জিত হোক না কেন, যদি এর মধ্যে নাজায়েয নাপাক কিছু মিশ্রিত হয়ে যায় তবে তা আর জায়েয থাকে না। নিম্নের উদাহরণ দ্বারা উক্ত শর্তটি সুস্পষ্ট করা হলো। মোরগ একটি হালাল প্রাণী। শরীয়ত এর গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তথাপি তা বৈধ হওয়ার জন্য চুরিকৃত না হওয়া, অবৈধ পন্থায় উপার্জিত না হওয়া, মৃত না হওয়া বরং নিয়মানুযায়ী জবাইকৃত হওয়া শর্ত। এমন কি উক্ত শর্তাবলী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যদি গোশতের ডেগের মধ্যে নাপাকী পতিত হয় তবে সমস্ত গোশতই নাপাক হয়ে খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে যায়। কতইনা পরিতাপের বিষয় উচু তলার লোকদের জন্য যাদের থেকে হারাম হালালের পার্থক্য একেবারে উঠেই গেছে। তবে সাধারণ লোকদের মধ্যে এ বিষয়ে কিছু সতর্কতা দেখা গেলেও তারা জায়েয নাজায়েযের প্রতি তেমন খেয়াল করে না। আর পাক-নাপাকের প্রতি তো সাবধানতা মোটেই নাই।
📄 কতিপয় হারাম খাদ্য
(১) মৃত জীব-জন্তু:
اِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ
ইরশাদ হচ্ছেঃ ........ "নিঃসন্দেহের তোমাদের উপর মৃত প্রাণীর গোশত হারাম করা হয়েছে।" -সূরাহ বাকারা আয়াতঃ ১৭৩
হারাম প্রাণীর মধ্যে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যাবলী বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়:
(ক) জবাই ব্যতীত রোগ অথবা অন্য কোন কারণে স্বাভাবিক মৃত প্রাণী।
(খ) গলাটিপে মারা প্রাণী।
(গ) আঘাত লেগে মৃত্যু হয়ে যাওয়া প্রাণী।
(ঘ) উপর থেকে পড়ে মৃত্যুবরণকারী প্রাণী।
(ঙ) শিং এর আঘাতে মৃত্যু হওয়া প্রাণী।
(চ) বন্য বা হিংস্র জন্তুর খাওয়ার কারণে মৃত্যুবরণকারী প্রাণী।
(ছ) কোন পূজা বা বলীর বেদীর উপর জবাই কৃত প্রাণী।
(জ) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে জবাইকৃত প্রাণী।
হারাম প্রাণী সমূহের বিস্তারিত বর্ণনা পবিত্র কোরআনের নিম্নোক্ত স্থানসমূহে রয়েছে।
সূরা বাকারা: আয়াত ১৭৩
সূরা মায়েদা: আয়াত: ৩
সূরা আনআম: আয়াত: ১১৮, ১৬১, ১৫৪
সূরা নাহল: আয়াত: ১১৫
মৃত প্রাণীর গোশত খাওয়া নিষেধ। এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বড় হেকমত নিহিত রয়েছে। যদিও আমরা এই হেকমত বুঝতে সক্ষম নই তবুও আল্লাহ তা'আলার হুকুম পালনের মধ্যেই আমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
নিম্নের বিষয়গুলির কারণে প্রাণীর মৃত্যু হতে পারে।
* বার্ধক্য, শারীরিক দুর্বলতার কারণে ক্রমে এতে দুর্বল হয়ে পড়ে যে, তার জীবনীশক্তিই রহিত হয়ে যায়।
* শারীরিক অসুস্থতার কারণে শরীর এবং গোশতে কোন প্রকার অস্বাভাবিকতা সৃষ্টির ফলে মৃত্য হয়
* বাহ্যিক দুর্ঘটনা অথবা অভ্যন্তরীণ বিষাক্ত পয়জনে মৃত্যু হয়।
* কোন বিষাক্ত প্রাণী সাপ ইত্যাদির দংশন মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকে।
উপরোল্লেখিত যে কোন কারণেই মৃত্যু হোক না কেন মৃত প্রাণীর মাংসে বিষাক্ত পয়জন, দুষিত রক্ত এবং ক্ষতিকর পয়জন ও জীবাণুর সমাবেশ ঘটে। ফলে তা কেউ ভক্ষণ করলে শারীরিক রোগের সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাছাড়া যে সকল প্রাণীর মৃত্যু জবাই ছাড়া হয় ও রক্ত প্রবাহিত না হয় তার বিষাক্ত জীবানু শরীরে থেকে যায়। আর যে সকল প্রাণী দেব-দেবীর নামে অথবা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে জবাই করা হয় এরূপ জন্তুর গোশত খেলে আকীদা নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মৃত জন্তুর গোশত হারাম করে দিয়েছেন।
📄 কতিপয় হারাম খাদ্যের বর্ণনা
(২) শূকরের মাংস
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
اِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ
"তোমাদের উপর মৃত প্রাণী, রক্ত এবং শুকরের মাংস হারাম করা হয়েছে, (সূরা বাকারা: আয়াত: ১৭৩)
এ আয়াত ছাড়াও শূকরের মাংস হারাম হওয়ার হুকুম সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ সূরা মায়েদা : আয়াত: ৩, সূরা আনআম: আয়াত: ১৪৫, সূরা নাহল: আয়াত: ১১৫ ইত্যাদি উল্লেখ করা যেতে পারে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত দুর্গন্ধযুক্ত এবং সীমাতীত অপবিত্র ঘৃণিত জন্তুর মাংস সম্পূর্ণরূপে হারাম বলেছেন। তাই মজুবত আকীদার মুসলমানগণের নিকট এটা এত ঘৃণিত যে, উক্ত জন্তুটির নাম লওয়াকেও তারা সহ্য করতে পারে না। সূরা আনআমের ১৫৪ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা এটাকে 'রিজসুন' এবং ফুসুক অর্থাৎ সীমাহীন অপবিত্র ও আল্লাহর হুকুমের নাফরমানী বলে উল্লেখ করেছেন।
শূকর পৃথিবীর নাপাক প্রাণীকুলের অন্তর্ভুক্ত একটা ঘৃণিত প্রাণী। এটা ময়লা আবর্জনার উপর মুখ লাগাতে থাকে, নাপাকী খায়, নোংরা স্বভাব বিশিষ্ট, এর মধ্যে নাই লজ্জা শরমের কোন বালাই, মেজাজ সাংঘাতিক উগ্র, আর রক্ত ক্ষতিকর জীবাণুর ভান্ডার এবং মাংস রূহানী এবং শারীরিক ক্ষতির মূল।
শূকরের গোশত সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞানের অভিমত খুবই শিক্ষাপ্রদ। গবেষণায় জানা গেছে যে, ক্রমাগত এই গোশত ব্যবহারে চর্ম রোগ, যকৃৎ এবং নাড়ীর রোগ, আমাশয়, পাতলা পায়খানা, মূত্র থলীর সমস্যা, পেটে ক্রিমির আধিক্য, হৃদরোগ ও ক্যান্সার হয়ে থাকে। এবং মাংস থেকে সৃষ্ট পোকা নাড়ী এবং রক্তে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে পৌছে মৃগী রোগ সৃষ্টি করে। এবং চর্বি ব্যবহারে রক্তে কোলিস্টোল বেড়ে যাওয়ায় রক্তবাহী ধমনী (শিরা) সংকীর্ণ হয়ে যায় এবং শিরা সংকুচিত হওয়ায় রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত ঘটে। যার প্রতিক্রিয়া হিসাবে অবশ্যই প্যারালাইসিস অথবা মানসিক রোগ দেখা দেয়। সচরাচর শূকরের মাংস ভক্ষণকারীদের চামড়ার উপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা সৃষ্টি হয় যা একটা স্থায়ী চর্মরোগের আকার ধারণ করে। এ ছাড়াও শূকরের মাংস খাওয়ায় ছোট বড় আরো অনেক প্রকার রোগ হয়ে থাকে।
পবিত্র কুরআন মজীদ ছাড়াও ইঞ্জিল শরীফেও শূকরকে হারাম বলা হয়েছে। কিন্তু আজ সমস্ত পাশ্চাত্য দেশে শূকরের মাংস প্রিয় হয়ে উঠেছে এবং তাদের দেখা দেখি প্রাচ্য দেশগুলিও এর প্রতি ধাবিত হচ্ছে। এটা সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত বাস্তব একটা বিষয় যে, শূকরের মাংসভোজী জাতি এবং গোত্র উক্ত বেহায়া জন্তুর মতই নির্লজ্জ ও বেশরম, কারণ মাদী শূকর একটি মাত্র পুরুষ শূকরের সঙ্গমে গর্ববতী হয় না। বরং তাদের গর্ভধারণের জন্য একটার পর একটা শূকরের বারবার সঙ্গমের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক পশুও এমন নির্লজ্জতা পছন্দ করে না।
সুতরাং শূকরের মত জানোয়ার যার মাংস ভক্ষণে রূহানী এবং চারিত্রিক রোগ সৃষ্টি হয়, এর ধারে কাছে যাওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
📄 কতিপয় হারাম খাদ্য
(৩) রক্ত
পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ
: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য মৃত জীব এবং রক্ত হারাম করেছেন।" সূরা বাকারা: আয়াত: ১৭৩
খানা-পিনার বস্তুর মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের হারাম হল রক্ত। মৃত্যু প্রাণী এবং শূকুরের আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত হারাম হওয়া সম্পর্কেও বারবার আলোচনা এসেছে।
(حَرَام - حَرَم) এবং (محروم) এই তিনটি শব্দ একই শব্দ মূল বা ধাতু থেকে এসেছে।
(حرم) এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। তবে নিষেধের অর্থ কখনো এর সম্মানের কারণে ও হতে পারে যেমন বাইতুল্লাহ শরীফের হারাম ইত্যাদি। নিষিদ্ধতার দ্বিতীয় কারণ হলো এর নিকৃষ্টতা। যেমন মৃত প্রাণীর মাংস, শূকর, কুকুর এবং রক্ত ইত্যাদি হারাম হওয়া।
মূলত রক্ত শরীরের সকল জীবাণু, বিষাক্ত পদার্থ, ক্ষতিকর প্রভাব এবং রোগ বহনকারী। রক্তের তীব্রতা ও উষ্ণতার দ্বারাই এই ক্ষতিকর প্রভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। আল্লাহ তা'আলা রক্তকে হারাম আখ্যায়িত করে স্বীয় হেকমতের মাধ্যমে মানুষের উপর বড় মেহেরবানী করেছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, রক্ত পানকারীর নাড়ীতে পৌঁছে তার জীবানুগুলি ইমোনিয়া সৃষ্টি করে। ফলে যকৃৎ দুষণ এবং বিভিন্ন প্রকার রোগের সৃষ্টি হয়।